[তুমুল গাঢ় সমাচার ৬] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৬

[গত সংখ্যার পর]

৫.

তবে ষাটের দশকের কবিতার প্রগতিপন্থা অন্যভাবেও সংক্রমিত হয়েছিল। পঞ্চাশের যুগেই বাম-প্রগতিশীল ধারার সাথে জাতীয়তাবাদী ধারার অন্তর্লীন যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে। সেটা বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে ষাটের দশকে। এই যোগাযোগ রাজনৈতিক আন্দোলনে যেমন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও ক্রমশ এক নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে থাকে। বাম-প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মী-সংগঠকদের পক্ষ থেকে সচেতনভাবে ‘জাতীয়তাবাদী’ ধারার প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী ধারার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা অগ্রগণ্য ছিলেন, তাদের মধ্যে শামসুর রাহমানের নাম প্রথমেই চলে আসবে। বাম-প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা শামসুর রাহমানের সাথে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন, প্রেরণা জোগাতেন, কোনো বিশেষ দিবস বা উপলক্ষে বাংলার এই প্রতিভাবান কবি যাতে কবিতা লেখেন, সে সম্পর্কে সচেতন প্ররোচনা ছিল তাদের।

যে কোনো কারণেই হোক, ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইতে শামসুর রাহমানের প্রসঙ্গ আসেনি। এর একটি কারণ হতে পারে, পঞ্চাশের দশকের কবি হিসেবে তার অভ্যুদয়। তবে ঘনিষ্ঠ বিচারে শামসুর রাহমানকে ছাড়া ষাটের কবিতায় আধুনিকতার নির্মাণ ও পুনর্জাগরণের বিষয়টি আলোচনা করা প্রায়-অসম্ভব। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। সে হিসেবে, বাংলা কবিতার ষাটের দশক তার হাত দিয়েই শুরু। বস্তুত, ষাটের দশকেই বের হতে থাকে সাড়া-জাগানো তার একের পর এক কাব্যগ্রন্থ :রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৬), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮) ও নিজ বাসভূমে (১৯৭০)। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় লেখা ‘বন্দীশিবির থেকে’ (১৯৭২) থেকে পেছনে ফিরে গেলে দেখা যাবে যে গোটা ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি-সংগ্রাম তার কবিতার মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে গ্রন্থিত হয়ে এসেছে। রৌদ্র করোটিতেই তিনি লিখেছেন ‘লালনের গান’; রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন কবিতা যখন তার গানকে বেআইনি করা হয়েছে; ভাষা আন্দোলন ও বাংলা কবিতার অভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যকে সমর্থন করে লিখেছেন বিধ্বস্ত নীলিমার ‘বাংলা কবিতার প্রতি’; আয়ুব শাহীর স্বৈরাচার শাসনের ছায়ায় লিখেছেন নিরালোকে দিব্যরথের ‘সকল প্রশংসা তার’; রাজনৈতিক দমন-পীড়নকে মনে রেখে লিখেছেন ‘টেলেমেকাস’; গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে লিখেছেন নিজ বাসভূমের এক ঝাঁক প্রতিবাদী কবিতা- ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’, ‘পুলিশ রিপোর্ট’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘ঐকান্তিক শ্রেণীহীনা’, ‘কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি’, ‘কবিয়াল রমেশ শীল’, ‘কী যুগে আমরা করি বাস’, ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’, ‘এ যুদ্ধের শেষ নেই’, অথবা ‘আমি কথা বলাতে চাই’। ষাটের দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম শামসুর রাহমানের অন্তরঙ্গে-বহিরঙ্গে যেমন অনুভবযোগ্য পরিবর্তন এনেছিল, তেমনি এসব আন্দোলন-সংগ্রাম নিছক রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার মধ্যে আটকে না থেকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আইডেনটিটি বা আত্মসত্তা খুঁজে পেয়েছিল তার ও তার সহযাত্রীদের কবিতা-গানের মাধ্যমে।

এইসবই পুরোনো, বহু-চর্চিত প্রসঙ্গ। রাজনীতি ও সংস্কৃতি এ দুইয়ের মধ্যে ইতিহাসের গভীর এরিয়েলে অলক্ষ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে যায়। শামসুর রাহমানের ষাটের দশকের লেখায় ক্রম-বাড়ন্ত রাজনৈতিক, এমনকি শ্রেণি-সচেতনতার যে লক্ষণ দেখতে পাই তার কারণ নিহিত ছিল সে সময়ের পরিবেশে, হাওয়ায়, এমনকি দেয়াল-লিখনে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা বুঝি স্পষ্ট হয়। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে কবির সাথে দেখা হলে আমি বলি যে আমার বহুদিনের ইচ্ছা যে তিনি যেন সেজার ভায়েহোর একটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ভায়েহোর কোন কবিতাটির কথা বলছেন? কবিতাটির নাম শুনে তিনি বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে বললেন, আপনি হয়তো জানেন না, এই কবিতাটির আদলে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম ষাটের দশকেই, আমার নিজ বাসভূমে কাব্যগ্রন্থে সেটি আছে। অস্বীকার করব না যে আমি কিছুটা পরিমাণে চমকে উঠেছিলাম। ষাটের দশকের কবি-সাহিত্যিকেরা যারা এ দেশের নব-জাগরণের অধ্যায় নীরবে সৃষ্টি করেছিলেন তাদের পঠন-পাঠনে কোনো খামতি ছিল না। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী সৃষ্টির সাথে তাদের যেমন পরিচিতি ছিল, প্রগতিবাদী সাহিত্যের সাথেও তাদের যোগসূত্র ছিল নিবিড়। পেরুর কবি সেজার ভায়েহো মার্কসবাদে অনুপ্রাণিত কবি ছিলেন, ১৯২৮ ও ১৯২৯ সালে পরপর দু’বার তিনি রাশিয়ার নতুন নির্মাণ দেখতে যান, ১৯৩১ সালে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, ১৯৩৬-৩৯ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে তিনি দু’বছর সক্রিয় অংশ নেন জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনীর বিরুদ্ধে, আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের অংশ হয়ে। ১৯৩৮ সালে প্যারিসে ৪৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। আমি ভেবেছিলাম যে শামসুর রাহমানকে আমি তার সম্ভাব্য অজানা কোনো এক কবির সম্পর্কে আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিচ্ছি। অথচ প্রায় তিন দশক আগেই কবি সেজার ভায়েহো সম্পর্কে জেনেছেন; শুধু জেনেছেন নয়, তার কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের এক শ্রেষ্ঠ কবিতাও রচনা করেছেন। বাংলাদেশের ষাটের দশকের নব-জাগরণের এমনি ছিল গভীর মানবিক নির্মাণ, যা দেশ-মাটির জলে শেকড় ছাড়লেও অতিক্রম করে গিয়েছিল দেশ-কালের গণ্ডী।

সেজার ভায়েহোর কবিতাটি ছিল এ রকম :

I will die in Paris, on a rainy day
on some day I can already remember.
I will die in ParisÑ and I don’t step asideÑ
Perhaps on a Thursday, as today is Thursday, in autumn.

It will be a Thursday, because today, Thursday, setting down
these lines, I have put my upper arm bones on
wrong, and never so much as today have I found myself
with all the road ahead of me, alone.

Ceasar Vallejo is dead. Everyone beat him
although he never does anything to them;
they beat him hard with a stick and hard also

with a rope. These are the witnesses :
the Thursdays, and the bones of my arms,
the solitude, and the rain, and the roads… I will die in Paris, on a rainy day
on some day I can already remember.
I will die in Paris and I don’t step aside
Perhaps on a Thursday, as today is Thursday, in autumn.

It will be a Thursday, because today, Thursday, setting down
these lines, I have put my upper arm bones on
wrong, and never so much as today have I found myself
with all the road ahead of me, alone.

Ceasar Vallejo is dead. Everyone beat him
although he never does anything to them;
they beat him hard with a stick and hard also

with a rope. These are the witnesses :
the Thursdays, and the bones of my arms,
the solitude, and the rain, and the roads…

বিষণ্ণ, অতি-ব্যক্তিক, অমোঘ পরিণতির দিকে ধাবমান, কবি-জীবনের সায়াহ্নকালীন এই উচ্চারণ তরুণতর শামসুর রাহমানের হাতে পড়ে এক অন্য রূপ পেয়েছিল। ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিবেচনা’ কবিতাটির অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি (পাঠক, পুরোটা পড়ে নেবেন, এই ভরসা রাখি) :

‘সেদিনও কি এমনি অক্লান্ত ঝরঝর বৃষ্টি হবে এ শহরে?

ঘিনঘিনে কাদা

জমবে গলির মোড়ে সেদিনও কি এমনি,

যেদিন থাকব পড়ে খাটে নিশ্চেতন,

নির্বিকার, মৃত?

