সংখ্যালঘু বনাম আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা

প্রথম কিস্তি

আমি কি সংখ্যালঘু? এক অর্থে প্রশ্ন রাখাটাই হাস্যকর। আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নামই বলে দিচ্ছে আমি কী। এ নিয়ে বাহাস করার অর্থই হয় না। তবে বিষয়টা অত সরল না-ও হতে পারে। আজকাল সংখ্যালঘু কথাটার ‘সংখ্যায় লঘু’ এমন একটা কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংখ্যায় মেজরিটি হয়েও কেউ কার্যত মাইনরিটি হতে পারে। সারা বিশ্বে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, শিশুমৃত্যুর হারে অনেক বৈষম্য থেকে যাওয়ার পরেও। তারপরও কি আমরা বলতে পারি যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরেও সংখ্যালঘুর মতো অধস্তন অবস্থান তাদের। তার মানে ব্যাপারটা শুধু সংখ্যায় (নিউমেরিক্যালি) বেশি-কমের বিবেচনা নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—কে কত বেশি ক্ষমতাবান? নারীরা পুরুষদের চেয়ে এখনো কম ক্ষমতাবান বলেই সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু। সুতরাং সংখ্যায় বেশি-কম যা-ই থাক না কেন, কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা ব্যক্তি ‘ক্ষমতা হারিয়ে’ কীভাবে সংখ্যালঘু ‘হয়ে ওঠে’, সেটিই হচ্ছে প্রথম বিচার্য বিষয়। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, নারীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। যখন আপনি সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেন, তখন আপনি নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ ভাবতে শুরু করেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, একজন ইহুদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যাকে অ্যান্টি-সেমিটিকরা ইহুদি বলে ডাকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, একজন সংখ্যালঘু হচ্ছে সেই মানুষ, যাকে একজন সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বলে ডাকে, যেমন: ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে ‘উপজাতি’ বলে পরিচিত করে না, তাকে ‘উপজাতি’ বলে কোনো বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই নানা পরিচয় থাকে। কোন পরিচয়ে কে কখন কতটা নিজেকে জাহির করবে, সেই স্বাধীনতাটা সবার সমান নয়। আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) জাহির করার স্বাধীনতা যে সমাজে যত বেশি, সেই সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতাও তত বেশি এবং সেই সমাজও তত বেশি উন্নত। অমর্ত্য সেন তাঁর আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ে নিজের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন: ‘আমি একই সঙ্গে হতে পারি একজন এশীয়, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাঙালি, যার রয়েছে বাংলাদেশি পূর্বপুরুষ, একজন মার্কিন দেশে বা ব্রিটেনে বসবাসকারী, একজন অর্থনীতিবিদ, দর্শনচর্চায় অনুপ্রবেশকারী, একজন লেখক, একজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষজ্ঞ, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রে জোরালোভাবে বিশ্বাসী, একজন পুরুষ, একজন নারীবাদী, একজন “হেটেরোসেক্সুয়াল”, কিন্তু সমকামীদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনকারী, যার জীবনযাত্রার ধরন কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে খাপ খায় না (নন-রিলিজিয়াস), সে এসেছে হিন্দু সামাজিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড) থেকে, সে অ-ব্রাহ্মণ, এবং সে বিশ্বাস করে না মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জীবনে (আফটার লাইফে), বা এই প্রশ্ন যদি তাকে করা হয়, সে এ-ও বলবে—সে বিশ্বাস করে না কোনো পূর্ব-জন্মেও। এটা হচ্ছে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র নমুনা-চয়ন, যার প্রতিটাতেই আমি হয়তো একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত—এবং চাইলে এ রকম আরও অনেক পরিচয়ের সদস্য হতে পারি আমি; সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির বিচারে কোন পরিচয়টা সেই মুহূর্তে আমাকে বেশি টানছে, তার ওপর।’ অমর্ত্য সেনের স্বাধীনতা আছে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে লাগসই পরিচয়টা অবস্থাভেদে, পছন্দ অনুযায়ী ও রুচির বিচারে বেছে নেওয়ার। এই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ সবার থাকে না, সব শ্রেণীর থাকে না, সব সমাজে থাকে না।

অমর্ত্য সেন বইটি লিখেছিলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে প্রচারিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব। সংঘাত বলতে পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক মূলগত দ্বন্দ্বের ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও তাঁর অনুসারীরা। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নানাভাবে পাশ্চাত্যের শত্রু বানিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তারই বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হিসেবে অমর্ত্য সেন ২০০৬ সালে বইটি লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে এই বিরোধ আবিষ্কার ছিল একটি দুষ্ট-পরিকল্পনা। প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বকে এক পরাশক্তির অধীনে আনার ও সর্বত্র আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব জোরেশোরে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই বই লেখার আরও বহু বছর আগে থেকেই আমি আবছা করে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি ব্যক্তিকেই কোনো বিশেষ আত্মপরিচয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র বা ধর্ম বেঁধে দিতে পারে না। কোন পরিচয়ে সে নিজেকে কখন পরিচিতি করাতে চায়, সেই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ তার চাই—এটা তার মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং সে কারণেই কৈশোর থেকেই কেউ আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললে আপত্তি করেছি, পারলে প্রতিবাদ করেছি, না করলেও মেনে নিইনি।

এর জন্য আমার পারিবারিক ঐতিহ্যও কিছুটা দায়ী। আমি এখানে কোনো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা তুলছি না। আমার ধারণা, এ রকম অভিজ্ঞতা আরও অনেকের জীবনেই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সেটা মনে রেখেই দু-একটি আত্মজৈবনিক তথ্য যোগ করব এখানে। ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই আত্মকথন—তার জন্য আগেই তত্ত্বজ্ঞ পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার মা ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে তাঁর পরিচয়কে সীমিত রাখেননি। ঈদে বা শবেবরাতের অনুষ্ঠানে নিজে উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন, বাসায় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে দাওয়াতও দিতেন। উৎসবে বা সংকটে পড়লে মাজারে ‘মানত’ করা ছিল তাঁর সংসারের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব কিছু ‘ভোকাবুলারি’ ছিল। হাইকোর্টের মাজার ‘গরম পীরের মাজার’, ফলে মাজারের পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা জানানো চাই। নইলে আধ্যাত্মিক গুরু রুষ্ট হবেন। মিরপুরের মাজার আবার ছিল ‘ঠান্ডা পীরের মাজার’—তিনি দুর্বাসা মুনি নন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দোষ নেন না। আমাদের বাসায় জন্মাবধি দেখেছি নানা সময়ে বিভিন্ন মুসলমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন পুণ্যবান ব্যক্তিরা এসেছেন। তাঁদের যথাবিহিত যত্ন করা হয়েছে। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো যুক্তি শৈশব থেকেই পাইনি। মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন—যদি হিন্দু ধর্মে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে ভারতমুখিনতার সঙ্গে সমীকরণ করা হতো। পাড়ার বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গেলে যদি বিক্রেতা তাঁকে বলত, ‘দাদি, আপনাদের দ্যাশ থেকে আইছে।’ মা উত্তরে বলেছেন, ‘তাই নাকি, জানতাম না তো সিলেটে আজকাল এসব পেঁয়াজ হচ্ছে,’ এবং তারপরেই তিরস্কার করে বলে উঠতেন, ‘দাদির সঙ্গে ফাজলামি করার আর বিষয় পাওনি, না?’ বিক্রেতা লজ্জিত হতো, ‘না, দাদি, ভুল হয়ে গেছে’—এমনটাই বলত। তিনি বাজারের সবার কাছে ছিলেন ‘সর্বজনীন দাদি’। শুনেছি, মৃত্যুর পরে তাঁর মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য অনেক লোক তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, আমার বাবাও এই মতেরই মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন—অসংখ্য ছাত্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। মানুষ বড়ই রহস্যময় জীব। আমি মৃত্যুর পরে তাঁকে একবার মাত্র স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু তাঁর পূর্বতন (মুসলমান) ছাত্ররা ও সহকর্মীরা—যাঁরা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে আসীন হয়েছিলেন—তাঁকে নাকি অনেকবারই স্বপ্নে দেখেছেন এবং সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবিতে দেখেছেন। তাঁরা ফোন করে বা দেখা করে আমাকে তা বলার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি পারমার্থিক বিষয়ে নিবিষ্ট নই, কিন্তু আমার শুধু বলার কথা—হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের বিভিন্নতা সেখানে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ফলে আমার পক্ষে, নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবা কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয় একটি কারণও ছিল। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আমার বাবা অধ্যক্ষ বি বি সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন সমগ্র নর্থ-ইস্ট সেক্টরের ‘এডুকেশন অফিসার’ হিসেবে। শিলংয়ে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কাজটা ছিল রিলিফ ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের পরিচালনার কাজে অংশ নেওয়া। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন তাঁর পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে অধ্যক্ষ হিসেবে। এ দেশে বীরাঙ্গনাদের প্রথম কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানেই। মুজিবনগর সরকারে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা সবাই নাকি একটি করে ‘প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তবে স্বীকৃতি বা পদোন্নতি নিয়ে তাঁর মনে কখনো ক্ষোভ ছিল না। এই না-পাওয়াটাকে তিনি তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ পরিচিতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত করেননি। দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। একবার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যার মুখে। সেবার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার তাঁর পাকিস্তানি বস-এর ছোট ভাই হওয়ায় তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। আরেকবার এই স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে, সেনা-অভ্যুত্থানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে (বর্তমান লেখকসহ)। এই গ্রেপ্তার ছিল ভুল-বোঝাবুঝির, গ্রেপ্তার এবং যাঁরা এটা করেছিলেন তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাত্তগত ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করেছিলেন। সে রকম শুনেছি। তবে আমার গর্বের ব্যাপার যে আমার বড় ভাই ছিলেন একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। মুজিববাহিনীতে নয়, সে সুযোগও তাঁর ছিল। তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে (এফএফ) যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরে। জানের তোয়াক্কা না করে তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁকে আমরা সারা শরীরে জোঁকে-খাওয়া অবস্থায় দেখতে পাই নয় মাস যুদ্ধের পরেই। কিছুদিন ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার দায়িত্বপূর্ণ কাজেও ছিলেন, কিন্তু তদানীন্তন নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৭৪ সালেই ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন। সেটাও (পরে শুনেছি) স্বাধীনতার পরে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতার মুখ গলে তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল, বা এমনই কিছুর প্রতিবাদে। এরপর বাদবাকি জীবনটা প্রায় প্রবাসেই কাটালেন কোনো প্রবল অভিমান বুকে নিয়ে। এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত সদস্য হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ আত্মপরিচয়টা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আমারও আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল ও আছে।

তৃতীয় একটি কারণও রয়েছে, তবে সেটা মোটামুটি প্রকাশ্যেই ধারণ করে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই এবং কালক্রমে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলাম। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো কারণ ছিল না, কেননা পার্টিতে মণি সিংহ বা মোহাম্মদ ফরহাদ, জিতেন ঘোষ বা হাতেম আলী, মণিকৃষ্ণ সেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজয় রায়, মতিউর রহমান বা মনজুরুল আহসান খান—এসব নামের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত বিবেচনাবোধ কখনোই মনে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আমার প্রথম ও প্রধান আত্মপরিচয় ছিল—আমি সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের প্রগতির পক্ষের লোক। আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললেই (বলতে পারেন অনেকেই) আমি তা মানব কেন? ঠিক একইভাবে, পারিবারিক দিক থেকে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীও (যতই তাঁকে বোঝানো যাক) নিজেকে এখনো ‘সংখ্যালঘু’ বলে ভাবতে চান না বা পারেন না।

মোট কথা, অমর্ত্য সেনের দার্শনিক গ্রন্থটা পড়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা কখন কী পরিমাণে আমি জাহির করব, সে স্বাধীনতাটা আমাকে দেওয়া দরকার বা আমার অর্জন করা দরকার। কিন্তু এসব কথা আমি বাঁশখালীর ওই সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া মাতৃসমা নারীটিকে বোঝাব কী করে? বস্তুত, আমি তাঁকে সংখ্যালঘুও বলতে চাইছি না। তাঁর পরনের পোশাক, তাঁর ঘর-গৃহস্থালি, তাঁর পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে বলে দিচ্ছে, অন্য কোনো শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হওয়া দরকার এ ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে অনন্যোপায় হয়ে বলছি—তিনি আসলে অতি-সংখ্যালঘু।

দ্বিতীয় কিস্তি: অতি-সংখ্যালঘুর ওপরে আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

