প্রথম আলো বাজেট সংলাপ ২০১২-১৩: বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ১৫-০৬-২০১২
null
আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও অর্থনীতির কোনো অঙ্কই বলছে না যে তা অর্জন করা সহজ হবে।
প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘প্রথম আলো বাজেট সংলাপ, ২০১২-১৩’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। আলোচনায় অংশ নেন দেশের তিনজন বিশেষজ্ঞ। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার জন্যই এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। আলোচকেরা প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এ ছাড়া বাজেট কাঠামো এবং এর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, তিনটি অনুমান সত্য হলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই হারে প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
আকবর আলি খান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘আমরা যখন প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি, তখন কেউ কেউ বলে, সেটা নিয়ে এত কথা বলার কী আছে। বছর শেষে প্রবৃদ্ধি যা হওয়ার তা-ই হয়। আসলে এ নিয়ে কথা বলার কারণ হলো, প্রবৃদ্ধি সব সময় সরলরৈখিকভাবে আসে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব থাক আর মনা পাগলাই থাক, প্রবৃদ্ধির হার একই থাকবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, যদি তিনটি অনুমান সত্য হয়, তাহলে নতুন বাজেটে প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। সেগুলো হলো: আসছে অর্থবছরে দেশে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ২০ শতাংশ হারে কমবে এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভালো ভালো কথা বলার জন্য। এটিতে কোনো সমস্যা দেখি না। অর্থমন্ত্রী যদি ভালো কথা না বলেন, তাহলে সকলের মাঝে একধরনের নৈরাশ্য তৈরি হবে। তবে অর্থমন্ত্রীকে খেয়াল রাখতে হবে, ভালো কথা বলতে গিয়ে তিনি যেন অতিরঞ্জিত কোনো কথা বলে না ফেলেন। যদি সেটি হয়, তাহলে তিনি খেলো হয়ে যাবেন। অর্থমন্ত্রীর এবারের পুরো বাজেট বক্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে বিশ্বাসযোগ্যতার বেশ অভাব আছে।’
আকবর আলি খান বলেন, গত মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) লেখা চিঠিতে অর্থমন্ত্রী নিজেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকট প্রলম্বিত হবে বলে মত দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অর্থনীতির কিছু সংকটের কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি ও বাজেটের আকার নিয়ে আমার তেমন কোনো বিরোধিতা নেই। ঘাটতি বেশি হলেই একেবারে আসমান ভেঙে পড়বে না। আবার উচ্চাভিলাষী বাজেট—এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একমত নই।’
সাবেক এই অর্থসচিব আরও বলেন, ‘আমাদের যে অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার, তার জন্য বড় বাজেটই বরং দরকার। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি। এই ঘাটতি অর্থনীতির বড় নিয়ামক। আমি যদি দেখি সহজে ডলার ধার পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে আমি বলব ১০-১২ শতাংশ বাজেট ঘাটতিও কোনো বিষয় নয়।’
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অনেক সরকারি কর্তাব্যক্তি বলেন, “আইএমএফের ঋণ নিয়েছি তাতে সমস্যা কী। ব্যাংকের কাছ থেকেও আমরা ঋণ নিই।” কিন্তু আমি বলি, আইএমএফ ব্যাংকও না, হাসপাতালও না। সেখানে তারাই যায়, যারা ইনটেনসিভ কেয়ারে থাকার উপযুক্ত। অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির সংকট দূর করতে যে ডাক্তারের (আইএমএফ) কাছে গেছেন, তিনি বলেছেন, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আমাদের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। তিনি এও বলেন, সরকার তো আমাদের কথা শুনে না। তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের কথা না শুনে যদি আইএমএফের কথাগুলো ঠিকমতো শুনে, সেটিও মঙ্গলজনক হবে। আমরাও চাই আইএমএফের সঙ্গে করা চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হোক। সেটি হলে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি পাব।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের বিষয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে বড় সমস্যা, সময়মতো টেন্ডার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া। চার মাসের সময় দিয়ে টেন্ডার যদি চার মাসে সম্পন্ন করা না যায়, তাহলে কোনো ভদ্রলোকই ব্যবসা করতে আসবেন না।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আকবর আলি বলেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে দু-তিন কোটি মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাকি ১২ কোটি হয়তো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কিছুটা খাপখাইয়ে নিতে পারে।
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বাজেটের বিভিন্ন দিকের প্রাক্কলনে সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বব্যাংক বলেছে আগামীতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার বলছে, ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই, যেখানে তিন বছর ধরেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহও সন্তোষজনক নয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, আগামীতে জনপ্রশাসনে এমন কী বিপ্লব হয়ে যাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সুশাসন ও বিভিন্ন সংস্কারের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজ অবশ্য বলেন, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়-ব্যয় ইত্যাদিতে বাংলাদেশ ভালো করেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রতি দশকে এক শতাংশ করে। প্রতি সাত বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ এবং প্রতি ২১ বছরে তা আট গুণ হওয়ার উদাহরণ অনেক দেশই তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পক্ষেও এ রকম অর্জন করা অসম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন। তিনি বলেন, গত দুই দশকের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির প্রবণতাকে বিবেচনায় নিলে তা ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ হওয়াই যথেষ্ট ছিল। তবে আগামীতে তা যদি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
বৈদেশিক সাহায্য প্রসঙ্গে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘২০০৬ সালে কিন্তু সাহায্য বেশ এসেছিল। হঠাৎ করে কী হলো। এখন আমাদের মধ্যেই হতাশার সুর যে আগামীতেও এ সাহায্য খুব বেশি আসবে না।’ বিনায়ক সেনের প্রশ্ন, ‘এটা কি পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়টি প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার কারণে, নাকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সবকিছুই গোলমেলে লাগছে।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বিনায়ক সেন বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়িত না হওয়ার কোনো যোগাযোগ নেই। দুর্নীতিবাজ আমলা হলে বরং শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করত। কারণ, কাজ হলেই না হয় কিছু পাওয়া যায়।’ এ বিষয়ে বিনায়ক সেন বলেন, আমলারা কি ইংরেজি বোঝেন না, না দাতাদের ভাষা বোঝেন না—প্রশ্ন তোলা যায়। তবে এই যদি কেন্দ্রীয় সরকারের বাস্তবতা হয়, বাস্তবায়নের দায়িত্ব বরং স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়।
দেশে অদ্ভুত এক রাজনৈতিক দর্শন কাজ করছে মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার কথাটি কি এখন শুনতে পান? এখন তো সবই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী।’ অবকাঠামো বলতে শুধু সড়ক অবকাঠামো বোঝানো হয়ে থাকে—এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিনায়ক সেন বলেন, ‘অথচ যেকোনো ভালো শহরের বৈশিষ্ট্য হলো এমন গণপরিবহন থাকা, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে শহরে এসে কাজ সেরে আবার তাঁরা শহরের বাইরে চলে যেতে পারেন।’
খেলাপি ঋণ দুই থেকে তিনবার পুনঃ তফসিল করা যেতে পারে, ১০ থেকে ১২ বার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফল কী, প্রবাসী-আয়ের সুফল সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না—এসব বিষয় উল্লেখ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের ফলে কী পরিবর্তন হয়েছে বা দেশের উন্নয়নে এসব প্রতিবেদন কীভাবে অবদান রাখছে, তা নিয়ে গবেষণার তাগিদ দেন বিনায়ক সেন।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। সঞ্চালক ছিলেন বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন। এ ছাড়া প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, উপসম্পাদক আনিসুল হক, প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহিছ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কোনো স্থায়ী সমাধান নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২১-০৬-২০১২

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তাঁরা এ খাতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
পাশাপাশি তাঁরা এ-ও বলেছেন, দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্বল্প সময়ের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি চালু থাকতে পারে। তবে প্রকৃত উন্নয়নের পথে যেতে হলে দরকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আর এ জন্য সবার আগে শিক্ষার উন্নয়নে নজর দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক, শিক্ষা খাতে তিন বছর ধরেই বাজেটে বরাদ্দ কমছে।
প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল বুধবার ‘অতিদারিদ্র্য নিরসন: সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ব্র্যাক অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জের সহযোগিতায় প্রথম আলো বৈঠকটির আয়োজন করে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এতে স্বাগত বক্তব্য দেন। বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী ও হোসেন জিল্লুর রহমান, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান এ কে এম নুরুন্নবী, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন, বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি আখতার আহমেদ, ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির পরিচালক শীপা হাফিজা, প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক প্রমুখ।
টেকসই নিরাপত্তা: রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, দারিদ্র্য নিরসনই মূল কথা নয়। গতানুগতিক দারিদ্র্য নিরসনের চিন্তার বাইরে গিয়ে গোটা বিষয়কে দেখা দরকার সামাজিক ন্যায়বিচারের অর্থে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এখন আর টেবিলের এক পাশে পড়ে থাকা বিষয় নয়। এ বিষয়ে গত ৩০ বছরে আমরা কী করলাম, তার হিসাব মেলানো দরকার।’ তিনি বলেন, ‘ভারত এ বিষয়ে সাংবিধানিক অধিকার তৈরির পর বাস্তবায়নের দিকে গেছে। আর আমরা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করছি।’ তিনি বলেন, খোলাবাজারে চাল বিক্রির (ওএমএস) মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা যাবে না।
মাহবুব হোসেন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর চালিয়ে নিতে হবে। তিনি মনে করেন, এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ঠিকই আছে। দরকার মূলত কর্মসূচিগুলোর কর্মদক্ষতা। অনেক কর্মসূচি রয়েছে ত্রাণ হিসেবে। পানিতে ডুবে গেলে মানুষের নাকটা যেমন শুধু ভেসে থাকে, অনেকটা সে রকম। এ থেকে উত্তরণ দরকার।
মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে দারিদ্র্য নিরসন হবে। সরকারের অন্য খাতগুলোকেও সমানভাবে কাজ করতে হবে।’
শীপা হাফিজা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলোর কোনো তথ্যভান্ডারই এখনো তৈরি হয়নি। তা ছাড়া যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলোতে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নীতি গ্রহণ করা দরকার আসলে ‘মানুষ’কে মাথায় রেখে, যা খুব বেশি হয় না।
আনিসুল হক বলেন, যমুনা সেতু হওয়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। তৈরি পোশাক কারখানা, নির্মাণ শ্রমিক, ভুট্টা চাষ, পোলট্রি ইত্যাদিতে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, কর্মসূচিগুলো বেশির ভাগই প্রকল্পভিত্তিক। প্রকল্প শেষ হলেই যেন সব শেষ হয়ে যায়। আর যেখানে যত বেশি প্রকল্প, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবও তত বেশি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক কারণেও কিছু কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। যেমন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’। ফলাফল কী হবে, এখনই বলা যাবে না। আবার কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেখানে তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য ঘুষ দেওয়া-নেওয়া হয়।
আখতার আহমেদ বলেন, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব।
নগর দারিদ্র্য: বিনায়ক সেন বলেন, নগর দরিদ্ররা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তবে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, নগর দরিদ্ররা গ্রামে চলে গেলে নগরের ওপর চাপ কমত, তাদের জীবনও আরও সুন্দর হতে পারত। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কয়েক বছর আগে নগর দরিদ্রদের জন্য অস্থায়ীভাবে নগরে জমি বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছিল। একে ‘সর্বনাশা প্রস্তাব’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক কষ্টে তা রোধ করা গেছে। একবার বরাদ্দ দিলে তাদের আর উচ্ছেদ করা যেত না। রাজনৈতিক হলেও নানা প্রণোদনা দিয়ে নগর দরিদ্রদের গ্রামে পাঠানোর জন্য যে ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচি’ হাতে নেওয়া হয়েছিল, তার অনেক সুফল পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষার উন্নয়ন: মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, শিক্ষা এবং একমাত্র শিক্ষার উন্নয়নই হতে পারে দারিদ্র্য নিরসনের অন্যতম উপায়। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে তা-ই হয়েছে। তিনি বলেন, কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কর্মসংস্থানের বিশাল আয়োজন করা না গেলে কিছুই হবে না।
অথচ বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তিন বছর ধরেই কমছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের যে ধারণা, তাতে এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না।’
আখতার আহমেদ বলেন, শিক্ষা খাতে বৃত্তিজাতীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু পুষ্টির বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত। অথচ শিক্ষা ও পুষ্টি—এ দুই খাতেই সমান নজর দিতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারলে এর চেয়ে বেশিও অর্জন করা সম্ভব।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: সব পরিকল্পনার মধ্যেই জনসংখ্যাকে রাখতে হবে বলে মনে করেন এ কে এম নুরুন্নবী। তিনি বলেন, কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক কোনো তথ্য নেই। কারণ, সরকারি উৎসগুলোর মধ্যেই সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধনটাও কার্যকরভাবে করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার-ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
নুরুন্নবী আরও বলেন, এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যথাযথ পদক্ষেপ না নিতে পারলে আগামী ১০ বছরে দেশ বয়স্ক লোকের ভারে ভরে যাবে। শুরু হয়ে যাবে অরাজকতা।
কিছু পরামর্শ: হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে যায় হঠাৎ অসুখ বিসুখে পড়লে, ওষুধের খরচের কারণে। অথচ এ বিষয়ে কোনো কর্মসূচি নেই। অক্টোবর-নভেম্বরে মৌসুমি দরিদ্রদের কোনো কাজ থাকে না। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ও মানুষের কিছু করার থাকে না। তাদের জন্যও কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল একেবারে না খাওয়াটাই ছিল সমস্যা। এখন সমস্যা পুষ্টিহীনতা।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সরকারের ওপরই চাপটা বেশি। সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম বিত্তশালীদের এ ব্যাপারে চাপ দেয় না। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কেন তাঁদের অনীহা বুঝতে পারছি না।’
ফরাসউদ্দিন আরও বলেন, ২০০১ সালের হিসাবে দেশে ১৪ লাখ প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।
বিনায়ক সেন বলেন, ধনিক শ্রেণীর সম্পদের ওপর থেকে কর আদায় করে তা সহজেই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে ব্যয় করা যায়।

