বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::১০৪
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
[নুরুল ইসলামের স্মৃতিচারণ] … এক-অর্থে সেটা ‘স্বীকারোক্তি’র মতো শোনাবে আজ :
“দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে তিনি ইতিমধ্যেই জনগণের উদ্দেশে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনুধাবন করতে আমাদের ব্যর্থতা বা অনাগ্রহ তাঁকে ক্ষুুব্ধ করেছিল। তাঁর মত অনুযায়ী দেশ তখন বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছিল, তাতে চরম পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, দেশে সে সময় বিরাজমান গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবিত পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর পথ। তিনি আমাদের এটা স্পষ্ট করেই বললেন যে দেশের বিদ্যমান সমস্যা এবং এর সমাধান সম্পর্কে আমাদের যথাযথ চিন্তাভাবনা নেই।
১৯৭৫ সালের ৮ জানুয়ারি আমাদের উপরিউক্ত ছুটিতে যাওয়ার আগে আমি তাঁর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছিলাম। পার্লামেন্টে নতুন সংবিধান (বাকশাল) পাস হওয়ার সামান্য কয়েক দিন আগে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন তাঁকে বেশ বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। আমি কিছু বিদায়ী কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। তিনি রুমের মধ্যে পায়চারি করছিলেন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানটি তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে…।’
তিনি বললেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বিভক্তি এবং অস্থিরতা থেকে মুক্ত করতে তিনি চূড়ান্ত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করার কাজটি অন্ধকার ঝোড়ো রাতে ঘন ঘন বজ্রপাতের মধ্য দিয়ে একটি গভীর বন অতিক্রম করার সঙ্গে তুলনীয়। এখানে বিপদ আছে, আছে অনিশ্চয়তা। তবে একই সঙ্গে একটি নতুন সকাল ও সূর্যের আলোয় ভরা নতুন গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছানোর আশাও আছে। এই কঠিন যাত্রাকে বেছে নেওয়া ছাড়া তাঁর সামনে আর কোন পথ ছিল না।”

এই কঠিন যাত্রা শুরু করাই কঠিন-এর জন্য ঝুঁকি নিতে হয়, সাহস লাগে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। অনেক সময় অনেক দূর গিয়ে দেখা যায় রাস্তাটা বন্ধ-আর এগুলো যাচ্ছে না। তখন পিছু হঠতে হয়। যারা বিপ্লবী তারা অগ্রযাত্রার অগ্রগতিতেও বিমোহিত হন না, আবার সাময়িক পরাজয়েও ভেঙে পড়েন না। তবে বাকশালের মৌলিক অর্থনৈতিক দিকগুলো যে শুধু ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসেই প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল তা নয়। ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ কথাটি ১৯৭২ সালেই বলা হয়েছিল; একইভাবে ‘মাল্টিপারপাস সমবায়ের’ কথা ওই বছরেই একাধিক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছিলেন। এখন আমরা সেদিকটির প্রতি নজর দেব।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আট-দশটা দেশের মতো সাধারণ গণতন্ত্রের পথ ধরে হাঁটতে চান না। স্বাধীনতার সেই প্রথম লগ্নেই তিনি বলেছিলেন যে, গতানুগতিক ধারায় বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলানো যাবে না:
‘আমার সরকার আভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাসী, পুরাতন সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। অবাস্তব তাত্ত্বিকতা নয়, আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের বাস্তব প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে পুরাতন সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়ে নতুন সমাজ গড়তে হবে। শোষণ ও অবিচারমুক্ত নতুন সমাজ আমরা গড়ে তুলব এবং জাতির এই মহাক্রান্তিলগ্নে সম্পদের সামাজিকীকরণের পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচির শুভ সূচনা হিসেবে আমার সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।’
সে সময়ে বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণের পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলা হলেও তার চিন্তায় তখনই নতুন পথে যাত্রার অভিপ্রায় সুস্পষ্ট। ‘পুরাতন সামাজিক কাঠামো ভেঙে ফেলা’; ‘সম্পদের সামাজিকীকরণ’; সমতামুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘সমাজতান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক দর্শন; ‘শোষণ ও অবিচারমুক্ত সমাজ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা; সামাজিকীকরণের বিষয়টিকে ‘পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচি’ হিসেবে দেখার চেষ্টা; এবং এক্ষেত্রে ‘অবাস্তব তাত্ত্বিকতা’ পরিহার করে বাস্তবানুগ হওয়ার তাগিদ। বঙ্গবন্ধুর চিন্তার এই মৌলিক উপাদানগুলো তখনই জন্ম নিচ্ছিল, যা কালক্রমে আরও পরিণতি লাভ করে। বাকশালের অর্থনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে তার ছাপ সুস্পষ্ট।
কো-অপারেটিভ করার কথা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই স্পষ্ট করে বলেছিলেণ-বাকশালের পূর্বসূরী ছিল তার এই চিন্তা। ওই বছরের ৫ এপ্রিলের বক্তৃতায় তিনি বলেন:’কিন্তু একটা কথা, এই দেশ নতুনভাবে সাজাতে হবে। গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল কইরেন না। আপনাদের জমি আমি নেব না। ভয় পাইয়েন না, জমি নিয়ে যাব তা নয়। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটা করে কো-অপারেটিভ হবে, প্রত্যেক গ্রামে গ্রামে। এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু তার আওতায় থাকবে বেকার প্রত্যেকটি মানুষ। যে মানুষ কাজ করতে পারে। তাকে এই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে এবং বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। আলটিমেটলি প্রত্যেকটি ভিলেজে একটা করে কো-অপারেটিভ করা হবে। তাদের কাছে পয়সা যাবে। কাছে বেতন যাবে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল…। তা না হলে দেশ এগুনো যাবে না। এজন্যই ভিলেজে কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে, পাঁচ বৎসর মেয়াদি প্রত্যেকটি গ্রামে কয়েক হাজার থেকে পাঁচশ থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত কম্পলসারি কমিউনিটি হবে। আপনার জমির ফসল আপনি নিবেন। একটি অংশ যাবে কো-অপারেটিভে, ঐ অংশ গভর্নমেন্টের হবে। দ্বিতীয় অংশ থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে।’
উদ্ধৃত অংশ থেকে পুরো অর্থটি স্পষ্ট হয় না। তবে এর থেকে মূল ধারণাটি অনেকখানি আঁচ করা যায়। উৎপাদনমুখী সমবায় করা হবে, জমির মালিক তার জমির পরিমাণ অনুযায়ী ফসল পাবেন, একটি অংশ যাবে কো-অপারেটিভের তহবিলে, অপর একটি অংশ যাবে থানাভিত্তিক কাউন্সিলে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু গোড়া থেকেই সমবায়ীকরণের সঙ্গে বিকেন্দ্রীভূত শাসন-ব্যবস্থার একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাকশালের অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে এই যোগসূত্রকে আরও যুক্তিসিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সমবায়ের ধারণা বঙ্গবন্ধুর মনে স্বাধীনতার পূর্বাপর সময় থেকে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে বিরাজ করছিল। ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনের আগে জাতির উদ্দেশে রেডিও-টিভি ভাষণে মুজিব প্রথমবারের মতো ‘বহুমুখী সমবায়ের’ কথা উল্লেখ করেন। উদ্ধৃতিটি তার চিন্তারাশিকে সংক্ষেপে তুলে ধরে:
‘একটি স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি পর্যায়ে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা যেতে পারে না। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষীদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানে জায়গিরদারী, জমিদারী, সরকারী প্রথার অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে গোটা ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভূমি দখলের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত করে অবশ্যই নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাসজমি ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই আধুনিকীকরণ করতে হবে। অবিলম্বে চাষীদের বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি সংহতি সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকার এজন্যে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।’
দেখা যাচ্ছে, ‘বহুমুখী সমবায়’ গঠনের বিষয়টিকে গোড়া থেকেই বঙ্গবন্ধু কৃষির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, উৎপাদনের অপেক্ষাকৃত সুষম বণ্টন, সামন্তবাদী উৎপাদন-সম্পর্কের বিলোপ, ভূমিহীনদের জীবন-মান উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ভেবেছিলেন। সমবায়ের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি দ্রুততর করা এবং সুষম বণ্টন অর্জন- এই দুই লক্ষ্যকেই তিনি করায়ত্ত করতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তার এই চিন্তা আরও বিকশিত হয়। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চের ভাষণে, বঙ্গবন্ধু তার ‘সমবায়-চিন্তা’ ও ‘বিকেন্দ্রীকরণের’ চিন্তাকে এভাবে প্রকাশ করলেন:’এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই-যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের। সে আঘাত করতে চাই এই ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি জানি আপনাদের সমর্থন আছে কিন্তু একটা কথা, এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না, ভয় পাবেন না যে, জমি নিয়ে যাবো। তা নয়। পাঁচ বছরের প্ল্যান-এই বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু তার অংশ- যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে কো-অপারেটিভ-এর সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কার্স প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল টাউটদেরকে বিদায় দেওয়া হবে, তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে, পাঁচ বছরের প্ল্যানে প্রত্যেকটি গ্রামে পাঁচশত থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত নিয়ে কম্পলসারি কো-অপারেটিভ হবে। আপনাদের জমির ফসল আপনি নেবেন। অংশ যাবে কো-অপারেটিভের হাতে, অংশ যাবে গভর্নমেন্টের হাতে। দ্বিতীয়, থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে। এই কাউন্সিলে রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি কর্মচারী যেই হয়-একজন তার চেয়ারম্যান হবেন। এই থানা কাউন্সিলে থাকবে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সরকারি কর্মচারী। তার মধ্যে আমাদের কৃষক, শ্রমিক আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি থাকবে, যুবক প্রতিনিধি থাকবে, কৃষক প্রতিনিধি থাকবে-তারাই থানাকে চালাবে। আর মহকুমা থাকবে না, সমস্ত মহকুমা জেলা হয়ে যাবে। সেই মহকুমার একটি করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল থাকবে। সব কর্মচারী এক সাথে তার মধ্যে থাকবে। এরমধ্যে পিপলস রিপ্রেজেন্টেশন হবে, তার চেয়ারম্যান থাকবে। সেখানে তারা সরকার চালাবেন-এইভাবে আমি একটি সিস্টেমের চিন্তা করছি এবং করবো বলে ইনশাআল্লাহ আমি ঠিক করেছি। আপনাদের সাহায্য ও সহানুভূতি চাই।’
বাকশালের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু দেশকে সংকটের খাদ থেকে স্বাভাবিক অগ্রযাত্রার পথে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। এটা করতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে জোর দেন দুটি উপাদানের ওপরে। গ্রামজীবনের বিকাশের ক্ষেত্রে যৌথ-চাষাবাদের ওপরে গুরুত্ব আরোপ এবং বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়ন। জমির মালিকানা-সম্পর্কে হাত না দিয়েই তিনি যৌথ-আবাদের মডেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন প্রশাসনের ও বিচার-ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। তিনি মনে করতেন যে, দুর্ভিক্ষ-উত্তর পরিস্থিতিতে গ্রামবাংলাকে বাঁচানোর ও ধরে তুলে দাঁড়ানোর জন্যে এটাই একমাত্র উপায়। সেরকম ‘আর্জেন্সি’ নিয়েই তিনি বলেছিলেন:
“আমার যুবক ভাইরা, আমি যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে এর উপর বাংলার মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পায়জামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। আর গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই কো-অপারেটিভকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলার জন্য কাজ করে যেতে হবে। যুবক চাই, ছাত্র চাই, সকলকে চাই।
আর একটা কথা বলতে চাই, বিচার। বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লাহর মর্জি যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে সেই মামলা শেষ হতে লাগে প্রায় ২০ বছর। আমি যদি উকিল হই, আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে কেস নিয়ে যাই। ঐ মামলার ফয়সালা হয় না। আর যদি ক্রিমিনাল কেস হয়-তিন বা চার বছরের আগে শেষ হয় না। এই বিচার বিভাগকে নতুন করে এমন করতে হবে, যে থানায় ট্রাইব্যুনাল করার চেষ্টা করছি সেখানে মানুষ এক বছর বা দেড় বছরের মধ্যে বিচার পাবে-তার বন্দোবস্ত করছি। আশা করি সেটা হবে।
তাই আমি একথা জানতে চাই আপনাদের কাছে, জানতে চাই একটি কথা। এই যে চারটি প্রোগ্রাম দিলাম, এই যে আমি কো-অপারেটিভ করবো, থানা কাউন্সিল করবো, সাবডিভিশনাল কাউন্সিল হবে, আর আমি যে আপনাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ফসল চেয়েছি, জমিতে যে ফসল হয় তার ডবল। কল-কারখানায় কাজ-সরকারি কর্মচারী ভাইরা একটু ইনডিসিপ্লিনে এসে গেছে। অফিসে যান, কাজ করেন। আপনাদের কষ্ট আছে, আমি জানি। দুঃখী মানুষ আপনারা। আপনারা কাজ করেন। যাদের পেটে খাবার নাই, তাদের উপর ট্যাক্স বসিয়ে আমি আপনাদের পোষতে পারবো না। প্রোডাকশন বাড়লে আপনাদেরও এদের সাথে উন্নতি হবে।”
আজকাল কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর সমবায়-চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেন। এই সমবায়-চিন্তা ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি-খামার বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কিনা সে প্রশ্ন তাদের মনে দেখা দেয়। এক্ষেত্রে তিনটি দিক আমাদের বিচার করতে হবে। প্রথমত, কৃষিতে বা গ্রাম-জীবনে যৌথতার চর্চা বা সমবায়ের চর্চা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই বাংলায় একটি প্রতিষ্ঠিত ঘরানা। এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তার ‘সমবায়’ গ্রন্থে বহুবার তার যুক্তি পেশ করেছেন। প্রমথ চৌধুরী থেকে শুরু করে স্যার আজিজুল হক সকলেই বাংলার রায়ত-কৃষকের দুর্দশার কথা আলোচনা করে কোনো-না-কোন প্রকারের সমবায়-ব্যবস্থার বা যৌথ অঙ্গীকারের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ-বেকারত্ব সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। এ কারণেই সমবায়ের ধারণাকে বঙ্গবন্ধু বা তার সমসাময়িক নেতৃত্বের কাছে অপ্রত্যাশিত কোনো ‘বিদেশী’ (ইমপোর্টেড) ধারণা বলে মনে হয়নি। দ্বিতীয়ত, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ১৯১৭ সালে রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব বা পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লব সমবায়ের ধারণাটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল তৃতীয় বিশ্বের নেতৃত্বের কাছে। বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে চীন, ভিয়েতনাম ও পূর্ব ইউরোপের অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তৃতীয়ত, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের প্রায় সকল অর্থনীতিবিদই যৌথ চাষপ্রথা প্রবর্তনের ব্যাপারে প্রায় নিঃসংশয় ছিলেন। অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা ইতোপূর্বে করে গেছেন। আমি তার লেখার সূত্র ধরে তিনটি প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি নিচে তুলে ধরছি।
প্রথমেই আসে বিশ্বব্যাংকে কর্মরত ফাল্যান্ড ও পারকিনসন দুই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদের কথা। “বাংলাদেশ-এ টেস্ট কেইস অফ ডেভেলপমেন্ট” বইতে তারা শেষ পর্যন্ত এই উপসংহারে পৌঁছান:
“সুতরাং প্রতীয়মান হয়, যদি আয় বিতরণ এবং নিয়োজনের সুযোগের সমস্যার সমাধান করতে হবে, তাহলে যৌথ চাষ ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। …এ ধরনের স্পষ্টতই সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশ সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত নাও হতে পারে। কিন্তু এই উপসংহার কোনো মতবাদে বিশ্বাস থেকে নিঃসৃত নয়; এই উপসংহারে উপনীত হতে হয় কেননা জমি-স্বল্পতার পরিস্থিতিতে ভূমিহীনদের জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া দুরূহ।”
এর পরে আসে অধ্যাপক নূরুল ইসলামের কথা, যিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি গোড়াতে অর্থনীতিবিদ মো. আনিসুর রহমানের মতো অতটা ‘সমবায়পন্থি’ ছিলেন না। কিন্তু আলোচনার এক পর্যায়ে তিনিও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ‘যতোই জনসংখ্যা এবং তার সঙ্গে ভূমিহীন মজুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষুদ্রাকার জোতসমূহ আরও বিভক্ত হতে থাকবে, ততোই কোনো-না-কোনো ধরনের যৌথ ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য চাপ ও যুক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা, কেননা, এরূপ ব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান বেকারত্বকে অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছানো থেকে রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির এরূপ ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে জমির কোনো-না-কোনো ধরনের যৌথ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আয় ও শ্রম নিয়োজন ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে”।
গ্রামের ‘উদ্বৃত্ত শ্রমকে’ কীভাবে উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা যায় এটাই ছিল তাদের প্রাথমিক দুর্ভাবনা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর গবেষক আবু আবদুল্লাহ মনে করেছিলেন যে,
“ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে জমির পুনর্বিতরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাবলীর সমাধান দিতে পারবে না; বরং কতক ক্ষেত্রে তা এসব সমস্যাকে আরও সংগীন করে তুলতে পারে। সুতরাং, আমাদের কৃষি সমস্যার সমাধান কোনো-না-কোনো ধরনের যৌথতামূলক ব্যবস্থার মধ্যেই খুঁজতে হবে।”
আমি বলতে চাইছি যে, বাকশালে বিধৃত বহুমুখী কো-অপারেটিভ বা সঞ্চয়ের মৌলিক চিন্তাটির পেছনে নানা সূত্র থেকেই যুক্তি-সমর্থন এসেছিল। এটা ঠিক যে সেকালের বাংলাদেশে শহরের মধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশ গ্রামের সনাতনি কৃষি-ব্যবস্থার সরাসরি সুবিধাভোগী ছিলেন এবং প্রস্তাবিত সমবায় ব্যবস্থায় তাদের স্বার্থহানি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাছাড়া, গ্রামীণ এলিট-শ্রেণি সমবায়-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ রোধে শহরের মধ্যবিত্তকে পূর্বাপর সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। নগরের ‘মধ্যবিত্ত’ ও গ্রামের ‘এলিট’ এদের যৌথ-প্রভাবকে প্রতিহত করে নতুন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য নতুন রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর কাছে তখন তিনটি পথ খোলা ছিল- (ক) ক্রমশ নৈরাজ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা, যেটা তার ও তার প্রজন্মের নেতৃত্বের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না; (খ) ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ধরন মেনে মার্কিন-চীন-পাকিস্তান এই অক্ষ-শক্তির কাছে নতিস্বীকার করা এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা, যেটা বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীরা কখনোই মেনে নিতে পারতেন না; (গ) নৈরাজ্য ও প্রতিক্রিয়ার মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা, যেটা বঙ্গবন্ধু চেষ্টা করেছিলেন বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে সফল হলে দেশ আবার সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসত, আর বিফল হলে অনিবার্য ছিল চিলির কায়দায় নিষ্ঠুর ও দীর্ঘ সামরিক শাসন। বাস্তবেও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে সুদীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দেশে নিষ্ঠুর সামরিক শাসন চলেছিল।

[ক্রমশ]

