বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৭

পূর্বে প্রকাশিতের পর
কেননা, ‘ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি’ আইন, দর্শন ও রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি বহুল-অধীত ধারণা। সুযোগ কী ও কত প্রকারের, কোন সুযোগগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সে কারণেই (সম্পদ কম থাকলে) কোন সুযোগগুলোর ক্ষেত্রে সমতা বিধান সর্বাগ্রে করা উচিত এ নিয়ে পলিটিক্যাল ও মরাল ফিলোসফারদের মধ্যে বেশ খানিকটা মতানৈক্য রয়েছে। আইনী বা আনুষ্ঠানিক সমতা  (Formal equality of opportunity) বনাম বাস্তবিক সমতা  (Substantive equality of opportunity) বা ন্যায়সঙ্গত সমতা  (Fair equality of opportunity), সুযোগের সমতা (equality of opportunity) বনাম সামর্থ্যের সমতা (capability) ইত্যাদি ভেদজ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। নৈয়ায়িক বা ন্যায়বাদী দর্শনে এসব মতপার্থক্যের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সেসব আলোচনার বা টেক্সটের পূর্ব-ঐতিহ্য বাংলায় ইতোপূর্বে না থাকায় শুধু ‘সুযোগের সমতা’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে সাংবিধানিক (বা আইনি) লক্ষ্য পূরিত হবার নয়। এ জন্যেই আলোচনার জন্য ইংরেজি ও বাংলা পাঠ উভয়ের ওপরেই নির্ভর করেছি। কোন কনসেপ্টের গুরুত্ব মীমাংসা করার জন্য ইংরেজি পাঠের আশ্রয় নিয়েছি, যদিও উদ্ৃব্দতিগুলো থাকছে মূলত বাংলা পাঠ থেকে। আমার আশা যে, এই দ্বি-ভাষিক পাঠের মধ্য দিয়ে ভাবনার অনুবাদ-কর্ম সহজতর হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূল নীতি’ (Fundamental Principles of State Policy) অধ্যায়ে সমাজতন্ত্রকে শুধু একটি মৌলিক আদর্শ হিসেবেই গ্রহণ করা হয়নি। এর সংজ্ঞা সরাসরি কোনো ‘মার্কসীয় টেক্সট’ থেকেই গেছে বলে মনে হয়। নতুন সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে ‘শোষণমুক্তি’ এবং এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’। সংবিধানের ১০নং ধারায় লেখা ছিল : ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ এখানে ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ বলতে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝানো হয়নি। তবে রাষ্ট্রীয় খাতের যে বড় একটি অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকবে, সেটা ছিল স্পষ্ট। উন্নয়নের পথে রাষ্ট্রের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একথা একমাত্র চরম খোলা-বাজার অনুসারী Libertarianরা ছাড়া সকলেই কমবেশি স্বীকার করে থাকেন। অনগ্রসর এলাকা, পিছিয়ে পড়া মানুষ ও জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার জন্য রাষ্ট্রের হাত-বাড়ানো প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও অনুপস্থিতি যে যে ক্ষেত্রে প্রকট- যেমন জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে- সেখানে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয়। বাজারমুখীন বিনিয়োগ কর্মকাণ্ড, যেখানে ঋণাত্মক উপচেপড়া প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে (negative externalities and spillovers) সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরিবেশ-দূষণ এবং পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে জনস্বার্থের রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, যা কোনো একক বা সমবেত ব্যক্তি খাতের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু উদ্যোগ ও নেতৃত্ব আসতে হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকেই। এসবের বাইরেও ১৯৭২ সালের পটভূমিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে আরও কিছু বাড়তি দায়িত্ব ও চাপ নিতে হয়েছিল।
প্রথমত, বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিকাশ চেয়েছিলেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ১৯৭২ সালে সংসদে সংবিধান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কল্যাণ রাষ্ট্রে’র কল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বড় কথা হলো জনকল্যাণ। এই রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র রূপে যাতে গড়তে পারি, সেই লক্ষ্য স্থির রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।’ জনকল্যাণের জন্য ব্যয় নির্বাহের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকুলান। একটি অবিকশিত কর-রাজস্ব সিস্টেমের মাধ্যমে তা সেদিন অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য যেমন দরকার হয়ে পড়েছিল ‘নন-মার্কেট’ পন্থায় সম্পদের আহরণ, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘বাণিজ্যিক’ ভিত্তিতে গড়ে তোলা ও সেসব কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারিত করা। নন-মার্কেট পন্থায় সম্পদ আহরণের উদাহরণ হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রম-ভিত্তিক নদী-পুকুর-খাল খনন, রাস্তা-ঘাট মেরামত ও নির্মাণ প্রভৃতি স্থানীয় উদ্যোগের কথা এখানে স্মরণ করা যায়। এই ডাক ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন বিভিন্ন জনসভায়। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে ‘বাণিজ্যিক ভিত্তিতে’ পরিচালনা করার গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধ হয়েছিল সেদিন। এর পূর্বাপর ঐতিহাসিক উদাহরণ তৎকালীন নেতৃত্বের সামনেই ছিল। ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পে’ তুলনামূলকভাবে পুঁজির পরিমাণ লাগে বেশি। আর এসব খাতে টার্নওভার রেট কম- মুনাফা আসে অনেক দেরি করে- ফলে এসব খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের পুঁজিপতিরা উৎসাহিত হয় না। এক্ষেত্রে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের উদাহরণ তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাছাড়া সোভিয়েতসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ‘সংস্কারও’ তারা দেখেছিলেন (কোসিগিনের রিফর্মের কথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংসদে তুলেছিলেন)।
দ্বিতীয়ত, ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পের’ কারণ ছাড়াও সেকালের ব্যক্তি-পুঁজিবাদী খাতের দুর্বলতাও তারা বিবেচনায় নিয়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে পেছনে থেকে আর্থিক বা নৈতিক সহায়তা দানে সক্ষম বাঙালি পুঁজিবাদীদের সংখ্যা ষাটের দশকে ছিল অত্যন্ত নগণ্য। যারা ছিলেন, তাদের বেশির ভাগেরই মিল-কলকারখানা চালানোর মতো অভিজ্ঞতা বা অবিসংবাদিত দক্ষতা ছিল না। আর যাদের কিছুটা দক্ষতা ছিল, তাদের মধ্যে হিন্দু-বাঙালি পুঁজিবাদীদের অংশটি (যেমন ঢাকেশ্বরী কটন মিলের সুনীল কুমার বোস) প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের বৈরী পরিবেশে। বিশেষত ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনের কারণে এদের অনেকেই অন্যত্র পুঁজি স্থানান্তরিত করতে থাকেন। সুনীল বোসকে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর গ্রেপ্তার করা হয় এবং কেবল ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরই তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি পান। এভাবে পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে ধনিক বাঙালি ‘শিল্প বুর্জোয়া’ বসু-পরিবার স্বাধীনতার পরে শিল্প খাত থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন ও কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। আর.পি. সাহার মতো যারা মাঝারিমানের ব্যবসায়ী পূর্ব বাংলায় রয়ে গিয়েছিলেন, তারা পূর্বাপর শিল্প খাতের সঙ্গে তেমনভাবে জড়িত ছিলেন না। ফলে, চাইলেও ১৯৭২ সালে বড় কোনো শিল্পোদ্যোগে এগিয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। অন্যদিকে ১৯৩৭-৪৬ পর্বে বাংলার শাসনভার মুসলিম লীগ সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম শিল্প-পুঁজির তেমন কোনো বিকাশ ঘটেনি। বস্তুত ১৯৪৭-৭১ সময় পর্বে পাকিস্তান হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় তেমনভাবে বাঙালি মুসলিম শিল্প পুঁজির বিকাশ হয়নি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে রাজনৈতিক আনুকূল্যে ও ইপিআইডিসির সহায়তায়- বিশেষ করে পাট ও বস্ত্র খাতে- কিছু বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন কল-কারখানা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। রুশ গবেষক সের্গেই বারানভ ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় থেকে এই ধারার শিল্পোদ্যোক্তাদের ওপরে একটি সমীক্ষা চালান। তার হিসেবে মাঝারি বৃহৎ শিল্প খাতে বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন বিজনেস গ্রুপের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬। চট্টগ্রামের একে খান গ্রুপ ছাড়া সারা পাকিস্তানের পর্যায়ে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা এদের কারোরই ছিল না। এদের অধিকাংশই সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধিকার সংগ্রামে প্রবলভাবে দাঁড়াননি বা দাঁড়াতে পারেননি (কেউ কেউ সরাসরি বিরোধিতাও করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কালে)। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রস্তুতের সময় আওয়ামী লীগের ভেতরে বাঙালি শিল্পপতির সমর্থক কোনো লবির প্রবল অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মূলত ‘মধ্যস্তরের’ দল হিসেবেই পরিচিত ছিল। ক্ষমতায় আসতে পারে ভেবে যেসব (উঠতি) ধনিকেরা জাতীয়তাবাদী ধারাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে তাদের ভূমিকা আরও প্রশ্নকীর্ণ হয়ে পড়ে। অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তা গোষ্ঠীর প্রায় সবাই এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এদের অনেকেরই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় এলাকাতেই কল-কারখানা ছিল। তাদের ফেলে যাওয়া সেই মিলগুলোই ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এক হিসেবে, তা ছিল ১৯৭২ সালের মোট রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতের ৬০ শতাংশ পরিসম্পদের সমান।
তৃতীয়ত, অবাঙালি মালিকানাধীন ‘পরিত্যক্ত শিল্প খাত’ ও বাঙালি মালিকানাধীন ‘দুর্বল’ শিল্প খাত- এ দুটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিশ্রুত শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত খাত গড়ে তোলার পেছনে। বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীরা পাকিস্তানের তুলনায় এক ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো বাংলাদেশেও বৃহৎ শিল্প-বুর্জোয়া বা কার্টেল-মনোপলি গড়ে উঠুক তা তারা কখনোই মনে-প্রাণে চাননি। এরকম মনোপলি পুঁজির প্রভাব বাড়তে থাকায় পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তা তারা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রের পৌনঃপুনিক লঙ্ঘনের পেছনে এই বাইশ পরিবারের পরোক্ষ প্রভাব কার্যকর ছিল পূর্বাপর। এসবও তারা তাদের অভিজ্ঞতার বলেই জানতেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সে পথেই আবার গড়াক সেটি তারা চাননি। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করেছিল সেদিন। অর্থাৎ উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রধান খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়ার পেছনে ‘বাইশ পরিবার বিরোধিতা’ ছিল একটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ। আমার মতে, প্রধানতম কারণ। বঙ্গবন্ধু তার নানা বক্তৃতায় বিষয়টি উল্লেখ করেছেন- কী স্বাধীনতার আগে, কী স্বাধীনতার পরে। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকায় এক ভাষণে শেখ মুজিব বলেন :’২২ বছরের ইতিহাস, খুনের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস মীর জাফরের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস, খুবই করুণ ইতিহাস। ইতিহাস গৃহহারা সর্বহারার আর্তনাদের ইতিহাস… ২২ বছর কেটে গেল আমরা জীবন যৌবন ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি কিন্তু পেলাম কি আজ আমরা। আজকে দেশের মধ্যে গ্রামে গ্রামে হাহাকার। … আজকে ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়েছে। গরিব দিন দিন গরিব হয়ে গেছে। বড়লোক দিন দিন বড়লোক হয়ে যাচ্ছে।’ এর ঠিক দুই বছর পরে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় ‘জাতীয়করণ’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অবধারিতভাবে উঠে এলো বাইশ পরিবারের কথা :
‘শ্রমিকেরা সারা জীবন শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন। এগুলো জাতীয়তকরণের অর্থ হলো শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দেওয়া। আমরা শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দিয়েছি। আপনারা জানেন, পশ্চিমাদের হাতে যে সমস্ত কল-কারখানা ছিল তার সব টাকা তারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। … আমি এখানে আজ আর একটা কথা ঘোষণা করেছি। সরকার যেসব কারখানা জাতীয়করণ করেছেন, এখন থেকে সেগুলোর প্রত্যেকটির ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে দুইজন করে সদস্য থাকবেন এবং শ্রমিকরা নির্বাচনের মাধ্যমে এই সদস্যদের বোর্ডে পাঠাবেন। এ ছাড়া বোর্ডে সরকারের এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে তিনজন সদস্য থাকবেন এবং এই পাঁচজন বসে কারখানা চালাবেন। যাই আর হোক না কেন, আদমজী, দাউদ বা আমিনের পকেটে যাবে না।’ শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, বাইশ পরিবারের মতো একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ রুদ্ধ করার জন্য রাষ্ট্রের শক্ত ভূমিকা এবং বৃহৎ শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা পূর্ণভাবে টিকে থাকতে সক্ষম এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথা নানা প্রান্ত থেকেই বলা হচ্ছিল। কেউ বলছিলেন ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ যুক্তি দিয়েছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে :’আজ আমাদের দেশে, অর্থাৎ সাবেক পাকিস্তানে যে সমস্যা ছিল, তা দূর করার জন্য যদি মহানবীর বাণীর শত ভাগের এক ভাগও মেনে নিত, তাহলে কুখ্যাত আদমজি, দাউদ, ইস্পাহানির মতো লোক এ দেশে জন্মলাভ করতে পারত না।’ কেউ আবার যুক্তি দিয়েছেন ইতিহাসের নিকট অভিজ্ঞতা থেকে। ড. কামাল হোসেন পরবর্তীকালে লিখেছেন এ প্রসঙ্গে :’The vision of an independent Bangladesh which had inspirad the freedon fighter, was of a society which would be free from exploitation. They were quite clear that having freed themselves from the infamous ‘22 families’ of Pakistan, they were not going to create ‘22 families’ to take their place in Bangladesh.’