রবীন্দ্রনাথে অবগাহন

বিশেষ প্রতিনিধি | তারিখ: ২০-০৬-২০১১

নিজের আঁকা ছবিতে তিনি রহস্যময়। সেই ছবি মঞ্চে, চারপাশের দেয়ালে। সঙ্গে উৎকীর্ণ তাঁর রচনার অংশ। রবির সেই বাণী স্পষ্ট, বাইরের ঝলমলে রবির আলোর মতোই অম্লান। তাতেই অবগাহন করে কাটল সারা বেলা, এই সময়ে তাঁর প্রাসঙ্গিকতার অনুসন্ধান প্রয়াসে।
প্রথম আলো ও ব্র্যাক ব্যাংক আয়োজিত ‘রবীন্দ্রনাথ, এই সময়ে’ শীর্ষক দুই দিনের সেমিনারের গতকাল রোববার ছিল সমাপনী। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উইন্ডি টাউন মিলনায়তনে কবির সার্ধশততম জন্মবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এই সেমিনারে গতকালও চারটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা শ্রেণীর রবীন্দ্র-অনুরাগী শ্রোতা দিনভর নিমগ্ন ছিলেন বিদগ্ধজনের নানামাত্রিক রবীন্দ্র-বিশ্লেষণে। রবীন্দ্রনাথ যে আমাদের জীবনে এখনো সত্য ও সুন্দরের ফল্গুধারার মতো বহমান, সে কথাই নানাজনের মুখে ঘুরেফিরে এসেছিল বিভিন্নভাবে। সত্য ও সুন্দরের প্রাসঙ্গিকতা কখনো হারায় না।

রবীন্দ্রনাথের নাটক
সকাল ১০টায় আলোচনার পালা শুরু হয়েছিল নাটক বিষয়ে। অধ্যাপক অনুপম সেন ছিলেন সভাপতি। প্রবন্ধ পড়েন নাট্যজন আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ নাট্যরচনায় ছিলেন বৈচিত্র্যসন্ধানী এবং সেই কারণে তাঁর নাটকে পাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মনোলোকের সন্ধান। তাঁর সমগ্র নাট্যসাহিত্যে পাই ধর্মীয় ভণ্ডামি, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ক্ষুদ্রতার স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সোচ্চার উচ্চারণ। তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার, বিশ্বের অন্যতম সেরা নাট্যকারও। চিরনতুন এবং চিরপ্রাসঙ্গিক।’ তিনি বিভিন্ন নাটকের সংলাপের উদ্ধৃতি দিয়ে, নাট্যনির্দেশনা ও মঞ্চায়নের অভিজ্ঞতার উল্লেখের মাধ্যমে আলোচনাকে রসগ্রাহী করে তুলেছিলেন।
পরে এ প্রসঙ্গে ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেছেন, সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের নাটকের সংখ্যা ৭৮টি। স্বাধীনতার পর ৪০টি মূল নাটক এবং ৩৪টি রূপান্তরিত মিলিয়ে ৭৪টি নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে। নাটকে তিনি বিশ্বনাগরিকতাবাদী।
অভিনয়শিল্পী সারা যাকেরও রবীন্দ্রনাটক নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর নাটকে আমরা লক্ষ করি, সব সময় তিনি সমাজের কোনো একটি বড় বাধা বা শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বিষয় তুলে ধরেছেন। সে কারণে তাঁর নাটক সাধারণ দর্শকও সহজেই গ্রহণ করতে পারে। তবে সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতে যদি উপস্থাপনার রাবীন্দ্রিক রীতি ভেঙে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা যায়, তবে নব নব রূপে তাঁকে আবিষ্কার করা সম্ভব।’
ড. আফসার আহমেদ বলেন, ইউরোপীয় রীতির প্রসেনিয়াম থেকে বাংলা নাটক যে বেরিয়ে এসেছে, রবীন্দ্রনাথের হাতেই তার সূচনা হয়েছিল। তিনি সংগীতকেন্দ্রিক আসরনির্ভর দেশীয় ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতির আঙ্গিকে নাট্য রচনা করেছেন। তাঁর চিত্রকল্প আরোপিত নয়, দৃশ্যের বর্ণনার মধ্য দিয়ে যে চিত্রকল্প তৈরি করেছেন, তা সহজেই দর্শকচিত্ত স্পর্শ করেছে।
সভাপতি অনুপম সেন বলেছেন, তাঁর নাটক সাংকেতিক বা রূপকধর্মী। এই নাটকের মৌলিকতা অতুলনীয়। বিশ্বনাট্যসাহিত্যে এমন নাটক বিরল। তিনি একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী হয়েও আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাঙালিকত্বকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। আবার সমাজের প্রতিটি মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মুক্তি ঘটবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। নাটকে সেই বিশ্বাস পরস্ফুিট করে তুলেছেন। তিনি কেবল এই সময়েই প্রাসঙ্গিক নন, তিনি কালজয়ী।

রবীন্দ্র-বিবেচনায় মনুষ্যত্বের দায়
চা পানের পরে ‘রবীন্দ্র-বিবেচনায় মনুষ্যত্বের দায়’ বিষয়ে দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হলো অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে।
ড. আকবর আলি খান দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, তবে তিনি সেটি সামনে রেখে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা করেন। কবির পরিবারের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি। কারণ এ সম্পর্কে অনেকেরই সঠিক ধারণার অভাব আছে। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন। জমিদার বললেই মনে হয় উৎপীড়ক। কিন্তু তিনি উৎপীড়ক নন, নিজেই উৎপীড়িত ছিলেন পীরালি বংশের কারণে। প্রায় ৩০০ বছর আগে তাঁর পূর্বপুরুষ কলকাতায় গেলেও কুলীন ব্রাহ্মণেরা তাঁদের জাতে নেননি। ব্রাহ্মণেরা তাঁদের সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দিতেন না। বিয়ের কনে আনতে হতো পূর্ববঙ্গের পাড়াগাঁ থেকে। রবীন্দ্রনাথের জন্যই তা করা হয়েছিল। জাতিভেদের কুফল সারা জীবন ভোগ করেছেন। অন্যদিকে দ্বারকানাথ ঠাকুর বড় জমিদার ছিলেন, তিনি তা ছিলেন না। বছরে তাঁর জমিদারির আয় হতো ৪৫ হাজার টাকা। সেই টাকা সংসারে ভাগ হয়ে যেত পাঁচ পরিবারে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বেতন ছিল বার্ষিক ৪৮ হাজার এবং অধ্যাপকের বেতন ছিল নয় হাজার ৬০০ টাকা।’ এমন আরও অনেক তথ্য উপস্থাপন করে তিনি বলেছেন, কবির পরিবার ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই। কাজেই সাধারণ মানুষের দুরবস্থা যে তিনি জানতেন না, তা নয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়েই তিনি মানুষের দুর্দশা উপলব্ধি করেছেন এবং সাহিত্যে তা তুলে ধরেছেন।
এরপর প্রাবন্ধিক বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ মার্ক্স বা গান্ধীর দৃষ্টিতে পশ্চিমকে দেখেননি। পুরো গ্রহণ বা বর্জনে তাঁর সায় ছিল না। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় চেয়েছিলেন। নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতিবিদেরা উন্নয়ন বলতে যে ধরনের মানব উন্নয়ন, শিক্ষা, ক্ষমতায়ন—এসবের কথা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের মানবমুক্তির ভাবনাতেও তা-ই ছিল। তাঁর কথাই আজ আলোচিত হচ্ছে। তবে বর্ণবাদ বিলোপের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। নারীর সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ভেবেছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে হূদয় নিয়েই তিনি বেশি ভাবিত ছিলেন। অবশ্য তিনি সব ক্ষেত্রেই তাঁর কালকে অতিক্রম করে যাবেন, এমন দাবি করাও তাঁর প্রতি অবিচার করা। তাঁর কাছে আদর্শের চেয়ে মানুষ ছিল বড়। এই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি সোচ্চার ছিলেন। যেসব সমস্যার সরাসরি সমাধান তিনি দেননি, তা তাঁর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবির মধ্যেই অন্তর্নিহিত আছে। এখানেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা।
আলোচনায় অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ বলেন, সমাজের চেয়ে ব্যক্তিমানুষ তাঁর কাছে বড় ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তি মানুষ সমাজের অণু। এই অণুগুলো বদলালে সমাজ বদলাবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রেও পরিবর্তন আসবে। মনুষ্যত্ব অর্জনের কত পন্থা আছে, মানুষ কত উচ্চে উঠতে পারে, তিনি সেই সন্ধানই করেছেন। মনে রাখতে হবে, তিনি বিদ্রোহী ছিলেন না, সমাজসংস্কারকও ছিলেন না। তিনি সংস্কারক ছিলেন ভাষা ও সংস্কৃতির।
ড. মালেকা বেগম বলেন, ‘নারীবাদ মানবতাবাদের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি মানবতার কথা বলেছেন। আন্দোলনের পথে নেমে তাই আমরা তাঁর কথা বাদ দিতে পারি না। তিনি কিছু লুকোননি। সরাসরি স্পষ্ট করে বলেছেন, আমাদের সমাজে যেটার অভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। তাঁর বক্তব্যকে সামগ্রিক ভাবনার আলোকে নিয়ে লক্ষ করেছি, সেখানে আছে সমাজবদলের দলিল।’
অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেছেন, ‘তিনি ব্যক্তির ওপর সমষ্টির প্রাধান্য পছন্দ করেননি। তিনি ভাবতেন, মানুষ নেই তো সত্যও নেই। এই মানুষকেই তিনি আত্মশক্তিতে বলীয়ান করার কথা বলেছেন। বিশেষত, গ্রামের মানুষের ক্ষেত্রে যেভাবে বলেছেন, রাজনীতিকদের তা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’
সভাপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে গুলিয়ে দেওয়া যাবে না—রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তি একাকী অনেক কিছু করতে পারে না, রাষ্ট্রের সাহায্য প্রয়োজন হয়। তবে সমাজকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতেন না তিনি। তাঁর কাছে সমাজ বড়, রাষ্ট্র নয়। সমাজের অনেক অসংগতি তিনি মানেননি। মানলে সেসব নিয়ে লিখতেন না। সেই লেখায় সত্যমূল্য না থাকলে তা হয় ছলনা। তাঁর লেখা ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ কথাটি আজ প্রবাদের মতোই সত্য। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রতিকারহীন শক্তির অপরাধ চলছে, কর্মহীন বেকার যুবক ছুটছে, নিষ্ফল মাথা কুটছে—এগুলো সবই সত্যি। এসবই তার মনুষ্যত্বের দায় বহন করে। এই সত্যের জন্য, এই সমাজ ভাঙার শক্তির জন্যই রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথের জাতিভাবনা
দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা ছিল মিলনায়তনেই। খাবারের পর তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় এই দুই দিনের সেমিনারের আহ্বায়ক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে।
রবীন্দ্রনাথের জাতিভাবনা নিয়ে প্রবন্ধ পড়েন ড. বিনায়ক সেন। দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এ পর্বে। প্রাবন্ধিক বলেছেন, ‘জাতি’ না বলে রবীন্দ্রনাথ ‘নেশন’ বলতে চেয়েছেন। তাঁর জীবনের প্রথম পর্বে ১৮৮৫-১৯১০ পর্যন্ত ছিল এই ‘নেশন’-এর প্রতি গভীর মোহ। ভাষা দিয়েই তাঁর এই মোহ শুরু হয়েছিল। তিনি নানা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় করে মহাজাতি গঠন করতে চেয়েছেন। এই মোহ ভেঙেছে ১৯১০-৪১ কালপর্যায়ে। তিনি তখন ‘নো নেশন’-এর পক্ষে কথা বলেছেন। প্রাচ্যে সমাজকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং পাশ্চাত্যে রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সমাজ গঠিত হয়। তিনি এই দুয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় চেয়েছিলেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথকে তিনি বলেছেন ‘ট্র্যাজিক হিরো’।
আলোচনায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুুল হক বলেন, ‘রাজনৈতিক মতপ্রকাশের জন্য রবীন্দ্রনাথ অনেকবার নিন্দিত হয়েছেন। আমাদের সমাজে ভাষাগত, ধর্মীয়, স্থানীয়—বহু ধরনের ঐক্য ছিল। এই ঐক্যের বোধকে তিনি জাতীয়তাবোধ বলেছেন। উগ্র জাতীয়তা গ্রহণ করেননি। এর মধ্যে জাতীয়তাবাদের বিকার লক্ষ করেছিলেন। সমন্বয়ের পথ ধরেই বাঙালিকে উন্নত হওয়ার কথা বলেছিলেন।’
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমরা বাংলায় কথা বলি তাই আমাদের বাঙালি বলা হয়। কিন্তু বলাই যেতে পারে, ১৯৪৭ সালের পরে বাঙালি জাতি বলে আর কিছু নেই। কারণ, তারপর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। নতুন পরিস্থিতিতে আমরা লড়াই করে যে রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছি, সেই রবীন্দ্রনাথও অন্য রকম।’
ড. রুশিদান ইসলাম রহমান বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ জাতিসত্তার ভিতর থেকে আন্তর্জাতিকতার বিষয়টি দেখেছেন। আমরা জাতিসত্তাকে বিকশিত করছি না—এই আক্ষেপ তাঁর ছিল। “বাংলাদেশ” নামটি তাঁর রচনাতেই সবচেয়ে বেশি এসেছে।’
সভাপতি আনিসুজ্জামান বলেন, ইউরোপীয় ও ভারতীয় রাষ্ট্রভাবনায় পার্থক্য ছিল। মোগল-আফগান শাসনের সময় যে সমস্যা হয়নি, ইংরেজ শাসনামলে তা দেখা দিয়েছিল। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রে সংঘবদ্ধ সংস্থা। এর লক্ষ্য রাজনীতি ও ব্যবসা পরিচালনা। ব্যবসা বাড়াতে বাড়াতে অন্য দেশ দখল করে সংঘাতের দিকে চলে যায়। অন্যের দেশ দখল করার নীতিকে রবীন্দ্রনাথ মানতে পারেননি। তিনি জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে আত্মশক্তি জোগানোর কথা বলেছেন, যাকে আজ আমরা জনগণের ক্ষমতায়ন বলছি। তবে সামাজিক মানুষ হিসেবে তিনি অনেক কিছুই এড়াতে পারেননি।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা
শেষ অধিবেশনটি ছিল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনা বিষয়ে। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক আবুল মোমেন প্রবন্ধ লিখেছিলেন। অসুস্থতার কারণে আসেননি। সেটি পাঠ করেছেন মারুফা রহমান। প্রবন্ধকার বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ পেশাজীবী তৈরির জন্য শিক্ষার কথা ভাবেননি। শিক্ষা কোনো গণ্ডিতে বা ছকে বাঁধা যায়—এমন কথা তাঁর ভাবনাতেই আসেনি। তাঁর কাছে পড়ানোর বিষয়, ধরন বা উপকরণের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো চর্চা ও সাধনায় নিরত শিক্ষকের সহূদয় সক্রিয় সাহচর্য। তাঁর শিক্ষাব্যবস্থায় মুক্তি ও আনন্দ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচক দ্বিজেন শর্মা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানুষকে বদলে পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।
অধ্যাপক মোহীত উল আলম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের মৌলিক শিক্ষাভাবনার সঙ্গে আমাদের ভাবনা মেলে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার ভৌত পরিকাঠামোর অভাব আছে।’
অধ্যাপক গোলাম মোস্তাফা বলেন, ‘আমরা বৃত্তিজীবী চাই, মানুষ চাই না। শিক্ষার মূল আদর্শ হারিয়ে ফেলেছি।’
সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, সফল মানুষ হওয়ার কথা অনেকে বলেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রেনেসাঁ-মানব। তিনি জীবনের সব সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে মানুষ যেন তাঁর জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে, তেমন শিক্ষা চেয়েছিলেন।
অধিবেশন সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই দুই দিনের আটটি সেমিনারের প্রবন্ধ ও আলোচনাগুলো নিয়ে একটি বই প্রকাশ করা হবে। আগামী ২২ শ্রাবণ কবির প্রয়াণ দিবসে বইটি প্রকাশিত হবে।