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি

‘কতদূর এগোলো মানুষ’- এই পঙ্‌ক্তিটি লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ। আজ পঞ্চাশ বছর পরে আমরা এই প্রশ্ন করতে পারি যে, কতদূর এগোলো দেশ, মানুষ, সমাজ? সেটা বুঝতে গেলে নানা পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আমরা পরিসংখ্যান বা সূচক দিয়ে সেই পথপরিক্রমার গল্পগাথা রচনা করতে পারি। আমরা ইচ্ছে করলে গাণিতিক মডেল দিয়ে সেই পথপরিক্রমার ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারি। ইচ্ছে করলে অতিব্যক্তিক পর্যায়ে অতিতুচ্ছ মানুষের জীবনের পথপরিক্রমা দিয়েও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। যেমন আমার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষেরও জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমার বিভিন্ন পর্যায়কে মেলানো সম্ভব।
আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে- যে বছর আইয়ুব খান ক্ষমতায় এলেন। ১৯৬৪ সালে যখন আমার ৬ বছর বয়স- আওয়ামী লীগ নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হলো এবং তার সাধারণ সম্পাদক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় জীবনের এই ইতিবাচক রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি দুটো ঋণাত্মক ঘটনাও সে বছর ঘটেছিল। ১৯৬৪ সালেই ঘটে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ‘বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু এবং আরও অনেক প্রগতিশীল রাজনৈতিক মানুষই তখন রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। এক অর্থে সেটিই ছিল ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের শুরুর পর্যায়।
দ্বিতীয় ঋণাত্মক ঘটনাটি ঘটে যখন ১৯৬৪ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মস্কো এবং চীনের শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। সেটিও ষাটের দশকের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করেছিল। মস্কোপন্থি এবং চীনপন্থি বিভাজনে দুর্বল হয়ে পড়েছিল প্রগতিশীল শক্তির আন্দোলন; যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশে এখনও চলছে।
১৯৬৯ সালে আমি সর্বপ্রথম নিজেকে পত্রিকার পাঠক হিসেবে আবিস্কার করি। তখন বাসায় পূর্বদেশ আসত এবং সেই পূর্বদেশের পাতায় আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলার বিবরণী প্রতিদিন ছাপা হতো। অতিআগ্রহ নিয়ে সেটি আমি পড়তাম। তখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সেই থেকে রাজনীতির প্রতি একটু একটু করে জানা-বোঝার আগ্রহ আমার বাড়তে থাকে।
সত্তর সালের মধ্যে আমাদের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনে এক ধরনের রাজনৈতিক মনোজাগতিক বিপ্লব ঘটে যায়। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতন হয়, শেখ মুজিব জেল থেকে বের হয়ে আসেন। ১৯৭০ সালে আসাদ মারা যান। যে রাস্তা দিয়ে আমরা প্রতিদিন বাসে করে স্কুলে যেতাম, সেই আইয়ুব গেটের নাম আমাদের চোখের সামনে আসাদ গেটে রূপান্তরিত হয়। সে বছরই ঘূর্ণিঝড় প্রবলভাবে নাড়া দেয় আমাদের সবাইকে। আমরা পয়ষট্টি সালে একবার অনুভব করেছিলাম যে, নিজেদেরকে আমাদের নিজেদের রক্ষা করতে হবে। কেননা তখন পাক-ভারত যুদ্ধ চলছিল পশ্চিম ফ্রন্টে। সে সময় পূর্ব ফ্রন্ট ছিল অরক্ষিত। ১৯৭০ সালে দ্বিতীয়বার আমরা অনুভব করলাম যে, আমরা অরক্ষিত। ঘূর্ণিঝড়ে এত বড় সংখ্যক মানুষ (প্রায় ৫ লাখ) মারা গেল- অথচ তার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী প্রায় এগিয়েই এলো না। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ আরও তীব্রতর হয়েছিল সেদিন। আমি অনেকটা মনে করি বাংলাদেশের জাতীয় জাগরণের পেছনে এবং সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের পেছনে এই ঘূর্ণিঝড়ের পরোক্ষ রাজনৈতিক ভূমিকা কাজ করে থাকবে।
এই প্রথম আমরা চোখের সামনে দেখতে পেলাম ঘূর্ণিঝড়ে নিহত এত অসংখ্য মানুষের ছবি। পত্রিকার পাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, রাজনৈতিক চায়ের আড্ডায় সর্বত্র এই বোধটা গভীরভাবে সঞ্চারিত হলো। তাই আজকে যখন আমরা বলি, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা থেকে ১৯৭১- এই পাঁচ বছরের মধ্যে কী করে একটি জনগোষ্ঠী একটি বিচ্ছিন্নতাবাদের চেতনায় দীক্ষিত হলো এবং একটি নতুনতর রাষ্ট্রের জন্ম দেবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো, তার কার্যকারণ খুঁজতে হবে এই সমস্ত ঘটনার অভিঘাতের মধ্য দিয়ে। শুধু তাই নয়, এই সমস্ত আপাত তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে কতগুলো মূল্যবোধও এখন আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়েছে। সেই মূল্যবোধগুলো আমরা একদিনে পাইনি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল্যবোধ আমরা ছেষষ্টি সাল থেকে সর্বপ্রথম প্রবলভাবে জাগ্রত হতে দেখলাম, যার সূত্রপাত হয়েছিল আটচল্লিশ-বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সেই সমস্ত ঘটনার অভিঘাতে জাতীয়তাবাদ আরও বেশি শানিত রূপ ধারণ করে, যার একটা প্রাথমিক বিবরণী আমরা পাই শামসুর রাহমানের ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থে।
সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ শব্দটি কে কখন প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন জানা নেই, কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা বোধের আন্দোলন গভীরতর বিকাশ পায় ষাটের দশকের মধ্যভাগে। এই সময়েই আধুনিক বাংলা কবিতারও বিপুল প্রসার ঘটে। আমাদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন অনেক বেশি সেক্যুলার চেতনায় ঋদ্ধ হতে থাকে। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে যখন বঙ্গবন্ধু সরাসরিভাবে অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার পক্ষে উচ্চারণ করেন, তখন তা একেবারেই রাজনৈতিক অ্যাডভেঞ্চার মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে একটি ক্রমান্বয়ে পরিণতিপ্রাপ্ত অনুভূতির যৌক্তিক প্রতিষ্ঠা। এভাবেই আমাদের দেশের অসাম্প্রদায়িকতাবোধ এবং সেক্যুলার রাজনীতির প্রাথমিক ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠা পায়। সত্তর সালের নির্বাচনী ইশতেহারে তার স্বাক্ষর আমরা পাই। সত্তরের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং তারও আগের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু সমতাবাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষা তথা সমাজতন্ত্রের কথাটা জোরেশোরে এবং স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন। আর গণতন্ত্রের কথাতো পূর্বাপর দাবি হিসেবে ছিলই।
পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন। ১৯৫৪ সালের যে নির্বাচন হয়েছিল, সেটি হয়েছিল ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার ভিত্তিতে। কিন্তু ধর্ম নির্বিশেষে যে নির্বাচন প্রথা, সত্তরের নির্বাচনেই সেটি প্রথম বাস্তবায়িত হয়। সুতরাং, ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্বোধন কিন্তু প্রথম ঘটে সত্তর সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং সেই নির্বাচনের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সেটি পরোক্ষ স্বীকৃতি লাভ করে।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমার বয়স তেরো। এই তেরো বছর বয়সে চিত্রপরিচালক তারকোভস্কির ‘ইভানভের শৈশবকালের’ মতন চোখ দিয়ে আমি দেখেছিলাম যুদ্ধের সন্ত্রাস, বিদ্রোহ, গ্লানি ও ভয়। এই সমস্ত অনুভূতি তখন আমাকে তাড়া করে ফিরেছিল। এরই মধ্যে আমার বড় ভাই যুদ্ধে গেলেন। আমার বাবা মুজিবনগর সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে উত্তর-পূর্ব সেক্টরের বিভিন্ন ক্যাম্পের দেখাশোনার কাজ করছেন। যুদ্ধের ভেতরে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতো ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘জয়বাংলা’ ইত্যাদি পত্রিকা- যেখানে রণাঙ্গনের খবরাখবর থাকত। আমি সেগুলো নিয়মিত পাঠ করতাম। সেই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারের কথা তো থাকতই।
আমার এবং আমার মতো অনেক মানুষের মনেই তখন একটা স্বাধীন উদারনৈতিক বাংলাদেশের রূপকল্প মনের মধ্যে জেগে ওঠে। ১৯৭২ সালে আমরা যে বাংলাদেশ পাই, তার প্রথম একটা মৌলিক উপাদান ছিল এই স্বাধীনতা এবং উদার নৈতিকতাসমৃদ্ধ বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয় যে মৌলিক উপাদান আমরা দেখতে পাই তা হলো, রাতারাতি যেন বদলে গিয়েছিল জনচৈতন্যের চেহারা। সেদিনের জনআকাঙ্ক্ষার কথাটি হয়তো আজকে গালভারী কথার মতো শোনায়, কিন্তু জনআকাঙ্ক্ষা সত্যি সত্যি তখন একটা শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। সকল মানুষের চোখেই ১৯৭২ সালের সেই সময়ে দ্রুত বড় হয়ে ওঠার একটা আকাঙ্ক্ষা বা এক জীবনে এই অর্জনগুলো সম্ভব- সেই প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি যেন ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। কিন্তু এই শুভবোধের পাশাপাশি উন্নয়নের জন্য যে জনআকাঙ্ক্ষার বিস্ম্ফোরণের প্রয়োজন, তার পাশাপাশি তখন আমরা প্রাথমিক নৈরাজ্যেরও বিস্তার ঘটতে দেখি। ১৯৭৪ সালে আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। একদল ছাত্রের ধর্মঘটের কারণে সেই সময় অধিকাংশ দিনই কোনো ক্লাস হচ্ছে না; এমনকি প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার যে ক্লাস টেস্ট, সেটিও অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। তখনই আমরা জাসদ এবং এ জাতীয় সংগঠনের অভ্যুদয় দেখি এবং তাদের রাজনীতির প্রভাব সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনের ওপর একটা ঘোরতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বৈকি। প্রাথমিকভাবে কেউ কেউ এসব সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট হলেও পরবর্তীকালে এর কারণে একটা বড় অংশ তরুণের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। আমরা যারা এর আঁচ বাঁচিয়ে চলতে পেরেছিলাম বা শিখেছিলাম- তাদের ঠাঁই হয় ব্রিটিশ কাউন্সিল বা আমেরিকান সেন্টার লাইব্রেরির ভেতরে। কেননা তখন কলেজে প্রায় কোনো লেখাপড়াই হতো না। এই একই সময়ে আমরা দেখতে পাই নানা ধরনের সামাজিক অস্থিরতা। তার মধ্যে হঠাৎ বিত্তের ঝলকানি, ব্রিফকেস ব্যবসায়ীর হঠাৎ বড়লোক হয়ে ওঠা বা অবাঙালি মালিকানাধীন পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করে বসা ইত্যাদিও রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা দেখতে পাই চরমপন্থি বিভিন্ন রাজনীতির বিকাশ, যার ফলে অনেক রকমের গুপ্ত হত্যার শিকার হচ্ছিল সাধারণ মানুষসহ অনেক রাজনীতিবিদ। একটা হিসাবে দেখা যায় যে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কর্মী গুপ্ত হত্যায় নিহত হয়েছিলেন।
চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ আমাদের আরেকটা দিক থেকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা এর আগে কখনও চোখের সামনে দুর্ভিক্ষের মৃত্যু দেখতে পাইনি। গল্প-উপন্যাসে পড়েছি। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র জয়গুনের চরিত্রের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, বা তারও আগে ‘অশনিসংকেত’ বা তারাশঙ্করের ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসের মাধ্যমে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে ঢাকার মতন শহরে ঢাকা কলেজের সামনে সমগ্র জনকোলাহলের মধ্যে মানুষ মারা যাচ্ছে বা বস্ত্রহীন মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে- এই দৃশ্য দেখা আমার সেবারই প্রথম। এখন বুঝতে পারি খাদ্য সাহায্যের ওপরে নির্ভরতা কী ভয়ানকভাবে একটি রাষ্ট্র বা জাতিকে পঙ্গু করে দেয়। বাহাত্তরের খরা, তিয়াত্তর সালের বন্যা এবং চুয়াত্তরের উপর্যুপরি দুইবারের বিধ্বংসী বন্যায় সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বণ্টন ব্যবস্থা এবং উৎপাদনে ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার কোথাও গিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। রাশিয়া নিজেই তখন আমেরিকার কাছ থেকে গম সাহায্য নিচ্ছিল। আমেরিকার কাছে সাহায্য চাওয়ায় চুয়াত্তরের জুন মাসে সোজা বলে দিয়েছিল যে, যেহেতু কিউবাতে বাংলাদেশ পাট রপ্তানি করেছে, সেহেতু তাকে পিএল ৪৮০-এর শর্ত অনুযায়ী কোনো খাদ্য সাহায্য দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ সরকার তখন বলেছিল, ‘এই নিয়ম আমাদের জানা ছিল না; ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে যখন আমরা কিউবাতে পাট রপ্তানি করি, তখনতো সেই তথ্য আপনারা জানতেন। কিন্তু তখনতো আপনারা বলেননি।’ পরবর্তীকালে [অমর্ত্য সেনের স্ত্রী] অর্থনৈতিক চিন্তক, ঐতিহাসিক এমা রথচাইল্ড ফরেন এফেয়ার্স সাময়িকীতে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে একটি লেখায় বলেছিলেন, কিউবায় রপ্তানির কারণে পিএল ৪৮০-এর খাদ্য সাহায্য দেওয়া যাবে না- এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত অবস্থান। কেননা মিসর বাংলাদেশেরও আগে কিউবাতে পাট রপ্তানি করেছিল, তবু পিএল ৪৮০-এর অধীনে তার খাদ্য সাহায্য পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বাংলাদেশকে এক প্রকার শাস্তি দেবার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে তিনি ধারণা করেন। এরকমই ছিল সেই সময়ের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ খুবই সীমিত ছিল। সুতরাং বহির্বাণিজ্য সূত্রে খাদ্য শস্য ক্রয় করে বণ্টনের সুযোগ ছিল সীমিত। একাধিক বক্তৃতা, আলোচনায়, সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার অসহায়তার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ভিক্ষুক জাতির কোনো মান-ইজ্জত থাকে না। আমি জায়গায় জায়গায় গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারব না।
এইরকম একটি পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সাময়িককালের জন্য-মতান্তরে ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য-বাকশাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করলেন। এর প্রধান কারণ ছিল- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়। এ নিয়েও একটি ভ্রান্ত প্রচারণা দেশ চালু আছে। কেননা তখন ১৯৭৩ সালের নির্বাচন অনুযায়ী পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব বা আইন পাস করার জন্য তার জরুরি অবস্থা বা বাকশাল জাতীয় ব্যবস্থা বা অন্য কোনো অথরিটিরিয়ান ব্যবস্থার প্রবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কারণ, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব ছিল। সুতরাং এর তাগিদটা রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার কারণে উদ্ভূত হয়নি। মূলত উদ্ভূত হয়েছে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দেশকে সাময়িক সময়ের জন্য কড়া শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে মাটি থেকে তুলে দাঁড় করানোর জন্য; কক্ষচ্যুত রেলগাড়িকে রেললাইনের ওপরে তোলার জন্য। এবং ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসেও এটির সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছিল ১৯৭৪ সালের গোড়া থেকেই। তৎকালীন নেতৃত্ব-যার মধ্যে সিপিবি এবং ন্যাপও রয়েছে- তারা বুঝতে পারছিলেন যে দেশটাকে একটা ডামাডোলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে এবং এটাকে রোখার জন্য জুন মাস থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সিপিবি এবং ন্যাপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এই আলোচনায় অংশ নেন। দেশে যে একটা জরুরি অবস্থা আনা প্রয়োজন, সে ব্যাপারে বামপন্থি সমালোচকেরা শুধু নয় দক্ষিণপন্থি সমালোচকদেরও যেমন খন্দকার আব্দুল হামিদকে লিখতে দেখেছি। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি লিখেছেন, ‘শোনা যাইতেছে দেশে ইমার্জেন্সি আসিতেছে’। অর্থাৎ, অবস্থা যে ক্রমশ ওই আপৎকালীন জরুরি অবস্থার টিপিং পয়েন্টের দিকে এগোচ্ছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমি বিশেষভাবে এ কথাটি উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, বাকশালের পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা ছিল, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। যেমন আমাদের সংবিধানে যে চার মূলনীতি গৃহীত হয়েছে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা- তার বিশদ মূল্যায়ন করার চেষ্টা এই কর্মসূচিতে রয়েছে। যেমন মালিকানা সম্পর্কের ব্যাপারে সংবিধানে বলা হয়েছে, আমাদের তিন ধরনের মালিকানা থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায় মালিকানা ও ব্যক্তি মালিকানা। এ সমবায় মালিকানার আইডিয়াটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করা হয় বাকশালের কর্মসূচিতে। যেমন প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়নে সম্ভব হলে পরীক্ষামূলকভাবে একটি করে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ করা যায় কিনা, তার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ জমি যার তারই থাকবে, কিন্তু জমির অংশ, শ্রমের অংশ এবং পুঁজির অংশ সবটা মিলিয়ে কৃষি খাতে একটা বণ্টননীতি করা যায় কিনা, সেটার কথা তিনি এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে বলেছিলেন। বলেননি যে এটাই সর্বত্র একবারে চালু হয়ে যেতে হবে, বলেছিলেন পরীক্ষা করে দেখা যাক। কেন এটা করতে হবে? কারণ, বাংলাদেশে একটা বড় বাস্তবতা হচ্ছে যে, এ দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের প্রতি বর্গকিলোমিটারে যদি ১২০০ জন মানুষ বসবাস করে, ভারতে বাস করে ৪০০ জন। এর থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশ কীরকম ঘনবসতির দেশ। সেই দেশে জমির সিলিং দিয়ে জমি পুনর্বণ্টন করার যে প্রথাগত নিয়ম চালু আছে নানা দেশে, সেই নিয়ম বাস্তবায়ন করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। সুতরাং সংগত কারণেই এখানে কিছু সমবায় উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছিল। মনে রাখতে হবে তখনও কিন্তু নগরায়ণ তেমনভাবে হয়নি। তখন নগরে জনসংখ্যা ছিল শতকরা ৫ শতাংশ। সুতরাং এমন নয় যে, গ্রামের মানুষ বা কৃষি খাতের মানুষকে সরিয়ে আমরা রাতারাতি নগরের মানুষে পরিণত করতে পারতাম। আজকের এই নগরায়ণ তখন ছিল না। যেটি এখন অনেকটা সহজতর হয়েছে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এখন গ্রামে থেকেও একটা পরিবারের কোনো সদস্য শহরে এসে কাজ করতে পারেন, গ্রামে টাকা পাঠাতে পারেন। অথবা অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদেশে যেতে পারেন। কিংবা কেউ কেউ ধীরে ধীরে শহরে পুরোপুরি স্থানান্তরিত হয়ে যেতে পারেন। এই সুযোগটা তখন ছিল না। সুতরাং একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে সমবায় কর্মসূচিটিকে সর্বাত্মকভাবে প্রায় সকল অর্থনীতিবিদই সমর্থন জানিয়েছিলেন। আমার জানা মতে তখনকার দিনের প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ, দেশ নিয়ে চিন্তা করেন এমন মানুষেরা জানিয়েছিলেন যে, এই কো-অপারেটিভ এক্সপেরিমেন্ট করা যেতে পারে। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে, ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল, যাতে অংশগ্রহণ করেন রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ডসহ বহু দেশের অর্থনীতিবিদেরা। সম্মেলনের এক পর্যায়ে তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান এবং সেই দলের নেতা অস্টিন রবিনসন তখন বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন যে, ‘আপনি যে সমাজতন্ত্রের কথা বলছেন সেটি কি আমদের একটু বুঝিয়ে বলবেন?’ বঙ্গবন্ধু তখন বলেন, ‘আমাদের সমাজতন্ত্র হলো বাংলাদেশ সমাজতন্ত্র, বাংলাদেশের মতো করে সমাজতন্ত্র। এর বেশি অতিরিক্ত কোনো সংজ্ঞার দরকার নেই।’ তখন এ সম্পর্কে অস্টিন রবিনসন বলেছিলেন, শেখ মুজিবের এই উত্তরটি কোনো চতুর উত্তর ছিল না, এটি প্রকৃতপক্ষেই বাস্তব জ্ঞানভিত্তিক উত্তর ছিল, কেননা বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে সমাজতান্ত্রিক সমাজ বা সমতামুখী সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা কোনো গতবাধা মডেল অনুসরণ করে হতে পারে না। কিংবা রাশিয়া বা ভিয়েতনাম ধরে এটাকে অনুসরণ করা যেতে পারে না। বাংলাদেশের মনমানসিকতার সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ক্যাপাসিটি- এসব মিলিয়েই সেটা গড়ে উঠতে হবে।

