বিত্ত ও বৈষম্য (Wealth and Inequality)

বিনায়ক সেন

১. টমাস পিকেটির নতুন বই
২০১৪ সালের মে মাসের ৭ তারিখে ৪৩ বছর পূর্ণ হলো টমাস পিকেটির। পিকেটি প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক। ঠিক এক মাস আগে বেরিয়েছে তাঁর দ্বিতীয় বই ‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’। চারপাশে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেছে এ বই নিয়ে। নোবেল জয়ী অর্থনীতির অধ্যাপক পল ত্রুক্রগম্যান এ বইয়ের আলোচনাই করেছেন ‘নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস’ শীর্ষক খ্যাতনামা পাক্ষিকে। বলেছেন, পিকেটির বই সম্ভবত ‘এক দশকের মধ্যে অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই’। এ বই ২০টি শিল্পোন্নত দেশের ওপর গত তিনশ’ বছরের তথ্য-উপাত্ত জড়ো করে পুনরায় বৈষম্যের প্রশ্নটিকে মেইন স্ট্রিম অর্থনীতির মূল প্রসঙ্গের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে। এখন বোঝা যায় কেন পুঁজিবাদকে রবীন্দ্রনাথ ‘যক্ষপুরী’ নাম দিয়েছিলেন। পিকেটি তাঁর বইয়ে যক্ষের ধন-সম্পদের সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মার্কস তার পুঁজি গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন কী করে পুঁজির ক্রমাগত সঞ্চয়নের (অ্যাকুমুলেশন) অবধারিত পরিণতি হচ্ছে সমাজে ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্য। পিকেটি-কর্তৃক সংগৃহীত উনিশ শতকের তথ্য মার্কসের এ দাবিকে সমর্থন করে। দৃষ্টিকটুভাবে বাড়তে থাকা আয়-বৈষম্যের পরিণতিতে এভাবেই দেখা দিয়েছিল ১৯১৪-১৮ সালের প্রথম মহাযুদ্ধ। অন্যদিকে সাইমন কুজেনেস গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি দেখালেন, জাতীয় আয়ে পুঁজির অনুপাতে ক্রমাগত বৃদ্ধি যে ঘটতেই থাকবে এমন কোনো কথা নেই। শিল্প-বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে এটা ঘটলেও পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত উন্নতি ও শিক্ষার বিকাশের কারণে জাতীয় আয়ে পুঁজির অনুপাত কমে আসবে বা এক জায়গায় স্থিতিশীল হবে। আয়-বৈষম্য গোড়ার দিকে বাড়লেও পরবর্তীতে কমতে থাকবে। দুই মহাযুদ্ধের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কুজনেস দেখালেন প্রথমে বাড়া ও পরে কমার এই প্রবণতা। অর্থাৎ মার্কসের উনিশ শতকীয় গবেষণা থেকে লাগামছাড়া বৈষম্য বৃদ্ধির যে চিত্র বেরিয়ে এসেছিল, তার বিপরীতে তাতে কুজনেস এক আশাবাদী চিত্র আঁকলেন। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম : পুঁজিবাদে যখন ঘর বেঁধেছি, তখন বৈষম্যে আর কী ভয়!

পিকেটির যুক্তি হচ্ছে, মার্কসের নেতিবাচক পূর্বাভাস কেবল আংশিকভাবে সত্য : শিল্পোন্নত দেশের কোনো কোনো পর্যায় সম্পর্কে তা খাটে। কিন্তু সবসময় নয়। একইভাবে তাঁর যুক্তি হচ্ছে, কুজনেসের আশাবাদী উচ্ছ্বাসের পেছনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই। দুই যুদ্ধের মধ্যকার সময়ে শিল্পমন্দার কারণে পুঁজির বিকাশ বিঘি্নত হয়েছিল। যুদ্ধের সময়ে অনেক পুঁজি-পণ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের দুই দশকে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেটের অভ্যুদয় ও ট্রেড ইউনিয়নের শক্তিশালী ভূমিকার কারণে পুঁজির লাগামছাড়া বৃদ্ধিকে কিছুটা রাশ টানা গিয়েছিল। ফলে ওই সময়-পর্বে বৈষম্য কিছুটা হ্রাস পেয়ে থাকবে। কিন্তু এ অবস্থাটা বদলে যায় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে এবং এখনও এর মধ্যেই আছি আমরা। এই সময়টা শ্রমের বিরুদ্ধে পুঁজির ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার কাল। জাতীয় আয়ে পুঁজির অংশ দ্রুত বাড়তে থাকে আবারও; আর শ্রমের অংশ ক্রমাগত কমতে থাকে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফের বাড়তে থাকে ধনী-গরিবে আয়-বৈষম্য। এই প্রবণতাটি ২০০০-এর দশকে মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পেঁৗছেছে। কিন্তু এটাই পিকেটির প্রধান বক্তব্য নয়।

তাঁর আরও দাবি :শিল্পোন্নত দেশে পুঁজির ক্রমাগত সঞ্চয়নের প্রক্রিয়ায় সমাজের ‘সর্বোচ্চ ১ শতাংশের’ হাতে আয় (ইনকাম) ও বিত্ত (অ্যাসেট) দুই-ই উত্তরোত্তর কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশ কেউই এর থেকে বাদ পড়ছে না। তাঁর আরও একটি দাবি, এসবই শুধু অর্থনীতির উপাদানের কারণে হচ্ছে না। ১৯৮০ সাল থেকে বৈষম্য-বৃদ্ধির যে ধারাবাহিক প্রবণতা পাই, তার পেছনে কাজ করেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকও। কোন শ্রেণীর জন্য কী ধরনের কর বসবে বা কী ধরনের ব্যাংক-অর্থায়ন নীতি গ্রহণ করা হবে, তা রাজনীতিতে যারা প্রভাবশালী তাদের দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে।

পিকেটির বইতে তিনশ’ বছরের বিচিত্রবিধ তথ্য সমাবেশের মধ্য দিয়ে এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক বয়ান উপস্থাপন করা হয়েছে। শিল্পোন্নত দেশের অভিজ্ঞতা তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন নির্মোহভাবে। এক্ষেত্রে তিনি মার্কসের সহযাত্রী। মার্কসের মতোই তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ‘পুঁজিবাদের মৌলিক কাঠামোগত দ্বন্দ্ব’ হচ্ছে এ ব্যবস্থায় অর্থনীতির ‘প্রবৃদ্ধি হারের’ তুলনায় ‘পুঁজির থেকে রিটার্নের হার’ বেশি করে বাড়তে থাকা। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পোন্নত দেশে বাৎসরিক প্রবৃদ্ধির হার যদি ১-২ শতাংশ, সেখানে পুঁজি বিনিয়োগে রিটার্নের হার হয় ৪-৫ শতাংশ (বলে রাখি, উন্নত দেশগুলোয় সর্বাধুনিক ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রযুক্তির ক্রিয়াশীলতার কারণে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় কখনোই ১-২ শতাংশের বেশি হয় না)। এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকটা দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ও যুদ্ধ-পরবর্তী এক-দুই দশকে কমে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধিতে রাশ টানা না গেলে তা শিল্পোন্নত দেশে উত্তরোত্তর বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা, এমনকি যুদ্ধ-বিপ্লব পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে পারে। এজন্যই পিকেটির বই নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট এত আতঙ্কিত।

এ অবস্থা থেকে পিকেটি অবশ্য যুক্তি খুঁজেছেন পুঁজির ওপরে ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে বাৎসরিক কর বসানোর মধ্যে। তাঁর মতে, পুঁজির রিটার্নের ওপর হস্তক্ষেপ করে লাভ নেই। কেননা এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা হবে। কিন্তু পুঁজির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর ক্রমবর্ধমান হারে কর বসানোই যেতে পারে। যেমন যাদের পুঁজির পরিমাণ ১০ লাখ ডলারের কম সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ বাৎসরিক কর, ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডলারের পুঁজি বা সম্পদ যাদের, তাদের ওপর ১ শতাংশ কর, ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ডলার পুঁজি বা সম্পদ যাদের তাদের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ কর, এভাবে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসানো যেতে পারে।

বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে পুঁজির উত্তরোত্তর মালিকানার ওপরে বর্ধিত হারে কর বসানোর পক্ষে অন্যবিধ উপাত্তও সম্প্রতি জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। ব্রিটেনে সরকারি পর্যায়ে পরিচালিত বিত্ত-জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৮-১০ সালে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পরিবার মোট বিত্তের ৪৪ শতাংশের অধিকারী। একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও। অবশ্য পিকেটির লেখায় উল্টো প্রবণতার কথাও উলিলখিত হয়েছে। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে যে দুটো শুভ প্রভাবকের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ধারাবাহিকভাবে প্রযুক্তিগত উন্নতির দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ও শিক্ষার সর্বাত্মক বিস্তারের মাধ্যমে শ্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি। চীন ও পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশ এ দুটো প্রভাবককে আশ্রয় করেই দ্রুত উন্নতি লাভ করেছে এবং এতে বিশ্বব্যাপী পুঁজি ও শ্রমের মধ্যকার বৈষম্যের মাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছুটা শুভ সূচনাও হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এসব উদাহরণ হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমিত। তার ওপরে, এসব দেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের পর্যায়ে শিল্পোন্নত দেশের মতোই দ্রুত বৈষম্য বৃদ্ধির অশুভ প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।

পিকেটি মন্তব্য করেছেন, পুঁজির উপরে প্রগ্রেসিভ হারে কর বসানোর নীতি কার্যকর করতে হলে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন। পুঁজি যে রকম বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বচ্ছন্দ ও সচল, সেখানে সে সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হতে পারে। তাকে ধরা অত সহজ নয়। কিন্তু পিকেটি এও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পুঁজির এই অতিমাত্রায় সঞ্চয়ন বা দৌরাত্ম্য ‘বাজার ব্যবস্থার কোনো ত্রুটির ফসল নয়’। বিশুদ্ধ ও নিখুঁত বাজার ব্যবস্থাতেও পুঁজির রিটার্নের হার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশিই হবে। আর এই ধারা থেকে গেলে বৈষম্য বাড়তে বাধ্য এবং এক পর্যায়ে লাগামছাড়া বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতাকে উস্কে দেবে। এই পয়েন্টে তিনি আবারও মার্কসের সহগামী; দু’জনেই পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত বিরোধ আবিষ্কার করতে চেয়েছেন।

অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থা পুঁজির এই বল্গাহীন বিকাশের ধারাকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। পিকেটি বলছেন :”ইয়েট পিওর অ্যান্ড পারফেক্ট কমপিটিশন ক্যান নট অল্টার দ্য ইনইকুয়ালিটি অব রিটার্ন অন ক্যাপিটাল বিইং গ্রেটার দ্যান দ্য রেট অব গ্রোথ অব ইকোনমি। দিস ইজ নট দ্য কনসেকুয়েন্স অব এনি মার্কেট ‘ইমপারফেকশন’।” শেষ পর্যন্ত তিনি সমস্যার মুক্তি খুঁজেছেন ‘পুঁজিবাদের ওপর গণতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়ার মধ্যে। ইউরোপিয়ান ডেমোক্রেসির সেরা ঐতিহ্য ধরে গণতন্ত্রকে গভীরতর, বিস্তৃততর ও পূর্ণতর করার মধ্যে। পিকেটির স্বদেশীয় প্যারিসবাসী দার্শনিক জাঁক দেরিদাঁ এ ক্ষেত্রে একই কথা বলেছিলেন নব্বইয়ের দশকে। পুঁজির শাসন তার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে; গণতন্ত্রকে এখন আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তবে সেই গণতন্ত্র দেরিদাঁর ভাষায় ‘এখনও আসতে বাকি’।

২. আমাদের ‘১ শতাংশ’
পিকেটি তাঁর নতুন বইয়ে দ্রুত বৃদ্ধিশীল বিত্ত-বৈষম্যের মূলে ক্রিয়াশীল দেখেছেন সংকীর্ণ এক শ্রেণীর কাছে পুঁজির ক্রমাগত হারে জড়ো হওয়াকে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাকে রোধ করার জন্য তিনি দু’ধরনের নীতির কথা বলেছেন। একটি হচ্ছে, পুঁজির বল্গাহীন কুক্ষিগতকরণের ধারাকে ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে কর বসিয়ে নিরুৎসাহিত করা। অন্যটি হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও শিক্ষার আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পুঁজির বিকেন্দ্রীভবন করা ও শ্রমের দক্ষতা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা। প্রথমটি যদি হয়ে থাকে ‘ডাইভারজেন্সকে’ কমিয়ে আনার নীতি, দ্বিতীয়টি তবে ‘কনভারজেন্স’কে লালন করার উপায়। দুঃখের বিষয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রযুক্তিগত উন্নতির বিকাশ খুবই অসম, এমনকি শিক্ষার সরলতম সূচকেও দেশে দেশে ব্যবধান এখনও অত্যন্ত দৃষ্টিকটু পর্যায়ে রয়েছে। আর দেশের ভেতরে প্রযুক্তির অধিকারে এবং শিক্ষার স্তরে/মানে ধনী-গরিবে বৈষম্য বা বৈপরীত্য আরও করুণ। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু জাতীয় আয়ে পুঁজি আর শ্রমের অধিকারের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে তাই নয়। বৈষম্য চোখে পড়ার মতো বেড়েছে শ্রমের ভেতরেই_ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে, হাইস্কুল থেকে ‘ঝরে পড়া শ্রমিক’ আর ‘কলেজ-শিক্ষিত শ্রমিকের’ মধ্যে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বল্প-শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের ব্যবধান ক্রমেই প্রকট হারে বাড়ছে। বাংলাদেশেও বাড়ছে। কিন্তু আমি এখানে পিকেটির মূল প্রতিপাদ্য শতাংশের হাতে ক্রমেই কুক্ষিগত হওয়া পুঁজি বা সম্পদ এ প্রসঙ্গে সবাইকেই আরেকটু ভাবতে বলব। কেননা,ম ‘১ শতাংশের ক্ষমতা’র প্রসঙ্গটি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে গত দুই দশকের গণতান্ত্রিক ডিসকোর্সের মধ্যে প্রায় অনালোচিত থেকে যাচ্ছে।

ব্যাপারটা সত্যি বিস্ময়কর। ১ শতাংশের সম্পদের প্রসঙ্গটি অনালোচিত থাকছে গণতন্ত্রের যুগেই! অথচ যখন গণতন্ত্র ছিল না, তখন এ নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হতো। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যগগনে, সেই সুদূর ষাটের দশকে, আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তেইশ পরিবারের’ নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ। পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ খাদিজা হক এই ‘তেইশ পরিবার’ শনাক্ত করেছিলেন; পরবর্তী সময়ে স্টিফেন হোয়াইট ‘একচলি্লশ পরিবারের’ সম্পদ নিরূপণ করেছিলেন। আরও পরে, সোভিয়েত অর্থনীতিবিদ সের্গেই বারানভ পূর্ব পাকিস্তানের সময়েই ‘১৬ জন বাঙালি পরিবারের’ তালিকা প্রণয়ন করেছিলেন, যার উল্লেখ রয়েছে রেহমান সোবহানের লেখায়। স্বাধীনতার পর আশির দশকে যখন গণতন্ত্র নেই এ দেশে, তখন আবারও নতুন করে ১ শতাংশের ক্ষমতার প্রসঙ্গ উঠেছিল। এই আলোচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের বামশক্তি। আমার বেশ মনে পড়ে, ১৯৮৭ সালের গোড়ার দিকে এক ঝকঝকে অপরাহ্নে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ বললেন, ‘দেশ আজ পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মতো দুই অর্থনীতিতে ভাগ হয়ে গেছে। এই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ করছে কতিপয় বৃহৎ ধনিক গোষ্ঠী ও পরিবার। আপনারা তাদের পরিসংখ্যান দিয়ে খুঁজে বার করুন।’ মোহাম্মদ ফরহাদের পরনে ছিল ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি এবং যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর চোখেমুখে এক শান্ত বিপ্লবী দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল। ততদিনে ‘একতা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বের হতে শুরু করেছে ‘ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনী’। এই মর্মে একটি বইও বেরিয়েছিল পরে মতিউর রহমান ও সৈয়দ আজিজুল হকের গ্রন্থনায়। পিকেটির ধৈর্য, দক্ষতা, সুযোগ ও অধ্যবসায় কোনোটাই আমাদের ছিল না। পরিসংখ্যানগতভাবে শতাংশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও বিত্তকে আমরা সেদিন তুলে ধরতে পারিনি। ১৯৮৮ সালে ‘বাংলাদেশে বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ’ শীর্ষক বাংলায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। মনে পড়ে, অধুনা-বিলুপ্ত ‘মুক্তির দিগন্ত’ নামক মাসিক পত্রিকায় (এটির কিছুটা কৌলীন্য ছিল সেকালে ‘ওয়ার্ল্ড মার্কসিস্ট রিভিয়্যু’র অনুবাদ-পত্রিকা হিসেবে)। তাতে ‘৩৬টি পরিবার’ শনাক্ত করা হয়েছিল যারা একই সাথে সে সময়কার ব্যাংক, বীমা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন, আবার সরকারি ব্যাংকের বৃহৎ ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিও ছিলেন। পরে ১৯৯১ সালে, প্রাইভেটাইজেশন নিয়ে ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে এ পরিবারগুলো নিয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলাম। অগ্রজ এমএম আকাশও সে সময় এ নিয়ে আলাদা করে লিখেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ‘১ শতাংশের প্রভাব’ নিয়ে আরও লেখা ও গবেষণার প্রয়োজন ছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, আমাদের ‘রাজনৈতিক সমাজ’ ও ‘সিভিল সমাজ’ কেউই গত দু’দশকে ‘১ শতাংশের ক্ষমতা’ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেননি।

আমাদের কর্তাব্যক্তিদের মাঝেমধ্যে বলতে শুনি, বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই যেমন, উন্নত বিশ্বে বৈষম্য নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে অথচ ‘এ দেশে তো আয়-বৈষম্য তেমন একটা বাড়ছে না’। বরং ২০০৫ ও ২০১০ সালের বিবিএস জরিপ হিসেবে নিলে দেখা যাচ্ছে, শহর এলাকায় আয়-বৈষম্য একই আছে অথবা কিছুটা যেন কমেছে! এঁদের যুক্তিতে, পিকেটির লেখা তাই এখানে অপ্রাসঙ্গিক। তা ছাড়া উন্নয়নের যে পর্যায়ে বাংলাদেশ এখন, সেখানে দারিদ্র্য কমাটাই মূল কথা; বৈষম্য যদি কিছুটা বেড়েও থাকে। তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাই কি?

বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান প্রবণতার যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পিকেটিকে আঠারো শতকের ফ্রান্সের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটতে হয়েছে (জেমস্কারা স্ট্যাটিসটিক হাতড়ানো লেনিনের মতো)। এমনকি ফিরে যেতে হয়েছে জেন অস্টেন বা বালজাকের উপন্যাসের পাতায়, যেখানে তাঁরা উল্লেখ করছেন পাত্র-পাত্রীর জমিদারি সম্পদ, বিনিয়োগ ও রিটার্নের কথা। তা ছাড়া ‘লুক্সেমবার্গ প্রকল্পের’ আওতায় পশ্চিম ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে সম্পাদিত হচ্ছে আয়-ব্যয় জরিপ। যুক্তরাষ্ট্রে ও যুক্তরাজ্যে প্রতি দু-তিন বছর অন্তর সম্পন্ন হচ্ছে ‘বিত্তের ওপর জরিপ’ বা ওয়েলথ সার্ভে। সম্পদ জরিপের কোনোটাই কখনও আমাদের দেশে হয়নি; এখনও হয় না। যেটা হয়ে থাকে, সেটা হচ্ছে খানা-পর্যায়ে আয়-ব্যয় জরিপ। কিন্তু তাতে অতি গরিবদের অংশগ্রহণ থাকে, গরিবের থাকে, মধ্যবিত্তের থাকে। কিন্তু শহর এলাকার (বিশেষত, ঢাকা ও চট্টগ্রাম) ধনিক পরিবারের বলতে গেলে অংশগ্রহণই থাকে না। আর ঢাকার অতি-ধনিক পরিবারদের ওপর আয়-ব্যয় জরিপ চালানোর মতো ক্ষমতা নেই বিবিএসের। কেননা, যারা প্রশ্নের উত্তর দেবেন তারা তো মহাপরাক্রমশালী। উত্তর দিতে না চাইলে কার সাধ্য তাদের বাধ্য করে! ফলে গবেষণা কর্মকর্তাদের ওই সব ধনাঢ্য পরিবারের ফটক থেকেই ফিরে আসতে হয়। সন্দেহ কি, এর ফলে তথ্য যা পাওয়া যায় তাতে মনে হতেই পারে, ২০০০-এর দশকে শহর এলাকায় আয়-বৈষম্যের মাত্রা নিরূপক জিনি-সহগের মাত্রা একই আছে। বেশ কমে গেলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকত না। কেননা, এর সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই এ নেহাতই পরিসংখ্যানগত ত্রুটিজনিত বিভ্রম।

আশির দশকের ‘অ-গণতান্ত্রিক’ প্রেক্ষিতের তুলনায় ২০১০-এর দশকের ‘গণতান্ত্রিক’ পরিবেশে আমাদের ১ শতাংশের বিত্ত, প্রভাব ও প্রতিপত্তি যে আরও অনেক গুণে বেড়েছে তার সপক্ষে সরাসরি তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সেকালে সহজেই সরকারি ব্যাংকের সূত্রে ঋণ-গ্রহণ ও খেলাপি ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা যেত। এখন ওয়ান-স্টপ ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো হয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে ওপরওয়ালার ইচ্ছা ব্যতীত অক্ষর-পরিমাণ তথ্য-পরিসংখ্যান বের করা কঠিন। সে সময় যারা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন তাঁরা নিজেরাই এখন ১ শতাংশ অথবা ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছেন। ‘সবকিছুই কালের ও শ্রেণী-স্বার্থের অধীন’ এ নিয়ম মেনে তারা সামরিক বহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ে নীরবতা পালন করছেন। ফলে গবেষকের কার্যোদ্ধার হওয়া এখন দুরূহ। বৃহৎ করদাতা যাঁরা তাঁরা কারা এবং তাঁদের কাছে সম্পদ কত, এটিও জানার উপায় নেই। এমনকি গবেষণার প্রয়োজনেও। তথ্য অধিকার আইনের প্রবেশ এখানে নিষিদ্ধ। তবে তারপরও কিছু পরোক্ষ সূচক তৈরি করা যায়, যার থেকে ১ শতাংশের ক্রমবর্ধমান বিত্ত ও প্রতিপত্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা মেলে।

দেশীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা আশির দশকের গোড়ায় যেখানে ছিল ৬-৭টি, এখন তার সংখ্যা ৩১। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ৮টি ইসলামিক কমার্শিয়াল ব্যাংক। অনুরূপভাবে বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা-পরিচালককে বোধকরি ১ শতাংশের মধ্যে গণ্য করা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত দেশের ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেলের উদ্যোক্তাদেরও। পত্রিকা মালিকদেরও। স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত, কোম্পানির সংখ্যা এ সময়ে বেড়েছে। এর মধ্যে ‘কনগ্গ্নমারেটের’ (শিল্প-ব্যবসা গ্রুপ যারা একাধিক খাতে বিচরণরত) সংখ্যাই ৩০টি। এরাও ১ শতাংশের মধ্যে পড়েন। বিশ বছর আগে ঢাকায় ডেভেলপারের সংখ্যা ছিল ৫টিরও কম। এখন ২৫০টির মতো। রিহ্যাবের প্রধান ৫০টি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গত দুই দশকে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে আনুুমানিক ৫-৬ লাখের মতো। ফ্ল্যাটের গড় মূল্য এই সময়কালে পরে প্রায় ১০-১৫ গুণ বেড়েছে। এই ফ্ল্যাট কেনার মতো অর্থ-বিত্ত যাঁদের হাতে তাঁরা ১ শতাংশ না হন, ৫ শতাংশের মধ্যে নিশ্চয়ই পড়েন। তবে এঁদের মধ্যে ১ শতাংশ চেনার উপায় হচ্ছে, কোন এলাকায় তাদের বাস ও একাধিক ফ্ল্যাট বা বাড়ি আছে কি-না সে তথ্য। আমি একজনকে জানি, যার ঢাকা শহরে ৬০টির বেশি ফ্ল্যাট আছে। আর একাধিক ফ্ল্যাট আছে অনেকেরই।

এই ধনাঢ্য শ্রেণী কোনো সম্পদ-কর দেন না। কেননা আমাদের দেশে কোনো ওয়েলথ-ট্যাক্সের প্রথা নেই। সম্পদ-করের কথা শুনলেই কেউ কেউ অপ্রাসঙ্গিক, অযৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয় এ ধরনের কথা বলতে থাকেন। এ কর আছে ভারতসহ বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশে ও প্রায় সব উন্নত দেশেই। ভারতে ১ শতাংশ হারে এ কর বসানো হয়ে থাকে ‘নিট’ পরিসম্পদের ওপর। অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্যায়নে গৃহীত ঋণ বাদ রাখা হয়। দ্বিতীয় ফ্ল্যাট বা জমির প্লটই (সেটা শহরের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে হলে) শুধু সম্পদের মধ্যে ধরা হয়। ভারতীয় মূল্যে ৩০ লাখের ওপরে সম্পদ যাদের তাদের ক্ষেত্রেই ১ শতাংশ সম্পদ-কর বসানো হয়। আমরা পিকেটির যুক্তি অনুসারে এখানেও ‘প্রগ্রেসিভ’ হারে পুঁজি বা সম্পদের ওপরে কর ধার্যের সুপারিশ করতে পারি। এতে অনায়াসে প্রতি বছরে অতিরিক্ত ১০০০-২০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসবে, যা অতি-দরিদ্রের ‘উপরে টেনে তোলা’ ক্ষেত্রে ব্যয় করা যায়। বর্তমানে ধনী ব্যক্তির আয়করের ওপর ‘সারচার্জের’ নামে যা আহরিত হয় তার পরিমাণ অতি-নগণ্য (গত বছরে ছিল মাত্র ১৩১ কোটি টাকার মতো)।

কিন্তু শুধু সম্পত্তি কর বসিয়ে এই ১ শতাংশের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এদের আর্থিক প্রভাব আছে, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। নির্বাচনী ব্যয় ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংস্কার না এলে এই প্রভাব চলতেই থাকবে। গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে রাজনৈতিক সমাজ নয়, বরং যাদের দ্বারা তারা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত_ সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ‘১ শতাংশ’ শ্রেণী। কালক্রমে এমনকি রাজার চেয়েও অধিক পরাক্রমশালী হয়ে দাঁড়াতে পারে এই শ্রেণীর প্রভাব-প্রতিপত্তি। যক্ষপুরীর রাজা এক সময় এ কথা বুঝতে পেরে তার নিজেরই গড়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নন্দিনীর সাহায্য চেয়েছিলেন। যক্ষের ধন জড়ো করার মধ্যে জীবনের সহজ সুখ নিহিত নেই। রক্তকরবী নাটকের এই ছিল মর্মবাণী। নন্দিনীকে রাজা তাই বলেছিলেন :’আমার যা আছে সব বোঝা হয়ে আছে। সোনাকে জমিয়ে তুলে তো পরশমণি হয় না’। পিকেটি ক্রমবর্ধমান বিত্ত-বৈষ্যমের অশুভ পরিণতির দিকে দৃষ্টিপাত করে আমাদের এ সরল সত্যের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

বিনায়ক সেন
লেখক
প্রাবন্ধিক
গবেষক

Original post on Samakal here.

