
Category Archives: Non-Fiction
প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি সাম্প্রতিক বিতর্ক
তারিখ: ১০-০৬-২০১১
বিশেষভাবে এ বছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাড়তি সংশয় জানানোর কোনো কারণ নেই। এ নিয়ে অবশ্য সিপিডিসহ প্রকাশ্যে সংশয় ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। সবকিছুই বলা হচ্ছে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে। বাস্তবতা হলো, যাঁরা বলছেন প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭, আর যাঁরা বলছেন ৬ দশমিক ৩ বা তারও কম—উভয়ের কাছেই পূর্ণাঙ্গ উপাত্ত নেই। সে উপাত্ত আসবে আরও কয়েক মাস পর, তখন পূর্ণ অর্থবছরের হিসাব পাওয়া যাবে। প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত হিসাব বর্তমানের প্রাক্কলিত হিসাবের চেয়ে তখন বাড়তেও পারে, একই থাকতে পারে, আবার কমতেও পারে। যেমন, ২০০৯-১০-এর প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার বেশি ছিল। তা ছাড়া কেবল এ বছরেই ৬-এর অধিক প্রবৃদ্ধির হার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা তো নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫-০৬-এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৬, ২০০৬-০৭-এ ৬ দশমিক ৪, এমনকি ২০০৭-০৮-এ বিশ্বমন্দার মুখেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ২। সে হিসাবে যে বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৪১ শতাংশ, আমদানির বড় অংশ হচ্ছে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি, কৃষিতে বোরো ধানে বাম্পার ফলন, আমনও খারাপ হয়নি, ক্ষুদ্র ঋণ ও বাণিজ্য ঋণের সম্প্রসারণশীল প্রবাহ ব্যক্তি খাতে গিয়েছে, সেখানে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাক্কলিত হয়ে থাকলে এত সংশয়াপন্ন হওয়ার কোনো কারণ ঘটে কি? যা-ই হোক, আবারও বলছি, প্রবৃদ্ধির হার প্রসঙ্গে চূড়ান্ত মীমাংসা করার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বৃক্ষকে দেখতে চেয়ে অরণ্যকে যেন দেখতে ভুলে না যাই। আমাদের দেশের গ্রাম ও শহরের অর্থনীতিতে, বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি খাতে গত এক দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, বরং তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে ‘রাজনীতি হচ্ছে’ (যা কেউ কেউ বলছেন) এ রকম অভিযোগ তাই ব্যক্ত করা আমার বিচারে সংগত নয়। এতে করে বিবিএসকেও খাটো করা হয়। অথচ ভারতে সিএসও বা পাকিস্তানের এফবিএসের তুলনায় বিবিএস কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই, যাঁরাই ভারতের বা পাকিস্তানের স্টেট জিডিপি বা প্রভিন্সিয়াল জিডিপি উপাত্ত নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন। সর্বোপরি পূর্ববর্তী বছরগুলোয় (বিশেষত সুতীব্র বিশ্বমন্দার ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০-এ) অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল শ্লথতর, অর্থনীতিতে তখন অব্যবহূত ক্যাপাসিটির সৃষ্টি হয়েছিল, এ বছরে এসে তা ব্যবহূত হয়েছে (যে জন্য কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে ২০১০-১১তে) সে কারণেও প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে কেন যেখানে বিনিয়োগের অনুপাত তেমন একটা বাড়েনি, সেটা শুধু এ বছরের জন্যই ‘বিশেষভাবে’ বাধা হতে যাবে কেন? বিনিয়োগের অনুপাত তো ২০০২-০৩ সাল থেকেই ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। সুতরাং এই ধাঁধার রহস্য উন্মোচন করতে গেলে কার্যত ২০০২-০৩ সাল থেকেই প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে উপাত্ত আমরা পাই, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে এবং সম্যক আলোচনা করতে হবে। শুধু সংশয় প্রকাশ করে ছেড়ে দিলে চলবে না। তা ছাড়া বিনিয়োগের হিসাবও অবমূল্যায়িত হতে পারে, কেননা, এক দশক আগের তুলনায় এখন বিনিয়োগের সিংহভাগ হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এবং এই খাতে বিনিয়োগে গত এক দশকে যে পরিমাণগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে, তা এখনো পরিসংখ্যানে যথাযথভাবে ধরা পড়ছে না।
বিনিয়োগ মোটামুটি একই পর্যায়ে থাকার পরও প্রবৃদ্ধি কেন ২০০২-০৩ সালের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০১০-১১ সালের ৬ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে, তার অনেকগুলো ব্যাখ্যা হতে পারে। যদি আমরা হ্যারড-ডোমার সরলীকৃত দুনিয়ার মধ্যেই থাকি (যেখানে সঞ্চয় ও ভৌত বিনিয়োগই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক), সেই নিরিখেও বলা যেতে পারে যে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা ২০০২-২০১১ কালপর্বে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে থাকবে। বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাওয়ার প্রধান উৎস ছিল দুটি। প্রথমত, গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত হারে স্থানান্তরিত হয়েছে শ্রমশক্তি (২০০১ সালের ২৫ শতাংশের তুলনায় বর্তমানে নগর জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে)। এই রি-লোকেশন অ্যাফেক্টের কারণে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃ িদ্ধ পাওয়ার কথা। গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে একটা বড় কারণ হলো, গ্রামের তুলনায় শহরে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেশি। শুধু মাত্রায় বেশি নয়, আমার অনুমান, শহরে শ্রমের উৎপাদনশীলতা গ্রামের তুলনায় আরও দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। না হলে এক উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী গত এক দশকে শহরে পাড়ি জমানো সত্ত্বেও নগর-দারিদ্র্য দ্রুত হারে কমে যেত না। কেউ কেউ বলতে পারেন যে গ্রাম থেকে যারা শহরে জড়ো হয়েছে, তারা অধিকাংশই এসেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, সুতরাং এখানে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে সেই ধারণা কতটা যুক্তিযুক্ত? এ পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শহরে কর্মকাণ্ডে আগের চেয়ে অনেক গতিশীলতা এসেছে, আয় বেড়েছে এবং লক্ষণীয়ভাবে দারিদ্র্য কমেছে। নগর অর্থনীতির ‘আকর্ষণীয় ক্ষমতা’ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অর্থনীতির ভেতরেও বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। আরও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সেটা যেমন ঘটেছে কৃষি অর্থনীতির ভেতরে (যেমন, বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তারে), তেমনি ঘটেছে গ্রামীণ অকৃষি অর্থনীতির ভেতরেও। এই শেষোক্ত ধারার বড় প্রমাণ হচ্ছে, গ্রামীণ অকৃষি অর্থনীতিতে পুঁজির চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। এর পরোক্ষ সমর্থন মেলে মাইক্রো-ফাইন্যান্স খাতে পুঁজির বর্ধিত জোগানের জন্য একই ব্যক্তির নানা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ (মাল্টিপল লোন) নেওয়ার প্রবণতায়। এ ধরনের ঋণের ৮০ শতাংশই নেওয়া হয়েছে আরও বেশি করে পুঁজি সংগ্রহের জন্য। তার মানে, গ্রামে মাথাপিছু পুঁজির পরিমাণ বেড়েছে এবং তা বেড়েছে আরও বেশি করে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যাওয়ার কারণে। গ্রামে এখন মজুরি-শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে এবং এক হিসাবে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত মজুরি-শ্রমিকের সংখ্যা গ্রামের মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পারিবারিক শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে মজুরি-শ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কারণে গ্রামের শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। এতে করে প্রবৃদ্ধিও বাড়ার কথা বিনিয়োগের সামগ্রিক অনুপাত একরূপ থাকা সত্ত্বেও।
