হোর্হে লুই বোর্হেসের কবিতা: চতুস্পদী

চতুস্পদী
অন্যদেরও মৃত্যু এই সময়ে, কিন্তু সেসব দূর অতীতের গল্প।
এই সমাগত ঋতু–সবাই জানে–মৃত্যুর এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।
ইয়াকুব আল -মনসুরের নিতান্ত প্রজা আমি,
তবে কি আমারও মৃত্যু হবে গোলাপের মত, আর আরিস্ততল?

হোর্হে লুই বোর্হেসের কবিতা: আদম তোমারই দেহের ছাই

আদম তোমারই দেহের ছাই
তরবারি সেভাবেই খসে পড়বে, যেভাবে বৃক্ষ থেকে ফল।
কৃষ্টালও ততটা নাজুক, যতটাই গ্রানাইট পাথর।
সব কিছুই ছাই হয় তার নিজস্ব নিয়মে।
লোহাতে যেমন লুকানো তার মর্চে-ধরা স্বভাব। ধ্বনিতে যেমন প্রতিধ্বনি।
আদি পিতা আদম –সে তোমারই দেহের ছাই।
প্রথম স্বর্গোদ্যানই হবে শেষ স্বর্গোদ্যান।
নাইটিংগেল পাখী ও গ্রীক কবি পিন্ডার দুজনই অভিন্ন কলরব।
সূর্যোদয় সূর্যাস্তরই প্রতিচ্ছবি।
মাইসেনিয়ান সম্রাট—কবরে শায়িত এক স্বর্ণালী মুখোশ মাত্র।
সবচেয়ে উঁচু দেয়ালও সবচেয়ে জরাজীর্ণ ভগ্নস্তূপ।
রাজা উরকুইজা, আততায়ীর ছোরা যাকে ছুঁতে পারেনি, তারও পরিণতি এমন।
আয়নায় যে মুখ আজকে নিজেকে দেখেছে
সে গতকালের মুখ নয়। রাত্রি তাকে বদলে ফেলেছে রাতারাতি।
কাল এভাবেই সূক্ষ্ম, অনবরত, ভাংচুর করছে আমাদের।

হিরাক্লিটাসের সেই প্রবাদের অবিরল বয়ে যাওয়া
জল যদি হতে পারতাম আমি,
যদি হতে পারতাম সেই আদি ও অকৃত্রিম অগ্নি,
কিন্তু আজ এই দীর্ঘ অফুরান দিনের শেষে
নিজেকে আমার একা লাগছে এবং মনে হচ্ছে,
আমি কখনোই আর পরিত্রাণ পাব না।

হোর্হে লুই বোর্হেসের কবিতা: সীমানাগুলো

সীমানাগুলো
ভার্লেনের একটি লাইন আর কখনোই মনে পড়বে না আমার।
কাছের একটি রাস্তা যেখানে আমার যাওয়া হবে না কোনদিন।
একটি আয়না শেষবারের মত দেখে নিল আমাকে।
একটি দরজা পৃথিবীর শেষ দিন অব্দি বন্ধ হয়ে গেল।
আমার লাইব্রেরীর অনেকগুলো বই (মিলিয়ে দেখছি এখন)
আর কখনোই খোলা হবে না।
এই গ্রীষ্মে আমার বয়স হবে পঞ্চাশ।
মৃত্যু আমাকে ব্যবহার করে চলেছে ক্রমাগত।

নাজিম হিকমতের কবিতা: রোমিও ও জুলিয়েট বিষয়ে

রোমিও ও জুলিয়েট বিষয়ে
রোমিও বা জুলিয়েট হওয়া কোন অপরাধ নয়;
ভালবাসার জন্যে মৃত্যুবরণ করাও কোন অপরাধ নয়।
যেটা দেখার, সেটা হচ্ছে—তুমি নিজে রোমিও বা জুলিয়েট
হতে পারবে কিনা,
আমি বলতে চাইছি, এসবই তোমার হৃদয়ের বিষয়-আশয়।।

যেমন, ব্যারিকেডের ভেতরে যুদ্ধ করা,
বা উত্তর মেরু অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়া,
বা ধমনীতে কোন ঔষধের
পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সম্মতি দেয়া—
এসব করতে গিয়ে মৃত্যু হয় যদি
তা কি কোন অপরাধ হবে?

রোমিও বা জুলিয়েট হওয়া কোন অপরাধ নয়;
ভালবাসার জন্যে মৃত্যুবরণ করাও কোন অপরাধ নয়।

ধরো, তুমি পৃথিবীর প্রেমে পুরোপুরি বিবশ,
কিন্তু সে তো জানেও না—তুমি বেঁচে আছো কিনা।
তুমি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে চাইছ না,
কিন্তু সে নিশ্চিত তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে—
আমি বলতে চাইছি, তুমি আপেল ভালবাসো,
তার মানে কি এই যে আপেলও তোমাকে ভালবাসবে?
আমি বলতে চাইছি, জুলিয়েট যদি রোমিওকে আর ভালবাসতে না চায়
—অথবা জুলিয়েট কখনোই যদি রোমিওকে ভাল না বাসত—
তাতেও কি সে কোন অংশে কম রোমিও হত?

রোমিও বা জুলিয়েট হওয়া কোন অপরাধ নয়;
ভালবাসার জন্যে মৃত্যুবরণ করাও কোন অপরাধ নয়।

নাজিম হিকমতের কবিতা: তোমাদের হাত আর মিথ্যে রটনাগুলো নিয়ে

তোমাদের হাত আর মিথ্যে রটনাগুলো নিয়ে
তোমাদের হাত থমথমে, যেমন হয়ে থাকে পাথরেরা;
বিষণ্ণ, যেমন জেলের ভেতরের সব গান;
জড়োসড়ো নিজের ভারে, যেমন সব ভারবাহী জীব;
তোমাদের হাত ফুলে আছে অনাহারে থাকা শিশুর চেহারার মত ।
তোমাদের হাত ছন্দময়, যেন অনায়াসে উড়ে চলা মৌমাছি;
পরিপূর্ণ, যেমন দুধে উপচে ভরা স্তন;
সাহসী, প্রকৃতির মত;
তোমাদের হাত রুক্ষ চামড়ার নিচে লুকিয়ে রাখে
তার কোমল স্পর্শ।

এই পৃথিবী কোন ষাড়ের শিঙ্গের মধ্যে নয়—
তোমাদের হাতের মধ্যেই তার ভর রেখে চলেছে।
ভাই, ও ভাই আমার,
তারা তোমাদের কাছে মিথ্যে রটাচ্ছে।
অথচ তোমরা অনাহারে আছো,
বাঁচার জন্যে পর্যাপ্ত রুটি-মাংসের প্রয়োজন যেখানে
সেখানে সাদা চাদর বিছানো টেবিলে বসে
অন্তত একবেলা ভালো করে খাওয়ার আগেই তোমরা বিদায় নিচ্ছ
এই পৃথিবী থেকে—যার প্রতিটা শাখা ফলের ভারে ঝুঁকে আছে।
ও ভাই আমার,
এশিয়া, আফ্রিকা, নিকট ও মধ্য প্রাচ্য, প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জ
বা আমার দেশ
যেখানেই থাকো (তোমরাই গোটা বিশ্বের শতকরা সত্তর ভাগ),
তোমাদের হাতের মতই বুড়িয়ে গেছো তোমরা, আর সেরকমই ভুলো-মনা;
তোমাদের হাতের মতই তোমরা সজাগ, অবাক-করা, তারুণ্যে দীপ্ত ।
ও ভাই আমার,
আমার ইউরোপের ও আমেরিকার ভায়েরা,
তোমরাও চৌকশ, সাহসী, আর মনভোলা, তোমাদের হাতের মত—
তোমাদের হাতের মতই তোমাদের সহজে বশ করা যায়,
সহজেই ভোলানো যায়…

ভাই, ও ভাই আমার,
যদি চ্যানেল গুলো মিথ্যে বলে,
যদি সংবাদপত্র গুলো মিথ্যে বলে,
যদি বই গুলো মিথ্যে বলে,
যদি দেয়ালের পোস্টার আর পত্রিকার বিজ্ঞাপন গুলো মিথ্যে বলে,
যদি রূপালী চিত্রে নারীদের উরু গুলো মিথ্যে বলে,
যদি প্রার্থনা গুলো,
ঘুমপাড়ানি ছড়া গুলো,
স্বপ্ন গুলো মিথ্যে বলে,
যদি জিপসি যাদুকরেরা মিথ্যে বলে,
যদি নিরাশাকরোজ্জ্বল দিনের রাত গুলোর জ্যোছনারা মিথ্যে বলে
যদি গলার স্বর গুলো,
যদি অক্ষর গুলো মিথ্যে বলে,
যদি সবাই এবং সবকিছু মিথ্যে বলে,
তাহলে জানবে, তারা আসলে চাচ্ছে
তোমাদের হাত গুলো যেন কাদার মত সুবাধ্য থাকে,
যেন অন্ধকারের মত অন্ধ থাকে,
যেন মূক-বধির হয়ে থাকে ভেড়া বা কুকুরের মত—
যাতে তোমাদের হাত গুলো কখনো বিদ্রোহ না করে বসে।
যেন কোনদিনই এই নশ্বর, এই বাসযোগ্য পৃথিবী থেকে
(যেখানে আমরা ক্ষণকালের অতিথি)
এই বনিক সাম্রাজ্য, এই নিষ্ঠুরতা, মুছে না যায়।

অর্জন কম নয় কেলেঙ্কারিও আছে

জাকির হোসেন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিশ্ব অর্থনীতি ছিল মন্দার কবলে। আশঙ্কা করা হয়েছিল_ মন্দার বিলম্বিত প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষত রফতানি ও রেমিট্যান্স খাত বড় ধাক্কা খাবে। এ আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের চেষ্টার পাশাপাশি মন্দা মোকাবেলায় সরকারের সহায়কনীতি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার অর্থবছরে (২০০৮-০৯) রফতানিতে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়। পরের প্রতিটি অর্থবছরে রফতানি আগের তুলনায় বেড়েছে। বলা যায়, সরকারের চার বছরে সামষ্টিক অর্থনীতি মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এ সময়ে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়; কমেছে দারিদ্র্য হার। কৃষি উৎপাদনে ভালো সাফল্য এসেছে।
গত চার বছরে অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনায় বাংলাদেশ এগিয়েছে। তবে শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, হলমার্কের মতো একের পর এক কেলেঙ্কারি অর্থনীতির সাফল্যকে ম্লান করেছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবেশের

সূচকে কিছুটা অবনতি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতিরও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অর্থনীতির জন্য নানা সংস্কারের ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ব্যয় ব্যবস্থাপনা, বেসরকারিকরণ, প্রশাসনে দক্ষতা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংস্কার ত্বরান্বিত হয়নি।

