তিমিরবিনাশী সমাজের দিকে? (Towards an Enlightened Society?)

বিনায়ক সেন

১. প্রথাগত মতাদর্শের বিপর্যয়
আমরা অর্থনীতিবিদ্যার একটি সংকটের মধ্যে আছি। কোনো আপ্তবাক্যেই আমরা আর আস্থাবান থাকতে পারছি না। একসময়ের বহুশ্রুত ‘মিশ্র-অর্থনীতি’ এখন আর প্রায় ব্যবহারই হয় না বলতে গেলে। আমাদের যৌবনে মিশ্র-অর্থনীতিই ছিল সব তত্ত্বের সারাৎসার। ব্যক্তি খাত থাকবে, কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ছাড়া অর্থনীতির চাকা দ্রুত এগোবে না_ এ রকম একটি স্লোগান আমাদের খুবই প্রভাবিত করেছিল। কেইনসীয় অর্থনীতির উত্থান, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’-এর ধারণা, উপনিবেশ থেকে সবে বেরোনো দেশগুলোর রাষ্ট্রের উপায়ান্তরহীন ভূমিকা এর পেছনে কাজ করে থাকবে। এরই ভাবাদর্শগত ছায়ায় কেটেছে বাংলাদেশের সত্তরের দশক।

আশির দশকের গোড়ার দিকে দ্বিতীয় তেল-সংকটের পর থেকে শুরু করে প্রায় দুই দশক একচ্ছত্র রাজত্ব করেছে অন্য একটি ধারণা। অবাধ বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব অর্থনীতির যুক্তি-তর্কে যতটা তারও বেশি সহায়-সমর্থন পেয়েছিল রেগান-থ্যাচারের রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে। তেল-সংকটের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লাতিন আমেরিকায় দেখা দেয় ঋণ পরিশোধের সংকট। এখানেই প্রথম শুরু হয় ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’_ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের তখন মন্ত্র ছিল ‘স্টেবিলাইজেশন, লিবারেলাইজেশন এবং গ্রোথ’। অবাধ বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করলে শুধু সংকটের অবসান ঘটবে তা-ই নয়, অর্থনীতির প্রধান প্রধান সমস্যারও অবসান ঘটবে। ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোয় প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে গেছে। মিশ্র-অর্থনীতি ও পরিকল্পনাময় অর্থনীতির বিপরীতে বাজার অর্থনীতির মতাদর্শকে সেদিন মনে হচ্ছিল অপ্রতিরোধ্য ও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আদর্শ বলে। দার্শনিক কান্ট_ হেগেলের ছাত্র ফুকোয়ামা যখন লিখলেন, বার্লিন দেয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে শ্রেণী-যুদ্ধের তথা ইতিহাসের অবসান ঘটেছে তখন তা সময়ের স্বাভাবিক দাবি হিসেবেই অনেকে গ্রহণ করেছেন।

বার্লিনের দেয়াল ভাঙার পর আরও প্রায় ২৫ বছর কেটে গেছে। এ সময়ের অভিজ্ঞতা অবাধ বাজার অর্থনীতির ও তার আদর্শের সমাজ-রাষ্ট্রের পক্ষে যায়নি। প্রথমত, অর্থনীতিবিদ পিকেটি দেখিয়েছেন যে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা পরিত্যাগ করার ফলে উন্নত বিশ্বের সমাজ হয়েছে আরও বেশি বৈষম্যমূলক। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের তিন দশকে (গোল্ডেন এইজ অব ক্যাপিটালিজম) জাতীয় আয়ে পুঁজির তুলনায় শ্রমের অনুপাত যা-ওবা বাড়ছিল, সে ধারা কমতে থাকে সত্তরের দশকের শেষদিকে এবং পরবর্তী দু’দশকে তা একেবারেই শুকিয়ে আসে। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেই বেড়েছে সম্পদ, আয় ও ক্ষমতার বৈষম্য। অবাধ বাজার অর্থনীতি শ্রীবৃদ্ধি এনেছে বটে; কিন্তু তার সুফল পেয়েছে মূলত একটা শ্রেণী : বড় কারবারের মালিক, সিইও, ব্যাংকার, শিল্পপতি, পুঁজিবাজারের ফটকাবাজ, রাজনৈতিক প্রকল্পের সুবিধাভোগী লবিস্ট বা দালালগোষ্ঠী। এরা সমাজের ১ শতাংশ অথচ এদের কাছে এসব দেশের ৬০ শতাংশ সম্পদ চলে গেছে। গত ২৫ বছরের অবাধ বাজার অর্থনীতির ফলে জন্ম নিয়েছে ‘সুপার-রিচ’ নামক একটি শ্রেণীর। এদেরই ওপর প্রগ্রেসিভ হারে কর বসানোর প্রস্তাব করেছেন তিনি; আয়ের ওপরে কর তো বটেই, সম্পদের ওপরও দৃষ্টি তার। পিকেটির মতই যে শিরোধার্য তা নয়, তবে তার বইটির প্রশংসা করে সমালোচনা লিখেছেন তিনজন নোবেলজয়ী, এটাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো তথ্য নয় (এর মধ্যে আছেন_ রবার্ট সলো, পল ত্রুক্রগম্যান ও জোসেফ স্টিগলিৎস)। অবাধ বাজার অর্থনীতি যে আপনাআপনি বণ্টনের সমস্যার সমাধান দিতে পারে না সেটা পিকেটি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বড় আকারে প্রমাণ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে না আনা গেলে সামাজিক দুর্বিপাক বাড়ার সমূহ আশঙ্কা থেকে যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় নতুন করে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো দেখা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে_ ফার্গুসনসহ বিভিন্ন শহরে বর্ণ-বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভের একটি উদাহরণ_ এদের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কার্যকারণ। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, আয়-বৈষম্য, ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও চলমান মন্দা, সামাজিক খাত বিশেষত স্বাস্থ্য খাতের অচলাবস্থা নির্ধন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের মন থেকে ‘একটি বাড়ি, অনেক সুযোগ’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া আমেরিকান ড্রিম ভেঙে দিয়েছে। এখন ভরসা তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসী সস্তা শ্রম ও মেধার জোগানের ওপর। কিন্তু মন্দা পরিস্থিতিতে এ নিয়েও স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে অভিবাসী ও স্থানীয় শ্রমের ভেতরই।

তৃতীয়ত, অবাধ বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব রাজত্ব করেছে শুধু অর্থনৈতিক যুক্তি-তর্কের ওপর নির্ভর করে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অবাধ বাজার অর্থনীতি বা নিও-লিবারেলিজম হচ্ছে ‘একটা প্যাকেজ’। সেখানে একটা নিলে আরও কিছু উপাদান ফাও হিসেবে গছিয়ে দেওয়া হয়। এ রকমই একটি ‘ফাও’ হচ্ছে নিউ কনজারভেটিজম, মূলত খ্রিস্টীয় ধর্মাদর্শের ওপরে এর ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে, যার ব্যাখ্যাও অতি-সংকীর্ণ ধর্মবোধের দ্বারা নির্মিত। লিও স্ট্রাউসের মতবাদকে নিউ কনজারভেটিজমের অনুপ্রেরণা বলে ধরা হলেও এর অনুসারীরা গুরুমারা শিষ্যে পরিণত হয়েছেন। সামাজিক নীতিতে শিষ্যরা ‘ফ্যামিলি ভ্যালুস’-এর গুণকীর্তন করেন, ধর্মীয় নীতিতে তারা ‘ইসলামিস্ট’ শক্তিকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন এবং রাজনীতিতে তারা শুধু সেসব সরকারকেই মানতে প্রস্তুত যারা হবেন তাদের একনিষ্ঠ স্বার্থবাহী। সাদ্দামকে সরানোর জন্য ইরাক যুদ্ধ শুরু করার কিছুদিন পরই লিও স্ট্রাউসের কন্যা ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এ খোলা কলম লিখে প্রতিবাদ করলেন। তার বক্তব্য_ পল উলফোভিচ, রিচার্ড পারলে, কন্ডোলিজা রাইস এসব ‘নিউ-কন’ তাত্তি্বকরা যা বলছেন তার সঙ্গে লিও স্ট্রাউসের দর্শনের কোনো মিল নেই। বুশের ইরাক আক্রমণের তীব্র সমালোচকে পরিণত হন তিনি (যেমন_ মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন মওদুদীর ছেলে এ দেশে এসে)।

চতুর্থত, অবাধ বাজার অর্থনীতির মতাদর্শ সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সে সূত্রে কান্টের ‘চিরস্থায়ী শান্তির’ মতো নিখিল প্রশান্তি বিশ্বে নেমে আসবে, যুদ্ধ বিগ্রহহীন বিশ্বের তত্ত্বও প্রচার করেছিল। দেখা গেল যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ হয়নি, বরং তা ক্রমাগত নতুন নতুন মাত্রা পেয়ে চলেছে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নানা পর্যায়ে। সোভিয়েতের অবসান হলেও যুদ্ধের অবসান হয়নি, সমরবাদ আজও বাড়-বাড়ন্ত। ২০১৪ সালে নিঃশব্দে পালিত হলো ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর শতবার্ষিকী। ১০০ বছর আগে লেনিন লিখেছিলেন_ ‘যুদ্ধ ছাড়া সাম্রাজ্য চলতে পারে না।’ ওবামার যুগে এসেও দেখতে পাচ্ছি এ কথা খাটছে। লেনিনের অনেক কথা হয়তো মিলেছে অথবা মেলেনি; কিন্তু অন্তত এ পর্যবেক্ষণটি আজও এতসব এক বিশ্ব তত্ত্ব, পোস্ট মডার্নিজম, পোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালিজমের পরও সত্য বলে প্রতিভাত হচ্ছে।

আর ‘গণতন্ত্র’? অবাধ বাজার অর্থনীতির সঙ্গে বলা হয়েছিল গণতন্ত্র সর্বত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। আমি সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কে যাচ্ছি না। মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা থাকবেন বা না থাকবেন এটি ঠিক করা গণতন্ত্রের একটি আবশ্যকীয় দিক। কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক সংজ্ঞার বাইরে যাওয়ারও দরকার আছে। অমর্ত্য সেন এক বক্তৃতায় বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে ‘আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শাসনকার্য চালানো’ (গভর্নিং বাই ডিসকাশন)। এটিও গণতন্ত্রের একটি মর্মগত উপলব্ধি। অন্যদিকে সমাজের ‘সর্বস্তরে গণতন্ত্রায়নের’ কথাও আমরা শুনেছি_ এটি বোধকরি ম্যাক্সিম্যালিস্ট অভিধা। এই ৩টি সংজ্ঞার যেটিকেই আশ্রয় করা হোক না কেন, বার্লিন দেয়াল পতনের পরের ২৫ বছরে গণতন্ত্রের অবস্থা বিশ্বজুড়েই ভালো নয়। অনেক দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে আবার পিছু হটতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে মিশ্র বা ‘সংকর গণতন্ত্রের’ নানা অসম্পূর্ণ রূপ। ২০০০-এর দশক থেকে অনেকটা ইরাক যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এসবের সমান্তরালে_ গণতন্ত্রের প্রবণতায় অসুস্থতা বা পিছু হটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। লিটারেচারে একে বলা হচ্ছে, পশ্চাৎপসরণ বা ডেমোক্রেটিক ব্যাকট্রেকিং। শুধু তাই নয়, পার্থ চ্যাটার্জি লিখেছেন, পুঁজিবাদ নিজেই হয়ে পড়েছে তার বিঘোষিত গণতন্ত্রের বিরোধী সত্তা। ক্যাপিটালিজম এগেইনস্ট ডেমোক্রেসি।

নিরঙ্কুশ পরিকল্পনার অর্থনীতি নিয়ে মোহভঙ্গের যথেষ্ট ন্যায়সঙ্গত কারণ রয়েছে। মিশ্র অর্থনীতির প্রতিও আস্থা নেই। বাকি ছিল_ অবাধ বাজার অর্থনীতি। ২৫ বছর আগে তার যে অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি ছিল সেটি এখন অনেকটাই ঝাঁপসা হয়ে এসেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি সমালোচনার মুখে পড়ছে ওপরে বর্ণিত ৫টি কারণে। সাধারণভাবে এখন আর বলা যাবে না যে, একটি আদর্শ অর্থনীতির মডেল আমাদের চোখের সামনে রয়েছে_ আমাদের কাজ হচ্ছে তাকে কেবল যথাসাধ্য অনুসরণ করা। আমাদের ঝুঁলিতে নিরঙ্কুশ পরিকল্পনার অর্থনীতি, মিশ্র অর্থনীতি ও অবাধ বাজার অর্থনীতির বিশ্ব-অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সেসব খণ্ডচিত্র মাত্র। এই অর্থে আমি বলেছি শুরুতে, আমরা অর্থনীতিবিদ্যার একটি সংকটের মধ্যে আছি। জীবনানন্দ ‘তিমিরবিনাশী’ সমাজের প্রতীক্ষায় ছিলেন। আমাদের সে লক্ষ্যে তত্ত্বগত চর্চাকে নিরুৎসাহ করা নয়, বরং আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় সে চর্চাকে আরও বেশি মেধা, মনন ও নিষ্ঠায় ধারালো করে তুলতে হবে।

২. ব্যাস্টিক ও সমষ্টির মেলবন্ধন
চোখের সামনে কোনো আরাধ্য অর্থনৈতিক মতাদর্শ আর নেই, এক অর্থে এটা ভালোই। রাস্তাটা এখন ডেড-এন্ডে পেঁৗছেছে অভিযানের সমাপ্তি, এখনই প্রকৃত যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হতে পারে। কোনোটা জাতীয়তাবাদসম্মত, কোনোটা পুঁজিবাদী ধারার, কোনোটা সমাজতন্ত্রের পক্ষে_ এসব বিবেচনা আর বড় নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। বিশ্বজোড়া গরিবরা ওপরে উঠছে, মধ্যবিত্তের আকার বড় হচ্ছে, নারীদের কণ্ঠস্বর ও অবস্থান জোরালো হচ্ছে, অভিবাসীরা মেধা ও প্রবৃদ্ধির জোগান দিচ্ছেন। আর রয়েছে সারাবিশ্বেরই এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ-যুবাগোষ্ঠী_ এরা সবকিছুই গ্রহণ করতে প্রস্তুত; কিন্তু কোনো কিছুকে পরীক্ষা না করে যাচাই-বাছাই না করে নির্বিচারে মেনে নেওয়ার পাত্র নয়। গর্বাচেভ সমাজতন্ত্রকে নবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সে কথা রাখেননি, বরং গোটা ব্যবস্থাকেই অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। ওবামা পুঁজিবাদকে সহনীয় ও মানবিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সে কথা রাখতে পারেননি, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আমলেই জড়িয়ে পড়েছে নতুন নতুন ড্রোন যুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং নতুন স্নায়ুযুদ্ধে। এরা নিজেদের দেশে প্রথম দিকে ‘চেইঞ্জ-এজেন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সাধারণ মানুষ তাতে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু শেষাবধি তারা হতাশই হয়েছে। আমি ক্লিনটন-ডেমোক্র্যাট আর বেল্গয়ারের নিউ লেবারের কথা না-ই তুললাম এখানে। সামগ্রিকভাবে একটি উদার-সহনশীল জনকল্যাণমুখী সুষম বণ্টনের সমাজ দিতে পারেনি এদের শাসনাধীন সরকারগুলো।

কিন্তু তাতে জনসমস্যার সমাধান খোঁজার তাগিদ তো কমে যায়নি। তবে প্রশ্নটাকে এখন নতুন করে পেশ করতে হবে। অন্ধ মতাদর্শ নয়, বরং বাস্তব অনুশীলনে ও ক্রমাগত তত্ত্বচর্চার পরিশীলনে যা নিজ দেশের মানুষের জন্য ‘শ্রেষ্ঠ’ বলে মনে হবে তার একাধিক বিকল্প মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। একেক দেশের পরিস্থিতিতে তা হবে হয়তো একেক রকম, যদিও এ নবভাবনার কিছু প্রাথমিক সূত্রের তত্ত্ব-তালাশ করা সম্ভব। এই তত্ত্ব-তালাশের উৎস হতে হবে নানা স্থানিক সূত্রে গাঁথা। এতে সাহিত্য থাকবে, বিজ্ঞান থাকবে, সংস্কৃতি থাকবে, প্রশাসন থাকবে_ এর চিন্তার উৎস হবে বিভিন্ন, স্বেচ্ছাকৃতভাবে ‘একলেকটিক’। একলেকটিক হওয়া মানে_ বহু উৎসের প্রতি হাত বাড়ানো; নির্বিচারে অগ্রসর হওয়া নয়। এখানে রবীন্দ্রনাথ, মার্কস উভয়ই থাকবেন, মিল ও গ্রামসি এরাও থাকবেন, যেমন থাকবেন লালন ও রামমোহন রায়, রোকেয়া ও গান্ধী, চার্বাক, সন্ত কবীর ও ইবনে আরাবি। হারিয়ে যাওয়া ইসলামী সভ্যতা ও লোকজ দর্শন-সংস্কৃতি, আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন জাদুঘর ও উপনিষদের দুর্লভ গ্রন্থরাজি, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, সব মানবিক জ্ঞানের আধার হবে এই নতুন মননশীলতা। বাংলাদেশে নতুন সভ্যতার নির্মাণ করতে চাইলে এই বহুমুখী সংগ্রহশীলতার প্রয়োজন। তিনটি উদাহরণ টানছি।

বঙ্কিমের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ রচনাটির কথা অনেকেরই মনে আছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান চালচিত্রের এক জায়গায় মিল খুঁজে পাই। প্রবৃদ্ধি নাকি সমতামুখী প্রবৃদ্ধি, এই বিতর্ক বোঝার জন্য রচনাটি জরুরি পাঠ্য বলে মনে হতে পারে, অন্তত পরিকল্পনাবিদ ও অর্থনীতিবিদদের জন্য। সেখানে বঙ্কিম শুরু করেছেন এই বলে_ ‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশে বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে।’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বটে; কিন্তু তাতে করে কি জনকল্যাণ বাড়ছে, বণ্টন আরও সুষম হচ্ছে? এ প্রশ্ন বঙ্কিম তুললেন সেখানে। অবকাঠামো নির্মাণ মানেই ‘দেশের বড় মঙ্গল হইতেছে’ এ ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন_

‘কি মঙ্গল, দেখিতে পাইতেছ না? ঐ দেখ, ভাগীরথীর যে উত্তাল তরঙ্গমালায় দিগ্গঞ্জ ভাসিয়া গিয়াছিল, অগি্নময়ী তরণি ক্রীড়াশীল হংসের ন্যায় তাহাকে বিদীর্ণ করিয়া বাণিজ্য দ্রব্য বহিয়া ছুটিতেছে। ঐ যে দেখিতেছ, রাজপথ, পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ঐ স্থানে সন্ধ্যার পর, হয় কাদায় পিছলে পা ভাঙিয়া পড়িয়া থাকিতে, না হয় দস্যু হস্তে প্রাণত্যাগ করিতে; এখন সেখানে গ্যাসের প্রভাবে কোটি চন্দ্র জ্বলিতেছে_ এই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে, কাহার এত মঙ্গল? ঐ যে হাসিম শেখ, আর রামা কৈর্বত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাতায়, খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্তিচর্মাবশিষ্ট বলদে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চসিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?_ বল দেখি চষ্মা নাকে বাবু! ইহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে? তুমি লেখাপড়া শিখিয়া ইহাদিগের কি মঙ্গল সাধিয়াছ?’

বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট : শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটালেই বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলেই দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে না। ‘দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবী কয়জন?_ হিসাব করিলে তাহারাই দেশ_ দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী; যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের মঙ্গল নাই।’ অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি যদি সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে না পারে সে প্রবৃদ্ধিতে কীসের মঙ্গল, কীসের জনকল্যাণ?

বঙ্কিমচন্দ্র কোনো বামপন্থি ছিলেন না। না হয়েও, তিনি আজকের দিনের পরিভাষায় যাকে বলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বা সমতামুখী প্রবৃদ্ধি কিসে এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিলের ছাত্র (যদিও ‘একলব্য ছাত্র’_ কেননা মিলের সাথে তার কখনও দেখা হয়নি) বিধায় বঙ্কিম ‘প্রিন্সিপালস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ ভালো করে পড়েছিলেন। ‘বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধা-তত্ত্বে’ তার আস্থা ছিল। ওই লেখাতেই তিনি বলেছেন, ‘বিদেশীয় বাণিজ্য কারণ আমাদিগের দেশের ধনবৃদ্ধি হইতেছে।’ কিন্তু সেটা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দেশের ভেতরে অন্যায় সম্পদ যারা কেন্দ্রীভূত করছেন বৈধ ও অবৈধ উপায়ে তাদের ছাড় দিতে হবে। যেমন_ জমিদার শ্রেণীভিত্তিক যে ভূমি ব্যবস্থা তাকে তিনি সর্বাংশে নিন্দা করেছেন : ‘জীবের শত্রু জীব; মনুষ্যের শত্রু মনুষ্য; বাঙালি কৃষকের শত্রু বাঙালি ভূস্বামী। ব্যাঘ্রাদি বৃহজ্জন্তু, ছাগাদি ক্ষুদ্র জন্তুগণকে ভক্ষণ করে; জমিদার নামক, বড় মানুষ, কৃষক নামক ছোট মানুষকে ভক্ষণ করে।’ সমস্ত তথ্য-উপাত্ত বিচার করে বঙ্কিম এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, জমিদারি ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়াই ভালো, এর পরিবর্তে বাংলায় চালু হওয়া উচিত রায়তওয়ারি বা প্রজাওয়ারি মালিকানায় জমি বন্দোবস্ত। এ রকম র‌্যাডিকেল প্রস্তাব যার, তিনি বাস্তবে কোনো সোশ্যালিস্ট বা সিন্ডিক্যালিস্ট ছিলেন না। অর্থনীতির নির্মোহ বিশ্লেষণই তাকে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের (আজকের পরিভাষায়, রফতানিমুখী উন্নয়নের) পাশাপাশি কৃষক ও গ্রামমুখিন উন্নয়ন চিন্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রশ্নে অবিচল রেখেছিল। ১৮৭২ সালে লেখা প্রবন্ধটি হান্টারের ‘এনালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ গবেষণার পূর্বসূরি। রচনাটির যুক্তিগুলো বাংলার প্রথম আদমশুমারির আগেই পরিকল্পিত হয়েছিল।

‘দেশের শ্রীবৃদ্ধি’ ও ‘কৃষকের কল্যাণ’_ যথাক্রমে সামষ্টিক ও ব্যাস্টিক এ দুই অর্থনৈতিক দিককে বঙ্কিম তার লেখায় মেলাতে চেয়েছেন। সে চিন্তায় সুশাসনেরও স্থান রয়েছে। সেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা রয়েছে, রয়েছে ‘আদিম ধনসঞ্চয়’-এর কথাও। ‘রুল অব ল’-এর জাঁতাকলে পড়ে কত কৃষক আইন-আদালত করে কবে সর্বস্ব হারাল তার মর্মস্পর্শী বিবরণ আছে এতে। বস্তুত, উন্নয়ন অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের এ লেখাটির তুল্য বিশ্লেষণাত্মক লেখা সর্বত্রই দুর্লভ। এটি উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই পঠিত হতে পারবে।

দ্বিতীয় উদাহরণটি রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ থেকে নেওয়া। রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাতেও ব্যাস্টি ও সমষ্টির কল্যাণের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা বড় আকারে উত্থাপিত হয়েছে। রাশিয়ায় বলশেভিক মত চলছে; কিন্তু সে মত কালের বিচারে টিকবে কি-না এ নিয়ে তার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যকে আজকের দিনেও অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ মনে হয়। নতুন সোভিয়েত ব্যবস্থাকে নির্বিচারে গাল-মন্দও করেননি, আবার ভক্তি বিগলিত চোখেও দেখতে চাননি। তিনি লিখছেন, ‘সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কসীয় অর্থনৈতিক মতটা সম্পূর্ণ গ্রাহ্য কি-না সে কথা বলবার সময় আজও আসেনি; কেননা এ মত এতদিন প্রধানত পুঁথির মধ্যেই টলে টলে বেড়াচ্ছিল, এমন বৃহৎ ক্ষেত্রে এত বড় সাহসের সঙ্গে ছাড়া পায়নি। পরীক্ষার ভিতর দিয়ে পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে এ মতের কতটুকু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আজ নিশ্চিত কেউ বলতে পারে না।’ স্বার্থপরতা একেবারে ছেড়ে দিলে আপদ বাড়তে পারে, মানব প্রকৃতির স্বভাবজ সম্পত্তি-পরায়ণতা একেবারে ছেঁটে ফেলতে চাইলে এ ‘সিস্টেম’ হয়তো টিকবে না। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি পরার্থপরতা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য খুঁজেছেন। এই মেলানোর তত্ত্বে তার পক্ষপাতিত্ব অবশ্য সামষ্টিক জনকল্যাণের দিকে, বাজার অর্থনীতির স্বার্থবুদ্ধির প্রতি নয়। এ ক্ষেত্রে নিখুঁত সমাধান তার জানা নেই : “ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যখন উৎকট স্বার্থপরতায় পেঁৗছিয়ে সমাজে নানা প্রকার উৎপাত মথিত করে তখন উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বার্থ থেকে স্ব-টাকে এক কোপে দাও উড়িয়ে। তাহলেই সমস্ত ঠিক চলবে।’ তাতে হয়তো উৎপাত কমতে পারে। কিন্তু চলার পথ বন্ধ হওয়া অসম্ভব নয়।” ব্যক্তির জন্য ইনসেনটিভ ও জনকল্যাণের ওয়েলফেয়ার ইকোনমিক্সের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে রবীন্দ্রনাথ এ প্রশ্নে পূর্বাপর সচেতন ছিলেন। ১৯২০-এর দশকে লেখা ‘সংহতি’ প্রবন্ধেও এর পূর্বলেখ পাই আমরা।