রবীন্দ্রনাথ ও মধ্যপ্রাচ্য (Tagore and the Middle East)

বিনায়ক সেন

১. সভ্যতার সংঘাত
Rabindranath Tagore
বার্লিন দেয়াল পতনের দু’বছরের মাথায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হলো স্যামুয়েল হান্টিংটনের নাটকীয় থিসিস_ ‘সভ্যতার সংঘাত’। ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থি রক্ষণশীলদের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক। সেখানেই হান্টিংটন এ বক্তৃতাটি দিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে প্রভাবশালী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে থিসিসটি আরও সুসংগঠিতভাবে প্রকাশ পেল। সেখানে তিনি যা লিখলেন তা অনুবাদে দাঁড়ায় মোটামুটি এ রকম :’আজকের পৃথিবীর সমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মৌলিক উৎস এবার থেকে আর ভাবাদর্শ বা অর্থনৈতিক কার্যকারণের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের প্রধান উৎস হবে সাংস্কৃতিক। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়া জাতি-রাষ্ট্রসমূহ এবার থেকে সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কারণেই পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে। সভ্যতার সংঘাত এবার থেকে বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ামক শক্তি হয়ে দেখা দেবে। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যেকার বিভেদরেখা ধরেই আগামী দিনের যুদ্ধের রেখা নির্মিত হবে।’ ‘বিভিন্ন সভ্যতা’ মানে পাশ্চাত্য (পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা) সভ্যতার সাথে অন্যসব সভ্যতার লড়াই। তবে নন-ওয়েস্টার্ন সভ্যতাসমূহের মধ্যে হান্টিংটন বিশেষ করে চিহ্নিত করেছিলেন ইসলাম প্রভাবিত সভ্যতা বা মুসলিম সভ্যতাকে। ভারত ও রাশিয়াকে ফেললেন ‘সুইং সভ্যতা’র কাতারে, অর্থাৎ একপ্রকার দোদুল্যমান মিত্র হিসেবে। ‘আমরা এবং তারা’_ এই লড়াই কার্যত দাঁড়িয়ে গেল পাশ্চাত্য বনাম ইসলামী সভ্যতার লড়াইয়ে। হান্টিংটনের বইয়ের পূর্ণ শিরোনাম ছিল ‘সভ্যতার সংঘাত এবং বিশ্বব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস’। সভ্যতার সংঘাত_ এই শব্দবন্ধটি অবশ্য তার আগেই ব্যবহৃত হয়েছে ১৯২৬ সালের একটি বইয়ে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে বেসিল ম্যাথিউস লিখেছেন অনুসন্ধানী গ্রন্থ :’ইয়াং ইসলাম অন ট্রেক :স্টাডি ইন দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস্’। এ বই প্রকাশের ৬ বছর পরে ১৯৩২ সালে পারস্যে যাবেন রবীন্দ্রনাথ। মূলত ইরান এবং অংশত ইরাক ভ্রমণের বিবরণী নিয়ে লেখা হবে ‘পারস্য যাত্রী’। উপমহাদেশের বাইরে এটাই হবে তার শেষ বিদেশ ভ্রমণ। তবে নিছক ভ্রমণ কাহিনী ছিল না বইটি। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, বিশেষত মুসলিম সভ্যতার সাথে ঘনিয়ে ওঠা সংঘাত-তত্ত্ব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ দেখা যাচ্ছে অবহিত ছিলেন। এ নিয়ে বইয়ের নানা স্থানে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে, যার পদ্ধতিগত দৃষ্টিকোণ ও সমকালীন গুরুত্ব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এ নিয়েই কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছি এখানে।

২. আকাশ-সাম্রাজ্যবাদ
‘দূরত্ব’ তৈরি করতে পারলে অন্যপক্ষকে শত্রুপক্ষ ভাবা সহজ এবং সেই শত্রুর বিনাশ সাধনও অনায়াসসাধ্য হয়ে ওঠে। সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্বের মূলে রয়েছে নানা সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে অপরিচিতের দেয়াল তুলে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা। বিভিন্ন গোত্র, জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে অচেনা দেয়াল তুলে বৈরী ভাবনা সৃষ্টির প্রয়াসের বিরুদ্ধে কোরআন শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে :’আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতিতে ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হতে পার।’ অপরিচিতকে সহজেই হত্যা করা যায় এবং এ কাজে প্রযুক্তিগত উন্নতি বাড়তি উৎসাহ যোগাতে পারে। এখানে ‘দূরত্ব’ বলতে শুধু ভৌগোলিক দূরত্বকে বোঝানো হচ্ছে না; মানস ভূগোলের ব্যবধানকেও নির্দেশ করা হচ্ছে। জাতিতে জাতিতে ‘দূরত্ব’ সৃষ্টি করার জন্য চাই নয়া ধারাভাষ্য, নতুন জ্ঞান-উৎপাদন; যার মাধ্যমে আপনকে পর, পরকে শত্রু এবং শত্রুকে দূর থেকে অধুনাতন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই নির্মূল করা সম্ভব। দূরত্ব-সৃষ্টির মাধ্যমে ‘অপরায়ন’ (মানে পর করে দেওয়ার) রাজনীতি ও এর আধুনিক কলাকৌশল রবীন্দ্রনাথের চোখে ধরা পড়েছিল। তখন সবেমাত্র মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী ভাগবাটোয়ারা শেষ হয়েছে, যদিও খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ও প্রতিরোধ চলছে বিভিন্ন অঞ্চলেই। এই পরিস্থিতিতেই মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন (দীর্ঘ উদৃব্দতি কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিধায় তুলে দিচ্ছি):

“বোগদাদে ব্রিটিশদের আকাশফৌজ আছে। সেই ফৌজের খ্রিস্টান ধর্মযাজক আমাকে খবর দিলেন, এখানকার কোন শেখদের গ্রামে তারা প্রতিদিন বোমাবর্ষণ করছেন। সেখানে আবালবৃদ্ধবনিতা যারা মরছে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঊর্ধ্বলোক থেকে মার খাচ্ছে; এই সাম্রাজ্যনীতি ব্যক্তিবিশেষের সত্তাকে অস্পষ্ট করে দেয় বলেই তাদের মারা এত সহজ। খ্রিস্ট এসব মানুষকেও পিতার সন্তান বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু খ্রিস্টান ধর্মযাজকের কাছে সেই পিতা এবং তার সন্তান হয়েছে অবাস্তব; তাদের সাম্রাজ্য-তত্ত্বের উড়োজাহাজ থেকে চেনা গেল না তাদের; সেজন্য সাম্রাজ্যজুড়ে আজ মার পড়ছে সেই খ্রিস্টেরই বুকে। তাছাড়া উড়োজাহাজ থেকে এসব মরুচারীকে মারা যায় এতটা সহজে, ফিরে মার খাওয়ার আশঙ্কা এতই কম যে, মারের বাস্তবতা তাতেও ক্ষীণ হয়ে আসে। যাদের অতি নিরাপদে মারা সম্ভব, মারওয়ালাদের কাছে তারা যথেষ্ট প্রতীয়মান নয়। এই কারণে, পাশ্চাত্য হননবিদ্যা যারা জানে না, তাদের মানবসত্তা আজ পশ্চিমের অস্ত্রীদের কাছে ক্রমশই অত্যন্ত ঝাপসা হয়ে আসছে।”

আকাশের দূরত্ব থেকে দেখলে নিচের মানুষের অস্তিত্ব মানবেতর পর্যায়ে চলে যায়, আর সে অবস্থায় প্রযুক্তি সহায়ক হলে মানব-হত্যায় আত্মার সন্তাপ হয় আরও কম। বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ-বর্ণিত বাগদাদে আমরা দেখিনি কি আকাশ থেকে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ বা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আফগানিস্তানে উপর্যুপরি ‘ড্রোন আক্রমণ?’ সরাসরি নৈকট্যে কমান্ডো সৈন্য পাঠিয়ে গুলিবর্ষণের চেয়ে অন্তরীক্ষে থেকে মনুষ্যবিহীন স্বয়ংক্রিয় রিমোট চালিত বিমান (ড্রোন) আক্রমণ অনেক বেশি ‘বিবেকসম্মত পন্থা’ বলে পাশ্চাত্যে বিবেচিত হয়েছে! একেই লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক তত্ত্ব নির্মিত উড়োজাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে।’ সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্ব এ রকমই একটি আক্রমণাত্মক-তত্ত্ব নির্মিত উড়োজাহাজ যা বুশ, সাদ্দাম, ব্লেয়ার, লাদেন সবাইকেই একযোগে ককপিটে বহন করতে সক্ষম। দাঙ্গা বাধানোয় কুশলী শ্যারন বা হালের মোদিও এর থেকে বাদ যাবেন না। সমস্যা জট পাকিয়েছে শুধু পাশ্চাত্যের মনের গভীরে নয়, সংকট দেখা দিয়েছে প্রাচ্যেও। এ যুগে নৈর্ব্যক্তিক মনন মানবতাবিদ্ধ না হলে হয়ে উঠতে পারে আবেগ-অনুভূতিহীন মারের যন্ত্র_ আ কিলিং মেশিন।

গীতায় অর্জুন যে আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে বন্ধু-স্বজনদের ওপরে অস্ত্রাঘাতে শেষ পর্যন্ত বিব্রত হলেন না, অর্জুন-বিষাদ যে এত ক্ষণস্থায়ী হলো, এর পেছনেও রয়েছে সাম্রাজ্য-বিস্তারের অমোঘ যুক্তি। তার মানে বিষয়টা শুধু পাশ্চাত্যের লোভের আগ্রাসনের নয়, সমস্যাটা প্রাচ্য-মনেরও। অর্জুন দক্ষ তীরন্দাজ। যোজন যোজন দূরত্বে থেকে নিষ্কাম মানসলোকে ডুবে গিয়ে সে যখন ‘শতঘ্নী বর্ষণ করতে বেরোয়, তখন সে নির্মমভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে; যাদের মারে তাদের অপরাধের হিসাববোধ উদ্যত বাহুকে দ্বিধাগ্রস্ত করে না। কেননা হিসাবের অঙ্কটা অদৃশ্য হয়ে যায়। যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আঁধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়োজাহাজ-অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে দেখলে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর।’ দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্যের নিরাবেগ যুক্তির দর্শন ও প্রাচ্যের নিরাবেগ মোহমুক্তির দর্শন মিলতে পারে। মিলছে একই মারের বিন্দুতে_ একই ক্ষমতা প্রয়োগের ভরকেন্দ্রে। ‘সেখান থেকে যাদের ওপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য’ বুঝি এই যে_ শরীরের মৃত্যু হয়, কিন্তু আত্মার মৃত্যু হয় না! এভাবেই নিঃসহায়রা যুগে যুগে পড়ে পড়ে মার খেয়েছে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য দর্শনের এক অন্ধকার দিকের এই রবীন্দ্র-কৃত ব্যাখ্যা আমাদের চেতনাকে সচকিত করে দেয়। ‘সেন্টিমেন্টের বালাই নেই’ এমন আধুনিক যুগকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিমনস্কতার নামে বরণ করতে রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। নবযুগের পুষ্পক-রথ, দিব্যাস্ত্র বা গাণ্ডীবের টংকার কোন দেবত্বকে ইঙ্গিত করে না। ‘জাভাযাত্রীর পত্রে’ তাই তিনি নিদ্বর্িধায় লিখতে পেরেছিলেন, ‘এই পৃথিবীতে মানুষ যদি একেবারে মরে, তবে সে এই জন্যেই মরবে_ সে সত্যকে জেনেছিল কিন্তু সত্যের ব্যবহার জানেনি। সে দেবতার শক্তি পেয়েছিল, দেবত্ব পায়নি।’ ‘পারস্য যাত্রী’তে এ নিয়ে পাশ্চাত্যকে দুষেছেন এই বলে যে, ‘য়ুরোপ দেবতার অস্ত্র পেয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে দেবতার চিত্ত পায়নি।’ অন্যদিকে প্রাচ্য এত ধর্মাশ্রিত ধর্ম নিয়ে কথা বললেই গায়ে ফোস্কা’ পড়ে যায়, তবু ধর্মের স্থৈর্য্য ও ধৈর্য তার অর্জন হয় নি।

৩. হাফেজ-সাদির দেশে
গর্বাচভের চরিত্রে একটি বড় ত্রুটি ছিল রাজনৈতিক দ্বিধা ও সংশয়ের ভেতরে বিরামহীনভাবে ভুগতে থাকা। তাঁর অনিচ্ছুক পৌরোহিত্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। কিন্তু সব পতন-স্খলনের মধ্যে একটি সত্য-উপলব্ধি ছিল তাঁর। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, সত্যের ওপরে মার্কসবাদীদের একচেটিয়া অধিকার নেই এবং কোনো ভাবাদর্শই মানবকল্যাণের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আগুনের, পরে যেমন মানুষের সভ্যতা-নিরপেক্ষভাবে অধিকার রয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপরে যেমন রয়েছে, বাজার-ব্যবস্থার, পরেও তেমনভাবেই স্বাভাবিক দাবি রয়েছে। মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশে আগুন আবিষ্কারের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল পণ্য-বিনিময় ব্যবস্থা তথা পণ্য-অর্থনীতির আবিষ্কার। সমাজতন্ত্রের অর্থনীতিতেও নিতান্ত ভাবাদর্শ-তাড়িতভাবে অন্ধ না হলে এই পণ্য-অর্থনীতির সর্বাধুনিক ব্যবহার হতে পারত। পারস্যে আসার ঠিক দু’বছর আগে ‘রাশিয়ার চিঠি’তে রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, মানুষের স্বভাবের সঙ্গে সহজেই মেলে এমন রীতিনীতির সঙ্গে আপোসরফা করা প্রয়োজন। কিছু কিছু প্রগতির ধারণা জন্মায় হয়তো কোনো বিশেষ দেশ বা ভূগোলে, কিন্তু তাতে সহজাত অধিকারবোধ করে সব দেশের ও সভ্যতার মানুষই। অক্টোবর বিপ্লবের বৈষম্য-বিরোধী ধারণাও তেমনি। বিপ্লবের এত বছর পরেও ‘বৈষম্যকে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না’ এই ধারণার মৃত্যু হয়নি। রাশিয়ায় গিয়ে এই ধারণার প্রতি যেমন আকৃষ্ট হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, পারস্যে গিয়ে তেমনি মরমীবাদের ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। হাফিজ-সাদী বা রুমীর কবিতার প্রতি যেমন। পারস্যের এই মরমি কবিদের মধ্য দিয়ে ইসলামি সভ্যতার যে পরিচয় মেলে তা চিরকালের অনুভূতি; সব ধর্মের ও সংস্কৃতির মানুষের কাছেই তা আদরণীয় সঞ্চয়। ঠিক এই যুক্তিতেই ইউরোপের চেয়ে পারস্যেই তাঁকে ভালো বুঝতে পারবে এ কথা কবি বিশ্বাস করতেন : ‘কাব্য পারসিকদের নেশা, কবিদের সঙ্গে এদের আন্তরিক মৈত্রী। আমার খ্যাতির সাহায্যে সেই মৈত্রী আমি কোনো দান না দিয়েই পেয়েছি। অন্য দেশে সাহিত্যরসিক মহলেই সাহিত্যিকদের আদর, পলিটিশিয়ানদের দরবারে তার আসন পড়ে না। এখানে সেই গণ্ডি দেখা গেল না। যাঁরা সম্মানের আয়োজন করেছেন তারা প্রধানত রাজদরবারিদের দল। মনে পড়ল ঈজিপ্টের কথা। সেখানে যখন গেলেম রাষ্টনেতারা আমাদের অভ্যর্থনার জন্যে এলেন। বললেন, এই উপলক্ষে তাদের পার্লামেন্টের সভা কিছুক্ষণের জন্যে মুলতবি রাখতে হলো। প্রাচ্যজাতীয়ের মধ্যেই এটা সম্ভব। এদের কাছে আমি শুধু কবি নই, আমি প্রাচ্য কবি। সেই জন্যে এরা অগ্রসর হয়ে আমাকে সম্মান করতে স্বভাবত ইচ্ছা করেছে, কেননা সেই সম্মানের ভাগ এদের সকলেরই।’

নোবেলপ্রাপ্তির পর সেলিব্রেটির প্রতি আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই আগ্রহবোধের মধ্যে আত্মীয়তাবোধের প্রকাশ দেখেছেন। ‘ইন্দো-এরিয়ান’ সূত্রে পারস্যের সঙ্গে তার ‘রক্তের সম্পর্ক’ রয়েছে এ কথা অনুমানের পর আসল কথাটা পাড়লেন : ‘এখানে একটা জনশ্রুতি রটেছে যে, পারসিক মরমিয়া কবিদের রচনার সঙ্গে আমার লেখার আছে স্বাজাত্য। … বিনা বাধায় এদের কাছে আসা সহজ, সেটা স্পষ্ট অনুভব করা গেল। এরা যে অন্য সমাজের, অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের, অন্য সমাজগণ্ডির, সেটা আমাকে মনে করিয়ে দেবার মতো কোনো উপলব্ধি আমার গোচর হয়নি।’ মরমিয়া কবি বা সুফী-সাধকের সঙ্গে নিজের মিলের প্রসঙ্গ পারস্যে এসেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম আবিষ্কার করলেন এমনটা নয়। তিনি নিজেকে সুফী-সাধক কবিদের কাছের লোক বলেই ভেবেছেন বহুকাল থেকে। পারস্যে উষ্ণ অভ্যর্থনার উত্তরে তিনি তাঁর ‘সুফী’ পরিচয়টাকেই বিশেষ করে তুলে ধরেছিলেন : ‘আপনাদের পূর্বতন সুফী-সাধক কবি ও রূপকার যাঁরা আমি তাঁদেরই আপন, এসেছি আধুনিক কালের ভাষা নিয়ে; তাই আমাকে স্বীকার করা আপনাদের পক্ষে কঠিন হবে না।’ বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অনর্গল ফার্সি জানতেন। কবির নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ‘আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তাঁর মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল।’ অন্যত্র লিখেছেন, ‘অবশেষে হাফেজের সমাধি দেখতে বেরোলুম, পিতার তীর্থস্থানে আমার মানস অর্ঘ্য নিবেদন করতে।’ দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ার মতো ভিন্নতর অর্থে পারস্যও তাঁর কাছে সভ্যতার এক ‘তীর্থস্থান’ বলে মনে হয়েছিল। সেটা শুধু আচার্য পিতৃদেবের স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ নিবেদনের সুবাদে তাঁর নে এসেছিল এরকম ভাষার কোন কারণ নেই। এর প্রধান কারণ ছেলেন তিনি নিজেই। পারস্য-যাত্রার বহু আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভেতরে মধ্যপ্রাচ্য, ইসলাম ও মরমীবাদের প্রতি আগ্রহ দেখে দিয়েছিল। ব্যক্তিগত আকর্ষণ থেকেই তিনি সুফীবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

রবীন্দ্রনাথ যে সময়ে বেড়ে উঠেছেন তখন সুফীবাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কোন ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ছিল না। রামমোহন স্বয়ং ব্রাক্ষ্ম মতের প্রচারে খ্রিস্টীয় ইউনিটেরিয়াল চার্চ-এর পাশাপাশি কোরআন ও ইসলাম থেকে প্রেরণা লাভ করেছিলেন। মুতাজেল্লা সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী ধরো তাঁকে বাড়তি উৎসাহ দিয়েছিল।

কিন্তু এরকম সে আমলে অনেকেই ছিলেন। ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ‘কালচারের লড়াই’ (১৯৩০) বলে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে মোহাম্মদ আহবাব চৌধুরী বিদ্যাবিনোদ কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের জীবন-চরিত থেকে একটি উদ্ধৃতি দেন।তাতে লেখা : ‘ফির্দ্দোসি, সাদি, ওমর খৈয়াম, জামি, জালাল উদ্দিন রুমী প্রভৃতি পারস্যের বাণীপুত্রগণও তাঁহার সথা ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র বাহ্যিক আচারে হিন্দু হইলেও অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে তিনি ভক্ত সুফী হইয়া উঠিয়াছিলেন।