সব সময় আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, আমরা কোনো উন্নত আধুনিক পুঁজিবাদী দেশের বা কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের বা কোনো দেশেরই মডেল অনুকরণ করে বড় হতে পারব না। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখার আছে। সেদিক থেকে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ অনেকটা দেং শিয়াও পিং-এর বাংলাদেশ। সেখানে মূল জোরটা দেওয়া হবে কাজটা সফল হলো কিনা তার ওপরে। বেড়াল সাদা না কালো সেই আলোচনাটা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চাইতে বড় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বেড়ালটি ইঁদুর মারতে পারে কিনা। দেং শিয়াও পিং-এর মতোই বঙ্গবন্ধুর একটি বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান ছিল, সজাগ টনটনে। এবং সে জন্যই তিনি ব্যক্তিগত খাতে বিনিয়োগের সীমা প্রথমে ২৫ লাখ, পরে ৩ কোটি, তারপরে ৩০ কোটি পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তখনকার দিনের ৩ কোটি বা ৩০ কোটি আজকের যুগে একশ-দুশ কোটি টাকার সমতুল্য। সুতরাং এটা মনে রাখতে হবে যে, তিনি মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্প উদ্যোক্তার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে চেয়েছিলেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওই সিলিংটাকে তিনি আরও পর্যালোচনা করার পক্ষপাতি ছিলেন। কালক্রমে এটা সংসদে রিভাইজড হবে সেটাই ছিল আইডিয়া।
বাংলাদেশ যে আজকে এতদূর এগিয়েছে তার একটা বড় কারণ হলো- বাংলাদেশের যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তারা কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিলেন। তারা একপেশে, শুধু বাজারমুখী অর্থনীতি বা শুধু রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতির পেছনে ছোটেননি। এটা বিশেষভাবে নব্বইয়ের দশক থেকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
একাত্তরে স্বাধীনতা যদি বাংলাদেশের প্রথম মৌলিক অর্জন হয়, বাঙালি জাতির পক্ষে দ্বিতীয় মৌলিক অর্জন হচ্ছে ১৯৯০ সালের অভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে মিলিটারি স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে। নব্বই সালে আমার বয়স ৩২ বছর। তখন এই বয়সের আশপাশে যাদের বয়স তারা প্রায় সকলেই সেদিন ঢাকার রাস্তায় ছিলেন। এবং তারা সকলেই সেদিন দ্বিতীয়বারের স্বাধীনতা অর্জনকে উপলব্ধি করেছিলেন। মিলিটারি স্বৈরতন্ত্রের এই পরাজয়টি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এর মধ্য দিয়ে মিলিটারি শাসন অনিবার্য নয় এবং তা ছাড়াই যে সিভিলিয়ান শাসনে দেশ পরিচালিত হতে পারে এমন একটি মূল্যবোধের জন্ম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দীর্ঘ পনেরো বছর পরে এ ঘটনাটি ঘটেছিল। এর ফলে গণতন্ত্রের প্রতি একটা অঙ্গীকারের সূচনা হয়। এবং আমাদের আজকের যে অর্থনৈতিক অর্জন তার সূচনাটা হয় মূলত নব্বই দশক থেকেই।
এখন পরিসংখ্যানের প্রশ্নে আসি। আমরা যদি নব্বই সাল থেকে আন্তদেশ শুমারির একটা বিচার-বিশ্নেষণ করি, তাহলে আমরা দেখতে পাবো, যে সমস্ত খাতে অর্থনৈতিক সামাজিক সাফল্য আমাদের এসেছে- তার সূচনা নব্বই দশক থেকে হাঁটিহাঁটি করে শুরু হলেও মূলত এই সাফল্যের মূল অভিঘাত এসে পড়েছে দু’হাজার দশের দশকে। সেটা আমরা শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে বলি, গড় আয়ুস্কালের ক্ষেত্রে বলি, মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বলি, নারী শ্রমের অংশগ্রহণ হারের ক্ষেত্রে বলি, জিডিপি গ্রোথের উল্লম্ম্ফনের ক্ষেত্রে বলি, দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে বলি, জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বিস্তারের ক্ষেত্রে বলি এই সমস্ত ক্ষেত্রেই আমরা এক সময় যে দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম সেই পাকিস্তানের থেকে এগিয়ে আছি। এমনকি পাশের বৃহৎ দেশ ভারত তার তুলনায় আমরা অনেক সামাজিক সূচকে এগিয়ে আছি, যার সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি জড়িত। এমনকি অর্থনৈতিক সূচকেও ভারতের সঙ্গে যে ব্যবধান আমাদের ছিল, ধরা যাক মাথাপিছু জিডিপির ক্ষেত্রে ব্যবধান- সেটিও আমরা লক্ষণীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে পেরেছি। সেটা পিপিপি হিসেবেই বলা হোক বা সাধারণভাবে কারেন্ট ইউএস ডলারের বিচারেই বলা হোক। এমনকি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, কারেন্ট ইউএস ডলারে ভারতের মাথাপিছু আয়কেও আমরা টেক্কা দিয়েছি। এই পরিবর্তনগুলো সহসা অর্জিত হয়নি। এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে কাজ করেছে চারটি ফ্যাক্টর। একটি হচ্ছে সাধারণ মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা; যেটা দিয়ে আমি বাহাত্তর সালের কথা বলে শুরু করেছিলাম। জনগণের আকাঙ্ক্ষার এই ফ্যাক্টর আর সমস্ত ক্ষেত্রকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। দ্বিতীয় ফ্যাক্টর কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতি। উচ্চ আকাঙ্ক্ষার কারণে জনগণ আর নিজেকে প্রথাগত পেশায় আবদ্ধ রাখতে চাইছে না। সে আর মান্ধাতা আমলের কৃষিতে বিশ্বাসী নয়। সে চাইছে নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে এবং এরই ফলে আমরা দেখতে পাই যে, কৃষিখাতে একটা বিরাট প্রযুক্তিগত বিকাশ ঘটে গেছে। যে কৃষিক্ষেত্রে আগে লাঙল ছাড়া চাষ করা যেত না, সেখানে প্রায় সর্বত্রই এখন পাওয়ার টিলারের ব্যবহার। যেখানে আমরা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম না, সেখানে এখন আমরা পোলট্রি, লাইভস্টক এমনকি গো-পালন সেক্টরেও অভাবিত উন্নতি করেছি গত পাঁচ-সাত বছরে। মৎস্য উৎপাদন এবং মাথাপিছু মাছের ভোগের পরিমাণেও আমরা এগিয়ে আছি। এই সবটাই ঘটেছে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে। মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকলে, তার বদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে যাবার আকাঙ্ক্ষা না থাকলে এত দ্রুত এটা সম্ভব হতো না। এর পেছনে আরও একটা প্রাতিষ্ঠানিক কারণের উল্লেখ করতে চাই, আমাদের দেশে প্রথাগতভাবে যেটা সত্তরের দশকে ভুলভাবে ভাবা হয়েছিল যে, কৃষিতে সামন্তবাদী অবশেষ রয়ে গেছে। অথচ যেখানে সামন্তবাদী অবশেষের প্রাবল্য ভারত ও পাকিস্তানের কৃষিখাতের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। আধা সামন্তবাদের প্রাবল্য আমাদের দেশে বলতে গেলে আজ নেই। আমাদের দেশের শ্রমিক অনেক বেশি চলমান, তারা অনেক বেশি বিদেশ ও শহরমুখীন। আমাদের গ্রামের যে মান্ধাতা আমলের ক্ষমতা কাঠামো, আশি-নব্বই দশকে তাকে অতি সহজেই চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হয়েছে এবং এর ফলে দেখা যাচ্ছে যে বর্গা বাজারে একটা নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে। আগে যেখানে বর্গাচাষি, ভাগচাষি ছিল প্রধান প্রথা, সেখানে চলে এসেছে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে বার্ষিক চুক্তির বদলে সিজনাল চুক্তির ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং এই চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের অধীনে যে জমি- সেটিতো কমেইনি, বরং ১৯৮৮ সালের ২৩ শতাংশের বদলে এখন প্রায় ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এই ৫০ শতাংশের মধ্যে প্রায় অর্ধেক জমি চাষাবাদ করছেন কার্যত ভূমিহীন বর্গাচাষিরা। এটি যে কতবড় সামাজিক উত্থান এবং পরিবর্তনের নির্দেশক, তা বলে পুরোপুরি বোঝানো যাবে না। আমি বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে, গ্রামজীবনে একে একটি সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক অর্জন হিসেবে শনাক্ত করতে চাই।
তৃতীয় যে অর্জনটি গ্রামে হয়েছে, এবং যার প্রভাব আমরা আগামীতেও দেখতে পাবো- সেটি হচ্ছে ‘মিশ্র ধরনের’ খানার উদ্ভব। এই ধরনের খানাগুলো ঠিক কৃষিতেও পুরোপুরি নয়, অকৃষিতেও পুরোপুরি নয়। যে খানাগুলোর কিছু সদস্য কৃষিতে নিয়োজিত, কিছু সদস্য অকৃষিতে নিয়োজিত। এই খানাগুলোকে আমি মিশ্র খানা বলছি। মিশ্র খানার শতকরা হার গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এদের আরও বেশি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন এবং তার জন্য আমাদের ছোট শহরগুলোর উন্নয়ন আবশ্যক। কেননা মিশ্র খানাগুলো বাস করে গ্রামাঞ্চলে। তারা যদি অকৃষি খাতে আরও বেশি যুক্ত হয়, তাহলে সবচাইতে ভালো হয় গ্রামের বাইরে ছোট ছোট শহরে কাজ করে দিনের শেষে যাতে ঘরে ফিরে আসতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। যেটা শ্রীলঙ্কাতে আছে। যেহেতু শ্রীলঙ্কাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক বেশি সমৃদ্ধ, তারা সকালে গিয়ে রাতে রেলে করে ঘরে ফিরে আসতে পারে। এই রকম ব্যবস্থা যদি চালু করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে আগামী এক দশকে এই মিশ্র খানার পরিমাণ আরও বাড়বে বৈ কমবে না।
চতুর্থ যে বিষয়টি এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে, সেটি আমাদের নারী শ্রমশক্তির বিকাশ। আমাদের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৩৬ শতাংশ। সেটি ভারতের ৩০ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। এবং পাকিস্তানের চাইতে তো অনেক বেশিই। এটি এমনকি সাম্প্রতিককালে শ্রীলঙ্কাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই হারটিকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মালয়েশিয়ার ৫৫ শতাংশ বা চীনের ৬০ শতাংশের হারে নিয়ে যেতে গেলে আমাদের আরও কসরত করতে হবে। কিন্তু যতটুকু প্রসারিত হয়েছে সেটির অর্থনৈতিক সামাজিক অভিঘাত খুবই লক্ষণীয়। সেটি কেবল সমাজের জন্যই শুভ হয়নি, যারা এই পরিবর্তনটা এনেছেন সেই নারীদের জীবনেই শুভ ফল বয়ে এনেছে। আমাদের দেশ এখন অনেকখানি এগিয়ে গেছে মূলত এই জেন্ডার ডেভেলপমেন্টের কারণে। এই অর্থে একজন সমাজবিজ্ঞানী সম্প্রতি বলেছেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কি মূলত নারীনির্ভর উন্নয়ন? এই কথাটির মধ্যে অতিশয়োক্তি থাকতে পারে কিন্তু এর মধ্যে সত্যতা অনেকখানি। একে আরও সবল এবং সফল করতে হবে এবং এটা হতে পেরেছে দুই-তিনটা পার্শ্ব ফ্যাক্টরের কারণে। তার মধ্যে একটা অবশ্যই রপ্তানিমুখীন শিল্পের বিকাশ-যেটিকে আমরা গার্মেন্ট শিল্প হিসেবে দেখি। যদিও এখন অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রেও এটি ঘটছে। এর পেছনে কিছুটা গ্রামপর্যায়ে ঋণের সরবরাহ বৃদ্ধিও অবদান রেখেছে। অনেক ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা নারীর ক্ষেত্রে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সরবরাহ বেড়েছে এবং তারা নানা ধরনের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজে নিয়োজিত হতে পেরেছেন। লাইভস্টক ও পোলট্রি সেক্টরের বিকাশও এ ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি কৃষিখাতেও অনেক নারী এগিয়ে এসেছেন। এবং এর মাধ্যমে এক ধরনের ফেমিনাইজেশন ঘটছে গ্রামাঞ্চলের কৃষি এবং অকৃষি খাতে, সেটিও লক্ষ্য করার মতো। কিন্তু এটাকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, বিশেষত আমি মনে করি ঢাকায় মধ্যবিত্ত নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের হার বরং একটু কম। সেইখানে আমাদের জড়তাটা কাটিয়ে ওঠা দরকার এবং এক্ষেত্রে সহায়তার দিগন্ত আরও প্রসারিত করা দরকার।
গত পঞ্চাশ বছরে অনেক বঞ্চনা নিরাশার মধ্য দিয়ে আমাদের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। আমাদের কৃষি নিয়ে নৈরাশ্য ছিল; কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না, কারণ কৃষির উৎপাদন সম্পর্ক হচ্ছে আধা সামন্ততান্ত্রিক। শিল্প খাত নিয়ে নৈরাশ্য ছিল যে, বলা হতো বাঙালিরা প্রথম প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তা। তারা আধুনিক শিল্প-কলকারখানা চালাতে জানে না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নৈরাশ্য ছিল। কেননা আমাদের দেশ এমনিতেই সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখানে রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের নৈরাশ্য ছিল প্রবৃদ্ধি নিয়ে, কেননা এখানে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে থাকে। এর ফলে শুধু যে ফসলহানি হয় তাই নয়, কোনো আধুনিক শিল্পোদ্যোক্তাও এখানে বিনিয়োগ করতে চাইবেন না। বন্যায় তার ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এমন অনেক নৈরাশ্যকে আমাদের দেখতে হয়েছে আমাদেরই জীবদ্দশায় গত পঞ্চাশ বছরে। এবং সত্তর-আশি-নব্বই দশকে এই নৈরাশ্যবাদগুলো ছিল খুবই প্রবল, যার চিহ্ন আমরা খুঁজে পাই তৎকালীন সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাহিত্যে। এখন অবশ্য একটা উল্টো সুর বইছে। এখন আমরা সর্বত্র আশাবাদের কথা শুনছি। ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা শুনছি। এখন অনেকেই আছেন যারা ইতিবাচকতার কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়েন। তারা বলতে চান যে, সব পরিবর্তনতো ইতিবাচক হয়নি। এখনও তো অনেক পরিবর্তন বাকি এবং সেটা হওয়া সম্ভব নয়, কেননা বিভিন্ন সমস্যা আমাদের জর্জরিত করছে। এর মধ্যে সমস্যা রয়েছে সুশাসন নিয়ে, গণতন্ত্র নিয়ে, উন্নত মানের শিক্ষা নিয়ে, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি নিয়ে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ নিয়ে আছে এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ। আমার কথা হচ্ছে- এই ধরনের আশা এবং নিরাশার মধ্য দিয়েই আমাদের আগামী ২০ বছর চলতে হবে। আশার দিকটিকেও আমাদের সংহত করতে হবে, নিরাশার দিকটিকেও আমাদের যথাসম্ভব উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে। কোনো জাতির বিকাশ সহসা এবং অতিদ্রুত করা যায় না। দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের অধিবাসীদের যখন এই প্রশ্ন করা হয় যে, তারা কীভাবে উন্নয়ন করল- তখন তারা বলে, ‘আমাদের এই যে উন্নয়ন আপনারা দেখছেন, সেটা করতে গিয়ে আমাদের বাবা-মা, পিতামহ-পিতামহীদের পিঠ ভেঙে গেছে। তারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে গেছেন। এবং এই অমানুষিক খাটুনিতে তারা জীবনে আর কোনো কিছু পাননি। স্বপ্ন দেখেছেন, কষ্ট করেছেন কিন্তু বাস্তব জীবনে নিজেরা আর কোনো কিছু ভোগ করে যেতে পারেননি। তারা সব কিছু করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।’ অর্থাৎ সেখানে একটা-দুইটা প্রজন্ম এমন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। যখন আমরা অতিদ্রুত কোনো কিছু অর্জন করতে চাই বা পারি না বলে হতাশা বোধ করি- তখন আমাদেরও মনে রাখতে হবে যে, আমাদের উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি হচ্ছে পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং পরিশ্রম। এবং এই পরিশ্রম করার মানেই হচ্ছে যে, কিছু অর্জনের জন্য একটা সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিশ্রম করে যাওয়া। সেই সময়টাতো আমাদের নিজেদের দিতে হবে। তাই বলছি, আমাদের যে অস্থিরতা, আমাদের যে অসম্পূর্ণতা, আমাদের যে তীক্ষষ্ট ব্যর্থতাবোধ- সেটাকে পরিশীলিত করতে হবে ইতিহাসের মাপকাঠিতে। যে জিনিসটা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরে অর্জন সম্ভব, সেটি হয়তো আপনি চাইতে পারেন বিশ-ত্রিশ বছরে। কিন্তু পাঁচ বা দশ বছরের মধ্যেই সেটা নাটকীয়ভাবে চাইতে পারেন না। আপনাকে সেই ফল পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষা আর পরিশ্রম করতে হবে। আমি মনে করি যে, একটা জাতির মধ্যে সেই ধৈর্য ও স্থৈর্য থাকা প্রয়োজন। আমি আমার জীবদ্দশায় অনেক সফলতা দেখতে চেয়েছিলাম- যার কিছু কিছু দেখতে পেয়েছি। কখনও ভাবিনি নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য শাসনের অবসান হবে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো সারাজীবন ধরেই দেখব দক্ষিণ অফ্রিকায় সাদা এবং কালোদের এই বিভাজন চলছে। কিন্তু সেই বিভাজন টেকেনি। আমি আমার জীবদ্দশায় কখনও ভাবিনি যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং প্রথাগত সমাজতন্ত্রের দেশগুলো এক-দুই বছরের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ে বিলীন হয়ে যাবে। সেটাও দেখেছি। সুতরাং কিছু কিছু ভালো যা আমরা ভাবিনি কিন্তু ঘটেছে, কিছু কিছু অভাবনীয় ঘটনা যা ভাবিনি সেগুলোও ঘটেছে। আমাদের কিছু পাওয়া এবং কিছু না পাওয়াটাকে মেনে নিতে হবে। এবং অপেক্ষা করতে হবে আরও ভালো দিনের জন্য; আর তার জন্য পরিশ্রম করে যেতে হবে। সেটা আমার জীবদ্দশায় হোক বা না হোক।
লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতি
বিশ্নেষক