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৬
পূর্বে প্রকাশিতের পর
এই কথাগুলো কিছুটা নির্দয় বিচারই বলে ঠেকবে- বিশেষত যদি আমরা সংবিধান নিয়ে ১৯৭২ সালের গণপরিষদেও নানা আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ককে সামগ্রিকভাবে মাথায় রাখি। কোনো প্রকার আন্তরিকতা বা আত্যন্তিক তাগিদ ছাড়াই শুধু নির্বাচনী জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছিল, এটা বিশ্বাস করা শক্ত। প্রথমত, জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রচার করা দোষের কিছু নয়। মানুষ এরকম আদর্শ সমর্থন করে কিনা তা যাচাই করার একটা বড় মাধ্যমই হচ্ছে নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, সেদিনের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাদের অভিপ্রায় প্রকাশে আন্তরিক ছিলেন না- একে নিছক লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত বলে মনে হতে পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃত্বে বিশেষত বঙ্গবন্ধুর মধ্যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছিল। যার চিহ্ন বিভিন্ন দলিলপত্রের আলোচনার মধ্য দিয়ে ইতোপূর্বেই আমরা দেখেছি। ‘সত্তরের নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রের কথা বলে’- লেখকের এই বিচারটিও তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। এবং সবশেষে, একটা রক্ষণশীল সমাজে- যেখানে ধর্মের আড়ালে সংস্কারের প্রভাব প্রবল, সেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বললে কৃষক-মধ্যবিত্ত সমাজের ভোট বেশি করে পাওয়া যাবে, এটাও তর্কসাপেক্ষ অনুমান। রক্ষণশীলতার এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সমাজে এখনও কাটেনি, তখনও ছিল। তার পরও জনগণের সামনে এনলাইটেনমেন্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘সমাজতন্ত্র’ তথা সামাজিক ন্যায়ের আইডিয়া তুলে ধরতে গিয়ে ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত হননি। আধুনিক রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়ের ধারণাকে তাঁরা কোনো প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যগত চিন্তার সাথে জোর করে মেলাতে বা মেশাতে চাননি। সেরকম চেষ্টা তাদের চোখের সামনেই ছিল- ‘গান্ধীবাদী’ সমাজতন্ত্র, ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’, ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’ বিভিন্ন ধারা ষাটের দশকে চলমান ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনচেতনা ও ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু ঐতিহ্য-রক্ষার নামে সমাজতন্ত্রের ঐতিহ্য-নিরপেক্ষ প্রগতিবাদী ধারণাকে তাঁরা অবমূল্যায়িত করতে চাননি। দুধে জল মিশিয়ে তাকে গ্রহণযোগ্য মোড়কে বিক্রি করতে চাননি- নির্বাচনে জয়লাভের জন্য হলেও। তাঁদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। ফলে, পাকিস্তানের পরিবেশে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জনগণকে কাছে টানার জন্য আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা বলে থাকবে, নইলে তারা বামপন্থি দলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে পারত, অধ্যাপক চৌধুরীর এই মীমাংসাও যুক্তিসিদ্ধ ঠেকে না। প্রথমত, যেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বলে ‘নাস্তিক’ বলে অভিহিত হওয়ার বরং আশঙ্কা আছে, সে রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কেবল জনসমর্থনের তাগিদে শব্দটি প্রচার করেছিল- এই যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, ১৯৭০ সালের প্রেক্ষিতে জনতুষ্টিবাদের যুক্তিও দুর্বল, কেননা সমাজতন্ত্র তখনও গণদাবি হয়ে ওঠেনি। আর বামপন্থি দলের তরফ থেকে প্রতিযোগিতার ভয়? সেটাও আজ কষ্টকল্পনা বলে মনে হয়। বিশেষত যদি মনে রাখি যে, সত্তরের নির্বাচন বয়কট করেছিল বামপন্থি বলে দাবিদার পিকিংপন্থি ভাসানী ন্যাপ। এটি ছিল মাওলানা ভাসানীর সবচেয়ে বড় এক রাজনৈতিক ভুল- ‘স্ট্রাটেজিক ব্লান্ডার’। যদিও কমরেড হায়দার আকবর খান রনো তাঁর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একে ভাসানীর ‘ওয়াক অভার’ দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এমনও হতে পারে যে, পরবর্তী সময়ে (নব্বই বা তৎপরবর্তী) আওয়ামী লীগের ‘বুর্জোয়া’ রূপান্তর দেখে লেখক তার বিরুদ্ধ সমালোচনাকে প্রোথিত করেছেন অতীতে- ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগকে বিচার করার ক্ষেত্রে বা সংবিধানে বিধৃত গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের Authenticity যাচাই করার ক্ষেত্রে। এই সূত্রে বলে রাখি, সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমাকে একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন যে, বাহাত্তরের সংবিধানের বেশকিছু ন্যায়সংগত বামপন্থি সমালোচনা সত্ত্বেও- এবং ১৯৭২-৭৫ পর্বে বাস্তবে গৃহীত কর্মসূচির তর্কাতীত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও- সমাজতন্ত্র তথা চার আদর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের আন্তরিক অভিপ্রায় নিয়ে অন্তত তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তাঁর মনে এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কমরেড সেলিম ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকাকে স্বীকার করেন, তবে ব্যক্তিকে তার দল থেকে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না- সেটিও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য সাময়িক কালের জন্য ‘একদল’ করতেই হবে, সব সমাজতন্ত্র-অভিমুখীন দেশকেই গণতন্ত্রের প্রচলিত পথ ছাড়তেই হবে- এটা আদৌ আবশ্যক নয়। আবার একদল করলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে- ব্যাপারটা তেমনও নয়। ১৯৭২-৭৫ সালে সিপিবির অভিমতও ছিল তাই। সোভিয়েত ও অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিও সেই বার্তাই দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে- তিনি এটাও আমাকে জানিয়েছেন। মোট কথা, সমাজতন্ত্র অভিমুখে দীর্ঘ পথ চলায় বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক অভিপ্রায় ও আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় ছিল না সেদিনের বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বা বামপন্থি ন্যাপ-সিপিবি মহলে (সেদিনের গণচীন, যেটি তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি বা তার স্থানীয় সমর্থক গোষ্ঠীদের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র)। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা বাহাত্তরের সংবিধানের সমতামুখী সমাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিশেষ ধারার প্রতি মনোযোগ দেব। এই ধারাগুলোর ঘনিষ্ঠ বিচার করলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমৃদ্ধ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ধারা সম্পর্কে তাত্ত্বিক সংশয়ের আর কোনো অবকাশ থাকে না। আজকের বাংলাদেশ যদি বঙ্গবন্ধুর সেদিনের তাত্ত্বিক উপলব্ধিতে ফিরে যেতে পারে, তবে সেটা হবে একটি বড় পাওয়া।
৯. গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারা ও উপধারা
Lost in Translation বলে একটা কথা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত আছে। তর্জমায় অনেক ক্ষেত্রে মূল পাঠের অর্থই হারিয়ে যায়। যারা বিদেশি ভাষা থেকে কবিতা অনুবাদের কাজে জড়িত, তারা ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেন। তারপরও আমরা অনুবাদের কাজে ব্যাপৃত হই। সেটা শুধু কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত আমরা ‘অনুবাদ’ করে চলেছি- কখনও নিজের কথা অন্যকে বোঝানোর জন্যে, কখনও অন্যের কথা নিজের বোধের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য। সাম্রাজ্যবাদ যখন উপনিবেশে আসে, তখন সে তার ভাষা-সংস্কৃতিকে যথাসাধ্য ‘অনুবাদ’ করে স্থানীয় অধিবাসীকে তার শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে তৎপর হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এখনও এই অনুবাদ প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের বৈঠকে, এইড গ্রুপ কনসালটেশনে, প্রবাসে কর্মসংস্থানের দেন-দরবারে প্রতিপক্ষ বুঝে আমাদের ‘অনুবাদ’ করে যেতে হয়, যাতে করে দাতা ও গৃহীতা পরস্পরকে বুঝতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা একেকজন জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অনুবাদ-কর্মে নিয়োজিত। আমরা পারস্পরিক ‘সম্পর্কের অনুবাদ’ করে চলি নিজস্ব মূল্যবোধের কাঠামোয়। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য যেটা প্রাসঙ্গিক তা হলো বাহাত্তরের সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক। সুবিদিত যে, সংবিধানটির বাংলা পাঠই আদর্শ পাঠ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং বাংলা সংস্করণই ‘খসড়া’ হিসেবে গণপরিষদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানটি আদিতে আসলে বাংলায় লিখিত হয়নি। এটি প্রথমে ইংরেজিতে লিখিত হয় এবং তারপরেই কেবল বাংলায় তর্জমা করা হয়। তর্জমার পর বাংলা পাঠকেই ‘আদর্শ পাঠ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং এ সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি কোনো ধারা বা উপধারা বোঝার বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা, বিভ্রান্তি বা ‘কনফিউশন’ দেখা দেয়, তবে বাংলা পাঠকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হবে। এ নিয়ে ড. আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন :
‘ড. কামাল হোসেন এজেন্ডা পাঠালেন :বাংলাদেশের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি খসড়া তৈরি করবেন ইংরেজিতে, আমাকে তার বাংলা করে দিতে হবে, শেষ পর্যন্ত বাংলাটাই গৃহীত হবে প্রামাণ্য ভাষ্য বলে। বললাম, একা পারব না, একটা দল চাই। তিনি বললেন, আপনি লোক বেছে নিন।’
আগেই বলেছি তর্জমার দলে আরও ছিলেন কবি ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এবং ড. মযহারুল ইসলাম। সংবিধান তর্জমা করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আনিসুজ্জামান বর্ণনা করেছেন এভাবে :’মনে পড়ে, আইনমন্ত্রীর দপ্তরে এক দুপুরে কামাল আর আমি মুখোমুখি বসে। প্যাডের কাগজে খসখস করে কামাল লিখতে শুরু করলেন সংবিধানের প্রস্তাবনা। এক স্লিপ লেখা হলে সাদা কাগজের সঙ্গে সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম। একটা অনাস্বাদিত শিহরণ জাগল দেহে-মনে :এই আমার স্বাধীন দেশ, তার সংবিধান-রচনার কাজে হাত দিয়েছি। কামালকে বললাম, অনুবাদটা মাজাঘষা করতে হবে, বাড়ি নিয়ে যাই। তিনি বললেন, মূলটারও কিছু উন্নতি ঘটাতে হবে, কাল আবার বসব একসঙ্গে। …সংবিধানের কাজে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে পনেরো দিন আমি ঢাকায় থেকেছি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে… গণপরিষদ-ভবনে- পরে যা রূপান্তরিত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে- আমাকে একটা কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেখানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেটেছে। কখনও বেশি রাত হয়ে গেলে কামালের বাড়ির বসার ঘরে শুয়ে বাকি রাত যাপন করেছি। সকালে সে বাড়িতেই নাশতা করে দ্রুত চলে এসেছি গণপরিষদে।’
এক অর্থে, সংবিধানের খসড়া দুটো ভিন্ন ভাষায় সমান্তরালভাবে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু, সন্দেহ নেই, আগে ইংরেজি টেক্সট তৈরি হয়েছিল, পরে এর বাংলা তর্জমা হচ্ছিল। এ জন্যেই বাংলা পাঠকে আইনত শিরোধার্য করলেও মূল কনসেপ্ট এবং বর্ণনাগুলো যেহেতু ইংরেজিতে হচ্ছিল, এর ইংরেজি পাঠের ওপরেই সাংবিধানিক-আইনি ও দার্শনিক ‘মর্মার্থ’ অনুধাবনের জন্য জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। আমার বলার কথা হলো, সংবিধানের বাংলা পাঠ তখনই সারগর্ভ পাঠ হয়ে ওঠে, যখন আমরা এর মূল ইংরেজি আদি-পাঠকে পাশাপাশি রাখি। যেন বাংলা সংবিধানের প্রতিটি লাইনের ব্যবধানে অদৃশ্য কালিতে লেখা রয়েছে এর ইংরেজি পাঠ। যেন এই ইংরেজি পাঠকে পড়ে এর শব্দগত, প্রত্যয়গত ও গঠনগত অর্থ যথাযথ অনুধাবন করার পরই বাংলা পাঠের দিকে তাকাব কেবল- ইংরেজি পাঠকে চোখের সামনে থেকে মুছে দিয়ে। একই সঙ্গে পড়া এবং মুছে দেওয়া- দেরিদীয় এই ‘Eraser’ প্রকরণ ব্যবহার করেই কেবল সংবিধানের ধারা-উপধারার মর্মার্থ আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে পারে। একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে পড়ছে। বহু বছর আগে যখন অমর্ত্য সেনের ‘জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’ বইটি হাতে এসে পড়ল, তখন সাগ্রহে লক্ষ্য করলাম যে, বইটির শেষে অমর্ত্য সেনের নিজের করা একটি পরিভাষার তালিকা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই জানেন যে, বইটি অনূদিত হয়েছিল মূলের ইংরেজি থেকে বাংলায়। কিন্তু অমর্ত্য সেন অনূদিত পাঠটি মনোযোগ দিয়ে দেখে দিয়েছিলেন এবং দেখতে দেখতে বেশকিছু পরিভাষা নির্দেশ করেছিলেন। এর মধ্যে একটির কেবল উল্লেখ করি। ‘পণ্যমোহবদ্ধতা’ টার্মটি তিনি প্রস্তাব করেন মার্কসের ‘Commodity Fetishism’ ধারণাটি অনুবাদের ক্ষেত্রে। যেটা বলতে চাইছি, শুধু পণ্যমোহবদ্ধতা শুনলে আমরা বুঝতে পারব না শব্দটির দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ের একটি বিশিষ্ট কনসেপ্ট ‘Commodity Fetishism’-এর রূপরেখা ফুটে উঠবে না। পণ্যমোহবদ্ধতা ভালো, কিন্তু ঋবঃরংযরংস ছাড়া সে অচল। এজন্যেই বলেছি- অনুবাদে মূলের চেহারা ঢাকা পড়ে যায় :Lost in Translation।
বাহাত্তরের সংবিধান থেকে একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে আসছে। শাসনতন্ত্রের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।’ কিন্তু ‘সুযোগের সমতা’ উচ্চারণে এর অর্থ সুস্পষ্ট হয় না। কেননা, ইতোপূর্বে বাংলায় ‘সুযোগের সমতা’ ধারণাটিকে কোথাও ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর অর্থ জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর আদি ইংরেজি পাঠে, যেখানে বলা আছে :’The state shall endeavor to ensure equality of opportunity to all citizens.’ বাংলা পাঠের অর্থ বোঝার জন্য এখানে ইংরেজি পাঠের অবশ্যই অনুগামী হতে হচ্ছে।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
মোট কথা, সমাজতন্ত্রের মধ্যে গণতন্ত্রের ‘কনটেন্ট’ আরো বাড়াতে হয়, সেটা কি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার বিচারে, কি বাংলার মানুষের মন-মানসিকতা বিচার করে।
এসবের থেকে কিছুটা ভিন্ন যুক্তি দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের আছাদুজ্জামান খান। তার মতে, সংবিধানে যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রস্তাব করা হয়েছে তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- এর গণতান্ত্রিক ধারাসমূহকে (যথা ব্যক্তি-স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা ইত্যাদি যাকে এক কথায় বলা হয়  civil liberty) রাখা হয়েছে ‘মৌলিক অধিকারের’ অধ্যায়ে, আর সমাজতান্ত্রিক ধারাসমূহকে (যথা প্রত্যেকের ‘অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, মজুরির নিশ্চয়তা, শিক্ষালাভের নিশ্চয়তা, চাকরির সংস্থানের নিশ্চয়তা ইত্যাদি বিষয়কে) রাখা হয়েছে ‘মূলনীতির’ অধ্যায়ে। ইচ্ছাকৃতভাবেই এগুলোকে মৌলিক অধিকারভুক্ত করা হয় নাই। কেন করা হয় নাই, তার কারণ হচ্ছে যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে এ সমস্ত অর্থনৈতিক অধিকার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে থাকলেও এর বাস্তবায়ন হবে ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রের সংগতি-সামর্থ্যের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু ব্যক্তি-স্বাধীনতা প্রভৃতি civil liberty তথা গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ অবিলম্বে দেওয়া সম্ভব হলে সেগুলো মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করাই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ, এখানে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নযোগ্য বা Gradualist মতবাদ হিসেবে দেখার চেষ্টা হয়েছে। এর ‘গণতান্ত্রিক’ কনটেন্টকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘সমাজতান্ত্রিক’ কনটেন্টকে সংরক্ষণ করার দৃষ্টিকোণ যেটা বিধৃত হয়েছে সেটা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ। গণতন্ত্রকে এখনই নিশ্চিত করতে হবে, সমাজতন্ত্র আসবে ধীরে ধীরে। এই  Gradualist অ্যাপ্রোচ মালিকানা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও সংবিধানে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিগত মালিকানা রাখা হয়েছে, তারপরও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে দীর্ঘকালের জন্য ব্যক্তিগত মালিকানার প্রয়োজনীয়তা থেকে যাবে। চীনের সংবিধানের (অধ্যায়-২ সাধারণ নীতিমালা, ধারা-৫) উদ্ৃব্দতি দিয়ে আছাদুজ্জামান খান দেখালেন যে, সেখানে চার ধরনের মালিকানার অস্তিত্ব আছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী যৌথ মালিকানা, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের একান্ত নিজস্ব মালিকানা এবং পুঁজিবাদী মালিকানা। এই শেষোক্ত মালিকানা সম্পর্কে বেশ দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি। তাতে বলা ছিল :
‘The policy of the state towards capitalist industry and commerce is to use, restrict and transform them. Through control exercised by organs of state administration, leadership by the state sector of the economy, and supervision by the masses of the workers, the state makes use of the positive aspects of capitalist industry and commerce which are beneficial to national welfare and the people’s livelihood, restricts their negative aspects which are detrimental to national welfare and the people’s livelihood, and encourages and guides their transformation of state-capitalist economy, gradually replacing capitalist ownership by the whole people.’