মতামত জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন সমকালকে বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মন্দা-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। এ সময়কালে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রশংসাযোগ্য। রফতানি বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের আরও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ এখন চীনের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক। কৃষি প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। মোটা দাগে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়নি। তারপরও জনমনে কিছু বিষয়ে অসন্তুষ্টি আছে।

কী সেই অসন্তুষ্টি_ জানতে চাইলে বিনায়ক সেন বলেন, গত দশকে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে। ফলে মানুষের প্রত্যাশার চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সে চাপের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংস্কৃতি তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। মানুষ দিনবদলের সরকারের কাছে আরও কিছু প্রত্যাশা করেছিল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল, একটা কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। বিনিয়োগে বড় ধরনের অগ্রগতির কথা ছিল, যা হয়নি। বিনিয়োগের হার গত কয়েক বছরে একই রকম রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এডিপি বাস্তবায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রত্যাশিত সংস্কার হয়নি। শেয়ারবাজারে ধস, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের তহবিল লোপাটসহ কিছু বিষয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আর্থিক খাতের নানা সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিকে মাঝে মধ্যে ঝামেলায় ফেলেছে।

একের পর এক কেলেঙ্কারি :অর্থনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার শেয়ারবাজারে ধসের মাধ্যমে প্রথম বড় ধাক্কা খায়। ২০১০ সালের শেষে বড় ধরনের ধস নামে শেয়ারবাজারে। ফুলে-ফেঁপে ওঠা সূচকের ধারাবাহিক পতনে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। এই ধসের পেছনে একটি প্রভাবশালী অশুভ চক্রের কারসাজি ছিল, যা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে। গত দুই বছরে সরকারের নানা পদক্ষেপেও শেয়ারবাজারের সংকট দূর হয়নি। বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রতি আস্থাবান হতে পারছেন না।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর পদ্মা সেতু নিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার। মহাজোট সরকারের চার বছর নিয়ে সমকালের সাম্প্রতিক এক জরিপে বেশির ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে জটিলতার প্রধান দায় সরকারের।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ফলে আর্থিক খাতে সরকারের মনোযোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগের কারণে সরকার সমালোচিত হয়। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে একটি চক্র জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাৎ করে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হলমার্কই নেয় দুই হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এটি ছিল ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে ডেসটিনি গ্রুপও নানা কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। এই গ্রুপের এমডিসহ শীর্ষ কর্তারা এখন কারাগারে।

চাঙ্গা হয়নি বিনিয়োগ :জিডিপিতে বিনিয়োগের অংশ ২৪ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বিগত বিএনপি সরকারের আমলেও একই হারে বিনিয়োগ হয়। বাংলাদেশকে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের হার হতে হবে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থায় ওই হারে বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিক হিসাবে গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। বেড়ে গেছে ঋণের সুদহার। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মনোভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি খেলাপি ঋণও অনেক বেড়ে গেছে। ঋণ শ্রেণীকরণের নতুন নীতি এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যেতে পারে।

কিছু স্বস্তিকর পরিসংখ্যান :মন্দার শুরুতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে চলে যায়। এর পরের তিন বছরে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৬৭৬ ডলার। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৮ ডলার। মন্দা-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী ছিল। একটি অর্থবছর বাদে এ খাতে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। সরকার বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে পেরেছে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে।

দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ কমেনি :সমকালের জরিপে প্রশ্ন ছিল_ দ্রব্যমূল্য চার বছর আগের তুলনায় এখন সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে কি-না। এর উত্তরে ৫৫ শতাংশ ‘না’ বলেছেন। কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে_ এমন উত্তর দিয়েছেন ৩১ শতাংশ। চালের দাম কিছুটা কমলেও বাস্তবতা এমনই। আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬২ শতাংশে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নেমেছে।

বেসরকারি সংস্থা কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দ্রব্যমূল্য বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, গত এক বছরে মিনিকেট, নাজিরশাইল, আমন, পাইজাম, স্বর্ণাসহ নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের দরকারি চালের দাম কমেছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। চাল ছাড়া অন্যান্য নিত্যপণ্য যেমন_ আটা, ডাল, সয়াবিন তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি প্রভৃতির দাম বেড়েছে।

মধ্যাহ্নের সমাজ

বিনায়ক সেন

১.
কেন মধ্যাহ্ন উপন্যাসটি লিখতে হলো_ তাকে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘সময়কে’ ধারণ করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। সচরাচর যেসব বিষয় নিয়ে তার চরিত্ররা মাথা ঘামায় না- রাজনীতি, কাল, সমাজ- সে সবকিছুকে আর গল্পের বাইরে রাখা গেল না। কেননা, গল্পটাই কতদূর এগুলো মানুষ- তা নিয়ে। ১৯০৫ সালের পর থেকে পূর্ববঙ্গের সমাজ কীভাবে বদলে যেতে থাকল এ রকম কোনো ইতিহাসবোধে তাকে পেয়ে বসেছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্প্রতি-প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সাজ্জাদ শরীফকে জানিয়েছিলেন যে, নিজের জীবন ভাঙিয়ে আর কত উপন্যাস লেখা যায়! সে জন্যেই নাকি তাকে একা এবং কয়েকজন, সেই সময়, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ ও ‘প্রথম আলো’র মতো ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিখতে হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের জন্য বিষয়টা এমন নয়। তিনি খুব সচেতন প্রয়োজনেই এই ইতিহাস-প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন বোধ করি। তাঁর নিজস্ব স্টাইলে ব্যাখ্যাটা এরকম :’আমি লিখি নিজের খুশিতে। আমার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, কাল, মহান বোধ [!] এই সব অতি প্রয়োজনীয় [?] বিষয়গুলি এসেছে কি আসে নি, তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। ইদানীং মনে হয়, আমার কোনো সমস্যা হয়েছে। হয়তো বা ব্রেনের কোথাও শর্ট সার্কিট হয়েছে। যে-কোনো লেখায় হাত দিলেই মনে হয়_ চেষ্টা করে দেখি, সমস্যাটাকে ধরা যায় কি-না। মধ্যাহ্নেও একই ব্যাপার হয়েছে। ১৯০৫ সালে কাহিনী শুরু করে এগুতে চেষ্টা করেছি। পাঠকরা চমকে উঠবেন না। আমি ইতিহাসের বই লিখছি না। গল্পকার হিসেবে গল্পই বলছি। তার পরেও…’

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, ‘তারপরেও’ বলতে গল্প ছাড়াও ইতিহাস সম্পর্কে কোনো নতুন সচেতনতার প্রতি কি তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন? আর ইতিহাস-গল্প মিলিয়ে যদি কিছু লিখবেন তাহলে ১৯০৫ সাল থেকেই তা শুরু করবেন কেন? সময় ধরার ইচ্ছের কথা বলছেন, কিন্তু কোন কালপর্বে শুরু করে কোথায় তার যতি টানবেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চয়ই। ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসে যে-সময়কে অনুভব করা হয়েছে, তার ব্যাপ্তি ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশভাগ অবধি। কেন এই বিশেষ সময়ের টানাপোড়েনের মধ্যে তাকে প্রবেশ করতে হলো_ সেটা একটা প্রশ্ন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উপন্যাসটিতে যে সমাজকে তিনি এঁকেছেন, সেই সমাজচিত্র সে সমাজকল্পিত, না বাস্তব_ সে প্রশ্নে পরে আসা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, চিত্রটাকে তিনি কেন এত গুরুত্বের সঙ্গে আঁকলেন? আজকের যুগের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিচালিত সমাজের প্রেক্ষিতে মধ্যাহ্নের সমাজকে মনে হবে কোন অচিনপুরের গল্প_ এক আধুনিক ইউটোপিয়া। এই উপন্যাস ভর করে আছে আদর্শস্থানীয় দুই চরিত্রের ওপরে, যার একজন হরিচরণ সাহা এবং অন্যজন মওলানা ইদ্রিস। এই দুই শুভবোধসম্পন্ন মানুষ_ বস্তুত নিয়ত এবাদতে রত সূফী-সন্তই বলা চলে তাদের_ যারা সবসময়েই কী করে মানুষের উপকার করা যায় সেই চেষ্টায় নিয়োজিত, তারাই উপন্যাসের ঘটনাবলির ওপরে বৃক্ষের ছায়া হয়ে থাকেন শুরুর লাইন থেকে শেষ পর্যন্ত। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের শুরু হয় যে-পুকুরঘাটে, দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ হয় একই পুকুরঘাটে; কেবল শুরুর দৃশ্যে ছিলেন হরিচরণ, শেষের দৃশ্যে মওলানা ইদ্রিস। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র_ ভালো স্বভাবের ও মন্দ স্বভাবের চরিত্ররা সবাই এদেরকে নিয়েই, এদেরকে পাশে রেখেই যার যার জীবন কাটায়, যার যার মতো করে মৃত্যুবরণ করে।