আলনায় খুব

সহজে থাকবে ঝুলে সাদা জামা। বোতামের ঘরগুলো যেন

করোটির চোখ, মানে কালো গহ্বর। জুতো জোড়া

রইবে পড়ে এক কোণে, যমজ কবর। কবিতার

খাতা নগ্ন নারীর মতোই চিৎ হয়ে

উদর দেখিয়ে

টেবিলে থাকবে শুয়ে আর দেয়ালের টিকটিকি

প্রকাশ্যেই করবে সঙ্গম।

যেদিন মরব আমি, সেদিন কি বার হবে, বলা মুশকিল।

শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?

যেবারই হোক,

সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা

না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে, পথঘাট,

পুণ্যবান শবানুগামীরা বড় বিরক্ত হবেন।’

এই সাক্ষাতের আরও কিছুকাল পরে- ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে, এ দেশেও বাম-প্রগতিশীল মহলে নানা জিজ্ঞাসার টানাপড়েন দেখা দিয়েছে- কবির সাথে তার শ্যামলীর বাসায় দেখা হয়েছিল। এসব ভাঙন, বিলুপ্তিবাদ, অস্থিরতা কবির ভালো লাগেনি। বেশ জোরের সাথেই অনুযোগ করেছিলেন, ‘এখন তো আর পার্টির থেকে কেউ আমার কাছে আসে না। আগে তারা কত আসতেন, আমাকে দিয়ে তারা কত কবিতা লিখিয়েছেন। সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে।’

৬.

এবার বোধহয় উপসংহারের দিকে যাওয়া চলে। এই প্রবন্ধটিতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইটিকে উপলক্ষ করে ষাটের দশকের কবিতা প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চেয়েছি। প্রথমত, বলার কথা ছিল এই যে, ষাটের দশকে রাজনৈতিক আন্দোলন তথা আমাদের জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম এমনিতেই সফলতা পায়নি। ‘আন্দোলন’ যে ‘মুক্তি-সংগ্রামে’ পরিণত হয়েছিল তার পেছনে যেমন অর্থনীতিবিদদের গড়া ‘দুই-অর্থনীতি’ শীর্ষক বৈষম্যের তত্ত্ব যুক্তি-ভিত্তি জুগিয়েছিল ষাটের দশকের শিল্প আন্দোলন, বিশেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার আন্দোলনও কাজ করে থাকবে। আধুনিক বাংলা কবিতার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক নব-জাগরণের ধারার সাথে যুক্ত হয়েছিল। ষাটের দশকের ‘রেনেসাঁ’ ছাড়া আমরা বিশ্বতালে তাল রেখে চলা শিখতে পারতাম না, আমাদের সেই বিরল আত্মবিশ্বাসটুকু আত্মস্থ হতো না যেটি না আসলে একটি সংগ্রামরত জাতি জগৎ-সম্মুখে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, যেমন পারে না একটি অর্বাচীন বালক ভাব প্রকাশের ভাষাহীন হয়ে সৃষ্টিশীল হতে, শত মেধা থাকা সত্ত্বেও। ষাটের দশকের কবিতার ভুবন, তার শিল্পলোক, সেই বালকটিকে এক মেধাসম্পন্ন জাগতিক সম্ভাবনার একটি আত্মনির্ভর পাটাতন দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে একটি জাতি-নির্মাণের স্বপ্ন দেখা যায়।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৫] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৫

[গত সংখ্যার পর]

বলেওছিলাম তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে, এ নিয়ে লিখতে। তিনি আগ্রহের সাথে তার অনন্যসাধারণ উচ্চারণে গাঢ় কণ্ঠে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন তার ‘আপনারা জানেন’ কবিতাটি। এর ফর্ম নিয়ে মৌলিকত্বের দাবি ছিল তার :

আপনারা জানেন
মহামতি প্লেটো কী বলেছেন…
দার্শনিক কান্ট কী বলেছেন…
হেগেল কী বলেছেন…
মহামতি বুদ্ধ কী বলেছেন…
দেকার্তে কিংবা
বেগর্স কী বলেছেন…
বার্ট্রান্ড রাসেল কী বলেছেন…
হোয়াইটহেড কী বলেছেন…
জীবনানন্দ দাশ কী বলেছেন…
বুদ্ধদেব বসু কিংবা বিষ্ণু দে কী বলেছেন…
কী বলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ!
কী বলেছেন কবিকুল চূড়ামণি মাইকেল!
আপনারা জানেন
ঈশ্বরের পুত্র যিশু কী বলেছেন…
ইউরিপিডিস কিংবা সফোক্লিস কী বলেছেন…
মিশেল ফুকো কী বলেছেন,
দেরিদ্দা কী বলেছেন
কী বলেছেন পিকাসো
কিংবা পল এলুয়ার!
এই গ্রন্থের মহাপুরুষেরা কে কী বলেছেন
আপনার সবাই জানেন। এখানে বক্তৃতা আমার উদ্দেশ্য
নয়, আমি এক নগণ্য মানুষ, আমি
শুধু বলি :জলে পড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন

আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, একদিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার কবিতার আলোচনা করার সময় আমাদের শহীদ কাদরী পড়তে বলেছিলেন। বাংলা কবিতায় আবেগের প্রবল উত্তাপ ও আতিশয্য, এখানে তির্যক ভঙ্গিতে বলার মতো শক্তি, স্যাটায়ার-এর সংহত ক্ষমতা প্রায় দুর্লক্ষ্য। শহীদ কাদরী সেই দুর্লভতমদের একজন। এটাই ছিল স্যারের বক্তব্য। ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’র তির্যক কবিতাগুলোকে মনে রেখেই তিনি এ কথা বলেছিলেন। তখন আমার মনে হতো যে, বহিরঙ্গে স্যাটায়ার থাকলেও ভেতরে ভেতরে শহীদ কাদরী সময়ের সাথে আরও বেশি নিঃসঙ্গ বেদনাহত সমাজের ক্ষত সারিয়ে তোলা যায় এমন পঙ্‌ক্তিমালায় সংহতি খুঁজছিলেন। হয়তো জাগরণের পরেই আসে মোহভঙ্গের পর্ব, আমাদের জাতীয় জীবনেও এটা পর্বান্তর ঘটেছিল। যে-বই থেকে নিজের প্রিয় কবিতাটি বেছে সেদিন পড়েছিলেন তার পাতায় কিছু লিখে দিতে অনুরোধ করায় শহীদ কাদরী লিখেছিলেন- ‘এই নশ্বর গ্রহ থেকে একদিন সব স্বাক্ষরই মুছে যাবে- মনে রেখো।’

৪.

আলোচনার বাইরে থেকে গেল আরও অনেক কবি-সাহিত্যিকের রচনা- মহাদেব সাহা, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, অরুণাভ সরকার, হায়াৎ মামুদ প্রমুখ। যেমন বাইরে থেকে গেল ষাটের দশকের চলতি সাময়িকীর প্রসঙ্গ। একুশে উপলক্ষে যেসব পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বার হতো তার মধ্যে সমাজ-বদলের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অনেক কবিতা ও গদ্য-রচনা থাকত। সেসব লেখাও পরোক্ষভাবে ষাটের দশকের নব-জাগরণে সাহায্য করেছিল। এই দশকের স্বল্পায়ু কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ‘লিটল ম্যাগাজিন’গুলোর মধ্যে ছিল সাম্প্রতিক, স্বাক্ষর, না, কালবেলা ও বক্তব্য। সংক্ষিপ্ত অথচ সংকেতবাহী নাম-সংবলিত এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত ইতিহাস-গবেষকদের বা বর্তমানকালের সাহিত্য-পাঠকদের কাছ থেকে যথাযথ মনোযোগ লাভ করেনি। এসব পত্রপত্রিকা থেকে শ্রমে-নিষ্ঠায় সেরা লেখাগুলো বাছাই করে খণ্ডে খণ্ডে এক সময় সংকলন বের হবে- এটা আশা করা অন্যায় নয়। একই রকমের প্রত্যাশা ছিল ‘একতা’ পত্রিকার বিষয়েও। এই পত্রিকার পাতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে সত্তর ও আশির দশকে, পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে যার সংকলন হওয়া জরুরি। এসব সংকলনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নব-জাগরণের ‘প্রগতিবাদী’ ধারার একটি সমৃদ্ধ ছবি ফুটে উঠবে। আগামী দিনে বাম-প্রগতিশীল ধারার বিকাশের জন্যও এটি জরুরি।