দুই পক্ষেই এটা ঘটেছিল। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘পারস্য প্রতিভা’ গ্রন্থে মুক্তবুদ্ধির চিন্তাবিদ মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ্ ইসলামী ধারায় সুফীমতের গুরুত্ব বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। তিনি এ-ও দেখিয়েছিলেন যে কোরআনের শিক্ষার সাথে উপনিষদের ব্রক্ষ্মসূত্রের ‘সুন্দর ঐক্য’ রয়েছে : ‘বেদান্তের সহিত সুফীমতের প্রধান সাদৃশ্য _ এ উভয়ই শুধু একেশ্বরবাদ নহে অধিকন্তু উভয়ের চৈতন্যে বিশ্বাসী অদ্বৈতবাদ।’ পারস্যে যাত্রার আগে ‘পারস্য প্রতিভা’ বইটি রবীন্দ্রনাথের হাতে পেঁৗছেছিল কিনা জানি না, তবে সন্দেহ নেই। অবশ্য বরকতুল্লাহ্র যুক্তির সাথে পরবর্তী সময়ে আহমদ শরীফের বিশ্লেষণে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি ‘বাঙালি ও বাঙলা সাহিত্য’ গ্রন্থে পারস্যের সুফীমতকে দ্বৈতবাদীদের দলে ফেলেছেন : ‘কুফায়াকুল’ দ্বৈতবাদের পরিচায়ক। পক্ষান্তরে ‘একোহম বহুস্যাম’ অদ্বৈতবাদ নির্দেশক। সুফীরা মুসলমান, তাই দ্বৈতবাদী, কিন্তু অদ্বৈত সত্তার অভিলাষী। বৈষ্ণবগণ ব্রহ্মবাদের প্রচ্ছায় গড়া, তবু তাদের সাধনা চলে দ্বৈতবোধে এবং পরিণামে অদ্বৈত সত্ত্বার প্রয়াসে। সুফী ও বৈষ্ণব উভয়েই পরনের কাঙালি।… সুফীমতবাদের সাথে বৈষ্ণবাদর্শের আত্যান্তিক সাদৃশ্য ও আচারিক মিল।’ আমাদের পক্ষে এসব গূঢ় তত্ত্বালাপের মর্মার্থ বোঝা সহজ নয়। কিন্তু যেটা লক্ষ্য করার_ তা হলো বিভিন্ন ধর্মের ও দর্শনের মধ্যে ‘সংঘাত যতটা, মিলের বা দেওয়া-নেওয়ার প্রবণতাও ইতিহাসে ততটা কম নয়। এই ‘মিলের ইতিহাস’ লিখতে গেলে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পারস্যবাসী মরমী বন্ধুদের পাশাপাশি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সুফীতত্ত্বের স্থানীয় বিকাশের প্রসঙ্গ চলে আসবে। হাফেজকে যে বাংলার শাসক একবার বেড়িয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন, তা এমনি এমনি নয়_ তার পেছনে সভ্যতার সংলাপের সাংস্কৃতিক তাগিদও কাজ করেছিল। রবীন্দ্রনাথের একাধিক বক্তৃতায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই তাগিদ থেকেই। ১৯১৫ সালে মুসলমান ঘরে জন্ম নেওয়া কিন্তু সন্ত রামানন্দের শিষ্য কবীরের কবিতার ইংরেজি তর্জমা প্রকাশের উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ। এর আগে ও পরে আর কেউই কবীরের কবিতা অনুবাদে প্রবৃত্ত হননি বস্তুত। বেদান্ত, সুফীবাদ বৈষ্ণব ও বাউল ভাবের দর্শনের সাথে কবির একান্ত ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার একটি অলিখিত ইতিহাস রয়ে গেছে আজ অবধি। অন্ধ অনুসরণের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি অনীহা থেকেই রবীন্দ্রনাথ এটা করেছিলেন। কবীরের ইংরেজি তর্জমার ভূমিকায় কবীর সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক এভলিন আন্ডারহিল লক্ষ্য করেন যে, কবীরের গানে পারস্য মরমী কবিদের (আত্তার, সাদি, রুমি, হাফেজ) গভীর প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন ধারার ও ধর্মের মরমী দর্শনের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত ছিল কবীরের। এভলিনের একথাটি রবীন্দ্রনাথের নিজের ক্ষেত্রেও খাটে। তাঁর ‘মনের মানুষ’-এর ধারণাটি কোন বিশেষ ধর্মের বা ঘরানার মধ্যে পড়ে না। এর মধ্যে নানা ধর্মের মরমীবাদের ছায়ামতি ঘটেছে যেমন, নিজস্ব ধর্ম নিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী চিন্তারও প্রভাব পাই। কিন্তু তা ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব সত্ত্বেও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নিজস্ব একান্ত মরমী ভাবাদর্শকে তিনি কখনো প্রয়োগ করতে চাননি। জানতেন, এতে করে মরমী দর্শন ও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা কোনো অংশেরই কল্যাণ সাধন হবে না। মরমীবাদে ব্যক্তিজীবনে ধ্যানকেন্দ্রী হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাকে রেখেছিলেন নিরঙ্কুশ ধর্মনিরপেক্ষতায়_ ইহজাগতিকতার চৌহদ্দিতেই। যখন সুফী-সাধক বলে নিজেকে পরিচিত করাচ্ছেন তখনও পারস্যের বিদ্বৎ সমাজকে জানাতে ভোলেননি যে, তিনি ইউরোপের আধুনিকতারও সমঝদার। ইউরোপের যা সভ্যতা তা গ্রহণ করতে হবে।

৪. অন্ধ ধর্মাচারের বোঝা
সভ্যতার সংঘাত-তত্ত্বের বয়ান করে হান্টিংটন নবপর্যায়ে পাশ্চাত্যের কূটনীতির মূল অভিপ্রায়কে ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র। কিন্তু সংঘাত-তত্ত্বের দায়দায়িত্ব প্রাচ্যও এড়াতে পারে না। অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের ও মিথ্যে ধর্মাচারের দৌরাত্ম্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানা লেখায়, প্রবন্ধে ও চিঠিপত্রে আক্ষেপ করেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাস ক্রমশ একটি খাদের দিকে গড়িয়ে চলছিল, এ কথা তিনি জানতেন। ধর্ম-বিভক্ত সমাজে কী করে সত্যিকারের ধর্মবোধ জাগ্রত হতে পারে সার্বিক মানবকল্যাণকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনে এর জন্য তিনি দেশে-বিদেশে শুভ দৃষ্টান্ত খুঁজে বেড়াতেন। তুরস্কের কামাল আতার্তুক মোল্লাতন্ত্রকে বশে এনেছেন বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “কামাল পাশা বললেন মধ্যযুগের অচলায়তন থেকে তুরস্ককে মুক্তি নিতে হবে। তুরস্কের বিচার বিভাগের মন্ত্রী বললেন : মেডিয়াভেল প্রিন্সিপলস্ মাস্ট গিভ ওয়ে টু সেক্যুলার ল’স। উই আর ক্রিয়েটিং আ মডার্ন, সিভিলাইজড্ নেশন।” মধ্যযুগের শাসন থেকে তুরস্ককে বেরিয়ে আসতে হবে, কেননা ‘পরিপূর্ণভাবে বুদ্ধিসঙ্গতভাবে প্রাণযাত্রা নির্বাহে বাধা দেয় মধ্যযুগের পৌরাণিক অন্ধ সংস্কার’। এর জন্য প্রয়োজনে যেন কিছুটা বল প্রয়োগেও কবি প্রস্তুত : ‘আধুনিক লোক ব্যবহারে’ মধ্যযুগের অন্ধ সংস্কারের প্রতি ‘নির্মম হতে হবে’ এই ছিল কামাল পাশার অনুসারীদের ঘোষণা। অন্যদিকে ইরানের রেজা শাহ ছিলেন কসাক সৈন্য দলের অধিপতি মাত্র, বিদ্যালয়ে ‘য়ুরোপের শিক্ষা তিনি পাননি’, এমনকি ‘পারসিক ভাষাতেও তিনি কাঁচা’। এসব বলার পর প্রশস্তির সুরে বললেন, ‘আমার মনে পড়ল আমাদের আকবর বাদশাহের কথা। কেবল যে বিদেশির কবল থেকে তিনি পারস্যকে বাঁচিয়েছেন তা নয়, মোল্লাদের আধিপত্য জালে দৃঢ়বদ্ধ পারস্যকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রতন্ত্রকে প্রবল ও অচল বাধা থেকে উদ্ধার করেছেন।’ কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক, রেজা শাহ্র ইরান তার পক্ষপাতিত্ব কোন দিকে তা বেশ বোঝা যায়।

আর উপমহাদেশ? হাফেজের সমাধি যেখানে সেখানকার গভর্নরকে কবি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জটিল ধর্মের পাকে আপাদমস্তক জড়িভূত’ যে ভারতবর্ষ তার মুক্তি আসবে কীভাবে? উত্তরে গভর্নর বললেন, ‘সাম্প্রদায়িক ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে যতদিন না ভারত একাত্ম হবে’ ততদিন এই সমাজের নিষ্কৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ তারপর আক্ষেপ করে বলছেন, ‘অন্ধ আচারের বোঝার তলে পঙ্গু আমাদের দেশ, বিধিনিষেধের নিরর্থকতায় শতধাবিভক্ত আমাদের সমাজ।’ হাফেজের সমাধিতে যখন গেছেন, দেখলেন সমাধিরক্ষক একখানি বড় চৌকো আকারের বই এনে উপস্থিত করল। সেটা ছিল হাফেজেরই একটি কাব্যগ্রন্থ। এ সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, কোনো একটি বিশেষ ইচ্ছা মনে নিয়ে চোখ বুঝে এই গ্রন্থ খুলে যে কবিতাটি বেরোবে তার থেকেই বোঝা যাবে সে ইচ্ছাটি সফল হবে কিনা। রবীন্দ্রনাথ সে বইয়ের পাতা খোলার আগে চোখ বুজে মনে মনে ইচ্ছা করলেন, ‘ধর্ম নামধারী অন্ধতার প্রাণান্তিক ফাঁস থেকে ভারতবর্ষ যেন মুক্তি পায়।’ এর বছর পনেরোর মধ্যেই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও দেশান্তরের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারতবর্ষ’। হিন্দু ও মুসলমান এ দুই সম্প্রদায় নিয়ে এক ‘মহাজাতি’ গঠনের স্বপ্ন ছিল তাঁর। ১৯৪৭-এর দেশভাগ সে ক্ষেত্রে তাঁর স্বপ্নের বিপরীতে হলেও হয়তো তারপরও পুরোপুরি হতোদ্যম হতেন না তিনি। ঘরের বিবাদ অহর্নিশি চলার চেয়ে ঘর ভাগ হওয়াই ভালো।

‘পারস্য যাত্রী’র একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে এশিয়ার নবজাগরণের বা রেনেসাঁর কথা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এশিয়া জাগছে এবং প্রতিটি দেশেই এই জাগরণপর্ব চলছে যার যার মতো করে। রবীন্দ্রনাথ কায়মানোবাক্যে চেয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার পাশাপাশি প্রাচ্যও উঠে দাঁড়াক : ‘এ কথা বলা বাহুল্য যে, এশিয়ার প্রত্যেক দেশ আপন শক্তি প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুসারে আপন ঐতিহাসিক সমস্যা স্বয়ং সমাধান করবে… তাই আমি এই কামনা ঘোষণা করি যে, আমাদের মধ্যে সাধনার মিলন ঘটুক। এবং সেই মিলনে প্রাচ্য মহাদেশ মহতী শক্তিতে জেগে উঠুক_ তার সাহিত্য, তার কলা, তার নূতন নিরাময় সমাজনীতি, তার অন্ধসংস্কারমুক্ত বিশুদ্ধ ধর্মবুদ্ধি, তার আত্মশক্তিতে অবসাদহীন শ্রদ্ধা’ নিয়ে। এশিয়ার এই নবজাগরণের তালিকার মধ্যে যেমন ছিল দূরপ্রাচ্যের জাপান ও চীন, তেমনি ছিল নিকট মধ্যপ্রাচ্য। পশ্চিম এশিয়ার নব-আন্দোলিত মুসলমান সমাজের এক বড় ধরনের উত্থানের প্রতীক্ষা করছিলেন কবি। তিনি জানতেন মিসর, তুরস্ক, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান প্রভৃতি দেশের প্রাগ্-ইসলামি ঐতিহ্য এবং ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগের বিবরণী। আব্বাসীয় আমলের সুশাসন, বিজ্ঞান-সাধনা ও শিল্পকলা তাঁকে বিমোহিত করেছিল। বা তারও আগের সম্রাট দরিয়ুসের রেখে যাওয়া ভগ্নাবশেষের সাথে মোয়েনজো দারেরি সমসাময়িক সভ্যতার মিল খুঁজে পেয়ে রোমাঞ্চ অনুভব করেছেন। দরিয়ুসের গ্রন্থাগার ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আলেকজান্দার_ সেই গ্রন্থাগারে বহু সহস্র চর্মপত্র রক্ষিত ছিল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাও ছিল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তাও ছিল। রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আলেকজান্দার আজ জগতে এমন কিছুই রেখে যাননি যা এই পার্সিপোলিসের ক্ষতিপূরণস্বরূপে তুলনীয় হতে পারে।’

পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা এশিয়ার এই নবজাগরণকে যেমন বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে সাম্প্রদায়িক ধর্মবুদ্ধি বা ভেদবুদ্ধি। এশিয়াকে জাগতে হলে এর থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতেই হবে, কেননা ‘সাম্প্রদায়িক ধর্মবুদ্ধি মানুষের যত অনিষ্ট করেছে এমন বিষয়বুদ্ধি করেনি। বিষয়াসক্তির মোহে মানুষ যত অন্যায়ী, যত নিষ্ঠুর হয়, ধর্মমতের আসক্তি থেকে মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি ন্যায়ভ্রষ্ট, অন্ধ ও হিংস্র হয়ে ওঠে। ইতিহাসে তার ধারাবাহিক প্রমাণ আছে।’

এ ক্ষেত্রেই শুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার কথা মনে এলো তাঁর : ‘নবযুগের আহ্বানে পশ্চিম এশিয়া কী রকম সাড়া দিচ্ছে সেটা স্পষ্ট করে জানা ভালো। খুব বড় করে সেটা জানবার এখনও সময় হয়নি। … কিন্তু সত্য ছোটো হয়েই আসে। সেই সত্য এশিয়ার সেই দুর্বলতাকে আঘাত করতে শুরু করেছে যেখানে অন্ধসংস্কারে, জড় প্রথায়, তার চলাচলের পথ বন্ধ। এ পথ এখনও খোলসা হয়নি, কিন্তু দেখা যায় এই দিকে তার মনটা বিচলিত।’ কী সেই সত্য? ‘এশিয়ার নানা দেশেই এমন কথা উঠেছে যে, সাম্প্রদায়িক ধর্ম মানবের সকল ক্ষেত্রজুড়ে থাকলে চলবে না।’ অর্থাৎ ধর্মাচরণ থাকবে কেবল কিছু নির্দিষ্ট এলাকায়_ সর্বত্র নয়; এবং রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য মানলে, রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অবিমিশ্রভাবে সেক্যুলারিজমের সমর্থক।

৫. সভ্যতার সংলাপ
‘পারস্য-যাত্রী’ গ্রন্থটি খুঁটিয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সমাজে নবজাগরণের সংকেতের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের সাথে ‘সংলাপ’-এর তাগিদ অনুভব করা যায়। রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সম্প্রদায়গত ধর্মের প্রভাবকে অস্বীকার করেছেন। আবার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুক্তি খুঁজেছেন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারের বাইরে। সেখানে তিনি ব্যক্তিগত ধর্মীয় মূল্যবোধকে (যা ছিল ‘মিশ্র’ চরিত্রের) সাহসের সাথে লালন ও ক্রমবিকশিত করেছেন। খ্রীস্টিয় ইউরোপ এনলাইটেনমেন্ট-এর পর্ব পেরিয়েও যেমন যুক্ত হতে পারেনি বিশ্ব মানবতাবাদে, ধর্মাশ্রিত প্রাচ্যও তেমনি উপনীত হতে পারেনি মানবকল্যাণমুখী, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের উদার জমিনে। এদিকটি রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি। ‘পারস্য-যাত্রী’ রচনার কালে যেমন, আজকের দিনেও ‘কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্ম ধর্মের বিশুদ্ধ প্রাণতত্ত্ব নিয়ে টিকে নেই’ _ কি পাশ্চাত্যে, কি প্রাচ্যে। আমরা ভুলে যাই, ‘যে সমস্ত ইটকাঠ নিয়ে সেই সব সম্প্রদায়কে কালে কালে ঠেকো দিয়ে দিয়ে খাড়া করে রাখা হয়েছে তারা সম্পূর্ণ অন্য কালের আচার বিচার প্রথা বিশ্বাস জনশ্রুতি।’ আজকের দিনে হলে এ কথা লেখার জন্য রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতার মামলা উঠত। কটূক্তির কারণে তাঁর শিলাইদহের-সাজাদপুরের-পতিসরের বাড়িতে আক্রমণ পর্যন্ত হতে পারত একদল ধর্মোন্মাদের দ্বারা। অন্যত্র পড়ি, ‘আরব পারস্যকে ধর্ম দিয়েছে’, বিনিময়ে পারস্য তার শিল্পগুণ দিয়ে ইসলামকে আরো ‘ঐশ্বর্যশালী’ করেছে। এক জায়গায় এ মন্তব্যও করেছেন, ‘মাদুরার মন্দির, ইস্পাহানের মসজিদ এসব প্রাচীনকালের অস্তিত্বের দলিল _ এখনকার কালকে, যদি সে দখল করে তবে তাকে জবরদখল বলব।’ এ কথা বলার জন্য এ যুগে তাঁর বিচার দাবি করতেন নিশ্চয় কেউ কেউ। কেননা ঊনিশ-বিশ শতকের গোড়ার দিককার অসহিষ্ণুতার চেয়ে একবিংশ শতকের সূচনা-পর্বে এসে ধর্ম_ প্রসঙ্গে অসহিষ্ণুতার মাত্রা দক্ষিণ এশিয়ায় আরো বেড়ে গিয়েছে। সমাজতাত্তি্বক আশিস নন্দী একথা আক্ষেপ করে বলেছিলেন। হাফেজের সমাধিতে গিয়ে যে-রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁকে এ রকম তিরস্কারের গ্গ্নানি এর আগেও অবশ্য অনেকবার সইতে হয়েছে। হাফেজকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছেন, মনে মনে, ‘আমরা দু’জনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রূকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারেনি… নিশ্চিত মনে হলো, আজ কত শত বৎসর পরে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।’ পারস্য থেকে ফিরে গিয়ে ১৯৩৩ সালে স্পষ্ট করে বলেছেন মনের কথাটা : ‘আমার স্বভাবে এবং ব্যবহারে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব নেই’, দুই পক্ষেরই অত্যাচারে ‘আমি সমান লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ হই’। অথচ পরস্পরকে বাদ দিয়ে এদের এক পা চলারও উপায় নেই। পারস্য-যাত্রীতে কথাটা উপমা দিয়ে বলেছেন : ‘এই দুই বিপরীতধর্মী সম্প্রদায়কে নিয়ে আমাদের দেশ। এ যেন দুই যমজ ভাই পিঠে পিঠে জোড়া; একজনের পা ফেলা আর-একজনের পা ফেলাকে প্রতিবাদ করতেই আছে। দুইজনকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করাও যায় না, সম্পূর্ণ এক করাও অসাধ্য।’ এক্ষেত্রে মিল আসবে তখনই যখন ‘বিভিন্নতাকে’ শক্তি বলে জানব। বিভিন্নের মধ্যেকার সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিধি নিষেধের বেড়াগুলো ভেঙে যাবে। যতদিন তা না হয়; ততদিন বিভিন্নের মধ্যে ‘সংলাপ’ চলুক – সংঘাতকেই বড় করে দেখা না যেন হয়। এ-ই ছিল রবীন্দ্রনাথের দাবি আমাদের কাছে।

১৯৭৯ সালের ‘ইসলামি বিপ্লবে’র পর খোমেনী-উত্তর ইরানে অনেক নাটকীয়ও বিতর্কিত পরিবর্তন এসেছে গত তিন দশকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রতি পারস্যের অনুরাগ যেন এখনো অটুট। ২০১১ সালের ২৯ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবার্ষিকীতে ইরানের পার্লামেন্টে (মজলিস) উন্মোচন করা হয়েছে তাঁর স্মরণে একটি প্রস্তরফলক। তাতে উৎকীর্ণ তাঁর ‘পারস্যে জন্মদিনে’ কবিতাটি এবং তাঁর একটি চমকপ্রদ প্রতিকৃতি। প্রায় একই সময়ে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর একটি মূর্তি স্থাপিত হয়েছে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে। রক্ষণশীলতার কোনো কুযুক্তি এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। রেজা শাহ্র ইরানে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এ তথ্য জানার পরও ‘বিপ্লবী’ ইরানের কাছে রবীন্দ্রনাথের সমাদর একটুকু কমেনি। এক্ষেত্রে ইরানের ইসলাম তার অন্তরের শক্তিরই প্রমাণ দিয়েছে! এক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নী পারস্য-আরব এ ধরণের বিভাজন রেখা টেনে ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা হবে পণ্ডশ্রম। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য নানা সভ্যতার মধ্যে ‘সংঘাত’ যেমন, ‘সংলাপ’ও চলছে একই সাথে।

পারস্যে রবীন্দ্রনাথকে সম্মাননা দেওয়ার সময় বসরার গভর্নর শেখ সাদির একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন। কবিতাটির অংশবিশেষ রবীন্দ্রনাথের হাতে অনূদিত হয়ে ‘পারস্য-যাত্রীর’ পরিশিষ্টে সংকলিত হয়েছে। চতুষ্পদীটি এ রকম :

‘হায় মানুষ! এই জগৎটা শুধু দৈহিক অহং-এর পুষ্টির জন্য নয়;
যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী মানুষের সন্ধান পাওয়া বড়োই কঠিন;
ভোরের পাখির সুরলহরী নিদ্রিত মানুষ জানে না
মানুষের জগৎটা যে কী, তা পশু কেমন করে জানবে!’

Original post on Samakal here.