মধ্যাহ্নের সমাজের বড় শক্তি তার অন্তর্নিহিত নৈতিক শ্রেয়বোধ। এর প্রধান উৎস হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিসের মতো মানুষেরা হলেও অপেক্ষাকৃত খাটো মানুষ যারা, তারাও প্রবল মানবিকতায় আক্রান্ত। তারা পারতপক্ষে অন্যায় করেন না, বা করলেও পরিহার্য বলে আত্মগ্গ্নানিতে ভুগতে থাকেন। জুলেখা, শরীফা, মনিশংকর, শিবশংকর, আতর_ এরা সবাই পৃথিবীতে ভালোমানুষের পাল্লা ভারী করেছে। আর লাবুস তো জুলেখার পুত্র সন্তান হলেও আসলে হরিচরণ-মওলানা ইদ্রিসের আধ্যাত্মিক সন্তান। লাবুস শহরে এলে কটকটে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটত, খুবই স্বাভাবিক হতো তার হিমু-হওয়া! তার মানে এই নয় যে, এই সমাজে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের সংঘাত ছিল না। সংঘাত-দ্বন্দ্ব-অনাচার ছিল যদিও, কিন্তু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হতো না। হরিচরণের নিজের পাটের আড়ত রয়েছে, ‘সাহা’ যেহেতু সেহেতু কৃষিপণ্য নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা তার উপার্জনের স্বাভাবিক উৎস। সুতরাং বাণিজ্যবিরোধী ছিল না ওই সমাজ। যে অঞ্চল নিয়ে এই উপন্যাস তার হাওরেই সওদাগররা ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য় তাদের নৌবাণিজ্যের নাও ভাসিয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যের ধারা থাকলেও এ ধরনের সমাজে টাকার শক্তিতে মানুষের ক্ষমতাকে মাপা হয়নি। শশাংক পালের মতো জমিদার বা ধনু শেখের মতো কুটিল ব্যবসায়ী মানুষও সমীহ করে চলেছে হরিচরণকে_ সেটা তার অর্থের কারণে যতটা, তার চেয়েও বেশি তার নৈতিক স্বভাবের কারণে। আরেকটি দিক হচ্ছে, মধ্যাহ্নের সমাজে স্বার্থপরতাই ব্যক্তির একমাত্র প্রণোদনা নয়; এখানে পরার্থপরতার বোধ সহজাতভাবে ক্রিয়াশীল থাকে বিভিন্ন স্তরে। বলা বাহুল্য, একুশ শতকের আজকের এই অপরাহ্নের সমাজ বাণিজ্যিক বোধের সমাজ। ঊনিশ-বিশ শতকের [অন্তত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ও মোটা দাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত পর্যন্ত] অপেক্ষাকৃত নির্দোষ পৃথিবীর মূল্যবোধের থেকে আজকের এই সমাজ মৌলিকভাবেই আলাদা। মধ্যাহ্নে অনায়াসে সমাজের বিভিন্ন স্তর, শ্রেণী ও ধর্মের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যাতায়াত চলে। এখানে বৃক্ষের অসুখ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়, জুলেখা গায় উকিল মুন্সি ও রাধারমণের গান, রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদের হাহাকার, হাওরের ঢেউয়ে বেজে ওঠে। সেটা যে কেবল নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য_ তা মনে করেননি লেখক। ব্যাপক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান আদান-প্রদানকে ধারণ করেছিল এই মধ্যাহ্নের সমাজ। সেখানে কোন চিহ্নটা কার, বা কোন গানের লাইনটা কোন সম্প্রদায়ের জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছে_ সেটা হিন্দুর নাকি মুসলমানের, মজুরের নাকি অবস্থাপন্ন কৃষকের_ সেটা বের করাটা দুরূহ। ওই সমাজের অবশ্য তাতে কিছু যায় আসেনি।

এ রকম সমাজের কাহিনী কি ইউটোপিয়ার মতো শোনাচ্ছে? হোক ইউটোপিয়া, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই কল্পকথা নির্মাণে [নাকি বাস্তবেই গল্পটা এভাবেই তিনি শুনেছিলেন] এত শ্রম ও মেধা ঢালবেন কেন? আমার ধারণা, মধ্যাহ্নের ভূমিকায় পুরো কারণটা হুমায়ূন আহমেদ বলেননি। শুধু ‘সময়’কে ধরার জন্য ওই বিশেষ কালপর্বের প্রতি চোখ ফেরাননি তিনি; আরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল তার। কোনো অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা ছিল আমাদের মন ও মননকে নাড়া দেওয়ার জন্যে। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সমাজের অন্তরাল প্রাণশক্তির উৎস কোথায়, তা দেখানো চোখে আঙ্গুল দিয়ে।

২.
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই।’ মধ্যাহ্ন উপন্যাসে সেই পাপকে অবলীলাক্রমে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই পাপের মধ্যে সহাবস্থানকেই চূড়ান্ত মানেনি। শশাংক পালের মতো অত্যাচারী জমিদারেরা এতকাল নিরীহ রায়তের পেছনে লেগেছে। তার মৃত্যুর পরে ধনু শেখের মতো ব্যবসায়ীরা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। শশাংক পালের যোগাযোগ ছিল কোলকাতার প্রশাসনের সাথে, ধনু শেখ নিয়েছে মুসলিম লীগের আশ্রয়। স্বদেশী আন্দোলনের তাড়া খাওয়া বিপ্লবীর হাতে আহত হতে হয় তাকে; শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষই দাঙ্গা ঘটানোর ষড়যন্ত্রী হিসেবে তাকে দায়ী করে এবং তার ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দেয়। আর শশাংক পালের মৃত্যু হয় কোনো অব্যাখ্যাত ব্যাধিতে। শশাংক পাল_ ধনু শেখের প্ররোচনার কারণে হোক, আর দুই যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্রমে বেড়ে যাওয়া ভেদবুদ্ধির কারণে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মধ্যাহ্নের সমাজেও ঢুকতে থাকে। রাতের অন্ধকারে একদল আরেক দলের লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়, একপক্ষ আরেক পক্ষের জাতিনাশ ধর্মনাশ করে, বাড়িতে আগুন লাগায়, পুলিশের কাছে মিথ্যে মামলা দিয়ে, হুমকি দিয়ে এলাকা পরিত্যাগে বাধ্য করে, নষ্ট মেয়ের অপবাদ দেয়, হাওরের নির্জনে এনে ধর্ষণ করে, জায়গা-জমি বসতবাড়ি দখল করে নেয়। এসবই হয়, কিন্তু এটা মধ্যাহ্নের সমাজের অন্দরমহলকে ছুঁতে পারে না। কোনো লৌকিক বা অলৌকিক কারণে এর মানুষগুলো পরস্পরের বিপদে এগিয়ে আসে।
পরস্পরের পাশে সহায়-সমর্থনের উদাহরণ অনেক এই উপন্যাসে। আমি এখানে দু’একটি উদাহরণ দেব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে মওলানা ইদ্রিস রওনা হয়েছেন বগুড়ার মহাস্থানগড়ের দিকে। পথ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। বগুড়ার পরিবর্তে রংপুরে চলে গেছেন। এক পর্যায়ে রাত হলে তাকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এসেছে একটি হিন্দু পরিবার। লক্ষণ দাসের পরিবার কাছেরই এক মন্দিরের সেবায়েত। ঐ বাড়ীতেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তার। খাবারেরও ব্যবস্থা হয়েছে_ অবশ্য রাখা হয়েছে উঠানেই। লোকটা তাকে বলেছে, ‘মুসলমানকে বাড়িতে ঢুকাব না। এত বড় পাপ করতে পারব না।’ মওলানা তাতেই খুশী। তিনি নামাজ শেষ করে মোনাজাত করে দোয়া চাইলেন যাতে এই পরোপকারী পরিবারটির প্রতি রহমত বর্ষিত হয়। এ সময়ে কপালে চওড়া করে সিন্দুর দেয়া ঘোমটা পরা একটা মেয়ে মওলানার সামনে এসে দাঁড়াল প্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ থেকে। মওলানার হাতে একটি কাঁথা দিয়ে বলল চলে যেতে : ‘দৌড় দিয়া তালগাছ পর্যন্ত যাবেন। সেখানে নদী পাবেন। নদীর নাম করতোয়া। নদী বরাবর দক্ষিণমুখী হাঁটবেন। থামবেন না। আমার স্বামী লোক খারাপ। আপনার সঙ্গে টাকাপয়সা আছে আপনি তাকে বলেছেন। সে লোক আনতে গেছে। টাকাপয়সা কেড়ে নিবে। আপনাকে মেরেও ফেলতে পারে। এই কাজ সে আগেও কয়েকবার করেছে। দাঁড়ায়া আছেন কেন? দৌড় দেন’।

রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে যে পাপ আছে তা অস্বীকার না করে স্বীকার করাই ভাল, স্বীকার করলে যদি আমরা পরিত্রাণের পথ পাই। হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করেও, করার মাঝেই, থমকে দাঁড়িয়েছে অথবা স্পষ্ট করে প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ধনু শেখ এলাকার মসজিদের ইমাম নিয়ামত হোসেনকে ডেকে নিয়ে বলেছে, ‘জুম্মার নামাজের পরে তুমি সুন্দর কইরা ওয়াজ করবা। তুমি বলবা সব মুসলমানের দায়িত্ব নিজেদের রক্ষা করা। পরিবার রক্ষা করা এবং পাকিস্তান হাসেলের জন্য কাজ করা। … তার জন্যে প্রয়োজনে রক্তপাত করতে হবে। শহীদ হতে হবে। বলতে পারবা না?’ আপাতত সম্মতি দিলেও চে’গুয়েভারার চেয়ে কোন অংশে কম যান না ইমাম নিয়ামত হোসেন। রাতের অন্ধকারে মনিশংকরের কাছে গিয়ে বলে দিয়েছেন, কাল জুম্মার নামাজের পরে দাঙ্গা শুরু হবে। শুধু তা-ই নয়, পরদিন জুম্মার নামাজ শেষে ইমাম নিয়ামত মওলানা ইদ্রিসকে আমন্ত্রণ জানালেন কিছু বলার জন্যে। ইদ্রিসকে বহুদিন ধরে হরিচরণ সাহার বাসায় আশ্রয়ের পর থেকেই হিন্দুদের সঙ্গে উঠা-বসা করার জন্যে একঘরে করে রেখেছে ধনু শেখ। মওলানা ইদ্রিস দাঙ্গা ঘটানোর পরিস্থিতি বদলাতে উঠে দাঁড়িয়ে সুরা হুজুরাত এর তের নম্বর আয়াতের স্মরণ করলেন, যেখানে পৃথিবীর সব মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করে পরে বিভক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন জাতিতে ও গোত্রে, যাতে তারা ‘একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে’। দোয়া পাঠের সময় ইমাম নিয়ামত হোসেন প্রার্থনা করলেন যেন বান্ধবপুরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা না হয়।

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠানের ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে এক উদারনৈতিক আবহাওয়া বিরাজ করেছিল এলাকায়। অত্যাচারী শশাংক পাল মারা যাওয়ার পর তার মুখাগি্ন করতে তার স্বধর্মের কেউ রাজী হলো না। হয়তো তিনি সারাজীবন অবিশ্বাসী নাস্তিক ছিলেন বলে, হয়তো অত্যাচারী ছিলেন বলে। মুসলমান হয়ে মওলানা ইদ্রিস এগিয়ে এলেন এক্ষেত্রে। সমস্যা হলো পুরোহিতের সাথে তাকেও কিছু মন্ত্র পড়তে হলো শেষকৃত্যের প্রয়োজনে। এর জন্যে কাফের বলে ফতোয়া দেওয়া হলো তার বিরুদ্ধে। লাবুস এসে প্রতিবাদ করে বলল, ‘লাশের মুখে আগুন দিয়েছে। লাশের আবার হিন্দু মুসলমান কী? লাশ নামাজ কালাম পড়ে না। মন্দিরে ঘণ্টাও বাজায় না’। অন্যত্র, লাবুস ও ইদ্রিসের মধ্যে অন্য একটি ধর্মীয় আলাপের বিনিময় হয়। ইদ্রিসের শিশুবয়সী মেয়ে পুষ্পরাণীকে দুধ খাওয়ানোর কেউ নেই। তার স্ত্রী জুলেখা তাকে পরিত্যাগ করে গেছেন। এদিকে গ্রামের বাগাদিপাড়ার মেয়ে ষোল সতেরো বয়সী কালী গতকালই তার মেয়েকে হারিয়েছে। পুষ্পরাণীকে পেয়ে সাগ্রহে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে সে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের কণ্ঠেই শোনা যাক : ‘মাওলানা ইদ্রিস লাবুসের কাছে হিন্দু-মেয়ের বুকের দুধ খাওয়া নিয়ে ক্ষীণ আপত্তি তুললেন। লাবুস বলল, দুধের কোনো হিন্দু-মুসলমান নাই। হিন্দু-মুসলমান মানুষের চিন্তায়। দুধের চিন্তার শক্তি নাই। লাবুসের কথায় মাওলানা হকচকিয়ে গেলেন। ধর্ম নিয়ে এইভাবে তিনি কোনোদিন চিন্তা করেননি। এই দিকে চিন্তা করা যেতে পারে।’ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাত্যহিকের সাংস্কৃতিক ব্যবহারিক বিনিময়ের এ রকম অনেক উদাহরণ আরো ছড়িয়ে আছে। আজকের এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির যুগে ধর্ম-ধর্ম করে আমাদের নগর ও গ্রামের জীবন এখন ব্যতিব্যস্ত। লাবুস-মওলানা ইদ্রিস হরিচরণের মতো চরিত্ররা কি আছে এখনো আমাদের আশেপাশে কোথাও?

