জনজীবনের অর্থনীতি

বিনায়ক সেন

১. মিল ও অমিল

প্রতিটি শাস্ত্রই তার নিজের চারদিকে একটা সীমারেখা এঁকে দেয় বা বেড়া তুলে দেয়, যাতে করে বেড়ার ভেতর থেকে কেউ বাইরে যেতে না পারে, বা বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। রামায়ণে সীতার দেবর লক্ষ্মণ সীতার ভিটের চারদিকে একটি রেখা টেনে দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত যে-ই আসুক না কেন, সীতা যেন ঐ রেখার বাইরে পা না রাখেন। তাহলেই তিনি বিপদমুক্ত থাকবেন। বাংলা প্রবচনে একেই বলা হয়েছে_ লক্ষ্মণরেখা। শাস্ত্রগুলোও তেমনি তার চতুর্দিকে লক্ষ্মণরেখা এঁকে নিজেকে অন্য শাস্ত্রের প্রভাবমুক্ত বা ‘বিপদমুক্ত’ রাখতে চেয়েছে। বিশেষত এটা ঘটে এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে যখন শাস্ত্রগুলো ক্রমান্বয়ে একাডেমিক সনদ দানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি ‘ফ্যাকাল্টি’ হতে থাকে। বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিটি শাস্ত্রকেই তার নিজস্ব গণ্ডী দাঁড় করাতে হয়েছিল, সন্দেহ নেই। তবে সমাজে অত্যধিক শ্রম-বিভাজনের কারণে অতিমাত্রায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে গিয়ে কোথাও কোনো সার্বিক দার্শনিক (নৈতিক) ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে কি-না_ এ প্রশ্ন এডাম স্মিথ তার ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইতেই তুলেছিলেন। অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে নীতিশাস্ত্র (ও অন্যান্য শাস্ত্রের) বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্ষতি হয়েছে যেমন অর্থশাস্ত্রের, তেমনি নীতিশাস্ত্রেরও। এরকম একটি মত জোরে-শোরে উত্থাপন করেছিলেন অমর্ত্য সেন তার ‘এথিকস্ অ্যান্ড ইকোনমিক্স’ গ্রন্থে। আমি এসব সূত্র ধরে এই লেখায় মোটের উপর বলতে চেয়েছি যে, সাহিত্যের সঙ্গে অর্থশাস্ত্রের বিচ্ছিন্নতার কারণে অর্থনীতি নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনাও বেশ কিছুটা পরিমাণে ‘সংকীর্ণ’ হয়ে পড়েছে। এতে করে ক্ষতি হয়েছে দুই পক্ষেই। সাহিত্যে সর্বাধিুনিক অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো সেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। আবার অর্থশাস্ত্রেও সাহিত্যে বিবৃত জনজীবনের অভিজ্ঞতাগুলো যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার ফলে শাস্ত্রটির জনবিচ্ছিন্ন বিদ্যায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটাকে এক ধরনের ‘একাডেমিক প্রটেকশনিজম’-এর ফলপরিণাম হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অথচ সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও এ দুই মানবিক বিদ্যার (হিউম্যানিটিক) মধ্যে ‘নাড়ির বন্ধনকে’ অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘সাহিত্য’ বলতে আমি মহাকাব্য, পুঁথি, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ সবকিছুকেই এক জায়গায় জড়ো করছি। বাংলায় ইকোনমিক্স শব্দটার ভাষান্তরে অর্থনীতি ও অর্থশাস্ত্র দুই-ই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্বিত্বতা এড়ানোর জন্য আমি এখানে ইকোনমিক্স অর্থে অর্থশাস্ত্র আর ইকোনমি অর্থে অর্থনীতি ব্যবহার করছি। সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল দেখতে পাওয়া যায় বিষয়বস্তুর অভিন্ন ঝোঁকের মধ্যেই। উন্নয়ন ও সাম্যের ধারণা দুই বিদ্যার ক্ষেত্রেই অভিনিবেশের বিষয়। কোন নীতি জনহিতৈষী বা কোন নীতিই বা জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর_ এসব আলাপ উভয়বিধ বিদ্যারই চর্চার বিষয়। এটা ঠিক যে, জনজীবনের যেসব ধারণা সাহিত্যে অনায়াসে চলে আসে, তাকে বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করে বিচারের প্রয়াস চলে অর্থশাস্ত্রে। শুধু বিশেষভাবে সংজ্ঞার ঝোঁক নয়, বিচার-পদ্ধতিতেও গাণিতিক ও ইকোনমেট্রিক মডেল নির্মাণ ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ যোগ করা হয় আধুনিক অর্থশাস্ত্রে। তারপরও সমাজ-প্রগতির বা অধোগতির তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি কার্য-কারণ বোঝার তাগিদ পাওয়া যায় সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র উভয়ের মধ্যেই। একই ভাষার রকমফের সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেমন দুই ভিন্ন জাতি, ঠিক তেমনভাবেই একই ঝোঁক ও মূল্যবোধ ধারণ করা সত্ত্বেও সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র দুই ভিন্ন বিদ্যার আদল পায়। এই মৌলিক মিলের জায়গাটিকে ধরে রাখতে পারলে দুই বিদ্যারই বিকাশে তা আরো পুষ্টি জোগাবে সেটি এখানে আরো একবার মনে করিয়ে দেওয়া। এই মৌলিক মিলের অনেক উদাহরণ রয়ে গেছে বাঙালির অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে। বাংলা সাহিত্যের নানা উদাহরণের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রাগ্রসর অর্থনৈতিক চিন্তার পদচ্ছাপ (ফুটপ্রিন্টস)। আবার সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক অর্থনৈতিক কূটভাষের সরল সূত্র। এমনকি অনেক অর্থনৈতিক নীতিমালার সম্ভাব্য ধারণা-অভিজ্ঞান। এ রকম দুটো উদাহরণ হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা বিভূতিভূষণের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাস। এ দুটি লেখার সূত্র ধরে আমি পরবর্তী দুই অধ্যায়ে সাহিত্যে অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে কিছু বাড়তি প্রসঙ্গের উল্লেখ করব।

২. স্মিথ, ডিকেন্স, মিল ও বঙ্কিম

খোলা বাজার বা অবাধ বাজার-অর্থনীতি নিয়ে আমাদের জনমনে কম-বেশি ভুল-শুদ্ধ একটা ধারণা চালু আছে। বিশেষ কতগুলো শর্তসাপেক্ষে এ অবাধ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার অর্থনীতি হচ্ছে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথ_ এরকম একটি বক্তব্যের শাস্ত্রীয় সূচনা হয় স্মিথের ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইয়ে। এই বাজার-অর্থনীতি কোনো সর্বজ্ঞ পরিকল্পনাকারীর হাত ধরে কাজ করে না। বস্তুত কেউই এর পরিচালনার দায়িত্বে নেই। সমাজের সব ইকোনমিক এজেন্টেই স্বীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডে যুক্ত হন। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির স্বপ্রণোদিত উদ্যমের ফল হয় সামগ্রিকভাবে সবার জন্য শুভ। এই চমৎকার পরিণতির পেছনে কোনো নিখিল প্রজ্ঞার হাত নেই_ যা আছে তা হলো বাজারের অদৃশ্য হাতের জাদু। সেই থেকে স্মিথের ইনভিজিবল হ্যান্ড-এর তত্ত্ব অর্থশাস্ত্রে চালু হয়ে রয়েছে। বাজারের এই ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব অনেকগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে এ পর্যন্ত। এর মধ্যে আবার নজর কেড়েছে দার্শনিক মিশেল ফুকোর একটি বিশ্লেষণ। তিনি এক জায়গায় বলছেন যে, অদৃশ্য হাত-এর তত্ত্বে রাজা বা সার্বভৌম ক্ষমতা পুরোপুরি অস্বীকৃত। রাজা রাষ্ট্রের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা বা রাষ্ট্রক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি অপ্রয়োজনীয় সত্তা। অর্থাৎ ফুকোর ব্যাখ্যায়, সামন্তবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে যাওয়ার এক পর্যায়ে রাজার অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংকুচিত করার জন্য ১৬৮৮ সালের ‘গ্গ্নোরিয়াস রিভুল্যুশন’ যেসব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিল তারই সর্বোচ্চ তাত্তি্বক স্বীকৃতি মেলে ১৭৭৬ সালে স্মিথের লেখায় বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্বে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে রাজার যদি কোনো আবশ্যিক ভূমিকা না-ই থাকে, তাহলে তার অস্তিত্বের একটি বড় অংশই মহিমা হারিয়ে ফেলে। এদিক থেকে দেখলে ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব আসলে একটি অন্তর্ঘাতমূলক রাজদ্রোহী তাত্তি্বক তৎপরতা_ সর্বময় ক্ষমতার মালিক রাজা বা সার্বভৌমের বিরুদ্ধে। ফুকো তাই লিখেছেন, ‘ইকোনমিক্স ইজ আ ডিসিপ্লিন উইদাউট টোটালিটি।’ আমার নড়বড়ে অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন :’অর্থশাস্ত্র হচ্ছে এমন একটি বিদ্যা যা রাজার পক্ষে গোটা রাষ্ট্রকে শাসন করা সম্ভব এ রকম সার্বভৌম-কেন্দ্রিক ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে।… উদারনৈতিকতাবাদের জন্মই এই সূত্রে। এক দিকে আইনের যুক্তিতে গোটা সমাজের উপরে সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, আর অন্যদিকে আধিপত্যের হাত গলে যাওয়া অসংখ্য নাগরিকের/প্রজার বিভিন্নমুখী অর্থনৈতিক স্বার্থের (স্বাধীন) অন্বেষণ। এ দুই প্রবণতার মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে।’

বাজারের অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে এভাবে র‌্যাডিক্যাল ধারায় মহিমান্বিত করার চেষ্টা সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে টমাস কার্লাইল এই অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে নির্ভর করা শাস্ত্রটিকেই অভিহিত করলেন ‘এক বিষণ্ন বিজ্ঞান’ (ডিসমাল সায়েন্স) হিসেবে। অন্যদিকে অলিভার টুইস্ট, ব্রিক হাউস, হার্ড টাইমস প্রভৃতি উপন্যাসের মাধ্যমে চার্লস ডিকেন্স ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে অস্বীকার করে দেখালেন যে, সমাজের কল্যাণসাধন এই অর্থশাস্ত্রের অভিপ্রায় নয়। শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এসব অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে উঠল তার উপন্যাসে। পরিবেশ দূষণ, অনগ্রসর নগর পরিকল্পনা, কারখানায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধিমালার অনুপস্থিতি, জনশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা_ এসব বিতর্ক জন্মে উঠেছিল ইউরোপে আরও পরে; কিন্তু ডিকেন্সের লেখায় এসব বিতর্কের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ডিকেন্সের এই লেখাগুলো যখন প্রকাশিক হচ্ছে, ততদিনে আত্মপ্রকাশ করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। কার্লাইল ও ডিকেন্সের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিল। কার্লাইল ১৮৪৯ সালে অর্থশাস্ত্রকে বলেছেন, ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’; এর ঠিক এক বছর আগে, ১৮৪৮ সালে বেরিয়েছে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’। বইটি মৌলিক গোত্রের না হলেও স্মিথ-রিকাভো-ম্যালথাসের ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে সুপাঠ্যবই হিসেবে বিন্যস্ত করেছিলেন মিল। পরবর্তী প্রায় একশ’ বছর ধরে বাংলার (ও ভারতের) জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিকরা যেমন, উচ্চপর্যায়ের সরকারি চাকরি-প্রার্থী এদেশের ভদ্র সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকেই মিলের বইটির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল অর্থশাস্ত্রের পরীক্ষায় পাসের জন্য। বঙ্কিমের অর্থনৈতিক চিন্তাতেও এ বইয়ের গভীর প্রভাব ছিল। তবে বঙ্কিম তার বিভিন্ন লেখায় ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণে আরও কিছু প্রসঙ্গের সূত্রপাত করেন, যা তার চিন্তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।

অন্যত্র আমি বঙ্কিমচন্দ্রের ১৮৭২ সালের লেখা ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ এবং সে লেখায় অর্থশাস্ত্রীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে আমি তিনটি প্রসঙ্গের পুনরুক্তি করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত, দেশের শ্রীবৃদ্ধির (এখনকার পরিভাষায়_ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) প্রশ্নটিকে তিনি সরাসরিভাবে সম্পদ-বণ্টন তথা ভূমি-বণ্টন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করেছিলেন। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি বললেন, ‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে… আমাদের দেশের বড় মঙ্গল হইতেছে।’ কী মঙ্গল, তা-ও বললেন। চাষের অধীনে জমি বাড়ছে, রেললাইন বসেছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, বাণিজ্য দ্রব্য নিয়ে স্টিমার চলছে নদীবক্ষে, শহরে সন্ধ্যার পরে গ্রামের আলো জ্বলছে, ‘ফুলিস্কেপ কাগজে বঙ্গদর্শনের জন্য সমাজতত্ত্ব’ লেখা হচ্ছে, ইংরেজি শিক্ষার প্রসার হচ্ছে, সাহেবদের আসবাবপত্র আসছে, সেই সাথে তাদের আদব-কায়দাও আসছে। এসব বলার পরই এল তার পয়লা সওয়াল : ‘এরই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটি কথা জিজ্ঞসার আছে, কাহার এত মঙ্গল? হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাথায় খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্থিচর্ম্ম বিশিষ্ট বলছে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চষিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?… দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবী কয়জন?… যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।’ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোনো সামগ্রিক সূচকই উন্নয়নের সূচক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা গরিবমুখিন হচ্ছে সেটিই প্রধান বিচার্য।

দ্বিতীয়ত, ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যে নতুন জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন করেছিল তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন বঙ্কিম। আজকের ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা সে যুগেও ছিল রক্ষণশীল ও জমিদারি ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সমর্থক। এদের সমালোচনা করে বঙ্কিম প্রজাওয়ারী (রায়তওয়ারী) ব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দিলেন। তার ভাষায়, লর্ড কর্নওয়ালিস ‘মহাভ্রমে পতিত হইয়া প্রজাদিগের আরও গুরুতর সর্বনাশ করিলেন’_ তিনি ‘রাজস্বের কন্ট্রাক্টরদিগকে ভূস্বামী করিলেন’। অথচ, ”প্রজারাই চিরকালের ভূস্বামী; জমিদারেরা কস্মিনকালে কেহ নহেন_ কেবল সরকারি তহশীলদার। কর্নওয়ালিশ যথার্থ ভূস্বামীর নিকট হইতে ভূমি কাড়িয়া লইয়া তহশীলদারকে দিলেন… এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র কস্মিনকালে ফিরিবে না।” সম্পত্তির উপর মালিকানার ধরন যে অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা, এখানে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, এই অবস্থার যে দ্রুত নিরসন করা যাচ্ছে না, তার কারণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী শুধু জমিদারেরা নন, উচ্চ শ্রেণীর কৃতবিদ্য লোকেরাও অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভদ্র সম্প্রদায় তথা বাবুরা (এ ‘বাবুদের’ নিয়ে তার একটি স্বতন্ত্র তীক্ষষ্ট ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধও রয়েছে)। বঙ্গদর্শন পত্রিকার শুরুতে ‘পত্রসূচনা’য় বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট করে জানালেন যে, বাঙালির উন্নতি বলতে তিনি কখনোই কেবল সুশিক্ষিতের উন্নতি বোঝাচ্ছেন না। তার ভাষ্যে, ‘সমগ্র বাঙালির উন্নতি না হইলে দেশের কোন মঙ্গল নাই। সমস্ত দেশের লোক ইংরেজি বুঝে না, কস্মিনকালে বুঝিবে, এ মত প্রত্যাশা করা যায় না।… সুতরাং বাঙ্গালায় যে কথা উক্ত না হইবে, তাহা তিন কোটি বাঙ্গালী কখন বুঝিবে না, বা শুনিবে না। এখনও শুনে না, ভবিষ্যতে কোন কালেও শুনিবে না। যে কথা দেশের সকল লোকে বুঝে না, বা শুনে না, সে কথায় সামাজিক বিশেষ কোন উন্নতির সম্ভাবনা নাই’। দেখা যাচ্ছে, বঙ্কিম বাংলা ভাষার জনভিত্তিক প্রসারকে উন্নতির আরম্ভ-বিন্দু হিসেবে দেখেছেন এমনকি অধস্তন ও কৃতবিদ্য শ্রেণীর মধ্যে। ‘সমকক্ষতা’ স্থাপনের একটি পাটাতন হিসেবে দেখেছেন। ভূমি-বণ্টনের অনাব্যতার প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি ভাষায় সমকক্ষতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে তিনি শুধু অর্থনৈতিক সমতা-অর্জনের উপায় হিসেবে নয়, দেশের উন্নতির ভিত্তি হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। এভাবে তিনি কার্লাইল-ডিকেন্সের ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’ সমালোচনার উত্তর খুঁজছেন উপনিবেশিক পরিস্থিতিতে। বেন্থাম-মিলের উপযোগীবাদী তত্ত্বকে তিনি সজোরে নাড়া দিচ্ছেন গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সমীহ ভাবকে বজায় রেখেই। মিলের ইউটিলিটারিয়ান দর্শন নিয়ে তিনি কমলাকান্তের দফতরেও পরিহাস করেছেন। তার ভাষ্যে আবারও ফিরে যাই ‘এরূপ কখন কোন দেশে হয় নাই যে, ইতর লোক চিরকাল এক অবস্থায় রহিল, ভদ্রলোকদিগের অবিরত শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। বরং যে যে সমাজের বিশেষ উন্নতি হইয়াছে, সেই সেই সমাজে উভয় সম্প্রদায় সমকক্ষ, বিমিশ্রিত এবং সহৃদয়তাসম্পন্ন। যতদিন এই ভাব ঘটে নাই_ যতদিন উভয়ে পার্থক্য ছিল, ততদিন উন্নতি ঘটে নাই। যখন উভয় সম্প্রদায়ের সামঞ্জস্য হইল, সেই দিন হইতে শ্রীবৃদ্ধি আরম্ভ।’ এক অর্থে ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রের যে-উদ্বোধন ঘটেছিল স্মিথ-রিকার্ডো-মিলের হাত ধরে, তার মধ্যে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্র ছিল না। এবারে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের কিছু মৌলিক উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত দিলেন বাংলার প্রথম অর্থশাস্ত্রবিশারদ বঙ্কিমচন্দ্র। তার কথিত সহৃদয়তাসম্পন্ন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও হাল আমলের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ তত্ত্বের পূর্বলেখ বলে মনে হয়।