এসবের উদ্ধৃতি দিয়ে আছাদুজ্জামান খান এ রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন :’আমাদের এখানেও পুঁজিবাদী শিল্প ও ব্যবসাকে প্রথমে  protect করে পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিলোপ সাধন করা হবে। আমরাও সেই নীতিই গ্রহণ করেছি। একেবারে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান :’সমাজতন্ত্র পর্যায়ক্রমে করতে হবে।’ কেননা, ‘আমাদের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা আছে।’ তা ছাড়া ‘কার্ল মার্কস যা বলেছেন, তা চিরকাল সত্য হবে- তেমন কথা আর স্বীকৃত নয়।’ এবং সে কারণেই ‘মার্কসকে সর্বত্র কপি করা হয়নি।’ এই শেষোক্ত পয়েন্টটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :’বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন চিন্তাধারা নিয়ে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলেছে।’ এখানে মূল প্রশ্ন হলো, ‘আমরা সমাজতন্ত্রের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করেছি কি না?’ আছাদুজ্জামান মনে করেন, কোনো বাধার সৃষ্টি করা হয়নি। কেননা, রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে ‘কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া ছাড়াই’ এবং ‘গণস্বার্থে’ কোনো সম্পত্তি ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত (বা সমবায়ী) মালিকানায় নিয়ে আসতে পারেন :’সে জন্যেই আমি বলেছি যে, চীন বা অন্য কোনো দেশের চাইতে বেশি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা আমরা রেখেছি।’ বামপন্থি সমালোচকেরা (সংসদের ভেতরে ও বাইরে) খামোখাই এ নিয়ে মাঠ গরম করা বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন!
সুবিদিত যে, বাহাত্তরের সংবিধানের সবচেয়ে তীব্র ‘বামপন্থি’ সমালোচনা এসেছিল গণপরিষদ সদস্য ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কাছ থেকে। তবে সংসদের বাইরে থেকেও Dissent এসেছিল। তাতে একটি প্রবল মত ছিল, ‘সমাজতন্ত্রের ধারা’ সংবিধানে রাখার দরকারটাই বা কী? শুধুমাত্র গণতন্ত্র থাকলেই হলো। যুক্তিটা হলো, সত্যিকারের গণতন্ত্র কোনো সমাজে কার্যকর থাকলে সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতা এসব কোনোটারই আলাদাভাবে রাখা দরকার হয় না। এ রকম একটি লিবারেল যুক্তি দিয়েছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ। ‘সত্যিকারের গণতন্ত্র’ বলতে কোন ধরনের গণতন্ত্র দরকার তা অবশ্য তিনি স্পষ্ট করেননি তার লেখায়। কিন্তু চার-স্তম্ভের বঙ্গবন্ধুর সাংবিধানিক আদর্শকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং উক্ত চার দফাকে সংবিধানে সংযোজন করাকে সরাসরিভাবে ভুল পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। ‘শেখ মুজিব-নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ পার্টির সর্বাপেক্ষা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ ত্বরিত গতিতে দেশের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা’ এ কথা বলার পর এর ‘বিধানিক ত্রুটি’ কোথায় তা তিনি নির্দেশ করলেন। ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থের লেখকের স্বভাবসুলভ ambiguous অবস্থান এখানেও পাওয়া যায়। একদিকে তিনি যা বলতেন, পরের মুহূর্তেই তিনি তার বিপরীতার্থক সম্ভাবনা দেখতে পেতেন। সংবিধান প্রশ্নে এসেও তার এই প্রবণতা চোখে পড়ে। একদিকে আবুল মনসুর আহমদ স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘ডেমোক্র্যাসি, সোশিয়ালিজম, ন্যাশনালিজম, সেকিউলারিজম :এই চারটিকে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি করা হইয়াছে। এর সব কয়টির আমি ঘোরতর সমর্থক। শুধু এমনি সমর্থক না, মূলনীতি হিসেবেও সমর্থক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আধুনিক যুগের সব রাষ্ট্রকেই সেকিউলার ডেমোক্র্যাটিক নেশন-স্টেট হইতে হইবে।’ তার পরের বাক্যেই তিনি মত ঘুরিয়ে ফেললেন :’কিন্তু আমার মত এই যে, এর কোনোটাই সংবিধানে মূলনীতিরূপে উল্লিখিত হইবার বিষয় নয়। গণতন্ত্র ছাড়া আর বাকি সব কটিই সরকারি নীতি; রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। দেশে ঠিকমতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেই আর সব ভালো কাজ নিশ্চিত হইয়া যায়।’ এই ‘ঠিকমত গণতন্ত্র’-এর স্বরূপ অবশ্য লেখক এখানেও প্রকাশ করেননি। তবে শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেই আর সমাজবাদের আলাদা উল্লেখের আবশ্যিকতা থাকে না- এ যুক্তি আজ পাশ্চাত্যের কোনো লিবারেল তাত্ত্বিকই জোর গলায় বলার সাহস পান না। দার্শনিক জন রাউলস বা অমর্ত্য সেনরা তাহলে ন্যায়পরায়ণ সমাজের কথা কেন আলাদা করে আলোচনা করবেন, বা গণতন্ত্রের পাশাপাশি ‘আইডিয়া অব জাস্টিস’-এর কথা তুলবেন কেন?
যা হোক, আবুল মনসুর আহমদ সে ধরনের যুক্তি-চর্চায় গেলেন না। তিনি ‘অকাট্য প্রমাণ’ হাজির করলেন তার পরিবর্তে (পাঠক লক্ষ্য করুন যে তিনি সচেতনভাবে সমাজতন্ত্র শব্দটি এড়িয়ে ‘সমাজবাদ’ শব্দটিকে ব্যবহার করছেন) :’এই ধরনের একটি বিচ্যুতির কথা বলিয়াই আমি আমাদের সংবিধান রচয়িতাদের ত্রুটির প্রমাণ দিতেছি। এটা সমাজবাদের বিধান। সমাজবাদ একটা অর্থনীতি। এটাকে সংবিধানের মূলনীতি করার কোনো দরকার ছিল না। যে কোনো গণতন্ত্রী পার্টি যদি সমাজবাদ প্রতিষ্ঠাকে তাদের পার্টি-প্রোগ্রাম রূপে গ্রহণ করেন, তবে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের জনগণের বিপুল সমর্থন তারা পাইবেনই। তবু আওয়ামী লীগ পার্টি অনাবশ্যকভাবে সমাজবাদকে সংবিধানের মূলনীতি রূপে গ্রহণ করিয়াছেন।’ এবং এ জন্যে তিনি সাক্ষী মেনেছেন ভারতের নেতা নেহরুকে। কথাটা আংশিক সত্যি। নেহরু-আম্বেদকরের ১৯৫১ সালের সংবিধানে সরাসরি সমাজতন্ত্রের কথা মূলনীতি হিসেবে ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও ছিল না। আমরা আগেই দেখেছি, এই দুটি শব্দ ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ১৯৭৬ সালে সংযোজিত হয় মূলনীতি হিসেবে ভারতীয় সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদ অন্তত এটুকু যোগ করতে পারতেন যে, নেহরু-আম্বেদকরের মূল সংবিধানেই চৎবধসনষব-এ যুক্ত হয়েছিল ৪টি মূলনীতি :
Preamble- :
Justice (social, economic and political), (Liberty of thought, expression, belief, faith and worship), Equality (of status and of opportunity), and Fraternity (assuring  the dignity of individual)। এর মধ্যে  Liberty এবং Fraternity বাদ দিলে Justice এবং Equality সংক্রান্ত ঘোষণা দুটি ছিল সরাসরি ‘সমাজবাদ’ তথা সমতামুখীন সমাজের আকাঙ্ক্ষার সাথে সরাসরিভাবে সম্পর্কিত।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল মনসুর আহমদের কিছু ত্রুটিও হয়েছে বঙ্গবন্ধুর চার-আদর্শকে নিয়ে। তার লেখায় তিনি প্রকারান্তরে দাবি করেছেন- সংবিধানে সংযোজনের আগে আওয়ামী লীগের আর কোনো মেনিফেস্টোতে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ ছিল না। ইতোপূর্বে আমি দেখাবার চেষ্টা করেছি, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে আওয়ামী লীগের দলিলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা সরাসরিভাবে সন্নিবেশিত হয়েছিল বেশ আগে থাকতেই। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি অবশ্য রাজনৈতিক vocabularyতে আসে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের বক্তব্য-বিবৃতি-ভাষণে (এর আগে শুধু অসাম্প্রদায়িকতা ও কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বৈষম্য না করার কথা ছিল)। লেখক এই মতে পৌঁছাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধুর চার-আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং সংবিধানের প্রণেতারা এই দাবি করে বরং সত্যের অপলাপ করেছেন। লেখকের বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমাদের সংবিধান রচয়িতারা নিজেরা ওই মহান আদর্শকে সংবিধানভুক্ত করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন। তাই জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ওই ভুল তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।’ এটা পড়লে লেখকের তথ্যনিষ্ঠা সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ না জেগে পারে না। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই বঙ্গবন্ধুর চার আদর্শের অবয়ব কালক্রমে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল।
আবুল মনসুর আহমদের সংবিধানের ওপর উপরোক্ত সমালোচনা এসেছিল ‘ডান দিক’ থেকে। অর্থাৎ লিবারেল বা উদারনৈতিক গণতন্ত্রী দৃষ্টিকোণ থেকে। তবে, ‘বাম দিক’ থেকেও সেদিন সংবিধানের ওপরে অনেক সমালোচনা এসেছিল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংসদের ভেতরে থেকে সেসব সমালোচনার অনেকটাই উত্থাপন করেছিলেন। সংসদের বাইরে থেকে বামপন্থি দলগুলোও যার যার মতো করে সেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। কোনটা রাষ্ট্রের মূলনীতি আর কোন কোন দাবি রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হবার দাবি রাখে- এ নিয়ে সেদিন জোর তর্ক-বিতর্ক উঠেছিল। তবে বামধারার অধিকাংশ সমালোচকই (আমি ন্যাপ-সিপিবি ঘরানার কথা বলছি) সেদিনের গণপরিষদের অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিবর্তন বা প্রাতিষ্ঠানিক evolution-এর সাথে সাথে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গিও বদল হতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদ’ বইতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার সংশয় ব্যক্ত করেছেন এভাবে :’রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিতে আওয়ামী লীগের যে অত্যন্ত উৎসাহ ছিল, তা মোটেই নয়।… সত্তরের নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রের কথা বলে; সমাজে শোষণ থাকবে না এবং অর্থনীতির লক্ষ্য হবে সমাজতন্ত্র অভিমুখী- এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ওই লক্ষ্যে ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমিহীনদের কাছে জমি পৌঁছে দেওয়া, কর ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ঘোষণাতে ছিল। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি আন্তরিক ছিল- এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। এগুলো দেওয়া হয়েছিল নিতান্ত বাধ্য হয়ে। নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনগণের পক্ষে না বলে উপায় থাকে না। তা ছাড়া বামপন্থি দলগুলো সমাজতন্ত্রের কথা বলে জনগণকে নিজেদের দিকে টেনে নেবে- এমন আশঙ্কাও ছিল।’
[ক্রমশ]https://googleads.g.doubleclick.net/pagead/ads?client=ca-pub-9442091006829624&output=html&h=250&slotname=9443271832&adk=1331586746&adf=832419000&pi=t.ma~as.9443271832&w=300&lmt=1628144762&psa=1&format=300×250&url=https%3A%2F%2Fwww.samakal.com%2Fnational-election-2018%2Farticle%2F210149669%2F%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%2599%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%2597%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A7%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2597%25E0%25A6%25A3%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%2595-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25A7%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%2593-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%2580-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2599%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B7%25E0%25A6%25BE&flash=0&wgl=1&adsid=ChAI8PWoiAYQhMehqNPvj6IvEjwAD2iaZOefh47pms1-Z9eHrb6_E-7agz-dJRdprKBDHvePmXdx3PSW_dboDZyJ9AptOOxy35t6YCGZlGI&uach=WyJXaW5kb3dzIiwiMTAuMCIsIng4NiIsIiIsIjkyLjAuNDUxNS4xMDciLFtdLG51bGwsbnVsbCxudWxsXQ..&tt_state=W3siaXNzdWVyT3JpZ2luIjoiaHR0cHM6Ly9hdHRlc3RhdGlvbi5hbmRyb2lkLmNvbSIsInN0YXRlIjo3fV0.&dt=1628144726881&bpp=1&bdt=1182&idt=403&shv=r20210802&mjsv=m202108040201&ptt=9&saldr=aa&abxe=1&cookie=ID%3D41f465110656505a-22353dcdafca0002%3AT%3D1628144727%3ART%3D1628144727%3AS%3DALNI_MYweFHM8DCHnzhgcM7jCgXB3R4IKw&prev_fmts=0x0%2C300x250%2C300x250%2C304x250%2C300x250&nras=1&correlator=2247964085113&frm=20&pv=1&ga_vid=1203111009.1628143455&ga_sid=1628144727&ga_hid=1291477603&ga_fc=0&u_tz=360&u_his=1&u_java=0&u_h=1080&u_w=1920&u_ah=1040&u_aw=1920&u_cd=24&u_nplug=3&u_nmime=4&adx=643&ady=4476&biw=1903&bih=937&scr_x=0&scr_y=745&eid=20211866%2C21067496&oid=3&pvsid=418908138783655&pem=873&ref=https%3A%2F%2Fsamakal.com%2F&eae=0&fc=1920&brdim=0%2C0%2C0%2C0%2C1920%2C0%2C1920%2C1040%2C1920%2C937&vis=1&rsz=%7Co%7CoeEbr%7C&abl=NS&pfx=0&fu=0&bc=31&ifi=4&uci=a!4&btvi=3&fsb=1&xpc=9c8dTasLvk&p=https%3A//www.samakal.com&dtd=35549

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৪

পূর্বে প্রকাশিতের পর
চীনের ১৯৪৯ সালের সংবিধানে ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্পষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের অবস্থা চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো নয়। এ জন্যই তাজউদ্দীন বলেছেন, ‘৫০ বছর আগে সোভিয়েট ইউনিয়নের মানুষ যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থার সঙ্গে আমাদের এখনকার অবস্থার তুলনা করতে হবে। ২৫ বছর আগের পূর্ব জার্মানির সঙ্গে আমাদের তুলনা করতে হবে।’ এখানকার সোভিয়েত, চীন বা পূর্ব জার্মানির সঙ্গে তুলনা করে সংবিধান তৈরি করলে চলবে না। বিপ্লবের পরপর যে বিধান ছিল এসব দেশে সেখানে তো ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল- এই হচ্ছে তাজউদ্দীনের যুক্তি। বামপন্থি দলগুলোর সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি  historicism-র অনুবর্তী; শুধু যুক্তির খাতিরে না, বিশ্বাস করেন বলেই। যে সমাজ বা দেশের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রতিতুলনা করা হবে, তাদের সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে আমরা আছি কিনা, সেটাই প্রথমে দেখা দরকার :
‘কেউ যদি সোভিয়েট ইউনিয়নের ১৯৪৭ সালের সংবিধানের সঙ্গে তুলনা করে সেই পর্যায়ে আমাদের সমাজতন্ত্রের বিধান করার দাবি জানান, তাহলে আমি বলব যে, সেই সমাজের সেই পর্যায়ে আমরা আছি কিনা, আমাদের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মানসিকতা সেই পর্যায়ে আছে কিনা, সেটা বিবেচনা করতে হবে।’
এ থেকে স্পষ্ট করে বোঝা যায় কেন বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রকে এক চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন, কেন বলেছিলেন যে, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানো অনেক দূরের পথ, এর জন্যে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, সবশেষে তাজউদ্দীন এ-ও বললেন, ‘সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্রের’ কথা যাঁরা বলেন, তিনি তাদের দলে পড়েন না। কেননা, ‘সম্পূর্ণ’ বলা মানে সে আদর্শের বিকাশের গতি অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। দর্শন সম্পর্কে তার অবধানতার পরিচয় পাই এই স্তবকে :
‘সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝা যায়? আমি এটুকু জানি, সমাজতান্ত্রিক দর্শন সম্বন্ধে যে-কেউ যদি বলে, এই জিনিস করলে পরে পূর্ণ সমাজতন্ত্র হয়ে যাবে, তা হলে বলতে হবে যে, ভবিষ্যতে সভ্যতার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল।’
অর্থাৎ পূর্ণ সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে হেগেলীয় End of Histroy প্রকল্পের মতোই সমার্থক চিন্তা। ‘পূর্ণতার’ দিকে আমরা কেবল পৌঁছানোর চেষ্টাই করে যেতে পারি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে- এর বেশি কিছু নয়। স্পষ্টতই, তাজউদ্দীন সমাজতন্ত্রের Idealized version-এ বিশ্বাসী ছিলেন না। সে জন্যেই তার সিদ্ধান্ত হলো, সংবিধানে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন মিশ্র মালিকানা সমন্বিত অর্থনীতির প্রস্তাবনাই সঠিক হয়েছে :
‘ব্যক্তিগত মালিকানা দিয়েছি দেখে সেটার জন্য সমাজতন্ত্র দাবিদার একটা দল বলেছেন যে, এটা সমাজতন্ত্র হয়নি, আবার আর একটা দল বলছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা যা দেওয়া হয়েছে, তা ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি, খুব কম দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত মালিকরা বড় ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। আমার মনে হয়, দুই দলের কথায় যখন তারা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের কারও কথায় কর্ণপাত না করে আমরা যেটা দিয়েছি, সেটাই তাদের গ্রহণ করা উচিত। কারণ, এটা সুসামঞ্জস্য হয়েছে এবং সুসমন্বিত হয়েছে।’
সবশেষে, তাজউদ্দীন হঠকারী ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ দলে দাবিদার বলে গোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টি দিলেন (এই গণপরিষদের অধিবেশন চলাকালীনই জাসদের জন্ম হবে)। কেন মালিকানা-প্রশ্নে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রাধান্য রেখেই ব্যক্তি খাতের নিয়ন্ত্রিত বিকাশকে উৎসাহ দিতে হবে- এর পেছনে ‘প্র্যাকটিক্যাল নেসেসিটি’ ছাড়াও জনগণের ‘পশ্চাৎপদ মানসিকতার’ দিকেও সচেতন থাকার কথা বললেন তিনি। বিপ্লব ডি-রেইলড হয়ে যেতে পারে এই হঠকারী অতি বামপন্থি শক্তি ও দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির যুগপৎ সাঁড়াশি আক্রমণে। তাজউদ্দীন বললেন :
‘জনাব স্পিকার সাহেব, আপনি জানেন, আমার সমাজের শিক্ষিত এবং তরুণ এবং অত্যন্ত আদর্শবাদী বলে পরিচিত কিছু কিছু লোক- তাদের সংখ্যা বেশি কি কম, তা নির্ণয় করা আমার পক্ষে খুব কঠিন- যে কার্যকলাপ দেখাচ্ছে, সেটা খুবই দুঃখজনক। যেখানে একটা সমাজতান্ত্রিক বিধানে স্বাভাবিকভাবে বলা যায় যে, যৌথ মালিকানা থাকবে, সেই জায়গায় একদিকে তারা প্রগতির কথা বলছে, আর একদিকে অপরের পকেট থেকে কেড়ে পর্যন্ত সম্পদ নিতে, পয়সা নিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। এই যে মনোবৃত্তি, এতে আর যাই হোক, সমাজতন্ত্র যে হবে না, তাতে কোনো সন্দেহ নাই।’
এ রকম হতাশার কথা বঙ্গবন্ধুও তার ১৯৭২-৭৫ পর্বের নানা ভাষণে ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ক্ষেদোক্তি করেছিলেন। প্রথমে তিনি চিহ্নিত করলেন পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি ও সমমনা অন্যান্য হঠকারী অতি বামদের :
‘এক রাতের অন্ধকারে গুলি করে মারে, আর বলে রাজনীতি করে। রাতে একজন লোক শুয়ে আছে, তাকে জানালা দিয়ে গুলি করে মারল। বলে আমি বিপ্লবী। তুমি বিপ্লবী, না দাগী চোর? এদের কোনো নীতি নাই, এদের কোনো আদর্শ নাই, এদের কিছুই নাই। এরা বড় বড় কথা বলে।… হাটবাজার, চিনির দোকানে, মুরগির দোকানে, সবজির দোকানে ডাকাতি করে বিপ্লব হয় না। ঐ রণদিভের থিওরি ইট মারো, সেপাইয়ের আস্তানায় ইট মারো, ওয়ালে একটা পাথর মারো, এতে বিপ্লব হয় না।’
এই হটকারী অতি বামপন্থি শক্তির মধ্যে দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তিও প্রথম থেকেই বা একপর্যায়ে এসে মিশে গিয়েছিল। মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলে আসলে তারা সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল। তাদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে বলেছিলেন :
‘যারা মনে করেন রাতের অন্ধকারে গুলি করে কিংবা রেললাইন তুলে দিয়ে টেররিজম করে বিপ্লব হয়, তারা কোথায় আছেন তারা জানেন না। … এই টেররিজম দিয়ে দেশের বিপ্লব হয় না, হয় নাই, হতে পারে না। … দুঃখের বিষয়, অনেকে এখনও টেররিজম-এ বিশ্বাস করেন। যাই হোক, ভবিষ্যতে তাদের ভুল ভাঙবে। … আর একটা জিনিস। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক- তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে, সে কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। … সেই জন্যেই এক মুখে সোশ্যালিজম ও প্রগতির কথা এবং আর এক মুখে সাম্প্রদায়িকতা চলতে পারে না। সমাজতন্ত্র প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না। একটা হচ্ছে পূর্ব আর একটা হচ্ছে পশ্চিম।’
এ ছাড়াও দলের ভেতরে সুবিধালিপ্সু শক্তির অনুপ্রবেশ, দুর্নীতির প্রসার, শৃঙ্খলার স্খলন প্রভৃতি সমস্যার কথা বলেছিলেন সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু। এর থেকে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্র গড়ার পথে বাধা কত প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত দিক থেকে আসতে পারে। এর জন্য নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। নতুন মানুষ প্রয়োজন- এটা বঙ্গবন্ধু বা তাজউদ্দীনের জন্য শুধু কথার কথা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র কেন রাতারাতি বা স্বল্পতম সময়ে করা যাবে না সে সম্পর্কে তাজউদ্দীনের সর্বশেষ যুক্তির দিকে এটা আবারও আমাদের ধাবিত করে। ১৯৭২ সালের ৩০ অক্টোবরের সেই ভাষণে তাজউদ্দীন তাই স্বীকারোক্তি সুরে বলে উঠেছিলেন :
‘মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত, প্রত্যেকটি মানুষ সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত কেবল আইন লিখে সুষ্ঠুভাবে আমরা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। তাই আমি আবার বলছি, বারবার বলতে চাচ্ছি যে, যে সমস্ত প্রগতিশীল দল এবং দেশপ্রেমিক দল, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থায় বিশ্বাসী, তাদের কর্তব্য হবে আজকে সেই মানুষ গড়ে তোলা, যে মানুষ সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হবেন, যে মানুষ যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী হবেন। যে মানুষ অপরের থেকে কেড়ে নিয়ে মালিক বনে সমাজতন্ত্রবাদী হওয়ার দাবি করবেন না। ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেই হোন আর যাই হোন, তিনি সেই ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী থেকে কোনো অংশে কম দোষী হবেন না, তার চাইতে কোনো অংশেই ভালো মানুষ বলে পরিচিত হবেন না। কাজেই আজকে সেই মানুষ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে।’
নতুন মানুষ আগে সৃষ্টি হবে, নাকি নতুন উৎপাদন সম্পর্ক আগে সৃষ্টি হবে, নাকি দুই-ই ‘দ্বান্দ্বিকভাবে’ একত্রে সৃষ্টি হবে- এটি মার্কসীয় সমাজ বদলের তত্ত্বের একটি অতি পুরাতন সমস্যা। সম্ভবত তাজউদ্দীন জানতেন যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন কতকগুলি বিষয়ীগত (সাবজেকটিভ) ও বস্তুগত (অবজেকটিভ) অবস্থার ওপরে নির্ভরশীল। সাধারণভাবে সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত সম্পর্কে মার্কস যা বলেছিলেন তা ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। A Contribution to the Critique of Political Economy গ্রন্থের বিখ্যাত ‘ভূমিকায়’ মার্কস লিখেছিলেন :
‘No social order is ever developed before all the productive forces for wihch it is sufficient have been developed, and new superior relations of production never replace older ones before the material conditions for their existence have matured within the framework of the old society.’