জনগণের অবস্থা জলেপড়া পিঁপড়ের মতো

তারিখ: ০৯-০৬-২০১২

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নিরন্তর সংশয়বাদের কোনো কারণ নেই। নিরন্তর সংশয়বাদ অর্থনীতিবিদদের বস্তুনিষ্ঠতাকে ক্ষুণ্ন করে। বাজেট আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ধারাবাহিকভাবে অনেক সময় অনেকেই সংশয় ব্যক্ত করে থাকেন। এবং সেটা একসময় পাভলোভীয় মনস্তত্ত্বের ধারা অনুসারে একটি স্বভাবে পরিণত হয়। আমি বাজেটকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কালের দুটি উদাহরণ দেব। যখন গত বছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন ২০১০-১১ অর্থবছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি বিতর্ক হয়েছিল। সংশয়বাদীরা তখন বলেছিলেন, প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ কোনোভাবেই হতে পারে না; বরং এটা হবে ৬ শতাংশ বা তার কাছাকাছি। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন চূড়ান্ত হিসাবে দেখা গেল, ২০১০-১১-অর্থবছের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশই হয়েছে। দ্বিতীয় উদাহরণটি খুব সাম্প্রতিক কালের। গত ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সংকট ঘনীভূত হয়ে ওঠে। বৈদেশিক সাহায্য না আসা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারকে উপায়ান্তর না দেখে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অনেক বেশি হারে ঋণ নিতে হয়। সংশয়বাদীরা তখন বলতে থাকেন, অচিরেই অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। যেন চারদিকের সব বাতি একে একে নিভে যাচ্ছে। কিন্তু তার পরের কয়েক মাসে সংযত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি গ্রহণ করে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অনেকটাই ফিরিয়ে আনতে পারা গেছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্প আয়ের অর্থনীতিতে সংযত মুদ্রানীতি যে আদৌ কাজ করে, তা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। এর স্বীকৃতি মিলেছে এ মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারে আবার বেশ কিছুটা স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছে, মূল্যস্ফীতির হারও বেশ কিছুটা কমে এসেছে এবং সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ এবং লেনদেনের ভারসাম্য বেশ কিছুটা উন্নত হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতির সংশয়বাদের বিপরীতে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার প্রাথমিকভাবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে, যা হয়তো চূড়ান্ত হিসাবে কিছুটা বাড়বে। এই ৬ দশমিক ৩ শতাংশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বাদে অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। সুতরাং ঘনায়মান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার এই সাফল্য কিছুটা হলেও সবাইকে স্বীকার করতে হবে। সেটা সংশয়বাদীরা মুখে বলুন বা না-ই বলুন। বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা সব সময়ই খাদের কিনার থেকে সাফল্যের সঙ্গে ফিরে আসতে পেরেছে। এটাও আমাদের অর্থনীতির উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতার আরেকটা দিক।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেটকে যাঁরা রাজনৈতিক ইচ্ছাপূরণের জন্য উচ্চাভিলাষী বলছেন, তাঁদের পক্ষে যুক্তি মেলে না। এর কারণ, গত অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ব্যয় ও জিডিপির অনুপাত ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ, এবারও এই অনুপাত ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। তবে বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়ে সংগত কারণেই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে: ক. আমাদের দেশের বাজেটের অর্থায়ন দুই দশক আগে ছিল বৈদেশিক সাহার্য্যনির্ভর, এখন তা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভর; খ. এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষমতা বাড়েনি; গ. গেল অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে আরও প্রতিকূল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে—যেমন, ইউরো জোনের সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে; সিরিয়া, চাই কি ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণে আমাদের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ঘ. কয়েক বছর ধরে কৃষি উৎপাদন প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত ছিল, এ ক্ষেত্রে মন্দভাগ্য দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে। এসব কারণে আমার মোটা দাগের অভিমত হলো, এই বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সর্বাগ্রে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত (যখন মূল্যস্ফীতি আবার ৫-৭ শতাংশে ফিরে আসবে এবং বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি অর্জিত হবে) করার পরই কেবল উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার দিকে অগ্রসর হওয়া। প্রয়োজনে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমিয়ে এনেও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা চাই। আমার ধারণা, এবারের বাজেট বক্তৃতায় একদিকে সংযত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কথা বলে গেল অর্থবছরের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার থেকে আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশে উল্লম্ফনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবানুগ নয়। এটা সম্ভবত করা হয়েছে জনতুষ্টির কথা ভেবে। অর্থমন্ত্রী এটা না করলেও পারতেন। এখানে আমার প্রধান আপত্তি দুটি। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার যুক্তি ছাড়াও আরও দুটি বাড়তি উদ্বেগ এখানে রয়েছে। প্রথমত, শুধু প্রবৃদ্ধিই জীবনযাত্রার কল্যাণ বয়ে আনে না। প্রবৃদ্ধি কল্যাণ বয়ে আনবে কি না, সেটা নির্ভর করে শুধু প্রবৃদ্ধির হারের ওপর নয়, প্রবৃদ্ধির চরিত্রের ওপর। যেমন, পরিবেশ ধ্বংস করে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে চাইলে তা জনগণের অকল্যাণ বয়ে আনে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্পকে (খাল-বিল-নদী-জলাশয়, বনভূমি ইত্যাদি) উৎসাহিত করে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হারের প্রস্তাব করা হলে সমাজে আয় ও সম্পদবৈষম্য দ্রুত হারে বাড়তে থাকে, যেটা বাংলাদেশে এক দশক ধরে ঘটছে। বাজেট বক্তৃতায় ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে আয় ও সম্পদবৈষম্য বৃদ্ধির প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এবার আসি বাজেট থেকে জনসাধারণ কী প্রত্যাশা জানিয়েছিল এবং কী তারা পেতে যাচ্ছে, সেই প্রসঙ্গে। প্রথমেই লক্ষ করার বিষয়, সেটা হলো বাজেট নিয়ে জনসাধারণের প্রত্যাশা অত্যন্ত সীমিত হয়ে আসছে। জনমানুষ হচ্ছে জলে পড়া পিঁপড়ের মতো, তারা শুধু এটুকুই আশা করে যে রাষ্ট্র তাদের ডাঙায় তুলে দেবে। তাহলে তারা নিজেরাই চলতে পারবে। তারা চাইছে দ্রব্যমূল্যের সহনীয় পরিস্থিতি। প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, না ৭ দশমিক ২ শতাংশ হলো, এ নিয়ে তাদের তেমন উদ্বিগ্ন বা বিতর্কিত হতে দেখা যায় না অর্থনীতিবিদদের মতো। দ্বিতীয়ত, এযাবৎ প্রতিটি সরকারই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, কিছুটা করে দারিদ্র্য কমিয়েছে, বেশ কিছুটা মানবসম্পদ উন্নয়ন করেছে, কিন্তু তাতে সাধারণ জনগণ খুশি হয়ে পর পর দুবার কোনো রাজনৈতিক সরকারকে নির্বাচনে জয়ী করেনি। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা। এর দুটি সম্ভাব্য উত্তর আমি এখানে নিবেদন করতে পারি। এক. জনসাধারণ রাজনৈতিক সরকারকে মূল্যায়ন করে প্রবৃদ্ধির জাতীয় অর্থনৈতিক সূচকে নয়, তারা জোর দেয় বেশি করে অন-অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ওপরে, যেমন: সুশাসন, মানবাধিকার, মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস, রাজনীতিবিদদের ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ তথা তাঁদের আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা, শিষ্টাচার ইত্যাদি। দুই. আরেকটি বড় কারণ হতে পারে, অর্থনৈতিক সূচকে ভালো করার পরও প্রধান দুই রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো (এখানে ভালোর সংজ্ঞা হচ্ছে সৎ ও যোগ্য। যিনি নির্বাচনে টাকা ও পেশিশক্তির জোরে জয়লাভ করেন, তাঁকে এখানে ভালো প্রার্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে না) প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয় না। তারা যাঁদের মনোনয়ন দেয়, তাঁদের একটি বড় অংশই হচ্ছেন মনোনয়ন-বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে আসা ‘খারাপ’ প্রার্থী এবং এই খারাপ প্রার্থীরা যখন জয়লাভ করেন, তাঁরা অর্থনৈতিক সুশাসন এবং মাঠপর্যায়ে বাজেটের বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান। নথিপত্রে হয়তো বাজেট ঠিকই বাস্তবায়িত হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে দুর্নীতি ঢুকে পড়ে।
জনসাধারণ বাজেটের কাছে চায় পুনর্বণ্টনমূলক নীতি, বাজেটের একটি প্রধান কাজও হচ্ছে তা-ই। সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, গেল বছরের বাজেটে দুই কোটি টাকার ওপরে সম্পত্তি যাঁদের রয়েছে, এই সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে কম, মাত্র চার হাজার; তাঁদের কাছ থেকে প্রদত্ত করের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সারচার্জ এসেছে মাত্র ৪৫-৫০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে বর্তমান বাজেটে উচিত ছিল, বাজারের চলতি মূল্যে সম্পত্তির মূল্যায়ন করা। তা করা হলে দেখা যেত, এই সারচার্জের আওতায় অন্তত দুই থেকে তিন লাখ লোক চলে আসত, তার ফলে সারচার্জ তথা ‘প্রপার্টি ট্যাক্স’ (বাংলাদেশে এখনো কোনো প্রপার্টি ট্যাক্স চালু হয়নি, যেটা উন্নত সব দেশে রয়েছে) বাবদ হয়তো অতিরিক্ত ৬০০-৭০০ কোটি টাকা চলে আসত। এবং এই টাকা দিয়ে শহর ও গ্রামের হতদরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য সম্পদ সৃষ্টি (ব্র্যাকের টিইউপি কর্মসূচির মতো) করার উদ্যোগ নেওয়া যেত। এবারের বাজেটে আমি হতাশ হয়েছি দেখে যে ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি পুনর্বণ্টনের কোনো কর্মসূচিকে সমর্থন দেওয়া হয়নি বা এ মর্মে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সমর্থনের কথাও বলা হয়নি; বরং বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও গরিবমুখিনতা সীমাবদ্ধ থেকেছে কিছু সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির মধ্যে এবং এসব কর্মসূচিও গরিব মানুষের তাৎপর্যপূণভাবে সাহায্য করতে পারে না। কারণ, এসব কর্মসূচিতে প্রদত্ত মাসিক সুবিধার পরিমাণ এক-দেড় দিনের কৃষি-মজুরির চেয়ে কম।
সর্বশেষে বলব, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও আমাদের বৈদেশিক সাহায্য দরকার। এবং সে জন্য বৈদেশিক সাহায্যদাতাদের মনস্তত্ত্বও আমাদের বুঝতে হবে। গত বছর এ ক্ষেত্রে আমরা সফল হইনি। আগামী বছরে সফল হতেই হবে। নইলে বাজেটের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে পড়বে আবারও। দুঃখের বিষয়, এই সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষুধা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে ১৬ কোটি মানুষের দেশের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ দরকার (যেমন, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাগুলোকে বাজেটের মোট ব্যয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সরাসরি ‘ম্যাচিং গ্রান্ট’ হিসেবে বরাদ্দ করা), সে সম্পর্কে কোনো উদ্যোগ নেই। আমি তাতে বিস্মিত হইনি। কেননা, আমরা বাস করছি পল ক্রুগম্যানের ভাষায়, এক ‘ক্রমবিলীয়মান প্রত্যাশার যুগে’।
 বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ। গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)।

তৃতীয় ইউটোপিয়ার মুখোমুখি

তারিখ: ০৪-১১-২০১১


১. উত্তর-ঔপনিবেশিকতা ও ইউটোপিয়া
আমরা এক আধুনিক ইউটোপিয়ার সন্ধানে আছি। আগামী এক দশকে দেশ কোন পথ ধরে অগ্রসর হবে, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগের সীমা নেই। এর একটা বড় কারণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিচারে বিশ্বের মধ্যে আমরাই সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ। তার ওপর রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিরন্তর ঝুঁকি। অব্যাহত বিশ্বমন্দা-পরিস্থিতিও আমাদের অর্থনীতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। এ রকম একটা জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কোন পথে অগ্রসর হবে, তা চলতি উন্নয়নের ছকে নির্ণয় করা সহজ নয়। উন্নয়নের প্রচলিত পাঠ্যবইগুলো এ রকম একটি দেশের অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে লেখা হয়নি। এ দেশের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ (সদ্য প্রয়াত) আবু আবদুল্লাহকে দুই দশক আগে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘১০০ বছর পর কোন ধরনের বাংলাদেশকে দেখতে চান আপনি?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘১০০ বছর পর এ দেশের কতটা ভূখণ্ড সমুদ্রে তলিয়ে যাবে, সে নিয়ে আসুন, ভাবি।’ এই ভৌগোলিক উদ্বেগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শামসুর রাহমান লেখেন, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’। এটা এক অর্থে নতুন ইউটোপিয়ারই অন্বেষণ। জন্মের মুহূর্ত থেকেই বাংলাদেশ এই তালাশের মধ্যে আছে। নইলে কবির মনে হতো না যে দেশটা কী করে একটি ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো গভীর রাতে মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠছে, যার মুখে ‘শতাব্দীর গাঢ় বিশদ শ্যাওলা আর ভীষণ ফাটল, যেন বেদনার রেখা’।
ইউটোপিয়া হচ্ছে ‘ত্রুটিযুক্ত বাস্তবতার ত্রুটিমুক্ত প্রতিফলন’—এক ‘পারফেক্টেড রিয়ালিটি’। দার্শনিক মিশেল ফুকো এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেন ইউটোপিয়াকে। হাইপার-পাওয়ার নিয়ন্ত্রিত এই বৈরী বিশ্বে তীব্র অপমান ও প্রবল অস্বীকারের মধ্যে বাস করে আমরা ইউটোপিয়াকে আঁকড়ে ধরি এবং এর মাধ্যমে আমাদের উত্তর-ঔপনিবেশিক সত্তার স্বাধীনতাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করি। এই চেষ্টার আদি রূপ বাংলা সাহিত্যের প্রথম ইউটোপিয়া-সংক্রান্ত রচনা—ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস। সেই সূত্রে ফিউচার স্টাডিজের একটি নতুন প্রত্যয় তিনি বাংলায় আমাদের উপহার দিলেন, যার নাম ভবিষ্য-বিচার। রবীন্দ্রনাথও প্রবলভাবে আক্রান্ত ছিলেন ইউটোপিয়ায়। প্রথমে লিখলেন ‘স্বদেশী সমাজ’, তারপর নেশনের ন্যারেটিভকে প্রতিহত করতে করতে পৌঁছালেন এমন এক সমাজকল্পে, যার নাম ‘নো-নেশনের সমাজ’। বিল অ্যাশক্রফটের মতো তাত্ত্বিক মনে করেন, উপনিবেশবিরোধী ক্রিটিক্যাল ইউটোপিয়ার আদি চিন্তকদের একজন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যেমন ছিলেন আফ্রিকার পটভূমিতে ফ্রানস ফেনন।
‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের শেষে রবীন্দ্রনাথ প্রতীক্ষা করেন প্রাচ্যদিগন্তে নব সূর্যোদয়ের। অন্যত্র শুনতে পান ‘ঐ মহামানব আসে’—নতুন রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশের সম্ভাব্য আবির্ভাবের বার্তা। ‘সামাজিক প্রবন্ধ’ সংগ্রহের একটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু বোঝানোর জন্য ভূদেব বেছে নেন আগ্রহ-জাগানিয়া শিরোনাম—‘নেতৃপ্রতীক্ষা’। আজও আমরা এক নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমাবেশের প্রতীক্ষায় আছি। এর কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় (এবং এ দেশে) নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্র ও অসহিষ্ণু গণতন্ত্রের মধ্যে ভেদরেখা ক্রমেই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

