রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বিদেশি বন্ধুরা (Tagore and his Foreign Friends)

বিনায়ক সেন
Tagore
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য :ব্যক্তিগত সংলাপ?

২০০৩ সালের প্যারিসে এক ক্যাফের টেবিলে বসে আছেন মুস্তাফা শেরিফ। বসন্তকালের শেষ অপরাহ্নের আলোয় উদ্ভাসিত প্যারিসের পথ-ঘাট। কিন্তু মুস্তাফা শেরিফের সেদিকে মন নেই। ইসলাম ও দর্শন নিয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি আলজেরিয়ায় খ্যাতিমান। ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাতেই অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবীদের একজন। তিনি আজ গভীরভাবে চিন্তামগ্ন। ক্যাফেটিও সাধারণ রেস্তোরাঁ নয়। প্যারিসের ইনস্টিটিউট অব অ্যারাব ওয়ার্ল্ড-এর টি-রুমে বসে মুস্তাফা শেরিফ বিশেষ একজনের প্রতীক্ষা করছেন। তিনি জাঁক দেরিদাঁ, তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীর সেরা দার্শনিক-চিন্তাবিদদের একজন দেরিদাঁ। কিন্তু নতুনত্ব রয়েছে তার আজকের আগমনে। দেরিদাঁ ও মুস্তাফা শেরিফ আজ আলাপ করবেন সভ্যতার সংঘাত ও সংলাপ নিয়ে। বিশেষত ‘ইসলাম ও পাশ্চাত্য’ এ দুইয়ের মধ্যকার সভ্যতা-সম্পর্কিত সম্পর্ক নিয়ে। শেষ পর্যন্ত তারা উভয়েই মানছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বলতে যে একরৈখিক ধারণা দেওয়া হয়, তা ঠিক নয়। প্রাচ্যও বিভিন্ন, পাশ্চাত্যও বিভিন্ন। এই বিভিন্ন প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘাত যেমন রয়েছে, ঐক্যের যোগসূত্রও রয়েছে। সক্রাতিসের ‘নিজেকে জানো’ উক্তি মেনে আজ প্রাচ্যকে যেমন তার বিভিন্নতাকে বুঝতে হবে, পাশ্চাত্যকেও তেমনি নিজের ভেতরের ভিন্নতাকে নতুন করে জানতে হবে। আন্তঃসভ্যতার সংলাপের এই আহ্বান জানানোর মাস কয়েকের মধ্যেই ক্যান্সারে মারা যাবেন দেরিদাঁ।

দেরিদাঁ-মুস্তাফা শেরিফের আলোচনা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত। নিজেদের বুঝ পরিষ্কার করার জন্যই। কিন্তু তারা সংলাপের যে কথা সেদিন তুলেছিলেন, তা একেবারে নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত অর্থে দার্শনিক ছিলেন না হয়তো, কিন্তু সভ্যতার সংঘাত ও সংলাপ এ বিষয়ে বিস্ময়কর অভিনিবেশ ছিল তাঁর। তার চিহ্ন পাই একেবারে লেখক জীবনের গোড়ার দিকের লেখাগুলোতেই। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ত্রিশের দিকে। ১৮৯১ সালে ‘প্রাচ্য সমাজ’ প্রবন্ধে সৈয়দ আমির আলির প্রবন্ধের সূত্র ধরে ‘পাশ্চাত্য ও ইসলাম’ নিয়ে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ টেনে আনছেন, যা দেরিদাঁ-শেরিফ সংলাপের কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনো এক ইংরেজ মহিলা ‘মুসলমান স্ত্রীলোকদের দুরবস্থা বর্ণনা করিয়া নাইনটিন্থ সেঞ্চুরিতে যে প্রবন্ধ লিখিয়াছেন’ তার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে অনগ্রসরতার কারণ ‘ধর্মে নহে, জ্ঞানবিদ্যা সভ্যতার অভাবে।’ ইউরোপও এক সময় অনগ্রসর ছিল। ইউরোপেও নারীরা অত্যাচারিত ছিলেন, খ্রিস্টধর্মের উপস্থিতি তাতে পরিবর্তন আনতে পারেনি। ইউরোপে ‘তখন কোনো উচ্চ অঙ্গের ধর্মানুষ্ঠানে স্ত্রীলোকের অধিকার ছিল না। জনসমাজে মিশিতে, প্রকাশ্যে বাহির হইতে, কোনো ভোজে বা উৎসবে গমন করিতে তাহাদের কঠিন নিষেধ ছিল।… খ্রিস্টধর্মবৎসল জুস্টিনিয়নের অধিকারকালে কনস্টান্টিনোপলের রাজপথ স্ত্রীলোকদের প্রতি কী নিদারুণ অত্যাচারের দৃশ্যস্থল ছিল।’ তারপর রবীন্দ্রনাথ ইসলামের আবির্ভাব সম্পর্কে সুচিন্তিত মন্তব্য করলেন। আজকের যুগের জন্য প্রাসঙ্গিক বিধায় পুরো উদৃব্দতিটি শোনা দরকার:
‘এমন সময়ে মহম্মদের আবির্ভাব হইল। মর্ত্যলোকে স্বর্গরাজ্যের আসন্ন আগমন প্রচার করিয়া লোকসমাজে একটা হুলস্থূল বাধাইয়া দেওয়া তাহার উদ্দেশ্য ছিল না। সে সময়ে আরব-সমাজে যে উচ্ছৃংখলতা ছিল তাহাই যথাসম্ভব সংযত করিতে তিনি মনোনিবেশ করিলেন। পূর্বে বহুবিবাহ, দাসীসংসর্গ ও যথেচ্ছ স্ত্রী পরিত্যাগে কোনো বাধা ছিল না; তিনি তাহার সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়া স্ত্রীলোককে অপেক্ষাকৃত মান্যপদবীতে আরোহণ করিলেন। তিনি বারবার বলিয়াছেন, স্ত্রীবর্জন ঈশ্বরের চক্ষে নিতান্ত অপ্রিয় কার্য। কিন্তু এ-প্রথা সমূলে উৎপাটিত করা কাহারও সাধ্যায়ত্ত ছিল না। এইজন্য তিনি স্ত্রীবর্জন একেবারে নিষেধ না করিয়া অনেকগুলি গুরুতর বাধার সৃষ্টি করিলেন।… কতকগুলি পরিবর্তন সাধন করিয়া সমাজকে পথনির্দেশ করিয়াছিলেন। তবু সমাজ সেইখানেই থামিয়া রহিল। কিন্তু সে-দোষ মুসলমান ধর্মের নহে, সে কেবল জ্ঞান বিদ্যা সভ্যতার অভাব।’

এই দীর্ঘ উদৃব্দতির পেছনে রবীন্দ্রনাথের উদ্বেগের জায়গা কোথায় তা পরিষ্কার। তিনি চাচ্ছেন যে ইসলাম সম্পর্কে ইউরোপীয় মতই চূড়ান্ত নয় তা স্বপ্রমাণিত করতে। অন্ধকার সব সভ্যতার ভেতরেই আছে, প্রয়োজন হচ্ছে সংঘাতের মুহূর্তগুলো এড়িয়ে সংলাপের ও ঐক্যের মুহূর্তগুলোর ওপরে জোর দেওয়া। এ কাজটি তিনি বিশেষভাবে শুরু করেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরবর্তী পর্বে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রোধের আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার পর থেকে রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এই বিচ্ছিন্নতার পর্ব তাঁকে নানা দিক থেকে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিল। তাঁর দেশের মানুষের উন্নতি কোন পথে এ নিয়ে দুর্ভাবনা হচ্ছিল কবির। সে লক্ষ্যে আধুনিকতার ধারণাকে পুনর্নির্মাণ করতে চাইছিলেন তিনি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মধ্যে নিরন্তর ও অর্থবহ সংলাপ ছাড়া এই আধুনিকতার পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয় এটা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল তরুণ বয়সেই। কিন্তু ধন্দ দেখা দিয়েছিল প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে। উনিশ শতকের রেনেসাঁর চিন্তকদের মতো তিনি ফিরতে রাজি ছিলেন না ভারতীয় প্রাচ্যের ‘প্রাচীন মৌলিকত্বে’। শাস্ত্রের অনুশাসনে বিধির তুলনায় নিষেধেরই বেড়া বেশি করে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। তা ছাড়া, উনিশ শতকের রেনেসাঁর চিন্তকেরা ‘প্রাচ্য’ বলতে শুধু স্বজাতীয় প্রাচ্যকেই বোঝাতেন। যেমন, হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা রেনেসাঁর আকর-উৎস বলতে বোঝাতেন বেদ-উপনিষদ-পুরাণ-কাব্য চতুষ্টয়কে। মুসলিম বুদ্ধিজীবীরাও প্রায় অবিকল মনোজগতের পথে বারে বারে ফিরে যেতেন ধর্মীয়-পুরাণ অনুষঙ্গে ও উৎসে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা তো আরও বেশি করে স্বজাতীয় প্রাচ্যের চর্চা করতেন। প্রাচ্য যে বিভিন্ন ধারার, এবং তার মধ্যে যে বহুমাত্রিকতা রয়েছে, বহু সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের প্রকাশ রয়েছে, সেটা সুদূর লাতিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে দক্ষিণ এশীয় ও দূরপ্রাচ্য অবধি বিস্তৃত ভূপ্রকৃতি ও বিচিত্রবিধ সমাজ-সংস্কৃতি থেকে বেশ বোঝা যায়। তবে এদেশে রবীন্দ্রনাথই প্রথম এ কথা মর্মে-মর্মে ধারণ করেছিলেন এবং নানাভাবে নিজের দেশে ও বিদেশে গিয়ে সে কথা অন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। আমি সন্দেহ করি, তাঁর বিশ্ব-পর্যটনের যতিহীন প্রয়াসের পেছনে ছিল পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশের বিভিন্ন ধারাকে প্রত্যক্ষে জানা-বোঝার তাগিদ। এজন্যেই কবি গিয়েছিলেন বিলেত-আমেরিকার বাইরে জাপানে, চীন দেশে, জাভায়, সিংহল দ্বীপে, মরুতীর্থে মধ্যপ্রাচ্যে তথা আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, মিসরে, এমনকি সুদূর লাতিন আমেরিকায়। কেন এই চরৈবেতি চড়ূয়া স্বভাব? অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা এসব পরিব্রাজকের মতোই যেন বিশ্ব-পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন কবি। তবে পরিব্রাজনার পেছনে প্রবল ব্যক্তিগত উৎসাহের কারণ নিহিত ছিল অন্যত্র প্রাচ্যীয় বিভিন্নতাকে স্বচক্ষে সপ্রমাণিত করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নিজের জীবন-চর্চা, বিশ্বাস ও রচনাকর্মের মধ্য দিয়ে।