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজটিও তাই শুধু ইচ্ছাপূরণের বিষয় না হয়ে বিষয়ীগত এবং বস্তুগত পরিস্থিতির বিকাশের ওপরে নির্ভর করে গড়ে উঠবে। এমনটাই বঙ্গবন্ধু ও তার নিকট সহকর্মীদের দ্বারা প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানের সার্বিক আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসে। তবে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ধারণার মধ্যে কতটুকু গণতন্ত্রের ওপরে জোর দেওয়া হবে, আর কতটুকু সমাজন্ত্রের ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হবে, এ নিয়ে সেদিনের গণপরিষদের ভেতরে এবং বাইরে বেশ কিছুটা ভিন্ন মত ছিল। গণপরিষদের ভেতরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন এই বলে যে, প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক দেশের একটা বড় ত্রুটি তার মধ্যে গণতন্ত্রকে সেভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। যদিও সেসব দেশের সাম্প্রতিক ঝোঁক হলো রাষ্ট্রের আরও গণতন্ত্রায়নের প্রতি। এ জন্যে এসব দেশে নানা ধরনের সাংবিধানিক সংশোধনী আসছে। স্ট্যালিন আমলের সঙ্গে ক্রুশ্চেভের আমলে তুলনা করে তিনি বললেন যে, ‘কে ভুল ছিল, কে শুদ্ধ ছিল, বলব না। তবে ক্রুশ্চেভের সময় থেকে মৌলিক মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রকে দেওয়ার জন্য মানুষের একটা প্রচেষ্টা সোভিয়েট রাশিয়ায় চলছে এবং যা আজকে কোসিগিনকে পর্যন্ত করতে হচ্ছে। তাতে বোঝা যায় রাশিয়ায় আজ গণতন্ত্রকে গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চলছে এবং কালের উত্তরণে এই প্রবণতা যদি এগিয়ে যায়, তাহলে এমন সময় আসতে পারে, যখন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র আনা সম্ভব।’ অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের মডেল সোভিয়েতের জন্যও প্রযোজ্য। গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র আখেরে কার্যকর হয় না এবং সে কারণে এসব দেশের জন্যও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রই চূড়ান্ত পরিণাম হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য। তার মানে ধ্রুপদি সমাজতন্ত্রের মডেলে বেশি করে গণতন্ত্রের প্রতি জোর দিতে হবে। এটাই হচ্ছে মূল যুক্তি :’সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নতুন নতুন কর্মপন্থা যারা দেবে, জনগণ তাদেরকেই ভোট দেবে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র হবে- এই আদর্শকে অবলম্বন করে যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করতে পারে।’ এম মনসুর আলীও একইভাবে মনে করেছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানের ‘সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি অবস্থান’। শুধু তাই নয়, সংবিধানে এর সংযোজন সারা বিশ্বেই একটি অনন্য উদাহরণ :’একমাত্র বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এই যে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি অবস্থান এবং অগ্রসর হওয়া এটা সম্ভব। কেননা, অস্বীকার করার উপায় নাই যে, যে সমাজতন্ত্র জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সত্যিকারের সমাজতন্ত্র হতে পারে না। মানুষের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, বিকাশ লাভ করে, সেই সমাজতন্ত্রই প্রকৃত সমাজতন্ত্র।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

৩. গণতন্ত্রের হাত ধরে এই সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা করা শক্ত- এটা স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে : ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ দীর্ঘকাল ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায় রয়েছেন। সংবিধানে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছে।’ কিন্তু ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা’ আর ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ এ দুটো লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠবে না তো? এই সম্ভাবনা স্বীকার করে বলা হচ্ছে : ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা করতে গিয়ে আমরা যে নতুন পথে চলেছি, সে বিষয়ে আমরা সচেতন। সমাজতন্ত্রের দিকে পরিকল্পিত অগ্রগতির পথে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি হতে না পারে, সেজন্য সংবিধানে কয়েকটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।’ এর মধ্যে একটি হলো, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ‘সম্পত্তির অধিকারকে’ সীমাবদ্ধ করা। উদ্ৃব্দতিটি তাৎপর্যপূর্ণ :

‘সম্পত্তির অধিকার বা ব্যবসা ও বাণিজ্যের অধিকার কোনো কোনো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, ভূমি-সংস্কার ও অন্যান্য ব্যবস্থার পক্ষে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। এই জন্যে আমরা বলেছি যে, আইন সাপেক্ষে এইসব অধিকার ভোগ করা হবে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন মনে করলে সংসদ এই সব অধিকার হরণ করতে বা সীমাবদ্ধ করতে পারবেন। সংসদ যদি সেরকম কোনো আইন প্রণয়ন করেন, তাহলে আদালত তা নাকচ করতে পারবেন না। নাগরিকদের অধিকার রক্ষার পূর্ণ ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করে সম্পত্তি ও ব্যবসা সংক্রান্ত যেসব আইন সংসদ তৈরি করবেন, আদালত সেগুলো নাকচ করতে পারবেন না।’

অর্থাৎ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে এমন ধুয়া তুলে কালক্ষেপণ করা যাবে না। এখানে লিবারেল প্রিন্সিপলকে অতিক্রম করে সোস্যালিস্ট প্রিন্সিপলকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক হিসাবে, মিলকে ছাড়িয়ে এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মার্কসের উত্তরাধিকার। এই সমাজতন্ত্র উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ ধারণার চেয়ে স্পষ্টতই আরও বেশি কিছু। এ কথা স্পষ্ট করে উচ্চারিত হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামের ১৯ অক্টোবরের ভাষণে। সেই ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন, তা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমার দালিলিক আলোচনাকে সমর্থন করে :

‘আমার বন্ধু যারা অনেক সময় ইতিহাসের বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করেন, তারা পর্যালোচনা করে অনেক সময় দেখতে চান না যে, যেদিন সমাজতন্ত্রের প্রোগ্রাম আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছিল, সেদিন আজকের অনেক দল শুধুমাত্র welfare state-এর প্রোগ্রাম নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে যখন আমরা গণতন্ত্রের সংগ্রাম করতে করতে মানুষের অধিকার এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের পন্থাকে চিন্তা করে সমাজতন্ত্রের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলাম, তার পূর্ব হতেই আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম করে আসছিল।’

তারপরও গণতন্ত্রের পথ ধরে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনো যাবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় ছিল অনেকের মনেই। ওই একই বক্তৃতায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছেন : ‘গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব কি সম্ভব নয়, সেই বিতর্কে আমি যাব না। তবে আমরা বিশ্বাস এবং আস্থার সঙ্গে সেই পথ বেছে নিয়েছি। বেছে নিয়েছে সারা জাতি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, একনায়কত্ব নয়।’ সমাজতন্ত্রের দিকে চলার পথে গণতন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কিনা সে সম্পর্কে সাংবিধানিক ধারা সংযোজন করা দরকার এই মর্মে ড. কামাল হোসেন যে কথা ইতোপূর্বে বলেছিলেন, এবার তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তিনি। গণতান্ত্রিক সব অধিকারই থাকবে, শুধু একটি জায়গায় ছাড়া। সেটি হলো শাসনতন্ত্রের তৃতীয় ভাগের ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। সৈয়দ নজরুল বললেন :

‘যারা মনে করেন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব নয়, তারা যে প্রশ্নটি করেন সেটা হলো এই যে, সম্পত্তির মৌলিক অধিকার যদি স্বীকার করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত করা অথবা সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য রাষ্ট্রের যদি যে কোনো সময় সম্পত্তির অধিকার করা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত করার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে তার প্রতি সেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিনা… আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও এই প্রশ্ন এসেছিল। যেদিন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ব্যাংক, ইনসিওরেন্স জাতীয়করণ করার জন্য আইন পাস করেছিল, সেদিন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস জনাব হেদায়েতুল্লাহ তাকে নাকচ করেছিলেন এই বলে যে, সম্পত্তির মৌলিক অধিকারের প্রশ্নের এটা বিরোধী। সেজন্য আমাদের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণেতাগণ অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন ছিলেন বলে এই শাসনতন্ত্রের তৃতীয় ভাগে ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রযোজিত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং মৌলিক আদর্শের প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত করার আদর্শকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।’

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্টের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের- এ কথা সেদিনের গণপরিষদের বক্তৃতায় ব্যাখ্যা করেছেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তার বক্তব্য পরিস্কার- গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার যেমন দীর্ঘদিনের, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ার প্রতিও দলটির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বহু বছর আগে থেকেই চলে আসছে। সেটা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সংগ্রামে আরও বেশি করে গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এর উৎপত্তি আরও আগে। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী অধ্যায়ে ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ঘোষণা ও কর্মসূচির আলোচনায় আমি কিছুটা আলোচনা করেছি। কিন্তু তার একটি সাক্ষ্য পাচ্ছি স্বয়ং তাজউদ্দীন আহমদের সেদিনের ভাষণেও। সেটি এবার শুনে নেওয়া যাক। ৩০ শে অক্টোবরের এই ভাষণে তাজউদ্দীন সংসদে বলেছিলেন :

‘অর্থনৈতিক অধিকারের কথা বলতে গেলে আজকে গর্বের সঙ্গে এই পরিষদে ঘোষণা করতে চাই, আমার দল আওয়ামী লীগ ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসের ৬, ৭, ৮ তারিখে ঢাকার গ্রিন রোডের আমবাগানে যে কাউন্সিল অধিবেশন করেছিলেন, তাতে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে পরিস্কার ভাষায় এ দেশের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। এই সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন ধাপে জাতীয়করণের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়ার বিধান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে গৃহীত হয়। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরবচ্ছিন্নভাবে এ দেশে সমাজতন্ত্রের কথা বলে এসেছেন। আগে সমাজতন্ত্রের কথা মানুষ পরিস্কারভাবে বুঝত না। যারা সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিল তারা মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করত। সমাজতন্ত্রের কথা বললে সমাজতন্ত্রকে ধর্মের সঙ্গে জড়িত করে তাকে ধর্মবিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হতো এবং মানুষের এক অংশকে এ ব্যাপারে দায়ী করা যেত। আজকে আওয়ামী লীগ বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্কারভাবে সমাজতন্ত্র কী, তা বলে দিয়েছে।’

এরপর তাজউদ্দীন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেব সমাজতন্ত্রের কথা তুললেন : ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে আইন প্রণয়নের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় ৪৭ অনুচ্ছেদের কথা।’ এরপর ‘প্রগতিবাদী’ সমালোচকদের উদ্দেশ করে তিনি বললেন : ‘যারা প্রগতিবাদী বলে দাবি করেন, তারা সমালোচনা করছেন এই সংবিধান সমাজতান্ত্রিক সংবিধান নয় বলে। আমি জানি না, সমাজতান্ত্রিক সংবিধান কীভাবে হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে হতে পারে, সে পরিকল্পনা কেউ যদি দিতে পারতেন, তাহলে এই পরিষদ তা অত্যন্ত সতর্কতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতেন। আমি সমাজতান্ত্রিক দেশের বিভিন্ন সংবিধান- ২৫ বছর আগের, ৩০ বা ৫০ বছর আগের সংবিধান দেখেছি। তাতে যে বিধান রয়েছে সে বিধান আজকে বাংলাদেশের সংবিধানের চাইতে যে উন্নত, সে কথা বলা চলে না … তবে বাস্তব ভিত্তিতে এই অবস্থায় এ দেশে সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র করা যাবে কিনা, সেটা দেখতে হবে।’

এটা বলেই তাজউদ্দীন লক্ষ্য করেন যে, সেদিনের বাংলাদেশে সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র দূরে থাক, পূর্ণ গণতন্ত্রও বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন : ‘আজকে আমাদের সামনে সবচাইতে বড় যে কর্তব্য রয়েছে, সেটা হচ্ছে আমাদের সমাজের অবস্থা লক্ষ্য করা। … আজকে আমাদের সমাজের যে অবস্থা, তাতে সমাজতন্ত্র দূরের কথা- পূর্ণ গণতন্ত্রের অবস্থাও আসতে পারে না।’ তাজউদ্দীনের গোটা ভাষণে তার স্বভাবসুলভ বিশ্নেষণী মনের ছাপ আগাগোড়া ফুটে উঠেছে। প্রথমত, ‘কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে’ এবং এই লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতীকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য’ রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার- এ কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে তিনি যোগ করলেন ‘সমবায় ভিত্তিতে যৌথ কৃষি খামার’ করার কথাও, কেননা এ ব্যাপারে (সমবায়ী মালিকানা স্বীকার করে নেওয়ার পর) ‘এই সংবিধানে (আর) কোনো বাধা নেই।’

তাজউদ্দীনের সেদিনের ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ব্যক্তি-পুঁজির প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার আবশ্যকতা নিয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিখাতের মধ্যে সুসামঞ্জস্য অনুপাত থাকা দরকার এটা ব্যাখ্যা করে তিনি যা বললেন তার সরলার্থ হলো বাস্তবের নিরিখে ও কালক্রমে এই অনুপাত পরিবর্তিত হতে পারে। প্রথমত, ‘উঠতি পুঁজিবাদ সম্পর্কে আমরা ব্যবস্থা করেছি’; এই উঠতি পুঁজিবাদ যাতে বিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ না হতে পারে সেদিকে রাষ্ট্রের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। পুরো উদ্ৃব্দতিটি প্রণিধানযোগ্য :’আজকে ব্যক্তিগত মালিকানা, ব্যক্তিগত পুঁজিতে যে সংশয়ভাব দেখা দিয়েছে, তাতে শুধু এটাই আমরা বলতে পারি, আইনের বিধান মোতাবেক ব্যক্তিগত মালিককে যেটা দেওয়া হবে, সেটার মালিকানা সে নিশ্চয়ই আইনের বিধান-অনুযায়ী নির্বিঘ্নে ভোগ করতে পারবে। আইনের বিধান-অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই অর্থনৈতিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু পুঁজিপতিদেরকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাবের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। কাজেই, … আজকে ব্যক্তিগত মালিকানায় উৎসাহ আমরা ততটুকুই দেব, যতটুকু উৎসাহ দিলে ব্যক্তিগত শোষণ, ব্যক্তিগত বঞ্চনা এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব ঘটাবার সুবিধা ব্যক্তি মালিকানায় থাকে না। এটা পরিস্কার থাকা ভালো।’

দ্বিতীয়, ব্যক্তিগত পুঁজিকে যদি নিয়ন্ত্রণে রেখেই বিকাশ করতে দেওয়া হয়, তাহলে সংবিধানে এর নিম্নসীমা-ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হলো না কেন? কেন ব্যাপারটাকে অনংঃৎধপঃ রাখা হলো কেবল ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ত্রিবিধ মালিকানার কথা বলে? এ বিষয়ে তাজউদ্দীনের সুচিন্তিত উত্তর হচ্ছে, পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে মাথায় রাখতে হবে :