দুর্ভাগ্য যেটা, তা হলো বাঙালি বলতে বঙ্কিমচন্দ্র বর্ণ-নির্বিশেষে ধর্ম-নির্বিশেষে অভিন্ন জাতিসত্তা বোঝাননি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এই অন্ধত্ব বিশেষ করে দেখা দিয়েছিল বাংলার মুসলমান সমাজকে স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে। দেশের শ্রীবৃদ্ধির অসঙ্গতির আলোচনায় পরান মণ্ডল, হাসিম শেখ ও রাজা কৈবর্ত্তের উল্লেখ তবু পাই, কিন্তু জাতি-নির্মাণের প্রকল্পে কোথাও ‘হাসিম শেখ’কে দেখতে পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক চিন্তায় বঙ্কিমচন্দ্র সমতাবাদী, কিন্তু রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় তিনি যে নেশনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেখানে মুসলমানদের স্থান করে দেননি। ১৯৬৪ সালে আবুজাফর শামসুদ্দীন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র ফরাসি বিপ্লব নিয়ে পড়েছেন। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও জানতেন, সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি নিয়েও কখনও কখনও প্রচার চালিয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দুর ধর্মীয় পুনরুত্থান ছাড়া আর কিছুই যে বুঝতে পারেননি এটি একটি ঐতিহাসিক আশ্চর্য! এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রথমবারের মতো উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রে যে বাঙালি চিন্তকের মধ্যে মৌলিকত্ত্ব কিছুটা লক্ষ্য করা যায়, সেই চিন্তকের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে সুগভীর ফাটল থেকে গিয়েছিল। ফলে কার্লাইল-ডিকেন্সের বিষণ্নতার কলঙ্ক থেকে অর্থশাস্ত্রকে মুক্ত করা বঙ্কিমের মতো তীক্ষষ্টধীর পক্ষেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এক অর্থে এটি একটি ব্যর্থতার মডেল হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী বছরগুলোয়। অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর ধারণার আশ্রয়ের পাশাপাশি সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে অনগ্রসর ধারণাকে লালন করার এই পরস্পরবিরোধী ধারা উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধের অনেক বাঙালির তত্ত্ব চর্চার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে। মোরশেদ শফিউল হাসানের অধুনাকালের গবেষণা ‘পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ : দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া’ গ্রন্থে যেসব আকর-উপাদান জড়ো করা হয়েছে, তাতে করে পাকিস্তান-উত্তর পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাঙালি মুসলিম ‘রেনেসাঁ’ পর্বের বিভিন্ন মুসলমান চিন্তাবিদের মধ্যেও বঙ্কিম-প্রদর্শিত ফাটলের পথ ধরে চলবার প্রবণতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আকরম খাঁ থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ থেকে আবুল ফজল কেউই বঙ্কিম-প্রদর্শিত স্ববিরোধিতার পথ থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে পারেননি।

৩. দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি

অমর্ত্য সেন যেসব কারণে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ নিয়ে তাঁর মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ‘পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস্’। যেটা লক্ষ্য করার তাহলো দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যেসব রচনা পাওয়া যায় তার মধ্যে সেন-উলি্লখিত কার্যকারণের একটি পূর্ব অনুমান মেলে। ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর (যার ফলে, সরকারি হিসাবেই অবিভক্ত বাংলার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মৃত্যুবরণ করেছিলেন) অমর্ত্য সেনের গ্রন্থের আলোচনায় আসেনি। যেমন অন্তর্ভুক্ত হয়নি উনিশ শতকের অন্তত ৫টি দুর্ভিক্ষ, যথাক্রমে ১৮৬৫/৬৬, ১৮৭৩/৭৪, ১৮৮৪, ১৮৯১/৯২ ও ১৮৯৫/৯৭। তিনি তার গ্রন্থে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ ও সংঘটন।

তবে সাহিত্যের আকর-উপাদান খুঁজলে বাংলার বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়, যাতে শুধু সেনের এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের প্রমাণ্যতাই মেলে না, পাওয়া যায় আরও বাড়তি কিছু উপাদানের অস্তিত্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি মুসলমান-বিদ্বেষী উপাদানের কারণে এখন অনেকটাই অর্থনৈতিক ডিসকোর্সের বাইরে। এমনকি অর্থশাস্ত্রের ছাত্রছাত্রীরাও দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি বোঝার প্রয়োজনে কদাচিৎ ‘আনন্দমঠ’ পড়ে দেখতে চান। বঙ্কিম অবশ্য ‘আনন্দমঠ’ লিখেছিলেন ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর ঘটে যাওয়ার একশো বছর পরে (১৮৮০ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত)। এই দুর্ভিক্ষের আকর-উপাদান তিনি জড়ো করেছিলেন হান্টার সাহেবের লেখা ‘দ্য এনালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ পড়ে। দুর্ভিক্ষ বোঝার দৃষ্টিকোন থেকে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি পড়লে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে।

প্রথমত, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রকৃতিসৃষ্ট কিছু উপাদান (যেমন দুর্ভিক্ষের আগের পরপর তিনটি বছরেই ভালো ফসল না হওয়া) ক্রিয়াশীল থাকলেও একে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষই বলতে চেয়েছেন লেখক। সামগ্রিকভাবে সুশাসনের অভাব একটি বড় কারণ ছিল এই দুর্ভিক্ষের পেছনে। মনে রাখতে হবে যে এই সময়ে কোম্পানির শাসনের গোড়া পত্তন হচ্ছিল। ১৭৫৭-এর পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের পর, বিশেষত ১৭৬৫ সালের পর থেকে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসন গেড়ে বসতে থাকে। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ হয় এমনই একটি উত্তরণকালীন পর্যায়ে_ যখন না কোম্পানি না দেশীয় নবাবেরা (যেমন রেজা খাঁ) পূর্ণ শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। আর উত্তরণকালীন পর্যায়ের সুযোগ নিয়ে শাসনব্যবস্থায় অরাজকতা নেমে এসেছিল। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা সরাসরিভাবে মহাজনী কারবারে যেমন, তেমনি প্রত্যক্ষভাবে লুণ্ঠনকার্যেও জড়িত হয়ে পড়েন। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট-এর কালে এডমন্ড বার্কের উত্থাপিত অভিযোগে এটি ছিল একটি বড় বিষয়। দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড খরার মুখে বাংলার ‘চৈতালি’ শস্যের বিনষ্ট হওয়ার পরিস্থিতিতে সরকার বছরের গোড়াতেই কোম্পানির সেনাবাহিনীর জন্য ‘৮০ হাজার মণ চাল মজুদ করার’ নীতি নেয়। ফলে বাজারে দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো চালের সরবরাহ আরও কমে যায়। তৃতীয়ত, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসে ব্যাপকভাবে কুটিরশিল্পের ধ্বংসের কারণে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সে সময়ে রাজস্ব-সংগ্রহের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। মোগল আমলে গোটা গ্রাম সমষ্টিগতভাবে রাজস্ব দিত। গ্রামপ্রধান সে রাজস্ব সংগ্রহ করে মোগল সরকারের ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। উত্তরণশীল এই পর্বে গ্রামভিত্তিক রাজস্ব সংগ্রহের পরিবর্তে ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক রাজস্ব-ব্যবস্থা চালু হলো এবং সেটাও করা হলো ভিন্ন উপায়ে। আগে যেখানে উৎপাদিত শস্যের হিসাবে খাজনা দেওয়া হতো, এখন সেটা হতে থাকল নগদ অর্থে। দুর্ভিক্ষের আলামত সত্ত্বেও রাজস্ব-সংগ্রহের মোট পরিমাণ কমল না। আকাড়ার সময়ের সুযোগ নিয়ে মজুদদারি করে চালের ব্যবসায় এ সময়ে বিনিয়োগ করেছিলেন রাজকর্মচারীরা। সুপ্রকাশ রায় তার ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ বইতে জানিয়েছেন যে, ‘বাংলা ও বিহারের সমস্ত ইংরেজ বণিক, তাহাদের সকল আমলা-গোমস্তা, রাজস্ব বিভাগের সকল কর্মচারী, যে যেখানে নিযুক্ত ছিল সেখানেই দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রমে ধান, চাউল ক্রয় করিতে লাগিল’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনিক নির্দেশে আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে মজুদদারি, ব্যবসায় নিয়োজিত সেখানে শুধু বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’কে এখানে দোষ দেওয়া চলে না। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় পরবর্তীকালে জন স্টুয়ার্ট মিল আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি অবাধ করে দেওয়ার পক্ষে জোরালো অভিমত রেখেছিলেন।

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এসব উপাদান ছাড়াও আরও রয়েছে দুর্ভিক্ষের ক্রমবিস্তৃতির বিবরণ, এমনকি ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের মাংস মানুষে খাওয়ার আতঙ্ক উদ্রেককারী উল্লেখ। দীর্ঘ উদ্ধৃতির এখানে সুযোগ নেই, তারপরও একটি ছোট্ট বিবরণ দিচ্ছি যার থেকে দুর্ভিক্ষের বিস্তৃতির বিভিন্ন পর্যায়কে বিশ্লেষণাত্মক উপায়ে শনাক্ত করা সম্ভব:

‘অকস্মাৎ আশ্বিন মাসে দেবতা বিমুখ হইলেন। আশ্বিনে-কার্তিকে বিন্দুমাত্র বৃষ্টি পড়িল না। মাঠে ধান্য সকল শুকাইয়া একেবারে খড় হইয়া গেল, যাহার দুই এক কাহন ফলিয়াছিল। রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহির জন্য কিনিয়া রাখিলেন। লোকে আর খাইতে পাইল না। প্রথমে এক সন্ধ্যা উপবাস করিল। তারপর এক সন্ধ্যা আধপেটা করিয়া খাইতে লাগিল। তারপর দুই সন্ধ্যা উপবাস আরম্ভ করিল। যে কিছু চৈত্র ফসল হইল, কাহারও মুখে তাহা কুলাইল না, [ওদিকে সরকার] একেবারে শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়াইয় দিল।… লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিত আরম্ভ করিল। তারপর কে ভিক্ষা দেয়! উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল, গোরু বেচিল, লাঙল জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ি বেচিল, জোতজমা বেচিল। তারপর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কেনে! খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাষ খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল।… অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।’

১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের যে বিবরণ ‘আনন্দমঠ’-এ পাই তার সঙ্গে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’-এর তুলনা করলে আধুনিক দুর্ভিক্ষের সঙ্গে অষ্টাদশ-উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষের বেশ কিছু মিল ও অমিল চোখে পড়বে। যারা চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে অর্থশাস্ত্রীয় গবেষণায় উৎসাহী তাদের জন্য। এরকম সাহিত্যিক তুলনা-প্রতিতুলনা বিরল অন্তর্দৃষ্টি জোগাতে পারে। ‘অশনিসংকেত’ উপন্যাসে (দুর্ভিক্ষ যখন দানা বাঁধছে) গঙ্গাচরণ চালের ব্যবসায়ী কুণ্ডু মশায়কে জিজ্ঞেস করলেন_ ‘ধান চাল কোথায় গেল? আপনার এত বড় দোকানের মাচা একদম ফাঁকা কেন?’ উত্তরে কুণ্ডু মশায় বললেন, ‘কি করবো বাপু, সেদিন পাঁচু কুণ্ডুর দোকান লুঠ হবার পর কি করে সাহস করে মাল রাখি এখানে বলুন। সবারই সে দশা। তারপর শুনচি পুলিসে নিয়ে যাবে চাল কম দমে মিলিটারির জন্যে’। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রেঙ্গুন থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেল, জাপানের সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ইচ্ছে করেই ভেঙে দেওয়া হলো। মজুদদারি ব্যবসা তো ছিলই। সাধারণ ব্যবসায়ী ও কিছুটা অবস্থাপন্ন গৃহস্থেরাও যাকে বলে ‘প্যানিক হোর্ডিং’ করা শুরু করল। সরকার বাহাদুর নিজেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আমদানিকৃত চালের একটা বড় অংশ পাঠিয়ে দিলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধরত সেনাদের কাছে। এই নীতির জন্য সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। আর দেশের ভেতরে বড় বড় আড়তদারকে বাধ্য করা হলো সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে। এই ধান ক্রয় করা হতো কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে_ এর মধ্যে সে সময় বড় ভূমিকা পালন করেছিল পরবর্তীকালের শিল্পপতি ইস্পাহানির মতো ব্যবসায়ী গ্রুপেরা। অর্থনীতিবিদ আবদুল্লাহ্ ফারুক তার ‘কয়েকজন বাঙালী শিল্পোদ্যোক্তার জীবনী’ বইতে জানিয়েছেন যে, এ সময় মজুদদারি ও ফাটকাবাজি ব্যবসায় লগি্ন করে লাভবান হয়েছিলেন ‘দানবীর’ রণদাপ্রসাদ সাহারাও। তাই উপন্যাসে কুণ্ডু মশাইকে গঙ্গাচরণ বলছেন, ‘বুঝে কাজ করুন, কিছু চাল দেশে থাকুক। নইলে দুর্ভিক্ষ হবে যে’। উত্তরে কুণ্ডু মশাই বললেন, ‘বুঝি সব, কিন্তু আমি একা রাখলি তো হবে না। খাঁ বাবুরা এত বড় আড়তদার, সব ধান বেচে দিয়েচে গবর্নমেন্টের কন্ট্রাক্টরদের কাছে। এক দানা ধান রাখেনি।’

তারাশংকরের ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসে পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম থেকে বিজয় নীলাকে লিখেছে, ‘এখন মাঘ মাস, এরই মধ্যে দেখছি_ ধান প্রায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। গত বছরের ডিনায়েল পলিসি, এ বছরের অজমা, এর ওপর চোরা বাজারের কালো কাপড় ঢাকা হাত ধান টেনে নিচ্ছে।’ সরবরাহে ঘাটতির কারণে বাজারে চালের দামও বাড়ছিল দ্রুত হারে। সুব্রত রায় চৌধুরী তার ‘কথাসাহিত্য মন্বন্তরের দিনগুলিতে’ বইতে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’ থেকে চালের দামবৃদ্ধি সম্পর্কে একটি সারণি উপস্থাপন করেছেন। তাতে দেখা যায়, সে বছর ফাল্গুনে চালের দর মণপ্রতি ছিল ৬ টাকা, সেটা চৈত্রের শেষে দাঁড়ায় ২০ টাকা। আশ্বিন মাসে অনঙ্গ বৌ মতিকে বলছে যে, চালের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে, উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের পারিশ্রমিক ছিল নিম্নরূপ_ গঙ্গাচরণের ক্ষেত্রে মাসিক আয় ১২ টাকা, দুর্গা পণ্ডিত পেতেন মাসে ৬ টাকা ৪৫ পয়া, নবীন বাড়ূই পেতেন দৈনিক ১৬ আনা করে, আর জেলে বৌ আরও কম_ দৈনিক ১০-১২ আনা করে। চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এদের সকলেরই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। এক পর্যায়ে নবীন বাড়ূই, জেলে বৌ বা মতি মুচিনীর হাতে কোনো কাজও ছিল না। মতি তো মারাই গেল। অর্থাৎ সাহিত্যেও অমর্ত্য সেন-ব্যাখ্যাত এক্সচেঞ্জ এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের ন্যারেটিভ বিশ্বস্ততার সঙ্গে রূপায়িত হচ্ছিল।

দুঃখের বিষয়, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বঙ্কিমচন্দ্র ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বিভূতিভূষণ (বা তারাশংকর) করেছিলেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলাদেশে বা অন্যত্র কোনো বিশ্বস্ত সাহিত্যিকে বিবরণী আমরা পাইনি এখনো। সত্তর-আশি দশকের বাংলাদেশের অব্যাহত সুশাসনহীনতা, রাজনৈতিক খুন ও গুমখুন, সামরিক শাসনের অভ্যুদয়, লুটপাটের অর্থনীতি এরকম নানা উপসর্গের পেছনে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও দুর্ভিক্ষজনিত মূল্যবোধের ক্ষয় একটি মৌলিক বিনাশের সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। অন্তত এমনটাই আমার কাছে মনে হয়েছে। ১৯৭৪ নিয়ে নীরবতা এদেশের সাহিত্য ও অর্থনীতি চর্চা উভয়ের ক্ষেত্রেই ফলদায়ী হয়নি। কবিরা স্পষ্টভাষী বলে সে সময়ে কিছুটা পরিমাণে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। রফিক আজাদ যেমন লিখেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’। শহীদ কাদরীও তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম দেন_ ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’। শামসুর রাহমানও লিখেছেন, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ বা ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’র মতো কাব্য-শিরোনাম। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ। সাধারণভাবে আমাদের সুবাধ্য সুশীল সমাজ ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও তার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো অব্যাখ্যাত কারণে নীরব থাকাটাকেই শ্রেয়তর অবস্থান বলে মনে করেছে।

লেখক
গবেষক
প্রাবন্ধিক

ইতিহাসের নিস্তব্ধতা

বিনায়ক সেন

১. দেশভাগ ও গণহত্যা

কোনো কাকতালীয় কারণে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশই_ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় গণহত্যা এড়াতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও অব্যবহিত পর সংঘটিত দাঙ্গাগুলোর বিস্তৃতি এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছিল যে, একে গবেষকদের এক বড় অংশ দেখেছিলেন ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’ (বা জেনোসাইডাল পার্টিশন) হিসেবে। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন_ শহীদ আমিন, বীণা দাস ও বোন পান্ডে স্বাধীনতার আনন্দকে মলিন হয়ে যেতে দেখেছিলেন পার্টিশন-দাঙ্গার বিষয় পরিণামে। আশিষ নন্দী, উর্বশী বুটালিয়া প্রমুখ যারা প্রথাগত অর্থে নিম্নবর্গের ইতিহাস-প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন তারাই প্রথম ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’-এর শব্দবন্ধটি প্রয়োগ করেন। একই ধারায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, গোয়ানিজ বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান পাকিস্তানের সাংবাদিক নেভিল এন্থনি ম্যাসকারেনহাস তার ‘সানডে টাইমস’-এর ১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রচ্ছদ নিবন্ধের শিরোনাম করেন ‘জেনোসাইড’। তবে তারও আগে আমাদের স্মরণ করতে হবে আদি-চিন্তক সাদত হাসান মান্টোকে, যিনি দেশভাগের সময়কালীন গণহত্যা নিয়ে তার অবিস্মরণীয় (কিন্তু সহজপাঠ্য নয়) ‘স্কেচগুলো’ রেখে গেছেন। এতই ব্যাপক ছিল গণহত্যামূলক দাঙ্গা যে, তার পরিণাম দেখে শিউরে উঠেছিলেন নেহরু ও জিন্নাহ উভয়েই। মান্টো তার অতি ক্ষুদ্র ‘বিনয়’ গল্পটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

‘দাঙ্গাকারীরা ট্রেনটাকে থামালো। যারা অন্য ধর্মের ছিল তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বার করল ও হত্যা করল। এসব কাজ যখন শেষ হলো তখন ট্রেনের বাদবাকি যাত্রীদের তারা আপ্যায়িত করল দুধ, কাস্টার্ড আর টাটকা ফল দিয়ে।’

ট্রেনটা ছাড়ার আগে আতিথেয়তা দানকারীদের নেতা সমবেত যাত্রীদের উদ্দেশে একটি বক্তৃতা দিলেন : ‘ভায়েরা ও বোনেরা, যেহেতু আপনাদের ট্রেন আসার সংবাদটি আমরা দেরিতে পেয়েছি তাই আমাদের যা ইচ্ছে ছিল সে রকম কোনো আপ্যায়ন আপনাদেরকে প্রদান করতে পারিনি।’
যারা গোবিন্দ নিহালনীর সিনেমা ‘তামস’ দেখেছেন বা কুশওয়ান্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ পড়েছেন তাদের এ নিয়ে বাড়তি কিছু বলার নেই। ইয়াসমিন খান তার ‘দ্য গ্রেট পার্টিশন : দ্য মেকিং অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’ বইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এ রকম নির্মম দেশভাগই কি ছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের কাঙ্ক্ষিত ‘চূড়ান্ত মুহূর্ত’? একেই কি নেহরু তার ১৫ আগস্টের মধ্যরাতের বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’_ নিয়তির সঙ্গে আমাদের অচ্ছেদ্য বন্ধন?