শুধু প্রাচ্য নয়, পাশ্চাত্যও তো বিভিন্ন। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সমীকরণের প্রাচ্য-অংশটি যেমনটা একরূপ নয়, পাশ্চাত্য-অংশটিও তেমনি নানা ধারা, ছক ও স্বভাবের। যে পাশ্চাত্য অনবরত প্রাচ্যকে বশীভূত করে শাসন-শোষণ করতে চায় সেটি এক ধরনের। যে পাশ্চাত্য আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার মাধ্যমে মানব সভ্যতায় অবদান রাখছে সেটি অন্য ধরনের। এ কথাও রবীন্দ্রনাথের সটান উপলব্ধিতে ধরা পড়েছিল। তাঁর ‘ছোট ইংরেজ ও বড় ইংরেজ’ লেখাটি এ রকম চেতনা থেকেই উৎসারিত। তা ছাড়া, পাশ্চাত্য নিজেদের মধ্যেও অনবরত পায়ে লাগিয়ে ঝগড়া বাধাতে পারদর্শী তার বিগত পাঁচশো বছরের ইতিহাস সে কথাই বলে (এমনটা যখন রবীন্দ্রনাথ ভাবছেন তখনও প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু হয়নি)। তার উপর রয়েছে পশ্চিম ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপের সংস্কৃতিগত ব্যবধান। যেমন রয়েছে ফারাক ইউরোপ ও আমেরিকার ভেতরে। ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এই দুইয়ের মধ্যকার সংলাপকে অনায়াস বাহাস বলে মনে করা কঠিন। কোন ‘প্রাচ্যের’ সাথে কোন ‘পাশ্চাত্যের’ সংলাপের কথা হচ্ছে? সাম্রাজ্য মদমত্ত পাশ্চাত্যের সাথে আত্ম-সংহারী জাতিবিভেদী প্রাচ্যের সাথে সংলাপে তো কবির উৎসাহ থাকার কথা নয়। তা ছাড়া, পাশ্চাত্যের কাছ থেকে কিছু দান হাত পেতে নেওয়ার পাশাপাশি এটাও তো ভাবতে হবে, পাশ্চাত্যকে দেওয়ার মতো আদরণীয় কিছু আদৌ প্রাচ্যের আছে কিনা? নইলে যে একতরফা বিনিময়ই চলতে থাকবে, আর একতরফা বিনিময় কেবল চলতে পারে পরাধীন সত্তার ক্ষেত্রেই। সকল মানব জাতির না করে প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য কেউ কি পরস্পরের কাছ থেকে কিছু নিতে বা পরস্পরকে কিছু দিতে সক্ষম? এসব ভাবনা রবীন্দ্রনাথের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ১৯১০-৩০ পর্বের নানা লেখায় এসব প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসবে কখনও জাতীয়তাবাদের সমালোচনায়, কখনও সাম্রাজ্য ও যুদ্ধের প্রসঙ্গে, কখনও ধন-বৈষম্য, কখনও জাতি-বৈষম্য, কখনও কলের সভ্যতার বিশ্লেষণে। রাজনীতি, ধর্ম, সভ্যতা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানব-কল্যাণের পরিণতি নিয়ে এসব উদ্বেগ তাঁর শিল্প-সাহিত্য চর্চায় অনবরত ঢুকে পড়তে থাকবে। এরই মধ্য দিয়ে কবি শিলাইদহ ও শান্তিনিকেতনের আশ্রমের ছায়া পেরিয়ে হয়ে উঠবেন বিশ্বের বিবেকবান বুদ্ধিজীবীদের একজন।

কিন্তু এই পালাবদলের বিবরণী অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি কবির বিদেশি বন্ধুদের মনোযোগের বাইরে রাখি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মধ্যকার সংলাপে সমীকরণ খোঁজার চেষ্টা শুধু ব্যক্তি-রবীন্দ্রনাথে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সংলাপটি কবির সচেতন উদ্যোগে ও তাগিদে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর কাছের ও দূরের বলয়ে। স্বদেশের সহচরেরা যেমন; এই সংলাপের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন বিদেশি পথিকেরাও। এর পূর্ণ ইতিহাস এখনও জানা হয়নি আমাদের। কিন্তু এটুকু জানা যে কবির মননশীল চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর বিদেশি বন্ধুরা, ইংরেজিতে যাকে বলে ইন্টারলকুটর বা সহ-আড্ডাধারীরা। এঁদের মধ্যে যেমন আছেন ইয়েটস-পাউন্ডের মতো কবি, আইনস্টাইনের মতো পদার্থবিদ, রাসেল-বের্গসঁ-শোয়াইটজারের মতো দার্শনিক, ওয়েলস-বার্নার্ডশ-হামসেনের মতো লেখক, ফ্রয়েড-হ্যাভলক এলিসের মতো মনোবিজ্ঞানী, বুনিন-হিমেনেথ-জিদের মতো তাঁর কবিতার নোবেলবিজয়ী অনুবাদক, এমনকি র‌্যামসে ম্যাকডোনাল্ড ও উড্র উইলসনের মতো রাজনীতিক। এই সংলাপে পরোক্ষভাবে ঘটনা-পরম্পরায় যুক্ত হয়েছেন রাইনের মারিয়া রিল্কে, ফেদেরিকো লোর্কা, লুই বনুয়েল, বরিস পাস্তেরনাক, আন্না আখমাতভা ও পাবলো নেরুদা, যারা সরাসরি কবির সানিনধ্যে আসেননি, কিন্তু বহন করেছেন তাঁর গান, কবিতা বা গদ্য-ভাবনার বীজ। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ অনেকটা স্বউদ্যোগে নিজ হাতেই যেন সম্পন্ন করেছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার মহাজাতি বৈঠকের। আবার এসবের মধ্য দিয়েই পদ্মা-পারের কবি হয়ে উঠছিলেন এক বিশ্ব-ব্যক্তিত্ব; স্থান করে নিচ্ছিলেন বিশ্ব-কবির সারিতে। অবশ্যই এই মহা-সংলাপ হয়েছিল তাঁর পছন্দের প্রাচ্য ও পছন্দের পাশ্চাত্যের ধারার মধ্যে। এই বৈঠকের ভাষা দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক বা সাহিত্যিক ভাব বিনিময়ের হলেও এর প্রেরণা বহুত্ববাদী, একান্তভাবেই জাতীয়তাবাদের বাইরের ভুবনের। সে কথা ম্যানিফেস্টোর মতো কবি ১৯১৭ সালের ‘ন্যাশনালিজম’ বক্তৃতামালায় সবিস্তারে তুলে ধরছেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমদর্শী সমালোচনায়। ১৯৯১ সালে ন্যাশনালিজম গ্রন্থের ভূমিকায় ইংরেজ দার্শনিক ই.পি. থমসন তাঁকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সেটা রবীন্দ্রনাথের জানার কথা নয়। জার্মান দার্শনিক হাবেরমাস ১৯৯০-র দশকে খুঁজেছিলেন ‘পোস্ট-ন্যাশনালিজম’-এর সম্ভাবনা। সেটাও রবীন্দ্রনাথের জানার কথা নয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে তাঁর রচনা-কর্মই উত্তর-আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা ও পোস্ট-ন্যাশনালিজম ধারণার সবচেয়ে কাছাকাছি কী সেই সময়ে, কী এই সময়ে তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে, অন্তত এই ভূখণ্ডে। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর বহুত্ববাদী মনের কারণে, সেখানে নানা-প্রাচ্য ও নানা-পাশ্চাত্যের রঙে ঝিলমিল। এটা তাঁর ভিনদেশি সহ-আলাপীদের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়। এনার্কিস্ট, লিবারেল হিউম্যানিস্ট, কট্টর মার্কসিস্ট, ফেবিয়ান সোশ্যালিস্ট, থিওসফিস্ট, ওরিয়েন্টালিস্ট, ফেমিনিস্ট, লজিক্যাল পজিটিভিস্ট, খ্রিস্টীয় আদর্শবাদী, সুফী মতাবলম্বী, মার্টিন বুবেরের মতো ইহুদি আদর্শের প্রচারক, বৈদান্তিক, নাস্তিবাদী, সংশয়বাদী কে নেই রবীন্দ্রনাথের সাথে এই মহাজাতি সংলাপে! আর এই বিদেশি সভায় প্রাচ্যের হয়ে একাই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন কবি। এই সংলাপের যা কিছু ঘটেছে তার অনেকটাই ঘটেছে লোকচক্ষুর অগোচরে, দিনলিপি বা চিঠির নিভৃত পাতায়, অথবা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মধ্যে। অর্থাৎ এখনকার মতো মিডিয়ার ২৪-ঘণ্টা নজরদারির বাইরে, বলা যায় কবির একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতার কাঠামোয়। কখনও কখনও অবশ্য সেসব আলোচনা ও পত্রালাপ প্রকাশ পেয়েছে ‘মডার্ন রিভিউ’তে অথবা অনূদিত হয়েছে ‘প্রবাসী’র পাতায়। তবু এর মধ্য দিয়েই আমাদের প্রাচ্যকে বহির্বিশ্ব জানতে পেরেছে। বর্ণবাদী ওরিয়েন্টালিজমের বাইরে যে-প্রাচ্যকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গর্ব করতেন, তার সাথে বিতর্ক ও আড্ডার সুযোগ মিলেছে পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিদের। এজন্যেই কি কবির প্রাণপাত কষ্ট স্বীকার, ঘুরে বেড়ানো, দেশ থেকে দেশে (কখনও কখনও ছয় মাস-এক বছর ধরেও ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে) জাহাজে বা রেলগাড়িতে চড়ে দীর্ঘ যাত্রায়। রুশ চিত্রশিল্পী নিকোলাই রেরিখ তাঁর ‘হিমাবৎ’ (হিমালয়ের সনি্নকটে) গ্রন্থে লিখেছেন, কবির সাক্ষাৎ মেলা ভার, কেননা ‘অক্লান্ত ভাবে তিনি সারা পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’ কেন এই কষ্ট স্বীকার, সে কি কেবল ঘরের বাইরের পৃথিবীকে সম্মান জানানোরা জন্যে, নাকি জাতি হিসেবে ‘বাঙ্গালীকে’ যাতে কেউ কূপমণ্ডূক মনে করতে না পারে, সেজন্যেও? দ্বিতীয়বার আমেরিকা সফরের সময় (১৯১৬-১৭ সালে) টানা ১২১ দিনে প্রায় ৭০০০ মাইল ঘুরে ৫৭টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন কবি। সে তো নিছক খ্যাতির পেছনে দৌড়ানোর জন্যে নয়, অথবা খ্যাতির বিড়ম্বনার পার্শ্বর্-প্রতিক্রিয়াজাতও নয়। বিবেকানন্দের পর কিন্তু ভিন্ন পন্থায় ধর্মনিরপেক্ষ ভাবে প্রাচ্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন কবি মার্কিন দেশের জনসমাজের সম্মুখে এক ব্যাপক ব্যক্তিগত উদ্যোগে। মনে রাখতে হবে, অর্থবহ সংলাপ হয় সমকক্ষদের মধ্যে কেবল। সেভাবেই রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার সব সংলাপে অংশ নিয়েছেন নিজের কোনো অসম্পূর্ণতায় কুণ্ঠাবোধ করা ছাড়াই। যখন নোবেল পাননি তখনও আস্থাশীল ছিলেন নিজের সম্পর্কে। এক কথায়, বিদেশি বন্ধুদের সাথে আলাপে-সংলাপে, বিতর্কে-বাদানুবাদে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট, জ্ঞানোৎসাহী ও উদার শ্রোতা ও বক্তা উভয় ভূমিকাতেই। এর জন্যে প্রতিটি সাক্ষাৎ ও প্রতিটি চিঠির পেছনে তাঁকে যথাসাধ্য প্রস্তুতি নিতে হতো। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন বিপুল ও সর্বব্যাপী, আমাদের আজও তা বিস্মিত না করে পারে না। এরই কিছু অনুচিহ্ন নিয়ে বর্তমান লেখা।