“ব্যক্তিগত মালিকানা অবশ্য আইনের বিধান মোতাবেক হবে এবং ব্যক্তিগত মালিক যাতে করে সম্পত্তি বৃদ্ধি করে, মুনাফা বৃদ্ধি করে, সম্পদ বৃদ্ধি করে তার ‘প্রফিট’ দিয়ে আমার সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থাকে বানচাল করতে না পারে, তার ব্যবস্থা আইন অবশ্যই করবে। বলা হয়েছে, তা হলো সেই বিধান সংবিধানে কেন করা হলো না? আমি আগেই বলেছি, সংবিধানে সব আইন, চুলচেরা আইন বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা যায় না, করা বাঞ্ছনীয় নয়। কতটুকু করা হবে, সেটার উচ্চসীমা, নিম্নসীমা কতটুকু থাকবে, সেগুলি সংবিধানে বেঁধে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যৎ সংসদ সে উচ্চসীমা বা নিম্নসীমা, কোন সময় তার কতটুকু সীমা নির্ধারণ করা উচিত, তা বিবেচনা করে দেখতে পারবেন।”

অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সংসদে যারা আসবেন, তারা সে সময়ের পরিস্থিতি বিচার করে ব্যক্তিগত পুঁজির চৌহদ্দি নির্ধারণ করবেন। তবে পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ যে স্বাধীন বাংলাদেশে করতে দেওয়া হবে না, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই সংবিধান প্রণেতাদের মনে।

তৃতীয়ত, অনেকে বলেছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা রয়েছে বলে সমাজতন্ত্র আর থাকে না। এরও উত্তর দিলেন তাজউদ্দীন। তিনি দেখালেন যে, সমাজতান্ত্রিক এমন অনেক দেশ, রয়ে গেছে যেখানে ব্যক্তিমালিকানা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। যেমন- ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদে দেখতে পাবেন সেখানে তারা ৪ প্রকারের মালিকানা দিয়েছে।’

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭২

পূর্বে প্রকাশিতের পর

তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, আমীর-উল ইসলাম, আছাদুজ্জামান খান, আবু সাইয়িদ প্রমুখ। সংবিধান রচনা কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল। কয়েক মাসের কাজের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি সংসদে ‘বিল আকারে’ উত্থাপন করেন ড. কামাল হোসেন। উল্লেখ্য, ১৭ এপ্রিল থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ড্রাফটিং কমিটির ‘৭৪টি বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও ৮ মে’র মধ্যে সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে ‘৯৮টি প্রস্তাব’ জমা পড়ে ড্রাফটিং কমিটির কাছে। অবশ্য এই ৯৮টি প্রস্তাব ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়নি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। এমনকি ড্রাফটিং কমিটির সভার বিবরণীও পরবর্তীকালে পাওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু ৭৪টি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্যে ধারণা করা যায় যে, ড্রাফটিং কমিটিতে বিভিন্ন ধারা ও উপধারার সংযোজন-বিয়োজন নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। বিশেষ বিশেষ শব্দের ব্যবহার নিয়ে মতানৈক্য ঘটেছিল। শেষ পর্যন্ত যে খসড়াটি উত্থাপিত হয় তাতে ৩৪ জনের সবাই একমত হননি। খসড়াতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ আপত্তি জানিয়েছিলেন মোট ৬ জন সদস্য। ১২ অক্টোবরে সংসদে উত্থাপনের পর খসড়া সংবিধানের ওপরে গণপরিষদ সদস্যদের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। এটাও জানানো দরকার যে, সংবিধানটি প্রথমে ইংরেজিতে রচনা করা হয়, এবং পরে তা বাংলায় অনুবাদ করা হয়। বস্তুত ইংরেজিতে লেখা এবং বাংলায় অনুবাদ-কর্ম পাশাপাশি চলছিলো। খসড়া সংবিধানটি সংসদে উত্থাপিত হয় বাংলা ভাষায়। এ ক্ষেত্রে ইংরেজি থেকে ভাষান্তরের জন্য গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান ও কমিটির অন্য দু’জন সদস্য ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ও ড. মজহারুল ইসলাম। ইংরেজি থেকে অনূদিত হলেও এটা পরিস্কার হয়েছিল যে, যদি কখনও ইংরেজি পাঠের অর্থ-উদ্ধার বা ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়, তবে সে ক্ষেত্রে ‘বাংলা পাঠকেই’ চূড়ান্ত পাঠ বা মানদণ্ড হিসেবে ধরা হবে। এজন্য সংবিধানের ‘বাংলা পাঠ’-এর গুরুত্ব অপরিসীম।

উত্থাপিত খসড়ার প্রতিটি ধারা-উপধারার শব্দগত, ব্যুৎপত্তিগত ও তাৎপর্যগত বিচার-বিশ্নেষণ করা হয়। বলা যায়, দীর্ঘ এক মাসব্যাপী উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই কেবল সংবিধানটি সংশোধিত ও পরিমার্জিত হয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সৌভাগ্য ক্রমে, এই সংসদীয় বিতর্কের প্রসেডিংস পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। ভারতের সংবিধান নিয়ে গণপরিষদে বিতর্ক চলেছিল ১১৪ দিন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা চলেছিল ২৪ দিন। আপাতদৃষ্টিতে ওই তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে বিতর্ক সমাপ্ত হওয়ার একটি বড় কারণ ছিল, রাষ্ট্রের মূল মূল পরামর্শ ও নীতিমালার বিষয়ে সেদিনের গণপরিষদে ব্যাপক ঐকমত্যের উপস্থিতি। এই সীমিত বিভেদের পেছনে প্রধান কারণ ছিল, মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জিত সার্বিক রাজনৈতিক উপলব্ধি যা নিয়ে সেদিন গভীর ঐকমত্য বিরাজ করছিল (যার ওপরে পূর্ববর্তী অধ্যায়ে বিস্তৃত দালিলিক আলোচনা করা হয়েছে)।

যেহেতু আমাদের আলোচনার মূল সূত্র আবর্তিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ও সংবিধানের সমতামুখীন আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে, সেহেতু আমরা এখানে বিশেষভাবে নজর দেব কয়েকটি বিশিষ্ট সাংবিধানিক ধারার প্রতি। অর্থাৎ সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা না করে এর অর্থনৈতিক রূপকল্পের মধ্যে আমাদের মনোযোগ সীমিত থাকবে। এই অর্থনৈতিক ধারাগুলোর রাজনৈতিক-দার্শনিক তাৎপর্য নিয়ে অতীতে সেভাবে আলোচনা হয়নি। এসব ধারার বিচার-বিশ্নেষণ করলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে অনেক কাছে থেকে অনুধাবন করা যায়। এক্ষেত্রে আপাতত আমার হাতের কাছে তথ্য-উৎস চারটি : ক. ড্রাফটিং কমিটির রিপোর্ট (যেটি, ১০ জুন ‘খসড়া সংবিধান’ তৈরি হওয়ার সময় একটি আলাদা ডকুমেন্ট হিসেবে প্রস্তুত করা হয়); খ. কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত খসড়া সংবিধান; গ. এই খসড়া সংবিধানের ওপরে বাহাত্তরের গণপরিষদে আলোচনার প্রসেডিংস, এবং ঘ. সংসদে অনুমোদিত চূড়ান্ত সংবিধান। সমকালীন পত্র-পত্রিকায় সংবিধান সম্পর্কিত অনেক বিচার-বিশ্নেষণ নিশ্চয়ই প্রকাশিত হয়েছিল সে সময়ে। কিন্তু সেসব খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ আমার এখনও হয়নি। তাছাড়া সেদিনের অনেক ব্যক্তিই আর জীবিত নেই। ফলে অনেক প্রাসঙ্গিক ‘ইন্টারভিউ’ থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উপরোক্ত তথ্য-উৎসসমূহের ঘনিষ্ঠ পাঠে বঙ্গবন্ধুর ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে কয়েকটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসে।

আমার কাছে প্রথমেই যেটা চোখে পড়েছে তা হলো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য ও আদর্শে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ। সংবিধানের কাঠামোয় গণতন্ত্রের উদারনৈতিকতার নীতি (যাকে আমি বলছি- ‘লিবার্টি প্রিন্সিপল’), আর শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার নীতি (যাকে আমি বলছি- ‘সোশ্যালিস্ট প্রিন্সিপল’)- এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করার দুরূহ কাজে হাত দেওয়া হয়েছিল সেদিন। এই চ্যালেঞ্জটাই বঙ্গবন্ধু সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। ড্রাফটিং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল :

‘The Committee has also been conscious that at least in one major aspect it would be breaking new ground in making promises which would fulfill the pledge embodied in the preamble that ‘It shall be a fundamental aim of the state to realise through the democratic proces a socialist society, free from exploitation.’

অর্থাৎ শুধু চার মূলস্তম্ভকে- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- সংবিধানের বিভিন্ন দফা-উপদফার মধ্যে প্রতিফলিত করাই নয় ড্রাফটিং কমিটির কাজ (সেটা তো একটা প্রাথমিক কর্তব্য বটেই)। এর সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত সাংবিধানিক নিরাপত্তা-কবচ (safe-guards) তৈরি করা। কেননা, তৃতীয় বিশ্বের পটভূমিতে এরকম গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সাংবিধানিক রূপ- অন্তত আগে থাকতেই ঠিক করে নিয়ে বা পূর্ব-নির্ধারিতভাবে-এর আগে কখনও রচিত হয়নি। এমন এক সংবিধান হতে হবে যেখানে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এ দুইয়ের মধ্যে কোনোটিকেই ভারসাম্যহীনভাবে ভারী করে তোলা হবে না। দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়সাধনের চেষ্টা করা হবে সচেতনভাবে- যাতে করে কোনো একটি আদর্শের প্রতি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গতিমুখ একপেশেভাবে ঝুঁকে না যায়।

এরকম সমন্বয়ের সমাজ তথা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারা সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াই বাস্তবে অব্যাহত রাখা যাবে কিনা আগামী দিনগুলোয়- বাহাত্তর সালেই সে প্রশ্ন উঠেছিল। অবস্থার দুর্বিপাকে, দেশি-বিদেশি শত্রুর চাপে, লিডারশিপের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের কারণে, বা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত ঝুঁকির কারণে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে- এ বিষয়ে সংবিধান প্রণেতারা (এবং বঙ্গবন্ধু) অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। তারপরও একটাকে বিসর্জন দিয়ে অন্যটিকে আঁকড়ে ধরতে চাননি তারা। কয়েকটি উদাহরণ।

খসড়া সংবিধান নিয়ে গণপরিষদে আলোচনা করতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তার সূচনা বক্তব্যে বললেন, ‘শাসনতন্ত্র ছাড়া কোনো দেশ- তার অর্থ মালিকবিহীন নৌকা, হালবিহীন নৌকা। শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকার থাকবে, শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে কতর্ব্যও থাকবে।’ এখানে বলা দরকার, গান্ধী Universal Declaration of Human Rights-এর পাশাপাশি Universal Declaration of Human Duties-এর ঘোষণা চেয়েছিলেন। অধিকার ও কর্তব্য-এ দুইয়ের অন্তর্লীন যোগাযোগ স্মরণ করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সংবিধানের মূল আদর্শকে আবারও তুলে ধরলেন সংসদ সদস্যদের সামনে:

‘এবং যতদূর সম্ভব, যে শাসনতন্ত্র পেশ করা হয়েছে, সেটা যে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে, তা সম্বন্ধে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের আদর্শ পরিস্কার হয়ে রয়েছে। এই পরিস্কার আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এবং সে আদর্শের ভিত্তিতে এদেশ চলবে। জাতীয়তাবাদ- বাঙালি জাতীয়তাবাদ- এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ চলবে বাংলাদেশে। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাঙালির রক্ত দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদ। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকারকে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে। যেখানে শোষণহীন সমাজ থাকবে। শোষক শ্রেণি আর কোনোদিন দেশের মানুষকে শোষণ করতে পারবে না। এবং সমাজতন্ত্র না হলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ৫৪,০০০ বর্গমাইলের মধ্যে বাঁচতে পারবে না। সে জন্য অর্থনীতি হবে সমাজতান্ত্রিক। আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। … কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। … এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে বাংলার শাসনতন্ত্র তৈরি হবে। এটা জনগণ চায়, জনগণ এটা বিশ্বাস করে। জনগণ এজন্য সংগ্রাম করেছে। লক্ষ লক্ষ লোক এই জন্য জীবন দিয়েছে। এই আদর্শ নিয়েই বাংলার নতুন সমাজ গড়ে উঠবে।’

এর পরে ভাষণ দিতে উঠলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। সেখানে তিনি প্রথমে সমাজতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করলেন এবং পরে গণতন্ত্রকে রেখে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সমস্যা সম্পর্কে ইঙ্গিত করলেন। উদ্ৃব্দতিটি বড়, কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সম্পর্কে সেদিনের সংসদের Pulse বোঝার জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর বিশেষ বিশেষ দিকটি নিচে তুলে ধরা হলো।

১. অনুন্নত দেশের পটভূমিতে ‘সমাজতন্ত্র’ আর উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’-এর মধ্যে পার্থক্য আছে : ‘আমাদের কাছে সমাজতন্ত্র বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি। সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে আমরা বুঝি এমন এক সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে জাতিকে এবং জাতীয় অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে আত্মত্যাগের প্রয়োজন, সকলে তা ভাগ করে নেবে। আবার সকলের প্রচেষ্টায় যে সম্পদ গড়ে উঠবে, তাও সকলে সুষমভাবে ভাগ করে নেবে। আমাদের সংবিধানে তাই সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্র পরিচালনার একটা মূলনীতি বলে ঘোষিত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মালিকানার নীতিতে বলা হয়েছে যে, প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে। আর আইন যে সীমা নির্ধারণ করবে, সেই সীমার মধ্যে সমবায়গত বা ব্যক্তিগত মালিকানা থাকবে।’ অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির চরিত্র হবে মালিকানা-সম্পর্কের দিক থেকে ‘মিশ্র চরিত্রের’, যদিও Mixed Economy শব্দটি সেদিন ব্যবহূত হয়নি।

২. শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানা নয়, এই সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য মানুষকে শোষণ থেকে মুক্তি দেওয়া এবং তাকে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ ও সুযোগের অধিকার দেওয়া : ‘সর্বপ্রকার শোষণ থেকে কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশকে মুক্তিদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ যাতে সকল নাগরিক লাভ করতে পারেন, সেই দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। সকল নাগরিক যাতে সমান সুযোগ পেতে পারেন এবং রাষ্ট্রের সর্বত্র যাতে সমান স্তরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লাভ করা যায়, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবেন।’ অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে নাগরিকেরা দার্শনিক জন রাউলস (Rawls) এর ভাষায় শুধু Formal Equality of Opportunity নয়, তারা Substantive Equality of Opportunity-রও অধিকারী হবেন। এর অর্থ, এটা শুধু যেনতেনভাবে পাওয়া মৌলিক সুযোগের সমতা বিধান নয়। এখানে গুণে-মানের সমতারও (Equality of Standards) কথাও থাকছে। দ্বিতীয়ত, এখানে শুধু  Equality of Opportunity বা সুযোগের সমতার মধ্যেই আলোচনা সীমিত রাখা হয়নি। Equality of Outcomes-র কথাও অনুমিত থাকছে। সুযোগের সমতার পাশাপাশি নাগরিকেরা যাতে করে সর্বত্র ‘সমান স্তরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ লাভ করেন, রাষ্ট্র তা ‘নিশ্চিত করবে’- এটার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭১