তৃতীয় উদাহরণটি নজরুলের ‘ছুৎমার্গ’ রচনা থেকে নেওয়া। শ্রেণীর নামে, জাতের নামে, ধর্মের নামে, বর্ণের নামে সামাজিক ছুৎমার্গকে প্রশ্রয় দিলে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই সামাজিক উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারে না। এডাম স্মিথের মতাদর্শ ছিল সামাজিক ছুৎমার্গহীন এক ‘অর্থনৈতিক মানব’-এর সমাজের। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ অবাধ বাজার অর্থনীতিকে শিরোধার্য করেছে, কিন্তু ‘অর্থনৈতিক মানব’ তত্ত্বকে যৌক্তিকভাবে স্বীকার করেনি। ফলে বেশকিছুটা প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন ঘটলেও সামাজিক জাত-পাত-ধর্ম-আচার প্রভৃতির ভেদবুদ্ধি থেকে আমাদের মতো দেশগুলোর মুক্তি মেলেনি। সামাজিকভাবে আমরা ‘ছাড়া-ছাড়া’ থাকব আর অর্থনৈতিকভাবে আমরা ‘একত্রিত’ হব_ বাজার অর্থনীতির এই সামাজিক মতাদর্শ অবাস্তব। আমেরিকা-ইউরোপের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, শত মাল্টিকালচারালিজম আওড়ানো সত্ত্বেও সেখানে ‘সামাজিক প্রভেদ’ ঘুচেনি বা ‘সামাজিক দেওয়া-নেওয়ার’ সম্পর্ক বিভিন্ন সামাজিক বর্গের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পায়নি। নজরুল লিখছেন, ‘আমাদের গভীর বিশ্বাস যে, হিন্দু মুসলমান মিলনের প্রধান অন্তরায় হইতেছে এই ছোঁয়াছুঁয়ির জঘন্য ব্যাপারটাই। … বিবেকানন্দ বলিয়াছেন যে, ভারতে যেদিন হইতে এই ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দটার উৎপত্তি সেদিন হইতেই ভারতের পতন, মুসলমান আগমনে নয়। … মানুষ হইয়া মানুষকে কুকুর-বিড়ালের মতো এত ঘৃণা করা মনুষ্যত্বের ও আত্মার অবমাননা করা নয় কি? … হিংসা, দ্বেষ জাতিগত রেষারেষির কি সাংঘাতিক বীজ রোপণ করিতেছ তোমরা! অথচ মঞ্চে দাঁড়াইয়া বলিতেছ, ‘ভাই মুসলমান এস, ভাই ভাই এক ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই!’ ‘কী ভীষণ প্রতারণা! মিথ্যার কি বিশ্রী মোহজাল! এই দিয়া তুমি একটা অখণ্ড জাতি গড়িয়া তুলিবে?’ নরেন্দ্র মোদির আধুনিক ভারত-তত্ত্ব বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে যাওয়ার কংগ্রেসি তত্ত্ব এ প্রেক্ষিতেই আমাদের দেখতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক উদারীকরণ করে ভারতীয় সমাজ আধুনিক হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে সামাজিক ‘ছুৎমার্গ’ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারছে। জাত-পাতের ব্যবধান ডিঙিয়ে পরস্পরকে আপনার, ‘সমকক্ষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, ‘কাছের করে’ জানতে হবে। নইলে কাঙ্ক্ষিত সমাজের সূত্রপাত ঘটবে না।

ইচ্ছা করেই অন্যান্য বাঙালি তাত্তি্বক, চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিকদের কথা এ প্রসঙ্গে বাদ রাখলাম। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আমার বলার কথা ছিল যে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন চিন্তা বড় বেশি পরনির্ভরশীল তত্ত্বের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থানীয় চিন্তার সূত্রে অর্থনৈতিক তত্ত্বকে আমরা সেভাবে দাঁড় করাতে পারিনি। অথচ সে সম্ভাবনা বিশদভাবে রয়ে গেছে পূর্বসূরিদের চিন্তা-ভাবনায়। প্রবৃদ্ধি হলেই আমরা ধরে নিচ্ছি তা অবধারিতভাবে জনকল্যাণমুখী এবং সে কারণেই ফি-বছর প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক একটি প্রথাগত সংলাপে পরিণত হচ্ছে। সমতামুখিন প্রবৃদ্ধি কিসে সাধিত হবে সে ধরনের প্রশ্নে আমরা প্রবেশ করতে কুণ্ঠিত হচ্ছি। দারিদ্র্য কমছে বলে কিছুটা আত্মপ্রসাদ বোধ করছি, দারিদ্র্য কমার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছি না। তুলনামূলকভাবে অদক্ষ শ্রমের কল্যাণ হচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তুলনামূলকভাবে অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানরা আগামীতে মধ্যবিত্তে পরিণত হবে কি-না এই মৌলিক সামাজিক সচলতার প্রশ্নটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। তা ছাড়া, হাড় ভাঙা খাটুনির পর হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত্তের পুষ্টির সমস্যা এখনও চলে যায়নি। দেশের হয়তো শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, ‘মঙ্গলের ছড়াছড়ি হচ্ছে’; কিন্তু ‘চরম দরিদ্রে’ থাকা মানুষরা কিন্তু এখনও সংখ্যায় প্রায় ২ কোটির মতো। এরা এখনও ‘দীনের হতে দীন’। তিন বেলা হয়তো এরা খেতে পারছে; কিন্তু মৌলিক অনেক নাগরিক সুবিধা থেকে এরা এখনও বঞ্চিত। ক্ষমতার কাছে এরা এখনও অসহায়। মধ্য আয়ের দেশ হয়তো অচিরেই আমরা হতে পারব; কিন্তু চরম দরিদ্র মানুষের অবস্থার পরিবর্তন না হলে এই শ্রীবৃদ্ধিতে সান্ত্বনা নেই। আছে কি?

লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতি বিশ্লেষক

বিত্ত ও বৈষম্য (Wealth and Inequality)

বিনায়ক সেন

১. টমাস পিকেটির নতুন বই
২০১৪ সালের মে মাসের ৭ তারিখে ৪৩ বছর পূর্ণ হলো টমাস পিকেটির। পিকেটি প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক। ঠিক এক মাস আগে বেরিয়েছে তাঁর দ্বিতীয় বই ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’। চারপাশে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেছে এ বই নিয়ে। নোবেল জয়ী অর্থনীতির অধ্যাপক পল ত্রুক্রগম্যান এ বইয়ের আলোচনাই করেছেন ‘নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস’ শীর্ষক খ্যাতনামা পাক্ষিকে। বলেছেন, পিকেটির বই সম্ভবত ‘এক দশকের মধ্যে অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই’। এ বই ২০টি শিল্পোন্নত দেশের ওপর গত তিনশ’ বছরের তথ্য-উপাত্ত জড়ো করে পুনরায় বৈষম্যের প্রশ্নটিকে মেইন স্ট্রিম অর্থনীতির মূল প্রসঙ্গের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে। এখন বোঝা যায় কেন পুঁজিবাদকে রবীন্দ্রনাথ ‘যক্ষপুরী’ নাম দিয়েছিলেন। পিকেটি তাঁর বইয়ে যক্ষের ধন-সম্পদের সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মার্কস তার পুঁজি গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কী করে পুঁজির ক্রমাগত সঞ্চয়নের (অ্যাকুমুলেশন) অবধারিত পরিণতি হচ্ছে সমাজে ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্য। পিকেটি-কর্তৃক সংগৃহীত উনিশ শতকের তথ্য মার্কসের এ দাবিকে সমর্থন করে। দৃষ্টিকটুভাবে বাড়তে থাকা আয়-বৈষম্যের পরিণতিতে এভাবেই দেখা দিয়েছিল ১৯১৪-১৮ সালের প্রথম মহাযুদ্ধ। অন্যদিকে সাইমন কুজেনেস গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি দেখালেন, জাতীয় আয়ে পুঁজির অনুপাতে ক্রমাগত বৃদ্ধি যে ঘটতেই থাকবে এমন কোনো কথা নেই। শিল্প-বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে এটা ঘটলেও পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত উন্নতি ও শিক্ষার বিকাশের কারণে জাতীয় আয়ে পুঁজির অনুপাত কমে আসবে বা এক জায়গায় স্থিতিশীল হবে। আয়-বৈষম্য গোড়ার দিকে বাড়লেও পরবর্তীতে কমতে থাকবে। দুই মহাযুদ্ধের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কুজনেস দেখালেন প্রথমে বাড়া ও পরে কমার এই প্রবণতা। অর্থাৎ মার্কসের উনিশ শতকীয় গবেষণা থেকে লাগামছাড়া বৈষম্য বৃদ্ধির যে চিত্র বেরিয়ে এসেছিল, তার বিপরীতে তাতে কুজনেস এক আশাবাদী চিত্র আঁকলেন। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম : পুঁজিবাদে যখন ঘর বেঁধেছি, তখন বৈষম্যে আর কী ভয়!

পিকেটির যুক্তি হচ্ছে, মার্কসের নেতিবাচক পূর্বাভাস কেবল আংশিকভাবে সত্য : শিল্পোন্নত দেশের কোনো কোনো পর্যায় সম্পর্কে তা খাটে। কিন্তু সবসময় নয়। একইভাবে তাঁর যুক্তি হচ্ছে, কুজনেসের আশাবাদী উচ্ছ্বাসের পেছনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই। দুই যুদ্ধের মধ্যকার সময়ে শিল্পমন্দার কারণে পুঁজির বিকাশ বিঘি্নত হয়েছিল। যুদ্ধের সময়ে অনেক পুঁজি-পণ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের দুই দশকে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেটের অভ্যুদয় ও ট্রেড ইউনিয়নের শক্তিশালী ভূমিকার কারণে পুঁজির লাগামছাড়া বৃদ্ধিকে কিছুটা রাশ টানা গিয়েছিল। ফলে ওই সময়-পর্বে বৈষম্য কিছুটা হ্রাস পেয়ে থাকবে। কিন্তু এ অবস্থাটা বদলে যায় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে এবং এখনও এর মধ্যেই আছি আমরা। এই সময়টা শ্রমের বিরুদ্ধে পুঁজির ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার কাল। জাতীয় আয়ে পুঁজির অংশ দ্রুত বাড়তে থাকে আবারও; আর শ্রমের অংশ ক্রমাগত কমতে থাকে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফের বাড়তে থাকে ধনী-গরিবে আয়-বৈষম্য। এই প্রবণতাটি ২০০০-এর দশকে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পেঁৗছেছে। কিন্তু এটাই পিকেটির প্রধান বক্তব্য নয়।

তাঁর আরও দাবি :শিল্পোন্নত দেশে পুঁজির ক্রমাগত সঞ্চয়নের প্রক্রিয়ায় সমাজের ‘সর্বোচ্চ ১ শতাংশের’ হাতে আয় (ইনকাম) ও বিত্ত (অ্যাসেট) দুই-ই উত্তরোত্তর কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশ কেউই এর থেকে বাদ পড়ছে না। তাঁর আরও একটি দাবি, এসবই শুধু অর্থনীতির উপাদানের কারণে হচ্ছে না। ১৯৮০ সাল থেকে বৈষম্য-বৃদ্ধির যে ধারাবাহিক প্রবণতা পাই, তার পেছনে কাজ করেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকও। কোন শ্রেণীর জন্য কী ধরনের কর বসবে বা কী ধরনের ব্যাংক-অর্থায়ন নীতি গ্রহণ করা হবে, তা রাজনীতিতে যারা প্রভাবশালী তাদের দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে।

পিকেটির বইতে তিনশ’ বছরের বিচিত্রবিধ তথ্য সমাবেশের মধ্য দিয়ে এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক বয়ান উপস্থাপন করা হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশের অভিজ্ঞতা তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন নির্মোহভাবে। এক্ষেত্রে তিনি মার্কসের সহযাত্রী। মার্কসের মতোই তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ‘পুঁজিবাদের মৌলিক কাঠামোগত দ্বন্দ্ব’ হচ্ছে এ ব্যবস্থায় অর্থনীতির ‘প্রবৃদ্ধি হারের’ তুলনায় ‘পুঁজির থেকে রিটার্নের হার’ বেশি করে বাড়তে থাকা। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পোন্নত দেশে বাৎসরিক প্রবৃদ্ধির হার যদি ১-২ শতাংশ, সেখানে পুঁজি বিনিয়োগে রিটার্নের হার হয় ৪-৫ শতাংশ (বলে রাখি, উন্নত দেশগুলোয় সর্বাধুনিক ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রযুক্তির ক্রিয়াশীলতার কারণে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় কখনোই ১-২ শতাংশের বেশি হয় না)। এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকটা দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ও যুদ্ধ-পরবর্তী এক-দুই দশকে কমে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধিতে রাশ টানা না গেলে তা শিল্পোন্নত দেশে উত্তরোত্তর বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা, এমনকি যুদ্ধ-বিপ্লব পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে পারে। এজন্যই পিকেটির বই নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট এত আতঙ্কিত।

এ অবস্থা থেকে পিকেটি অবশ্য যুক্তি খুঁজেছেন পুঁজির ওপরে ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে বাৎসরিক কর বসানোর মধ্যে। তাঁর মতে, পুঁজির রিটার্নের ওপর হস্তক্ষেপ করে লাভ নেই। কেননা এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা হবে। কিন্তু পুঁজির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর ক্রমবর্ধমান হারে কর বসানোই যেতে পারে। যেমন যাদের পুঁজির পরিমাণ ১০ লাখ ডলারের কম সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ বাৎসরিক কর, ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডলারের পুঁজি বা সম্পদ যাদের, তাদের ওপর ১ শতাংশ কর, ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার পুঁজি বা সম্পদ যাদের তাদের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ কর, এভাবে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসানো যেতে পারে।

বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে পুঁজির উত্তরোত্তর মালিকানার ওপরে বর্ধিত হারে কর বসানোর পক্ষে অন্যবিধ উপাত্তও সম্প্রতি জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। ব্রিটেনে সরকারি পর্যায়ে পরিচালিত বিত্ত-জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৮-১০ সালে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পরিবার মোট বিত্তের ৪৪ শতাংশের অধিকারী। একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও। অবশ্য পিকেটির লেখায় উল্টো প্রবণতার কথাও উলিলখিত হয়েছে। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে যে দুটো শুভ প্রভাবকের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকভাবে প্রযুক্তিগত উন্নতির দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ও শিক্ষার সর্বাত্মক বিস্তারের মাধ্যমে শ্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি। চীন ও পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশ এ দুটো প্রভাবককে আশ্রয় করেই দ্রুত উন্নতি লাভ করেছে এবং এতে বিশ্বব্যাপী পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার বৈষম্যের মাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছুটা শুভ সূচনাও হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এসব উদাহরণ হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমিত। তার ওপরে, এসব দেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের পর্যায়ে শিল্পোন্নত দেশের মতোই দ্রুত বৈষম্য বৃদ্ধির অশুভ প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।

পিকেটি মন্তব্য করেছেন, পুঁজির উপরে প্রগ্রেসিভ হারে কর বসানোর নীতি কার্যকর করতে হলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন। পুঁজি যে রকম বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বচ্ছন্দ ও সচল, সেখানে সে সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হতে পারে। তাকে ধরা অত সহজ নয়। কিন্তু পিকেটি এও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পুঁজির এই অতিমাত্রায় সঞ্চয়ন বা দৌরাত্ম্য ‘বাজার ব্যবস্থার কোনো ত্রুটির ফসল নয়’। বিশুদ্ধ ও নিখুঁত বাজার ব্যবস্থাতেও পুঁজির রিটার্নের হার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশিই হবে। আর এই ধারা থেকে গেলে বৈষম্য বাড়তে বাধ্য এবং এক পর্যায়ে লাগামছাড়া বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতাকে উস্কে দেবে। এই পয়েন্টে তিনি আবারও মার্কসের সহগামী; দু’জনেই পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বিরোধ আবিষ্কার করতে চেয়েছেন।

অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থা পুঁজির এই বল্গাহীন বিকাশের ধারাকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। পিকেটি বলছেন :”ইয়েট পিওর অ্যান্ড পারফেক্ট কমপিটিশন ক্যান নট অল্টার দ্য ইনইকুয়ালিটি অব রিটার্ন অন ক্যাপিটাল বিইং গ্রেটার দ্যান দ্য রেট অব গ্রোথ অব ইকোনমি। দিস ইজ নট দ্য কনসেকুয়েন্স অব এনি মার্কেট ‘ইমপারফেকশন’।” শেষ পর্যন্ত তিনি সমস্যার মুক্তি খুঁজেছেন ‘পুঁজিবাদের ওপর গণতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার মধ্যে। ইউরোপিয়ান ডেমোক্রেসির সেরা ঐতিহ্য ধরে গণতন্ত্রকে গভীরতর, বিস্তৃততর ও পূর্ণতর করার মধ্যে। পিকেটির স্বদেশীয় প্যারিসবাসী দার্শনিক জাঁক দেরিদাঁ এ ক্ষেত্রে একই কথা বলেছিলেন নব্বইয়ের দশকে। পুঁজির শাসন তার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে; গণতন্ত্রকে এখন আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তবে সেই গণতন্ত্র দেরিদাঁর ভাষায় ‘এখনও আসতে বাকি’।

২. আমাদের ‘১ শতাংশ’
পিকেটি তাঁর নতুন বইয়ে দ্রুত বৃদ্ধিশীল বিত্ত-বৈষম্যের মূলে ক্রিয়াশীল দেখেছেন সংকীর্ণ এক শ্রেণীর কাছে পুঁজির ক্রমাগত হারে জড়ো হওয়াকে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাকে রোধ করার জন্য তিনি দু’ধরনের নীতির কথা বলেছেন। একটি হচ্ছে, পুঁজির বল্গাহীন কুক্ষিগতকরণের ধারাকে ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে কর বসিয়ে নিরুৎসাহিত করা। অন্যটি হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও শিক্ষার আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পুঁজির বিকেন্দ্রীভবন করা ও শ্রমের দক্ষতা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা। প্রথমটি যদি হয়ে থাকে ‘ডাইভারজেন্সকে’ কমিয়ে আনার নীতি, দ্বিতীয়টি তবে ‘কনভারজেন্স’কে লালন করার উপায়। দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রযুক্তিগত উন্নতির বিকাশ খুবই অসম, এমনকি শিক্ষার সরলতম সূচকেও দেশে দেশে ব্যবধান এখনও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু পর্যায়ে রয়েছে। আর দেশের ভেতরে প্রযুক্তির অধিকারে এবং শিক্ষার স্তরে/মানে ধনী-গরিবে বৈষম্য বা বৈপরীত্য আরও করুণ। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু জাতীয় আয়ে পুঁজি আর শ্রমের অধিকারের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে তাই নয়। বৈষম্য চোখে পড়ার মতো বেড়েছে শ্রমের ভেতরেই_ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে, হাইস্কুল থেকে ‘ঝরে পড়া শ্রমিক’ আর ‘কলেজ-শিক্ষিত শ্রমিকের’ মধ্যে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বল্প-শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের ব্যবধান ক্রমেই প্রকট হারে বাড়ছে। বাংলাদেশেও বাড়ছে। কিন্তু আমি এখানে পিকেটির মূল প্রতিপাদ্য শতাংশের হাতে ক্রমেই কুক্ষিগত হওয়া পুঁজি বা সম্পদ এ প্রসঙ্গে সবাইকেই আরেকটু ভাবতে বলব। কেননা,ম ‘১ শতাংশের ক্ষমতা’র প্রসঙ্গটি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে গত দুই দশকের গণতান্ত্রিক ডিসকোর্সের মধ্যে প্রায় অনালোচিত থেকে যাচ্ছে।

ব্যাপারটা সত্যি বিস্ময়কর। ১ শতাংশের সম্পদের প্রসঙ্গটি অনালোচিত থাকছে গণতন্ত্রের যুগেই! অথচ যখন গণতন্ত্র ছিল না, তখন এ নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হতো। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যগগনে, সেই সুদূর ষাটের দশকে, আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তেইশ পরিবারের’ নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ। পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ খাদিজা হক এই ‘তেইশ পরিবার’ শনাক্ত করেছিলেন; পরবর্তী সময়ে স্টিফেন হোয়াইট ‘একচলি্লশ পরিবারের’ সম্পদ নিরূপণ করেছিলেন। আরও পরে, সোভিয়েত অর্থনীতিবিদ সের্গেই বারানভ পূর্ব পাকিস্তানের সময়েই ‘১৬ জন বাঙালি পরিবারের’ তালিকা প্রণয়ন করেছিলেন, যার উল্লেখ রয়েছে রেহমান সোবহানের লেখায়। স্বাধীনতার পর আশির দশকে যখন গণতন্ত্র নেই এ দেশে, তখন আবারও নতুন করে ১ শতাংশের ক্ষমতার প্রসঙ্গ উঠেছিল। এই আলোচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের বামশক্তি। আমার বেশ মনে পড়ে, ১৯৮৭ সালের গোড়ার দিকে এক ঝকঝকে অপরাহ্নে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বললেন, ‘দেশ আজ পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মতো দুই অর্থনীতিতে ভাগ হয়ে গেছে। এই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ করছে কতিপয় বৃহৎ ধনিক গোষ্ঠী ও পরিবার। আপনারা তাদের পরিসংখ্যান দিয়ে খুঁজে বার করুন।’ মোহাম্মদ ফরহাদের পরনে ছিল ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি এবং যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর চোখেমুখে এক শান্ত বিপ্লবী দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল। ততদিনে ‘একতা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বের হতে শুরু করেছে ‘ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী’। এই মর্মে একটি বইও বেরিয়েছিল পরে মতিউর রহমান ও সৈয়দ আজিজুল হকের গ্রন্থনায়। পিকেটির ধৈর্য, দক্ষতা, সুযোগ ও অধ্যবসায় কোনোটাই আমাদের ছিল না। পরিসংখ্যানগতভাবে শতাংশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও বিত্তকে আমরা সেদিন তুলে ধরতে পারিনি। ১৯৮৮ সালে ‘বাংলাদেশে বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ’ শীর্ষক বাংলায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। মনে পড়ে, অধুনা-বিলুপ্ত ‘মুক্তির দিগন্ত’ নামক মাসিক পত্রিকায় (এটির কিছুটা কৌলীন্য ছিল সেকালে ‘ওয়ার্ল্ড মার্কসিস্ট রিভিয়্যু’র অনুবাদ-পত্রিকা হিসেবে)। তাতে ‘৩৬টি পরিবার’ শনাক্ত করা হয়েছিল যারা একই সাথে সে সময়কার ব্যাংক, বীমা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন, আবার সরকারি ব্যাংকের বৃহৎ ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিও ছিলেন। পরে ১৯৯১ সালে, প্রাইভেটাইজেশন নিয়ে ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে এ পরিবারগুলো নিয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলাম। অগ্রজ এমএম আকাশও সে সময় এ নিয়ে আলাদা করে লিখেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ‘১ শতাংশের প্রভাব’ নিয়ে আরও লেখা ও গবেষণার প্রয়োজন ছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, আমাদের ‘রাজনৈতিক সমাজ’ ও ‘সিভিল সমাজ’ কেউই গত দু’দশকে ‘১ শতাংশের ক্ষমতা’ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেননি।

আমাদের কর্তাব্যক্তিদের মাঝেমধ্যে বলতে শুনি, বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই যেমন, উন্নত বিশ্বে বৈষম্য নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে অথচ ‘এ দেশে তো আয়-বৈষম্য তেমন একটা বাড়ছে না’। বরং ২০০৫ ও ২০১০ সালের বিবিএস জরিপ হিসেবে নিলে দেখা যাচ্ছে, শহর এলাকায় আয়-বৈষম্য একই আছে অথবা কিছুটা যেন কমেছে! এঁদের যুক্তিতে, পিকেটির লেখা তাই এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তা ছাড়া উন্নয়নের যে পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন, সেখানে দারিদ্র্য কমাটাই মূল কথা; বৈষম্য যদি কিছুটা বেড়েও থাকে। তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাই কি?

বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পিকেটিকে আঠারো শতকের ফ্রান্সের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটতে হয়েছে (জেমস্কারা স্ট্যাটিসটিক হাতড়ানো লেনিনের মতো)। এমনকি ফিরে যেতে হয়েছে জেন অস্টেন বা বালজাকের উপন্যাসের পাতায়, যেখানে তাঁরা উল্লেখ করছেন পাত্র-পাত্রীর জমিদারি সম্পদ, বিনিয়োগ ও রিটার্নের কথা। তা ছাড়া ‘লুক্সেমবার্গ প্রকল্পের’ আওতায় পশ্চিম ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে সম্পাদিত হচ্ছে আয়-ব্যয় জরিপ। যুক্তরাষ্ট্রে ও যুক্তরাজ্যে প্রতি দু-তিন বছর অন্তর সম্পন্ন হচ্ছে ‘বিত্তের ওপর জরিপ’ বা ওয়েলথ সার্ভে। সম্পদ জরিপের কোনোটাই কখনও আমাদের দেশে হয়নি; এখনও হয় না। যেটা হয়ে থাকে, সেটা হচ্ছে খানা-পর্যায়ে আয়-ব্যয় জরিপ। কিন্তু তাতে অতি গরিবদের অংশগ্রহণ থাকে, গরিবের থাকে, মধ্যবিত্তের থাকে। কিন্তু শহর এলাকার (বিশেষত, ঢাকা ও চট্টগ্রাম) ধনিক পরিবারের বলতে গেলে অংশগ্রহণই থাকে না। আর ঢাকার অতি-ধনিক পরিবারদের ওপর আয়-ব্যয় জরিপ চালানোর মতো ক্ষমতা নেই বিবিএসের। কেননা, যারা প্রশ্নের উত্তর দেবেন তারা তো মহাপরাক্রমশালী। উত্তর দিতে না চাইলে কার সাধ্য তাদের বাধ্য করে! ফলে গবেষণা কর্মকর্তাদের ওই সব ধনাঢ্য পরিবারের ফটক থেকেই ফিরে আসতে হয়। সন্দেহ কি, এর ফলে তথ্য যা পাওয়া যায় তাতে মনে হতেই পারে, ২০০০-এর দশকে শহর এলাকায় আয়-বৈষম্যের মাত্রা নিরূপক জিনি-সহগের মাত্রা একই আছে। বেশ কমে গেলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকত না। কেননা, এর সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই এ নেহাতই পরিসংখ্যানগত ত্রুটিজনিত বিভ্রম।

আশির দশকের ‘অ-গণতান্ত্রিক’ প্রেক্ষিতের তুলনায় ২০১০-এর দশকের ‘গণতান্ত্রিক’ পরিবেশে আমাদের ১ শতাংশের বিত্ত, প্রভাব ও প্রতিপত্তি যে আরও অনেক গুণে বেড়েছে তার সপক্ষে সরাসরি তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সেকালে সহজেই সরকারি ব্যাংকের সূত্রে ঋণ-গ্রহণ ও খেলাপি ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা যেত। এখন ওয়ান-স্টপ ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো হয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে ওপরওয়ালার ইচ্ছা ব্যতীত অক্ষর-পরিমাণ তথ্য-পরিসংখ্যান বের করা কঠিন। সে সময় যারা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন তাঁরা নিজেরাই এখন ১ শতাংশ অথবা ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছেন। ‘সবকিছুই কালের ও শ্রেণী-স্বার্থের অধীন’ এ নিয়ম মেনে তারা সামরিক বহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ে নীরবতা পালন করছেন। ফলে গবেষকের কার্যোদ্ধার হওয়া এখন দুরূহ। বৃহৎ করদাতা যাঁরা তাঁরা কারা এবং তাঁদের কাছে সম্পদ কত, এটিও জানার উপায় নেই। এমনকি গবেষণার প্রয়োজনেও। তথ্য অধিকার আইনের প্রবেশ এখানে নিষিদ্ধ। তবে তারপরও কিছু পরোক্ষ সূচক তৈরি করা যায়, যার থেকে ১ শতাংশের ক্রমবর্ধমান বিত্ত ও প্রতিপত্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মেলে।

দেশীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা আশির দশকের গোড়ায় যেখানে ছিল ৬-৭টি, এখন তার সংখ্যা ৩১। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ৮টি ইসলামিক কমার্শিয়াল ব্যাংক। অনুরূপভাবে বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা-পরিচালককে বোধকরি ১ শতাংশের মধ্যে গণ্য করা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত দেশের ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেলের উদ্যোক্তাদেরও। পত্রিকা মালিকদেরও। স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত, কোম্পানির সংখ্যা এ সময়ে বেড়েছে। এর মধ্যে ‘কনগ্গ্নমারেটের’ (শিল্প-ব্যবসা গ্রুপ যারা একাধিক খাতে বিচরণরত) সংখ্যাই ৩০টি। এরাও ১ শতাংশের মধ্যে পড়েন। বিশ বছর আগে ঢাকায় ডেভেলপারের সংখ্যা ছিল ৫টিরও কম। এখন ২৫০টির মতো। রিহ্যাবের প্রধান ৫০টি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গত দুই দশকে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে আনুুমানিক ৫-৬ লাখের মতো। ফ্ল্যাটের গড় মূল্য এই সময়কালে পরে প্রায় ১০-১৫ গুণ বেড়েছে। এই ফ্ল্যাট কেনার মতো অর্থ-বিত্ত যাঁদের হাতে তাঁরা ১ শতাংশ না হন, ৫ শতাংশের মধ্যে নিশ্চয়ই পড়েন। তবে এঁদের মধ্যে ১ শতাংশ চেনার উপায় হচ্ছে, কোন এলাকায় তাদের বাস ও একাধিক ফ্ল্যাট বা বাড়ি আছে কি-না সে তথ্য। আমি একজনকে জানি, যার ঢাকা শহরে ৬০টির বেশি ফ্ল্যাট আছে। আর একাধিক ফ্ল্যাট আছে অনেকেরই।

এই ধনাঢ্য শ্রেণী কোনো সম্পদ-কর দেন না। কেননা আমাদের দেশে কোনো ওয়েলথ-ট্যাক্সের প্রথা নেই। সম্পদ-করের কথা শুনলেই কেউ কেউ অপ্রাসঙ্গিক, অযৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয় এ ধরনের কথা বলতে থাকেন। এ কর আছে ভারতসহ বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশে ও প্রায় সব উন্নত দেশেই। ভারতে ১ শতাংশ হারে এ কর বসানো হয়ে থাকে ‘নিট’ পরিসম্পদের ওপর। অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্যায়নে গৃহীত ঋণ বাদ রাখা হয়। দ্বিতীয় ফ্ল্যাট বা জমির প্লটই (সেটা শহরের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে হলে) শুধু সম্পদের মধ্যে ধরা হয়। ভারতীয় মূল্যে ৩০ লাখের ওপরে সম্পদ যাদের তাদের ক্ষেত্রেই ১ শতাংশ সম্পদ-কর বসানো হয়। আমরা পিকেটির যুক্তি অনুসারে এখানেও ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে পুঁজি বা সম্পদের ওপরে কর ধার্যের সুপারিশ করতে পারি। এতে অনায়াসে প্রতি বছরে অতিরিক্ত ১০০০-২০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসবে, যা অতি-দরিদ্রের ‘উপরে টেনে তোলা’ ক্ষেত্রে ব্যয় করা যায়। বর্তমানে ধনী ব্যক্তির আয়করের ওপর ‘সারচার্জের’ নামে যা আহরিত হয় তার পরিমাণ অতি-নগণ্য (গত বছরে ছিল মাত্র ১৩১ কোটি টাকার মতো)।

কিন্তু শুধু সম্পত্তি কর বসিয়ে এই ১ শতাংশের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এদের আর্থিক প্রভাব আছে, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। নির্বাচনী ব্যয় ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংস্কার না এলে এই প্রভাব চলতেই থাকবে। গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে রাজনৈতিক সমাজ নয়, বরং যাদের দ্বারা তারা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত_ সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ‘১ শতাংশ’ শ্রেণী। কালক্রমে এমনকি রাজার চেয়েও অধিক পরাক্রমশালী হয়ে দাঁড়াতে পারে এই শ্রেণীর প্রভাব-প্রতিপত্তি। যক্ষপুরীর রাজা এক সময় এ কথা বুঝতে পেরে তার নিজেরই গড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নন্দিনীর সাহায্য চেয়েছিলেন। যক্ষের ধন জড়ো করার মধ্যে জীবনের সহজ সুখ নিহিত নেই। রক্তকরবী নাটকের এই ছিল মর্মবাণী। নন্দিনীকে রাজা তাই বলেছিলেন :’আমার যা আছে সব বোঝা হয়ে আছে। সোনাকে জমিয়ে তুলে তো পরশমণি হয় না’। পিকেটি ক্রমবর্ধমান বিত্ত-বৈষ্যমের অশুভ পরিণতির দিকে দৃষ্টিপাত করে আমাদের এ সরল সত্যের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

বিনায়ক সেন
লেখক
প্রাবন্ধিক
গবেষক

Original post on Samakal here.

রবীন্দ্রনাথ ও মধ্যপ্রাচ্য (Tagore and the Middle East)

বিনায়ক সেন

১. সভ্যতার সংঘাত
Rabindranath Tagore
বার্লিন দেয়াল পতনের দু’বছরের মাথায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হলো স্যামুয়েল হান্টিংটনের নাটকীয় থিসিস_ ‘সভ্যতার সংঘাত’। ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থি রক্ষণশীলদের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক। সেখানেই হান্টিংটন এ বক্তৃতাটি দিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে প্রভাবশালী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে থিসিসটি আরও সুসংগঠিতভাবে প্রকাশ পেল। সেখানে তিনি যা লিখলেন তা অনুবাদে দাঁড়ায় মোটামুটি এ রকম :’আজকের পৃথিবীর সমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মৌলিক উৎস এবার থেকে আর ভাবাদর্শ বা অর্থনৈতিক কার্যকারণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রধান উৎস হবে সাংস্কৃতিক। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়া জাতি-রাষ্ট্রসমূহ এবার থেকে সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কারণেই পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। সভ্যতার সংঘাত এবার থেকে বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হয়ে দেখা দেবে। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যেকার বিভেদরেখা ধরেই আগামী দিনের যুদ্ধের রেখা নির্মিত হবে।’ ‘বিভিন্ন সভ্যতা’ মানে পাশ্চাত্য (পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা) সভ্যতার সাথে অন্যসব সভ্যতার লড়াই। তবে নন-ওয়েস্টার্ন সভ্যতাসমূহের মধ্যে হান্টিংটন বিশেষ করে চিহ্নিত করেছিলেন ইসলাম প্রভাবিত সভ্যতা বা মুসলিম সভ্যতাকে। ভারত ও রাশিয়াকে ফেললেন ‘সুইং সভ্যতা’র কাতারে, অর্থাৎ একপ্রকার দোদুল্যমান মিত্র হিসেবে। ‘আমরা এবং তারা’_ এই লড়াই কার্যত দাঁড়িয়ে গেল পাশ্চাত্য বনাম ইসলামী সভ্যতার লড়াইয়ে। হান্টিংটনের বইয়ের পূর্ণ শিরোনাম ছিল ‘সভ্যতার সংঘাত এবং বিশ্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস’। সভ্যতার সংঘাত_ এই শব্দবন্ধটি অবশ্য তার আগেই ব্যবহৃত হয়েছে ১৯২৬ সালের একটি বইয়ে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বেসিল ম্যাথিউস লিখেছেন অনুসন্ধানী গ্রন্থ :’ইয়াং ইসলাম অন ট্রেক :স্টাডি ইন দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস্’। এ বই প্রকাশের ৬ বছর পরে ১৯৩২ সালে পারস্যে যাবেন রবীন্দ্রনাথ। মূলত ইরান এবং অংশত ইরাক ভ্রমণের বিবরণী নিয়ে লেখা হবে ‘পারস্য যাত্রী’। উপমহাদেশের বাইরে এটাই হবে তার শেষ বিদেশ ভ্রমণ। তবে নিছক ভ্রমণ কাহিনী ছিল না বইটি। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, বিশেষত মুসলিম সভ্যতার সাথে ঘনিয়ে ওঠা সংঘাত-তত্ত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ দেখা যাচ্ছে অবহিত ছিলেন। এ নিয়ে বইয়ের নানা স্থানে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে, যার পদ্ধতিগত দৃষ্টিকোণ ও সমকালীন গুরুত্ব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এ নিয়েই কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছি এখানে।

২. আকাশ-সাম্রাজ্যবাদ
‘দূরত্ব’ তৈরি করতে পারলে অন্যপক্ষকে শত্রুপক্ষ ভাবা সহজ এবং সেই শত্রুর বিনাশ সাধনও অনায়াসসাধ্য হয়ে ওঠে। সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্বের মূলে রয়েছে নানা সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে অপরিচিতের দেয়াল তুলে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা। বিভিন্ন গোত্র, জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে অচেনা দেয়াল তুলে বৈরী ভাবনা সৃষ্টির প্রয়াসের বিরুদ্ধে কোরআন শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে :’আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতিতে ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।’ অপরিচিতকে সহজেই হত্যা করা যায় এবং এ কাজে প্রযুক্তিগত উন্নতি বাড়তি উৎসাহ যোগাতে পারে। এখানে ‘দূরত্ব’ বলতে শুধু ভৌগোলিক দূরত্বকে বোঝানো হচ্ছে না; মানস ভূগোলের ব্যবধানকেও নির্দেশ করা হচ্ছে। জাতিতে জাতিতে ‘দূরত্ব’ সৃষ্টি করার জন্য চাই নয়া ধারাভাষ্য, নতুন জ্ঞান-উৎপাদন; যার মাধ্যমে আপনকে পর, পরকে শত্রু এবং শত্রুকে দূর থেকে অধুনাতন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই নির্মূল করা সম্ভব। দূরত্ব-সৃষ্টির মাধ্যমে ‘অপরায়ন’ (মানে পর করে দেওয়ার) রাজনীতি ও এর আধুনিক কলাকৌশল রবীন্দ্রনাথের চোখে ধরা পড়েছিল। তখন সবেমাত্র মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী ভাগবাটোয়ারা শেষ হয়েছে, যদিও খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ও প্রতিরোধ চলছে বিভিন্ন অঞ্চলেই। এই পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন (দীর্ঘ উদৃব্দতি কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিধায় তুলে দিচ্ছি):

“বোগদাদে ব্রিটিশদের আকাশফৌজ আছে। সেই ফৌজের খ্রিস্টান ধর্মযাজক আমাকে খবর দিলেন, এখানকার কোন শেখদের গ্রামে তারা প্রতিদিন বোমাবর্ষণ করছেন। সেখানে আবালবৃদ্ধবনিতা যারা মরছে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঊর্ধ্বলোক থেকে মার খাচ্ছে; এই সাম্রাজ্যনীতি ব্যক্তিবিশেষের সত্তাকে অস্পষ্ট করে দেয় বলেই তাদের মারা এত সহজ। খ্রিস্ট এসব মানুষকেও পিতার সন্তান বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু খ্রিস্টান ধর্মযাজকের কাছে সেই পিতা এবং তার সন্তান হয়েছে অবাস্তব; তাদের সাম্রাজ্য-তত্ত্বের উড়োজাহাজ থেকে চেনা গেল না তাদের; সেজন্য সাম্রাজ্যজুড়ে আজ মার পড়ছে সেই খ্রিস্টেরই বুকে। তাছাড়া উড়োজাহাজ থেকে এসব মরুচারীকে মারা যায় এতটা সহজে, ফিরে মার খাওয়ার আশঙ্কা এতই কম যে, মারের বাস্তবতা তাতেও ক্ষীণ হয়ে আসে। যাদের অতি নিরাপদে মারা সম্ভব, মারওয়ালাদের কাছে তারা যথেষ্ট প্রতীয়মান নয়। এই কারণে, পাশ্চাত্য হননবিদ্যা যারা জানে না, তাদের মানবসত্তা আজ পশ্চিমের অস্ত্রীদের কাছে ক্রমশই অত্যন্ত ঝাপসা হয়ে আসছে।”

আকাশের দূরত্ব থেকে দেখলে নিচের মানুষের অস্তিত্ব মানবেতর পর্যায়ে চলে যায়, আর সে অবস্থায় প্রযুক্তি সহায়ক হলে মানব-হত্যায় আত্মার সন্তাপ হয় আরও কম। বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ-বর্ণিত বাগদাদে আমরা দেখিনি কি আকাশ থেকে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ বা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আফগানিস্তানে উপর্যুপরি ‘ড্রোন আক্রমণ?’ সরাসরি নৈকট্যে কমান্ডো সৈন্য পাঠিয়ে গুলিবর্ষণের চেয়ে অন্তরীক্ষে থেকে মনুষ্যবিহীন স্বয়ংক্রিয় রিমোট চালিত বিমান (ড্রোন) আক্রমণ অনেক বেশি ‘বিবেকসম্মত পন্থা’ বলে পাশ্চাত্যে বিবেচিত হয়েছে! একেই লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক তত্ত্ব নির্মিত উড়োজাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে।’ সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্ব এ রকমই একটি আক্রমণাত্মক-তত্ত্ব নির্মিত উড়োজাহাজ যা বুশ, সাদ্দাম, ব্লেয়ার, লাদেন সবাইকেই একযোগে ককপিটে বহন করতে সক্ষম। দাঙ্গা বাধানোয় কুশলী শ্যারন বা হালের মোদিও এর থেকে বাদ যাবেন না। সমস্যা জট পাকিয়েছে শুধু পাশ্চাত্যের মনের গভীরে নয়, সংকট দেখা দিয়েছে প্রাচ্যেও। এ যুগে নৈর্ব্যক্তিক মনন মানবতাবিদ্ধ না হলে হয়ে উঠতে পারে আবেগ-অনুভূতিহীন মারের যন্ত্র_ আ কিলিং মেশিন।

গীতায় অর্জুন যে আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে বন্ধু-স্বজনদের ওপরে অস্ত্রাঘাতে শেষ পর্যন্ত বিব্রত হলেন না, অর্জুন-বিষাদ যে এত ক্ষণস্থায়ী হলো, এর পেছনেও রয়েছে সাম্রাজ্য-বিস্তারের অমোঘ যুক্তি। তার মানে বিষয়টা শুধু পাশ্চাত্যের লোভের আগ্রাসনের নয়, সমস্যাটা প্রাচ্য-মনেরও। অর্জুন দক্ষ তীরন্দাজ। যোজন যোজন দূরত্বে থেকে নিষ্কাম মানসলোকে ডুবে গিয়ে সে যখন ‘শতঘ্নী বর্ষণ করতে বেরোয়, তখন সে নির্মমভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে; যাদের মারে তাদের অপরাধের হিসাববোধ উদ্যত বাহুকে দ্বিধাগ্রস্ত করে না। কেননা হিসাবের অঙ্কটা অদৃশ্য হয়ে যায়। যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আঁধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়োজাহাজ-অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে দেখলে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর।’ দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্যের নিরাবেগ যুক্তির দর্শন ও প্রাচ্যের নিরাবেগ মোহমুক্তির দর্শন মিলতে পারে। মিলছে একই মারের বিন্দুতে_ একই ক্ষমতা প্রয়োগের ভরকেন্দ্রে। ‘সেখান থেকে যাদের ওপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য’ বুঝি এই যে_ শরীরের মৃত্যু হয়, কিন্তু আত্মার মৃত্যু হয় না! এভাবেই নিঃসহায়রা যুগে যুগে পড়ে পড়ে মার খেয়েছে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য দর্শনের এক অন্ধকার দিকের এই রবীন্দ্র-কৃত ব্যাখ্যা আমাদের চেতনাকে সচকিত করে দেয়। ‘সেন্টিমেন্টের বালাই নেই’ এমন আধুনিক যুগকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিমনস্কতার নামে বরণ করতে রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। নবযুগের পুষ্পক-রথ, দিব্যাস্ত্র বা গাণ্ডীবের টংকার কোন দেবত্বকে ইঙ্গিত করে না। ‘জাভাযাত্রীর পত্রে’ তাই তিনি নিদ্বর্িধায় লিখতে পেরেছিলেন, ‘এই পৃথিবীতে মানুষ যদি একেবারে মরে, তবে সে এই জন্যেই মরবে_ সে সত্যকে জেনেছিল কিন্তু সত্যের ব্যবহার জানেনি। সে দেবতার শক্তি পেয়েছিল, দেবত্ব পায়নি।’ ‘পারস্য যাত্রী’তে এ নিয়ে পাশ্চাত্যকে দুষেছেন এই বলে যে, ‘য়ুরোপ দেবতার অস্ত্র পেয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে দেবতার চিত্ত পায়নি।’ অন্যদিকে প্রাচ্য এত ধর্মাশ্রিত ধর্ম নিয়ে কথা বললেই গায়ে ফোস্কা’ পড়ে যায়, তবু ধর্মের স্থৈর্য্য ও ধৈর্য তার অর্জন হয় নি।

৩. হাফেজ-সাদির দেশে
গর্বাচভের চরিত্রে একটি বড় ত্রুটি ছিল রাজনৈতিক দ্বিধা ও সংশয়ের ভেতরে বিরামহীনভাবে ভুগতে থাকা। তাঁর অনিচ্ছুক পৌরোহিত্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। কিন্তু সব পতন-স্খলনের মধ্যে একটি সত্য-উপলব্ধি ছিল তাঁর। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সত্যের ওপরে মার্কসবাদীদের একচেটিয়া অধিকার নেই এবং কোনো ভাবাদর্শই মানবকল্যাণের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আগুনের, পরে যেমন মানুষের সভ্যতা-নিরপেক্ষভাবে অধিকার রয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপরে যেমন রয়েছে, বাজার-ব্যবস্থার, পরেও তেমনভাবেই স্বাভাবিক দাবি রয়েছে। মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশে আগুন আবিষ্কারের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল পণ্য-বিনিময় ব্যবস্থা তথা পণ্য-অর্থনীতির আবিষ্কার। সমাজতন্ত্রের অর্থনীতিতেও নিতান্ত ভাবাদর্শ-তাড়িতভাবে অন্ধ না হলে এই পণ্য-অর্থনীতির সর্বাধুনিক ব্যবহার হতে পারত। পারস্যে আসার ঠিক দু’বছর আগে ‘রাশিয়ার চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, মানুষের স্বভাবের সঙ্গে সহজেই মেলে এমন রীতিনীতির সঙ্গে আপোসরফা করা প্রয়োজন। কিছু কিছু প্রগতির ধারণা জন্মায় হয়তো কোনো বিশেষ দেশ বা ভূগোলে, কিন্তু তাতে সহজাত অধিকারবোধ করে সব দেশের ও সভ্যতার মানুষই। অক্টোবর বিপ্লবের বৈষম্য-বিরোধী ধারণাও তেমনি। বিপ্লবের এত বছর পরেও ‘বৈষম্যকে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না’ এই ধারণার মৃত্যু হয়নি। রাশিয়ায় গিয়ে এই ধারণার প্রতি যেমন আকৃষ্ট হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, পারস্যে গিয়ে তেমনি মরমীবাদের ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। হাফিজ-সাদী বা রুমীর কবিতার প্রতি যেমন। পারস্যের এই মরমি কবিদের মধ্য দিয়ে ইসলামি সভ্যতার যে পরিচয় মেলে তা চিরকালের অনুভূতি; সব ধর্মের ও সংস্কৃতির মানুষের কাছেই তা আদরণীয় সঞ্চয়। ঠিক এই যুক্তিতেই ইউরোপের চেয়ে পারস্যেই তাঁকে ভালো বুঝতে পারবে এ কথা কবি বিশ্বাস করতেন : ‘কাব্য পারসিকদের নেশা, কবিদের সঙ্গে এদের আন্তরিক মৈত্রী। আমার খ্যাতির সাহায্যে সেই মৈত্রী আমি কোনো দান না দিয়েই পেয়েছি। অন্য দেশে সাহিত্যরসিক মহলেই সাহিত্যিকদের আদর, পলিটিশিয়ানদের দরবারে তার আসন পড়ে না। এখানে সেই গণ্ডি দেখা গেল না। যাঁরা সম্মানের আয়োজন করেছেন তারা প্রধানত রাজদরবারিদের দল। মনে পড়ল ঈজিপ্টের কথা। সেখানে যখন গেলেম রাষ্টনেতারা আমাদের অভ্যর্থনার জন্যে এলেন। বললেন, এই উপলক্ষে তাদের পার্লামেন্টের সভা কিছুক্ষণের জন্যে মুলতবি রাখতে হলো। প্রাচ্যজাতীয়ের মধ্যেই এটা সম্ভব। এদের কাছে আমি শুধু কবি নই, আমি প্রাচ্য কবি। সেই জন্যে এরা অগ্রসর হয়ে আমাকে সম্মান করতে স্বভাবত ইচ্ছা করেছে, কেননা সেই সম্মানের ভাগ এদের সকলেরই।’