উটপাখি: ধ্বংসের সমান অংশীদার (The Ostrich)

বিনায়ক সেন

১. আমার বন্ধুদের লড়াই
বাংলাদেশে এখন, এই মুহূর্তে, ‘সেক্যুলারপন্থি’দের সঙ্গে ‘গণতন্ত্রপন্থি’দের লড়াই প্রবল আকার ধারণ করেছে। অস্বীকার করব না যে, এই লড়াই নিয়ে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এখন এক ধরনের নৈতিক মুছিবতের মধ্যে আছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের একটি দল যে কোনো মূল্যে যুদ্ধাপরাধের বিচার করে ছাড়বেই। তাঁদের যুক্তি, যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাজ সমাধা না করা গেলে দেশে সেক্যুলারিজম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে না। এর জন্য সাময়িকভাবে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেও তারা রাজি। আমার প্রিয় বন্ধুদের অন্য একটি দল যে কোনো মূল্যে নির্বাচনী গণতন্ত্রের রীতি-নীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের যুক্তি, অবাধ ও সব দলের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ একটি নির্বাচন করা না গেলে দেশ প্রবল সংকটের মধ্যে পড়বে। কেননা এতে করে সরকার লেজিটিমেসির অভাবে ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনে তারা সেক্যুলারিজমকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। এমনকি এর জন্য এমন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও তারা মেনে নিতে রাজি, যেটি হয়তো হবে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন নিয়ে, হয়তো যুদ্ধাপরাধের বিচার সুদীর্ঘ কালের জন্য স্থগিত বা শ্লথ করার বিনিময়েই। সত্যের খাতিরে অবশ্য বলা দরকার, আমার বন্ধুদের দু’দলই যুদ্ধাপরাধের বিচার ও গণতন্ত্র উভয়েরই বাস্তবায়ন চান, কিন্তু এ দুই লক্ষ্যের মধ্যে যদি সংঘর্ষ বাধে তাহলে তাদের একেকজনের পক্ষপাতিত্ব থাকবে একেক দিকে। ইয়েভতুশেঙ্কো তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব শুধু ভালো আর মন্দের মধ্যে হয় না। অনেক রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব ঘটে থাকে [কম] ভালো আর [বেশি] ভালোর মধ্যে। ভালো আর মন্দের লড়াই এ দেশকে অতীতে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। ভালো আর ভালোর লড়াই এবার এ দেশকে খাদের ভেতরে ফেলে দিতে চলেছে।

২. ভুলগুলো কোথায় হয়েছিল
ভুলের সূত্রপাত হয়েছিল সত্তর দশকেই। পঁচাত্তরে মুজিব প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে নিহত হলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের আদি প্রতিশ্রুতি_ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র_ রাষ্ট্র যদি দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করতে পারত তাহলে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ধারায় এরই মধ্যে একটি সবল গণতান্ত্রিক [পুঁজিবাদী] সমাজ ও অর্থনীতি এ দেশে গড়ে উঠত। উন্নয়নের নিচু পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো থাকে অবিকশিত। তখন সক্ষম জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সময়ের আগে এগিয়ে থাকার কারণে_ যাকে আমরা ‘দূরদর্শিতা’ বলি_ ‘প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি’ অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারে। উপনিবেশ থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার আদি পর্যায়ে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় [ভারতে] জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এবং সেসব দেশের রূপান্তরধর্মী আর্থ-সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এসব দেশের কোনো কোনোটিতে ছিল একদলীয় শাসন, কোনোটিতে ছিল গণতন্ত্র, আবার কোনো কোনোটিতে সক্রিয় ছিল সামরিক নেতৃত্ব। প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব যাই হোক, একটি বিষয় ছিল অভিন্ন। দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এসব দেশে অব্যাহত ছিল জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের শাসন, যারা গোড়াতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল বা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকা এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের আদি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব বর্ণবৈষম্যবাদের রাজনৈতিক অবসানের পর থেকেই আজ পর্যন্ত সক্রিয় ও ক্ষমতাসীন রয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক বর্ণবৈষম্যবাদের অবসানের লক্ষ্যের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা বিপথগামী না হয়ে অব্যাহতভাবে এগোতে পেরেছে। কেন উন্নয়নের গোড়ার পর্যায়ে আদি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য উপনিবেশ-উত্তর পূর্ব এশিয়া বা ভারতের দিকে তাকানোরও প্রয়োজন নেই। উন্নত দেশগুলোর যখন পুঁজিবাদ সংহত ও বিকাশমান করা প্রয়োজন দেখা দিচ্ছিল, সেখানেও একই অভিজ্ঞতাকে আদি পর্যায়ে দেখতে পাই। বোনাপার্টের ফ্রান্স, বিসমার্কের জার্মানি বা মেইজির জাপান এর উজ্জ্বল উদাহরণ। সমাজতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রে বলতে পারি যে, লেনিন যদি বিপ্লবের সাত বছরের মাথায় মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মারা না যেতেন, রাশিয়া আরও উন্নত ও আকর্ষণীয় সমাজতান্ত্রিক উন্নয়নের সঙ্গে অগ্রসর হতে পারত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধ নামক বিপ্লবে’র চার বছরের মাথায় আমরা হারালাম মুজিবকে শুধু নয়, নির্মমতম জেলহত্যার মধ্য দিয়ে তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতৃত্বকেও। মৃত্যুকালে মুজিবের বয়স হয়েছিল ৫৫, আর তাজউদ্দীনের ৫০। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গোড়ার পর্বে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের এই শূন্যতা অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদকে দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল করতে দেয়নি। অর্থনৈতিক নীতিমালার ক্ষেত্রে এদেশকে সুস্থ ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক’ ধারায় বিকশিত হতে দেয়নি। এ দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রগতিশীল সম্ভাবনাগুলোকেও করেছে পরবর্তী দশকে অনেকটাই পথহারা। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পরপরই এক বছরের মাথায় জিন্নাহর মৃত্যু সে দেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে দিয়েছিল, যার অনুরণন এখনও চলছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান পঁচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের আদি-চেতনার বাস্তবায়নকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। মুজিব-তাজউদ্দীন যেখানে নেই সেরকম ভূমিকা পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। পরবর্তী শাসনামল প্রমাণ করে তাঁর সে দক্ষতাও ছিল। এর ফলে সুস্থ ধারায় অর্থনৈতিক বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক পূর্বশর্ত হিসেবে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের কাম্য ভূমিকা তাঁর কাছ থেকেও আসতে পারত। কিন্তু বাড়তি দুর্ভাগ্য এ দেশের। জিয়া সে ধারায় এগোতে পারলেন না। সে পথে এগোতে চেয়েছিলেন কি-না পুরোপুরি, সে তর্কের এখনও মীমাংসা হয়নি। আমাকে আদিতে সিপিবি-ঘরানার একজন [প্রাক্তন] বামপন্থি নেতা বলেছেন, ক্ষমতায় আসার পরপরই জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতীয়তাবাদী ও বাম নেতৃবৃন্দের কাছে গিয়ে সমর্থন ও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। সোভিয়েত পার্টি সত্তরের দশকে জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা জাতীয়তাবাদী শক্তির অংশ হিসেবেই দেখেছিল। জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থি শক্তিদের একটি বৃহত্তর সমঝোতার সম্ভাবনা তখন সৃষ্টি হয়েছিল। এই পটভূমিতেই জিয়ার খালকাটা বিপ্লবকে ও হ্যাঁ-না ভোটে জিয়াকে তৎকালীন সিপিবির নেতৃত্ব সমর্থন দিয়ে থাকবেন। কিন্তু সমঝোতার এই সম্ভাবনা স্থায়ী হয়নি। তা ছাড়া জিয়া নিজেই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলে সামরিক বাহিনীর মধ্যে সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির অস্তিত্ব অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাহেরের মৃত্যু ছিল এরই ধারাবাহিকতায়।আমি বলতে চাইছি, মুক্তিযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী শক্তি ও বাম ধারার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সমঝোতা ও ঐক্যের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়া এ দেশের রাজনৈতিক বিকাশের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী অশুভ প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে এ দেশের রাজনীতির প্রধানতম দ্বন্দ্ব_ ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থানের ঝুঁকি_ মোকাবেলা করা একা আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী শক্তির পক্ষে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর জন্য কতটা জিয়া নিজে দায়ী, আর কতটা বাম প্রগতিশীলরা দায়ী, তা রাজনৈতিক ইতিহাসবিদরা একদিন নির্ধারণ করবেন। জিয়া ও মূলধারার মুক্তিযুদ্ধের শক্তির মধ্যে সেদিন ওই সমঝোতা হলে দেশে আরও আগে সুস্থ পুঁজিবাদী ধারা গড়ে উঠতে পারত এবং পুঁজিবাদী ধারার বিকাশও হতো আরও বেগবান। রাষ্ট্রও হতো আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ্বাসী। সমাজ-সংস্কৃতি হতো আরও বেশি উদার ও অন্তর্ভুক্তি-প্রবণ। সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতো আরও বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও সহনশীল। পাশ্চাত্যের মাপকাঠিতেই আরও বেশি দক্ষ ও গণতান্ত্রিক। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান দলই তখনও থাকত, কিন্তু দুটো দলই [বা তার সৃষ্ট জোটই] হতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। দুটো দলই তখন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ধারণ করত সমানভাবে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে পূর্বাপর সমানভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকত। দুটো দলকেই সমানভাবে পাওয়া যেত মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সোচ্চার। দুটো দলের মধ্যেই এখনও যারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে চলেছেন তারা এই না হতে পারার মর্মবেদনা বুঝবেন।জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া জাতীয়তাবাদী ও বাম প্রগতিশীল শক্তির সমঝোতার সম্ভাবনা বাস্তবায়ন না হতে পারার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকবে। যেমন_ জিয়া-সরকারের চরিত্র গোড়া থেকেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের উপস্থিতির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে থাকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধীকারী শাহ আজিজুর রহমানের জিয়া-সরকারের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ ছিল একটি সামান্য উদাহরণ। শুধু সরকারের চরিত্রে নয়, দলের চরিত্রের ওপরও এটি দীর্ঘমেয়াদি অশুভ প্রভাব ফেলে। নবগঠিত দল বিএনপিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এক অস্বস্তিকর সহাবস্থানে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়। দলটিতে দেখা দেয় প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শের প্রবণতা। এর সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে ২০০১-২০০৬ পর্বে। বিএনপির নেতৃত্বদানকারী মুক্তিযুদ্ধের শক্তি প্রথমবারের মতো তখন বুঝতে পারছিলেন জোটের ভেতর ও বাইরে ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রবল অস্তিত্ব। এ নিয়ে তাদের মধ্যে নীরব অভিযোগ ও মনোকষ্ট দেখেছি। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে এ অবস্থানটি তখন তাদের নীরবে সয়ে নিতে হয়েছিল। এ অবস্থা এখনও চলছে। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ডানপন্থি শক্তির সঙ্গে জোটের ভেতরে ও বাইরে সমঝোতা করে চলা ছাড়া যেন এ মুহূর্তে তাদের গত্যন্তর নেই! এ নিয়ে প্রবলভাবে চিন্তিত বিএনপির ভেতরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও নেতৃত্ব। দলটি যখন প্রবল সরকারি চাপের মুখে তখন ডানপন্থি শক্তিকে মোকাবেলা করার বিষয়টিকে তারা ‘ভবিষ্যতের জন্য তুলে রাখছে’ যেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বিএনপি আজ ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিকে ছাড় শুধু নয়, তার ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এমনকি সাধারণ সাংগঠনিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড টিকিয়ে রাখার জন্য। এমন অমাবস্যায় দলটি এর আগে কখনও পড়েনি। অথচ এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। গত দুই বছরে বিএনপির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বেড়েছে মূলত সরকারের অজনপ্রিয়তার কারণে। অবাধ ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে বিএনপি এককভাবেই ক্ষমতায় আসীন হতে পারত বা তার কাছাকাছি অবস্থানে যেতে পারত। ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধার তার কোনো দরকার ছিল না। সত্তর দশকেও দলটি গড়ার সময় এ রকম ছাড় দেওয়ার দরকার ছিল না, এখনও সে প্রয়োজনীয়তা এ দলটির নেই। দুঃখের বিষয়, আমার প্রিয় বন্ধুদের যে অংশটি গণতন্ত্রপন্থি তারা এ নিয়ে ততটা সোচ্চার নন। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার পেছনে সরকারের একগুঁয়েমি যেমন দায়ী, ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে প্রধান বিরোধী দলও যে সমান দায়ী, সে কথা তাঁরা জোরের সঙ্গে বলতে চান না। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী গ্রামগঞ্জে-মফস্বল শহরে এমনকি রাজধানীর বুকে যেভাবে সহিংসতা করেছে তাতে যে কোনো নাগরিক বিপন্ন বোধ না করে পারবেন না। দেশের কিছু কিছু এলাকা সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী_ এ রকম কিছু জেলা, এই অশুভ শক্তির ‘মুক্তাঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে। দেশের ভেতরে কিছু কিছু স্থানের খবর পড়ে মনে হয় এগুলো বাংলাদেশে নয়, বরং আফগানিস্তান, পাকিস্তান, কঙ্গো বা সুদানের খবর পড়ছি। বাংলাদেশ যে আজ ‘সহিংস দেশে’র পরিচিতি পাচ্ছে এর পেছনে কি এই অশুভ শক্তির উত্থান প্রধানত দায়ী নয়? সরকারের একতরফা নির্বাচন করার কৌশলকে বর্তমান সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিরোধী দলের সহিংস আন্দোলনকে কি সমানভাবে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত ছিল না? এপক্ষকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বললে ওপক্ষও কি ‘ফ্যাসিবাদী’ বলার যথেষ্ট কারণ ইতিমধ্যেই সৃষ্টি করে থাকেনি? সেদিক থেকে দেখলে ২০১৩ সালের শেষে ২৮ ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সিপিডি-টিআইবি প্রমুখ আয়োজিত ‘নাগরিক সভা’ আমাদেরকে একরূপ হতাশই করেছে।

৩. একটি শেষ মুহূর্তের অসম্পূর্ণ সংলাপ
এ নিয়ে যা লিখছি তা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও টিভিতে দেখানো খবর এবং মুখ্য উদ্যোক্তাদের একাধিক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। এতে করে পুরো চিত্রটা পাওয়া নাও যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই সেদিনের ‘নাগরিক সভা’য় সব ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দুর্ভাবনা। যেখানে আরও কিছুদিন নির্বাচন পেছানোর সাংবিধানিক সুযোগ ছিল, সেখানে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ রেখে নির্বাচন করলে যে সংকট কাটবে না, এটিই ছিল আলোচনার প্রধান সুর। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিপন্ন হবে না, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটবে না, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। সংলাপে বিদ্বজ্জনরা এ নিয়ে চিন্তিত মন্তব্য করেছেন। এ রকম চলতে থাকলে তৃতীয় কোনো অসাংবিধানিক শক্তি চলে আসতে পারে এক পর্যায়ে, এ আশঙ্কাও ব্যক্ত হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যেন কার্যত সৃষ্টি করেছে আরও একটি এক-এগারোর আশঙ্কা, সুতরাং এর দায়দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়_ এ যুক্তিও পরোক্ষভাবে শুনতে পেয়েছি। কিন্তু আরও যেন কিছু কথা, কিছু নাগরিক সামাজিক কমিটমেন্টের ভাষ্য আমরা শুনতে চেয়েছিলাম রাজধানীর এই উচ্চবর্গের মানুষ, তথা বিদ্বজ্জনদের কাছ থেকে।কী বলা হয়েছিল সেদিন, তার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল কী তাঁরা বলেননি সেদিন। কেউ কেউ হয়তো বলে থাকবেন, কিন্তু সেটি ওই আলোচনার প্রধান সুর ছিল না। প্রথমত, সময়ের বিচারে নাগরিক সভাটি দেরিতে, বড় দেরিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি তাদের শুরু করা উচিত ছিল বছর খানেক বা তারও আগে। এতে করে নাগরিক সমাজ আরও নানা বিষয়ে প্রভাব ফেলার বা অন্তত নিজেদের বিবেকি মত রাখার সুযোগ পেতেন। উদাহরণত, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে তারা বছর খানেক আগেই সভা ডাকতে পারতেন। গণজাগরণ মঞ্চের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও তারা বিতর্ক করতে পারতেন। চরম ডানপন্থি শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধা প্রধান বিরোধী গণতান্ত্রিক দলের পক্ষে সমীচীন হয়েছে কি-না সে প্রশ্নে তারা দিনব্যাপী আলোচনা-ডায়ালগ করতে পারতেন। কেন এসব বিষয় নিয়ে তারা উচ্চকিত হননি তা তারাই জানেন। দেশের পরিস্থিতি তাহলে হয়তো এ পর্যায়ে গড়াত না। দ্বিতীয়ত, অগণতান্ত্রিকতা আজ সর্বত্র বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। সরকার যেমন ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণ করেছে, বিরোধী দলের আন্দোলনেও ‘অগণতান্ত্রিক’ আচরণ স্পষ্ট। গত এক বছর ধরে আন্দোলনের নামে যে হারে সহিংসতা হয়েছে জেলায় জেলায়, তাতে বিরোধী রাজনীতির ‘অগণতান্ত্রিকতা’ দৃশ্যমান। তৃতীয়ত, ধরা যাক, এই মুহূর্তে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলো। এবং এও ধরে নেওয়া যাক, আগের নির্বাচনগুলোয় গত দুই দশকে যেমনটা ঘটেছে, বিরোধী জোট এবারে জয়ী হলো। কিন্তু তাতে করে গণতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা হবে তারই বা নিশ্চয়তা কী? সহিংস অগণতান্ত্রিকতার অনুশীলন করে যে অশুভ শক্তিকে আমরা প্রশ্রয় পেতে দেখলাম তারা তো তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হবে। সেটাই কি আমরা চাই? আমরা কি চাই যুদ্ধাপরাধের বিচার_ ৪২ বছর পরে যে কোনো কারণেই হোক যখন সবে শুরু হয়েছে_ থেমে যাক? একবার অপরাধীদের হাতে ক্ষমতা গেলে বা তারা ছাড়া পেলে কী ভয়ঙ্কর অমাবস্যা নেমে আসবে এ দেশে, এ নিয়ে তো চরম দুর্ভাবনা নাগরিক সভার উদ্যোক্তাদের কথায় এবং বার্তায় দেখতে পেলাম না। চতুর্থত, উদ্যোক্তারা তো একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’র কথা বলতে পারতেন। যে চুক্তিতে বলা হতো, অবাধ, স্বচ্ছ ও সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য নয়। যে চুক্তিতে এ-ও বলা হতো, চরম ডানপন্থি সহিংস শক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদচারণা গ্রহণযোগ্য নয়। জন রাউলসের ‘রিজনিবল প্লুরালিজম’ সংজ্ঞায় এই সহিংস শক্তি পড়ে না। যে চুক্তিতে বলা হতো, অসাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলার মূল্যবোধ ছাড়া নির্বাচনী গণতন্ত্র কখনও প্রকৃত গণতন্ত্র হতে পারে না। যে চুক্তিতে বলা হতো যে, বাহাত্তরের মূল চারটি নীতি আসলে পরস্পরের পরিপূরক। সমাজতন্ত্র ছাড়া যেমন গণতন্ত্র জনকল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, তেমনি গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়। সেক্যুলারিজম ছাড়া জাতীয়তবাদ শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর শাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। সেক্যুলারিজম বর্ণবৈষম্যবাদের মতো ধর্মবৈষম্যবাদের আশঙ্কাকে দূর করে। এবং সবশেষে নাগরিক সভার অনেকেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রার্থীদের ‘হলফনামার’ সূত্র ধরে একহাত নিয়েছেন সরকারদলীয় রাজনীতিবিদদের। বলেছেন, ক্ষমতায় থেকে সম্ভবত অবৈধ উপায়ে সম্পদ আহরণের সম্ভাবনার কথা। এই উদ্বেগে কারও আপত্তি থাকার কথা নয় সাধারণভাবে। কিন্তু এই উদ্বেগ আরও বিস্তৃত পরিসরে ব্যক্ত হওয়া উচিত ছিল। নাগরিক সভার উচ্চবর্গের অংশগ্রহণকারীরা বলতে পারতেন, হলফনামায় যে সম্পদ আহরণের চিত্র বেরিয়ে এসেছে তা সাধারণভাবে কম-বেশি সত্য উচ্চবর্গের সবার ক্ষেত্রেই। যারাই এ সময়ে [গত এক দশকে] রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতাশালী হয়েছেন_ তা তিনি সরকার দলেই থাকুন, আর বিরোধী দলেই থাকুন_ তাঁরাই দ্রুত অর্থবিত্তের অধিকারী হয়েছেন। পাওয়ার, প্রফিট আর প্রিভিলেজ_ এ তিনের বরপুত্র হয়েছেন তাঁরা। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থাকা যে উচ্চবর্গের নাগরিক সমাজ সেদিনের নাগরিক সভায় অংশ নিয়েছিলেন তারাও হয়তো কম-বেশি এই সম্পদ আহরণ প্রক্রিয়ার বাইরে নন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে সরকারদলীয় প্রার্থীদের সম্পদ হয়তো বেড়েছে ৭ গুণ, সে তুলনায় বিরোধীদলীয় সদস্যদের সম্পদ হয়তো বেড়েছে ৪ গুণ এবং উচ্চবর্গের নাগরিক সমাজের সদস্যদের বেড়েছে হয়তো ২ অথবা ৩ গুণ [নাগরিক সমাজের যে অংশটি ব্যবসায়ী শিল্পপতি তাদেরকে এখানে ইচ্ছে করেই বাদ রাখছি]। একই সময়ে আমলাদের অর্থবিত্তও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে থাকবে। করপোরেট ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার যারা তাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। সংখ্যাগুলো কাল্পনিক, কিন্তু সমাজে আয় ও সম্পদ-বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করার সুবাদে বলতে পারি_ এ ধরনের প্যাটার্ন বাস্তবতার বাইরে নয়। এ প্রশ্নেও বলতে বাধ্য, সেদিনের নাগরিক সভার হলফনামা সম্পর্কিত আলোচনা নিতান্ত একপেশে মনে হয়েছে। এ প্রসঙ্গগুলো আগামীতে উপস্থাপনের সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি।কিন্তু আমি এসব কথা মনে করিয়ে দেওয়ার কে? আমি তো উটপাখি, সমাজের-ইতিহাসের ওপর দিয়ে ঝড়-ঝঞ্ছা যখন বয়ে যাবে তখন আমার বালিতে মুখ গুঁজে থাকার কথা। ‘উটপাখী’ কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে/ আমরা দুজনে সমান অংশিদার/ অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,/আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার/তাই অসহ্য লাগে ও-আত্মরতি।/অন্ধ হ’লে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ বাংলাদেশ নাকি ধ্বংসের কিনারে গিয়ে বারবার ফিরে আসে। কিন্তু এ রকম কোনো মৌল সূত্রের রক্ষাকবচ আসলে নেই। যা ঘটছে এখন বাংলাদেশে, যা ঘটতে যাচ্ছে, তার জন্য সমানভাবে দায়ী থাকবে সরকার, বিরোধী দল ও সিভিল সমাজ। শুনেছি, উটপাখিরাও আসলে বালিতে মুখ লুকায় না। বালিতে তারা মুখ গুঁজে ডিমকে রক্ষা করার জন্য। নিতান্ত জীবন-চর্চার প্রয়োজনেই। তাই উটপাখিদের তুলনা দেওয়াটা তাদের জন্য হবে অপমানকর। সরদার ফজলুল করীম এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, মানুষ আসলে মানুষকে মারতে পারে না। হয় মানুষ অমানুষকে [পশুকে] মারে, অথবা অমানুষ [পশু] মানুষকে মারে। আমরা এই ভয়াবহ সমীকরণের মধ্যে বাস করছি।

লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতিবিদ

Original post on Samakal here.

রাষ্ট্র ও নিরাশ্রয়

মোহভঙ্গের কবিতা

বিনায়ক সেন

১. নাদের আলি, আমি আর কত বড় হব?