২০০২-২০১১ কালপর্বে প্রবৃদ্ধির উত্তরোত্তর বাড়ার পেছনে শ্রমশক্তির বর্ধিত নিয়োজনও অনেকাংশে কাজ করে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। যেসব নারী আগে ‘ঘর-গৃহস্থালির’ অর্থনীতিতে আটকে থাকতেন, তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সরাসরি শ্রমের বাজারে অংশ নিচ্ছেন। এক দশক আগেও শ্রমের বাজারে নারীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ১৫-২০ শতাংশ, এ হার এখন ৩০-৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কৃষিতে ও অকৃষিতে, ক্ষুদ্র ঋণের (ও কিছুটা বাণিজ্যিক ঋণের) সম্প্রসারণে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে এটা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই শ্রমঘন কাজে নিয়োজিত, ফলে বিনিয়োগের অনুপাত একই থাকলেও শুধু নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণের কারণেই প্রবৃদ্ধি বেশ কিছুটা বাড়ার কথা। এ ধারা আরও বেগবান করা গেলে (পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় এ হার ৭০-৮০ শতাংশ) এ দেশের প্রবৃদ্ধির হার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজি সঞ্চয়ের বর্ধমান প্রবণতা, শ্রমবাজারে নারীর উত্তরোত্তর অংশগ্রহণ এসব প্রবৃদ্ধির ‘সরবরাহগত’ দিককে নির্দেশ করে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়ার ক্ষেত্রে ‘চাহিদাগত’ দিকও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আলোচনায় প্রায়ই আসে না সেটা হলো, এক দশক ধরে দ্রুত হারে দারিদ্র্য কমে যাওয়ার ধারা এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হারকেও বাড়িয়ে থাকবে। গোড়ার পর্বের দারিদ্র্য অবস্থা নিরসনের সঙ্গে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এটা সুস্পষ্ট। আমাদের দেশে দুই দশক ধরেই দারিদ্র্য কমছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় আমলেই কমেছে। কিন্তু দারিদ্র্য বিশেষভাবে কমেছে ২০০০-২০১০ কালপর্বে (সেটা ২০০০, ২০০৫, ২০১০ সালের দারিদ্র্য-উপাত্ত বিচার করলেই দেখা যায়)। দারিদ্র্য অব্যাহতভাবে কমার অর্থ গ্রামীণ বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্রয়ক্ষমতা এসেছে। এই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে কৃষি, কৃষিজাত শিল্প, অকৃষি পণ্য ও সেবা খাতগুলোর সম্প্রসারণ ঘটেছে সুদূর গ্রামাঞ্চলেও। ফলে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উত্তরোত্তর বর্ধমান ‘অভ্যন্তরীণ ভোগ’ (ডমেস্টিক কনসাম্পশন) প্রবৃদ্ধির এক নতুন নিয়ামকে পরিণত হচ্ছে। এ কথা এক দশক আগেও অতটা খাটত না। অর্থাৎ এই নিরিখেও আমরা দেখছি যে বিনিয়োগের অনুপাত একই থাকলেও বর্ধিত ভোগের কারণেও প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে রপ্তানি ও প্রবাসী-আয়ের পাশাপাশি ‘স্থানীয় বাজার’-এর সম্প্রসারণ আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
কিন্তু আমরা কেবল হ্যারড-ডোমার দুনিয়াতেই আবদ্ধ নেই এবং শুধু সরলীকৃত হ্যারড-ডোমার সমীকরণের নিরিখেই প্রবৃদ্ধিকে বিচার করলে চলবে কেন। ভৌত বিনিয়োগ ছাড়াও প্রবৃদ্ধির আরও দুটো প্রধান নিয়ামক হলো মানব-পুঁজির (হিউম্যান ক্যাপিটাল) গঠন ও প্রযুক্তিগত বিকাশ। মানব-পুঁজি গঠনে (শিক্ষার বিস্তারে যেমন) ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তার সুফল আমাদের এখন পেতে শুরু করার কথা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেসরকারি খাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। দুই দশক আগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার যেখানে ছিল ৪০-৫০ শতাংশ, এখন তা ৭০-৮০ শতাংশ। গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীদের পাসের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুণগত মানকে আগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই শ্রমশক্তির শিক্ষাগত মাত্রা বেড়েছে, আধাদক্ষ ও দক্ষ শ্রমশক্তির অনুপাত বেড়েছে, যার শুভ প্রভাব পড়তে বাধ্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও সেই সূত্রে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির ওপরও।
ধীরলয়ে হলেও প্রযুক্তিগত উন্নতির বিশিষ্ট অবদান (যা ধরা পড়ে ‘টোটাল ফ্যাক্টর প্রডাক্টিভিটির পরিসংখ্যানে) বিভিন্ন খাতওয়ারি প্রবৃদ্ধির মধ্যে উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। কৃষকেরা উন্নত বীজ ব্যবহার করছেন (শুধু উফশী ধান নয়, অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রেও); শিল্প ও নির্মাণ খাতে উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে; সুদূর গ্রামেও মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে তথা বিনিয়োগ সহজতর হচ্ছে। সুতরাং প্রবৃদ্ধির হার বিচারের ক্ষেত্রে একপেশেভাবে শুধু বিনিয়োগের অনুপাতের দিকে তাকানো অসংগত।
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করছে। এর প্রস্তুতি কয়েক বছর ধরেই (২০০৪-০৫ সালের পর থেকেই) চলছিল। এই কৃতিত্ব যেমন বিএনপির, তেমনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ বর্তমান সরকারের অংশেও কিছুটা বর্তায়। প্রবৃদ্ধির হার বেগবান হলে দারিদ্র্য আরও দ্রুত হারে কমে আসবে, এ নিয়েও বিতর্ক নেই। কিন্তু যে প্রশ্ন এখানে তোলা যায় সেটা হলো, প্রবৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে। যেকোনো প্রবৃদ্ধিই সমান হারে দারিদ্র্য কমায় না। না হলে গ্রোথ কমিশনের মতো এত র্যাডিক্যাল নয় এমন কমিশনও ‘ইনক্লুসিভ গ্রোথ’ আর ‘কনভেনশনাল গ্রোথ’-এর মধ্যে পার্থক্য টানত না। বাংলাদেশের জন্য উচ্চ প্রবৃদ্ধির কৌশল রচনায় একটা বাড়তি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করছে কি না। আমাদের আয় বাড়ছে, কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার মান কমে যাচ্ছে কি না পরিবেশদূষণ, পাবলিক স্পেসের (যেমন—নদী, জলাশয়, পার্ক, উন্মুক্ত ময়দান) ক্রমবিলুপ্তি এবং তীব্র যানজটের কারণে। তাই আমাদের জন্য শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়, আরও জানা প্রয়োজন ‘গ্রিন জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি কতটা হচ্ছে। পরিবেশ-বিধ্বংসী প্রবৃদ্ধি কেবল পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর তা নয়, অর্থনৈতিক সাম্যের জন্যও ক্ষতিকর। পরিবেশ ধ্বংস করে যাঁরা নতুন প্রবৃদ্ধির জন্ম দিচ্ছেন (তুরাগ নদ বা বুড়িগঙ্গা ভরাট করে নির্মাণ প্রকল্প করলে তা এক হিসেবে ‘নতুন প্রবৃদ্ধি’, অন্য হিসেবে পরিবেশের সর্বনাশ), এসব বিনিয়োগকারীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না সুশাসনের দুর্বলতার জন্য। এসব বিনিয়োগকারীর মুনাফার একটা বড় অংশ কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ, যা সমাজে বৈষম্য বাড়াচ্ছে। এসব বিনিয়োগকারীর ওপর পরিবেশের ক্ষতি করার জন্য নিদেনপক্ষে বাড়তি কর (এনভায়রনমেন্টাল ট্যাক্স) আরোপ করা উচিত। কেননা, পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির ভুক্তভোগী সবাই—ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব-নির্বিশেষে। পরিবেশ-সহনশীল বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রয়োজন। বর্তমান বাজেটের ক্ষেত্রে আমি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করব ‘জনগণতান্ত্রিক’ সমন্বিত পাবলিক র্যাপিড ও মাস ট্রানজিটের গুরুত্বের কথা। আমাদের বিদ্যমান রেলপথ, জলপথ ও সড়কপথ (যা আছে তাকে ব্যবহার করে বা এর কিছুটা পরিমার্জনা করে) আমাদের নতুন করে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। যেসব ভাবনা ইতিমধ্যেই পরিবহন-অর্থনীতিবিদেরা করেছেন বৃহৎ ও মাঝারি আকারের শহরগুলোর জন্য, তা এখনই বাস্তবায়নে নিয়ে আসতে হবে। এদিকে বাজেট কিছুটা হলেও দৃষ্টি দেবে, এ আশা করছি।
ড. বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
নাজিম হিকমতের পৃথিবী
বিনায়ক সেন | তারিখ: ০৩-০৬-২০১১
আরো দেখুন: নাজিম হিকমতের কবিতা
নির্বাসিত নাজিম
‘নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়’ এমন একটি লাইন আমাদের যৌবনের আকাশে তারকাখচিত হয়ে গিয়েছিল। অনুবাদক ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫২ সালে বেরুনো বইয়ের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন যে, যদিও বেশিরভাগ কবিতাই ইংরেজি পাঠ থেকে নেওয়া, কিছু কিছু কবিতা ফরাসি থেকেও অনূদিত। ফরাসি থেকে অনুবাদের কাজে তিনি গীতা মুখোপাধ্যায় ও (পরবর্তীতে নিম্নবর্গের ইতিহাস-খ্যাত) রণজিৎ গুহের সাহায্য নিয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতিচারণায় পড়েছি, (১৯৫১ কি ’৫২ সালে কলকাতায়, জানি না কী করে, আমাদের বন্ধু ডেভিড কোহেনের হাতে এসেছিল নাজিম হিকমতের একগুচ্ছ কবিতার ইংরেজি তর্জমা। ইংরেজি খুব উচ্চাঙ্গের নয়। তবু পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন জানা যাচ্ছে ইংরেজিতে নাজিম হিকমতের কবিতার প্রথম সংকলন বের হয় কলকাতা থেকেই—পরিচয় প্রকাশনী থেকে ১৯৫২ সালে। ইংরেজিতে এর আগে নাজিম হিকমতের কোনো কাব্য-সংকলন প্রকাশ পায়নি। কেন এ রকম একটি সংকলন আর সব জায়গা থাকতে কলকাতা থেকেই প্রকাশিত হতে হবে সেটাও খানিকটা রহস্যজনক। এর পেছনের কার্য-কারণ সূত্র এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে।