নোবেলপ্রাপ্তির পর সেলিব্রেটির প্রতি আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই আগ্রহবোধের মধ্যে আত্মীয়তাবোধের প্রকাশ দেখেছেন। ‘ইন্দো-এরিয়ান’ সূত্রে পারস্যের সঙ্গে তার ‘রক্তের সম্পর্ক’ রয়েছে এ কথা অনুমানের পর আসল কথাটা পাড়লেন : ‘এখানে একটা জনশ্রুতি রটেছে যে, পারসিক মরমিয়া কবিদের রচনার সঙ্গে আমার লেখার আছে স্বাজাত্য। … বিনা বাধায় এদের কাছে আসা সহজ, সেটা স্পষ্ট অনুভব করা গেল। এরা যে অন্য সমাজের, অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের, অন্য সমাজগণ্ডির, সেটা আমাকে মনে করিয়ে দেবার মতো কোনো উপলব্ধি আমার গোচর হয়নি।’ মরমিয়া কবি বা সুফী-সাধকের সঙ্গে নিজের মিলের প্রসঙ্গ পারস্যে এসেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম আবিষ্কার করলেন এমনটা নয়। তিনি নিজেকে সুফী-সাধক কবিদের কাছের লোক বলেই ভেবেছেন বহুকাল থেকে। পারস্যে উষ্ণ অভ্যর্থনার উত্তরে তিনি তাঁর ‘সুফী’ পরিচয়টাকেই বিশেষ করে তুলে ধরেছিলেন : ‘আপনাদের পূর্বতন সুফী-সাধক কবি ও রূপকার যাঁরা আমি তাঁদেরই আপন, এসেছি আধুনিক কালের ভাষা নিয়ে; তাই আমাকে স্বীকার করা আপনাদের পক্ষে কঠিন হবে না।’ বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অনর্গল ফার্সি জানতেন। কবির নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ‘আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তাঁর মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।’ অন্যত্র লিখেছেন, ‘অবশেষে হাফেজের সমাধি দেখতে বেরোলুম, পিতার তীর্থস্থানে আমার মানস অর্ঘ্য নিবেদন করতে।’ দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার মতো ভিন্নতর অর্থে পারস্যও তাঁর কাছে সভ্যতার এক ‘তীর্থস্থান’ বলে মনে হয়েছিল। সেটা শুধু আচার্য পিতৃদেবের স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ নিবেদনের সুবাদে তাঁর নে এসেছিল এরকম ভাষার কোন কারণ নেই। এর প্রধান কারণ ছেলেন তিনি নিজেই। পারস্য-যাত্রার বহু আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভেতরে মধ্যপ্রাচ্য, ইসলাম ও মরমীবাদের প্রতি আগ্রহ দেখে দিয়েছিল। ব্যক্তিগত আকর্ষণ থেকেই তিনি সুফীবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে বেড়ে উঠেছেন তখন সুফীবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কোন ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ছিল না। রামমোহন স্বয়ং ব্রাক্ষ্ম মতের প্রচারে খ্রিস্টীয় ইউনিটেরিয়াল চার্চ-এর পাশাপাশি কোরআন ও ইসলাম থেকে প্রেরণা লাভ করেছিলেন। মুতাজেল্লা সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী ধরো তাঁকে বাড়তি উৎসাহ দিয়েছিল।

কিন্তু এরকম সে আমলে অনেকেই ছিলেন। ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘কালচারের লড়াই’ (১৯৩০) বলে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী বিদ্যাবিনোদ কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের জীবন-চরিত থেকে একটি উদ্ধৃতি দেন।তাতে লেখা : ‘ফির্দ্দোসি, সাদি, ওমর খৈয়াম, জামি, জালাল উদ্দিন রুমী প্রভৃতি পারস্যের বাণীপুত্রগণও তাঁহার সথা ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র বাহ্যিক আচারে হিন্দু হইলেও অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে তিনি ভক্ত সুফী হইয়া উঠিয়াছিলেন।

দুই পক্ষেই এটা ঘটেছিল। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘পারস্য প্রতিভা’ গ্রন্থে মুক্তবুদ্ধির চিন্তাবিদ মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ্ ইসলামী ধারায় সুফীমতের গুরুত্ব বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। তিনি এ-ও দেখিয়েছিলেন যে কোরআনের শিক্ষার সাথে উপনিষদের ব্রক্ষ্মসূত্রের ‘সুন্দর ঐক্য’ রয়েছে : ‘বেদান্তের সহিত সুফীমতের প্রধান সাদৃশ্য _ এ উভয়ই শুধু একেশ্বরবাদ নহে অধিকন্তু উভয়ের চৈতন্যে বিশ্বাসী অদ্বৈতবাদ।’ পারস্যে যাত্রার আগে ‘পারস্য প্রতিভা’ বইটি রবীন্দ্রনাথের হাতে পেঁৗছেছিল কিনা জানি না, তবে সন্দেহ নেই। অবশ্য বরকতুল্লাহ্র যুক্তির সাথে পরবর্তী সময়ে আহমদ শরীফের বিশ্লেষণে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ গ্রন্থে পারস্যের সুফীমতকে দ্বৈতবাদীদের দলে ফেলেছেন : ‘কুফায়াকুল’ দ্বৈতবাদের পরিচায়ক। পক্ষান্তরে ‘একোহম বহুস্যাম’ অদ্বৈতবাদ নির্দেশক। সুফীরা মুসলমান, তাই দ্বৈতবাদী, কিন্তু অদ্বৈত সত্তার অভিলাষী। বৈষ্ণবগণ ব্রহ্মবাদের প্রচ্ছায় গড়া, তবু তাদের সাধনা চলে দ্বৈতবোধে এবং পরিণামে অদ্বৈত সত্ত্বার প্রয়াসে। সুফী ও বৈষ্ণব উভয়েই পরনের কাঙালি।… সুফীমতবাদের সাথে বৈষ্ণবাদর্শের আত্যান্তিক সাদৃশ্য ও আচারিক মিল।’ আমাদের পক্ষে এসব গূঢ় তত্ত্বালাপের মর্মার্থ বোঝা সহজ নয়। কিন্তু যেটা লক্ষ্য করার_ তা হলো বিভিন্ন ধর্মের ও দর্শনের মধ্যে ‘সংঘাত যতটা, মিলের বা দেওয়া-নেওয়ার প্রবণতাও ইতিহাসে ততটা কম নয়। এই ‘মিলের ইতিহাস’ লিখতে গেলে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পারস্যবাসী মরমী বন্ধুদের পাশাপাশি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সুফীতত্ত্বের স্থানীয় বিকাশের প্রসঙ্গ চলে আসবে। হাফেজকে যে বাংলার শাসক একবার বেড়িয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন, তা এমনি এমনি নয়_ তার পেছনে সভ্যতার সংলাপের সাংস্কৃতিক তাগিদও কাজ করেছিল। রবীন্দ্রনাথের একাধিক বক্তৃতায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই তাগিদ থেকেই। ১৯১৫ সালে মুসলমান ঘরে জন্ম নেওয়া কিন্তু সন্ত রামানন্দের শিষ্য কবীরের কবিতার ইংরেজি তর্জমা প্রকাশের উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ। এর আগে ও পরে আর কেউই কবীরের কবিতা অনুবাদে প্রবৃত্ত হননি বস্তুত। বেদান্ত, সুফীবাদ বৈষ্ণব ও বাউল ভাবের দর্শনের সাথে কবির একান্ত ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার একটি অলিখিত ইতিহাস রয়ে গেছে আজ অবধি। অন্ধ অনুসরণের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি অনীহা থেকেই রবীন্দ্রনাথ এটা করেছিলেন। কবীরের ইংরেজি তর্জমার ভূমিকায় কবীর সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক এভলিন আন্ডারহিল লক্ষ্য করেন যে, কবীরের গানে পারস্য মরমী কবিদের (আত্তার, সাদি, রুমি, হাফেজ) গভীর প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন ধারার ও ধর্মের মরমী দর্শনের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত ছিল কবীরের। এভলিনের একথাটি রবীন্দ্রনাথের নিজের ক্ষেত্রেও খাটে। তাঁর ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাটি কোন বিশেষ ধর্মের বা ঘরানার মধ্যে পড়ে না। এর মধ্যে নানা ধর্মের মরমীবাদের ছায়ামতি ঘটেছে যেমন, নিজস্ব ধর্ম নিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী চিন্তারও প্রভাব পাই। কিন্তু তা ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব সত্ত্বেও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নিজস্ব একান্ত মরমী ভাবাদর্শকে তিনি কখনো প্রয়োগ করতে চাননি। জানতেন, এতে করে মরমী দর্শন ও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা কোনো অংশেরই কল্যাণ সাধন হবে না। মরমীবাদে ব্যক্তিজীবনে ধ্যানকেন্দ্রী হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাকে রেখেছিলেন নিরঙ্কুশ ধর্মনিরপেক্ষতায়_ ইহজাগতিকতার চৌহদ্দিতেই। যখন সুফী-সাধক বলে নিজেকে পরিচিত করাচ্ছেন তখনও পারস্যের বিদ্বৎ সমাজকে জানাতে ভোলেননি যে, তিনি ইউরোপের আধুনিকতারও সমঝদার। ইউরোপের যা সভ্যতা তা গ্রহণ করতে হবে।

৪. অন্ধ ধর্মাচারের বোঝা
সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্বের বয়ান করে হান্টিংটন নবপর্যায়ে পাশ্চাত্যের কূটনীতির মূল অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। কিন্তু সংঘাত-তত্ত্বের দায়দায়িত্ব প্রাচ্যও এড়াতে পারে না। অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের ও মিথ্যে ধর্মাচারের দৌরাত্ম্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানা লেখায়, প্রবন্ধে ও চিঠিপত্রে আক্ষেপ করেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাস ক্রমশ একটি খাদের দিকে গড়িয়ে চলছিল, এ কথা তিনি জানতেন। ধর্ম-বিভক্ত সমাজে কী করে সত্যিকারের ধর্মবোধ জাগ্রত হতে পারে সার্বিক মানবকল্যাণকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনে এর জন্য তিনি দেশে-বিদেশে শুভ দৃষ্টান্ত খুঁজে বেড়াতেন। তুরস্কের কামাল আতার্তুক মোল্লাতন্ত্রকে বশে এনেছেন বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “কামাল পাশা বললেন মধ্যযুগের অচলায়তন থেকে তুরস্ককে মুক্তি নিতে হবে। তুরস্কের বিচার বিভাগের মন্ত্রী বললেন : মেডিয়াভেল প্রিন্সিপলস্ মাস্ট গিভ ওয়ে টু সেক্যুলার ল’স। উই আর ক্রিয়েটিং আ মডার্ন, সিভিলাইজড্ নেশন।” মধ্যযুগের শাসন থেকে তুরস্ককে বেরিয়ে আসতে হবে, কেননা ‘পরিপূর্ণভাবে বুদ্ধিসঙ্গতভাবে প্রাণযাত্রা নির্বাহে বাধা দেয় মধ্যযুগের পৌরাণিক অন্ধ সংস্কার’। এর জন্য প্রয়োজনে যেন কিছুটা বল প্রয়োগেও কবি প্রস্তুত : ‘আধুনিক লোক ব্যবহারে’ মধ্যযুগের অন্ধ সংস্কারের প্রতি ‘নির্মম হতে হবে’ এই ছিল কামাল পাশার অনুসারীদের ঘোষণা। অন্যদিকে ইরানের রেজা শাহ ছিলেন কসাক সৈন্য দলের অধিপতি মাত্র, বিদ্যালয়ে ‘য়ুরোপের শিক্ষা তিনি পাননি’, এমনকি ‘পারসিক ভাষাতেও তিনি কাঁচা’। এসব বলার পর প্রশস্তির সুরে বললেন, ‘আমার মনে পড়ল আমাদের আকবর বাদশাহের কথা। কেবল যে বিদেশির কবল থেকে তিনি পারস্যকে বাঁচিয়েছেন তা নয়, মোল্লাদের আধিপত্য জালে দৃঢ়বদ্ধ পারস্যকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রতন্ত্রকে প্রবল ও অচল বাধা থেকে উদ্ধার করেছেন।’ কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক, রেজা শাহ্র ইরান তার পক্ষপাতিত্ব কোন দিকে তা বেশ বোঝা যায়।

আর উপমহাদেশ? হাফেজের সমাধি যেখানে সেখানকার গভর্নরকে কবি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জটিল ধর্মের পাকে আপাদমস্তক জড়িভূত’ যে ভারতবর্ষ তার মুক্তি আসবে কীভাবে? উত্তরে গভর্নর বললেন, ‘সাম্প্রদায়িক ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে যতদিন না ভারত একাত্ম হবে’ ততদিন এই সমাজের নিষ্কৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ তারপর আক্ষেপ করে বলছেন, ‘অন্ধ আচারের বোঝার তলে পঙ্গু আমাদের দেশ, বিধিনিষেধের নিরর্থকতায় শতধাবিভক্ত আমাদের সমাজ।’ হাফেজের সমাধিতে যখন গেছেন, দেখলেন সমাধিরক্ষক একখানি বড় চৌকো আকারের বই এনে উপস্থিত করল। সেটা ছিল হাফেজেরই একটি কাব্যগ্রন্থ। এ সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, কোনো একটি বিশেষ ইচ্ছা মনে নিয়ে চোখ বুঝে এই গ্রন্থ খুলে যে কবিতাটি বেরোবে তার থেকেই বোঝা যাবে সে ইচ্ছাটি সফল হবে কিনা। রবীন্দ্রনাথ সে বইয়ের পাতা খোলার আগে চোখ বুজে মনে মনে ইচ্ছা করলেন, ‘ধর্ম নামধারী অন্ধতার প্রাণান্তিক ফাঁস থেকে ভারতবর্ষ যেন মুক্তি পায়।’ এর বছর পনেরোর মধ্যেই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও দেশান্তরের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারতবর্ষ’। হিন্দু ও মুসলমান এ দুই সম্প্রদায় নিয়ে এক ‘মহাজাতি’ গঠনের স্বপ্ন ছিল তাঁর। ১৯৪৭-এর দেশভাগ সে ক্ষেত্রে তাঁর স্বপ্নের বিপরীতে হলেও হয়তো তারপরও পুরোপুরি হতোদ্যম হতেন না তিনি। ঘরের বিবাদ অহর্নিশি চলার চেয়ে ঘর ভাগ হওয়াই ভালো।

‘পারস্য যাত্রী’র একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে এশিয়ার নবজাগরণের বা রেনেসাঁর কথা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এশিয়া জাগছে এবং প্রতিটি দেশেই এই জাগরণপর্ব চলছে যার যার মতো করে। রবীন্দ্রনাথ কায়মানোবাক্যে চেয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার পাশাপাশি প্রাচ্যও উঠে দাঁড়াক : ‘এ কথা বলা বাহুল্য যে, এশিয়ার প্রত্যেক দেশ আপন শক্তি প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুসারে আপন ঐতিহাসিক সমস্যা স্বয়ং সমাধান করবে… তাই আমি এই কামনা ঘোষণা করি যে, আমাদের মধ্যে সাধনার মিলন ঘটুক। এবং সেই মিলনে প্রাচ্য মহাদেশ মহতী শক্তিতে জেগে উঠুক_ তার সাহিত্য, তার কলা, তার নূতন নিরাময় সমাজনীতি, তার অন্ধসংস্কারমুক্ত বিশুদ্ধ ধর্মবুদ্ধি, তার আত্মশক্তিতে অবসাদহীন শ্রদ্ধা’ নিয়ে। এশিয়ার এই নবজাগরণের তালিকার মধ্যে যেমন ছিল দূরপ্রাচ্যের জাপান ও চীন, তেমনি ছিল নিকট মধ্যপ্রাচ্য। পশ্চিম এশিয়ার নব-আন্দোলিত মুসলমান সমাজের এক বড় ধরনের উত্থানের প্রতীক্ষা করছিলেন কবি। তিনি জানতেন মিসর, তুরস্ক, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান প্রভৃতি দেশের প্রাগ্-ইসলামি ঐতিহ্য এবং ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগের বিবরণী। আব্বাসীয় আমলের সুশাসন, বিজ্ঞান-সাধনা ও শিল্পকলা তাঁকে বিমোহিত করেছিল। বা তারও আগের সম্রাট দরিয়ুসের রেখে যাওয়া ভগ্নাবশেষের সাথে মোয়েনজো দারেরি সমসাময়িক সভ্যতার মিল খুঁজে পেয়ে রোমাঞ্চ অনুভব করেছেন। দরিয়ুসের গ্রন্থাগার ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আলেকজান্দার_ সেই গ্রন্থাগারে বহু সহস্র চর্মপত্র রক্ষিত ছিল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাও ছিল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাও ছিল। রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আলেকজান্দার আজ জগতে এমন কিছুই রেখে যাননি যা এই পার্সিপোলিসের ক্ষতিপূরণস্বরূপে তুলনীয় হতে পারে।’

পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা এশিয়ার এই নবজাগরণকে যেমন বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে সাম্প্রদায়িক ধর্মবুদ্ধি বা ভেদবুদ্ধি। এশিয়াকে জাগতে হলে এর থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতেই হবে, কেননা ‘সাম্প্রদায়িক ধর্মবুদ্ধি মানুষের যত অনিষ্ট করেছে এমন বিষয়বুদ্ধি করেনি। বিষয়াসক্তির মোহে মানুষ যত অন্যায়ী, যত নিষ্ঠুর হয়, ধর্মমতের আসক্তি থেকে মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি ন্যায়ভ্রষ্ট, অন্ধ ও হিংস্র হয়ে ওঠে। ইতিহাসে তার ধারাবাহিক প্রমাণ আছে।’

এ ক্ষেত্রেই শুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার কথা মনে এলো তাঁর : ‘নবযুগের আহ্বানে পশ্চিম এশিয়া কী রকম সাড়া দিচ্ছে সেটা স্পষ্ট করে জানা ভালো। খুব বড় করে সেটা জানবার এখনও সময় হয়নি। … কিন্তু সত্য ছোটো হয়েই আসে। সেই সত্য এশিয়ার সেই দুর্বলতাকে আঘাত করতে শুরু করেছে যেখানে অন্ধসংস্কারে, জড় প্রথায়, তার চলাচলের পথ বন্ধ। এ পথ এখনও খোলসা হয়নি, কিন্তু দেখা যায় এই দিকে তার মনটা বিচলিত।’ কী সেই সত্য? ‘এশিয়ার নানা দেশেই এমন কথা উঠেছে যে, সাম্প্রদায়িক ধর্ম মানবের সকল ক্ষেত্রজুড়ে থাকলে চলবে না।’ অর্থাৎ ধর্মাচরণ থাকবে কেবল কিছু নির্দিষ্ট এলাকায়_ সর্বত্র নয়; এবং রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য মানলে, রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অবিমিশ্রভাবে সেক্যুলারিজমের সমর্থক।

৫. সভ্যতার সংলাপ
‘পারস্য-যাত্রী’ গ্রন্থটি খুঁটিয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সমাজে নবজাগরণের সংকেতের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের সাথে ‘সংলাপ’-এর তাগিদ অনুভব করা যায়। রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সম্প্রদায়গত ধর্মের প্রভাবকে অস্বীকার করেছেন। আবার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুক্তি খুঁজেছেন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারের বাইরে। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত ধর্মীয় মূল্যবোধকে (যা ছিল ‘মিশ্র’ চরিত্রের) সাহসের সাথে লালন ও ক্রমবিকশিত করেছেন। খ্রীস্টিয় ইউরোপ এনলাইটেনমেন্ট-এর পর্ব পেরিয়েও যেমন যুক্ত হতে পারেনি বিশ্ব মানবতাবাদে, ধর্মাশ্রিত প্রাচ্যও তেমনি উপনীত হতে পারেনি মানবকল্যাণমুখী, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের উদার জমিনে। এদিকটি রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি। ‘পারস্য-যাত্রী’ রচনার কালে যেমন, আজকের দিনেও ‘কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্ম ধর্মের বিশুদ্ধ প্রাণতত্ত্ব নিয়ে টিকে নেই’ _ কি পাশ্চাত্যে, কি প্রাচ্যে। আমরা ভুলে যাই, ‘যে সমস্ত ইটকাঠ নিয়ে সেই সব সম্প্রদায়কে কালে কালে ঠেকো দিয়ে দিয়ে খাড়া করে রাখা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য কালের আচার বিচার প্রথা বিশ্বাস জনশ্রুতি।’ আজকের দিনে হলে এ কথা লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার মামলা উঠত। কটূক্তির কারণে তাঁর শিলাইদহের-সাজাদপুরের-পতিসরের বাড়িতে আক্রমণ পর্যন্ত হতে পারত একদল ধর্মোন্মাদের দ্বারা। অন্যত্র পড়ি, ‘আরব পারস্যকে ধর্ম দিয়েছে’, বিনিময়ে পারস্য তার শিল্পগুণ দিয়ে ইসলামকে আরো ‘ঐশ্বর্যশালী’ করেছে। এক জায়গায় এ মন্তব্যও করেছেন, ‘মাদুরার মন্দির, ইস্পাহানের মসজিদ এসব প্রাচীনকালের অস্তিত্বের দলিল _ এখনকার কালকে, যদি সে দখল করে তবে তাকে জবরদখল বলব।’ এ কথা বলার জন্য এ যুগে তাঁর বিচার দাবি করতেন নিশ্চয় কেউ কেউ। কেননা ঊনিশ-বিশ শতকের গোড়ার দিককার অসহিষ্ণুতার চেয়ে একবিংশ শতকের সূচনা-পর্বে এসে ধর্ম_ প্রসঙ্গে অসহিষ্ণুতার মাত্রা দক্ষিণ এশিয়ায় আরো বেড়ে গিয়েছে। সমাজতাত্তি্বক আশিস নন্দী একথা আক্ষেপ করে বলেছিলেন। হাফেজের সমাধিতে গিয়ে যে-রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁকে এ রকম তিরস্কারের গ্গ্নানি এর আগেও অবশ্য অনেকবার সইতে হয়েছে। হাফেজকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন, মনে মনে, ‘আমরা দু’জনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রূকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারেনি… নিশ্চিত মনে হলো, আজ কত শত বৎসর পরে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।’ পারস্য থেকে ফিরে গিয়ে ১৯৩৩ সালে স্পষ্ট করে বলেছেন মনের কথাটা : ‘আমার স্বভাবে এবং ব্যবহারে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব নেই’, দুই পক্ষেরই অত্যাচারে ‘আমি সমান লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ হই’। অথচ পরস্পরকে বাদ দিয়ে এদের এক পা চলারও উপায় নেই। পারস্য-যাত্রীতে কথাটা উপমা দিয়ে বলেছেন : ‘এই দুই বিপরীতধর্মী সম্প্রদায়কে নিয়ে আমাদের দেশ। এ যেন দুই যমজ ভাই পিঠে পিঠে জোড়া; একজনের পা ফেলা আর-একজনের পা ফেলাকে প্রতিবাদ করতেই আছে। দুইজনকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করাও যায় না, সম্পূর্ণ এক করাও অসাধ্য।’ এক্ষেত্রে মিল আসবে তখনই যখন ‘বিভিন্নতাকে’ শক্তি বলে জানব। বিভিন্নের মধ্যেকার সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিধি নিষেধের বেড়াগুলো ভেঙে যাবে। যতদিন তা না হয়; ততদিন বিভিন্নের মধ্যে ‘সংলাপ’ চলুক – সংঘাতকেই বড় করে দেখা না যেন হয়। এ-ই ছিল রবীন্দ্রনাথের দাবি আমাদের কাছে।

১৯৭৯ সালের ‘ইসলামি বিপ্লবে’র পর খোমেনী-উত্তর ইরানে অনেক নাটকীয়ও বিতর্কিত পরিবর্তন এসেছে গত তিন দশকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতি পারস্যের অনুরাগ যেন এখনো অটুট। ২০১১ সালের ২৯ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবার্ষিকীতে ইরানের পার্লামেন্টে (মজলিস) উন্মোচন করা হয়েছে তাঁর স্মরণে একটি প্রস্তরফলক। তাতে উৎকীর্ণ তাঁর ‘পারস্যে জন্মদিনে’ কবিতাটি এবং তাঁর একটি চমকপ্রদ প্রতিকৃতি। প্রায় একই সময়ে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর একটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে। রক্ষণশীলতার কোনো কুযুক্তি এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। রেজা শাহ্র ইরানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এ তথ্য জানার পরও ‘বিপ্লবী’ ইরানের কাছে রবীন্দ্রনাথের সমাদর একটুকু কমেনি। এক্ষেত্রে ইরানের ইসলাম তার অন্তরের শক্তিরই প্রমাণ দিয়েছে! এক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নী পারস্য-আরব এ ধরণের বিভাজন রেখা টেনে ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা হবে পণ্ডশ্রম। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য নানা সভ্যতার মধ্যে ‘সংঘাত’ যেমন, ‘সংলাপ’ও চলছে একই সাথে।

পারস্যে রবীন্দ্রনাথকে সম্মাননা দেওয়ার সময় বসরার গভর্নর শেখ সাদির একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন। কবিতাটির অংশবিশেষ রবীন্দ্রনাথের হাতে অনূদিত হয়ে ‘পারস্য-যাত্রীর’ পরিশিষ্টে সংকলিত হয়েছে। চতুষ্পদীটি এ রকম :

‘হায় মানুষ! এই জগৎটা শুধু দৈহিক অহং-এর পুষ্টির জন্য নয়;
যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী মানুষের সন্ধান পাওয়া বড়োই কঠিন;
ভোরের পাখির সুরলহরী নিদ্রিত মানুষ জানে না
মানুষের জগৎটা যে কী, তা পশু কেমন করে জানবে!’