ষাটের দশকে এই ভূখণ্ডে একজন ‘কমিটেড’ সমর সেন, দীনেশ দাস, সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কেউ ছিলেন না। এরা সবাই জীবনের বড় সময়জুড়ে বামধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, এ দেশের গদ্যের ভুবনে একজন শহীদুল্লা কায়সার সৃষ্টিশীল ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত জেলে বসে লেখা তার ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসটি ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয়। শ্রেণি-সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িকতা, সামন্ততান্ত্রিক প্রথার বিরুদ্ধে নারীর বিদ্রোহ- সব মিলিয়ে সংশপ্তক উপন্যাসটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পটভূমি অলক্ষ্যে নির্মাণ করে দেয়। শহীদুল্লা কায়সার সরাসরিভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ভাই জহির রায়হানও একই আদর্শে প্রাণিত হয়েছিলেন এবং সাহিত্য রচনা করেছিলেন, যদিও তার প্রতিভা পূর্ণতা পেয়েছিল শিল্পকলার সেলুলয়েড মাধ্যমেই। তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করতে সাহায্য করেছিল চলচ্চিত্রের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমে। অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ-চেতনার ধারায় প্রেরণা এসেছিল প্রথাগত বাম-গণতান্ত্রিক ধারার বাইরের অস্তিত্ববাদ থেকেও। আমি এই সূত্রে বিশেষ করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচনাবলির কথা উল্লেখ করতে চাই। অস্তিত্ববাদের ভেতরের এক বিশেষ ধারা- আলবেয়ার কাম্যুর থিওরি অব অ্যাবসার্ড ওয়ালীউল্লাহকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। ওয়ালীউল্লাহর লেখায় গদ্যকে সামনে এগিয়ে দিয়ে পিছু পিছু হাঁটে কবিতা এবং এক মোহাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করে। ‘চাঁদের অমাবস্যা’র সূচনা-পর্বেই আলবেয়ার কাম্যু ভর করেন এ দেশের নব-জাগরণের নিঃশব্দ উত্থানের ওপরে। ‘যুবক শিক্ষক’ (যার নাম পুরো উপন্যাসে জানা যায় না) বাঁশঝাড়ের মধ্যে রাতের আলো-অন্ধকারে একটি যুবতী নারীর অর্ধ-উলঙ্গ মৃতদেহ দেখতে পায় এবং দৃশ্যটি দেখে সে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়ে :’যুবক শিক্ষক জ্যান্ত মুরগি-মুখে হাল্ক্কা তামাটে রঙের শেয়াল দেখেছে। বুনো বেড়ালের রক্তাক্ত মুখ দেখেছে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট মহামারী-হাহাকার দেখেছে, কিন্তু কখনও বিজন রাতে বাঁশঝাড়ের মধ্যে যুবতী নারীর মৃতদেহ দেখে নাই। হত্যাকারী দেখে নাই। সে ছুটতেই থাকে।’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ চল্লিশের দশকে সিপিআই-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সংশপ্তকের মার্কসীয় শ্রেণি-সংগ্রামের সাথে চাঁদের অমাবস্যার ফ্রয়েডীয় সাইকো-অ্যানালাইসিস মিলেমিশে গিয়ে পূর্ব বাংলার গদ্য-সাহিত্যের দৃষ্টিশক্তিকে প্রসারিত করে দিয়েছিল। যার ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে নির্মিত হতে পেরেছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ অথবা হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’র মতো উপন্যাস।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা শহীদুল্লা কায়সার উভয়েরই প্রগতিশীল মার্কসবাদী ভাবাদর্শের নিরিখে মানস-জমিন আগে থেকে তৈরি করা ছিল। তারা যেটা গদ্যে পেরেছিলেন, সেভাবে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে ষাটের কবিতার ভুবনে সমাজ বদলের কাব্য লিখতে খুব বেশি কেউ সক্রিয় ছিলেন না। রণেশ দাশগুপ্ত তার ‘আধুনিক বাংলা কবিতার প্রগতিতে বাংলাদেশের ধারা’ নিবন্ধে হুমায়ুন কবির ও নিয়ামত হোসেনের উল্লেখ করেছেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’র যুবতীর মৃতদেহের মতোই হুমায়ুন কবির ‘করালী বেহুলা’ কবিতার লখিন্দরের মৃতদেহকে পড়ে থাকতে দেখেন :

‘নিথর চাঁদের রাত হরিদ্রাভ চাঁপার আকাশ

বণিক বণিতা ঘুমে জাগে একা কল্লোলিনী প্রেম

সোনার বরণ তনু ক্ষয়ে যায় বিষের ছোঁয়ায়

তখন হঠাৎ হায়! হায়, প্রাকৃত নারী কতবার হতভাগ্য হবে।!’

ষাটের দশকেই ‘কুসমিত ইস্পাত’-এর কবি হুমায়ুন কবির অনায়াসে বলে ওঠেন :

‘কলার মান্দাসে আজ বেহুলা ভাসে না বুঝি

শরীরী আগুন তার দেহ; করাল রূপালী নারী

আগুনের তরঙ্গে ফোঁপায়, বুঝি ঝড় উঠে আসে।

চম্মক নগরে থাকি বৃদ্ধ চাঁদ বণিক আমরা

বেহুলা বলয়ে শোন- খোঁজ সেই কুটিল নাগিনী

ছিন্নভিন্ন হত্যা করো, দগ্ধ করো, বিষময় দেহ।’

রণেশ দাশগুপ্ত সঙ্গত কারণেই তার নিবন্ধে উপ-শিরোনাম দিয়েছেন- ‘একটি অসমাপ্ত পর্যালোচনা’। এর কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের নব-জাগরণে প্রগতিবাদী ধারার সম্যক মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমে চাই এর সংকলন। তিনি ১৯৮৯ সালে এ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা এখনও প্রাসঙ্গিক :

‘বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের আধুনিক প্রগতির কবিতার ধারাটাকে বোঝার জন্য চাই সমস্ত কবিতার সমাবেশ বা সমারোহ। চাই অন্ততপক্ষে সংকলন। … বাংলাদেশের কবিদের বই একটি-দুটি করে বেরোতে শুরু করে সাধারণত ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এর আগে এবং পরে প্রথিতযশা কবিদের লেখাও বেরিয়েছে প্রধানত ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর রবিবাসরীয় পৃষ্ঠায় অথবা সাধারণভাবে অনিয়মিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় কিংবা বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাব্যপত্রে অথবা একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শহীদ স্মরণিকায়। … বাংলাদেশের কবিতার জগতে রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রাম একটি আবহ গড়ে দিয়েছে, যাতে প্রথিতযশারা এবং উদীয়মানেরা হাতে হাত রাখতে ভ্রূক্ষেপ করেন না।’

রণেশ দাশগুপ্ত এর পর গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছিলেন ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘আধুনিক কবিতা’, সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিষ্ণু দে সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের কবিতা এক স্তবক’ এবং জুলাই ১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দুর্গাদাস সরকার ও সনাতন কবিয়াল সম্পাদিত ‘গ্রাম থেকে সংগ্রাম’ সংকলন গ্রন্থের। এই শেষোক্ত সংকলনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এ দেশের ‘মহিলা-কবিদের কবিতা-সংগ্রহ’। এর থেকে অবশ্য ষাটের দশকের কবিতার প্রগতিবাদী ধারা সম্পর্কে সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় না, কেবল আমাদের ঔৎসুক্য আরও বেড়ে যায়।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৪] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৪
[গত সংখ্যার পর]

৩. নব-জাগরণের ভাষা ও শহীদ কাদরী

শহীদ কাদরীকে আমি ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থের প্রসঙ্গ তুলে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তার ষাটের দশকের কবিতায় অবক্ষয়ের, যুদ্ধের, মড়কের, দাঙ্গার প্রভৃতি বিপর্যয়ের যত উল্লেখ, তা কতটা পরিমাণে সমকালীন বাস্তব দ্বারা চিহ্নিত, নাকি সেটা নিতান্তই তার কল্পনাপ্রসূত? নব-জাগরণের অকৃত্রিমতা বোঝার জন্য এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া জরুরি।

‘উত্তরাধিকার’-এর একেকটি কবিতা ধরে ধরে কবি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ-দাংগা অবক্ষয়-বোধ ষাটের দশকের নয়, এগুলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। উদাহরণত, নাম-কবিতায় তিনি স্মরণীয় করে লিখেছেন :

জন্মেই কুকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে-
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন
দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রক্তচক্ষু সেই ব্লাক আউট আঁধারে।

এখানে সন্ত্রস্ত শহর, ব্লাক আউট আধার প্রভৃতি শব্দ ষাটের দশকের ঢাকাকে বোঝাচ্ছে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার দীপহীন রাত্রিকে নির্দেশ করছে। অনেক যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারী ও মন্বন্তর সূচিত শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে শহীদ কাদরী শ্রান্ত-ক্লান্ত কলকাতা থেকে উদ্ভিন্নযৌবনা ঢাকা শহরে এসে পা রাখলেন। দেশভাগের পরিণামে এক প্রকার উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল তাকে। এর ফলে যেসব কবিতা বেরিয়েছিল তাকে নিছক কবির ‘মনোজাত নাগরিক বিকলাঙ্গ জীবনজগতের সন্ধান’ (জনৈক সমালোচকের উক্তি তুলে ধরছি) বলে চিহ্নিত করলে পুরোটা বলা হয় না। দেশভাগের ফলে উন্মূল উৎপাটিত খসড়া জীবনের কষ্টটা তাতে চাপা পড়ে যায়। উদ্বাস্তু জীবন থেকেই উদ্বাস্তু মনের উদ্ভব। তাই তিনি ‘নপুংসক সন্তের উক্তি’ কবিতায় বলেছেন :