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::১০৩
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
এবারেও তাদের বেশিরভাগ নেতারই এই মনোভাব ছিল। তাছাড়া, বাকশালের কর্মসূচি ছিল অনেকাংশে র‌্যাডিকেল (বিশেষত বহুমুখী সমবায় ও বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত)। প্রচলিত আওয়ামী লীগের দলীয় ভাবনাকে সেটি অতিক্রম করে গিয়েছিল। দক্ষিণপন্থিরা এবং চরম বামপন্থিরা (তাদের নাম আজকে নাই-বা করলাম) পূর্বাপর আওয়ামী লীগ ও বাকশাল কর্মসূচির বিরুদ্ধতা করেছিল। তাদের মাথায় ঘুরছিল ভারতের ‘সম্প্রসারণবাদ’ আর সোভিয়েত ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ বিরোধিতার পুরোনো স্লোগান। অথচ চীন তখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি এবং ১৯৭২-৭৫ পর্বে এক কপর্দকও সহায়তা করেনি- এমনি ছিল চরম বামপন্থিদের মোহান্ধতা। পাকিস্তানবাদী দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কথা নাই বললাম। আসলে সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাস্তা কোনো গুলশান এভিন্যুর মতো মসৃণ রাজপথ নয়। সেটা বঙ্গবন্ধু যেমন জানতেন, তেমনি তৎকালীন সিপিবি-ন্যাপ নেতৃত্বও জানতেন। এদেশের ভেতরে ও বাইরের প্রতিক্রিয়াশীলদের হুমকি থেকে বের করে নিয়ে এসে প্রগতির ধারায় পরিচালিত করতে হবে এক সর্বব্যাপী আয়োজনের মাধ্যমে এটিই ছিল প্রধান উপলব্ধি। এই পথ বিপদ-সংকুল মুজিব নিজেও সেটি বুঝতে পেরেছিলেন। অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে সেটা তিনি বলেও ছিলেন। এক ধরনের প্রিমনিশন হয়েছিল তার। যেন দেখতে পাচ্ছিলেন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ নদী তিনি নৌকাযোগে পার হচ্ছেন। সেই সময়টা পার হতে পারলেই তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে আছে ঝরঝরে বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধ সোনালি দিন। বাকশাল-পর্ব ছিল সেই অসমাপ্ত মহা-উৎক্রমণের পর্ব।
দেশের সংকট মোকাবিলায় সাময়িককালের জন্য হলেও বাকশালের মতো একটি নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি- এ উপলব্ধি সিপিবি-ন্যাপ তৎকালীন ‘মস্কোপন্থি’ দল-গোষ্ঠীর মধ্যে একটি বড় অংশের মধ্যেই পূর্বাপর জাগ্রত ছিল। এরা অনেকে ১৯৭২ সাল থেকেই একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে থাকবেন। মতিউর রহমানের পূর্বোক্ত লেখাতেও এর ইঙ্গিত আছে। এটা কোনো অস্বাভাবিক চিন্তা ছিল না সিপিবি-ন্যাপের জন্য। সে সময়ের ষাট-সত্তরের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত তত্ত্ব ছিল ‘অপুঁজিবাদী বিকাশের পথ’ (যা পরে সমাজতন্ত্র-অভিমুখীনতার বা ‘সোশ্যালিস্ট ওরিয়েন্টেশন’ বলে অভিহিত হয়)। মধ্যবিত্তের প্রগতিশীল অংশের সাথে শ্রমিক-কৃষক সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের ঐক্যজোট ছাড়া জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এক পর্যায়ে বিপথগামী হয়ে যেতে পারে- এই আশঙ্কা ছিল তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই। সিপিবি-ন্যাপের মতো প্রগতিশীল বামপন্থি ধারাগুলো সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সাথে ‘অভিন্ন মঞ্চ’ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান নন, অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলামও মনে করেছেন, বাকশালের পেছনে দেশের বামপন্থি মহল ও আন্তর্জাতিকভাবে সোভিয়েত বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অনেকেই পরোক্ষভাবে সমর্থন জুগিয়ে থাকবে। তিনি অবশ্য সেখানে ‘জনশ্রুতির দোহাই’ দিয়েছেন তার প্রদত্ত তথ্যের উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে। কিন্তু যেভাবে লিখেছেন তাতে বোঝা যায়, জনশ্রুতিকে তিনি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। পুরো উদ্ধৃতিটি আমি তুলে ধরতে চাই। নুরুল ইসলাম লিখেছেন :
‘জনশ্রুতি ছিল, প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনীর ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ব্যক্তি-গোষ্ঠীর কাছ থেকে পরামর্শ পেয়েছিলেন। কিন্তু এ সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ কোনো জ্ঞান ছিল না। অনেকে মনে করত যে বঙ্গবন্ধু বিশেষ করে বাংলাদেশের কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। হয়তো তাঁরা পূর্ব ইউরোপের একদলীয় রাষ্ট্র ও পরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা পোল্যান্ড ও যুগোস্লাভিয়ার মতো দেশের উদাহরণ তুলে ধরে থাকতে পারেন। সাধারণভাবে এই দেশগুলো সোভিয়েত ব্যবস্থা থেকে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারণাগুলো নিয়েছিল। তারপর কিছুটা রদবদল করে তাদের দেশে তা কার্যকর করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাদের পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামো ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর সোভিয়েত ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বহুমুখী কৃষি সমবায় ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের যে বিষয়গুলো রেখেছিলেন, তা পূর্ব ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনীয়। এগুলো সবই আমার ধারণা। এ ব্যাপারে আমি সরাসরি কোনো খবর পাইনি অথবা বাম দলগুলোর সঙ্গেও আমার কোনো আলোচনা হয়নি।’
১৯৭২ সাল থেকেই জাতীয় সরকার ধরনের ঐক্যজোট গড়া এবং ১৯৭৪ থেকেই বাকশাল ধারার একটি সাময়িক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলাপ-আলোচনা চলছিল। ‘বুর্জোয়া-গণতন্ত্র’ নিয়ে বিভ্রম ছিল না সিপিবি-ন্যাপের বড় অংশের মধ্যে। যে কোনো মূল্যে গণতন্ত্র রাখতেই হবে- এ রকম হঠকারী লিবারেল বিভ্রমের মায়াজালে আবদ্ধ হতে চাননি তারা। অনেক সময়ে অনেক প্রয়োজনে উন্নয়নের শুদ্ধ মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব নয়- এটা তারা জানতেন; সোভিয়েত পার্টিরও সেটা জানা ছিল। বঙ্গবন্ধুর মধ্যেও সে উপলব্ধি জেগেছিল। আগে দেশের মানুষের জন্য খাদ্য-সংস্থান করতে হবে; বণ্টন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে হবে, তারপর অন্যকিছু। ১৯৭২-৭৪ সালের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মনে হয়েছিল, দেশকে বাঁচাতে হলে অন্য পথ নিতে হবে, কয়েক বছরের জন্য হলেও। লাইনচ্যুত রেলগাড়িকে স্বাভাবিক উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে আনতে হলে আপাতদৃষ্টিতে কিছু ‘অস্বাভাবিক পন্থা’ অবলম্বন করতেই হয়। যে কোনো প্রবল সংকটের মুখেই মানুষকে তা করতে হয়। সেটা একটা জাতি বা দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তখন ‘গণতন্ত্র গেল, গণতন্ত্র গেল’ বলে মায়াকান্না জুড়ে দিলে প্রাগম্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেওয়া হয় না। মুশকিল হলো, লিবারেলরা বা সোশ্যাল লিবারেলরা ইতিহাসের পরিবর্তনে ‘জোর খাটানোর’ (রোল অব ফোর্স) ভূমিকাকে সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে অস্বীকার করে থাকেন। এংগেলসের অ্যান্টি-ডুরিং এ ক্ষেত্রে অবশ্যপাঠ্য ইতিহাসের পট-পরিবর্তনে কেন ‘শক্তি প্রয়োগের’ প্রয়োজন তা বোঝার ক্ষেত্রে।
পোস্ট-কলোনিয়াল আমলে ডোমিন্যান্স ও হেজিমনি দুইয়েরই ভূমিকা থাকে, বিশেষত উন্নয়নের শুরুর পর্যায়ে। বাংলাদেশের অবস্থাটাও সেদিন ছিল সে রকম। মনে রাখতে হবে, সাধারণভাবে বাংলাদেশ ১৯৬৯/৭০ সালের মাথাপিছু আয়কে ছুঁতে পেরেছিল ১৯৮১/৮২ সালের দিকেই কেবল। এ অর্থে ১৯৭২-১৯৮২ এই ১০ বছর ছিল বাংলাদেশের পুনর্গঠন পর্ব। এ ধরনের পর্বের ক্ষেত্রে কোনো অর্থনীতিবিদ বা পরিসংখ্যানবিদই স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নের ধারণা প্রয়োগ করতে চাইবেন না। আর ১৯৭২-৭৪ পর্বের পরিস্থিতি ছিল আরও বিপদসংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। আমি এ ক্ষেত্রে ১৯১৭ সালের বিপ্লবের সাথে একটি বড় সাদৃশ্য দেখতে পাই। দুই ক্ষেত্রেই প্রথমদিকে নিয়মতান্ত্রিক রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা ছিল। কিন্তু তাতে নয়া রিজিমের বিরুদ্ধাচরণ করার ক্রমবর্ধমান অপতৎপরতাকে নিরুৎসাহিত করা যায়নি। রাশিয়ায় ‘হোয়াইট টেরর’ (অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীলদের ও চরমপন্থি দলগুলোর চোরাগোপ্তা আক্রমণ) যখন ব্যাপক আকারে শুরু হলো এবং স্বয়ং লেনিন ১৯১৮ সালে এদের আক্রমণে গুলিবিদ্ধ হলেন, তখন বাধ্য হয়ে শুরু করতে হয়েছিল ‘রেড টেরর’। এই একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ১৯৭১ সালের পর আওয়ামী লীগকে। ১৯৭২-৭৪ পর্বে প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন চোরাগোপ্তা আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন। বিপ্লবোত্তর রেড টেররকেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘লাল ঘোড়া দাবড়ানোর’ কথা তুলে। এ পরিস্থিতিতে অন্য পথ অবলম্বন করা ছাড়া কোনো পথ খোলা ছিল না। এটাই রূঢ় বাস্তবতা। ‘রেড টেরর’ শুরু হওয়ার পর বহির্বিশ্বে, বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় লেনিনের সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে ছি ছি পড়ে গেল। লিবারেলদের মধ্যে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন নতুন সরকারের থেকে। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও এটি ঘটেছিল। হয়তো এদের অনেকে রাজনীতির বাইরে থেকে বাকশালের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। তাদের অবস্থা ছিল অনেকটা বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার প্রথম বছরগুলোর বৈরী পরিবেশ হতবিহ্বল ও বিচলিত ম্যাক্সিম গোর্কির মতো। ব্যক্তিস্বাধীনতার নানা হস্তক্ষেপে গোর্কি প্রায়ই লেনিনের দ্বারস্থ হতেন। প্রতিবারই এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে অম্লমধুর বাক্য বিনিময় হতো। শেষ পর্যন্ত বিপ্লবোত্তর নতুন ব্যবস্থাকে যারা মন থেকে মানতে পারছেন না, তাদেরকে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় ১৯২১ সালে। যে স্টিমারে করে তারা দেশের বাইরে চলে যান, তার নাম দেওয়া হয় ‘ফিলোসফার’স স্টিমার’। মূলত লিবারেল রাজনীতির সাথে জড়িত বা একেবারেই যারা রাজনীতি-সচেতন নন, সেসব ঝুঁকি-এড়ানো বুদ্ধিজীবী এই স্টিমারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য এদের বড় একটা অংশ বিপ্লবোত্তর রুশ সরকারের সমর্থক হিসেবে প্রবাসে আবার সক্রিয় হয়েছিলেন। বাকশালের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নমত সত্ত্বেও বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীই একে ‘আপৎকালীন ব্যবস্থা’ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। দেশ এমনই সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল যে, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তারা এ রকম ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত সায় জানিয়েছিলেন বৃহত্তর প্রগতির স্বার্থে।
আগেই বলেছি, বাকশাল জাতীয় ব্যবস্থা গড়া নিয়ে ১৯৭৪ সালজুড়েই কথাবার্তা চলছিল রাজনৈতিক মহলে। সরকারের একজন তীক্ষষ্ট ও তীব্র ‘দক্ষিণপন্থি’ সমালোচক হিসেবে ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ নামে ইত্তেফাক পত্রিকায় কলাম লিখতেন ‘স্পষ্টভাষী’ (খোন্দকার আব্দুল হামিদ)। এহেন ‘স্পষ্টভাষী’ ১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল লিখেছেন :
“চারিদিকে অসংখ্য গুজব। ‘এমারজেন্সির’ নামে বলগাহীন জল্পনা-কল্পনা। আমার ওসব জল্পনা-কল্পনার প্রয়োজন নাই। দুর্নীতি, চোরাচালান, মওজুদদারী, মুনাফাখুরী, শ্বেত-সন্ত্রাস ও সমাজবিরোধী নৈরাজ্যবাদী কার্যকলাপ দমনের জন্য সামরিক বাহিনীকে সাময়িকভাবে নামানোর প্রয়োজন বোধ করিলে সরকার তাহা করিবে, আমাদের আপত্তির কোন কারণ নাই। আমরা শুধু চাই শান্তি। আমরা সন্ত্রাস চাই না। আমরা চাই নিরাপত্তা।…’গ্যাংগ্রিন মলমে-প্রলেপে সারে না’ নিবন্ধে বলা হইয়াছে যে, এটা হইল আজিকার জরুরী কর্তব্যের এক দিক। অপর দিকটি হইতেছে অর্থনীতির পাগলা ঘোড়াকে পাকড়াও করিয়া আস্তাবলে আবদ্ধ করা, এই অর্থনৈতিক নৈরাজ্যকে দমন করা, ইহাকে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরাইয়া আনা। আমি অত বড় বড় তত্ত্ব বুঝি না। কোন বিশেষ তত্ত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি কোন সেট-নোশন বা পূর্ব-নির্ধারিত ধারণাও পোষণ করি না।…অতি তেজস্কর ঔষধ অতি ক্ষীণ, দুর্বল রোগীর অঙ্গে পরীক্ষা করিতে গিয়া আমরা রোগীকেই মৃতকল্প করিয়া তুলিয়াছি।…রোগী বাঁচিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পরে অনেক পাওয়া যাইবে।…অতএব, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ইমারজেন্সি হইবে কি হইবে না, সেটা আমার ততটা বিবেচ্য নয়। আমার চোখে আজ সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন, এই বিশৃঙ্খল অর্থনীতির পাগলা ঘোড়াকে ডিসিপ্লিনে আনা। এই দিকটিকে উপেক্ষা করিয়া শুধু উপরদিকে ইমারজেন্সি-পাওয়ার প্রয়োগ করিলে বাঞ্ছিত ফল সম্পূর্ণ পরিমাণে লাভ করা সম্ভব নাও হইতে পারে।”
এই যদি হয় দক্ষিণপন্থি সমালোচকেরও উপলব্ধি, তবে বামপন্থি মহলে উদ্বেগ আরও গভীরতর হবে, তাতে আর সন্দেহ কী! ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এই উদ্বেগই ছিল প্রধান সুর। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে; আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে হবে; দুর্নীতিকে প্রশমন করতে হবে; জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে- এটাই ছিল তার প্রধান বিবেচনা। রাজনীতি এখানে অর্থনীতির বোধের দ্বারা চালিত হয়েছে। লিবারেল বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই সেটি বুঝতে পারেন না। এ বিষয়ে নুরুল ইসলামের স্মৃতিচারণ এখনও প্রাসঙ্গিক।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::১০২
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
এটাকেই বিপ্লব-উত্তরকালের পরিপ্রেক্ষিতে ‘উত্তরণশীল পর্ব’ বা ট্রানজিশন পিরিয়ড বলা হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের অভ্যুদয় সোভিয়েত-চীন দেশের মতো ‘আর্থ-সামাজিক’ বিপ্লব ছিল না ঠিক, কিন্তু ‘বিপ্লব’ ছিল সর্বার্থেই। এবং বিপ্লব হয়ে থাকলে তার একটি ‘উত্তরণশীল পর্ব’ থাকবেই, যার মধ্য দিয়ে গোটা দেশকে অতিক্রম করতে হয় একটি ‘পুরোনো ব্যবস্থা’ থেকে ‘নতুন ব্যবস্থায়’ পৌঁছানোর জন্যে। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক প্রচেষ্টার মতোই বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর রাস্তা কোন পিচঢালা মসৃণ পথ ছিল না। এতে ছিল চড়াই-উৎরাই-অপ্রত্যাশিত বন্যা ও দুর্ভিক্ষের ছোবল। এরকম পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিপ্লবের পরে অবস্থা বুঝে আঁকাবাঁকা পথের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তখন পিছু হটলে সাইডলাইনে থাকা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ ভদ্রলোকেরা দুয়ো দুয়ো করে ব্যঙ্গ করতে থাকে। তারা তখন বলতে থাকে, ”খুব তো বড় মুখ করে ‘সমাজতন্ত্র’ করতে চেয়েছিলে, এখন বোঝ। সেই তো পিছু হটতে হচ্ছে তোমাদের। পাহাড়ে উঠতে চেয়েছিলে সাত-পাঁচ না ভেবে। অথচ এখন দেখছ রাস্তাটা ডেডএন্ডে আটকে গেছে। এখন তো তোমাদের ফিরে আসতে হবে নিচে। নামতে নামতে তারপরে বের করতে হবে আবার উপরে ওঠার রাস্তা। তা-ও খুঁজে পাবে কিনা তার কী গ্যারান্টি?” এরকম তির্যক তিরস্কার চারপাশ থেকে ধ্বনিত হতে থাকবে। বিপ্লবীদের পরাজয়ে যারা সবসময়ই এরকম অযাচিত উপদেশ আর তিরস্কার বাণী বর্ষণ করে থাকে। বঙ্গবন্ধুকেও ১৯৭২ সাল থেকেই এ ধরনের তিরস্কার-গঞ্জনার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছিল। মুজিব ঠিকই জানতেন যে এটা সেই দেশ যেখানে দশজন ভিলেন মিলে- ঘরে-বাইরের শত্রুরা একযোগে-যখন একজন নায়ককে পেটায়, তখন চারপাশের উৎসুক জনতা ভিড় করে তারিয়ে তারিয়ে সেদৃশ্য উপভোগ করে। এরাই সেই জনতা যারা সফল হলে মাথায় চড়িয়ে নাচতে থাকে, আর বিফল হলে মাটিতে মুহূর্তেই ছুড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করে না। মুজিব এটা জেনেও পিছু হটে অন্য রাস্তা খুঁজতে দেরি করেননি। ডিসিপ্লিন অ্যান্ড ডেভেলপ-এরকম একটি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ সূচনা করে। তার সহযোগীদের বলেও ছিলেন সেকথা।
দ্বিতীয় বিপ্লব যে উত্তরণশীল পর্বের একটি ‘সাময়িক কর্মসূচি’ ছিল এর নানা সাক্ষ্য পরবর্তীকালে আমরা পেয়েছি। প্রথম প্রমাণ হিসেবে শেখ হাসিনার নিজের স্মৃতিচারণাকে পেশ করতে চাই। ১৯৯৫ সালে শেখ হাসিনা এ বিষয়ে লিখেছেন:
”আজ যখন আমরা জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছি তখন বার বার আব্বার কথা মনে পড়ছে। যখন তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী দিলেন। অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেন এবং সকল রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষকে একই মঞ্চে সমবেত করে দেশগড়ার কাজে আত্মনিয়োগের ব্যবস্থা করলেন। তখন একটা নতুন সিস্টেম দাঁড়ালো। আমি আব্বাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘সারাজীবন সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, এখন এই পদ্ধতিতে কেন গেলেন?’
তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, একটা বিপ্লব হয়েছে। যে কোন বিপ্লবের পর সমাজে একটা বিবর্তন আসে, আমাদের সমাজেও আসবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হবে এবং এর বিস্তৃতিও হবে-যার প্রভাব পড়বে সমাজ ব্যবস্থার উপর। কিছু মানুষ হঠাৎ করে প্রচুর টাকার মালিক হবে-সামাজিক অবস্থান ও প্রভাব বাড়াতে নির্বাচন করবে শুধু টাকার জোরে; এর প্রভাব নির্বাচনের উপরও পড়বে। দেখা যাবে টাকা ও লাঠির জোরে নির্বাচন হচ্ছে। সত্যিকার সমাজসেবক বা দেশপ্রেমিক বা আদর্শবান যারা তারা এদের সাথে টাকা ও লাঠির জোরে পেরে উঠবে না। তাই এমন একটা ব্যবস্থা করতে চাই অন্তত কিছু দিনের জন্য যাতে কালো টাকা ও পেশিশক্তি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে। একটা সাধারণ নির্বাচন যদি এভাবে হয় তাহলেই মানুষের চক্ষু খুলে যাবে আর মানুষকে কেউ ধোঁকা দিতে পারবে না। আর এ ব্যবস্থা মাত্র ৩/৪ বৎসরের জন্য; পরে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব।”
উপরের উদ্ধৃত অংশের সারাংসার নিহিত ছিল একটি বাক্যে। চতুর্থ সংশোধনী ও পরবর্তীকালে বাকশাল গঠন একটি প্রয়োজনীয় নিদান ছিল সেদিনের সমস্যা মোকাবিলায়। কিন্তু এটি ছিল সাময়িককালের জন্যে :’মাত্র ৩/৪ বৎসরের জন্য; পরে আবার আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাব।’ এই একই কথা বলেছেন আমাকে প্রাক্তন আমলা ও অর্থমন্ত্রী এম. সাইদুজ্জামান। বঙ্গবন্ধুর বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের শেষ কয়েক মাসে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে থেকে কাজ করেছিলেন তিনি। একবার বঙ্গবন্ধুকে বাকশালের আয়ুস্কাল নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। উত্তরে বঙ্গবন্ধু কোনো কথা না বলে হাতের তিনটি আঙুল দেখিয়ে ইঙ্গিত করেছিলেন-‘তিন বছরের জন্য’। সাইদুজ্জামান আমাকে আরও জানান যে অবস্থা মোকাবিলায় বঙ্গবন্ধুকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সংসদীয় পদ্ধতি থেকে কিছুকালের জন্যে হলেও ‘সরে আসতে হবে’ (কেননা সব অথেনটিক বিপ্লবের ক্ষেত্রেই এটা করতে হয়েছে) একথা বলেছিলেন খোদ ফিদেল ক্যাস্ট্রো নিজে। ক্যাস্ট্রো স্বয়ং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলেন পরবর্তীকালে কানাডায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত (যিনি যুগপৎ কিউবারও দায়িত্বে ছিলেন) কর্নেল নুরুজ্জামানকে। তবে আইডিয়াটা শুধু ক্যাস্ট্রোর থেকেই উদ্গাত হয়েছিল তা নয়। অন্য উৎসের থেকেও পরোক্ষ সমর্থন মিলেছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাময়িক পর্বের জন্য বাকশাল গঠনের বিষয়ে সমর্থন দিয়েছিল? এ বিষয়ে কিছুটা পরস্পরবিরোধী মত পাওয়া যায়। মতিউর রহমান তার ‘বাকশাল-কমিউনিস্ট পার্টি’ প্রবন্ধে লিখেছেন: “এমন একটি কথা প্রচারিত আছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর পেছনে বাংলাদেশের ‘মস্কোপন্থি’দের প্ররোচনা ছিল। এবং তাদের পরামর্শেই ওই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল সেদিন। এসব কিছুর পেছনে ‘সোভিয়েতের হাত’ রয়েছে, এমন কথাও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এর সমর্থনে কেউ কোনো সত্য তথ্য দিতে পারেনি। প্রচারিত এ তথ্য অসত্য।” এ প্রসংগে মতিউর রহমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামানের উদাহরণ দিয়েছেন। একাধিক বইয়ে মনিরুজ্জামান দাবি করেছেন, ”একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দেশের অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের ঢাকাস্থ দূতাবাসের প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের দুজন বড় নেতাকে ‘এক দল’ করার জন্য প্রভাবিত করেছিল।” মতিউর রহমানের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে যে, ‘এসব তথ্যের সমর্থনে কোনো সূত্র বা তথ্য হাজির করেন নি তালুকদার মনিরুজ্জামান। সে জন্য তাঁর বইয়ের কোনো পাঠকের পক্ষে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ নেই।’
সিপিবি সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (১৯৭২-৭৫ পর্বে ডাকসুর সহসভাপতি) অবশ্য কিছুটা ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন বাকশাল প্রসংগে সোভিয়েত-দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে। আমাকে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, সোভিয়েতের বার্তা ছিল কিছু অস্পষ্ট। বিশেষ পরিস্থিতিতে ‘এক দল’ করা যাবে না এমন কোনো কথা নেই বিপ্লবের জ্ঞানকোষে, আবার সমাজতন্ত্র নির্মাণের জন্য এক দল ‘করতেই হবে’ এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। এই বার্তাই নাকি সোভিয়েত পার্টি তখন ভ্রাতৃপ্রতিম সিপিবিকে জানিয়েছিল। অর্থাৎ পরিস্থিতি সাপেক্ষে এক দল করলে যে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না এমন একটি মনোভাব সোভিয়েত তরফ থেকে ব্যক্ত হয়েছিল-যেটি পূর্বে উল্লেখিত কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোর পরামর্শের সঙ্গে মিলে যায়। চুয়াত্তর সাল থেকেই এরকম একটি সার্বিক উপলব্ধি জেগেছিল যে গতানুগতিক বৃত্তের বাইরে গিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। সেটি যেমন জেগেছিল বঙ্গবন্ধুর মনে, তেমনি ন্যাপ-সিপিবির নেতৃত্বেও বড় অংশের মধ্যেই। সেটা হতে পারে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ এবং সিপিবির রাজনৈতিক শক্তিকে একক প্ল্যাটফর্মে একত্র করার মাধ্যমে (নিজ নিজ দলের স্বতন্ত্র পরিচয় রাজনৈতিক মঞ্চের ভেতরে বাইরে অক্ষুণ্ণ রেখেই)। অথবা, প্রয়োজন বোধে, কৌশলগত কারণে দলীর স্বাতন্ত্র্য বাইরে প্রকাশ্য না করে আপাতদৃষ্টিতে ‘এক দল’ গড়ার মাধ্যমে। শেখ মুজিব নিজে ‘এক দলের’ মধ্যে এরকম ‘বিভিন্ন গ্রুপের’ সমাবেশ স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত ছিলেন। ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে কমরেড হায়দার আকবর খান রনো স্মৃতিচারণা করেছেন যে বঙ্গবন্ধু তাঁকে এবং রাশেদ খান মেননকে বাকশালে যোগ দিতে বলেছিলেন। তখন তারা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আপনার দল তো নানা ধরনের লোকের খিচুড়ি। আপনার দলেই গাজী ভাইয়ের এক দল, মনি ভাইয়ের আরেক দল, তার মধ্যে আবার মস্কোপন্থিদের নিয়েছেন!… এবার আপনি বলেন, কোন উপদলের সঙ্গে থাকবো, মনি ভাইয়ের সঙ্গে, রাজ্জাক-তোফায়েলের সঙ্গে, না আর কারও সঙ্গে? আর তাদের অধীনে থাকবোই বা কেন?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোরা নিজেরাই একটা গ্রুপ হয়ে যা, সোজা চলে আসবি আমার কাছে, একেবারে আমার বেডরুমে!’ অর্থাৎ এক দলের বাতাবরণে বিভিন্ন গ্রুপের অস্তিত্ব বঙ্গবন্ধু কার্যত স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সম্ভবত সিপিবি’র তৎকালীন নেতৃত্বের মধ্যেও এরকম সম্ভাবনার কথা উঁকি দিয়ে থাকবে। স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে থাকতে পারলে ভালো, নইলে নির্দিষ্ট গ্রুপ, ধারা, উপদল বা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে থেকে গিয়ে দেশকে আপাতত সংকটের খাদ থেকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। চুয়াত্তরের মে মাসেই সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটি দেশের পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয় (মতিউর রহমানের বয়ান থেকে উদ্ধৃত করছি):
“বাংলাদেশের সমস্ত পরিস্থিতি আজ এক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হইয়াছে।’ সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে বলা হয়েছিল, ‘শাসক দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংকট ও সরকারের বহুবিধ দুর্বলতা বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে কঠিন ও জটিল সমস্যা হিসেবে উপস্থিত হইয়াছে। দেশ অগ্রসর হইতে পারিতেছে না।’ তাই স্বাধীনতা ও প্রগতির বিরোধী সকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এই বক্তব্য তুলে ধরে যে, ‘একটি সার্বিক কর্মসূচির ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রকৃত সৎ ও প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক দল ও ব্যক্তিদের লইয়া শরীক দলসমূহের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখিয়া এমন একটি মৈত্রী জোট গড়িয়া তোলা প্রয়োজন, যে জোট ক্রমান্বয়ে সর্বস্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারিবে এবং সিদ্ধান্ত কার্যকরীকরণের ক্ষেত্রেও যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করিতে পারিবে।’ চুয়াত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের বেশ কয়েক দফা আলোচনা হয়েছিল। এসব আলোচনা থেকে এটা জানা যায় যে, তিনি দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন। সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মতিউর রহমান আরও জানিয়েছেন যে, ‘বাকশাল’ একক দল গঠনের বিষয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের মধ্যে কিছু উৎসাহ ছিল তৎকালীন ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক পংকজ ভট্টাচার্য আমাকে বলেছিলেন। আর, কমরেড ফরহাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এ প্রসঙ্গে ফরহাদ ভাইয়ের চিরকূট নিয়ে সকালে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের কাছে যাওয়া-আসা করেছি কয়েকবার। এটা পরিস্কার মনে আছে, জাসদ নেতা সিরাজুল আলম খানকে বাকশালে যোগ দিতে সম্মত করতে চেষ্টা করেছিলেন। সে বৈঠক আমাদের বাসায় হয়েছিল। … সে সময়ে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। একাংশ একক দলে যোগ দেয়ার পক্ষে ছিলেন। তাদের মধ্যে অগ্রিম উৎসাহ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। আরেক অংশের মতামত ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠনের জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেও বোঝাতে চেষ্টা করতে হবে। …এভাবেই মানুষের মধ্যে, এমনকি পার্টির ভেতরেও এমন ধারণার সৃষ্টি হয় যে, কমিউনিস্ট পার্টি ‘বাকশাল’ গঠনে উদ্যোগী ছিল এবং ‘বাকশালের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়ে যাবে’।”
নিজেদের স্বাতন্ত্র্যকে বড় করে না দেখে দেশের বৃহত্তর তাগিদে বিভিন্ন প্রগতিশীল ধারা, উপধারা ও ব্যক্তিবর্গ সেদিন বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। সিপিবি-ন্যাপ তারপরও এটি মেনে নিয়েছিল পরিস্থিতির চাপে ও কৌশলগত কারণে। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এই দুটি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে স্বাধীনতার ও প্রগতির পক্ষের সকল শক্তিকে একত্র করার চেষ্টা করেছিল।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::১০১
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
শোষণমুক্ত সমাজের জন্য পূর্বাপর আকাঙ্ক্ষা এবং সে ধরনের সমাজ গড়ার জন্য একটি প্রায়োগিক ও বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একথা বলা চলে যে শেখ মুজিব পুঁথিপড়া মার্কসবাদ বা রাশিয়া-চীন-পূর্ব ইউরোপের প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ছকের বাইরে অন্য ধরনের সমাজতন্ত্র, সমাজবাদ বা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছিলেন। ‘বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতন্ত্র’ এই কথাটা মুজিব বলেছিলেন অস্টিন রবিনসনের প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে। এই কথাটি তিনি আরও অনেক ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন। যেখানে ঘুরে-ফিরে এসেছে ক্রমান্বয়ে চলার নীতি বা গ্রাজুয়ালিজম। দেশের মানুষের মন-মানসিকতা ও সমসাময়িক উন্নয়ন-সমস্যার সঙ্গে মানানসই অর্থনৈতিক কাঠামোয় সমতামুখী আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার তাগিদ। এক্ষেত্রে কোনো আগাম ব্লু-প্রিন্ট তার সামনে সেদিন ছিল না। সে ধরনের কোনো নকশা বা রোডম্যাপ সেদিন কেউই দিতে পারেননি। না দার্শনিকেরা, না অর্থনীতিবিদেরা, না রাজনীতিবিদেরা। যারা সেদিন সরকারের বাইরে থেকে ‘আরও সমাজতন্ত্র’, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’, ‘মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সমাজতন্ত্র’ এসব স্লোগান তুলে চারদিক প্রকম্পিত করছিলেন-কোনো বিশেষ দল, ব্যক্তি বা ধারার নাম না ধরেই বলছি-তারাও বস্তুতপক্ষে জানতেন না ১৯৭২-৭৫ পর্বে তারা আসলে কী চান এবং কীভাবে তাদের আরাধ্য সমাজ-অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা পাবে।
এই প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে ১৯৭২-৭৫ কালপর্বে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা এবং দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনাকে। এই কালপর্বের মূল্যায়ন করা এই রচনার পরিধির বাইরে। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই ইতোপূর্বে লিখে গেছেন, যার মধ্যে প্রথমেই আসবে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের পথিকৃৎধারার গ্রন্থসমূহ-যার মধ্যে রয়েছে ‘ডেভেলপমেন্ট প্লানিং ইন বাংলাদেশ :এ স্টাডি ইন পলিটিক্যাল ইকোনমি’ (১৯৭৯); ‘মেকিং অফ এ নেশন, বাংলাদেশ :অ্যান ইকোনমিস্ট’স টেল’ (২০০৩)। অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যৌথভাবে লিখেছিলেন ‘পাবলিক এন্টারপ্রাইজ ইন অ্যান ইন্টারমিডিয়েট রিজিম :এ স্টাডি ইন দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ বাংলাদেশ’ (১৯৮০); ‘আনট্রাংকুইল রিকালেকশনস :নেশন বিল্ডিং ইন পোস্ট-লিবারেশন বাংলাদেশ’ (২০২১)। অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও অধ্যাপক আজিজুর রহমান খান ১৯৭২-৭৫ পর্ব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লিখে গেছেন যার থেকে তৎকালীন সময়ের একটি প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়াও বিদেশি অর্থনীতিবিদেরা সে সময়ের বাংলাদেশের উন্নয়ন-সমস্যা নিয়ে লিখে গেছেন। তাদের মধ্যে যারা বই লিখেছেন বা বই সম্পাদনা করেছেন সেই কাতারে আগে উল্লিখিত ই.এ.জি. রবিনসন ও কীথ গ্রিফিনের সম্পাদিত বই, ইউস্ত ফাল্যান্ড ও জে.আর. পারকিনসনের ‘বাংলাদেশ :দ্য টেস্ট কেইস অব ডেভেলপমেন্ট’; ফেল্ডম্যানের ‘আনহ্যাপি ইস্ট পাকিস্তান :এ সার্ভে অফ ইন্টার-রিজিওনাল ইনইকুয়ালিটি ইন পাকিস্তান (১৯৭১); ওয়াল্টার ফেলকন ও গুস্তাভ পাপানেকের সম্পাদিত ‘ডেভেলেপমেন্ট পলিসি-দ্য পাকিস্তানি এক্সপেরিয়েন্স’ (১৯৭১), ইত্যাদি। এর সঙ্গে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে ‘প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দলিল’ (১৯৭৩) এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অভিমত। এসবের সার-সংক্ষেপ করে একটি চমকপ্রদ পুস্তক রচিত হতে পারে, কিন্তু সেটা করা বর্তমানে আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু তৎকালীন কয়েকটি ইস্যুর মধ্যেই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।
বঙ্গবন্ধুর ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচি দিয়েই আমি এই পর্বের আলোচনা শুরু করতে চাই। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাহাত্তরের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী আনা হয়। এর সুবাদে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় (দল হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠিত হয় আরও কয়েক মাস পরে-১৯৭৫ সালের ৭ জুন)। এই পরিবর্তন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারির ভাষণে বলেছিলেন যে, পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে দ্রুতগতিতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই পদ্ধতিগত পরিবর্তন তখন আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। এটা শুধু রাজনৈতিক শক্তির সুবিধের জন্য নয়-কেননা সংসদে তখন আওয়ামী লীগেরই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা। মুজিব চাইলে সংসদের মাধ্যমে সেদিন ব্রুট মেজরিটি প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। এটা ছিল রাষ্ট্রের সক্ষমতা-অর্জনের প্রয়োজনে এবং সমাজকে অবক্ষয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্যে একটি জরুরি উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারির ভাষণে বারবার শাসন-পদ্ধতির ‘সাময়িক পরিবর্তনের’ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাধ্য হয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই এটা করতে হচ্ছে- এটা সকলকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির ভাষণে মুজিব সমাজ-রাষ্ট্রের নানা উপসর্গের কথা তুলেছেন। তার সোজা-সাপ্টা কথা-এ ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। একটি পরিবর্তন আসন্ন। হয় প্রগতিশীলেরা এই পরিবর্তন করবে, নয়তো প্রতিক্রিয়াশীলেরা পরিবর্তন আনতে চাইবে। বঙ্গবন্ধুর বয়ানেই সেটা শোনা যাক।
“এই ‘করাপশন’ যারা করে, তারা কারা? আমরা ৫ পারসেন্ট শিক্ষিত সমাজ। আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি করাপ্ট ‘পিপ্‌ল’। আর আমরাই করি বক্তৃতা। আমরা লিখি খবরের কাগজে।…আজ আমি যা করেছি, তা বহু দুঃখে করতে হয়েছে। বহুদিন পর্যন্ত বিবেকের দংশনে জ্বলেছি। আপোষ করি নাই কোন অন্যায়ের সাথে। মাথা নত করি নাই কোন অন্যায়ের কাছে।…অর্থ আনবো, সেই অর্থ চুরি করে খাবে। টাকা আনবো, তা বিদেশে চালান দেবে। এ আর সহ্য করা যায় না। এসব যারা করে, বাংলার মাটি থেকে তাদের উৎখাত করতে হবে। এর জন্য আমি ওয়াদাবদ্ধ।…স্পিকার সাহেব, আজ আমাদের কি অবস্থা! আজ আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। ভিক্ষুকের জাতের কোন ইজ্জত আছে? দুনিয়ায় জীবনভর ভিক্ষা পাওয়া যায়? আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। সেজন্য কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে। কাজ করবো না, ফাঁকি দেব। অফিসে যাব না, ফাঁকি দেব। ফ্রি স্টাইল। কিন্তু ফ্রি স্টাইল মানে গণতন্ত্র নয়। অফিসে ১০টার সময় যাওয়ার কথা বলে ১২টার আগে যাব না। পাঁচটায় ছুটি হলে ৩টায় ফিরে আসতে হবে। কারখানায় কাজ করবো না, কিন্তু পয়সা দিতে হবে। আমাদের শ্রমিকরা খারাপ নয়। আমাদের শ্রমিকরা কাজ করতে চায়। আমাদের কৃষকরাও আজকে কাজ করছে। ফুড প্রোডাকশন এগিয়ে গেছে। অথচ আমরা ব্যাঘাত সৃষ্টি করি, আমরা ষড়যন্ত্র করি। আমরাই ধোকা দেই। আমরাই লুট করে খাই। জমি দখল করে নেই। এসকল কাজ করে কারা? আমরা, এই দেশের তথাকথিত লেখাপড়া জানা মানুষ।…কলে কারখানায়, খেত-খামারে আমাদের প্রোডাকশন বাড়াতে হবে। তা না হলে দেশ বাঁচতে পারে না। কি করে আমরা বাঁচবো, যদি ধরুন, বছরে ২০ লক্ষ টন খাবার ডেফিসিট হয়? এই তিন বৎসর পর্যন্ত গড়ে এর চেয়ে অনেক বেশি খাবার আনতে হয়েছে। প্রথম আনতে হয়েছে ত্রিশ লক্ষ টন। ধরুন, যদি প্রত্যেক বৎসর গড়ে ৫৪০ লক্ষ মণ খাদ্য আনতে হয় বিদেশ থেকে, কোথায় পাওয়া যাবে, কে দেবে? জাহাজ ভাড়া কোথায়? বিশ থেকে ত্রিশ লক্ষ টন প্রতি বছর আমাদের আনতে হয়েছে বিদেশ থেকে এই তিন বৎসরে।…কিন্তু বন্ধু রাষ্ট্ররা কতকাল দেবে? এদেশে মানুষ বাড়ছে। বৎসরে ত্রিশ লক্ষ লোক বাড়ে। আজকে আমাদের তাই ‘পপুলেশন প্ল্যানিং’ করতে হবে। ‘পপুলেশন কন্ট্রোল’ করতে হবে। না হলে বিশ বৎসর পরে ১৫ কোটি লোক হবে যাবে। আর পঁচিশ বৎসর পরে? চুয়ান্ন হাজার স্কোয়ার মাইল জায়গায় এত লোক বাঁচতে পারবে না। যত ক্ষমতাই থাকুক, বাঁচার উপায় নাই। অতএব, ‘পপুলেশন কন্ট্রোল’ আমাদের করতেই হবে। সেজন্য ডেফিনিট স্টেপ আমাদের নিতেই হবে বাংলাদেশে।…আমরা কলোনি ছিলাম। আমরা কোন জিনিসে ‘সেল্‌ফ সাফিসিয়েন্ট’ নই। আমরা খাবারে ‘সেল্‌ফ সাফিসিয়েন্ট নই, কাপড়ে ‘সেল্‌ফ সাফিসিয়েন্ট’ নই, তেলে ‘সেল্‌ফ সাফিসিয়েন্ট’ নই, ঔষধে আমরা ‘সেল্‌ফ সাফিসিয়েন্ট’ নই। আমাদের ‘মেটিরিয়ালস্‌’ কিনতে হবে। আমরা কলোনি ছিলাম পাকিস্তানিদের। আমাদের সব কিছু প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সব কিছু বিদেশ থেকে আনতে হবে। কোথায় পাবেন বৈদেশিক মুদ্রা আপনারা? ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হবে? ইনকাম করতে হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।…স্পিকার সাহেব, আজকের এই সংশোধন কম দুঃখে করি নাই। আমরা জীবনভর সংগ্রাম করেছি। কেউ যদি মনে করেন যে, জনগণের ভোটের অধিকার আমরা কেড়ে নিয়েছি, তাহলে আমি বলবো, না। আজকে এখানে যে সিস্টেম করা হয়েছে, তাতে পার্লামেন্ট-এর মেম্বাররা জনগণের দ্বারা ভোটে নির্বাচিত হবে। যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন, তাঁকেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার আছে।…এই সিস্টেমের মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে, মানুষ যাতে সহজে বিচার পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার পায়। ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। ‘কলোনিয়াল পাওয়ার’ এবং রুল নিয়ে দেশ চলতে পারে না। নতুন স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। এখানে ‘জুডিশিয়াল সিস্টেম’ এর অনেক পরিবর্তন দরকার।….জানি, আমাদের অসুবিধা আছে। আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ হয় নাই। আমাদের দেশে বন্যা হয় প্রত্যেক বৎসর, সাইক্লোন হয় প্রত্যেক বৎসর, ন্যাচারাল ক্যালামিটি হয়। সে সবের বিরুদ্ধে আমাদেরই লড়তে হবে। আজ আমাদের কথা হল, শোষণহীন সমাজ গড়তে হবে। আমরা এর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।…যদি আমি মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলি, তাহলে মানুষ থাকি কোথায়? প্রথমেই আমাকে মনুষ্যত্ব আনতে হবে, তবে আমি মানুষ হবো। মানুষ কেন আমাকে বলা হয়। কারণ আমার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে। যখন মনুষ্যত্ব আমরা হারিয়ে ফেলি, তখন তো মানুষ থাকি না। আমরা মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি। আমি সকলের কাছে আবেদন করব, আমি দেশবাসীর কাছে আবেদন করব, আজ শাসনতন্ত্রের যে সংশোধন হল, তার কথা যেন সকলে ভেবে দেখেন।…আমার ক্ষমতা তো কম ছিল না। প্রাইমমিনিস্টার হিসাবে সমস্ত ক্ষমতা আপনারা আমাকে দিয়েছেন। আমার টু-থার্ড’স মেজরিটি, তবু আপনারা শাসনতন্ত্র অ্যামেন্ডমেন্ট করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করেছেন।…তবু আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি শাসনতন্ত্রের। কারণ, একটা সুষ্ঠু শাসন কায়েম করতে হবে। যেখানে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে, যেখানে মানুষ অত্যাচার-অবিচার থেকে বাঁচতে পারে। চেষ্টা নতুন। আজ আমি বলতে চাই, দিস ইজ আওয়ার সেকেন্ড রিভলিউশন। এই রিভলিউশন-এর অর্থ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এর অর্থ অত্যাচার, অবিচার নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।”
উপরের দীর্ঘ উদ্ধৃতির থেকে দুটি প্রবণতা স্পষ্ট। প্রথমত, সমাজ-জীবন, রাষ্ট্র-জীবন বা অর্থনৈতিক জীবনের নানা ক্ষেত্রেই বেশ কিছু উপসর্গ দানা বাঁধছিল। এইড, বিশেষত ফুড এইড-এর ক্ষেত্রে নির্ভরতা একটা চিরস্থায়ী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর জন্যে দরকার ছিল খাদ্য-উৎপাদন বাড়ানোর জরুরি প্রস্তুতি। তাছাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতা ও দাম-বৃদ্ধি প্রায়ই হেডলাইন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ফলে কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষও বাড়ছিল; উঠতি মধ্যবিত্তের মনেও দেখা দিচ্ছিল উদ্বেগ, এর জন্যে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল শিল্প-কারখানায় ‘উৎপাদন বাড়ানোর’ ব্যাপক আয়োজন। কৃষিতে বা শিল্পে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা সত্ত্বেও দেশের সমস্যা পর্বতাকার ধারণ করত যদি-না ‘পপুলেশন প্লানিং’কে বাস্তবায়ন করা যায়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত ছিল জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনশিক্ষার বিষয়সমূহ। ফি বছর বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করা বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক দুর্বিপাক-আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, হঠাৎ-বিত্তের এক ক্ষুদ্র কিন্তু দাপুটে গোষ্ঠীর আবির্ভাব, দুর্নীতির বিস্তার। পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে এই সবই প্রত্যাশিত সমস্যা। দরকার ছিল গোটা সমাজ-জাতিকে একসূত্রে বাঁধা। ব্যক্তিস্বার্থকে এক্ষেত্রে অনেকটাই বিসর্জন দিতে হয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বার্থে।
[ক্রমশ]