Original post on Samakal here.

How political culture matches “Poor Economics”

Binayak Sen

It is often said that “every nation gets the government it deserves”, a quote popularly misattributed to diverse commentators such as Alexis de Tocqueville and Abraham Lincoln but that is in fact derived from Joseph de Maistre’s publication in the Lettres et Opuscules. There is a grain of truth in this. Governance conditions improve more in the context of active citizenry empowered with actionable rights, than in the context of passive citizenship. Political leadership of a given nation-state is a reflection of its constituency i.e. “endogenous” to the characteristics of its citizens. A more nuanced epigram stems from Leninist dialectics where Ulyanov said that “politics is the concentrated expression of economics”. One should not interpret this as yet another iteration of economic determinism where economics dictates what happens to politics. Articulated in the height of the New Economic Policy amidst civil war, when the survival of the new born Socialist state was at stake, the Leninist epigram defined protecting economic peace at any costs as the cornerstone of political governance. There is only a very limited zone of subjectivity within which politics can be truly free and independent of the compulsions dictated by economic interests. The present intervention further narrows down on one aspect of such economic moments by focusing on poverty dynamics and the consequences that such dynamics hold for the nature of political culture.

This article makes two main points. First, the central narrative of the last two decades of economic development can be summarized by a silent but dramatic ascent of the poor. Second, this ascent of the poor, although deservedly celebrated in its own right, has implications for the nature of Bangladeshi politics as seen in the persistence of the overall low-level of democracy.

It may be noted that the poor’s rapid ascent has also made its footprints in the sphere of cultural productions, notably in the rising significance of religion in the context of a weak but moderate Muslim democracy. But, this question will be dealt with in a separate essay.

1. Structure and Agency

Bangladesh has been subjected to oscillating pessimism and optimism in the last 42 years. At one time Bangladesh was dubbed the test case for development. In another time it was seen as the role model of least developed countries (LDCs) in making progress on economic and social fronts. Such oscillations between positive and negative appraisals is not exceptional – it is arguably a common characteristic of many low income countries passing through the phases of stagnation, renewal and retrogression. Sometimes economic institutions grow but political institutions lag behind, displaying the complex interrelations between economic, social and political indicators. Underdevelopment is conceptually expressed not just at the level of low income but also in the unpredicted mismatches between economic and political dimensions of development. Since early last year, the country has been viewed mainly through a pessimistic lens.

This essay glosses over the acuteness of the currently burning issue of post-election political settlements. There has been endless commentary on the subject, especially on the critical importance of an inclusive, free and fair election that would ensure the participation of the historically two major nationalist political parties. The relevance of party-inclusiveness can be seen from the fact that each of these major parties had roughly about 33 to 40 percent share of the votes cast, even when they failed to win majority seats in the parliament (as per 2001 and 2008 elections). The interest in the present intervention however lies in examining the forces of inertia—why things remain as they are—that tend to reproduce the disconnects between economic progress and political regress.

Early entrants into the global capitalist system had the initial advantage in maintaining the complex dynamics between economic and political developments. Historically, in developed countries of the West, economic development could be given exclusive primacy for a long time while paying little attention to political development. Early capitalist transformations of these economies did not require the commensurate – by now established as a universal standard – practice of liberal politics. This was not only true in the case of policies adopted in the New World (colonies) but also in the case of political practices adopted in the Old World (metropolis)—the terms old and new being used originally from the European perspective. Comparative economic history shows that there has been a significant time lag between economic and political moments in the development of Western modernity. Market capitalist institutions developed much earlier than the political institutions of democracy based on universal suffrage. In contrast, developing countries saw the nationalist acceptance of the “idea of democracy” based on universal suffrage much earlier than the corresponding capitalist institutions found their roots in such societies. Although the idea of free and fair electoral democracy based on multi-party system remained popular in these societies it lacked other “institutional ingredients” that make democracy work. Part of the problems stems from ignoring participation and public reason as a precondition to democratic order. The ruling coalition typically lacked imagination and authenticity, and as a result, it lapsed mainly into a “mimicry of democracy” compared to the Western standard achieved today (the problem of mimicry has a pervasive existence in early stages of development, including in articulating nationalism and the idea of Nation).

Bangladesh’s experience of the last two decades, however, suggests that decent long-term economic development can take place even under political regimes engaged in such a mimicry of democracy. That raises a legitimate question: what explains the continued democratic mimicry in the face of such economic development? In other contexts, arguably, such a mismatch between economic and political moments (unstable political equilibrium) would not have lasted long: it would lead either to authoritarian rule or to a more acceptable order of inclusive democracy. What is it in our past development that makes democratic mimicry persistent? It is easy to invoke the continued personal rivalry between the two main leaders of the country—recent telephonic conversation expressed it more clearly–as explanation for the persistence of democratic mimicry. This answer is too easy to be taken seriously. There must be some “structural factors” that underline such democratic mimicry. The interest, therefore, is in understanding the persistence of democratic mimicry in such dynamic economic contexts as Bangladesh where economic conditions for full-blown democracy are not ripe as yet. The problem is analogous to explaining the trend towards mean reversion in finance literature. It is useful to know why things do not improve although (unlike some countries of Sub-Saharan Africa) they do not fall apart either here.

The article takes a long term view on current disillusionment, arguing that the very factors that gave rise to our economic success also contained elements that contributed to democratic underdevelopment or even backtracking, marked by dysfunctionality of political institutions with negative spill-overs on the society at large through sporadic uncontrolled outbreak of extremist violence. In taking this long term view, it specifically focuses on the “structure-agency” framework whereby the main actors of economic development also shape the nature of political subjectivity.

For the purposes of this essay, the term “upper class” denotes the governing class and consists of the political elite, the higher echelon of the business class, the top government functionaries and NGO leaders, and the upper crust of military bureaucracy. The term “middle class” refers to routine business and factory owners, self-employed family entrepreneurs, English-educated salaried workers, managers, teachers, doctors, engineers and other professionals, medium level NGO functionaries, as well as civil society think-tanks and opinion makers. This is in contrast to the “lower class” which consists of peasants, industrial workers, day laborers, transport workers, petty commodity producers, and in general diverse mix of subaltern and marginal social groups.

2. “Poor” Economics

Abhijit Banerjee and Esther Duflo in their influential book “Poor Economics: A Radical Rethinking of the Way to Fight Global Poverty” explored the micro institutional arrangements that benefit the poor most and drew our attention to the choice that policy makers have in designing pro-poor programs and plans. Their phrase “poor economics” is borrowed here to exemplify a path of economic development which rests primarily on the productive use of relatively unskilled labor, resulting in their rapid economic mobility and quality of life improvements. This is “poor” economics because it works well for the poor both as beneficiaries and actors as opposed to a path of development–which can be termed “non-poor” economics–where the main actors and beneficiaries are the middle class and the rich. The uniqueness of Bangladesh’s development that drew global attention is the way poor economics worked particularly well for the poor, resulting in a rapid movement out of poverty within a short span of time with commensurate improvements in social indicators and/ or human development.

The basic narrative of Bangladeshi economic successes is well known, but like most stories of success it can be told differently. “Seeing like the poor” would mean tracing how these economic successes impacted the economic lives of the poor. The four main economic drivers of growth and development in the past two decades have been improvements in agriculture, rural non-farm sector, export led industrialization and remittances. Bangladesh’s efforts in giving impetus to its poor through these four economic drivers was supported by simultaneous social investments in basic health and human development, such as providing decent coverage of preventive health care and primary through secondary education, especially for the female population and the poor. Without the latter, the poor’s participation in those sectorial drivers would not have been successful – for example, exposure to basic literacy and primary education is required for an average female laborer to participate in the ready-made garments (RMG) sector.

While agriculture and rural non-farm sector were the mainstays of development in the 80s and 90s, beginning with the 2000s, export led industrialization and foreign remittances began to play a more prominent role. Rise in agricultural productivity freed up surplus farm labor for non-farm jobs and resulted in rapid internal migration to cities, a development that was supported by export growth and a mode of urbanization where construction sector growth was backed up by remittance. This process of transformation is mentioned elsewhere by the author in a collaborative paper with Mahabub Hossain and Yasuyuki Sawada for the WDR 2013 for Jobs. The truly striking facet in this story of transformation is the crucial role of relatively unskilled labor, noticeably including female labor from the 2000s onwards, in the agriculture, rural non- farm, export led industries, and construction sectors.

This has resulted in the economic ascent of relatively unskilled labor — the poor and the poorest — along the poverty and human development ladder. The mystery of the success in meeting the MDGs at a relatively low level of income, for which Bangladesh is so applauded at home and abroad, lies herein. Bangladesh’s development irrespective of political regimes and ideological orientations cannot be understood merely by looking at macro growth figures – it requires close examination of micro statistics of the ascendancy of the poor across the four main drivers previously mentioned.

While this story is well known to close economic observers of Bangladesh, less discussed is the impact of “poor” economics on other aspects of economic, social and political lives. The virtual lack of rapid and mass public transport in urban areas is one of the most striking economic expressions of inadequacies of democratic culture in Bangladesh. The poor simply lacked the citizen voice to demand decent public transport both in terms of intra-city travel and inter-city connectivity. The absence of citizen voice has been a general problem afflicting the entire range of public services. Had the middle class been the driving force of economic development, the likelihood is that it would have been more successful in extracting better quality public services from the state. In most countries of the world there is a broad correlation between the level of middle class activism and the development of urban transportation. A cursory comparison of the capitals of the two Bengals, Kolkata and Dhaka, illustrates this point well with the former enjoying far greater choices of public transport services. In all advanced democracies where the middle class remains an influential voting constituency, the creation and/or maintenance of a decent and inclusive public transport is regarded as a political good.

The corollary question is why the voices of the non-poor have also not been strong enough to extract better quality public services in Bangladesh? Given the faster poverty reduction in the last two decades, with the poverty headcount declining from approximately 62% in 1991/92 to 32% in 2010, one might have expected a significant qualitative change in the supply of public services. This has not happened because of two factors, one economic and the other sociological. Rapid moving out of poverty was not matched by an equally rapid increase in the population share of the middle class since there is an analytical gap between crossing the poverty line and becoming part of the middle class. Recall that the non-poor is a mixed category comprising of vulnerable non-poor (those in the vicinity of $1.25-2 line), lower middle class ($2-3 line), upper middle class ($3-4 line) and upper class (above $4 line). This article deliberately deviates from the internationally suggested definition of measuring middle class as being in the range $2-10 line because of the low average income of Bangladeshis. In the last two decades, of those who escaped poverty very few entered into the stratum of upper middle class, but instead most of them found themselves in the vulnerable non-poor and lower middle class categories. Swelling in the ranks of specifically these two categories is one reason why poverty reduction was not translated into improved quality of public services measured in terms of broad-based access, beneficiary satisfaction, significant impact, and low corruption. However, the issue is not only the relatively small size of the upper middle class. The middle class is not just an economic category but also a sociological category. The core of the middle class was classically defined by the English-educated workers and those employed in salaried jobs. The proportion of workers with English education (loosely defined as educated above class 10) and salaried jobs has increased much less dramatically than the rate of poverty reduction, thus effectively explaining the smaller traction of the sociological middle class with regard to improvement of public services and the democratic politics of public goods provisioning.

From the view-point of public economics, the issue of distributive justice is an important consideration in explaining the quality of growth and development. Successful democracies cannot afford to ignore the issue of distribution even from the electoral angle of winning over the “median voter”. Bangladesh has been experiencing sharp rises in inequality of income and assets over the last two decades. But, equally striking has been the simultaneous increase in the “tolerance for inequality”. Here too poor economics played a role of crucial difference. In a sense, the success of poor economics came as part of a Faustian bargain. While poverty was reduced, inequality in the distribution of income, assets and power rose sharply. It can be argued that the latter was an outcome of an attitude of political permissiveness towards corruption. Inequality of unearned incomes is likely to be higher than the inequality of earned incomes. It is likely that inequality of unearned income sustained by corruption and violation of legal norms–rather than human capital and skill based differences in income and asset acquisition—has fueled this sharp rise of inequality in income and assets. Widespread media coverage of the wealth statements of the ruling coalition candidates that were submitted to the Election Commission in the recent January 2014 election indicates that possibility. This has possibly been a reflection of the wider pattern of the accumulation process that underpins the formation of upper class and upper middle class. Such a process of wealth accumulation and the causal role of illegal incomes are likely to be captured inadequately in the HIES data, thus misleading the true extent of worsening ground realities in this respect.

The ultimate consequence of sharp rise in inequality was the diversion of focus of the politically influential upper and upper middle classes from improving the public services by holding the state actors accountable. Inequality enabled these privileged classes to rely more on private exclusive services (such as private transport, private security services, private clinics, and private schools) to form an enclave of their own with little traction with the system of distribution of public services.

Nevertheless, such elitism in the Bangladesh context was different from similar situations in Africa in that it also permitted a considerable degree of economic mobility for the poor. This helped to mitigate the bite of inequality on social peace and stability to some extent. Essentially, the poor did not object to the unprecedented concentration of economic power so long as they could also improve their fortunes. Politically, such an appeasing “class compromise” translated into subservient acceptance of the low quality of political culture. Such a class compromise on the part of the poor was, in turn, additionally rewarded by the governing coalition through implementing anti-poverty programs. The latter include social protection transfers and basic human development programs that benefited the poor families. Admittedly, such programs were not successful in equal measures between the poor and the poorest, rural and urban areas, and between ethnic majority and minority identities.

To summarize, in this implicit social contract, the poor benefit but the middle class and upper class benefit much more on the backs of the poor. Tolerance of such inequality will depend on the durability of success of this covenant. As long as this basic compact holds on, the poor economics shows a path of development that is much better than economic stagnation with worsening poverty along with exclusive reliance on a wasteful rent-seeking path of development. The sustenance of Bangladeshi democracy, up till now, rested on the political marketing of this covenant. The next section will argue that the success of this compact also contains elements that undermined itself, as reflected in political culture.

3. “Poor” Politics

Poor economics had significant footprints on the entire ensemble of relations that contribute to the low quality of political culture: the choice of political candidates, the relationship between the major political parties, the degree of inner-party democracy, the pattern of personal loyalty to the leaders and leader-worship, the rhetoric of political leaders, and, in general, the level of political discourse. Democratic mimicry is apparent in all of these.

The process that contributed to the low quality of public services in Bangladesh, as described in the previous section, is equally applicable to the production of low quality political governance. As long as the political class regarded the poor to be the median voter, the leaders did not feel enough electoral pressure to change the existing political and administrative practices both within the party and within various branches of the state. This is paradoxical since rapid poverty reduction in the last two decades also meant that a typical median voter now would actually be a potentially demanding non-poor (the new class of “movers” out of poverty). Nevertheless, the basic power equation underlying the political economy of public policy has not varied. This is because the new median non-poor voter still does not represent the electoral power of the middle class and is likely to be a representative of the vulnerable non-poor variety, lacking economic and political allies. Furthermore, his demands and psychology do not vary significantly from those of the poor voter. As a result, even though the country’s political scene has witnessed the practice of democratic mimicry for the last two decades, the procedural practice by itself did not lead incrementally to desired democratic transformation. The latter seems to be a tall order to attain for poor economics.

Not only has the social dynamics, seen through the angle of changing profile of the median voter, failed to create sufficient political pressure for political reform, it may have become an excuse for the political leaders to evade and postpone institutional changes that are being demanded of them. For example, the need for modernization in politics—campaign finance reform and inner-party democracy for instance–has been indefinitely postponed by invoking the argument that such reforms while desirable are not practical given the stage of economic development. This political underdevelopment was not addressed by the prevalent strategies, articulated in the global discourse, which focused instead on basic needs in the 1970s, structural adjustment in the 1980s, and MDGs in the 1990s. These strategies, while vastly different, nevertheless operated within a narrow definition of development and did not give equal priority to easily monitorable political indicators along with economic and social indicators. This further reduced the compulsions to improve political culture. Instead, the focus of politics and politicians turned towards appealing to the lowest common denominator of the population, thus preventing a higher level of political discourse corresponding to the standards of the sociological middle class.

The failures of the poor and vulnerable non-poor in this regard are perhaps understandable, but why was the middle class not able to change political culture? The small size of the middle class segment cannot be invoked as an adequate explanation here. In the 1960s, the Bengali middle classes could provide political leadership during the national liberation movement, even though it was proportionately smaller then than it is now. Why then is the comparatively larger middle class now incapable of effecting political reforms? After all, the share of the economic middle class has increased from about 8% to 19% between 1991/92 and 2010 (according to author’s estimates using the Chen-Ravallion line for middle class). Back in the 1960s, the newly formed middle class or the vernacular elite were the children of peasants and the consequent national liberation movement drew on the resources of a deeply peasant Bengali nationalism, which had broad based national appeal. This is no longer the case. The urban middle class is now distant from the peasant mode of economic and cultural lives. They may walk on the streets of Dhaka but actually feel more at home in living in the global village of the advanced countries. A vast Bangladeshi diaspora continues to feed the dreams and aspirations of this class. In short, formation of economic middle class per se does not mean the growth of political middle class willing to fight for the modernist ideals of political democracy. In addition, the middle class has also been a beneficiary of the system of poor economics, especially through urban property development, exports and remittances, and enjoyed their share of the spoils of corruption and rent-seeking. Ultimately, this has subdued and defused their reformist potential to take on both parties of the political equation–the government and the opposition alliance–even on basic libertarian issues such as political repression by the state and opposition violence against ordinary citizens, including ethnic and religious minorities. A recent telling example is the inability of the business class to enforce discipline on the political process even at the cost of their own financial interests. Arguably, the democratic activism by the middle class would have been more likely in the context of economic decay. This has been a central thesis of Benjamin Friedman in his book “The Moral Consequences of Economic Growth”. On the other side, the political class could easily disregard the demands of the middle class because political leaders are aware of and rely significantly on the support of the lower class when it comes to electoral democracy.

Perry Anderson once noted that the economic causes underlying the dynamics of Tahrir Square movement were linked with vast educated unemployment along with rural distress. The Bangladesh scenario has been different (so far) from that context because of the success of poor economics, as discussed in the preceding section. This description should not mean that the members of the lower class have no agency of their own against the profit, power and privileges of the upper class. In fact, in the past two decades the members of lower class have repeatedly demonstrated their agency by replacing one party by another in successive elections but stopped short of demanding a higher quality of political representation. Their surprisingly enthusiastic turnout in past elections under the guise of festive participation can then be interpreted also as a subversive activity of the lower class corrosive to one-party rule. In the West, such subversion has been tamed by the ruling classes, resulting in low voter turnout and political apathy. In our case, participation in elections has been an art of popular resistance. This is the key reason why the people feel so disenfranchised by the prevalence of uncontested seats in the recently held one-sided election.

The sustainability of maintaining this democratic mimicry based on poor economics would be eventually challenged in the process of development. The essay takes a long-term of view on political reforms based on class formation, class dynamics and class action. The dialectics of poverty reduction contains the seeds for such change – as education and literacy increases, the first generation movers out of poverty who have relied on the four economic drivers of poor economics will graduate into the category of English-educated salaried middle class in a more industrialized and urbanized settings. Alternatively, the current middle class could become more active in demanding political change. This evolutionary path of transition from poor economics to middle class economics is not devoid of tensions, slippages, conflicts and revolutions. Studying other countries experiencing rapid poverty reduction under democratic mimicry may hold some useful lessons in this regard but will have to remain a topic for another article.

Binayak Sen is Research Director at the Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS).

উটপাখি: ধ্বংসের সমান অংশীদার (Ostriches: Culprits of Destruction)

বিনায়ক সেন

১. আমার বন্ধুদের লড়াই
বাংলাদেশে এখন, এই মুহূর্তে, ‘সেক্যুলারপন্থি’দের সঙ্গে ‘গণতন্ত্রপন্থি’দের লড়াই প্রবল আকার ধারণ করেছে। অস্বীকার করব না যে, এই লড়াই নিয়ে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এখন এক ধরনের নৈতিক মুছিবতের মধ্যে আছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের একটি দল যে কোনো মূল্যে যুদ্ধাপরাধের বিচার করে ছাড়বেই। তাঁদের যুক্তি, যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাজ সমাধা না করা গেলে দেশে সেক্যুলারিজম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে না। এর জন্য সাময়িকভাবে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেও তারা রাজি। আমার প্রিয় বন্ধুদের অন্য একটি দল যে কোনো মূল্যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের রীতি-নীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের যুক্তি, অবাধ ও সব দলের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ একটি নির্বাচন করা না গেলে দেশ প্রবল সংকটের মধ্যে পড়বে। কেননা এতে করে সরকার লেজিটিমেসির অভাবে ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনে তারা সেক্যুলারিজমকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। এমনকি এর জন্য এমন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও তারা মেনে নিতে রাজি, যেটি হয়তো হবে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন নিয়ে, হয়তো যুদ্ধাপরাধের বিচার সুদীর্ঘ কালের জন্য স্থগিত বা শ্লথ করার বিনিময়েই। সত্যের খাতিরে অবশ্য বলা দরকার, আমার বন্ধুদের দু’দলই যুদ্ধাপরাধের বিচার ও গণতন্ত্র উভয়েরই বাস্তবায়ন চান, কিন্তু এ দুই লক্ষ্যের মধ্যে যদি সংঘর্ষ বাধে তাহলে তাদের একেকজনের পক্ষপাতিত্ব থাকবে একেক দিকে। ইয়েভতুশেঙ্কো তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব শুধু ভালো আর মন্দের মধ্যে হয় না। অনেক রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব ঘটে থাকে [কম] ভালো আর [বেশি] ভালোর মধ্যে। ভালো আর মন্দের লড়াই এ দেশকে অতীতে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। ভালো আর ভালোর লড়াই এবার এ দেশকে খাদের ভেতরে ফেলে দিতে চলেছে।