পূর্বে প্রকাশিতের পর
৮. বাহাত্তরের সংবিধানের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র
বঙ্গবন্ধু মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছিলেন না। তবে সত্যের ওপরে কেবল তো ‘মার্কসবাদীদেরই’ মনোপলি নেই। পুঁজিবাদী সমাজের তুলনায় সমতাবাদী সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের মতো বঙ্গবন্ধুর এই বিষয়ে চিন্তা স্বচ্ছ ছিল। যদিও তার লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ গড়া, কিন্তু লক্ষ্যটা যে অনেক দূরের স্টেশন, এ রকম একটা কৃষিপ্রধান পশ্চাৎপদ সমাজের পটভূমিতে সহজে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেটা তিনি পঞ্চাশের দশকেই বুঝতে পেরেছিলেন। সুতরাং সমাজতন্ত্র তার কাছে কোন  End-State নয় বরং একটি Process বা দীর্ঘকালীন অভিযাত্রার মতো বিষয় বলেই প্রতিভাত হয়েছিল। অর্থাৎ এটি কোনো তিন বা পাঁচ বছরে সমাধা করার মতো চ্যালেঞ্জ নয়। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি যে, ১৯৭২-৭৫ পর্বে তিনি সমাজতন্ত্র অর্জনের অনিবার্যতার পাশাপাশি এর দীর্ঘ পথযাত্রার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মার্কস বা লেনিনের মতো তত্ত্বচর্চা করেননি তিনি, কিন্তু বাস্তব কাণ্ডজ্ঞানের জোরে ‘আদর্শ’ ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য এক সুদীর্ঘ ‘প্রস্তুতি-পর্বের’ মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে পেরেছিলেন। সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ১৯৭৪ সালের ৪ ডিসেম্বরের ভাষণে আবারও ফিরে যেতে হয়। সেখানে তিনি বারবার বলছেন যে গণতন্ত্রের কাঠামোয় সমাজতন্ত্রের পথে যাত্রা করা সহজ নয়। এমনকি যারা দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জন্য গণতন্ত্রের হাত ছেড়ে দিয়েছিল, তারাও এখনও সমাজতন্ত্রে পৌঁছাতে পারেনি:
‘সোশ্যালিজম যেখানে শুরু হয়েছে সে সোভিয়েত ইউনিয়নে আজ ৫১ বৎসর হয়ে গেছে সোশ্যালিজম করতে পারে নাই। এখনও ঘাত-প্রতিঘাতে অগ্রসর হচ্ছে, নতুন নতুন পথ তাদের জানতে হচ্ছে। এ রাস্তা সোজা রাস্তা নয়, এ রাস্তা কঠিন রাস্তা।’
যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্যই এটা প্রযোজ্য হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান এবং প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশের পক্ষে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করা কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু কোনো রাখঢাক করেননি :
‘পরিস্কার কথা … সোশ্যালিজম এত সোজা না। আমরা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি যাতে ভবিষ্যতে এ দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়। সে পদক্ষেপ নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। বাধা আমাদের আসবেই। যাদের কাছ থেকে আমরা সম্পদ নিয়েছি, যারা এখানে সম্পদ ফেলে গেছে, তাদের দালালরা, বিদেশি শক্তিরা তারা আজকে চেষ্টা করছে আমাদের এই সমাজতান্ত্রিক ইকোনমি বানচাল করার জন্য। যাতে প্রডাকশন কম হয়, যাতে দুশমনরা খুশি হয়, মানুষের কষ্ট হয়। … এত তাড়াতাড়ি কিছু দিবার ক্ষমতা আমাদের নেই। … আমরা একটা সিস্টেম নিয়েছি। যে সিস্টেমে আমাদের কোনো অসুবিধা হতো না যদি সোশ্যালিজম না নিতাম। … যখন আমাকে আঘাত করতে হয়েছে, বুঝে শুনে আঘাত করেছি। … ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, কোম্পানি, মিল-ইন্ডাস্ট্রিজ, ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট যদ্দুর পারা যায় হাতে নিয়ে নেও। কষ্ট হবে, বুঝতে হবে এক্সপিরিয়েন্স নাই। ভবিষ্যতে, অদূর ভবিষ্যতে সোশ্যালিজম [হবে বলে] আজকে লেট করা যায় না। ১০ বৎসর, ২০ বৎসর, ২৫ বৎসর পর লেট করা যায়। এইটা মানুষকে বুঝতে হবে, যারা সোশ্যালিজমে বিশ্বাস করে। যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা না বুঝলে উপায় নাই। সোজা রাস্তায় হয় না। সে জন্যে সে পথ আমাদের ছাড়তে হবে।’
দেখা যাচ্ছে যে, দুটো চিন্তাই বঙ্গবন্ধুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে রাতারাতি যেমন সমাজতন্ত্র গড়া যাবে না, অন্যদিকে, সমাজতন্ত্র দূরের স্টেশন বলে প্রগতিশীল পদক্ষেপ নেওয়া থেকে আজকে বিরত থাকা যাবে না। ‘দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য’ এবং ‘আসন্ন কর্তব্য’ উভয়ের মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। এবং সেই ভারসাম্যতা বজায় রাখতে হবে গণতন্ত্রকে রক্ষা করেই। তা-ও আবার কৃষিপ্রধান পশ্চাৎপদ সমাজের পটভূমিতেই। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় কেন মুজিবের পক্ষে সমাজতন্ত্রকে একটি  ‘end-state’ হিসেবে দেখা সম্ভব ছিল না, এবং কেন সমাজতন্ত্রকে তিনি একটি ‘চলমান প্রক্রিয়া’ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, পুঁজিবাদের ‘প্রগতিশীল’ অর্জন ও বিকাশের ধারার মধ্যেই তিনি ‘সমাজতান্ত্রিক’ উপাদানগুলোকে লালন ও বৃদ্ধিশীল করতে চেয়েছিলেন। এই বিষয়টি তিনি মার্কস চর্চা করে বোঝেননি, বুঝেছিলেন ইনটুয়েটিভলি। তবে এ ধরনের ভাবনার আলো-হাওয়ার মধ্যেই তিনি বাস করছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে, এটা অনুমান করা শক্ত নয়। ১৯৭৪ সালেই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন-এর উদ্যোগে কনফারেন্স ‘দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ উইদিন এ সোশ্যালিস্ট ফেমওয়ার্ক’ (পরে এটি বই আকারেও প্রকাশিত হয়)। অনুন্নত কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে ‘সমাজতান্ত্রিক রূপরেখা’ কীভাবে দাঁড়াতে পারে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদেরা। দূরের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র এবং কাছের লক্ষ্য অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও তার প্রগতিশীল রূপান্তর- এই দুটো বিষয়ই সেই সম্মেলনে স্থান পেয়েছিল। সুতরাং দূর এবং আশু কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু নানা উৎস থেকেই তথ্য ও প্রেরণা পাচ্ছিলেন। তবে এটি শুধু গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র নয়, সমাজতন্ত্রের সার্বিক ধারণার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মার্কস-এঙ্গেলস, এমনকি লেনিন শেষ পর্যন্ত এটা মেনে নিয়েছিলেন সমাজতন্ত্র বিনির্মাণকে ‘End-State’ হিসেবে না দেখে বরং ‘Process’ হিসেবেই দেখা শ্রেয়তর। তার অর্থ, পুঁজিবাদের উপাদানগুলোর পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের উপাদানগুলো অবস্থান করবে, জন্ম নেবে এবং আর্থসামাজিক রূপান্তরের ধারায় সমাজতন্ত্রের উপাদানগুলো ক্রমশই জয়যুক্ত হয়ে সমাজতন্ত্রকে আখেরে বিজয়ী করবে। সমাজতন্ত্রের আদর্শকে যদি Socialism-as-an-end-state হিসেবে না দেখে Socialism-as-a-process হিসেবে দেখা যায় তাহলে বৃহৎ-উল্লম্ম্ফনমূলক হঠকারী কর্মসূচিকে যেমন পাশ কাটানো যায়, আবার পুঁজিবাদের স্বয়ংক্রিয় ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত বিকাশের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করার নিষ্ফ্ক্রিয় অবস্থানকেও এড়ানো সম্ভব। নিউ ইকোনমিক পলিসি (NEP) নিয়ে লেনিনের নানা বক্তব্যের মধ্যে Socialism-as-a-process এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সমর্থন স্পষ্ট হয়।
সমাজতন্ত্রে পৌঁছাতে হলে যে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে তার ইঙ্গিত লেনিনের লেখাতেই পাওয়া যায়। ইনট্রোডিউসিং নিউ ইকোনমিক পলিসি শীর্ষক ভাষণে লেনিন বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র জোতের কৃষিব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে কয়েকটা প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। তার মানে এটা বলছি না যে, শতাব্দী লেগে যাবে। কিন্তু আমাদের মতো এতো বড় দেশে সবাইকে ট্রাক্টর যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সুবিধা এবং বিদ্যুৎ দিতে হলে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। এটাই অবজেকটিভ পরিস্থিতি।’ তার মানে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পর্ব সম্পন্ন করার বিষয়টি এক-দুই বছরের নয়, কয়েক দশকের ও প্রজন্মের ব্যাপার এটি। সেরকম সময়ে গ্রামীন অর্থনীতিতে সমবায়ী খাতের পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকেরাও থেকে যাবে এক সুদীর্ঘ কাল।
পুঁজিবাদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্র অনেক দিন পর্যন্ত অবস্থান করে চলতে পারে- পুঁজিবাদের ‘ভেতর থেকেই’ যে সমাজতন্ত্রের অনেক ‘বস্তুগত ভিত্তির’ জন্ম হয় বা হতে পারে- এ কথা লেনিন অনেকবারই বলেছেন। একটি উদাহরণ কেবল এখানে দেব। অক্টোবর বিপ্লবের পরও যে নারীরা ‘স্বাধীন’ হতে পারছে না, তার কারণ বাসার কাজের বোঝা তাদের ওপরে পূর্বাপর থেকেই যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি বিশেষ করে তাকাতে বললেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের বেশ কিছু প্রগতিশীল উদ্ভাবনের প্রতি। পুরো উদ্ৃব্দতিটি বর্তমান আলোচনার জন্য প্রণিধানযোগ্য। লেনিন লিখেছেন :
‘Do we take proper care of the shoots of communism which already exist in this sphere? Again the answer is no. Public catering establishments, nurseries, kindergartens- here we have examples of these shoots which can really emancipate women. These means are not new, they (like all the material prerequisites for socialism) were created by large-scale capitalism.’

পুঁজিবাদী দেশগুলোয় সর্বজনীন নির্বাচনী ব্যবস্থায় উত্তরণ, সর্বজনীন স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা-ব্যবস্থা, সর্বজনীন ও মৌলিক শিক্ষাবিধির প্রচলন, বেকার ভাতা ইত্যাদি ধারণাগুলো এমনিতেই অর্জন হয়নি। এর পেছনে ছিল শ্রমিক শ্রেণির নিরন্তর আন্দোলন-সংগ্রাম, অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকট, বিপ্লব ও বিপ্লবপ্রচেষ্টা, যুদ্ধ ও যুদ্ধের কারণে বদলে যাওয়া সামাজিক-শ্রেণি শক্তির পুনর্বিন্যাস প্রভৃতি উপাদানের চাপ। প্যারি কমিউন না হলে বিসমার্কের জার্মানিতে (সামাজিক গণতন্ত্রীদের ক্ষমতায় আসারও ঢের আগে) ‘Social State’-এর জন্ম হতো না। ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ ধারণার পেছনে বিসমার্ক থেকে শুরু করে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সোশ্যাল ডেমোক্রেটসরা, লিবারেল কান্ট-মিল থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মার্কস-এঙ্গেলস সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন। ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে’ মার্কস-এঙ্গেলস যেসব ‘গণতান্ত্রিক দাবি’ তুলেছিলেন তা কোনো দূর-ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির জন্য বিশিষ্ট দাবি নয়। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি যে, যাকে আমরা আজকে ‘Social democracy’ বলি, তার অধিকাংশ দাবিই উদারনৈতিক গণতন্ত্রী আর কট্টর সমাজতন্ত্রী মতের অনুসারীদের কখনও বিচ্ছিন্ন, কখনও সমবেত, আন্দোলন-সংগ্রামেরই ফসল। এসব Social Democratic দাবি-দাওয়ার কোনটি লিবারেলদের সংগ্রামের অর্জন, কোনটি সামাজিক গণতন্ত্রীদের বা কোনটি কমিউনিস্টদের সংগ্রামের প্রভাব সেটি চুলচেরা বিশ্নেষণ করে বলা সত্যই কঠিন কাজ। মিল, বার্নস্টাইন এবং লেনিন যথাক্রমে লিবারেল, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ও কমিউনিস্ট ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এই ত্রিধারার মধ্য থেকেই যার যার মতো করে অতীতে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ধ্যান-ধারণা বলার চেষ্টা করা হয়েছে এবং বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে। এটুকু বলা যায়, বঙ্গবন্ধু ও তার নিকট সহযাত্রীরা মোটা দাগে এসব ধারা ও উপধারা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি এসব আন্দোলনের জল-হাওয়াতেই বড় হয়ে উঠেছেন এবং রাজনৈতিকভাবে পরিপকস্ফ হয়েছেন। এ কথা তিনি জানতেন যে, সব ধারার মধ্যেই শিক্ষণীয় ও বর্জনীয় দিক রয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রূপান্তরের জন্য তিনি বিভিন্ন সূত্র থেকে ধ্যান-ধারণা ও অভিজ্ঞতা আহরণের পক্ষপাতী ছিলেন। এই ‘প্রাগম্যাটিক’ চিন্তাই লেনিনের ভাষায় ‘প্র্যাকটিক্যাল ইকোনমিকস’- তাকে সংবিধানের ‘৪টি স্তম্ভ’ নির্বাচনে সাহায্য করেছে। তিনি গণতন্ত্রও চান, সমাজতন্ত্রও চান। ধর্মনিরপেক্ষতাও চান, আবার বিশেষ চিহ্ন সম্বলিত জাতীয়তাবাদও অবলম্বন করতে চান। কোনোটিকেই তিনি অন্যটির চেয়ে বেশি ‘গুরুত্ব’ দিতে চান না। এই মূল আদর্শের মধ্যে আবার রয়ে গেছে নানা ধারা ও উপধারা। সেসব মিলিয়ে একটি দূরদর্শী কিন্তু বাস্তবোচিত ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তিনি গড়তে চেয়েছিলেন। বলেও ছিলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য সব উৎসের দিকে তিনি হাত বাড়াতে প্রস্তুত। তারই প্রতিফলন ঘটে বাহাত্তরের সংবিধানে।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে (যে ভাষণে জাতীয়করণের নীতি ঘোষিত হয়) বঙ্গবন্ধু জানালেন যে, তিনি সংবিধান তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। এ নিয়ে অযথা কালক্ষেপণ করতে চান না তিনি। এ নিয়ে বিলম্ব করায় পাকিস্তান রাষ্ট্র যথাযথভাবে পরিচালিত হতে পারেনি, সামরিক বাহিনী রাষ্ট্র ক্ষমতায় জেঁকে বসেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ৬-দফার ভিত্তিতে সাংবিধানিক প্রশ্নের অনিষ্পত্তির কারণে পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছিল। সে জন্যেই স্বাধীন দেশে তার ফার্স্ট প্রায়োরিটি হয়ে দাঁড়ায় একটি আধুনিক, প্রগতিশীল, কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখীন সংবিধান নির্মাণ। উপরোক্ত ভাষণে তিনি জানালেন : ‘বিশেষজ্ঞরা খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কাজ অনেকটা অগ্রসর হয়েছে এবং খসড়া শাসনতন্ত্র গণপরিষদের সামনে পেশ করা হবে। এই শাসনতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’।
এই ভাষণের দুই সপ্তাহ পরে (১০ এপ্রিল, ১৯৭২) গণপরিষদের অধিবেশনে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ সম্পর্কিত প্রস্তাব পাস হয়। এই ঘোষণার পরের দিন (১১ এপ্রিল, ১৯৭২) সংবিধান তৈরির জন্য একটি ‘ড্রাফটিং কমিটি’ (Constitution Drafting Committee) গঠিত হয়। যার নেতৃত্ব দেন কমিটির সভাপতি হিসেবে ড. কামাল হোসেন। এ কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৪ জন; সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছাড়া বাদবাকি সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের থেকে।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