১৯৭২ সালে, মনে পড়ে, প্রথম আমাদের হাতে আসে রণেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্য-সমগ্র। এর ভূমিকায় জীবনানন্দের কবিতা ও কাব্যবিশ্বাসের গভীর ইতিবাচক মূল্যায়ন ছিল। প্রগতিশীল সমাজ পরিবর্তনের পক্ষের শক্তি ও আত্মিক সমর্থক হিসেবেই কবিকে চিহ্নিত করেছিলেন এই বামপন্থী সাহিত্য-সমালোচক। ‘সাতটি তারার তিমির’ ও ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ থেকে উদৃব্দতি দিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর বক্তব্য সপ্রমাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ভূমিকাটি পড়ে সে সময় আমার মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। অগ্রণী ‘মার্কসবাদী’ সমালোচক হয়েও তিনি ‘অমার্কসবাদী’ জীবনানন্দের প্রতি এত উৎসাহ নিয়েছিলেন কেন? এটুকু তো জানাই ছিল যে, জীবনানন্দ আদর্শে আস্থাবান কোনো সমর সেন, অরুণ মিত্র বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় নন। জীবদ্দশায় কোনো মার্কসবাদী পার্টি বা ঐ ধারার সাহিত্য-গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত ছিলেন না তিনি। ‘নির্জনতম কবি’র যে শিরোপা বুদ্ধদেব বসু তাঁর মাথায় পরিয়ে দিয়েছিলেন তাতে অন্যকিছু তাঁকে ভাবা সহজ ছিল না। তার ওপরে যোগ হয়েছিল তাঁর ‘রূপসী বাংলা’র ক্রমবর্ধমান অতুল জনপ্রিয়তা। সদ্য স্বাধীন দেশে মনে হতো ‘রূপসী বাংলা’ যেন বাংলাদেশকে স্মরণ করেই এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা আগাম ভেবেই কবি লিখেছিলেন! এ দেশের নদী-নালা, মাঠ-পুকুর, বৃক্ষলতা, পাখ-পাখালি, আদিগন্ত ছড়িয়ে থাকা সবুজ ধানক্ষেত, বাংলার রূপকথা ও কিংবদন্তিমালা, কৃষি ও কৃষকের জীবন, গ্রাম ছেড়ে আসা শহরের উঠতি মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও টানাপড়েন_ সব মিলিয়ে তখন ‘রূপসী বাংলা’র কবিকে মনে হতো পূর্ববর্তী এক অন্য ভুবনের মানুষ। এর মধ্যে প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের চিহ্ন খোঁজা মনে হয়েছিল কষ্টকল্পনাই। এর কিছুদিন পরেই হাতে পেলাম আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘শুদ্ধতম কবি’। সৈয়দের গদ্যের ছটা আর জীবনানন্দের কবিতার ওপর ভিনদেশি প্রভাবের নিপুণ বিশ্লেষণ আমাদের প্রজন্মকে বিমোহিত করেছিল। সৈয়দ তাঁর লেখায় জীবনানন্দের কবিকৃতির ওপর জোর দিয়েছেন মূলত আঙ্গিকের দৃষ্টিকোণ থেকে। কবির সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে বিশেষ কোনো গোচরে আনেননি তিনিও। ফলে জীবনানন্দের ‘অরাজনৈতিক’ ভাবমূর্তি আরও প্রবলভাবে গেড়ে বসে আমাদের তৎকালীন ধারণার মধ্যে। কিন্তু আর কেউ নন, স্বয়ং রণেশ দাশগুপ্ত জীবনানন্দ দাশের কাব্য-সমগ্রের প্রবল ইতিবাচক ভূমিকা লিখেছেন_ এই খটকাটি শেষ পর্যন্ত থেকেই যায় মনের মধ্যে। তাহলে কি জীবনানন্দ সম্পর্কে আমরা যা জেনেছি তা সম্পূর্ণ নয়? তাঁর কাব্যজীবনের পেছনে [সে সময় তাঁর গদ্য রচনাগুলোর অস্তিত্ব আমরা জানতাম না] রয়ে গেছে সমাজ-রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো নিভৃত সমাচার? তখন দেশভাগ, দেশান্তর, উদ্বাস্তু জীবন_ ১৯৪৭-এর এসব রাষ্ট্রিক ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে ভাবার তাগিদ তৈরি হয়নি। বরিশালে বিএম কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন, সেখানেই বেশিরভাগ কবিতা লিখেছেন, দেশ ভাগের পর কলকাতায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন, এবং ঐ শহরেই মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এক ট্রাম-দুর্ঘটনায় মারা যান। জীবনানন্দবিষয়ক আত্মজৈবনিক তথ্য এটুকুতেই সীমিত ছিল। এ বিষয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ তো বটেই, রণেশ দাশগুপ্তও বিস্তৃত করে কিছু জানাননি তখন। ক্লিনটন বুথ সিলির জীবনানন্দ জীবনী তখনও আসতে বাকি।

এ রকম অনবধানতা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ঘিরেও। সত্তরের দশকে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক উৎসবে, পাড়ার ‘বিচিত্রানুষ্ঠানে’ [তখনও পাড়াকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানাদি হতো এ দেশে] আবৃত্তিযোগ্য কবিতার প্রথম সারিতে থাকত ‘কেউ কথা রাখেনি’। আমরা তখন কেউই বিশেষ খেয়াল করিনি এর অন্যতম চরিত্র নাদের আলিকে, যে কবিকে তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তা-ও আবার যা তা বিল নয়, সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর নাকি একসঙ্গে খেলা করত। এ নিয়ে সুনীলের ব্যাখ্যা পরে শুনেছি : ‘পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমরের খেলা করার ছবিটা মোটেই কাল্পনিক নয়। এ রকম দেখাই যায় মাঝে মাঝে। তবে, পদ্মফুলের বদলে শালুক হতে পারে, আর সাপ হলো খুব সম্ভবত জলঢোড়া।’ ‘তিন প্রহরের বিল’ যে মাদারীপুরের পূর্ব মাইজপাড়ার অপসৃত কোনো এক ব্রাহ্মণপল্লীর কাছেই, সে কথা তখন কারও মাথায় আসেনি। কবিতাটিতে শুধু পূর্ববঙ্গ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দেশভাগ-পরবর্তী শহর কলকাতার কঠিন উদ্বাস্তু জীবনের কথাও। আর ছিল বঞ্চনা থেকে উত্থিত শ্রেণী-বৈষম্য চেতনা_ সেটিও বহু পরে চোখে পড়েছে। চৌধুরীদের বিশাল ভবনের ভেতরে চলছে রাশ-উৎসব, তার গেটে দাঁড়িয়ে কবি দেখছেন সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা কত-না আমোদে হাসছে, তাঁর কৈশোরক অস্তিত্বের দিকে তারা কেউ ফিরেও তাকায়নি! ‘বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস একদিন আমরাও’_ এ শ্রেণী-বৈষম্য চেতনা নয়তো কী!
১৯৭২ সালের জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারি মাসে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় বেরিয়েছে শামসুর রাহমানের ‘স্যামসন’। মুক্তিযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে, কিন্তু ন’মাস ধরে পুরো দেশটাকে বন্দিশিবির বানানোর ক্ষোভ তখনও যায়নি। ‘ক্ষমতামাতাল জঙ্গি হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা, তোমাদের হোমরা-চোমরা সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?’ এই ত্রুক্রদ্ধ ও ক্ষুব্ধ স্বর প্রাত্যহিকতার জগৎ থেকে তুলে নিয়ে কবিতায় সাজানো হয়েছিল। ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন নবজাত রাষ্ট্রের প্রধান কবিকণ্ঠটি। অসহায় অন্ধ শৃঙ্খলিত মিল্টন-বর্ণিত প্যারাডাইস লস্টের ‘স্যামসন’-এর তুলনায় এ এক অন্য স্যামসন প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছে। তখন সত্যই ছিল প্রদীপ্ত হওয়ার সময়। ১৯৭১-এ মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়ে এটাই ছিল প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা, সার্থকতমও। এর আগে বাংলা কবিতায় এই স্বর শোনা যায়নি:

‘আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন_
পাইকারি হত্যা দিগ্গি্বদিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
_এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এসব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘনঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব কিছু বুঝি ঠিকই…’

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে স্বাধীনতা সাম্যের স্পৃহা জাগে, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘পাওয়ার, প্রফিট আর প্রিভিলেজ’ এই তিন উপাদানের সম্মোহক প্রভাবে পড়ে যারা হয়তো সমাজ-রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে পারতেন, সংকটে পথ দেখাতে পারতেন, তারাও সে পথ ছেড়ে চলে গেছেন অন্য এক বলয়ে। এলিট আর সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগহীনতা এখন এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে, আজ তারা দুই ভিন্ন গ্রহের অধিবাসী :পরস্পরের ভাষা বুঝতেও তারা অক্ষম। শামসুর রাহমানের কবিতা রাষ্ট্র তথা এলিট শ্রেণীর এই ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।

সত্তর দশক থেকে শুরু করে শামসুর রাহমানের কবিতায় ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসা নিরাশার ছায়া তাঁর কবিতার বইয়ের নিরাশাকরোজ্জ্বল নামকরণের মধ্যেই সুস্পষ্ট। ধারাবাহিকভাবে শোক, ক্ষোভ ও বেদনার পতাকা উড়িয়েছে তাঁর কবিতার বইগুলি : দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি, আমি অনাহারী, শূন্যতায় তুমি শোকসভা, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে, অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই, শিরোনাম মনে পড়ে না, ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ, এক ফোঁটা কেমন অনল, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে, স্বপ্নেরা ডুকরে ওঠে বারবার, খুব বেশি ভালো থাকতে নেই, ধ্বংসের কিনারে বসে, গৃহযুদ্ধের আগে, খণ্ডিত গৌরব, হরিণের হাড়, উজাড় বাগানে, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নে বেঁচে আছি, ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে, গন্তব্য নাই বা থাকুক, গোরস্তানে কোকিলের করুণ আহ্বান ইত্যাদি।

জীবনানন্দের কোনো মোহ ছিল না ১৯৪৭ নিয়ে, সুনীলের মোহভঙ্গ হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাটের দশকের অর্থনৈতিক দুর্বিপাকে_ তারও পেছনে ছিল দেশভাগজনিত মানবিক বিপর্যয়। শামসুর রাহমানকে দেশভাগের সূত্রে দেশান্তরিত হয়ে আসতে হয়নি এ দেশে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে ঘিরে যে প্রচণ্ড আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালে, তাকে ক্রমশ বিলীন হতে দেখেছেন তিনি। নিজেকে দেশান্তরিত উদ্বাস্তু মনে করার কোনো কারণ ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন দেশের ভেতরেই মানসিক এক উদ্বাস্তু, একধরনের ‘ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পারসন’। বাংলা সাহিত্যের তিনজন প্রধান কবিরই মোহভঙ্গ হয়েছিল আধুনিক রাষ্ট্রের বিষয়ে। ঔপনিবেশিকতার অবসান হলেই নবযুগের সূচনা হবে রাতারাতি_ এ কথা তিনজনের কেউই চিন্তা করতেন না। তবে নবযুগের আকাশে পূর্ণিমা না আসুক ঘোর কৃষ্ণপক্ষে তা ঢেকে যাবে না, এটাও তাঁরা বিশ্বাস করতেন। বাস্তবতা ছিল আরও নির্মম। এ কথা মেনে নিতে তাদের কষ্ট হওয়ারই কথা। তিনজনার কষ্টের কার্যকারণ এক নয়; যে সময়ে তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পরিণতি প্রাপ্তি তা-ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ভূগোলের। তারপরও তা একই কষ্টের গল্প। নিরাশ্রয়ের কষ্ট ছিল তিনজনেরই জীবনে। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলতেন, কবির মৃত্যু না হলে ফুল জন্মায় না। এই তিন বাঙালি কবির মৃত্যুতে পৃথিবীতে তিনটি আশ্চর্য জাতের গোলাপের জন্ম হয়েছিল।

২. বিভিন্ন কোরাস

‘তরুণ’ ও ‘পরিণত’ মার্কসের মধ্যে যেমন, তরুণ ও পরিণত জীবনানন্দের মধ্যেও বোধকরি সে রকম একটি বিভাজন রেখা রয়ে গেছে। অনেকটা ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার যেমন বলেছিলেন_ জীবনের দুই পর্বের রচনার মধ্যে এপিস্টেমোলজিক্যাল ব্রেক বা জ্ঞানতাত্তি্বক ছেদ! তাঁর কাব্যজীবনের ‘আগের’ নাকি ‘পরের’ পর্বটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ_ এ নিয়ে মতান্তর রয়েছে। ‘বনলতা সেন’ ও তার পূর্ববর্তী কবিতাকে বুদ্ধদেব বসু অনেক বড় করে দেখেছিলেন। বুদ্ধদেবের কথা উল্লেখ করেই জীবনানন্দ এক চিঠিতে প্রভাকর সেনকে জানিয়েছিলেন, “আমার কবিতার জন্য বেশ বড় স্থান দিয়েছিলেন তিনি প্রগতিতে এবং পরে ‘কবিতা’য় প্রথম দিক দিয়ে। তারপরে ‘বনলতা সেন’-এর পরবর্তী কাব্যে আমি তাঁর পৃথিবীর অপরিচিত, আমার নিজেরও পৃথিবীর বাইরে চলে গেছি বলে মনে করেন তিনি।” সবাই অবশ্য এ ধারণায় শামিল ছিলেন না। অন্যরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বনলতা সেন পরবর্তী যুগের কবিতাই বরং জীবনানন্দের শ্রেয়তর অবদান। এ মতটিকেও অগ্রাহ্য করেননি জীবনানন্দ। ঐ একই চিঠিতে জানাতে ভোলেননি যে, ‘নিরুক্ত ও পূর্বাশা’র সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য মনে করেন আমার শেষের দিকের কবিতায় আমার পারিপাশর্ি্বক চেতনা পৌঢ় পরিণতি লাভ করেছে। এ পারিপাশর্ি্বকতা অবশ্য সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে। তরুণতর কবিরা অবশ্য এসব মূল্যায়ন নিয়ে মাথা থামাননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘জীবৎকালে তেমন কিছু স্বীকৃতিও পাননি তিনি।… মৃত্যুর পরে অনেক পত্রিকাই তাঁকে অগ্রাহ্য করে, কোনো কোনোটি আবার তাঁর সম্পর্কে ভুলভাল বিবরণও ছাপে। অথচ তখন জীবনানন্দ দাশই ক্রমশ হয়ে উঠছেন আমাদের প্রধান আরাধ্য পুরুষ। রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা কবিতার ভাষা আমূল বদলে ফেলার কৃতিত্বের কারণে’ এই সম্মান।

একই চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু ও সঞ্জয় ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর কাব্যজীবনের দুই পর্যায় সম্পর্কে দুই ভিন্ন ও বিপরীতধর্মী মূল্যায়ন লক্ষ্য করার পর অবশেষে জীবনানন্দ যা বললেন, তার মানে দাঁড়ায়_ তিনি একই সঙ্গে বিভিন্ন রকম, বিভিন্ন কোরাসের লোক, বহুবিধ কণ্ঠস্বরকে ধারণ করতে আগ্রহী এবং অনবরত নতুন পথ খুঁজে চলেছেন। শুধু আঙ্গিকের নিরীক্ষায় নয়, বিষয়বস্তু বা চেতনার নানা চিত্রণেও তিনি উৎসাহী। বুদ্ধদেব ও সঞ্জয় যা বলেছেন তাঁর সম্পর্কে, তাকে তিনি অস্বীকার করছেন না, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। কেননা, তার ভাষায়, ‘আরও দু’চার রকম চেতনা আছে, আজও যাদের কবিতায় শুদ্ধ করে নিয়ে নির্ণয় করে দেখতে আমি ভালোবাসি।’ সেই চেতনাগুলোর প্রকৃতি বা প্রকার নিয়ে কবি আর কিছু বলেননি। কিন্তু নতুনতর বক্তব্য, উপলব্ধি বা দর্শন কী করে শিল্পসম্মত করে কবিতায় তুলে আনা যায়, তারই অবিরাম তালাশের মধ্যে আছেন, এটুকু অন্তত ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ পর্বেই জানিয়েছিলেন তিনি_ ‘কেহ যাহা জানে নাই কোন এক বাণী/আমি বয়ে আনি।’ এটা শুধু আত্মপ্রকাশের ঘোষণা ছিল না, তার সারা জীবনের অঙ্গীকারও ছিল। নতুনতর ‘বাণী’ উপলব্ধি ও চেতনাকে কবিতার ‘ফর্মে’ ধরার জন্য অনবরত নিরীক্ষার মধ্যেই আমৃত্যু থাকতে হয়েছে তাকে। কখনও সফল হয়েছেন, কখনও হননি ততটা_ সেটা ভিন্ন প্রশ্ন।

শুধু চিঠির জনান্তিকে নয়, তাঁর কাব্যচর্চার বিভিন্ন ও বিপরীতধর্মী মূল্যায়নের বিষয়টি প্রকাশ্যেও আনলেন এক পর্যায়ে। ১৯৫৪ সালে মৃত্যুর কয়েক মাস আগে প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকায় লিখলেন : ‘আমার কবিতাকে বা এ কাব্যের কবিকে নির্জন বা নির্জনতম আখ্যা দেওয়া হয়েছে; কেউ বলেছেন, এ কবিতা প্রধানত প্রকৃতির বা প্রধানত ইতিহাস ও সমাজ চেতনার, অন্য মতে নিশ্চেতনার; কারও মীমাংসায় এ কাব্য একান্তই প্রতীকী; সম্পূর্ণ অবচেতনার; সুররিয়ালিস্ট। আরও নানা রকম আখ্যা চোখে পড়েছে।’ এসব আখ্যা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন না কবি, কিন্তু এটুকু কেবল তার পাঠক-সমালোচকদের জানাতে চাইছেন যে, এসব অভিধাই ‘আংশিকভাবে সত্য_ কোনো কোনো কবিতা বা কাব্যের কোনো কোনো অধ্যায় সম্বন্ধে খাটে; সমগ্র কাব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে নয়।’ এখানে ‘সমগ্র কাব্য’ বলতে শুধু গ্রন্থিত কবিতাকে বুঝলে চলবে না, অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত কবিতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। জীবনানন্দের জীবদ্দশায় গ্রন্থর্ভূত কবিতার সংখ্যা ১৬২। ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর হিসাব থেকে জানা যায়, জীবনানন্দের অগ্রন্থিত ও আবিষ্কৃত কবিতার সংখ্যা হবে প্রায় ৬৬০ [এখন আরও বেশি] অর্থাৎ জীবদ্দশায় গ্রন্থর্ভূত কবিতার তুলনায় চার গুণেরও বেশি।

‘অগ্রন্থিত জীবনানন্দ’-এর বিশ্লেষণ স্বতন্ত্র মনোযোগের দাবিদার_ সে কাজ এখনও বাকি অথবা হয়ত সবে শুরু হয়েছে। অগ্রন্থিত কবিতার বিপুল সম্ভারকে আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে রচনার কাল-নিরূপণ একটি বড় সমস্যা। উদাহরণত, তার ‘ছায়া আবছায়া’ [প্রতিক্ষণ থেকে ২০০৪ সালে ভূমেন্দ্র গুহ ও গৌতম মিত্র সম্পাদিত হয়ে প্রকাশিত] সংকলনটি পড়ে মনে হয় বিভিন্ন সময়ের রচনা, তাঁর ‘বেলা অবেলা কালবেলা’র মতোই। শেষোক্ত কাব্যগ্রন্থটির রচনাকাল ১৯৩৪ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর থেকে মনে হয় কাব্যের ‘আদি পর্যায়’ ও ‘অন্তিম পর্যায়’ এই বিভাজন রেখা কবি তার নিজের ক্ষেত্রে হয়তো স্বীকার করতে চাননি। হয়তো সেটা চৈতন্যের [শিল্প-চৈতন্য, ব্যক্তি-চৈতন্য ও সমাজ-চৈতন্যের] বিভিন্ন প্রবণতা ও ধারাকে তিনি একই সময়ে নিজের মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখেছিলেন বলে।

‘অগ্রন্থিত জীবনানন্দ’ আলোচনার আরও একটি বড় প্রশ্ন হলো, গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত/অপ্রকাশিত কবি-সত্তা কি একই ভাবনা-চিন্তা দর্শন ও বিবর্তনকে তুলে ধরছে, নাকি জীবনানন্দের কাব্য-চর্চায় আগে জানা যায়নি এমন কোনো দিককে [নিরীক্ষামূলক হয়ত-বা] নির্দেশ করছে? জীবনানন্দের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটা যে অবান্তর নয় তার বড় প্রমাণ ‘রূপসী বাংলা’। ১৯৩৪ সালের মার্চ মাসে এর কবিতাগুলো লেখা হয়, অথচ জীবদ্দশায় এর অস্তিত্ব অনুমান পর্যন্ত করা যায়নি। আর এ কথা তো সুবিদিত যে, জীবনানন্দের জনপ্রিয়তার পেছনে ‘বনলতা সেন’ যেমন, ‘রূপসী বাংলা’ও বড় ভূমিকা রেখেছে। অপ্রকাশিত জীবনানন্দের মধ্যে রূপসী বাংলার মতো নতুনতর কোনো চেতনা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে হয়তো-বা; সে সম্ভাবনা বিপুল পরিমাণ অগ্রন্থিত কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে খুবই প্রবল। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে জীবনানন্দের গদ্য-রচনা প্রকাশের পর। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। এতগুলো গল্প ও উপন্যাস প্রায় প্রকাশযোগ্য করে গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে দিয়েছিলেন, যেমন অবলীলায় তিনি বাক্সবন্দি করে রেখেছিলেন তার কবিতার অজস্র পাণ্ডুলিপি। এ-ও একধরনের মমিকরণ [মামিফিকেশন]_ দীর্ঘকাল পরে কোনো প্রত্নতাত্তি্বক সেসব মমিকে খুঁড়ে বের করবেন সে রকম কোনো প্রত্যাশায়? এসব রচনা প্রকাশের পর প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটবার পর প্রশ্ন উঠছে। জীবনানন্দের গল্প ও উপন্যাসের সঙ্গে তাঁর কবিতার আন্তঃসম্পর্ক কী তা নিয়ে। গদ্য-পদ্যের সম্পর্কের আলোচনা রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিচারের জন্য তেমন আবশ্যিক বিষয় নয়, যতটা জরুরি তা জীবনানন্দের ক্ষেত্রে। কেননা, এক অর্থে জীবনানন্দের কবিতা ও গল্প-উপন্যাস একই বিষয়-ভাবনার দুই শিল্পিত উৎসারণ।

৩. ইতিহাসের অবসাদের সময়

রহস্য শেষ পর্যন্ত অধরা থাকে বলেই কবিতা রহস্যময়ী এবং রহস্যের কারণেই পদ্য-রচনাটি ‘কবিতা’ হয়ে ওঠে। কেননা, কবিতা তা যতই আটপৌঢ়ে বিষয়ের আর মুখের কথার কাছাকাছি হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত শিল্পসম্মত হয় কোনো [অব্যাখ্যাত] রহস্যের কারণে। ‘কবিতার কথা’য় সেই রহস্যময়ীর উল্লেখ আছে। জীবনানন্দের গদ্য-পাঠ তাঁর কবিতার রহস্য-ঘেরা মনোভূমিকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। কবিতা বিচারের জন্য কবির ‘হৃদয়ে’ কল্পনার এবং কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার উপাদান কীভাবে কাজ করছে তা দেখার ‘স্বতন্ত্র সারবত্তা’ আছে_ এ কথা জীবনানন্দ নিজেই ‘কবিতার কথা’য় বলেছিলেন। কবির কল্পনার ভেতরে ‘চিন্তা ও অভিজ্ঞতা’ খুঁজে পাওয়ার জন্য আমরা দ্বারস্থ হতে পারি তাঁর গদ্য-রচনার কাছে। গল্প-উপন্যাসগুলো ধারাবাহিকভাবে পড়তে শুরু করলে স্পষ্ট হয় কেন জীবনানন্দের তিরিশের কবিতা বদলে গেল চলি্লশে এসে, বিশেষত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দেশভাগ ও এর পরবর্তী সময়ের চাপে। গদ্য-পাঠের এই অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় তার পদ্যের মোড়-পরিবর্তন ও তার কার্যকারণ। কবির এই পালাবদল ইতিহাস-চেতনার সূত্রে ততটা নয়, যতটা সমকালীন সমাজ-রাষ্ট্র রাজনীতির সূত্রে প্রাপ্ত। সঞ্জয় ভট্টাচার্য যেমন বলেছিলেন পঞ্চাশের দশকের শুরুতে। ‘অনেক মৃত্যু পার হয়ে এসেছি আমরা, অনেক শেষ দেখার প্রাণ বিনিময় করে এসেছি_ স্বদেশী সন্ত্রাসবাদে, মারীতে, মন্বন্তরে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে, দাঙ্গায়।’ সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে জীবনানন্দকেও যেতে হয়েছে। এ কারণেই চলি্লশের গদ্য-রচনাগুলোর কাছে বারবার ফিরে যেতে হয় আমাদের [যাই কি আমরা সেভাবে?]। তার ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ ও ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ কবিতাগুচ্ছের পূর্ণতর উপলব্ধির জন্য। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য কেননা তিনি মনে করতেন ‘কবিতার অস্থির ভেতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান।’ ব্যক্তি-জীবনে বৈবাহিক অবসাদ যেমন, সমাজ-রাষ্ট্রের পালাবদলে ঝক্কিও তেমনি তাকে প্রবলভাবে সামলে চলতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় উদ্বাস্তু-প্রায় জীবনযাপনের এদিক-ওদিক মেলাবার চেষ্টাতেই বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর অন্তঃকরণ। এর একটি বিশ্বস্ত চিত্র পাই তার সে সময়কার গদ্য রচনায়।

‘বেলা অবেলা কালবেলা’-র তীক্ষষ্ট রাজনৈতিক বোধ কোনো বিশেষ সমাজ-দর্শনের তাগিদে স্ফূরিত হয়নি। এটি জীবনানন্দের একান্ত নির্দলীয় প্রগতিশীল চেতনা, যাকে চলি্লশের যুগের বামপন্থিরা কেউ কেউ চিনতে ভুল করেছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা ননি ভৌমিকের কাছে অপরিচিত ঠেকেছিল প্রখ্যাত বাম-ডান মতাদর্শকের বাইরে একটি তৃতীয় অবস্থানের খোঁজার চেষ্টা। আর কংগ্রেসি বলয়ের সজনীকান্ত দাস দক্ষিণপন্থি রক্ষণশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলছিলেন_ পূর্বাপর সেটি তিরিশের যুগেই ‘শনিবারের চিঠি’র আক্রমণাত্মক নন্দনতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। জীবনানন্দ কোনো শিবিরেই ভরসা পাননি, যদিও তার মতাদর্শ ছিল সমাজ-প্রগতিকে লক্ষ্য করে : অসাম্প্রদায়িক, গরিব মানুষের প্রতি সহমর্মী, বৈষম্য-বিরোধী, নারীমুক্তির পক্ষে, ব্যক্তি ও সমাজের শুভবুদ্ধির জন্য সচেষ্ট এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা-মদমত্ত পরাক্রমশীলতার বিরুদ্ধে। ‘সময়ের তীরে’ কবিতায় তিনি সবাইকেই একহাত নিলেন, আমেরিকা-ভারত-রাশিয়া কোথাও মানুষের সর্বাত্মক মুক্তির প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়িত হতে দেখেননি বলে। উদৃব্দতিটা এ রকম [কত আগে লেখা এই সত্যভাষণ ভাবা যায়!]:

‘তোমাকে আমেরিকার কংগ্রেস-ভবনে দেখতে চেয়েছিলাম,
কিংবা ভারতের;
অথবা ক্রেমলিনে কি বেতসতন্বী সূর্যশিখার কোনো স্থান আছে
যার মানে পবিত্রতা শান্তি শক্তি শুভ্রতা_ সকলের জন্যে!
নিঃসীম শূন্যে শূন্যের সংঘর্ষে স্বতরুৎসারা নীলিমার মতো কোনো রাষ্ট্র কি নেই আজ আর
কোনো নগরী নেই
সৃষ্টির মরালীকে যা বহন করে চলেছে মধু বাতাসে
নক্ষত্রে_ লোক থেকে সূর্যলোকান্তরে!’