২. ভুলগুলো কোথায় হয়েছিল
ভুলের সূত্রপাত হয়েছিল সত্তর দশকেই। পঁচাত্তরে মুজিব প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে নিহত হলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের আদি প্রতিশ্রুতি_ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র_ রাষ্ট্র যদি দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করতে পারত তাহলে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ধারায় এরই মধ্যে একটি সবল গণতান্ত্রিক [পুঁজিবাদী] সমাজ ও অর্থনীতি এ দেশে গড়ে উঠত। উন্নয়নের নিচু পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো থাকে অবিকশিত। তখন সক্ষম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সময়ের আগে এগিয়ে থাকার কারণে_ যাকে আমরা ‘দূরদর্শিতা’ বলি_ ‘প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি’ অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারে। উপনিবেশ থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার আদি পর্যায়ে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় [ভারতে] জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এবং সেসব দেশের রূপান্তরধর্মী আর্থ-সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব দেশের কোনো কোনোটিতে ছিল একদলীয় শাসন, কোনোটিতে ছিল গণতন্ত্র, আবার কোনো কোনোটিতে সক্রিয় ছিল সামরিক নেতৃত্ব। প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব যাই হোক, একটি বিষয় ছিল অভিন্ন। দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এসব দেশে অব্যাহত ছিল জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের শাসন, যারা গোড়াতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল বা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকা এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের আদি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব বর্ণবৈষম্যবাদের রাজনৈতিক অবসানের পর থেকেই আজ পর্যন্ত সক্রিয় ও ক্ষমতাসীন রয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক বর্ণবৈষম্যবাদের অবসানের লক্ষ্যের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা বিপথগামী না হয়ে অব্যাহতভাবে এগোতে পেরেছে। কেন উন্নয়নের গোড়ার পর্যায়ে আদি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য উপনিবেশ-উত্তর পূর্ব এশিয়া বা ভারতের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন নেই। উন্নত দেশগুলোর যখন পুঁজিবাদ সংহত ও বিকাশমান করা প্রয়োজন দেখা দিচ্ছিল, সেখানেও একই অভিজ্ঞতাকে আদি পর্যায়ে দেখতে পাই। বোনাপার্টের ফ্রান্স, বিসমার্কের জার্মানি বা মেইজির জাপান এর উজ্জ্বল উদাহরণ। সমাজতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রে বলতে পারি যে, লেনিন যদি বিপ্লবের সাত বছরের মাথায় মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা না যেতেন, রাশিয়া আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের সঙ্গে অগ্রসর হতে পারত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধ নামক বিপ্লবে’র চার বছরের মাথায় আমরা হারালাম মুজিবকে শুধু নয়, নির্মমতম জেলহত্যার মধ্য দিয়ে তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতৃত্বকেও। মৃত্যুকালে মুজিবের বয়স হয়েছিল ৫৫, আর তাজউদ্দীনের ৫০। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গোড়ার পর্বে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের এই শূন্যতা অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদকে দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল করতে দেয়নি। অর্থনৈতিক নীতিমালার ক্ষেত্রে এদেশকে সুস্থ ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক’ ধারায় বিকশিত হতে দেয়নি। এ দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রগতিশীল সম্ভাবনাগুলোকেও করেছে পরবর্তী দশকে অনেকটাই পথহারা। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পরপরই এক বছরের মাথায় জিন্নাহর মৃত্যু সে দেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল, যার অনুরণন এখনও চলছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান পঁচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের আদি-চেতনার বাস্তবায়নকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। মুজিব-তাজউদ্দীন যেখানে নেই সেরকম ভূমিকা পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। পরবর্তী শাসনামল প্রমাণ করে তাঁর সে দক্ষতাও ছিল। এর ফলে সুস্থ ধারায় অর্থনৈতিক বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক পূর্বশর্ত হিসেবে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের কাম্য ভূমিকা তাঁর কাছ থেকেও আসতে পারত। কিন্তু বাড়তি দুর্ভাগ্য এ দেশের। জিয়া সে ধারায় এগোতে পারলেন না। সে পথে এগোতে চেয়েছিলেন কি-না পুরোপুরি, সে তর্কের এখনও মীমাংসা হয়নি। আমাকে আদিতে সিপিবি-ঘরানার একজন [প্রাক্তন] বামপন্থি নেতা বলেছেন, ক্ষমতায় আসার পরপরই জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতীয়তাবাদী ও বাম নেতৃবৃন্দের কাছে গিয়ে সমর্থন ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সোভিয়েত পার্টি সত্তরের দশকে জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা জাতীয়তাবাদী শক্তির অংশ হিসেবেই দেখেছিল। জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থি শক্তিদের একটি বৃহত্তর সমঝোতার সম্ভাবনা তখন সৃষ্টি হয়েছিল। এই পটভূমিতেই জিয়ার খালকাটা বিপ্লবকে ও হ্যাঁ-না ভোটে জিয়াকে তৎকালীন সিপিবির নেতৃত্ব সমর্থন দিয়ে থাকবেন। কিন্তু সমঝোতার এই সম্ভাবনা স্থায়ী হয়নি। তা ছাড়া জিয়া নিজেই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলে সামরিক বাহিনীর মধ্যে সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির অস্তিত্ব অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাহেরের মৃত্যু ছিল এরই ধারাবাহিকতায়।আমি বলতে চাইছি, মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী শক্তি ও বাম ধারার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সমঝোতা ও ঐক্যের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়া এ দেশের রাজনৈতিক বিকাশের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী অশুভ প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে এ দেশের রাজনীতির প্রধানতম দ্বন্দ্ব_ ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থানের ঝুঁকি_ মোকাবেলা করা একা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী শক্তির পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর জন্য কতটা জিয়া নিজে দায়ী, আর কতটা বাম প্রগতিশীলরা দায়ী, তা রাজনৈতিক ইতিহাসবিদরা একদিন নির্ধারণ করবেন। জিয়া ও মূলধারার মুক্তিযুদ্ধের শক্তির মধ্যে সেদিন ওই সমঝোতা হলে দেশে আরও আগে সুস্থ পুঁজিবাদী ধারা গড়ে উঠতে পারত এবং পুঁজিবাদী ধারার বিকাশও হতো আরও বেগবান। রাষ্ট্রও হতো আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ্বাসী। সমাজ-সংস্কৃতি হতো আরও বেশি উদার ও অন্তর্ভুক্তি-প্রবণ। সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতো আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও সহনশীল। পাশ্চাত্যের মাপকাঠিতেই আরও বেশি দক্ষ ও গণতান্ত্রিক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান দলই তখনও থাকত, কিন্তু দুটো দলই [বা তার সৃষ্ট জোটই] হতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। দুটো দলই তখন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধারণ করত সমানভাবে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে পূর্বাপর সমানভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকত। দুটো দলকেই সমানভাবে পাওয়া যেত মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সোচ্চার। দুটো দলের মধ্যেই এখনও যারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছেন তারা এই না হতে পারার মর্মবেদনা বুঝবেন।জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতীয়তাবাদী ও বাম প্রগতিশীল শক্তির সমঝোতার সম্ভাবনা বাস্তবায়ন না হতে পারার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকবে। যেমন_ জিয়া-সরকারের চরিত্র গোড়া থেকেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে থাকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধীকারী শাহ আজিজুর রহমানের জিয়া-সরকারের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ ছিল একটি সামান্য উদাহরণ। শুধু সরকারের চরিত্রে নয়, দলের চরিত্রের ওপরও এটি দীর্ঘমেয়াদি অশুভ প্রভাব ফেলে। নবগঠিত দল বিএনপিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এক অস্বস্তিকর সহাবস্থানে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়। দলটিতে দেখা দেয় প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শের প্রবণতা। এর সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে ২০০১-২০০৬ পর্বে। বিএনপির নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযুদ্ধের শক্তি প্রথমবারের মতো তখন বুঝতে পারছিলেন জোটের ভেতর ও বাইরে ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রবল অস্তিত্ব। এ নিয়ে তাদের মধ্যে নীরব অভিযোগ ও মনোকষ্ট দেখেছি। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে এ অবস্থানটি তখন তাদের নীরবে সয়ে নিতে হয়েছিল। এ অবস্থা এখনও চলছে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ডানপন্থি শক্তির সঙ্গে জোটের ভেতরে ও বাইরে সমঝোতা করে চলা ছাড়া যেন এ মুহূর্তে তাদের গত্যন্তর নেই! এ নিয়ে প্রবলভাবে চিন্তিত বিএনপির ভেতরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও নেতৃত্ব। দলটি যখন প্রবল সরকারি চাপের মুখে তখন ডানপন্থি শক্তিকে মোকাবেলা করার বিষয়টিকে তারা ‘ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখছে’ যেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বিএনপি আজ ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিকে ছাড় শুধু নয়, তার ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এমনকি সাধারণ সাংগঠনিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখার জন্য। এমন অমাবস্যায় দলটি এর আগে কখনও পড়েনি। অথচ এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। গত দুই বছরে বিএনপির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বেড়েছে মূলত সরকারের অজনপ্রিয়তার কারণে। অবাধ ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে বিএনপি এককভাবেই ক্ষমতায় আসীন হতে পারত বা তার কাছাকাছি অবস্থানে যেতে পারত। ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধার তার কোনো দরকার ছিল না। সত্তর দশকেও দলটি গড়ার সময় এ রকম ছাড় দেওয়ার দরকার ছিল না, এখনও সে প্রয়োজনীয়তা এ দলটির নেই। দুঃখের বিষয়, আমার প্রিয় বন্ধুদের যে অংশটি গণতন্ত্রপন্থি তারা এ নিয়ে ততটা সোচ্চার নন। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার পেছনে সরকারের একগুঁয়েমি যেমন দায়ী, ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে প্রধান বিরোধী দলও যে সমান দায়ী, সে কথা তাঁরা জোরের সঙ্গে বলতে চান না। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী গ্রামগঞ্জে-মফস্বল শহরে এমনকি রাজধানীর বুকে যেভাবে সহিংসতা করেছে তাতে যে কোনো নাগরিক বিপন্ন বোধ না করে পারবেন না। দেশের কিছু কিছু এলাকা সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী_ এ রকম কিছু জেলা, এই অশুভ শক্তির ‘মুক্তাঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে। দেশের ভেতরে কিছু কিছু স্থানের খবর পড়ে মনে হয় এগুলো বাংলাদেশে নয়, বরং আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কঙ্গো বা সুদানের খবর পড়ছি। বাংলাদেশ যে আজ ‘সহিংস দেশে’র পরিচিতি পাচ্ছে এর পেছনে কি এই অশুভ শক্তির উত্থান প্রধানত দায়ী নয়? সরকারের একতরফা নির্বাচন করার কৌশলকে বর্তমান সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিরোধী দলের সহিংস আন্দোলনকে কি সমানভাবে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত ছিল না? এপক্ষকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বললে ওপক্ষও কি ‘ফ্যাসিবাদী’ বলার যথেষ্ট কারণ ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করে থাকেনি? সেদিক থেকে দেখলে ২০১৩ সালের শেষে ২৮ ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সিপিডি-টিআইবি প্রমুখ আয়োজিত ‘নাগরিক সভা’ আমাদেরকে একরূপ হতাশই করেছে।

৩. একটি শেষ মুহূর্তের অসম্পূর্ণ সংলাপ
এ নিয়ে যা লিখছি তা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও টিভিতে দেখানো খবর এবং মুখ্য উদ্যোক্তাদের একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। এতে করে পুরো চিত্রটা পাওয়া নাও যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই সেদিনের ‘নাগরিক সভা’য় সব ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দুর্ভাবনা। যেখানে আরও কিছুদিন নির্বাচন পেছানোর সাংবিধানিক সুযোগ ছিল, সেখানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ রেখে নির্বাচন করলে যে সংকট কাটবে না, এটিই ছিল আলোচনার প্রধান সুর। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিপন্ন হবে না, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটবে না, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। সংলাপে বিদ্বজ্জনরা এ নিয়ে চিন্তিত মন্তব্য করেছেন। এ রকম চলতে থাকলে তৃতীয় কোনো অসাংবিধানিক শক্তি চলে আসতে পারে এক পর্যায়ে, এ আশঙ্কাও ব্যক্ত হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যেন কার্যত সৃষ্টি করেছে আরও একটি এক-এগারোর আশঙ্কা, সুতরাং এর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়_ এ যুক্তিও পরোক্ষভাবে শুনতে পেয়েছি। কিন্তু আরও যেন কিছু কথা, কিছু নাগরিক সামাজিক কমিটমেন্টের ভাষ্য আমরা শুনতে চেয়েছিলাম রাজধানীর এই উচ্চবর্গের মানুষ, তথা বিদ্বজ্জনদের কাছ থেকে।কী বলা হয়েছিল সেদিন, তার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কী তাঁরা বলেননি সেদিন। কেউ কেউ হয়তো বলে থাকবেন, কিন্তু সেটি ওই আলোচনার প্রধান সুর ছিল না। প্রথমত, সময়ের বিচারে নাগরিক সভাটি দেরিতে, বড় দেরিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি তাদের শুরু করা উচিত ছিল বছর খানেক বা তারও আগে। এতে করে নাগরিক সমাজ আরও নানা বিষয়ে প্রভাব ফেলার বা অন্তত নিজেদের বিবেকি মত রাখার সুযোগ পেতেন। উদাহরণত, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে তারা বছর খানেক আগেই সভা ডাকতে পারতেন। গণজাগরণ মঞ্চের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও তারা বিতর্ক করতে পারতেন। চরম ডানপন্থি শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধা প্রধান বিরোধী গণতান্ত্রিক দলের পক্ষে সমীচীন হয়েছে কি-না সে প্রশ্নে তারা দিনব্যাপী আলোচনা-ডায়ালগ করতে পারতেন। কেন এসব বিষয় নিয়ে তারা উচ্চকিত হননি তা তারাই জানেন। দেশের পরিস্থিতি তাহলে হয়তো এ পর্যায়ে গড়াত না। দ্বিতীয়ত, অগণতান্ত্রিকতা আজ সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। সরকার যেমন ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণ করেছে, বিরোধী দলের আন্দোলনেও ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণ স্পষ্ট। গত এক বছর ধরে আন্দোলনের নামে যে হারে সহিংসতা হয়েছে জেলায় জেলায়, তাতে বিরোধী রাজনীতির ‘অগণতান্ত্রিকতা’ দৃশ্যমান। তৃতীয়ত, ধরা যাক, এই মুহূর্তে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলো। এবং এও ধরে নেওয়া যাক, আগের নির্বাচনগুলোয় গত দুই দশকে যেমনটা ঘটেছে, বিরোধী জোট এবারে জয়ী হলো। কিন্তু তাতে করে গণতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা হবে তারই বা নিশ্চয়তা কী? সহিংস অগণতান্ত্রিকতার অনুশীলন করে যে অশুভ শক্তিকে আমরা প্রশ্রয় পেতে দেখলাম তারা তো তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হবে। সেটাই কি আমরা চাই? আমরা কি চাই যুদ্ধাপরাধের বিচার_ ৪২ বছর পরে যে কোনো কারণেই হোক যখন সবে শুরু হয়েছে_ থেমে যাক? একবার অপরাধীদের হাতে ক্ষমতা গেলে বা তারা ছাড়া পেলে কী ভয়ঙ্কর অমাবস্যা নেমে আসবে এ দেশে, এ নিয়ে তো চরম দুর্ভাবনা নাগরিক সভার উদ্যোক্তাদের কথায় এবং বার্তায় দেখতে পেলাম না। চতুর্থত, উদ্যোক্তারা তো একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’র কথা বলতে পারতেন। যে চুক্তিতে বলা হতো, অবাধ, স্বচ্ছ ও সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য নয়। যে চুক্তিতে এ-ও বলা হতো, চরম ডানপন্থি সহিংস শক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদচারণা গ্রহণযোগ্য নয়। জন রাউলসের ‘রিজনিবল প্লুরালিজম’ সংজ্ঞায় এই সহিংস শক্তি পড়ে না। যে চুক্তিতে বলা হতো, অসাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলার মূল্যবোধ ছাড়া নির্বাচনী গণতন্ত্র কখনও প্রকৃত গণতন্ত্র হতে পারে না। যে চুক্তিতে বলা হতো যে, বাহাত্তরের মূল চারটি নীতি আসলে পরস্পরের পরিপূরক। সমাজতন্ত্র ছাড়া যেমন গণতন্ত্র জনকল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, তেমনি গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। সেক্যুলারিজম ছাড়া জাতীয়তবাদ শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর শাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। সেক্যুলারিজম বর্ণবৈষম্যবাদের মতো ধর্মবৈষম্যবাদের আশঙ্কাকে দূর করে। এবং সবশেষে নাগরিক সভার অনেকেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রার্থীদের ‘হলফনামার’ সূত্র ধরে একহাত নিয়েছেন সরকারদলীয় রাজনীতিবিদদের। বলেছেন, ক্ষমতায় থেকে সম্ভবত অবৈধ উপায়ে সম্পদ আহরণের সম্ভাবনার কথা। এই উদ্বেগে কারও আপত্তি থাকার কথা নয় সাধারণভাবে। কিন্তু এই উদ্বেগ আরও বিস্তৃত পরিসরে ব্যক্ত হওয়া উচিত ছিল। নাগরিক সভার উচ্চবর্গের অংশগ্রহণকারীরা বলতে পারতেন, হলফনামায় যে সম্পদ আহরণের চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা সাধারণভাবে কম-বেশি সত্য উচ্চবর্গের সবার ক্ষেত্রেই। যারাই এ সময়ে [গত এক দশকে] রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতাশালী হয়েছেন_ তা তিনি সরকার দলেই থাকুন, আর বিরোধী দলেই থাকুন_ তাঁরাই দ্রুত অর্থবিত্তের অধিকারী হয়েছেন। পাওয়ার, প্রফিট আর প্রিভিলেজ_ এ তিনের বরপুত্র হয়েছেন তাঁরা। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থাকা যে উচ্চবর্গের নাগরিক সমাজ সেদিনের নাগরিক সভায় অংশ নিয়েছিলেন তারাও হয়তো কম-বেশি এই সম্পদ আহরণ প্রক্রিয়ার বাইরে নন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে সরকারদলীয় প্রার্থীদের সম্পদ হয়তো বেড়েছে ৭ গুণ, সে তুলনায় বিরোধীদলীয় সদস্যদের সম্পদ হয়তো বেড়েছে ৪ গুণ এবং উচ্চবর্গের নাগরিক সমাজের সদস্যদের বেড়েছে হয়তো ২ অথবা ৩ গুণ [নাগরিক সমাজের যে অংশটি ব্যবসায়ী শিল্পপতি তাদেরকে এখানে ইচ্ছে করেই বাদ রাখছি]। একই সময়ে আমলাদের অর্থবিত্তও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে থাকবে। করপোরেট ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার যারা তাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। সংখ্যাগুলো কাল্পনিক, কিন্তু সমাজে আয় ও সম্পদ-বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করার সুবাদে বলতে পারি_ এ ধরনের প্যাটার্ন বাস্তবতার বাইরে নয়। এ প্রশ্নেও বলতে বাধ্য, সেদিনের নাগরিক সভার হলফনামা সম্পর্কিত আলোচনা নিতান্ত একপেশে মনে হয়েছে। এ প্রসঙ্গগুলো আগামীতে উপস্থাপনের সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি।কিন্তু আমি এসব কথা মনে করিয়ে দেওয়ার কে? আমি তো উটপাখি, সমাজের-ইতিহাসের ওপর দিয়ে ঝড়-ঝঞ্ছা যখন বয়ে যাবে তখন আমার বালিতে মুখ গুঁজে থাকার কথা। ‘উটপাখী’ কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে/ আমরা দুজনে সমান অংশিদার/ অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,/আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার/তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি।/অন্ধ হ’লে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ বাংলাদেশ নাকি ধ্বংসের কিনারে গিয়ে বারবার ফিরে আসে। কিন্তু এ রকম কোনো মৌল সূত্রের রক্ষাকবচ আসলে নেই। যা ঘটছে এখন বাংলাদেশে, যা ঘটতে যাচ্ছে, তার জন্য সমানভাবে দায়ী থাকবে সরকার, বিরোধী দল ও সিভিল সমাজ। শুনেছি, উটপাখিরাও আসলে বালিতে মুখ লুকায় না। বালিতে তারা মুখ গুঁজে ডিমকে রক্ষা করার জন্য। নিতান্ত জীবন-চর্চার প্রয়োজনেই। তাই উটপাখিদের তুলনা দেওয়াটা তাদের জন্য হবে অপমানকর। সরদার ফজলুল করীম এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, মানুষ আসলে মানুষকে মারতে পারে না। হয় মানুষ অমানুষকে [পশুকে] মারে, অথবা অমানুষ [পশু] মানুষকে মারে। আমরা এই ভয়াবহ সমীকরণের মধ্যে বাস করছি।

লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতিবিদ

Original post on Samakal here.

ইতিহাসের নিস্তব্ধতা

বিনায়ক সেন

১. দেশভাগ ও গণহত্যা

কোনো কাকতালীয় কারণে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশই_ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় গণহত্যা এড়াতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও অব্যবহিত পর সংঘটিত দাঙ্গাগুলোর বিস্তৃতি এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছিল যে, একে গবেষকদের এক বড় অংশ দেখেছিলেন ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’ (বা জেনোসাইডাল পার্টিশন) হিসেবে। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন_ শহীদ আমিন, বীণা দাস ও বোন পান্ডে স্বাধীনতার আনন্দকে মলিন হয়ে যেতে দেখেছিলেন পার্টিশন-দাঙ্গার বিষয় পরিণামে। আশিষ নন্দী, উর্বশী বুটালিয়া প্রমুখ যারা প্রথাগত অর্থে নিম্নবর্গের ইতিহাস-প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন তারাই প্রথম ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’-এর শব্দবন্ধটি প্রয়োগ করেন। একই ধারায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, গোয়ানিজ বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান পাকিস্তানের সাংবাদিক নেভিল এন্থনি ম্যাসকারেনহাস তার ‘সানডে টাইমস’-এর ১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রচ্ছদ নিবন্ধের শিরোনাম করেন ‘জেনোসাইড’। তবে তারও আগে আমাদের স্মরণ করতে হবে আদি-চিন্তক সাদত হাসান মান্টোকে, যিনি দেশভাগের সময়কালীন গণহত্যা নিয়ে তার অবিস্মরণীয় (কিন্তু সহজপাঠ্য নয়) ‘স্কেচগুলো’ রেখে গেছেন। এতই ব্যাপক ছিল গণহত্যামূলক দাঙ্গা যে, তার পরিণাম দেখে শিউরে উঠেছিলেন নেহরু ও জিন্নাহ উভয়েই। মান্টো তার অতি ক্ষুদ্র ‘বিনয়’ গল্পটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

‘দাঙ্গাকারীরা ট্রেনটাকে থামালো। যারা অন্য ধর্মের ছিল তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বার করল ও হত্যা করল। এসব কাজ যখন শেষ হলো তখন ট্রেনের বাদবাকি যাত্রীদের তারা আপ্যায়িত করল দুধ, কাস্টার্ড আর টাটকা ফল দিয়ে।’

ট্রেনটা ছাড়ার আগে আতিথেয়তা দানকারীদের নেতা সমবেত যাত্রীদের উদ্দেশে একটি বক্তৃতা দিলেন : ‘ভায়েরা ও বোনেরা, যেহেতু আপনাদের ট্রেন আসার সংবাদটি আমরা দেরিতে পেয়েছি তাই আমাদের যা ইচ্ছে ছিল সে রকম কোনো আপ্যায়ন আপনাদেরকে প্রদান করতে পারিনি।’
যারা গোবিন্দ নিহালনীর সিনেমা ‘তামস’ দেখেছেন বা কুশওয়ান্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ পড়েছেন তাদের এ নিয়ে বাড়তি কিছু বলার নেই। ইয়াসমিন খান তার ‘দ্য গ্রেট পার্টিশন : দ্য মেকিং অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’ বইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এ রকম নির্মম দেশভাগই কি ছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের কাঙ্ক্ষিত ‘চূড়ান্ত মুহূর্ত’? একেই কি নেহরু তার ১৫ আগস্টের মধ্যরাতের বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’_ নিয়তির সঙ্গে আমাদের অচ্ছেদ্য বন্ধন?

