মারিনা সিভেতায়েভার কবিতা: শিরোনাম-হীন


লোহার ছোট্ট কৌটা খুলে
বার করেছি দুঃখের উপহারঃ
ছোট্ট একটা আংটি, তাতে
মুক্তার পাথর বসানো— জ্বলছে

বেড়ালের মত নিঃশব্দে এবার বেরিয়ে যাওয়ার পালা
আমার মুখে-ঠোঁটে হাওয়ার ঝাপ্টা
ভেসে আসছে কান্না, পাখিরা ডানা মেলল…
আমার বাঁদিকে—রাজহংসীরা, ডানদিকে—কাকেদের ভীড়,
আমাদের চলার পথ—দুদিকে সরে যাচ্ছে

তুমি যেদিকে চলেছো সেদিকে কুয়াশার মেঘ
তোমার পথ হারালো স্বপ্নে-ডোবা অরণ্যে
তোমার পথ হারালো তপ্ত বালুর মধ্যে
তোমার আত্মা—ফেটে পড়ছে চিৎকারে
তোমার চোখ—মুছে নিচ্ছে নীরবে

আর আমার দেহের উপরে—জড়ো হচ্ছে পেঁচাদের দল
আর আমার দেহের উপরে—জোরে শ্বাস ফেলছে ঘাস


কেউ কোনকিছু ধ্বংস করে নি আমাদের,
আমি সুখী—আমাদের এই বিচ্ছেদে।
সহস্র যোজন দূরত্বে থেকে
এই নাও, আমার চুম্বন।

আমাদের ছিল–দুই মেরুর প্রতিভা।
আমার স্বর এই প্রথম—হঠাৎই শান্ত হয়ে এল।
আমার এই ছেড়া-খোঁড়া কবিতায়
তোমার এসে যায় না কিছু।

তুমি যেদিক পানে উড়াল দিচ্ছ,
ঈগলছানা আমার,
সফল হও, প্রার্থনা করি।
সূর্যের অসহ্য আলো তুমি এত সহজে
সইতে পারলে,
আমার তারুণ্যে ভরা সেদিনের তাকানো
সে কি আরো অসহ্য ছিল?

কেউ তোমাকে এতটা মমতায় দ্যাখে নি।
শেষবারের মত—কোন প্রত্যাশা নিয়ে বলছি না—
সহস্র বছরের ওপার থেকে দিচ্ছি,
এই নাও, আমার চুম্বন।


আমার এই বিশাল শহরে এখন—রাত্রি।
রাস্তায় নামলাম যখন, ঘরবাড়ী সব—ঘুমাচ্ছে।
যেখানেই যাই, আমার পিছু ছাড়ে না—বাতাস।
কারো জানালা থেকে ভেসে আসছে—গান।
ভোর না হওয়া অব্দি
বুকের হাড়-পাঁজর কাঁপিয়ে—জোর হাওয়া উঠবে।
দিনের ডালপালা সরিয়ে বার হয়ে এসো—স্বাধীন।
বন্ধুরা, আমি তোমাদেরই স্বপ্নে ছিলাম—এক পড়শী।

খামোখা জল ফেলো না
বাবা-মা’র কথা ভেবে। ওঠো। ঈশ্বর আছেন।
রাতের এই রাস্তা ধরে চলো সেদিকে,যেখানে
ধারে-কাছে নেই কোন কাঁপা হারিকেনের আলো
বা নেড়ি কুত্তাদের দল।


আজ অথবা কাল, কোন একদিন, এই বরফ গলবে।
তুমি তখন শীতে কাঁপছো পশমের চাদর গায়ে—একা।
ভাবতে কষ্ট হচ্ছে আমার,
ততদিনে শুকিয়ে গেছে তোমার ঠোঁট।

টলমল করে হাঁটবে তখন, পানাহারে অরুচি।
তোমার চারপাশ থেকে ছিটকে পড়েছে সকলেই।
এই কি ছিল সেই অঙ্গুলি, যার জন্যে
কাতর রগোঝিন ছুরি শানিয়েছিল একদা?

আর চোখ, তোমার সে চোখ, সে-ও কবে
বয়সের সাথে নিভে গেছে বৃত্তাকার গর্তে।
তুমি হয়ত তখন কারো কাঁধে ভর দিয়ে
ফিরে আসছ নিজের বিষণ্ণ ভিটেয়।

দূরে, খোলা রাস্তায়, দ্যাখো জেগে আছে একটা সারস।
দরোজা হাট করে খোলা—রাতের হাওয়া দিচ্ছে।
এসো তবে, হে আমার অনাকাংখিত অতিথি,
দাঁড়াও, আমার এই আলোকময় শান্ত কোনে।