‘কেন এই স্বদেশ সংলগ্ন আমি, নিঃসঙ্গ উদ্বাস্তু,
জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা,
আঁধার টানেলে যেন ভূতলবাসীর মতো, যেন
সদ্য, উঠে আসা কিমাকার বিভীষিকা নিদারুণ!
আমার বিকট চুলে দুঃস্বপ্নের বাসা? সবার আত্মার পাপ
আমার দুচোখে শুধু পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমার মত লেগে আছে
জানি, এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর গোধূলীর যে বংশজাত আমি
বস্তুতই নংপুসক, অন্ধ, কিন্তু সত্যসন্ধা দুরন্ত সন্তান।

একে কেবল স্যাড জেনারেশন, হাংরি জেনারেশন, ষাটের অবক্ষয়বাদী কবিতার ধারা বলে শনাক্ত করা চলে না। এর একটি আশু তাৎপর্য এই যে, অবক্ষয়বোধের পেছনে শুধু হই-চই, শুধু প্রথাগতকে অস্বীকার করে তারুণ্যের স্বাক্ষর রাখার তাগিদ ছিল না। এর পেছনে রাষ্ট্র-সমাজজীবনের বিপর্যয়ের যোগসূত্র ছিল। ইতিহাসের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েই তবে লেখা সম্ভব ছিল ‘উত্তরাধিকার’-এ :

‘-এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা
এবং আমাকে নিস্কপর্দক নিষ্ফ্ক্রিয়, নঞর্থক
করে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা!’

আগেই বলেছি, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এক গভীর দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ অবক্ষয়ের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। কিন্তু দেশ-ভাবনাকে নিয়েও খেলেছিলেন তারা ছন্দে-উপমায় চিত্রকল্পে-সংকেতে। এর একটা বড় কারণ ছিল ষাটের কবিদের মধ্যে প্রবল সমকালীনতাবোধ। ষাটের দশকে শুধু ছয়-দফা আন্দোলনই নয়; ১৯৬৮ থেকে শুরু করে ফ্রান্স, আমেরিকা, চেকোশ্নোভাকিয়া, সারা বিশ্বেই ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল। ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল; চে গুয়েভারা মারা গেলেন বলিভিয়ায়, রবার্ট কেনেডি নিহত; নিক্সন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন। সত্তর সালের জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু হলো পূর্ববাংলার অসংখ্য মানুষের। আর সে বছরই নির্বাচনে জয় পেল শেখ মুজিবের দল, সেই মুজিব যিনি পান্নালালের গান ভালবাসতেন-‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।’ এসবের প্রভাব এসে পড়েছিল কবিতার স্বগত উচ্চারণেও। শহীদ কাদরীর ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’ এর উদাহরণ :

সংবাদপত্রের শেষ পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসেছে
এক দীর্ঘ সাঁজোয়া-বাহিনী
এবং হেডলাইনগুলো অনবরত বাজিয়ে চলছে সাইরেন।
একটি চুম্বনের মধ্যে সচিৎকার ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,
একটি নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুস্কালে
৬০,০০০,০০ উদ্বাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল
লাফিয়ে উঠলো এই টেবিলের ‘পর;
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুখাদ্যের ধোঁয়া
কেননা এক বাচাল বাবুর্চির
সবল নেতৃত্বে
আর সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে
আমাদের সচ্ছল কিচেনে
অনর্গল রান্না হ’য়ে চলেছে আপন-মনে
নানা ধরনের মাংস-
নাইজেরিয়ার, আমেরিকার, সায়গনের, বাংলার
কালো, শাদা, এবং ব্রাউন মাংস।

সমসাময়িক জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এই তীব্র সচেতনতা ষাটের অবক্ষয়-পেরুনো জাগরণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, সে যুগে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি ছিল গর্বের সাথে ধারণ করার মতো একটি শিরস্ত্রাণ। সেটি যত-না মাওবাদ বা সোভিয়েতের কারণে (১৯৬৮ সালে চেকোশ্নোভকিয়ায় গিয়েছিল রুশি ট্যাংক- সে স্মৃতি তখনও তাজা) তারচেয়ে বেশি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প খোঁজার তাগিদে। প্রায় একই সময়ে ইন্দিরার কংগ্রেস, ভুট্টোর পিপিপি আর মুজিবের আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রকে তার অন্যতম আত্ম-পরিচয় হিসেবে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই পরিবর্তন মাও সে তুং-এর ‘রেড বুক’-এর কারণে হয়নি। ষাটের দ্বিতীয় ভাগের কবিতায় সমাজ-চেতনা সে ধরনের বোধে প্রধানত চালিত হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, পাকিস্তানে ‘বাইশ পরিবার’-এর উত্থান প্রভৃতি অনুষঙ্গ ৬-দফাকে ১১-দফায় পরিণত করতে সাহায্য করেছিল। এই অর্থনৈতিক চেতনা কবিতার বলয়ে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে থাকবে। এক অসহায় বিপর্যস্ত মানবিক বোধে ষাটের কবিরা সমাজ-পরিবর্তন ও সাম্য-ধারণার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে দাঁড়ালেও সে তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ছাড়তে চাননি। শহীদ কাদরী লিখেছেন :

চুলের চটুল অহঙ্কার সহনীয় নয় কোনো সুধীমণ্ডলীর কাছে
অতএব খাটো হতে হবে তাকে,
সমাজের দশটা মাথার মতো হতে হলে, দশটা মাথার মতো
অতএব বেঁটে হ’তে হবে তাকে
তবু সে আমার চুল
অন্ধ
মূক ও বধির চুল মাস না যেতেই
আহত অশ্বের মতো আবার লাফিয়ে উঠছে অবিরাম

শুধু শহীদ কাদরী নন; এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সামষ্টিক কল্যাণ কামনা অনায়াসে সহাবস্থান করছিল ষাটের দশকের প্রায় সব কবির মানসে-কবিতায়।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। ষাটের প্রতিনিধিত্বশীল কন্ঠ হিসেবে শহীদ কাদরীর আলোচনা কতদূর সঙ্গত? এটা তো সবারই জানা যে, শহীদ কাদরীর সাথে ছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের একদার গভীর বন্ধুত্ব, যা গড়ে উঠেছিল পঞ্চাশের দশকেই। তারপরও শহীদ কাদরীকে আলোচনায় টেনে আনা। কেননা, তিনি উভয় দশকেই তার পদচ্ছাপ রেখেছিলেন। ষাটের তরুণ ও তরুণতর কবিকুলের আড্ডায়-এমনকি সত্তরের দশকেও প্রবাসের পথে পাড়ি দেওয়া পর্যন্ত- তার ছিল নিয়মিত উপস্থিতি। এমনকি এসব আড্ডার অনেকাংশে তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। ষাট দশককে যদি জাগরণের পর্ব বলি, তাহলে সে সাংস্কৃৃতিক উত্থানের নিঃসঙ্গ যুবরাজ তিনি। এ নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষ্য তুলে ধরছি :

‘উদ্দাম বলিষ্ঠ প্রাণশক্তি নিয়ে নাইল ভ্যালিতে আসত আরও একজন, শহীদ কাদরী-আমাদের সবার বিস্ময় ও মোটামুটি কেন্দ্রীয় আকর্ষণ।… বিশ শতকী ইউরোপীয় আধুনিকতার ও ছিল প্রায় মূর্ত-প্রতীক। পড়াশোনায় ও চেতানজগতে সেই আধুনিকতাকে ও ধারণ করত। প্রথম ষাটের অনেক তরুণ-লেখকের আধুনিকতার চেতনা অনেকখানিই ওর হাত থেকে পাওয়া। আমাদের দলের কেউ ছিল না ও, কখনো হয়ওনি তা, কিন্তু যাকে ঘিরে নাইল ভ্যালির আসর সবচেয়ে উদ্দাম আর ভরাট হয়ে থাকত সে ঐ শহীদ।… কেবল ষাটের লেখকদের নয়, পঞ্চাশ-ষাটের প্রায় সব লেখকের মূলবিন্দু ছিল শহীদ। ওর বলিষ্ঠ মাদকতাপূর্ণ আকর্ষণ সবাইকে ওর দিকে টেনে নিত। আমাদের অগ্রজ লেখকদের থেকে শুরু করে সে-সময়কার তরুণতম লেখকটির যা ছিল সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত-সেই পশ্চিমি আধুনিকতার উন্মূল মনোভঙ্গি, নিঃস্বতা, বোদলেয়ার বা আমেরিকার বিটনিক সম্প্রদায়ের বেহিশেবি বোহেমিয়ান জীবনযাত্রা, কাম্যুর উপন্যাসের বহিরাগত মানুষ বা এলিয়টের ফাঁপা মানুষ- সবকিছুকে নিজের ভেতর ধারণ-করা এক রহস্যময় মানুষ ছিল ও।… ওর কোনো দল ছিল না। ও ছিল একা। নিজের নিঃশব্দ একক দলের একচ্ছত্র অধিপতি।’