সত্যিই তো কোথাও কী এমন রাষ্ট্র নেই আজ আর অথবা এমন কোনো নগরী নেই যেখানে সকলের জন্য রয়েছে ‘শান্তি শক্তি শুভ্রতার’ আয়োজন! এই কথাগুলো ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ পর্বের আস্থাবান লাইন ‘প্রতিদিন ভোর আসে ধানের গুচ্ছের মতো সবুজ সহজ’ এর প্যাস্টোরাল দৃশ্য থেকে কতটাই আলাদা! এই পরিবর্তন কবির চিন্তায় এলো কী করে? এর একটি পূর্বাভাস পাওয়া যায় জীবনানন্দের গদ্য রচনায়, বিশেষত সময়কালীন উপন্যাসে। চলি্লশের দশকের কবিতা ও উপন্যাসগুলো পাশাপাশি পাঠ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এর মধ্যে আবার ১৯৪৮ সাল জীবনানন্দের সৃষ্টিকর্মের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছরই প্রকাশিত হয় ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ এবং রচিত হয় ‘বেলা অবেলা কালবেলা’র বেশকিছু কবিতা। রাজনীতি, রাষ্ট্র, নগর, দেশভাগ, যুদ্ধ, দাঙ্গা, বাণিজ্য, স্বাধীনতা, যন্ত্র-সভ্যতা প্রভৃতি সমসাময়িক প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে এতে। আছে ‘পাওয়ার ও পার্টি পলিটিক্সে’র কথাও। এখানে কবির বর্ণনাভঙ্গি তির্যক, স্বর কখনও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের, কখনও অনুকম্পার, পরিহাসের। এ এক অন্য জীবনানন্দের নির্মাণ, যা বিচলিত করেছিল বুদ্ধদেব বসুকে [‘কি লিখছেন জীবনানন্দ আজকাল!’]। ঐ ১৯৪৮ সালেই_ আমাদের এখন জানা হয়েছে জীবনানন্দ লিখলেন চার চারটি উপন্যাস : [আরও বেশি হয়তো বা] ‘সুতীর্থ’, ‘জলপাইহাটি’, ‘মাল্যবান’ ও ‘বাসমতীর উপাখ্যান’। আমি শুধু শেষের উপন্যাসটি ধরে কিছু উদাহরণ দেব জীবনানন্দের কাজে গদ্য-পদ্যের যোগসূত্র দেখানোর জন্য। অন্যান্য উপন্যাসও একই যোগসূত্রকে তুলে ধরে।
সমকালীনতায় ক্রমশ তলিয়ে যাওয়ার পর্বান্তগুলো স্পষ্ট হয় ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ উপন্যাসে। মানুষের মধ্যে অবিরাম প্রীতির অভাব দেখে ব্যথিত কবির মন_ কবিতা ও উপন্যাস দুই বর্ণনা রীতিতেই তা ফুটে উঠেছে। ‘কোথাও শান্তির কথা নেই তার, উদ্দীপ্তিও নেই’ কবিতায় যেমন, উপন্যাসেও সেই হতাশা_ নিরাশ্বাস এসেছে। ‘বাসমতীর উপাখ্যান’-এ এই নিরাশার উৎস সমকালীন রাজনীতি, দেশভাগ, দাঙ্গা আর ইতিমধ্যেই ফিকে হয়ে আসা ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার আনন্দ। দেশভাগের পর দেশের চেহারা কী রকম দাঁড়াবে তা নিয়ে কোনো আশাবাদ ছিল না তাঁর মনে। একধরনের নৈর্ব্যক্তিক নির্লিপ্তি নিয়ে তিনি ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও স্বাধীনতাকে গ্রহণ করেছিলেন। ‘বাসমতীর উপাখ্যান’ উপন্যাসের একটি অংশ নিম্নরূপ:

‘শিগগিরই তো দেশ স্বাধীন হবে।’

‘সে ভিড়ের মধ্যে আমাদের কোনো স্থান হবে না।’

‘এই বলছ? কী করে বুঝলে?’ রমা বললে, ‘চোখে বুঝি দূরের জিনিস দেখতে পাও?’

‘হ্যাঁ, নির্ঘাত। মিলিটারিতে চেষ্টা করলে অবিশ্যি কমিশন পাওয়া যেত, মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার বয়স নেই। অন্য কোনো কাজ পাওয়া যাবে না। যেসব ছেলের পরীক্ষার খাতা দেখে ঘেন্না ধরে গেছে। চাকরি ও ব্যবসার বাজারে ওদের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল; কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ওরা পথ কেটে নিতে জানে, স্বাধীন ভারতে ওদের সুবিধা হবে।’

‘ওদের সুবিধে হবে বলতে চাও বুঝি তুমি?’ রমা যেন অবহিত হয়ে স্ফটিকের ভেতর দিয়ে গ্গ্নানিকর ভবিষ্যৎটাকে দেখে, তবুও সেটাকে অবিশ্বাস করবার চেষ্টা করে বললে।

‘হ্যাঁ, ওদের; আর ওদের মতন ছোকরা আর বুড়োদের। কিন্তু আমাদের কোনো মীমাংসা হবে না। মীমাংসার ভার যাদের ওপরে বাংলাদেশের সেসব অন্ধদের তো এখনই দেখছি আমি; রাতারাতি ভোল বদলাবে এরা। এদের আওতায় সমস্ত দেশ অন্ধ, খোঁড়া, নুলো, বোবায় ভরে যাবে, টাকা চাকরি ব্যবসা, সবই ওদের; দেশ স্বাধীন হলো বলে ভালো লাগবে আমাদের। কিন্তু অন্যসব দিক দিয়ে খুবই খারাপ লাগবে। সপরিবারে মরেও যেতে পারি।… স্বাধীনতার কোনো সেবকও আমাদের দিকে ফিরে তাকাতে যাবে না।’

ভাবতে কিছুটা অবাক লাগে যে, স্বাধীনতার এক বছর না যেতেই ঔপনিবেশিকতা-উত্তর ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ সম্পর্কে কী রকম মোহভঙ্গ হয়েছিল জীবনানন্দের। আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন:

‘… পুলিশ সেক্রেটারিয়েট সবই বেশ জুতিয়ে সুখে থাকবে।’

‘জুতিয়ে?… তাহলে দুঃখ হবে কাদের?’

‘যারা দুঃখের জন্য জন্মেছিল তাদের।… ব্রিটিশ আমলে যারা ঘাড় পেতে দুঃখ সহ্য করেছিল এবারেও বহন করবার ক্ষমতায় খুব সম্ভব আরও বেশি দুঃখ সহ্য করতে হবে তাদের। কিন্তু আরও খানিকটা চোখ খুলে যাবে তাদের, মানুষের জীবন সম্বন্ধে, আশা ও আশাবাদ সম্বন্ধে যা ভুল বুঝেছিল শুধরে নিতে পারবে, আরও স্পষ্ট একটা দার্শনিক সংস্থানে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে মনে হচ্ছে।’

আমি বলতে চাইছি, জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’ ও ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ স্বাধীনতা-উত্তর [ঔপনিবেশিকতা-উত্তর] ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ সম্পর্কে মোহভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত। তিনি যে সমাজকে প্রতিষ্ঠা হতে দেখতে চেয়েছিলেন তা ‘পাওয়ার, প্রফিট আর প্রিভিলেজ’_ এই তিনের অশুভ প্রভাবের বাইরের সমাজ। তবে তা প্রখ্যাত বামপন্থার প্রগতিশীল সমাজের ধারণার মধ্যেও সীমিত থাকেনি। কেননা একমাত্র মার্কসকেই তিনি আঁকড়ে ছিলেন না তাঁর শ্রেয়তর সমাজকে সংজ্ঞায়িত করার প্রশ্নে। উপন্যাসে বলেছেন যে, ইউরোপের স্কিনোজা, ফ্রয়েড, মার্কস, আইনস্টাইন আর ‘আমাদের দেশের আগের কালের পণ্ডিতরা যা রেখে গেছেন।’ তার ভিত্তিতে সেই সমাজের সংজ্ঞায়নের কাজ শুরু করতে হবে। এ কারণেই বারেবারে তাঁর এই সময়কার কবিতায় ফিরে এসেছে জ্ঞানসমাজের কথা, নিছক জ্ঞানের নয়, হৃদয়ের শুভ্রতা-শুদ্ধ জ্ঞান চর্চার কথা। সে সমাজ গড়াও সহসা সম্ভব নয়, সে অনেক শত শতাব্দীর ‘মনীষীদের কাজ’_ এ রকম বলেছেন কবিতায়। এ-ও আধুনিতারই নির্মাণ, তবে যুদ্ধ আর বাণিজ্যকে অবলম্বন করা কোনো বণিক-আধুনিকতার নয়। এটি অন্য এক ‘বিকল্প আধুনিতা’র নির্মাণ। বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যের ‘প্রয়াণপটভূমি’ কবিতায় তাঁর স্বভাবজ ভঙ্গিতে বলছেন [আমি নির্বাচিত অংশ গদ্যকারে তুলে ধরছি]: ‘মানবহৃদয়, দিন কি শুধু গেল? শতাব্দী কি চলে গেল! আজকে যখন সান্ত্বনা কম, নিরাশা ঢের, চেতনা কালজয়ী হতে গিয়ে প্রতি পদেই আঘাত পেয়ে অমেয় কথা ভাবে। ইতিহাসের ব্যাপক অবসাদের সময় এখন, তবু নরনারীর ভিড় নব নবীন প্রাক্ সাধনার;_ নিজের মনের সচল পৃথিবীকে ক্রেমলিনে লন্ডনে দেখে তবুও তারা আরো নতুন অমল পৃথিবীর।’ না, জীবনানন্দের কবিতাকে শুধু নির্জন ইতিহাসচেতনার জন্য স্মরণ করলে ভুল হবে। নিছক মতাদর্শগত প্রগতিশীলতার মধ্যেও বদ্ধ ছিলেন না তিনি। বাসমতীর উপাখ্যানে আমরা এ নিয়ে স্পষ্ট বাদানুবাদ পড়ি:

‘সুমিতা কমিউনিজম নিয়ে আছে। ওর সঙ্গে মনে বনে না আমার।’

‘আমি ভেবেছিলুম তুমিও কমিউনিস্ট।’

‘সেটা ভুল ভেবেছিলেন।’

‘তুমি কংগ্রেসের?’

‘না।’

‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম’ প্রিন্সিপাল খানিকক্ষণ পরে বললেন, ‘যেন কংগ্রেস-কমিউনিজম ছাড়া আর পৃথিবী নেই।’

‘আছে, সেখানে পলিটিক্সও আছে হয়তো_ কিন্তু আজকালকার চারদিককার সব চালু পলিটিক্স নেই।’

‘রাজনীতি বলতে এক ভিন্ন ধরনের বোধকে জীবনানন্দ ধারণ করেছিলেন ভেতরে। তার বর্ণনা-বিশ্লেষণ পাই তাঁর গদ্য-রচনায়। এই বর্ণনা-বিশ্লেষণকে বাদ দিয়ে পাশ কাটিয়ে আমরা বুঝতে পারব না পুরোপুরি_ কেন তিনি লিখেছিলেন, এত অনায়াসে সেকালে বসেই লিখতে পেরেছিলেন বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যের ‘সামান্য মানুষ’ কবিতার শেষ স্তবকটি:

‘প্রতিটি মাঘের হাওয়া ফাল্গুনের আগে এসে দোলায় সে সব।
আমাদের পাওয়ার ও পার্টি-পলিটিক্স
জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরেক রকম শ্রীছাঁদ।
কমিটি মিটিং ভেঙে আকাশে তাকালে মনে পড়ে_
সে আর সপ্তমী তিথি : চাঁদ।’

৪. যার যা হারিয়ে গেছে

দেশভাগ জীবনানন্দকে বিপর্যস্ত করেছিল, কিন্তু ততদিনে তার কবিখ্যাতি প্রতিষ্ঠিত, ফলে চাকরি জুটিয়ে যাহোক সংসার চালানোর মতো অবস্থা তিনি করে নিতে পেরেছিলেন। অনটন ছিল। কিন্তু তার ভেতরেই অফুরন্ত সৃষ্টির মধ্যে ব্যাপৃত ছিলেন তিনি আমৃত্যু। দেশভাগের রাজনীতি ও উদ্বাস্তুতা এসব তিনি যথাসম্ভব যুক্তি-জিজ্ঞাসা দিয়ে মোকাবেলা করেছিলেন। তা ছাড়া কলকাতা তাঁর কাছে অপরিচিত কোনো শহর ছিল না। এই শহরেই তিনি তিরিশের দশকের গোড়ায় বেশকিছু দিন ছিলেন। ‘কল্লোল’ ও ‘কালি-কলম’ যুগের অংশীদারও ছিলেন তিনি। অধ্যাপনা করেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন, খুব কাছ থেকে নগর-জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। ফলে চলি্লশের দশকের শেষে যখন কলকাতায় এলেন পারিপাশর্ি্বককে [পরিবর্তন সত্ত্বেও] চিনতে-বুঝতে অসুবিধে হয়নি তাঁর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্য পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কঠিন। দেশভাগ তাঁর জন্য আরও বেশি ক্লেশকর অভিজ্ঞতা বয়ে নিয়ে এসেছিল। আক্ষরিক অর্থেই প্রথম দিকে ‘রিফিউজি’ বা শরণার্থী হিসেবেই নিজেকে চিহ্নিত করেছেন তিনি। এখানে আমার শুধু যোগ করার_ দেশভাগের অভিজ্ঞতা তার কবিতা ও গদ্যরচনাকে মৌলিকভাবে প্রভাবিত করেছে। যার অমোচনীয় প্রভাব বিস্তৃত ছিল তাঁর জীবনে, আমৃত্যু। সুনীলের সৃষ্টির এই বিশেষ দিকটি নিয়ে আরও বেশি করে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এদিক থেকে কবিদের মধ্যে বাংলাদেশে তার নিকটতম তুলনা হবেন সম্ভবত শহীদ কাদরী। গদ্য-রচনায় হাত দেননি যদিও, কিন্তু শহীদ কাদরীর পঞ্চাশের দশকে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় আসা তার চৈতন্যের ওপরে গভীর আত্মজৈবনিক প্রভাব ফেলেছিল। শহীদের ‘উত্তরাধিকার’-এর বহু কবিতায় দেশভাগ, যুদ্ধ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তুতার ছাপ রয়ে গেছে। ‘কলকাতা’ দেশভাগ-উত্তর শহীদ কাদরীর জন্য ফরাসি মনোবিজ্ঞানী দার্শনিক লাকাঁর উদ্ভাবিত ‘অপর’-এর মতো কাজ করেছে। পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশও তেমনি ‘অপর’ হয়ে থেকে গেছে সুনীলের রচনায়।

দেশভাগের অভিঘাত সুনীলের জীবনে সরাসরিভাবে পড়েনি। জয় গোস্বামীর ‘নন্দর মা’ কবিতায় যেভাবে শরণার্থীদের দেশত্যাগ করতে হয়েছিল, সুনীলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন ছিল না। সুনীলের বাবা দেশভাগের আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সুনীলরা সপরিবারে সেখানেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তবে সরাসরিভাবে না হলেও দেশভাগের অপ্রত্যক্ষ অভিঘাত হয়েছিল প্রবল ও সুদূরপ্রসারী। এ নিয়ে সুনীল বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ আত্মজৈবনিক গদ্য ও কবিতা লিখেছেন। ‘ইতিহাসের পরিহাস’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলাম, পূর্ব বাংলায় আমাদের নিজস্ব বাড়িঘর, বাগান, পুকুর অন্য একটি রাষ্ট্রের মধ্যে পড়ে গেছে। সেখানে ফিরে যেতে হলে আমাদের একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকতে হবে। আমরা আর ফিরে যাইনি।’ ব্যবহারিক জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেশভাগ সুনীলের কৈশোর-যৌবনকে আক্রান্ত করেছিল দু’ভাবে। প্রথমত, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় গ্রামের বাড়ি থেকে আর আসার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-শরিকরা দেশভাগের পরে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন সীমান্তের ওপারে। এর চাপ সুনীলের পরিবারের ওপরও পড়েছিল। সুনীলের বর্ণনায় তার একটি চিত্র পাই:

‘দেশ বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিবারটিও উদ্বাস্তু হয়ে গেল বটে, কিন্তু আমরা কোনো সরকারি সাহায্য নিইনি, জবরদখল কলোনিগুলোতেও আশ্রয় নিতে হয়নি। আমার বাবার একটি স্কুল মাস্টারির চাকরি ছিল, তখনকার দিনে তার মাইনে ছিল যৎসামান্য। আমাদের চার ভাইবোন ও মা ছাড়াও পূর্ববঙ্গ থেকে আগত কিছু কিছু আত্মীয়স্বজনকে সেই সময় আশ্রয় দিতে হয়েছিল, সবাই মিলে আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম এবং কোনোক্রমে আত্মসম্মান বজায় রেখে বেঁচে ছিলাম। আমি তখন ১৩ বছরের কিশোর, দারিদ্র্যের কষ্ট বিশেষ অনুভব করতাম না, কিন্তু বাড়ির বাইরে বেরুলে কিংবা স্কুলে গেলে টের পেতাম, অন্যরা আমাদের বহিরাগত বলে মনে করে। উদ্বাস্তুদের সংখ্যা যখন এক কোটির কাছাকাছি হয়ে গেল, সেই বিরাট সংখ্যার মানুষ সারা পশ্চিম বাংলায় বিশৃঙ্খলা ঘটিয়েছিল, তখন আমার সহপাঠীদের কেউ কেউ আমার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলত, আমিও সেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের একজন। অবিভক্ত বাংলায় আমি ছিলাম যাদের সঙ্গে সমান সমান, বাংলা ভাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি হয়ে গেলাম তাদের চোখে অবাঞ্ছিত। আমাদের কৈশোর হলো খুব সংক্ষিপ্ত। আমাদের গুরুজনরা অনবরত বলতেন, যে কোনো উপায়ে যে কোনো একটা জীবিকা জোগাড় করো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এখানে বাঁচার একমাত্র উপায় খুব দ্রুত উদ্বাস্তু পরিচয়টা মুছে ফেলে মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যাওয়া। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই আমি জীবিকা অর্জন শুরু করি, কিন্তু উদ্বাস্তু পরিচয়টা কখনও মুছে ফেলতে পারিনি।’

দেশভাগের প্রভাব পড়েছিল সুনীলের সাহিত্য জীবনেও। সুনীলের প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’-এর পটভূমিকা দেশভাগ ও দেশত্যাগের পরবর্তী ‘শিকড়হীনতা’। তাঁর ‘অর্জুন’ উপন্যাসে রয়েছে উদ্বাস্তু কলোনির গল্প। পরবর্তীকালে এই সময় নিয়ে লেখা ‘পূর্ব পশ্চিম’ উপন্যাসে দেশভাগের আখ্যান বিবৃত হয়েছে। দুই বাংলার মানুষের জীবন সমান্তরালভাবে বর্ণিত হয়েছে আরও বৃহৎ প্রেক্ষাপটে। তবে শুধু গদ্য রচনায় নয়, কবিতায়ও প্রভাব পড়েছে দেশভাগ ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্বাস্তু জীবনের। উদ্বাস্তুদের বিপুল সংখ্যা পরবর্তীতে সিপিএমের জন্য বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। সুনীলের ব্যাখ্যায়, ‘বাংলা ভাগের জন্য কংগ্রেস দলকে দায়ী করে উদ্বাস্তুরা প্রথম থেকেই সরকারবিরোধী, সেই সুযোগ নিল বিরোধী পক্ষ অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি। পশ্চিম বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যুত্থান ও শক্তিবৃদ্ধির মূলে আছে উদ্বাস্তুরা। ক্রমে কমিউনিস্টরা পশ্চিম বাংলার ক্ষমতা দখল করে ওদেরই সাহায্যে, যাদের বলা যেতে পারে ‘এক্সটারনাল প্রলেতারিয়েত।’ দেশভাগ, উদ্বাস্তুতা ও বিপন্ন সময়ের সঙ্গে নকশাল আন্দোলনেরও যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন সুনীল। মন্তব্যটা তাৎপর্যপূর্ণ নকশাল আন্দোলনের সামাজিক পটভূমি বোঝার জন্য:

‘একটা সময় তো আমরা বাউণ্ডুলের মতো এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতাম।… কারণ সময়টাই তখন ছিল খুব অস্থির। ভবিষ্যৎ-টৎ খুব বেশি দেখতে পেত না কেউ।… আমাদের সময় সবটাই অনিশ্চিত। কিছু পরে নকশাল আন্দোলন তো ওই অস্থিরতা থেকেই শুরু। আমাদের তখন একটু বয়স হয়ে গিয়েছে। সত্তর সালে যদি আমাদের আর একটু কম বয়স হতো তো আমরাও নকশাল করতাম। পঞ্চাশের দশকে আমরা রাজনীতির দিকে ছুটিনি। তার বদলে ভাষা নিয়ে যত ভাঙচুর করেছি। ভাষার মধ্যেই গুলি চালিয়েছি, বোমা ফাটিয়েছি। ওই সময় একটা কবিতাতে লিখেছিলাম, ‘আমিও পৃথিবী, স্বর্গ, কলেজ স্ট্রিটের মহাঅগি্নকাণ্ড দেখে শিল্পকে প্রহার করি, ভেঙেচুরে নষ্ট করি, লাথি মেরে নরকে পাঠাই’_ ওটা কিন্তু এক ধরনের নকশাল অ্যাটিটিউডই বটে। আমাদের দিচ্ছে না কিছু করতে। কাজেই আমরা সব ভেঙেচুরে নষ্ট করে যাব। এই অস্থিরতা বোধ আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াত।’ এই অস্থিরতাবোধ_ যার জন্ম হয়েছিল দেশভাগ, উদ্বাস্তুতা ও অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে_ ক্রমশ সৃষ্টি করেছিল এক নতুন নান্দনিক চেতনারও। এর অনিবার্য পরিণতি_ ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর অভ্যুদয়। এঁদের দ্রোহ শুধু সমকালীন সমাজের চলতি সংস্কার বা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে চালিত ছিল না। এঁরা উদ্বাস্তু সময়ের সন্তান বলেই পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের বাংলাভাষী মানুষদের সাংস্কৃতিকভাবে সহমর্মী করে তুলতে চেয়েছিলেন। ততদিনে পূর্ববঙ্গে ঘটে গেছে বাহান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৫৩ সালে ‘কৃত্তিবাস’-এর প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন:

‘কৃত্তিবাস বাংলাদেশের তরুণতম কবিদের মুখপত্র।… বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে পাকিস্তানের কবিদের স্থান প্রায় অনুল্লেখ্য। তাতে কোনো দুঃখ থাকত না_ যদি না তাদের কেউ কেউ আশ্চর্য সার্থক কবিতাও লিখতেন। বাংলাদেশের শারীরিক মানচিত্রের মতোই কাব্যের মানচিত্রও খণ্ডিত হয়েছে। কিন্তু উভয় বঙ্গে বাংলা ভাষার পূর্ণ অধিকার সম্বন্ধে যেন আমাদের কখনও না সন্দিগ্ধ হতে হয়। পাকিস্তানের তরুণ কবিরা আমাদের সমদলীয়, সহকর্মীও।’

এরই মধ্যে পূর্ববঙ্গে প্রকাশ পাবে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘নতুন কবিতা’। সেখানে এবং কৃত্তিবাসে অচিরেই লিখবেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিন, আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ। পূর্ববঙ্গ অবশ্য এগুবে তার নিজস্ব নিয়মে, নিজের শক্তিতে, নিজের পরিণতির দিকে_ অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অনেক চড়াই-উৎরাই, অনেক রক্ত আর অশ্রুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেটা অন্য ইতিহাস। ‘দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন ও সুনীলের সাহিত্যকর্ম’ নিয়ে মোটামুটি একটি গবেষণাগ্রন্থ লিখে ফেলা যায় [কেউ নিশ্চয় করবেন আগামীতে]। এত অসংখ্য বার এসবের উল্লেখ রয়ে গেছে বলে সুনীলের গদ্যে ও কবিতায়! শেষ দিকের কবিতাগুলোতে তো বারবার ফিরে এসেছে এসব প্রসঙ্গ তাঁর স্মৃতি-সত্তার অনুষঙ্গ হয়ে। ‘ভালবাসার খণ্ডকাব্য’ গ্রন্থের ‘ভোরবেলার স্বপ্ন’ কবিতাটি তারই একটি উদাহরণ। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নজরুল, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক সবাই উপস্থিত। কবি ভাবছেন :

“দু’পাশে কিসের এত ধ্বংসস্তূপ?
নিবেদিতা বললেন, এটা কোন দেশ, চিনতে পারছি না।
গান লিখছেন রবীন্দ্রনাথ আর গুন গুন করে সুর ভাজছেন
এক সময়, মুখ তুলে প্রশ্ন করলেন খুব মৃদু কণ্ঠে
তোমরা দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে পারলে না?
কৃষ্ণনগরের বাড়িতে দিলীপকে গান শেখাচ্ছেন তার বাবা
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
আচমকা থেমে গিয়ে হা-হা করে হাসতে লাগলেন দ্বিজেন্দ্রলাল
জানালা দিয়ে তাকিয়ে বললেন, দ্যাখ, দ্যাখ
কী ভেবে লিখেছিলাম, আর আজ তার কী অর্থ
সকল দেশের রানী যে চাকরানী হতে চলেছে এই দেশ?
… … … … …
জীবনানন্দ কালি ঢেলে দিচ্ছেন রূপসী বাংলার পাণ্ডুলিপিতে
হঠাৎ আপন মনে বলে উঠলেন মহাপৃথিবী না ছাই!
জন্মভূমিটাই থাকল না!
… … … … …
বিভূতিভূষণ দাঁড়িয়ে আছেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সামনে
বারবার ডাকছেন অপু, অপু, ছেলেরা কেউ গ্রাহ্য করছে না
… … … … …
রেডিওর সামনে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ
শুনছেন নিজেরই গান
… … … … …
এক সময় খেয়াল হলো। তাঁর একটা গান তো কেউ আর গায় না
সীমান্তের ওপারেও না, এ পারেও না
সহ্য করতে পারবেন না বলে এতদিন সীমান্ত দেখতে যাননি
আজ গিয়ে দাঁড়ালেন সেখানে
এখন শিলাইদহে যেতে তাঁর ভিসা লাগবে
নিজেই গলা খুলে ধরলেন তার সেই প্রিয় গানটি
বাঙালির গান, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা
সত্য হউক সত্য হউক…
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক, এক হউক, এক হউক…
এ কী রবীন্দ্রনাথ কাঁদছেন?”