পাঠক নিশ্চয়ই বলবেন, কথা হচ্ছে ২৫ মার্চের ও তার পরের ৯ মাসের গণহত্যা, যেটা বাংলাদেশে ঘটেছিল তা নিয়ে। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের দেশভাগ (হোক তা গণহত্যামূলক দেশভাগ) টেনে আনা কেন? দুই কারণে। এক. বাংলাদেশেও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল ২৫ মার্চের গণহত্যাময় ‘কালরাত্রির’ পরই, দুই. বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে জাতীয়তাবাদী ঘরানার ইতিহাসবিদরা যত বই লিখেছেন, গণহত্যা নিয়ে লিখেছেন খুবই কম সে তুলনায়। একই কথা প্রযোজ্য ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের ক্ষেত্রে। তারাও জাতীয় আন্দোলন লিখতে গিয়ে দেশভাগের দাঙ্গাকে কার্যত এড়িয়ে গেছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার অভিজ্ঞতাই এক রাতের মধ্যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নাকি স্বাধীনতা’ এর মধ্যে যারা তখনও দোলাচলে ভুগছিলেন তাদের এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। এরপর আর থাকা চলে না পাকিস্তানের সঙ্গে_ এ রকম একটি সর্বজনীন বোধে মিলিত হয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। অভিজ্ঞতাটা চুন্নু ডোমের চোখে এ রকম:

‘আমরা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ শাঁখারীবাজার থেকে প্রতিবারে একশত লাশ উঠিয়ে তৃতীয়বার ট্রাকবোঝাই করে তিনশত লাশ ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর ও প্রবেশপথের দু’পাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিববাড়ী, রমনা কালীবাড়ি, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে লাশ উঠিয়েছি। … আমাদের ইন্সপেক্টর পঞ্চম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এরপর আমরা লাশঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-কিশোর ও শিশুর স্তূপ করা লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি। আর গণেশ, রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। লাশগুলো ঝাঁঝরা দেখেছি, মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাইনি, যোনিপথ ক্ষত-বিক্ষত এবং পেছনের মাংস কাটা দেখেছি। … প্রত্যেক যুবতীর মাথায় খোঁপা খোঁপা চুল দেখলাম।’

হুমায়ূন আহমেদের মতো শক্তিশালী লেখক ২৫ মার্চের গণহত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে তার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বইয়ে ন্যারেটিভ থামিয়ে দিয়ে গণহত্যার এসব প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য পাতার পর পাতাজুড়ে তুলে দিয়েছেন। মার্চের রাজনৈতিক সংলাপের এক পর্যায়ে এ রকম একটি গণহত্যা ঘটানোর পরিকল্পনা পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি করল কী করে? এটা করলে অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক যারা এ দেশে তখন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিলেন তারাও যে বিরুদ্ধ-পক্ষে চলে যাবেন এবং তার পরিণতি তো আরও অনিবার্য হয়ে উঠবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়_ কিছু আগে বা কিছু পরে সে সম্ভাবনাটুকু তারা কি আদৌ বিবেচনায় নিয়েছিলেন? ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে খ্যাত ২৫ মার্চের গণহত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন, ‘আমি আর্মির এ পদক্ষেপের বিরোধী ছিলাম। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলরা এর পক্ষে ছিলেন। তিন দিন ধরে আলোচনা চলছিল মুজিবকে নিয়ে কী করা হবে_ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হবে নাকি মেরে ফেলা হবে, তা নিয়ে। একাংশ চেয়েছিল তাঁকে মেরে ফেলতে। ২১ মার্চ পর্যন্ত আমরা জানতাম না আর্মি কোনো অ্যাকশনে যাবে কি-না। ২২ মার্চ টিক্কা (খান) আমাদের জানালেন_ তৈরি থাকতে।’ এই উদৃব্দতিটি যেখান থেকে নেওয়া সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পাকিস্তানের সিএসপি আমলা হাসান জাহিরের বই ‘দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’। তার বইয়ে অনেক নেপথ্যে বলা ঘটনার উল্লেখ আছে, শুধু বর্ণনা নেই ২৫ মার্চের গণহত্যার। এক জায়গায় তিনি বলছেন, মে-জুন মাসের দিকে তিনি গেছেন তার কিছু বাঙালি বন্ধুর বাসায়। সেসব বাসায় ভীত, বিচলিত, আতঙ্কিত দেখেছেন তাদের পরিবারকে : ‘সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে ভীতি ও নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলার যে চিত্র আমি দেখেছি তা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। এদের প্রতিটি পরিবার ভয়াবহ কাহিনী শুনিয়েছে আমাদের, এর মধ্যে ছিল মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা আর এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ছিল আর্মি অপারেশন।’ এর বেশি আর কিছু সেখানে পাওয়া যায় না। শুধু এক জায়গায়, তিনি বাঙালি নিধন-পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেছেন ‘ফাইনাল সল্যুশন’ হিসেবে। বলা বাহুল্য, এই শব্দবন্ধটি হিটলারের জার্মানিতে নাজিরা ব্যবহার করেছিল ইহুদিদের সমূলে সংহারের মাধ্যমে জাতি-নিধন পরিকল্পনাকে বোঝাতে গিয়ে। এই নীতি এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছিল_ এটা হাসান জাহির হিসাবে নেননি। ২৫ মার্চের গণহত্যার শিকার হয়েছিল প্রথমে রেললাইনের ধারের বস্তিবাসী ও তার পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়_ এটিও তার নজর এড়িয়ে গেছে।

২. ইতিহাসের ‘উচ্চকণ্ঠ’ বনাম ইতিহাসের ‘নিস্তব্ধতা’

ইতিহাস অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলে, অনেক বেশি বলে, কিন্তু অনেক বিষয় নিয়ে আবার কোনো উচ্চবাচ্যই করে না, এড়িয়ে যায় বা ‘নিস্তব্ধ’ থাকে। ইতিহাস যেহেতু আমাদের কাছে ‘অতীত’কে বিনির্মাণ করে, উপস্থাপনা করে, সেহেতু কোন ঘটনাটা কতটা প্রাধান্য পায় তার ওপরে ভিত্তি করে আমাদের লিখিত-পড়িত ‘ইতিহাসবোধ’ (টেক্সট) তৈরি হয়। ইতিহাসের জন্য যা অস্বস্তিকর, সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ফলে শেষাবধি আমরা যা পাই তা হলো সময়ের এক খণ্ডিত চিত্র কেবল। এই খণ্ডিত চিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে যে সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তাও খণ্ডিত হতে থাকে ‘ভেতর থেকে’। নিটশে একে বলেছিলেন, এ রকম ইতিহাসে ‘মৃতরা জীবিতদের মাটিচাপা দিয়ে কবর দেয়’।

বিসমার্ক জার্মানিতে একনায়ক হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার দু’বছর পরে, ১৮৭৩ সালে, জার্মান দার্শনিক নিটশে কিছু ‘অসময়ের ভাবনা’ লিখতে শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি লেখেন_ ‘দ্য ইউজ অ্যান্ড এবিউস অব হিস্টরি ফর লাইফ’। এই ছোট্ট পুস্তিকাটি প্রথাগত

ইতিহাসবিদ্যার মৌলিক পদ্ধতিগত সমালোচনা হিসেবে আজ স্বীকৃত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চার নানা খুঁটিনাটি তথ্য পেশ করে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে, অথচ অনেক জরুরি বিষয় নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই, বিচার-বিশ্লেষণ তো আরও পরের কথা। এই ছিল নিটশের মূল কথা। নিটশের এই কথার সূত্র ধরে নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ তার একটি লেখায় বলেছেন, কোনো কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ইতিহাসপনা_ অতিরিক্ত স্মৃতিশক্তির মতো_ কোনো দেশের সংস্কৃতির অবক্ষয়মান স্বাস্থ্যকে নির্দেশ করে’। এক্ষেত্রে তিনি বিখ্যাত স্নায়ু

মনস্তত্ত্ববিদ এআর লুবিয়ার একটি গল্প উদৃব্দত করেন। এই মনস্তত্ত্ববিদের কাছে সমস্যা নিয়ে এক রোগী এসেছেন। তার সমস্যা হলো_ তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি : সে কোনো কিছুই ভুলতে পারে না, সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ খণ্ড খণ্ড চিত্র হিসেবে তার মনের মধ্যে রয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এত অসংখ্য খুঁটিনাটির মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গিয়ে কোনো কিছুরই অর্থ উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চা উভয় ধারার মধ্যেই অনেক অনাবশ্যক খুঁটিনাটি তথ্যের জড়ো হওয়াকে একটি বড় মানসিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও কোনো কোনো বিষয়ে আমাদের ‘প্রখর স্মৃতিশক্তির’ পরিচয় পাই। বস্তুত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ_ এই তিনটি দেশেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে অনাবশ্যক নানা তথ্যের বিপুল আয়োজন, যা পাঠককে (ও নাগরিককে) ‘ক্লান্ত, ক্লান্ত’ করে। বাহান্না, বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তরের ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ_ জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসে যেটা হারিয়ে যায় তা হলো সাধারণ জনচৈতন্যের ও জনজীবনের ক্রমবিবর্তনশীল নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের পুরো গল্পটা আবর্তিত হতে থাকে ‘আগে থেকে গল্পের সমাপ্তি কী জেনে নিয়ে’ গল্প বলার মধ্যে (অর্থাৎ ‘টেলিওলজিক্যাল’ চরিত্রসম্পন্ন) এবং সে গল্পও আবর্তিত হতে থাকে ‘নায়ককে’ ঘিরে_ সেটা হতে পারে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, ব্যক্তিনায়ক হিসেবে মুজিব, ২৬ মার্চ, ১৭ এপ্রিল ও ১৬ ডিসেম্বরের বীরগাথা আর এসবের ‘অতিরিক্ত’ আয়োজনে চাপা পড়ে যায় ২৫ মার্চ_ যার সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে কেবল ‘একটি কালরাত্রি’। এমনকি ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস’ যেন নয়-নয়টি মাসের বিবরণ নয়, এটি যেন পূর্ব-নির্মিত রাজনৈতিক ভাবাদর্শের একটি অধীনস্থ প্রত্যয়, যেন একটি দ্রুত ঘটে যাওয়া পর্ব, যার প্রতিটি দিনের কোনো বিবরণ নেই বা যা হারিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের সামরিক যুদ্ধের খাতওয়ারি দিনলিপির মধ্যে। যদি ইতিহাসকে ‘ক্রম-প্রকাশ্য’ (আগে থেকে অনুমান সম্ভব নয় এমন) কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা যেত তাহলে আমরা অন্যরকম ইতিহাসের বয়ান পেতাম। সে ক্ষেত্রে আরও বেশি জীবন্ত, সত্যাশ্রয়ী ও মানবিক দেখাত ওপরের বর্ণিত জাতীয় মাইলফলকগুলো। সেখানেও স্বাধীনতার ইচ্ছা কীভাবে দানা বেঁধে উঠছিল তাকে ধরার চেষ্টা থাকত; কিন্তু সেটা হতো সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের চেয়ে আরও জটিল, বহু-সম্ভাবনাময় এবং বহু-ইঙ্গিতময় বয়ান। সেখানে উত্থান-পতন, সংশয়-দোলাচল, অস্থিরতা ও গণজাগরণ থাকত সব মানবিক বাস্তবতা নিয়ে। সেটি হতো না কেবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা সমরকৌশলের বিবরণ মাত্র। এ কারণেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ (বা চেতনাগুলো) এসব কথাকে কখনোই আমরা ঘটনাপরম্পরায় শনাক্ত করতে পারিনি এবং এ জন্যই (আমার ধারণা) আমাদের মৌলিক সাংবিধানিক প্রত্যয়গুলোতে যেমন : বাঙালি জাতীয়তাবাদের ‘বাঙালিত্ব’, সমাজতন্ত্রের ‘অভিপ্রায়’, গণতন্ত্রের ‘বৈশিষ্ট্য’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার ‘মানে কী’_ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো ‘সংজ্ঞাকে’ আমরা আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ডিসকোর্সে তুলে ধরতে পারিনি বা তা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক করতে পারিনি। এটা সম্ভব হতো যদি আমরা বাংলাদেশের ‘জনগণের ইতিহাসকে’ (পিপলস হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ) আমাদের ইতিহাস চর্চার প্রধান বিষয় হিসেবে শনাক্ত করতাম। তা না করে আমরা যা করেছি (কিছু স্মরণীয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে, যেমন বদরুদ্দীন উমরের ‘ভাষা আন্দোলন’ বিষয়ক গবেষণা) তা হলো একটি (নতুন) রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্ত লেখার চেষ্টা। ‘রাষ্ট্র’ অবশ্যই জনগণের ইতিহাস লেখার একটি অংশ; কিন্তু সেটিই একমাত্র ও প্রধান অংশ নয়।

৩. গণহত্যা নিয়ে পাঠ ও অপাঠ

‘রাষ্ট্রীয় ইতিহাস’ বনাম ‘জনগণের ইতিহাস’ এই প্রতিস্থাপনাটি সবচেয়ে বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বা তার পরের ৯ মাসের ক্রমাগত গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের বিবরণী পাঠ করি। আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ড, যেখানে সংকলিত হয়েছে ‘গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’। এর ভূমিকায় সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার দলিল ও তথ্য জমা হয়েছে। এর ভেতর ১৫ হাজার পৃষ্ঠা ছাপা হচ্ছে। বাকি দলিল ও তথ্যাদি ছাপার বাইরে রয়ে যাবে’। দুঃখের বিষয়, বাদবাকি দলিল ও তথ্যাদি গ্রন্থিত আকারে আমরা এখনও পাইনি বা পেলেও হয়তো অত্যন্ত আংশিকভাবে পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, এ অষ্টম খণ্ডটির কোনো ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থও (আমার জানা মতে) এখন পর্যন্ত বাজারে আসেনি। অষ্টম খণ্ডটিতে ২৬২টি মূল্যবান সাক্ষাৎকার রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই হলো সাধারণ মানুষের বয়ান। এ সাক্ষাৎকারগুলো সংগৃহীত আলাপের অতি সামান্য অংশ; কিন্তু এতে করেই একাত্তরের গণহত্যার যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে তাতে করে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়কে প্রামাণ্যতার ভিত্তিতে আমাদের নিজেদের ও বিশ্ববাসীর জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করা সম্ভব।

কী আছে এসব সাক্ষাৎকারে? প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো, এক বৈরী রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত সামরিক-রাজনৈতিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অসহায় এক নিরপরাধ সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভয়ার্ত দিনযাপন। একাত্তরের ৯ মাসে কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই পুরো দেশটা এক বন্দিশিবিরে পরিণত হয়েছিল তার প্রামাণ্যতা মেলে এখানে। আমি বলেছি, প্রথম অনুভূতিটা ছিল ‘ভয়ের’_ এক ভীতিবহ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়েছিল ওই নয় মাসে। একটি উদাহরণ নাজিমুদ্দিন মানিক বলছেন, ২৬ মার্চের ভোরবেলার কথা:

‘বায়তুল মোকাররমের মোড়ে রাস্তার ওপর আরও দুটি নাম না জানা বাঙালি বীরের নশ্বর দেহ চোখে পড়ল, চোখে পড়ল জিপিওর পেছনের গেটে এক ঝুড়ি রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ড আর নাড়িভুঁড়ি। তবুও আমি হেঁটে চলেছি, হেঁটে চলেছেন আমার চারপাশের মানুষজন। কেননা আমি এবং আমার চারপাশের মানুষ_ আমরা সবাই তখন বাঁচতে চাই এবং সে জন্যই আমাদের কারও প্রতি কারও কোনো খেয়াল নেই, কারও সঙ্গে কারও কোনো কথা নেই। সবার চোখেই একটা সন্ত্রস্ত ভাব। সবাই ভীতি বিহ্বল’।

প্রাথমিকভাবে যেটা ছিল ভয়ের অনুভূতি, সেটা সময়ের সঙ্গে নীরব অসহযোগিতা ও ক্রমেই সক্রিয় প্রতিবাদ প্রতিরোধে রূপ নেয়। অনেকগুলো সাক্ষাৎকারে বর্ণিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ ছাত্র, নারী, বৃদ্ধ, সাধারণ কৃষক, মেহনতি মানুষ, আলেম, ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, শারীরিক নির্যাতন, অগি্নসংযোগ ও হত্যার বিবরণ। বিশেষভাবে এসেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘জাতিগতভাবে’ ধ্বংস ও তাদের হত্যা করার বর্ণনা। এসব সাক্ষাৎকার একনাগাড়ে পড়াও সম্ভব নয়, এমনই সব নির্যাতনের বিবরণ দেয়া হয়েছে। যত ধরনের নারী-নির্যাতন সম্ভব, যত ধরনের হত্যা সম্ভব, যত ধরনের আক্রমণ ও লুণ্ঠন সম্ভব_ সব কিছুর নমুনা সংকলিত হয়েছে এসব গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের ডকুমেন্টেশনের মধ্যে।

এসব সাক্ষাৎকারে বেরিয়ে এসেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসার বা জওয়ানদের চেয়েও পাশবিক ভূমিকা পালন করেছে এ দেশের একটি গোষ্ঠী_ যারা রাজাকার বাহিনী, শান্তি কমিটি প্রভৃতি সাংগঠনিক আয়োজনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে মফস্বল শহরে ও গ্রামাঞ্চলে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। ব্যক্তিগতভাবে এদের মধ্যেও কেউ কেউ কদাচিৎ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন এমনও দৃষ্টান্ত মেলে এসব সাক্ষাৎকারে। তবে সাধারণ চিত্রটা ছিল এদের সম্পর্কে এটাই। অকাট্য সব প্রমাণ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপতৎপরতা ও সরাসরিভাবে নিরীহ-নির্দোষ মানবতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের জুন মাসের পরের সময়ের বিবরণ যেসব সাক্ষাৎকারে দেয়া হয়েছে তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে দখলদার বাহিনী ও তার সহযোগী শক্তিদের মধ্যে ক্রমাগত ভীতি সঞ্চারের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধারণ অবাঙালিদের ওপর বাঙালির আক্রমণেরও কিন্তু সাক্ষ্য পাওয়া যায় এসব সাক্ষাৎকারে। এ সময়ের বেশিরভাগ অত্যাচার-নির্যাতনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা। যারা অত্যাচারিত হয়েছে তারা খুব কম উদাহরণেই সেসব তথ্য দিয়েছেন শত অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তারা তথ্য গোপন করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন। এদের অনেকেই বলেছেন যে, তারা এখন শারীরিকভাবে পঙ্গু বা চলৎশক্তিহীন বা ক্রনিক কোনো ব্যাধিতে ভুগছেন বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দিন কাটাচ্ছেন কোনোভাবে। এসব বীরত্বময় ব্যক্তিরা প্রতিরোধের কাহিনী পড়তে গিয়ে আপনার মনে হবে_ এরাও তো ছিলেন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তা তাদের সনদপত্র থাকুক বা না থাকুক। আমার প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কি এদেরকে অষ্টম খণ্ড থেকে শনাক্ত করে কোনো সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা কখনো নিয়েছে? বা কোনো নিতান্ত বৈষয়িক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের তরফ থেকে? আছে কি এদের নামে প্রতিটি গ্রামে কোনো স্মৃতিফলক? এ জন্যই এই লেখার শুরুর দিকে উচ্চকণ্ঠ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ইতিহাসের বিপরীতে জন-ইতিহাসের নিস্তব্ধতার কথা বলেছি।

তবে এতসব সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারেকাছেও যাননি এখনো যারা দেশে-বিদেশে ১৯৭১-এর গণহত্যা অস্বীকার করেন_ তারা। হার্ভার্ড গবেষক শর্মিলা বোস এদের একজন। তিনি অনায়াসে তাই লিখতে পারেন যে, নারী নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন এ জাতীয় কাজ দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করেনি বা করলেও এসবে তাদের অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই। এ দেশের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যারা ভেতর থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছিল নয় মাস ধরে, তারাই বেশিরভাগ আক্রমণ-নির্যাতন করে থাকবে। এ জন্যই তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ বলার পরিবর্তে ‘গৃহযুদ্ধ’ শব্দটি পছন্দ করেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে তা সঠিক হলেও সাধারণভাবে এটি একটি অতি অসত্য পর্যবেক্ষণ। শর্মিলা বোস তার ‘ফিল্ড-ওয়ার্ক’-এর ভিত্তিতে যে বইটি লিখেছেন তার নাম ‘দ্য ডেড রেকনিং’। সে বইয়ে তিনি

