বেট্রোল্ট ব্রেশটের কবিতা: যারা আগামীতে জন্ম নেবে তাদের প্রতি

যারা আগামীতে জন্ম নেবে তাদের প্রতি

সত্যি,কী সময়ে বাস আমার!
সোজা-সাপটা কথা বলাও এখন মূর্খতা।
যার কপালে কোন ভাঁজ পড়ে নি সে আসলে বোধশক্তিহীন।
আর যে লোকটা হেসে চলেছে,
সে এখনো তার দুঃসংবাদ পায় নি।

এ কী সময়ে বাস যখন
বৃক্ষ নিয়ে আলাপও অপরাধ,
পাছে ধরা পড়ে যায়
লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা
তাদের দুষ্কর্মগুলো?
এ কী সময়ে বাস যখন
এই যে লোকটা রাস্তা পার হয়ে গেল
সে এরই মধ্যে গুম,
অস্থির অপেক্ষায় থাকা তার বন্ধুরা
যার হদিশ কোনদিনই পাবে না।

এসব ভাবলে আমি বেশ আছি।তবে
বলতে পারো, এ-ও দুর্ঘটনাই এক ।
আমার এই বেঁচে যাওয়ার পেছনে
কোন জোরালো যুক্তি নেই। আমার ধারণা,
নেহাৎই কাকতালীয় ভাবে, আমি বেঁচে গেছি।
(কপাল যেদিন মন্দ হবে, সেদিন নির্ঘাত সমাধি)

আমাকে বোঝানো হয়েছে
খাবে-দাবে,আর খোশ মেজাজে থাকবে,
সব কিছু ঠিকঠাক চলছে, এই ভেবে।
আমি বুঝে পাই না
একজন অনাহারী, অন্যের পাত থেকে কেড়ে না খেলে
একজন তৃষ্ণার্ত, অন্যের হাত থেকে ছিনিয়ে না নিলে
যেখানে প্রতিদিনের আহার পানীয় জোটে না
তার পক্ষে কীভাবে ঠিকঠাক চলা সম্ভব?
অথচ, এরপরও, চলছি।

আমিও প্রজ্ঞ্বাবান হতে চাই।
প্রজ্ঞ্বা কিসে, তা প্রাচীন গ্রন্থে লেখাঃ
“পার্থিবের দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলো
শঙ্কাহীন জীবন কাটাও
সংঘাতে জড়িয়ে পড়ো না
সত্যকে আঁকড়ে অসত্যকে জয় করো
বাসনা পূর্ণ করো না
বাসনাকে অতিক্রম করো”।
এতসব করা আমার সাধ্যাতীত।
সত্যি,কী সময়ে বাস আমার।


এক বিশৃংখল সময়ে আমি শহরে এসেছিলাম
চারপাশে দুর্ভিক্ষ তখন।
এক বিদ্রোহের সময়ে
আমি জনতার কাতারে এসে দাঁড়াই,
বিদ্রোহী হয়ে উঠি তাদের দেখাদেখি।
এভাবেই আমার সময় আমি পার করে দিয়েছি,
পৃথিবীতে যতটা সময় আমার বরাদ্দে ছিল।

এক নিরন্তর যুদ্ধের মধ্যে আহার সারতে হয়েছে আমাকে।
চারপাশে খুনীদের রেখেই আমি ঘুমাতে গিয়েছি।
ভালোবেসেছি বাধাবন্ধনহীন, আর নিসর্গকে
আস্বাদন করেছি প্রচন্ড অধৈর্যে।
এভাবেই আমার সময় আমি পার করে দিয়েছি,
পৃথিবীতে যতটা সময় আমার বরাদ্দে ছিল।

আমার সময়ে সব পথেরই শেষ হত
কোন-না-কোন গাড্ডায়।
আমার কথাই আমাকে চিনিয়ে দিয়েছে
আততায়ীদের নিকট,
চাইলেও একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
শুধু এটুকু জানতাম, আমাকে সরিয়ে দিলে
যারা ক্ষমতায়, তারা আরো নিরাপদে থাকবে—
সবকিছুর মধ্যে কেবল এটাই ছিল আশার দিক।
এভাবেই আমার সময় আমি পার করে দিয়েছি,
পৃথিবীতে যতটা সময় আমার বরাদ্দে ছিল।

আমাদের জনবল ছিল সামান্য, আর গন্তব্য
যদিও-বা ছিল অনেক দূরে, চিনতে কষ্ট হয় নি।
এ-ও জানতাম, আমার একার পক্ষে
সেখানে পৌঁছানো হবে না।
এভাবেই আমার সময় আমি পার করে দিয়েছি,
পৃথিবীতে যতটা সময় আমার বরাদ্দে ছিল।


তোমরা
যারা মহাপ্লাবনের পরে উপরে উঠে আসবে,
যার গভীরে একদিন আমরা তলিয়ে গেছি,
তোমরা যখন আমাদের ব্যর্থতার কথা বলবে
তখন এই অন্ধকার সময়ের কথা
বলতে ভুলো না, যার গ্রাস থেকে
নিজেদের সেদিন বাঁচাতে পেরেছিলে।