বাংলাদেশ ও ভারত তুলনামূলক উন্নয়ন

বাংলাদেশ এগোচ্ছে, কিন্তু ঠিক কতটা এগোচ্ছে সেটা জানার জন্য তার আগের অবস্থার সঙ্গে পরের অবস্থার তুলনা করা যেমন জরুরি, তেমনি ওই একই সময়পর্বে অন্য দেশগুলো কেমন বা কতদূর এগিয়েছে তা জানাটা সহায়ক হতে পারে। প্রসংগ সূত্রে আজকাল প্রায়ই ভারতের সঙ্গে প্রতিতুলনা চলে আসে। জনমনে সেটা অনেককাল ধরে চলছিলই, কিন্তু অর্থশাস্ত্রে এর সূত্রপাত করেন জঁ দ্রেজ। ২০০৪ সালে একটি নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশের হঠাৎ-উত্থান প্রত্যক্ষ করে লিখেছিলেন :’বাংলাদেশ শোজ দ্য ওয়ে’। ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে বেশ কিছু বিষয়ে শিখতে পারে এই আইডিয়াটা তারই। সেই প্রবন্ধে তিনি বলেন:
‘Bangladesh is no paradise to human development…It is still one of the most deprived countries in the world. However, social indicators in Bangladesh are improving quite rapidly. Whether one looks at infant mortality, or vaccination rates, or school participation, or child nutrition, or fertility rates, the message is similar: living conditions are rapidly improving not just for a privileged elite but also for the population at large.’

এর ৯ বছর পরে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে লেখা ‘এন আনসারটেইন গ্লোরি :ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কন্ট্রাডিকশনস্‌’ বইটিতে জঁ দ্রেজ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জিডিপি-সূচক, শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রভৃতি মানদণ্ডে জীবনযাত্রার মানের মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগত পর্যালোচনা উত্থাপন করেন। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান দিয়ে সে বইয়ে তারা দেখান যে মাথাপিছু আয়ে ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ভারতকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল। মাথাপিছু জাতীয় আয়ই জীবনযাত্রার মানের একমাত্র বা প্রধান নির্দেশক নয়, একথা অমর্ত্য সেন অতীতে বহুবারই উল্লেখ করেছেন। কখনও শ্রীলঙ্কার প্রসংগ টেনেছেন, কখনও ভারতের কেরালা রাজ্যের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। ইদানীং বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আনছেন। ২০১৩ সালের ওই বইতে দ্রেজ-সেন লিখেছেন:
‘Bangladesh has overtaken India in terms of a wide range of basic social indicators, including life expectancy, child survival, enhanced immunization rates, reduced fertility rates, and even some (not all) schooling indicators… Most social indicators now look better in Bangladesh than in India, despite Bangladesh having less than half of India’s per capita income.’