২. তাঁর নোবেলজয়ী অনুবাদকেরা

বিদেশি বন্ধুদের সারিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে চলে আসে তাঁর সৃষ্টিকর্মের অনুবাদকেরা। এখানে শুধু তাঁদেরকেই উল্লেখ করব যারা রবীন্দ্রনাথের লেখার অনুবাদকদের মধ্যে অগ্রগণ্যই ছিলেন না; পরে তাঁরা নিজেরাই পেয়েছিলেন নোবেল পুরস্কার। তার মানে এই নয় যে, নোবেল যারা পাননি তাঁরা ছিলেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সংলাপের বাইরে। টলস্টয় রবীন্দ্রনাথকে চিনতেন না ঠিকই, কিন্তু কবি তাঁর লেখার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন। টলস্টয়ের ‘আন্না কারেনিনা’ তাঁর তেমন ভালো লাগেনি, তবে টলস্টয়ের আদর্শে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নানা লেখার মধ্যে (বিশেষ করে স্বদেশী-সমাজ পর্বের লেখাগুলোয়) টলস্টয়ের সযত্ন উল্লেখ রয়েছে। টলস্টয়ের মতো রাইনের মারিয়া রিল্কেরও রবীন্দ্রনাথের সাথে সরাসরি কখনও দেখা হয়নি। রিল্কে রাশিয়ায় ছিলেন একটা সময়ে ও রুশ ভাষা ভালো জানতেন; কাব্য-বিষয়ে পাস্তেরনাক-সিভেতায়েভার সাথে বিখ্যাত পত্রালাপ রয়েছে তাঁর। এটা আমরা ভুলে যাই কী করে যে, জার্মান ভাষায় গীতাঞ্জলি অনুবাদের জন্য রিল্কেকেই প্রথমে অনুরোধ করা হয়েছিল প্রকাশকের পক্ষ থেকে। নোবেল প্রাপ্তির আগেই রবীন্দ্রনাথের কথা শুনেছিলেন তিনি তার বন্ধু ওলন্দাজ কবি ভন আদেনের কাছে। ১৯১৪ সালে যখন আদ্রে জিদের করা গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদ বার হলো তখন সে অনুবাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে রিল্কে নিজে থেকে জার্মান প্রকাশক কুর্ট উয়োলফ্কে চিঠি লিখেছেন। এ বইয়ের দ্রুতই জার্মান অনুবাদ বের হওয়া দরকার এই ছিল রিল্কের মত। চিঠিটা পেয়ে উয়োলফ বরং রিল্কেকেই অনুরোধ করেন অনুবাদ-কর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্যে। কিন্তু রিল্কের তখন চলছে প্রেরণার সংকট। ডুইনো এলিজি অর্ধ-সমাপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে, লেখা আপাতত বেরুচ্ছে না। গীতাঞ্জলির অনুবাদ-কর্মে হাত দিতে হলে অন্য সব কাজ পিছিয়ে যাবে এই আশঙ্কার পাশাপাশি একটি কেজো যুক্তিও দেখিয়েছিলেন তিনি। অনুবাদ যেহেতু করতে হবে ইংরেজি থেকেই, আর ফরাসি ও রুশ ভাষায় অনায়াস দখল সত্ত্বেও ইংরেজি তাঁর তেমন আয়ত্তে নেই। ফলে সুবিচার করা হবে না লেখাগুলোর প্রতি। ‘আমি নিজের ভিতরে এই কাজটা করার জন্য অনিবার্য আহ্বান শুনতে পাচ্ছি না আর একমাত্র তা থেকেই একটা নিশ্চিতভাবে ভালো কাজ জন্ম নিতে পারে।’ এভাবেই গীতাঞ্জলির অনুবাদ-কর্মের শ্রমসাধ্য কাজটিকে দায়সারাভাবে না দেখে সৃষ্টিশীল গুরুত্বের সাথে দেখেছেন তিনি। অবশ্য এ চিঠির কয়েক বছর বাদে ১৯২১ সালেই জার্মানিতে রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি ৮ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। এ কাজটি করেছিলেন হেলেন মেয়ার-ফ্রাঙ্ক ও তাঁর স্বামী দার্শনিক ভাষা-তাত্তিবক হাইনরিশ মেয়ার-বেনফি। কোনো বিদেশি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রচনাবলির প্রকাশ এই প্রথম। ইংরেজিতে তিরিশের দশকের শেষেই সিলেক্টেড ওয়ার্কস বেরিয়েছিল কেবল, রুশ ভাষায় আরও পরে, পঞ্চাশের দশকে।

গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদের সাথে আঁদ্রে জিদ কী করে জড়িত হলেন, সে গল্পও কৌতূহলোদ্দীপক। সাঁ জ পার্স ফরাসি লেখক, নোবেল পুরস্কার পান ১৯৬০ সালে, জীবনের শেষ তিন দশকে কাটিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আর জিদ নোবেল পান ১৯৪৭ সালে। গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদের সাথে দু’জনেই জড়িত ছিলেন :পার্স পরোক্ষভাবে, জিদ প্রত্যক্ষভাবে। ১৯১২ সালে ইয়েটস-এর ভূমিকা সংবলিত গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ বের হওয়ার সাথে সাথে তা কেবল ইংল্যান্ডে নয়; ইউরোপের সমগ্র সারস্বত সমাজেরই দৃষ্টি কেড়েছিল। পার্সের বয়স তখন ২৫, লেখক-জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সংগ্রাম করছেন। আর জিদের বয়স তখন ৪৩, ইতিমধ্যেই ফরাসি সাহিত্যাকাশে দেদীপ্যমান। পত্রিকায় গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ পড়ে পার্স উচ্ছ্বসিত হয়ে জিদকে সে কথা জানান। শুধু তা-ই নয়, কবির সাথে উদ্যোগী হয়ে দেখা করেন লন্ডনে এবং গ্রন্থটির ফরাসি অনুবাদের জন্য জিদকেই মনোনীত করতে অনুরোধ করে যান। কেন গীতাঞ্জলির সুর পার্স ও জিদ উভয়কেই এত টেনেছিল সেটা এক চিত্তাকর্ষক আলোচনার বিষয় হতে পারে। কেননা, জিদ গোড়া থেকেই অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ধারার লেখক, সেটা প্রচলিত নীতিবোধ বা ধর্মবিশ্বাসকে সমালোচনা করার ক্ষেত্রে যেমন দেখা গেছে, তেমনি পরে স্তালিন পন্থাকে তীব্র ভর্ৎসনা করার বেলাতেও সুস্পষ্ট। গীতাঞ্জলির মরমি ভাবাদর্শের প্রতি তাঁর বরং নির্লিপ্তিই থাকার কথা। তারপরও আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে তিনি যা বলেছিলেন তা হলো, এর সহজ সরাসরি উচ্চারণ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এ কাব্যের বক্তব্যকে বোঝার জন্য কোনো অভিধানের প্রয়োজন নেই বা কোনো ভারতীয় পুরাণ বা শাস্ত্রের সাথে পূর্ব-পরিচয়ের দরকার নেই। এতটাই পাঠক-বন্ধু রচনা এটি। অন্যদিকে, পার্স তরুণ বয়স থেকেই অধুনাপন্থি, আভোগার্দ যাকে বলে, পরে নাজিবাদবিরোধী বুদ্ধিজীবী হিসেবে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। হয়তো ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতা থেকে এই মিতবাক ছোট ছোট কবিতা ছিল সম্পূর্ণই ভিন্ন স্বাদ ও ঘরানার। ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন হিসেবে কল্পনা করা ছাড়াও একে দিব্যি মানবীয় প্রেরণায় পড়ে ফেলা যায়। গীতাঞ্জলির এটি একটি বড় গুণ। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ সে রকম সরল সত্যের আহ্বান হয়তো তাঁদের মনে আলোড়ন তুলে থাকবে। বিশেষ করে অবাক লাগে গীতাঞ্জলির ফরাসি অনুবাদের ভূমিকায় জিদ যখন বোদলেয়ারের সাথে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করছেন, অথবা উদাহরণ টানছেন গ্যেটের ফাউস্টের। প্রাচ্যীয় বিচ্ছুরণ তখন একান্তভাবে আর প্রাচ্যের একচেটিয়া থাকছে না, পাশ্চাত্য ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে উঠছে। বা অন্যভাবে বললে, বোদলেয়ার. গ্যেটে বা জিদ নিজেও প্রাচ্যীয় অনুষঙ্গের অন্তর্লীন মুহূর্ত হয়ে উঠছেন। ‘আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা’ এই উন্মাতাল আলো কি কেবল উপনিষদের? বা একে বৈষ্ণব দর্শনের সারাৎসারও বলে মনে করেননি জিদ। বরং এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন মানবীয় ভালোবাসারই দর্শন, যেখানে শাস্ত্রীয় ধর্ম নেই, বরং ভালোবাসাই সেখানে পরম ধর্ম হয়ে আছে। গীতাঞ্জলির এই ব্যাখ্যা জিদের জীবন-দর্শন দ্বারা স্পষ্টতই প্রভাবিত। কবির ‘জীবনদেবতার’ স্বীকৃতি নেই এতে।

গীতাঞ্জলির জিদ-কৃত ভূমিকায় প্রাচ্য-বিষয়ক আরেকটি বহুল-উদৃব্দত অভিযোগের অপনোদন করা হয়েছে। প্রাচ্যীয় শাস্ত্র-সাহিত্যাদি অর্থহীন; এর সমগ্র সম্ভারও ইউরোপের এক তাক বইয়ের চেয়ে মূল্যবান নয় এ রকম একটি আপ্তবাক্যের তিরস্কার ম্যাকলের কলম থেকে ১৮৩০’র দশকে নিঃসৃত হয়েছিল। তার পর থেকেই এক ধরনের হীনম্মন্যতা প্রাচ্যদেশকে তাড়া করে ফিরেছে। জিদ কিন্তু তা বলছেন না। প্রথমত, তিনি বলছেন যে গীতাঞ্জলির সহজ উচ্চারণ তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে। কেননা, ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থরাজি তাঁর পড়া নেই, এবং অনন্তকাল হাতে পেলেও তা পড়ে শেষ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাচ্যের ভাবনার মাঝে কেবল দেবত্ববাদ নয়, সেখানে সংশয়বাদও খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, ‘বহুদেববাদ আসলে প্রকৃত সত্য নয়’। কেননা, অমন যে আকর-গ্রন্থ ঋগ্গ্বেদ সেখানেও বলা হচ্ছে :’এসব তত্ত্ব কে জানে? কে-ই বা এসব নিয়ে কথা বলতে পারে? কোথা থেকে আসে প্রাণী? এই সৃষ্টিই বা কী? এর সামনে দেবতাদেরও বামনের মতো দেখায় কীভাবে এর আরম্ভ হয়েছিল তা কার জানা আছে?’ গীতাঞ্জলি, জিদের চোখে, এ রকমই মুক্ত প্রেরণায় রচিত এবং এই বোধ আধুনিক কাব্যকলারই লক্ষণ।

দেখা যাচ্ছে, ফরাসি দেশেই গীতাঞ্জলির ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-কর্মের (ইংল্যান্ডের চেয়েও আমি বলব) উচ্চ মূল্যায়ন হয়েছিল বেশি করে। সেটি শুধু জিদের স্থিতধী মূল্যায়নেই প্রকাশ পায়নি। ১৯১৫ সালে রোমাঁ রোলাঁ নোবেল পুরস্কার পান (পুরস্কারটা হাতে পান ১৯১৬ সালে)। রোলাঁ যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে আপন করে নিয়েছেন সেরকম উৎসাহ ইংল্যান্ডে ক্রমশ দুষ্প্র্রাপ্য হয়ে উঠছিল। রোলাঁর সাথে গান্ধীর যেমন, যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ পত্রালাপ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ৭০ বছর পূর্তিতে ‘গোল্ডেন বুক অব টেগোর’ সংকলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রোলাঁই। প্রথম মহাযুদ্ধের পটভূমিতে ইউরোপ ও এশিয়ার লেখক-শিল্পীদের প্যাসিফিস্ট অবস্থানে একত্রিত করা নিয়ে এঁদের মধ্যে সহমত ছিল। প্রাচ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়ূক, আর পাশ্চাত্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নৈতিক ভিত্তি লাভ করুক এই ছিল রোলাঁর মত। পরে ফ্যাসিবাদবিরোধী জোরালো অবস্থানে যাতে কবি দৃঢ় থাকেন (বিশেষত ১৯২৬ সালে মুসোলিনির ইতালি ভ্রমণের পর) সেক্ষেত্রে রোলাঁ বিশেষভাবে সজাগ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। তবে রোলাঁ বা আঁরি বারবুসের মতো শান্তি-আন্দোলনের নেতারাই নন; বৃহত্তর ফরাসি সারস্বত সমাজে রবীন্দ্রনাথের স্থান ছিল সাধারণভাবেই খুব উঁচুতে। এক্ষেত্রে পল ভ্যালেরির উদাহরণ টানা যায়।

ফরাসি প্রতীকবাদী আন্দোলনের পুরোধা কবি ভ্যালেরির প্রভাব আধুনিক কবিতার ওপরে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। আধুনিক বাংলা কবিতাও এর ব্যতিক্রম নয়। বুদ্ধদেব বসু ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত উভয়েই ভ্যালেরির কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। এহেন ভ্যালেরি রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনীতে এসে কবির সাথে পরিচিত হয়ে একেবারে বিমোহিত হয়ে গেলেন। ১৯৩০ সালে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্রকর্মের এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। এই কাজটি করার জন্য সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে এসেছিলেন তিনি। মূল প্রদর্শনীর আগে এক প্রাক্-প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল এবং তাতেই নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন ভ্যালেরি। তিনি কবির আঁকা মূর্ত-বিমূর্ত ধারার ছবিগুলো দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে, এসব ছবির প্রদর্শনী এ কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে তাতে ফরাসি চিত্রকরদের জন্যে তা ‘এক শিক্ষণীয় বিষয় হবে’। প্রাচ্যের চিত্রকলা মানেই মুঘল মিনিয়েচার বা বাংলার সনাতনী পট-চিত্র, রবীন্দ্রনাথ এ ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। অবচেতনের অস্বচ্ছ আবহে থেকে থেকে ঝিলিক দিচ্ছে মূর্ত অবয়ব, সে-ও মনের অন্ধকার আলোয় ঘেরাটোপে আঁকা, যেন অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমের অন্য বিচ্ছুরণ। ইউরোপে এক্সপ্রেশনিজম সবে শুরু হয়েছে, পল ক্লি জার্মানিতে এর নেতৃত্বে, ফ্রান্সে তখনও ততটা ছড়িয়ে পড়েনি, তারই মধ্যে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রদর্শনী। এর তাৎপর্য এই আন্দোলনের অন্যতম তাত্তি্বক ভ্যালেরির প্রখর দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। কিন্তু আরও একটি কারণে অভিভূত হয়েছিলেন ভ্যালেরি। গীতাঞ্জলির শান্ত-সৌম্য চেহারার সন্ত কবি সর্বাধুনিক এক্সপ্রেশনিজমের মূর্ত-বিমূর্ত চিত্রকলার মাধ্যমে নিজেকে পুনরায় প্রকাশিত করছেন, সেটি তাঁকে কিছুটা বিস্মিত না করে পারেনি। কিন্তু প্রধান কারণ ছিল অন্যত্র। ভ্যালেরির সাথে সাক্ষাৎকালে কবি অনর্গল বলতে থাকলেন ভারতবর্ষের দুঃসহ পরিস্থিতির কথা (ততদিনে ১৯২৮ সালের মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা হয়ে গেছে; দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক ধর-পাকড়)। আর বললেন প্রথম মহাযুদ্ধে নিহত ‘দশ লক্ষ ভারতীয় সৈন্যের’ কথা, যাদের ফ্রান্সের মাটিতে কবর দেয়া হয়েছে, অথচ কোনো স্মৃতিসৌধ গড়া হয়নি তাদের নামে। কবির বক্তব্য ছিল, ‘ফ্রান্সের কাছে এতখানি নিষ্ঠুরতা তিনি আশা করেননি।’ দেখা গেছে, যুদ্ধ ও শাান্তির প্রশ্নে ১৯৩০ সালেও এসে কবি আবেগে আলোড়িত হয়ে উঠছেন, যেমনটা হয়েছেন ১৯১৭ সালে ন্যাশনালিজম বক্তৃতামালায়। এই সাক্ষাৎকারে ভ্যালেরি অভিভূত হয়েছিলেন, সে কথা ওকাম্পো তাঁর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক বইয়ে আমাদের জানিয়েছেন।