গত শতকে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলছিল ম্যাকার্থিবাদের দাপট। সর্বত্র কমিউনিজমের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন সিনেটর ম্যাকার্থি—‘আন-আমেরিকান’ কর্মকাণ্ডের জন্য হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন একের পর এক কবি-নাট্যকার-শিল্পী-বিজ্ঞানীরা। হলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও বাদ যাচ্ছেন না। এদের মধ্যে ছিলেন লেখক আর্থার মিলার, এলিয়া কাজান, লিলিয়ান হেলম্যান, হাওয়ার্ড ফাস্ট, ডরোথি পার্কার, ইরউইন শ, ল্যাংস্টন হিউজ, সাংবাদিক উইলিয়াম শীরার, গায়ক পিট সিগার, নোবেল-জয়ী বিজ্ঞানী লাইনাস পাওলিং প্রমুখ। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মুক্তচিন্তার নামে দেশদ্রোহী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এসবের মধ্য দিয়ে কার্যত তাঁরা পরিণত হয়েছেন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সমর্থকে। এ রকম বৈরী পরিবেশে কমিউনিস্ট কবি নাজিম হিকমতের অনুবাদ আমেরিকায় প্রকাশ করা সহজ ছিল না। নাজিমের অনুবাদ যাঁরা সেদিন করেছিলেন (তাঁদের নাম যথাক্রমে নিলুফার ও রোসেট) তাঁদেরকেও ছদ্মনামের আশ্রয় নিতে হয়। ফলে অনুবাদক হিসেবে ছাপা হয় আলি ইউনূসের নাম। ‘আলি’ খুবই প্রচলিত নাম, আর ‘ইউনূস’ এসেছিল ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর কবি ইউনূস এমরে-র থেকে। অনুবাদকেরা জানতেন, দরবেশ কবিকুলের মধ্যে রুমি ছাড়া এমরের কবিতা নাজিমের খুব প্রিয় ছিল। যা হোক, অনুবাদ তো হলো, কিন্তু ছাপানো নিয়ে সমস্যা গেল না। এই সময়ে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভারত থেকে আসা কিছু শিক্ষার্থী’ (ওদের নাম এখনো জানা যায়নি এবং ওদের অধিকাংশ বাঙালি হলে বিস্ময়ের কিছু নেই) নাজিমের এই অনুবাদ হাতে পান। পড়ে তাঁরা এতই বিমোহিত হয়ে পড়েন যে, এই মহার্ঘ বস্তু দ্রুত জনসমক্ষে আনার জন্য পাণ্ডুলিপির একটি অনুলিপি পাঠিয়ে দেন কলকাতায়। এভাবেই ‘পরিচয়’ প্রকাশনী থেকে (হয়তো ডেভিড কোহেনের হাত ঘুরেই) ১৯৫২ সালে ৩৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ইংরেজিতে ‘নাজিম হিকমতের নির্বাচিত কবিতা’র প্রথম সংকলন।
যেহেতু নাজিম আজীবন কবিতা লিখেছেন তাঁর মাতৃভাষা তুর্কিতে, তাঁর কবিতার অনুবাদ কিছুটা দেরিতে হলেও পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুবাদ হয়েছে রুশ ভাষায়, তার পরে ফরাসিতে এবং গত দুই দশকে সবচেয়ে বেশি হারে ইংরেজিতে। তাঁর কবিতার পাঠকের সংখ্যা ইংরেজি-জানা বৃত্তে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, তাঁর স্বদেশীয় মরমী কবি জালালুদ্দিন রুমীর মতো নাজিম হিকমতও আধুনিক ইঙ্গ-মার্কিন সাহিত্যের ভুবনে এখন একটি অতি প্রিয় নাম। অন্তত দশটি কাব্য-সংকলন, একাধিক জীবনী গ্রন্থ, স্মৃতিচারণা ও চিঠিপত্র নিয়ে নাজিমিয়ানা এখন ইংরেজিতে অনুবাদের একটি বিশেষ শাখায় পরিণত হয়েছে। নিজের কবিতার অনুবাদ নিয়ে ১৯৬১ সালের দিকে লেখা একটি কবিতায় নাজিম লিখেছিলেন, ‘তিরিশটি-চল্লিশটি ভাষায় আমার লেখা প্রকাশিত, কিন্তু আমার তুরস্কে, আমার তুর্কি ভাষায় আমার লেখা নিষিদ্ধ।’ ১৯৫১ সালের ২৫ জুলাই তুরস্কের সরকার তাঁর নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেয়। ২০০৯ সালে মৃত্যুর ৪৬ বছর পর সেই নাগরিকত্ব ফিরে পান তিনি। এখন ইস্তাম্বুলের এশিয়া অংশে চালু হয়েছে নাজিমের প্রিয়তমা স্ত্রীর নামে ‘পিরাইয়ে কাফ্যে’, খোলা হয়েছে নাজিম হিকমত আকাদেমি, সেখানে প্রতিদিন ভিড় করে সংস্কৃতিমনা সাধারণ মানুষ।
এক নিঃসঙ্গ বিপ্লবী
১৯০২ সালে তাঁর জন্ম তুরস্কের ছোট্ট শহর আলেপ্পোয়। যেখানে জন্ম সেখানে কখনো আর ফিরে যাননি। বলতেন, ‘ফিরে যেতে ভালোবাসি না আমি।’ তারপরও ফিরে গিয়েছিলেন মস্কোতে—একবার নয়, বার তিনেক। প্রথমবার ১৯২১ সালে—মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। দ্বিতীয়বার ১৯২৮ সালে—তুরস্কের গোপন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে। তৃতীয়বার ১৯৫১ সালে—জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৬৩ সালে মস্কোতেই তাঁর মৃত্যু। ঘর থেকে প্রতিদিনের মতো বের হয়েছেন সকালের পত্রিকা আনতে, পত্রিকাটা হাতে নিয়েই ঢলে পড়েন আকস্মিকভাবে। অনেক দিনের বুকের অসুখ নিয়ে এর বছর কয়েক আগেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—‘এঞ্জাইনা প্যাক্টোরিস’। ১৯২১ সালে যখন মস্কোয় পড়তে যান তখন তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর। ১৪ বছর বয়স থেকে কবিতা লিখেছেন। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘কেউ কেউ জানে উদ্ভিদ জগতের রহস্য, কেউ কেউ জানে মাছেদের ভুবন, কেউ বা জানে তারাদের নাম, আর আমি জানি সব ধরনের নিঃসঙ্গতার ভাষা।’
রেজিস দেব্রে এক সময়ে চে গুয়েভারার বলিভিয়ার অভিযানের সঙ্গী ছিলেন (এবং পরবর্তীতে হয়েছিলেন ফ্রান্সের সোশ্যালিস্ত প্রেসিডেন্ট মিতেরাঁর উপদেষ্টা)। তিনি নাজিমের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন প্যারিসে। বিশ্ব জনমতের চাপে তুরস্কের জেল থেকে তিনি সবে ছাড়া পেয়েছেন। ‘কমিউনিস্ট পার্টিতে এলেন কীভাবে’—এই প্রশ্নের উত্তরে নাজিম বলেছিলেন: ‘পার্টি করে মানুষ সাধারণত দুই কারণে। এক, তারা আসে মেহনতি শ্রেণীর থেকে। মেহনতি শ্রেণীর পার্টিতে খেটে-খাওয়া মানুষেরা আসবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার জন্য এটা প্রযোজ্য নয়। আমার পরিবার ছিল আমলাদের পরিবার (নাজিমের নানা ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর “পাশা”—সুলতানদের দরবারে এক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী)। দুই, আর পার্টিতে যারা আসে, তারা আসে বুদ্ধির তাড়নায়—বই পড়ে, চিন্তা করে, মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে। কিন্তু আমি এসেছিলাম হূদয়ের টানে। ১৯ বছর বয়সে যখন মস্কোয় যাই আমার একমাত্র ইচ্ছে ছিল লেনিনের সঙ্গে দেখা করব, দেখা করে বলা, “আপনার সাফল্যের গোপন চাবিকাঠি আমাকে বলে দিন। আপনি কী করে বিপ্লব সমাধা করলেন তার রহস্য আমাকে বলুন।” আসলে আমার ইচ্ছে ছিল, লেনিনের কাছ থেকে এরকম কোনো গোপন চাবিকাঠি পকেটে নিয়ে আমি নিজ দেশ তুরস্কে ফিরে যাব। তারপর “বিপ্লব করে” গরিবী ঘুচাব দেশের মানুষের।’ লেনিনের সঙ্গে অবশ্য সরাসরি কখনো দেখা হয়নি নাজিমের। কিন্তু ১৯২৪ সালে লেনিন যখন মারা গেলেন তখন সেই অগণন শোক মিছিলের মধ্যে তিনিও অংশ নিয়েছিলেন।
মস্কোয় থাকতেই কমিনটার্নের সংস্পর্শে গড়ে ওঠা তুরস্কের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নাজিমও জড়িয়ে পড়েন। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মুস্তফা সুফির মৃত্যু ঘটে কিছুটা রহস্যজনকভাবে দেশে ফেরার পথে সমুদ্রে জাহাজডুবি হয়ে। লেনিনের মৃত্যুর কিছুদিন পরেই ১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নাজিম ফিরে যান তুরস্কে। এরই মধ্যে তুরস্কে খেলাফতের অবসান হয়েছে, রিপাবলিক ঘোষিত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মোস্তফা কামাল (পরে আতাতুর্ক অভিধা পেয়েছেন)। কমিউনিস্টদের সঙ্গে প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি নিয়ে চলছিল আতাতুর্কের রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু সে অবস্থা অল্প দিনেই বদলে যায়। নিষিদ্ধ হয় ‘প্রগ্রেসিভ রিপাবলিকান পার্টি’ (প্রকাশ্য সংগঠন ছিল এটি বামপন্থীদের)। কমিউনিস্ট পার্টি চলে যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে। তুরস্কে ফিরে গিয়ে নাজিম প্রকাশ্যে কাজ করেছেন প্রথমে বিভিন্ন পত্রিকায়, উদ্দেশ্য—লেখালেখি। আবার গোপনে যুক্ত থেকেছেন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে—ইস্তাম্বুলে পার্টির গোপন কংগ্রেসেও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে গোপন ইশতেহার বিলির দায়ে তুরস্কের আদালত তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় আত্মগোপনরত অবস্থায়। নাজিমকে আবারও দেশ ছেড়ে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসতে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে। ১৯২৬ সালের অক্টোবরে প্রবাসে থাকাকালীনই সাধারণ ক্ষমতায় রাজবন্দীদের মামলা তুলে নেওয়া হলে এর আগেকার ১৫ বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রত্যাহার করা হয় নাজিমের ওপর থেকে। ১৯২৮ সালে নাজিম তুরস্কে ঢুকতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন, তিন মাস জেল খেটে আবার বেরিয়ে আসেন। এর পর থেকে তুরস্কেই ছিলেন তিনি কিন্তু বিরতিহীনভাবে ‘আজ গ্রেপ্তার, কাল ছাড়া আবার পরশু গ্রেপ্তার’ এরকম চক্রের মধ্য দিয়ে। এ সময়ের আতাতুর্ক শাসনের লক্ষণীয় দিক ছিল বামপন্থীদের