বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ (Bangladesh’s expanding middle-class)

middle_class_info

Prothom-Alo: সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন মধ্যবিত্ত
বাংলাদেশে দ্রুত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হচ্ছে। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিশাল অংশ চাকরি করে। তারা এখন ফ্ল্যাটে থাকে কিংবা জমির মালিক। তারা ইন্টারনেটও ব্যবহার করে। টাকাপয়সা রাখে ব্যাংক হিসাবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন মধ্যবিত্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মধ্যবিত্ত হবে। এ তথ্য বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস)। গবেষণাটি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। গতকাল বৃহস্পতিবার গবেষণার এ ফল প্রকাশ করা হয়। যাঁরা দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার (পিপিপি হিসাবে) আয় করেন, তাঁদের মধ্যবিত্ত হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এ হিসাবটি স্বীকৃত। বিআইডিএস এ গবেষণাটি করেছে ঢাকা শহরের ১২টি এলাকায়। গবেষণার নমুনার সংখ্যা ৮০৯। গবেষণাটি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বিনায়ক সেন প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যবিত্তের সেই হিসাবটি ২০১০ সাল ধরে করা হয়েছে। অতীতের একই প্রবণতা ধরে নেওয়া হলে ২০১৫ সালে এসে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী মোট জনগোষ্ঠীর সাড়ে ২২ শতাংশ হবে। বিস্তারিত ->

সমকাল (Samakal): ২০৩০ সালে মধ্যবিত্ত হবে ৩৩ শতাংশ
দেশে মধ্যবিত্তের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত দুই দশকে মধ্যবিত্ত জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৩ সালে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন প্রাক্কলন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএসের এক বছরের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে ‘বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের আকার ও প্রবৃদ্ধি’ বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন। বিস্তারিত ->

Financial Express: BIDS study reveals growing middle class BD’s dramatic success
There has been a significant rise in the share of middle class group in the country over the last one decade (1992-2000). If the trend continues, the middle income class will comprise about 25 per cent of the country’s total population in 2025 and 33 per cent in 2030. Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS) Researcher Director Dr Binayak Sen revealed the information while presenting a keynote paper on “Size and Growth of Middle Class in Bangladesh” at BIDS Research ALMANAC, 2014-2015. Read more ->

Daily Star: Bangladesh’s middle-class expanding
One-fourth, or 25 percent, of the total population will belong to the middle-class income category by 2025, thanks to greater access to education, finance and IT services, and private sector employment, a recent study found. At present, 20 percent of the population belongs to the middle-income category in Bangladesh in contrast to 24.1 percent in neighbouring India. Read more ->

Dhaka Tribune: BIDS: Middle-class people to reach 33% by 2030
The middle-class group is expected to stand at 33% of the country’s total population by 2030, says Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS). Over the last two decades, the country witnessed a remarkable rise in middle class group, it said, adding that if the trend continues, the country is expected to add 25% of its total population by 2025. It said only 9% of the population belonged to this category decades back and in 2010, this group accounted for 20%. BIDS Research Director Binayak Sen revealed the information in his keynote paper on “Size and Growth of Middle Class in Bangladesh” at the BIDS dissemination event on presentations from the BIDS Research Almanac 2014-2015, at BIDS yesterday. Read more ->

One-third population to be middle-class by ’33
The size of middle class population in the country may soar to one-third of the total population by the year 2033, which is now 20 percent, says a latest BIDS study. The study entitled: ‘Size and Growth of Middle Class in Bangladesh: Trends, Drivers and Policy Implications,’ published on Thursday, considered those in the segment whose per day income is 2 to 3 US dollars. Research Director at the Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS) Dr Binayak Sen, who conducted the study, said the middle-class size now more than doubled to 20 percent from 1990 level of 9 percent and it could soar to 25 percent by 2025 and to 33 percent by 2033, according to their assessment. Read more ->

আমি আশাবাদী (I am optimistic)

অর্থনীতির ক্ষেত্রে নতুন বছরটা ভালোই যাবে মনে হচ্ছে। এর বড় দিক হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এখন অনেক কম। সরকার যেহেতু তেলের মূল্য পুরোপুরি সমন্বয় করেনি, সেহেতু এ খাত থেকে আয় জমা হচ্ছে। স্থানীয় অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধিজনিত অর্থ সরবরাহে এই অর্থ কাজে লাগবে। অন্যদিকে রফতানি বাজারে অশুভ কোনো ছায়া দেখতে পাচ্ছি না। মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য যে আঞ্চলিক গোলযোগ হচ্ছে, তা অভিবাসনের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা সৃষ্টি করবে না।

দ্বিতীয়ত, গত দুই বছরের সঙ্গে তুলনা করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগে আস্থা ফিরতে সহায়ক হবে। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগের ঘাটতি কিছুটা পূরণ হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আর্থিক খাতে অনিয়মের মূলে আঘাত হানা যাবে কি-না! অনিয়মের রাশ টেনে ধরতে না পারলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়ে যাবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কার্যকর অর্থায়নের খুবই দরকার। এ খাতের উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করা গেলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তারা নতুনভাবে অবদান রাখতে পারবেন।

অর্থনীতিতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটা পালাবদল আসে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল একভাবে গেছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল অন্যভাবে যাবে। আমার মনে হয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি হবে আগামী কয়েক বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি বড় উৎস। এতদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন হয়েছে তুলনামূলক বেশি। পদ্মা সেতু এবং একে ঘিরে রাস্তাঘাট, রেলপথসহ অবকাঠামোর যে উন্নয়ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হবে, তা নতুন এক ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করবে। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের অনেক সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো হয়নি। বেসরকারি বড় উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ সেখানে যাচ্ছে। ওই এলাকা দিয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সমুদ্রকেন্দ্রিক ব্লু ইকোনমির নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সুতরাং ওই অঞ্চলে যে গুণগত পরিবর্তন আসছে, তা অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে।

অর্থনীতির সম্ভাবনা বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসুর সঙ্গে একমত। আমি মনে করি, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চীনের কাছাকাছি চলে যাবে। কারণ চীনের গতি শ্লথ হচ্ছে, আর আমাদের বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য এখন দরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ সেরে ফেলা এবং সম্ভাবনাময় বিশেষ এলাকার দিকে নজর দেওয়া। তা করতে পারলে খুব সহজেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি আট শতাংশে নিয়ে যাওয়া যাবে।

আরেকটি বিষয় বলা দরকার এবং তা হলো, মানব উন্নয়নের সাফল্য ধরে রাখতে হবে। বিশেষত শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির কাজে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যুবশক্তিকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে দেশের ভেতরে ও বিদেশে কর্মসংস্থানে গুণগত পরিবর্তন আসবে। এটা যে কতটা ফলদায়ক তার লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের জনশক্তি বিশেষত নারীরা বিদেশে কাজ পাচ্ছেন।
আমাদের মধ্যবিত্তের আকার গত দুই দশকে দ্বিগুণ হয়েছে। মধ্যবিত্তের আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এটা করতে হলে গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের মধ্যবিত্তের সমপর্যায়ে উন্নত শিক্ষা দিতে হবে। ইংরেজি মাধ্যমের বাইরে শিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে। গরিবের সন্তান দুর্বল মানের শিক্ষায় আটকে যাচ্ছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। মধ্যবিত্ত হতে গেলে গরিবদের সেবা খাতে আসতে হবে। কৃষি শ্রমিক হিসেবে থাকলে হবে না। সুতরাং কীভাবে গরিবকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত করা যায়, তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বাংলাদেশকে। আমি প্রত্যাশা করি, ‘দারিদ্র্য’ শব্দটি একদিন ইতিহাসে পরিণত হবে।

এমডিজির গতানুগতিক পন্থায় এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়

বিনায়ক সেনসহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশের সাফল্য এবং এসডিজিতে (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) প্রবেশ উপলক্ষে প্রথম আলোর সঙ্গে উন্নয়নের পথযাত্রা নিয়ে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সমতামুখী প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করছেন তিনি। এর আগে ছিলেন বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নাল ও বইপত্রে তাঁর ৫০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