২. প্রজা বনাম তন্ত্র
এ দেশের সামাজিক ইতিহাসে ইউটোপিয়ার দুটো ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ আমরা অতীতে প্রত্যক্ষ করেছি। ‘প্রথম ইউটোপিয়া’ ছিল ‘পাকিস্তান’ নামক ধারণাটিকে ঘিরে। পাকিস্তান আন্দোলনে এই ভূখণ্ড প্রবলভাবে যুক্ত হয়েছিল—তার মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃষকবর্গের ইউটোপিয়া। পাকিস্তান ছিল তাদের চোখে এক আদর্শ রাষ্ট্র, যেখানে অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক পীড়ন থেকে কৃষকের মুক্তি আসবে, তাঁদের স্বার্থের দেখভাল করবে এক নতুন সমতাবাদী রাষ্ট্র। যেখানে প্রজায় ও তন্ত্রে বিরোধ হবে না। ১৯০১-১৯৪৭ পর্বে বাংলাদেশের কৃষি খাত ‘ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি’-এর চাপে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কৃষি খাত (ভারতের চেয়ে) উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে চলছিল। অর্থাৎ দুই অঞ্চলে ভিন্ন দুই কারণে পাকিস্তান আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। প্রবল অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে উপায়ান্তরহীন হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিল পূর্ব বাংলার গরিব বর্গাচাষি ভূমিহীন কৃষককুল। অন্যদিকে, পাকিস্তানে এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল সামন্ততান্ত্রিক শক্তি, মূলত বৃহৎ ভূস্বামী ও ধনী কৃষকেরা। ইতিহাসবিদ আহমেদ কামাল তাঁর স্টেট এগেইনস্ট নেশন বইয়ে দেখিয়েছেন, প্রথম ইউটোপিয়াটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মলাভের কয়েক বছরের মধ্যেই কী করে ভেঙে পড়ে।
ষাটের দশকে নেশন ও ন্যাশনালিজমকে কেন্দ্র করে জন্ম নেয় ‘দ্বিতীয় ইউটোপিয়া’, যার পরিণতি—১৯৭১। এই আন্দোলনে ক্রিয়াশীল ছিল শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের ‘ওপরে ওঠার’ স্বাভাবিক শ্রেণী-আকাঙ্ক্ষা। তবে শুধু মধ্যবিত্তের ওপর ভর করে বিজয় সম্ভব ছিল না। ১৯৭১ সালের নয় মাসে মুক্তিযুদ্ধ এক নতুন সামাজিক শক্তিতে বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে: মধ্যবিত্ত ছাপিয়ে ক্রমেই বেড়ে উঠছিল সাধারণ নিম্নবর্গ মানুষের উপস্থিতি। এ পর্যন্ত গবেষণায় স্পষ্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল গ্রামের সাধারণ মেহনতি মানুষ, যারা ছিল আধুনিক শিক্ষার বাইরে। ১৯৭১ সালের ইউটোপিয়ায় এক ভিন্নতর সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতিকে এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছিল। সেসব প্রতিশ্রুতির অনেক কিছুই স্বাধীনতার ৪০ বছরে প্রতিষ্ঠা পায়নি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ‘দিনবদলের পালা’ ছিল নির্বাচনী ইচ্ছাপূরণের কড়চা কেবল, যার অধিকাংশই আজ ভুলে যেতে বসেছে শাসক দল। এভাবেই দ্বিতীয় ইউটোপিয়া ভেঙে পড়েছে আজ।

৩. জ্যাক সাহেবের ফরিদপুর
আমরা বর্তমানে এক নতুন (তৃতীয়) ইউটোপিয়ার প্রাক-মুহূর্তে অবস্থান করছি। কিন্তু একে কেবল উন্নয়নবাদী প্রতর্কে বর্ণনা করা যাবে না। ‘এ দেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের স্তরে উন্নীত হবে’—এই অবস্থান আমাদের প্রগতিকে পর্যবসিত করে জিডিপির নিতান্ত সূচকে। জিডিপির পরিসংখ্যানে গরিব-মেহনতি মানুষের সামাজিক জাগরণের (মবিলিটি) আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয় না।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯১০ সালে ফরিদপুরের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর (জেলা প্রশাসক) জে সি জ্যাক দারিদ্র্যের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা চালান। এটাই ছিল ঔপনিবেশিক বাংলার প্রথম দারিদ্র্য জরিপ, যার সঙ্গে আধুনিক কালের পারিবারিক আয়-ব্যয় জরিপের তুলনা চলে। ১৯১৬ সালে এই জরিপের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে জ্যাক সাহেব তাঁর দ্য ইকোনমিক লাইফ অব আ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট বইটি রচনা করেন। এ বইয়ে জ্যাক দারিদ্র্যকে তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরে বিভাজন করেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী ১৯১০ সালে ফরিদপুরে ‘চরম দারিদ্র্যে’ বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল মোট জনগোষ্ঠীর ২০.৭ শতাংশ; এর ঠিক পরই ‘স্বল্প-দারিদ্র্যে’ বাস করত ২৮.২ শতাংশ; আর ৫১.১ শতাংশ ছিল ‘দারিদ্র্যসীমার ওপরে’। অর্থাৎ মোটা দাগে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ১৯১০ সালে দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছিল। জ্যাকের জরিপের ৯৫ বছর পর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০০৫ সালে যে জরিপ চালায়, তাতে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় দারিদ্র্যের মধ্যে অবস্থানরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০.৮ শতাংশে। অর্থাৎ ৯৫ বছরে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় দারিদ্র্য কমেছে মাত্র ১০ শতাংশ (শতাব্দীজুড়ে এই সূচকের বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে)।
একুশ শতকের প্রথম দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার প্রবণতা বেগবান হয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ২০১০ সালের অতি সাম্প্রতিক আয়-ব্যয় জরিপেও দেখা যাচ্ছে চরম দারিদ্র্যের প্রবল উপস্থিতি। গোটা দেশের (শহর-গ্রাম মিলিয়ে) মোট ৩২ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশই হচ্ছে চরম দরিদ্র। কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের বর্ধিত প্রবাহ, মাইক্রো ফাইন্যান্সের প্রসার, দ্রুত নগরায়ণ—এসব সত্ত্বেও কেন দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠী এখনো থেকে গেল চরম দারিদ্র্যে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে গেল দারিদ্র্যের ভেতরে?
আর এসবই হিসাব করা হয়েছে সরলতম প্রয়োজনের সূচকে। যদি গণতান্ত্রিক ভোটে সবার মতামত নিয়ে আমরা দারিদ্র্যসীমা সংজ্ঞায়িত করতাম (অন্তত যে ধরনের পভার্টি-লাইন শ্রীলঙ্কায় বা লাতিন আমেরিকায় চালু, তা যদি এ দেশে ব্যবহার করা হয়), তাহলে দারিদ্র্য-প্রবণতার ক্ষেত্রে শাসকবর্গের আত্মতুষ্টির সাম্প্রতিক চিত্র অনেকখানি বদলে যেত। ‘ইকোনমিকস’ শব্দটা যার সূত্রে আমরা প্রাপ্ত, সেই অর্থনীতিবিদ আলফ্রেড মার্শাল যা বলেছিলেন তা মোটা দাগে এই, ‘কেন সমাজের একদল মানুষ সুসংস্কৃত জীবন যাপন করবে, আর অন্য একদল মানুষ উদয়াস্ত কায়িক শ্রমে নিজেদের জীবনীশক্তি ধ্বংস করবে—এটি হচ্ছে অর্থশাস্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন।’ পাঠক, লক্ষ করবেন, প্রশ্নটা ক্যাপিটাল গ্রন্থের লেখক মার্কস করছেন না, করছেন নব্য-ধ্রুপদি অর্থশাস্ত্রের প্রবক্তা প্রিন্সিপলস অব ইকোনমিকস-এর মার্শাল সাহেব।