এখন এই শেষোক্ত অবস্থারও পরিবর্তন ঘটেছে। এখন অবশ্য মাথাপিছু জিডিপিতে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় বেশ কিছুটা এগিয়ে। কিন্তু সেই ব্যবধানও দ্রুত কমে আসছে। আগে (অর্থাৎ ২০১০ সালে) বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল ২৮৮৩ পিপিপি ডলার (২০১৭ সালের স্থিরীকৃত মূল্যে), আর ভারতের মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল ৪২৩৭ পিপিপি ডলার। অর্থাৎ ভারতের মাথাপিছু আয় ২০১০ সালে বাংলাদেশের থেকে ৪৭ শতাংশ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে (কভিডের আগেই) অবস্থাটা কিছুটা বদলে যায়। দুই দেশের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান (পিপিপি ডলারে) নেমে গিয়েছিল ৪১ শতাংশে। মাথাপিছু জাতীয় আয় বা জিএনআই-এর সূচকে তুলনামূলক ব্যবধান ছিল আরও কম- মাত্র ২২ শতাংশ (২০২০ সালে ভারতে মাথাপিছু জিএনআই ছিল ৬০৬০ পিপিপি ডলার, আর বাংলাদেশে ৪৯৭৬ পিপিপি ডলার)। অর্থাৎ, আমি বলতে চাইছি, পিপিপি ডলারের মাপকাঠিতেও ভারতের মাথাপিছু জাতীয় আয় এখন আর বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয়ের তুলনায় দ্বিগুণ এগিয়ে নেই। বাংলাদেশের জাতীয় আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ক্রমেই ভারতের সঙ্গে তার ব্যবধান কমিয়ে এনেছে এবং আনছে। এর কারণ বোঝাও দুস্কর নয়। ২০১০-১৫ কালপর্বে বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু জাতীয় আয় বা জিএনআই-র গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬-২০ পর্বে বাংলাদেশে এই প্রবৃদ্ধি হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে, পক্ষান্তরে ভারতে তা দাঁড়ায় মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশে। অর্থাৎ ভারতে লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, আর বাংলাদেশে লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার। এর ফলে মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এটাই সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
ক্রমশ যে বাংলাদেশ শুধু সামাজিক সূচকে নয়, মাথাপিছু জাতীয় আয়ের নিরিখেও ভারতের সঙ্গে এক কদমে পা ফেলছে, তার কারণ কী? আমি তিনটি উপাদানের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি। প্রথমত, বাংলাদেশ ক্রমেই একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং ন্যাশনে’ পরিণত হচ্ছে। ১৯৯০ সালে জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অনুপাত ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ; সেটা বছর বছর বেড়ে ২০১৯ সালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে। ডানি রডরিকের ভাষায় বলতে হয়, ভারতে গত তিন দশকে ‘প্রি-ম্যাচিউর ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ হয়েছে। অর্থাৎ শিল্পায়নের চাহিদা পূরণ না করেই এটি তড়িঘড়ি করে সার্ভিস সেক্টরের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে কৃষিখাতে ‘উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি’ তুলনামূলকভাবে অধিক হারে বিরাজ করছে ভারতে বাংলাদেশের তুলনায়। বাংলাদেশে ২০১৯ সালে কৃষিতে মোট শ্রমশক্তির শতকরা ৩৮ ভাগ নিয়োজিত ছিল; ভারতে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ। একই কারণে, বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ভারতের তুলনায়। ২০২০ সালে জনসংখ্যার মধ্যে নগরের অংশ শতকরা ৩৫ ভাগ, আর বাংলাদেশে ৩৮ ভাগ। অথচ ১৯৯০ সালে ভারতে নগর-জনসংখ্যার অনুপাত বাংলাদেশের চেয়ে বেশিই ছিল (যথাক্রমে ২৬ ভাগ ও ২০ ভাগ)। অর্থাৎ, গত তিন দশকে ভারত ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড হয়েছে শুধু নয়, এটি নগরায়ণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমের বাজারে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারতের থেকে এগিয়ে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় পিছিয়েই ছিল: তখন নারীদের ক্ষেত্রে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল বাংলাদেশে ২৫ শতাংশ এবং ভারতে ৩০ শতাংশ। ২০১৯ সালে পাই এর বিপরীত চিত্র। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার বাংলাদেশে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে, আর ভারতে বাড়ে তো নাই, বরং কমে গেছে ২১ শতাংশে। মোটা দাগে বলা যায়, বাংলাদেশে নারীর ‘অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ বেড়েছে ভারতের তুলনায়। এর সুফল পড়েছে চারদিকে। মাধ্যমিক পর্যায়ে নারীর স্কুলগামিতার হার এতে করে উৎসাহিত হয়েছে। ভাবা যায় যে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে এই হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ (ভারতে তখন ৩৫ শতাংশ)? এর পরবর্তী তিন দশকে দুই দেশেই ‘ছাত্রী উপবৃত্তি’ ও ‘সর্বশিক্ষা-অভিযান’ জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু ফলাফলে এখন এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের স্কুলগামিতার হার ৭৮ শতাংশ, ভারতে যেখানে ৭৪ শতাংশ। একই কথা খাটে শিশু পুষ্টির ক্ষেত্রেও। ১৯৯০ সালে পাঁচ বছরের কম বয়েসী শিশুদের মধ্যে খর্বতার হার বাংলাদেশে ছিল ৬৩ শতাংশ আর ভারতে ৬২ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ভারতের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম (বাংলাদেশে ২৮ শতাংশ, আর ভারতে ৩৫ শতাংশ)। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতি সংবেদনশীল আরও নানা সূচকে বাংলাদেশ প্রথম দিকে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে থেকেও বর্তমানে এগিয়ে গেছে।
তৃতীয়ত, তথ্য-উপাত্ত বিচার করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় ভারতের পতনশীল সূচক-প্রবণতার শুরু ২০১৪ সালের পর থেকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা সামাজিক অগ্রগতি যেকোনো মানদণ্ডেই ২০১০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ ভারতের জন্য সন্তোষজনক ছিল না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে- যেমন ম্যানুফ্যাকচারিং জিডিপির অনুপাত, নগরায়ণ, বা শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় (এবং কিছুটা অপ্রত্যাশিত) অধোগমন হয়েছে। এর প্রধান কারণ মনে হয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সূত্রে নিহিত। বিগত বছরগুলোয় অবিমৃষ্যকারী কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ভারতের অর্থনীতিতে (যার মধ্যে সবার আগে আসে ‘ডিমনিটাইজেশন’ বা হঠাৎ করে পাঁচশ টাকার নোট বাতিল করে দেওয়ার হঠকারী সিদ্ধান্ত)। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে কিছু কিছু রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতা বৃদ্ধিকারী পদক্ষেপে (৩৭০ ধারা বিলোপ; ‘অনুপ্রবেশকারী খেদাও’ আন্দোলন; ‘সিএএ বিল’ ঘিরে অসহিষ্ণুতা)। সামগ্রিকভাবে, ‘হিন্দুত্ব’-এর চড়া সুরের রাজনীতি অর্থনীতির জন্যে অতিপ্রয়োজনীয় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও ‘সামাজিক পুঁজিতে’ অবক্ষয় ধরিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ‘ক্ষতিকর স্থিতাবস্থা’ থেকে অর্থনীতির জন্য ‘সহায়ক স্থিতাবস্থায়’ পৌঁছানো না গেলে অর্থনৈতিক-সামাজিক সূচকে অধোগমন ঠেকানো কঠিন।
এখানে গোড়ায় একটা আপত্তি উঠতে পারে। কেউ বলতে পারেন যে ভারত এত বড় দেশ এবং তার মধ্যে এত রাজ্যের সমাহার। তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিতুলনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত। তারচেয়ে বরং বাংলাদেশের তুলনা সাজে ভিয়েতনামের সঙ্গে। সেক্ষেত্রে বলতে হয় বাংলাদেশ ভৌগোলিক মানদণ্ডে ছোট হলেও জনসংখ্যার মানদণ্ডে ছোট নয়। এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ। তাছাড়া, জনঘনত্বের বিচারে এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘন-জনবসতির দেশ। সেদিক থেকেও দেখা দরকার যে বাংলাদেশ প্রতিকূল ঘন-জনবসতির চাপ সহ্য করেও কীভাবে অন্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে অর্থনীতির বা জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রতিযোগিতায়। সেক্ষেত্রে আমাদের শুধু তুলনামূলক মাথাপিছু জাতীয় আয়ের দিকে তাকানোই যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে অন্যান্য সামাজিক সূচকের দিকেও। ২০১১ সালের দিকে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের পাল্লা ঝুঁকে ছিল অনেক সূচকে। প্রশ্ন হচ্ছে, সে অবস্থা কি এখনও আছে? যদি থাকে, তাহলে এর কারণ কী?
এই সাফল্যের অংশীদার সকলেই : রাষ্ট্র, ব্যক্তি খাত, এনজিও ও মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ। জিডিপির আন্তঃকালীন ও তুলনামূলক তুলনায় যাদের আপত্তি (আপত্তিটা অবশ্য সংগত কারণেই) তাদের বলি, এই সাফল্য দৃশ্যমান নানা সূচকেই। দ্রেজ-সেন যেসব সূচকের কথা বলেছিলেন তার প্রায় প্রতিটিতেই বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় এগিয়ে আছে। ১.৯০ পিপিপি ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের মাত্রা ছিল ১৪ শতাংশ; ভারতে তা ছিল ২০ শতাংশ। ভারতে প্রবৃদ্ধি শুধু ২০১০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে তুলনামূলকভাবে শ্নথতর হয়েছে তা-ই নয়, এর গুণগত মান বরাবরই ছিল বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা খারাপ। যেমন, ‘গ্রোথ ভলাটাইলিটি’ বা প্রবৃদ্ধির বছর-বছর অস্থিরতা বা উঠানামার সূচকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধারা ছিল ভারতের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল। অস্থিরতার সূচক ২০১০ দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে ছিল ০ দশমিক ৩৫, আর ভারতে ১ দশমিক ২৩। ২০১০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এটি দু’দেশেই বেড়েছে, তবে ভারতে বেড়েছে আরও বেশি হারে। ২০১৬-২০ কালপর্বে বাংলাদেশে এই সূচক গিয়ে হয়েছে ২ দশমিক ১, আর ভারতে এই সূচক পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৮-এ। প্রবৃদ্ধির অস্থিরতা বাড়লে সমাজ-জীবনেও অস্থিরতা বাড়ে এবং সামাজিক সূচকের অগ্রগতিও আড়ষ্ট হয়ে যায়।
তাছাড়া, এটাও লক্ষ্য করার মতো ভারতে বৈষম্যের হার আমাদের দেশের তুলনায় বেশ উঁচুতে এবং এটি বরাবরের একটি প্রবণতা। ১৯৯২ সালে ভোগ-ব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য পরিমাপের জিনি-সহগ ছিল ভারতের ক্ষেত্রে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১১ সালে ভারতের ক্ষেত্রে এই জিনি সূচকের পরিমাপ হচ্ছে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি বাড়েনি। ভারতের ক্ষেত্রে কোনো তথ্য নেই। কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ২০১১ সালের পর থেকে ভারত তার ‘দারিদ্র্য পরিস্থিতি’ রিপোর্ট করা বন্ধ রেখেছে। বৈষম্যের মাত্রা বেশি থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আবেদন কমে যায়। এর ফলে সমাজে অন্যান্য বৈষম্য (জাত-পাত, ধর্মভেদ, জাতিভেদ এ জাতীয় ‘হরাইজন্টাল ইনইকুয়ালিটি’) প্ররোচিত হয়ে থাকে। বিভেদকামী রাজনীতি ও সামাজিক শক্তির বিস্তার ঘটে। ভারতের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতায় আমরা এর চিহ্ন খুঁজে পাই। উন্নয়নের এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশকেও অবশ্য সতর্ক থাকতে হবে এবং অগ্রিম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়নের প্রতিযোগিতায়-অন্য সব প্রতিযোগিতার মতই-একবার অবতীর্ণ হলে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা কয় না।
লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতি বিশ্নেষক

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::১০০
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

মুসলিম লীগের হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের সাথেই তিনি বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এ-ধরনের প্রস্তাবে নেহরু-প্যাটেলের কংগ্রেস এবং জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের মূল অংশ রাজি না হওয়ায় এই ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা প্রজাতন্ত্র’ প্রকল্পটি আর এগোতে পারেনি। না পারলেও কথাগুলো মুজিবের মনে গেঁথে গিয়েছিল। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস তার ‘প্রসঙ্গ শেখ মুজিব’ বইতে এ নিয়ে লিখেছেন এভাবে:
‘শেখ মুজিবের জীবনদর্শন ও অভিধানে সাহসিকতা দুঃসাহস প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা রাগ-বিরাগ-অনুরাগ বাৎসল্য-অনুভূতি-সহানুভূতি প্রভৃতি অসংখ্য শব্দের ভিড় চোখে পড়ে। শুধু চোখে পড়ে না একটি শব্দ-নৈরাশ্য। আশ্চর্যের বিষয় সেদিনও তিনি নিরাশ হলেন না। বাংলা খণ্ডিত হবার কিছুদিন পর তিনি আমাদেরকে ডাকলেন কলকাতার এক সভায়। স্থান সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেল, পার্ক রোড। সভায় যোগদান করেন কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিস, শহীদুল্লা কায়সার, কে.জি. মুস্তাফা, মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী, নুরুল আলম, শরফুদ্দিন আহমদ, আখলাকুর রহমান প্রমুখ সাংবাদিক ও যুব মুসলিম লীগ কর্মী। তাঁদের কেউ কেউ ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সভার আলোচনায়ও অংশ নিয়েছিলেন।
শেখ মুজিবের কথাগুলো আজও বিশেষভাবে যেন কানে বাজে…শোষকদের হাতে আমরা পরাজিত হয়েছি। কিন্তু এ পরাজয় সাময়িক। চলুন পাকিস্তানে যাই, শোষিত-নিপীড়িত মানুষকে সংগঠিত করি। পূর্ব বাংলায় কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতী মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। শোষকদের পরাজিত করতে শোষিত জনগোষ্ঠী নিজেরাই যথেষ্ট। তারাই প্রতিষ্ঠা করতে পারবে নিজেদের সরকার, নিজেদের গণতন্ত্র, নিজেদের সমাজব্যবস্থা-শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ। সেদিন আমার দুঃখী মানুষের মুখে ফুটবে হাসি। সোনার বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হবে শোষিতের গণতন্ত্র, শোষিত-নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার। এই তো আমরা চাই। এই আমাদের স্বপ্ন।’
‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ ও ‘শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ’ এই দুটো স্বপ্নই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মনে জাগ্রত হয়েছিল কালক্রমে। বস্তুত তার মধ্যে ক্রম-বিকাশের একটি সুস্পষ্ট ধারা দেখতে পাওয়া যায়। ঘটনাপ্রবাহের ঘাত-প্রতিঘাতে এবং প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় বিবর্তিত হচ্ছিল তার চিন্তা-চেতনা। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘আমার দেখা নয়াচীন’ পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করেছে। তিনি সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সিস্টেমের ভালো-মন্দ বিচার করতে শুরু করেছেন খোলা মন নিয়ে। একদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সাম্যের দিকে তার দৃষ্টি কেড়েছিল। অন্যদিকে, এই ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতার অভাব ও গণতন্ত্রের সমস্যা এসব তাকে পীড়া দিচ্ছিল। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে যখন তিনি কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তখনই তিনি পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি যখন আওয়ামী লীগের মূল দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়েছে তখন কর্মসূচির মধ্যে প্রোথিত হয়ে গেছে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও আদর্শ। সেই ধারাবাহিকতায় এসেছে ১৯৭০-এর নির্বাচনী মেনিফ্যাস্টোতে সমাজতন্ত্রের কথা। তবে সেই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সোভিয়েত ও চীন দেশের সমাজতন্ত্রকে গুলিয়ে ফেলা উচিত হবে না। সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তি-উদ্যোগের কথাও বলছেন, গণতন্ত্রের তথা সাধারণ জনগণের গণতান্ত্রিক (নির্বাচনী) অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাও বলছেন। ষাটের দশকে যেন প্রতিটি বছরে তার পরিপকস্ফতা বেড়ে যাচ্ছে। তিনি প্রতিটি বছরের ব্যবধানে তার সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। এই ক্রম-পরিণতিবোধ শেখ মুজিবের বৈশিষ্ট্য এবং এর পরম্পরায় এসেছে তার চার মূলনীতি এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান।
বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের পরিসরে সমাজতন্ত্র গড়া নিয়ে সোভিয়েত-চীনের ‘মডেল’ বা পশ্চিম ইউরোপীয় ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসির’ ছকের বাইরে অন্যকিছু অনুসরণ করবেন এটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে বাহাত্তরের সংবিধান গ্রহণের সময়ে ‘গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতন্ত্র’ নির্মাণের স্বকীয় বাচনভঙ্গিতে। এ যেন মার্কসের সঙ্গে স্টুয়ার্ট মিলকে মেলানোর চেষ্টা। অথবা রাসেলের সঙ্গে লেনিনকে মেলানোর তাগিদ। কিন্তু এর অন্যবিধ স্বীকৃতিরও প্রমাণ পাই আমরা বিদেশি অর্থনীতিবিদদের লেখায়। ১৯৭৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের কনফারেন্স। তার বিষয়বস্তু- ‘সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা’। ১৯৭৪ সালে এই কনফারেন্সে পঠিত প্রবন্ধগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয় স্মরণীয় পুস্তক ‘দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ উইদিন এ সোশ্যালিস্ট ফ্রেমওয়ার্ক’। এর সম্পাদক ছিলেন ই,এ,জি রবিনসন (অস্টিন রবিনসন) ও কীথ গ্রিফিন। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের আমন্ত্রণে এই সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদেরা অংশ নেন বিআইডিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি। ফ্রান্সের ডানিয়েল থর্নার, রেনে ডুমো; ভারতের অশোক মিত্র ও অর্জুন সেনগুপ্ত; জাপানের সাবুরো ওকিতা ও আকিরা তাকাহাসি; যুক্তরাজ্যের পল স্ট্রিটেন ও মাইকেল লিপটন; যুক্তরাষ্ট্রের গুস্তাভ রানিস, ইয়ারোস্লাভ ভানেক ও হলিস চেনেরী; রাশিয়ার ভদ্মাদিমির কনদ্রাতিয়েভ ও ইলিয়া রেদকো; পোলান্ডের ইয়ান লিপিনস্কি; হাঙ্গেরির আন্দ্রিয়াস ব্রোদি; যুগোস্লাভিয়ার ব্রাঙ্কো হরবাট, আলেকসান্দার বাট প্রমুখ। এদেশের নুরুল ইসলাম, আতাহার হোসেন, এম,এন, হুদা, রেহমান সোবহান, মোশাররফ হোসেন, আনিসুর রহমান, মোজাফ্‌ফর আহমদ, এ.আর. খান, স্বদেশ বোস, মহীউদ্দীন আলমগীর প্রমুখ কীর্তিমান অর্থনীতিবিদ এতে অংশ নিয়েছিলেন। এরকম বিদ্বৎজনের সভা আর এদেশে (এর আগে ও পরে) অনুষ্ঠিত হয়নি বললেই চলে।
এই কনফারেন্সের শেষ দিনে দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদেরা গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন-সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে। অর্থাৎ শুধু শুভেচ্ছা জানানোর জন্যে তারা যাননি। গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন-চিন্তা, বিশেষত সমাজতন্ত্র নিয়ে তার মূল ভাবনা সম্পর্কে জানতে-বুঝতে। অস্টিন রবিনসন এ সম্পর্কে লিখেছেন:
‘We were anxious to avoid a continuous stream of argument and recrimination as to whether it would be better for Bangladesh to adopt socialist or capitalist policies. That issue had become chose jugee–irrelevant to our discussions. All who were invited came to the conference prepared to treat it as such and we used the words `within the framework of a socialist economy’ as an essential part of the title of the conference.
It was nevertheless, very far from clear what exactly might be meant by ‘as a socialist framework’. It had been clear from the first that Bangladesh was not adopting uncritically any one of the familiar frameworks of the U.S.S.R., of Communist China, of Poland, of Romania or any other prototypes. Among ourselves we sometimes spoke of Yugoslavia as something nearer to a model. But that meant no more than that Bangladesh must be expected to work out her own compromise between a controlled economy and a price-guided economy. When on the last day of the conference we were given the opportunity of discussing the problems of developing Bangladesh with the Prime Minister, Sheik Mujibur Rahman, he was asked what was meant by Bangladesh socialism. His answer was ‘socialism as we shall practise it in Bangladesh’. This was not, as I understand it, a quick and clever repartee to a troublesome question. It was a perfectly accurate reflection of the practical and pragmatic attitude of the Bangladesh government to its problems.’