ভ্যালেরি অবশ্য নোবেল পুরস্কার পাননি, যেমন মেলেনি লরেন্স, জয়েস বা পাউন্ডের ভাগ্যে। কিন্তু ইভান বুনিন পেয়েছিলেন ১৯৩৩ সালে। রুশিদের মধ্যে সাহিত্যে তিনিই প্রথম এ পুরস্কার পান। গীতাঞ্জলির নোবেল অনুবাদকদের মধ্যে ইংরেজিতে যেমন ছিলেন ইয়েটস, ফরাসিতে জিদ, আর রুশ ভাষায় বুনিন ও পাস্তেরনাক (আখমাতভাও রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছিলেন, তবে ১৯৬৪ সালে তিনি নোবেল তালিকায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়ে হয়ে হয়নি)। ১৯১৮ সালে গীতাঞ্জলির রুশ সংকলন প্রকাশ পায় বুনিনের সম্পাদনায়। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার পরে রুশ ভাষাতেই গীতাঞ্জলির অনুবাদ হয়। তবে মূল গ্রন্থটি হাতের কাছে না থাকায় এ কথা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না বইটির পুরোটা তাঁরই অনুবাদ কিনা, নাকি অন্য রুশি অনুবাদকরাও (যেমন টলস্টয়-পুত্র ইলিয়া টলস্টয়) তাতে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯১৮ সালের সংস্করণটি মনে হচ্ছে পুশেনিনকভের প্রচেষ্টায় অনূদিত হয়েছিল, তবে সার্বিক সম্পাদনা ছিল ইভান বুনিনের। সেই অনুবাদে বুনিন কতটা হস্তক্ষেপ করেছিলেন, ইয়েটস্-এর মতো কোনো কোনো কবিতা নিজেই ঘষা-মাজা করার চেষ্টা করেছিলেন কিনা, তা জানার সহজ উপায় নেই। বুনিনের সাথে রবীন্দ্রনাথের কখনও সাক্ষাৎকার হয়নি, যদিও সেটা অনায়াসে হতে পারত। বুনিন অক্টোবর বিপ্লবের পর প্যারিসে চলে যান এবং সেখানে বসেই রুশ বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারকাজে সক্রিয় অংশ নেন। তবে বুনিন কবির কাছে একেবারে অপরিচিত নাম ছিলেন না। প্যারিস প্রবাসী রুশ বুদ্ধিজীবীদের গ্রুপ ১৯২৩ সালে কোলকাতায় কবিকে চিঠি লিখে অর্থ সংগ্রহের জন্য অনুরোধ জানায়। উদ্দেশ্য অক্টোবর বিপ্লবের কারণে বিতাড়িত ভিন্নমতের রুশ বুদ্ধিজীবীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। এই অনুরোধ আসে মধ্যযুগের ইতিহাসবিদ ও অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ভিনোগ্রাদভের তরফ থেকে, যার চিঠিতে প্যারিস প্রবাসী গ্রুপ ও বুনিনের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া ভ্রমণের আগে থেকেই রুশ অক্টোবর বিপ্লব সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণভাবে উৎসাহী ও জিজ্ঞাসু ছিলেন। ইংরেজদের সমস্ত (অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত) প্রচারণা সত্ত্বেও তিনি রাশিয়ার ও রুশ বিপ্লবের বিরোধী দলে নাম লেখাতে চাননি। কয়েক বার ব্যর্থ চেষ্টার পর ১৯৩০ সালে তিনি স্বচক্ষে বিপ্লব-উত্তর কর্মকাণ্ড দেখার জন্য রাশিয়ায় যান। ‘রাশিয়ার চিঠি’তে সে ভ্রমণের বৃত্তান্ত রয়েছে। কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বইটির সুর ছিল রাশিয়ার সংস্কার প্রসঙ্গে অনেকটাই প্রশংসাবাচক। এতে প্যারিস প্রবাসী ভিন্নমতের বুদ্ধিজীবীরা (যার মধ্যে বুনিনও ছিলেন) কবির প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে থাকবেন। গীতাঞ্জলি অনুবাদের পর রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে বুনিনের নিস্তব্ধতা এর থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। রবীন্দ্রনাথের তরফেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে কোনো তাগিদ লক্ষ্য করা যায়নি। কবির রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল যে, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মোকাবেলায় কিছু ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও সোভিয়েতের আন্তর্জাতিক অবস্থান মোটের উপর প্রাচ্যের জন্য কল্যাণকর ও বিশ্ব-শান্তির সহায়ক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবির এই অবস্থানে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পাস্তারনাক রবীন্দ্রনাথে আকৃষ্ট হয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। ১৯৩৬ সালে গোর্কির মৃত্যুর পরে পাস্তেরনাকই ছিলেন সোভিয়েত লেখক সংঘ রাইটার্স ইউনিয়নের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু মিখাইল বুলগাকভের মতো তিনিও অবস্থার শিকারে পরিণত হন। স্তালিনের সুনজরে থাকার কারণে দুজনে প্রাণে বেঁচে যান ঠিকই, কিন্তু স্বাধীন চিন্তার লেখা থেকে সরে আসতে হয় এঁদের। বুলগাকভ নিমজ্জিত হন মস্কো আর্ট থিয়েটারে, আর পাস্তেরনাক নিয়োজিত হন অনুবাদ-কর্মে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৫৩ সাল (স্তালিনের মৃত্যু হয় যে বছর) অবধি পাস্তেরনাক শুধু অনুবাদের কাজই নিষ্ঠার সাথে করে গেছেন। শেকসপিয়র রচনাবলির রুশ অনুবাদ তাঁরই দক্ষ হাতে সুসম্পাদিত হয়। অনুবাদের ধারাবাহিকতায় এক সময় তাঁর চোখে পড়ে রবীন্দ্রনাথের রচনাকর্ম। এর পেছনে পাস্তেরনাকের প্রেমিকা কবি ওলগা ইভিনস্কায়ার (ড. জিভাগো উপন্যাসের লারার চরিত্র তাঁরই আদলে গড়া) বড় অবদান ছিল। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা তিনিই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। এ বিষয়ে ওলগা লিখেছেন, পাস্তেরনাক পেরেডেলকিনোয় একবার এলে তিনি রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি কবিতা ‘শেষ লেখার’ অন্তর্ভুক্ত, যেটি শুরু হয়েছে ‘ঘণ্টা বাজে দূরে’ লাইনটি দিয়ে। অনুবাদটি শুনে পাস্তেরনাকের চোখে জল এসে গিয়েছিল। এখানে ছোট্ট একটা তথ্যগত ত্রুটি শুধরে রাখি। পাস্তেরনাকের জীবনীকার ক্রিস্টোফার বার্নস লিখেছেন, ১৯৩০-এর দিকে পাস্তেরনাক রাশিয়ার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনোমতেই পাসপোর্ট নাকি জোগাড় করা যাচ্ছিল না। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন মস্কো যান তখন তাকে দিয়েও নাকি চেষ্টা নেয়া হয়েছিল রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানোর, যাতে পাস্তেরনাকের পাসপোর্টের একটা সুরাহা হয়। এটা কতটা সত্যি তা আরও যাচাই করে দেখা দরকার। পাস্তেরনাক তিরিশের দশকে বেশ কয়েক বার ‘লিটারেরি ডেলিগেশন’-এর সদস্য হয়ে রাশিয়ার বাইরে গিয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে প্যারিসে ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স কংগ্রেসে তিনি সোভিয়েত প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৩৬-৩৮ পর্বে একাধিক বার কবি ওসিপ মান্দেলস্টাম, আন্না আখমাতভা ও মারিনা সিভেতায়েভার জন্যে স্তালিনের কাছে পর্যন্ত দেন-দরবার করতে হয়েছিল তাঁকে। যাদের ওপর দিয়ে তিরিশের দশকে শুদ্ধি অভিযানের ঝড় বয়ে গিয়েছিল, পাস্তেরনাক তাদের মধ্যে ছিলেন না। বৈষয়িক কোনো কষ্টেও তাঁকে কখনও পড়তে হয়নি। তাঁর বরং কিছুটা অসুবিধে হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে, স্তালিনের মৃত্যুর পর। কিন্তু সেটা ‘ড. জিভাগো’ পর্বের কথা।