৪. নাগরিক অধিকারের ভাষা
দারিদ্র্য, বিশেষত চরম দারিদ্র্য, এ দেশ থেকে সহজে মুছে যাবে না, বা আজ কমে এলেও কোনো আকস্মিক বা প্রত্যাশিত দুর্বিপাকে দারিদ্র্য আবারও বেড়ে যেতে পারে। এর কারণ, আমাদের নির্বাচনী গণতন্ত্র এখনো ‘অধিকারের ভাষায়’ কথা বলছে না। চরম দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকরী সামাজিক নিরাপত্তা চাওয়া প্রজাকুলের পক্ষ থেকে কোনো সকাতর আবেদন নয়; এটা পাওয়া নাগরিক হিসেবে তার মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার।
সরকারে যাঁরা থাকেন, তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, দেশে এরই মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ রকম বিচিত্রবিধ ‘সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী’ চালু হয়েছে। এবং এ বাবদ মোট সরকারি ব্যয়ের (রাজস্ব/উন্নয়ন মিলিয়ে) প্রায় ১৫ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে। মূল সমস্যাটা ধরা পড়ে মাথাপিছু বরাদ্দের হার বিবেচনায় নিলে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী বৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি—এসব কর্মসূচিতে প্রতিমাসে সুবিধাভোগী-পিছু যে টাকা (৩০০ থেকে ৫০০ টাকা মাসে) দেওয়া হয়, তা কেবল দুই বা তিন দিনের কৃষিমজুরির সমান। এই অর্থ এতই নগণ্য যে একে ‘টোকেনিজম’ বা লোক দেখানো কর্মসূচি বললে অত্যুক্তি হয় না। ফলে এসব কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে দারিদ্র্যসীমা পেরোনো যায় না। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তর থেকে গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের ঝরে পড়াও বন্ধ করা যায় না। মঙ্গা এলাকায় ১০০ বা ৮০ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্পে কাজ করে যেটুকু আয় হয়, তাতে করে দারিদ্র্যসীমার অর্ধেক পথও পাড়ি দেওয়া যায় না। কিন্তু এসব কর্মসূচিতে মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়াতে গেলে বর্তমান রাজস্ব কাঠামোয় তা অর্জন করা দুরূহ। এর জন্য বিত্তবান শ্রেণীর ওপর করারোপ করে নতুন সম্পদ আহরণ করা প্রয়োজন। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের কর-রাজস্বের পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ১০-১১ শতাংশ। এই হার যদি আরও ২-৩ শতাংশ বাড়ানো যেত (দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদেরই কর-জিডিপি অনুপাত সর্বনিম্নে) এবং আহরিত বাড়তি সম্পদটুকুর পুরোটাই যদি সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে আসত, তাহলে আরও দ্রুত হারে আমরা চরম দারিদ্র্য মুছে ফেলতে পারতাম। যে দেশে বণ্টনমূলক ভূমি-সংস্কার করার অবকাশ সীমিত, সে দেশে বিত্তশালী শ্রেণীর ওপর বর্ধিত করারোপের মাধ্যমেই কেবল পুনর্বণ্টনমূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এখানেই তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার হতে পারত। অন্তত তাই প্রত্যাশিত ছিল ‘দিনবদলের সরকার’-এর কাছ থেকে।
কিন্তু আমরা সেদিকে অগ্রসর হইনি, বরং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে যেসব বৃহৎ বিনিয়োগকারী সমবেতভাবে দুই-তিন হাজার কোটি টাকার বেশি (অনুমানে বলছি) লাভ করেছেন, তাঁদের মুনাফার ওপর কর মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শেয়ারবাজার যখন তেজি হয়ে উঠছিল সেই সূচনাপর্বেই। এবারের বাজেটে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারীদের ওপর ১০ শতাংশ সম্পদ-কর সারচার্জ হিসেবে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এই বাড়তি রাজস্ব (যদি আহরিত হয়ও) চরম দরিদ্রদের জন্য ব্যয়িত হবে—এই মর্মে কোনো প্রতিশ্রুতি পর্যন্ত নেই। বলা হচ্ছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমানে যা ব্যয় করা হচ্ছে, তা জিডিপির আড়াই শতাংশ এবং এই অর্থ প্রকৃত গরিবদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা জানার জন্য জাতীয় পর্যায়ে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহায়তায় চরম দরিদ্রদের ওপর ‘ন্যাশনাল ডেটাবেইস’ তৈরি করা হবে। অথচ প্রায় একই সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দেশে কালোটাকার মোট পরিমাণ জিডিপির ৮১ শতাংশ (সর্বোচ্চ হিসাব) অথবা ন্যূনপক্ষে ৪২ শতাংশ (সর্বনিম্ন হিসাব)। এই কালোটাকার বণ্টনের ওপর জাতীয় পর্যায়ে কোনো জরিপ নেই, নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে না। বর্তমান রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশে তা জানারও উপায় নেই। যেমন জানার উপায় নেই গত দুই দশকে আর্থিক খাত থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে ধনিক গোষ্ঠীর ‘লুটপাটের কাহিনি’ (আশির দশকে একতা পত্রিকায় এ নিয়ে একবার কিছু তথ্য বেরিয়েছিল)। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর দোহাই দিয়ে আজ আড়াল করে রাখা হচ্ছে গণতন্ত্রের দুই দশকে প্রাথমিক পুঁজি আহরণের ‘দ্বিতীয়’ পর্যায়কে, যা স্বৈরতন্ত্রের অধীনে ‘প্রথম’ পর্যায়ের লুণ্ঠনের চেয়ে আরও সর্বগ্রাসী লুণ্ঠনের চিত্রকে তুলে ধরতে পারত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধভাবে ভূমি দখল, জলাশয় দখল, বনজ সম্পদ দখলের মধ্য দিয়ে পুঁজি আহরণের আরও নানা সূত্র। বাংলাদেশে ‘এলিট প্রবৃদ্ধি’ নিয়ে আমরা কোনো গবেষণাই হাতে নিতে পারিনি।
দারিদ্র্য থেকে উত্থান যদি নাগরিক অধিকার হয়ে থাকে, তাহলে অধিকারের ভাষাতেই ভবিষ্যতে নাগরিক সমাজকে কথা বলতে হবে। রক্ষণশীল অর্থশাস্ত্রের একটি মতে, দারিদ্র্যকে এখনো কেবল ব্যক্তিগত দায়দায়িত্বের বিষয় হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। এতে সমাজ, রাষ্ট্র ভূমিকা রাখে অত্যন্ত পরোক্ষভাবে। এই মতের সঙ্গে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক অধিকার ধারণার নিরন্তর বিরোধ রয়ে গেছে। সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ‘সর্বজনীনতা’র যে উত্থান আমরা এ দেশে (ও ইউরোপে) দেখেছি, এর একমাত্র যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও সর্বজনীন অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। এর মানে দাঁড়ায়, এক দেশে দুই অর্থনীতি ও দুই সমাজ চলতে পারে না। আমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, সেখানে যা যা ঘটবে, তার শুরুর বিন্দু এই ভাবনার সূত্রে গাঁথা। একেই আমরা ‘তৃতীয় ইউটোপিয়া’ বলছি। এর সম্ভাব্য আশু কর্মসূচি হতে পারে এ রকম।
দরিদ্রদের ওপরে ওঠা নিশ্চিত করতে হলে বিশেষত বংশানুক্রমিক ধরে চলা চরম দারিদ্র্যকে দূর করতে হলে উচ্চশিক্ষায়, আধুনিক খাতের কর্মসংস্থানে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে হবে। এক, উন্নত মানের প্রতিটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত করতে হবে এবং তার সুফল যেন দরিদ্র জনগোষ্ঠী পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণত, সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল, সানবিমস স্কুল, হলিক্রস বা নটর ডেম কলেজের মতো এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সিট তোলা থাকবে চরম দরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য। ভারতে ইতিমধ্যেই এলিট স্কুলগুলোর ২৫ শতাংশ সিট গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। এতে করে গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েরা উন্নত শিক্ষার সুযোগ পেয়ে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের মতোই অধিক আয় ও সম্মানের পেশায় যেতে পারবে। দুই, দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা খাসজমির ওপর চরম দরিদ্র গোষ্ঠীর প্রাথমিক অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অকৃষি খাতে ব্যবহারের কারণ দেখিয়ে সরকারি খাসজমিকে বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার প্রথা বন্ধ করতে হবে। তিন, দেশের সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য-বিমা চালু করার অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে চরম দরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারের জন্য অবিলম্বে স্বাস্থ্য-বিমা ও পুষ্টি কর্মসূচি চালু করতে হবে। চার, শুধু মঙ্গা মৌসুমে নয়, বছরের সব মৌসুমে গ্রামে কর্মনিশ্চয়তার কর্মসূচি চালু করতে হবে। পাঁচ, গরিব পরিবারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রীদের জন্য বিশেষ আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। ছয়, গ্রামে যেসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে, তা শহরের দরিদ্র পরিবারের জন্যও প্রসারিত করা চাই। সাত, চরম দরিদ্রদের জন্য পাইলট পর্যায়ে যেসব ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি ইতিমধ্যে সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে, তা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। আট, গ্রাম ও পৌরসভা এলাকার স্থানীয় সরকার কাঠামোকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে জোরদার করতে হবে, যাতে এসব কাঠামো জনগণের কাছে থেকে তাদের দৈনন্দিনের সমস্যা সমাধানে সরাসরি ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। জাতীয় বাজেটের অধীনে ইউনিয়ন পরিষদকে কিছু শর্ত সাপেক্ষে বছরে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া যায়, যাতে এই অর্থ স্থানীয় সমস্যা সমাধানে ব্যবহূত হতে পারে। নয়, এসব উদ্যোগের জন্য যে বাড়তি সম্পদ জোগান করতে হবে, তার জন্য বিত্তশালী শ্রেণীর আয় ও সম্পদের ওপর বর্ধিত করারোপ করার কোনো বিকল্প নেই। অতিরিক্ত জোগানকৃত অর্থ চরম দরিদ্রদের জন্য সামাজিক তহবিল সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে সম্পূরক আমদানি শুল্কের অংশ হিসেবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য তহবিলের জন্য ‘সারচার্জ’ বসানো হয়ে থাকে। এ রকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও নেওয়া যায়। দশ, মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রতিহত করার জন্য গরিব ও ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠীকে সারা দেশে আরও ব্যাপক সরকারি ও এনজিও সহায়তা দিয়ে ‘লিগ্যাল এইড’ কার্যক্রম চালু করতে হবে, যাতে তারা বর্তমান নিঃসহায় অবস্থা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারে। পরিবেশবিরোধী কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও আরও সক্রিয় আইনি প্রতিরোধ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগকেও আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এবং এগারো, গরিবদের জন্য যেসব সামাজিক, উন্নয়নমূলক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে—যাদের দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত—তাদের ভূমিকাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ, বাধামুক্ত ও বেগবান করতে হবে। এই নতুন ‘১১ দফা’ একটি উদাহরণ মাত্র। এর সঙ্গে আরও অনেক করণীয় যুক্ত হতে হবে।
এসবই যেকোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হারে বাস্তবায়নযোগ্য স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক অধিকারের চৌহদ্দিরও সম্প্রসারণ ঘটবে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোয় ও চলতি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দরিদ্র ও চরম-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে এসব দাবির স্বীকৃতি মেলা সহজ নয়। এসব দাবির পক্ষে সাংবিধানিক ও আইনি স্বীকৃতি আদায়ের এবং তা বাস্তবায়নের জন্য দলনির্বিশেষে নাগরিক (রাজনৈতিক-সামাজিক) সমাবেশ-আন্দোলন বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশে বিবদমান দুই রাজনৈতিক পরাশক্তির দৃষ্টি, অন্যদিকে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণসাধন তাদের লক্ষ্য নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যে বসন্ত এসেছে, ভবিষ্যতে তা আমাদের দেশেও আসতে বাকি।
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষণা পরিচালক বিআইডিএস।

কাঁটাতারের দেয়াল

বিনায়ক সেন | তারিখ: ০৭-০৯-২০১১

ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা বিষয়ে গোড়া থেকেই বাংলাদেশের জনমনে তিনটি মূল অভিযোগ ক্রিয়াশীল ছিল। প্রথমত, দুই বন্ধুসুলভ প্রতিবেশীর মধ্যে ভৌগোলিক কাঁটাতারের বেড়া থাকা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, দূর ঐতিহাসিক কাল থেকেই যারা প্রতিবেশী, তাদের মধ্যে মানসিক কাঁটাতারও থাকা উচিত নয়। এই কাঁটাতার যে আছে, তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভারতবর্ষে প্রচারিত হতে না দেওয়া। এটা দেওয়া হয় না ওপরের নির্দেশেই। তৃতীয়ত, এর আগে পানি চুক্তি, দক্ষিণ বেরুবাড়ীর বিনিময়ে তিনবিঘা করিডর দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা-ও রক্ষিত হয়নি। এমনকি সাম্প্রতিক কালে সীমান্ত হত্যা বন্ধে রাবার বুলেটের প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করেনি।

ফলে এবারও যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি পালন করবে, তার ভরসা কী? ’৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর (র‌্যাটিফাই) করলেও ভারতীয় পার্লামেন্ট অদ্যাবধি তা অনুস্বাক্ষর করেনি। তিনবিঘা করিডরের অধিকারের বদলে তারা দিচ্ছে কেবল ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের সুযোগ। এ রকম উদাহরণ অজস্র।

বাংলাদেশ সরকারের তরফে বলা হচ্ছিল, ট্রানজিট ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ভারতের চাহিদা বাংলাদেশ মেনে নিলে ভারতীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যের ওপরে আরোপিত অশুল্ক সব বাধা দূর করা হবে, অথবা অভিন্ন নদীতে ন্যায্য পানির হিস্যা পাব। অতীতের অভিজ্ঞতা মনে রাখলে এ ব্যাপারে আশঙ্কা রয়েই যায়। সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিটি ভেস্তে গেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের জনগণ মোটেই বিস্মিত হয়েছে বলে মনে হয় না। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্র-রাজ্য সরকার মিলিয়ে জটিলতার অজুহাত তুলে যেভাবে আসন্ন চুক্তিস্বাক্ষর থেকে পিছিয়ে গেল, তাতে কার্যত তাদের সদিচ্ছার অভাবই প্রকাশ পেয়েছে। সেই তুলনায় আমাদের সরকারি পক্ষের উপদেষ্টা ও মন্ত্রীসহ যাঁরা এ ব্যাপারে অতি উচ্ছ্বাস দেখিয়েছেন, তাঁদের আচরণ বাড়াবাড়িই ঠেকেছে।

কলকাতা বন্দর বাঁচানোর অজুহাতে ফারাক্কা বাঁধ করা হলেও বাঁচেনি কলকাতা বন্দর। অথচ আমাদের অনেক নদ-নদী এই বাঁধের কারণে মরে গেছে এবং আরও নদী মৃতপ্রায়। তিস্তা নদীর উজানে ব্যারাজ করা হয়েছে আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করেই। এখন শেষ মুহূর্তে কেন্দ্র-রাজ্যের বিরোধের কথা তুলে পানি চুক্তি না হতে পারাটা আমাদের চরমভাবে হতাশ করবে বৈকি। এই হতাশার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতেই হয়, আমরা তড়িঘড়ি করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরে তাদের প্রবেশাধিকার দিতে চাই না। এ-সংক্রান্ত বিশদ কারিগরি পর্যালোচনাও করা হয়নি। বাংলাদেশের রপ্তানি ৪০ শতাংশ বাড়ায় ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণক্ষমতার ওপর যথেষ্ট চাপ বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এই অবস্থায় মনমোহন সিংয়ের সফর উপলক্ষে অতি উৎসাহী হয়ে আমাদের প্রয়োজন হিসাব না করেই, বন্দরগুলোর ধারণক্ষমতা আমলে না নিয়েই চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর তাদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। বরং উপযুক্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনের পর মংলা বন্দরকেই ট্রানজিটের নৌ-কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

খেয়াল করা দরকার, সড়ক-রেল ও নৌ-ট্রানজিট আলোচনার মধ্যে ভারত শেষ মুহূর্তে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে, কিন্তু তিস্তা ও তিনবিঘা করিডরের সুষ্ঠু মীমাংসা থেকে তারা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমান অবস্থায়, ট্রানজিট থেকেও বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ কম। কারণ, ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর অর্থনীতি এখনো নাজুক এবং খারাপ রাস্তার কারণে তাদের দিক থেকে বড় আকারের মালামাল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পরিবহনের সুযোগও কম।

অশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশের পণ্য ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। মান নিয়ন্ত্রণের নামে কড়াকড়ির জন্য বাংলাদেশের শুকনো খাদ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং তৈরি পোশাক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আমাদের ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকারে নানা বাধা সৃষ্টি করেও রেখেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এটাও দেখতে হবে যে ভারতে বাংলাদেশি চ্যানেল দেখতে দেওয়া এবং সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হওয়ার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে, ভারতের দিক থেকে ভৌগোলিক ও মানসিক কাঁটাতার অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত ট্রানজিট দেওয়া হবে চরম বোকামি।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি সাম্প্রতিক বিতর্ক