অষ্টম খণ্ডের একটি কেস স্টাডিকেও আবার নতুন করে বিচার করার প্রয়াস নেননি স্বীয় মত প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি ব্যাপক হারের গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু অষ্টম খণ্ডের যে কোনো সাক্ষাৎকারই তার মতের বিপক্ষে যায়। তিনি ব্যাপকভাবে ‘নারী ধর্ষণ’-এর বিষয়টিকেও ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মনে করেছেন। আমার সামান্য হিসেবে আমি দেখতে পাচ্ছি যে, শতকরা ৭০ ভাগ সাক্ষাৎকারেই সরাসরিভাবে নারী ধর্ষণের উল্লেখ রয়েছে এবং বিশেষ করে যেখানে নারীরা নিজেরা বয়ান দিয়েছেন তার প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই পাশবিক নারী নির্যাতনের উল্লেখ রয়েছে। এসব নারীর কারো ঠিকানা সংগ্রহ করে মুখোমুখি হতে চেষ্টা করেননি শর্মিলা বোস। গণহত্যা অস্বীকারকারী হলোকাস্ট ডিনায়ার হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তার বইয়ের জন্য, বিশেষভাবে যা সমাদৃত হয়েছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের পাকিস্তানে, যেখানে তিনি প্রায় সেলিব্রেটি। পারিবারিক সূত্রে তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের ভাই শিশির কুমার বোসের মেয়ে_ ফলে তিনি বাড়তি কিছুটা মনোযোগও পেয়েছেন। আমি নির্মোহভাবে বিচার করেই এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডটি অস্বীকার করে, বিশেষত একে তার গবেষণার নমুনা বয়ানে অন্তর্ভুক্ত না করে, তিনি মৌলিক অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছেন।

২৫ মার্চের গণহত্যা বা সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস-নির্যাতন সম্পর্কে নিস্তব্ধতা রয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাস চর্চায়। এই নিস্তব্ধতা এখনো চলছে। হামিদ মীরের মতো সাহসী সাংবাদিক এর ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই, কিন্তু তারপরও এই উদাসীন্য চলছে। সে দেশের জনগণকে একাত্তরের প্রকৃত ঘটনা জানতে দেয়া হয়নি কখনো। এখনো তারা একাত্তরের গণহত্যার অধ্যায়টি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। ২০০৭ থেকে ২০০৯ প্রায় তিন বছর বর্তমান লেখক বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ হিসেবে পাকিস্তানের ওপর কাজ করেছেন। পাকিস্তানের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রণালয়ে ও দফতরে তাকে যেতে হয়েছে কর্মোপলক্ষে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমি লক্ষ্য করেছি যে, ২৫ মার্চের গণহত্যা বা নয় মাসের অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই সাধারণ পাকিস্তানিদের, এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আমলাদেরও। বাংলাদেশ ‘বিযুক্ত হয়েছে’ সামরিক শাসকদের এবং ভুট্টোর ভুলের কারণে_ এ পর্যন্ত তারা কেউ কেউ স্বীকার করেন; কিন্তু গণহত্যার আলোচনা সম্পর্কে তারা অজ্ঞ, অথবা তা জ্ঞানত বা অজ্ঞানত এড়িয়ে গেছেন। এদের মধ্যে যারা কিছুটা অসহিষ্ণু_ তারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য ইন্দিরাকে দায়ী করেন এবং মুজিবকে সাধারণভাবে মনে করেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। পাকিস্তানের নানা শহরে পূর্ব

পাকিস্তানের অনেক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদের নামে সড়ক রয়েছে (শেরে বাংলা ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীসহ)। কিন্তু একটিও সড়ক নেই শেখ মুজিবের নামে। অফিসিয়াল এস্টাবলিশমেন্টেরচোখে মুজিব এখনো ‘সবচেয়ে ঘৃণিত’ ব্যক্তি। ২০০৭ সালে লাহোরে সেন্সাস কার্যালয়ে নানা আপ্যায়নের মধ্যে আমার কাছে এ রকম একটি বক্তব্য জোরেশোরে তুলে ধরেছিলেন একজন উচ্চপদস্থ আমলা। আমি তাকে হাসান আসকারী রিজভীর লেখা ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘মিলিটারি, স্টেট অ্যান্ড সোসাইটি ইন পাকিস্তান’ বইটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। সেখানে এক জায়গায় রিজভী লিখছেন:

‘(মার্চের) সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরোধ আন্দোলনকে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। আওয়ামী লীগের কট্টর অংশটি চেয়েছিল মার্চের শুরুতেই স্বাধীনতার ঘোষণা করতে; কিন্তু মুজিবুর রহমান তাদেরকে পিছু টেনে রেখেছিলেন। মার্চের আন্দোলনের পরে … পাকিস্তানের সাথে যেটুকু ভঙ্গুর যোগাযোগ ছিল দেশটির, যদিওবা তার অবশিষ্ট কিছু থেকে থাকে সেসময়ে, তাও সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেল যখন সেনারা শহরে ঢুকল শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে।’

২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল আমাদের সাধারণ জনচৈতন্যে তদানীন্তন পাকিস্তানের সাথে অবশিষ্ট মানসিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার মুহূর্ত। এই কথাটা আমি লাহোরে কেন্দ্রীয় সেন্সাস কার্যালয়ে বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেছিলাম। এরপর সভাকক্ষে এক ধরনের বিষণ্ন ও অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছিল। ইতিহাস শুধু ‘অনিবার্যতার’ মাধ্যমে অগ্রসর হয় না, এর মধ্যে ক্রান্তিলগ্নের ‘আকস্মিকতার’ অবদানও ক্রিয়াশীল থাকে, যা নাটকীয়ভাবে ভিন্ন যুগের ভেতরে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যায়।

লেখক
অর্থনীতিবিদ
প্রাবন্ধিক

উপর্যুপরি আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

দ্বিতীয় কিস্তি (প্রথম কিস্তি)

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতন বিভিন্ন যুগে হয়েছে। তবে ধারণা করা যায় যে প্রাক-ঔপনিবেশিক, ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক ও আধুনিক আমলে এই নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ছিল। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে ২০১২ বা ২০১৩ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। এটাই এখানে আমার মূল বক্তব্য।

কিন্তু তার আগে আমাকে বাঁশখালীতে ফিরে যেতে হবে। আমি সেখানে যাইনি। অনেকের মতো আমিও সেই বিপর্যস্ত নারীকে দেখেছি টিভির পর্দায়, বিভিন্ন চ্যানেলে, দগ্ধ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত অবস্থায় কাতরস্বরে কী যেন বলছেন এবং পরমুহূর্তে আবার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত তাঁর এত দিনকার গৃহস্থালির অবশিষ্টাংশ ও পোড়ামাটির ধুলায় ক্লান্তিতে কান্নায় শুয়ে পড়ছেন—এ রকম একটা ছোট্ট ‘ক্লিপ’ আমাদের দেখানো হয়েছে। আমি তাঁর নাম পর্যন্ত জানি না। কিন্তু মাতৃসমা এই নারী আমাকে পেয়ে জানতে চাইতেই পারেন, ‘বাবা, এই যে এসব ঘটে গেল, এটা কেন হলো, এর ব্যাখ্যা কী?’ ফলে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে আবারও বিস্মৃতি থেকে টেনে আনতে হচ্ছে কেবল তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য, যেপ্রশ্ন তিনি কখনোই আমাকে করেননি বা হয়তো কাউকেই করেননি বা সম্ভবত কোনো দিনই করবেন না। তবে তাঁর ঘর-গৃহস্থালির অবশেষ দেখে এবং শুধু তাঁর নয়, অধিকাংশ মানুষ যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সম্প্রদায়কেন্দ্রিক এই আক্রমণে, তাঁদের সহায়-সম্পত্তি দেখে—এ রকম ধারণা আমার জন্মেছে যে তাঁরা কেউই উচ্চবর্গের নন। এমনকি শহরে মধ্যবিত্তের যে জীবনমান তার চেয়েও বেশ কিছুটা নিচুতেই তাঁদের অবস্থান বোধ করি। বস্তুত, আক্রমণের পর তাঁদের ঘর-গৃহস্থালির যে চেহারা দেখানো হয়েছে টিভির পর্দায় বা পত্রিকার স্থিরচিত্রে, তাতে করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জেগেছে আমার তা হলো—এখান থেকে লুটপাটের কী পেল দুর্বৃত্তরা? এঁরা হয়তো ভূমিহীন চরম দরিদ্র পরিবারের কেউ নন, কিন্তু মধ্যবিত্তের সম্পদ-জমি ইত্যাদি সংজ্ঞায় এঁরা পড়েন কি না এ নিয়ে শেষাবধি সন্দেহ থেকেই গেল। সম্পদ বলতে একটা ভিটেমাটি, চালাঘরের মধ্যে একটা খাট বা বড়জোর একটা আলনা, কিছু ঘটি-বাটি, একটা দুটো চেয়ার-টেবিল বা বড়জোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট টিভি। এঁরা গ্রামবাংলার ধ্রুপদি গরিব কৃষক বা ছোট্ট মফস্বল শহরের বা বাজার-উপজেলা কেন্দ্রের খুদে ব্যবসায়ী। প্রথাগত অর্থে সংখ্যালঘু বলতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যে শ্রেণীটিকে বোঝানো হয়ে থাকে, এঁদের স্থান তার থেকে অনেক নিচে—সামাজিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, শিক্ষার মান যেকোনো মানদণ্ডেই তাঁদের বিচার করুন না কেন। এই কারণে আমি এঁদের ‘অতি-সংখ্যালঘু’ বলছি। এরা আলট্রা-পুওরের মতোই আলট্রা-মাইনরিটি।

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতনের যেসব প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে তা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কোনো বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার জন্য। এর কোনোটা লেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে (যেমন ১৮৮০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৬-এর দাঙ্গার কারণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে)। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের আগের (১৯৪৬ সালের) দাঙ্গা বোঝার তাগিদ থেকে। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের পরের (১৯৫০ বা ১৯৬৪ সালের) দাঙ্গার প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য। স্বাধীনতার পর এ দেশে ১৯৯২ সালের বা ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন নিয়েও কিছু লেখালেখি হয়েছে। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঁড় করানো হয়েছিল সেসব ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রেও এগুলো যথেষ্ট ছিল কি না সে বিষয়েও আমার কিছুটা সংশয় রয়েছে। কিন্তু আমি এখানে সেসব বিচারে যাব না। আমি ধরে নেব এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ন্যায্যতা রয়েছে। আমি শুধু দেখব যে এসব ডিসকোর্স দিয়ে ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে ব্যাখ্যা করা চলে কি না।

হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে একই আলো-হাওয়ার মধ্যে শত শত বছর বাস করেও ‘যাহা মনুষ্যচিত, যাহা ধর্মবিহিত’ সে রকম একটি সম্পর্ক ‘আমাদের মধ্যে হয় নাই’ এবং এই অর্থে আমাদের মধ্যে ‘একটি পাপ আছে’ ও ‘এই পাপ বহুদিন হইতে চলিয়া আসিতেছে’। এটা স্বীকার না করলে ‘এই পাপ থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নাই’। এর থেকে আভাস মেলে যে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেও, বিচ্ছিন্ন হলেও, মাঝেমধ্যেই দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়েছে; উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে নিয়ম না-মানা চৈতন্যপন্থী, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মতের যেমন, তেমনি সমতাবাদ অনুসারী নব্য ধর্মমত ইসলামের সঙ্গেও। তবে সে আমলে অতি-শাস্ত্র মানা বিশুদ্ধপন্থীদের সঙ্গে শাস্ত্র হুবহু না-মানা অবিশুদ্ধপন্থীদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মধ্যযুগীয় সমাজে; ফলে দ্বন্দ্ব থাকলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তা পর্যবসিত হয়নি সেকালে। এই অবস্থাটা উনিশ শতকের বাংলায়ও বহুকাল অবধি ছিল। ফরায়েজি-ওহাবি শুদ্ধাচরণের মতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গড়ে উঠেছিল লালন ও তাঁর অনুসারীদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তখনকার সমাজ এ রকম নানা মতবাদ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পেরেছিল বলেই সামাজিক ভারসাম্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাটা ১৮৮০ সালের পর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর পেছনে দায়ী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক উত্থান, যা বঙ্কিম-প্রদর্শিত বাহুবলের তত্ত্বকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে পরবর্তী দশকগুলোয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারের ওপর আক্রমণ-নির্যাতনকে এই দ্বন্দ্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় কি না? প্রথমেই আমাদের মনে পড়বে জমিদার-কৃষক দ্বন্দ্বের তত্ত্বের কথা। হিন্দু জমিদার বনাম মুসলমান কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িকীকরণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অনিবার্যভাবে জন্ম নিল—এমন মত পাওয়া যাবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের রচনায়। জমিদার বনাম কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব যে সাম্প্রদায়িক পরিণতিতে গড়াতে পারে তার আভাস রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিশদভাবেই পাওয়া যায়। তবে বাঁশখালীতে, বেগমগঞ্জে বা বাগেরহাটে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের ঠিক ঘরে-বাইরে-এর নিখিলেশের শ্রেণীতে ফেলা যায় না—এতে আশা করি কম-বেশি সবাই একমত হবেন। ১৯০৫-০৭ সালের ‘স্বদেশি আন্দোলন’ চলাকালীন বঙ্গভঙ্গ রোধে সেভাবে মুসলমান কৃষকেরা অংশ নেয়নি। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে কৃষকেরা ভেবেছিল, বাবুরা তো এমনিতে তাদের কাছে আসেন না, ‘বাবুরা বোধকরি বিপদে পড়িয়াছে’ বলেই এখন তাদের কাছে এসে স্বদেশি প্রচারণা চালিয়ে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারকে বা উপজেলা কেন্দ্রের আক্রমণের শিকার খুদে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ঠিক ধ্রুপদি অর্থে ‘হিন্দু বাবু’ বলা চলে না বোধকরি।

১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন দাঙ্গার একটি মেইনস্ট্রিম ব্যাখ্যা হলো, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণভাবে ব্যাপক কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাপক দ্বন্দ্ব ছিল এবং দ্বন্দ্ব বাড়ছিল এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত ও মুসলমান মধ্যবিত্ত প্রতিযোগিতা করছিল চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা খাতে নিজেদের ক্ষমতাবান করতে। একসময় সে প্রতিযোগিতা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের রূপ নেয় ও এর পরিণতিতে এমনকি তা দাঙ্গা-আক্রমণ-নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কালপর্ব নিয়ে লেখা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন উপন্যাসে এ রকম দ্বন্দ্বের বিস্তার কীভাবে গ্রাম এলাকায় ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েছিল তার সত্যনিষ্ঠ বিবরণী পাই। ক্রমেই জমিদার নিয়ামত হোসেন ও অত্যাচারী শশাংক পালের জায়গা নিচ্ছিল উঠতি ধনিক ধনু শেখ। তবে দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্বার্থচিন্তার তত্ত্বও বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ, বাগেরহাটের ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন-দাঙ্গাকে ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না। নির্যাতিত পরিবারগুলোকে কোনোভাবেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উঠতি মধ্যবিত্ত বলে মনে হয়নি আমার। এরা আদৌ কোনো আকর্ষণীয় সরকারি বা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নিয়োজিত কি না সে বিষয়েও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দুটো বড় দাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সামাজিক ভিতকেও ভেতর থেকে নড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও দেশভাগের দাঙ্গার প্রাথমিক আঘাত সামলে উঠে হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে এই বঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগের বছরে এদের সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে। ২০১১ সালে এটা আরও নেমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে। ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাগুলোর পেছনে মূলত দায়ী করা হয় বৈরী রাষ্ট্রশক্তিকে এবং সেই শক্তির সমর্থক মুসলিম লীগের রাজনীতিকে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শত্রু-সম্পত্তি আইন যারা জমি-বাড়ির মালিক, সেসব হিন্দু পরিবারের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়। বস্তুত, দাঙ্গার মাধ্যমে যতটা ক্ষতিসাধন হয়েছে এই শ্রেণীর, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে শত্রু-সম্পত্তি আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও হাল আমলের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে বুঝতে সাহায্য করে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় আজ সাম্প্রদায়িক বৈরী শক্তি অধিষ্ঠিত নেই। নেই মুসলিম লীগের মতো কোনো শাসক দলও। শত্রু-সম্পত্তি আইন সাধারণভাবে সারা দেশেই এখনো বিদ্যমান—এই পাপ আপনার, আমার, সবার—কিন্তু বিশেষভাবে বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ বা বাগেরহাটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কেন রাষ্ট্রশক্তি বা তার সহযোগী স্থানীয় সামাজিক শ্রেণী-দলগুলো চড়াও হতে যাবে কেবল সম্পত্তি দখলের জন্য, তার সপক্ষে যুক্তি মেলা ভার। এই অতি-সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করে জামায়াত-শিবির (যদি করেও থাকে) কী ফায়দা পাবে, সেটিও কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেথড ইন দ্য ম্যাডনেস’ সে রকম কিছু খুঁজে পাচ্ছি না এখানে। তাহলে এই অযৌক্তিককে কোন যুক্তিতে ধরব?

সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতনের সর্বশেষ যে ব্যাখ্যাটি আমার হাতের কাছে রয়েছে তা হলো, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রে এক জাতি, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্র—এ রকম রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের চাপে এসব দুরাচার ঘটছে। এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেহেতু আত্যন্তিকভাবে কোনো বিশেষ একটা আত্মপরিচয়কেই বড় ও চূড়ান্ত করে দেখতে চায়, সেহেতু অন্যান্য আত্মপরিচয়ের জাতি, গ্রুপ বা ব্যক্তিরা হয়ে পড়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একেই কালচারাল স্টাডিজ এবংবিধ বিদ্যায়তনিক পরিসরে বলা হয়ে থাকে ‘অপরায়ণ’। তবে ‘অপর’ হলেই যে ‘পর’ হবে বা ‘পর’ হলেই যে ‘শত্রু’ হবে এবং ‘শত্রু’ হলেই ‘নির্যাতনের লক্ষ্য’ হবে—এ রকম কোনো অবধারিত নিয়মনীতি অপরায়ণের সূত্রে গাঁথা নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনীতিতে সেক্যুলার বাঙালিত্ব তথা ‘ভাষাকে’ বড় করে তুলছে বলেই এর বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনীতিতে দাঁড়াতে হবে ‘ধর্মকে’ কেন্দ্র করে—এ রকম কোনো মিঠে ডায়ালেকটিক অনিবার্য নয়। এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে গিয়ে যিনি জাতিসংঘে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি একসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সদালাপী এই ব্যক্তিটি বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ‘জল বনাম পানির’ উপমা টেনে এনেছিলেন। কিন্তু বিষয়টা এত সরল ছিল না। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ভাষার ও অঞ্চলের এবং ধর্মের শব্দ এত বেশি ঢুকেছে যে এই ভাষার মিশ্র চরিত্রের ভিত্তিতে বঙ্কিমের মতো সাম্প্রদায়িক চিন্তকও একপর্যায়ে বাঙালি হিন্দুর বিশুদ্ধ ইতিহাস ব্যাখ্যা লেখা অসম্ভব বলে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে বঙ্কিম অবিমিশ্র আর্য জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির ইতিহাস লেখার বদলে একপর্যায়ে সম্ভবত ‘বহুজাতিক বাঙালি’র ইতিহাস লেখার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, ‘বাংলার স্বাধীন (মুসলমান) সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন’, ইত্যাদি। ভুল শুনলাম কি—‘বহুজাতিক বাঙালি’? যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে একই সঙ্গে বাঙালি ও বাংলাদেশি, একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘বহুজাতি’ এ দেশে গড়ে উঠতে পারা যাবে না কেন? এ রকম ‘বহুজাতিক বাঙালি’তে কে সংখ্যাগুরু, কে সংখ্যালঘু—এই প্রশ্নের গুরুত্বই কমে যায়। তা ছাড়া এই ভূখণ্ডে তো বাংলা ছাড়াও অন্যান্য বহু ভাষাভাষী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছেই, তাদেরও তো এই বহুজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি বাঁশখালীর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে পোড়ামাটির গন্ধ ও কালো ধুলার মধ্যে ভূলুণ্ঠিতা মাতৃসমা ওই নারীকে এসব তত্ত্ব বোঝাব কী করে? (শেষ)