৩.
তাহলে দাঁড়াচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানে মিলে একটা যে অভিন্ন সংস্কৃতি, তলার দিকে গড়ে উঠেছিল, শত কংগ্রেসী লীগ রাজনীতির ডামাডোলেও যেটা পুরোপুরি ধসে যায়নি, সে রকম কোন শুভনীতিবোধসম্পন্ন অস্তিত্বকেই অমাদের ‘মধ্যাহ্ন’ অর্থাৎ ‘স্বর্ণযুগ’ বলছেন লেখক? আজ সেই মধ্যাহ্ন গড়িয়ে এই সমাজ_ এই তিমিরবিলাসী সমাজ উপনীত হয়েছে তার অপরাহ্নে। ‘অপরাহ্ন’ কথাটা আমি ‘লেইট ক্যাপিটলিজম’-এর তাত্তি্বক সাহিত্য-সমালোচক ফ্রেডেরিক জেমসনের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। বণিজ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিকে, শিল্পকেও মানবসত্ত্বাকে ক্রমাগত ‘ব্যবহৃত-ব্যবহৃত’ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বর্জ্যের মতো পাগলার লেগুনের মতো অন্ধকার কোণে। হুমায়ূন আহমেদ এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গীনির্ভর সমাজকে মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেননি। হিমুকে দিয়েছেন এই বাণিজ্যিক সমাজকে বিদ্রূপ করার মনোমুগ্ধকর ক্ষমতা। ‘অয়োময়’-এর মীর্জা হেরে যাচ্ছে উঠতি বণিক শ্রেণীর কাছে, যেভাবে ধনু শেখের কাছে হেরে গিয়েছিল শশাংক পাল। তবু স্রষ্টার পক্ষপাতিত্ব পরাজিতের দিকেই। সত্যজিতের ‘জলসাঘর’-এর শেষ দৃশ্যে বিশ্বাম্ভর কোথায় মিলিয়ে যান সে খবর আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমাদের মনে থেকে যায় শেষ সঙ্গীত সভার নৃত্যগীতের রেশ। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষে আমরা জানতে পেরেছি ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ আসন্ন, ভিটেমাটি ছাড়ছে দু’তরফেই, নতুন রাষ্ট্রজীবনের শুরু হবে সীমান্তের দু’দিকেই। পাকিস্তান হচ্ছে ‘কৃষকের ইউটোপিয়া’ গবেষকরা রায় দিয়েছেন, শুধু কিছু মানুষের মনে শান্তি নেই। কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। হরিচরণ সাহা মারা গেছেন, লাবুস মৃত্যুশয্যায়, মওলানা ইদ্রিস সবচেয়ে বেশি নিরাশ্রয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একই সুখ-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিস ছিলেন এই পাপবিদ্ধ সমাজের রক্ষাকবচ_ তারা আঁকড়ে ছিলেন সমাজের ভালোত্বকে শুভবোধকে, মঙ্গলকামনাকে। তারা সমাজকে অন্ধকারর্ খাদের মধ্যে গড়িয়ে পড়তে দেননি।

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষটা এ রকম। লাবুস, যে কিনা আমাদের অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎকে নায়কের মতো লালন করেছে, সে মারা যাচ্ছে। কোনো অব্যাখ্যাত অসুখে তাকে আক্রান্ত করেছে। অসুখ নিয়েই সে এসেছে নির্জন পুকুরের ঘাটে এবং সেখানে হঠাৎই সে তার মৃত মাকে দেখতে পাচ্ছে কাছে। একপর্যায়ে মা’র কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। তার এই মৃত মার নাম জুলেখা। যিনি জীবিত থাকাকালে স্বয়ং উকিল মুন্সীকে গান শুনিয়েছেন এবং নজরুল যাকে দিয়ে কলকাতায় গান রেকর্ড করিয়েছেন। তিনি এবারে গুনগুন করে গান ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন বইটির শেষ দুটি লাইন, যা পড়তে থাকলে এখনো আমি এক অনির্বচনীয় শিহরণ অনুভব করি : ‘মওলানা ইদ্রিস ঘর থেকে বের হয়েছেন, হাদিস উদ্দিন বের হয়েছে। পুকুরঘাট থেকে যে সুরধ্বনি বের হয়ে আসছে, তার জন্ম এই পৃথিবীতে নয়। অন্য কোনোখানে।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোসেন মিয়া ময়নাদ্বীপের সমতাবাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদের বান্ধবপুর তেমনি একটি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্র, সেখানে সব গোত্রের ও বর্ণের মানুষেরা মানবিক মমতায় পরস্পরের হাত আঁকড়ে ধরবে। তবে এই অপরাহ্নের সমাজের কাছে হুমায়ূনের এই ইতিহাসপাঠ কল্পজগতের ভাষ্য বলে মনে হতে পারে।

অর্থনীতি ও রাজনীতির ধাঁধা

বিনায়ক সেন, অজয় দাশগুপ্ত

সামনে বাজেট রয়েছে। কিন্তু সরকারের চতুর্থ বছরটা উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের বছর নয়। এর পরিবর্তে আগের বছরগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতি এসেছে তা বজায় রাখা, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারে অবনতি ঘটতে না দেওয়া, রফতানি উৎসাহিত করা_ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা জরুরি। নির্বাচনের আগের বাজেটে জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণের চাপ থাকবে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি ব্যাহত হতে পারে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে ঋণ বাড়ালেও সমস্যা দেখা দিতে পারে আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি বড় ধাঁধা বা পাজল দিয়েই লেখাটা শুরু করি। অর্থনীতিবিদ যারা, দেশ-দুনিয়ার অর্থ নিয়ে চর্চা করেন যারা, তাদের বিবেচনায় গত দুই যুগে বাংলাদেশে অর্থনীতির বেশ কিছু সূচক যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। যেমন প্রবৃদ্ধির হার ভালো, দারিদ্র্য হ্রাসের হার বাড়ছে, সামাজিক সূচকে রয়েছে সফলতা। অর্থনীতিবিদরা এসব অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আলোচ্য সময়ে দেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে। গণমাধ্যম যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করেছে। নিয়মিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সরকার পরিবর্তনের এটাই একমাত্র পন্থা হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এ অর্জনের পরও কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হতে পারছে না কেন? তাহলে কি অর্থনীতিবিদদের কাছে যেসব সূচক গুরুত্বপূর্ণ শাসকদের মূল্যায়নে; নাগরিকরা একই সূচকের ওপর নির্ভর করে না?

যে কোনো দল সাধারণ নির্বাচনে যাওয়ার আগে ইশতেহার ঘোষণা করে এবং তাতে দরিদ্র মানুষের সহায়তার জন্য বিভিন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এসবের বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে সে বিষয়ে তারা খেয়াল রাখে। এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান অন্য অনেক উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় ভিন্ন। বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে তারা সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। সাধারণ নির্বাচনেও বাংলাদেশের ভোটার উপস্থিতির হার যথেষ্ট বেশি। এখানকার নাগরিকরা ধরেই নেয় যে, ম্যাক্রো অর্থনীতি এবং সামাজিক সূচকগুলো ক্রমাগত ভালো হতে থাকবে এবং এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সম্ভবত সরকার সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নে তারা এসবকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। সামাজিক খাতেও রয়েছে সাফল্য। কিন্তু পাশাপাশি গত দুই দশকে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আয়-বৈষম্য বেড়েছে এবং এটা জনমনে অসন্তোষ ও হতাশার সৃষ্টি করছে। যদিও এ সময়ে দারিদ্র্য কমছে, কিন্তু জনসাধারণ আপেক্ষিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। মজুরি হার বেড়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা-পুষ্টির ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটছে। কিন্তু এগুলোর যতটা না গুরুত্ব, সেটা ছাপিয়ে ওঠে ‘আমার চেয়ে তার বেশি উন্নতির’ প্রশ্নটি। এ বিষয়টি তারা ভালো চোখে দেখে না। এখানে আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। যদি এ আয়-বৈষম্য অধিকতর শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে ঘটত সেটা সহনশীল হতো। কিন্তু বাস্তবে এ বৈষম্যের পেছনে হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানব পুঁজির যতটা না অবদান, ব্যবসায়িক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা যতটা না কাজ করে, তার অনেক বেশি কাজ করে দুর্নীতি। সহজ কথায় বলা যায়, অনুপার্জিত আয়ের মাধ্যমে কিছু লোক বাড়তি সম্পদ সৃষ্টি করে। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, রাজধানী ঢাকায় এখন সাধারণ মানের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্যও ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয় পড়ে। যারা সরকারি চাকরি করেন তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ও যাদের, তাদের পক্ষে এ আয় থেকে সঞ্চয় করে এত দামের ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়।