কোণঠাসা করার পাশাপাশি আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা। য়ুরোপের অনেক দেশের আগেই ১৯৩০ সালে তুরস্কের মহিলারা পায় ভোটাধিকার, স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও পায় তারা। শরিয়াপন্থীদের সঙ্গে রিপাবলিকপন্থীদের রাজনৈতিক লড়াইও চলতে থাকে। কিন্তু নাজিমকে ক্রমাগত বিব্রত হতে হয় একের পর এক মামলায়। নাজিম নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন কি-না সেটা এখানে বিবেচ্য বিষয় ছিল না। গোপন বনাম প্রকাশ্যে কাজ নিয়ে পার্টি মধ্যে মতদ্বৈততা ছিল। নাজিম ছিলেন প্রকাশ্যে কাজের পক্ষে এবং এ কারণে ১৯৩২ সালে পার্টি থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়। কিন্তু নাজিম নিজেই ছিলেন মার্কসবাদী পার্টির জীবন্ত প্রতীক। ফলে পার্টির সদস্যপদ হারালেও তাঁর বিরুদ্ধে হয়রানি মামলা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এখন জানা যাচ্ছে যে, স্বয়ং আতাতুর্ক এবং তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুক্রু কায়া নাজিমের কবিতা গোপনে ভালোবাসতেন বলে বামপন্থী সত্ত্বেও তাঁকে দীর্ঘদিনের জন্য কারারুদ্ধ করে রাখতে চায়নি তুরস্কের সরকার। ছোট ছোট মামলায় জড়িয়ে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত রাখাই ছিল দমন-পীড়নের উদ্দেশ্য। একটি উদাহরণ দিলে রাষ্ট্রের এই কূটকৌশলটি পরিষ্কার হবে।
১৯৩১ সালের ৬ মে নাজিম গ্রেপ্তার হন লেখার জন্য; ছাড়া পান ওই বছরের ১০ মে। ১৯৩৩ সালে ১৮ মার্চ আবার গ্রেপ্তার হন লেখার কারণে। এবার রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলী সরকারকে উৎখাত করার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দাবি করে। ওই বছরের ২৯ জুলাই ছয় মাসের কারাদণ্ড পান। ওই একই বছরের ২৭ আগস্ট তাঁকে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় ব্যঙ্গ কবিতা লেখার জন্য। ১৯৩৪ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁকে দেওয়া হয় আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড সম্পূর্ণ অন্য একটি মামলায়, যদিও সেটাও লেখারই জন্য। ১৯৩৪ সালের ৪ আগস্ট রিপবালিকের এক দশক পূর্তি উপলক্ষে নাজিম আবারও সাধারণ ক্ষমায় ছাড়া পান। এসব ডামাডোলের মধ্যেই আবার তাঁর কয়েকটি কবিতা সরকারি অনুমোদনে কলেজের পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়। ইতিমধ্যে স্পেনে শুরু হয়ে গেছে ফ্রাঙ্কোবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন। এই অবস্থায় ১৯৩৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নাজিম আবারও গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামিনে ছাড়া পান। এসবের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কবিতা ছড়িয়ে পড়েছে তুরস্কের সীমানার বাইরে। সুররিয়ালিস্তরা প্যারিসে তাঁর কবিতার অনুবাদ প্রকাশ করেছে এরই মধ্যে। কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি তাঁর কবিতার ওপরে গানের রেকর্ড বের করেছে। নাজিম নিজে বিভিন্ন নাটক লিখে মঞ্চস্থ করাচ্ছেন, ফাঁকে ফাঁকে লিখছেন চিত্রনাট্য এমনকি ১৯৩৭ সালে নিজেই নির্মাণ করেছেন এক শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র ‘সূর্যের দিকে’ (এর আগে ইস্তাম্বুল সিম্ফনি ও বুর্মা সিম্ফনি নামে আরও দুটি তথ্যচিত্রও তাঁর পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে।) রাশিয়ায় তখন চলছে কুখ্যাত মস্কো শো-ট্রায়াল—লেনিনের সহকর্মী বুখারিন রাদেক, জিনোভিয়েভ কামেনেভদের বিরুদ্ধে। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে প্রায় একইভাবে সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য কারণ দেখিয়ে মায়াকোভস্কি-মেইয়ের হোল্ডের সহকর্মী নাজিমের বিরুদ্ধে তুরস্কেও চলছে প্রহসন-বিচার। ১৯৩৮ সালের ১৭ জানুয়ারি শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হলেন নাজিম হিকমত। এবার তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে ২৮ বছর চার মাসের দীর্ঘ কারাদণ্ড। হয়তো আতাতুর্ক বেঁচে থাকলে এমনটা হতো না। কিন্তু আতাতুর্ক মারা যান ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর। ফলে ওই দণ্ডের আর রদবদল হয়নি।
নাজিমের মতো আর কোনো কবিকে বিংশ শতাব্দীতে এতো ক্ষান্তিহীন ভাবে আইনি মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হয়নি, এতবার গ্রেপ্তারও করা হয়নি, সম্ভবত আর কাউকে। যদি সব কারাদণ্ডের আদেশ বহাল থাকত— ইলিয়া এরেনবুর্গ হিসাব করে বের করেছেন—তাহলে তাঁকে জেলের মধ্যে কাটাতে হতো এক দুটো বছর নয়, এক দুই দশকও নয়—মোট ৫৬ বছর। এতটাই বিপজ্জনক ছিলেন ‘সিস্টেমের জন্য’ নীলচক্ষু সোনালী চুলের কবি নাজিম হিকমত!
মায়াকোভস্কি, বোদলেয়ার ও রুমি
কবিতায় যে নন্দনতত্ত্ব নাজিম প্রবর্তন করেছিলেন তার জন্য তিনি অকুণ্ঠ ঋণ-স্বীকার করেছেন তিনজনের কাছে। একজন রুশ কবি (কারো কারো মতে, ‘অক্টোবর বিপ্লবের কণ্ঠস্বর’) ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি। দ্বিতীয় জন, আধুনিক ফরাসী কবিতা যার হাতে জন্ম সেই কিংবদন্তীসম শার্ল বোদলেয়ার। আর তৃতীয় জন, নিজ দেশের—‘মরমী কবি’ জালালুদ্দিন রুমি। মায়াকোভস্কির প্রভাব পড়েছিল তার প্রথম দিকের কবিতায়। এ নিয়ে অনেকেই লিখেছেন যে, সিঁড়ি-ভাঙা মাত্রায় মুক্ত ছন্দে নাজিমও তার কবিতার লাইন সাজিয়েছেন। মায়াকোভস্কির মতই তার কবিতায় দেখা দিত নানা অপ্রত্যাশিত বাঁক, তার কবিতার তীর্যক সুরও একই উৎস থেকে প্রাপ্ত। নাজিমের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল মায়াকোভস্কির। উভয়ে একই মঞ্চ থেকে কতবার কবিতা-পাঠ করেছেন উদাত্ত গলায়। বিশের দশকের শুরুতে মস্কো তখন হয়ে উঠছে নব-নিরীক্ষা আন্দোলনের কেন্দ্র। কবিতা, নাটক, সিনেমা, উপন্যাস-সর্বত্র চলছে নতুন প্রলেতারীয় কালচারকে চিনে-নেওয়ার পালা। ১৯২১-২৪ ও পরে ১৯২৫-২৮ কালপর্বে নাজিমের কবি-জীবন এই নব-নিরীক্ষা আন্দোলনৈর পরিবেশে অগ্রসর হয়েছে।
একবার মায়াকোভস্কি ও নাজিম একই মঞ্চে কবিতা পড়বেন। হাত-পা নেড়ে মায়াকোভস্কি তাঁর কবিতা উচ্চগ্রামে পড়ে গেলেন। এরপর নাজিমের পালা। স্বভাবতই কিছুটা স্নায়ুর চাপে ছিলেন। মায়াকোভস্কি তাঁকে বললেন, ‘দ্যাখো বাপু, তুমি তো পড়বে কবিতা তুর্কি ভাষায়, এখানকার রুমী দর্শকেরা সেসবের বিন্দু-বিসর্গ জানে না। সুতরাং মনের সুখে তুমি পড়ে যাও। দেখবে প্রচুর হাত তালি পাবে।’
এরেনবুর্গ তার স্মৃতিকথায় বলেছেন, মায়াকোভস্কি নয় বরং নাজিমের কবিতার নিকটতম তুলনা হতে পারে কেবল পল এলুয়ারের কবিতা। সেটা সম্ভবত এলুয়ারের ওলগার সাথে নাজিমের কবিতায় পিরাইয়ের বহুল উল্লেখের কথা ভেবে লেখা। এলুয়ার ও নাজিম উভয়েই অবিশ্রান্তভাবে নিজেদের প্রিয়তমাসুদের প্রসঙ্গ এনেছেন কবিতায়। নাজিম নিজে অবশ্য বলেছেন অন্য কথা। মায়াকোভস্কির মত কংক্রিট কিছুটা কর্কশ গদ্য-ছন্দের চেয়ে আরো অনেক মৃদু-স্বরের কবিতা তার। জেলপর্বের কবিতায় আসলেই নাজিমের স্বর অনেক খাদে নেমে গিয়েছিল—যেন নিজের কথা অন্য কারো জন্যে নয়, কেবল তার নিজের জন্যে লেখা অথবা তার প্রিয়তমার মুখোমুখি বসে স্বাগত উচ্চারণে শোনানোর জন্যে লেখা।
দেব্রে তাঁর সাক্ষাৎকারে নাজিমকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি কার জন্যে কবিতা লেখেন, নাজিমের উত্তর ছিল সোজাসাপ্টা: ‘কবিতাকে আগে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। একজন বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক, বামপন্থী, দায়বদ্ধ কবি (যে-নামেই তাকে চিহ্নিত করুন না কেন) তিনি হবেন এক সদা-সক্রিয় কবি: তিনি শুধু মানুষের হূদয়ের কথাই বলবেন না, হূদয়কে তিনি একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চালিত করবেন।.. লেনিন যখন বেঁচে ছিলেন, সেই সময়ের মস্কোয় মায়াকোভস্কি ও ইয়েসেনিনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। সেসময় বড় বড় জমায়েতে কবিতা পড়া হত। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমার দেশেও তো কবিরা যুগ যুগ ধরে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে ঘুরে জনগণের সামনে কবিতা পাঠ করেছেন। জেলে যাওয়ার আগে আমিও কবিতা লিখতাম বহু শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ব বলে। পরে যখন জেলে থাকতে হল অনেক দিন ধরে, তখন থেকে আমার স্বরও নেমে যেতে থাকল। আমার শ্রোতা বলতে কেউ ছিল না, বা থাকলেও এক-দুজন মাত্র। একজনকে শোনাতে পারলেও আমার মনে হত তখন এর মধ্য দিয়েই আমি পৃথিবীর সব মানুষের কাছে যেতে পারছি’।