প্রথম আলো : যাকে বলা হয় বাংলাদেশ প্যারাডক্স বা ধাঁধা—দুর্নীতি ও দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশের উন্নতি বিস্ময়কর। এমডিজির সাফল্যে জাতিসংঘের স্বীকৃতির লগ্নে এই ধাঁধাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
বিনায়ক সেন : এই স্বীকৃতির শুরুটা ২০০০–এর দশকে। আমি কিন্তু আরেকটু পেছনে থেকে আসতে চাই। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজির অগ্রগতি পরিমাপ করা হয় নব্বই সালের অবস্থার নিরিখে। অথচ নব্বই পর্যন্ত বহির্বিশ্বে ধারণা ছিল, বাংলাদেশ খুব একটা এগোচ্ছে না। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম যে ব্যক্তি এ ধারণাকে জোরের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেন, তিনি আবু আবদুল্লাহ। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের ২৫ বছর, একটি ইতিবাচক প্রেক্ষিত’ প্রবন্ধে তিনি দেখান, ওই ধারণা বেঠিক। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনার ভিত্তিতে তিনি দেখান সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাথমিকে ভর্তি, শিশুমৃত্যুর হারসহ আরও কিছু সূচকে মাথাপিছু আয়ের সাপেক্ষে বাংলাদেশ সম্ভাব্য অর্জনের তুলনায় বেশি আগুয়ান। এরপর ২০০৪ সালে ফরাসি অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ লিখলেন: বাংলাদেশ শোজ দ্য ওয়ে। তাঁর দাবি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে, বিশেষ করে মৌলিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ও অমর্ত্য সেনের যৌথ গ্রন্থ অ্যান আনসার্টেন গ্লোরি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশন-এ আরও পরিসংখ্যান দিয়ে দাবিটাকে তিনি জোরালো ভিত্তি দেন। সুতরাং ধারাবাহিক উন্নতির সমান্তরালে ধারাবাহিক স্বীকৃতিও আসছিল। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত হলেন। এতে আমি অন্তত বিস্মিত হইনি। ২০০১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের শুরুতেই আমরা কিন্তু এই সাফল্যের পূর্বাভাস দেখিয়েছিলাম। সুতরাং তিন দশক ধরেই বাংলাদেশের সাফল্যের পাণ্ডুলিপি রচিত হয়ে আসছে।
প্রথম আলো : এই তিন দশকের প্রচেষ্টা ও সাফল্যের ইতিহাসে অনেকগুলো সরকার ক্ষমতায় ছিল। বিভেদ সত্ত্বেও তার মানে প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা ছিল?
বিনায়ক সেন : তার মানে এমডিজি রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। যে-ই সরকারে থাকুক, তারা মনে করেছে এমডিজিতে আরও সাফল্য মানে জনগণের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা, আরও উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। এভাবে উন্নয়নের ফলাফল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠল। শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে এক সরকারের কর্মসূচি পরের সরকার বাতিল না করে বরং আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং সেটার বাহবা নেওয়ারও চেষ্টা করেছে। নব্বইয়ের পর কয়েকবার সরকার পরিবর্তন হলেও এই প্রতিযোগিতা বহাল থেকেছে। তবে সত্য যে, এই প্রচেষ্টার সূত্রপাত সত্তরের দশকে। বিশেষ করে ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পরে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এই উপলব্ধিতে আসেন যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য উৎপাদন ও নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। একটা আরেকটার সঙ্গে জড়িত। খাদ্য উৎপাদন না বাড়ালে খাদ্য-দারিদ্র্য কমবে না। আবার নারীশিক্ষার প্রসার না ঘটলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত হবে না। সুতরাং এমডিজি প্রবর্তনের আগেই নব্বইয়ের দশকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কতগুলো কর্মসূচি চালু হয়েছিল। যেমন আশির দশকে টিকাদান কর্মসূচি, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা নব্বই দশকে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু হয় আশির দশকের শেষে। এসবই প্রমাণ করে, অঘোষিতভাবে হলেও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটা সামাজিক চুক্তি হয়ে ছিল যে কিছু বিষয়ে আমরা অগ্রগতি ঘটাব। এটাই আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের অর্থনৈতিক মূল্যবোধ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই মূল্যবোধ আরও দৃঢ় হয়েছে।
প্রথম আলো : নব্বইয়ের দশকে একগুচ্ছ নতুন অর্থনৈতিক চালক, যেমন সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মসূচি, বাজার, এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ ইত্যাদির কী ভূমিকা?
বিনায়ক সেন : এ অর্জন একক চালিকাশক্তি দিয়েও হয়নি, এক পথেও হয়নি। সরকারি খাতের পাশাপাশি এনজিও খাতেরও সমান্তরাল অবদান ছিল। এনজিও-জিও সহযোগিতার যুক্তি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। অমর্ত্য সেন যে পাবলিক অ্যাকশনের কথা বলেন, তার মধ্যে সরকারের পাশাপাশি এনজিও, বৃহত্তর অর্থে স্থানীয় জনগণ ও সামাজিক উদ্যোগও আছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় পাবলিক অ্যাকশনের ধারণা আরও প্রসারিত হয়েছে। এখন সবার হাতে মুঠোফোন, গণযোগাযোগ নিবিড়। এই সুবাদে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়টা একজন স্বাস্থ্যকর্মীর যাওয়া না যাওয়ার ওপর এখন আর পুরোটা নির্ভরশীল নয়। জনবসতির ঘনত্ব বেশি থাকায় তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি, নারীশিক্ষা, ছোট পরিবার, পরিচ্ছন্নতার স্লোগান—এখন বাস-স্কুটারের পেছনে লেখা থাকতে দেখা যায়। একে বলা যায় দেখা থেকে শেখা।
প্রথম আলো : এমডিজি পূরণের পর কী কী ঘাটতি রয়ে গেল?
বিনায়ক সেন : তিনটি ক্ষেত্রে ঘাটতি চিহ্নিত করতে চাই। প্রধান হচ্ছে, পরিমাণে এগোলেও গুণগত মান অর্জিত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ভালো, কিন্তু সমাপ্তির হার ভালো না। শিক্ষার মানও ভালো না। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অষ্টম শ্রেণি পাস করলে ছেলেমেয়েরা পঞ্চম শ্রেণির জ্ঞান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। তার মানে যারা পঞ্চম শ্রেণির আগে ঝরে যাচ্ছে, কিংবা যারা শুধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যাচ্ছে, তারা তৃতীয় শ্রেণির পর্যায়ে পড়ে থাকছে। এটা গুণগত মানের প্রশ্ন। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আমরা প্রতিষেধকে সাফল্য অর্জন করেছি, কিন্তু সর্বজনীন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা চালু করতে পারিনি। এটা বেশি প্রযোজ্য গরিবদের বেলায়। এরপর আসে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সামাজিক অসাম্য। ডিএইচএস দেখাচ্ছে, তলার ১০ শতাংশের সঙ্গে উচ্চের ১০ শতাংশের মধ্যে এখনো প্রচণ্ড বৈষম্য বিদ্যমান। হাওর ও পার্বত্য দুর্গম এলাকায় সেবাগুলো যায়নি। সুশাসনগত সমস্যা, তথা দুর্নীতি ও দলীয়পনা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ স্তরেই কর্মসূচিগুলো থেমে গেছে।
প্রথম আলো : এমডিজির পর এসডিজি ঠিক করা হলো ১৫ বছরের জন্য। দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, এসডিজিতে লক্ষ্যমাত্রা বিমূর্ত ও কর্মপন্থা অবাস্তব।
বিনায়ক সেন : এমডিজির এই ঘাটতিগুলো এসডিজিতে অর্জনের লক্ষ্য হিসেবে রাখা আছে। এমডিজির আটটি লক্ষ্য ছিল, এসডিজিতে ১৭টি। এমডিজিতে দারিদ্র্য নিয়ে কথা ছিল, কিন্তু বৈষম্য নিয়ে কথা ছিল না। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে তিনটা দিকে আমি বিশেষভাবে উৎসাহী: যেমন ১০ নম্বর লক্ষ্যে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশের আয়বৃদ্ধির হার জাতীয় আয়বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হতে হবে। অর্থাৎ দরিদ্রতম ৪০ শতাংশের আয়বৃদ্ধি জাতীয় আয়বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়া দরকার। এই লক্ষ্যটা তাৎপর্যপূর্ণ। এর পাশাপাশি বলা হয়েছে টেকসই উন্নয়নের কথা। টেকসই উন্নয়ন বলতে সামাজিক সংহতিমূলক সামগ্রিক উন্নয়ন বোঝায়। আমরা অনেকেই এই চ্যালেঞ্জটাকে লক্ষ্য হিসেবে নেওয়ার জন্য পাঁচ-সাত বছর ধরে বলে আসছি। আমরা চাইছি আয়বৈষম্য, সম্পদবৈষম্য, ভোগবৈষম্য কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, তার পথনির্দেশ।
প্রথম আলো : আমরা এখন নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ, এ পর্যায়ে জনগণ তো জীবনযাপনের সংগতিপূর্ণভাবে উচ্চমান ও অধিকার দাবি করবে?
বিনায়ক সেন : বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০৩০-এর মধ্যে দারিদ্র্য ৩ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনতে পারলেই ধরে নেওয়া হবে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে ৩ শতাংশ জনসংখ্যাও কিন্তু বিরাট আকারের। এসডিজির ৪ নম্বরে বলা হয়েছে মানসম্পন্ন শিক্ষার কথা। তার মানে এমডিজির যে অসম্পূর্ণতা ছিল, এখানে সেটাকে লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইয়ের পদ্ধতি নেই। এখন পৃথিবীর প্রায় ৭০টির মতো দেশ আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের অংশ। ভারতের দুটি রাজ্য এর অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষার মানের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এ ধরনের আন্তর্জাতিক যাচাইব্যবস্থার অংশ করতে হবে। যখন বলছি যে আমরা নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরিত হয়েছি, তখন তো এসব মান অর্জন জরুরি। আবারও বলছি, মানের দিকটা অর্জিত হবে না, যদি এক নম্বর লক্ষ্য দারিদ্র্য নির্মূল এবং ১০ নম্বর লক্ষ্য আয়বৈষম্য কমিয়ে আনা না যায়।
প্রথম আলো : এমডিজি পূরণ হয়েছে, কারণ বিশ্বের দারিদ্র্যের বিপুল অংশের যেখানে বাস ছিল, সেই চীন একাই তা দূর করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের বেলায়ও ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরিত হয়েছে। তাই এমডিজি ও এসডিজির পুরোনো পদ্ধতি কতটা কার্যকর?
বিনায়ক সেন : পুরোনো পদ্ধতির কিছু কিছু কাজে লাগবে যেমন এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বা বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ। মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলেও খরচ বাড়াতে হবে। তেমনি দারিদ্র্য হ্রাস থেকে সম্পূর্ণ দূরীকরণ করতে চাইলেও বিপুল ব্যয় চাই। পুরোটাই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সম্পদের যথাযথ সমাবেশের ওপর। আগের তুলনায় অনেক বেশি দরিদ্র মানুষের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে বা তাদের সব সহায়তা দিতে হবে।
প্রথম আলো : পশ্চিমা সরকারগুলোর তরফে এমডিজিতে তাদের জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এসেছে প্রতিশ্রুতির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। দারিদ্র্য নিরসনে বৈশ্বিকভাবে বছরে যে ৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, তা কোথা থেকে আসবে?
বিনায়ক সেন : দেশীয় স্তরে বলতে পারি যে আমাদের ট্যাক্স-জিডিপির বর্তমান ১২ থেকে ১৩ শতাংশ দিয়ে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়। ন্যূনতম সুশাসন বজায় রেখে কীভাবে আমরা প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারি এবং আয়বৃদ্ধিকে যথাযথ করারোপ করে দরিদ্র মানুষের জন্য ব্যয় করতে পারি। অর্থাৎ মোটামুটি আইনশৃঙ্খলা, মোটামুটি সুশাসনের মাধ্যমে উন্নতির মাধ্যমে যে আয় সৃষ্টি হবে, তার ওপর আগের চেয়ে আরও বড় আকারে করারোপ করতে হবে। আর তা ব্যয় করতে হবে সামাজিক শিক্ষা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ খাতে। সুতরাং ধনীদের ওপর আগের ছেয়ে বেশি করারোপ করতে হবে। পাশাপাশি চেষ্টা করতে হবে ন্যূনতম সুশাসন থেকে পূর্ণ সুশাসন ও ন্যূনতম গণতন্ত্র থেকে পূর্ণ গণতন্ত্রে উত্তরণের। উন্নয়নের ধারা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেই তা করতে হবে। এভাবে গণতন্ত্র ও সুশাসনের চাহিদা যত বাড়বে, গণতন্ত্র ও সুশাসনের দাবিও তত বাড়বে। যেমন আমি আশা করছি আগামী ১৫ বছরে এসডিজি যখন বাস্তবায়িত হবে, তার মধ্যে তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আকার ও চাহিদা বাড়তে থাকবে। এই বর্ধিত চাপের কারণেই আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি গতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক হতে বাধ্য হবে। এই বাস্তবতাকে আমাদের রাজনৈতিক কর্তারা আমলে নেবেন আশা করি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ
বিনায়ক সেন : ধন্যবাদ।