তারিখ: ১০-০৬-২০১১

বিশেষভাবে এ বছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাড়তি সংশয় জানানোর কোনো কারণ নেই। এ নিয়ে অবশ্য সিপিডিসহ প্রকাশ্যে সংশয় ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। সবকিছুই বলা হচ্ছে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে। বাস্তবতা হলো, যাঁরা বলছেন প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭, আর যাঁরা বলছেন ৬ দশমিক ৩ বা তারও কম—উভয়ের কাছেই পূর্ণাঙ্গ উপাত্ত নেই। সে উপাত্ত আসবে আরও কয়েক মাস পর, তখন পূর্ণ অর্থবছরের হিসাব পাওয়া যাবে। প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত হিসাব বর্তমানের প্রাক্কলিত হিসাবের চেয়ে তখন বাড়তেও পারে, একই থাকতে পারে, আবার কমতেও পারে। যেমন, ২০০৯-১০-এর প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বেশি ছিল। তা ছাড়া কেবল এ বছরেই ৬-এর অধিক প্রবৃদ্ধির হার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা তো নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫-০৬-এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৬, ২০০৬-০৭-এ ৬ দশমিক ৪, এমনকি ২০০৭-০৮-এ বিশ্বমন্দার মুখেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ২। সে হিসাবে যে বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৪১ শতাংশ, আমদানির বড় অংশ হচ্ছে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি, কৃষিতে বোরো ধানে বাম্পার ফলন, আমনও খারাপ হয়নি, ক্ষুদ্র ঋণ ও বাণিজ্য ঋণের সম্প্রসারণশীল প্রবাহ ব্যক্তি খাতে গিয়েছে, সেখানে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলিত হয়ে থাকলে এত সংশয়াপন্ন হওয়ার কোনো কারণ ঘটে কি? যা-ই হোক, আবারও বলছি, প্রবৃদ্ধির হার প্রসঙ্গে চূড়ান্ত মীমাংসা করার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বৃক্ষকে দেখতে চেয়ে অরণ্যকে যেন দেখতে ভুলে না যাই। আমাদের দেশের গ্রাম ও শহরের অর্থনীতিতে, বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি খাতে গত এক দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, বরং তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে ‘রাজনীতি হচ্ছে’ (যা কেউ কেউ বলছেন) এ রকম অভিযোগ তাই ব্যক্ত করা আমার বিচারে সংগত নয়। এতে করে বিবিএসকেও খাটো করা হয়। অথচ ভারতে সিএসও বা পাকিস্তানের এফবিএসের তুলনায় বিবিএস কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই, যাঁরাই ভারতের বা পাকিস্তানের স্টেট জিডিপি বা প্রভিন্সিয়াল জিডিপি উপাত্ত নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন। সর্বোপরি পূর্ববর্তী বছরগুলোয় (বিশেষত সুতীব্র বিশ্বমন্দার ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০-এ) অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল শ্লথতর, অর্থনীতিতে তখন অব্যবহূত ক্যাপাসিটির সৃষ্টি হয়েছিল, এ বছরে এসে তা ব্যবহূত হয়েছে (যে জন্য কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে ২০১০-১১তে) সে কারণেও প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে কেন যেখানে বিনিয়োগের অনুপাত তেমন একটা বাড়েনি, সেটা শুধু এ বছরের জন্যই ‘বিশেষভাবে’ বাধা হতে যাবে কেন? বিনিয়োগের অনুপাত তো ২০০২-০৩ সাল থেকেই ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। সুতরাং এই ধাঁধার রহস্য উন্মোচন করতে গেলে কার্যত ২০০২-০৩ সাল থেকেই প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে উপাত্ত আমরা পাই, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে এবং সম্যক আলোচনা করতে হবে। শুধু সংশয় প্রকাশ করে ছেড়ে দিলে চলবে না। তা ছাড়া বিনিয়োগের হিসাবও অবমূল্যায়িত হতে পারে, কেননা, এক দশক আগের তুলনায় এখন বিনিয়োগের সিংহভাগ হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এবং এই খাতে বিনিয়োগে গত এক দশকে যে পরিমাণগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে, তা এখনো পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে ধরা পড়ছে না।
বিনিয়োগ মোটামুটি একই পর্যায়ে থাকার পরও প্রবৃদ্ধি কেন ২০০২-০৩ সালের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০১০-১১ সালের ৬ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে, তার অনেকগুলো ব্যাখ্যা হতে পারে। যদি আমরা হ্যারড-ডোমার সরলীকৃত দুনিয়ার মধ্যেই থাকি (যেখানে সঞ্চয় ও ভৌত বিনিয়োগই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক), সেই নিরিখেও বলা যেতে পারে যে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা ২০০২-২০১১ কালপর্বে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে থাকবে। বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাওয়ার প্রধান উৎস ছিল দুটি। প্রথমত, গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত হারে স্থানান্তরিত হয়েছে শ্রমশক্তি (২০০১ সালের ২৫ শতাংশের তুলনায় বর্তমানে নগর জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে)। এই রি-লোকেশন অ্যাফেক্টের কারণে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃ িদ্ধ পাওয়ার কথা। গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে একটা বড় কারণ হলো, গ্রামের তুলনায় শহরে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশি। শুধু মাত্রায় বেশি নয়, আমার অনুমান, শহরে শ্রমের উৎপাদনশীলতা গ্রামের তুলনায় আরও দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। না হলে এক উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী গত এক দশকে শহরে পাড়ি জমানো সত্ত্বেও নগর-দারিদ্র্য দ্রুত হারে কমে যেত না। কেউ কেউ বলতে পারেন যে গ্রাম থেকে যারা শহরে জড়ো হয়েছে, তারা অধিকাংশই এসেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, সুতরাং এখানে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে সেই ধারণা কতটা যুক্তিযুক্ত? এ পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শহরে কর্মকাণ্ডে আগের চেয়ে অনেক গতিশীলতা এসেছে, আয় বেড়েছে এবং লক্ষণীয়ভাবে দারিদ্র্য কমেছে। নগর অর্থনীতির ‘আকর্ষণীয় ক্ষমতা’ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরেও বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। আরও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সেটা যেমন ঘটেছে কৃষি অর্থনীতির ভেতরে (যেমন, বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তারে), তেমনি ঘটেছে গ্রামীণ অকৃষি অর্থনীতির ভেতরেও। এই শেষোক্ত ধারার বড় প্রমাণ হচ্ছে, গ্রামীণ অকৃষি অর্থনীতিতে পুঁজির চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। এর পরোক্ষ সমর্থন মেলে মাইক্রো-ফাইন্যান্স খাতে পুঁজির বর্ধিত জোগানের জন্য একই ব্যক্তির নানা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ (মাল্টিপল লোন) নেওয়ার প্রবণতায়। এ ধরনের ঋণের ৮০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে আরও বেশি করে পুঁজি সংগ্রহের জন্য। তার মানে, গ্রামে মাথাপিছু পুঁজির পরিমাণ বেড়েছে এবং তা বেড়েছে আরও বেশি করে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যাওয়ার কারণে। গ্রামে এখন মজুরি-শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে এবং এক হিসাবে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মজুরি-শ্রমিকের সংখ্যা গ্রামের মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পারিবারিক শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে মজুরি-শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কারণে গ্রামের শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। এতে করে প্রবৃদ্ধিও বাড়ার কথা বিনিয়োগের সামগ্রিক অনুপাত একরূপ থাকা সত্ত্বেও।
২০০২-২০১১ কালপর্বে প্রবৃদ্ধির উত্তরোত্তর বাড়ার পেছনে শ্রমশক্তির বর্ধিত নিয়োজনও অনেকাংশে কাজ করে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। যেসব নারী আগে ‘ঘর-গৃহস্থালির’ অর্থনীতিতে আটকে থাকতেন, তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সরাসরি শ্রমের বাজারে অংশ নিচ্ছেন। এক দশক আগেও শ্রমের বাজারে নারীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ১৫-২০ শতাংশ, এ হার এখন ৩০-৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কৃষিতে ও অকৃষিতে, ক্ষুদ্র ঋণের (ও কিছুটা বাণিজ্যিক ঋণের) সম্প্রসারণে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে এটা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই শ্রমঘন কাজে নিয়োজিত, ফলে বিনিয়োগের অনুপাত একই থাকলেও শুধু নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণের কারণেই প্রবৃদ্ধি বেশ কিছুটা বাড়ার কথা। এ ধারা আরও বেগবান করা গেলে (পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় এ হার ৭০-৮০ শতাংশ) এ দেশের প্রবৃদ্ধির হার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজি সঞ্চয়ের বর্ধমান প্রবণতা, শ্রমবাজারে নারীর উত্তরোত্তর অংশগ্রহণ এসব প্রবৃদ্ধির ‘সরবরাহগত’ দিককে নির্দেশ করে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়ার ক্ষেত্রে ‘চাহিদাগত’ দিকও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আলোচনায় প্রায়ই আসে না সেটা হলো, এক দশক ধরে দ্রুত হারে দারিদ্র্য কমে যাওয়ার ধারা এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হারকেও বাড়িয়ে থাকবে। গোড়ার পর্বের দারিদ্র্য অবস্থা নিরসনের সঙ্গে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এটা সুস্পষ্ট। আমাদের দেশে দুই দশক ধরেই দারিদ্র্য কমছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় আমলেই কমেছে। কিন্তু দারিদ্র্য বিশেষভাবে কমেছে ২০০০-২০১০ কালপর্বে (সেটা ২০০০, ২০০৫, ২০১০ সালের দারিদ্র্য-উপাত্ত বিচার করলেই দেখা যায়)। দারিদ্র্য অব্যাহতভাবে কমার অর্থ গ্রামীণ বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্রয়ক্ষমতা এসেছে। এই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে কৃষি, কৃষিজাত শিল্প, অকৃষি পণ্য ও সেবা খাতগুলোর সম্প্রসারণ ঘটেছে সুদূর গ্রামাঞ্চলেও। ফলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উত্তরোত্তর বর্ধমান ‘অভ্যন্তরীণ ভোগ’ (ডমেস্টিক কনসাম্পশন) প্রবৃদ্ধির এক নতুন নিয়ামকে পরিণত হচ্ছে। এ কথা এক দশক আগেও অতটা খাটত না। অর্থাৎ এই নিরিখেও আমরা দেখছি যে বিনিয়োগের অনুপাত একই থাকলেও বর্ধিত ভোগের কারণেও প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে রপ্তানি ও প্রবাসী-আয়ের পাশাপাশি ‘স্থানীয় বাজার’-এর সম্প্রসারণ আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু আমরা কেবল হ্যারড-ডোমার দুনিয়াতেই আবদ্ধ নেই এবং শুধু সরলীকৃত হ্যারড-ডোমার সমীকরণের নিরিখেই প্রবৃদ্ধিকে বিচার করলে চলবে কেন। ভৌত বিনিয়োগ ছাড়াও প্রবৃদ্ধির আরও দুটো প্রধান নিয়ামক হলো মানব-পুঁজির (হিউম্যান ক্যাপিটাল) গঠন ও প্রযুক্তিগত বিকাশ। মানব-পুঁজি গঠনে (শিক্ষার বিস্তারে যেমন) ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার সুফল আমাদের এখন পেতে শুরু করার কথা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেসরকারি খাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। দুই দশক আগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার যেখানে ছিল ৪০-৫০ শতাংশ, এখন তা ৭০-৮০ শতাংশ। গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের পাসের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুণগত মানকে আগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই শ্রমশক্তির শিক্ষাগত মাত্রা বেড়েছে, আধাদক্ষ ও দক্ষ শ্রমশক্তির অনুপাত বেড়েছে, যার শুভ প্রভাব পড়তে বাধ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সেই সূত্রে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির ওপরও।
ধীরলয়ে হলেও প্রযুক্তিগত উন্নতির বিশিষ্ট অবদান (যা ধরা পড়ে ‘টোটাল ফ্যাক্টর প্রডাক্টিভিটির পরিসংখ্যানে) বিভিন্ন খাতওয়ারি প্রবৃদ্ধির মধ্যে উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। কৃষকেরা উন্নত বীজ ব্যবহার করছেন (শুধু উফশী ধান নয়, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও); শিল্প ও নির্মাণ খাতে উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে; সুদূর গ্রামেও মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে তথা বিনিয়োগ সহজতর হচ্ছে। সুতরাং প্রবৃদ্ধির হার বিচারের ক্ষেত্রে একপেশেভাবে শুধু বিনিয়োগের অনুপাতের দিকে তাকানো অসংগত।
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করছে। এর প্রস্তুতি কয়েক বছর ধরেই (২০০৪-০৫ সালের পর থেকেই) চলছিল। এই কৃতিত্ব যেমন বিএনপির, তেমনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ বর্তমান সরকারের অংশেও কিছুটা বর্তায়। প্রবৃদ্ধির হার বেগবান হলে দারিদ্র্য আরও দ্রুত হারে কমে আসবে, এ নিয়েও বিতর্ক নেই। কিন্তু যে প্রশ্ন এখানে তোলা যায় সেটা হলো, প্রবৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে। যেকোনো প্রবৃদ্ধিই সমান হারে দারিদ্র্য কমায় না। না হলে গ্রোথ কমিশনের মতো এত র্যাডিক্যাল নয় এমন কমিশনও ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ আর ‘কনভেনশনাল গ্রোথ’-এর মধ্যে পার্থক্য টানত না। বাংলাদেশের জন্য উচ্চ প্রবৃদ্ধির কৌশল রচনায় একটা বাড়তি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করছে কি না। আমাদের আয় বাড়ছে, কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে কি না পরিবেশদূষণ, পাবলিক স্পেসের (যেমন—নদী, জলাশয়, পার্ক, উন্মুক্ত ময়দান) ক্রমবিলুপ্তি এবং তীব্র যানজটের কারণে। তাই আমাদের জন্য শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়, আরও জানা প্রয়োজন ‘গ্রিন জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি কতটা হচ্ছে। পরিবেশ-বিধ্বংসী প্রবৃদ্ধি কেবল পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর তা নয়, অর্থনৈতিক সাম্যের জন্যও ক্ষতিকর। পরিবেশ ধ্বংস করে যাঁরা নতুন প্রবৃদ্ধির জন্ম দিচ্ছেন (তুরাগ নদ বা বুড়িগঙ্গা ভরাট করে নির্মাণ প্রকল্প করলে তা এক হিসেবে ‘নতুন প্রবৃদ্ধি’, অন্য হিসেবে পরিবেশের সর্বনাশ), এসব বিনিয়োগকারীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না সুশাসনের দুর্বলতার জন্য। এসব বিনিয়োগকারীর মুনাফার একটা বড় অংশ কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ, যা সমাজে বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এসব বিনিয়োগকারীর ওপর পরিবেশের ক্ষতি করার জন্য নিদেনপক্ষে বাড়তি কর (এনভায়রনমেন্টাল ট্যাক্স) আরোপ করা উচিত। কেননা, পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির ভুক্তভোগী সবাই—ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব-নির্বিশেষে। পরিবেশ-সহনশীল বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন। বর্তমান বাজেটের ক্ষেত্রে আমি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করব ‘জনগণতান্ত্রিক’ সমন্বিত পাবলিক র্যাপিড ও মাস ট্রানজিটের গুরুত্বের কথা। আমাদের বিদ্যমান রেলপথ, জলপথ ও সড়কপথ (যা আছে তাকে ব্যবহার করে বা এর কিছুটা পরিমার্জনা করে) আমাদের নতুন করে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। যেসব ভাবনা ইতিমধ্যেই পরিবহন-অর্থনীতিবিদেরা করেছেন বৃহৎ ও মাঝারি আকারের শহরগুলোর জন্য, তা এখনই বাস্তবায়নে নিয়ে আসতে হবে। এদিকে বাজেট কিছুটা হলেও দৃষ্টি দেবে, এ আশা করছি।
ড. বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

নাজিম হিকমতের কবিতা: পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জীব, ঝরাপাতা

তারিখ: ০৩-০৬-২০১১

পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জীব
তুমি মাকড়সার মতো, ভাই আমার,
অন্ধকারের আড়ালে বেঁচে আছো
ভীতু মাকড়সার মতো।
তুমি চড়ুইয়ের মতো, ভাই আমার,
ছোট্ট ডানা মেলে এদিক-ওদিক
অস্থির চড়ুইয়ের মতো।
তুমি শামুকের মতো, ভাই আমার,
নিজের মধ্যে তৃপ্ত
গুটানো শামুকের মতো।
তুমি সব সময় এক অজানা আশঙ্কায়, ভাই আমার,
যেন কোনো ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে
তোমার নিত্য বসবাস।

তুমি একা নও এমন, তোমার মতন যারা
সংখ্যায় তারা পাঁচ-দশ নয়—লাখ লাখ
দুঃখজনক, কিন্তু সত্যি।
তুমি ভেড়ার মতো, ভাই আমার,
কেউ তোমাকে লাঠি দেখালে
দ্রুত দলের মধ্যে ভিড়ে যাও
আর যখন ছুটতে থাকো কসাইখানার দিকে
তখনো মুখে বেশ একটা গর্বের ভাব।
এ জন্যেই বলছি, তুমি হলে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জীব
মাছেদের চেয়েও অদ্ভুত
যারা জলের বাইরের সমুদ্রকে দেখতে পায় না।
জগ জোড়া যে-অত্যাচার চলছে
তা আসলে হচ্ছে তোমারই কারণে।
আমরা যদি এখনো অভুক্ত থাকি, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ি,
রক্তে ভেসে যাই,
আমাদের যদি এরপরও আঙুলের মতো পিষে-দলে
ওরা মদিরা বানায়
তাহলে এর জন্যে দায়ী হচ্ছো
তুমি—
এ কথা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে ঠিকই,
কিন্তু এসবের অধিকাংশ দায়, ভাই আমার,
কেবল তোমার একার।