নাজিম তার এক কবিতায় একবার নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বলো, হিকমত-পুত্র, কোন শহরে তুমি মরতে চাও’? উত্তর দিয়েছিলেন এই বলে, ‘আমি মারা যেতে চাই ইস্তাম্বুলে, মস্কোয় এবং প্যারিসেও।’ অন্যত্র বলেছেন, ‘আমার মৃত্যুগুলোকে আমি পৃথিবীর উপরে বীজের মত ছড়িয়ে দিয়েছি, এর কিছু পড়েছে ওদেসায়, কিছু ইস্তাম্বুলে, আর কিছু প্রাগে। সবচেয়ে যে-দেশকে আমি ভালোবাসি সেটি হচ্ছে পৃথিবী। যখন আমার সময় আসবে, আমাকে পৃথিবী দিয়ে মুড়ে দিও’। অনেক শহরের মধ্যে প্যারিস যে মাঝে-মাঝেই ঘুরে-ফিরে আসে তার কবিতায় তার একটা প্রধান কারণ ছিলেন বোদলেয়ার। ‘প্যারিস স্প্লীন’ থেকে গদ্য-ছন্দের এক নতুন সুষমা তিনি আহরণ করেছিলেন। ফরাসি ভাষায় দখল থাকায় মূলের স্বাদ নিতে বাধা হয়নি তারা নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনের নানা খুঁটিনাটি কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছিল তার কবিতায় বোদলেয়ারের প্রেরণাতেই। অন্যত্র তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘আমি কবিতা লিখতে শুরু করি পনেরো বছর বয়সে। ঐ সময়ে ভালোবাসা ও মৃত্যু কবিতাকে আচ্ছন্ন করে থাকে। বাবার দিক থেকে আমি একেবারেই প্রাচ্যপন্থী, আর মা’র দিক থেকে পুরোপুরি য়ুরোপীয়। আমি বোদলেয়ার দ্বারা পুরোপুরি আচ্ছন্ন দিলাম, কিন্তু আমার দেশের দরবেশ কবিকুলও আমার চৈতন্যে প্রভাব ফেলেছিলেন। আমি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণে তৈরি’।
প্যারিসের কোন জিনিসটি সবচেয়ে ভালো লাগে? সে হচ্ছে প্যারিসই। এখানে কি তোমার দেখা হয়েছে তোমার কমরেডদের সঙ্গে? হ্যাঁ, আমি দেখেছি নামিক কামাল, জিয়া পাশা, মুস্তফা সুফি ওদের। আমি দেখেছি আমার তরুণী বয়সের মাকে—তিনি ছবি আঁঁকছেন, ফরাসিতে কথা বলছেন অনর্গল— পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী তিনি। বলো তো. প্যারিসকে কেমন দেখায়? তাকে দেখায় প্যারিস বাসীর মতো। বলো, আদমের পুত্র, এবারে বলো—তুমি কি প্যারিসকে বিশ্বাস করো, হ্যাঁ, আমি প্যারিসকে বিশ্বাস করি।’ তাঁর প্রিয় বন্ধু লুই আরাগঁ, পল এ লুয়ার, ত্রিস্তান জারা, পাবলো পিকাসো—এদের স্মৃতি প্যারিসকে ঘিরেই। এ কারণেই অন্যত্র বলেছেন, ‘আমি বেঁচে থাকব আরাগঁ-র কবিতায়, আমি বেঁচে থাকব পিকাসোর শাদা কবুতরে, আমি বেঁচে থাকব মার্সাইয়ের ডক শ্রমিকদের মধ্যে।’ শহর নিয়ে এরকম অনর্গল প্রশস্তি-গাঁথা আর কোথাও নেই: নেরুদা করেননি তার মান্টিয়াগো নিয়ে, কার্দেনাল করেননি তাঁর মানাগুয়া নিয়ে, পুশকিন করেননি তার সেই পিটার্সবাগ নিয়ে। নাজিম নিজেও আর কোনো শহরকে নিয়ে এতটা প্রেমময় কাব্য লেখেননি।
দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থরাজি : দুর্লভ সময়ের হলফনামা
বিনায়ক সেন
বোর্হেস বলেছিলেন, বেহেশত্ নিশ্চয়ই হবে এক বিশাল গ্রন্থাগার।আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও বইটি হাতে পেয়ে স্বাক্ষরপত্রে কিছু লিখতে অনুরোধ করায় কবি শহীদ কাদরী লিখেছিলেন, ‘এই নশ্বর গ্রহ থেকে এক দিন সব স্বাক্ষরই মুছে যাবে—মনে রেখো।’ তাই গ্রন্থরাজি নিয়ে সান্ত্বনার কিছু নেই। তার পরও এই লেখা।
‘কুঝনেস্কি মস্ত’ (কুঝনেস্কি সেতু) মস্কোর প্রাচীনতম মেট্রো স্টেশনের একটি। মেট্রো থেকে বের হয়ে হাতের ডান দিকে এগোলে দু-তিনটি দোকানের পরই একটি পুরোনো বইয়ের স্বর্গরাজ্য। সেখানে হঠাৎই পেয়ে যাই একদিন হিলফেরডিংয়ের লেখা ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল বইটি। জর্মন থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ। প্রকাশনার তারিখ ১৯২৪—লেনিন সে বছর মারা গেলেন। মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তখন জোরেশোরে পড়ানো হচ্ছে ‘ইম্পিরীয়লিজম’— সাম্রাজ্যবাদের অর্থনীতি। প্লেখানভ, কাউটস্কি, লেনিন, হবসন, হিলফেরডিং, রোজা লুক্সেমবুর্গ, বুখারিন। তখনকার মস্কোয় (সত্তরের দশকের কথা বলছি) যত সহজে মার্কসীয় ধারার বইপত্র পাওয়া যেত, ততটা সহজে পাওয়া যেত না ‘বুর্জোয়া অর্থনীতি’র বইপত্র।
ফলে বইখানা হাতে পেয়ে ৯০ রুবলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা ছাত্রবৃত্তির বাজেটে বেশ কিছুটা টান পড়লেও আমি তখন আনন্দে আটখানা। এ রকমই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত জর্জ কাট্কভের দ্য ট্রায়াল অব বুখারিন হাতে পেয়ে। সোভিয়েত প্রসিকিউটর ভিশিনস্কি ও বুখারিনের মধ্যকার সেই বাদানুবাদ এখনো পাঠককে বিমর্ষ করবে। ১৯৩৮ সালে স্তালিন ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার মনগড়া অভিযোগে বুখারিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের পর থেকে নিকোলাই বুখারিনের মর্যাদা আবারও সরকারিভাবে ফিরিয়ে আনে সিপিএসইউ। অবশ্য তখনকার মস্কোয় বুখারিনের বা ট্রটস্কির রচনা পাওয়া সম্ভব ছিল না (দ্য হিস্টরি অব রাশান রিভল্যুশন বইটির ১৯৩৬ সালের একটি ইংরেজি অনুবাদ আমার সংগ্রহে রয়েছে)। এ বইগুলো পেয়েছিলাম আরও দুই দশক পরে—ওয়াশিংটনের একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে।
মনে হয় দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেটাই শুরুর বিন্দু আমার। তারপর বেশ কিছু দুর্লভ রচনার হদিস পেয়েছি মস্কোতেই। বর্তমানে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ১৯৮১ সালে আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন পূর্ববঙ্গের প্রথম বাঙালি মুসলিম কমিউনিস্ট পাবনা-সিরাজগঞ্জের গোলাম আম্বিয়া খান লোহানীর বিষয়ে খোঁজখবর করতে। তখনো আমার জানা ছিল না, লোহানীও বুখারিনের মতো মস্কোয় ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের কোনো এক দিনে স্তালিনীয় নিষ্পেষণের কবলে মৃত্যুবরণ করেছেন। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের (‘চ্যাটো’ বলে যিনি খ্যাত—সরোজিনী নাইডুর ভ্রাতা) নেতৃত্বাধীন বার্লিন গ্রুপের সঙ্গে মস্কোয় আগমন তাঁর, ১৯২১ সালে। লেনিনের কাছে লেখা বিখ্যাত ‘চট্টোপাধ্যায়-লোহানী-খানখোজে’-এর উপনিবেশবিষয়ক থিসিসের মূল রচয়িতা ছিলেন আমাদের লোহানী। এ কথা এম এন রায় তাঁর স্মৃতিকথায় আগেই জানিয়েছিলেন। সেই সূত্রেই মতি ভাইয়ের কৌতূহল।
খুঁজতে খুঁজতে হাজির হই লেনিন রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে। সাধারণ সেকশনে লোহানীর লেখা পাওয়া যাবে না জেনে দ্বারস্থ হই লেনিন গ্রন্থাগারের আর্কাইভে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে দিনের পর দিন ঘেঁটে উদ্ধার করি লোহানীর রচনা। তখনকার দিনের (আমি ১৯২২-১৯৩২ পর্বের কথা বলছি) কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল, পেজেন্ট ইন্টারন্যাশনাল, মোপর প্রভৃতি জার্নালে সন ধরে ধরে খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যাই লোহানীর অদ্যাবধি বাংলায় বা ইংরেজিতে অপ্রকাশিত বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ। সেসব এখনো উল্টেপাল্টে দেখি, আর ভাবি সেই সময়ের কথা—কী হয়েছে, আর কী হতে পারত, তা নিয়ে মনের মধ্যে ঝড় ওঠে।
২.
দুই পর্বে মিলিয়ে ওয়াশিংটনে ছিলাম নয় বছর। জীবিকার জন্য কাজের বাইরে (বিশ্বব্যাংকে আমি তখন কর্মরত) শখ বলতে সময় পেলেই বইয়ের দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়ানো। বলতে দ্বিধা নেই, ওয়াশিংটনের প্রায় সব পুরোনো বইয়ের দোকানে অনেক অপরাহ্ন ও সন্ধে ব্যয় করেছি। জর্জ টাউনের কয়েকটি দোকান ছিল প্রসিদ্ধ, আর ছিল ‘দ্যুপন্ট সার্কেল’ মেট্রোয় ঢোকার মুখে দু-তিনটা দোকান। এক-দুটো আবার রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত খোলা থাকত। এগুলোর কোথাও কোথাও পেয়ে যাই অর্থনীতিবিষয়ক বেশ কিছু বইয়ের প্রথম দিককার সংস্করণ। যেমন, নোবেল অর্থনীতিবিদ আর্থার লুইসের ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং বইয়ের ১৯৬৫ সালের সংস্করণ (এসব বইয়ের কোনো আধুনিক সংস্করণ বহুদিন বাজারে নেই)। অথবা চিরায়ত গ্রন্থ রেভারেন্ড প্রফেসর ম্যালথাসের এন এসে অন দ্য প্রিন্সিপাল অব পপুলেশন অ্যান্ড ইটস্ এফেক্টস্ অন হিউম্যান হ্যাপিনেস-এর ১৮৯০ সালের সংস্করণ। কার্ল কাউটস্কির দ্য এগ্রারিয়ান কোয়েশ্চেন অবশ্য পাই ই-বে সূত্রে। অর্থনীতির কিছু দুর্লভ বই ঢাকার রাস্তাতেও পেয়েছি। আশির দশকে তোপখানা রোডে সিপিবি অফিসের সামনের ফুটপাতে যেমন এক দিনেই পেয়ে গিয়েছিলাম গ্যারি বেকার রচিত হিউম্যান ক্যাপিটাল-এর ১৯৬৪ সালের সংস্করণ এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহানের ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত প্রথম বই বেসিক ডেমোক্রেসিস্, ওয়ার্কস প্রোগ্রামস্ অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ইন ইস্ট পাকিস্তান। স্যারকে সে কথা বলাতে তিনি দার্শনিকসুলভ মুচকি হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘আমিও শুনেছি, আমার বইগুলো এখন ফুটপাতে পাওয়া যাচ্ছে!’
৩.