ষাটের রেনেসাঁর এই যোগ্যতম প্রতিনিধির মৃত্যু হয় প্রবাসেই, যদিও তখনও তিনি স্বদেশকে একটি অঙ্গুরীর মতো নৈকট্যে রেখেছিলেন। মৃত্যুর বছর কয়েক আগে নিউইয়র্কে তার বাসগৃহে এক দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল তার সাথে মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চা, হাক্সলির দ্য ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে। মিশেল ফুকো, জাঁক দেরিদা এবং অন্যান্য ফরাসি দার্শনিককে নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল তার। তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’-র অনেক কবিতায় সেসব বিষয় ঘুরে-ফিরে এসেছে। দেশভাগ, বোদলেয়ার, এলিয়ট, গিন্সবার্গ, অবক্ষয়-চেতনা, স্বদেশ-চিন্তা, প্রেম-অপ্রেম, কোলাহল-নিঃসঙ্গতা এসবের ভেতর দিয়ে একাকী অচেনা মাছের মতো তিনি চলছিলেন এক বৃহত্তর মানব-কল্যাণবোধে, দীপিত-তাপিত হয়ে; আমি ‘অন্য সাম্যবাদ’ বলব (যা প্রথাগত আদলের সমাজতন্ত্রের ধারণার বাইরে)।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৩] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৩

[গত সংখ্যার পর]

এসব বিভিন্ন ধারার উৎস থেকে ষাটের দশকের সাহিত্য জগতে নানামুখী প্রভাব যে অনায়াসে এসে পড়তে পারছিল, তার একটা বড় কারণ ছিল এসব উৎসের মধ্যে সম্পূরক স্ববিরোধিতা। ক্লেদজ কুসুম-এর বোদলেয়ার তরুণ বয়সে ১৮৪৮ সালের বিপ্লব-প্রচেষ্টায় অংশ নিয়েছিলেন; এই বিপ্লবে বুক বেঁধেই মার্কস-এঙ্গেলস লিখেছিলেন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। সার্ত্র-কাম্যু অস্তিত্ববাদী হয়েও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালে নাজি-অধিকৃত ফ্রান্সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং নিয়মিত ‘কমবেট’ পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন; অ্যালেন গিন্সবার্গ পারিবারিক সূত্র এবং মতাদর্শগতভাবে ছিলেন বামপন্থার দিকে ঝুঁকে : পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিনাশই তার কাম্য ছিল (যদিও তার ‘অন্য বামপন্থা’ ছিল প্রথাগত বামপন্থার বাইরে)। আমি বলতে চাইছি, ষাটের কবিতা তথা সাহিত্যলোকে অবক্ষয়ের ঋতু নেমে আসার পেছনে নানাবিধ প্রেরণা ক্রিয়াশীল থাকলেও মোটের ওপর তা সমাজমুখী চিন্তা-ভাবনার দূরবর্তী ছিল না। এবং সে কারণেই রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চাপে যখন দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছিল তখন তারা সহজেই অবক্ষয়ী নেতিবাদ থেকে সমাজমুখী ইতিবাদে চলে যেতে পেরেছিলেন। তবে এই চলে যাওয়া তাদের জন্য একমুখী উৎক্রমণ ছিল না। সমাজমুখী প্রেরণার পর্বেও তারা তাদের পূর্বের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভঙ্গি হারাননি। এ জন্যই নির্মলেন্দু গুণ লিখতে পেরেছিলেন ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’র এত দ্বিত্বতা-ধর্মী শিরোনাম; আবুল হাসান ‘রাজা যায় রাজা আসে’র মতো নির্বিকার পর্যবেক্ষণ, বা জন্ম নিয়েছিল আবদুল মান্নান সৈয়দের সাড়া-জাগানো গল্প-গ্রন্থ ‘সত্যের মত বদমাশ’ (যা ছিল ভুল কারণে নিষিদ্ধ বই তখনকার দিনে, এবং যা মিশেল ফুকোর ‘রিজিম অব ট্রুথ’কে একবারের জন্য হলেও মনে করাবে)। এই বিপরীত সন্নিপাতই রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য, যেখানে অন্তর্মুখী স্বভাব ও বহির্মুখী পদচারণা, প্রেম ও দ্রোহ, ব্যক্তিগত অবক্ষয় বোধ ও সামষ্টিক পরার্থপরতা একসাথে ক্রিয়াশীল থাকে। ষাটের প্রধান প্রধান কবি-সাহিত্যিকদের জন্যই এ কথা খাটে- ওই দশকের প্রথম পর্ব-দ্বিতীয় পর্ব নির্বিশেষে। বিপরীতের একত্র-সমাবেশ এই থিসিসকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এভাবে :

‘আমাদের প্রথম তারুণ্যকে জ্বালিয়ে তুলেছিল অবক্ষয়; এ আমাদের অনুভূতিকে তীব্রভাবে উদ্দীপিত করেছিল, কিন্তু (প্রথম যৌবনের প্রচণ্ডতায় ও অপরিণতির কারণে) একে আমরা ভালভাবে আত্মস্থ করতে পারিনি। তাই অবক্ষয় নিয়ে আমরা হৈ-চৈ করলেও এ ধারণায় আমাদের চোখে পড়ার মতো সাফল্য কম। কিন্তু জাগরণকে আমরা দেখেছিলাম কিছুদিন পরে, সামান্য একটু পরিণত বয়সে। তা ছাড়া এর সঙ্গে শৈল্পিক দূরত্বও আমাদের ছিল দ্বিতীয় লেখকদের চেয়ে বেশি। তাই ওদের চেয়ে আমরা একে আত্মস্থ করেছিলাম অনেক বেশি নিবিড়ভাবে এবং এতে আমাদের সাফল্যও হয়েছিল ওদের চেয়ে বেশি। লেখক-জীবনের সূচনায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বিশেষ করে রফিক আজাদ ছিল আমণ্ডুপদনখ অবক্ষয়ের চেতনায় প্রোথিত। কিন্তু ধীরে ধীরে গভীর দেশাত্মবোধ এবং উচ্চতর সংঘ-চেতনাকে তারা আত্মস্থ করেছিল।’

কিন্তু তার মানে কি এই যে, ষাটের দ্বিতীয় পর্বের জাতীয়তাবাদ এবং সমাজচেতনা একে একে গ্রাস করেছিল অবক্ষয়ের কবি-সাহিত্যিকদের? তারা কি হয়ে পড়েছিলেন জাতীয়তাবাদের দাস? রাষ্ট্র-ক্ষমতার জনবিচ্ছিন্ন চরিত্রকে গোড়া থেকেই কি তারা সন্দেহের চোখে দেখেননি? ‘রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট’ বলে করেননি কি প্রতিবাদ? ‘অথেনটিক’ তথা অকৃত্রিম জাগরণের একটি কুলক্ষণই হলো তার রাজশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলার ক্ষমতা। এ জন্যই রফিক আজাদ স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই অনায়াসে বলতে পারেন একই সাথে আশা ও হতাশায় বিদ্ধ স্থিতধী পঙ্‌ক্তিমালা। একগুচ্ছ বিচ্ছিন্ন উদাহরণ তার ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ (১৯৭৪) গ্রন্থ থেকে-সেসব আজও কী সাম্প্রতিক শোনায়!