প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হওয়া অবাস্তব নয়

Dr. Binayak Sen photoপ্রস্তাবিত বাজেট, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংক খাত, দুর্নীতি, সুশাসন, রাজস্ব সংগ্রহসহ ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সমতামুখী প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করছেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এই সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নাল ও বইপত্রে ৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম

প্রথম আলো : প্রস্তাবিত বাজেট কেমন হলো?
বিনায়ক সেন : বাজেট নিয়ে আশির দশকে, এমনকি ষাটের দশকেও সমালোচনা থাকত। এখন তা ছিদ্রান্বেষী নিন্দা ও লাগামছাড়া স্তাবকতা—এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, যেখানে যতটুকু ভালো হয়েছে, তা বলা উচিত। আর মন্দ হলে মন্দ বলতে হবে। একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, শক্তিশালী দিককেও দুর্বলতম বলা হচ্ছে। এই প্রবণতা আমার কাছে পরিহার্য। যেমন ধরুন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধরাটা খুবই বাস্তবোচিত হয়েছে। প্রথমত, প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে একটি স্বাভাবিক বছর পেলে ৭ শতাংশ অর্জন করা অবাস্তব নয়। দ্বিতীয়ত, ঘাটতি বাজেট ১৫ বছর ধরেই ৪-৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতিও ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে আশা করা যায় দেশে ভালো ফলন ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার কারণে।
প্রথম আলো : তিনটি কারণকে বিবেচনায় নিয়েই আপনার এত বড় আশাবাদ? সার্বিকভাবে দেশের মৌলিক বাজেট–শৃঙ্খলা কি ঠিক আছে?
বিনায়ক সেন : আমি বলব সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট–শৃঙ্খলা একরকম ঠিকই আছে। এখন যদি দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পারল না, তখন ব্যয়ের কাঠামো কাটছাঁট করতে হবে। আর এই কাটছাঁটের পরও যদি বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকে, প্রবৃদ্ধির হার যদি ৭ শতাংশ অর্জন করা যায়, মূল্যস্ফীতি যদি ৬ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে, তাহলে আমি এটাকে সময়োচিত ও বাস্তবোচিত বাজেটই বলব। এটা বলার পরই আমি মূল কথাটি বলতে চাইছি।
প্রথম আলো : সেটা কী?
বিনায়ক সেন : মূল কথাটা হচ্ছে আমরা এখনো আলোচনাটা সাধারণ মানের প্রবৃদ্ধির মধ্যেই আটকে রাখছি। সমতামুখী প্রবৃদ্ধি বা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলছি না। সমতামুখী প্রবৃদ্ধির তিনটি মাত্রা রয়েছে। একটা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্বশীলতা। প্রবৃদ্ধিকে ওঠা–নামা থেকে রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধিকে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে, অর্থাৎ এতে সমাজের সবার ও দেশের সব অঞ্চলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তৃতীয়ত হচ্ছে আয়বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ যত দিন যাচ্ছে, তত আমরা অধিক বৈষম্যমূলক সমাজ থেকে অপেক্ষাকৃত কম বৈষম্যমূলক সমাজে পরিণত হতে পারছি কি না। ২০১০ সালের আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, আয়বৈষম্যের সূচক বেশ উঁচু পর্যায়ে চলে গেছে।
প্রথম আলো : সমতামুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনে আমরা কতটুকু কী করতে পারছি?
বিনায়ক সেন : প্রথমটি মোটামুটি অর্জিত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্বশীলতা অর্জনে ধারাবাহিকতা রয়েছে আমাদের। অনেকেই একে ৬ শতাংশের ফাঁদ বলছেন, কিন্তু আমি ‘ফাঁদ’ বলতে রাজি নই। একনাগাড়ে প্রায় এক দশক ধরে ৬ শতাংশ হার অর্জনের দেশ খুব বেশি নেই। এক দশকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক সংকটও তৈরি হয়েছে। সবকিছুর পরও স্থায়িত্বশীলতার নিক্তিতে আমাদের অর্জন বেশ ভালোই বলা যায়।
প্রথম আলো : বাকি দুটির অবস্থা তাহলে ভালো নয়?
বিনায়ক সেন : না, সেটা না। যেমন অংশগ্রহণমূলক দিক থেকে আমি বলব আংশিক সাফল্য এসেছে। দুই দশক আগেও শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ১৫ শতাংশ। এখন ৩৩-৩৪ শতাংশ। এটা ৬০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে প্রবৃদ্ধি যেমন ত্বরান্বিত হবে, আয়ও বাড়বে। আবার যুবশক্তির মধ্যে পোশাক ও কৃষি খাতের অদক্ষ-আধা দক্ষ শ্রমিক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান যথেষ্ট। কিন্তু স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ থেকে সাফল্য পাইনি। কারণ, আমাদের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার সব কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে চালিত। এবারের বাজেট বক্তব্যে অবশ্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে বণ্টনবৈষম্য দূর করার ইঙ্গিত রয়েছে। স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে একটা আলাদা কৌশলপত্র হওয়ার কথা। সেটা যদি সত্যি হয়, এবার থেকেই যেন বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ স্থানীয় সরকারের জন্য রাখা হয়। ভারতের কেরালায় যা আছে এক-তৃতীয়াংশ।
প্রথম আলো : সে হিসাবে বাজেটের মোট আকার থেকে স্থানীয় সরকারের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিচ্ছেন?
বিনায়ক সেন : হ্যাঁ। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জন্য থাকতে পারে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা থাকতে পারে নগরাঞ্চলের জন্য। এতে লাভ যেটা হবে, প্রতিবছর বাজেট বাস্তবায়ন করতে না পারার যে সমালোচনা আছে, সেটা দূর হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) যতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে না, ততটুকু বরাদ্দ দিলেও একটা কাজ হবে। আর তাতে দরিদ্র অঞ্চল, বিশেষ করে হাওর, লবণাক্তপ্রবণ, বন ও পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে।
প্রথম আলো : বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছু বললেন না?
বিনায়ক সেন : বাজেট বক্তব্যে এটি প্রায় অনুপস্থিত। দারিদ্র্য দূরীকরণের কথা বলা হলেও আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্য দূরীকরণ নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। আয়বৈষম্য ও ভোগবৈষম্যের তুলনায় বেশি হারে বাড়ছে সম্পদবৈষম্য। সম্পদবৈষম্যকে যদি আঘাত করতে হয়, তাহলে সম্পদের ওপর আয়কর সারচার্জ সংগ্রহের বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করতে হবে। বড় দুর্বলতা হলো সম্পদের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে না। ভিত্তি ধরা হচ্ছে সম্পদ ক্রয়মূল্যকে, ন্যায্য বাজারমূল্যকে নয়। ফলে মাত্র ১০ হাজার লোক এই আয়কর সারচার্জ দিচ্ছেন। বাংলাদেশে দুই কোটি টাকার ওপরে সম্পদের মালিক মাত্র ১০ হাজার লোক—এটা অবিশ্বাস্য।
প্রথম আলো : সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন থেকে সরকার কীভাবে লাভবান হতে পারে?