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

সংখ্যালঘু বনাম আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা

প্রথম কিস্তি

আমি কি সংখ্যালঘু? এক অর্থে প্রশ্ন রাখাটাই হাস্যকর। আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নামই বলে দিচ্ছে আমি কী। এ নিয়ে বাহাস করার অর্থই হয় না। তবে বিষয়টা অত সরল না-ও হতে পারে। আজকাল সংখ্যালঘু কথাটার ‘সংখ্যায় লঘু’ এমন একটা কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংখ্যায় মেজরিটি হয়েও কেউ কার্যত মাইনরিটি হতে পারে। সারা বিশ্বে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, শিশুমৃত্যুর হারে অনেক বৈষম্য থেকে যাওয়ার পরেও। তারপরও কি আমরা বলতে পারি যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরেও সংখ্যালঘুর মতো অধস্তন অবস্থান তাদের। তার মানে ব্যাপারটা শুধু সংখ্যায় (নিউমেরিক্যালি) বেশি-কমের বিবেচনা নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—কে কত বেশি ক্ষমতাবান? নারীরা পুরুষদের চেয়ে এখনো কম ক্ষমতাবান বলেই সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু। সুতরাং সংখ্যায় বেশি-কম যা-ই থাক না কেন, কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা ব্যক্তি ‘ক্ষমতা হারিয়ে’ কীভাবে সংখ্যালঘু ‘হয়ে ওঠে’, সেটিই হচ্ছে প্রথম বিচার্য বিষয়। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, নারীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। যখন আপনি সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেন, তখন আপনি নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ ভাবতে শুরু করেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, একজন ইহুদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যাকে অ্যান্টি-সেমিটিকরা ইহুদি বলে ডাকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, একজন সংখ্যালঘু হচ্ছে সেই মানুষ, যাকে একজন সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বলে ডাকে, যেমন: ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে ‘উপজাতি’ বলে পরিচিত করে না, তাকে ‘উপজাতি’ বলে কোনো বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই নানা পরিচয় থাকে। কোন পরিচয়ে কে কখন কতটা নিজেকে জাহির করবে, সেই স্বাধীনতাটা সবার সমান নয়। আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) জাহির করার স্বাধীনতা যে সমাজে যত বেশি, সেই সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতাও তত বেশি এবং সেই সমাজও তত বেশি উন্নত। অমর্ত্য সেন তাঁর আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ে নিজের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন: ‘আমি একই সঙ্গে হতে পারি একজন এশীয়, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাঙালি, যার রয়েছে বাংলাদেশি পূর্বপুরুষ, একজন মার্কিন দেশে বা ব্রিটেনে বসবাসকারী, একজন অর্থনীতিবিদ, দর্শনচর্চায় অনুপ্রবেশকারী, একজন লেখক, একজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষজ্ঞ, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রে জোরালোভাবে বিশ্বাসী, একজন পুরুষ, একজন নারীবাদী, একজন “হেটেরোসেক্সুয়াল”, কিন্তু সমকামীদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনকারী, যার জীবনযাত্রার ধরন কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে খাপ খায় না (নন-রিলিজিয়াস), সে এসেছে হিন্দু সামাজিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড) থেকে, সে অ-ব্রাহ্মণ, এবং সে বিশ্বাস করে না মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জীবনে (আফটার লাইফে), বা এই প্রশ্ন যদি তাকে করা হয়, সে এ-ও বলবে—সে বিশ্বাস করে না কোনো পূর্ব-জন্মেও। এটা হচ্ছে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র নমুনা-চয়ন, যার প্রতিটাতেই আমি হয়তো একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত—এবং চাইলে এ রকম আরও অনেক পরিচয়ের সদস্য হতে পারি আমি; সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির বিচারে কোন পরিচয়টা সেই মুহূর্তে আমাকে বেশি টানছে, তার ওপর।’ অমর্ত্য সেনের স্বাধীনতা আছে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে লাগসই পরিচয়টা অবস্থাভেদে, পছন্দ অনুযায়ী ও রুচির বিচারে বেছে নেওয়ার। এই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ সবার থাকে না, সব শ্রেণীর থাকে না, সব সমাজে থাকে না।

অমর্ত্য সেন বইটি লিখেছিলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে প্রচারিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব। সংঘাত বলতে পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক মূলগত দ্বন্দ্বের ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও তাঁর অনুসারীরা। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নানাভাবে পাশ্চাত্যের শত্রু বানিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তারই বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হিসেবে অমর্ত্য সেন ২০০৬ সালে বইটি লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে এই বিরোধ আবিষ্কার ছিল একটি দুষ্ট-পরিকল্পনা। প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বকে এক পরাশক্তির অধীনে আনার ও সর্বত্র আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব জোরেশোরে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই বই লেখার আরও বহু বছর আগে থেকেই আমি আবছা করে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি ব্যক্তিকেই কোনো বিশেষ আত্মপরিচয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র বা ধর্ম বেঁধে দিতে পারে না। কোন পরিচয়ে সে নিজেকে কখন পরিচিতি করাতে চায়, সেই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ তার চাই—এটা তার মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং সে কারণেই কৈশোর থেকেই কেউ আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললে আপত্তি করেছি, পারলে প্রতিবাদ করেছি, না করলেও মেনে নিইনি।

এর জন্য আমার পারিবারিক ঐতিহ্যও কিছুটা দায়ী। আমি এখানে কোনো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা তুলছি না। আমার ধারণা, এ রকম অভিজ্ঞতা আরও অনেকের জীবনেই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সেটা মনে রেখেই দু-একটি আত্মজৈবনিক তথ্য যোগ করব এখানে। ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই আত্মকথন—তার জন্য আগেই তত্ত্বজ্ঞ পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার মা ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে তাঁর পরিচয়কে সীমিত রাখেননি। ঈদে বা শবেবরাতের অনুষ্ঠানে নিজে উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন, বাসায় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে দাওয়াতও দিতেন। উৎসবে বা সংকটে পড়লে মাজারে ‘মানত’ করা ছিল তাঁর সংসারের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব কিছু ‘ভোকাবুলারি’ ছিল। হাইকোর্টের মাজার ‘গরম পীরের মাজার’, ফলে মাজারের পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা জানানো চাই। নইলে আধ্যাত্মিক গুরু রুষ্ট হবেন। মিরপুরের মাজার আবার ছিল ‘ঠান্ডা পীরের মাজার’—তিনি দুর্বাসা মুনি নন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দোষ নেন না। আমাদের বাসায় জন্মাবধি দেখেছি নানা সময়ে বিভিন্ন মুসলমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন পুণ্যবান ব্যক্তিরা এসেছেন। তাঁদের যথাবিহিত যত্ন করা হয়েছে। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো যুক্তি শৈশব থেকেই পাইনি। মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন—যদি হিন্দু ধর্মে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে ভারতমুখিনতার সঙ্গে সমীকরণ করা হতো। পাড়ার বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গেলে যদি বিক্রেতা তাঁকে বলত, ‘দাদি, আপনাদের দ্যাশ থেকে আইছে।’ মা উত্তরে বলেছেন, ‘তাই নাকি, জানতাম না তো সিলেটে আজকাল এসব পেঁয়াজ হচ্ছে,’ এবং তারপরেই তিরস্কার করে বলে উঠতেন, ‘দাদির সঙ্গে ফাজলামি করার আর বিষয় পাওনি, না?’ বিক্রেতা লজ্জিত হতো, ‘না, দাদি, ভুল হয়ে গেছে’—এমনটাই বলত। তিনি বাজারের সবার কাছে ছিলেন ‘সর্বজনীন দাদি’। শুনেছি, মৃত্যুর পরে তাঁর মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য অনেক লোক তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, আমার বাবাও এই মতেরই মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন—অসংখ্য ছাত্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। মানুষ বড়ই রহস্যময় জীব। আমি মৃত্যুর পরে তাঁকে একবার মাত্র স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু তাঁর পূর্বতন (মুসলমান) ছাত্ররা ও সহকর্মীরা—যাঁরা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে আসীন হয়েছিলেন—তাঁকে নাকি অনেকবারই স্বপ্নে দেখেছেন এবং সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবিতে দেখেছেন। তাঁরা ফোন করে বা দেখা করে আমাকে তা বলার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি পারমার্থিক বিষয়ে নিবিষ্ট নই, কিন্তু আমার শুধু বলার কথা—হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের বিভিন্নতা সেখানে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ফলে আমার পক্ষে, নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবা কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয় একটি কারণও ছিল। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আমার বাবা অধ্যক্ষ বি বি সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন সমগ্র নর্থ-ইস্ট সেক্টরের ‘এডুকেশন অফিসার’ হিসেবে। শিলংয়ে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কাজটা ছিল রিলিফ ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের পরিচালনার কাজে অংশ নেওয়া। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন তাঁর পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে অধ্যক্ষ হিসেবে। এ দেশে বীরাঙ্গনাদের প্রথম কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানেই। মুজিবনগর সরকারে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা সবাই নাকি একটি করে ‘প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তবে স্বীকৃতি বা পদোন্নতি নিয়ে তাঁর মনে কখনো ক্ষোভ ছিল না। এই না-পাওয়াটাকে তিনি তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ পরিচিতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত করেননি। দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। একবার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যার মুখে। সেবার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার তাঁর পাকিস্তানি বস-এর ছোট ভাই হওয়ায় তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। আরেকবার এই স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে, সেনা-অভ্যুত্থানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে (বর্তমান লেখকসহ)। এই গ্রেপ্তার ছিল ভুল-বোঝাবুঝির, গ্রেপ্তার এবং যাঁরা এটা করেছিলেন তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাত্তগত ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করেছিলেন। সে রকম শুনেছি। তবে আমার গর্বের ব্যাপার যে আমার বড় ভাই ছিলেন একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। মুজিববাহিনীতে নয়, সে সুযোগও তাঁর ছিল। তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে (এফএফ) যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরে। জানের তোয়াক্কা না করে তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁকে আমরা সারা শরীরে জোঁকে-খাওয়া অবস্থায় দেখতে পাই নয় মাস যুদ্ধের পরেই। কিছুদিন ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার দায়িত্বপূর্ণ কাজেও ছিলেন, কিন্তু তদানীন্তন নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৭৪ সালেই ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন। সেটাও (পরে শুনেছি) স্বাধীনতার পরে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতার মুখ গলে তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল, বা এমনই কিছুর প্রতিবাদে। এরপর বাদবাকি জীবনটা প্রায় প্রবাসেই কাটালেন কোনো প্রবল অভিমান বুকে নিয়ে। এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত সদস্য হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ আত্মপরিচয়টা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আমারও আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল ও আছে।

তৃতীয় একটি কারণও রয়েছে, তবে সেটা মোটামুটি প্রকাশ্যেই ধারণ করে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই এবং কালক্রমে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলাম। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো কারণ ছিল না, কেননা পার্টিতে মণি সিংহ বা মোহাম্মদ ফরহাদ, জিতেন ঘোষ বা হাতেম আলী, মণিকৃষ্ণ সেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজয় রায়, মতিউর রহমান বা মনজুরুল আহসান খান—এসব নামের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত বিবেচনাবোধ কখনোই মনে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আমার প্রথম ও প্রধান আত্মপরিচয় ছিল—আমি সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের প্রগতির পক্ষের লোক। আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললেই (বলতে পারেন অনেকেই) আমি তা মানব কেন? ঠিক একইভাবে, পারিবারিক দিক থেকে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীও (যতই তাঁকে বোঝানো যাক) নিজেকে এখনো ‘সংখ্যালঘু’ বলে ভাবতে চান না বা পারেন না।

মোট কথা, অমর্ত্য সেনের দার্শনিক গ্রন্থটা পড়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা কখন কী পরিমাণে আমি জাহির করব, সে স্বাধীনতাটা আমাকে দেওয়া দরকার বা আমার অর্জন করা দরকার। কিন্তু এসব কথা আমি বাঁশখালীর ওই সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া মাতৃসমা নারীটিকে বোঝাব কী করে? বস্তুত, আমি তাঁকে সংখ্যালঘুও বলতে চাইছি না। তাঁর পরনের পোশাক, তাঁর ঘর-গৃহস্থালি, তাঁর পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে বলে দিচ্ছে, অন্য কোনো শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হওয়া দরকার এ ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে অনন্যোপায় হয়ে বলছি—তিনি আসলে অতি-সংখ্যালঘু।

দ্বিতীয় কিস্তি: অতি-সংখ্যালঘুর ওপরে আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

একটি ভিন্নধারার জন-আন্দোলন

শাহবাগ চত্বরে দেরিদা

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা ঢাকায় কখনো আসেননি। এই ভূভাগের সবচেয়ে কাছে তিনি এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়, ১৯৯৮ সালে। সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—পৃথিবীর সবাই মিলে ‘বইকে’ রক্ষা করতে হবে ‘কম্পিউটারের আগ্রাসী আক্রমণের’ বিরুদ্ধে। তার পরও শাহবাগ স্কয়ারে (এখন যেটা ‘প্রজন্ম চত্বর’ হিসেবে ক্রমেই পরিচিতি পাচ্ছে) এলে তিনি আজ উৎফুল্লই হতেন, কিছুটা অবাকও হতেন। সেটা এই কারণে নয় যে, এই চত্বরে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের অধিকাংশই তাঁর নামই শোনেনি। সেটা এ কারণেও নয় যে, এত অসংখ্য শিশু-কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েকে তিনি একসঙ্গে এর আগে জড়ো হতে দেখেননি। তাঁর তো জানাই ছিল, ১৯৬৮ সালের আগুনঝরা মে মাস, যে মাসে প্যারিসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসে দর্শনের ও গণতন্ত্রের একটা নতুন ধারণার সূচনা করেছিল ইউরোপে।

দেরিদার কথা মনে হলো এ জন্য যে, তিনিই প্রথমে বলেছিলেন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলনের কথা। তাঁর পরিভাষায়—ডিসেন্টারড রেভল্যুশন। যে আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত প্ররোচনা নেই, যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী ‘কেন্দ্র’, ‘সংঘ’ বা ‘আদর্শিক’ সংগঠন বা আইডিওলজি; যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী বা শ্রেণীজোট। এককথায়, যে আন্দোলন ধ্রুপদি মার্ক্সবাদের বাইরে, অথচ যা দেরিদার ভাষায়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য জরুরি। সুবিদিত যে, স্পেক্টরস অব মার্ক্স লেখার পর থেকে ডিকনস্ট্রাকশনের দেরিদা ক্রমেই ঝুঁকছিলেন এক নতুন ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে। দেরিদা অ্যান্ড দ্য টাইম অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে তার সবিশেষ বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।

দেরিদার কথা মনে হলো আরও এ কারণে যে, বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মধ্যে এরই মধ্যে দেখা গেছে এবং এখনো সেসব বৈশিষ্ট্যের পরবর্তী বিকাশের সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। তবে ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘাতের সমূহ সম্ভাবনা/আশঙ্কা রয়ে গেছে প্রজাতন্ত্রের পক্ষ ও বিপক্ষের যুযুধান শক্তির মধ্যে। যে ইতিহাসের মধ্যে আমরা এখনো আছি, সেই ক্রম-প্রকাশমান ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। দেরিদা একে বলেছিলেন, হিস্টরি অব দ্য প্রেজেন্ট। তার পরও কয়েকটি নজরকাড়া দিকের উল্লেখ না করে পারছি না।

২. আন্দোলনের নজরকাড়া দিক

প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরের চলমান আন্দোলন কোনো দলীয় বা বহুদলীয় জোট বা মঞ্চ থেকে শুরু হয়নি বা এখনো পরিচালিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীরা সামনে বা পেছনে থেকে অংশ নিচ্ছেন—নেওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে যাদেরই ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার, তারা যে ছাত্রসংগঠনেরই হোক, তারাই এখানে আসছে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আসছে, এমনকি ছাত্রদলের সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই আসছেন। কেননা, প্রশ্নটা দলীয় নয়, ব্যক্তিগত। এখানেও ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ আপ্তবাক্যটা খাটে। ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকেই এখানে লাখো মানুষ জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন। যেটা লক্ষ করার, তা হলো, রাজনৈতিক ছাত্রকর্মীরা যাঁরা এখানে অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরছেন না বা সেই পরিচয় জাহির করার জন্য তাঁরা উদ্বেলিত হয়ে উঠছেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলচর্চার বাইরে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই আন্দোলন অরাজনৈতিক। এর মধ্যেও তীক্ষ রাজনৈতিক বোধ রয়েছে, কিন্তু সেটা দলীয় রাজনৈতিক নীতি-আদর্শগত সংকীর্ণ বোধ থেকে আলাদা। যে অর্থে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘সব দর্শনচর্চা, সবকিছুই রাজনৈতিক’, ঠিক সেই অর্থে শাহবাগের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি নিয়ে এক নতুন ধরনের ‘নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ’-এর সূচনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ সেমিনারকেন্দ্রিক ও বিদেশি অনুদানপুষ্ট থিংক-ট্যাংক ও এনজিওভিত্তিক তথাকথিত সিভিল সমাজের ‘নাগরিক আন্দোলন’ থেকে আলাদা। এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ঘিরেই, মূলত সরকার-বদলকে কেন্দ্র করে, অথবা সরকারের নীতিমালাকে ঘিরে। অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতাচর্চার বলয়ে ঘুরপাক খায় এসব নাগরিক সংলাপ। এক অর্থে (গ্রামসীয় অর্থে) এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সমাজের আন্দোলনেরই একটি শাখা ‘এক্সটেনশন’। এদিক থেকেও থেকেও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে মনে হবে আলাদা চরিত্রের। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নির্ধারণ করলেই এটা বোঝা যায়।

এই আন্দোলন আদিতে শুরু হয়েছিল যাদের তাগিদে, তাদের একটি বড় অংশ এর আগের পাঁচ-সাত বছর ধরে—এই তরুণ বয়সেই—অনলাইনে তীব্র সংগ্রাম করে এসেছেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাত্তর নিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে, এ দেশের ইতিহাস নিয়ে, আজকের ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিরন্তর দুর্ভাবনা ও মনঃকষ্ট ছিল। কিছু একটা করার তীব্র ব্যক্তিগত তাগিদ একুশ শতকের এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ওই সাইবার যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছিল। হতে পারে, এসব ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁদের, তাতে পরিশীলনের ঘাটতি থেকে গেছে, সময় সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র লড়াই যে সাইবার স্পেসে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শাহবাগ আন্দোলনের জিনিওলজি বা সূত্রপাতের একটি চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়।

চতুর্থত, এই আন্দোলনের ‘উৎসবমুখর চরিত্র’ ভুলে যাওয়ার নয়। একে তো ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর দারুণ সময়। আমাদের সংস্কৃতির সেরা মাধ্যমগুলো: গান, নাটক, কবিতা, ছড়া, সিনেমা, চিত্রকর্ম—এসবের বর্ণিল সমাহার এখানে। এই আন্দোলনের ৯০ শতাংশের বয়সই পনেরো থেকে তিরিশের মধ্যে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আবার মেয়েরা। এই সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মিশেছে তারুণ্যের তীব্র ইনসাফ বোধ। সমাবেশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির পাশাপাশি বারবার যেটা বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ‘আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে চাই আমাদের অতীতকে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রকে’। আমাদের প্রজন্ম যেটা পারেনি আশি-নব্বইয়ের দশকে, সেটা একুশ শতকের প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। একটি শিশু, একজন কিশোরী, একটি তরুণের ডাকে অন্যান্য বয়সী, অন্যান্য পেশা ও শ্রেণীর লোকেরা সাড়া দিয়ে প্রতিদিন ও প্রতিরাত আসছে এখানে। কোনো বিশেষ নেতা বা নেত্রীর ডাকে তারা এখানে আসছে না। আন্দোলনের এই মেজাজটা আমাদের বুঝতে হবে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে কোনো দলীয় নেতা-নেত্রীর ছবি বা পোস্টার নেই। এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’।

৩. এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখব?