গীতাঞ্জলির স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও দক্ষ হাতের মধ্যস্থতা ঘটেছে। ইয়েটস, জিদ, বুনিন ও পাস্তেরনাকের মতোই হিমেনেথ পরে নোবেল পুরস্কার পান (১৯৫৬ সালে)। গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ বের হয় ১৯১২ সালে, ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। হিমেনেথ ও তাঁর স্ত্রী জেনোবিয়া মিলে ১৯১৩ থেকে ১৯২০-এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বাইশটি বই স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিসেন্ট মুন, গীতাঞ্জলি, গার্ডনার, ডাকঘর, স্ট্রে বার্ডস, রাজা ও রানী, মালিনী ও হাংরি স্টোনস গল্প-সংগ্রহ। স্প্যানিশ ভাষায় এদের অনুবাদ-কর্ম এতই সার্থক যে, পরে হিমেনেথের নিজের বই যেখানে অবিক্রীত অবস্থায় ধুলোচাপা থাকত, রবীন্দ্রনাথের তখন প্রতি বছরে হাজার হাজার কপি বই বিক্রি হতো। তবে ১৯২১ সালে প্যারিস থেকে মাদ্রিদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষপর্যন্ত আর স্পেনে যাওয়া হয়নি কবির। ফলে রবীন্দ্রনাথের সাথে হিমেনেথ-দম্পতির আর দেখা হয়ে ওঠেনি। সেবার স্পেনে গেলে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেতেন কী অসাধারণ আয়োজন করা হচ্ছিল স্পেনে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্যে। হিমেনেথের ইচ্ছে ছিল স্বীয় জন্মভূমি আন্দালুশিয়ায় কবিকে নিয়ে যাওয়ার। পরিকল্পনা ছিল কত কী! রবীন্দ্রনাথের মুখে বাংলায় কবিতা পাঠ শুনবেন, স্পেনের ছেলেমেয়েরা করবে কবির সামনে তাঁরই লেখা ‘বিসর্জন’ নাটক, আর সেই নাটকে মহড়া দিচ্ছিলেন রুবেন দারিও, লুই বনুয়েল, আর নামভূমিকায় তরুণ লোর্কা স্বয়ং। কী চমৎকারই না হতে পারত রবীন্দ্রনাথের স্পেনে আগমন! ঐতিহাসিক এই অসাক্ষাতের অবশ্য প্রভাব থেকে গিয়েছিল তার পরেও বহু কাল অবধি। এই প্রভাব এসে পড়েছিল হিমেনেথ-লোর্কার সূত্রে পরে আরেক নোবেল জয়ী কবি চিলির পাবলো নেরুদার উপরেও। লাতিন মহাদেশের এই কবি তাঁর সৃষ্টিশীলতার গোড়ার পর্বেই রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রবলভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সে কথা আমাদের জানা। তাঁর ‘বিশটি প্রেমের কবিতা আর একটি হতাশার সঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থের ১৬তম কবিতার স্তোত্র প্রত্যক্ষভাবে শুরু হয় ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ চরণটি দিয়ে। এখানেও দেখতে পাচ্ছি এক প্রাচ্যের সুর কীভাবে অন্য প্রাচ্যকে প্রভাবিত করছে। হিমেনেথ দম্পতি যেখানে রবীন্দ্রনাথের মরমি ছায়ায় আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন, নেরুদা সেখানে সেই একই উৎস থেকে খুঁজে নিচ্ছেন অনশ্বর প্রেম ও বিরহের পদাবলি। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করতে করতে হিমেনেথের এক সময় মনে হয়েছিল, এতে বড় বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়ছেন তিনি, ক্ষতি হচ্ছে তার নিজেরই সৃষ্টিকর্মের। সেজন্যে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ কর্ম এক পর্যায়ে বন্ধ পর্যন্ত করে দিয়েছিলেন। হয়তো স্প্যানিশ ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যে, অথবা আন্দালুশিয়ার ভূ-প্রকৃতির মধ্যেই এমন কিছু উপাদান ছিল যা রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতার সমীপবর্তী। লোর্কার সুসি্নগ্ধ গীতিকবিতা বা ব্যালাডগুলো স্মরণ করলে এই সম্ভাবনা দূরান্বয়ী বলে মনে হয় না। এর বহু পরে আরেক নোবেল জয়ী কবি মেক্সিকোব অক্টাভিও পাজ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ১৯৬৭ সালে লিখলেন, এখানে মেক্সিকোয় ‘তরুণরা তেমনই আগ্রহ নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে পড়ে, যেভাবে তাদের দাদামশায়রা একশো বছর আগে রোমান্টিক কবিদের রচনা পড়তেন’। পাজ নোবেল পেয়েছিলেন ১৯৯০ সালে।

লাতিন মহাদেশের আরেক নোবেল জয়ী কবি চিলির গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল। গীতাঞ্জলির কিছু কবিতা তিনি অনুবাদ করেন এবং কবির একটি নির্বাচিত কবিতার সংকলনও প্রকাশ করেন। সত্য, মুত্যু, সুন্দর, পার্থিব এসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গদ্যে-পদ্যে যা লিখে গেছেন তা নিয়ে প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন মিস্ত্রাল। মিস্ত্রালের ‘নির্বাচিত গদ্য ও গদ্য-কবিতা’য় একটি অংশ রয়েছে, যার নাম ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে কয়েকটি মন্তব্য’। রবীন্দ্রনাথ পড়তে পড়তে তাঁর মনে তাৎক্ষণিক যেসব প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা গদ্য-কবিতার আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন মিস্ত্রাল। আখেরে সেটি নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। মিস্ত্রাল রবীন্দ্রনাথের মতোই ভাববাদী দার্শনিক ছিলেন একথা মনে রাখলে দুই প্রাচ্যের মধ্যকার যোগসূত্র বুঝতে কষ্ট হয় না। মিস্ত্রালের রবীন্দ্রনাথ অনুপ্রাণিত মন্তব্যটির অংশবিশেষ এ রকম ‘গীতাঞ্জলি’র ঈশ্বরকে উদ্দেশ করে বলছেন :’না, আমার বিশ্বাস হয় না যে আমি হারিয়ে যাব মৃত্যুর পরে। হারাবার হলে তুমি আমাকে পরিপূর্ণ করে তুলেছিলে কেন, যদি নিঃশেষিত আখের ক্ষেতের মত আমাকে এক সময় পরিত্যক্ত ও শূন্য হয়েই পড়ে থাকতে হবে? প্রতিদিন সকালে আমার হৃদয়ে আর কপালে এমন আলো তুমি কেন ছড়াবে, যদি আমাকে আলগোছে বেছে না নেবে, যেমনটা বেছে নেয় শরতের রোদে ভিজে ওঠা আঙুর ক্ষেত থেকে সবচেয়ে পরিপকস্ফ আঙুরটিকে? না, মৃত্যুকে বরফহিম বা মমতাশূন্য বলে মনে হয় না আবার, যেমনটা অন্যদের কাছে ঠেকে। বরং মৃত্যু যেন অনর্গল তেজের বিকীরণ এক, শরীরকে ছাই করে দেয় কেবল আত্মাকে পরিপূর্ণ করে তোলার জন্যে। মৃত্যুর স্পর্শ কঠিন, তিক্ত এবং তীব্র, যেরকম তোমাকে ভালবাসা, তোমার বিস্ময়-জাগানিয়া ভালবাসা!’ মিস্ত্রাল স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু বিষয়ক নশ্বর-অবিনশ্বর সংক্রান্ত ভাবনাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে বলছেন, ‘ওই-যে, চাকা ঘুরছে ঝনঝনি/বুকের মাঝে শুনছ কি সেই ধ্বনি?’ সে ধ্বনি মিস্ত্রালকেও স্পর্শ করেছে। এখানে বলা দরকার যে, ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির পর মিস্ত্রালই দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি ১৯৪৫ সালে নোবেল পেয়েছিলেন তৃতীয় বিশ্ব থেকে। সাহিত্যে প্রাচ্যের তৃতীয় নোবেলপ্রাপ্তি আরও অনেক পরে জাপানে কাওয়াবাতা পান ১৯৬৮ সালে। রবীন্দ্রনাথের মতোই মিস্ত্রাল সক্রিয় ছিলেন নানা ক্ষেত্রে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন গোটা লাতিন মহাদেশে। এ নিয়ে ওকাম্পোর সাথে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি বিনিময় হয়েছিল তার। আজ পর্যন্ত ‘ওকাম্পোর সাথে মিস্ত্রালের পত্রালাপ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে রয়েছে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য শিল্প আন্দোলন অনুধাবনের জন্যে। এ দুই বিদুষী সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের সাথেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। উল্লেখ্য, কবির লেখার প্রতি চিলির তরুণ কবি পাবলো নেরুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মিস্ত্রালই প্রথম। ষাটের দশকে ওক্টাভিও পাজও যখন মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত ছিলেন ভারতে, তখন দিলি্ল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত এক স্মারক বক্তৃতায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ও লাতিন আমেরিকা সংক্রান্ত ‘সভ্যতার আলাপ’ নিয়ে বলতে গিয়ে ওকাম্পো ও মিস্ত্রাল এ দুই অমোচনীয় বন্ধ যোগাযোগের কথা, ও সেই সুবাদে তরুণতর প্রজন্মের ওপরে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের কথা বিশেষ গুরুত্বের সাথে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