বিনায়ক সেন : এতে রাজস্ব আয় বাড়বে, যা বৈষম্যহীন প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। উদাহরণস্বরূপ যদি বলি কয়েক বছরে দেশে মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে। বিশেষ করে নগরাঞ্চলে। তাঁদের কাছ থেকে আয়কর সারচার্জ এবং/অথবা প্রত্যক্ষ সম্পদ-করের মাধ্যমে (যা এখনো বাজেটে নেই) অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা বেশি আয় করা সম্ভব। তবে দুই বছর ধরেই একটি ভালো দিক লক্ষ করছি। এখন প্রত্যক্ষ বা আয়করকে রাজস্ব সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ সমতামুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনেরই উদ্যোগ। পোশাকশিল্পসহ প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি খাতগুলো থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর ১ শতাংশ হারে কর বসানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা প্রবৃদ্ধিকে সমতামুখী করবে। আর শিশু-শিল্প হলে কর-রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যারা ভালো প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, তাদের থেকে কিছুটা আয়কর আদায় করা জরুরি।
প্রথম আলো : কিন্তু মানুষের প্রথম চাওয়া হচ্ছে অবকাঠামো উন্নয়ন ও যানজট নিরসন। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?
বিনায়ক সেন : প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে—আমাদের এখন সে ধরনের অবকাঠামো দরকার। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেয়ে বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাটাও বড় কথা। মানুষ নগরমুখী হচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা মোট জনগোষ্ঠীর ৪৫ শতাংশ হয়ে যাবে। তাদের সমস্যার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। আগে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ছিল কৃষি অর্থনীতি ও রপ্তানি, এখন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে হবে নগর অর্থনীতি ও রপ্তানি। ফলে নগরে ও নগরবাসীর জন্য এখন বেশি হারে বিনিয়োগ করতে হবে। যানজট নগরবাসীর কর্মজীবনের বড় একটা সময় খেয়ে ফেলছে। বাজেটে যানজট নিরসনে বা নগর অর্থনীতি উন্নয়নে তেমন কোনো কৌশলগত নির্দেশনা নেই। ঢাকার বাইরে শহরগুলোর অবকাঠামোগত পরিবেশ আরও খারাপ, অথচ শহরেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি করে জড়ো হচ্ছে। আর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) পদ্ধতির একটা উদ্যোগ সরকার নিলেও এর কোনো ফল দেখা যায়নি। পিপিপিতে ৪৩টি প্রকল্প নিয়ে অর্থমন্ত্রী আর জানালেন না কোনটির কী হাল? বিদ্যুৎ যেমন জাতীয় তাগিদ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, অবকাঠামো খাতেরও একই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
প্রথম আলো : তাহলেই কি সমতামুখী প্রবৃদ্ধি আসবে?
বিনায়ক সেন : না। সমতামুখী প্রবৃদ্ধির জন্য আরও দরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ভালো বরাদ্দ। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন, প্রয়োজনের ধারে-কাছেই তিনি যেতে পারেননি। স্বাস্থ্য খাতেরও একই অবস্থা। এ দুই খাতে বরাদ্দের অপ্রতুলতায় বিস্মিত না হয়ে পারি না। পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকেরা মাসে ৩০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে রাজি থাকলেও তাঁদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা পলিসি চালু করা যায়নি।
শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিও রয়েছে। যেমন মাদ্রাসাশিক্ষা থেকে সবচেয়ে কম ফল (রিটার্ন) পাওয়া যায়। অথচ মাদ্রাসাশিক্ষা-ব্যবস্থায় যদি কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যায়, ভালো ফল পাওয়া যাবে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় আমাদের বুয়েট ভালো, ঢাকা মেডিকেল কলেজও (ডিএমসি) ভালো। দরকার ছিল বুয়েটের মতো আরও পাঁচটা ‘বুয়েট’ করা, ডিএমসির মতো পাঁচটা ‘ডিএমসি’ করা। ভারতে যেমন করে প্রথম সারির বেশ কিছু আইআইএম, আইআইটি ও মেডিকেল কলেজ আছে। সেদিকে আমরা গুরুত্বই দিচ্ছি না। মোটের ওপর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আগামী ১০ বছরে প্রধান গুরুত্ব দিতে হবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিকার্ডো হাউসম্যান সম্প্রতি হিসাব করে বলেছেন, শ্রমশক্তির মান গড়ে তিন বছর স্কুলশিক্ষা থেকে আট বছর স্কুলশিক্ষার মানে উত্তীর্ণ করতে পারলে জিডিপির আকার শুধু এ কারণেই দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।
প্রথম আলো : আমাদের আর্থিক খাত কি ঠিকভাবে চলছে? দুর্নীতি কী করে কমবে, সুশাসনের কী হলো?
বিনায়ক সেন : খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কর-রেয়াত এবং ব্যাংকঋণ—এ দুই বিকল্পের ক্ষেত্রে একজন শিল্পপতি যদি দেখেন ব্যাংকঋণ ফেরত দিতে হচ্ছে না, তখন কর-প্রণোদনা কাজ করবে না। কর-প্রণোদনার নীতি আর্থিক-প্রণোদনার নীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আর্থিক খাতে এখনো শৃঙ্খলার অভাব। উচ্চ খেলাপি ঋণের হার থেকে আমরা বের হতে পারছি না। উচিত হবে সোনালী ব্যাংককে হাতে রেখে বাকিগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া। কেননা, সরকারি খাতেই রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ বেশি। অন্যদিকে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, বেসরকারীকরণের পর তা যেন গুটি কয়েক মুখচেনা শিল্প-ব্যাংক পরিবারের কাছে চলে না যায়।
দুর্নীতি হ্রাস বা সুশাসন চালু সরকার চাইলে অনেকখানিই পারবে। বলছি না যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু খাতভিত্তিক সুশাসন তো আমরা চাইতেই পারি; অন্তত কয়েকটি খাতে। আর দুর্নীতির মাধ্যমে যারা টাকা কামাচ্ছে, তাদেরও ধরা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর যৌথভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারীদের (টিআইএন) যাবতীয় তথ্য মিলিয়ে নজরদারি করলে অবৈধ উপায়ে টাকা কামানো, কর ফাঁকি দেওয়া ও খেলাপি হওয়া—এসব রোধ করা অনেকখানিই সম্ভব।
প্রথম আলো : করদাতার সংখ্যা সরকার তেমন বাড়াতে পারছে না। কোনো পরামর্শ?
বিনায়ক সেন : ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে। আরও চার কোটি মানুষ আছে দারিদ্র্যঝুঁকিতে। বাকি থাকল আট কোটি মানুষ, তথা ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবার (পরিবারপ্রতি পাঁচজন হিসাবে)। পরিবারে যদি একজন আয় করেন, তাহলেও আয়করের আওতায় আসতে পারেন ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যক্তি। এর মধ্যে শহরবাসী ৫০ লাখ। অথচ বর্তমানে আয়কর দেন কেবল ১০ লাখ লোক। শুধু নগরমুখী করেও প্রায় পাঁচ গুণ আয়করদাতা বাড়ানো সম্ভব। তাই বলব যে উপজেলা পর্যায়ে কর অফিস সম্প্রসারিত না করে শহর পর্যায়ে এর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হোক।
প্রথম আলো : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কীভাবে দেখছেন?
বিনায়ক সেন : নদী আমাদের প্রাণ, ট্রানজিট তাঁদের প্রাণ। কৌশলগত স্বার্থের দিক থেকে আমরা তাঁদের পানির বিনিময়ে ট্রানজিট দিতে পারি।
প্রথম আলো : আপনাকে বাজেট প্রণয়নের দায়িত্ব দিলে কোন খাতে অগ্রাধিকার দিতেন?
বিনায়ক সেন : অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। অবশ্যই সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে। অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বের কথা যদি বলি, দেখুন, এক যমুনা সেতুর কারণে আশির দশকের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ থেকে আমরা ২০০০ সালের পর ৫-এর ওপরে উঠেছি। পদ্মা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন হলে নিশ্চয়ই ৭-এর ওপরে ওঠা সহজ হবে। আর নীল (সমুদ্র) অর্থনীতি চাঙা করতে পারলে তো কথাই নেই।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
বিনায়ক সেন : ধন্যবাদ।