যেখানে রয়েছো স্থির-মূল্যবান আসবাব, বাড়ি;
কিছুতে প্রশান্তি তুমি এ-জীবনে কখনো পাবে না।
শব্দহীন চ’লে যাবে জীবনের দরকারি গাড়ি-
কেননা, ধ্বংসের আগে সাইরেন কেউ বাজাবে না।
আমার জীবনে স্থায়ী কোন সকাল-দুপুর নেই,
সারাক্ষণ ব্যেপে থাকে- অপরাহেপ্ত-মনোধিমণ্ডলে।
সম্পূর্ণ বর্জন নয়, গ্রহণে-বর্জনে গড়ে নেই
মানুষের বসবাসযোগ্য চিরস্থায়ী ঘর-বাড়ি;
বহিরঙ্গে নাগরিক-অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক;
স্থান-কাল পরিপার্শ্বে নিজ হাতে চাষাবাদ করি
সামান্য আপন জমি, বর্গা-জমি চষি না কখনো।
অ্যাটম বোমার থেকে দু’বছর বড় এই আমি
ধ্বংস ও শান্তির মধ্যে মেরু-দূর প্রভেদ মানি না।
ক্ষীয়মাণ মূল্যবোধে, সভ্যতার সমূহ সংকটে
আমি কি উদ্বিগ্ন খুব?-উদ্বিগ্নতা আমাকে সাজে কি?
রাষ্ট্র, রাষ্ট্রনীতি, নেতা, নানাবিধ আইন-কানুন
নিয়ন্ত্রিত ক’রে যাচ্ছে যথারীতি প্রকাশ্য জীবন,
ভিতর-মহল জেঁকে বসে আছে লাল বর্ণমালা।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে;
ক্ষুুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুন-
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে;
থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।

যেজন প্রকৃত বিষাদগ্রস্ত সেই কেবল গভীর দেশাত্মবোধে আলোড়িত হতে পারে- এই ধূসর পাণ্ডুলিপি শুধু জীবনানন্দ লেখেননি। রফিক আজাদ যেমন ‘বেশ্যার বেড়াল’-এর মতো কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ‘গান হতে বলি’; নির্মলেন্দু গুণ যেমন লিখেছেন ‘হুলিয়া’, তেমনি দুর্ভিক্ষের ঘনায়মান দৃশ্যপটকে মনে রেখে ‘সর্বগ্রাসী হে নাগিণী’র বিখ্যাত সূচনা-পঙ্‌ক্তি (সঙ্গত কারণেই তার প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে পরবর্তীতে বিবেচিত হয়েছে)। আবদুল মান্নান সৈয়দ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’-এর পরাবাস্তববাদী ভুবনে বিচরণ করে অসাধারণ সব লাইন লিখে গেলেন। এই এক কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে পরাবাস্তববাদ (ও ‘জীবন আমার বোন’-এর পাস্তেরনাক) আমাদের জাগরণের সাথী হয়ে গেল। আজও যখন পড়ি চমৎকৃত না হয়ে পারি না: ‘এই রাত্রিরা বেথেলহাম-কে ব্রথেলে পরিণত করে’; ‘সিংহের খাঁচায় বসে আমি গল্প লিখছি মনে মনে’; ‘দাও আমাকে সুযোগ বিশুদ্ধ পাগল কি বিশুদ্ধ মাতাল কি বিশুদ্ধ চরিত্রহীন কি বিশুদ্ধ ভালোমানুষের’; ‘খটখটে মাটির ভিতর উনিশ বছর আমি ছিপ ফেলে বসে আছি আত্মার সন্ধানে’; অথবা ‘পাপের ভিতর গোলাপ থাকে, এমনকি শব্দের পাপেও, কবিরা যেমন’। ১৯৬৯ সালে উত্তাল দেশের পরিস্থিতিতে তিনি যখন ভাবছেন তার নিজের জীবনের পরিণতি নিয়ে, তখনও স্বদেশ সকাল বেদনার্ত উঠে আসতে দেখতে পাই। ‘জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসায়’ তাকে বলতে শুনি এভাবে :

আমি দীপহীন অন্ধকার ঘরে একা
এরি মাঝখানে নিজের আগুনে জ্বালিয়েছি লণ্ঠন আমার,
এই শতাব্দীর সন্ধ্যাকালে।
এ আঁধারে দু-হাত পেয়ালা করে
তারা-জ্বলা পানি খাবো বলে নেমে যাবো ভীষণ জীবনে।
আমার নিজের তৈরি, নিজের আগুনে জ্বালা
লণ্ঠন কি সঙ্গে যাবে? লণ্ঠন কি সঙ্গে সঙ্গে যাবে?
চিৎকারে ছুটেছি একটি কালো ঘোড়া, পরে নিয়ে
মানুষের ছদ্মবেশ; দীপ্র, সান্দ্র আত্মা বিক্রি করে
জীবনের লঘু-গুরু প্রত্যেকটি দোকানে ফিরেছি,
শরীরে ধারণ করে একমাত্র লাশের প্রচ্ছদ।

আর ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ পর্যায়ে এসে ভেঙে পড়বে পূর্বেকার সব মায়াবী আয়না। কালো ঘোড়া তখন উৎফুল্ল শাদা ঘোড়া হয়ে যাবে। তিনি বলে উঠবেন :

মন্বন্তর আমাকে এক জন্ম দিয়েছে
মহোত্থান আমাকে দ্বিতীয় জন্ম দিক
সমস্ত দৃশ্যচ্ছবি আমি ধরে ফেলি
কালো হাওয়া
সমস্ত শব্দমালা আমি ধরে ফেলি
লাল হাওয়া
আমি শূন্যে প্রোথিত হয়েও জাগ্রত রেখেছি আমার স্বপ্নের এ্যানটেনা
আমার হাত ফসকে শাদা একটি ঘোড়া বেরিয়ে গেছে প্রান্তরে
ফাল্কগ্দুনের এই দিন

সুবিদিত যে, ঐতিহাসিকভাবে পরাবাস্তবাদীদের মধ্যে দুই দল হয়ে গিয়েছিল। এক দল আন্দ্রে ব্রেতোর নেতৃত্বে ‘প্রগতিশীল’ রাজনীতির পথে পা বাড়িয়েছিলেন, ৪র্থ ইন্টারন্যাশনালের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন (এর বিনিময়ে ট্রটস্কি হাত দিয়েছিলেন ব্রেতো-রচিত সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টোর খসড়ার পরিমার্জনায়)। আরেক দল থেকে গিয়েছিলেন জাগরণবিমুখ স্ব্বপ্নের মায়াচ্ছন্নতায় (এদের কেউ কেউ ভিড়ে গিয়েছিলেন সালভাদর দালির ফ্যাসিবাদী ক্যাম্পে)। ষাটের শেষের দিকে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এমনই বিভাজন হয়তো ঘটে থাকবে প্রথম ষাটের চন্দ্রাহত কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে। আদিতে পরাবাস্তববাদে আক্রান্ত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন সময়ের সাথে সাথে আরও সমাজমনস্ক থিমের মধ্যে ঢুকে গেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্য পরিবর্তনটা সাময়িক হলেও তার সমগ্র কাব্যচর্চার জন্য এটি যে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়-ফেরা, তা এখন বির্তকের ঊর্ধ্বে।

এক-অর্থে, ‘কণ্ঠস্ব্বর’-এর প্রথম সংখ্যার ম্যানিফেস্টো ধারার উচ্চারণ ও তৃতীয় সংখ্যার ম্যানিফেস্টো ধারার উচ্চারণের মধ্যে একটি বিপরীতমুখী ভাবের প্রকাশ দেখতে পাই। প্রথম ধারার উচ্চারণে ছিল শুধু শিল্প-তাড়িতদের কথা: ‘যারা সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী’ তাদের মানবিক শৈল্পিক স্বীকৃতির প্রচ্ছন্ন তাগিদ ছিল সেই আহ্বানে। ‘কণ্ঠস্বর’ তৃতীয় সংখ্যায় পড়ি অন্যরকম (যদিও একটি আরেকটিকে অস্বীকার করে না) প্রেরণা :’যারা জীবনকে অনুভব করতে চান শত তলে, শত পথে, বিঘ্নিত রাস্তায়; আঙ্গিকের জটিলাক্ষরে, চিন্তার বিচিত্র সরণিতে; কটু স্বাদে ও লোনা আঘ্রাণে, সততায়, শ্রদ্ধদ্ধায়, বিস্ময়ে অভিভূতিতে ও পাপে; মহত্ত্বে ও রিরংসায়; উৎকণ্ঠায় ও আলিঙ্গনে’ সেই তরুণদের ডাক দেওয়া হবে সেখানে। এই পরিবর্তনটা ঘটেছিল সমাজ-রাজনীতির পালাবদলের হাত ধরেই। এক্ষেত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নিজের ব্যাখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ :’ষাটের দশকের বিপুল সামষ্টিক উত্থান এবং গণজোয়ারের মুখে এই জাতির সমস্ত ব্যক্তিগত বিবেচনা যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল তখনও আমাদের ধারার লেখকদের ভেতর জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি ব্যক্তিক মনোভঙ্গি এবং অনিকেতের চেতনা নিবিড়ভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’কে আমি এর একটি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। ষাটের প্রায় প্রতিটি লেখকের লেখাতেই এই ব্যাপারটা কমবেশি ঘটেছে।’