ঝরাপাতা
আমি পাতা ঝরার কথা পেয়েছি পঞ্চাশ হাজার কবিতায়
উপন্যাসে লেখায়
আমি পাতা ঝরার ছবি দেখেছি পঞ্চাশ হাজার সিনেমার দৃশ্যে
পাতা ঝরতেও দেখেছি পঞ্চাশ হাজার বার
এলোমেলো উড়তে ফিরতে পচে যেতে
আমার পায়ের তলায় করতলে আঙুলে মচমচ শব্দ তুলে
পঞ্চাশ হাজার বার ওদের মৃত্যু আমাকে দেখতে হয়েছে
তার পরও পাতা ঝরার দৃশ্যে আমি আলোড়িত না হয়ে পারি না
বিশেষ করে ওরা যখন ঝরতে থাকে বুলেভার্দে
বিশেষ করে যখন ঝরতে থাকে চেস্টনাট গাছের পাতারা
তার ওপর যদি শিশুরা ভিড় জমায় চারপাশে
তার ওপর যদি রোদ ওঠে সেদিন
কোনো বন্ধুর ভালো খবর পাই
আর সেদিন যদি বুকের অসুখটা দেখা না দ্যায়
যদি বুঝতে পারি আমার ভালোবাসা আমাকে ছেড়ে যায়নি
বিশেষ করে আমার চারপাশের মানুষকে ভালো থাকতে দেখি
ঝরা পাতার দৃশ্যে আমি আলোড়িত না হয়ে পারি না
বিশেষ করে ওরা যখন ঝরে পড়তে থাকে বুলেভার্দে
বিশেষ করে যখন ঝরতে থাকে
চেস্টনাট গাছের পাতারা
অনুবাদ: বিনায়ক সেন

নাজিম হিকমতের পৃথিবী

বিনায়ক সেন | তারিখ: ০৩-০৬-২০১১
আরো দেখুন: নাজিম হিকমতের কবিতা

নির্বাসিত নাজিম
‘নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়’ এমন একটি লাইন আমাদের যৌবনের আকাশে তারকাখচিত হয়ে গিয়েছিল। অনুবাদক ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫২ সালে বেরুনো বইয়ের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন যে, যদিও বেশিরভাগ কবিতাই ইংরেজি পাঠ থেকে নেওয়া, কিছু কিছু কবিতা ফরাসি থেকেও অনূদিত। ফরাসি থেকে অনুবাদের কাজে তিনি গীতা মুখোপাধ্যায় ও (পরবর্তীতে নিম্নবর্গের ইতিহাস-খ্যাত) রণজিৎ গুহের সাহায্য নিয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতিচারণায় পড়েছি, (১৯৫১ কি ’৫২ সালে কলকাতায়, জানি না কী করে, আমাদের বন্ধু ডেভিড কোহেনের হাতে এসেছিল নাজিম হিকমতের একগুচ্ছ কবিতার ইংরেজি তর্জমা। ইংরেজি খুব উচ্চাঙ্গের নয়। তবু পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন জানা যাচ্ছে ইংরেজিতে নাজিম হিকমতের কবিতার প্রথম সংকলন বের হয় কলকাতা থেকেই—পরিচয় প্রকাশনী থেকে ১৯৫২ সালে। ইংরেজিতে এর আগে নাজিম হিকমতের কোনো কাব্য-সংকলন প্রকাশ পায়নি। কেন এ রকম একটি সংকলন আর সব জায়গা থাকতে কলকাতা থেকেই প্রকাশিত হতে হবে সেটাও খানিকটা রহস্যজনক। এর পেছনের কার্য-কারণ সূত্র এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।

গত শতকে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলছিল ম্যাকার্থিবাদের দাপট। সর্বত্র কমিউনিজমের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন সিনেটর ম্যাকার্থি—‘আন-আমেরিকান’ কর্মকাণ্ডের জন্য হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন একের পর এক কবি-নাট্যকার-শিল্পী-বিজ্ঞানীরা। হলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও বাদ যাচ্ছেন না। এদের মধ্যে ছিলেন লেখক আর্থার মিলার, এলিয়া কাজান, লিলিয়ান হেলম্যান, হাওয়ার্ড ফাস্ট, ডরোথি পার্কার, ইরউইন শ, ল্যাংস্টন হিউজ, সাংবাদিক উইলিয়াম শীরার, গায়ক পিট সিগার, নোবেল-জয়ী বিজ্ঞানী লাইনাস পাওলিং প্রমুখ। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মুক্তচিন্তার নামে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এসবের মধ্য দিয়ে কার্যত তাঁরা পরিণত হয়েছেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সমর্থকে। এ রকম বৈরী পরিবেশে কমিউনিস্ট কবি নাজিম হিকমতের অনুবাদ আমেরিকায় প্রকাশ করা সহজ ছিল না। নাজিমের অনুবাদ যাঁরা সেদিন করেছিলেন (তাঁদের নাম যথাক্রমে নিলুফার ও রোসেট) তাঁদেরকেও ছদ্মনামের আশ্রয় নিতে হয়। ফলে অনুবাদক হিসেবে ছাপা হয় আলি ইউনূসের নাম। ‘আলি’ খুবই প্রচলিত নাম, আর ‘ইউনূস’ এসেছিল ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর কবি ইউনূস এমরে-র থেকে। অনুবাদকেরা জানতেন, দরবেশ কবিকুলের মধ্যে রুমি ছাড়া এমরের কবিতা নাজিমের খুব প্রিয় ছিল। যা হোক, অনুবাদ তো হলো, কিন্তু ছাপানো নিয়ে সমস্যা গেল না। এই সময়ে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভারত থেকে আসা কিছু শিক্ষার্থী’ (ওদের নাম এখনো জানা যায়নি এবং ওদের অধিকাংশ বাঙালি হলে বিস্ময়ের কিছু নেই) নাজিমের এই অনুবাদ হাতে পান। পড়ে তাঁরা এতই বিমোহিত হয়ে পড়েন যে, এই মহার্ঘ বস্তু দ্রুত জনসমক্ষে আনার জন্য পাণ্ডুলিপির একটি অনুলিপি পাঠিয়ে দেন কলকাতায়। এভাবেই ‘পরিচয়’ প্রকাশনী থেকে (হয়তো ডেভিড কোহেনের হাত ঘুরেই) ১৯৫২ সালে ৩৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে ‘নাজিম হিকমতের নির্বাচিত কবিতা’র প্রথম সংকলন।

যেহেতু নাজিম আজীবন কবিতা লিখেছেন তাঁর মাতৃভাষা তুর্কিতে, তাঁর কবিতার অনুবাদ কিছুটা দেরিতে হলেও পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুবাদ হয়েছে রুশ ভাষায়, তার পরে ফরাসিতে এবং গত দুই দশকে সবচেয়ে বেশি হারে ইংরেজিতে। তাঁর কবিতার পাঠকের সংখ্যা ইংরেজি-জানা বৃত্তে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, তাঁর স্বদেশীয় মরমী কবি জালালুদ্দিন রুমীর মতো নাজিম হিকমতও আধুনিক ইঙ্গ-মার্কিন সাহিত্যের ভুবনে এখন একটি অতি প্রিয় নাম। অন্তত দশটি কাব্য-সংকলন, একাধিক জীবনী গ্রন্থ, স্মৃতিচারণা ও চিঠিপত্র নিয়ে নাজিমিয়ানা এখন ইংরেজিতে অনুবাদের একটি বিশেষ শাখায় পরিণত হয়েছে। নিজের কবিতার অনুবাদ নিয়ে ১৯৬১ সালের দিকে লেখা একটি কবিতায় নাজিম লিখেছিলেন, ‘তিরিশটি-চল্লিশটি ভাষায় আমার লেখা প্রকাশিত, কিন্তু আমার তুরস্কে, আমার তুর্কি ভাষায় আমার লেখা নিষিদ্ধ।’ ১৯৫১ সালের ২৫ জুলাই তুরস্কের সরকার তাঁর নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেয়। ২০০৯ সালে মৃত্যুর ৪৬ বছর পর সেই নাগরিকত্ব ফিরে পান তিনি। এখন ইস্তাম্বুলের এশিয়া অংশে চালু হয়েছে নাজিমের প্রিয়তমা স্ত্রীর নামে ‘পিরাইয়ে কাফ্যে’, খোলা হয়েছে নাজিম হিকমত আকাদেমি, সেখানে প্রতিদিন ভিড় করে সংস্কৃতিমনা সাধারণ মানুষ।

এক নিঃসঙ্গ বিপ্লবী
১৯০২ সালে তাঁর জন্ম তুরস্কের ছোট্ট শহর আলেপ্পোয়। যেখানে জন্ম সেখানে কখনো আর ফিরে যাননি। বলতেন, ‘ফিরে যেতে ভালোবাসি না আমি।’ তারপরও ফিরে গিয়েছিলেন মস্কোতে—একবার নয়, বার তিনেক। প্রথমবার ১৯২১ সালে—মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। দ্বিতীয়বার ১৯২৮ সালে—তুরস্কের গোপন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে। তৃতীয়বার ১৯৫১ সালে—জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৬৩ সালে মস্কোতেই তাঁর মৃত্যু। ঘর থেকে প্রতিদিনের মতো বের হয়েছেন সকালের পত্রিকা আনতে, পত্রিকাটা হাতে নিয়েই ঢলে পড়েন আকস্মিকভাবে। অনেক দিনের বুকের অসুখ নিয়ে এর বছর কয়েক আগেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—‘এঞ্জাইনা প্যাক্টোরিস’। ১৯২১ সালে যখন মস্কোয় পড়তে যান তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর। ১৪ বছর বয়স থেকে কবিতা লিখেছেন। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘কেউ কেউ জানে উদ্ভিদ জগতের রহস্য, কেউ কেউ জানে মাছেদের ভুবন, কেউ বা জানে তারাদের নাম, আর আমি জানি সব ধরনের নিঃসঙ্গতার ভাষা।’

রেজিস দেব্রে এক সময়ে চে গুয়েভারার বলিভিয়ার অভিযানের সঙ্গী ছিলেন (এবং পরবর্তীতে হয়েছিলেন ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ত প্রেসিডেন্ট মিতেরাঁর উপদেষ্টা)। তিনি নাজিমের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন প্যারিসে। বিশ্ব জনমতের চাপে তুরস্কের জেল থেকে তিনি সবে ছাড়া পেয়েছেন। ‘কমিউনিস্ট পার্টিতে এলেন কীভাবে’—এই প্রশ্নের উত্তরে নাজিম বলেছিলেন: ‘পার্টি করে মানুষ সাধারণত দুই কারণে। এক, তারা আসে মেহনতি শ্রেণীর থেকে। মেহনতি শ্রেণীর পার্টিতে খেটে-খাওয়া মানুষেরা আসবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার জন্য এটা প্রযোজ্য নয়। আমার পরিবার ছিল আমলাদের পরিবার (নাজিমের নানা ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর “পাশা”—সুলতানদের দরবারে এক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী)। দুই, আর পার্টিতে যারা আসে, তারা আসে বুদ্ধির তাড়নায়—বই পড়ে, চিন্তা করে, মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে। কিন্তু আমি এসেছিলাম হূদয়ের টানে। ১৯ বছর বয়সে যখন মস্কোয় যাই আমার একমাত্র ইচ্ছে ছিল লেনিনের সঙ্গে দেখা করব, দেখা করে বলা, “আপনার সাফল্যের গোপন চাবিকাঠি আমাকে বলে দিন। আপনি কী করে বিপ্লব সমাধা করলেন তার রহস্য আমাকে বলুন।” আসলে আমার ইচ্ছে ছিল, লেনিনের কাছ থেকে এরকম কোনো গোপন চাবিকাঠি পকেটে নিয়ে আমি নিজ দেশ তুরস্কে ফিরে যাব। তারপর “বিপ্লব করে” গরিবী ঘুচাব দেশের মানুষের।’ লেনিনের সঙ্গে অবশ্য সরাসরি কখনো দেখা হয়নি নাজিমের। কিন্তু ১৯২৪ সালে লেনিন যখন মারা গেলেন তখন সেই অগণন শোক মিছিলের মধ্যে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন।

মস্কোয় থাকতেই কমিনটার্নের সংস্পর্শে গড়ে ওঠা তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নাজিমও জড়িয়ে পড়েন। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মুস্তফা সুফির মৃত্যু ঘটে কিছুটা রহস্যজনকভাবে দেশে ফেরার পথে সমুদ্রে জাহাজডুবি হয়ে। লেনিনের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই ১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নাজিম ফিরে যান তুরস্কে। এরই মধ্যে তুরস্কে খেলাফতের অবসান হয়েছে, রিপাবলিক ঘোষিত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মোস্তফা কামাল (পরে আতাতুর্ক অভিধা পেয়েছেন)। কমিউনিস্টদের সঙ্গে প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি নিয়ে চলছিল আতাতুর্কের রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু সে অবস্থা অল্প দিনেই বদলে যায়। নিষিদ্ধ হয় ‘প্রগ্রেসিভ রিপাবলিকান পার্টি’ (প্রকাশ্য সংগঠন ছিল এটি বামপন্থীদের)। কমিউনিস্ট পার্টি চলে যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে। তুরস্কে ফিরে গিয়ে নাজিম প্রকাশ্যে কাজ করেছেন প্রথমে বিভিন্ন পত্রিকায়, উদ্দেশ্য—লেখালেখি। আবার গোপনে যুক্ত থেকেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে—ইস্তাম্বুলে পার্টির গোপন কংগ্রেসেও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে গোপন ইশতেহার বিলির দায়ে তুরস্কের আদালত তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় আত্মগোপনরত অবস্থায়। নাজিমকে আবারও দেশ ছেড়ে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসতে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে। ১৯২৬ সালের অক্টোবরে প্রবাসে থাকাকালীনই সাধারণ ক্ষমতায় রাজবন্দীদের মামলা তুলে নেওয়া হলে এর আগেকার ১৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করা হয় নাজিমের ওপর থেকে। ১৯২৮ সালে নাজিম তুরস্কে ঢুকতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন, তিন মাস জেল খেটে আবার বেরিয়ে আসেন। এর পর থেকে তুরস্কেই ছিলেন তিনি কিন্তু বিরতিহীনভাবে ‘আজ গ্রেপ্তার, কাল ছাড়া আবার পরশু গ্রেপ্তার’ এরকম চক্রের মধ্য দিয়ে। এ সময়ের আতাতুর্ক শাসনের লক্ষণীয় দিক ছিল বামপন্থীদের কোণঠাসা করার পাশাপাশি আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা। য়ুরোপের অনেক দেশের আগেই ১৯৩০ সালে তুরস্কের মহিলারা পায় ভোটাধিকার, স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও পায় তারা। শরিয়াপন্থীদের সঙ্গে রিপাবলিকপন্থীদের রাজনৈতিক লড়াইও চলতে থাকে। কিন্তু নাজিমকে ক্রমাগত বিব্রত হতে হয় একের পর এক মামলায়। নাজিম নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন কি-না সেটা এখানে বিবেচ্য বিষয় ছিল না। গোপন বনাম প্রকাশ্যে কাজ নিয়ে পার্টি মধ্যে মতদ্বৈততা ছিল। নাজিম ছিলেন প্রকাশ্যে কাজের পক্ষে এবং এ কারণে ১৯৩২ সালে পার্টি থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়। কিন্তু নাজিম নিজেই ছিলেন মার্কসবাদী পার্টির জীবন্ত প্রতীক। ফলে পার্টির সদস্যপদ হারালেও তাঁর বিরুদ্ধে হয়রানি মামলা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এখন জানা যাচ্ছে যে, স্বয়ং আতাতুর্ক এবং তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুক্রু কায়া নাজিমের কবিতা গোপনে ভালোবাসতেন বলে বামপন্থী সত্ত্বেও তাঁকে দীর্ঘদিনের জন্য কারারুদ্ধ করে রাখতে চায়নি তুরস্কের সরকার। ছোট ছোট মামলায় জড়িয়ে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত রাখাই ছিল দমন-পীড়নের উদ্দেশ্য। একটি উদাহরণ দিলে রাষ্ট্রের এই কূটকৌশলটি পরিষ্কার হবে।