চায়ের পেয়ালায় ঝড় (Tempest in a Teacup)

বিনায়ক সেন

এবারের বাজেট যে পরিবেশে দেওয়া হচ্ছে তা সম্ভবত বাজেটের আলোচনার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৫ জানুয়ারির নিরুত্তাপ নির্বাচন অলক্ষ্যে থেকে বাজেট নিয়ে তর্ক-বিতর্কের পরিবেশের ওপর এক ধরনের নিরুৎসাহের সৃষ্টি করেছে।
budget
সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে যে সরকার গঠিত হতো, সেই সরকারের প্রথম বাজেট ও বর্তমান বাজেটের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে কোথায় যেন একটা নৈতিক ফাঁক থেকে গেছে। এই রাজনৈতিক ছন্দপতনের প্রভাব বাজেট আলোচনার ওপরও পড়তে বাধ্য।

৬ শতাংশ থেকে উত্তরণ কি সম্ভব? :বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তার নিজস্ব গতিশীলতা নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বাজেটের আকার-প্রকার যা-ই হোক, তা এই গতিশীলতার ক্ষেত্রে খুব একটা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটাতে পারবে না। এ দেশের কৃষি খাতকে ধরে রেখেছে বাংলার কৃষক, রফতানি খাতকে ধরে রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিক আর রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ক্ষুদ্র ঋণ খাতের উত্তরোত্তর প্রসার গ্রাম ও শহরের নিচুতলার অর্থনীতিকে সেবা, পরিবহন ও ক্ষুদ্র বাণিজ্য খাতের মধ্য দিয়ে প্রবৃদ্ধিমুখী করে রেখেছে। এ অর্থনীতি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও পণ্ডিতরা চায়ের পেয়ালায় ঝড় তুলবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত পাঁচ বছরে এ অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৬.২ শতাংশ, না হয় কমিয়েই বলি_ মোটা দাগে ৬ শতাংশ। আরেকটা যমুনা সেতুর মতো পদ্মা সেতু না হলে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগ স্থাপিত না হলে, গভীর সমুদ্র বন্দর না হলে, ঢাকায় মেট্রোরেল না হলে, আন্তঃশহর রেলব্যবস্থা জোরদার না হলে, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবৃদ্ধির হারকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা যাবে না। সুশাসন নিয়ে যত কথাই বলি না কেন, ম্যাক্রো-কাঠামো নিয়ে যে সূক্ষ্ম বিচারই প্রয়োগ করি না কেন, রাজস্ব কাঠামোয় যত বৈপ্লবিক পরিবর্তনই আনি না কেন, কিছুতেই কিছু হবে না_ যদি ভৌত অবকাঠামোগত খাতে একটি বড় ধরনের ‘ধাক্কা’ না আসে। বাকি কাজটা জনগণ সুশাসনের অভাবের মধ্যেও করে নিতে পারবে। নিজেদের দারিদ্র্য কমাতে পারবে।

স্থানীয় সরকারের প্রসঙ্গ :এবারের বাজেটে স্থানীয় সরকারের ভূমিকাটি পুনরায় জোরেশোরে উপস্থাপিত হয়েছে। বর্তমানের কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য চাই নিচের দিকের স্থানীয় সরকারের ওপর অধিকতর ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ। কিন্তু বাজেটে এটা করার জন্য পূর্বশর্ত আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এর জন্য ‘দক্ষ ও প্রশিক্ষিত আমলাতন্ত্রের’ প্রয়োজন হবে। আমার মতে, ‘বিশেষায়িত আমলাতন্ত্রের’ জন্য অপেক্ষা না করে এখনই ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন। অন্তত ১০ শতাংশ বাজেট-বরাদ্দ সরাসরি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের কাছে ন্যস্ত করা যেত। এতে করে স্থানীয় সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করে স্থানীয় পরিষদের পক্ষে স্থানীয় প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হতো, যা কেবল এডিপির মাধ্যমে সমাধান করা কঠিন। ভূমি মালিকানা সনদ এবং ভূমি জরিপ ও রেকর্ড সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শহর এলাকায় ভূমি, গৃহায়ন বা সম্পদের ওপর কোনো জরিপ করার তাগিদ দেখা যায়না বাজেটের মধ্যে। গ্রামের তুলনায় শহরে জমি বা সম্পত্তির ওপরে মালিকানার বণ্টন আরও অসম। এটার সঙ্গে শহর এলাকায় সম্পত্তি কর বসানোর প্রশ্নটিও জড়িত। গ্রামের ক্ষেত্রে ভূমি মালিকানা সনদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিত্তহীন ভূমিহীনদের মাঝে খাস জমি বণ্টনের কথা উচ্চারিত হয়নি বা এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি কী করে আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে উন্নীত করা যাবে, সে নিয়ে কোনো দুর্ভাবনা নেই।

সম্পদ আহরণ তথা অর্থায়নের প্রশ্ন :বাজেটে যথার্থভাবেই স্থানীয়ভাবে সম্পদ আহরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ কর, বিশেষত আয়করের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিত্তশালীরা বেশি হারে আয়করের ওপর ‘সারচার্জ’ দেবেন, এটাও ঠিক আছে সুষম উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু এ দেশে এখনও ‘সম্পদ কর’ (ওয়েলথ ট্যাক্স) নেই। যেমনটা আছে পাশের দেশ ভারতে বা পাশ্চাত্যের উন্নত দেশে। এটা বাস্তবায়িক হলে অনায়াসে ১০০০-২০০০ কোটি টাকা আহরণ করা যেত। আয়করের সারচার্জের ক্ষেত্রেও সম্পত্তির মূল্যায়নে ‘ফেয়ার মার্কেট ভ্যালু’ প্রয়োগ করা উচিত ছিল। তবে শুধু স্থানীয় উদ্যোগে সম্পদ সমাবেশ করাই যথেষ্ট নয়। আমরা এখনও স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়েছি। আরও কিছুদিন সেই তালিকায় থাকব। সে ক্ষেত্রে কম সুদে বৈদেশিক সাহায্য জোরদারভাবে সংগ্রহের প্রতি আমাদের আরও সচেষ্ট হওয়া উচিত।

মধ্যবিত্তের অর্থনীতিতে উত্তরণ চাই :সবশেষে, মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে একটা কথা বলতে চাই। আমরা শুধু মধ্য আয়ের দেশ নয়, মধ্যবিত্তের দেশে পরিণত হতে চাই। কেবল ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করে এটা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী; দরকার উন্নত মানের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থা। সংস্কৃতি খাতে যত ব্যয় হয়েছে, তার সিকিভাগও ব্যয় হয় না এ দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে। ‘আইসিটি’ আর বিজ্ঞান গবেষণা এক জিনিস নয়। শিক্ষা খাতে তাই ব্যয় বরাদ্দ আরও বেশি হারে বাড়ানো প্রয়োজন। ভারতে যেমন বিশ্বখ্যাত উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান (যথা_ আইআইটি এবং আইআইএম) রয়েছে, সে রকম প্রতিষ্ঠান সামান্য সরকারি সহায়তা পেলে আমাদের দেশেও গড়ে উঠতে পারে। বস্তুত পিপিপির জন্য উঁচু মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা একটি জরুরি বিবেচনা হতে পারে। এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলে আগামী ১০ বছরে আমাদের উচ্চশিক্ষার মান শুধু নয়, আমাদের আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের চিত্রটাই আমূল বদলে যাবে। একটি মধ্যবিত্ত অর্থনীতি নির্মাণের জন্য এটি অবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। এ ব্যাপারে এ বাজেটের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আশা করেছিলাম।

Original article at Samakal here.

নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু করার বিকল্প নেই

ড. বিনায়ক সেন, অর্থনীতিবিদ। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকে সিনিয়র ইকোনমিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএনডিপিসহ বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটির সদস্য (১৯৯৭-২০০১), সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশনের সদস্য (২০০২-০৩।) বাংলাদেশের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র (আইপিআরএসপি) প্রণয়নে অন্যদের সঙ্গে ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। উন্নয়ন গবেষণায় ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’, ‘জন ক্ষমতায়ন’, ‘নৈতিকতা ও উন্নয়ন’ ইত্যাদি বিষয় তাঁর আগ্রহ ও ভাবনার জায়গা। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক বিষয় নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রতিচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ

প্রথম আলো : অর্থনীতির জন্য বড় বড় ঘটনা যেগুলো, যেমন পদ্মা সেতু প্রকল্প, জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাত, হল-মার্ক, শেয়ার মার্কেটের মতো ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ এসব দ্বারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত।

বিনায়ক সেন : এই পরিপ্রেক্ষিতে কৌটিল্য বলেছিলেন, যাঁরা তত্ত্বজ্ঞানী হয়েছেন, তাঁদের সমদর্শী হওয়া চাই। গ্লাসটা যে অর্ধেকের বেশি ভর্তি, সেটাও দেখতে হবে। যে বড় বড় উপসর্গের কথা বললেন, সেগুলো এই সরকারের শাসনকালের নেতিবাচক দিক। কিন্তু কোনো শাসনামল বিচারের প্রচলিত রীতি হলো, সেই আমলে প্রবৃদ্ধির হার কেমন ছিল? দারিদ্র্য দূরীকরণ, আয়বৈষম্য কমানো, সামাজিক সেবা সম্পর্কেও বলতে হবে। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে পশ্চিমা জগৎসহ চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধির হারও কমে আসে। বাংলাদেশ এই সময়ে ৬ শতাংশের সামান্য ওপরে প্রবৃদ্ধিশীল ছিল। এটা উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশের ওপরে। বৈশ্বিক স্তরেও বাংলাদেশের সূচক ওপরে ছিল। এ সময়ে রেমিট্যান্সের অব্যাহত প্রবাহ অবকাঠামো নির্মাণে কাজে লেগেছে, রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি বিশেষত গার্মেন্টসে যা কর্মসংস্থান করেছে, খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতির কারণে খাদ্য আমদানি কম করতে হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি শক্ত পর্যায়ে এসেছে। মজুরি অনেক বেড়েছে। শহরের ইনফরমাল ব্যবসা ও সেবা খাতও আগের থেকে শক্তিশালী। আর এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেছে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে। প্রথম দুই বছরে মুদ্রানীতি সংকট সৃষ্টি করলেও গত এক বছরে সংযত নীতি নেওয়ার সুফলও সমাজে পড়েছে।

প্রথম আলো : কিন্তু প্রবৃদ্ধির চরিত্র নিয়েও কথা থাকে। বৈষম্য এবং সামাজিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় বেড়েছে। আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক ভিত্তিটাই তো দাঁড়িয়ে আছে সস্তা শ্রম ও বিল-নদী-বন তথা প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠনের মাধ্যমে।

বিনায়ক সেন : প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, একই সঙ্গে সমাজে তীব্রভাবে আয়বৈষম্যও বাড়ছে। এখন আয়বৈষম্যের জিনি সূচক ৪৮-৫০ শতাংশ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আয়বৈষম্যের সূচকের চেয়েও বেশি। প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও আয়বৈষম্য বাড়া কেন মানুষ মেনে নিচ্ছে? না মানলে এই প্রবৃদ্ধি তো টেকসই হতো না। দুটো কারণ কাজ করছে মনে হয়, আপেক্ষিক বৈষম্য বাড়লেও অ্যাবসলিউট বৈষম্য কমছে। দুই দশকে চরম দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর মাধ্যমে মানুষ কিছুটা সান্ত্বনা পাচ্ছে। আমাদের দেশ কিন্তু ভারত বা পাকিস্তানের মতো আদিতে অতি বৈষম্যপরায়ণ নয়। এখানে বর্ণ, গোত্র, ধর্ম, জাতিসহ বিভিন্ন রকম বিভাজনের তীব্রতা অনেক কম। বৈষম্য কমার পাশাপাশি গত দুই দশকে সামাজিক গতিশীলতাও বেড়েছে। ১০ বছর আগে যারা চরম দরিদ্র ছিল, ২০১২ সালে তাদের ৫০ শতাংশ দরিদ্র হয়েছে, ১০ বছর আগে যারা দরিদ্র ছিল, তাদের ৩৫ শতাংশ ছিল, তারা এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে গিয়েছে, ১০ বছর আগে যারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ছিল, তাদের ১০ শতাংশ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে গিয়েছে। সামগ্রিকভাবে শুধু দারিদ্র্য সূচক বা এমডিজি সূচকে নয়, সচলতার সূচকেও অর্জন হয়েছে। এসব অর্জনের কারণে আয়বৈষম্য বাড়া সত্ত্বেও আপাতত মেনে নেওয়ার একটা প্রবণতা বাড়ছে।

প্রথম আলো : এটা কি একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও দুর্নীতির বিস্তার ঘটাচ্ছে না? দুর্নীতির মাধ্যমে ভালো থাকার চেষ্টা করে পরিবর্তনের চেষ্টা থেকে সরে যাচ্ছে কি না?
বিনায়ক সেন : সম্প্রতি ভারতের সমাজবিজ্ঞানী আশীষ নন্দী এ ব্যাপারে একটা মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি ইজ আ ইকুলাইজিং ফোর্স। দরিদ্রের কাছে নেটওয়ার্কিংয়ের অস্ত্র নেই, তার আছে দুর্নীতির অস্ত্র। যারা আমাদের মতো উচ্চ-মধ্যবিত্ত, যারা নেটওয়ার্কিং সোসাইটির মধ্যে বাস করে, তারা দুর্নীতি না করে ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়ানো যায়, ভালো চাকরি পাইয়ে দেওয়া যায়, ওমুক ক্লাব তমুক ক্লাবে জড়িত হওয়া যায়, ভালো থাকা যায়। দরিদ্রদের পক্ষে দুর্নীতিই হচ্ছে আয়-উপার্জনের বাইরে একমাত্র অবলম্বন। যাঁরা শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত সমাজের কথা বলেন, তাঁদের আমি ভয় পাই। একমাত্র স্ট্যালিনিজমের মাধ্যমেই শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া গিয়েছিল। সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করা হলেও দুর্নীতিকে লেশমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। বিদেশিরা আমাদের চাবুক মারার একটা অস্ত্র হিসেবে দুর্নীতির অভিযোগকে ব্যবহার করে। অনেকে বলেন, দুর্নীতি না হলে বাংলাদেশে আরও প্রবৃদ্ধি হতো। এটা একটা মিথ। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতির সঙ্গে প্রবৃদ্ধির হারের কোনো সম্পর্ক নেই। যেটার সম্পর্ক আছে তা হলো মাথাপিছু আয়ের। অর্থাৎ আপনি যখন পর্তুগালের মতো স্তরে মাথাপিছু আয় তুলতে পারবেন, তখন আপনার সমাজ মোটামুটিভাবে দুর্নীতিমুক্ত সমাজে পরিণত হবে। আমাদের উন্নয়ন বাড়ানোয়, অবকাঠামো প্রতিবন্ধক আছে, সেসব ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক হিসেবে আমাদের বলতেই হবে। আমি হার্টের অসুখে হাসপাতালে গিয়ে দেখি যন্ত্র কাজ করছে না, তার বিরুদ্ধে বলতেই হবে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতিকে জড়িয়ে বলা ঠিক নয়।

প্রথম আলো : প্রবৃদ্ধি বাড়লে তো বিনিয়োগও বাড়ার কথা। কিন্তু ভোগবিলাসে অথবা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে পুঁজি। এটা কেন?