পাঠক নিশ্চয়ই বলবেন, কথা হচ্ছে ২৫ মার্চের ও তার পরের ৯ মাসের গণহত্যা, যেটা বাংলাদেশে ঘটেছিল তা নিয়ে। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের দেশভাগ (হোক তা গণহত্যামূলক দেশভাগ) টেনে আনা কেন? দুই কারণে। এক. বাংলাদেশেও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল ২৫ মার্চের গণহত্যাময় ‘কালরাত্রির’ পরই, দুই. বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে জাতীয়তাবাদী ঘরানার ইতিহাসবিদরা যত বই লিখেছেন, গণহত্যা নিয়ে লিখেছেন খুবই কম সে তুলনায়। একই কথা প্রযোজ্য ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের ক্ষেত্রে। তারাও জাতীয় আন্দোলন লিখতে গিয়ে দেশভাগের দাঙ্গাকে কার্যত এড়িয়ে গেছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার অভিজ্ঞতাই এক রাতের মধ্যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নাকি স্বাধীনতা’ এর মধ্যে যারা তখনও দোলাচলে ভুগছিলেন তাদের এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। এরপর আর থাকা চলে না পাকিস্তানের সঙ্গে_ এ রকম একটি সর্বজনীন বোধে মিলিত হয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। অভিজ্ঞতাটা চুন্নু ডোমের চোখে এ রকম:

‘আমরা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ শাঁখারীবাজার থেকে প্রতিবারে একশত লাশ উঠিয়ে তৃতীয়বার ট্রাকবোঝাই করে তিনশত লাশ ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর ও প্রবেশপথের দু’পাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিববাড়ী, রমনা কালীবাড়ি, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে লাশ উঠিয়েছি। … আমাদের ইন্সপেক্টর পঞ্চম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এরপর আমরা লাশঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-কিশোর ও শিশুর স্তূপ করা লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি। আর গণেশ, রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। লাশগুলো ঝাঁঝরা দেখেছি, মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাইনি, যোনিপথ ক্ষত-বিক্ষত এবং পেছনের মাংস কাটা দেখেছি। … প্রত্যেক যুবতীর মাথায় খোঁপা খোঁপা চুল দেখলাম।’

হুমায়ূন আহমেদের মতো শক্তিশালী লেখক ২৫ মার্চের গণহত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে তার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বইয়ে ন্যারেটিভ থামিয়ে দিয়ে গণহত্যার এসব প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য পাতার পর পাতাজুড়ে তুলে দিয়েছেন। মার্চের রাজনৈতিক সংলাপের এক পর্যায়ে এ রকম একটি গণহত্যা ঘটানোর পরিকল্পনা পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি করল কী করে? এটা করলে অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক যারা এ দেশে তখন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিলেন তারাও যে বিরুদ্ধ-পক্ষে চলে যাবেন এবং তার পরিণতি তো আরও অনিবার্য হয়ে উঠবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়_ কিছু আগে বা কিছু পরে সে সম্ভাবনাটুকু তারা কি আদৌ বিবেচনায় নিয়েছিলেন? ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে খ্যাত ২৫ মার্চের গণহত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন, ‘আমি আর্মির এ পদক্ষেপের বিরোধী ছিলাম। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলরা এর পক্ষে ছিলেন। তিন দিন ধরে আলোচনা চলছিল মুজিবকে নিয়ে কী করা হবে_ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হবে নাকি মেরে ফেলা হবে, তা নিয়ে। একাংশ চেয়েছিল তাঁকে মেরে ফেলতে। ২১ মার্চ পর্যন্ত আমরা জানতাম না আর্মি কোনো অ্যাকশনে যাবে কি-না। ২২ মার্চ টিক্কা (খান) আমাদের জানালেন_ তৈরি থাকতে।’ এই উদৃব্দতিটি যেখান থেকে নেওয়া সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পাকিস্তানের সিএসপি আমলা হাসান জাহিরের বই ‘দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’। তার বইয়ে অনেক নেপথ্যে বলা ঘটনার উল্লেখ আছে, শুধু বর্ণনা নেই ২৫ মার্চের গণহত্যার। এক জায়গায় তিনি বলছেন, মে-জুন মাসের দিকে তিনি গেছেন তার কিছু বাঙালি বন্ধুর বাসায়। সেসব বাসায় ভীত, বিচলিত, আতঙ্কিত দেখেছেন তাদের পরিবারকে : ‘সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে ভীতি ও নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলার যে চিত্র আমি দেখেছি তা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। এদের প্রতিটি পরিবার ভয়াবহ কাহিনী শুনিয়েছে আমাদের, এর মধ্যে ছিল মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা আর এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ছিল আর্মি অপারেশন।’ এর বেশি আর কিছু সেখানে পাওয়া যায় না। শুধু এক জায়গায়, তিনি বাঙালি নিধন-পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেছেন ‘ফাইনাল সল্যুশন’ হিসেবে। বলা বাহুল্য, এই শব্দবন্ধটি হিটলারের জার্মানিতে নাজিরা ব্যবহার করেছিল ইহুদিদের সমূলে সংহারের মাধ্যমে জাতি-নিধন পরিকল্পনাকে বোঝাতে গিয়ে। এই নীতি এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছিল_ এটা হাসান জাহির হিসাবে নেননি। ২৫ মার্চের গণহত্যার শিকার হয়েছিল প্রথমে রেললাইনের ধারের বস্তিবাসী ও তার পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়_ এটিও তার নজর এড়িয়ে গেছে।

২. ইতিহাসের ‘উচ্চকণ্ঠ’ বনাম ইতিহাসের ‘নিস্তব্ধতা’

ইতিহাস অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলে, অনেক বেশি বলে, কিন্তু অনেক বিষয় নিয়ে আবার কোনো উচ্চবাচ্যই করে না, এড়িয়ে যায় বা ‘নিস্তব্ধ’ থাকে। ইতিহাস যেহেতু আমাদের কাছে ‘অতীত’কে বিনির্মাণ করে, উপস্থাপনা করে, সেহেতু কোন ঘটনাটা কতটা প্রাধান্য পায় তার ওপরে ভিত্তি করে আমাদের লিখিত-পড়িত ‘ইতিহাসবোধ’ (টেক্সট) তৈরি হয়। ইতিহাসের জন্য যা অস্বস্তিকর, সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ফলে শেষাবধি আমরা যা পাই তা হলো সময়ের এক খণ্ডিত চিত্র কেবল। এই খণ্ডিত চিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে যে সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তাও খণ্ডিত হতে থাকে ‘ভেতর থেকে’। নিটশে একে বলেছিলেন, এ রকম ইতিহাসে ‘মৃতরা জীবিতদের মাটিচাপা দিয়ে কবর দেয়’।

বিসমার্ক জার্মানিতে একনায়ক হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার দু’বছর পরে, ১৮৭৩ সালে, জার্মান দার্শনিক নিটশে কিছু ‘অসময়ের ভাবনা’ লিখতে শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি লেখেন_ ‘দ্য ইউজ অ্যান্ড এবিউস অব হিস্টরি ফর লাইফ’। এই ছোট্ট পুস্তিকাটি প্রথাগত

ইতিহাসবিদ্যার মৌলিক পদ্ধতিগত সমালোচনা হিসেবে আজ স্বীকৃত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চার নানা খুঁটিনাটি তথ্য পেশ করে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে, অথচ অনেক জরুরি বিষয় নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই, বিচার-বিশ্লেষণ তো আরও পরের কথা। এই ছিল নিটশের মূল কথা। নিটশের এই কথার সূত্র ধরে নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ তার একটি লেখায় বলেছেন, কোনো কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ইতিহাসপনা_ অতিরিক্ত স্মৃতিশক্তির মতো_ কোনো দেশের সংস্কৃতির অবক্ষয়মান স্বাস্থ্যকে নির্দেশ করে’। এক্ষেত্রে তিনি বিখ্যাত স্নায়ু

মনস্তত্ত্ববিদ এআর লুবিয়ার একটি গল্প উদৃব্দত করেন। এই মনস্তত্ত্ববিদের কাছে সমস্যা নিয়ে এক রোগী এসেছেন। তার সমস্যা হলো_ তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি : সে কোনো কিছুই ভুলতে পারে না, সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ খণ্ড খণ্ড চিত্র হিসেবে তার মনের মধ্যে রয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এত অসংখ্য খুঁটিনাটির মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গিয়ে কোনো কিছুরই অর্থ উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চা উভয় ধারার মধ্যেই অনেক অনাবশ্যক খুঁটিনাটি তথ্যের জড়ো হওয়াকে একটি বড় মানসিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও কোনো কোনো বিষয়ে আমাদের ‘প্রখর স্মৃতিশক্তির’ পরিচয় পাই। বস্তুত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ_ এই তিনটি দেশেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে অনাবশ্যক নানা তথ্যের বিপুল আয়োজন, যা পাঠককে (ও নাগরিককে) ‘ক্লান্ত, ক্লান্ত’ করে। বাহান্না, বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তরের ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ_ জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসে যেটা হারিয়ে যায় তা হলো সাধারণ জনচৈতন্যের ও জনজীবনের ক্রমবিবর্তনশীল নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের পুরো গল্পটা আবর্তিত হতে থাকে ‘আগে থেকে গল্পের সমাপ্তি কী জেনে নিয়ে’ গল্প বলার মধ্যে (অর্থাৎ ‘টেলিওলজিক্যাল’ চরিত্রসম্পন্ন) এবং সে গল্পও আবর্তিত হতে থাকে ‘নায়ককে’ ঘিরে_ সেটা হতে পারে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, ব্যক্তিনায়ক হিসেবে মুজিব, ২৬ মার্চ, ১৭ এপ্রিল ও ১৬ ডিসেম্বরের বীরগাথা আর এসবের ‘অতিরিক্ত’ আয়োজনে চাপা পড়ে যায় ২৫ মার্চ_ যার সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে কেবল ‘একটি কালরাত্রি’। এমনকি ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস’ যেন নয়-নয়টি মাসের বিবরণ নয়, এটি যেন পূর্ব-নির্মিত রাজনৈতিক ভাবাদর্শের একটি অধীনস্থ প্রত্যয়, যেন একটি দ্রুত ঘটে যাওয়া পর্ব, যার প্রতিটি দিনের কোনো বিবরণ নেই বা যা হারিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের সামরিক যুদ্ধের খাতওয়ারি দিনলিপির মধ্যে। যদি ইতিহাসকে ‘ক্রম-প্রকাশ্য’ (আগে থেকে অনুমান সম্ভব নয় এমন) কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা যেত তাহলে আমরা অন্যরকম ইতিহাসের বয়ান পেতাম। সে ক্ষেত্রে আরও বেশি জীবন্ত, সত্যাশ্রয়ী ও মানবিক দেখাত ওপরের বর্ণিত জাতীয় মাইলফলকগুলো। সেখানেও স্বাধীনতার ইচ্ছা কীভাবে দানা বেঁধে উঠছিল তাকে ধরার চেষ্টা থাকত; কিন্তু সেটা হতো সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের চেয়ে আরও জটিল, বহু-সম্ভাবনাময় এবং বহু-ইঙ্গিতময় বয়ান। সেখানে উত্থান-পতন, সংশয়-দোলাচল, অস্থিরতা ও গণজাগরণ থাকত সব মানবিক বাস্তবতা নিয়ে। সেটি হতো না কেবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা সমরকৌশলের বিবরণ মাত্র। এ কারণেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ (বা চেতনাগুলো) এসব কথাকে কখনোই আমরা ঘটনাপরম্পরায় শনাক্ত করতে পারিনি এবং এ জন্যই (আমার ধারণা) আমাদের মৌলিক সাংবিধানিক প্রত্যয়গুলোতে যেমন : বাঙালি জাতীয়তাবাদের ‘বাঙালিত্ব’, সমাজতন্ত্রের ‘অভিপ্রায়’, গণতন্ত্রের ‘বৈশিষ্ট্য’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার ‘মানে কী’_ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো ‘সংজ্ঞাকে’ আমরা আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ডিসকোর্সে তুলে ধরতে পারিনি বা তা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক করতে পারিনি। এটা সম্ভব হতো যদি আমরা বাংলাদেশের ‘জনগণের ইতিহাসকে’ (পিপলস হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ) আমাদের ইতিহাস চর্চার প্রধান বিষয় হিসেবে শনাক্ত করতাম। তা না করে আমরা যা করেছি (কিছু স্মরণীয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে, যেমন বদরুদ্দীন উমরের ‘ভাষা আন্দোলন’ বিষয়ক গবেষণা) তা হলো একটি (নতুন) রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্ত লেখার চেষ্টা। ‘রাষ্ট্র’ অবশ্যই জনগণের ইতিহাস লেখার একটি অংশ; কিন্তু সেটিই একমাত্র ও প্রধান অংশ নয়।

৩. গণহত্যা নিয়ে পাঠ ও অপাঠ

‘রাষ্ট্রীয় ইতিহাস’ বনাম ‘জনগণের ইতিহাস’ এই প্রতিস্থাপনাটি সবচেয়ে বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বা তার পরের ৯ মাসের ক্রমাগত গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের বিবরণী পাঠ করি। আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ড, যেখানে সংকলিত হয়েছে ‘গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’। এর ভূমিকায় সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার দলিল ও তথ্য জমা হয়েছে। এর ভেতর ১৫ হাজার পৃষ্ঠা ছাপা হচ্ছে। বাকি দলিল ও তথ্যাদি ছাপার বাইরে রয়ে যাবে’। দুঃখের বিষয়, বাদবাকি দলিল ও তথ্যাদি গ্রন্থিত আকারে আমরা এখনও পাইনি বা পেলেও হয়তো অত্যন্ত আংশিকভাবে পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, এ অষ্টম খণ্ডটির কোনো ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থও (আমার জানা মতে) এখন পর্যন্ত বাজারে আসেনি। অষ্টম খণ্ডটিতে ২৬২টি মূল্যবান সাক্ষাৎকার রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই হলো সাধারণ মানুষের বয়ান। এ সাক্ষাৎকারগুলো সংগৃহীত আলাপের অতি সামান্য অংশ; কিন্তু এতে করেই একাত্তরের গণহত্যার যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে তাতে করে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়কে প্রামাণ্যতার ভিত্তিতে আমাদের নিজেদের ও বিশ্ববাসীর জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করা সম্ভব।

কী আছে এসব সাক্ষাৎকারে? প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো, এক বৈরী রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত সামরিক-রাজনৈতিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অসহায় এক নিরপরাধ সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভয়ার্ত দিনযাপন। একাত্তরের ৯ মাসে কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই পুরো দেশটা এক বন্দিশিবিরে পরিণত হয়েছিল তার প্রামাণ্যতা মেলে এখানে। আমি বলেছি, প্রথম অনুভূতিটা ছিল ‘ভয়ের’_ এক ভীতিবহ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়েছিল ওই নয় মাসে। একটি উদাহরণ নাজিমুদ্দিন মানিক বলছেন, ২৬ মার্চের ভোরবেলার কথা:

‘বায়তুল মোকাররমের মোড়ে রাস্তার ওপর আরও দুটি নাম না জানা বাঙালি বীরের নশ্বর দেহ চোখে পড়ল, চোখে পড়ল জিপিওর পেছনের গেটে এক ঝুড়ি রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ড আর নাড়িভুঁড়ি। তবুও আমি হেঁটে চলেছি, হেঁটে চলেছেন আমার চারপাশের মানুষজন। কেননা আমি এবং আমার চারপাশের মানুষ_ আমরা সবাই তখন বাঁচতে চাই এবং সে জন্যই আমাদের কারও প্রতি কারও কোনো খেয়াল নেই, কারও সঙ্গে কারও কোনো কথা নেই। সবার চোখেই একটা সন্ত্রস্ত ভাব। সবাই ভীতি বিহ্বল’।

প্রাথমিকভাবে যেটা ছিল ভয়ের অনুভূতি, সেটা সময়ের সঙ্গে নীরব অসহযোগিতা ও ক্রমেই সক্রিয় প্রতিবাদ প্রতিরোধে রূপ নেয়। অনেকগুলো সাক্ষাৎকারে বর্ণিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ ছাত্র, নারী, বৃদ্ধ, সাধারণ কৃষক, মেহনতি মানুষ, আলেম, ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, শারীরিক নির্যাতন, অগি্নসংযোগ ও হত্যার বিবরণ। বিশেষভাবে এসেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘জাতিগতভাবে’ ধ্বংস ও তাদের হত্যা করার বর্ণনা। এসব সাক্ষাৎকার একনাগাড়ে পড়াও সম্ভব নয়, এমনই সব নির্যাতনের বিবরণ দেয়া হয়েছে। যত ধরনের নারী-নির্যাতন সম্ভব, যত ধরনের হত্যা সম্ভব, যত ধরনের আক্রমণ ও লুণ্ঠন সম্ভব_ সব কিছুর নমুনা সংকলিত হয়েছে এসব গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের ডকুমেন্টেশনের মধ্যে।

এসব সাক্ষাৎকারে বেরিয়ে এসেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসার বা জওয়ানদের চেয়েও পাশবিক ভূমিকা পালন করেছে এ দেশের একটি গোষ্ঠী_ যারা রাজাকার বাহিনী, শান্তি কমিটি প্রভৃতি সাংগঠনিক আয়োজনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে মফস্বল শহরে ও গ্রামাঞ্চলে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। ব্যক্তিগতভাবে এদের মধ্যেও কেউ কেউ কদাচিৎ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন এমনও দৃষ্টান্ত মেলে এসব সাক্ষাৎকারে। তবে সাধারণ চিত্রটা ছিল এদের সম্পর্কে এটাই। অকাট্য সব প্রমাণ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপতৎপরতা ও সরাসরিভাবে নিরীহ-নির্দোষ মানবতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের জুন মাসের পরের সময়ের বিবরণ যেসব সাক্ষাৎকারে দেয়া হয়েছে তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে দখলদার বাহিনী ও তার সহযোগী শক্তিদের মধ্যে ক্রমাগত ভীতি সঞ্চারের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধারণ অবাঙালিদের ওপর বাঙালির আক্রমণেরও কিন্তু সাক্ষ্য পাওয়া যায় এসব সাক্ষাৎকারে। এ সময়ের বেশিরভাগ অত্যাচার-নির্যাতনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা। যারা অত্যাচারিত হয়েছে তারা খুব কম উদাহরণেই সেসব তথ্য দিয়েছেন শত অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তারা তথ্য গোপন করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন। এদের অনেকেই বলেছেন যে, তারা এখন শারীরিকভাবে পঙ্গু বা চলৎশক্তিহীন বা ক্রনিক কোনো ব্যাধিতে ভুগছেন বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দিন কাটাচ্ছেন কোনোভাবে। এসব বীরত্বময় ব্যক্তিরা প্রতিরোধের কাহিনী পড়তে গিয়ে আপনার মনে হবে_ এরাও তো ছিলেন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তা তাদের সনদপত্র থাকুক বা না থাকুক। আমার প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কি এদেরকে অষ্টম খণ্ড থেকে শনাক্ত করে কোনো সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা কখনো নিয়েছে? বা কোনো নিতান্ত বৈষয়িক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের তরফ থেকে? আছে কি এদের নামে প্রতিটি গ্রামে কোনো স্মৃতিফলক? এ জন্যই এই লেখার শুরুর দিকে উচ্চকণ্ঠ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ইতিহাসের বিপরীতে জন-ইতিহাসের নিস্তব্ধতার কথা বলেছি।

তবে এতসব সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারেকাছেও যাননি এখনো যারা দেশে-বিদেশে ১৯৭১-এর গণহত্যা অস্বীকার করেন_ তারা। হার্ভার্ড গবেষক শর্মিলা বোস এদের একজন। তিনি অনায়াসে তাই লিখতে পারেন যে, নারী নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন এ জাতীয় কাজ দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করেনি বা করলেও এসবে তাদের অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই। এ দেশের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যারা ভেতর থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছিল নয় মাস ধরে, তারাই বেশিরভাগ আক্রমণ-নির্যাতন করে থাকবে। এ জন্যই তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ বলার পরিবর্তে ‘গৃহযুদ্ধ’ শব্দটি পছন্দ করেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে তা সঠিক হলেও সাধারণভাবে এটি একটি অতি অসত্য পর্যবেক্ষণ। শর্মিলা বোস তার ‘ফিল্ড-ওয়ার্ক’-এর ভিত্তিতে যে বইটি লিখেছেন তার নাম ‘দ্য ডেড রেকনিং’। সে বইয়ে তিনি

অষ্টম খণ্ডের একটি কেস স্টাডিকেও আবার নতুন করে বিচার করার প্রয়াস নেননি স্বীয় মত প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি ব্যাপক হারের গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু অষ্টম খণ্ডের যে কোনো সাক্ষাৎকারই তার মতের বিপক্ষে যায়। তিনি ব্যাপকভাবে ‘নারী ধর্ষণ’-এর বিষয়টিকেও ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মনে করেছেন। আমার সামান্য হিসেবে আমি দেখতে পাচ্ছি যে, শতকরা ৭০ ভাগ সাক্ষাৎকারেই সরাসরিভাবে নারী ধর্ষণের উল্লেখ রয়েছে এবং বিশেষ করে যেখানে নারীরা নিজেরা বয়ান দিয়েছেন তার প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই পাশবিক নারী নির্যাতনের উল্লেখ রয়েছে। এসব নারীর কারো ঠিকানা সংগ্রহ করে মুখোমুখি হতে চেষ্টা করেননি শর্মিলা বোস। গণহত্যা অস্বীকারকারী হলোকাস্ট ডিনায়ার হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তার বইয়ের জন্য, বিশেষভাবে যা সমাদৃত হয়েছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের পাকিস্তানে, যেখানে তিনি প্রায় সেলিব্রেটি। পারিবারিক সূত্রে তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের ভাই শিশির কুমার বোসের মেয়ে_ ফলে তিনি বাড়তি কিছুটা মনোযোগও পেয়েছেন। আমি নির্মোহভাবে বিচার করেই এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডটি অস্বীকার করে, বিশেষত একে তার গবেষণার নমুনা বয়ানে অন্তর্ভুক্ত না করে, তিনি মৌলিক অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছেন।

২৫ মার্চের গণহত্যা বা সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস-নির্যাতন সম্পর্কে নিস্তব্ধতা রয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাস চর্চায়। এই নিস্তব্ধতা এখনো চলছে। হামিদ মীরের মতো সাহসী সাংবাদিক এর ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই, কিন্তু তারপরও এই উদাসীন্য চলছে। সে দেশের জনগণকে একাত্তরের প্রকৃত ঘটনা জানতে দেয়া হয়নি কখনো। এখনো তারা একাত্তরের গণহত্যার অধ্যায়টি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। ২০০৭ থেকে ২০০৯ প্রায় তিন বছর বর্তমান লেখক বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ হিসেবে পাকিস্তানের ওপর কাজ করেছেন। পাকিস্তানের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রণালয়ে ও দফতরে তাকে যেতে হয়েছে কর্মোপলক্ষে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমি লক্ষ্য করেছি যে, ২৫ মার্চের গণহত্যা বা নয় মাসের অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই সাধারণ পাকিস্তানিদের, এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আমলাদেরও। বাংলাদেশ ‘বিযুক্ত হয়েছে’ সামরিক শাসকদের এবং ভুট্টোর ভুলের কারণে_ এ পর্যন্ত তারা কেউ কেউ স্বীকার করেন; কিন্তু গণহত্যার আলোচনা সম্পর্কে তারা অজ্ঞ, অথবা তা জ্ঞানত বা অজ্ঞানত এড়িয়ে গেছেন। এদের মধ্যে যারা কিছুটা অসহিষ্ণু_ তারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য ইন্দিরাকে দায়ী করেন এবং মুজিবকে সাধারণভাবে মনে করেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। পাকিস্তানের নানা শহরে পূর্ব

পাকিস্তানের অনেক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদের নামে সড়ক রয়েছে (শেরে বাংলা ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীসহ)। কিন্তু একটিও সড়ক নেই শেখ মুজিবের নামে। অফিসিয়াল এস্টাবলিশমেন্টেরচোখে মুজিব এখনো ‘সবচেয়ে ঘৃণিত’ ব্যক্তি। ২০০৭ সালে লাহোরে সেন্সাস কার্যালয়ে নানা আপ্যায়নের মধ্যে আমার কাছে এ রকম একটি বক্তব্য জোরেশোরে তুলে ধরেছিলেন একজন উচ্চপদস্থ আমলা। আমি তাকে হাসান আসকারী রিজভীর লেখা ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘মিলিটারি, স্টেট অ্যান্ড সোসাইটি ইন পাকিস্তান’ বইটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। সেখানে এক জায়গায় রিজভী লিখছেন:

‘(মার্চের) সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরোধ আন্দোলনকে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। আওয়ামী লীগের কট্টর অংশটি চেয়েছিল মার্চের শুরুতেই স্বাধীনতার ঘোষণা করতে; কিন্তু মুজিবুর রহমান তাদেরকে পিছু টেনে রেখেছিলেন। মার্চের আন্দোলনের পরে … পাকিস্তানের সাথে যেটুকু ভঙ্গুর যোগাযোগ ছিল দেশটির, যদিওবা তার অবশিষ্ট কিছু থেকে থাকে সেসময়ে, তাও সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেল যখন সেনারা শহরে ঢুকল শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে।’

২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল আমাদের সাধারণ জনচৈতন্যে তদানীন্তন পাকিস্তানের সাথে অবশিষ্ট মানসিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার মুহূর্ত। এই কথাটা আমি লাহোরে কেন্দ্রীয় সেন্সাস কার্যালয়ে বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেছিলাম। এরপর সভাকক্ষে এক ধরনের বিষণ্ন ও অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছিল। ইতিহাস শুধু ‘অনিবার্যতার’ মাধ্যমে অগ্রসর হয় না, এর মধ্যে ক্রান্তিলগ্নের ‘আকস্মিকতার’ অবদানও ক্রিয়াশীল থাকে, যা নাটকীয়ভাবে ভিন্ন যুগের ভেতরে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যায়।

লেখক
অর্থনীতিবিদ
প্রাবন্ধিক

উপর্যুপরি আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

দ্বিতীয় কিস্তি (প্রথম কিস্তি)

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতন বিভিন্ন যুগে হয়েছে। তবে ধারণা করা যায় যে প্রাক-ঔপনিবেশিক, ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক ও আধুনিক আমলে এই নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ছিল। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে ২০১২ বা ২০১৩ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। এটাই এখানে আমার মূল বক্তব্য।

কিন্তু তার আগে আমাকে বাঁশখালীতে ফিরে যেতে হবে। আমি সেখানে যাইনি। অনেকের মতো আমিও সেই বিপর্যস্ত নারীকে দেখেছি টিভির পর্দায়, বিভিন্ন চ্যানেলে, দগ্ধ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত অবস্থায় কাতরস্বরে কী যেন বলছেন এবং পরমুহূর্তে আবার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত তাঁর এত দিনকার গৃহস্থালির অবশিষ্টাংশ ও পোড়ামাটির ধুলায় ক্লান্তিতে কান্নায় শুয়ে পড়ছেন—এ রকম একটা ছোট্ট ‘ক্লিপ’ আমাদের দেখানো হয়েছে। আমি তাঁর নাম পর্যন্ত জানি না। কিন্তু মাতৃসমা এই নারী আমাকে পেয়ে জানতে চাইতেই পারেন, ‘বাবা, এই যে এসব ঘটে গেল, এটা কেন হলো, এর ব্যাখ্যা কী?’ ফলে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে আবারও বিস্মৃতি থেকে টেনে আনতে হচ্ছে কেবল তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য, যেপ্রশ্ন তিনি কখনোই আমাকে করেননি বা হয়তো কাউকেই করেননি বা সম্ভবত কোনো দিনই করবেন না। তবে তাঁর ঘর-গৃহস্থালির অবশেষ দেখে এবং শুধু তাঁর নয়, অধিকাংশ মানুষ যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সম্প্রদায়কেন্দ্রিক এই আক্রমণে, তাঁদের সহায়-সম্পত্তি দেখে—এ রকম ধারণা আমার জন্মেছে যে তাঁরা কেউই উচ্চবর্গের নন। এমনকি শহরে মধ্যবিত্তের যে জীবনমান তার চেয়েও বেশ কিছুটা নিচুতেই তাঁদের অবস্থান বোধ করি। বস্তুত, আক্রমণের পর তাঁদের ঘর-গৃহস্থালির যে চেহারা দেখানো হয়েছে টিভির পর্দায় বা পত্রিকার স্থিরচিত্রে, তাতে করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জেগেছে আমার তা হলো—এখান থেকে লুটপাটের কী পেল দুর্বৃত্তরা? এঁরা হয়তো ভূমিহীন চরম দরিদ্র পরিবারের কেউ নন, কিন্তু মধ্যবিত্তের সম্পদ-জমি ইত্যাদি সংজ্ঞায় এঁরা পড়েন কি না এ নিয়ে শেষাবধি সন্দেহ থেকেই গেল। সম্পদ বলতে একটা ভিটেমাটি, চালাঘরের মধ্যে একটা খাট বা বড়জোর একটা আলনা, কিছু ঘটি-বাটি, একটা দুটো চেয়ার-টেবিল বা বড়জোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট টিভি। এঁরা গ্রামবাংলার ধ্রুপদি গরিব কৃষক বা ছোট্ট মফস্বল শহরের বা বাজার-উপজেলা কেন্দ্রের খুদে ব্যবসায়ী। প্রথাগত অর্থে সংখ্যালঘু বলতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যে শ্রেণীটিকে বোঝানো হয়ে থাকে, এঁদের স্থান তার থেকে অনেক নিচে—সামাজিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, শিক্ষার মান যেকোনো মানদণ্ডেই তাঁদের বিচার করুন না কেন। এই কারণে আমি এঁদের ‘অতি-সংখ্যালঘু’ বলছি। এরা আলট্রা-পুওরের মতোই আলট্রা-মাইনরিটি।