ধারাবাহিক

পর্ব ::৭০

পূর্বে প্রকাশিতের পর
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের অভিজ্ঞতা জনচৈতন্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। যার প্রতিফলন এসে পড়েছিল রাজনৈতিক মতাদর্শেও। এরই যৌক্তিক আদর্শিক পরিণতি ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সেক্যুলারিজম। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন আহমদ রফিক, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন মতিন আহমদ চৌধুরী। এর প্রায় প্রতিটি সংখ্যা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। ‘কনটেন্ট-এনালাইসিস’ করে দেখা যায় যে নিয়মিতভাবে তাতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ সম্পর্কে প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট সংখ্যায় অর্থাৎ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক এক দিন আগে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাষণ ছাপা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল :’বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হচ্ছে আমাদের আদর্শ। বিশ বছরের ক্রমাগত সংগ্রামের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে এই আদর্শকে আমরা আজকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরছি। অসাম্প্রদায়িকতা বা ‘সেক্যুলারিজমের’ মহান আদর্শ বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আমরা বিশ্বের কাছে তুলে ধরছি। … গণতন্ত্র অর্থই হলো অসাম্প্রদায়িকতা। যেখানে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, সেখানে গণতন্ত্র কোনো দিন কার্যকরী হতে পারে না। আজ আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি বলে অসাম্প্রদায়িকতা বা সেক্যুলারিজমে বিশ্বাস করতে হবে। বাংলার প্রতিটি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যারা আছেন তাদের মধ্যে এ প্রত্যয় জন্মাতে হবে যে আপনারা সবাই বন্ধু। আর ভবিষ্যৎ বাংলার সুখের সবাই আপনারা রূপ দিতে যাচ্ছেন।’
এই একত্র-বোধের চেতনা জন্ম ত্বরান্বিত হয়েছে ১৯৭১ সালের সামষ্টিক প্রতিরোধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘জয় বাংলার’ ১৫ অক্টোবর সংখ্যায়। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও নতুন বাঙালী জাতীয়তাবাদকে পরস্পর-সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছিল :
‘মাত্র চব্বিশ বছর আগে সাম্প্রদায়িক জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রের পত্তন হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সাম্প্রদায়িকতাকে পরিহার করে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক জাতীয়তার ভিত্তিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতার জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে কাতারবন্দি হয়েছে। শুধু মাঠে ময়দানে স্ল্নোগান দেয়া নয়, একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাতিয়ার হাতে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে হত্যা করছে, প্রাণ দিচ্ছে। বাংলাদেশের সকল ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষ, বাঙালি জাতি হিসেবে প্রাণ নেয়া ও দেয়ার মিলিত রক্তধারায় যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছে, এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তা অনন্য। সাম্প্রদায়িকতাবাদের কবর রচনায় ইতিহাসের এই অনন্য অধ্যায়ের ভূমিকা অপরিসীম ও সুদূরপ্রসারী। … অন্যান্য বিষয় বাদ দিলেও শুধু বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই অভ্যুদয়কে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ মৌলিক অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানাতে হয়।’
দেখা যাচ্ছে যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ‘গণতন্ত্র’ অংশটিতে মূল্যবান সংযোজন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থান। ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্দেশিত অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনার বিকাশের ধারায় এটি ছিল একটি মৌলিক অর্জন। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ‘সমাজতন্ত্র’ অংশটিতেও মৌলিক উপলব্ধি এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই উচ্চারিত হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি। ১১ মে ১৯৭১-এর ‘জয় বাংলার’ প্রথম সংখ্যায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে লেখা :’স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সকল রকমের অত্যাচার, অবিচার, অন্যায় ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে এক সুখী, সমৃদ্ধ সুন্দর সমাজতান্ত্রিক ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েমে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
১৯ মে ১৯৭১-র ‘জয় বাংলার’ দ্বিতীয় সংখ্যায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বললেন যে, ‘নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জনগণকে যেসব ওয়াদা দিয়েছিল তার প্রতিটি তারা পালন করবে। তিনি জানান যে, তার সরকার ভূমিহীনকে ভূমিদান, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, বড় বড় শিল্প জাতীয়করণ করে দেশকে সমাজতন্ত্রের পথে নিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’ আবারও দেখা যাচ্ছে ১৯৭২ সালের আগেই মুক্তিসংগ্রামের মধ্যেও ভূমিবণ্টন, জাতীয়করণ ও সমাজতন্ত্রের কথা এসেছে।
‘জয় বাংলার’ ২ জুন ১৯৭১ সংখ্যা থেকে একটি ধারাবাহিক শুরু করা হয়। যার নাম ছিল- ‘আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোর কয়েকটি দিক’। ৯ জুলাই পর্যন্ত তা চলতে থাকে। এতে আরেকবার দলের অর্থনৈতিক নীতিমালা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দলের প্রধান মুখপত্রটিতে আবারও বলা হয় সমতামুখীন সমাজের প্রতি আওয়ামী লীগ ও মুজিবনগর সরকারের অব্যাহত কমিটমেন্টের কথা :’শোষণমুক্ত একটা ন্যায় ও সাম্যবাদী সমাজ গঠন করাই এই অর্থনৈতিক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এটা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপকল্প- যাতে অর্থনৈতিক অবিচার দূরীকরণ ও দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করা হবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ও সকল স্তরের মানুষের মধ্যে এই সমৃদ্ধির ফল যথাযথ বণ্টনের বিধান থাকবে।’
এই কমিটমেন্ট মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে উচ্চারিত হয়েছিল। ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন ২৩ নভেম্বর। বিজয়ের প্রায় এক মাস আগের এই ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধুর ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ ধারণাটিকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে :’আমাদের আজকের সংগ্রাম সেদিনই সার্থক হবে যেদিন আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। সমাজের যে ভবিষ্যৎ রূপ আজ বাংলাদেশের জনসাধারণ প্রত্যক্ষ করেছেন সেখানে সকলের সমানাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গঠিত হবে এবং উন্নয়ন ও পরিপূর্ণতার সাধারণ লক্ষ্যে উপনীত হবার প্রয়াসে সকলে অংশগ্রহণ করবেন।’
এই সমাজতন্ত্র ছিল ‘গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে’ সমাজতান্ত্রিক ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা- যেটি আওয়ামী লীগের ঘোষণা ও কর্মসূচিতে ইতিপূর্বে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এই সমাজতন্ত্রের উদ্ভবস্থল বাংলাদেশেই। এটি এমনকি সংগ্রাম চলাকালীন অন্যান্য দলের নেতারাও অনুধাবন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে কারও আপত্তি থাকা উচিত নয়’, এবং যোগ করেছিলেন যে, ‘এ বিপ্লব বাইরের কোনো দেশ থেকে আমদানি করা হয়নি, কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে তো নয়ই।’ তিনি আরও লক্ষ্য করেন যে, ‘বাংলাদেশের এ বিপ্লবের গুরুত্ব কোনো অংশেই চীন ও রাশিয়ার বিপ্লবের চেয়ে কম নয়। এটা বাংলাদেশের মানুষের সর্বাত্মক বিপ্লব।’ সবাই এই ব্যাখ্যার সাথে একমত ছিলেন তা অবশ্য নয়। পার্থক্যটা ছিল সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তার মাত্রায় ও গভীরতায়। ১৮ নভেম্বর সল্টলেকে শরণার্থীদের এক জনসভায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মীজানুর রহমান চৌধুরী যেমন বিকল্প ফর্মুলেশন হিসেবে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র না বলে একে অভিহিত করেছিল ‘গণতান্ত্রিক সমাজবাদ’ রূপে। কিন্তু পার্থক্যটা ছিল প্রবণতায় ও ঝোঁকে। কেউ ‘গণতান্ত্রিক’ উপাদানের ওপরে বেশি করে জোর দিয়েছিলেন (যেমন, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি), আবার কেউ দৃষ্টি দিচ্ছিলেন এর ‘সমাজতান্ত্রিক’ উপাদানের প্রতি। কিন্তু দুটো উপাদানই অর্থনৈতিক মতাদর্শে থাকতে হবে যা নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে কোনো সংশয় বা বিতর্ক ছিল না। সেদিন মুক্তিসংগ্রাম চলাকালেই তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোর’ আলোকে ‘আমরা ইতিমধ্যেই মুক্ত এলাকায় ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সমাজবাদ কায়েমের কাজ শুরু করে দিয়েছি।’ এ বিষয়ে প্রায়-সর্বস্তরে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছিল এটা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারাও একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক উদারমনা ব্যবস্থা কামনা করতেন। একজন গেরিলা নেতা আবদুল মান্নানের উদ্ৃব্দতি দিয়েছিল ‘নিউজ উইকের’ ২২ নভেম্বর সংখ্যায়। রচনাটির শিরোনাম ছিল- ‘বাংলা :প্রতিশোধের মুহূর্ত’। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মান্নান বলছেন : ‘আমরা জয়ী হলে সত্যিকারের গণতন্ত্রই আমরা লাভ করব। অন্যান্য উন্নতিশীল রাষ্ট্রের মতো স্বাভাবিকভাবেই আমাদেরও সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থাকবে, কিন্তু সাম্যবাদী নয়। আমরা একটি নতুন জাতি, বাংলাদেশের জন্যই এ লড়াই করছি।’ প্রথাগত সোভিয়েত বা চীনের সমাজতন্ত্রের মডেলের চেয়ে আলাদা করে ভাবার চেষ্টাটা এখানে লক্ষণীয়। এক কথায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র-এর সমাজবাদ নিয়ে বিভিন্নমুখী ঝোঁক বা উপলব্ধি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এবং সাধারণভাবে মুক্তিযোদ্ধা জনগণের মধ্যে বিরাজ করছিল। কিন্তু তার মধ্যে সমতাবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে ‘নূ্যনতম ঐক্যের’ জায়গাটিতে কখনও ফাটল ধরেনি, আর সেটি হচ্ছে এক উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সমতামুখীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। এর দু’দিন আগেই বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে ভারত ও ভুটানের পক্ষ থেকে। বিজয় তখনও অর্জিত হয়নি। এই প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভের পটভূমিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বেতার ভাষণে ঘোষণা করলেন : ‘নবজাত স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ শান্তিপূর্ণ অবস্থান, জোটনিরপেক্ষতা এবং সকল প্রকার ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতন্ত্রী জীবন গঠনে অভিলাষী।’
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী তখন ঢাকার দ্বারপ্রান্তে। বিজয় সমাগত- রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন এটা জেনে গেছেন। তাজউদ্দীন আহমদ বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে একটি দীর্ঘ ভাষণ দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের বহু প্রতীক্ষিত অভ্যুদয়, কিন্তু তাজউদ্দীনের মনে বিষাদের ছায়া। কেননা, মুজিব তখনও কারাগারের নির্জন সেলে বন্দি। তার ওপর থেকে মৃত্যুদণ্ডাদেশের ঝুঁকি চলে যায়নি। অপ্রকৃতিস্থ ইয়াহিয়া কী করে বসেন তা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এই বিষাদের মধ্যেও তাজউদ্দীন নবজাত রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা আবারও স্মরণ করতে ভুললেন না। এই নতুন রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত থাকলেও চার আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সেদিনের নেতৃত্ব ছিলেন বদ্ধপরিকর। পুরো উদ্ধৃতিটি নেহরুর Tryst with Destiny বক্তৃতার চেয়ে (যেটি ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্যরাত্রিতে দেওয়া হয়েছিল) কোনো অংশে কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় :’বাংলাদেশের মানুষের এই আনন্দের মুহূর্ত তবু ম্লান হয়ে গেছে এক বিষাদের ছায়ায়। বাংলাদেশের স্বপ্ন যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাস্তবে রূপায়িত হলো, তখন সেই স্বপ্নের দ্রষ্টা, বাঙালি জাতির জনক, শেখ মুজিবুর রহমান শত্রুর কারাগারে বন্দি হয়ে আছেন। দেশবাসীর নিকটে অথবা দূরে, যেখানেই থাকুন না কেন, বঙ্গবন্ধু সর্বদাই জাগরূক রয়েছেন তাদের অন্তরে। যে চেতনা আমাদের অতীতকে রূপান্তরিত করেছে, তিনি সেই চেতনার প্রতীক; যে রূপকাহিনী ভবিষ্যতে আমাদের জাতিকে যোগাবে ভাব ও চিন্তা, তিনি সেই কাহিনীর অংশ। তবু এই মুহূর্তে তার অনুপস্থিতিতে আমরা সকলেই বেদনার্ত।’
এ কথা বলে তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর এতদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শকে দুটি বাক্যে তুলে ধরলেন :’আমাদের এই নতুন রাষ্ট্রের আদর্শ হল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোট-নিরপেক্ষতা এবং সর্বপ্রকার সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরোধিতা করা। আমরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।’
বঙ্গবন্ধু কারামুক্তির জন্য আরও কিছু সময় প্রচণ্ড উৎকণ্ঠার মধ্যে অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসবেন ১০ই জানুয়ারি। ঘোষিত হবে তার চার মূলনীতি- যাকে তিনি অন্যত্র ‘চার দফা’ বলেছেন : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার আদর্শের ওপরে তিনি নির্দেশ দেবেন যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান তৈরি করার জন্য। এবং মাত্র ৮ মাসের মধ্যে খসড়া প্রস্তুত হয়ে কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে তার উপরে বিশদ আলোচনা এবং উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের পর গৃহীত হবে সেটি। প্রচুর শ্রম, অনেক ভাবনাচিন্তা, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা বিবেচনা, অপ্রত্যাশিত ও প্রত্যাশিত উৎস থেকে অনুপ্রাণিত তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি, অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হবে এই অনন্য দলিলে। বাঙালির সাম্যচিন্তার ক্ষেত্রে এই সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে আজ অব্দি। আমরা এখন সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করব।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৯


পূর্বে প্রকাশিতের পর
জনগণের কাছে দীর্ঘকাল ধরে করা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির জন্য অর্থনীতিবিদেরা কেন জবাবদিহি করবেন? এবং তাও সময় সময় রাজনীতিবিদদের সমর্থন ছাড়া? এ রকম ধারা চলতে থাকলে ইতিহাসকে বিস্মৃতির গর্ভে ঠেলে দেওয়া হবে। হয়তো এমন সময় এক দিন আসবে যে, অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে আওয়ামী লীগ যে একদা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখেছিল ‘স্বাধীন, শোষণহীন ও শ্রেণিহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ কায়েম করার কথা, সেটিকে কেউ বাহাত্তর-পরবর্তী Invention বা কষ্টকল্পনা বলে চালিয়ে দিতে পারে। অবমূল্যায়িত করা হতে পারে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সমাজ প্রতিষ্ঠা করার চূড়ান্ত লক্ষ্যকে। চাই কি, এর জন্য রাজনৈতিক Scapegoat খোঁজাটাও বিচিত্র নয়।
আমি হয়তো কথাটা এখানে বাড়িয়ে বললাম। জাতীয়করণের দাবি পঞ্চাশের দশক থেকেই জানানো হচ্ছিল- বিশেষত পাটশিল্প ও পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। ষাটের দশকে এসে জাতীয়করণের চিন্তাটি আরও মূর্ত ও চূড়ান্ত রূপ লাভ করে যখন এর প্রয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা হয় ‘মূল, ভারী ও বৃহৎ শিল্পের’ ক্ষেত্রে (তা সে বাঙালি বা অবাঙালি যার অধীনেই থাকুক না কেন)। আজকের পরিভাষায় যাকে বলে MSME- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এর আওতা থেকে মুক্ত রাখা হয়। এই ইতিহাসকে না জানলে বা অস্বীকার করলে মনে হতেই পারে যে, জাতীয়করণের শব্দটি হচ্ছে স্বাধীনতা পরবর্তীকালের পদক্ষেপ মাত্র। কেবল একটি After-Thought : অবাঙালী বৃহৎ শিল্প মালিকেরা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন (আর বাঙালি বৃহৎ শিল্প মালিকেরা কেউ কেউ ‘দালালি করেছেন’), সেজন্যেই বুঝি বাধ্য হয়ে Nationalise করতে হয়েছে বাহাত্তরের সরকারকে। এরকম ভাবার পেছনে কোনো যুক্তি নেই যদি আওয়ামী লীগের দলিলপত্রে জাতীয়করণের আইডিয়ার বিকাশকে দালিলিকভাবে অনুসরণ করি। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন :
‘১৯৭২ সালের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু প্রথম যে কাজটি করলেন তা হলো [বৃহৎ] শিল্পের জাতীয়করণ। কারণ, এটা তার এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং ১৯৬৯ সালের এগারো দফার সময় থেকেই এই প্রতিশ্রুতি ছিল। ষাটের দশকজুড়ে তাঁর দলের এবং দেশের অন্যান্য অংশের বিবৃতি ও ঘোষণায় অসংখ্যবার বলা হয়েছিল যে, ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি কিছু পরিবারের হাতে থাকবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করা দরকার, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন অথবা বাণিজ্য ও শিল্প বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের অন্যান্য বিশ্নেষণ বা সুপারিশের আগেই শিল্পের জাতীয়করণ করা হয়েছিল। যদিও জনমনে এমন এক ধরনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, জাতীয়করণের নীতি নেওয়া হয়েছিল পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী। ১৯৭২-৭৫ এবং পরবর্তীকালে প্রায়ই আমি এ রকম একটি ভুল ধারণা মানুষকে সাধারণভাবে পোষণ করতে দেখেছি।’ এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন হলেও বেদনার আভাস দেখতে পাই।
স্বাধীনতার আগে ও পরে জাতীয়করণের প্রশ্নে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন হতেই পারে, জন-মনস্তত্ত্বেও পরিবর্তন আসতে পারে। এই সদা পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে কোনো কিছুই পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে নয়। আজ থেকে ৫০ বছর আগে সমাজতান্ত্রিক সমাজ বলতে যা বোঝানো হতো, আজকের সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তার থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাসকে ইতিহাস হিসেবেই দেখা উচিত। অর্থাৎ, অতীতের কোনো  event-কে যদি ব্যাখ্যা করতে হয় (এলান বাদিউ  event-কে যে-অর্থে ব্যবহার করেছেন আমি সেই অর্থেই বলছি) তাকে ইতিহাসের ধারাতেই ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করা উচিত সেদিনের মাপকাঠিতে, কেবল এ যুগের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। এভাবে দেখলে সন্দেহ থাকে না যে, ৭২-পরবর্তী ন্যাশনালাইজেশন কর্মসূচি পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সমমনা গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনের এক long-standing প্রতিশ্রুতির স্বাভাবিক ও অনিবার্য ফসল।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি মেনে- এক লোক এক ভোট-এর ভিত্তিতে- অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে পূর্ব বাংলার ১৬৪টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬২টি আসনে জয়লাভ করে। এর সঙ্গে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৫টি আসন যোগ করতে হবে। এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ১৯৭০ সালের ৬ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকে সামনে রেখে আদর্শ ও লক্ষ্যকে কীভাবে আওয়ামী লীগ সেদিন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছিল, সেটি বিচার করা দরকার।
কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচিতে আবারও ফিরে এলো সমতামুখী সমাজ গড়ার কথা। বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বোঝার জন্য এটি জরুরি। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকা লিখল :
‘একচেটিয়া পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জমিদারী, জায়গীরদারী, সরদারীর বিলোপ সাধন করিয়া গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে দেশব্যাপী সাম্যবাদী অর্থনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় সমুন্নত করার কল্যাণময় প্রতিশ্রুতি বিধৃত করিয়া নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গতকাল (শনিবার) উহার কর্মসূচি ঘোষণা করে।’
ইত্তেফাকের রিপোর্টিং থেকে দেখা যায় যে, সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আদর্শ হলেও এই ব্যবস্থায় ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা ছিল একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ : ‘দলীয় কর্মসূচিতে ঘোষণা করা হইয়াছে যে, দেশে ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্র’ কায়েমের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হইবে এবং এমন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা হইবে, যেখানে ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্যবাদ হইবে বিঘোষিত ও আচরিত নীতি।’ সাম্যবাদের পাশাপাশি এবার ন্যায়পরায়ণতাকে (Justice) একটি আলাদা মানদণ্ড হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে এটাও লক্ষণীয়। এই যুক্ততার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ধারার তুলনায় একটা ভিন্ন মাত্রা দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও ন্যায়পরায়ণতা বলতে কী বা কোনো ধরনের Social Justice কে ইঙ্গিত দেওয়া হলো তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। উল্লেখ্য, সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার মধ্যে ইউটিলিটারিয়ান, লিবারটেরিয়ান, Kant বাদী, মার্ক্সের শ্রম-অনুযায়ী বন্টনবাদী, Rawls বাদী, অমর্ত্য সেনের চিন্তাধারার অনুসারী বিভিন্ন (অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী) ধারা-উপধারা রয়ে গেছে। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোচনার সময়ে আমরা এদিকটায় দৃষ্টি দেব বিশেষ করে। আপাতত যেটা বলার তাহলো, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধান জোর পড়েছে ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের’ প্রতিষ্ঠার ওপরে। সরাসরিভাবে সমাজতন্ত্র শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র একবার। সমতামুখীন সমাজের কথা এসেছে পরোক্ষভাবে- অনুমিত প্রসঙ্গ হিসেবে। ‘ঘোষণা ও কর্মসূচিতে’ যেভাবে এর আগে অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম’ করার কথা বলা হয়েছিল, সে রকম প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে রয়েছে। তবে প্রচুর Aesopian ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ‘দেশে প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই গণতন্ত্রে মানুষের সকল মৌলিক স্বাধীনতা শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করা হবে।’
২. ‘শোষণের অবসান অবশ্যই করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষণ ও অবিচারের যে অসহনীয় কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে, অবশ্যই তার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। জাতীয় শিল্প সম্পদের শতকরা ৬০ ভাগের অধিক আজ মাত্র দু’ডজন পরিবার করায়ত্ত করেছে। ব্যাংকিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগ এবং বীমা সম্পদের শতকরা ৭৫ ভাগ এ দু’ডজন পরিবারের কুক্ষিগত।’
৩. ‘৬ দফাতেই রয়েছে সমাধান। … আমাদের বিশ্বাস শাসনতান্ত্রিক এ কাঠামোর মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব আনা সম্ভব। অন্যান্য অবিচার ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
৪. সরাসরিভাবে আগের মতো ‘মূল, বৃহৎ ও ভারী শিল্প’ জাতীয়করণের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি যদিও, কিন্তু এই সম্পর্কে পর্যাপ্ত ইঙ্গিত ছিল। ‘জাতীয়তকরণের মাধ্যমে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোসহ অর্থনীতির মূল চাবিকাঠিগুলোকে জনগণের মালিকানায় আনা অত্যাবশ্যক বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থনীতির এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সাধিত হতে হবে সরকারি অর্থাৎ জনগণের মালিকানায়। নতুন ব্যবস্থায় শ্রমিকগণ শিল্প ব্যবস্থাপনায় ও মূলধন পর্যায়ে অংশীদার হবেন। বেসরকারি পর্যায়ে এর নিজস্ব ভূমিকা পালন করার সুবিধা রয়েছে। একচেটিয়াবাদ … সম্পূর্ণরূপে বিলোপ সাধন করতে হবে।’ আলাদা করে পাট ও তুলা ব্যবসা ‘জাতীয়করণের’ কথাও বলা হয়েছিল ইশতেহারে।
৫. কৃষি খাত সম্পর্কে বলা হয়েছিল:’প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারি, জায়গিরদারি, সরদারি প্রথার অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। … ভূমির সর্বোচ্চ সীমা অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে’, এবং ‘নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাসজমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।’ শুধু ভূমি বণ্টনই নয়, ‘অবিলম্বে চাষিদের বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি সংহতি সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’
৬. বিদেশনীতির ক্ষেত্রে বলা ছিল যে, ‘আমাদের অবশ্যই সত্যিকারের স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে। আমরা ইতিপূর্বে ‘সিয়াটো’, ‘সেন্টো’ ও অন্যান্য সামরিক জোট থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছি।
ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো জোটে জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে আমাদের বিঘোষিত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত জনগণের যে সংগ্রাম চলছে, সে সংগ্রামে আমরা আমাদের সমর্থন জানিয়েছি।’
সামগ্রিক বিচারে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল এক ‘প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের’ প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সমাজ গড়ার বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উপাদান ছিল। সেসব উপাদান আরও স্পষ্ট ও ঘনীভূত রূপ নিয়ে দেখা দেবে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। বাঙালির সাম্যচিন্তার এক মাইলস্টোন হয়ে দাঁড়াবে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকট সহকর্মীদের তৈরি করা বাহাত্তরের সংবিধান।