বিনায়ক সেন : গত ৩০ বছরের বিনিয়োগ ঋণের সঙ্গে মধ্যমেয়াদি ঋণের সম্পর্ক বিচার করেন তাহলে দেখবেন, সেগুলো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োজিত হয়নি। এর পেছনে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিও কিছুটা দায়ী। এ কারণে পুঁজি চলে গেছে রিয়েল এস্টেটে বা ভোগবিলাসে। বিনিয়োগের ৩০ বছরের সিরিজ বিচার করলে দুটো উল্লম্ফন দেখতে পাব, আশির দশকে বিনিয়োগের হার জিডিপির অনুপাতে ছিল ১২-১৩ শতাংশ। নব্বই দশকে এটা লাফিয়ে ১৭-১৮ শতাংশে উঠে যায়। নব্বই দশকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেশ কিছু স্থিতিশীলতার নীতি নেওয়া হয়। যমুনা সেতু নির্মাণও বিনিয়োগের হার বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় উল্লম্ফন হয় ২০০৩-০৪ দিকে। তখন ১৭-১৮ থেকে বেড়ে ২৩-২৪ শতাংশে চলে যায়। সেই অবস্থা এখনো বিরাজ করছে। যাঁরা বলছেন নীতিমালার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না, তা ঠিক নয়। এর জন্য চমৎকার অনুঘটক ছিল রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং রপ্তানিমুখী গার্মেন্টের বিকাশ। ২০০৫-এ কোটা উঠে যাওয়ার পরও এই শিল্প বিকশিত হয়। এখন আমাদের প্রয়োজন আরেকটা বড় কোনো চালকের উদ্ভব। সেটা হতে পারে রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টের মতো আরেকটা বড় কোনো ধাক্কা। সেটা ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলিং সেক্টরে হতে পারে, তথ্যপ্রযুক্তি হতে পারে। এখন আমাদের চাই আরেকটা নতুন খাত। এ রকম ঘটনা ছাড়া বিনিয়োগ ৩০-৪০ শতাংশে যেতে পারব ভারতের মতো। ভারতেও এভাবে বহুমুখী বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগ বেড়েছে। খেয়াল করার বিষয়, আমাদের অর্থনীতিবিদেরা কিন্তু গার্মেন্ট খাত কিংবা প্রবাসী শ্রম খাতে সাফল্যের কোনো অনুমান আগাম করতে পারেননি। আমার মনে হয়, এ রকম তৃতীয় একটি খাত হয়তো আমাদের অগোচরে বিকশিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার ও পরিকল্পনাবিদদের উচিত সেই সম্ভাবনাটা খুঁজে বের করা।

প্রথম আলো : জ্বালানি ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থে দুর্নীতির পাশাপাশি পাবলিক সেক্টরকে প্রাইভেট মুনাফার জন্য সাজানোর ভুল নীতি আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। যেমন কুইক রেন্টালের কথা বলা যায়। দিনের পর দিন সংকটের সুরাহা না করে একটা যেনতেন সমাধান গিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কী বলবেন?

বিনায়ক সেন : এসব সমস্যা গত দুই দশক ধরে জমে হয়েছে। কুইক রেন্টাল সমাধান নয়। কিন্তু আপৎকালীন এই ব্যবস্থারও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুফল আছে। গার্মেন্ট শিল্প, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতো কি না, মেপে মেপে বলা উচিত। তবে কুইক রেন্টালের পাশাপাশি অন্যান্য স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগও পাশাপাশি শুরু করা উচিত ছিল। বিকল্প নিয়ে উদ্যোগ অনেক দেরিতে আসছে বা আসেইনি। এর দায়ভাগ গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা তার আগের বিএনপি সরকারও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সমাধান নিয়ে উদ্যোগী হননি। উচিত ছিল নাগরিক সমাজ, অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনেক আগেই বসা। তা করা হলে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে থাকত। এই খাতে ন্যূনতম পরিচালন ক্ষমতার প্রমাণ আমরা রাখতে পারিনি। অন্যদিকে দুর্নীতি হয় বলে বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনো বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি। অন্যদিকে নিজেরাও গ্যাস ও জ্বালানি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে পারিনি। মধ্য আয়ের দেশের কাছাকাছি যেতে হলে বাস্তবোচিত জ্বালানি নীতি এখনই নিতে হবে।

প্রথম আলো : বিশ্বব্যাংক তো সরে গেল। আপনি বেশ আগে থেকেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কিসের ভরসায়?

বিনায়ক সেন : নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা, যেটি এক বছর আগে বলেছিলাম; তখন নেওয়া গেলে আরও ভালো হতো। সরকার উদ্যোগ নিয়েও পিছিয়ে যায়। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরে আমরা একটা সেতু নির্মাণ করতে পারব না, তা নয়। আমাদের বিশেষজ্ঞ আছেন। আর অর্থ, যা প্রয়োজন, তা খুব বড় নয়। এক বিলিয়ন ডলার বা আট হাজার কোটি টাকা স্থানীয় মুদ্রায়, আর দুই বিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রায়। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাটি আজ থেকে সাত-আট মাস আগে বণিক বার্তাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলাম, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরবে না এবং নিজস্ব অর্থায়নেই এটি নির্মাণ করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এটি বড় কিছু নয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে পাঁচ বছরে, অর্থাৎ দুই বিলিয়ন ডলার আমাদের একসঙ্গে ব্যয় করতে হবে না। এই পরিমাণ অর্থ তিন মাসের আমদানি-ব্যয়েরও কম। প্রতিবছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রার জোগান দিতে হবে। বাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ‘ডলার বন্ড’ ছেড়ে সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানে ৬ থেকে ৮ শতাংশ সুদ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। বিদেশি মুদ্রার ৫০ শতাংশ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সহজেই জোগানো যায়। বতর্মানে আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স-প্রবাহও বেশ। এ বছরে আমদানি ব্যয়ও ছিল কম। ফলে রিজার্ভ থেকে ফিবছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা মোটেই কঠিন নয়। প্রবাসী অনেক বিশেষজ্ঞ ও বসবাসকারী আমাকে বলেছেন, ২-৩ শতাংশ সুদ দিলেই ডলার বন্ড বিক্রি করা যাবে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সুদ পাওয়া যায় দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে ২-৩ শতাংশ সুদ ঘোষণা করলেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানকার বাঙালিরাই দেবে। অনেকে বলছেন, বন্ডের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপবে। আসলে প্রতি মাসে রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের সামান্য অংশই ব্যয় হবে বন্ডের সুদসহ আসল পরিশোধে। পরিশোধে অনেক বছর সময়ও পাওয়া যাবে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে স্বচ্ছতা বজায় রাখায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথম আলো : কিন্তু সামর্থ্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে সরকারের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা।

বিনায়ক সেন : বড় বিষয় হলো ঝুঁকি নয়, সরকারের দোদুল্যমানতা বা মনস্থির করতে না পারা। এটা সুশাসনের পরিচয় নয়। বর্তমান সরকারের বাকি মেয়াদে হয়তো বড় ধাপ ফেলা যাবে না। তবে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা সম্ভব। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে এর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পদ্মা সেতু থেকে হাই রিটার্নও মিলবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টও স্বীকার করেছেন, এ সেতুটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, পদ্মা সেতু না হলে রাজনৈতিক মাশুলও সরকারের জন্য চড়া হয়ে যাবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সমর্থন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। দুটি কারণ মিলিয়েই রাজনৈতিক অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকেই যাওয়া উচিত। এটা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ইস্যু নয়, এটি জাতীয় বিষয়। এ ক্ষেত্রে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো নির্মাণ ও এর উন্নয়ন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাও জরুরি। বর্তমান সরকার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে আগামী সরকার সেটি চালিয়ে যাবে, তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক সরকারের নেওয়া কর্মসূচি অন্য সরকার তো বন্ধ করছে না; বরং সম্প্রসারণ করছে। কাজ শুরুর পর বিশ্বব্যাংকও আবার পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে। যমুনা সেতুর বেলায়ও বিশ্বব্যাংক পরে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ স্থগিত রাখলে অর্থনৈতিক তো বটে, রাজনৈতিক-সামাজিকভাবেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।