একটি ভিন্নধারার জন-আন্দোলন

শাহবাগ চত্বরে দেরিদা

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা ঢাকায় কখনো আসেননি। এই ভূভাগের সবচেয়ে কাছে তিনি এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়, ১৯৯৮ সালে। সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—পৃথিবীর সবাই মিলে ‘বইকে’ রক্ষা করতে হবে ‘কম্পিউটারের আগ্রাসী আক্রমণের’ বিরুদ্ধে। তার পরও শাহবাগ স্কয়ারে (এখন যেটা ‘প্রজন্ম চত্বর’ হিসেবে ক্রমেই পরিচিতি পাচ্ছে) এলে তিনি আজ উৎফুল্লই হতেন, কিছুটা অবাকও হতেন। সেটা এই কারণে নয় যে, এই চত্বরে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের অধিকাংশই তাঁর নামই শোনেনি। সেটা এ কারণেও নয় যে, এত অসংখ্য শিশু-কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েকে তিনি একসঙ্গে এর আগে জড়ো হতে দেখেননি। তাঁর তো জানাই ছিল, ১৯৬৮ সালের আগুনঝরা মে মাস, যে মাসে প্যারিসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসে দর্শনের ও গণতন্ত্রের একটা নতুন ধারণার সূচনা করেছিল ইউরোপে।

দেরিদার কথা মনে হলো এ জন্য যে, তিনিই প্রথমে বলেছিলেন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলনের কথা। তাঁর পরিভাষায়—ডিসেন্টারড রেভল্যুশন। যে আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত প্ররোচনা নেই, যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী ‘কেন্দ্র’, ‘সংঘ’ বা ‘আদর্শিক’ সংগঠন বা আইডিওলজি; যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী বা শ্রেণীজোট। এককথায়, যে আন্দোলন ধ্রুপদি মার্ক্সবাদের বাইরে, অথচ যা দেরিদার ভাষায়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য জরুরি। সুবিদিত যে, স্পেক্টরস অব মার্ক্স লেখার পর থেকে ডিকনস্ট্রাকশনের দেরিদা ক্রমেই ঝুঁকছিলেন এক নতুন ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে। দেরিদা অ্যান্ড দ্য টাইম অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে তার সবিশেষ বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।

দেরিদার কথা মনে হলো আরও এ কারণে যে, বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মধ্যে এরই মধ্যে দেখা গেছে এবং এখনো সেসব বৈশিষ্ট্যের পরবর্তী বিকাশের সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। তবে ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘাতের সমূহ সম্ভাবনা/আশঙ্কা রয়ে গেছে প্রজাতন্ত্রের পক্ষ ও বিপক্ষের যুযুধান শক্তির মধ্যে। যে ইতিহাসের মধ্যে আমরা এখনো আছি, সেই ক্রম-প্রকাশমান ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। দেরিদা একে বলেছিলেন, হিস্টরি অব দ্য প্রেজেন্ট। তার পরও কয়েকটি নজরকাড়া দিকের উল্লেখ না করে পারছি না।

২. আন্দোলনের নজরকাড়া দিক

প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরের চলমান আন্দোলন কোনো দলীয় বা বহুদলীয় জোট বা মঞ্চ থেকে শুরু হয়নি বা এখনো পরিচালিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীরা সামনে বা পেছনে থেকে অংশ নিচ্ছেন—নেওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে যাদেরই ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার, তারা যে ছাত্রসংগঠনেরই হোক, তারাই এখানে আসছে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আসছে, এমনকি ছাত্রদলের সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই আসছেন। কেননা, প্রশ্নটা দলীয় নয়, ব্যক্তিগত। এখানেও ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ আপ্তবাক্যটা খাটে। ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকেই এখানে লাখো মানুষ জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন। যেটা লক্ষ করার, তা হলো, রাজনৈতিক ছাত্রকর্মীরা যাঁরা এখানে অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরছেন না বা সেই পরিচয় জাহির করার জন্য তাঁরা উদ্বেলিত হয়ে উঠছেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলচর্চার বাইরে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই আন্দোলন অরাজনৈতিক। এর মধ্যেও তীক্ষ রাজনৈতিক বোধ রয়েছে, কিন্তু সেটা দলীয় রাজনৈতিক নীতি-আদর্শগত সংকীর্ণ বোধ থেকে আলাদা। যে অর্থে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘সব দর্শনচর্চা, সবকিছুই রাজনৈতিক’, ঠিক সেই অর্থে শাহবাগের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি নিয়ে এক নতুন ধরনের ‘নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ’-এর সূচনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ সেমিনারকেন্দ্রিক ও বিদেশি অনুদানপুষ্ট থিংক-ট্যাংক ও এনজিওভিত্তিক তথাকথিত সিভিল সমাজের ‘নাগরিক আন্দোলন’ থেকে আলাদা। এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ঘিরেই, মূলত সরকার-বদলকে কেন্দ্র করে, অথবা সরকারের নীতিমালাকে ঘিরে। অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতাচর্চার বলয়ে ঘুরপাক খায় এসব নাগরিক সংলাপ। এক অর্থে (গ্রামসীয় অর্থে) এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সমাজের আন্দোলনেরই একটি শাখা ‘এক্সটেনশন’। এদিক থেকেও থেকেও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে মনে হবে আলাদা চরিত্রের। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নির্ধারণ করলেই এটা বোঝা যায়।

এই আন্দোলন আদিতে শুরু হয়েছিল যাদের তাগিদে, তাদের একটি বড় অংশ এর আগের পাঁচ-সাত বছর ধরে—এই তরুণ বয়সেই—অনলাইনে তীব্র সংগ্রাম করে এসেছেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাত্তর নিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে, এ দেশের ইতিহাস নিয়ে, আজকের ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিরন্তর দুর্ভাবনা ও মনঃকষ্ট ছিল। কিছু একটা করার তীব্র ব্যক্তিগত তাগিদ একুশ শতকের এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ওই সাইবার যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছিল। হতে পারে, এসব ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁদের, তাতে পরিশীলনের ঘাটতি থেকে গেছে, সময় সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র লড়াই যে সাইবার স্পেসে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শাহবাগ আন্দোলনের জিনিওলজি বা সূত্রপাতের একটি চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়।

চতুর্থত, এই আন্দোলনের ‘উৎসবমুখর চরিত্র’ ভুলে যাওয়ার নয়। একে তো ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর দারুণ সময়। আমাদের সংস্কৃতির সেরা মাধ্যমগুলো: গান, নাটক, কবিতা, ছড়া, সিনেমা, চিত্রকর্ম—এসবের বর্ণিল সমাহার এখানে। এই আন্দোলনের ৯০ শতাংশের বয়সই পনেরো থেকে তিরিশের মধ্যে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আবার মেয়েরা। এই সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মিশেছে তারুণ্যের তীব্র ইনসাফ বোধ। সমাবেশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির পাশাপাশি বারবার যেটা বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ‘আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে চাই আমাদের অতীতকে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রকে’। আমাদের প্রজন্ম যেটা পারেনি আশি-নব্বইয়ের দশকে, সেটা একুশ শতকের প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। একটি শিশু, একজন কিশোরী, একটি তরুণের ডাকে অন্যান্য বয়সী, অন্যান্য পেশা ও শ্রেণীর লোকেরা সাড়া দিয়ে প্রতিদিন ও প্রতিরাত আসছে এখানে। কোনো বিশেষ নেতা বা নেত্রীর ডাকে তারা এখানে আসছে না। আন্দোলনের এই মেজাজটা আমাদের বুঝতে হবে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে কোনো দলীয় নেতা-নেত্রীর ছবি বা পোস্টার নেই। এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’।

৩. এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখব?

প্রতিটা প্রজন্ম তার নিজের নায়ক বেছে নেয়, তার নিজের বিপ্লব গড়ে তোলে, তার নিজের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বায়ান্নতে যার জন্ম, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে; যাদের জন্ম একাত্তরে, তারা অংশ নিয়েছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে; যাদের জন্ম নব্বইয়ের শুরুতে, তারা এখন অংশ নিচ্ছে ২০১৩ সালের এই শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে। আজ যারা অংশ নিচ্ছে তারা তাদের স্বকীয়তা নিয়েই আসছে। এর অকৃত্রিমতাকে (অথেনটিসিটি) যেন চিনতে ভুল না করি।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক দশকে তো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এমন কোনো চেতনার পুনরুজ্জীবন হয়নি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, তাহলে এই ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত চেতনা এত তীব্র হলো কী করে? এর একটা উত্তর হতে পারে, আমাদের ও তাদের মধ্যে প্রজন্মগত এক বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। তরুণেরা যে আমাদের থেকে প্রজন্মগত যুক্তিতেই অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিজস্বভাবে দেশপ্রেমের এক আলাদাবোধ ও বয়ান শাণিত করে তুলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি। গত দুই দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের নীরবে উঠে দাঁড়ানোও তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে থাকবে ‘কলঙ্কমোচন’-এর যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদের কলঙ্ক যেভাবে আমরা গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি; যেভাবে আমরা জাতি হিসেবে ভালো করছি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য মোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতের সরলতম সূচকে; যেভাবে গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ ছড়িয়ে পড়েছে এ দেশের নানা জেলায়-উপজেলায়; যেভাবে রপ্তানি খাতে, প্রবাসের কাজে, ক্ষুদ্রঋণে, আধুনিক ব্যাংক-বিমা সেবায়, নারীশিক্ষায়, ক্রিকেটে, বই প্রকাশনায়, গানে-নাটকে, বেসরকারি মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনে আমরা এগিয়ে গেছি—এসব নানা সাফল্যের পাশাপাশি বড় দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আমাদের গত কয়েক দশকের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্তি। এটা একুশ শতকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা নিক বা ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা নিক—মাধ্যমনির্বিশেষে একই ধরনের প্রেরণায় একটি মূল দাবিতে একাত্ম হতে পেরেছে তারা।

কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, এর পরে কী? তরুণেরা কেন কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নেই নিজেদের দাবিগুলো সীমিত রাখছে? সমাজে তো কত অনাচার আছে, রাষ্ট্রের তো কত অন্যায় আছে, সরকারেরও তো কত দিকে ঘাটতি-ব্যর্থতা আছে—সেসব ইস্যু কেন স্থান পাবে না শাহবাগ চত্বরের স্লোগানে? আন্দোলনকারীরা এর উত্তরে বলতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি—আমরা এখনো দেশের ভার কাঁধে তুলে নিইনি। সব দায়মুক্তির ভার আমরা এখনই নেব কেন? তার পরও আমরা খোলা রেখেছি বইয়ের পাতা, বন্ধ করিনি অন্য সম্ভাবনাগুলো, আন্দোলনের জনতা চাইলে অন্যান্য ইস্যু আনতে পারে, তবে এটি আমাদের আদি ভাবনা ছিল না। কেননা, যেসব দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, তার অর্ধেক অর্জনও হবে আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া।

আমার চোখে, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের একটি মৌলিক অভিপ্রায় হচ্ছে—সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকেই আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতে, সমাজ সংগঠনে ও সংস্কৃতিবলয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি মানেই আওয়ামী লীগ নয়; বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের একটা বড় অংশ একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না—এমনটাও ভাবা অসংগত নয়। ইউরোপের অনেক দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক নামের দল রয়েছে, সে সূত্রে এখানেও এমন দল থাকতে পারে, কিন্তু যে দলই করুক না কেন, চিহ্নিত যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের দলে রেখে কোনো পার্টি, জোট বা শক্তি রাজনীতি করতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। আগামী দিনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় বিবেচনা হিসেবে দেখা দেবে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের এটা একটি মূল পর্যবেক্ষণ। কেউ তো বাধা দেয়নি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শাহবাগে এসে সংহতি জানানোর ক্ষেত্রে। সেটা তারা করল না কেন? এর বিপরীতে আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পরে তাদের যে বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে এসেছে, বেশ কিছুটা হতাশই হয়েছি। এই শক্তিশালী ও অপার সম্ভাবনাময় আধুনিকমনা একটি প্রধান দলের কাছ থেকে আরও বলিষ্ঠ ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনরত সাধারণ জনসমাজের ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রে আরও সচেষ্ট হওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের না বোঝার কথা নয়।