১৯৩১ সালের ৬ মে নাজিম গ্রেপ্তার হন লেখার জন্য; ছাড়া পান ওই বছরের ১০ মে। ১৯৩৩ সালে ১৮ মার্চ আবার গ্রেপ্তার হন লেখার কারণে। এবার রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলী সরকারকে উৎখাত করার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দাবি করে। ওই বছরের ২৯ জুলাই ছয় মাসের কারাদণ্ড পান। ওই একই বছরের ২৭ আগস্ট তাঁকে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় ব্যঙ্গ কবিতা লেখার জন্য। ১৯৩৪ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁকে দেওয়া হয় আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড সম্পূর্ণ অন্য একটি মামলায়, যদিও সেটাও লেখারই জন্য। ১৯৩৪ সালের ৪ আগস্ট রিপবালিকের এক দশক পূর্তি উপলক্ষে নাজিম আবারও সাধারণ ক্ষমায় ছাড়া পান। এসব ডামাডোলের মধ্যেই আবার তাঁর কয়েকটি কবিতা সরকারি অনুমোদনে কলেজের পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়। ইতিমধ্যে স্পেনে শুরু হয়ে গেছে ফ্রাঙ্কোবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন। এই অবস্থায় ১৯৩৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নাজিম আবারও গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামিনে ছাড়া পান। এসবের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কবিতা ছড়িয়ে পড়েছে তুরস্কের সীমানার বাইরে। সুররিয়ালিস্তরা প্যারিসে তাঁর কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করেছে এরই মধ্যে। কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি তাঁর কবিতার ওপরে গানের রেকর্ড বের করেছে। নাজিম নিজে বিভিন্ন নাটক লিখে মঞ্চস্থ করাচ্ছেন, ফাঁকে ফাঁকে লিখছেন চিত্রনাট্য এমনকি ১৯৩৭ সালে নিজেই নির্মাণ করেছেন এক শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র ‘সূর্যের দিকে’ (এর আগে ইস্তাম্বুল সিম্ফনি ও বুর্মা সিম্ফনি নামে আরও দুটি তথ্যচিত্রও তাঁর পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে।) রাশিয়ায় তখন চলছে কুখ্যাত মস্কো শো-ট্রায়াল—লেনিনের সহকর্মী বুখারিন রাদেক, জিনোভিয়েভ কামেনেভদের বিরুদ্ধে। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে প্রায় একইভাবে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য কারণ দেখিয়ে মায়াকোভস্কি-মেইয়ের হোল্ডের সহকর্মী নাজিমের বিরুদ্ধে তুরস্কেও চলছে প্রহসন-বিচার। ১৯৩৮ সালের ১৭ জানুয়ারি শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হলেন নাজিম হিকমত। এবার তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে ২৮ বছর চার মাসের দীর্ঘ কারাদণ্ড। হয়তো আতাতুর্ক বেঁচে থাকলে এমনটা হতো না। কিন্তু আতাতুর্ক মারা যান ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর। ফলে ওই দণ্ডের আর রদবদল হয়নি।

নাজিমের মতো আর কোনো কবিকে বিংশ শতাব্দীতে এতো ক্ষান্তিহীন ভাবে আইনি মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হয়নি, এতবার গ্রেপ্তারও করা হয়নি, সম্ভবত আর কাউকে। যদি সব কারাদণ্ডের আদেশ বহাল থাকত— ইলিয়া এরেনবুর্গ হিসাব করে বের করেছেন—তাহলে তাঁকে জেলের মধ্যে কাটাতে হতো এক দুটো বছর নয়, এক দুই দশকও নয়—মোট ৫৬ বছর। এতটাই বিপজ্জনক ছিলেন ‘সিস্টেমের জন্য’ নীলচক্ষু সোনালী চুলের কবি নাজিম হিকমত!

মায়াকোভস্কি, বোদলেয়ার ও রুমি
কবিতায় যে নন্দনতত্ত্ব নাজিম প্রবর্তন করেছিলেন তার জন্য তিনি অকুণ্ঠ ঋণ-স্বীকার করেছেন তিনজনের কাছে। একজন রুশ কবি (কারো কারো মতে, ‘অক্টোবর বিপ্লবের কণ্ঠস্বর’) ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি। দ্বিতীয় জন, আধুনিক ফরাসী কবিতা যার হাতে জন্ম সেই কিংবদন্তীসম শার্ল বোদলেয়ার। আর তৃতীয় জন, নিজ দেশের—‘মরমী কবি’ জালালুদ্দিন রুমি। মায়াকোভস্কির প্রভাব পড়েছিল তার প্রথম দিকের কবিতায়। এ নিয়ে অনেকেই লিখেছেন যে, সিঁড়ি-ভাঙা মাত্রায় মুক্ত ছন্দে নাজিমও তার কবিতার লাইন সাজিয়েছেন। মায়াকোভস্কির মতই তার কবিতায় দেখা দিত নানা অপ্রত্যাশিত বাঁক, তার কবিতার তীর্যক সুরও একই উৎস থেকে প্রাপ্ত। নাজিমের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল মায়াকোভস্কির। উভয়ে একই মঞ্চ থেকে কতবার কবিতা-পাঠ করেছেন উদাত্ত গলায়। বিশের দশকের শুরুতে মস্কো তখন হয়ে উঠছে নব-নিরীক্ষা আন্দোলনের কেন্দ্র। কবিতা, নাটক, সিনেমা, উপন্যাস-সর্বত্র চলছে নতুন প্রলেতারীয় কালচারকে চিনে-নেওয়ার পালা। ১৯২১-২৪ ও পরে ১৯২৫-২৮ কালপর্বে নাজিমের কবি-জীবন এই নব-নিরীক্ষা আন্দোলনৈর পরিবেশে অগ্রসর হয়েছে।

একবার মায়াকোভস্কি ও নাজিম একই মঞ্চে কবিতা পড়বেন। হাত-পা নেড়ে মায়াকোভস্কি তাঁর কবিতা উচ্চগ্রামে পড়ে গেলেন। এরপর নাজিমের পালা। স্বভাবতই কিছুটা স্নায়ুর চাপে ছিলেন। মায়াকোভস্কি তাঁকে বললেন, ‘দ্যাখো বাপু, তুমি তো পড়বে কবিতা তুর্কি ভাষায়, এখানকার রুমী দর্শকেরা সেসবের বিন্দু-বিসর্গ জানে না। সুতরাং মনের সুখে তুমি পড়ে যাও। দেখবে প্রচুর হাত তালি পাবে।’

এরেনবুর্গ তার স্মৃতিকথায় বলেছেন, মায়াকোভস্কি নয় বরং নাজিমের কবিতার নিকটতম তুলনা হতে পারে কেবল পল এলুয়ারের কবিতা। সেটা সম্ভবত এলুয়ারের ওলগার সাথে নাজিমের কবিতায় পিরাইয়ের বহুল উল্লেখের কথা ভেবে লেখা। এলুয়ার ও নাজিম উভয়েই অবিশ্রান্তভাবে নিজেদের প্রিয়তমাসুদের প্রসঙ্গ এনেছেন কবিতায়। নাজিম নিজে অবশ্য বলেছেন অন্য কথা। মায়াকোভস্কির মত কংক্রিট কিছুটা কর্কশ গদ্য-ছন্দের চেয়ে আরো অনেক মৃদু-স্বরের কবিতা তার। জেলপর্বের কবিতায় আসলেই নাজিমের স্বর অনেক খাদে নেমে গিয়েছিল—যেন নিজের কথা অন্য কারো জন্যে নয়, কেবল তার নিজের জন্যে লেখা অথবা তার প্রিয়তমার মুখোমুখি বসে স্বাগত উচ্চারণে শোনানোর জন্যে লেখা।

দেব্রে তাঁর সাক্ষাৎকারে নাজিমকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কার জন্যে কবিতা লেখেন, নাজিমের উত্তর ছিল সোজাসাপ্টা: ‘কবিতাকে আগে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। একজন বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক, বামপন্থী, দায়বদ্ধ কবি (যে-নামেই তাকে চিহ্নিত করুন না কেন) তিনি হবেন এক সদা-সক্রিয় কবি: তিনি শুধু মানুষের হূদয়ের কথাই বলবেন না, হূদয়কে তিনি একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিত করবেন।.. লেনিন যখন বেঁচে ছিলেন, সেই সময়ের মস্কোয় মায়াকোভস্কি ও ইয়েসেনিনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সেসময় বড় বড় জমায়েতে কবিতা পড়া হত। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমার দেশেও তো কবিরা যুগ যুগ ধরে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে জনগণের সামনে কবিতা পাঠ করেছেন। জেলে যাওয়ার আগে আমিও কবিতা লিখতাম বহু শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ব বলে। পরে যখন জেলে থাকতে হল অনেক দিন ধরে, তখন থেকে আমার স্বরও নেমে যেতে থাকল। আমার শ্রোতা বলতে কেউ ছিল না, বা থাকলেও এক-দুজন মাত্র। একজনকে শোনাতে পারলেও আমার মনে হত তখন এর মধ্য দিয়েই আমি পৃথিবীর সব মানুষের কাছে যেতে পারছি’।

নাজিম তার এক কবিতায় একবার নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও’? উত্তর দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আমি মারা যেতে চাই ইস্তাম্বুলে, মস্কোয় এবং প্যারিসেও।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘আমার মৃত্যুগুলোকে আমি পৃথিবীর উপরে বীজের মত ছড়িয়ে দিয়েছি, এর কিছু পড়েছে ওদেসায়, কিছু ইস্তাম্বুলে, আর কিছু প্রাগে। সবচেয়ে যে-দেশকে আমি ভালোবাসি সেটি হচ্ছে পৃথিবী। যখন আমার সময় আসবে, আমাকে পৃথিবী দিয়ে মুড়ে দিও’। অনেক শহরের মধ্যে প্যারিস যে মাঝে-মাঝেই ঘুরে-ফিরে আসে তার কবিতায় তার একটা প্রধান কারণ ছিলেন বোদলেয়ার। ‘প্যারিস স্প্লীন’ থেকে গদ্য-ছন্দের এক নতুন সুষমা তিনি আহরণ করেছিলেন। ফরাসি ভাষায় দখল থাকায় মূলের স্বাদ নিতে বাধা হয়নি তারা নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনের নানা খুঁটিনাটি কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছিল তার কবিতায় বোদলেয়ারের প্রেরণাতেই। অন্যত্র তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘আমি কবিতা লিখতে শুরু করি পনেরো বছর বয়সে। ঐ সময়ে ভালোবাসা ও মৃত্যু কবিতাকে আচ্ছন্ন করে থাকে। বাবার দিক থেকে আমি একেবারেই প্রাচ্যপন্থী, আর মা’র দিক থেকে পুরোপুরি য়ুরোপীয়। আমি বোদলেয়ার দ্বারা পুরোপুরি আচ্ছন্ন দিলাম, কিন্তু আমার দেশের দরবেশ কবিকুলও আমার চৈতন্যে প্রভাব ফেলেছিলেন। আমি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণে তৈরি’।

প্যারিসের কোন জিনিসটি সবচেয়ে ভালো লাগে? সে হচ্ছে প্যারিসই। এখানে কি তোমার দেখা হয়েছে তোমার কমরেডদের সঙ্গে? হ্যাঁ, আমি দেখেছি নামিক কামাল, জিয়া পাশা, মুস্তফা সুফি ওদের। আমি দেখেছি আমার তরুণী বয়সের মাকে—তিনি ছবি আঁঁকছেন, ফরাসিতে কথা বলছেন অনর্গল— পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী তিনি। বলো তো. প্যারিসকে কেমন দেখায়? তাকে দেখায় প্যারিস বাসীর মতো। বলো, আদমের পুত্র, এবারে বলো—তুমি কি প্যারিসকে বিশ্বাস করো, হ্যাঁ, আমি প্যারিসকে বিশ্বাস করি।’ তাঁর প্রিয় বন্ধু লুই আরাগঁ, পল এ লুয়ার, ত্রিস্তান জারা, পাবলো পিকাসো—এদের স্মৃতি প্যারিসকে ঘিরেই। এ কারণেই অন্যত্র বলেছেন, ‘আমি বেঁচে থাকব আরাগঁ-র কবিতায়, আমি বেঁচে থাকব পিকাসোর শাদা কবুতরে, আমি বেঁচে থাকব মার্সাইয়ের ডক শ্রমিকদের মধ্যে।’ শহর নিয়ে এরকম অনর্গল প্রশস্তি-গাঁথা আর কোথাও নেই: নেরুদা করেননি তার মান্টিয়াগো নিয়ে, কার্দেনাল করেননি তাঁর মানাগুয়া নিয়ে, পুশকিন করেননি তার সেই পিটার্সবাগ নিয়ে। নাজিম নিজেও আর কোনো শহরকে নিয়ে এতটা প্রেমময় কাব্য লেখেননি।