প্রতিটা প্রজন্ম তার নিজের নায়ক বেছে নেয়, তার নিজের বিপ্লব গড়ে তোলে, তার নিজের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বায়ান্নতে যার জন্ম, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে; যাদের জন্ম একাত্তরে, তারা অংশ নিয়েছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে; যাদের জন্ম নব্বইয়ের শুরুতে, তারা এখন অংশ নিচ্ছে ২০১৩ সালের এই শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে। আজ যারা অংশ নিচ্ছে তারা তাদের স্বকীয়তা নিয়েই আসছে। এর অকৃত্রিমতাকে (অথেনটিসিটি) যেন চিনতে ভুল না করি।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক দশকে তো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এমন কোনো চেতনার পুনরুজ্জীবন হয়নি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, তাহলে এই ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত চেতনা এত তীব্র হলো কী করে? এর একটা উত্তর হতে পারে, আমাদের ও তাদের মধ্যে প্রজন্মগত এক বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। তরুণেরা যে আমাদের থেকে প্রজন্মগত যুক্তিতেই অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিজস্বভাবে দেশপ্রেমের এক আলাদাবোধ ও বয়ান শাণিত করে তুলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি। গত দুই দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের নীরবে উঠে দাঁড়ানোও তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে থাকবে ‘কলঙ্কমোচন’-এর যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদের কলঙ্ক যেভাবে আমরা গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি; যেভাবে আমরা জাতি হিসেবে ভালো করছি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য মোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতের সরলতম সূচকে; যেভাবে গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ ছড়িয়ে পড়েছে এ দেশের নানা জেলায়-উপজেলায়; যেভাবে রপ্তানি খাতে, প্রবাসের কাজে, ক্ষুদ্রঋণে, আধুনিক ব্যাংক-বিমা সেবায়, নারীশিক্ষায়, ক্রিকেটে, বই প্রকাশনায়, গানে-নাটকে, বেসরকারি মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনে আমরা এগিয়ে গেছি—এসব নানা সাফল্যের পাশাপাশি বড় দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আমাদের গত কয়েক দশকের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্তি। এটা একুশ শতকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা নিক বা ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা নিক—মাধ্যমনির্বিশেষে একই ধরনের প্রেরণায় একটি মূল দাবিতে একাত্ম হতে পেরেছে তারা।

কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, এর পরে কী? তরুণেরা কেন কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নেই নিজেদের দাবিগুলো সীমিত রাখছে? সমাজে তো কত অনাচার আছে, রাষ্ট্রের তো কত অন্যায় আছে, সরকারেরও তো কত দিকে ঘাটতি-ব্যর্থতা আছে—সেসব ইস্যু কেন স্থান পাবে না শাহবাগ চত্বরের স্লোগানে? আন্দোলনকারীরা এর উত্তরে বলতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি—আমরা এখনো দেশের ভার কাঁধে তুলে নিইনি। সব দায়মুক্তির ভার আমরা এখনই নেব কেন? তার পরও আমরা খোলা রেখেছি বইয়ের পাতা, বন্ধ করিনি অন্য সম্ভাবনাগুলো, আন্দোলনের জনতা চাইলে অন্যান্য ইস্যু আনতে পারে, তবে এটি আমাদের আদি ভাবনা ছিল না। কেননা, যেসব দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, তার অর্ধেক অর্জনও হবে আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া।

আমার চোখে, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের একটি মৌলিক অভিপ্রায় হচ্ছে—সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকেই আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতে, সমাজ সংগঠনে ও সংস্কৃতিবলয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি মানেই আওয়ামী লীগ নয়; বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের একটা বড় অংশ একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না—এমনটাও ভাবা অসংগত নয়। ইউরোপের অনেক দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক নামের দল রয়েছে, সে সূত্রে এখানেও এমন দল থাকতে পারে, কিন্তু যে দলই করুক না কেন, চিহ্নিত যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের দলে রেখে কোনো পার্টি, জোট বা শক্তি রাজনীতি করতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। আগামী দিনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় বিবেচনা হিসেবে দেখা দেবে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের এটা একটি মূল পর্যবেক্ষণ। কেউ তো বাধা দেয়নি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শাহবাগে এসে সংহতি জানানোর ক্ষেত্রে। সেটা তারা করল না কেন? এর বিপরীতে আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পরে তাদের যে বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে এসেছে, বেশ কিছুটা হতাশই হয়েছি। এই শক্তিশালী ও অপার সম্ভাবনাময় আধুনিকমনা একটি প্রধান দলের কাছ থেকে আরও বলিষ্ঠ ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনরত সাধারণ জনসমাজের ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রে আরও সচেষ্ট হওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের না বোঝার কথা নয়।

সবশেষে, একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে—এই আন্দোলন আর কত দিন চলবে? সরকারি মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, পাছে এই আন্দোলন আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার দিকে গড়াতে থাকে! প্রধান বিরোধী দলের উদ্বেগ তো ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। শাসক অর্থনৈতিক শ্রেণীরাও চিন্তিত এই ভেবে যে, তাজরীন গার্মেন্টস-জাতীয় কোনো শ্রেণী-পেশার আন্দোলনের সঙ্গে তারুণ্যের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কি না! পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোনো আন্দোলনকেই শাসকশ্রেণী ও দলগুলো বেশি দিন সহজভাবে নিতে পারে না—এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। শাহবাগের আন্দোলন যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার পরও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যাবে আগামী বছরগুলোতে। আমরা পূর্ণ নয়, খণ্ডিতকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি। আমরা চিরস্থায়ী হতে চাই না, ক্ষণস্থায়িত্বেই আমাদের আনন্দ। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনে, কেননা সাইবার স্পেস থেকে রাজপথের স্পেসে চাইলে আমরা যেকোনো সময়েই আবার বেরিয়ে আসতে পারি, অন্য কোনো দাবি নিয়ে। আবার কালই ফিরে যেতে পারি, যদি জনসমাজ তা চায়। ভবিষ্যতে যারা এ দেশের গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে শঙ্কিত, তারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের এই বোধকে আশা করি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। শীত যাই যাই, ঋতুরাজ সমাগত, কড়া নাড়ছে দরজায়। এই আন্দোলনের উৎসবমুখর চরিত্র সবারই যে ভালো লাগবে এমন নয়। কোনো নিরীহ জন-আন্দোলনও একপর্যায়ে সহিংস আক্রমণের শিকার হতে পারে, এবং একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তার পরও মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের একটা দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন থেকে যাবে, একটা বড় দাগ রেখে যাবে এটি। কবি যেমনটা বলেছিলেন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।

নিজস্ব উদ্যোগ দ্রুতই নেয়া প্রয়োজন

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থ নেবে না সরকার— এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাটি আজ থেকে প্রায় সাত-আট মাস আগে বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে উল্লেখ করেছিলাম। কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব, সেটিও বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম সেখানে। বলেছিলাম, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফিরবে না এবং নিজস্ব অর্থায়নেই এটি নির্মাণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কাজ নিজস্ব অর্থায়নে করার প্রয়োজন নেই।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ মুদ্রায় জোগান দিতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এটি বড় কিছু নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখনো আছে। এর পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার বা তার কিছু বেশি হবে। সময় অতিবাহিত হওয়ায় ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। বিদেশী মুদ্রার ৫০ শতাংশ আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সহজেই জোগানো সম্ভব। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সপ্রবাহও ভালো। আমদানি এবার কম হয়েছে আমাদের। ফলে রিজার্ভ থেকে প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কঠিন হবে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে চার বছরে অর্থাত্ ২ বিলিয়ন ডলার আমাদের একসঙ্গে ব্যয় করতে হবে না। প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিদেশী মুদ্রার জোগান দিতে হবে। বাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার, ‘ডলার বন্ড’ ছেড়ে সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানে ৬-৮ শতাংশ সুদ দেয়ারও প্রয়োজন নেই।

আমি সম্প্রতি ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম, সেখানকার বিশেষজ্ঞ ও বসবাসকারীরা আমাকে বলেছেন, ২-৩ শতাংশ সুদ দিলেই ডলার বন্ড বিক্রি করা যাবে। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে সুদ পাওয়া যায় দশমিক ৭ শতাংশ। সেখানে ২-৩ শতাংশ সুদ ঘোষণা করলেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব। সেখানকার বাঙালিদের কাছ থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। অনেক বাঙালি রেস্টুরেন্ট মালিক আমার কাছে তাদের আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই বলছেন, বন্ডের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা চাপবে। বিষয়টি ঠিক নয়। প্রতি মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে এবং রফতানি থেকে যে অর্থ পাচ্ছি, তার সামান্য অংশই ব্যয় করতে হবে বন্ডের সুদসহ আসল পরিশোধে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও রফতানি আয় বাড়ছে। ফলে বন্ডের অর্থ ও সুদ পরিশোধকে বোঝা ভাবার যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করি না। এটি পরিশোধে অনেক বছর সময়ও পাওয়া যাবে।

বড় বিষয় হলো সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্যোগ নেয়া ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের প্রশ্ন। নিজস্ব অর্থায়নের পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার কথা, যেটি এক বছর আগে বলেছিলাম; তখন নেয়া গেলে আরো ভালো হতো। সরকার উদ্যোগও নিয়েছিল; কিন্তু পরে সেখান থেকে পিছিয়ে আসে। এখন আবার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদে তেমন কিছু করা যাবে না সত্য; তবে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করা সম্ভব এ সময়ের মধ্যেই। প্রতীকী হলেও কিছু কাজ শুরু করা উচিত। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল করতে এর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পদ্মা সেতু থেকে হাই রিটার্নও মিলবে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টও স্বীকার করেছেন, এ সেতুটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিকভাবে পদ্মা সেতু না হওয়ার যে মাশুল, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার তা দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকে অগ্রসর না হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরও রাজনৈতিক সমর্থন হারানোর শঙ্কা রয়েছে। দুটি কারণ মিলেই রাজনৈতিক অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দিকেই যাওয়া উচিত। অন্যরা যে বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন যেমন— অর্থায়ন, এগুলো বড় বিষয় নয়; অন্তত দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায়। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞও এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে মত দিচ্ছেন। তারাও দীর্ঘমেয়াদে পদ্মা সেতু ও রাজনীতির বিষয়টি অনুধাবন করছেন। সন্দেহ নেই, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে স্বচ্ছতা বজায় রাখায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

পদ্মা সেতুটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ইস্যু নয়, এটি জাতীয় বিষয়। এক্ষেত্রে বড় দুই রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো নির্মাণ ও এর উন্নয়ন কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠাও জরুরি। বর্তমান সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে আগামী সরকার সেটি চালিয়ে যাবে, তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কিন্তু সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। এক সরকারের নেয়া কর্মসূচি অন্য সরকার বন্ধ করছে না; বরং এটি সম্প্রসারণ করছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বর্তমান সরকার নিলেও আগামী সরকারকে তা চালিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজ শুরুর পর বিশ্বব্যাংকও পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে। আমরা আহ্বানও জানাতে পারি। যমুনা নদীতে নির্মিত সেতুর ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংক পরে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ স্থগিত রাখলে অর্থনৈতিক তো বটে, রাজনৈতিক-সামাজিকভাবেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।

উত্তর আধুনিকতার পাঠ

বিনায়ক সেন

১. আধুনিক যুগের ‘অবসান’ নেই?

ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে সময়কে তিন ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে_ যথাক্রমে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের জন্ম এবং পাঠ্যবইয়ের যুক্তি অনুসারে এই যুগ এখনও চলছে। আধুনিক যুগের অবসান নেই। এক অর্থে আধুনিক যুগে উত্তরণের পর থেকে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। এখন বড়জোর যেটা চলতে পারে তাহলো মূল ইতিহাসের বাইরে থেকে যাওয়া বিশ্বের অধিকাংশ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মেষশাবকের মতো ইতিহাসে প্রত্যাবর্তন। পাশ্চাত্যের যুক্তি_ সেটা সম্ভব কেবল আধুনিকায়নের মাধ্যমে। এটা শুধু এন্ড অব হিস্ট্রিখ্যাত ফুকোয়ামার যুক্তি নয়, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট তাত্তি্বকদের প্রায় সবাই কমবেশি এই মতে জড়ো হয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, এদের মধ্যে মতবিভেদ ছিল না। কিন্তু তা ছিল আধুনিকায়নের মধ্যেই মতবিভেদ। এনার্কিজম, সিন্ডিক্যালিজম, বলশেভিজম নানা মতবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল উন্নত-মাঝারি, পুঁজিবাদী নানা দেশে এই সময়ে। তবে এসব ডিসকোর্সে উপনিবেশের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না, কেননা উপনিবেশের অধিবাসীদের এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপ কখনও সমকক্ষ মানুষ বলেই স্বীকার করেনি। নইলে আমাদের ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ বলে ভাবাটাই সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। আরিস্ততলের গণতন্ত্রে যেমন দাসত্বের স্থান ছিল না, কান্ট-হেগেলের বিশ্ব-ইতিহাসে বা বৃহত্তর অর্থে বিশ্ব-শান্তির চর্চায় উপনিবেশের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আর বোবা ভাবলে বা করে রাখলে যা হয়, উপনিবেশ সম্পর্কে এক ধরনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মিথ্যাচারকে ক্রমাগতভাগে পুনরুৎপাদিত করা হচ্ছিল ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবিদ্যা নামক জ্ঞান কাণ্ডে। এসব তথ্য অবশ্য আমাদের ইতিমধ্যে এডোয়ার্ড সাইদের রচনা ও রণজিৎ গুহের নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চার কল্যাণে জানা হয়ে গেছে। এরা যেসব প্রশ্ন তুলেছেন তার আদি-প্রেরণা হিসেবে ছিলেন এবং আছেন মার্কস।

আধুনিকতা অথবা উত্তর-আধুনিকতা যে পথেই আপনি থাকুন না কেন মার্কসের কাছেই আপনাকে ফিরে যেতে হবে। অন্তত মার্কসের স্টেশনে কিছুক্ষণ হলেও আপনাকে জিরোতে হবে। এর কারণ, মার্কসের রচনাবলীর মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে আধুনিকতার অনিবার্যতা, তেমনি পাওয়া যাবে এর সমালোচনাও। অনেক সময় তিনি তার লেখায় যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন তা নিয়েই শতখানেক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখা হয়েছে। একটা উদাহরণ দেই। মার্কস এক পর্যায়ে বলেছিলেন, হেগেলের রচনায় ডায়ালেকটিকসের তত্ত্ব ‘মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে’। তার মানে এখন তাকে ‘সোজা করে নিলেই’ বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসকে নিষ্কাষণ করা যাবে। এ রকম একটা ব্যাখ্যা হতেই পারে। যেমন, একটা ব্যাখ্যা হতে পারে হেগেলের মন ভাববাদী, কিন্তু তার পদ্ধতি ডায়ালেকটিক্যাল যাতে কোনো ভুল নেই। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার এতে বাধ সাধলেন। তার যুক্তি, মাথার উপরে দাঁড়ানো হেগেলীয় পদ্ধতিকে সোজা করে নিতে গেলে নাট-বল্টু সবকিছুতে এলোমেলো হয়ে যায়। মার্কসীয় ডায়ালেকটিকস হেগেলের লেখা থেকে নয়, মার্কসের নিজের লেখা থেকেই আবিষ্কার [নিষ্কাষণ] করে নিতে হবে। সে সূত্রে তিনি মার্কসের মধ্যেই হেগেলীয় ‘তরুণ মার্কস’ আর স্বকীয় মহিমায় ভাস্বর ‘পরিণত মার্কস’_ এ দুইয়ের মধ্যে খুঁজে পেলেন ‘জ্ঞানতাত্তি্বক ভেদরেখা’ [এপিস্টেমোলজিক্যাল ব্রেক] । যা হোক এসব তর্ক ও ধন্দের কারণে মার্কসকে কখনও আধুনিকতাবাদীরা তাদের দলে টানার চেষ্টা করেছেন। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের অনেকেই মার্কসের রচনায় আধুনিকায়নের ‘নষ্ট রক্ত’ খুঁজে পেয়েছেন। আবার ফ্রেডেরিক জেমেসনের মত উত্তর-আধুনিক মার্কসবাদীরা মার্কসকে তাদের আদি-প্রেরণা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্যরা যারা প্রথম দিকে বেশ সোচ্চারেই মার্কস-বিরোধী ছিলেন বা সেদিকেই তাদের কণ্ঠ বেশি করে শোনা গেছিল, পরবর্তীতে তারাও তাদের মত কিছুটা বদলেছেন। বিশেষভাবে এটা ঘটেছে ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদার রচনায়_ স্পেক্টর অব মার্কস গ্রন্থের পর থেকে। ফুকোর শেষের দিকে রচনায় জোরেশোরে ফিরে এসেছে ইতিহাসে কর্তার [সাবজেক্ট] ভূমিকা, ফলে মার্কসের রচনার মতোই তরুণ ফুকো ও পরিণত ফুকোর মধ্যে বেশ খানিকটা ভেদরেখা সৃষ্টি হয়ে গেছে।

এসব বিভিন্নবিধ সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনার পেছনে মূল তাগিদ হচ্ছে সমাজকে বদলানো। আর সমাজকে বদলাতে গেলে প্রথাগত ব্যবস্থার দুই প্রধান সহায়ক শক্তি_ রাষ্ট্রযন্ত্র ও অর্থনীতি_ এদেরকেও যে বদলাতে হয়। আর এই পাল্টে দেয়ার ব্যাপারটা তো পুরোনো দালান ভেঙে নতুন দালান করার প্রকল্প নয়। একেক রাষ্ট্র ও একেক অর্থনীতি একেক ধরনের সমাজ ও সেই সঙ্গে একেক ধরনের ‘মানব’ তৈরি করে থাকে। আমরা যে কথার কথা হিসেবে বলি, উনি বেশ সনাতনী ধারার লোক, উনি বেশ চলতি হাওয়ার পন্থী সেসব আদৌ কথার কথা নয়।

আধুনিকায়নের মধ্যে থাকতে থাকতে আমাদের অন্দর-মহলেও আধুনিকায়ন ঢুকে পড়ে। চিন্তা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই, কিন্তু মনের জানালা দিয়ে আধুনিকায়নের স্বপ্ন কুয়াশার মতো ঢুকতে থাকে। ঢাকার রাস্তায় হাঁটি, কিন্তু মনে মনে ঢাকা শহরকে দেখি না, আসলে হাঁটতে থাকি ম্যানহ্যাটানের ফুটপাতে। এদেশ এগুচ্ছে; তার বিলবোর্ড করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি বা আইফেল টাওয়ারের কথা। গ্রাম-বাংলার তপ্ত দুপুরের রোদে কাজ থামিয়ে ক্ষেতের পাশেই গামছা বিছিয়ে নামাজ পড়ছে যে বৃদ্ধ কৃষক তার মুখচ্ছবি আমাদের বিলবোর্ড থেকে হারিয়ে যায়। রণে-বনে- সংকটে আমরা পীর-মুর্শিদ বা পুণ্যধামে ছুটি না আর। নবযুগের পীর-আউলিয়া ড্যান মজীনারা আমাদের আশ্বস্ত করেন। কোন পথ ধরে এগুলে আমরা পাশ্চাত্যের গুডবুকে থাকব, জিএসপি সুবিধে বাতিল হবে না, বা পাব ‘মডারেট মুসলিম ডেমোক্রেসি’র খেতাব, আর কি করা গেলে ওবামা বা নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন ঢাকায়, এমডিজিতে সাফল্যের করণে_ চাই কি শান্তির নোবেল_ এসব আমাদের রাষ্ট্রীয় তৎপরতার একটি প্রধান সাফল্য-সূচকে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট ইংরেজ বড় ইংরেজ’ ধারণা অনুসরণ করে বলা যেতে পারে ‘ছোট আধুনিকতা’ [তৃতীয় বিশ্ব] বনাম ‘বড় আধুনিকতা’ [পশ্চাত্য] এই খেলাই চলছে এখন।