একটি জেলা সদরে সাম্প্রতিক সফর থেকে জানা গেছে যে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোকের হাতে পাজেরো বা এ ধরনের দামি গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদ চলে আসে, যা জনগণের কাছে দৃষ্টিকটু ঠেকে। পরিশ্রম, দক্ষতা বা উন্নত শিক্ষার জন্য এসব অর্জন নয়, বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এর মূলে। জনগণের মধ্যে সম্পদের যে বৈষম্য, তার পেছনে দুর্নীতির রয়েছে বড় ভূমিকা_ সেটা বুঝতে পারে বলেই জনমন বিষিয়ে যায়। আর এ কারণেই নির্বাচনের সময়ে সরকারের ম্যাক্রো অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সাফল্য এখন পর্যন্ত বড় হয়ে দেখা দেয় না। এটাও লক্ষ্য করা হয় যে, অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত বলে জনগণ মনে করে এবং এসব করেও তারা দিব্যি থাকতে পারে। তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত এবং পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করায় রাজনীতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণেই যে সরকার ক্ষমতায় থাকছে, নির্বাচনকালে জনগণের বড় অংশ তার বিপরীতে চলে যাচ্ছে।

এই যে ধাঁধা, তার নিরসন করতে হলে যে দুর্নীতির মাধ্যমে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট কিছু লোক নিজের সম্পদ বাড়িয়ে নিচ্ছে, তার অবসান ঘটানো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। নির্বাচন হয় বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের মধ্যে। কিন্তু এমনকি দলের প্রধান নেতার জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচনে সেটা নিয়ামক থাকে না। বরং দায়ভার নিতে হয় পুরো দলকে।
সরকার বলতে পারে যে, বৈষম্য কমাতে তারা চেষ্টা করছে। এর উদাহরণ হিসেবে সামাজিক বেষ্টনী কর্মসূচির নজির টানা হয়। এ ধরনের অন্তত ৮০-৮৫টি কর্মসূচির কথা তারা বলতেও পারে। এতে ব্যয় হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ অর্থ। এ থেকে সমস্ত সুবিধা চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে কি-না, কোনো লিকেজ আছে কি-না সে প্রশ্ন রয়েছে। যদি ধরেও নিই যে, লিকেজ নেই অর্থাৎ দুর্নীতি-অনিয়ম হয় না এবং বয়স্ক ভাতা, ছাত্রী উপবৃত্তি, মঙ্গা এলাকার বিশেষ কর্মসূচির পূর্ণ সুফল সংশ্লিষ্টরা পাচ্ছে; তাহলেও এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রতীকই থেকে যায় এবং তা দিয়ে জীবন খুব একটা বদলানো যায় না। তাতে হয়তো ক্ষুধা কিছুটা লাঘব হয়, কিন্তু আয়-বৈষম্য কমে না। ইউরোপের অনেক দেশে বিশেষত ওয়েলফেয়ার স্টেটগুলোতে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করা গেছে। এর কারণ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে তাদের বাজেটের ২ শতাংশ নয়, বরং ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের হাতে এত সম্পদ নেই যে, রাজস্ব বাজেট থেকে এ অর্থ বরাদ্দ করা যাবে। আমাদের কর রাজস্ব আদায় সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। তারপরও এর পরিমাণ জিডিপির ১০-১১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এ কারণে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক যে, বাজেটের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কতটা কমানো যাবে। একটি উদাহরণ দিই। যে সম্পত্তির মূল্য ২ কোটি টাকার বেশি, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ বসানোর একটি পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের ৯ মাসে তা থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি টাকার মতো এবং দিয়েছে ১১শ’র মতো পরিবার। এত কম অর্থ আদায় হওয়ার কারণ সম্পত্তির মূল্য ধরা হয়েছে উৎস ধরে। ১০ বা ১৫ বছর আগে যে দামে তা কেনা, সেটাই উৎস মূল্য। কর আদায়ে নানাবিধ জটিলতা বাদ দিলেও কেবল মূল্য কম ধরায় অনেক ধনবান ব্যক্তিই সারচার্জের আওতায় আসছে না। বর্ধিত কর পাওয়া গেলে তা দিয়ে অনেক ধরনের কাজ সম্পন্ন করা যায়। যেমন স্বাস্থ্য বীমা। ভারতে বেশিরভাগ রাজ্যে এটা চালু আছে। বাংলাদেশেও কোনো কোনো এনজিও পাইলট প্রকল্প নিয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প চালু হলে দরিদ্রদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে আসে এবং বিপদে পড়ে সামান্য সম্পদ বিক্রি করতে হবে না।

সামনে বাজেট রয়েছে। কিন্তু সরকারের চতুর্থ বছরটা উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের বছর নয়। এর পরিবর্তে আগের বছরগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতি এসেছে তা বজায় রাখা, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারে অবনতি ঘটতে না দেওয়া, রফতানি উৎসাহিত করা_ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা জরুরি। নির্বাচনের আগের বাজেটে জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণের চাপ থাকবে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি ব্যাহত হতে পারে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে ঋণ বাড়ালেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আমরা জানি, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের তিনটি উৎস_ বৈদেশিক ঋণ-অনুদান, আর্থিক খাত-ব্যাংক ব্যবস্থা এবং কর রাজস্ব। কিন্তু কর রাজস্ব স্বল্প মেয়াদে খুব একটা বাড়ানো সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতি চাইলে প্রথম ও দ্বিতীয় উৎসের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। কিন্তু এ বছর বৈদেশিক সূত্র থেকে ঋণ-অনুদান নেতিবাচক। অর্থাৎ নতুন করে যা প্রাপ্তি তার চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে গেছে পুরনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। যেহেতু বৈদেশিক সাহায্য সেভাবে আসেনি, তাই সরকারকে কম সময়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে এবং আরও ঋণের জন্য হাত বাড়াতে হবে। ফলে ঝুঁকি রয়েছে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার। এ অবস্থায় বৈদেশিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগী হওয়ার বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে বোঝাপড়ার কারণে এ বছর ৯০ কোটি ডলারের (তিন বছরে এ ঋণ দেওয়া হবে) প্রথম কিস্তি মিলেছে। কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থায়ন স্থগিত হয়ে আছে এবং দাতারা এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে। বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে আগামী কয়েক মাসে নাটকীয় পরিবর্তনের আশা দূরাশা। এ অবস্থায় সরকারের সামনে বিকল্প হচ্ছে নিজের চাহিদা কমিয়ে আনা। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোও একই লক্ষ্য থেকে করা। এক হিসেবে দেখা যায়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও ভর্তুকি থাকবে এবং এ খাতে আগামী বছর ৬৪১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে।

সরকার কুইক রেন্টাল সূত্রে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এসব প্রকল্প চালু রাখতে হলে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল অর্থ দরকার হয়। কিন্তু সরকারের হাতে এ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেই। উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা করেও জনগণকে তার সুফল দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে সরকার ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে এবং দাতাদের পরামর্শও তেমনই। কিন্তু তাতে জনমনে প্রভাব পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ৭৭ শতাংশ জনগণের আস্থা রয়েছে_ গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জনমতের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গ্যালাপ পোলের জরিপে এ কথা বলা হলেও সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে এখন তা হ্রাস পাওয়ার কথা।

প্রশ্ন উঠতে পারে_ এ ধরনের পরিস্থিতি কি আগে ঘটেনি? ২০০৭-০৮ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গম-চালের দাম বেড়েছিল। সে সময় বিশ্বব্যাংকের তরফে বাজেট সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার সেটা পায়নি। ফলে সামষ্টিক খাতের ওপর চাপ সামলাতে অভ্যন্তরীণ সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রফতানি বাড়ছে। প্রবাসীরাও ভালো অর্থ পাঠাচ্ছে। কিন্তু সরকার বৈদেশিক সূত্রে বড় ধরনের রিলিফ পাবে_ এমন আশা কম। এ কারণেই বৈদেশিক সাহায্যদাতাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা দরকার। অর্থনীতির তাগিদই ঠিক করে দেবে রাজনৈতিক কৌশল, এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। এ বছরের জানুয়ারিতে সমকালে ‘একে একে নিভে যাচ্ছে বাতি’ শিরোনামের লেখার (লেখক বিনায়ক সেন) ভাবনায় ছিল যে সরকার নমনীয় হবে। কিন্তু গত ২-৩ মাসের ঘটনাবলিতে দেখা যাচ্ছে, সরকার সে পথে এগোচ্ছে না। অর্থাৎ এখনও হার্ডলাইনেই চলেছে।

প্রকৃতই আয়-বৈষম্য হ্রাসে সরকারের হাতে হাতিয়ার কম। গত এক দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ভালো। কৃষকের দাবি, এখন ধানের ন্যায্যমূল্য। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ভালো হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারে চাপ অপেক্ষাকৃত কম থাকছে।
সার্বিক প্রবৃদ্ধির হার এখনও সন্তোষজনক বলব। কয়েক বছরে সাড়ে পাঁচ-ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অনেকেই মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে মজুরি বাড়িয়ে নিতে পারছে। ধান কাটার সময়ে দিনে চার-পাঁচশ’ টাকা আয় করা সম্ভব। এ সময়ে মাসে ২০ দিন কাজ করেই ৩-৪ মাসের মতো চাল ঘরে তোলা যায়। ধানের চাতালে দেখেছি, নারী শ্রমিকরা কাজ থাকুক আর না থাকুক, বছরজুড়ে দিনে ১১০-১২০ টাকা আয় করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে পাঁচ-ছয় শতাংশ হলেও গ্রামের দরিদ্ররা ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শহরে বসবাস করে এমন অনেক লোক এখন গ্রামের জমি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ক্ষুদ্র কৃষক বা ক্ষেতমজুরদের চাষাবাদের জন্য দেয়। এর পেছনে অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে।

নির্মাণ খাতের চিত্রও ভালো। এর প্রভাব পড়ছে শহরের দরিদ্রদের একটি অংশের ওপর। সার্বিক অর্থনৈতিক এ চিত্র অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বিদেশিরা কে, কোথায়, কী বললেন কিংবা ট্রান্সপারেন্সির সূচকে কী বলা হলো, তার চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে অর্থনীতির নিজস্ব ডিনামিক্স।

তবে আমরা যদি সংস্কারের ক্ষুধা হারিয়ে না ফেলতাম, তাহলে আরও কিছু অর্জন সম্ভব হতো। এটা বলা হয়ে থাকে যে, যখন সম্পদ থাকে না তখন ভাবসম্পদ বিনিয়োগ করে সুফল পাওয়া যায়। আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্ধেকও বাস্তবায়ন করতে পারি না। এ অবস্থা অনেক বছর ধরে চললেও আমরা কেন প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনে ব্যর্থ হচ্ছি? জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে_ এটা কেন যথাসময়ে উদ্যোক্তারা ও সরকার বুঝতে পারল না? কুইক রেন্টালের ভায়াবিলিটি হিসাব করার সময় ২০০৭-০৮ সময়ে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য কেন বিবেচনায় নেওয়া হলো না? অনেকের অভিযোগ, অর্থনীতিবিদদের দ্বারা অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। ঋণ কোথায় দেওয়া হবে এবং কোথায় নয়, ব্যাংকিং সেক্টরের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে সেটা মূল্যায়ন করার ক্ষমতা থাকতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অপেশাদারিত্ব কাঙ্ক্ষিত নয় এবং এর পরিবর্তন এমনকি ক্ষমতার শেষ বছরেও করা সম্ভব। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ কমিটি রয়েছে। এমনকি নামজাদা অর্থনীতিবিদ ড. মনমোহন সিংও ড. কৌশিক বসুসহ অনেকের পরামর্শ নেন নিয়মিত।