৭. মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ও সমতামুখীন প্রতিশ্রুতি
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার তেমন অবকাশ ছিল না। ঘটনাপ্রবাহ অতিদ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল। পুরো বাংলাদেশ ছিল একটি বন্দিশিবির। বন্দিশিবিরের ভেতরে ও বাইরে সবাই বিজয়ের দিন গুনছিল। কিন্তু এই স্বল্প পরিসরেও অনেকটা ধাপ অতিক্রম করেছিল বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এসেছিল এই পর্বেই প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে। প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতা (সেক্যুলারিজম)-এর ধারণা নয় মাস অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে একটি মূল আদর্শে পরিণত হয় এবং গণতন্ত্রের জন্য এর সবিশেষ গুরুত্ব উপলব্ধ হয়। এর আগে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মসূচি’ শীর্ষক দলিলে বা ১৯৭০ সালের ‘নির্বাচনী ইশতেহারে’ কোথাও ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম শব্দটি সরাসরিভাবে ব্যবহূত হয়নি। যে ধরনের বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে তখন কাজ করতে হয়েছিল, এ ধরনের শব্দ ব্যবহার আশা করা সম্ভবও ছিল না। তৎকালীন আওয়ামী লীগের ‘নীতি ও কর্মসূচির ঘোষণা’ দলিলে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও সকল ধর্মের সমানাধিকারের পক্ষে স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি তখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক lexicon-এ আসেনি। সেখানে বলা হয়েছিল : ‘আওয়ামী লীগ হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি প্রভৃতি সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িক ও আঞ্চলিক বিভেদ ও বিদ্বেষের সম্পূর্ণ বিরোধী। আওয়ামী লীগ ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও মত নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাসী- ইহা গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাথমিক বার্তা।’
১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে কথাটা আরও পরোক্ষভাবে বলা হয়েছিল : ‘সকল নাগরিকের সমান অধিকারে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, আমরা সব সময়ই সব প্রকারের সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করে আসছি। সংখ্যালঘুরাও অন্যান্য নাগরিকের মতোই সমান অধিকার ভোগ করবে। আইনের সমান রক্ষাকবচ সকল ক্ষেত্রেই পাবে।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৬
পূর্বে প্রকাশিতের পর
অর্থনীতিবিদরা দলের রাজনৈতিক দর্শন ও অর্থনৈতিক আদর্শ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেননি এক্ষেত্রে। রাজনীতিবিদরাই এখানে মুখ্য ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো পাঠ করলে এ নিয়ে কোনোই সন্দেহ থাকে না। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও রাজনীতিবিদদের, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে শেখ মুজিবের, মূল ও নির্ধারক ভূমিকা ছিল। এ কথা খাটে ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোর ক্ষেত্রেও। গুরুত্ব বিবেচনা করে পুরো উদ্ৃব্দতিটাই আমি এখানে তুলে ধরতে চাই। দলের অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে বলা হয়েছিল :
‘আওয়ামী লীগের আদর্শ শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য ও দুর্দশার হাত হইতে মুক্তিলাভ করা সম্ভব বলিয়া আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। মূল শিল্পগুলিকে, যথা- খনিজ শিল্প, যুদ্ধের অস্ত্র-সরঞ্জাম শিল্প, বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক শিল্পকে জাতীয়করণ করিতে হইবে এবং ইহাদের পরিচালনার ভার রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গঠিত ও পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর ন্যস্ত করা হইবে। ব্যাংক, বীমা, গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন প্রভৃতি প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবশ্যকবোধে জাতীয়করণ করা হইবে। শিল্পে ও ব্যবসায় কোনো প্রকারের একচেটিয়া অধিকার স্বীকার করা হইবে না।’
বলা বাহুল্য, এই দাবিগুলির অনেক কিছুই ১৯৪৯ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ইতিপূর্বে আলোচিত ম্যানিফেস্টোতে বীজ হিসেবে বপন করা হয়েছিল। তবে এর আগে কোনো দলিলেই এত স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে, ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য ও দুদর্শার হাত হইতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব।’ তবে এই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে ঠিক কোন ধরনের ব্যবস্থা তা অবশ্য দলিলে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে এটি যে স্তালিন আমলের সমাজতন্ত্র নয়, সেটি এর ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ অধ্যায় থেকেই সুস্পষ্ট হয়। এই দুটি অধ্যায়ে ‘লিবার্টি প্রিন্সিপালকে’ সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ‘একমাত্র যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত অন্য কোনো সময়ে এই সকল অধিকার খর্ব করা হইবে না।’ এই দলিলে আবারো মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রচিত না হইলে কোনো শাসনতন্ত্র জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হইবে না।’ এবং ২১ দফা অনুসরণ করে বলা হয়েছে যে, এমন শাসনতন্ত্র চাই যা ‘অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, শাসনকার্যে এবং দেশরক্ষার ব্যাপারে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান’ করবে। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কথা বলা হলেও একটি ফেডারেল ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের’ কাঠামোতেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব, এমন বিশ্বাস ছিল ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোর প্রণেতাদের। এই দলিল পাঠে বরং উল্টো প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বৃহৎ ও পরিত্যক্ত শিল্পের ‘জাতীয়করণ’ নিয়ে এত পানি ঘোলা করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কোনো কোনো মহল থেকে? সেইসব বিরুদ্ধ সমালোচকরা কি জানতেন না যে, পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোতেই ছিল দেশের বৃহৎ ও মূল শিল্পকে ‘জাতীয়করণ’ (Nationalisation) করার কথা? অর্থাৎ শেষোক্ত নীতি ১৯৭২ সালের কোনো হঠাৎ আবিস্কার নয়। শুধু মূল শিল্প নয়, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন ‘প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক’ প্রতিষ্ঠানকে ‘আবশ্যকবোধে জাতীয়করণ করা’ হবে- এ ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনেরই ঘোষিত অর্থনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচির অংশ। এবং সেটা এসেছিল-তৎকালীন পরিস্থিতিতে-সমতামুখীন অর্থনীতি গড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই।
১৯৬৪ সালের উপরোক্ত দলিলে অর্থনৈতিক আদর্শের অংশ হিসেবে ‘দুই অর্থনীতির’ প্রসঙ্গও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য ছিল ১৯৫২ সালের পর থেকেই একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই বৈষম্যের আলোচনাটিকে নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সেকালের প্রাগ্রসর বাঙালি জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদেরাও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কেননা, এটি উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের একটি স্বীকৃত বিষয় ছিল এবং এর গুরুত্ব বাঙালি অর্থনীতিবিদরা স্বাভাবিক কারণেই অনুধাবন করেছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারও বিষয়টির গুরুত্ব এক পর্যায়ে কিছুটা হলেও (অন্ততঃ লোক দেখানোর জন্যে হলেও) অনুভব করেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের গতিপ্রকৃতি মনিটর করার জন্য একাধিক কমিশন গঠন করা হয়।
প্রতিটি পাঁচসালা পরিকল্পনার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে নাকি কমছে- এটা তলিয়ে দেখা ছিল এসব কমিশনের কাজ। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অংশ থেকেই শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা যোগ দিতেন কমিশনের সদস্য হিসেবে। কীভাবে ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ক বৈষম্য নিয়ে পেশাদার অর্থনীতিবিদদের কাজকর্ম পরিচালিত হতো এবং পরোক্ষভাবে তা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ওপর প্রভাব ফেলত তার একটি বিবরণ নুরুল ইসলামের ২০১৭ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে পাওয়া যায় :
‘In mid-1950, there was already a great deal of unhappiness among the educated middle class about the underdevelopment of East Pakistan. This awareness was particularly acute among the economists who analysed the extent and nature of economic disparity and used to write and speak about it in their meetings and conferences. The first organized expresion of such reencutment took place in 1956 when they submitted a report at the conference of East Pakistan on the First Five Year plan of Pakistan. They enunciated that Pakistan was not one economy but consisted of two economies. They recommended a set of special measures to remove the economic disparity!’  যে প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে এখানে, তার প্রস্তুতির কাজে নুরুল ইসলামের সক্রিয় অবদান ছিল। এসব জ্ঞানগত উদ্যোগের ফল পরিণামে পাকিস্তান সরকার এক পর্যায়ে বাধ্য হয় স্থায়ীভাবে ‘Finance Commissions on ‘East-West Income Disparity’ এবং ‘Inter-regional Economic Policies and Resource Allocations’ গঠন করতে। ফাইন্যান্স কমিশনের বাইরেও যেসব অর্থনীতিবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তারাও এই পূর্ব-পশ্চিম আঞ্চলিক বৈষম্য বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ে ১৯৬১ সালের জুন মাসে ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনার। হাবিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান প্রমুখ সেখানে প্রবন্ধ পাঠ করেন। হাবিবুর রহমান পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনে কর্মরত ছিলেন লাহোরে। সরকারি চাকরির ঝুঁকি নিয়েও তিনি পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের বিষয়ে তার অর্থনৈতিক বিচার-বিশ্নেষণ তুলে ধরেন। তার উত্থাপিত প্রবন্ধের নাম ছিল ‘Two Economies in Pakistan’- ১৯৬১ সালের ২রা মে-তে লেখা। এছাড়াও তিনি ১৯৬১ সালের ১ আগস্ট ‘The case for Separating the Economies of East and West Pakistan’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রস্তুত করেন। ১৯৬২ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম ‘Growth Models and Pakistan’। বাঙালি এই অর্থনীতিবিদ পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের ‘ইকোনমিক রিসার্চ’ সেকশনের এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে যুগপৎ দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি চাকরিতে থেকেও ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে তার উপরোক্ত দুটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন এবং জেনারেল আইয়ুব খানের রোষের শিকার হন। এই পথিকৃৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদের জীবন ও কর্মের ওপরে আরও বড় পরিসরে কাজ হওয়া উচিত। সামগ্রিকভাবে ‘দুই অর্থনীতি’ সংক্রান্ত আলোচনায় যারা ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, আখলাকুর রহমান, মোশারফ হোসেন, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান প্রত্যেকের জীবন ও কর্মের ওপর বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা হওয়া দরকার।
যাহোক, কার্জন হলের সেই বিখ্যাত সেমিনারে গঠিত রেহমান সোবহানের প্রবন্ধটি পরদিন মিডিয়ার হেডলাইন হয়েছিল। এ সম্পর্কে রেহমান সোবহান এভাবে স্মৃতিচারণা করেছেন  ‘The next morning, I opened the Pakistan observer to read a fornt page headline, ‘Rehman Sobhan says Pakistan has two economies.’ সেদিন কাকতালীয়ভাবে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন আইয়ুব খান। কার্জন হলের সেমিনারের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন? উত্তরে জেনারেল আইয়ুব বললেন,‘Pakistan has only one economy.’ পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যকার আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদেরাও এক সময় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের নেতৃত্ব দানকারী মাহবুব উল হক তার ১৯৬৩ সালের ‘দ্য স্ট্র্যাটেজি অব ইকোনমিক প্ল্যানিং’ বইতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন পাকিস্তানে পূর্ব-পশ্চিম অংশের মধ্যকার আঞ্চলিক বৈষম্যের ওপর।
আগেই বলেছি, অর্থনীতিবিদরা ‘দুই অর্থনীতি’ শক্তিশালী যুক্তিজাল বিভিন্ন সেমিনারে-কনফারেন্সে তুলে ধরেছিলেন, যদিও জনসমক্ষে এর সপক্ষে প্রচার-আলোচনা-মতামত গঠন করেন রাজনীতিবিদরাই। দুই অঞ্চলের মধ্যে আয়-বৈষম্য ও সম্পদ বরাদ্দ বৈষম্য শুধু নয়, বৈষম্যের সাথে সাথে বঞ্চনার রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুভূতি তারা প্রকাশ করেন দেশবাসীর সামনে। Theory-র সাথে Praxis-র যুগল সম্মিলনের এটি একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উপরোক্ত বিষয়ে ১৯৬৪ সালের উপরোক্ত দলিলেই বলা হয়েছিল :
‘কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদসমূহে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রায় একচেটিয়া অধিকার ও প্রাধান্য বর্তমান। সরকার ব্যক্তিগত শিল্প ও শিল্পপতিকে সাহায্যের নীতি গ্রহণ করায় উক্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের সহানুভূতিতে ও পক্ষপাতিত্বে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যক্তিগত শিল্প ব্যাপকভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে। তদুপরি, পাবলিক সেক্টরেও সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়োজিত হইয়াছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য সৃষ্টি হইয়াছে। এই অবস্থার প্রতিরোধ ও প্রতিকারকল্পে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশ্যে শিল্প ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট (Earmarked) অর্থ পাবলিক সেক্টরে নিয়োজিত করিবার নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যে দুই অর্থনীতির ভিত্তিতে একটা দীর্ঘকালীন ও কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে।’
উপরে উদ্ৃব্দত স্তবকে অর্থনৈতিক চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তার প্রকাশ হয়েছে রাজনৈতিক ভাষায়, যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে ‘পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য’ সৃষ্টির কথা। এর থেকে যে এক সময়ে ৬ দফা বেরিয়ে আসবে, এতে আর বিস্ময় কী! শেখ মুজিবের অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভা এখানেই। একটি যুক্তিনিষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশ্নেষণ থেকে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের  ‘Logical Next-step’ হিসেবে ‘ছয় দফা’ কর্মসূচিকে বের করে আনতে পেরেছিলেন। ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো থেকে ছয় দফা কর্মসূচিতে উত্তরণ ছিল সেরকম প্রত্যাশিত একটি যৌক্তিক উত্তরণ। এই ছয় দফা কর্মসূচির দলিল রাজনীতিবিদেরই চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফসল। বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরাই এই দলিল প্রস্তুত করেন। কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এতে মূল ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ মুজিব স্বয়ং। অর্থনীতিবিদরা এর নির্মাণে সরাসরিভাবে কোনো ভূমিকা রাখেননি। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম একাধিক আলাপচারিতায় এ ব্যাপারে আমাকে নিশ্চিত করেছেন। কার্যতও ৬ দফা কর্মসূচি সংবলিত মূল দলিলের- ‘আমাদের বাঁচার দাবি : ৬-দফা কর্মসূচি’র লেখক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং তারই পরিচিতিতে ও বয়ানে দলিলটি দেশ-জাতির কাছে উত্থাপিত হয়।
[ক্রমশ]