সবশেষে, একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে—এই আন্দোলন আর কত দিন চলবে? সরকারি মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, পাছে এই আন্দোলন আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার দিকে গড়াতে থাকে! প্রধান বিরোধী দলের উদ্বেগ তো ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। শাসক অর্থনৈতিক শ্রেণীরাও চিন্তিত এই ভেবে যে, তাজরীন গার্মেন্টস-জাতীয় কোনো শ্রেণী-পেশার আন্দোলনের সঙ্গে তারুণ্যের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কি না! পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোনো আন্দোলনকেই শাসকশ্রেণী ও দলগুলো বেশি দিন সহজভাবে নিতে পারে না—এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। শাহবাগের আন্দোলন যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার পরও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যাবে আগামী বছরগুলোতে। আমরা পূর্ণ নয়, খণ্ডিতকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি। আমরা চিরস্থায়ী হতে চাই না, ক্ষণস্থায়িত্বেই আমাদের আনন্দ। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনে, কেননা সাইবার স্পেস থেকে রাজপথের স্পেসে চাইলে আমরা যেকোনো সময়েই আবার বেরিয়ে আসতে পারি, অন্য কোনো দাবি নিয়ে। আবার কালই ফিরে যেতে পারি, যদি জনসমাজ তা চায়। ভবিষ্যতে যারা এ দেশের গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে শঙ্কিত, তারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের এই বোধকে আশা করি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। শীত যাই যাই, ঋতুরাজ সমাগত, কড়া নাড়ছে দরজায়। এই আন্দোলনের উৎসবমুখর চরিত্র সবারই যে ভালো লাগবে এমন নয়। কোনো নিরীহ জন-আন্দোলনও একপর্যায়ে সহিংস আক্রমণের শিকার হতে পারে, এবং একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তার পরও মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের একটা দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন থেকে যাবে, একটা বড় দাগ রেখে যাবে এটি। কবি যেমনটা বলেছিলেন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।

নিজস্ব উদ্যোগ দ্রুতই নেয়া প্রয়োজন

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থ নেবে না সরকার— এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাটি আজ থেকে প্রায় সাত-আট মাস আগে বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করেছিলাম। কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব, সেটিও বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম সেখানে। বলেছিলাম, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরবে না এবং নিজস্ব অর্থায়নেই এটি নির্মাণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কাজ নিজস্ব অর্থায়নে করার প্রয়োজন নেই।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ মুদ্রায় জোগান দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এটি বড় কিছু নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখনো আছে। এর পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার বা তার কিছু বেশি হবে। সময় অতিবাহিত হওয়ায় ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। বিদেশী মুদ্রার ৫০ শতাংশ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সহজেই জোগানো সম্ভব। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সপ্রবাহও ভালো। আমদানি এবার কম হয়েছে আমাদের। ফলে রিজার্ভ থেকে প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কঠিন হবে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে চার বছরে অর্থাত্ ২ বিলিয়ন ডলার আমাদের একসঙ্গে ব্যয় করতে হবে না। প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশী মুদ্রার জোগান দিতে হবে। বাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ‘ডলার বন্ড’ ছেড়ে সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানে ৬-৮ শতাংশ সুদ দেয়ারও প্রয়োজন নেই।

আমি সম্প্রতি ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম, সেখানকার বিশেষজ্ঞ ও বসবাসকারীরা আমাকে বলেছেন, ২-৩ শতাংশ সুদ দিলেই ডলার বন্ড বিক্রি করা যাবে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সুদ পাওয়া যায় দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে ২-৩ শতাংশ সুদ ঘোষণা করলেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানকার বাঙালিদের কাছ থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। অনেক বাঙালি রেস্টুরেন্ট মালিক আমার কাছে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই বলছেন, বন্ডের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপবে। বিষয়টি ঠিক নয়। প্রতি মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে এবং রফতানি থেকে যে অর্থ পাচ্ছি, তার সামান্য অংশই ব্যয় করতে হবে বন্ডের সুদসহ আসল পরিশোধে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও রফতানি আয় বাড়ছে। ফলে বন্ডের অর্থ ও সুদ পরিশোধকে বোঝা ভাবার যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করি না। এটি পরিশোধে অনেক বছর সময়ও পাওয়া যাবে।

বড় বিষয় হলো সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্যোগ নেয়া ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের প্রশ্ন। নিজস্ব অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার কথা, যেটি এক বছর আগে বলেছিলাম; তখন নেয়া গেলে আরো ভালো হতো। সরকার উদ্যোগও নিয়েছিল; কিন্তু পরে সেখান থেকে পিছিয়ে আসে। এখন আবার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদে তেমন কিছু করা যাবে না সত্য; তবে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা সম্ভব এ সময়ের মধ্যেই। প্রতীকী হলেও কিছু কাজ শুরু করা উচিত। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে এর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পদ্মা সেতু থেকে হাই রিটার্নও মিলবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টও স্বীকার করেছেন, এ সেতুটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিকভাবে পদ্মা সেতু না হওয়ার যে মাশুল, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার তা দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকে অগ্রসর না হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরও রাজনৈতিক সমর্থন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। দুটি কারণ মিলেই রাজনৈতিক অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকেই যাওয়া উচিত। অন্যরা যে বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন যেমন— অর্থায়ন, এগুলো বড় বিষয় নয়; অন্তত দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায়। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞও এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে মত দিচ্ছেন। তারাও দীর্ঘমেয়াদে পদ্মা সেতু ও রাজনীতির বিষয়টি অনুধাবন করছেন। সন্দেহ নেই, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে স্বচ্ছতা বজায় রাখায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

পদ্মা সেতুটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ইস্যু নয়, এটি জাতীয় বিষয়। এক্ষেত্রে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো নির্মাণ ও এর উন্নয়ন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাও জরুরি। বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে আগামী সরকার সেটি চালিয়ে যাবে, তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কিন্তু সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। এক সরকারের নেয়া কর্মসূচি অন্য সরকার বন্ধ করছে না; বরং এটি সম্প্রসারণ করছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিলেও আগামী সরকারকে তা চালিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজ শুরুর পর বিশ্বব্যাংকও পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে। আমরা আহ্বানও জানাতে পারি। যমুনা নদীতে নির্মিত সেতুর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংক পরে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ স্থগিত রাখলে অর্থনৈতিক তো বটে, রাজনৈতিক-সামাজিকভাবেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।

উত্তর আধুনিকতার পাঠ

বিনায়ক সেন

১. আধুনিক যুগের ‘অবসান’ নেই?

ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে সময়কে তিন ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে_ যথাক্রমে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের জন্ম এবং পাঠ্যবইয়ের যুক্তি অনুসারে এই যুগ এখনও চলছে। আধুনিক যুগের অবসান নেই। এক অর্থে আধুনিক যুগে উত্তরণের পর থেকে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। এখন বড়জোর যেটা চলতে পারে তাহলো মূল ইতিহাসের বাইরে থেকে যাওয়া বিশ্বের অধিকাংশ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মেষশাবকের মতো ইতিহাসে প্রত্যাবর্তন। পাশ্চাত্যের যুক্তি_ সেটা সম্ভব কেবল আধুনিকায়নের মাধ্যমে। এটা শুধু এন্ড অব হিস্ট্রিখ্যাত ফুকোয়ামার যুক্তি নয়, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট তাত্তি্বকদের প্রায় সবাই কমবেশি এই মতে জড়ো হয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, এদের মধ্যে মতবিভেদ ছিল না। কিন্তু তা ছিল আধুনিকায়নের মধ্যেই মতবিভেদ। এনার্কিজম, সিন্ডিক্যালিজম, বলশেভিজম নানা মতবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল উন্নত-মাঝারি, পুঁজিবাদী নানা দেশে এই সময়ে। তবে এসব ডিসকোর্সে উপনিবেশের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না, কেননা উপনিবেশের অধিবাসীদের এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপ কখনও সমকক্ষ মানুষ বলেই স্বীকার করেনি। নইলে আমাদের ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ বলে ভাবাটাই সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। আরিস্ততলের গণতন্ত্রে যেমন দাসত্বের স্থান ছিল না, কান্ট-হেগেলের বিশ্ব-ইতিহাসে বা বৃহত্তর অর্থে বিশ্ব-শান্তির চর্চায় উপনিবেশের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আর বোবা ভাবলে বা করে রাখলে যা হয়, উপনিবেশ সম্পর্কে এক ধরনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মিথ্যাচারকে ক্রমাগতভাগে পুনরুৎপাদিত করা হচ্ছিল ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবিদ্যা নামক জ্ঞান কাণ্ডে। এসব তথ্য অবশ্য আমাদের ইতিমধ্যে এডোয়ার্ড সাইদের রচনা ও রণজিৎ গুহের নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চার কল্যাণে জানা হয়ে গেছে। এরা যেসব প্রশ্ন তুলেছেন তার আদি-প্রেরণা হিসেবে ছিলেন এবং আছেন মার্কস।

আধুনিকতা অথবা উত্তর-আধুনিকতা যে পথেই আপনি থাকুন না কেন মার্কসের কাছেই আপনাকে ফিরে যেতে হবে। অন্তত মার্কসের স্টেশনে কিছুক্ষণ হলেও আপনাকে জিরোতে হবে। এর কারণ, মার্কসের রচনাবলীর মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে আধুনিকতার অনিবার্যতা, তেমনি পাওয়া যাবে এর সমালোচনাও। অনেক সময় তিনি তার লেখায় যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন তা নিয়েই শতখানেক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখা হয়েছে। একটা উদাহরণ দেই। মার্কস এক পর্যায়ে বলেছিলেন, হেগেলের রচনায় ডায়ালেকটিকসের তত্ত্ব ‘মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে’। তার মানে এখন তাকে ‘সোজা করে নিলেই’ বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসকে নিষ্কাষণ করা যাবে। এ রকম একটা ব্যাখ্যা হতেই পারে। যেমন, একটা ব্যাখ্যা হতে পারে হেগেলের মন ভাববাদী, কিন্তু তার পদ্ধতি ডায়ালেকটিক্যাল যাতে কোনো ভুল নেই। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার এতে বাধ সাধলেন। তার যুক্তি, মাথার উপরে দাঁড়ানো হেগেলীয় পদ্ধতিকে সোজা করে নিতে গেলে নাট-বল্টু সবকিছুতে এলোমেলো হয়ে যায়। মার্কসীয় ডায়ালেকটিকস হেগেলের লেখা থেকে নয়, মার্কসের নিজের লেখা থেকেই আবিষ্কার [নিষ্কাষণ] করে নিতে হবে। সে সূত্রে তিনি মার্কসের মধ্যেই হেগেলীয় ‘তরুণ মার্কস’ আর স্বকীয় মহিমায় ভাস্বর ‘পরিণত মার্কস’_ এ দুইয়ের মধ্যে খুঁজে পেলেন ‘জ্ঞানতাত্তি্বক ভেদরেখা’ [এপিস্টেমোলজিক্যাল ব্রেক] । যা হোক এসব তর্ক ও ধন্দের কারণে মার্কসকে কখনও আধুনিকতাবাদীরা তাদের দলে টানার চেষ্টা করেছেন। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের অনেকেই মার্কসের রচনায় আধুনিকায়নের ‘নষ্ট রক্ত’ খুঁজে পেয়েছেন। আবার ফ্রেডেরিক জেমেসনের মত উত্তর-আধুনিক মার্কসবাদীরা মার্কসকে তাদের আদি-প্রেরণা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্যরা যারা প্রথম দিকে বেশ সোচ্চারেই মার্কস-বিরোধী ছিলেন বা সেদিকেই তাদের কণ্ঠ বেশি করে শোনা গেছিল, পরবর্তীতে তারাও তাদের মত কিছুটা বদলেছেন। বিশেষভাবে এটা ঘটেছে ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদার রচনায়_ স্পেক্টর অব মার্কস গ্রন্থের পর থেকে। ফুকোর শেষের দিকে রচনায় জোরেশোরে ফিরে এসেছে ইতিহাসে কর্তার [সাবজেক্ট] ভূমিকা, ফলে মার্কসের রচনার মতোই তরুণ ফুকো ও পরিণত ফুকোর মধ্যে বেশ খানিকটা ভেদরেখা সৃষ্টি হয়ে গেছে।

এসব বিভিন্নবিধ সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনার পেছনে মূল তাগিদ হচ্ছে সমাজকে বদলানো। আর সমাজকে বদলাতে গেলে প্রথাগত ব্যবস্থার দুই প্রধান সহায়ক শক্তি_ রাষ্ট্রযন্ত্র ও অর্থনীতি_ এদেরকেও যে বদলাতে হয়। আর এই পাল্টে দেয়ার ব্যাপারটা তো পুরোনো দালান ভেঙে নতুন দালান করার প্রকল্প নয়। একেক রাষ্ট্র ও একেক অর্থনীতি একেক ধরনের সমাজ ও সেই সঙ্গে একেক ধরনের ‘মানব’ তৈরি করে থাকে। আমরা যে কথার কথা হিসেবে বলি, উনি বেশ সনাতনী ধারার লোক, উনি বেশ চলতি হাওয়ার পন্থী সেসব আদৌ কথার কথা নয়।