অর্থাৎ, ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক বলয়ে কোন ধরনের ব্যবস্থা বোঝানো হচ্ছে সে সম্পর্কে সেদিনের অর্থনীতিবিদদের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু এটুকু তারা জানতেন যে বাংলাদেশ নির্বিচারে কোনো প্রচলিত ছককে অনুসরণ করছে না। এই প্রচলিত ছকের মধ্যে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, পোলান্ড, রুমানিয়া প্রভৃতি দেশ। নিজেদের মধ্যে যখন তারা আলাপ-আলোচনা করেছেন তখন মাঝে-মধ্যে যুগোস্লাভিয়ার মডেলের কথা উঠেছে। এর বেশি কিছু নয়। ‘নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি’ এবং ‘বাজার-অর্থনীতি’ এ দুইয়ের মধ্যে এক ধরনের নিজস্ব ধারার আপস করতে হবে বাংলাদেশকে এটা অনুমান করা গিয়েছিল। কনফারেন্সের শেষ দিনে মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তারা জিজ্ঞেস করেছিলেন বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে কী বোঝায়? তার উত্তরে মুজিব বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে যে ধরনের সমাজতন্ত্র আমরা অনুশীলন করব সেটাই হবে আমাদের সমাজতন্ত্র’। এটা কোনো জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে কুশলী রাজনীতিকের দেওয়া তাৎক্ষণিক বা চতুর উত্তর ছিল না। এটা ছিল বাস্তব সমস্যার সমাধান করার জন্য ‘প্রাগমাটিক দৃষ্টিভঙ্গির’ একটি নিখুঁত প্রতিফলন। এই ছিলেন অস্টিন রবিনসনের চোখে শেখ মুজিব- একটি ‘প্রাকটিক্যাল অ্যান্ড প্রাগমাটিক এটিচুডের’ মানুষ। কোনো আদর্শের জড়ত্বে আটকে থাকা ডগমাটিক মানুষ তিনি কোনোকালেই ছিলেন না। এই জঙ্গমতা বিরল।
শেখ মুজিবের প্রায়োগিক ও বাস্তবজ্ঞানমণ্ডিত মনের কথা যখন উঠলই, তখন আরও একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরতে চাই। পাকিস্তানের অপশাসনের দিনগুলোর কথা মনে করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তার ‘ক্রমান্বয়ে চলার নীতি’: ‘আমি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখি ১৯৪৭-৪৮ সালে। কিন্তু আমি ২৭ বৎসর পর্যন্ত স্টেপ বাই স্টেপ মুভ করেছি। আমি জানি এদের সঙ্গে মানুষ থাকতে পারে না। আমি ইম্পেশেন্ট হই না, আমি এডভেনচারিস্ট নই। আমি খোদাকে হাজের নাজের জেনে করি, চুপি চুপি, আস্তে আস্তে, মুভ করি সব কিছু নিয়ে।’ এদিক থেকে দেখলে শেখ মুজিব ও দেং শিয়াও পিং-র মধ্যে একটি প্রচণ্ড মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এরা দুজনেই ছিলেন (অস্টিন রবিনসনের ভাষায়) ‘প্রাকটিক্যাল ও প্র্যাগমাটিক’ মনের মানুষ। দেং শিয়াও পিং-এর মতো মুজিবও বলতে পারতেন যে বিড়াল কালো না সাদা সেটা বড় কথা নয়, এটি ইঁদুর ধরতে পারে কিনা সেটাই আল্টিমেটলি বিচার্য। মুজিবও এরকম উদাহরণ দিয়ে তার প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেছেন। ‘লার্নিং বাই ডুইং’-এর কথা বলেছেন তিনি: ‘কেউ করে শেখে, কেউ দেখে শেখে, আর কেউ বই পড়ে শেখে। আর সবচেয়ে যে বেশি শেখে সে করে শেখে।’ যারা আইডিওলজির চশমা পরে পৃথিবীটাকে দেখে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন মাটির কাছাকাছি থাকার কথা:
“এদের আমি বলতাম, জনসাধারণ চলেছে পায়ে হেঁটে, আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলেছেন। জনসাধারণ আপনাদের কথা বুঝতেও পারবে না, আর সাথেও চলবে না। যতটুকু হজম করতে পারে ততটুকু জনসাধারণের কাছে পেশ করা উচিত।”
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৯৯
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
পরবর্তী সময়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এ নিয়ে বক্তব্য রাখেন-কিন্তু তিনিও লারমার ‘মানসিক ব্যবধান’ পুরোপুরি ঘোচাতে পারেননি। বরং তার কিছু কথায় বাড়তি ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থেকে গিয়েছিল। সৈয়দ নজরুল সেদিন শুরু করেছিলেন এভাবে-
‘বাঙালী হিসাবে পরিচয় দিতে রাজী না হয়ে বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই পরিষদ্‌-কক্ষ ত্যাগ করেন। আমরা শুধু পরিষদ্‌-সদস্যবৃন্দই নই- আমি মনে করি, সারা বাঙালী জাতি এতে মর্মাহত হয়েছে। আমি এটা না বললে পাছে ভুল বোঝাবুঝি হয়, সেজন্য আমি দাঁড়িয়েছি।
সেজন্য বলতে চাই, তিনি যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁদের প্রস্তাব উত্থাপন না করে, বাঙালী-পরিচয়ের প্রতিবাদে যাঁদের নাম করে এই পরিষদ্‌-কক্ষ পরিত্যাগ করে চলে গেছেন, তাঁরা বাঙালী জাতির অঙ্গ। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ৫ লক্ষ উপজাতি রয়েছে, তারা বাঙালী। তারা সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর অঙ্গ বলে আমরা মনে করি। বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি বাংলা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। এ কথা স্বীকার করার পরেও কেন তিনি চলে গেলেন, তা যদি তিনি বলতেন, তাহলে আমি এই পরিষদে তার জবাব দিতে পারতাম। তাঁর অনুপস্থিতিতে বলছি বলে এ কথা আমাকে বলতে হচ্ছে। ঐ পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা অধিবাসী, তাঁরা এই স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই অঙ্গ। বিশেষ করে কালকে আমাদের আইন-মন্ত্রী বলেছেন যে, তাঁদের প্রতি দীর্ঘকাল যাবৎ তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের সংসদীয় আইনের আওতা এবং বাইরের সভ্য জগতের আইনের আওতার বাইরে রেখে বিচ্ছিন্ন মনোভাবের সুযোগ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা দিয়েছিল। আমরা তা চাই না, আমরা চাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিকরা সারা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে। তা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫ লক্ষ অধিবাসী বাঙালী জাতির গর্ব হিসাবে থাকবে। শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনুন্নত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। যদি কেউ মনে করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে অনুন্নত অবস্থা, তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বাংলার অন্যান্য এলাকা অধিক অনুন্নত তাহলে তাঁর স্মরণ রাখা উচিত যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম দরিদ্র দেশ এবং বাংলাদেশে শিক্ষার হার কম। যে দেশের শিক্ষার হার কম, সে দেশ স্বভাবতই অনুন্নত হয়ে থাকে। এই অনুন্নতিই সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ত্রিশ লক্ষ বাঙালী প্রাণ দিয়েছে সেই অধিকারের সংগ্রামে এবং সেই সংগ্রামের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যে একাত্মতা অনুভব করে করে নাই, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি, বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজকে যে উদ্দেশ্যে পরিষদ্‌-কক্ষ ত্যাগ করেছেন, তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের জন্য তিনি সেটা করতে পারেন নাই-যদিও তিনি গর্ব করে বলে থাকেন, আমি বাঙালী। আমি বলব, যাদের ভোটে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সহযোগিতা থেকে এ হাউস বঞ্চিত হয়েছে।’
সৈয়দ নজরুল এখানে বাঙালীকে ‘রাষ্ট্র-জাতি’ হিসেবে দেখেছেন এবং এর অংশ হিসেবে পার্বতবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। লারমা-প্রসঙ্গের উপসংহারের দিকে আমরা এখন যেতে পারি। পার্বত্য-প্রশ্নে গণপরিষদের মধ্যে একাধিক প্রবণতা কাজ করছিল। একটি প্রবণতা ছিল ‘বাঙালী’ প্রশ্নে তর্ক-বিতর্ক এড়ানো। একই দেশে নানা জাতির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়াবে তা নিয়ে ভাবিত ছিলেন সদস্যরা। বাঙালী-অবাঙালী, বাঙালীর মধ্যে বাঙালী হিন্দু-বাঙালী মুসলিম এসব সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু ‘আইডেনটিটি’ ঘিরে যদি পাছে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম হয়, একারণে শঙ্কিত হচ্ছিলেন তারা। পাশের দেশ ভারতে তখন চলছিল মিজো বিদ্রোহের রেশ। সদ্যস্বাধীন দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে এরকম আশঙ্কা করা পুরোপুরি অমূলক ছিল না সেদিন। লারমা যখন ১৪ক-র পূর্বে-আলোচিত সংশোধনী প্রস্তাব আনলেন, তখন কুমিল্লা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সদস্য আহম্মদ আলী বলেছিলেন : ‘এখানে আমার একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য হল এই যে, যে সংশোধনী আনা হয়েছে, সেটা আমাদের মূল নীতির বিরুদ্ধে। আমার মনে হয়, ‘সংখ্যালঘু জাতিসমূহ’, ‘অনগ্রসর জাতিসমূহ’-এসব উক্তি যথার্থ নয়। আমরা জাতি হিসেবে বাঙালী, আমাদের জাতীয়তাবাদ বাঙালী-আমরা শুধু এইটুকুই জানি। এখানে সংখ্যালঘু জাতি এবং অনগ্রসর জাতির যে অবতারণা করা হয়েছে, এতে বরং আমাদের জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে হুমকি দেখানো হয়েছে।’
লারমা কখনও পার্বত্যবাসীকে বলেছেন ‘উপজাতি’, কখনও বলেছেন ‘অনগ্রসর জাতি’। আহম্মদ আলীর বক্তব্যের ৬ দিন আগে লারমা তার সূচনা বক্তব্যে বলেছিলেন : ‘আমার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে আমাদের জাতির পিতা শ্রদ্ধেয় বঙ্গবন্ধুর কাছে যুক্ত স্মারকলিপি দিয়েছিলাম। এই স্মারকলিপিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের জন্য গণতান্ত্রিক শাসনের কথা বলেছিলাম। আমাদের উপজাতিদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছিলাম।’ তখনই প্রতিবাদের রব উঠেছিল। জনৈক সদস্য বলেছিলেন: ‘মিস্টার লারমা একটি পৃথক স্বায়ত্তশাসিত এলাকার দাবী জানাচ্ছেন। এইভাবে এক দিক দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানা হচ্ছে বলে আমি মনে করি।’
কিন্তু সবাই এতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। কামারুজ্জামান সাহেবের বক্তব্য ইতিপূর্বেই আমি আলোচনা করেছি। তিনি এক মহাজাতির ভেতরে নানা জাতির সহাবস্থান দেখেছেন। অর্থাৎ এক বাঙালী পরিচিতির মধ্যেই নানা জাতির বসবাস হতে পারে, নানা জাতি-উপজাতির বিকাশ হতে পারে এমন যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, ড. কামাল হোসেন যুক্তি দেখিয়েছেন গণতান্ত্রিক সেক্যুলার কাঠামোর। বলেছেন যে বিশেষ সংরক্ষণের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসে অভিন্ন নাগরিক অধিকার বোধে একত্র হতে। অনগ্রসর এলাকার বিশেষ উন্নয়ন-চাহিদা পূরণের কথাও তিনি লারমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মো. ইউসুফ আলী বলেছেন- একই বাঙালী জাতির মধ্যে বিচিত্র নৃগোষ্ঠীর মিশ্রণের কথা বা ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটির’ কথা। উদ্ধৃতিটি তাৎপর্যপূর্ণ:
‘জনাব স্পীকার সাহেব, আমার বন্ধু লারমা সাহেব যে কথা বলেছেন, আমি তার পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষেপে বিনীতভাবে তাঁকে জানাতে চাই, আমরা জানি বাঙালী জাতির কথা এবং আরও জানি যে, বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ বাংলাদেশের ৫৪ হাজার বর্গমাইল এলাকায় ছড়িয়ে আছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলার যে সংস্কৃতি, বাংলার যে সাহিত্য, বাংলার যে ইতিহাস, তা হচ্ছে বৈচিত্র্যময় এবং সেই বৈচিত্র্য আমাদের মধ্যে ঐক্য এনেছে। Unity in diversity. . আজকে ঢাকা শহরে যখন কোন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেখানে যাঁরা নিজেদের উপজাতীয় বলে পরিচয় দিতে চান, তাঁদের বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংস্কৃতজ্ঞ বলে তুলে ধরা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, বাংলাদেশের চেহারায় বৈশিষ্ট্য, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নিয়ে যে মহৎ ‘কোরাস্‌’ গীত হয়, সেই গীতই হল বাংলার সংস্কৃতি। এই কারণে বৃটিশ যুগের মতো কাউকে উপজাতীয় হিসাবে চিহ্নিত করে divide and rule policy অবলম্বন করতে চাই না এবং সেই নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলার মানুষ সবাই এক।
এই প্রসঙ্গে আঞ্চলিকতার কথাও এসেছে। আমরা জানি, আইয়ুবের আমলে দেশের সংহতির যে সংজ্ঞা ছিল, তার সঙ্গে আমরা একমত হতে পারিনি। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, দেহের একটা অঙ্গকে আলাদা বা দুর্বল করে রেখে গোটা দেহকে সবল করা যায় না। তেমনি দেশের একটি অঙ্গকে দুর্বল করে গোটা দেশকে সবল করা যায় না।’
শেখ মুজিব গণপরিষদের ভেতরের এসব প্রবণতা জানতেন। তিনি লারমাকেও জানতেন এবং পার্বত্যবাসীর মনোকষ্টের বিষয়টিও বুঝতেন। তিনি যখন ‘বাঙালী’ বলতেন তখন তিনি বাংলার জনপদ ও তার অধিবাসীকেই মাথায় রাখতেন- যে-অধিবাসীরা পশ্চিম পাকিস্তানের ‘কলোনী-মাত্র’ ছিল। সেখানে তিনি সমতল ও পাহাড়ের সকল নৃতাত্ত্বিক ভাষাভিত্তিক জাতিকেই অন্তর্ভুক্ত করে কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি বারবার বলেছেন, ‘অনেক জাতি দুনিয়ায় আছে, যারা বিভিন্ন ভাষাবলম্বী হয়েও এক-জাতি হয়েছে। অনেক দেশে আছে, একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু নিয়ে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে- তারা এক জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর।’ আর সেই অনুভূতির অভিন্ন ভিত্তি হলো বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধ : ”বাঙালী জাতি যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা নিয়েছে, যার উপর ভিত্তি করে আমরা স্বাধীনতা নিয়েছি, যার উপর ভিত্তি করে আমরা সংগ্রাম করেছি, সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালী, আমার ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’।” এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অভিন্ন অনুভূতির মধ্যে লারমাও পড়েন। এই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের শরিক বাংলার সবাই-বাঙালী-অবাঙালী নির্বিশেষে সমতল ও পার্বত্য এলাকার অধিবাসী সকলেই যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে একাত্তরে।
প্রকৃত পক্ষে, বাঙালী জাতীয়তাবাদের পক্ষে দাঁড়ানোর মানে এই নয় যে পার্বত্যবাসীর অধিকারের বিপক্ষে দাঁড়ানো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে মুজিব বলেছিলেন: ‘উপজাতীয় এলাকা যাতে অন্যান্য এলাকার সাথে পুরাপুরি সংযোজিত হতে পারে, তারা যাতে জীবনের সবক্ষেত্রে অপর নাগরিকদের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, এই জন্য উপজাতীয় এলাকা উন্নয়নের ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় দ্বীপসমূহ এবং উপকূলবর্তী এলাকার বসবাসকারীরা যাতে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্যে তাদের সম্পদের সদ্ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিশেষ উদ্যোগ গৃহীত হওয়া প্রয়োজন।’ ১৯৭৩ সালে গৃহীত আওয়ামী লীগের ‘ঘোষণাপত্রে’ আলাদা করে বলা ছিল ‘পশ্চাৎপদ অঞ্চলসমূহ’-এর কথা: ‘আমাদের দেশের অবহেলিত পাহাড়ী অঞ্চলসমূহকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে উন্নীত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হইবে। যাহাতে এইসব অঞ্চলের মানুষ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দাদের মতই সর্বক্ষেত্রে সমভাবে সমুদয় সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করিতে পারে।’ এরকম উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। সন্দেহ নেই, লারমা বঙ্গবন্ধুর এসব প্রতিশ্রুত রূপকল্পে-যা গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সমাজতন্ত্র নির্মাণের আবশ্যকীয় অংশ-আস্থা রেখেছিলেন। এবং আস্থা রেখেছিলেন বলেই লারমা ও বঙ্গবন্ধু তাঁদের জীবদ্দশায় পরস্পরের হাত ছেড়ে দেননি। আগেই বলেছি, লারমা বাহাত্তরের সংবিধানে সই করেছিলেন এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাকশালেও যোগ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তার সহযোগীদের ওপরে নির্যাতন নেমে আসে। প্রতিবাদে তারাও গঠন করেন ‘শান্তি বাহিনী’। সামরিক শাসনামলে পার্বত্যবাসীর ওপরে যে অবিচার-নির্যাতন হয়েছিল সেকথা নিয়ে নতুন করে আর কিছু আজ যোগ করবার নেই।