তবে রবীন্দ্রনাথ-লাতিন মহাদেশের মধ্যকার উষ্ণ যোগাযোগের ইতিহাসে ব্যতিক্রম ছিলেন একজন। তিনি বরাবরই ব্যতিক্রমী লেখার ধরনে, চিন্তার ধরনে। শুধু ধরনে নয়; ধারণাতেও। নোবেল পাননি বটে, কিন্তু অনেক বারই তার নাম এসেছিল। বিখ্যাত না পাওয়াদের দলে বোর্হেসের নাম সামনের কাতারে। ‘স্বর্গ হবে এক বিশাল লাইব্রেরির মত’ এ কথাটি যিনি বলেছিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের বই পড়েননি, তা তো হওয়ার নয়। শুধু পড়েই ক্ষান্ত হননি, ১৯৩৭ সালে বেরুনো রবীন্দ্রনাথের সিলেক্টেড ওয়ার্কস-এর ম্যাকমিলান এডিশন হাতে পেয়ে দ্রুত এর একটি সমালোচনাও লিখে ফেলেন বোর্হেস। সমালোচনাটি মধুর ছিল না ‘তার সব লেখাই ঘুরেফিরে চন্দ্র আর সূর্যকে নিয়ে।’ বোর্হেস এ রকম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। মহারথীদের মধ্যকার প্রথম সন্দর্শন সব সময় ভালো যায় না। যেমন, রবীন্দ্রনাথ একবার বোদলেয়ারের কবিতা শুনে ‘ফার্নিচার পোয়েট’ বলে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেছিলেন। বোর্হেসের কাছেও রবীন্দ্রনাথকে একঘেয়ে পুনরুক্তিপ্রবণ বলে মনে হয়ে থাকবে। বোদলেয়ার সম্পর্কে কটূক্তি বোর্হেস ভোলেননি। ১৯২৪ সালের স্মৃতিচারণ করে তিনি যা লিখছেন তা মোটামুটি এই দাঁড়ায় :”তেরো বছর আগে নমস্য ও সুকণ্ঠের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কথা বলার কিছুটা ভীতিকর সুযোগ হয়েছিল আমার। আমরা তখন বোদলেয়ার নিয়ে কথা বলছিলাম। কেউ একজন পাঠ করছিল বোদলেয়ারের ‘ডেথ অব লাভার্স’, যেখানে বিছানা, ডিভান, ফুল, চিমনী, ফায়ারপ্লেসের তাক, আয়না এবং দেবদূতের উল্লেখ ছিল। কবি মন দিয়ে শুনছিলেন কবিতাটি। পড়া শেষ হলে মন্তব্য করলেন, ‘আমি তোমাদের ফার্নিচার পোয়েটকে পছন্দ করি না।’ সে মন্তব্যে আমি মন থেকে সায় দিয়েছিলাম। আজ কবির নিজের লেখাগুলো আবারও পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছে রোমান্টিক কাব্যের প্রায় তাৎপর্যহীন অলংকারের সমারোহ তাকে ততটা বিচলিত করেনি, যতটা তাকে টেনেছিল অস্পষ্টতার প্রতি অপ্রতিরোধ্য মোহ। রবীন্দ্রনাথ অসংশোধনীয়ভাবে অস্পষ্ট উচ্চারণ করে থাকেন। তার এক হাজার একটা লাইনের মধ্যে কোথাও কোনো লিরিক্যাল টেনশন নেই, একতিলও বাক পরিমিতি নেই। নির্বাচিত সংগ্রহের ভূমিকায় কবি লিখেছেন, ‘ফর্মের সমুদ্রে ডুবে যেতে হবে এর স্বাদ পাওয়ার জন্য।’ এ ধরনের চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের সহজেই আসে একাধারে তা অবয়বহীন এবং সহজে যাকে শনাক্ত করা যায় না। অর্থাৎ অস্পষ্টতা, অচিহ্নিত আবেগ, এবং নির্মাণে শৈথিল্য।” এই হচ্ছেন বোর্হেসের রবীন্দ্রনাথ। বোর্হেস যে অনুষ্ঠানের কথা বলছেন তার কিছুদিন বাদেই কবি চলে আসেন আর্জেন্টিনা থেকে। ফিরতি পথে জাহাজ থেকে রবীন্দ্রনাথ ওকাম্পোকে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাতে মনে হয়, বোদলেয়ার সম্পর্কে কবির কিছুটা হলেও মত পরিবর্তন হয়েছিল। ওকাম্পোর বাসায় বোদেলেয়ার চর্চা হচ্ছিল মূল ফরাসি ভাষাতে; সেটা বোদলেয়ার-ভক্ত ওকাম্পোর আগ্রহেই। রবীন্দ্রনাথ ওকাম্পোকে লিখেছিলেন, ‘বিজয়া, বোদলেয়ারের সেই যে কবিতাটি তোমার সাথে পড়েছিলাম, তার লিরিক্যাল অর্থটি এতদিন পরে আমার কাছে ধরা দিচ্ছে।’ ত্রিশের দশকে তরুণতর কবিকুলের সাথে বিশেষত বুদ্ধদেব, সুধীন্দ্রনাথ ও অমিয় চক্রবর্তীর কথা এখানে বলতে হয় আধুনিক কবিতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তর্কে-বিতর্কে বোদলেয়ার আরও আগ্রহের সাথে পর্যালোচিত হবে। সে রকম কোনো পুনর্চিন্তা বোর্হেসের মনে পরে জেগেছিল কিনা তা এখনও সহজে জানার উপায় নেই। বোর্হেস রবীন্দ্রনাথকে জেনেছিলেন ইংরেজি অনুবাদের সূত্রেই। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধাবলি পড়ার সুযোগ হয়নি। তার শেষ এক দশকের কবিতা তার সহজে জানার উপায় ছিল না অনুবাদের অভাবে। হতে পারে যে ন্যাশনালিজমের সমালোচনা রাশিয়া, সমাজতন্ত্র, সভ্যতার সংকট, সাম্রাজ্যবাদ এসব বিষয়ে বোর্হেসের তুলনামূলক আগ্রহ ছিল কম। ফলে এসব বিষয়ে তিনি ইপি থম্পসন, ইসাহ বার্লিন বা ব্রেখটের মতো উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো কিছু খুঁজে পাননি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু আমরা যারা নানা দিক থেকে কবিকে দেখার প্রচেষ্টা করেছি, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও পিচ্ছিলতার বোর্হেসীয় অভিযোগ (‘ইমপ্রেসাইজ অ্যান্ড ফ্লুইড’) কিছুটা কষ্টকল্পিত মনে হয় বৈকি। এটা হয়তো কবির কিছু কিছু লেখার ক্ষেত্রে খাটে; সমগ্র রচনাবলির প্রেক্ষিতে নয়। বরং অত্যন্ত নির্দয় অভিধা বলেই ঠেকবে।

একটি ভিন্নধারার জন-আন্দোলন

শাহবাগ চত্বরে দেরিদা

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা ঢাকায় কখনো আসেননি। এই ভূভাগের সবচেয়ে কাছে তিনি এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়, ১৯৯৮ সালে। সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—পৃথিবীর সবাই মিলে ‘বইকে’ রক্ষা করতে হবে ‘কম্পিউটারের আগ্রাসী আক্রমণের’ বিরুদ্ধে। তার পরও শাহবাগ স্কয়ারে (এখন যেটা ‘প্রজন্ম চত্বর’ হিসেবে ক্রমেই পরিচিতি পাচ্ছে) এলে তিনি আজ উৎফুল্লই হতেন, কিছুটা অবাকও হতেন। সেটা এই কারণে নয় যে, এই চত্বরে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের অধিকাংশই তাঁর নামই শোনেনি। সেটা এ কারণেও নয় যে, এত অসংখ্য শিশু-কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েকে তিনি একসঙ্গে এর আগে জড়ো হতে দেখেননি। তাঁর তো জানাই ছিল, ১৯৬৮ সালের আগুনঝরা মে মাস, যে মাসে প্যারিসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসে দর্শনের ও গণতন্ত্রের একটা নতুন ধারণার সূচনা করেছিল ইউরোপে।

দেরিদার কথা মনে হলো এ জন্য যে, তিনিই প্রথমে বলেছিলেন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলনের কথা। তাঁর পরিভাষায়—ডিসেন্টারড রেভল্যুশন। যে আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত প্ররোচনা নেই, যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী ‘কেন্দ্র’, ‘সংঘ’ বা ‘আদর্শিক’ সংগঠন বা আইডিওলজি; যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী বা শ্রেণীজোট। এককথায়, যে আন্দোলন ধ্রুপদি মার্ক্সবাদের বাইরে, অথচ যা দেরিদার ভাষায়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য জরুরি। সুবিদিত যে, স্পেক্টরস অব মার্ক্স লেখার পর থেকে ডিকনস্ট্রাকশনের দেরিদা ক্রমেই ঝুঁকছিলেন এক নতুন ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে। দেরিদা অ্যান্ড দ্য টাইম অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে তার সবিশেষ বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।

দেরিদার কথা মনে হলো আরও এ কারণে যে, বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মধ্যে এরই মধ্যে দেখা গেছে এবং এখনো সেসব বৈশিষ্ট্যের পরবর্তী বিকাশের সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। তবে ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘাতের সমূহ সম্ভাবনা/আশঙ্কা রয়ে গেছে প্রজাতন্ত্রের পক্ষ ও বিপক্ষের যুযুধান শক্তির মধ্যে। যে ইতিহাসের মধ্যে আমরা এখনো আছি, সেই ক্রম-প্রকাশমান ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। দেরিদা একে বলেছিলেন, হিস্টরি অব দ্য প্রেজেন্ট। তার পরও কয়েকটি নজরকাড়া দিকের উল্লেখ না করে পারছি না।

২. আন্দোলনের নজরকাড়া দিক

প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরের চলমান আন্দোলন কোনো দলীয় বা বহুদলীয় জোট বা মঞ্চ থেকে শুরু হয়নি বা এখনো পরিচালিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীরা সামনে বা পেছনে থেকে অংশ নিচ্ছেন—নেওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে যাদেরই ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার, তারা যে ছাত্রসংগঠনেরই হোক, তারাই এখানে আসছে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আসছে, এমনকি ছাত্রদলের সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই আসছেন। কেননা, প্রশ্নটা দলীয় নয়, ব্যক্তিগত। এখানেও ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ আপ্তবাক্যটা খাটে। ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকেই এখানে লাখো মানুষ জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন। যেটা লক্ষ করার, তা হলো, রাজনৈতিক ছাত্রকর্মীরা যাঁরা এখানে অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরছেন না বা সেই পরিচয় জাহির করার জন্য তাঁরা উদ্বেলিত হয়ে উঠছেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলচর্চার বাইরে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই আন্দোলন অরাজনৈতিক। এর মধ্যেও তীক্ষ রাজনৈতিক বোধ রয়েছে, কিন্তু সেটা দলীয় রাজনৈতিক নীতি-আদর্শগত সংকীর্ণ বোধ থেকে আলাদা। যে অর্থে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘সব দর্শনচর্চা, সবকিছুই রাজনৈতিক’, ঠিক সেই অর্থে শাহবাগের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি নিয়ে এক নতুন ধরনের ‘নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ’-এর সূচনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ সেমিনারকেন্দ্রিক ও বিদেশি অনুদানপুষ্ট থিংক-ট্যাংক ও এনজিওভিত্তিক তথাকথিত সিভিল সমাজের ‘নাগরিক আন্দোলন’ থেকে আলাদা। এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ঘিরেই, মূলত সরকার-বদলকে কেন্দ্র করে, অথবা সরকারের নীতিমালাকে ঘিরে। অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতাচর্চার বলয়ে ঘুরপাক খায় এসব নাগরিক সংলাপ। এক অর্থে (গ্রামসীয় অর্থে) এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সমাজের আন্দোলনেরই একটি শাখা ‘এক্সটেনশন’। এদিক থেকেও থেকেও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে মনে হবে আলাদা চরিত্রের। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নির্ধারণ করলেই এটা বোঝা যায়।