আধুনিকায়নের মধ্যে থাকতে থাকতে আমাদের অন্দর-মহলেও আধুনিকায়ন ঢুকে পড়ে। চিন্তা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই, কিন্তু মনের জানালা দিয়ে আধুনিকায়নের স্বপ্ন কুয়াশার মতো ঢুকতে থাকে। ঢাকার রাস্তায় হাঁটি, কিন্তু মনে মনে ঢাকা শহরকে দেখি না, আসলে হাঁটতে থাকি ম্যানহ্যাটানের ফুটপাতে। এদেশ এগুচ্ছে; তার বিলবোর্ড করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি বা আইফেল টাওয়ারের কথা। গ্রাম-বাংলার তপ্ত দুপুরের রোদে কাজ থামিয়ে ক্ষেতের পাশেই গামছা বিছিয়ে নামাজ পড়ছে যে বৃদ্ধ কৃষক তার মুখচ্ছবি আমাদের বিলবোর্ড থেকে হারিয়ে যায়। রণে-বনে- সংকটে আমরা পীর-মুর্শিদ বা পুণ্যধামে ছুটি না আর। নবযুগের পীর-আউলিয়া ড্যান মজীনারা আমাদের আশ্বস্ত করেন। কোন পথ ধরে এগুলে আমরা পাশ্চাত্যের গুডবুকে থাকব, জিএসপি সুবিধে বাতিল হবে না, বা পাব ‘মডারেট মুসলিম ডেমোক্রেসি’র খেতাব, আর কি করা গেলে ওবামা বা নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন ঢাকায়, এমডিজিতে সাফল্যের করণে_ চাই কি শান্তির নোবেল_ এসব আমাদের রাষ্ট্রীয় তৎপরতার একটি প্রধান সাফল্য-সূচকে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট ইংরেজ বড় ইংরেজ’ ধারণা অনুসরণ করে বলা যেতে পারে ‘ছোট আধুনিকতা’ [তৃতীয় বিশ্ব] বনাম ‘বড় আধুনিকতা’ [পশ্চাত্য] এই খেলাই চলছে এখন।

২. আধুনিকতার আদি প্রতিশ্রুতি

‘আধুনিকতার’ কোন একক সংজ্ঞা নেই। অর্থশাস্ত্রে আধুনিকায়ন [মডার্নাইজেশন] বলতে নগরায়ন, শিল্পায়ন প্রভৃতি ধারণা ব্যক্ত হয়ে থাকে। সমাজতত্ত্বে [ইংরেজিতে_ সোশ্যাল থিওরি] আধুনিকতা বা মডার্নিটি আবার ‘পুঁজিবাদ’ ধারণার সমার্থক। উত্তর-আধুনিকেরা অবশ্য পরবর্তীতে দেখিয়েছেন যে, প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ধারণাতেও আধুনিকতার মন্দ অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। পুঁজিবাদের মতো প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নির্মাণে, শিল্পায়নের পরিকল্পনায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে, নগর-ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধারার প্রযুক্তি-নির্ভর অবিবেচক মানসিকতা, একই ধরনের প্রবৃদ্ধি [গ্রোথ] মুখীনতাকে মানব-কল্যাণের উপরেও স্থান দেওয়া হয়েছিল। স্তালিনের শাসনামলেই ‘আদি সমাজতান্ত্রিক পুঁজি সঞ্চায়নের’ মাধ্যমে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবৃদ্ধিশীল দেশে পরিণত হয়েছিল ১৯২৬-৩৬ পর্বে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্র্তীতে ফেলদ্ম্যান-হ্যারড ডোমার প্রবৃদ্ধি-মডেলের উপত্তিগত ভিত্তি যুগিয়েছিলেন। এটা করতে গিয়ে যে অমানুষিক খেসারত দিতে হয়েছিল সেটা বড় বিবেচনা নয় এখানে। এর মধ্য দিয়ে প্রথাগত সমাজতন্ত্রে ক্রমশ স্থান করে নেয় যন্ত্র-মানব, যন্ত্রের রাজত্ব, বৃহত্তর-অর্থে ‘কলের নেশন’। ‘রক্তকরবী’র রাজা যেমন অনুভব করেছিলেন তারই সৃষ্ট যন্ত্র আর তার বশ্যতা মানছে না সেভাবেই একপর্যায়ে বিপর্যস্ত বোধ করেছিল প্রথাগত সমাজতন্ত্র। ক্রমশ প্রকৃতির প্রতি মেষপালকের মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জায়গা করে নিতে থাকে যন্ত্র-মানবের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘আই-রোবট’ সিরিজের লেখক আইজাক আসিমভ যেসব রোবটিক্যাল প্রিন্সিপলের কথা বলে গেছেন_ যা নিয়ে একুশ শতকে আমাদের আরও ভাবতে হবে_ সেসব নিয়ম মানেনি কলের রাজত্বের নব্য শাসকেরা। এর ফলেই নিয়ম উনিশ-বিশ শতকের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যবস্থাই ধারাবাহিকভাবে সংকটে পড়েছে।

এনলাইটেনমেন্টের তাত্তি্বকরা আধুনিকায়নের মাধ্যমে মানবকল্যাণ সাধনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেই যুগ এখনও আমাদের দেখতে বাকি। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের একটি বড় অংশই সে কথা মনে করেছেন। টেকনোলজিক্যাল মেন, ওয়ান-ডাইমেনশনাল মেন, ডেথ অব মেন_ এসব ধারণার মধ্য দিয়ে সমালোচকেরা চেয়েছেন সভ্যতার নতুন পর্যায়। দেরিদাঁ যাকে সুন্দর করে বলেছেন একটি আপ্ত-বাক্যে_ ‘যে গণতন্ত্র আসতে বাকি’ [ডেমোক্রেসি-টু-কাম]। অর্থাৎ এখন গণতন্ত্রের নামে উন্নত বিশ্বে [এবং সারা বিশ্বে] যা চলছে তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। আধুনিকতার মধ্যেই যারা বিকল্প সম্ভাবনা খোঁজেন সে রকম একজন জার্মান দার্শনিক হাবেরমাস_ তারও বক্তব্য এটাই। পাবলিক রিজন বা তর্ক-বিতর্ক-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সিভিল সমাজ নতুন কোন পথ খুঁজে নেবে ইউরোপে যা পাশ্চাত্যের অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র ও অসাম্যকে অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। বোদ্রিলার থেকে লিওতার পর্যন্ত ‘খাঁটি’ চরম উত্তর-আধুনিকতাবাদীরাও এতে হয়তো সায় দিতেও পারেন।

৩. ‘আধুনিকতা’ কি করতে চাইছে?

যে বিষয়ে সংজ্ঞা দেওয়াই কঠিন তা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করাই এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। আধুনিকতার সরলতম সংজ্ঞায় মৌল উপাদানকে [দাবিকে] চিহ্নিত করা যেতে পারে। তার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া হচ্ছে আধুনিকতার প্রথম দাবিটি। সেটি হচ্ছে, সব ধরনের সমাজকেই একটি অভিন্ন ছাঁচে ঢালার চেষ্টা, বা সমসত্ত্বতার [হোমজেনিটি] দাবি। মনে করুন, আপনি গত এক মাসে বিভিন্ন মহাদেশের বেশক’টি দেশের বড় বড় শহরেই ঘুরে এলেন। প্রতিটা শহরেই আপনি থেকেছেন পাঁচতারা হোটেলে। প্রতিটা হোটেলেই যে রুমে আপনি ছিলেন তাতে ছিল একই ধারার টিভি, বাথরুমের অভিন্ন ফিটিংস, কার্পেটিং এবং দেয়ালে প্রায় একই ধারার আধুনিক চিত্রকর্ম। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারে যে রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেলেন সেটিও [ধরা যাক] ছিল ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেলেন একই ধারার বিমানে করে, একই ধরনের সিটে বসে, একই ধরনের হলিউডি বা বলিউডি সিনেমা দেখতে দেখতে এবং প্রায় একই ধরনের স্ন্যাক ও পানীয় খেতে খেতে। এমনকি প্রায় একই ধরনের হাসি হেসে প্রায় একই ধরনের পোশাকের ও চেহারার বিমানবালা আপনাকে জানালো তার মাপা অভিবাদন। প্রায় একই চেহারার বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আপনি প্রায় একই রঙের ক্যাবে করে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেখানে সর্বত্র দেখেছেন একই ধরনের কোম্পানির বিজ্ঞাপন সংবলিত বিলবোর্ড। এত ‘সমসত্ত্বতার’ মধ্যে চলতে চলতে, বাস করতে করতে, একসময় আপনার হঠাৎ মনে হতেই পারে যে আপনি আসলে কোথাও যাননি, একই জায়গাতেই রয়ে গেছেন। আপনি আসলে টেরই পাচ্ছেন না কখন আপনি মেক্সিকো সিটিতে, কখন ন্যুয়র্কে, লন্ডনে, বার্লিনে, জোহানেসবার্গে, দুবাইয়ে, দিলি্লতে, ব্যাংককে বা সিডনিতে আছেন। এসব শহরের যে সার্কিটে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাতে করে স্থানের ও সময়ের কোনো বিশিষ্টতা খুঁজে পাচ্ছেন না আর [একমাত্র গায়ের রঙে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা ছাড়া]। কেননা, পোশাকে-আশাকেও সর্বত্র আপনি যাদের দেখছেন তারা প্রায় একই ধাঁচের জিনস, টপস, সানগ্গ্নাস পরে হালফিলের ল্যাপটপ বা আই-প্যাড নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই গল্পটা কল্পিত হলেও অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য নয়। আধুনিকতা নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা এমনই এক সমসত্ত্ব সমাজকে [জগতকে] কল্পনা করি। এই হচ্ছে আধুনিকায়নের পয়লা নম্বর দাবি। পুঁজিবাদ সারা বিশ্বকেই তার নিজের ছাঁচে গড়ে-পিটে তুলবে তা সে আদিবাসী-অধ্যুষিত অরণ্যই হোক, কৃষক-সমাজই হোক, আর নোমাডিক বা বেদুইন পশুপালক গোত্রই হোক। সুদূর জাভা থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, দূরবর্তী পাপুয়া নিউগিনি থেকে আন্দিস পর্বতমালা, ভারতবর্ষ থেকে সাহারা অঞ্চলবর্তী আফ্রিকা_ সর্বত্রই শিল্প-পুঁজি, বণিক-পুঁজি বহুজাতিক পুঁজি তার বাজারের সন্ধানে অনুপ্রবেশ করবে, বদলে দেবে প্রাগ-পুঁজিবাদী দৃশ্যপট এবং দেখাবে একটাই সিনেমা_ মেড ইন ইউএসএ বা মেড ইন ইউরোপ। সমসত্ত্বতার এই দাবিতে ক্ষুব্ধ উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের বক্তব্য এর ফলে হ্রাস পাচ্ছে জীবনবৈচিত্র্য, সামাজিক বৈচিত্র্য, প্রতিভার বৈচিত্র্য। এই আধুনিকতা আসলে সৃষ্টিশীলতা বিনাশী, কেননা এটা ব্যক্তিক/আঞ্চলিক সংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিনষ্ট করছে। তাছাড়া সমসত্ত্ব ছকে ‘উন্নয়ন’ সম্ভব নয়, যেমন এক সাইজের জ্যাকেটে সবাইকে কাপড় পরানো চলে না। যদিও ওয়াশিংটন কনসেসাস সেটাই করতে চেয়েছিল গত দু’দশক ধরে। আধুনিক সরল সমসত্ত্বতার বিপরীতে উত্তর-আধুনিকেরা চেয়েছেন জটিলতর অসমসত্ত্বতা, বিভিন্ন কোরাস, ভিন্ন ভিন্ন পথে চলার নমনীয়তা।

আধুনিকতার দ্বিতীয় দাবিটি ক্ষমতা-সম্পর্কিত। এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতি আধুনিকতার পক্ষপাতিত্ব। এর সবচেয়ে কাছের উদাহরণ_ আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা। সমাজে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্র্রের ক্ষমতা সমাজের আর সব ক্ষমতার উপরে। সবার উপরে রাষ্ট্র সত্য তাহার উপরে নাই_ এটি হচ্ছে আধুনিক চণ্ডীদাসের স্ল্নোগান। প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও একই চেহারা। পার্টির বা এর পলিটব্যুরো সেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। তুলনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভবন থাকলেও সেখানেও রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী-নির্ভর সরকার ব্যবস্থা কেন্দ্রাতীগ ক্ষমতার প্রায়োগ করে থাকে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর এক বিশ্বের ধারণা সারাবিশ্বে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক প্রয়োগকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংকে বিশ্বের প্রায় সব দেশই সদস্য। কিন্তু সেখানে এক দেশ এক ভোট প্রথা নেই। বিশ্বব্যাংকের তহবিলে যার হিস্যা যত বেশি তার তত বেশি ভোট। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একাই প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভোটে ক্ষমতাবান। অর্থাৎ সবই সমান, বলা হলেও আধুনিক গণতন্ত্রে কেউ কেউ ‘বেশি সমান’। এ ধরনের গণতন্ত্রে এক মানুষ-এক ভোট ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত প্রবর্তিত হয় এক ডলার-এক ভোট ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতা যার যত বেশি তার হাতে তত বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের পটভূমিতে স্টিগলিৎজ মহাশয় এই বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছেন।