বৈষম্য রোধে সরকার ভূমি সংস্কারের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে। এক সময়ে বলা হতো. কলকাতাকেন্দ্রিক বাবুরা কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে না। কিন্তু এখন কেন অনেকে কৃষক শ্রেণী থেকে উঠে এসে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হতে গিয়ে কৃষকের স্বার্থ ভুলে যান? কেন তাদের কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের প্রতি মমত্ববোধ থাকবে না? খাসজমি সরকারের হাতে যেটুকু রয়েছে সেটা পুনর্বণ্টন বিষয়ে অবশ্যই সিদ্ধান্তে আসতে হবে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে। ইউরোপ যে ইউরোপ হলো তার বড় প্রাতিষ্ঠানিক কারণ উনিশ ও বিশ শতকে স্থানীয় সরকার নিয়ে চর্চা। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। আমরা বিকেন্দ্রীকরণের এসব শিক্ষা জানা থাকলেও তা গ্রহণ করছি না? স্থানীয় সরকার যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এখন বড় ধরনের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ইউএনডিপি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় সরকারকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও যুক্ত করা গেলে গ্রামের জনগণ বুঝতে পারবে যে, তাদের উন্নয়নে সরকার অর্থ বরাদ্দ করছে এবং তা কাজে লাগানো হচ্ছে। এমনকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের অবস্থার পরিবর্তনও স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে করা সম্ভব।

আমরা মনে করি, বর্তমান বাজেটের মধ্যে সরকার আরেকটু গ্রামমুখী হতে পারে। বৈষম্য কমিয়ে জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হতে পারে। সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে_ সেটা নিশ্চয়ই তারা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

ড. বিনায়ক সেন :গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস
অজয় দাশগুপ্ত :সাংবাদিক

খেলায় এখন হাফ টাইম : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এখনও সময় আছে