১৩. ১৯৭২-৭৫: পুনর্গঠন ও দ্বিতীয় বিপ্লবের সূচনা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমতাবাদী চিন্তার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ক্রমাগতভাবে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যদি কিছু দূর গিয়ে দেখা যায় আর এগোনো যাচ্ছে না, পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ে বা ব্যারিকেডের কারণে, তাহলে বেশির ভাগ মানুষই যা করেন হতোদ্যম হয়ে পড়েন। কিন্তু নিরাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া মুজিবের স্বভাবে ছিল না। সংকটের মুখে তিনি সবসময় নতুন পথ খুঁজতেন: এভাবে না হলে ওভাবে, সোজা পথে না হলে ঘুর পথে। ১৯৪০-এর দশকে একসময় মুজিব ‘স্বাধীন স্বার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক বাংলা’ রিপাবলিকের স্বপ্ন দেখতেন। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে বাংলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার গঠিত হয়। তখন সোহরাওয়ার্দী আন্দামানসহ দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে রাজবন্দিদের মুক্তি দেন, যার অধিকাংশই ছিলেন বামপন্থি ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। বাংলার আসন্ন স্বাধীনতার প্রশ্নে এ পর্যায়ে আবুল হাশিম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কমিউনিস্ট নেতা বঙ্কিম মুখার্জী ও সোমনাথ লাহিড়ী প্রমুখের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। দেশ ভাগ হলে পাকিস্তান ও ভারতের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক সার্বভৌম বাংলার বিষয়ে তারা আলোচনা করেন। এই স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেটা মুজিব জানতেন।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৯৮
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
সংবিধান গ্রহণের শেষ কার্যদিবসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্মরণীয়ভাবে বলেছিলেন (এই বক্তব্যের পরই বঙ্গবন্ধু তাঁর সমাপনী ভাষণ দিতে উঠে দাঁড়ান):
“মাননীয় স্পীকার, স্যার, আজকের এই শেষ দিনে আমি কিছু বক্তব্য রাখতে ইচ্ছা করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি বলতে পারি। আজকে শেষ দিনে আমরা আমাদের মনের আকাঙ্ক্ষা, আমাদের মনের অভিব্যক্তি-প্রকাশের শেষ পর্যায়ে এসেছি। আজকের এই শেষ দিনে আমাদের যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর যে মনের কথা, যে মনের অভিব্যক্তি, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কথা এই মহান গণপরিষদে এক পবিত্র দলিলে আমরা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি- যে দলিলে থাকে মানুষের চলার পথের ইঙ্গিত। মানব-মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনের বাস্তকব রূপ আজকে এই মহান্‌ গণপরিষদে আমরা দিতে যাচ্ছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে, এই গণপরিষদের একজন নির্দলীয় সদস্য হিসাবে আমি যে আলোচনা করেছি এই সংবিধানের উপর, সেখানে আমার মনের যে অভিব্যক্তি, মনের যে আবেগ, মনের যে ধারণা, সেটাই আমি সরল মনে ব্যক্ত করেছি আমার বক্তব্যে- একজন সম্পূর্ণ সরল মনের মতো। সেখানে ছিল না কোন উদ্দেশ্যমূলক কথা, সেখানে ছিল দেশকে আমি যেভাবে ভালবেসেছি, যেভাবে আমার মনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি, যেভাবে আমি কোটি মানুষের একজন হয়ে দেখেছি, সেইভাবেই এই মহান্‌ গণপরিষদে বলেছি। মাননীয় স্পীকার, স্যার, আমি নির্দলীয় সদস্য হিসাবে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেছি এবং আমাকে মাননীয় সদস্য-সদস্যা ভাই-বোন, মাননীয় স্পীকার এবং ডেপুটি স্পীকার যে সময় দিয়েছিলেন কথা বলার, সেটা আমি মনে করি, এই মহান গণপরিষদে গণতান্ত্রিক অধিকারের একটা ঐতিহাসিক স্বাক্ষর হয়ে থাকবে। মাননীয় স্পীকার সাহেব, আজ যে সংবিধান এই মহান্‌ গণপরিষদে গৃহীত হবার শেষ পর্যায়ে রয়েছে, সেই সংবিধানে বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র উত্তরণ হবে আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশে। মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদের দেশে সমাজতন্ত্র হবে, দেশে অভাব থাকবে না, হাহাকার থাকবে না, মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ থাকবে না, হিংসা, দ্বেষ, বিদ্বেষ- কিছুই থাকবে না। শুধু থাকবে মানুষে মানুষে প্রেম, প্রীতি, মায়া, মমতা এবং তার দ্বারা এক নতুন সমাজ গড়ে উঠবে। মানবতার একটা ইতিহাস থাকবে এবং তাতে লেখা থাকবে “সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই”। আমি আজ কামনা করি, তাই হোক। আসুন, শপথ করি, যেন আমাদের চেষ্টা সফল হয়, যেন শোষণহীন সমাজ বাস্তবে রূপায়িত হয়। আর যেন রাস্তায় রাস্তায় শ্নোগান না হয়, “আমাদের দাবী মানতে হবে”। আর যেন মিছিল না হয়, “আমাদের দাবী মানতে হবে”, “সংগ্রামে চলবে, সংগ্রাম চলবেই” বলে। সেই অবস্থা আর যেন না হয়। আমরা যেন আমাদের জন্মভূমি গড়ার কাজে ভাল করে মনোনিবেশ করতে পারি। আজ এই সংবিধান যাদের রক্তে এল, তাদের কথা যেন ভুলে না যাই। অতীতের ভুলের ইতিহাস, অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, অতীতের মানব-সভ্যতা, মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার যে সংগ্রামে, আজ এই সংবিধানে তা সন্নিবেশ করে আমাদের ইতিহাস বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যাতে আমাদের এই ইতিহাস বিশ্বের মধ্যে অনন্য হয়ে থাকতে পারে। আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তাঁদেরকে, যাঁরা নিজেদের জীবন বলি দিয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন এবং এ দেশ থেকে স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যে সব ভাই-বোন সেই সরকারের কঠোর নির্যাতন সহ্য করেছিল, সে সব ভাই-বোনকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। স্বাধীনতার জন্য যে সব মা-বোন রক্ত দিল, যার জন্য আজ আমরা এই গণপরিষদে দাঁড়াতে পেরেছি, সেই মা-বোনদেরকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সেই সব বীর মুক্তি-পাগল লোকদের, যাঁরা আজ পঙ্গু হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, যার জন্য তাঁরা অসীম দুঃখ-কষ্টে কালাতিপাত করেছেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করছি ছাত্র-সমাজকে, শ্রদ্ধা নিবেদন করছি বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দকে, শ্রদ্ধা নিবেদন করছি বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নর-নারীকে। সর্বশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছি জাতির শ্রদ্ধেয় পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যাঁর নেতৃত্বে আজ এই মহান্‌ গণপরিষদে কোটি কোটি মানুষের জন্য এই পবিত্র দলিল রচিত হয়েছে।”
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, এসব কথা যিনি সংবিধান গ্রহণের শেষ কার্যদিবসে বলবেন, তাকে কেন শেখ মুজিব ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে বলবেন। আর বললেই বা তিনি শুনবেন কেন, বা কেনই বা চূড়ান্ত সংবিধানে স্বাক্ষর করবেন? মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাকশালেও যোগ দিয়েছিলেন ১৯৭৫ সালে এবং ‘দ্বিতীয় বিপ্লবকে’ সমর্থন করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ১৪নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে লেখা ছিল ‘জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান’ করার লক্ষ্য। এতে করে পার্বত্যবাসী ও সমতলবাসী সকল উপজাতি-সম্প্রদায়কেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এক্ষেত্রে ১৪ক ধারা হিসেবে সংশোধনী যেটি এনেছিলেন তাতে সংযোজন করতে চেয়েছিলেন নিল্ফেম্নাক্ত অংশ:
‘সংখ্যালঘু জাতিসমূহ ও অনগ্রসর জাতিসমূহের (ক) ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণ করা হইবে; (খ) শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ-অধিকার দেওয়া হইবে; এবং (গ) অগ্রসর জাতিসমূহের সহিত সমান পর্যায়ে উন্নীত হইবার পরিপূর্ণ সুযোগ রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে নিশ্চয়তা বিধান করিবেন।’
কিন্তু এই সংশোধনী আনার কোনো প্রয়োজন ছিল না, কেবল ‘মনস্তাত্ত্বিক কারণ’ ছাড়া। অন্যান্য ধারায় এসব অধিকারকে বাংলাদেশের সকল অধিবাসীর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন, ১৯নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে অঞ্চলগত সমতা বিধানের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে- ‘প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে (১) ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না,’ এবং (২) ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না’। এবং অবশ্যই মনে করতে হবে সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ উপধারা যেখানে স্পষ্ট করা বলা ছিল যে ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ অর্থাৎ লারমা যেটা চেয়েছিলেন সেটা অন্যভাবে অন্যান্য ধারার মধ্য দিয়ে পার্বত্যবাসীর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অনগ্রসর জাতি-গোষ্ঠীর যাতে অংশগ্রহণ থাকে সেজন্য ২৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল:
‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।
এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই (ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,
(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,
(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আগে উল্লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ড. কামাল হোসেন একটি দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছিলেন। পূর্বতন ১৯৫৬ বা ১৯৬২-এর সংবিধানে পার্বত্যবাসীর বিশেষ ব্যবস্থার মধ্যে এনে সার্বিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এটি তিনি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছিলেন। পুরো উদ্ধৃতিটি প্রাসংগিক বিধায় তুলে ধরা হলো:
‘জনাব স্পীকার সাহেব, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত মাননীয় সদস্য সেই এলাকা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন যে, বৃটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের সময় সে এলাকার যে একটা ইতিহাস ছিল, সংবিধানে তা উল্লেখ করা হয়নি। আগে সে এলাকার ব্যাপারে যে বিশেষ বিধান ছিল, এ সংবিধানে তা নেই। আমি এ কথা স্বীকার করছি, কিন্তু সেই সঙ্গে আমি এ কথাও বলতে চাই যে, আগে সে এলাকার লোকদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছিল। এ সম্বন্ধে আমরা দেখতে পারি ভারত শাসন আইনের ৯২ ধারা। সে ইতিহাস আমরা সংবিধানে লিখিনি। ৯২ ধারায় এগুলোকে ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ বলা হত। তাতে বলা আছে:
“The executive authority of a Province extends to excluded and partially excluded areas therein, but, not withstanding anything in this Act, no Act of the Federal Legislature or of the Provincial Legislature, shall apply to an excluded area or a partially excluded area…”
আইনের কোন ‘প্রটেকশন’ তাঁদের ছিল না। কোন আইন তাঁদের সম্পর্কে করা যেত না। আরও আছে:
“Governor may make regulation for the peace and good government of any area in a Province which is for the time being an excluded area, or a partially excluded area,…”
তখন তাঁরা সংসদের আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাইরে ছিলেন। তাঁরা আইনের আশ্রয়ের বাইরে ছিলেন। ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (৪) দফায় এবং ১৯৬২ সালের সংবিধানের ২২১ অনুচ্ছেদে এটা দেখতে পাই। তাঁদের আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করে সেখানে গভর্নরের শাসন চালু রাখার বিধান করা হয়েছিল। সংসদ তাঁদের ব্যাপারে কোন আইন প্রণয়ন করতে পারতেন না। তাঁরা আদালতের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত থাকতেন। হাইকোর্টে মামলা করতে পারতেন না। ফাঁসির অর্ডার হলেও হাইকোর্টে যেতে পারতেন না। সচেতনভাবেই আমরা সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে দিতে চাই। কারণ, এই সব বিধানের সাহায্যে তাঁদের নানাভাবে শোষণ করা সম্ভব হয়েছিল। দুঃখজনক যে, তাঁরা শোষিত হয়েছেন, তাঁদের শোষণ করা হয়েছে। মাননীয় সদস্য সেই শোষণের কথা বলেছেন। বিশেষ বিধান থাকার ফলেই শোষণ করা সম্ভব হত। ঔপনিবেশিক শাসকরা অন্যায়ভাবে নাগরিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করত, এক অংশের বিরুদ্ধে অন্য অংশকে লেলিয়ে দিয়ে নিজেদের সুবিধা আদায় করত। দেশের অন্যান্য নাগরিকের সমান অধিকার তাঁদের দেওয়া হয়নি। আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক এবং তাঁদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রেখেছিল এবং আমাদের শাসন ও শোষণ করত। বিশেষ বিধান থাকার ফলেই আমাদের শোষণ করা সম্ভব হত। আজ বাংলাদেশের সব অঞ্চলের জনসাধারণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। আমরা সবাই আজ এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর বা পটুয়াখালী- এই সব এলাকার যেখানেই থাকুন না কেন, সবাই সমান মর্যাদা ভোগ করবেন। তার পরেও দেশের অনগ্রসর লোকদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। আমি আপনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাননীয় সদস্যের কাছে আবেদন করব, তিনি যেন অতীতের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কথা চিরদিনের জন্য ভুলে যান। বাংলাদেশের সবাই যাতে স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে পারে, সেজন্য সকলে মিলে কাজ করার সময় এসেছে।’
তারপরও মানবেন্দ্র লারমার ওয়াকআউট ঠেকানো যায়নি। অনেকটা যেন অভিমান করেই তিনি সংসদ-কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। পরে আবার আসলেন বটে, কিন্তু দাগ, একটা দাগ, তার মনের মধ্যে থেকে গিয়েছিল।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৯৭
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আবুল ফজল একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন, যার নাম ‘শেখ মুজিব :তাঁকে যেমন দেখেছি’। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, কিন্তু মূল লেখাগুলো রচিত হয়েছে বেশ আগেই। লেখাগুলো স্মৃতিচারণমূলক- অনেকক্ষেত্রে ‘রোজনামচা’ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দেওয়া। ১৯৭৬ সালের ২৬ আগস্ট একটি রোজনামচায় তিনি লিখেছেন:
‘নিঃসন্দেহে শেখ ছিলেন এ যুগের সর্বপ্রধান বাঙালী। যে সর্বপ্রধান বাঙালীকে আমরা বাঙালীরাই কি না নিজের হাতে হত্যা করলাম! আশ্চর্য, এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও সত্য হলো। বাঙালীকে বাঙালী বলে পরিচয় দিতে কে জুগিয়েছিল সাহস? শেখ মুজিব নয় কি? বজ্রগর্ভ আর অমিত প্রেরণার উৎস ‘জয় বাংলা’ শ্নোগান কে তুলে দিয়েছিল বাঙালীর মুখে? শেখ মুজিব নয় কি? জিন্দাবাদে সে জোর, সে চেতনা, সে উদ্দীপনা কোথায়? জয় বাংলা প্রদীপ্ত শিখা, জিন্দাবাদ ধার করা এক মৃত বুলি। গ্রাম বাংলার শতকরা নব্বইজন যার অর্থই বুঝে না। এ যুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালী মুসলমান শেখ মুজিব- এ কথা বল্লে কিছুমাত্র অত্যুক্তি করা হয় না। হিন্দু বাঙালীয়ানা আর মুসলমান বাঙালীয়ানায় কিছুটা পার্থক্য আছে। তাই মুসলমান কথাটা যোগ করলাম। তবে এ পার্থক্য সবসময় বিরোধমূলক নয়। শেখ মুজিবের বেলায় যেমন তা ছিল না। তাঁর সমগ্র মুসলমানিত্ব নিয়েই তিনি এক পরিপূর্ণ বাঙালী ছিলেন। এমন বাঙালী বিরল। এ বিরল বাঙালীটিকেই কি না হত্যা করা হয়েছে। আমরা নিজেরাই করেছি। এ যেন নিজের অঙ্গ নিজে ছেদন করা।’
এই অনুশোচনা ও পিতৃহত্যার গ্লানি জাতির বিবেককে প্রতি মুহূর্ত দংশন করছে এটা বারবার ওই পুস্তকে উচ্চারিত হয়েছে। এটা কাকতালীয় নয় যে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের রাজধানীর নাম ‘মুজিব নগর’ করা হয়েছিল- সেটা আর কারও নামে নয়, শেখ মুজিবের নামেই। অন্যত্র আবুল ফজল লিখেছেন: ‘এ স্বাধীনতার জন্য আমরা শেখ মুজিবের কাছে ঋণী। তিনি সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর নাম যাদুমন্ত্রের মতো কাজ করেছে। তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা ব্যতিরেকে এবং অনুপস্থিতিতে যে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছিল তাঁকেই করা হয়েছিল সে সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং সে সরকারই নিয়ন্ত্রণ করেছে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে, সে সরকারের বাস্তব বা কাল্পনিক রাজধানীর নাম ‘মুজিব নগর’ হয়েছিল। অন্য নাম কারো মাথায় আসেনি।’ ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবরের রোজনামচায় তিনি আরও লিখেছেন:
‘সাম্প্রতিক ঘটনায় শেখ সাহেবের হত্যা সম্পর্কে আমি অনবরত বিবেকের একটা দংশন অনুভব করছি। এত বড় একটা দ্বিতীয় কারবালা ঘটে গেল দেশে, নির্মমতায় যে ঘটনার জুড়ি নেই ইতিহাসে। সে সম্পর্কে দেশের সর্বাপেক্ষা সচেতন অংশ শিক্ষিত আর বুদ্ধিজীবী সমাজ কিছুমাত্র বিচলিত বোধ করছেন না, এ ভাবা যায় ন। আশ্চর্য, মননশীল লেখক-শিল্পীদের মধ্যেও তেমন একটা সাড়া দেখা যায়নি এ নিয়ে।… এত বড় একক ট্র্যাজিক ঘটনা তাঁরা আর কোথায় খুঁজে পাবেন লেখার জন্য?’
আবুল ফজল বারে বারে এটাই বলতে চেয়েছেন, বাঙালিদের জন্য একটি নিজস্ব স্বাধীন আবাসভূমি শেখ মুজিবই দিয়ে গেছেন, অথচ তাকেই আমরা কী অবহেলাই না করেছি তার মৃত্যুর পর- অনেক অনেক দিন পর্যন্ত! প্রশ্ন উঠতে পারে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গড়া ‘বাঙালিদের’ জন্য এক স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি তার মধ্যে কি ‘অন্য জাতি-উপজাতি’ও পড়েন? এ নিয়ে কিছুটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে গত তিন দশকে। সে বিষয়ে দ্রুত আলোকপাত করতে চাই।
এর আগে এ বিষয়ে ইংগিত দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে বঙ্গবন্ধুর ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলার মানুষ’ এই শব্দযুগলের মধ্যে বৃহত্তর পরিচিতির আভাস পাই। এই পরিচিতিকে (আইডেনটিটি) কেবল নিছক ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ (মেজোরিটারিয়ান) জনগোষ্ঠীর পরিচয় হিসেবে নির্দিষ্ট করা চলে না। এর মধ্যে প্রথাগত-অর্থে যারা বাঙালি তারাও আছেন, আবার যারা মাতৃভাষা হিসেবে বাঙালি নন, তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যে ধরনের ‘মহাজাতি’ গঠনের কল্পনা করেছিলেন, শেখ মুজিবের কাছে ‘বাঙালি’ ছিল তেমনি এক মহাজাতিক প্রকল্প। যার মধ্যে বাঙালি হিন্দুরাও পড়েন, বাঙালি মুসলিমও পড়েন। কারও কারও কানে এটা কষ্টকল্পিত দাবি বলে মনে হতে পারে, সে জন্যে বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে গণপরিষদ বিতর্কে অংশ নেওয়া এএইচএম কামারুজ্জামান সাহেবের বক্তব্যের একটি অংশ তুলে ধরছি। এই ভাষণের প্রেক্ষাপটটি বলি। এর একদিন আগেই নির্দলীয় সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তার ‘ডিসেন্ট’ ব্যক্ত করেছেন। তিনি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন:
‘এই খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি আমাদেরকে সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করেছেন। এই খসড়া সংবিধানে আমাদের অবহেলিত অঞ্চলের কোন কথা নাই।… পার্বত্য চট্টগ্রাম হল বিভিন্ন জাতি-সত্তার ইতিহাস। কেমন করে সেই ইতিহাস আমাদের সংবিধানের পাতায় স্থান পেল না, তা আমি ভাবতে পারি না। সংবিধান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা, যা অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে-পড়া, নির্যাতিত জাতিকে অগ্রসর জাতির সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। বস্তুতপক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে আমরা সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না।’ এর কিছু পরে লারমা যোগ করলেন- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের একটা ইতিহাস আছে এবং সেই ইতিহাসকে কেন এই সংবিধানে সংযোজিত করা হল না?… এই সংবিধানে মানুষের মনের কথা লেখা হয়নি। কৃষক, শ্রমিক, মেথর, কামার, কুমার, মাঝি-মাল্লার জন্য কোন অধিকার রাখা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণের অধিকারের কথাও সংবিধানে লেখা হয়নি।’ এর পর সভা পরদিন সকাল পর্যন্ত মুলতবি হয়ে যায়।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সেদিনের বক্তব্য পুনরুক্তিমূলক ও আবেগ-আক্রান্ত ছিল। কিন্তু আবেগের আতিশয্যের কারণেই এই কথাগুলোকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার কোনো হেতু নেই। রাজনীতিতে ‘পার্সেপশন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এটা ভেবেই তৎকালীন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান এর পরের দিন একটি পরিশীলিত প্রত্যুত্তর দিলেন লারমার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। প্রথমেই তিনি লক্ষ্য করলেন যে, ‘সংবিধানে সবকিছু লেখা থাকে না এবং সব কথা লিখেই শুধু মানুষের কল্যাণ সাধন করা যায় না। সংবিধানের পরে আসে আইন, আসে আরও অনেক কর্তব্য।’ দ্বিতীয়ত, তিনি লারমাকে ‘আঞ্চলিকতার’ কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। লারমাকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন যে, ‘আমার বন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সদস্য গণপরিষদে তাঁর অঞ্চলের কথা বলেছেন। তাতে আপত্তি নাই। কথা বলা খারাপ নয়। তবে আঞ্চলিকতা পরিহার করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যে আঞ্চলিকতা মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।’
তৃতীয়ত, কামারুজ্জামান বললেন যে, জাতীয় পরিকল্পনার চৌহদ্দি গোটা বাংলাদেশ জুড়েই। সেই পরিকল্পনা পার্বত্যবাসীদের বাদ দিয়ে নয়। তাদের উন্নতির রাস্তা ঐ জাতীয় পরিকল্পনার নির্দেশিত পথেই নিহিত। তিনি বললেন, ‘কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, এই সমাজের কোনো অংশ অবহেলিত ও উপেক্ষিত হলে ক্ষমতাসীন সরকার যদি সেই অবহেলিত, উপেক্ষিত মানুষের জন্য কোন কিছু না করে, তাহলে তা হবে অন্যায়। আমরা কল্পনা করেছি সমস্ত অঞ্চলকে একটা অঞ্চল হিসাবে। তাই আগামী দিনে আমাদের [পার্বত্য] বন্ধুদের পরিস্কার নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, এই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন আঞ্চলিকতা থাকবে না। এই বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলকে একটি অঞ্চল হিসাবে পরিকল্পনা করে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে একটি সামাজিক জীব হিসেবে কল্পনা করে উন্নত করা হবে।’
চতুর্থত, লারমাকে আশ্বস্ত করে তিনি বললেন যে, ‘ইতিহাস আমরা জানি, ইতিহাস আমরা অস্বীকার করি না।’ এদিকে ‘আমাদের সুতীক্ষষ্ট দৃষ্টি আছে’ এবং এটাও ঠিক যে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোন অঞ্চলের প্রতি যদি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়, তাহলে অন্যায় করা হবে’। কেননা, তাতে করে ‘সেই ব্যাধি শুধু সেই অঞ্চলেই থাকবে না- সেই ব্যাধি বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরে, সারা বাংলাদেশেই ছাড়িয়ে পড়বে।’
সবশেষ, তিনি মহাজাতির মধ্যে বিভিন্ন জাতির সহাবস্থানের ইনোভেটিভ যুক্তিটি পেশ করলেন। এটি হচ্ছে ‘সেলিব্রেটিং ডাইভার্সিটির’ যুক্তি :’আমার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাইরাও অধিকার পাবেন। কোন অংশ হতেই তাঁরা বঞ্চিত হবেন না। বাঙালী হিসাবে আমরা বেঁচে থাকব। একটা জাতির অভ্যন্তরে বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে বৈচিত্র্য অনেক বেশী, মাধুর্য অনেক বেশী। এই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে শুধু এক জাতি, এক কৃষ্টি, এক সংস্কৃতি- তা নয়। বহু অঞ্চলের বহু মানুষ আছে, তাদের নিজস্ব অনেক কিছু আছে। শত বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকব। কিন্তু সর্বোপরি থাকবে আমাদের বাঙালী জাতীয়তাবাদ। সেই জাতীয়তাবাদ অক্ষুণ্ণ রেখে সেই জাতির অভ্যন্তরের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমরা সম-দৃষ্টি রেখে আমাদের জাতীয়তাবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করব।’
এর থেকে কি কোনোভাবে এই অনুমান করা চলে যে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীরা পার্বত্যবাসীকে সমতলবাসী হয়ে যেতে বলেছেন, বা পাহাড়ি জনগণকে ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে বলেছেন? অথচ এরকমই অবাস্তব অভিযোগ তোলা হয়েছে পরবর্তীকালে কোনো কোনো মহল থেকে। এমনকি শেখ মুজিবকেও এ পরিপ্রেক্ষিতে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে তারা দ্বিধাগ্রস্ত হননি। সেটা করা যেতেই পারে যদি তার পেছনে জোরালো যুক্তি থাকে। দুঃখের বিষয়, অতীতে এই বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতার পরিচয় দেওয়া হয়নি। যেমন, পার্বত্য ইস্যুতে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত লেখিকা তার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন পি,এইচ,ডি অভিসন্দর্ভে এই মর্মে অভিযোগ তুলেছেন যে শেখ মুজিব পাহাড়ি জনগণকে তাদের পৃথক পরিচিতি/আত্মসত্তা (আইডেনটিটি) ‘ভুলে গিয়ে বাঙালি’ হয়ে যেতে বলেছেন। মূল ইংরেজিতে বিবরণটি এই রকম: ‘He therefore asked the Hill people to forget about their separate identity and to become Bengalis’ এর সপক্ষে লেখিকা আমেনা মোহসীন সমর্থন হিসেবে দেখিয়েছেন একটি মাত্র তথ্যসূত্রের উৎস। সেটি হচ্ছে, অনন্ত বিহারী খীসার সঙ্গে সাক্ষাৎকার (যেটি ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসে নেওয়া)। লেখিকা আমাদের জানিয়েছেন যে, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে যে প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন অনন্ত বিহারী খীসা। স্বাধীনতার আগে ও পরে বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য বক্তৃতা-বিবৃতি বিচার করেও অনন্ত বিহারী খীসার বক্তব্যের সমর্থনে কোনো লাইন আমি অদ্যাবধি খুঁজে পাইনি। এমনকি এই মর্মে কোনো ইংগিতও পাইনি। এটি যদি শেখ মুজিবের চিন্তার একটি ‘স্তম্ভ’ হতো তাহলে কোথাও না কোথাও এর চিহ্ন (ঃৎধপব) থাকত। বরং এর বিপরীতেই তথ্য-প্রমাণের পাল্লা ভারী। শেখ মুজিব পূর্বাপর দেশের অনগ্রসর জাতি-গোষ্ঠী ও নৃগোষ্ঠী নিয়ে তার উন্নয়ন-বাসনা ব্যক্ত করেছেন, এবং আন্তরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ।
প্রথমত, যে সভার বরাত দিয়ে কথিত ‘বাঙালি হয়ে যেতে’ বলা হয়েছে তা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার এক মাস পরে। এর পরে ১১ এপ্রিল ‘খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। কয়েক মাস কাজের পরে কমিটি তৎকালীন বাংলাদেশ গণপরিষদে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধানটি উত্থাপন করে এবং অনেক আলাপ-আলোচনার পর সেটি ৪ নভেম্বর সংশোধিত হয়ে গৃহীত হয়। এখন দেখা যাক যে খসড়া সংবিধানে, গণপরিষদ বিতর্কে বা চূড়ান্তভাবে গৃহীত সংবিধানের পাঠে কোথাও পাহাড়ি জনগণকে ‘বাঙালি’ হয়ে যেতে বলা হয়েছিল কিনা বা সেরকম ইংগিত দেওয়া হয়েছিল কিনা। বা কেউ সেরকম ইংগিত দিয়ে থাকলেও তা গণপরিষদের অনুমোদন পেয়েছিল কিনা। সেরকম কিছু সংবিধানে থাকলে বা গণপরিষদ বিতর্কের প্রধান সুর হয়ে দাঁড়ালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার কথায় ও কাজে তা প্রতিফলিত হতো নিশ্চয়ই। কিন্তু তা কি আমরা দেখতে পাই? মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাহাত্তর সালের সংবিধানের গৃহীত চূড়ান্ত পাঠে সই করেছিলেন। শুধু সই করা নয়, এই সংবিধানের বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে তিনি সহমতও ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে গভীর বোঝাবুঝির কারণে তিনি আস্থা রাখতে পেরেছিলেন যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে যে সংবিধান তৈরি হয়েছে তারই পথরেখা ধরে লারমার স্বপ্নেরও বাস্তবায়ন ঘটবে তথা পাহাড়ি জনগণের জীবনের আমূল উন্নয়নও ঘটবে।

[ক্রমশ]