আধুনিকতার এই দ্বিতীয় দাবিটিকেও মেনে নিতে পারেননি উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এ কালের পুঁজিবাদের সঙ্গে সেকালের পুঁজিবাদের পার্থক্য ঘটে গেছে গত কয়েক দশকে। সেকালের পুঁজিবাদে ক্ষমতার প্রয়োগ হতো এক-কেন্দ্র থেকে। কিন্তু এ কালের পুঁজিবাদে ক্ষমতা আর এক কেন্দ্রে সীমিত নেই; ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র ও উৎস ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে। এটি ছড়িয়ে আছে স্কুলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্বাস্থ্যনিবাসে, জেলখানায়, পুলিশ ও সামরিক দপ্তরে, পরিবারের ভেতরে, বাজারের সিন্ডিকেটে, টেলিভিশনের চ্যানেলে, পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, খেলার মাঠে অর্থাৎ ক্ষমতা প্রায় সর্বত্র বিরাজমান। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভুত্বশীল শ্রেণীর ক্ষমতার চর্চাকে পূর্ণ গণতন্ত্রায়ন করতে গেলে বা জনমানুষের স্বার্থের সম্পূর্ণ অনুকূলে নিতে গেলে শুধু রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে বা রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রায়ন করলে চলবে না। সমাজের আর বাদবাকি যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা উপরে উল্লেখ করা হলো তার প্রতিটাতেই গণতন্ত্রায়ন সাধিত হতে হবে। মিশেল ফুকো যেমন দাবি করেছেন, ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রে থাকে না; এটা বহমান রয়েছে শিরায়-উপশিরায়-তন্তুতে_স্নায়ুকোষে-ডিএনএ-তে। উত্তর-আধুনিকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার এই সর্বব্যাপী অস্তিত্বের কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলালেই ক্ষমতার অবলুপ্তি ঘটে না, এতে করে বড়জোর ক্ষমতার হাতবদল ঘটে মাত্র। এই সূত্রে তাঁরা প্রথাগত সমাজতন্ত্রের মধ্যে ক্ষমতার আরও বোঝা হয়ে ‘গেড়ে বসাকে’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। জারতন্ত্র সরিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলেও ক্ষমতার দাপট কমেনি। পার্টি ও রাষ্ট্রের একশ্রেণীর আমলাদের হাত দিয়ে ক্ষমতার চর্চা চলেছে। এর কারণ, সমাজের নানা স্তরে জারতন্ত্রের শেকড় রয়ে গিয়েছিল অথবা নতুন করে পার্টিতন্ত্র সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার ক্ষমতার শেকড় ছড়িয়েছিল। মার্কস কথিত ‘ফ্রি এসোসিয়েশন অব ফ্রি প্রোডিউসার্স’ আর করা যায়নি। এ তো গেল প্রথাগত সমাজতন্ত্রের কথা। উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতা চর্চার আরও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম শেকড়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন ফুকো ও তার অনুসারীরা। যেমন ফুকোর একটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতাসীনেরা টিকে থাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সত্য-উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বস্তুগত উৎপাদনের মতো ‘সত্য-উৎপাদন’ পুুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য। এসব সত্য আপাত দৃষ্টিতে স্থান-কাল নিরপেক্ষ উদাহরণ মনে হলেও এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে ক্ষমতা-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। আবদুল মান্নান সৈয়দ যেমন লিখেছিলেন, ‘সত্যের মত বদমাশ’। এমনকি নিরীহতম গবেষণা-কাণ্ড যেটি তার মধ্য দিয়েও এমন সব সত্য উদ্ভাবন বা নির্মাণ করা হচ্ছে যার আসল লক্ষ্য_ মানবকে আরও বেশি করে শাস্ত্রের অধীনে আনা, এনে তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, তাকে মুক্ত করা নয়। ফুকো যেমন চিকিৎসা-শাস্ত্রের ইতিহাস ঘেঁটে জানিয়েছেন, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ ব্যবহারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে নতুন মনোবিদ্যায়। ব্যবহারের ‘স্বাভাবিকীকরণের’ [নর্মালাইজেশন] মাধ্যমে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সংক্ষুব্ধ শক্তিকে বশীভূত করা হয়েছে বিভিন্ন বিদ্যার, বিজ্ঞানের, রীতির, আচারের সমবেত প্রয়োগের মাধ্যমে। এর ফলে এক পর্যায়ে খাঁচার সব দরোজা খুলে দিলেও বনের পাখি আর উড়ে যেতে পারছে না_ স্বেচ্ছায় সে থেকে যাচ্ছে গৃহপালিত পাখি হিসেবেই।

উত্তর-আধুনিকেরা এই সত্য-উৎপাদনের তত্ত্ব ও তার ফল-পরিণামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক হিসেবে ফিরে যাচ্ছেন আন্তোনিও গ্রামসির সর্বেশ্বরতার [হেজিমনি] তত্ত্বে। আল থুসারের ‘আইডিওলজিক্যাল এপারেটাস অব স্টেট’ ধারণারও এটি কিছুটা অনুবর্তী। তবে গ্রামসি ও আল থুসার দুজনেই সত্য [বা ভাবাদর্শ] উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র-ক্ষমতার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচ্ছন্ন প্ররোচণা হিসেবে দেখেছিলেন। উত্তর-আধুনিক তাত্তি্বকদের কাছে, সত্য-উৎপাদন কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন চক্রের সজ্ঞান ষড়যন্ত্রের পরিণাম নয়। রোগ-জীবাণুর মতো তত্ত্ব বা সত্য নিজেই ক্ষমতার ধারক-বাহক হয়ে উঠতে পারে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে_ তাতে রাষ্ট্রের বিশেষ দপ্তরের ষড়যন্ত্রের বা সালতামামির প্রয়োজন নেই। এর মধ্য দিয়ে উত্তর-আধুনিকেরা নিজস্ব মূল্যেই তত্ত্ব নির্মাণ, মতাদর্শ প্রচার, বিশ্বাস ও ভাবাদর্শ_ জ্ঞানচর্চার যে কোন রূপকেই_ আরও বেশি ঘনিষ্ঠ ভাবে, জোরালো ভাবে, বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে একটি প্রশ্নে আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী উভয়েই এক-অবস্থানে। উভয়েই মনে করেছেন যে একালের পুঁজিবাদে সবকিছুই পরিণত হয়েছে পণ্যে। শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান মানব-সৃষ্টির কোনো শাখাই আর মার্কস-কথিত পণ্যমোহবদ্ধতার [কমোডিটি ফেটিশিজম] বাইরে, থাকছে না। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, সব কিছুই যদি পণ্য হয় [যেমন চে গুয়েভারার বিপ্লবী প্রতিকৃতির পোস্টার] তাহলে মানব-মুক্তি আসবে কোন পথে? যদি সমাজের সব খাতই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়ে থাকে তাহলে প্রতিরোধ দানা বাঁধবে কি করে? এর উত্তরে ফুকো বলেছিলেন, যেখানেই ক্ষমতা সেখানেই প্রতিরোধ দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের মধ্যে কোথাও স্বভূমির অস্তিত্ব থেকে যায় সমস্ত বন্দিদশার মধ্যেও। যেখানে পাখা মেলে মুক্তির বাসনা। ফুকো নিজেকে কখনো উত্তর-আধুনিক বলে দাবি করেননি। তবে ফুকো বা উত্তর-আধুনিকেরা ‘আধুনিকতার’ যে সমালোচনা নির্মাণ করেছিলেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে। তাঁরা প্রায় কেউই উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের বাইরের তৃতীয় বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে পারেননি। শেষোক্ত ক্ষেত্রে জোরেশোরে এগিয়ে আসে উত্তর-উপনিবেশিক সমাজের তাত্তি্বকেরা। উত্তর-উপনিবেশিকতাকে [পোস্ট কলোনিয়ালিটি] বিচারের মধ্যে এনে তারা পুঁজিবাদী আধুনিকতার আরেকটি চেহারা তুলে ধরেন। এই চেহারাটি মূলত ‘কপট, প্রতারক ও মায়াবী’ আধুনিকতার, যার মোদ্দা কথা হলো : হয় ছলে, নয় বলে, যে কোনো কৌশলে সাম্রাজ্য বিস্তার করো, অথবা প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম_ এমন শক্তিকে যে কোনো উপায়ে দুর্বল করে দাও। বাংলার উপনিবেশিক আমলের একটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় টেনে আনছি। এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশের পরিসরে আধুনিক ক্ষমতা-সম্পর্কের ‘কপট প্রতারক ও মায়াবী’ চরিত্রটি কিছুটা হলেও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

৪. আধুনিকতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ

উনিশ শতকের তিরিশের দশকের কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। উপনিবেশ ভারতের শিক্ষাদানের ভাষা, পাঠ্যসূচি ও সাহিত্য কীভাবে গড়ে তোলা উচিত তা নিয়ে জোর তর্ক চলছে ইংরেজদের মধ্যে। তর্কটা হচ্ছে ওরিয়েন্টালিস্ট ও এংলিসিস্টদের মধ্যে। কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনের সদস্যরা এ নিয়ে প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। ১৮৩৫ সালে লিপিবদ্ধ এর কার্যবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে, কমিটির অর্ধেক সদস্যরা ইংরেজিতে শিক্ষাদানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বাকি অর্ধেকের রায় নেটিভদের মধ্যে প্রচলিত শিক্ষারীতির পক্ষে। আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় পাঠদান অব্যাহত থাকুক_ এটাই তারা চাইছেন। তরুণ জন স্টুয়ার্ট মিলও এই শেষোক্ত দলের পক্ষ হয়ে কলম ধরেছেন। এই বিতর্কের দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছেন গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক নিজেও। বিদগ্ধ টমাস বেবিংটন ম্যাকলে চান নেটিভদের মধ্যে এংলিসিস্ট সাহেবদের একটি দেশীয় শ্রেণী গড়ে তুলতে। তাঁর লক্ষ্য, উপনিবেশ ভারতে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে কেবল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাঠদান করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এ পথেই কেবল শিক্ষার বিস্তার ঘটতে পারে উপনিবেশে। আলোকপ্রাপ্তি হতে পারে স্থানীয় অধিবাসীদের। এভাবেই বর্বরতার যুগ থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে আধুনিকতায়। বিতর্কের এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাকলে সাহেব যা বললেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের ইংরেজ শাসকদের জন্য ‘ম্যানিফেস্টো’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোটা দাগে সেটা শোনালো এ রকম : ‘আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আসলে কোন ভাষা জানাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য সংস্কৃত বা আরবি কোনো ভাষাই আমার জানা নেই। তবে, এসব ভাষার কতটুকু অন্তর্নিহিত মূল্য তা যাচাইয়ের জন্য যা করার তার সবই আমি করেছি। আরবি ও সংস্কৃত ভাষা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ গ্রন্থগুলো আমি পড়েছি। যারা এসব ভাষায় কথা বলে থাকেন তাদের সঙ্গে আমি আলাপ-আলোচনা করেছি। যারা প্রাচ্যবিদ বলে পরিচিত, প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে তাদের জ্ঞানকে আমি মান্য করি। এসব প্রাচ্যবিদের মধ্যে আমি আজ পর্যন্ত একজনকেও পাইনি যিনি অস্বীকার করেছেন যে, একটি ভালো ইউপরোপীয় গ্রন্থাগারের যে কোনো তাকও ভারতবর্ষ ও আরব ভূভাগের সমগ্র নেটিভ সাহিত্যের সমান মূল্যবান!’ ম্যাকলে সেদিন যা বললেন, তার একদশকের মধ্যে বাংলায় শুরু হলো ‘রেনেসাঁ’। ১৮৫০-এর দশকে রেলগাড়িও এলো এদেশে। এরপর থেকে গ্রাম হয়ে গেল অজপাড়া-গাঁ, আর শহর হয়ে পড়ল আধুনিকতার কেন্দ্র। সেদিনের নবজাগরণের নায়কেরা ম্যাকলের কথাতেই আস্থা আনলেন। তাঁদের সবারই স্বপ্ন ছিল, ম্যাকলে বর্ণিত ইউরোপীয় ভাষা-সাহিত্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ওপর ভর করে ‘আধুনিক জাতি’ হিসেবে একদিন জগৎ সভায় তাঁদের সমাজ স্থান করে নেবে। ঔপনিবেশিক চিন্তার সঙ্গে আমাদের নাড়ির বন্ধনের সেখানেই সূত্রপাত। আধুনিকতার স্বপ্ন দেখার শুরু সে সময়েই। বিষয়টা তাহলে দাঁড়াচ্ছে_ আমাদের জীনের সমস্যা।