তবে পরবর্তীকালে অর্থনীতির বাইরেও অন্য কিছু বিষয়ে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ-সংগ্রহের আগ্রহ জন্মাতে থাকে। এলেন অ্যান্ড আনউইন থেকে প্রকাশিত রাধাকৃষ্ণন সম্পাদিত হিস্টরি অব ফিলোসফি ইস্টার্ন অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন ১৯৬৭ সালের পর থেকেই বাজারে নেই। দুই খণ্ডের এ বইটি সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে প্রথম দেখেছিলাম। বহু দিন পরে ওয়াশিংটনে বইটির দুই খণ্ড হাতে পেয়ে শিহরিত হই। এর একটি প্রবন্ধ ‘সায়েন্টিফিক থট ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ অত্যন্ত মূল্যবান একটি রচনা, যার তুলনীয় কিছু এর আগেও হয়নি, পরেও হয়নি। ১৯০৬ সালের সংস্করণে সৈয়দ আমীর আলীর বিরল রচনা ইসলামও একইভাবে খুঁজে পাই পুরোনো বইয়ের দোকানে। এই বইয়ে সুফী মতাদর্শের ওপর আমীর আলীর গভীর আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায়।
আমার সংগ্রহে সবচেয়ে পুরোনো বই দুটি। একটি হচ্ছে, ১৮৬০ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ওড়িশা ও বাংলার দুর্ভিক্ষের ওপর ‘পেপারস’-এক বিপুলায়তন তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ১৮৭১ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত স্যার বার্টল ফ্রেরের অন্য দ্য ইমেপন্ডিং বেঙ্গল ফেমিন: হাও ইট উইল বি মেট অ্যান্ড হাও টু প্রিভেন্ট ফিউচার ফেমিন্স ইন ইন্ডিয়া। এটি তুলনামূলকভাবে ছোট বই, ১১২ পাতার কিন্তু বিশ্লেষণের নিরিখে পরবর্তীকালের অমর্ত্য সেনের পোভার্টি অ্যান্ড ফেমিন বিষয়ক গ্রন্থের সঙ্গে একযোগে পড়ার মতো।
১৮৮৬ সালের সংস্করণ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত বাংলায় প্রকাশিত বই-পুস্তিকার ক্যাটালগ অধ্যাপক ব্লুমহার্ডটের একটি অবশ্যমান্য আকর-গ্রন্থ। এই ক্যাটালগ ঘাঁটলে উনিশ শতকের বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান গ্রন্থকারদের রচনারাজির বৈচিত্র্য চোখের সামনে ফুটে ওঠে। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। এই দুটি খণ্ড যেকোনো সংগ্রাহকের জন্য আদরনীয়। ১৯৪৭-১৯৭১ কালপর্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রকাশিত বাংলা বইয়ের একটি অনুরূপ ক্যাটালগ কেউ প্রস্তুত করলে বাঙালি মাত্রেরই তিনি কৃতজ্ঞতাভাজন হতেন।
কবিতার প্রতি আকৈশোর পক্ষপাতিত্বের কারণে কিছু বই সংগ্রহের লোভ থেকে নিজেকে নিরস্ত করতে পারিনি। ১৯০০ সালে প্রকাশিত কিটসের চার খণ্ডের পকেট বুকসাইজের কবিতা-সংগ্রহের পাতাগুলো এখনো অটুট। এজরা পাউন্ডের জীবনের শেষ ৩০ বছর রাজনীতির ভুল পরিক্রমায় পরিকীর্ণ। এ সময়ের স্মৃতি বহন করছে—এজরা ও ডরোথি পাউন্ডের মধ্যকার ১৯৪৫-৪৬ কালপর্বের পত্রালাপ, যার নাম ‘লেটারস ইন কেপটিভিটি’। রিলকে, পাস্তারনাক ও মারিনা সভিতায়েভ অসম বয়সী তিন দিকপাল কবির মধ্যকার ১৯২৬ সালের পত্রালাপ আরও একটি বিরল বই। দুষ্প্রাপ্য মানেই যে তা ‘পুরোনো’ হতে হবে তা নয়। নাজিম হিকমত নিয়ে সম্প্রতি পশ্চিমের সাহিত্য মহলে প্রবল উৎসাহ জাগ্রত হয়েছে, তার সর্বশেষ নিদর্শন হাতে এসেছে কিছুকাল হলো। জেলে যে ১০ বছর ছিলেন নাজিম, সে সময়ে তাঁর সহবন্দী ছিলেন কবি ওরহান কেমাল। তাঁরই স্মৃতিচরণা: ইন জেইল উইথ নাজিম হিকমত। ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কোর ভূমিকাসংবলিত সাইমে গক্সু ও এডোয়ার্ড টিমস্-এর নাজিম হিকমতের প্রামাণ্য জীবনী-গ্রন্থ রোম্যান্টিক কমিউনিস্ট প্রকাশনার পর এটি তুরস্কের বিখ্যাত কবির ওপর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশনা। এখানে বলে রাখি, অন্য অনেক দেশের চেয়ে অনেক আগে বাংলাতে নাজিম হিকমতের অনুবাদ হয় ১৯৫১ সালে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় ফরাসি থেকে অনুবাদ করার ক্ষেত্রে সাহায্য নেন রণজিৎ গুহের (পরবর্তী সময়ে নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাত)।
আমাদের প্রজন্মের এক বড় অংশেরই বুদ্ধিবৃত্তির হাতেখড়ি হয়েছিল বার্ট্রান্ড রাসেলের মুক্তিচিন্তা ও কাম্যু-সার্ত্রের থিওরি অব দি অ্যাবসার্ড ও অস্তিত্ববাদের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার পর পরের বাংলা নাটকগুলো যেমন ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ এমনি এমনি আকাশে ওড়ায়নি। এর পেছনেও ছিল কাম্যু, সার্ত্রে, বেকেট, অ্যালবির অ্যাবসার্ড অনুপ্রেরণা। এর বিপরীতে ছিলেন সদা-বুদ্ধিদীপ্ত রাসেল। বিভিন্ন পত্রিকার লেটারস্ টু এডিটর কলামে রাসেল তাঁর জীবনের নানা পর্যায়ে যেসব চিঠি লিখেছিলেন, তা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘ইওরস্ ফেইথফুলিল বার্ট্রান্ড রাসেল’ একেকটি চিঠি টুকরো টুকরো বৈদূর্যমণি। এ রকম কিছু কিছু রচনার অত্যাধুনিক সংস্করণ থাকা সত্ত্বেও আমার মূল আগ্রহ ছিল প্রথম সংস্করণের প্রতি। এভাবেই আমি সংগ্রহ করি আলবেয়ার কাম্যুর দ্য মিথ অব সিসিফাস্ অ্যান্ড আদার এসেস্-এর ১৯৫৫ সালের সংস্করণ, অন্দ্রে জিদের ১৯৩৫ সালের আত্মজীবনী ইফ ইট ডাই, সার্ত্রের আত্মজীবনী ১৯৬৪ সালের সংস্করণ দ্য ওয়ার্ডস।
লা নুই বেঙ্গলিখ্যাত মির্চা এলিয়াদ নিয়ে মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতে-এর কল্যাণে বাঙালি পাঠক মাত্রেরই আগ্রহের শেষ নেই। এলিয়াদ সম্পর্কে এটুকু জানতাম যে চউসেস্কুর রুমানিয়া থেকে নির্বাসিত হয়ে প্রথমে প্যারিসে, পরে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
ভারতীয় ও পাশ্চাত্য ধর্মশাস্ত্রের ওপর একাধিক ইতিহাস বইয়ের রচয়িতা। জন্মস্থান রুমানিয়ায় তাঁর খ্যাতি অবশ্য ঔপন্যাসিক ও গ্রন্থকার হিসেবে—রুমানিয়ার আধুনিক সাহিত্যের প্রাণপুরুষ তিনি। লা নুই বেঙ্গলি যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের আগ্রহ জাগাবে এলিয়াদের চার খণ্ডে সম্পূর্ণ জর্নাল বা তাঁর (অসমাপ্ত) দুই খণ্ডেরআত্মজীবনী। এখনো এই আত্মজীবনীর এক অংশে গিয়ে আমাদের হূদস্পন্দন থেমে যায়, যেখানে তাঁর সঙ্গে মৈত্রেয়ীর প্রথম অনুরাগের উন্মেষ হচ্ছে। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এই রকম: ‘আমার লেখা ইসাবেল-এর প্রথম কপিগুলো হাতে পেলাম, এবং মৈত্রেয়ী, যিনি নিজেও ছিলেন কবি, আমাকে এর পর থেকে ভিন্ন চোখে দেখা শুরু করলেন। আমি তার সমকক্ষ হতে পারলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত একই চিন্তা-চেতনের পরিবারের সদস্য হতে পারলাম সেদিন। এবং এভাবেই, পরিবারের আর সবাই যখন উপরতলায়, আমরা নীচতলার লাইব্রেরীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটিয়েছি। আমাদের উপর দায়িত্ব ছিল ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসবিষয়ক বইয়ের ভেতরে যেসব দার্শনিক পরিভাষা পাওয়া যায় তার নির্ঘন্ট দাঁড় করানোর। একদিন ইনডেক্স কার্ডের বাক্সে আমাদের হাত মিলে গেল, এবং আমরা আর সেই বাঁধুনি থেকে নিজেদের সরিয়ে আনতে পারিনি।’ এর পরের ঘটনা পাঠকদের জানা। মৈত্রেয়ী দেবীর দার্শনিক পিতা এই মিলনকে (গায়ত্রী স্পিভাকের ভাষায়—‘ঔপনিবেশিক সংঘাতকে) সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। এলিয়াদকে অচিরেই বিদায় করা হয় মৈত্রেয়ীর পিতৃভবন থেকে, যে পিতাকে এলিয়াদ তাঁর বইয়ের সর্বত্র ‘অধ্যাপক’ নামে বর্ণনা করে গেছেন। ‘আমাদের মধ্যে আর কখনো দেখা হয়নি’—মৈত্রেয়ী সম্পর্কে এরপর তাঁর আত্মজীবনী নীরব। এলিয়াদের প্রতি এ রকম কোনো গোপন বেদনাবোধ থেকে সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেছি তাঁর প্রধান প্রধান দর্শন-রচনা, উপন্যাস ও ছোটগল্প। একই আগ্রহে সম্ভবত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর রচনার প্রতি আগ্রহ জন্মায়, যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ওকাম্পোর লরেন্স অব এরাবিয়া। লরেন্সের অধ্যাপক ভাই এই বইটিকে বলেছেন লরেন্সের জীবনীগুলোর মধ্যে ‘সবচেয়ে গভীর ও সমঞ্জস্য’ রচনা বলে।
৪.
রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বইয়ের ইংরেজি অনুবাদগুলোর প্রথম বা (না পারলে) দ্বিতীয়-তৃতীয় সংস্করণ খোঁজার আগ্রহ ও উত্তেজনা থেকে আর সবার মতো আমিও দূরে থাকতে পারিনি। এর অধিকাংশ বই-ই ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশিত। ১৯১৫ সালের সংস্করণ রবীন্দ্রনাথের অনুবাদেওয়ান হানড্রেড পোয়েমস্ অব কবীর। অনুবাদটির ক্ষেত্রে এভেলীন আন্ডারহিল সহায়তা করেছিলেন কবিকে, একটি বিশদ ভূমিকা লেখা ছাড়াও। রবীন্দ্রনাথের ওপর পনেরো শতকের সন্তকবি কবীরের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন কবীরের জীবনী তুলে ধরার পাশাপাশি। দেখা যাচ্ছে, এই অনুবাদকর্মে শুধু ক্ষিতিমোহন সেনের সংগৃহীত পাঠ (হিন্দি/ বাংলা) ছাড়াও অজিত কুমার চক্রবর্তীর ইংরেজিতে কৃত অনুবাদের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। অনেকেরই হয়তো জানা যে, গীতাঞ্জলি-র মাধ্যমে কবির ঋষি ভাবমূর্তির পাশাপাশি নারীবাদী একটি ভাবমূর্তিও ছড়িয়ে পড়েছিল পাশ্চাত্যের বিদ্বৎসভায়। এর বড় কারণ, ১৯১৪ সালের সংস্করণে চিত্রাঙ্গদার ইংরেজি নাট্যরূপ চিত্রার প্রকাশনা। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল মিসেস উইলিয়াম ভন মুডিকে (হ্যারিয়েট মুডি হিসেবে অধিক পরিচিত)। মুডি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একান্ত অনুরাগী, নিখাদ কাব্যপ্রেমী ও পারিবারিক বন্ধু। চিত্রা গ্রন্থটি ইংরেজিতে প্রকাশের পরপরই এর সমালোচনা লেখেন বসন্ত কুমার রায় ও হ্যামিলটন মেবি (এঁরা যুক্তভাবে আরও লিখেছেন)। সমালোচনার নামটিও তাৎপর্যপূর্ণ—রবীন্দ্রনাথ টেগোর- দ্য ফেমিনিস্ট পোয়েট অব ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে অবশ্য ন্যাশনালিজমের কবি হিসেবে ভাবতেন কি না, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। বসন্ত কুমার রায় ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ টেগোর: দ্য ম্যান অ্যান্ড হিজ পোয়েট্রি শীর্ষক জীবনীগ্রন্থ লিখেছিলেন (ম্যাকমিলান থেকে প্রকাশ পায় সেটি)। সমালোচনাটির এক জায়গায় বসন্ত হ্যামিলটন জুটি লেখেন: ‘নারীবাদবিষয়ক রবীন্দ্রনাথের দর্শন যেভাবে চিত্রা গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে, তা পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের কাছেও খুব বেশি র্যাডিকেল বলে মনে হতে পারে।’
গীতাঞ্জলির ১৯১৪ সালের সংস্করণ পর্যন্ত কেবল পৌঁছাতে পেরেছি আমি। এর ভূমিকায় স্পষ্ট যে রবীন্দ্রনাথ এই অনুবাদটিকে মূলত গদ্য-কর্ম হিসেবেই দেখেছিলেন—মূল বাংলা থেকে ইংরেজিতে ‘গদ্যে অনুবাদ’ (প্রোজ-ট্রান্সলেশনস) এভাবেই পাঠকদের কাছে পরিচিত হতে চেয়েছেন। বইটির শুরুতে ১৯১২ সালে করা রোদেনস্টাইনের কবি-প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছে, বইটি উৎসর্গও করা হয়েছে রোদেনস্টাইনকেই। এ বইটি আদিতে যিনি কিনেছিলেন কোনো এক অজ্ঞাতনামা আর এস এম (নাম বোঝার উপায় নেই) জনৈকা এলিজাবেথকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এই বলে: ‘এলিজাবেথকে—যার অদ্বিতীয় রূপ, যার মনের শক্তি এবং যার ব্যক্তিত্বের মাধুর্য এই কবিতাগুলোর মতই।’ পেনসিলের হস্তাক্ষরে লেখা—কালস্রোতে এখনো মুছে যায়নি।
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের কয়েকটি দুর্লভ সংগ্রহ আমি খুঁজে পেয়েছি কাকতালীয়ভাবে। ১৯২১ সালের মে মাসে প্রকাশিত দ্য মেন্টর পত্রিকার পুরোটা জুড়েই ছাপা হয় রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনা ‘উইমেন’। এর শুরুতে বিশেষভাবে মেন্টর পত্রিকার জন্য একটি ইংরেজি কবিতা লেখেন কবি। প্রথম মহাযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে নারীর সৃষ্টিশীলতাকে আহ্বান করা হয়েছে সংক্ষেপে এটুকুই বলার। ন্যাশনালিজম গ্রন্থে সংকলিত ‘ন্যাশনালিজম ইন দ্য ওয়েস্ট’ প্রবন্ধটি দেখা যাচ্ছে গ্রন্থের বাইরেও প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে লিবারেল পত্রিকা দ্য আটলান্টিক মান্থলি জার্নালে। বিখ্যাত এই পত্রিকাটির ১৯১৭ সালের জানুয়ারি-জুন পর্বের সব সংখ্যা আমার হাতে আসে। তাতে দেখতে পাই, কবির রচনার পাশাপাশি ছাপা হচ্ছে একই ধারার বিষয়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনালিজম’, হেনরি ফোর্ডের ‘রাইটস্ অ্যান্ড রংস্ অব প্যাসিফিজম’ জোসেফ কনরাডের ওপর সাম্প্রতিক আলোচনা।
এ তো গেল প্রথম মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা রচনাসমূহ। আসন্ন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আশঙ্কায় ইউরোপে গড়ে উঠেছিল যুদ্ধবিরোধী নাগ মঞ্চ।
তারই একটি ছিল প্যারিসে অবস্থানরত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনটেলেকচুয়াল কো-অপারেশন’। এর উদ্যোগে বিভিন্ন খোলা চিঠির একটি প্রকাশনা সিরিজ বের হয়েছিল তিরিশের দশকে। তারই অংশ হিসেবে, পৃথক পুস্তিকা হিসেবে ১৯৩৫ সালে আত্মপ্রকাশ পায় গিলবার্ট মারে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যকার পত্রালাপ। এর একটি অংশের অনুবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের আদি—রূপ:
‘একটা সময় ছিল যখন আমরা য়ুরোপের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন ছিলাম। য়ুরোপ আমাদের মধ্যে নতুন আশা জাগিয়ে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। আমরা মনে করতাম যে সারা পৃথিবীতে মুক্তির বাণী ছড়িয়ে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য। তার সাহিত্য ও শিল্পকলার মাধ্যমে আমরা তার ভাবের দিকটিকেই চিনেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, য়ুরোপের…কর্মকাণ্ডের মূল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এশিয়া ও আফ্রিকা—যেখানে তার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল মুনাফার আহরণ, সাম্রাজ্যের পরিচালনা এবং বাণিজ্যের সম্প্রসারণ। য়ুরোপের গুদাম এবং বাণিজ্য দপ্তরগুলো, তার পুলিশ চৌকি এবং সৈন্যের ব্যারাকগুলো বহুগুণে বর্ধিত হয়েছে, আর একই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে তার মানবিক সম্পর্কের দিকগুলো…এই বেষ্টনী ভেদ করে য়ুরোপের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তা প্রাচ্যে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।’
সেসব এক ভিন্ন সময়ের কথা বা আমাদের সময়েরও কথা। এভাবেই দুর্লভ যুগের হলফনামা থেকে যায় দুষ্প্রাপ্য কিছু গ্রন্থের পাতায়। বোর্হেসের কথাই যেন সত্য হয়।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ০১, ২০১১
দুর্ভিক্ষ এখন ইতিহাস
বিনায়ক সেন | তারিখ: ০১-০১-২০১১
দারিদ্র্যের নানা বিড়ম্বনা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্ষুধার কষ্ট, চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাবের কষ্ট, নিরাশ্রয়ের কষ্ট, ক্রমাগত ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার, জাত-পাতের অপমানের ও ক্ষমতাহীনতার প্রকাশ্য-গোপন লাঞ্ছনার কষ্ট। দেখা যাচ্ছে, ক্ষুধার নিরিখই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয় কে দরিদ্র তা বিচারের ক্ষেত্রে। তার পরও পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। বেদের উপাখ্যানে ঋষি বামদেব বলছেন, ‘অভাবের জন্য আমি কুকুরের নাড়িভুঁড়ি রান্না করে খেয়েছি, দেবতাদের মধ্যেও কোনো সাহায্যকারী পাইনি। নিজের স্ত্রীকে অপমানিত হতে দেখেছি।’ মানুষ শুধু নয়, পশুরাও ক্ষুধার্ত ছিল সময় সময়। ছান্দোগ্য উপনিষদে কুকুরেরা বলছে, ‘আমরা যাতে খাদ্য পাই সে জন্য সামগান করুন। আমরা ক্ষুধার্ত।’
প্রাক-ব্রিটিশ যুগে দারিদ্র্য যেমন ছিল, দুর্ভিক্ষও দেখা দিত মাঝেমধ্যেই। অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘দুর্ভিক্ষের সময় রাজা শস্যবীজ ও অন্ন দিয়ে প্রজাদের অনুগ্রহ করবেন। অন্নের বিনিময়ে দুর্গ বা সেতু নির্মাণ করাবেন বা কর্ম ছাড়াই অন্নদান করবেন।’ উপনিবেশ আমলের গোড়ার দিকে এ ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়ে। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এ এগারো শ ছিয়াত্তরের (১৭৭০) মন্বন্তরের ক্লাসিক বর্ণনা মেলে—সেখানে দস্যুদল যখন ক্ষুধার জ্বালায় শীর্ণ দলপতির মাংস খেতে শুরু করে, তা নরমাংস ভোজের কষ্ট-কল্পিত অনুমান নয়—এ নিয়ে জন শোরের সাক্ষ্যও রয়েছে। যে রাজ্যে সুশাসন নেই অথবা গণতন্ত্র নেই, সেখানে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পরপর ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষগুলো—যাকে মাইক ডেভিস বলেছেন ‘লেইট ভিক্টোরিয়ান হলোকাস্ট’—শুধু এল নিনোর (খরার) কারণে হয়নি। এর জন্য দায়ী উপনিবেশের শাসন। জন স্টুয়ার্ট মিল মনে করতেন, এটি ছিল কোম্পানির ‘পরোক্ষ’ শাসন উঠে গিয়ে ইংরেজ রাজশক্তির ‘প্রত্যক্ষ’ শাসন গেড়ে বসার প্রতিফল।