মৃত্যুর বছরখানেক আগে প্রকাশিত হয় সুনীলের ‘বালুকণার মতন অ-সামান্য’ কাব্যগ্রন্থটি। এটি ‘প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও কবিতাপ্রেমী’ রণজিৎ গুহকে উৎসর্গ করা। সেখানে আবারও তিনি একই থিমে ফিরে আসলেন, এবারে আত্মজৈবনিক সূত্রে [যা আগে গদ্য-রচনায় আমরা লক্ষ্য করেছি]:

‘আমার বাবা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন,
আমি বাড়ি যাচ্ছি!
তখন আমরা সামান্য ভাড়া বাড়িতে থাকি
পূর্ববঙ্গের দেশের বাড়ির কথা বাবা কখনও
উচ্চারণ করতেন না
তবু মৃত্যুর আগে… বাবা… বাড়ির স্বপ্ন
সে কোন স্বপ্নের দেশে ছিল আমাদের সেই বাড়ি।
… … … … …
এই দেশ বিভাগ, বাংলা-বিভাগ এখনও
শেল হয়ে বিঁধে আছে আমার বুকে
এটা ইতিহাস, মেনে নেওয়াও তো উচিত
কিন্তু যখনই ভাবি, রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে
কী করতেন
বাংলা ছিল যার প্রাণ, তিনি কি আর একদিনও
বাঁচতেন
মাঝে মাঝে এইসব ইতিহাসের মুখে
জুতো মারতে ইচ্ছে হয় না?’

এই ন্যারেটিভের বিপরীতেও অবশ্য অন্য ন্যারেটিভ রয়েছে। সীমান্তজুড়ে নির্মিত হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া, তাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঝুলে আছে ফেলানী। তিস্তার হিস্যা পায় না বাংলাদেশের জনপদ। অবৈধ সীমান্ত-বাণিজ্য চলে অবাধে। সুন্দরবন নষ্ট করার আন্তঃরাষ্ট্রীয় আয়োজন হয় রামপালে, কিন্তু এদেশের কোনো বাংলা টিভি চ্যানেলই প্রদর্শিত হয় না বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গে! চলি্লশ বছর পরেও ছিটমহলের সামান্য কিছু সংখ্যক মানুষের মানবিক দাবি পূরিত হয় না। দেশভরা শুধু স্মৃতি নয়। তা এখনও আমাদের আধুনিক রাষ্ট্র-ইতিহাসকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সুনীল কি এসব সাম্প্রতিক ও ততটা সাম্প্রতিক নয় তেমন বিষয়গুলো নিয়ে গদ্যাকারে বা কবিতার শব্দে সাজিয়ে কিছু লিখেছিলেন? অথবা লেখার কথা ভাবছিলেন, জানতে ইচ্ছে করে।

৫. প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে

শামসুর রাহমান সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একদা মন্তব্য করেছিলেন, যে কোনো বিষয় নিয়ে কবিতা লেখার অতুলনীয় ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। বাস্তবিক, সৃষ্টির প্রাচুর্যে শুধু একজনের সঙ্গেই তাঁর তুলনা চলে, তিনি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের সৌভাগ্য যে, গত চার দশকে আমাদের কবিতার ভুবনে সক্রিয় ছিলেন শামসুর রাহমান আর আমাদের গল্প-উপন্যাসের ভুবনে হুমায়ূন আহমেদ। বহু সংস্কৃতির এদেশে ‘সেক্যুলার’ প্রাণশক্তির নিভৃত কেন্দ্রে ছিলেন এঁরাই। এক দাপুটে রাষ্ট্র আর বহুগাঠনিক দ্বন্দ্বে বিকীর্ণ সমাজের পরিবেশ এদেরকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। কবিতার ঐতিহ্য ও মৌলিকতার বিষয়ে ভাবনায় শামসুর রাহমান তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। গ্যেটে যেমন অনুরক্ত হয়েছিলেন কালিদাস ও হাফিজের কবিতার প্রতি, শামসুর রাহমান হাত বাড়িয়ে ছিলেন বিশ্বসাহিত্যের বিপুল ভাণ্ডারের দিকে। সেই সঙ্গে এদেশের ও এ জনপদের সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ছিল। একদিকে পারিবারিক আবহর কারণে ঊর্দু ভাষা ছিল তার অনায়াস আয়ত্তে, অন্যদিকে ইংরেজি ছিল তার পাঠের মাধ্যম। কখনও ভাষা-ব্যবহারে জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় দেননি। তরুণতর কবিদের কাছে তাঁর পরামর্শ ছিল, যা কিছু মূল্যবান তা যে উৎসেরই হোক না কেন তাকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে উদার অবস্থান গ্রহণের: ‘আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে, বিদেশি সাহিত্য পরিক্রমায় আমরা যত পারদর্শীই হই না কেন, স্বদেশের নানা পুরাণ, লৌকিক কাব্য এবং বিভিন্ন যুগের কাব্যস্মৃতির প্রতি আনুগত্য না থাকলে কাব্যক্ষেত্রে অসামান্য সিদ্ধি লাভ অসম্ভব।’ এক্ষেত্রে স্বদেশীয় সাহিত্যকে ‘হিন্দু যুগ’ ও ‘মুসলিম যুগ’ করে পাঠ করার সাম্প্রদায়িক প্রবণতার চরম বিরোধী ছিলেন তিনি। আত্মপরিচয়ের [আইডেনটিটি] ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিজীবনে যেমন, কবিতার ক্ষেত্রেও বিচিত্র সব সূত্র, উৎস ও ঐতিহ্য থেকে আহরণ করেছেন বিষয়-চিন্তা, শব্দাবলি, উপমা, প্রেক্ষিত ও চিত্রকল্প। লালন-বর্ণিত চৈতন্য প্লাবিত নদীয়ার ‘তিন পাগলের’ কথাই তিনি শুধু জানতেন না, জানতেন সুফী সূত্রও_ মৌলানা জালালুদ্দিন রুমী, হাফিজ, নানা মাহজাবের ও ঘরানার চিন্তা দর্শন। কিন্তু এ নিয়ে আতিশয্য ছিল না তার মধ্যে_ সেটা বাউল-দর্শন হোক আর সুফী সন্ত-সাধুদের দর্শনই হোক। ‘স্বদেশীয়’ বলতেই জাতীয়তাবাদী যে অবস্থানের মানসিকতা বঙ্গভঙ্গ আমল থেকে এদেশে চালু আছে তাতে তার অন্তরাত্মা সায় দেয়নি। সেটা কূপমণ্ডূকতায় বিশ্বাস করতেন না বলে। অথচ আমাদের জাতীয় সংগ্রামে ও প্রগতিশীল জন-আন্দোলনে তাঁর কবিতাই ছিল রাজনৈতিক প্রেরণার বড় একটি উৎস। সাংস্কৃতিক কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা নিয়েই বাড়াবাড়ি করা তাঁর রুচিবিরুদ্ধ ছিল। তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন স্বদেশে_ রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আর বিদেশে_ রুমী, বোদলেয়ার, এলিয়ট, ইয়েটস ও নেরুদা। কিন্তু এঁদের কারোকেই অনুসরণ করেননি তাঁর কাব্যজীবনে। কাব্যকৃতির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিষয়ের বিচিত্রবিধ অভিগামিতায় তিনি প্রায় একাই বাংলাদেশের কবিতাকে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক যুগে পেঁৗছে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী, ফ্যাসিবাদবিরোধী ও ধর্মান্ধতাবিরোধী অবস্থাতে। তরুণতর কবিদের বলেছিলেন_ সিরিল কনোলির সূত্র ধরে_ সুরা, নারী লোলুপতা ও সাংবাদিকতা কবিতার শত্রু, এই তালিকায় তিনি যোগ করেছিলেন_ ‘ফ্যাসিবাদ’ ও ‘মৌলবাদ’। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনেই সাংস্কৃতিক-দার্শনিক রেনেসাঁ কাজ করে। ১৯৪৭ সালের পরে এদেশের জনগোষ্ঠীর ‘উত্থানের’ পেছনেও সাংস্কৃতিক ‘রেনেসাঁ’ আন্দোলন ক্রিয়াশীল ছিল। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে গড়ে উঠে তা একুশ শতাব্দীতে পেঁৗছেছে। এই ইতিহাস লিখতে গেলে শামসুর রাহমানের কবিতার ছায়ায় আমাদের দাঁড়াতেই হবে। তারপরও তাঁকে জীবনের শেষ দশ-পনেরো বছর রাষ্ট্রের নিরাশ্রয়ে থাকতে হয়েছে। সন্ত্রাস শেষ পর্যন্ত কবিকেও ছুঁলো। অতর্কিত প্রাণনাশের ভয় ঢুকে পড়েছে তাঁর নিত্যকার জীবনযাপনের মধ্যে। ব্যক্তি মানুষ যে কত বিপন্ন, কত অসহায়-আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতাসীন বলয়ের হুমকির মুখে_ এটা তারই একটি দৃষ্টান্ত।

শামসুর রাহমানের শেষ দিকের কাব্যগ্রন্থগুলোতে এক সদা-সশংক সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। নাগিব মাহফুজকে নব্বই দশকের গোড়ায় ছুরিকাহত করেছিল মিসরের মৌলবাদী শক্তি। শামসুর রাহমানের ওপরও এ রকম আক্রমণের চেষ্টা করা হয় নব্বই দশকের শেষ দিকে। ‘কবিতা এক ধরনের আশ্রয়’ গ্রন্থের একটি প্রবন্ধে তার সে সময়কার মনোভাব ফুটে উঠেছে :

‘আজকাল রাতের বেশিরভাগ সময় নির্ঘুম কাটে। যেটুকু ঘুমাই,
হিজিবিজি স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে নয়, জাগ্রত অবস্থাতেই প্রায়শই
একটি ধাবমান/ধারালো কুড়াল নাচতে থাকে দৃষ্টিপথে। এক
হিংস্র তরুণ ধেয়ে আসছে আমার দিকে। মূর্তিমান এক
বিভীষিকা দেখে আমি পাথরের মতো স্থির, বাকশক্তিরহিত।’

নিজেকে মার্চেন্ট অব ভেনিসের অ্যান্টোনিওর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে অ্যান্টোনিও এক জায়গায় বলছেন, ‘আই নো নট হোয়াট আই এম সো স্যাড।’ এর প্রভাব কবিতাতেও পড়েছে:

“ভোরবেলা কারা এসে ঘরে ঢুকে পড়ে; চোখ দুটি
কচলাতে কচলাতে দেখি,_ কয়েকটি রুক্ষ পশু
মানুষের কণ্ঠস্বরে বলে, ‘এক্ষুনি বেরিয়ে যাও
এই ঘর ছেড়ে,
এখানে থাকার অধিকার বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে,
তুমি বনবাদাড়ে আস্তানা খুঁজে নাও।’

বিভ্রান্ত, নির্বাক আমি চেয়ে থাকি হাবার ধরনে, ভয়ঙ্কর
ভূমিকম্প ভীষণ দুলিয়ে
এবং ধুলিয়ে দেয় সবকিছু; তাসের ঘরের
মতো ধসে পড়ে চতুর্দিক, ‘গীতবিতান’ এবং
গালিবের গজল নিমেষে মুছে যায়…”

এ রকম উদাহরণ যত্রতত্র তাঁর কবিতার লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া একদার সাজানো ঘর-গৃহস্থালিজুড়ে।

শামসুর রাহমানের এই ভীত-সন্ত্রস্ত কবিতাগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার স্মারক হিসেবে না দেখে এই সময়ের রাষ্ট্রের সমাজ-বিরুদ্ধ নাগরিক-বিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা হিসেবে আমরা পড়তে পারি। ১৯৪৭-উত্তর আধুনিক [ভারতীয়] রাষ্ট্র নিয়ে জীবনানন্দের মধ্যে কোনো মোহ ছিল না। দেশভাগের মধ্য দিয়ে মানব-ভূখণ্ড গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই যে দুর্দশায় ও বিপর্যয়ে পতিত হয়েছিল তা শুধু জিডিপি-এর স্বল্পকালীন পতনে এবং একপর্যায়ে এর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। একেকটা পরিবারের জন্য, ব্যক্তিজীবনের জন্য, এই দেশভাগের প্রতিক্রিয়া শুধু একপুরুষে নয়, পুরুষানুক্রমে চলেছে। আধুনিক রাষ্ট্র সেই ক্ষতিটুকু ‘জনকল্যাণ’ দিয়ে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনি_ এমনকি স্বীকারও করেনি যে, দেশভাগের ফলে বৈষয়িক-মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীমান্তের এপারের ও ওপারের দু’তরফের জনগোষ্ঠী। সুনীল লিখেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা অনেক বেশি আধুনিক ও মহৎ’ আদর্শ হতে পারে, কিন্তু ‘নেহরুর… সেই মহৎ আদর্শের দাম দিতে কয়েক কোটি মানুষ তাদের বাড়ি-ঘর-সম্পত্তি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ দাঙ্গায় কিংবা অনাহারে কিংবা রোগ-ভোগে প্রাণ দিয়েছে।’

এ তো গেল সেকালের কথা। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পরও আমাদের কালেও নিঃসহায় মানুষের বিপন্নতা কমেনি সীমান্তের এপারে বা ওপারে। রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বলা হয় [শুনেছি], যুধ্যমান মানব-গোষ্ঠীর মধ্যে প্রলয় থামাতেই রাষ্ট্রের উদ্ভব। কিন্তু কালক্রমে আধুনিক রাষ্ট্র_ এই আধুনিক বণিক রাষ্ট্র_ নিজেই নেমেছে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকায় : মানব-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অঘোষিত যুদ্ধ চলছে। রাষ্ট্র আর দুর্বলের আশ্রয়দাতা নয়, নিরাশ্রয়ের জনক। এ রকম রাষ্ট্রের প্রতি মোহভঙ্গ হতে বাধ্য। জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই মোহভঙ্গেরই কবিতা ও গদ্য লিখে গেছেন তাঁদের যার যার জীবনের শেষ অধ্যায়ে।

জনজীবনের অর্থনীতি

বিনায়ক সেন

১. মিল ও অমিল

প্রতিটি শাস্ত্রই তার নিজের চারদিকে একটা সীমারেখা এঁকে দেয় বা বেড়া তুলে দেয়, যাতে করে বেড়ার ভেতর থেকে কেউ বাইরে যেতে না পারে, বা বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। রামায়ণে সীতার দেবর লক্ষ্মণ সীতার ভিটের চারদিকে একটি রেখা টেনে দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত যে-ই আসুক না কেন, সীতা যেন ঐ রেখার বাইরে পা না রাখেন। তাহলেই তিনি বিপদমুক্ত থাকবেন। বাংলা প্রবচনে একেই বলা হয়েছে_ লক্ষ্মণরেখা। শাস্ত্রগুলোও তেমনি তার চতুর্দিকে লক্ষ্মণরেখা এঁকে নিজেকে অন্য শাস্ত্রের প্রভাবমুক্ত বা ‘বিপদমুক্ত’ রাখতে চেয়েছে। বিশেষত এটা ঘটে এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে যখন শাস্ত্রগুলো ক্রমান্বয়ে একাডেমিক সনদ দানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি ‘ফ্যাকাল্টি’ হতে থাকে। বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিটি শাস্ত্রকেই তার নিজস্ব গণ্ডী দাঁড় করাতে হয়েছিল, সন্দেহ নেই। তবে সমাজে অত্যধিক শ্রম-বিভাজনের কারণে অতিমাত্রায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে গিয়ে কোথাও কোনো সার্বিক দার্শনিক (নৈতিক) ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে কি-না_ এ প্রশ্ন এডাম স্মিথ তার ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইতেই তুলেছিলেন। অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে নীতিশাস্ত্র (ও অন্যান্য শাস্ত্রের) বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্ষতি হয়েছে যেমন অর্থশাস্ত্রের, তেমনি নীতিশাস্ত্রেরও। এরকম একটি মত জোরে-শোরে উত্থাপন করেছিলেন অমর্ত্য সেন তার ‘এথিকস্ অ্যান্ড ইকোনমিক্স’ গ্রন্থে। আমি এসব সূত্র ধরে এই লেখায় মোটের উপর বলতে চেয়েছি যে, সাহিত্যের সঙ্গে অর্থশাস্ত্রের বিচ্ছিন্নতার কারণে অর্থনীতি নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনাও বেশ কিছুটা পরিমাণে ‘সংকীর্ণ’ হয়ে পড়েছে। এতে করে ক্ষতি হয়েছে দুই পক্ষেই। সাহিত্যে সর্বাধিুনিক অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো সেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। আবার অর্থশাস্ত্রেও সাহিত্যে বিবৃত জনজীবনের অভিজ্ঞতাগুলো যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার ফলে শাস্ত্রটির জনবিচ্ছিন্ন বিদ্যায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটাকে এক ধরনের ‘একাডেমিক প্রটেকশনিজম’-এর ফলপরিণাম হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অথচ সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও এ দুই মানবিক বিদ্যার (হিউম্যানিটিক) মধ্যে ‘নাড়ির বন্ধনকে’ অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘সাহিত্য’ বলতে আমি মহাকাব্য, পুঁথি, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ সবকিছুকেই এক জায়গায় জড়ো করছি। বাংলায় ইকোনমিক্স শব্দটার ভাষান্তরে অর্থনীতি ও অর্থশাস্ত্র দুই-ই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্বিত্বতা এড়ানোর জন্য আমি এখানে ইকোনমিক্স অর্থে অর্থশাস্ত্র আর ইকোনমি অর্থে অর্থনীতি ব্যবহার করছি। সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল দেখতে পাওয়া যায় বিষয়বস্তুর অভিন্ন ঝোঁকের মধ্যেই। উন্নয়ন ও সাম্যের ধারণা দুই বিদ্যার ক্ষেত্রেই অভিনিবেশের বিষয়। কোন নীতি জনহিতৈষী বা কোন নীতিই বা জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর_ এসব আলাপ উভয়বিধ বিদ্যারই চর্চার বিষয়। এটা ঠিক যে, জনজীবনের যেসব ধারণা সাহিত্যে অনায়াসে চলে আসে, তাকে বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করে বিচারের প্রয়াস চলে অর্থশাস্ত্রে। শুধু বিশেষভাবে সংজ্ঞার ঝোঁক নয়, বিচার-পদ্ধতিতেও গাণিতিক ও ইকোনমেট্রিক মডেল নির্মাণ ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ যোগ করা হয় আধুনিক অর্থশাস্ত্রে। তারপরও সমাজ-প্রগতির বা অধোগতির তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি কার্য-কারণ বোঝার তাগিদ পাওয়া যায় সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র উভয়ের মধ্যেই। একই ভাষার রকমফের সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেমন দুই ভিন্ন জাতি, ঠিক তেমনভাবেই একই ঝোঁক ও মূল্যবোধ ধারণ করা সত্ত্বেও সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র দুই ভিন্ন বিদ্যার আদল পায়। এই মৌলিক মিলের জায়গাটিকে ধরে রাখতে পারলে দুই বিদ্যারই বিকাশে তা আরো পুষ্টি জোগাবে সেটি এখানে আরো একবার মনে করিয়ে দেওয়া। এই মৌলিক মিলের অনেক উদাহরণ রয়ে গেছে বাঙালির অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে। বাংলা সাহিত্যের নানা উদাহরণের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রাগ্রসর অর্থনৈতিক চিন্তার পদচ্ছাপ (ফুটপ্রিন্টস)। আবার সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক অর্থনৈতিক কূটভাষের সরল সূত্র। এমনকি অনেক অর্থনৈতিক নীতিমালার সম্ভাব্য ধারণা-অভিজ্ঞান। এ রকম দুটো উদাহরণ হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা বিভূতিভূষণের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাস। এ দুটি লেখার সূত্র ধরে আমি পরবর্তী দুই অধ্যায়ে সাহিত্যে অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে কিছু বাড়তি প্রসঙ্গের উল্লেখ করব।