এর পরবর্তী একশ বছর ধরে ‘আধুনিক’ শব্দটা এতটাই প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছিল আমাদের যে তা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘সভ্যতা’ বা সিভিলাইজেশনের নামান্তর। উনিশ-বিশ শতকের ভদ্রসম্প্রদায় বা ভদ্রলোক এসব শব্দবন্ধের মধ্যে যে ভদ্রতার ‘ধারণা’ মিশে ছিল তাকে ওই আধুনিকতার বাইরে আর কল্পনা করা যাচ্ছিল না। যুক্তিটা ছিল এ রকম : প্রাগ-আধুনিকেরা প্রাচীনপন্থি, রক্ষণশীল, পুরনো সংস্কারের মধ্যে আবদ্ধ জীব; যেন তারা প্রায় অসভ্য, আন-সিভিলাইজড। এর বিপরীতে আধুনিকেরা হচ্ছে প্রগতিপন্থি, চলতি হাওয়ার দল, বিজ্ঞানমনস্ক, জাত-পাত না-মানা বিদ্রোহী; যেন তারাই একমাত্র সভ্য, সিভিলাইজড। এ রকম দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ল বাংলার বিদ্বৎসমাজ_ প্রথমে হিন্দুরা, পরে একপর্যায়ে এই বিভক্তি দেখা দিল কালক্রমে মুসলমান সমাজেও। অবশ্য কারও কারও মতিভ্রমও হলো_ একবার কেউ এ দলে নাম লেখালেন, আরেকবার অন্য দলে ভিড়ে গেলেন। যেমনটা হলো কেশবচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র ও মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রে। কিন্তু আধুনিকতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের শিবিরবিভক্তির কয়েকটি বেদনাদায়ক ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া দেখা গেল অন্যত্র, যার প্রভাব বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য ভালো হয়নি।

প্রথমত, ইউরোপীয় ধারা মেনে চললে আধুনিক, নইলে তা রক্ষণশীল ও অনাধুনিক_ এ রকম একটি চটকজলদি সমীকরণ তাঁবু গাড়ল প্রথাগত জ্ঞানচর্চায়। এমনকি মনের ভুবনেও_ সেটা কিছুটা জ্ঞাতসারে, কিছুটা অজ্ঞাতসারে। প্রাগ-আধুনিক হয়েও তো সভ্য, ভদ্র ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায়। যেতে পারে। এ রকম সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া আর সহজে সম্ভব হলো না। শুধুমাত্র এই কারণেই ভূদেব মুখোপাধ্যায়_ যিনি ধর্ম ও পরিবার চিন্তায় সনাতনীয় হলেও ছিলেন হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মের মধ্যে ব্যবহারিক, জ্ঞানগত ও আত্মিক যোগসূত্র স্থাপনে বিশ্বাসী ও উদগ্রীব_ তার সমসাময়িক বঙ্কিমের মতো তেমন কোনো গুরুত্ব পেলেন না বাংলার বিদ্বৎসমাজে। বঙ্কিমকে উপর্যুপরি ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লেখার পরও সে রকম কোনো অপযশ কুড়াতে হলো না তাঁর স্বধর্মীদের কাছ থেকে। অথচ, ভূদেব ‘স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস’-এর মতো মৌলিক গ্রন্থ লিখেও পেলেন না সামাজিক বিজ্ঞানীর যথাবিহীত সম্মান। অর্থশাস্ত্রে বঙ্কিমের তুলনায় তাঁর অধিকতর বুৎপত্তিও আড়ালেই থেকে গেল। এর কারণ, বঙ্কিমচন্দ্রকে বরাবর দেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক ভারতের এক পথিকৃৎ ‘আধুনিক চিন্তক’-এর ভূমিকায় [যে আধুনিকতার সংজ্ঞা আবার উপযোগবাদী মিল বেন্থাম দ্বারা নির্দিষ্ট]।

দ্বিতীয়ত, প্রাগ-আধুনিক মানেই প্রাচীনপন্থি ও রক্ষণশীল এ রকম মনে করার কারণে যা-কিছু ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের বাইরে, তাকেই অস্বীকার বা খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা দেখা দিল। মহামতি কৌটিল্য যে কিসিঞ্জারের মতোই ‘আধুনিক’ হতে পারেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিস্তারে সে সম্ভাবনাকে আমলে নেওয়া হলো না। আকবর বাদশাহ ও আবুল ফজল মিলে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে নমুনা খাড়া করেছিলেন তা ইউরোপীয় ‘সেক্যুলার’ আদর্শের তুলনায় কোনো অংশে কম আদরণীয় অর্জন ছিল না_ সেটাও আমরা অনেককাল পর্যন্ত মনে রাখিনি। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে চেষ্টা করেছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য_ বিশ্ব সভ্যতার এ দুই ঐতিহ্যের মধ্যে সভ্যতার ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করতে। ইউরোপের মানবতন্ত্রের সাথে বাংলার আউল-বাউল-সহজিয়া ধারার ‘মনের মানুষ’-এর মানবতন্ত্রের মধ্যে ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করা ও তাঁর দর্শনচিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। এককথায়, তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার আধুনিকতাকে সমকক্ষতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে। কিন্তু তার কথা আমরাও শুনতে চাইনি, আর ইউরোপীয় মনীষা শুনতে চাইলেও তা বুঝতে অপারগ থেকেছে। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো রবীন্দ্রনাথও যে মুক্ত-চিন্তক বা ‘ফ্রি-থিংকার’ হতে পারেন, সেভাবেও আমরা তাকে বিচার করতে পারি_ সেসব কোনো সম্ভাবনা আমাদের মনে জাগেনি। ১৮৩৫ সালের কার্যবিবরণীতে ম্যাকলে তাঁর ভাষণে যেমন বলেছিলেন, প্রাচ্যের আছে কেবল কিছু মহান কবি, কিন্তু তারা তো কল্পনার রাজ্যে বিরাজ করে থাকেন মাত্র। জ্ঞানের রাজ্যে তাদের কোনো দক্ষতা নেই। রবীন্দ্রনাথকেও আমরা সেভাবেই কমবেশি কবির শিরোপা পরিয়ে দিয়ে জ্ঞানচর্চার মূলক্ষেত্র থেকে সরিয়ে রেখেছি।

প্রাগ-আধুনিককে খাটো করে দেখার কারণে তৃতীয় যে সমস্যা দেখা দিল তা হলো, ইউরোপীয় আধুনিকতাকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বড়ো ও মহার্ঘ করে আমরা দেখতে শুরু করলাম। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। এখনও বিশ্বব্যাংক বা মার্কিন দূতাবাস বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বললে আমরা ‘তা ঠিক, তা ঠিক’ করতে থাকি। উপনিবেশে ইউরোপ যেসব নিয়ম-কানুন, রাষ্ট্রযন্ত্র, তত্ত্ব ও আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা শুরু করল তাকেই আমরা নির্বিচারে মেনে নিতে শুরু করলাম ‘আধুনিক মানুষ’ হওয়ার সাধনায়। ইউরোপ যখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর গুরত্ব দিতে শুরু করল উনিশ শতকে, উপনিবেশে তারা গ্রহণ করল ভিন্ন নীতি। এ ক্ষেত্রে তারা নিল কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতাবান করার নীতি। সেই পথ ধরে আমরাও ভাবতে শুরু করলাম যে, আধুনিক রাষ্ট্র মানে আসলে এটি একটি কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা। ইউরোপ উনিশ শতকের শেষ থেকে নিজের দেশে আস্তে আস্তে গণশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, গণস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করল। কিন্তু উপনিবেশে সেসব ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠাই পেতে দিল না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসের মতো ইউরোপীয় শাসকদের কেউ কেউ আদিতে চেয়েছিলেন কৃষিতে স্ব-আবাদি ব্যক্তি মালিকানাধীন খামার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু কার্যত যা গড়ে উঠল তা হচ্ছে এক আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থা, যার মূল অভিপ্রায় ছিল এক অনুগত ও বাধ্যগত দেশীয় শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা করা। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আশ্রয়েই এ দেশে গড়ে উঠল এক জনবিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র যেটা আদৌ খোদ ইউরোপে প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। এককথায়, ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকেই ‘আধুনিকতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত’ মনে করে আমরা না-পেলাম প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ মনীষার ছায়া, না-পেলাম ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের সেরা অন্তর্দৃষ্টি। এর বড় প্রমাণ, প্রত্যক্ষ উপনিবেশের অবসানের পরেও আমরা নিজেদের মতো করে উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানাদি ভাবতে ও গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলাম না। ‘ইউরোপ উদ্ভাবন করবে এবং আমরা কেবল তার প্রয়োগ করব’, অর্থাৎ আমরা চিরকালই থাকব হাত পেতে_ এই মানসিক ছক থেকে বেরিয়ে যাওয়া আমাদের হলো না। আমরাও অনেক খাতে উদ্ভাবন করব এবং বাদবাকি বিশ্ব তা প্রয়োগ করবে_ এ রকম কোনো জ্ঞানভিত্তিক অভিমান আমাদের মধ্যে আজও এলো না। ফলে একজন দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ, একজন দ্বিতীয় সত্যেন বোস, একজন দ্বিতীয় মুহাম্মদ ইউনূস_ যারা সারা বিশ্বে বঙ্গ, বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে সৃষ্টিশীলতার মানদণ্ডে অতীতে ও সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠা করেছেন_ তারা শুধু ব্যতিক্রমী উদাহরণই হয়ে থাকলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে কত কথা হচ্ছে এখন। বলা হচ্ছে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা। অথচ আজকের ঢাকা শহর যতই ‘আধুনিক’ বলে নিজেকে দাবি করুক না কেন, এখানে আজও প্রতিষ্ঠা পায় না অন্তত একটি দ্বিতল বা ত্রিতল বই-পত্রের ভবন, যেখানে থাকবে নানা দেশের ও শাস্ত্রের বই, যার নিকটতম তুলনা হতে পারে আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো বার্নস-এন্ড-নোবলস বা ওয়াটারস্টোনস। অর্থাৎ আধুনিকায়নের মন্ত্রটাও আমরা সঠিকভাবে আওড়াতে পারিনি।

আধুনিকতার মূল সমস্যাটা রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথ ঠাকুর ঠিকই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ইউরোপীয় বা বৃহত্তর অর্থে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, সে যা বলে, যা আদর্শ হিসেবে প্রচার করে, সেটা সে আসলে মেনে চলতে চায় না। অর্থাৎ নিজের খেলার নিয়ম সে নিজেই বারবার ভাঙে। এটা রামমোহনের বুঝতে দেরি হয়নি। রামমোহন যেমন ছিলেন আপাতদৃষ্টিতে ম্যাকলের পক্ষে। তাঁর যুক্তি ছিল, উপনিষদ, ইসলাম ও ইউনিটেরিয়ান চার্চের মধ্যে রয়েছে একেশ্বরবাদী মতাদর্শের ঐক্য। ইংরেজরা যদি ইংরেজি স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যাদান করতে চায়, তবে তাই হোক। কিন্তু রামমোহনের শর্ত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ করা চলবে না_ চাই সবার জন্যে ইংরেজি শিক্ষা, চাই বেশি বেশি করে স্কুল, গুণগত মানের স্কুল। রামমোহন অনুসারী দ্বারকানাথও চেয়েছিলেন, বাংলায় শুধু বণিক-পুঁজির নয়, শিল্প-পুঁজিরও বিকাশ হোক। তিনি নিজে ছিলেন ১৮৩০-৪০ দশকের সবচেয়ে প্রাগ্রসর ব্যবসায়ী_ প্রথম বৃহৎ বাঙালি বুর্জোয়া।

প্যারিসের এক হোটেলে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দ্বারকানাথ জানিয়েছিলেন, প্রথাগত ধর্মীয় আচার-বিচার তিনি মানেন না এবং প্রয়োজনে তিনি ইউরোপীয় যুক্তিবাদী আদর্শে ভারতীয় সনাতন ধর্ম-কর্মকে বদলে নিতেও রাজি। এ জন্যে তিনি পণ্ডিতবর্গকে মাইনে দিয়ে পুষছেনও। তারপরও একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে কিছুটা মতানৈক্য হয়েই গেল পণ্ডিতপ্রবর ম্যাক্সমুলারের। তার সমসাময়িকদের কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে ম্যাক্সমুলারকে ডাকতেন ‘মোক্ষমুলার’, যেন এই জার্মান পণ্ডিতের লেখা পড়লে মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটবে। দ্বারকানাথ স্রেফ জানিয়ে দিলেন_ এবং গেয়েও শোনালেন_ ম্যাক্সমুলার ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের কিছুই বোঝেন না, কিন্তু তিনি ঠিকই পাশ্চত্যের রাগ-সঙ্গীত বোঝেন ও এর রস গ্রহণে পুরোপুরি সক্ষম। অর্থাৎ বিদ্যার্জনে বরং দ্বারকানাথ কিছুটা এগিয়েই ছিলেন। পাশ্চাত্যের আধুনিকতা আত্মস্থ করেও আমাদের বাড়তি কিছু দেওয়ার এখনও বহুকিছু আছে. যেমন ম্যাক্সমুলারের মতো পণ্ডিতকেও শেখানোর মতো কিছু ছিল দ্বারকানাথের।

রামমোহন-দ্বারকানাথের যৌথভাবে নির্মিত আধুনিকতা-প্রকল্পের ফাঁদে অবশ্য পা দেয়নি সদাসতর্ক ঔপনিবেশিক শক্তি। ইংরেজি ভাষাকে জনগণের স্তরে ছড়িয়ে পড়তে দেয়নি ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী। বাংলায় ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা ছিল বরাবরই অতিসীমিত, এখনও তাই। তাছাড়া সাধারণভাবে এ দেশে স্কুলের প্রসারই ছিল সীমিত। অন্যদিকে বিদেশি রীতিনীতি মেনে কারবারি ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এনে এ দেশের শিল্প-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে চেয়েছিলেন দ্বারকানাথ। ১৮৪৭-এর বিশ্ব স্টক মার্কেটের বিপর্যয়ের পর বাংলার শিল্পখাত আর সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত। বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তি মুখে বলেছে যে তারা চায় অবাধ বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠা, কিন্তু কার্যত তারা শিল্পায়নকে আরও নিরুৎসাহিতই করেছে এই পর্বে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধাতত্ত্ব জন স্টুয়ার্ট মিলের পাঠ্যবইয়ে বড় আকারে থাকলেও উপনিবেশে এর প্রয়োগ হয়েছিল অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে। আধুনিকতা ও পুঁজিবাদ ‘তার নিজের আদলে বিশ্বকে গড়ে নিতে চায়’_ এনলাইটেনমেন্টের এই মন্ত্রে পুঁজিবাদ নিজেই বিশ্বাস করেনি। পুঁজিবাদ বা আধুনিকতা ‘যা বলে সে আসলে তা না’। যখনই পাশ্চাত্যের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগেছে, খেলার নিয়ম ভাঙা হয়েছে, অথবা নতুন নিয়মের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ সূত্রে বলে রাখি, পুঁজিবাদের খেলায় ক্রমশ ‘সমকক্ষ’ হওয়ার সাধনায় নামা চীন এখন রামমোহন-দ্বারকানাথের সমস্যাটা নতুন করে বুঝতে পারছে। আধুনিকতা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বকে সেটা সে রক্ষা করেনি। আসলে সেরকম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সে পারে না, কেননা তা পুরোপুরি রক্ষা করতে গেলে ক্ষমতার চর্চা করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর ক্ষমতা প্রয়োগই তো আধুনিকতার অপ্রকাশ্য লক্ষ্য। উত্তর-আধুনিকবাদী দার্শনিকদের এই সমালোচনা মানি না মানি কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার নয়।

মধ্যাহ্নের সমাজ

বিনায়ক সেন

১.
কেন মধ্যাহ্ন উপন্যাসটি লিখতে হলো_ তাকে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘সময়কে’ ধারণ করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। সচরাচর যেসব বিষয় নিয়ে তার চরিত্ররা মাথা ঘামায় না- রাজনীতি, কাল, সমাজ- সে সবকিছুকে আর গল্পের বাইরে রাখা গেল না। কেননা, গল্পটাই কতদূর এগুলো মানুষ- তা নিয়ে। ১৯০৫ সালের পর থেকে পূর্ববঙ্গের সমাজ কীভাবে বদলে যেতে থাকল এ রকম কোনো ইতিহাসবোধে তাকে পেয়ে বসেছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্প্রতি-প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সাজ্জাদ শরীফকে জানিয়েছিলেন যে, নিজের জীবন ভাঙিয়ে আর কত উপন্যাস লেখা যায়! সে জন্যেই নাকি তাকে একা এবং কয়েকজন, সেই সময়, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ ও ‘প্রথম আলো’র মতো ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিখতে হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের জন্য বিষয়টা এমন নয়। তিনি খুব সচেতন প্রয়োজনেই এই ইতিহাস-প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন বোধ করি। তাঁর নিজস্ব স্টাইলে ব্যাখ্যাটা এরকম :’আমি লিখি নিজের খুশিতে। আমার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, কাল, মহান বোধ [!] এই সব অতি প্রয়োজনীয় [?] বিষয়গুলি এসেছে কি আসে নি, তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। ইদানীং মনে হয়, আমার কোনো সমস্যা হয়েছে। হয়তো বা ব্রেনের কোথাও শর্ট সার্কিট হয়েছে। যে-কোনো লেখায় হাত দিলেই মনে হয়_ চেষ্টা করে দেখি, সমস্যাটাকে ধরা যায় কি-না। মধ্যাহ্নেও একই ব্যাপার হয়েছে। ১৯০৫ সালে কাহিনী শুরু করে এগুতে চেষ্টা করেছি। পাঠকরা চমকে উঠবেন না। আমি ইতিহাসের বই লিখছি না। গল্পকার হিসেবে গল্পই বলছি। তার পরেও…’

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, ‘তারপরেও’ বলতে গল্প ছাড়াও ইতিহাস সম্পর্কে কোনো নতুন সচেতনতার প্রতি কি তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন? আর ইতিহাস-গল্প মিলিয়ে যদি কিছু লিখবেন তাহলে ১৯০৫ সাল থেকেই তা শুরু করবেন কেন? সময় ধরার ইচ্ছের কথা বলছেন, কিন্তু কোন কালপর্বে শুরু করে কোথায় তার যতি টানবেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চয়ই। ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসে যে-সময়কে অনুভব করা হয়েছে, তার ব্যাপ্তি ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশভাগ অবধি। কেন এই বিশেষ সময়ের টানাপোড়েনের মধ্যে তাকে প্রবেশ করতে হলো_ সেটা একটা প্রশ্ন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উপন্যাসটিতে যে সমাজকে তিনি এঁকেছেন, সেই সমাজচিত্র সে সমাজকল্পিত, না বাস্তব_ সে প্রশ্নে পরে আসা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, চিত্রটাকে তিনি কেন এত গুরুত্বের সঙ্গে আঁকলেন? আজকের যুগের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিচালিত সমাজের প্রেক্ষিতে মধ্যাহ্নের সমাজকে মনে হবে কোন অচিনপুরের গল্প_ এক আধুনিক ইউটোপিয়া। এই উপন্যাস ভর করে আছে আদর্শস্থানীয় দুই চরিত্রের ওপরে, যার একজন হরিচরণ সাহা এবং অন্যজন মওলানা ইদ্রিস। এই দুই শুভবোধসম্পন্ন মানুষ_ বস্তুত নিয়ত এবাদতে রত সূফী-সন্তই বলা চলে তাদের_ যারা সবসময়েই কী করে মানুষের উপকার করা যায় সেই চেষ্টায় নিয়োজিত, তারাই উপন্যাসের ঘটনাবলির ওপরে বৃক্ষের ছায়া হয়ে থাকেন শুরুর লাইন থেকে শেষ পর্যন্ত। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের শুরু হয় যে-পুকুরঘাটে, দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ হয় একই পুকুরঘাটে; কেবল শুরুর দৃশ্যে ছিলেন হরিচরণ, শেষের দৃশ্যে মওলানা ইদ্রিস। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র_ ভালো স্বভাবের ও মন্দ স্বভাবের চরিত্ররা সবাই এদেরকে নিয়েই, এদেরকে পাশে রেখেই যার যার জীবন কাটায়, যার যার মতো করে মৃত্যুবরণ করে।

মধ্যাহ্নের সমাজের বড় শক্তি তার অন্তর্নিহিত নৈতিক শ্রেয়বোধ। এর প্রধান উৎস হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিসের মতো মানুষেরা হলেও অপেক্ষাকৃত খাটো মানুষ যারা, তারাও প্রবল মানবিকতায় আক্রান্ত। তারা পারতপক্ষে অন্যায় করেন না, বা করলেও পরিহার্য বলে আত্মগ্গ্নানিতে ভুগতে থাকেন। জুলেখা, শরীফা, মনিশংকর, শিবশংকর, আতর_ এরা সবাই পৃথিবীতে ভালোমানুষের পাল্লা ভারী করেছে। আর লাবুস তো জুলেখার পুত্র সন্তান হলেও আসলে হরিচরণ-মওলানা ইদ্রিসের আধ্যাত্মিক সন্তান। লাবুস শহরে এলে কটকটে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটত, খুবই স্বাভাবিক হতো তার হিমু-হওয়া! তার মানে এই নয় যে, এই সমাজে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের সংঘাত ছিল না। সংঘাত-দ্বন্দ্ব-অনাচার ছিল যদিও, কিন্তু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হতো না। হরিচরণের নিজের পাটের আড়ত রয়েছে, ‘সাহা’ যেহেতু সেহেতু কৃষিপণ্য নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা তার উপার্জনের স্বাভাবিক উৎস। সুতরাং বাণিজ্যবিরোধী ছিল না ওই সমাজ। যে অঞ্চল নিয়ে এই উপন্যাস তার হাওরেই সওদাগররা ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য় তাদের নৌবাণিজ্যের নাও ভাসিয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যের ধারা থাকলেও এ ধরনের সমাজে টাকার শক্তিতে মানুষের ক্ষমতাকে মাপা হয়নি। শশাংক পালের মতো জমিদার বা ধনু শেখের মতো কুটিল ব্যবসায়ী মানুষও সমীহ করে চলেছে হরিচরণকে_ সেটা তার অর্থের কারণে যতটা, তার চেয়েও বেশি তার নৈতিক স্বভাবের কারণে। আরেকটি দিক হচ্ছে, মধ্যাহ্নের সমাজে স্বার্থপরতাই ব্যক্তির একমাত্র প্রণোদনা নয়; এখানে পরার্থপরতার বোধ সহজাতভাবে ক্রিয়াশীল থাকে বিভিন্ন স্তরে। বলা বাহুল্য, একুশ শতকের আজকের এই অপরাহ্নের সমাজ বাণিজ্যিক বোধের সমাজ। ঊনিশ-বিশ শতকের [অন্তত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ও মোটা দাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত পর্যন্ত] অপেক্ষাকৃত নির্দোষ পৃথিবীর মূল্যবোধের থেকে আজকের এই সমাজ মৌলিকভাবেই আলাদা। মধ্যাহ্নে অনায়াসে সমাজের বিভিন্ন স্তর, শ্রেণী ও ধর্মের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যাতায়াত চলে। এখানে বৃক্ষের অসুখ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়, জুলেখা গায় উকিল মুন্সি ও রাধারমণের গান, রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদের হাহাকার, হাওরের ঢেউয়ে বেজে ওঠে। সেটা যে কেবল নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য_ তা মনে করেননি লেখক। ব্যাপক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান আদান-প্রদানকে ধারণ করেছিল এই মধ্যাহ্নের সমাজ। সেখানে কোন চিহ্নটা কার, বা কোন গানের লাইনটা কোন সম্প্রদায়ের জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছে_ সেটা হিন্দুর নাকি মুসলমানের, মজুরের নাকি অবস্থাপন্ন কৃষকের_ সেটা বের করাটা দুরূহ। ওই সমাজের অবশ্য তাতে কিছু যায় আসেনি।

এ রকম সমাজের কাহিনী কি ইউটোপিয়ার মতো শোনাচ্ছে? হোক ইউটোপিয়া, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই কল্পকথা নির্মাণে [নাকি বাস্তবেই গল্পটা এভাবেই তিনি শুনেছিলেন] এত শ্রম ও মেধা ঢালবেন কেন? আমার ধারণা, মধ্যাহ্নের ভূমিকায় পুরো কারণটা হুমায়ূন আহমেদ বলেননি। শুধু ‘সময়’কে ধরার জন্য ওই বিশেষ কালপর্বের প্রতি চোখ ফেরাননি তিনি; আরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল তার। কোনো অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা ছিল আমাদের মন ও মননকে নাড়া দেওয়ার জন্যে। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সমাজের অন্তরাল প্রাণশক্তির উৎস কোথায়, তা দেখানো চোখে আঙ্গুল দিয়ে।