এই আন্দোলন আদিতে শুরু হয়েছিল যাদের তাগিদে, তাদের একটি বড় অংশ এর আগের পাঁচ-সাত বছর ধরে—এই তরুণ বয়সেই—অনলাইনে তীব্র সংগ্রাম করে এসেছেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাত্তর নিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে, এ দেশের ইতিহাস নিয়ে, আজকের ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিরন্তর দুর্ভাবনা ও মনঃকষ্ট ছিল। কিছু একটা করার তীব্র ব্যক্তিগত তাগিদ একুশ শতকের এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ওই সাইবার যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছিল। হতে পারে, এসব ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁদের, তাতে পরিশীলনের ঘাটতি থেকে গেছে, সময় সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র লড়াই যে সাইবার স্পেসে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শাহবাগ আন্দোলনের জিনিওলজি বা সূত্রপাতের একটি চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়।

চতুর্থত, এই আন্দোলনের ‘উৎসবমুখর চরিত্র’ ভুলে যাওয়ার নয়। একে তো ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর দারুণ সময়। আমাদের সংস্কৃতির সেরা মাধ্যমগুলো: গান, নাটক, কবিতা, ছড়া, সিনেমা, চিত্রকর্ম—এসবের বর্ণিল সমাহার এখানে। এই আন্দোলনের ৯০ শতাংশের বয়সই পনেরো থেকে তিরিশের মধ্যে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আবার মেয়েরা। এই সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মিশেছে তারুণ্যের তীব্র ইনসাফ বোধ। সমাবেশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির পাশাপাশি বারবার যেটা বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ‘আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে চাই আমাদের অতীতকে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রকে’। আমাদের প্রজন্ম যেটা পারেনি আশি-নব্বইয়ের দশকে, সেটা একুশ শতকের প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। একটি শিশু, একজন কিশোরী, একটি তরুণের ডাকে অন্যান্য বয়সী, অন্যান্য পেশা ও শ্রেণীর লোকেরা সাড়া দিয়ে প্রতিদিন ও প্রতিরাত আসছে এখানে। কোনো বিশেষ নেতা বা নেত্রীর ডাকে তারা এখানে আসছে না। আন্দোলনের এই মেজাজটা আমাদের বুঝতে হবে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে কোনো দলীয় নেতা-নেত্রীর ছবি বা পোস্টার নেই। এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’।

৩. এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখব?

প্রতিটা প্রজন্ম তার নিজের নায়ক বেছে নেয়, তার নিজের বিপ্লব গড়ে তোলে, তার নিজের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বায়ান্নতে যার জন্ম, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে; যাদের জন্ম একাত্তরে, তারা অংশ নিয়েছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে; যাদের জন্ম নব্বইয়ের শুরুতে, তারা এখন অংশ নিচ্ছে ২০১৩ সালের এই শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে। আজ যারা অংশ নিচ্ছে তারা তাদের স্বকীয়তা নিয়েই আসছে। এর অকৃত্রিমতাকে (অথেনটিসিটি) যেন চিনতে ভুল না করি।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক দশকে তো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এমন কোনো চেতনার পুনরুজ্জীবন হয়নি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, তাহলে এই ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত চেতনা এত তীব্র হলো কী করে? এর একটা উত্তর হতে পারে, আমাদের ও তাদের মধ্যে প্রজন্মগত এক বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। তরুণেরা যে আমাদের থেকে প্রজন্মগত যুক্তিতেই অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিজস্বভাবে দেশপ্রেমের এক আলাদাবোধ ও বয়ান শাণিত করে তুলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি। গত দুই দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের নীরবে উঠে দাঁড়ানোও তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে থাকবে ‘কলঙ্কমোচন’-এর যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদের কলঙ্ক যেভাবে আমরা গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি; যেভাবে আমরা জাতি হিসেবে ভালো করছি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য মোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতের সরলতম সূচকে; যেভাবে গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ ছড়িয়ে পড়েছে এ দেশের নানা জেলায়-উপজেলায়; যেভাবে রপ্তানি খাতে, প্রবাসের কাজে, ক্ষুদ্রঋণে, আধুনিক ব্যাংক-বিমা সেবায়, নারীশিক্ষায়, ক্রিকেটে, বই প্রকাশনায়, গানে-নাটকে, বেসরকারি মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনে আমরা এগিয়ে গেছি—এসব নানা সাফল্যের পাশাপাশি বড় দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আমাদের গত কয়েক দশকের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্তি। এটা একুশ শতকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা নিক বা ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা নিক—মাধ্যমনির্বিশেষে একই ধরনের প্রেরণায় একটি মূল দাবিতে একাত্ম হতে পেরেছে তারা।

কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, এর পরে কী? তরুণেরা কেন কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নেই নিজেদের দাবিগুলো সীমিত রাখছে? সমাজে তো কত অনাচার আছে, রাষ্ট্রের তো কত অন্যায় আছে, সরকারেরও তো কত দিকে ঘাটতি-ব্যর্থতা আছে—সেসব ইস্যু কেন স্থান পাবে না শাহবাগ চত্বরের স্লোগানে? আন্দোলনকারীরা এর উত্তরে বলতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি—আমরা এখনো দেশের ভার কাঁধে তুলে নিইনি। সব দায়মুক্তির ভার আমরা এখনই নেব কেন? তার পরও আমরা খোলা রেখেছি বইয়ের পাতা, বন্ধ করিনি অন্য সম্ভাবনাগুলো, আন্দোলনের জনতা চাইলে অন্যান্য ইস্যু আনতে পারে, তবে এটি আমাদের আদি ভাবনা ছিল না। কেননা, যেসব দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, তার অর্ধেক অর্জনও হবে আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া।

আমার চোখে, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের একটি মৌলিক অভিপ্রায় হচ্ছে—সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকেই আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতে, সমাজ সংগঠনে ও সংস্কৃতিবলয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি মানেই আওয়ামী লীগ নয়; বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের একটা বড় অংশ একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না—এমনটাও ভাবা অসংগত নয়। ইউরোপের অনেক দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক নামের দল রয়েছে, সে সূত্রে এখানেও এমন দল থাকতে পারে, কিন্তু যে দলই করুক না কেন, চিহ্নিত যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের দলে রেখে কোনো পার্টি, জোট বা শক্তি রাজনীতি করতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। আগামী দিনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় বিবেচনা হিসেবে দেখা দেবে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের এটা একটি মূল পর্যবেক্ষণ। কেউ তো বাধা দেয়নি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শাহবাগে এসে সংহতি জানানোর ক্ষেত্রে। সেটা তারা করল না কেন? এর বিপরীতে আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পরে তাদের যে বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে এসেছে, বেশ কিছুটা হতাশই হয়েছি। এই শক্তিশালী ও অপার সম্ভাবনাময় আধুনিকমনা একটি প্রধান দলের কাছ থেকে আরও বলিষ্ঠ ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনরত সাধারণ জনসমাজের ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রে আরও সচেষ্ট হওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের না বোঝার কথা নয়।

সবশেষে, একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে—এই আন্দোলন আর কত দিন চলবে? সরকারি মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, পাছে এই আন্দোলন আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার দিকে গড়াতে থাকে! প্রধান বিরোধী দলের উদ্বেগ তো ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। শাসক অর্থনৈতিক শ্রেণীরাও চিন্তিত এই ভেবে যে, তাজরীন গার্মেন্টস-জাতীয় কোনো শ্রেণী-পেশার আন্দোলনের সঙ্গে তারুণ্যের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কি না! পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোনো আন্দোলনকেই শাসকশ্রেণী ও দলগুলো বেশি দিন সহজভাবে নিতে পারে না—এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। শাহবাগের আন্দোলন যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার পরও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যাবে আগামী বছরগুলোতে। আমরা পূর্ণ নয়, খণ্ডিতকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি। আমরা চিরস্থায়ী হতে চাই না, ক্ষণস্থায়িত্বেই আমাদের আনন্দ। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনে, কেননা সাইবার স্পেস থেকে রাজপথের স্পেসে চাইলে আমরা যেকোনো সময়েই আবার বেরিয়ে আসতে পারি, অন্য কোনো দাবি নিয়ে। আবার কালই ফিরে যেতে পারি, যদি জনসমাজ তা চায়। ভবিষ্যতে যারা এ দেশের গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে শঙ্কিত, তারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের এই বোধকে আশা করি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। শীত যাই যাই, ঋতুরাজ সমাগত, কড়া নাড়ছে দরজায়। এই আন্দোলনের উৎসবমুখর চরিত্র সবারই যে ভালো লাগবে এমন নয়। কোনো নিরীহ জন-আন্দোলনও একপর্যায়ে সহিংস আক্রমণের শিকার হতে পারে, এবং একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তার পরও মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের একটা দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন থেকে যাবে, একটা বড় দাগ রেখে যাবে এটি। কবি যেমনটা বলেছিলেন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।