বিনায়ক সেন, অজয় দাশগুপ্ত | তারিখ: ১০ জুন ২০১২

জাতীয় সংসদে ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। এ সময়ে বিরোধীরা সংসদে ছিল না এবং বাজেট আলোচনায় অংশ নেবে, এমন সম্ভাবনাও প্রায় নেই। এ নিয়ে যা কিছু পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, সেটা দেখছি সংসদের বাইরে। এতে একাডেমিক চর্চা আছে, অর্থনীতিবিদদের আলোচনা আছে। রাজনীতিকরা তো মুখর আছেনই। আলোচনায় জোর পড়ছে মোট দেশজ প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়েছে কি-না, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে নেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কি-না এবং এ ধরনের আরও কিছু বিষয়ে। তবে আমাদের মনে হয়, আমজনতা যাদের বলি তাদের ঠিক পরিসংখ্যানের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে ততটা মাথাব্যথা থাকে না। তারা চায় প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে এমন পণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় থাকুক, আইন-শৃঙ্খলা ভালো থাকুক, জীবনযাপন সহজ থাকুক।
অর্থনীতি যেভাবে চলছে তাতে কেউ আশাবাদের কথা বলতে পারেন, কেউবা হতাশার দিকটিকেই বড় করে দেখবেন। এ ছাড়া নিরন্তর সংশয়বাদীরা তো রয়েছেনই। তারা এমনকি চূড়ান্ত হিসাবের জন্য অপেক্ষা করতেও রাজি নন। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে যখন প্রথমে ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলো, তখন তারা বলতে থাকলেন_ হতেই পারে না। বস্তুতপক্ষে ওই বছরে চূড়ান্ত হিসাবে এই ৬.৭ শতাংশ হারেই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এ বছরেও অর্থাৎ ২০১১-১২ অর্থবছরে বলা হতে থাকল সরকারের ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি, ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমতে থাকা, কুইক রেন্টালজনিত সমস্যা, বৈদেশিক সাহায্য কম আসা ইত্যাদি কারণে অচিরেই সংকট নেমে আসবে। এমন অবস্থা ২০০৭-০৮ সময়েও ছিল। সেটা অনেকটা বৈদেশিক সহায়তায় কাটিয়ে ওঠা গেছে। এবারেও গত তিন-চার মাসে পরিস্থিতির কিছুটা রাশ টানা সম্ভব হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা এবং আমদানি হ্রাস ও রফতানি বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে মূল্যস্ফীতি কমেছে, টাকা অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও সর্বশেষ প্রতিবেদনে এর প্রশংসা করেছে। এ ধরনের নীতি-কৌশলও কিন্তু অর্থনীতির পণ্ডিতদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।
এবারে বাজেটের প্রসঙ্গে আসি। অর্থনীতিতে কী ভালো হয়েছে, সেটা কেউ স্বীকার করতে পারেন, না-ও পারেন। মন্দ দিক প্রসঙ্গেও একই কথা। কিন্তু চলতি প্রসঙ্গে ব্যস্ত থেকে যেন আরও ভালো করার জন্য কী করা দরকার এবং কীভাবে করা দরকার সে আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে না রাখি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কাঠামোগত সংস্কার। এটি করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই গতিশীলতা আসবে না, সেটা অনেকেই স্বীকার করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ বড়ই কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তা চলতি বছরে কম এসেছে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে বাজেটে বিদেশি ঋণ-অনুদানের পরিমাণ থাকত জিডিপির ১০ শতাংশের মতো। কিন্তু এবারে মিলেছে ১.৩ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মিলেছে ১.৩৪ শতাংশ। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিরূপ থাকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে_ এ ধরনের পরিস্থিতিতে বছরে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বিদেশি সহায়তা পেলেই রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মেটানো যেত। ফলে ফিসকাল ঘাটতি মেটানোর অপর উৎস অভ্যন্তরীণ সূত্রের ওপর (ব্যাংকিং ও অ-ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অপেক্ষাকৃত বেশি সুদে ঋণ গ্রহণ) এভাবে চাপ পড়ত না। এখন প্রশ্ন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তা জোগাতে কেন পারছি না? বাজেটে এ নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত ছিল, কিন্তু নেই। শুধু এ বছর নয়, আগেও মেলেনি। কী কারণে পাওয়া যায়নি সেটা তুলে ধরা হলে জনগণ বুঝতে পারত যে এ জন্য কে দায়ী এবং কেনই বা ঋণ-নির্ভর বাজেট (যেটা জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন)। এটা মস্ত ধাঁধা যে সরকার একদিকে বিদেশি সাহায্য সংগ্রহ করতে পারছে না, অন্যদিকে পাইপলাইনে প্রচুর অর্থ-প্রস্তাব জমা পড়ে আছে। একদিকে আমরা বিদেশি সাহায্য চাইছি, একই সঙ্গে ঘরের দোরে এ সাহায্য প্রস্তাব নিয়ে কেউ কেউ হাজির থাকলেও সেটা নিতে পারছি না।
যদি সক্ষমতার অভাব হয়ে থাকে, তাহলে সমাধান হচ্ছে এটি বাড়াতে হবে। কোন কোন মন্ত্রণালয়ে বৈদেশিক সহায়তাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি ঘাটতি সেটা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের অধীনে সভা হতে পারে। দরকার মনে করলে পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য এ সক্ষমতাকে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধার শর্ত করা যায়।
যদি দেখা যায়, দাতাদের কোনো কোনো শর্ত অযৌক্তিক, যেমনটি অতীতে দেখেছি_ সেটাও জনগণকে বলা দরকার। তাহলে দাতারাও বড় মুখে বলতে পারবে না যে বাংলাদেশ সরকার ঋণ-অনুদান ব্যবহার করতে অসমর্থ।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসবে_ আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতা কি কমে গেছে? যদি এটা হয়ে থাকে তার সমাধান হচ্ছে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের এসব প্রকল্পে দায়িত্ব প্রদান করা। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছে তেমনটি ঘটতে থাকলে কখনোই ছাড় মিলবে না, এটাই এখনকার বাস্তবতা। স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যতিরেকে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মিলবে, এমন সম্ভাবনা কম।
কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্নে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাঁধা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন কম থাকছে। সাধারণত সৎ বা অসৎ যে কোনো লোকেরই বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা থাকে। ঠিকাদার টাকা ব্যয় না করলে কীভাবে লাভবান হবে? তারা কেন এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ এবং জুনের মধ্যে ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারবে না? যদি ১০০ শতাংশ ব্যয় করা হয় তাহলে প্রশ্ন আসবে_ গুণ-মান ঠিক আছে তো? আমাদের অর্থমন্ত্রীর বাজেটে এটা কখনও সংযোজিত হতে দেখা যায়নি যে, বড় বড় কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি হয়েছে। কাজ শেষ করা গেলেই যেখানে বিল মিলবে, সেখানে কেন পুরো অর্থ ব্যয় করা যায় না_ এ রহস্যের জট খোলা দরকার। একান্তই যদি আমাদের সচিবালয়কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে ১০-১৫ শতাংশ কাজ স্থানীয় সরকারের হাতে তুলে দিতে সমস্যা কোথায়? ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে এ ভার দেওয়া যেতে পারে। তারা স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করবে। এভাবে ফিসকাল বিকেন্দ্রীকরণ করে সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ স্থানীয় সরকারের কাছে দেওয়া হয়। উন্নত দেশগুলোতে এর হার আরও বেশি।
প্রশ্ন আসতে পারে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা রয়েছে কি-না। এ ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব হতে পারে_ কেন্দ্রীয় সরকার দেবে ৮০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার ২০ শতাংশ। নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকে তারা এ অর্থের জোগান দেবে। গত এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে থাকছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর আদায়ের সুযোগ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে ট্যাক্স-কোড কিছুটা বদলাতে হবে_ স্থানীয় সরকারের কোন কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কর আদায় করতে পারবে সে বিষয়টি এতে স্পষ্ট করা থাকবে। লোকাল গভর্নমেন্ট সাপোর্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প রয়েছে, যার উদ্দেশ্য স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকৃতই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১০-১৫ শতাংশ বিকেন্দ্রীকরণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘাটতি স্থানীয় সরকার কর্তৃক পূরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তৃতীয় যে সংস্কারের প্রশ্নটি তুলতে চাই সেটা হচ্ছে ঢাকার অভ্যন্তরে এবং বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। এ লক্ষ্য অর্জন কেবল সম্পদ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা বস্তিতে থাকে, তারা কি এভাবে থাকতে চায়? প্রকৃতপক্ষে তারা কাজের স্থলের কাছাকাছি থাকতে চায়। দূরে থেকেও যদি সহজে আসা-যাওয়া করা যায়, তাহলে সে বিকল্প অবশ্যই বিবেচনায় থাকত। শ্রীলংকার কলম্বো শহরে দেখেছি গল এক্সপ্রেস অনেকেরই পছন্দ। এতে চেপে সকালে অনেকে রাজধানীতে আসে এবং সন্ধ্যায় ফিরে যায়। এর প্রভাব কলম্বোতে যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। শহরের ভেতরে ও বাইরে যোগাযোগ বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। আমাদের জাতীয়তাবাদ এক। রাজধানী এক। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-গরিব_ সবাই এক সমাজের অংশীদার। বিদেশে গেলে দেখি, সব ধরনের নাগরিক বাস-ট্রাম-রেলগাড়ি-মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে-ফেরি_ এসব যান ব্যবহার বেশি করে। কিন্তু আমাদের দেশে চলার পথেই শ্রেণী বিভাজন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গরিবরা পায়ে হাঁটে, নিম্নবিত্তরা বাসে চাপে, মধ্যবিত্তরা রিকশা-সিএনজি ব্যবহার করে। আর সচ্ছলরা চাপে প্রাইভেট কার কিংবা সিএনজিতে। যেখানে উন্নত পুুঁজিবাদী দেশগুলোতে পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সেখানে আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ দাবি করেও পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রেখেছি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দিনে দিনে তা প্রকট হচ্ছে। আমাদের জাতীয় বাজেটে এমন কোনো প্রস্তাব নেই যাতে গণপরিবহন ব্যবস্থা সুলভ হতে পারে। এ জন্য যে বিনিয়োগ সুবিধা দরকার, সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। যদি আমরা এ পথে অগ্রসর হই, জাতীয় সঞ্চয়েও তার প্রভাব পড়বে। অনেক অনেক নারী-পুরুষ ব্যক্তিগত যানবাহন ছেড়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে শুরু করলে পারিবারিক ও জাতীয় সঞ্চয় বাড়বে।
দুঃখের বিষয় যে অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও তার বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের ধারেকাছেও নেই। যেমন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের সড়ক পথ, বুড়িগঙ্গা নদীর নাব্যতা বাড়ানো, রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ এবং রেল যোগাযোগের প্রসার। এসব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে তার প্রধান কারণ অর্থের অপ্রতুলতা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ-আয়োজনের অভাবও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু কেন হলো না, সে বিষয়ে সরকার জনগণের কাছে সঠিক তথ্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। ত্রুটি কোথায় ছিল এবং তার নিরসনে যে পদক্ষেপ নেওয়া হলো দাতারা কেন তাতে সন্তুষ্ট হলো না? এটি ছিল আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের বৃহত্তম আর্থিক প্রকল্প। স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ না পেলে এ ধরনের প্রকল্প লাভজনক হয় না। মালয়েশিয়া বা অন্য দেশ থেকে বেশি সুদে ঋণ নেওয়া হলে তা পরিশোধের জন্য টোলের হার বাড়াতে হবে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে নামমাত্র সুদে ঋণের কারণেই টোলের হার কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। এ বছরের বাজেটে পদ্মা সেতু খাতে ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ধরনের বরাদ্দ রাখা হলে ২০ বছরের বেশি সময় দরকার হবে সেতু নির্মাণে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলেই ফেলি। বড় বড় প্রকল্পে কেবল সরকারি নিরীক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কি-না, বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হয়েছে কি-না_ এসব দেখার জন্য স্বাধীন সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। আমাদের বোধকরি তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো শক্তিশালী উন্নয়ন কর্মসূচি মূল্যায়ন কমিশন দরকার, যার কাজ হবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পর্কে সরেজমিন মূল্যায়ন শেষে অভিমত প্রদান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান উন্নত দেশগুলোতে রয়েছে। তারা সরকার ও গণমাধ্যমকে পর্যালোচনার ফল জানাবে। এমনকি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পগুলোর বিষয়েও এ দুটি সংস্থার স্বাধীন মূল্যায়ন টিম রয়েছে, যারা বোর্ডে সরাসরি প্রতিবেদন পাঠায়।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রসঙ্গে উদ্যোগ নেই, সেটা বলেছি। সরকার নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি যা এতক্ষণ যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলো তা দূর করায় সহায়ক হতে পারে। শুধু তাই নয়, তারা চলতি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথভাবে চলার ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এখন দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেই। ফলে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নত না হলে দুই দিক থেকেই জনগণের সমস্যা। বর্তমানে স্বনিয়োজিত ও মজুরিভিত্তিক_ এই দু’ভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মজুরিভিত্তিক কাজে সরকারের তেমন উদ্যোগ নিতে হয় না। এটা করে বেসরকারি খাত। যেমন কৃষি। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ভালো। কৃষি মজুররা দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করে। শহর এলাকায় নির্মাণ খাতে কাজ মেলে এবং মজুরির হার ভালো। স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। কৃষি খাতের মতো এ ক্ষেত্রেও দুই দশক ধরে চলছে নীরব কর্মযজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নামে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু অযাচিত উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়, যা স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ গ্রামীণ ব্যাংক এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গত বছর সরকারের তদন্ত কমিটি এবং এ বছর তদন্ত কমিশন গঠন। এর ফলে অন্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো কিছুটা হলেও ভীত হয়ে পড়তে পারে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সম্মান ও মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে এই নাগরিক আশঙ্কা বাদ দিলেও স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের বৃহত্তর তাগিদ থেকে এ বিষয়টি তুলে ধরছি। আশ্চর্যের কথা এই যে, যে আর্থিক সংস্থার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই সেখানে যখন অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে_ এর বিপরীতে সরকারি ঋণদানকারী যেসব সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্য প্রকৃতই ঝুঁকিতে তাদের জন্য কোনো কমিটি-কমিশন সরকার গঠন করছে না। আশির দশকে মন্দ ঋণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সে সময়ে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। এখনকার অবস্থা তখনকার তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে, এমন প্রবণতা লক্ষণীয়। এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এক. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শ্রেণীবদ্ধ ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এর মধ্যে যৎসামান্য নগদ আদায়_ ১০ শতাংশ বা তার কম। বাকি সবটাই পুনঃতফসিল। এ ক্ষেত্রে নিয়ম যেখানে সর্বোচ্চ তিনবার করার, সেখানে ৮-১০ বারও করা হচ্ছে। এতে করে তারল্য সংকটের কারণে নতুন ঋণগ্রহীতার কাছে তহবিল পুনঃচক্রায়িত করা যাচ্ছে না। এ ধরনের পুনঃতফসিলের কারণে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকখানি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দুই. যেসব ঋণ গত কয়েক বছরে দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ উৎপাদনমুখী খাতে দেওয়া হয়েছে কি-না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কতটা দেওয়া হয়েছে তার মূল্যায়ন কোনো সরকারি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না। এ জন্য কোনো কাজ হচ্ছে বলেও এ মুহূর্তে জানা নেই।
তিন. সরকারি এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক হিসেবে যারা রয়েছেন তাদের অনেকের পেশাগত ব্যাংকিংয়ের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, রাজনৈতিক পরিচয়ই মুখ্য। এটাও লক্ষণীয় যে, যখন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ তহবিলের জন্য অর্থ সংকটে ভুগছে সেখানে নতুন করে কোন বিবেচনায় কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হলো। এর পেছনে দৃঢ় অর্থনৈতিক যুক্তি মেলে না। যুক্তি মিলত যদি এসব ব্যাংক এমন কোনো খাতের জন্য নির্দিষ্ট থাকত কিংবা নতুন কোনো ফিন্যান্সিয়াল প্রডাক্ট বাজারে আনত_ যেমন : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণ, আদিবাসী, চর এলাকা কিংবা স্থানীয় সরকারের জন্য অর্থায়ন। অতীতে বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক কোনো না কোনো রাজনৈতিক কানেকশনে অনুমতি পেয়েছে, এটা বড় করে দেখতে চাই না। কিন্তু দক্ষতার প্রশ্ন তো তোলা উচিত।
বাজেট আলোচনায় গরিবদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসঙ্গ থাকেই। ধরে নেওয়া হবে, প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যতটা কর্মসংস্থান হবে তার বাইরে যারা থাকবে তাদের এ বেষ্টনীর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। নব্বইয়ের দশকে বাজেটে এ বাবদ জিডিপির ০.৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকত (বাজেটের ৫ শতাংশ)। এখন তা জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে (মোট সরকারি ব্যয়ের ১৬-১৮ শতাংশ)। আপাতদৃষ্টিতে এটাকে উইন উইন কৌশল মনে হতে পারে। কিন্তু কার্যত কি তাই? এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এর তিনটি কারণ তুলে ধরব। এক. এসব কর্মসূচিতে যে পরিমাণ মাসিক সুবিধা দেওয়া হয় তা অতি নগণ্য। ৩০০-৫০০ টাকার বিধবা ভাতা কিংবা অন্য কোনো হেডে সহায়তার পরিমাণ এক বা দেড় দিনের কৃষি মজুরির সমান। এতে দরিদ্রের পক্ষে মই ধরে ওপরে ওঠার সুযোগ নেই। দ্বিতীয় হচ্ছে, এ ধরনের কর্মসূচি, বিশেষ করে খাদ্যভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, যার পরিমাণ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। অনেক এলাকায় অবহেলিত জনগোষ্ঠী এসব কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে না। তৃতীয় সমস্যা যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ_ বাজেট মানেই গরিবমুখীনতা, এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে না পারা। আর্থিক বরাদ্দ না বাড়িয়েও অনেক উপায়ে দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব। যেমন খাস জমি বিতরণ। যে খাস জমি সরকারের হাতে রয়েছে তা নিয়ম অনুযায়ী ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা চাই। অনেক গবেষণায় প্রমাণিত, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় এ ব্যবস্থায় অনেক পরিবার উপকৃত হয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের বাজেট আলোচনায় যেমন অনুপস্থিত তেমনি মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ নিয়ে তাগিদ দেখা যায় না। অথচ মাত্র দুই দশক আগে আমাদের বাবা-দাদারাই তো কৃষি কাজে নিযুক্ত ছিলেন! এ ধরনের শ্রেণী বিস্মৃতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাছাড়া শহর ও গ্রামের মধ্যেও রয়েছে বিস্মৃতি। শহরের দরিদ্ররা যেন দরিদ্র নয়, তারা যেন অনুপ্রবেশকারী। গ্রামের দরিদ্রদের জন্য যা কিছু ব্যবস্থা সেসব শহরের দরিদ্রদের জন্য বন্ধ। দিনবদলের এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সরকারের কাছে এটা আশা করিনি।
একটি সাবেকী মত হচ্ছে প্রবৃদ্ধি আবশ্যকীয়, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। এখন মত বদল হচ্ছে। যে প্রবৃদ্ধি পরিবেশ ধ্বংস করে, প্রাকৃতিক সম্পদ অবক্ষয় করে সে প্রবৃদ্ধি যেমন স্থায়িত্বশীল হয় না, তেমনি তা হয় বৈষম্যবর্ধক ও জনকল্যাণ বিরোধী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তুরাগ নদ ভরাট করে নির্মাণ শিল্পের বিকাশ। হাইপোথেটিক্যালি বলা যায়, বুড়িগঙ্গা ভরাট করে শিল্প নগরী করা হলে সেটা কি মেনে নেব? বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ হলে প্রবৃদ্ধি চীনের মতো ১০-১১ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজের অকল্যাণ হতে পারে, পরিবেশের সর্বনাশ হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেটের কোথাও পরিবেশসম্মত উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলা নেই। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবেশ সহনশীল প্রবৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন সহজ নয়। এ জন্য যেমন কর প্রশাসনে গ্রিন ট্যাক্স বড় ভূমিকা পালন করবে, তেমনি পরিবেশ দূষণকারী সব নির্মাণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বন্ধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া জলবায়ু বিপন্ন এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীল জনকল্যাণমুখী প্রবৃদ্ধি প্রায় অসম্ভব।
আমাদের জন্য দুঃখের বিষয় যে একটি রাজনৈতিক সরকার উন্নয়নকে কেবল ৫ বছরের মেয়াদেই সীমিত দেখতে চায়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যতটা সুযোগ প্রথম বছরে থাকে, নির্বাচনের আগে দুই বছরে সে তাগিদ ফুরিয়ে যায়। বর্তমান সরকার প্রথম দুই বছরে মন দিয়েছে শেয়ারবাজারে কৃত্রিম তেজীভাব সৃষ্টি করে চটজলদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তড়িঘড়ি সমাধানের প্রতি। যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার তুলে ধরা জরুরি ছিল, তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় চলে যায় পেছনের সারিতে। শেয়ারবাজার ও কুইক রেন্টাল সরকারকে বিপদে ফেলেছে। তবে খেলায় এখন হাফ টাইমের বিরতি চলছে। এখনও সময় আছে, যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা এতক্ষণ তুলে ধরলাম সেদিকে মনোযোগ দিলে সরকার হয়তো ক্রমশ লুপ্ত জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ড. বিনায়ক সেন : অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক এবং গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস
অজয় দাশগুপ্ত : সাংবাদিক

প্রথম আলো বাজেট সংলাপ ২০১২-১৩: বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ১৫-০৬-২০১২
null
আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও অর্থনীতির কোনো অঙ্কই বলছে না যে তা অর্জন করা সহজ হবে।
প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘প্রথম আলো বাজেট সংলাপ, ২০১২-১৩’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। আলোচনায় অংশ নেন দেশের তিনজন বিশেষজ্ঞ। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার জন্যই এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। আলোচকেরা প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এ ছাড়া বাজেট কাঠামো এবং এর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, তিনটি অনুমান সত্য হলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই হারে প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
আকবর আলি খান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘আমরা যখন প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি, তখন কেউ কেউ বলে, সেটা নিয়ে এত কথা বলার কী আছে। বছর শেষে প্রবৃদ্ধি যা হওয়ার তা-ই হয়। আসলে এ নিয়ে কথা বলার কারণ হলো, প্রবৃদ্ধি সব সময় সরলরৈখিকভাবে আসে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব থাক আর মনা পাগলাই থাক, প্রবৃদ্ধির হার একই থাকবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, যদি তিনটি অনুমান সত্য হয়, তাহলে নতুন বাজেটে প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। সেগুলো হলো: আসছে অর্থবছরে দেশে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ২০ শতাংশ হারে কমবে এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভালো ভালো কথা বলার জন্য। এটিতে কোনো সমস্যা দেখি না। অর্থমন্ত্রী যদি ভালো কথা না বলেন, তাহলে সকলের মাঝে একধরনের নৈরাশ্য তৈরি হবে। তবে অর্থমন্ত্রীকে খেয়াল রাখতে হবে, ভালো কথা বলতে গিয়ে তিনি যেন অতিরঞ্জিত কোনো কথা বলে না ফেলেন। যদি সেটি হয়, তাহলে তিনি খেলো হয়ে যাবেন। অর্থমন্ত্রীর এবারের পুরো বাজেট বক্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে বিশ্বাসযোগ্যতার বেশ অভাব আছে।’
আকবর আলি খান বলেন, গত মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) লেখা চিঠিতে অর্থমন্ত্রী নিজেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকট প্রলম্বিত হবে বলে মত দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অর্থনীতির কিছু সংকটের কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি ও বাজেটের আকার নিয়ে আমার তেমন কোনো বিরোধিতা নেই। ঘাটতি বেশি হলেই একেবারে আসমান ভেঙে পড়বে না। আবার উচ্চাভিলাষী বাজেট—এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একমত নই।’
সাবেক এই অর্থসচিব আরও বলেন, ‘আমাদের যে অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার, তার জন্য বড় বাজেটই বরং দরকার। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি। এই ঘাটতি অর্থনীতির বড় নিয়ামক। আমি যদি দেখি সহজে ডলার ধার পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে আমি বলব ১০-১২ শতাংশ বাজেট ঘাটতিও কোনো বিষয় নয়।’
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অনেক সরকারি কর্তাব্যক্তি বলেন, “আইএমএফের ঋণ নিয়েছি তাতে সমস্যা কী। ব্যাংকের কাছ থেকেও আমরা ঋণ নিই।” কিন্তু আমি বলি, আইএমএফ ব্যাংকও না, হাসপাতালও না। সেখানে তারাই যায়, যারা ইনটেনসিভ কেয়ারে থাকার উপযুক্ত। অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির সংকট দূর করতে যে ডাক্তারের (আইএমএফ) কাছে গেছেন, তিনি বলেছেন, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আমাদের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। তিনি এও বলেন, সরকার তো আমাদের কথা শুনে না। তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের কথা না শুনে যদি আইএমএফের কথাগুলো ঠিকমতো শুনে, সেটিও মঙ্গলজনক হবে। আমরাও চাই আইএমএফের সঙ্গে করা চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হোক। সেটি হলে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি পাব।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের বিষয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে বড় সমস্যা, সময়মতো টেন্ডার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া। চার মাসের সময় দিয়ে টেন্ডার যদি চার মাসে সম্পন্ন করা না যায়, তাহলে কোনো ভদ্রলোকই ব্যবসা করতে আসবেন না।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আকবর আলি বলেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে দু-তিন কোটি মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাকি ১২ কোটি হয়তো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কিছুটা খাপখাইয়ে নিতে পারে।
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বাজেটের বিভিন্ন দিকের প্রাক্কলনে সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বব্যাংক বলেছে আগামীতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার বলছে, ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই, যেখানে তিন বছর ধরেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহও সন্তোষজনক নয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, আগামীতে জনপ্রশাসনে এমন কী বিপ্লব হয়ে যাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সুশাসন ও বিভিন্ন সংস্কারের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজ অবশ্য বলেন, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়-ব্যয় ইত্যাদিতে বাংলাদেশ ভালো করেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রতি দশকে এক শতাংশ করে। প্রতি সাত বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ এবং প্রতি ২১ বছরে তা আট গুণ হওয়ার উদাহরণ অনেক দেশই তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পক্ষেও এ রকম অর্জন করা অসম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন। তিনি বলেন, গত দুই দশকের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির প্রবণতাকে বিবেচনায় নিলে তা ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ হওয়াই যথেষ্ট ছিল। তবে আগামীতে তা যদি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
বৈদেশিক সাহায্য প্রসঙ্গে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘২০০৬ সালে কিন্তু সাহায্য বেশ এসেছিল। হঠাৎ করে কী হলো। এখন আমাদের মধ্যেই হতাশার সুর যে আগামীতেও এ সাহায্য খুব বেশি আসবে না।’ বিনায়ক সেনের প্রশ্ন, ‘এটা কি পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়টি প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার কারণে, নাকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সবকিছুই গোলমেলে লাগছে।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বিনায়ক সেন বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়িত না হওয়ার কোনো যোগাযোগ নেই। দুর্নীতিবাজ আমলা হলে বরং শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করত। কারণ, কাজ হলেই না হয় কিছু পাওয়া যায়।’ এ বিষয়ে বিনায়ক সেন বলেন, আমলারা কি ইংরেজি বোঝেন না, না দাতাদের ভাষা বোঝেন না—প্রশ্ন তোলা যায়। তবে এই যদি কেন্দ্রীয় সরকারের বাস্তবতা হয়, বাস্তবায়নের দায়িত্ব বরং স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়।
দেশে অদ্ভুত এক রাজনৈতিক দর্শন কাজ করছে মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার কথাটি কি এখন শুনতে পান? এখন তো সবই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী।’ অবকাঠামো বলতে শুধু সড়ক অবকাঠামো বোঝানো হয়ে থাকে—এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিনায়ক সেন বলেন, ‘অথচ যেকোনো ভালো শহরের বৈশিষ্ট্য হলো এমন গণপরিবহন থাকা, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে শহরে এসে কাজ সেরে আবার তাঁরা শহরের বাইরে চলে যেতে পারেন।’
খেলাপি ঋণ দুই থেকে তিনবার পুনঃ তফসিল করা যেতে পারে, ১০ থেকে ১২ বার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফল কী, প্রবাসী-আয়ের সুফল সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না—এসব বিষয় উল্লেখ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের ফলে কী পরিবর্তন হয়েছে বা দেশের উন্নয়নে এসব প্রতিবেদন কীভাবে অবদান রাখছে, তা নিয়ে গবেষণার তাগিদ দেন বিনায়ক সেন।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। সঞ্চালক ছিলেন বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন। এ ছাড়া প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, উপসম্পাদক আনিসুল হক, প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহিছ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।