এক হিসেবে, এটা বিতর্কাতীত বিষয় হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত বিবেচনা ও সামষ্টিক বোধ- এ দুইয়ের মধ্যে কোন অলঙ্ঘ্য দেয়াল কল্পনা করা যায় না। ফ্রয়েড ও মার্কস উভয়েই পুঁজিবাদকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন, যে রকম জাক লাকাঁ ও মিশেল ফুকো। ব্যক্তিগত বেদনা ও সামষ্টিক ক্ষোভ এদের প্রতিতুলনা চলতে পারে কেবল সীমিত অর্থে ও পরিসরে ঘোরতর স্তালিনবাদী না হলে সবাই স্বীকার করবেন যে, মান্দেলস্টাম (যিনি গুলাগ বন্দিশিবিরে প্রাণ হারিয়েছিলেন) ও মায়াকোভস্কি (যিনি বিপ্লবকে কবিতায় ধারণ করেছিলেন) উভয়েই জলে-পড়া পিঁপড়েদের ডাঙায় তুলতে চেয়েছিলেন। আখমাতভাকে কি এক পর্যায়ে ‘বুর্জোয়া ডেকাডেন্সের’ অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হয়নি? তাহলে বিশেষভাবে ষাটের প্রথম ভাগের কবি-সাহিত্যিকদের কেন অবক্ষয়বাদী বলে চিহ্নিত হতে হবে এবং নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে? এই প্রেক্ষিতে আমি শহীদ কাদরীর পালাবদলকে বাড়তি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাই।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

১. ‘ভালবাসার সাম্পান’

নিস্তরঙ্গ ষাটের দশকের সূচনাপর্ব। ঢাকা তখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষায় এক ‘মনোরম মনোটনাস’ শহর। দোর্দণ্ড প্রতাপে সে সময়ে শাসন করছেন জেনারেল আইয়ুব খান। ১৯৫৮ সালে জারি হয়েছে তার সামরিক শাসন। এর ফলে কিছুকালের জন্যে হলেও প্রচণ্ড অবসাদের ঘুম নেমে এসেছে পূর্ব পাকিস্তানে। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এসব স্মৃতি ততদিনে অনেকটাই ফিকে। যেন প্রচণ্ড কোনো আঘাতে কুঁকড়ে গেছে পূর্ব বাংলার বিদ্রোহী সত্তা। পাকিস্তানের তৃতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনা চলছে, আর সেই সাথে চলছে শ্রীবৃদ্ধির আয়োজন। পরিকল্পনা কমিশনের তরুণ অর্থনীতিবিদ পাকিস্তানের মাহবুব উল হক লিখছেন বই দ্য স্ট্র্যাটেজি অব ইকোনমিক প্লানিং, যেখানে তিনি প্রবৃদ্ধি বেগবান করার জন্য কেন আপাতত অসম আঞ্চলিক উন্নয়ন দরকার, তার যুক্তিজাল বিস্তার করবেন। অস্থির উত্তাল পঞ্চাশের প্রথম ভাগের পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ সে সময় এক ধরনের সুস্থিতির পর্যায়ে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। দেশের সেরা ছাত্ররা যোগ দিচ্ছেন লোভনীয় সিভিল সার্ভিসে, ‘সিএসপি’র কাতারে। অন্যরা ব্যস্ত মধ্যবিত্ত জীবনের সাথে মানানসই কোনো চাকরি পাওয়ার খোঁজে। গুটিসুটি পাখা মেলছে এক ক্ষীণকায় বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণি- ইপিআইডিসি কর্তৃক অর্থায়িত কল-কারখানাকে কেন্দ্র করে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে তখন বন্ধ্যা সময়। যেন ব্যর্থ হয়েছে ১৮৪৮ সালের ইউরোপের আন্দোলন-সংগ্রাম, ফ্রান্সে গেড়ে বসেছে লুই বোনাপার্টের দুঃশাসন, প্রতিক্রিয়ার আঘাতে অবশ অপুষ্পক পরিবেশ চারদিকে। অবধারিত চক্রে বিপ্লব-প্রয়াসের পর নেমে এসেছে পুনরুজ্জীবনের কাল। অচিরেই নিষিদ্ধ হবে রবীন্দ্রনাথের নাটকের মঞ্চায়ন, এমনকি তার গানের প্রচার। একটা ভালো কবিতা লেখার জন্য তখন সংগ্রাম করতে হবে, একটা ভালো গল্পের জন্য জীবনক্ষয়ী যুদ্ধে নামতে হবে, এমন দমবন্ধ পরিস্থিতি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর রাজনৈতিক অর্থনীতি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

‘ষাটের দশকে আমাদের সমাজে অবক্ষয় এসেছিল দুটি পর্যায়ে। প্রথম ঢেউটি এসেছিল শ্বাস-চেপে-ধরা সামরিক নিগ্রহের হাত ধরে।… ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২-র মধ্যে ঘটেছিল মূল ঘটনাটি, যদিও এর জের চলেছিল একাত্তর অব্দি। …এর পরেরটা এসেছিল সামরিক স্বৈরশাসনের উপজাত হিশেবে। সামরিক শাসনের দম-আটকানো ও নিরানন্দ পরিবেশকে আইয়ুব খান পুষিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সমাজজীবনে অবাধ ও জবাবদিহিতাহীন বিত্তের সচ্ছল ও কল্লোলিত স্রোতধারা বইয়ে দিয়ে। অর্থ সংগ্রহের জন্য উন্নত দেশগুলোর দরজায় দরজায় ধরণা দিয়ে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। হঠাৎ-আসা সেই সুলভ বিপুল ও অনোপার্জিত বিত্ত সমাজজীবনের বন্দরে-বন্দরে রজতধারায় সচ্ছল ঢেউ জাগিয়ে তোলে।

আমাদের জাতির সুদীর্ঘ জীবনে বিত্তের পদপাতের ঘটনা এই প্রথম। বিত্তের দাঁতাল লোভ জাতির সুপ্ত চেতনার ভেতর থেকে জেগে উঠে এই সময় হয়ে ওঠে উদ্দাম। বর্বর অবাধ অলজ্জ অপরিমেয় রজতলিপ্সার সামনে ধসে পড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দীর ভেতর থেকে গড়ে-উঠে এই সমাজের নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের দৃঢ়প্রোথিত ইমারত। সবরকম ন্যায় নীতি হাস্যকর, অর্থহীন ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে।… নতুন অর্জিত মুদ্রার সঙ্গে নতুন অর্জিত পাপ এসে প্রবেশ করে সমাজজীবনে।’

এরকম একটি পরিবেশে কতিপয় সাহিত্য-পাগল যুবক কবিতা-প্রবন্ধ-গল্পের ভুবনে দুদ্দাড় প্রবেশ করেন। তাদের দীপ্তিমান সৃষ্টিশীলতা দিয়ে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন যে তাতে করে সেদিন শুধু নক্ষত্রলোকেই তাৎক্ষণিক ঝড় ওঠেনি, মর্ত্যলোকেও জাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল, যার নিকটতম তুলনা কেবল হতে পারে রেনেসাঁ বা নবজাগৃতি (রেনেসাঁর ‘বুর্জোয়া’ চরিত্রের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই বলছি)। পঞ্চাশের দশকে যার শুরু, কিন্তু গোটা ষাটের দশকজুড়েই যার বিরতিহীন চর্চা চলেছে পতনে ও উত্থানে, অবক্ষয়ে ও বিদ্রোহে, স্ব্বাক্ষরে ও বক্তব্যে, এক বিচিত্রবিধ কণ্ঠস্বরে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তোলে। ষাটের প্রথম ভাগের রচনাগুলিকে তাই শুধু অবক্ষয়ের পাঠ হিসেবে দেখা চলে না, যেমন চলে না ষাটের দ্বিতীয় ভাগের রচনাগুলিকে কেবল বিদ্রোহের চিহ্ন হিসেবে। আধুনিক কবিতার জনক শার্ল বোদলেয়ারের মধ্যে যেমন তাপ ও সন্তাপ, অবক্ষয়ী স্খলন ও অক্ষয় উত্থান পাশাপাশি কাজ করেছিল, তেমনি ষাটের সব পুরোধা কবি-সাহিত্যিকর ক্ষেত্রেই এটা সামগ্রিকভাবে খাটে।