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতনের যেসব প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে তা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কোনো বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার জন্য। এর কোনোটা লেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে (যেমন ১৮৮০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৬-এর দাঙ্গার কারণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে)। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের আগের (১৯৪৬ সালের) দাঙ্গা বোঝার তাগিদ থেকে। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের পরের (১৯৫০ বা ১৯৬৪ সালের) দাঙ্গার প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য। স্বাধীনতার পর এ দেশে ১৯৯২ সালের বা ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন নিয়েও কিছু লেখালেখি হয়েছে। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঁড় করানো হয়েছিল সেসব ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রেও এগুলো যথেষ্ট ছিল কি না সে বিষয়েও আমার কিছুটা সংশয় রয়েছে। কিন্তু আমি এখানে সেসব বিচারে যাব না। আমি ধরে নেব এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ন্যায্যতা রয়েছে। আমি শুধু দেখব যে এসব ডিসকোর্স দিয়ে ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে ব্যাখ্যা করা চলে কি না।

হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে একই আলো-হাওয়ার মধ্যে শত শত বছর বাস করেও ‘যাহা মনুষ্যচিত, যাহা ধর্মবিহিত’ সে রকম একটি সম্পর্ক ‘আমাদের মধ্যে হয় নাই’ এবং এই অর্থে আমাদের মধ্যে ‘একটি পাপ আছে’ ও ‘এই পাপ বহুদিন হইতে চলিয়া আসিতেছে’। এটা স্বীকার না করলে ‘এই পাপ থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নাই’। এর থেকে আভাস মেলে যে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেও, বিচ্ছিন্ন হলেও, মাঝেমধ্যেই দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়েছে; উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে নিয়ম না-মানা চৈতন্যপন্থী, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মতের যেমন, তেমনি সমতাবাদ অনুসারী নব্য ধর্মমত ইসলামের সঙ্গেও। তবে সে আমলে অতি-শাস্ত্র মানা বিশুদ্ধপন্থীদের সঙ্গে শাস্ত্র হুবহু না-মানা অবিশুদ্ধপন্থীদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মধ্যযুগীয় সমাজে; ফলে দ্বন্দ্ব থাকলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তা পর্যবসিত হয়নি সেকালে। এই অবস্থাটা উনিশ শতকের বাংলায়ও বহুকাল অবধি ছিল। ফরায়েজি-ওহাবি শুদ্ধাচরণের মতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গড়ে উঠেছিল লালন ও তাঁর অনুসারীদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তখনকার সমাজ এ রকম নানা মতবাদ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পেরেছিল বলেই সামাজিক ভারসাম্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাটা ১৮৮০ সালের পর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর পেছনে দায়ী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক উত্থান, যা বঙ্কিম-প্রদর্শিত বাহুবলের তত্ত্বকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে পরবর্তী দশকগুলোয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারের ওপর আক্রমণ-নির্যাতনকে এই দ্বন্দ্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় কি না? প্রথমেই আমাদের মনে পড়বে জমিদার-কৃষক দ্বন্দ্বের তত্ত্বের কথা। হিন্দু জমিদার বনাম মুসলমান কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িকীকরণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অনিবার্যভাবে জন্ম নিল—এমন মত পাওয়া যাবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের রচনায়। জমিদার বনাম কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব যে সাম্প্রদায়িক পরিণতিতে গড়াতে পারে তার আভাস রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিশদভাবেই পাওয়া যায়। তবে বাঁশখালীতে, বেগমগঞ্জে বা বাগেরহাটে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের ঠিক ঘরে-বাইরে-এর নিখিলেশের শ্রেণীতে ফেলা যায় না—এতে আশা করি কম-বেশি সবাই একমত হবেন। ১৯০৫-০৭ সালের ‘স্বদেশি আন্দোলন’ চলাকালীন বঙ্গভঙ্গ রোধে সেভাবে মুসলমান কৃষকেরা অংশ নেয়নি। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে কৃষকেরা ভেবেছিল, বাবুরা তো এমনিতে তাদের কাছে আসেন না, ‘বাবুরা বোধকরি বিপদে পড়িয়াছে’ বলেই এখন তাদের কাছে এসে স্বদেশি প্রচারণা চালিয়ে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারকে বা উপজেলা কেন্দ্রের আক্রমণের শিকার খুদে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ঠিক ধ্রুপদি অর্থে ‘হিন্দু বাবু’ বলা চলে না বোধকরি।

১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন দাঙ্গার একটি মেইনস্ট্রিম ব্যাখ্যা হলো, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণভাবে ব্যাপক কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাপক দ্বন্দ্ব ছিল এবং দ্বন্দ্ব বাড়ছিল এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত ও মুসলমান মধ্যবিত্ত প্রতিযোগিতা করছিল চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা খাতে নিজেদের ক্ষমতাবান করতে। একসময় সে প্রতিযোগিতা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের রূপ নেয় ও এর পরিণতিতে এমনকি তা দাঙ্গা-আক্রমণ-নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কালপর্ব নিয়ে লেখা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন উপন্যাসে এ রকম দ্বন্দ্বের বিস্তার কীভাবে গ্রাম এলাকায় ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েছিল তার সত্যনিষ্ঠ বিবরণী পাই। ক্রমেই জমিদার নিয়ামত হোসেন ও অত্যাচারী শশাংক পালের জায়গা নিচ্ছিল উঠতি ধনিক ধনু শেখ। তবে দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্বার্থচিন্তার তত্ত্বও বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ, বাগেরহাটের ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন-দাঙ্গাকে ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না। নির্যাতিত পরিবারগুলোকে কোনোভাবেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উঠতি মধ্যবিত্ত বলে মনে হয়নি আমার। এরা আদৌ কোনো আকর্ষণীয় সরকারি বা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নিয়োজিত কি না সে বিষয়েও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দুটো বড় দাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সামাজিক ভিতকেও ভেতর থেকে নড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও দেশভাগের দাঙ্গার প্রাথমিক আঘাত সামলে উঠে হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে এই বঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগের বছরে এদের সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে। ২০১১ সালে এটা আরও নেমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে। ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাগুলোর পেছনে মূলত দায়ী করা হয় বৈরী রাষ্ট্রশক্তিকে এবং সেই শক্তির সমর্থক মুসলিম লীগের রাজনীতিকে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শত্রু-সম্পত্তি আইন যারা জমি-বাড়ির মালিক, সেসব হিন্দু পরিবারের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়। বস্তুত, দাঙ্গার মাধ্যমে যতটা ক্ষতিসাধন হয়েছে এই শ্রেণীর, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে শত্রু-সম্পত্তি আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও হাল আমলের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে বুঝতে সাহায্য করে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় আজ সাম্প্রদায়িক বৈরী শক্তি অধিষ্ঠিত নেই। নেই মুসলিম লীগের মতো কোনো শাসক দলও। শত্রু-সম্পত্তি আইন সাধারণভাবে সারা দেশেই এখনো বিদ্যমান—এই পাপ আপনার, আমার, সবার—কিন্তু বিশেষভাবে বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ বা বাগেরহাটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কেন রাষ্ট্রশক্তি বা তার সহযোগী স্থানীয় সামাজিক শ্রেণী-দলগুলো চড়াও হতে যাবে কেবল সম্পত্তি দখলের জন্য, তার সপক্ষে যুক্তি মেলা ভার। এই অতি-সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করে জামায়াত-শিবির (যদি করেও থাকে) কী ফায়দা পাবে, সেটিও কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেথড ইন দ্য ম্যাডনেস’ সে রকম কিছু খুঁজে পাচ্ছি না এখানে। তাহলে এই অযৌক্তিককে কোন যুক্তিতে ধরব?

সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতনের সর্বশেষ যে ব্যাখ্যাটি আমার হাতের কাছে রয়েছে তা হলো, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রে এক জাতি, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্র—এ রকম রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের চাপে এসব দুরাচার ঘটছে। এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেহেতু আত্যন্তিকভাবে কোনো বিশেষ একটা আত্মপরিচয়কেই বড় ও চূড়ান্ত করে দেখতে চায়, সেহেতু অন্যান্য আত্মপরিচয়ের জাতি, গ্রুপ বা ব্যক্তিরা হয়ে পড়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একেই কালচারাল স্টাডিজ এবংবিধ বিদ্যায়তনিক পরিসরে বলা হয়ে থাকে ‘অপরায়ণ’। তবে ‘অপর’ হলেই যে ‘পর’ হবে বা ‘পর’ হলেই যে ‘শত্রু’ হবে এবং ‘শত্রু’ হলেই ‘নির্যাতনের লক্ষ্য’ হবে—এ রকম কোনো অবধারিত নিয়মনীতি অপরায়ণের সূত্রে গাঁথা নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনীতিতে সেক্যুলার বাঙালিত্ব তথা ‘ভাষাকে’ বড় করে তুলছে বলেই এর বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনীতিতে দাঁড়াতে হবে ‘ধর্মকে’ কেন্দ্র করে—এ রকম কোনো মিঠে ডায়ালেকটিক অনিবার্য নয়। এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে গিয়ে যিনি জাতিসংঘে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি একসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সদালাপী এই ব্যক্তিটি বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ‘জল বনাম পানির’ উপমা টেনে এনেছিলেন। কিন্তু বিষয়টা এত সরল ছিল না। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ভাষার ও অঞ্চলের এবং ধর্মের শব্দ এত বেশি ঢুকেছে যে এই ভাষার মিশ্র চরিত্রের ভিত্তিতে বঙ্কিমের মতো সাম্প্রদায়িক চিন্তকও একপর্যায়ে বাঙালি হিন্দুর বিশুদ্ধ ইতিহাস ব্যাখ্যা লেখা অসম্ভব বলে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে বঙ্কিম অবিমিশ্র আর্য জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির ইতিহাস লেখার বদলে একপর্যায়ে সম্ভবত ‘বহুজাতিক বাঙালি’র ইতিহাস লেখার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, ‘বাংলার স্বাধীন (মুসলমান) সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন’, ইত্যাদি। ভুল শুনলাম কি—‘বহুজাতিক বাঙালি’? যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে একই সঙ্গে বাঙালি ও বাংলাদেশি, একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘বহুজাতি’ এ দেশে গড়ে উঠতে পারা যাবে না কেন? এ রকম ‘বহুজাতিক বাঙালি’তে কে সংখ্যাগুরু, কে সংখ্যালঘু—এই প্রশ্নের গুরুত্বই কমে যায়। তা ছাড়া এই ভূখণ্ডে তো বাংলা ছাড়াও অন্যান্য বহু ভাষাভাষী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছেই, তাদেরও তো এই বহুজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি বাঁশখালীর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে পোড়ামাটির গন্ধ ও কালো ধুলার মধ্যে ভূলুণ্ঠিতা মাতৃসমা ওই নারীকে এসব তত্ত্ব বোঝাব কী করে? (শেষ)

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

সংখ্যালঘু বনাম আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা

প্রথম কিস্তি

আমি কি সংখ্যালঘু? এক অর্থে প্রশ্ন রাখাটাই হাস্যকর। আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নামই বলে দিচ্ছে আমি কী। এ নিয়ে বাহাস করার অর্থই হয় না। তবে বিষয়টা অত সরল না-ও হতে পারে। আজকাল সংখ্যালঘু কথাটার ‘সংখ্যায় লঘু’ এমন একটা কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংখ্যায় মেজরিটি হয়েও কেউ কার্যত মাইনরিটি হতে পারে। সারা বিশ্বে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, শিশুমৃত্যুর হারে অনেক বৈষম্য থেকে যাওয়ার পরেও। তারপরও কি আমরা বলতে পারি যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরেও সংখ্যালঘুর মতো অধস্তন অবস্থান তাদের। তার মানে ব্যাপারটা শুধু সংখ্যায় (নিউমেরিক্যালি) বেশি-কমের বিবেচনা নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—কে কত বেশি ক্ষমতাবান? নারীরা পুরুষদের চেয়ে এখনো কম ক্ষমতাবান বলেই সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু। সুতরাং সংখ্যায় বেশি-কম যা-ই থাক না কেন, কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা ব্যক্তি ‘ক্ষমতা হারিয়ে’ কীভাবে সংখ্যালঘু ‘হয়ে ওঠে’, সেটিই হচ্ছে প্রথম বিচার্য বিষয়। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, নারীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। যখন আপনি সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেন, তখন আপনি নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ ভাবতে শুরু করেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, একজন ইহুদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যাকে অ্যান্টি-সেমিটিকরা ইহুদি বলে ডাকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, একজন সংখ্যালঘু হচ্ছে সেই মানুষ, যাকে একজন সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বলে ডাকে, যেমন: ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে ‘উপজাতি’ বলে পরিচিত করে না, তাকে ‘উপজাতি’ বলে কোনো বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই নানা পরিচয় থাকে। কোন পরিচয়ে কে কখন কতটা নিজেকে জাহির করবে, সেই স্বাধীনতাটা সবার সমান নয়। আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) জাহির করার স্বাধীনতা যে সমাজে যত বেশি, সেই সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতাও তত বেশি এবং সেই সমাজও তত বেশি উন্নত। অমর্ত্য সেন তাঁর আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ে নিজের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন: ‘আমি একই সঙ্গে হতে পারি একজন এশীয়, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাঙালি, যার রয়েছে বাংলাদেশি পূর্বপুরুষ, একজন মার্কিন দেশে বা ব্রিটেনে বসবাসকারী, একজন অর্থনীতিবিদ, দর্শনচর্চায় অনুপ্রবেশকারী, একজন লেখক, একজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষজ্ঞ, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রে জোরালোভাবে বিশ্বাসী, একজন পুরুষ, একজন নারীবাদী, একজন “হেটেরোসেক্সুয়াল”, কিন্তু সমকামীদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনকারী, যার জীবনযাত্রার ধরন কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে খাপ খায় না (নন-রিলিজিয়াস), সে এসেছে হিন্দু সামাজিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড) থেকে, সে অ-ব্রাহ্মণ, এবং সে বিশ্বাস করে না মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জীবনে (আফটার লাইফে), বা এই প্রশ্ন যদি তাকে করা হয়, সে এ-ও বলবে—সে বিশ্বাস করে না কোনো পূর্ব-জন্মেও। এটা হচ্ছে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র নমুনা-চয়ন, যার প্রতিটাতেই আমি হয়তো একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত—এবং চাইলে এ রকম আরও অনেক পরিচয়ের সদস্য হতে পারি আমি; সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির বিচারে কোন পরিচয়টা সেই মুহূর্তে আমাকে বেশি টানছে, তার ওপর।’ অমর্ত্য সেনের স্বাধীনতা আছে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে লাগসই পরিচয়টা অবস্থাভেদে, পছন্দ অনুযায়ী ও রুচির বিচারে বেছে নেওয়ার। এই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ সবার থাকে না, সব শ্রেণীর থাকে না, সব সমাজে থাকে না।

অমর্ত্য সেন বইটি লিখেছিলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে প্রচারিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব। সংঘাত বলতে পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক মূলগত দ্বন্দ্বের ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও তাঁর অনুসারীরা। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নানাভাবে পাশ্চাত্যের শত্রু বানিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তারই বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হিসেবে অমর্ত্য সেন ২০০৬ সালে বইটি লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে এই বিরোধ আবিষ্কার ছিল একটি দুষ্ট-পরিকল্পনা। প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বকে এক পরাশক্তির অধীনে আনার ও সর্বত্র আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব জোরেশোরে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই বই লেখার আরও বহু বছর আগে থেকেই আমি আবছা করে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি ব্যক্তিকেই কোনো বিশেষ আত্মপরিচয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র বা ধর্ম বেঁধে দিতে পারে না। কোন পরিচয়ে সে নিজেকে কখন পরিচিতি করাতে চায়, সেই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ তার চাই—এটা তার মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং সে কারণেই কৈশোর থেকেই কেউ আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললে আপত্তি করেছি, পারলে প্রতিবাদ করেছি, না করলেও মেনে নিইনি।

এর জন্য আমার পারিবারিক ঐতিহ্যও কিছুটা দায়ী। আমি এখানে কোনো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা তুলছি না। আমার ধারণা, এ রকম অভিজ্ঞতা আরও অনেকের জীবনেই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সেটা মনে রেখেই দু-একটি আত্মজৈবনিক তথ্য যোগ করব এখানে। ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই আত্মকথন—তার জন্য আগেই তত্ত্বজ্ঞ পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার মা ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে তাঁর পরিচয়কে সীমিত রাখেননি। ঈদে বা শবেবরাতের অনুষ্ঠানে নিজে উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন, বাসায় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে দাওয়াতও দিতেন। উৎসবে বা সংকটে পড়লে মাজারে ‘মানত’ করা ছিল তাঁর সংসারের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব কিছু ‘ভোকাবুলারি’ ছিল। হাইকোর্টের মাজার ‘গরম পীরের মাজার’, ফলে মাজারের পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা জানানো চাই। নইলে আধ্যাত্মিক গুরু রুষ্ট হবেন। মিরপুরের মাজার আবার ছিল ‘ঠান্ডা পীরের মাজার’—তিনি দুর্বাসা মুনি নন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দোষ নেন না। আমাদের বাসায় জন্মাবধি দেখেছি নানা সময়ে বিভিন্ন মুসলমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন পুণ্যবান ব্যক্তিরা এসেছেন। তাঁদের যথাবিহিত যত্ন করা হয়েছে। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো যুক্তি শৈশব থেকেই পাইনি। মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন—যদি হিন্দু ধর্মে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে ভারতমুখিনতার সঙ্গে সমীকরণ করা হতো। পাড়ার বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গেলে যদি বিক্রেতা তাঁকে বলত, ‘দাদি, আপনাদের দ্যাশ থেকে আইছে।’ মা উত্তরে বলেছেন, ‘তাই নাকি, জানতাম না তো সিলেটে আজকাল এসব পেঁয়াজ হচ্ছে,’ এবং তারপরেই তিরস্কার করে বলে উঠতেন, ‘দাদির সঙ্গে ফাজলামি করার আর বিষয় পাওনি, না?’ বিক্রেতা লজ্জিত হতো, ‘না, দাদি, ভুল হয়ে গেছে’—এমনটাই বলত। তিনি বাজারের সবার কাছে ছিলেন ‘সর্বজনীন দাদি’। শুনেছি, মৃত্যুর পরে তাঁর মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য অনেক লোক তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, আমার বাবাও এই মতেরই মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন—অসংখ্য ছাত্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। মানুষ বড়ই রহস্যময় জীব। আমি মৃত্যুর পরে তাঁকে একবার মাত্র স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু তাঁর পূর্বতন (মুসলমান) ছাত্ররা ও সহকর্মীরা—যাঁরা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে আসীন হয়েছিলেন—তাঁকে নাকি অনেকবারই স্বপ্নে দেখেছেন এবং সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবিতে দেখেছেন। তাঁরা ফোন করে বা দেখা করে আমাকে তা বলার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি পারমার্থিক বিষয়ে নিবিষ্ট নই, কিন্তু আমার শুধু বলার কথা—হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের বিভিন্নতা সেখানে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ফলে আমার পক্ষে, নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবা কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয় একটি কারণও ছিল। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আমার বাবা অধ্যক্ষ বি বি সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন সমগ্র নর্থ-ইস্ট সেক্টরের ‘এডুকেশন অফিসার’ হিসেবে। শিলংয়ে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কাজটা ছিল রিলিফ ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের পরিচালনার কাজে অংশ নেওয়া। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন তাঁর পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে অধ্যক্ষ হিসেবে। এ দেশে বীরাঙ্গনাদের প্রথম কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানেই। মুজিবনগর সরকারে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা সবাই নাকি একটি করে ‘প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তবে স্বীকৃতি বা পদোন্নতি নিয়ে তাঁর মনে কখনো ক্ষোভ ছিল না। এই না-পাওয়াটাকে তিনি তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ পরিচিতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত করেননি। দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। একবার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যার মুখে। সেবার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার তাঁর পাকিস্তানি বস-এর ছোট ভাই হওয়ায় তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। আরেকবার এই স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে, সেনা-অভ্যুত্থানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে (বর্তমান লেখকসহ)। এই গ্রেপ্তার ছিল ভুল-বোঝাবুঝির, গ্রেপ্তার এবং যাঁরা এটা করেছিলেন তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাত্তগত ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করেছিলেন। সে রকম শুনেছি। তবে আমার গর্বের ব্যাপার যে আমার বড় ভাই ছিলেন একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। মুজিববাহিনীতে নয়, সে সুযোগও তাঁর ছিল। তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে (এফএফ) যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরে। জানের তোয়াক্কা না করে তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁকে আমরা সারা শরীরে জোঁকে-খাওয়া অবস্থায় দেখতে পাই নয় মাস যুদ্ধের পরেই। কিছুদিন ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার দায়িত্বপূর্ণ কাজেও ছিলেন, কিন্তু তদানীন্তন নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৭৪ সালেই ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন। সেটাও (পরে শুনেছি) স্বাধীনতার পরে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতার মুখ গলে তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল, বা এমনই কিছুর প্রতিবাদে। এরপর বাদবাকি জীবনটা প্রায় প্রবাসেই কাটালেন কোনো প্রবল অভিমান বুকে নিয়ে। এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত সদস্য হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ আত্মপরিচয়টা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আমারও আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল ও আছে।

তৃতীয় একটি কারণও রয়েছে, তবে সেটা মোটামুটি প্রকাশ্যেই ধারণ করে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই এবং কালক্রমে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলাম। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো কারণ ছিল না, কেননা পার্টিতে মণি সিংহ বা মোহাম্মদ ফরহাদ, জিতেন ঘোষ বা হাতেম আলী, মণিকৃষ্ণ সেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজয় রায়, মতিউর রহমান বা মনজুরুল আহসান খান—এসব নামের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত বিবেচনাবোধ কখনোই মনে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আমার প্রথম ও প্রধান আত্মপরিচয় ছিল—আমি সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের প্রগতির পক্ষের লোক। আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললেই (বলতে পারেন অনেকেই) আমি তা মানব কেন? ঠিক একইভাবে, পারিবারিক দিক থেকে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীও (যতই তাঁকে বোঝানো যাক) নিজেকে এখনো ‘সংখ্যালঘু’ বলে ভাবতে চান না বা পারেন না।

মোট কথা, অমর্ত্য সেনের দার্শনিক গ্রন্থটা পড়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা কখন কী পরিমাণে আমি জাহির করব, সে স্বাধীনতাটা আমাকে দেওয়া দরকার বা আমার অর্জন করা দরকার। কিন্তু এসব কথা আমি বাঁশখালীর ওই সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া মাতৃসমা নারীটিকে বোঝাব কী করে? বস্তুত, আমি তাঁকে সংখ্যালঘুও বলতে চাইছি না। তাঁর পরনের পোশাক, তাঁর ঘর-গৃহস্থালি, তাঁর পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে বলে দিচ্ছে, অন্য কোনো শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হওয়া দরকার এ ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে অনন্যোপায় হয়ে বলছি—তিনি আসলে অতি-সংখ্যালঘু।

দ্বিতীয় কিস্তি: অতি-সংখ্যালঘুর ওপরে আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।