২.
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই।’ মধ্যাহ্ন উপন্যাসে সেই পাপকে অবলীলাক্রমে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই পাপের মধ্যে সহাবস্থানকেই চূড়ান্ত মানেনি। শশাংক পালের মতো অত্যাচারী জমিদারেরা এতকাল নিরীহ রায়তের পেছনে লেগেছে। তার মৃত্যুর পরে ধনু শেখের মতো ব্যবসায়ীরা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। শশাংক পালের যোগাযোগ ছিল কোলকাতার প্রশাসনের সাথে, ধনু শেখ নিয়েছে মুসলিম লীগের আশ্রয়। স্বদেশী আন্দোলনের তাড়া খাওয়া বিপ্লবীর হাতে আহত হতে হয় তাকে; শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষই দাঙ্গা ঘটানোর ষড়যন্ত্রী হিসেবে তাকে দায়ী করে এবং তার ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দেয়। আর শশাংক পালের মৃত্যু হয় কোনো অব্যাখ্যাত ব্যাধিতে। শশাংক পাল_ ধনু শেখের প্ররোচনার কারণে হোক, আর দুই যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্রমে বেড়ে যাওয়া ভেদবুদ্ধির কারণে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মধ্যাহ্নের সমাজেও ঢুকতে থাকে। রাতের অন্ধকারে একদল আরেক দলের লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়, একপক্ষ আরেক পক্ষের জাতিনাশ ধর্মনাশ করে, বাড়িতে আগুন লাগায়, পুলিশের কাছে মিথ্যে মামলা দিয়ে, হুমকি দিয়ে এলাকা পরিত্যাগে বাধ্য করে, নষ্ট মেয়ের অপবাদ দেয়, হাওরের নির্জনে এনে ধর্ষণ করে, জায়গা-জমি বসতবাড়ি দখল করে নেয়। এসবই হয়, কিন্তু এটা মধ্যাহ্নের সমাজের অন্দরমহলকে ছুঁতে পারে না। কোনো লৌকিক বা অলৌকিক কারণে এর মানুষগুলো পরস্পরের বিপদে এগিয়ে আসে।
পরস্পরের পাশে সহায়-সমর্থনের উদাহরণ অনেক এই উপন্যাসে। আমি এখানে দু’একটি উদাহরণ দেব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে মওলানা ইদ্রিস রওনা হয়েছেন বগুড়ার মহাস্থানগড়ের দিকে। পথ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। বগুড়ার পরিবর্তে রংপুরে চলে গেছেন। এক পর্যায়ে রাত হলে তাকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এসেছে একটি হিন্দু পরিবার। লক্ষণ দাসের পরিবার কাছেরই এক মন্দিরের সেবায়েত। ঐ বাড়ীতেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তার। খাবারেরও ব্যবস্থা হয়েছে_ অবশ্য রাখা হয়েছে উঠানেই। লোকটা তাকে বলেছে, ‘মুসলমানকে বাড়িতে ঢুকাব না। এত বড় পাপ করতে পারব না।’ মওলানা তাতেই খুশী। তিনি নামাজ শেষ করে মোনাজাত করে দোয়া চাইলেন যাতে এই পরোপকারী পরিবারটির প্রতি রহমত বর্ষিত হয়। এ সময়ে কপালে চওড়া করে সিন্দুর দেয়া ঘোমটা পরা একটা মেয়ে মওলানার সামনে এসে দাঁড়াল প্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ থেকে। মওলানার হাতে একটি কাঁথা দিয়ে বলল চলে যেতে : ‘দৌড় দিয়া তালগাছ পর্যন্ত যাবেন। সেখানে নদী পাবেন। নদীর নাম করতোয়া। নদী বরাবর দক্ষিণমুখী হাঁটবেন। থামবেন না। আমার স্বামী লোক খারাপ। আপনার সঙ্গে টাকাপয়সা আছে আপনি তাকে বলেছেন। সে লোক আনতে গেছে। টাকাপয়সা কেড়ে নিবে। আপনাকে মেরেও ফেলতে পারে। এই কাজ সে আগেও কয়েকবার করেছে। দাঁড়ায়া আছেন কেন? দৌড় দেন’।

রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে যে পাপ আছে তা অস্বীকার না করে স্বীকার করাই ভাল, স্বীকার করলে যদি আমরা পরিত্রাণের পথ পাই। হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করেও, করার মাঝেই, থমকে দাঁড়িয়েছে অথবা স্পষ্ট করে প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ধনু শেখ এলাকার মসজিদের ইমাম নিয়ামত হোসেনকে ডেকে নিয়ে বলেছে, ‘জুম্মার নামাজের পরে তুমি সুন্দর কইরা ওয়াজ করবা। তুমি বলবা সব মুসলমানের দায়িত্ব নিজেদের রক্ষা করা। পরিবার রক্ষা করা এবং পাকিস্তান হাসেলের জন্য কাজ করা। … তার জন্যে প্রয়োজনে রক্তপাত করতে হবে। শহীদ হতে হবে। বলতে পারবা না?’ আপাতত সম্মতি দিলেও চে’গুয়েভারার চেয়ে কোন অংশে কম যান না ইমাম নিয়ামত হোসেন। রাতের অন্ধকারে মনিশংকরের কাছে গিয়ে বলে দিয়েছেন, কাল জুম্মার নামাজের পরে দাঙ্গা শুরু হবে। শুধু তা-ই নয়, পরদিন জুম্মার নামাজ শেষে ইমাম নিয়ামত মওলানা ইদ্রিসকে আমন্ত্রণ জানালেন কিছু বলার জন্যে। ইদ্রিসকে বহুদিন ধরে হরিচরণ সাহার বাসায় আশ্রয়ের পর থেকেই হিন্দুদের সঙ্গে উঠা-বসা করার জন্যে একঘরে করে রেখেছে ধনু শেখ। মওলানা ইদ্রিস দাঙ্গা ঘটানোর পরিস্থিতি বদলাতে উঠে দাঁড়িয়ে সুরা হুজুরাত এর তের নম্বর আয়াতের স্মরণ করলেন, যেখানে পৃথিবীর সব মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করে পরে বিভক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন জাতিতে ও গোত্রে, যাতে তারা ‘একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে’। দোয়া পাঠের সময় ইমাম নিয়ামত হোসেন প্রার্থনা করলেন যেন বান্ধবপুরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা না হয়।

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠানের ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে এক উদারনৈতিক আবহাওয়া বিরাজ করেছিল এলাকায়। অত্যাচারী শশাংক পাল মারা যাওয়ার পর তার মুখাগি্ন করতে তার স্বধর্মের কেউ রাজী হলো না। হয়তো তিনি সারাজীবন অবিশ্বাসী নাস্তিক ছিলেন বলে, হয়তো অত্যাচারী ছিলেন বলে। মুসলমান হয়ে মওলানা ইদ্রিস এগিয়ে এলেন এক্ষেত্রে। সমস্যা হলো পুরোহিতের সাথে তাকেও কিছু মন্ত্র পড়তে হলো শেষকৃত্যের প্রয়োজনে। এর জন্যে কাফের বলে ফতোয়া দেওয়া হলো তার বিরুদ্ধে। লাবুস এসে প্রতিবাদ করে বলল, ‘লাশের মুখে আগুন দিয়েছে। লাশের আবার হিন্দু মুসলমান কী? লাশ নামাজ কালাম পড়ে না। মন্দিরে ঘণ্টাও বাজায় না’। অন্যত্র, লাবুস ও ইদ্রিসের মধ্যে অন্য একটি ধর্মীয় আলাপের বিনিময় হয়। ইদ্রিসের শিশুবয়সী মেয়ে পুষ্পরাণীকে দুধ খাওয়ানোর কেউ নেই। তার স্ত্রী জুলেখা তাকে পরিত্যাগ করে গেছেন। এদিকে গ্রামের বাগাদিপাড়ার মেয়ে ষোল সতেরো বয়সী কালী গতকালই তার মেয়েকে হারিয়েছে। পুষ্পরাণীকে পেয়ে সাগ্রহে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে সে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের কণ্ঠেই শোনা যাক : ‘মাওলানা ইদ্রিস লাবুসের কাছে হিন্দু-মেয়ের বুকের দুধ খাওয়া নিয়ে ক্ষীণ আপত্তি তুললেন। লাবুস বলল, দুধের কোনো হিন্দু-মুসলমান নাই। হিন্দু-মুসলমান মানুষের চিন্তায়। দুধের চিন্তার শক্তি নাই। লাবুসের কথায় মাওলানা হকচকিয়ে গেলেন। ধর্ম নিয়ে এইভাবে তিনি কোনোদিন চিন্তা করেননি। এই দিকে চিন্তা করা যেতে পারে।’ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাত্যহিকের সাংস্কৃতিক ব্যবহারিক বিনিময়ের এ রকম অনেক উদাহরণ আরো ছড়িয়ে আছে। আজকের এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির যুগে ধর্ম-ধর্ম করে আমাদের নগর ও গ্রামের জীবন এখন ব্যতিব্যস্ত। লাবুস-মওলানা ইদ্রিস হরিচরণের মতো চরিত্ররা কি আছে এখনো আমাদের আশেপাশে কোথাও?

৩.
তাহলে দাঁড়াচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানে মিলে একটা যে অভিন্ন সংস্কৃতি, তলার দিকে গড়ে উঠেছিল, শত কংগ্রেসী লীগ রাজনীতির ডামাডোলেও যেটা পুরোপুরি ধসে যায়নি, সে রকম কোন শুভনীতিবোধসম্পন্ন অস্তিত্বকেই অমাদের ‘মধ্যাহ্ন’ অর্থাৎ ‘স্বর্ণযুগ’ বলছেন লেখক? আজ সেই মধ্যাহ্ন গড়িয়ে এই সমাজ_ এই তিমিরবিলাসী সমাজ উপনীত হয়েছে তার অপরাহ্নে। ‘অপরাহ্ন’ কথাটা আমি ‘লেইট ক্যাপিটলিজম’-এর তাত্তি্বক সাহিত্য-সমালোচক ফ্রেডেরিক জেমসনের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। বণিজ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিকে, শিল্পকেও মানবসত্ত্বাকে ক্রমাগত ‘ব্যবহৃত-ব্যবহৃত’ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বর্জ্যের মতো পাগলার লেগুনের মতো অন্ধকার কোণে। হুমায়ূন আহমেদ এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গীনির্ভর সমাজকে মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেননি। হিমুকে দিয়েছেন এই বাণিজ্যিক সমাজকে বিদ্রূপ করার মনোমুগ্ধকর ক্ষমতা। ‘অয়োময়’-এর মীর্জা হেরে যাচ্ছে উঠতি বণিক শ্রেণীর কাছে, যেভাবে ধনু শেখের কাছে হেরে গিয়েছিল শশাংক পাল। তবু স্রষ্টার পক্ষপাতিত্ব পরাজিতের দিকেই। সত্যজিতের ‘জলসাঘর’-এর শেষ দৃশ্যে বিশ্বাম্ভর কোথায় মিলিয়ে যান সে খবর আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমাদের মনে থেকে যায় শেষ সঙ্গীত সভার নৃত্যগীতের রেশ। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষে আমরা জানতে পেরেছি ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ আসন্ন, ভিটেমাটি ছাড়ছে দু’তরফেই, নতুন রাষ্ট্রজীবনের শুরু হবে সীমান্তের দু’দিকেই। পাকিস্তান হচ্ছে ‘কৃষকের ইউটোপিয়া’ গবেষকরা রায় দিয়েছেন, শুধু কিছু মানুষের মনে শান্তি নেই। কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। হরিচরণ সাহা মারা গেছেন, লাবুস মৃত্যুশয্যায়, মওলানা ইদ্রিস সবচেয়ে বেশি নিরাশ্রয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একই সুখ-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিস ছিলেন এই পাপবিদ্ধ সমাজের রক্ষাকবচ_ তারা আঁকড়ে ছিলেন সমাজের ভালোত্বকে শুভবোধকে, মঙ্গলকামনাকে। তারা সমাজকে অন্ধকারর্ খাদের মধ্যে গড়িয়ে পড়তে দেননি।

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষটা এ রকম। লাবুস, যে কিনা আমাদের অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎকে নায়কের মতো লালন করেছে, সে মারা যাচ্ছে। কোনো অব্যাখ্যাত অসুখে তাকে আক্রান্ত করেছে। অসুখ নিয়েই সে এসেছে নির্জন পুকুরের ঘাটে এবং সেখানে হঠাৎই সে তার মৃত মাকে দেখতে পাচ্ছে কাছে। একপর্যায়ে মা’র কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। তার এই মৃত মার নাম জুলেখা। যিনি জীবিত থাকাকালে স্বয়ং উকিল মুন্সীকে গান শুনিয়েছেন এবং নজরুল যাকে দিয়ে কলকাতায় গান রেকর্ড করিয়েছেন। তিনি এবারে গুনগুন করে গান ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন বইটির শেষ দুটি লাইন, যা পড়তে থাকলে এখনো আমি এক অনির্বচনীয় শিহরণ অনুভব করি : ‘মওলানা ইদ্রিস ঘর থেকে বের হয়েছেন, হাদিস উদ্দিন বের হয়েছে। পুকুরঘাট থেকে যে সুরধ্বনি বের হয়ে আসছে, তার জন্ম এই পৃথিবীতে নয়। অন্য কোনোখানে।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোসেন মিয়া ময়নাদ্বীপের সমতাবাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদের বান্ধবপুর তেমনি একটি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্র, সেখানে সব গোত্রের ও বর্ণের মানুষেরা মানবিক মমতায় পরস্পরের হাত আঁকড়ে ধরবে। তবে এই অপরাহ্নের সমাজের কাছে হুমায়ূনের এই ইতিহাসপাঠ কল্পজগতের ভাষ্য বলে মনে হতে পারে।