এই প্রবন্ধে আমি আরো যেটা প্রচ্ছন্নে বলার চেষ্টষ্টা করেছি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দুটি ভিন্ন যুক্তি-তর্ক আলাদাভাবে ষাটের দশকে উঠেছিল। একটি হচ্ছে, পাকিস্তানি কাঠামোর বিরুদ্ধে পরস্পর-বিরোধী দুই অর্থনৈতিক সত্তার দ্বন্দ্ব, যাকে আমরা ‘দুই-অর্থনীতি’ শীর্ষক বৈষম্যের যুক্তি হিসেবে পাঠ করেছি। ষাটের দশকের গোড়া থেকেই এই যুক্তি নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান প্রমুখ বাঙালি অর্থনীতিবিদের লেখা থেকে দানা বাঁধতে শুরু করে। এটাই শেষে পরিণতি পায় ৬-দফার দাবিসমূহে; ষাটের দশকের মধ্যভাগে। পাকিস্তানি স্ব্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পূর্ব বাংলার রেনেসাঁর জন্য দুই-অর্থনীতি শীর্ষক থিসিস ও তৎসংলগ্ন বৈষম্য-চেতনা ছিল একটি মূল স্তম্ভ্ভ। দ্বিতীয় যুক্তিটি হচ্ছে, পাকিস্তানি কালচার গড়ার অবিরাম প্রয়াস ভেঙে একটি আধুনিক বাঙালি মননশীলতার মাথা তোলা, যা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে কখনো উদাসীন মাটির পিদিমের মতো, কখনো স্বেচ্ছাচারী বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল ষাটের রচনাকর্মে, বিশেষ করে সে যুগের কবিতার শরীরে। অর্থশাস্ত্রের বৈষম্য-সংবেদনশীলতা ও কবিতার আধুনিকতা এই দুটি দূরবর্তী জগতের অলক্ষ্য যোগাযোগে সৃষ্টি হলো সেই অনুপম মুহূর্তের, যাকে আমরা প্রকৃতই ‘আমাদের আধুনিকতা’ বলে দাবি করতে পারি। এই আধুনিকতা একান্তভাবেই আমাদেরই সৃষ্টি; কোনো ইউরোপের ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বা এমনকি উনিশ শতকের বাংলায় রেনেসাঁ তথা পুনরুজ্জীবনবাদী আধুনিকতার সাথে এর চরিত্র বা গতি-প্রকৃতি মেলে না। ষাটের দশকের সেদিনের তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকরা যে-আধুনিক বোধের সূচনা করে গিয়েছিলেন তার আয়োজন ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক অসাম্যের যুক্তিতে পূর্ববাংলার জাগরণ সংঘটিত হতো না এবং সেপথ বেয়ে স্বাধীনতা শব্দটিও আমাদের করায়ত্ত হতো না। সময়ের এই গ্রন্থি থেকে দাঁড়ালে ষাটের প্রথম দিককার কবিতা-গদ্যের ভুবনের অবক্ষয়কে আর অবক্ষয় বলে মনে হয় না; বরং প্রতীতি হয় সামন্তবাদী সমাজের বিপরীতে অবক্ষয়-পেরুনো এক নিঃসঙ্গ আর্ত-দীর্ণ পথ-পরিক্রমা বলে। একইভাবে, ষাটের দ্বিতীয় ভাগের কবিতা ও গদ্য রচনাকেও নিরবচ্ছিন্ন সমাজমনস্ক বিপ্লব-অন্ব্বেষী প্রচেষ্টা বলে মনে হয় না; মাঝে মাঝেই ধরা পড়ে তার আত্ম-অনুকম্পাপ্রবণ মায়া-জাগানো শোকগ্রস্ত অন্তর্মুখী স্বভাব। এভাবেই রাষ্ট্র্রনৈতিক অন্যায় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্বারা আহত অবক্ষয়ী মন পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়িয়েছে সত্তরে বা একাত্তরে। এভাবেই ষাটের কাব্যভুবন গভীর সমাচার সৃষ্টি করেছে, জন্ম দিয়েছে এক পরিশীলিত আধুনিক মনের, যা একটি মুক্ত সংস্কৃতির পূর্বশর্ত। এই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃৃতিক চেতনার ভিত্তিতেই আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর সংবিধানের কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এটাই এই প্রবন্ধের মূল কথা, যার পূর্বাভাস প্রথম পেয়েছিলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালবাসার সাম্পান’ শীর্ষক স্মৃতিচারণায়। পড়ে সচকিত, দীপিত, উজ্জীবিত হয়েছিলাম। আমার সরাসরি শিক্ষক তিনি। তাঁকে ঘিরে তাঁর প্রিয় ষাটের দশককেই শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো এই লেখার মাধ্যমে।

২. অবক্ষয় ও জাগরণ :বৈপরীত্যের একত্র-সমাবেশ

ষাটের প্রথম ভাগের অবক্ষয়-চেতনা যে দ্বিতীয় ভাগে এসে সমাজ-রাজনীতি বোধে দীক্ষিত-তাড়িত হতে থাকে, সেটি ছিল খুব স্বাভাবিক পালাবদল। আবদুল মান্নান সৈয়দ পরবর্তী সময়ে বহিঃপৃথিবীর এই অনুপ্রবেশ সম্পর্কে এভাবে লিখেছেন বাহাত্তরে এসে :’আমার কবিতায় বহিঃপৃথিবী আর-কখনো এতো প্রবলভাবে প্রবেশ করেনি। … এক-হিশেবে এ এক তীব্র মোড়-ফেরা।’ এরই পরিণতিতে আমরা পেলাম ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ :স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরার আনন্দ ও গৌরব সেখানে যতিচিহ্নহীন গদ্যকবিতার অতিব্যক্তিক চিত্রল ছন্দে ‘পাথর প্রহত হঠাৎ-উচ্ছ্বসিত ঝরনাজলের মতো’ বেজে উঠেছিল। এই উচ্ছ্বাস শুধু তার ক্ষেত্রেই ঘটেনি, এ ধরনের আবেগকে ধারণ করেছিলেন ষাটের অবক্ষয়ের সব একদা-সারথীই। এর চিহ্নসমূহ ক্রমেই পরিস্ম্ফুুট হচ্ছিল ষাটের দ্বিতীয় ভাগ থেকেই। ‘কণ্ঠস্বর’ এবং ছয়-দফা ষাটের মধ্যভাগে প্রায় এক-বছরের ব্যবধানে জন্মায়। এটাকে কেবল হতাশ থেকে আশাবাদে উত্তরণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে সামষ্টিক জাতীয়তাবাদে পালাবদল বললে সবটা ধরা পড়ে না। জাগরণের জন্য প্রথমে এক সর্বব্যাপী অবক্ষয়-বোধের প্রয়োজন ছিল। নানাভাবে এই যুক্তিটিকে আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি।

প্রথমত, পুঁজিবাদী আধুনিকতা তথা আধুনিকতা-বোধের সাথে ‘উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার’ একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মার্কস একে ‘এলিয়েনেশন’ বলেছিলেন, আমাদের কবিকুল এই জনম-একাকিত্বকে অলজ্জিত নিনাদে প্রকাশ করেছিলেন মাত্র। নিজ দেশে তারা ‘বহিরাগত’ বলে নিজেদের মনে করেছিলেন- এই ভাবটি আধুনিক বিচ্ছিন্নতার নানা উৎসের কথা মনে করায়। কাম্যুর আউটসাইডার কি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে প্রভাবিত করেনি এবং সেই সূত্রে ‘বহিরাগত’ ভাবটি কি অস্তিত্ববাদের সূত্রেই প্রতিফলিত হয়নি ষাটের দশকে-মানসে? অন্যদিকে, অ্যালেন গিন্সবার্গ, গ্রেগরি করসো ও তাদের সহচরেরা যখন পঞ্চাশের-ষাটের পটভূমিতে আর্তরব করে উঠলেন, সেই বিটনিকদের আন্দোলন সরাসরি প্রভাব ফেলে থাকবে ষাটের কবিতায় (ষাটের দশকের শুরুতে গিন্সবার্গ কলকাতায় আসবেন, কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে তার, আর কৃত্তিবাসের সাথে কণ্ঠস্বর গোষ্ঠীর, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের লালন সম্পর্কেও কবিতা লিখবেন তিনি)। অপর দিকে, বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা বিত্তহীন অন্তঃসারশূন্য বিমর্ষ এক পৃথিবীকে নতুনভাবে মেলে ধরেছিল ষাটের কবিদের সামনে। বিভিন্নমুখী উৎস থেকেই ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার’ শিল্প-প্রেরণা বা প্ররোচনা এসেছিল সেদিন- এটাই আমি বলতে চাই। সেখানে মার্কসের পাশাপাশি বোদলেয়ার, সার্ত্র-কাম্যুর অস্তিত্ববাদী দর্শন থেকে জাঁ ককতো ও গিন্সবার্গ সবাই ছিলেন। সেখানে গোড়া থেকেই জীবনানন্দ ও রবীন্দ্রনাথও ছিলেন (আজ মনে হয়, ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’-এর রবীন্দ্র-বিরোধিতা ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো করে পাওয়ার চেষ্টা-সেটা ক্রমপ্রকাশ্য হয়েছিল-বিশেষ করে তার গানের ভুবনকে কেন্দ্র করে)। শহীদ কাদরী যেমন লিখেছিলেন আদি প্রত্যুষেই, ‘আমাদের চৈতন্যপ্রবাহে তুমি ট্রাফিক আইল্যান্ড’-রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল