এলেন গিন্সবার্গের কবিতা: লালন অনুসরণে

লালন অনুসরণে

এভাবেই আমি পৃথিবীর পথে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলাম
সেই-যে তারুণ্যবেলায় উইলিয়াম ব্লেক
আমাকে উস্কে দিলেন, তারপর কত মহামুনির নিষেধঃ
‘ওরে জড়াস নে বিষয়ের আশে,
বরং তৈরী হ মৃত্যুর জন্যে’
সেই যুবা বয়স থেকেই শুনছি এসব
আর এখন তো নিজেই আমি পৌঢ় নাগরিক এক,
বাঁধা পড়ে আছি লক্ষাধিক বইয়ের ভেতরে,
লক্ষাধিক চিন্তার জালে, লক্ষাধিক মুদ্রার স্তূপে,
লক্ষাধিক বাসনায়, তাহলে কবে
এ দেহের মায়া ছেড়ে যাওয়া হবে আমার?
এলেন গিন্সবার্গ বলে, আকন্ঠ ডুবে আছি আমি ক্লেদে।


প্রেমিকের পায়ের কাছে বসেছিলাম, সে বললে,
‘চুলোয় যাক এসব, শুধু নিজেকে সামলে চলো,
পা ফেলো দেখে-শুনে, নিয়মিত যোগে-ধ্যানে, আর
মেজাজটাকে বশে রাখো’
আমি এখন প্রায় বৃদ্ধ
আর বছর কুড়ি বাঁচবো কিনা জানিনা, হয়ত আর
কুড়ি হপ্তাও বাঁচবো না, পর মুহূর্তেই হয়ত
ডাক পড়বে আমার, হয়ত এরই মধ্যে
আমার পুনর্জন্ম ঘটে গেছে কীট-পতঙ্গের মধ্যে কে জানে
এলেন গিন্সবার্গ বলে, কীকরে জানব আমি
যা কিছু চলছে সব দেখছি কিনা স্বপ্নের ঘোরে–


এখন রাত বাজে দুটো। খুব ভোরে উঠে ছুটতে হবে
ট্যাক্সিতে মাইল কুড়ি–প্রতি দিনের মত নিজের খ্যাতির পেছনে।
শিল্প-কলা যোগ-ধ্যান করতে করতে এই ধান্দায় জানিনা
কীকরে জড়িয়ে পড়লাম।
কতিপয় মোহন শব্দের জন্য
আমি নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়েছি
শরীরকে ব্যবহার করেছি
নিজের নির্যাস ছড়ানোর জন্যে
আমার মন আচ্ছন্ন হয়ে আছে বিবশ কামনায়
হয়ত উচ্ছ্বাস ছিল আমার প্রাণেও
কিন্তু শেষ কবে প্রাণ ভরে শ্বাস নিয়েছি
তা মনে পড়েনা
আমার সমস্ত উক্তি কেবলি নিজেকে জাহিরের উছিলা
আমার বাসনাগুলো কবেই লুপ্ত
যদি মোক্ষই সত্যি করে চেয়ে ছিলাম
তাহলে লোলচর্ম এই দেহের ভেতরে
আমি কীকরে আটকে পড়লাম?
শুধু কয়েকটা শব্দের টানে,ভালবাসার মোহে,
আকন্ঠ বড়াই আর বাসনায় ডুবে
একের পর এক অপরাধ ঘটিয়ে?
এলেন গিন্সবার্গ বলে, কী যে বেড়াজালে আমি গেছি জড়িয়ে।


রাতে আমার ঘুম আসেনা, অন্ধকারে জেগে থেকে
আমি ঘনায়মান মৃত্যুর কথা ভাবি–
যখন দশ বছরের ছিলাম মহাবিশ্ব কত বড়
তা নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না
সেসময়ের তুলনায়
মৃত্যু এখন অনেকই কাছে চলে এসেছে–
যদি এবারে একটু না জিরোই
মৃত্যু আরো দ্রুত চলে আসবে
আর যদি ঘুমিয়ে পড়ি তাহলে
পরিত্রাণের পথ বন্ধ হবে আমার–
ঘুমন্ত বা জাগ্রত, এলেন
গিন্সবার্গ পড়ে থাকে বিছানায় এই মধ্য রাতে।


ভোর চারটা
তারপর ওরা আমার জন্যে এল
আমি বাথরুমের মধ্যে নিজেকে লুকালাম
ওরা বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে ফেলল
সেটা গিয়ে পড়ল একটা নিরীহ ছেলের ওপর
কাঠের দরজাটা নিরীহ ছেলেটার ওপর পড়ে
যেন কঁকিয়ে উঠল
কোনভাবে আমার ছায়াটাকে লুকিয়ে রেখে
কোমডের মধ্যে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে শুনলাম
ওরা ঘরের অন্য কোন থেকে আমার বদলে
টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে—
এভাবে আর কতদিন আমি ধোঁকা দিয়ে পারব?
অচিরেই ওরা দেখবে আমি ধরা পড়িনি
ওরা আবার ফিরে আসবে আমার জন্যে, তখন
এ দেহ আমি আবার কোথায় লুকাব?
আমি কি ‘আমিই’, নাকি ‘অন্য কেউ’, অথবা
আসলে আদৌ ‘কেউ’ নই?
তাহলে এই ভারী শরীর, এই দুর্বল হৃৎপিন্ড,
এই চুঁইয়ে পড়া কিডনি—এরা কারা?
পয়ষট্টি বছর ধরে এ কোন কয়েদি
জেল খেটে চলেছে
এই লাশের ভেতরে?
আমি ছাড়া আর কে এত
বুঁদ হয়ে আছে নেশায়?
অচিরেই এই খেলার সমাপ্তি, তাতেই বা
কার কি এলো গেলো, বলো?
সত্যই কি আসবে সে মাহেন্দ্র ক্ষণ? সত্যি কি হবে
তবে সেই ভবিষ্যৎ বাণী?


আমারও সুযোগ এসেছিল, কিন্তু সেটা আমি হারিয়েছি,
একবার দুবার নয়, এরকম সুযোগ পেয়েছি অনেকবার
কিন্তু সেসব গুরুত্বের সাথে নেইনি।
বলতে গেলে আমিও অভিভূত হয়েছিলাম, এমনকি প্রায় পাগল
হতে চলেছিলাম ভয়ে, পাছে
অমরত্বের বিরল সুযোগটা হারাই, তারপরও হারিয়েছি দেখো।
এলেন গিন্সবার্গ তোমাদের সাবধান করছে
আমাকে অনুসরণ করে
ধ্বংসের পথে এগিও না।