কিছুটা অবাক করার মতো যে ‘নব জাগরণের’ বাংলার তাবড় তাবড় রেনেসাঁ-চিন্তকেরা রায়তদের বিদ্রোহ ও ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নিয়ে যেমন, উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষগুলো নিয়েও উচ্চকিত ছিলেন না। হয়তো তা সিডিশনের ভয়ে, অথবা বিষয়-আশয় নিয়ে ভাবিত হয়ে, কেননা এঁদের অনেকেই ছিলেন উঁচু মাইনের সরকারি চাকুরে। রমেশ চন্দ্র দত্তের মতো কেউ কেউ ছিলেন অবশ্য উজ্জ্বল ব্যতিক্রম—ইংরেজি ও বাংলায় একের পর এক বই লিখে গেছেন রায়তের অবস্থা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে। মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছে দুর্ভিক্ষ নিবারণের উপায় নিয়ে সুবিখ্যাত ‘খোলা চিঠি’ লিখেছেন। তবে আর সবাই সে পথ মাড়াননি। এটি নিশ্চিতই রেনেসাঁর অন্ধকার দিক। আর দারিদ্র্য নিয়ে রেনেসাঁ ছিল একপ্রকার নির্বিকার—কখনো কদাচিৎ বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ‘হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত্তের’ জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। তবে শুধু রেনেসাঁর তত্ত্বে তালাশ করে লাভ কি, পরবর্তী সময়ে যাঁরা ক্ষমতাসীন ছিলেন, তাঁদের ঘাটতি আরও প্রকট।বাংলায় লিগ মিনিস্ট্রির শাসন সত্ত্বেও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এড়ানো যায়নি—যতই সীমিত হোক সে শাসনের চৌহদ্দি। দুর্ভিক্ষ আধুনিক উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রেও ঘটেছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিভিন্ন লেখা-পত্র থেকে এটুকু স্পষ্ট যে এর জন্য শুধু বিদেশি শক্তিকে দায়ী করা চলে না। যেমনটা সাতচল্লিশের পর খাদ্য-দাঙ্গাগুলো সেদিনের মুসলিম লীগ সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়, সেভাবেই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে থাকবে। কেউ একদিন কখনো নিশ্চয় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ইতিহাস—বিশেষত, এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব, যা আমরা এখনো সম্ভবত বহন করে চলেছি, তা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ লিখবেন।
এসব বিচারে, স্বাধীনতার ৪০ বছরে বলতেই হবে, অন্তত তিনটি দিক দিয়ে আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছি। এ কথা তথ্য-পরিসংখ্যানসহ জোরের সঙ্গেই বলা যায় আজ। এক. দুর্ভিক্ষের ছায়া থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। দুই. দারিদ্র্যের মাত্রা অনেকখানি কমে গেছে। তিন. চরম দারিদ্র্যের মাত্রা আরও বেশি করে কমে এসেছে। যদিও এসব অর্জন কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও পরিবেশদূষণের কারণে, যার কারণে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে এসব অর্জনের স্থায়িত্বশীলতা নিয়ে। তার পরও যা অর্জন তা অর্জনই। এবং তা কীভাবে এল, সে কথা আমলে আনা দরকার।
দুর্ভিক্ষ এখন ইতিহাস। এমনকি ‘মরা কার্ত্তিক’ও ইতিহাস হতে চলেছে। নব্বইয়ের দশকে মরা কার্ত্তিক নিয়ে সংবাদ থাকত পত্রিকার পাতায়। মরা কার্ত্তিক ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’ কি না এ নিয়ে তর্ক হতো। এর প্রাদুর্ভাবও কালক্রমে কমে এসেছে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের পত্রিকার রিপোর্টাজে মরা কার্ত্তিক অনুপস্থিত। উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙনের জেলাগুলোতে একদা দুর্ভিক্ষের গ্রাম ঘুরলে দেখা যাবে, এক দশক আগের তুলনায় কাজের সুযোগ বেড়েছে, আগের তুলনায় গ্রামগুলো থেকে অনেক বেশি হারে কাজের খোঁজে বাইরে যাচ্ছে মানুষ, সরকারি ও এনজিও সংস্থার উপস্থিতিও অনেক বেশি চোখে পড়ে। এমনকি চর এলাকায়ও যাচ্ছে উন্নয়ন-প্রকল্প। কিন্তু নদী এখনো ভাঙে। দুর্ভিক্ষ নেই যদিও, দারিদ্র্যের মাত্রা এসব এলাকায়ই এখনো বেশি।
চার দশক আগে দারিদ্র্যের হার যা ছিল, আজ তা কমে অর্ধেক হয়ে গেছে—যেভাবেই তার পরিমাপ করা হোক না কেন। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই সফলতা স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি। এক হিসাবে, ‘দারিদ্র্যসীমা’র নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর হার ১৯৭৩-৭৪ সালে ছিল ৮৩ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা এসে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। চলতি প্রবণতার ধারণা পেতে হলে বিআইডিএসের ক্রনিক পভার্টি গবেষণার আওতায় ২০০৫-২০১০ সালে জরিপকৃত ৬৪টি গ্রামের এক প্যানেল ডেটার দিকে তাকাতে পারি। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে, ‘সাবজেক্টিভ পভার্টি’র সূচকে গ্রামের দারিদ্র্য গত পাঁচ বছরে আরও ৭ শতাংশ কমে গেছে। মোট কথা, ২০০০-এর দশকে ২০০৭-২০০৯ সালের বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের হার দ্রুত হারে কমে গেছে। দৈনিক কৃষি মজুরি এখন দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়—প্রায় পাঁচ সের মোটা চালের সমতুল্য। এই নিরিখে ১৯৮৩-৮৪ সালে দৈনিক কৃষি মজুরি ছিল কেবল আড়াই সের চালের সমতুল্য। এতে করে শুধু মজুরির ওপর নির্ভরশীল এমন জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের মাত্রাও আরও কমে গেছে। অর্থাৎ, ২০০০-এর দশকে শুধু সার্বিক দারিদ্র্য নয়, চরম দারিদ্র্যও কমেছে।
এ কথা বলতেই হবে, স্বাধীনতার ৪০ বছরে দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি হারে কমেছে গণতন্ত্রের গত দুই দশকে। এই কমার সফলতা যেমন বিএনপি দাবি করতে পারে, আওয়ামী লীগেরও সমান দাবি তাতে। কেননা পাঁচ বছর পরপর সরকার বদলেছে—এক দলের সরকারের বিনিয়োগের সুফল আরেক দলের সরকার পেয়েছে। অন্তত এ বিষয়ে এই দুই দলের মধ্যে মতের মিল হবে, এটা আশা করা অসংগত নয়। দারিদ্র্য দূরীকরণে দলীয় সফলতার চুলচেরা সংখ্যাতাত্ত্বিক নিরূপণ সহজ নয়। যেমন সহজ নয় এ ক্ষেত্রে কতটা সরকারের, আর কতটা অসরকারের অবদান তা বের করা। অসরকারি খাতের এনজিও, বেসরকারি খাত, সাধারণ নাগরিক, নারীশক্তি—সবাই এতে ভূমিকা পালন করেছে। দারিদ্র্য কমে যাওয়ার এই সফলতায় নানা ধারা ক্রিয়াশীল—এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত নগরায়ণ, তৈরি পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানি খাত, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স, কৃষি খাত, সড়ক অবকাঠামো এবং ক্ষুদ্রঋণ। এসব খাত কেবল দেশজ বিকাশের কাজেই আসেনি, দারিদ্র্য দূরীকরণেও ভূমিকা রেখেছে।
দারিদ্র্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণের নীরব অবদানের কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে, যখন ক্ষুদ্রঋণ আবারও কাঠগড়ায়। ক্ষুদ্রঋণ এ দেশের দরিদ্র মানুষের সব সমস্যার সমাধান নয়। কোনো একক পলিসি বা প্রতিষ্ঠান দারিদ্র্যের সব সমস্যার সমাধান দিচ্ছে—এ দাবি কেউ করেনি। তার পরও ক্ষুদ্রঋণের বিপক্ষে কিছু অন্যায় অভিযোগ মাঝেমধ্যে শোনা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ক্ষুদ্রঋণে দরিদ্র মানুষের কোনো লাভ হয়নি। আমাদের হিসাবে, গত দুই দশকে গ্রামের দারিদ্র্য যতটা কমেছে, তার অন্তত এক-চতুর্থাংশ কমেছে কেবল ক্ষুদ্রঋণের কারণে। চরম দরিদ্র ব্যক্তিরাও এতে লাভবান হয়েছে পরোক্ষভাবে। যে এলাকায় ক্ষুদ্রঋণ গেছে, সেখানে কৃষি মজুরির হার বেড়েছে আরও বেশি হারে। চরম দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ক্ষুদ্র ঋণ পেয়েছেন, তাঁদের এক বড় অংশ বর্গা বাজারে প্রবেশ করেছেন—জমি রাখছেন বর্গায় বা বন্ধকে। বস্তুত এক হিসাবে, গত এক দশকে গ্রামে বর্গা বা বন্ধকের অধীন জমির পরিমাণ ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। কৃষি কাঠামোয় এটা একটা নীরব সামাজিক বিপ্লব বলা যায়। এর সুফল পেয়েছে দরিদ্র মানুষ, আর এর পরোক্ষ অর্থায়ন করেছে ক্ষুদ্রঋণ।
তবে সবার দারিদ্র্য যে সমান তালে কমছে, তা কিন্তু নয়। এই বদ্বীপের দেশে এখন দারিদ্র্যের সমস্যা সবচেয়ে বেশি সেসব এলাকায়ই, যেখানে পরিবেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। যেমনটা সমুদ্রবর্তী উপদ্রুত উপকূলে বা বেগবান নদীর পাড়, যেখানে ক্রমাগত ভাঙছে বা হাওর এলাকায়, যেখানে হঠাৎ বন্যায় গ্রাম নিমগ্ন জলপুরী, অথবা আদিবাসী-অধ্যুষিত দুর্গম পাহাড়ে, যেখানে নেই সহজ কাজের সংস্থান। এসব এলাকায় দরিদ্র ব্যক্তিরা সংখ্যায় কম হতে পারে, কিন্তু চরম দারিদ্র্যের মাত্রা এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এদের জন্য আলাদা করে ভাবা প্রয়োজন। এখন আমরা প্রতীক্ষায় আছি—কবে এ দেশে দারিদ্র্য ‘ইতিহাস’ হবে।
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।



Read entire article ->