২. আধুনিকতার আদি প্রতিশ্রুতি

‘আধুনিকতার’ কোন একক সংজ্ঞা নেই। অর্থশাস্ত্রে আধুনিকায়ন [মডার্নাইজেশন] বলতে নগরায়ন, শিল্পায়ন প্রভৃতি ধারণা ব্যক্ত হয়ে থাকে। সমাজতত্ত্বে [ইংরেজিতে_ সোশ্যাল থিওরি] আধুনিকতা বা মডার্নিটি আবার ‘পুঁজিবাদ’ ধারণার সমার্থক। উত্তর-আধুনিকেরা অবশ্য পরবর্তীতে দেখিয়েছেন যে, প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ধারণাতেও আধুনিকতার মন্দ অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। পুঁজিবাদের মতো প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নির্মাণে, শিল্পায়নের পরিকল্পনায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে, নগর-ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধারার প্রযুক্তি-নির্ভর অবিবেচক মানসিকতা, একই ধরনের প্রবৃদ্ধি [গ্রোথ] মুখীনতাকে মানব-কল্যাণের উপরেও স্থান দেওয়া হয়েছিল। স্তালিনের শাসনামলেই ‘আদি সমাজতান্ত্রিক পুঁজি সঞ্চায়নের’ মাধ্যমে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবৃদ্ধিশীল দেশে পরিণত হয়েছিল ১৯২৬-৩৬ পর্বে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্র্তীতে ফেলদ্ম্যান-হ্যারড ডোমার প্রবৃদ্ধি-মডেলের উপত্তিগত ভিত্তি যুগিয়েছিলেন। এটা করতে গিয়ে যে অমানুষিক খেসারত দিতে হয়েছিল সেটা বড় বিবেচনা নয় এখানে। এর মধ্য দিয়ে প্রথাগত সমাজতন্ত্রে ক্রমশ স্থান করে নেয় যন্ত্র-মানব, যন্ত্রের রাজত্ব, বৃহত্তর-অর্থে ‘কলের নেশন’। ‘রক্তকরবী’র রাজা যেমন অনুভব করেছিলেন তারই সৃষ্ট যন্ত্র আর তার বশ্যতা মানছে না সেভাবেই একপর্যায়ে বিপর্যস্ত বোধ করেছিল প্রথাগত সমাজতন্ত্র। ক্রমশ প্রকৃতির প্রতি মেষপালকের মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জায়গা করে নিতে থাকে যন্ত্র-মানবের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘আই-রোবট’ সিরিজের লেখক আইজাক আসিমভ যেসব রোবটিক্যাল প্রিন্সিপলের কথা বলে গেছেন_ যা নিয়ে একুশ শতকে আমাদের আরও ভাবতে হবে_ সেসব নিয়ম মানেনি কলের রাজত্বের নব্য শাসকেরা। এর ফলেই নিয়ম উনিশ-বিশ শতকের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যবস্থাই ধারাবাহিকভাবে সংকটে পড়েছে।

এনলাইটেনমেন্টের তাত্তি্বকরা আধুনিকায়নের মাধ্যমে মানবকল্যাণ সাধনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেই যুগ এখনও আমাদের দেখতে বাকি। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের একটি বড় অংশই সে কথা মনে করেছেন। টেকনোলজিক্যাল মেন, ওয়ান-ডাইমেনশনাল মেন, ডেথ অব মেন_ এসব ধারণার মধ্য দিয়ে সমালোচকেরা চেয়েছেন সভ্যতার নতুন পর্যায়। দেরিদাঁ যাকে সুন্দর করে বলেছেন একটি আপ্ত-বাক্যে_ ‘যে গণতন্ত্র আসতে বাকি’ [ডেমোক্রেসি-টু-কাম]। অর্থাৎ এখন গণতন্ত্রের নামে উন্নত বিশ্বে [এবং সারা বিশ্বে] যা চলছে তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। আধুনিকতার মধ্যেই যারা বিকল্প সম্ভাবনা খোঁজেন সে রকম একজন জার্মান দার্শনিক হাবেরমাস_ তারও বক্তব্য এটাই। পাবলিক রিজন বা তর্ক-বিতর্ক-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সিভিল সমাজ নতুন কোন পথ খুঁজে নেবে ইউরোপে যা পাশ্চাত্যের অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র ও অসাম্যকে অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। বোদ্রিলার থেকে লিওতার পর্যন্ত ‘খাঁটি’ চরম উত্তর-আধুনিকতাবাদীরাও এতে হয়তো সায় দিতেও পারেন।

৩. ‘আধুনিকতা’ কি করতে চাইছে?

যে বিষয়ে সংজ্ঞা দেওয়াই কঠিন তা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করাই এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। আধুনিকতার সরলতম সংজ্ঞায় মৌল উপাদানকে [দাবিকে] চিহ্নিত করা যেতে পারে। তার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া হচ্ছে আধুনিকতার প্রথম দাবিটি। সেটি হচ্ছে, সব ধরনের সমাজকেই একটি অভিন্ন ছাঁচে ঢালার চেষ্টা, বা সমসত্ত্বতার [হোমজেনিটি] দাবি। মনে করুন, আপনি গত এক মাসে বিভিন্ন মহাদেশের বেশক’টি দেশের বড় বড় শহরেই ঘুরে এলেন। প্রতিটা শহরেই আপনি থেকেছেন পাঁচতারা হোটেলে। প্রতিটা হোটেলেই যে রুমে আপনি ছিলেন তাতে ছিল একই ধারার টিভি, বাথরুমের অভিন্ন ফিটিংস, কার্পেটিং এবং দেয়ালে প্রায় একই ধারার আধুনিক চিত্রকর্ম। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারে যে রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেলেন সেটিও [ধরা যাক] ছিল ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেলেন একই ধারার বিমানে করে, একই ধরনের সিটে বসে, একই ধরনের হলিউডি বা বলিউডি সিনেমা দেখতে দেখতে এবং প্রায় একই ধরনের স্ন্যাক ও পানীয় খেতে খেতে। এমনকি প্রায় একই ধরনের হাসি হেসে প্রায় একই ধরনের পোশাকের ও চেহারার বিমানবালা আপনাকে জানালো তার মাপা অভিবাদন। প্রায় একই চেহারার বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আপনি প্রায় একই রঙের ক্যাবে করে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেখানে সর্বত্র দেখেছেন একই ধরনের কোম্পানির বিজ্ঞাপন সংবলিত বিলবোর্ড। এত ‘সমসত্ত্বতার’ মধ্যে চলতে চলতে, বাস করতে করতে, একসময় আপনার হঠাৎ মনে হতেই পারে যে আপনি আসলে কোথাও যাননি, একই জায়গাতেই রয়ে গেছেন। আপনি আসলে টেরই পাচ্ছেন না কখন আপনি মেক্সিকো সিটিতে, কখন ন্যুয়র্কে, লন্ডনে, বার্লিনে, জোহানেসবার্গে, দুবাইয়ে, দিলি্লতে, ব্যাংককে বা সিডনিতে আছেন। এসব শহরের যে সার্কিটে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাতে করে স্থানের ও সময়ের কোনো বিশিষ্টতা খুঁজে পাচ্ছেন না আর [একমাত্র গায়ের রঙে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা ছাড়া]। কেননা, পোশাকে-আশাকেও সর্বত্র আপনি যাদের দেখছেন তারা প্রায় একই ধাঁচের জিনস, টপস, সানগ্গ্নাস পরে হালফিলের ল্যাপটপ বা আই-প্যাড নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই গল্পটা কল্পিত হলেও অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য নয়। আধুনিকতা নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা এমনই এক সমসত্ত্ব সমাজকে [জগতকে] কল্পনা করি। এই হচ্ছে আধুনিকায়নের পয়লা নম্বর দাবি। পুঁজিবাদ সারা বিশ্বকেই তার নিজের ছাঁচে গড়ে-পিটে তুলবে তা সে আদিবাসী-অধ্যুষিত অরণ্যই হোক, কৃষক-সমাজই হোক, আর নোমাডিক বা বেদুইন পশুপালক গোত্রই হোক। সুদূর জাভা থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, দূরবর্তী পাপুয়া নিউগিনি থেকে আন্দিস পর্বতমালা, ভারতবর্ষ থেকে সাহারা অঞ্চলবর্তী আফ্রিকা_ সর্বত্রই শিল্প-পুঁজি, বণিক-পুঁজি বহুজাতিক পুঁজি তার বাজারের সন্ধানে অনুপ্রবেশ করবে, বদলে দেবে প্রাগ-পুঁজিবাদী দৃশ্যপট এবং দেখাবে একটাই সিনেমা_ মেড ইন ইউএসএ বা মেড ইন ইউরোপ। সমসত্ত্বতার এই দাবিতে ক্ষুব্ধ উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের বক্তব্য এর ফলে হ্রাস পাচ্ছে জীবনবৈচিত্র্য, সামাজিক বৈচিত্র্য, প্রতিভার বৈচিত্র্য। এই আধুনিকতা আসলে সৃষ্টিশীলতা বিনাশী, কেননা এটা ব্যক্তিক/আঞ্চলিক সংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিনষ্ট করছে। তাছাড়া সমসত্ত্ব ছকে ‘উন্নয়ন’ সম্ভব নয়, যেমন এক সাইজের জ্যাকেটে সবাইকে কাপড় পরানো চলে না। যদিও ওয়াশিংটন কনসেসাস সেটাই করতে চেয়েছিল গত দু’দশক ধরে। আধুনিক সরল সমসত্ত্বতার বিপরীতে উত্তর-আধুনিকেরা চেয়েছেন জটিলতর অসমসত্ত্বতা, বিভিন্ন কোরাস, ভিন্ন ভিন্ন পথে চলার নমনীয়তা।

আধুনিকতার দ্বিতীয় দাবিটি ক্ষমতা-সম্পর্কিত। এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতি আধুনিকতার পক্ষপাতিত্ব। এর সবচেয়ে কাছের উদাহরণ_ আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা। সমাজে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্র্রের ক্ষমতা সমাজের আর সব ক্ষমতার উপরে। সবার উপরে রাষ্ট্র সত্য তাহার উপরে নাই_ এটি হচ্ছে আধুনিক চণ্ডীদাসের স্ল্নোগান। প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও একই চেহারা। পার্টির বা এর পলিটব্যুরো সেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। তুলনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভবন থাকলেও সেখানেও রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী-নির্ভর সরকার ব্যবস্থা কেন্দ্রাতীগ ক্ষমতার প্রায়োগ করে থাকে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর এক বিশ্বের ধারণা সারাবিশ্বে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক প্রয়োগকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংকে বিশ্বের প্রায় সব দেশই সদস্য। কিন্তু সেখানে এক দেশ এক ভোট প্রথা নেই। বিশ্বব্যাংকের তহবিলে যার হিস্যা যত বেশি তার তত বেশি ভোট। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একাই প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভোটে ক্ষমতাবান। অর্থাৎ সবই সমান, বলা হলেও আধুনিক গণতন্ত্রে কেউ কেউ ‘বেশি সমান’। এ ধরনের গণতন্ত্রে এক মানুষ-এক ভোট ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত প্রবর্তিত হয় এক ডলার-এক ভোট ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতা যার যত বেশি তার হাতে তত বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের পটভূমিতে স্টিগলিৎজ মহাশয় এই বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছেন।

আধুনিকতার এই দ্বিতীয় দাবিটিকেও মেনে নিতে পারেননি উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এ কালের পুঁজিবাদের সঙ্গে সেকালের পুঁজিবাদের পার্থক্য ঘটে গেছে গত কয়েক দশকে। সেকালের পুঁজিবাদে ক্ষমতার প্রয়োগ হতো এক-কেন্দ্র থেকে। কিন্তু এ কালের পুঁজিবাদে ক্ষমতা আর এক কেন্দ্রে সীমিত নেই; ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র ও উৎস ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে। এটি ছড়িয়ে আছে স্কুলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্বাস্থ্যনিবাসে, জেলখানায়, পুলিশ ও সামরিক দপ্তরে, পরিবারের ভেতরে, বাজারের সিন্ডিকেটে, টেলিভিশনের চ্যানেলে, পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, খেলার মাঠে অর্থাৎ ক্ষমতা প্রায় সর্বত্র বিরাজমান। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভুত্বশীল শ্রেণীর ক্ষমতার চর্চাকে পূর্ণ গণতন্ত্রায়ন করতে গেলে বা জনমানুষের স্বার্থের সম্পূর্ণ অনুকূলে নিতে গেলে শুধু রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে বা রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রায়ন করলে চলবে না। সমাজের আর বাদবাকি যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা উপরে উল্লেখ করা হলো তার প্রতিটাতেই গণতন্ত্রায়ন সাধিত হতে হবে। মিশেল ফুকো যেমন দাবি করেছেন, ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রে থাকে না; এটা বহমান রয়েছে শিরায়-উপশিরায়-তন্তুতে_স্নায়ুকোষে-ডিএনএ-তে। উত্তর-আধুনিকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার এই সর্বব্যাপী অস্তিত্বের কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলালেই ক্ষমতার অবলুপ্তি ঘটে না, এতে করে বড়জোর ক্ষমতার হাতবদল ঘটে মাত্র। এই সূত্রে তাঁরা প্রথাগত সমাজতন্ত্রের মধ্যে ক্ষমতার আরও বোঝা হয়ে ‘গেড়ে বসাকে’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। জারতন্ত্র সরিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলেও ক্ষমতার দাপট কমেনি। পার্টি ও রাষ্ট্রের একশ্রেণীর আমলাদের হাত দিয়ে ক্ষমতার চর্চা চলেছে। এর কারণ, সমাজের নানা স্তরে জারতন্ত্রের শেকড় রয়ে গিয়েছিল অথবা নতুন করে পার্টিতন্ত্র সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার ক্ষমতার শেকড় ছড়িয়েছিল। মার্কস কথিত ‘ফ্রি এসোসিয়েশন অব ফ্রি প্রোডিউসার্স’ আর করা যায়নি। এ তো গেল প্রথাগত সমাজতন্ত্রের কথা। উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতা চর্চার আরও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম শেকড়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন ফুকো ও তার অনুসারীরা। যেমন ফুকোর একটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতাসীনেরা টিকে থাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সত্য-উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বস্তুগত উৎপাদনের মতো ‘সত্য-উৎপাদন’ পুুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য। এসব সত্য আপাত দৃষ্টিতে স্থান-কাল নিরপেক্ষ উদাহরণ মনে হলেও এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে ক্ষমতা-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। আবদুল মান্নান সৈয়দ যেমন লিখেছিলেন, ‘সত্যের মত বদমাশ’। এমনকি নিরীহতম গবেষণা-কাণ্ড যেটি তার মধ্য দিয়েও এমন সব সত্য উদ্ভাবন বা নির্মাণ করা হচ্ছে যার আসল লক্ষ্য_ মানবকে আরও বেশি করে শাস্ত্রের অধীনে আনা, এনে তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, তাকে মুক্ত করা নয়। ফুকো যেমন চিকিৎসা-শাস্ত্রের ইতিহাস ঘেঁটে জানিয়েছেন, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ ব্যবহারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে নতুন মনোবিদ্যায়। ব্যবহারের ‘স্বাভাবিকীকরণের’ [নর্মালাইজেশন] মাধ্যমে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সংক্ষুব্ধ শক্তিকে বশীভূত করা হয়েছে বিভিন্ন বিদ্যার, বিজ্ঞানের, রীতির, আচারের সমবেত প্রয়োগের মাধ্যমে। এর ফলে এক পর্যায়ে খাঁচার সব দরোজা খুলে দিলেও বনের পাখি আর উড়ে যেতে পারছে না_ স্বেচ্ছায় সে থেকে যাচ্ছে গৃহপালিত পাখি হিসেবেই।

উত্তর-আধুনিকেরা এই সত্য-উৎপাদনের তত্ত্ব ও তার ফল-পরিণামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক হিসেবে ফিরে যাচ্ছেন আন্তোনিও গ্রামসির সর্বেশ্বরতার [হেজিমনি] তত্ত্বে। আল থুসারের ‘আইডিওলজিক্যাল এপারেটাস অব স্টেট’ ধারণারও এটি কিছুটা অনুবর্তী। তবে গ্রামসি ও আল থুসার দুজনেই সত্য [বা ভাবাদর্শ] উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র-ক্ষমতার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচ্ছন্ন প্ররোচণা হিসেবে দেখেছিলেন। উত্তর-আধুনিক তাত্তি্বকদের কাছে, সত্য-উৎপাদন কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন চক্রের সজ্ঞান ষড়যন্ত্রের পরিণাম নয়। রোগ-জীবাণুর মতো তত্ত্ব বা সত্য নিজেই ক্ষমতার ধারক-বাহক হয়ে উঠতে পারে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে_ তাতে রাষ্ট্রের বিশেষ দপ্তরের ষড়যন্ত্রের বা সালতামামির প্রয়োজন নেই। এর মধ্য দিয়ে উত্তর-আধুনিকেরা নিজস্ব মূল্যেই তত্ত্ব নির্মাণ, মতাদর্শ প্রচার, বিশ্বাস ও ভাবাদর্শ_ জ্ঞানচর্চার যে কোন রূপকেই_ আরও বেশি ঘনিষ্ঠ ভাবে, জোরালো ভাবে, বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে একটি প্রশ্নে আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী উভয়েই এক-অবস্থানে। উভয়েই মনে করেছেন যে একালের পুঁজিবাদে সবকিছুই পরিণত হয়েছে পণ্যে। শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান মানব-সৃষ্টির কোনো শাখাই আর মার্কস-কথিত পণ্যমোহবদ্ধতার [কমোডিটি ফেটিশিজম] বাইরে, থাকছে না। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, সব কিছুই যদি পণ্য হয় [যেমন চে গুয়েভারার বিপ্লবী প্রতিকৃতির পোস্টার] তাহলে মানব-মুক্তি আসবে কোন পথে? যদি সমাজের সব খাতই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়ে থাকে তাহলে প্রতিরোধ দানা বাঁধবে কি করে? এর উত্তরে ফুকো বলেছিলেন, যেখানেই ক্ষমতা সেখানেই প্রতিরোধ দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের মধ্যে কোথাও স্বভূমির অস্তিত্ব থেকে যায় সমস্ত বন্দিদশার মধ্যেও। যেখানে পাখা মেলে মুক্তির বাসনা। ফুকো নিজেকে কখনো উত্তর-আধুনিক বলে দাবি করেননি। তবে ফুকো বা উত্তর-আধুনিকেরা ‘আধুনিকতার’ যে সমালোচনা নির্মাণ করেছিলেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে। তাঁরা প্রায় কেউই উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের বাইরের তৃতীয় বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে পারেননি। শেষোক্ত ক্ষেত্রে জোরেশোরে এগিয়ে আসে উত্তর-উপনিবেশিক সমাজের তাত্তি্বকেরা। উত্তর-উপনিবেশিকতাকে [পোস্ট কলোনিয়ালিটি] বিচারের মধ্যে এনে তারা পুঁজিবাদী আধুনিকতার আরেকটি চেহারা তুলে ধরেন। এই চেহারাটি মূলত ‘কপট, প্রতারক ও মায়াবী’ আধুনিকতার, যার মোদ্দা কথা হলো : হয় ছলে, নয় বলে, যে কোনো কৌশলে সাম্রাজ্য বিস্তার করো, অথবা প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম_ এমন শক্তিকে যে কোনো উপায়ে দুর্বল করে দাও। বাংলার উপনিবেশিক আমলের একটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় টেনে আনছি। এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশের পরিসরে আধুনিক ক্ষমতা-সম্পর্কের ‘কপট প্রতারক ও মায়াবী’ চরিত্রটি কিছুটা হলেও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