প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।

বিনায়ক সেন : ধন্যবাদ।

নিজস্ব উদ্যোগ দ্রুতই নেয়া প্রয়োজন

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থ নেবে না সরকার— এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাটি আজ থেকে প্রায় সাত-আট মাস আগে বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করেছিলাম। কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব, সেটিও বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম সেখানে। বলেছিলাম, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরবে না এবং নিজস্ব অর্থায়নেই এটি নির্মাণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কাজ নিজস্ব অর্থায়নে করার প্রয়োজন নেই।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ মুদ্রায় জোগান দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এটি বড় কিছু নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখনো আছে। এর পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার বা তার কিছু বেশি হবে। সময় অতিবাহিত হওয়ায় ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। বিদেশী মুদ্রার ৫০ শতাংশ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সহজেই জোগানো সম্ভব। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সপ্রবাহও ভালো। আমদানি এবার কম হয়েছে আমাদের। ফলে রিজার্ভ থেকে প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কঠিন হবে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে চার বছরে অর্থাত্ ২ বিলিয়ন ডলার আমাদের একসঙ্গে ব্যয় করতে হবে না। প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশী মুদ্রার জোগান দিতে হবে। বাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ‘ডলার বন্ড’ ছেড়ে সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানে ৬-৮ শতাংশ সুদ দেয়ারও প্রয়োজন নেই।

আমি সম্প্রতি ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম, সেখানকার বিশেষজ্ঞ ও বসবাসকারীরা আমাকে বলেছেন, ২-৩ শতাংশ সুদ দিলেই ডলার বন্ড বিক্রি করা যাবে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সুদ পাওয়া যায় দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে ২-৩ শতাংশ সুদ ঘোষণা করলেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানকার বাঙালিদের কাছ থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। অনেক বাঙালি রেস্টুরেন্ট মালিক আমার কাছে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই বলছেন, বন্ডের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপবে। বিষয়টি ঠিক নয়। প্রতি মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে এবং রফতানি থেকে যে অর্থ পাচ্ছি, তার সামান্য অংশই ব্যয় করতে হবে বন্ডের সুদসহ আসল পরিশোধে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও রফতানি আয় বাড়ছে। ফলে বন্ডের অর্থ ও সুদ পরিশোধকে বোঝা ভাবার যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করি না। এটি পরিশোধে অনেক বছর সময়ও পাওয়া যাবে।

বড় বিষয় হলো সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্যোগ নেয়া ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের প্রশ্ন। নিজস্ব অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার কথা, যেটি এক বছর আগে বলেছিলাম; তখন নেয়া গেলে আরো ভালো হতো। সরকার উদ্যোগও নিয়েছিল; কিন্তু পরে সেখান থেকে পিছিয়ে আসে। এখন আবার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদে তেমন কিছু করা যাবে না সত্য; তবে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা সম্ভব এ সময়ের মধ্যেই। প্রতীকী হলেও কিছু কাজ শুরু করা উচিত। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে এর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পদ্মা সেতু থেকে হাই রিটার্নও মিলবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টও স্বীকার করেছেন, এ সেতুটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিকভাবে পদ্মা সেতু না হওয়ার যে মাশুল, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার তা দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকে অগ্রসর না হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরও রাজনৈতিক সমর্থন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। দুটি কারণ মিলেই রাজনৈতিক অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকেই যাওয়া উচিত। অন্যরা যে বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন যেমন— অর্থায়ন, এগুলো বড় বিষয় নয়; অন্তত দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায়। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞও এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে মত দিচ্ছেন। তারাও দীর্ঘমেয়াদে পদ্মা সেতু ও রাজনীতির বিষয়টি অনুধাবন করছেন। সন্দেহ নেই, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে স্বচ্ছতা বজায় রাখায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

পদ্মা সেতুটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ইস্যু নয়, এটি জাতীয় বিষয়। এক্ষেত্রে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো নির্মাণ ও এর উন্নয়ন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাও জরুরি। বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে আগামী সরকার সেটি চালিয়ে যাবে, তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কিন্তু সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। এক সরকারের নেয়া কর্মসূচি অন্য সরকার বন্ধ করছে না; বরং এটি সম্প্রসারণ করছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিলেও আগামী সরকারকে তা চালিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজ শুরুর পর বিশ্বব্যাংকও পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে। আমরা আহ্বানও জানাতে পারি। যমুনা নদীতে নির্মিত সেতুর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংক পরে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ স্থগিত রাখলে অর্থনৈতিক তো বটে, রাজনৈতিক-সামাজিকভাবেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।

দারিদ্র্য কমলেও আয়-বৈষম্য বাড়ছে

সমকাল প্রতিবেদক
শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দেশে দারিদ্র্য কমেছে। এটি গর্বের বিষয় হলেও আত্মতুষ্টির কিছু নেই। কেননা দারিদ্র্য হ্রাসের পাশাপাশি ধনী-গরিবের মধ্যে আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে। এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। শহর এবং গ্রামে উভয় ক্ষেত্রে এ বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। মূলত সম্পদের অসম বণ্টন ও অবৈধ আয়ের উৎসের কারণে আয় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ অভিমত ব্যক্ত করেন তারা। ‘দারিদ্র্য বিমোচন : কোথায় আমাদের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খোন্দকার। প্যানেল আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি মনোয়ার হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু কাওসার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দুর্নীতিই আমাদের উন্নয়নের প্রধান বাধা। দুর্নীতিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি কমাতে পারলে জনগণ উন্নয়নের সুফল আরও বেশি পেত। প্রায় তিন ঘণ্টার প্রাণবন্ত আলোচনায় দারিদ্র্যের কারণ এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, দারিদ্র্য নিরসন করতে হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল পেতে হলে আয় বৈষম্য কমাতে হবে। কারণ আয় বৈষম্য থেকে দারিদ্র্যের উৎপত্তি। ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ার পেছনে কারণগুলো তুলে ধরেন বক্তারা।

তারা বলেন, প্রভাবশালীরা জমি দখল, জলাশয় দখল করে সম্পদ তৈরি করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছে না। এসব অবৈধ কাজের মাধ্যমে বিত্তশালীদের সম্পদ আরও বাড়ছে। অথচ গরিবের কাজের সুযোগ নেই, শিক্ষা নেই, ফসল উৎপাদন করলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, ব্যাংক থেকে ঋণের সুযোগও তাদের নেই। ফলে দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনের পরিবর্তন হচ্ছে না। দারিদ্র্য দূর করতে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তারা।

পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খোন্দকার অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, গুলশান ক্লাবে প্রতিদিন কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়। যারা জুয়া খেলার পেছনে কোটি টাকা খরচ করে বুঝতে হবে তারা কত বড়লোক। তিনি বলেন, দারিদ্র্য মাপার বিষয় নয়, এটি অনুধাবনের বিষয়। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যথা অনুধাবন করা গেলে সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। মন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের তুলনায় দারিদ্র্য আরও কমেছে। শিগগির এ ঘোষণা দেওয়া হবে।

ড. মির্জ্জা আজিজ বলেন, ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব এখনও প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়াতে পারে ৩২ শতাংশ। যদি তাই হয় তাহলে দুই বছরে কমবে ৮ শতাংশ, যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টির কারণ নেই। আমাদের এখনও অনেক কিছু করণীয় আছে।

অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন বলেন, দারিদ্র্য কমেছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় হলেও সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে আয় বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। যার একটি ফ্ল্যাট ছিল তার ১০টি ফ্ল্যাট হচ্ছে। অথচ গরিবরা ক্রমেই গরিব হচ্ছে। আয়কর ফাঁকি, প্রাকৃতিক সম্পদ দখল, ঋণ পরিশোধ না করা ইত্যাদি অবৈধ কাজের মাধ্যমে বিত্তশালীরা সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হলে বৈষম্য কমার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত ৫ কোটি লোক দরিদ্র। কাজেই আমাদের আত্মতুষ্টির কারণ নেই। দারিদ্র্য কমাতে হলে গরিবদের উৎপাদনমুখী কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। ড.ফরাস উদ্দিন মনে করেন, দারিদ্র্যের মূল কারণ কাজের সুযোগের অভাব। যারা গরিব তাদের সম্পদও নেই, নেই কাজের সুযোগও। দারিদ্র্যকে বহুমাত্রিক অভিশাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। দারিদ্র্য কমাতে শিক্ষা বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা ফ্রি করার প্রস্তাব করেন তিনি।

ড. সেলিম রায়হান দারিদ্র্য হ্রাসের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ১৯৯০-এর দশকে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮ শতাংশ। ২০০০ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৮ শতাংশ। ২০০৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ। এলডিসিভুক্ত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ অগ্রগতি অনেক ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।