৪. আধুনিকতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ

উনিশ শতকের তিরিশের দশকের কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। উপনিবেশ ভারতের শিক্ষাদানের ভাষা, পাঠ্যসূচি ও সাহিত্য কীভাবে গড়ে তোলা উচিত তা নিয়ে জোর তর্ক চলছে ইংরেজদের মধ্যে। তর্কটা হচ্ছে ওরিয়েন্টালিস্ট ও এংলিসিস্টদের মধ্যে। কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনের সদস্যরা এ নিয়ে প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। ১৮৩৫ সালে লিপিবদ্ধ এর কার্যবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে, কমিটির অর্ধেক সদস্যরা ইংরেজিতে শিক্ষাদানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বাকি অর্ধেকের রায় নেটিভদের মধ্যে প্রচলিত শিক্ষারীতির পক্ষে। আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় পাঠদান অব্যাহত থাকুক_ এটাই তারা চাইছেন। তরুণ জন স্টুয়ার্ট মিলও এই শেষোক্ত দলের পক্ষ হয়ে কলম ধরেছেন। এই বিতর্কের দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছেন গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক নিজেও। বিদগ্ধ টমাস বেবিংটন ম্যাকলে চান নেটিভদের মধ্যে এংলিসিস্ট সাহেবদের একটি দেশীয় শ্রেণী গড়ে তুলতে। তাঁর লক্ষ্য, উপনিবেশ ভারতে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে কেবল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাঠদান করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এ পথেই কেবল শিক্ষার বিস্তার ঘটতে পারে উপনিবেশে। আলোকপ্রাপ্তি হতে পারে স্থানীয় অধিবাসীদের। এভাবেই বর্বরতার যুগ থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে আধুনিকতায়। বিতর্কের এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাকলে সাহেব যা বললেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের ইংরেজ শাসকদের জন্য ‘ম্যানিফেস্টো’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোটা দাগে সেটা শোনালো এ রকম : ‘আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আসলে কোন ভাষা জানাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য সংস্কৃত বা আরবি কোনো ভাষাই আমার জানা নেই। তবে, এসব ভাষার কতটুকু অন্তর্নিহিত মূল্য তা যাচাইয়ের জন্য যা করার তার সবই আমি করেছি। আরবি ও সংস্কৃত ভাষা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ গ্রন্থগুলো আমি পড়েছি। যারা এসব ভাষায় কথা বলে থাকেন তাদের সঙ্গে আমি আলাপ-আলোচনা করেছি। যারা প্রাচ্যবিদ বলে পরিচিত, প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে তাদের জ্ঞানকে আমি মান্য করি। এসব প্রাচ্যবিদের মধ্যে আমি আজ পর্যন্ত একজনকেও পাইনি যিনি অস্বীকার করেছেন যে, একটি ভালো ইউপরোপীয় গ্রন্থাগারের যে কোনো তাকও ভারতবর্ষ ও আরব ভূভাগের সমগ্র নেটিভ সাহিত্যের সমান মূল্যবান!’ ম্যাকলে সেদিন যা বললেন, তার একদশকের মধ্যে বাংলায় শুরু হলো ‘রেনেসাঁ’। ১৮৫০-এর দশকে রেলগাড়িও এলো এদেশে। এরপর থেকে গ্রাম হয়ে গেল অজপাড়া-গাঁ, আর শহর হয়ে পড়ল আধুনিকতার কেন্দ্র। সেদিনের নবজাগরণের নায়কেরা ম্যাকলের কথাতেই আস্থা আনলেন। তাঁদের সবারই স্বপ্ন ছিল, ম্যাকলে বর্ণিত ইউরোপীয় ভাষা-সাহিত্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ওপর ভর করে ‘আধুনিক জাতি’ হিসেবে একদিন জগৎ সভায় তাঁদের সমাজ স্থান করে নেবে। ঔপনিবেশিক চিন্তার সঙ্গে আমাদের নাড়ির বন্ধনের সেখানেই সূত্রপাত। আধুনিকতার স্বপ্ন দেখার শুরু সে সময়েই। বিষয়টা তাহলে দাঁড়াচ্ছে_ আমাদের জীনের সমস্যা।

এর পরবর্তী একশ বছর ধরে ‘আধুনিক’ শব্দটা এতটাই প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছিল আমাদের যে তা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘সভ্যতা’ বা সিভিলাইজেশনের নামান্তর। উনিশ-বিশ শতকের ভদ্রসম্প্রদায় বা ভদ্রলোক এসব শব্দবন্ধের মধ্যে যে ভদ্রতার ‘ধারণা’ মিশে ছিল তাকে ওই আধুনিকতার বাইরে আর কল্পনা করা যাচ্ছিল না। যুক্তিটা ছিল এ রকম : প্রাগ-আধুনিকেরা প্রাচীনপন্থি, রক্ষণশীল, পুরনো সংস্কারের মধ্যে আবদ্ধ জীব; যেন তারা প্রায় অসভ্য, আন-সিভিলাইজড। এর বিপরীতে আধুনিকেরা হচ্ছে প্রগতিপন্থি, চলতি হাওয়ার দল, বিজ্ঞানমনস্ক, জাত-পাত না-মানা বিদ্রোহী; যেন তারাই একমাত্র সভ্য, সিভিলাইজড। এ রকম দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ল বাংলার বিদ্বৎসমাজ_ প্রথমে হিন্দুরা, পরে একপর্যায়ে এই বিভক্তি দেখা দিল কালক্রমে মুসলমান সমাজেও। অবশ্য কারও কারও মতিভ্রমও হলো_ একবার কেউ এ দলে নাম লেখালেন, আরেকবার অন্য দলে ভিড়ে গেলেন। যেমনটা হলো কেশবচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র ও মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রে। কিন্তু আধুনিকতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের শিবিরবিভক্তির কয়েকটি বেদনাদায়ক ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া দেখা গেল অন্যত্র, যার প্রভাব বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য ভালো হয়নি।

প্রথমত, ইউরোপীয় ধারা মেনে চললে আধুনিক, নইলে তা রক্ষণশীল ও অনাধুনিক_ এ রকম একটি চটকজলদি সমীকরণ তাঁবু গাড়ল প্রথাগত জ্ঞানচর্চায়। এমনকি মনের ভুবনেও_ সেটা কিছুটা জ্ঞাতসারে, কিছুটা অজ্ঞাতসারে। প্রাগ-আধুনিক হয়েও তো সভ্য, ভদ্র ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায়। যেতে পারে। এ রকম সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া আর সহজে সম্ভব হলো না। শুধুমাত্র এই কারণেই ভূদেব মুখোপাধ্যায়_ যিনি ধর্ম ও পরিবার চিন্তায় সনাতনীয় হলেও ছিলেন হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মের মধ্যে ব্যবহারিক, জ্ঞানগত ও আত্মিক যোগসূত্র স্থাপনে বিশ্বাসী ও উদগ্রীব_ তার সমসাময়িক বঙ্কিমের মতো তেমন কোনো গুরুত্ব পেলেন না বাংলার বিদ্বৎসমাজে। বঙ্কিমকে উপর্যুপরি ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লেখার পরও সে রকম কোনো অপযশ কুড়াতে হলো না তাঁর স্বধর্মীদের কাছ থেকে। অথচ, ভূদেব ‘স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস’-এর মতো মৌলিক গ্রন্থ লিখেও পেলেন না সামাজিক বিজ্ঞানীর যথাবিহীত সম্মান। অর্থশাস্ত্রে বঙ্কিমের তুলনায় তাঁর অধিকতর বুৎপত্তিও আড়ালেই থেকে গেল। এর কারণ, বঙ্কিমচন্দ্রকে বরাবর দেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক ভারতের এক পথিকৃৎ ‘আধুনিক চিন্তক’-এর ভূমিকায় [যে আধুনিকতার সংজ্ঞা আবার উপযোগবাদী মিল বেন্থাম দ্বারা নির্দিষ্ট]।

দ্বিতীয়ত, প্রাগ-আধুনিক মানেই প্রাচীনপন্থি ও রক্ষণশীল এ রকম মনে করার কারণে যা-কিছু ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের বাইরে, তাকেই অস্বীকার বা খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা দেখা দিল। মহামতি কৌটিল্য যে কিসিঞ্জারের মতোই ‘আধুনিক’ হতে পারেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিস্তারে সে সম্ভাবনাকে আমলে নেওয়া হলো না। আকবর বাদশাহ ও আবুল ফজল মিলে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে নমুনা খাড়া করেছিলেন তা ইউরোপীয় ‘সেক্যুলার’ আদর্শের তুলনায় কোনো অংশে কম আদরণীয় অর্জন ছিল না_ সেটাও আমরা অনেককাল পর্যন্ত মনে রাখিনি। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে চেষ্টা করেছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য_ বিশ্ব সভ্যতার এ দুই ঐতিহ্যের মধ্যে সভ্যতার ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করতে। ইউরোপের মানবতন্ত্রের সাথে বাংলার আউল-বাউল-সহজিয়া ধারার ‘মনের মানুষ’-এর মানবতন্ত্রের মধ্যে ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করা ও তাঁর দর্শনচিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। এককথায়, তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার আধুনিকতাকে সমকক্ষতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে। কিন্তু তার কথা আমরাও শুনতে চাইনি, আর ইউরোপীয় মনীষা শুনতে চাইলেও তা বুঝতে অপারগ থেকেছে। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো রবীন্দ্রনাথও যে মুক্ত-চিন্তক বা ‘ফ্রি-থিংকার’ হতে পারেন, সেভাবেও আমরা তাকে বিচার করতে পারি_ সেসব কোনো সম্ভাবনা আমাদের মনে জাগেনি। ১৮৩৫ সালের কার্যবিবরণীতে ম্যাকলে তাঁর ভাষণে যেমন বলেছিলেন, প্রাচ্যের আছে কেবল কিছু মহান কবি, কিন্তু তারা তো কল্পনার রাজ্যে বিরাজ করে থাকেন মাত্র। জ্ঞানের রাজ্যে তাদের কোনো দক্ষতা নেই। রবীন্দ্রনাথকেও আমরা সেভাবেই কমবেশি কবির শিরোপা পরিয়ে দিয়ে জ্ঞানচর্চার মূলক্ষেত্র থেকে সরিয়ে রেখেছি।

প্রাগ-আধুনিককে খাটো করে দেখার কারণে তৃতীয় যে সমস্যা দেখা দিল তা হলো, ইউরোপীয় আধুনিকতাকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বড়ো ও মহার্ঘ করে আমরা দেখতে শুরু করলাম। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। এখনও বিশ্বব্যাংক বা মার্কিন দূতাবাস বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বললে আমরা ‘তা ঠিক, তা ঠিক’ করতে থাকি। উপনিবেশে ইউরোপ যেসব নিয়ম-কানুন, রাষ্ট্রযন্ত্র, তত্ত্ব ও আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা শুরু করল তাকেই আমরা নির্বিচারে মেনে নিতে শুরু করলাম ‘আধুনিক মানুষ’ হওয়ার সাধনায়। ইউরোপ যখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর গুরত্ব দিতে শুরু করল উনিশ শতকে, উপনিবেশে তারা গ্রহণ করল ভিন্ন নীতি। এ ক্ষেত্রে তারা নিল কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতাবান করার নীতি। সেই পথ ধরে আমরাও ভাবতে শুরু করলাম যে, আধুনিক রাষ্ট্র মানে আসলে এটি একটি কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা। ইউরোপ উনিশ শতকের শেষ থেকে নিজের দেশে আস্তে আস্তে গণশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, গণস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করল। কিন্তু উপনিবেশে সেসব ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠাই পেতে দিল না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসের মতো ইউরোপীয় শাসকদের কেউ কেউ আদিতে চেয়েছিলেন কৃষিতে স্ব-আবাদি ব্যক্তি মালিকানাধীন খামার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু কার্যত যা গড়ে উঠল তা হচ্ছে এক আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থা, যার মূল অভিপ্রায় ছিল এক অনুগত ও বাধ্যগত দেশীয় শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা করা। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আশ্রয়েই এ দেশে গড়ে উঠল এক জনবিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র যেটা আদৌ খোদ ইউরোপে প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। এককথায়, ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকেই ‘আধুনিকতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত’ মনে করে আমরা না-পেলাম প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ মনীষার ছায়া, না-পেলাম ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের সেরা অন্তর্দৃষ্টি। এর বড় প্রমাণ, প্রত্যক্ষ উপনিবেশের অবসানের পরেও আমরা নিজেদের মতো করে উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানাদি ভাবতে ও গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলাম না। ‘ইউরোপ উদ্ভাবন করবে এবং আমরা কেবল তার প্রয়োগ করব’, অর্থাৎ আমরা চিরকালই থাকব হাত পেতে_ এই মানসিক ছক থেকে বেরিয়ে যাওয়া আমাদের হলো না। আমরাও অনেক খাতে উদ্ভাবন করব এবং বাদবাকি বিশ্ব তা প্রয়োগ করবে_ এ রকম কোনো জ্ঞানভিত্তিক অভিমান আমাদের মধ্যে আজও এলো না। ফলে একজন দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ, একজন দ্বিতীয় সত্যেন বোস, একজন দ্বিতীয় মুহাম্মদ ইউনূস_ যারা সারা বিশ্বে বঙ্গ, বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে সৃষ্টিশীলতার মানদণ্ডে অতীতে ও সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠা করেছেন_ তারা শুধু ব্যতিক্রমী উদাহরণই হয়ে থাকলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে কত কথা হচ্ছে এখন। বলা হচ্ছে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা। অথচ আজকের ঢাকা শহর যতই ‘আধুনিক’ বলে নিজেকে দাবি করুক না কেন, এখানে আজও প্রতিষ্ঠা পায় না অন্তত একটি দ্বিতল বা ত্রিতল বই-পত্রের ভবন, যেখানে থাকবে নানা দেশের ও শাস্ত্রের বই, যার নিকটতম তুলনা হতে পারে আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো বার্নস-এন্ড-নোবলস বা ওয়াটারস্টোনস। অর্থাৎ আধুনিকায়নের মন্ত্রটাও আমরা সঠিকভাবে আওড়াতে পারিনি।

আধুনিকতার মূল সমস্যাটা রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথ ঠাকুর ঠিকই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ইউরোপীয় বা বৃহত্তর অর্থে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, সে যা বলে, যা আদর্শ হিসেবে প্রচার করে, সেটা সে আসলে মেনে চলতে চায় না। অর্থাৎ নিজের খেলার নিয়ম সে নিজেই বারবার ভাঙে। এটা রামমোহনের বুঝতে দেরি হয়নি। রামমোহন যেমন ছিলেন আপাতদৃষ্টিতে ম্যাকলের পক্ষে। তাঁর যুক্তি ছিল, উপনিষদ, ইসলাম ও ইউনিটেরিয়ান চার্চের মধ্যে রয়েছে একেশ্বরবাদী মতাদর্শের ঐক্য। ইংরেজরা যদি ইংরেজি স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যাদান করতে চায়, তবে তাই হোক। কিন্তু রামমোহনের শর্ত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ করা চলবে না_ চাই সবার জন্যে ইংরেজি শিক্ষা, চাই বেশি বেশি করে স্কুল, গুণগত মানের স্কুল। রামমোহন অনুসারী দ্বারকানাথও চেয়েছিলেন, বাংলায় শুধু বণিক-পুঁজির নয়, শিল্প-পুঁজিরও বিকাশ হোক। তিনি নিজে ছিলেন ১৮৩০-৪০ দশকের সবচেয়ে প্রাগ্রসর ব্যবসায়ী_ প্রথম বৃহৎ বাঙালি বুর্জোয়া।

প্যারিসের এক হোটেলে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দ্বারকানাথ জানিয়েছিলেন, প্রথাগত ধর্মীয় আচার-বিচার তিনি মানেন না এবং প্রয়োজনে তিনি ইউরোপীয় যুক্তিবাদী আদর্শে ভারতীয় সনাতন ধর্ম-কর্মকে বদলে নিতেও রাজি। এ জন্যে তিনি পণ্ডিতবর্গকে মাইনে দিয়ে পুষছেনও। তারপরও একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে কিছুটা মতানৈক্য হয়েই গেল পণ্ডিতপ্রবর ম্যাক্সমুলারের। তার সমসাময়িকদের কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে ম্যাক্সমুলারকে ডাকতেন ‘মোক্ষমুলার’, যেন এই জার্মান পণ্ডিতের লেখা পড়লে মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটবে। দ্বারকানাথ স্রেফ জানিয়ে দিলেন_ এবং গেয়েও শোনালেন_ ম্যাক্সমুলার ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের কিছুই বোঝেন না, কিন্তু তিনি ঠিকই পাশ্চত্যের রাগ-সঙ্গীত বোঝেন ও এর রস গ্রহণে পুরোপুরি সক্ষম। অর্থাৎ বিদ্যার্জনে বরং দ্বারকানাথ কিছুটা এগিয়েই ছিলেন। পাশ্চাত্যের আধুনিকতা আত্মস্থ করেও আমাদের বাড়তি কিছু দেওয়ার এখনও বহুকিছু আছে. যেমন ম্যাক্সমুলারের মতো পণ্ডিতকেও শেখানোর মতো কিছু ছিল দ্বারকানাথের।

রামমোহন-দ্বারকানাথের যৌথভাবে নির্মিত আধুনিকতা-প্রকল্পের ফাঁদে অবশ্য পা দেয়নি সদাসতর্ক ঔপনিবেশিক শক্তি। ইংরেজি ভাষাকে জনগণের স্তরে ছড়িয়ে পড়তে দেয়নি ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী। বাংলায় ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা ছিল বরাবরই অতিসীমিত, এখনও তাই। তাছাড়া সাধারণভাবে এ দেশে স্কুলের প্রসারই ছিল সীমিত। অন্যদিকে বিদেশি রীতিনীতি মেনে কারবারি ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এনে এ দেশের শিল্প-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে চেয়েছিলেন দ্বারকানাথ। ১৮৪৭-এর বিশ্ব স্টক মার্কেটের বিপর্যয়ের পর বাংলার শিল্পখাত আর সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত। বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তি মুখে বলেছে যে তারা চায় অবাধ বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠা, কিন্তু কার্যত তারা শিল্পায়নকে আরও নিরুৎসাহিতই করেছে এই পর্বে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধাতত্ত্ব জন স্টুয়ার্ট মিলের পাঠ্যবইয়ে বড় আকারে থাকলেও উপনিবেশে এর প্রয়োগ হয়েছিল অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে। আধুনিকতা ও পুঁজিবাদ ‘তার নিজের আদলে বিশ্বকে গড়ে নিতে চায়’_ এনলাইটেনমেন্টের এই মন্ত্রে পুঁজিবাদ নিজেই বিশ্বাস করেনি। পুঁজিবাদ বা আধুনিকতা ‘যা বলে সে আসলে তা না’। যখনই পাশ্চাত্যের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগেছে, খেলার নিয়ম ভাঙা হয়েছে, অথবা নতুন নিয়মের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ সূত্রে বলে রাখি, পুঁজিবাদের খেলায় ক্রমশ ‘সমকক্ষ’ হওয়ার সাধনায় নামা চীন এখন রামমোহন-দ্বারকানাথের সমস্যাটা নতুন করে বুঝতে পারছে। আধুনিকতা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বকে সেটা সে রক্ষা করেনি। আসলে সেরকম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সে পারে না, কেননা তা পুরোপুরি রক্ষা করতে গেলে ক্ষমতার চর্চা করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর ক্ষমতা প্রয়োগই তো আধুনিকতার অপ্রকাশ্য লক্ষ্য। উত্তর-আধুনিকবাদী দার্শনিকদের এই সমালোচনা মানি না মানি কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার নয়।