২. স্মিথ, ডিকেন্স, মিল ও বঙ্কিম

খোলা বাজার বা অবাধ বাজার-অর্থনীতি নিয়ে আমাদের জনমনে কম-বেশি ভুল-শুদ্ধ একটা ধারণা চালু আছে। বিশেষ কতগুলো শর্তসাপেক্ষে এ অবাধ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার অর্থনীতি হচ্ছে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথ_ এরকম একটি বক্তব্যের শাস্ত্রীয় সূচনা হয় স্মিথের ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইয়ে। এই বাজার-অর্থনীতি কোনো সর্বজ্ঞ পরিকল্পনাকারীর হাত ধরে কাজ করে না। বস্তুত কেউই এর পরিচালনার দায়িত্বে নেই। সমাজের সব ইকোনমিক এজেন্টেই স্বীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডে যুক্ত হন। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির স্বপ্রণোদিত উদ্যমের ফল হয় সামগ্রিকভাবে সবার জন্য শুভ। এই চমৎকার পরিণতির পেছনে কোনো নিখিল প্রজ্ঞার হাত নেই_ যা আছে তা হলো বাজারের অদৃশ্য হাতের জাদু। সেই থেকে স্মিথের ইনভিজিবল হ্যান্ড-এর তত্ত্ব অর্থশাস্ত্রে চালু হয়ে রয়েছে। বাজারের এই ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব অনেকগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে এ পর্যন্ত। এর মধ্যে আবার নজর কেড়েছে দার্শনিক মিশেল ফুকোর একটি বিশ্লেষণ। তিনি এক জায়গায় বলছেন যে, অদৃশ্য হাত-এর তত্ত্বে রাজা বা সার্বভৌম ক্ষমতা পুরোপুরি অস্বীকৃত। রাজা রাষ্ট্রের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা বা রাষ্ট্রক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি অপ্রয়োজনীয় সত্তা। অর্থাৎ ফুকোর ব্যাখ্যায়, সামন্তবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে যাওয়ার এক পর্যায়ে রাজার অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংকুচিত করার জন্য ১৬৮৮ সালের ‘গ্গ্নোরিয়াস রিভুল্যুশন’ যেসব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিল তারই সর্বোচ্চ তাত্তি্বক স্বীকৃতি মেলে ১৭৭৬ সালে স্মিথের লেখায় বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্বে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে রাজার যদি কোনো আবশ্যিক ভূমিকা না-ই থাকে, তাহলে তার অস্তিত্বের একটি বড় অংশই মহিমা হারিয়ে ফেলে। এদিক থেকে দেখলে ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব আসলে একটি অন্তর্ঘাতমূলক রাজদ্রোহী তাত্তি্বক তৎপরতা_ সর্বময় ক্ষমতার মালিক রাজা বা সার্বভৌমের বিরুদ্ধে। ফুকো তাই লিখেছেন, ‘ইকোনমিক্স ইজ আ ডিসিপ্লিন উইদাউট টোটালিটি।’ আমার নড়বড়ে অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন :’অর্থশাস্ত্র হচ্ছে এমন একটি বিদ্যা যা রাজার পক্ষে গোটা রাষ্ট্রকে শাসন করা সম্ভব এ রকম সার্বভৌম-কেন্দ্রিক ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে।… উদারনৈতিকতাবাদের জন্মই এই সূত্রে। এক দিকে আইনের যুক্তিতে গোটা সমাজের উপরে সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, আর অন্যদিকে আধিপত্যের হাত গলে যাওয়া অসংখ্য নাগরিকের/প্রজার বিভিন্নমুখী অর্থনৈতিক স্বার্থের (স্বাধীন) অন্বেষণ। এ দুই প্রবণতার মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে।’

বাজারের অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে এভাবে র‌্যাডিক্যাল ধারায় মহিমান্বিত করার চেষ্টা সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে টমাস কার্লাইল এই অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে নির্ভর করা শাস্ত্রটিকেই অভিহিত করলেন ‘এক বিষণ্ন বিজ্ঞান’ (ডিসমাল সায়েন্স) হিসেবে। অন্যদিকে অলিভার টুইস্ট, ব্রিক হাউস, হার্ড টাইমস প্রভৃতি উপন্যাসের মাধ্যমে চার্লস ডিকেন্স ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে অস্বীকার করে দেখালেন যে, সমাজের কল্যাণসাধন এই অর্থশাস্ত্রের অভিপ্রায় নয়। শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এসব অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে উঠল তার উপন্যাসে। পরিবেশ দূষণ, অনগ্রসর নগর পরিকল্পনা, কারখানায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধিমালার অনুপস্থিতি, জনশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা_ এসব বিতর্ক জন্মে উঠেছিল ইউরোপে আরও পরে; কিন্তু ডিকেন্সের লেখায় এসব বিতর্কের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ডিকেন্সের এই লেখাগুলো যখন প্রকাশিক হচ্ছে, ততদিনে আত্মপ্রকাশ করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। কার্লাইল ও ডিকেন্সের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিল। কার্লাইল ১৮৪৯ সালে অর্থশাস্ত্রকে বলেছেন, ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’; এর ঠিক এক বছর আগে, ১৮৪৮ সালে বেরিয়েছে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’। বইটি মৌলিক গোত্রের না হলেও স্মিথ-রিকাভো-ম্যালথাসের ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে সুপাঠ্যবই হিসেবে বিন্যস্ত করেছিলেন মিল। পরবর্তী প্রায় একশ’ বছর ধরে বাংলার (ও ভারতের) জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিকরা যেমন, উচ্চপর্যায়ের সরকারি চাকরি-প্রার্থী এদেশের ভদ্র সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকেই মিলের বইটির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল অর্থশাস্ত্রের পরীক্ষায় পাসের জন্য। বঙ্কিমের অর্থনৈতিক চিন্তাতেও এ বইয়ের গভীর প্রভাব ছিল। তবে বঙ্কিম তার বিভিন্ন লেখায় ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণে আরও কিছু প্রসঙ্গের সূত্রপাত করেন, যা তার চিন্তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।

অন্যত্র আমি বঙ্কিমচন্দ্রের ১৮৭২ সালের লেখা ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ এবং সে লেখায় অর্থশাস্ত্রীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে আমি তিনটি প্রসঙ্গের পুনরুক্তি করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত, দেশের শ্রীবৃদ্ধির (এখনকার পরিভাষায়_ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) প্রশ্নটিকে তিনি সরাসরিভাবে সম্পদ-বণ্টন তথা ভূমি-বণ্টন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করেছিলেন। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি বললেন, ‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে… আমাদের দেশের বড় মঙ্গল হইতেছে।’ কী মঙ্গল, তা-ও বললেন। চাষের অধীনে জমি বাড়ছে, রেললাইন বসেছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, বাণিজ্য দ্রব্য নিয়ে স্টিমার চলছে নদীবক্ষে, শহরে সন্ধ্যার পরে গ্রামের আলো জ্বলছে, ‘ফুলিস্কেপ কাগজে বঙ্গদর্শনের জন্য সমাজতত্ত্ব’ লেখা হচ্ছে, ইংরেজি শিক্ষার প্রসার হচ্ছে, সাহেবদের আসবাবপত্র আসছে, সেই সাথে তাদের আদব-কায়দাও আসছে। এসব বলার পরই এল তার পয়লা সওয়াল : ‘এরই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটি কথা জিজ্ঞসার আছে, কাহার এত মঙ্গল? হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাথায় খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্থিচর্ম্ম বিশিষ্ট বলছে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চষিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?… দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবী কয়জন?… যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।’ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোনো সামগ্রিক সূচকই উন্নয়নের সূচক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা গরিবমুখিন হচ্ছে সেটিই প্রধান বিচার্য।

দ্বিতীয়ত, ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যে নতুন জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন করেছিল তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন বঙ্কিম। আজকের ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা সে যুগেও ছিল রক্ষণশীল ও জমিদারি ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সমর্থক। এদের সমালোচনা করে বঙ্কিম প্রজাওয়ারী (রায়তওয়ারী) ব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দিলেন। তার ভাষায়, লর্ড কর্নওয়ালিস ‘মহাভ্রমে পতিত হইয়া প্রজাদিগের আরও গুরুতর সর্বনাশ করিলেন’_ তিনি ‘রাজস্বের কন্ট্রাক্টরদিগকে ভূস্বামী করিলেন’। অথচ, ”প্রজারাই চিরকালের ভূস্বামী; জমিদারেরা কস্মিনকালে কেহ নহেন_ কেবল সরকারি তহশীলদার। কর্নওয়ালিশ যথার্থ ভূস্বামীর নিকট হইতে ভূমি কাড়িয়া লইয়া তহশীলদারকে দিলেন… এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র কস্মিনকালে ফিরিবে না।” সম্পত্তির উপর মালিকানার ধরন যে অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা, এখানে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, এই অবস্থার যে দ্রুত নিরসন করা যাচ্ছে না, তার কারণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী শুধু জমিদারেরা নন, উচ্চ শ্রেণীর কৃতবিদ্য লোকেরাও অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভদ্র সম্প্রদায় তথা বাবুরা (এ ‘বাবুদের’ নিয়ে তার একটি স্বতন্ত্র তীক্ষষ্ট ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধও রয়েছে)। বঙ্গদর্শন পত্রিকার শুরুতে ‘পত্রসূচনা’য় বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট করে জানালেন যে, বাঙালির উন্নতি বলতে তিনি কখনোই কেবল সুশিক্ষিতের উন্নতি বোঝাচ্ছেন না। তার ভাষ্যে, ‘সমগ্র বাঙালির উন্নতি না হইলে দেশের কোন মঙ্গল নাই। সমস্ত দেশের লোক ইংরেজি বুঝে না, কস্মিনকালে বুঝিবে, এ মত প্রত্যাশা করা যায় না।… সুতরাং বাঙ্গালায় যে কথা উক্ত না হইবে, তাহা তিন কোটি বাঙ্গালী কখন বুঝিবে না, বা শুনিবে না। এখনও শুনে না, ভবিষ্যতে কোন কালেও শুনিবে না। যে কথা দেশের সকল লোকে বুঝে না, বা শুনে না, সে কথায় সামাজিক বিশেষ কোন উন্নতির সম্ভাবনা নাই’। দেখা যাচ্ছে, বঙ্কিম বাংলা ভাষার জনভিত্তিক প্রসারকে উন্নতির আরম্ভ-বিন্দু হিসেবে দেখেছেন এমনকি অধস্তন ও কৃতবিদ্য শ্রেণীর মধ্যে। ‘সমকক্ষতা’ স্থাপনের একটি পাটাতন হিসেবে দেখেছেন। ভূমি-বণ্টনের অনাব্যতার প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি ভাষায় সমকক্ষতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে তিনি শুধু অর্থনৈতিক সমতা-অর্জনের উপায় হিসেবে নয়, দেশের উন্নতির ভিত্তি হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। এভাবে তিনি কার্লাইল-ডিকেন্সের ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’ সমালোচনার উত্তর খুঁজছেন উপনিবেশিক পরিস্থিতিতে। বেন্থাম-মিলের উপযোগীবাদী তত্ত্বকে তিনি সজোরে নাড়া দিচ্ছেন গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সমীহ ভাবকে বজায় রেখেই। মিলের ইউটিলিটারিয়ান দর্শন নিয়ে তিনি কমলাকান্তের দফতরেও পরিহাস করেছেন। তার ভাষ্যে আবারও ফিরে যাই ‘এরূপ কখন কোন দেশে হয় নাই যে, ইতর লোক চিরকাল এক অবস্থায় রহিল, ভদ্রলোকদিগের অবিরত শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। বরং যে যে সমাজের বিশেষ উন্নতি হইয়াছে, সেই সেই সমাজে উভয় সম্প্রদায় সমকক্ষ, বিমিশ্রিত এবং সহৃদয়তাসম্পন্ন। যতদিন এই ভাব ঘটে নাই_ যতদিন উভয়ে পার্থক্য ছিল, ততদিন উন্নতি ঘটে নাই। যখন উভয় সম্প্রদায়ের সামঞ্জস্য হইল, সেই দিন হইতে শ্রীবৃদ্ধি আরম্ভ।’ এক অর্থে ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রের যে-উদ্বোধন ঘটেছিল স্মিথ-রিকার্ডো-মিলের হাত ধরে, তার মধ্যে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্র ছিল না। এবারে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের কিছু মৌলিক উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত দিলেন বাংলার প্রথম অর্থশাস্ত্রবিশারদ বঙ্কিমচন্দ্র। তার কথিত সহৃদয়তাসম্পন্ন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও হাল আমলের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ তত্ত্বের পূর্বলেখ বলে মনে হয়।

দুর্ভাগ্য যেটা, তা হলো বাঙালি বলতে বঙ্কিমচন্দ্র বর্ণ-নির্বিশেষে ধর্ম-নির্বিশেষে অভিন্ন জাতিসত্তা বোঝাননি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এই অন্ধত্ব বিশেষ করে দেখা দিয়েছিল বাংলার মুসলমান সমাজকে স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে। দেশের শ্রীবৃদ্ধির অসঙ্গতির আলোচনায় পরান মণ্ডল, হাসিম শেখ ও রাজা কৈবর্ত্তের উল্লেখ তবু পাই, কিন্তু জাতি-নির্মাণের প্রকল্পে কোথাও ‘হাসিম শেখ’কে দেখতে পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক চিন্তায় বঙ্কিমচন্দ্র সমতাবাদী, কিন্তু রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় তিনি যে নেশনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেখানে মুসলমানদের স্থান করে দেননি। ১৯৬৪ সালে আবুজাফর শামসুদ্দীন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র ফরাসি বিপ্লব নিয়ে পড়েছেন। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও জানতেন, সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি নিয়েও কখনও কখনও প্রচার চালিয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দুর ধর্মীয় পুনরুত্থান ছাড়া আর কিছুই যে বুঝতে পারেননি এটি একটি ঐতিহাসিক আশ্চর্য! এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রথমবারের মতো উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রে যে বাঙালি চিন্তকের মধ্যে মৌলিকত্ত্ব কিছুটা লক্ষ্য করা যায়, সেই চিন্তকের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে সুগভীর ফাটল থেকে গিয়েছিল। ফলে কার্লাইল-ডিকেন্সের বিষণ্নতার কলঙ্ক থেকে অর্থশাস্ত্রকে মুক্ত করা বঙ্কিমের মতো তীক্ষষ্টধীর পক্ষেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এক অর্থে এটি একটি ব্যর্থতার মডেল হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী বছরগুলোয়। অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর ধারণার আশ্রয়ের পাশাপাশি সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে অনগ্রসর ধারণাকে লালন করার এই পরস্পরবিরোধী ধারা উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধের অনেক বাঙালির তত্ত্ব চর্চার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে। মোরশেদ শফিউল হাসানের অধুনাকালের গবেষণা ‘পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ : দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া’ গ্রন্থে যেসব আকর-উপাদান জড়ো করা হয়েছে, তাতে করে পাকিস্তান-উত্তর পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাঙালি মুসলিম ‘রেনেসাঁ’ পর্বের বিভিন্ন মুসলমান চিন্তাবিদের মধ্যেও বঙ্কিম-প্রদর্শিত ফাটলের পথ ধরে চলবার প্রবণতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আকরম খাঁ থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ থেকে আবুল ফজল কেউই বঙ্কিম-প্রদর্শিত স্ববিরোধিতার পথ থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে পারেননি।

৩. দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি

অমর্ত্য সেন যেসব কারণে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ নিয়ে তাঁর মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ‘পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস্’। যেটা লক্ষ্য করার তাহলো দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যেসব রচনা পাওয়া যায় তার মধ্যে সেন-উলি্লখিত কার্যকারণের একটি পূর্ব অনুমান মেলে। ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর (যার ফলে, সরকারি হিসাবেই অবিভক্ত বাংলার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মৃত্যুবরণ করেছিলেন) অমর্ত্য সেনের গ্রন্থের আলোচনায় আসেনি। যেমন অন্তর্ভুক্ত হয়নি উনিশ শতকের অন্তত ৫টি দুর্ভিক্ষ, যথাক্রমে ১৮৬৫/৬৬, ১৮৭৩/৭৪, ১৮৮৪, ১৮৯১/৯২ ও ১৮৯৫/৯৭। তিনি তার গ্রন্থে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ ও সংঘটন।

তবে সাহিত্যের আকর-উপাদান খুঁজলে বাংলার বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়, যাতে শুধু সেনের এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের প্রমাণ্যতাই মেলে না, পাওয়া যায় আরও বাড়তি কিছু উপাদানের অস্তিত্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি মুসলমান-বিদ্বেষী উপাদানের কারণে এখন অনেকটাই অর্থনৈতিক ডিসকোর্সের বাইরে। এমনকি অর্থশাস্ত্রের ছাত্রছাত্রীরাও দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি বোঝার প্রয়োজনে কদাচিৎ ‘আনন্দমঠ’ পড়ে দেখতে চান। বঙ্কিম অবশ্য ‘আনন্দমঠ’ লিখেছিলেন ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর ঘটে যাওয়ার একশো বছর পরে (১৮৮০ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত)। এই দুর্ভিক্ষের আকর-উপাদান তিনি জড়ো করেছিলেন হান্টার সাহেবের লেখা ‘দ্য এনালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ পড়ে। দুর্ভিক্ষ বোঝার দৃষ্টিকোন থেকে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি পড়লে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে।

প্রথমত, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রকৃতিসৃষ্ট কিছু উপাদান (যেমন দুর্ভিক্ষের আগের পরপর তিনটি বছরেই ভালো ফসল না হওয়া) ক্রিয়াশীল থাকলেও একে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষই বলতে চেয়েছেন লেখক। সামগ্রিকভাবে সুশাসনের অভাব একটি বড় কারণ ছিল এই দুর্ভিক্ষের পেছনে। মনে রাখতে হবে যে এই সময়ে কোম্পানির শাসনের গোড়া পত্তন হচ্ছিল। ১৭৫৭-এর পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের পর, বিশেষত ১৭৬৫ সালের পর থেকে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসন গেড়ে বসতে থাকে। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ হয় এমনই একটি উত্তরণকালীন পর্যায়ে_ যখন না কোম্পানি না দেশীয় নবাবেরা (যেমন রেজা খাঁ) পূর্ণ শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। আর উত্তরণকালীন পর্যায়ের সুযোগ নিয়ে শাসনব্যবস্থায় অরাজকতা নেমে এসেছিল। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা সরাসরিভাবে মহাজনী কারবারে যেমন, তেমনি প্রত্যক্ষভাবে লুণ্ঠনকার্যেও জড়িত হয়ে পড়েন। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট-এর কালে এডমন্ড বার্কের উত্থাপিত অভিযোগে এটি ছিল একটি বড় বিষয়। দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড খরার মুখে বাংলার ‘চৈতালি’ শস্যের বিনষ্ট হওয়ার পরিস্থিতিতে সরকার বছরের গোড়াতেই কোম্পানির সেনাবাহিনীর জন্য ‘৮০ হাজার মণ চাল মজুদ করার’ নীতি নেয়। ফলে বাজারে দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো চালের সরবরাহ আরও কমে যায়। তৃতীয়ত, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসে ব্যাপকভাবে কুটিরশিল্পের ধ্বংসের কারণে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সে সময়ে রাজস্ব-সংগ্রহের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। মোগল আমলে গোটা গ্রাম সমষ্টিগতভাবে রাজস্ব দিত। গ্রামপ্রধান সে রাজস্ব সংগ্রহ করে মোগল সরকারের ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। উত্তরণশীল এই পর্বে গ্রামভিত্তিক রাজস্ব সংগ্রহের পরিবর্তে ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক রাজস্ব-ব্যবস্থা চালু হলো এবং সেটাও করা হলো ভিন্ন উপায়ে। আগে যেখানে উৎপাদিত শস্যের হিসাবে খাজনা দেওয়া হতো, এখন সেটা হতে থাকল নগদ অর্থে। দুর্ভিক্ষের আলামত সত্ত্বেও রাজস্ব-সংগ্রহের মোট পরিমাণ কমল না। আকাড়ার সময়ের সুযোগ নিয়ে মজুদদারি করে চালের ব্যবসায় এ সময়ে বিনিয়োগ করেছিলেন রাজকর্মচারীরা। সুপ্রকাশ রায় তার ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ বইতে জানিয়েছেন যে, ‘বাংলা ও বিহারের সমস্ত ইংরেজ বণিক, তাহাদের সকল আমলা-গোমস্তা, রাজস্ব বিভাগের সকল কর্মচারী, যে যেখানে নিযুক্ত ছিল সেখানেই দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রমে ধান, চাউল ক্রয় করিতে লাগিল’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনিক নির্দেশে আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে মজুদদারি, ব্যবসায় নিয়োজিত সেখানে শুধু বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’কে এখানে দোষ দেওয়া চলে না। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় পরবর্তীকালে জন স্টুয়ার্ট মিল আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি অবাধ করে দেওয়ার পক্ষে জোরালো অভিমত রেখেছিলেন।

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এসব উপাদান ছাড়াও আরও রয়েছে দুর্ভিক্ষের ক্রমবিস্তৃতির বিবরণ, এমনকি ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের মাংস মানুষে খাওয়ার আতঙ্ক উদ্রেককারী উল্লেখ। দীর্ঘ উদ্ধৃতির এখানে সুযোগ নেই, তারপরও একটি ছোট্ট বিবরণ দিচ্ছি যার থেকে দুর্ভিক্ষের বিস্তৃতির বিভিন্ন পর্যায়কে বিশ্লেষণাত্মক উপায়ে শনাক্ত করা সম্ভব:

‘অকস্মাৎ আশ্বিন মাসে দেবতা বিমুখ হইলেন। আশ্বিনে-কার্তিকে বিন্দুমাত্র বৃষ্টি পড়িল না। মাঠে ধান্য সকল শুকাইয়া একেবারে খড় হইয়া গেল, যাহার দুই এক কাহন ফলিয়াছিল। রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহির জন্য কিনিয়া রাখিলেন। লোকে আর খাইতে পাইল না। প্রথমে এক সন্ধ্যা উপবাস করিল। তারপর এক সন্ধ্যা আধপেটা করিয়া খাইতে লাগিল। তারপর দুই সন্ধ্যা উপবাস আরম্ভ করিল। যে কিছু চৈত্র ফসল হইল, কাহারও মুখে তাহা কুলাইল না, [ওদিকে সরকার] একেবারে শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়াইয় দিল।… লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিত আরম্ভ করিল। তারপর কে ভিক্ষা দেয়! উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল, গোরু বেচিল, লাঙল জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ি বেচিল, জোতজমা বেচিল। তারপর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কেনে! খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাষ খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল।… অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।’

১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের যে বিবরণ ‘আনন্দমঠ’-এ পাই তার সঙ্গে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’-এর তুলনা করলে আধুনিক দুর্ভিক্ষের সঙ্গে অষ্টাদশ-উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষের বেশ কিছু মিল ও অমিল চোখে পড়বে। যারা চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে অর্থশাস্ত্রীয় গবেষণায় উৎসাহী তাদের জন্য। এরকম সাহিত্যিক তুলনা-প্রতিতুলনা বিরল অন্তর্দৃষ্টি জোগাতে পারে। ‘অশনিসংকেত’ উপন্যাসে (দুর্ভিক্ষ যখন দানা বাঁধছে) গঙ্গাচরণ চালের ব্যবসায়ী কুণ্ডু মশায়কে জিজ্ঞেস করলেন_ ‘ধান চাল কোথায় গেল? আপনার এত বড় দোকানের মাচা একদম ফাঁকা কেন?’ উত্তরে কুণ্ডু মশায় বললেন, ‘কি করবো বাপু, সেদিন পাঁচু কুণ্ডুর দোকান লুঠ হবার পর কি করে সাহস করে মাল রাখি এখানে বলুন। সবারই সে দশা। তারপর শুনচি পুলিসে নিয়ে যাবে চাল কম দমে মিলিটারির জন্যে’। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রেঙ্গুন থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেল, জাপানের সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ইচ্ছে করেই ভেঙে দেওয়া হলো। মজুদদারি ব্যবসা তো ছিলই। সাধারণ ব্যবসায়ী ও কিছুটা অবস্থাপন্ন গৃহস্থেরাও যাকে বলে ‘প্যানিক হোর্ডিং’ করা শুরু করল। সরকার বাহাদুর নিজেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আমদানিকৃত চালের একটা বড় অংশ পাঠিয়ে দিলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধরত সেনাদের কাছে। এই নীতির জন্য সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। আর দেশের ভেতরে বড় বড় আড়তদারকে বাধ্য করা হলো সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে। এই ধান ক্রয় করা হতো কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে_ এর মধ্যে সে সময় বড় ভূমিকা পালন করেছিল পরবর্তীকালের শিল্পপতি ইস্পাহানির মতো ব্যবসায়ী গ্রুপেরা। অর্থনীতিবিদ আবদুল্লাহ্ ফারুক তার ‘কয়েকজন বাঙালী শিল্পোদ্যোক্তার জীবনী’ বইতে জানিয়েছেন যে, এ সময় মজুদদারি ও ফাটকাবাজি ব্যবসায় লগি্ন করে লাভবান হয়েছিলেন ‘দানবীর’ রণদাপ্রসাদ সাহারাও। তাই উপন্যাসে কুণ্ডু মশাইকে গঙ্গাচরণ বলছেন, ‘বুঝে কাজ করুন, কিছু চাল দেশে থাকুক। নইলে দুর্ভিক্ষ হবে যে’। উত্তরে কুণ্ডু মশাই বললেন, ‘বুঝি সব, কিন্তু আমি একা রাখলি তো হবে না। খাঁ বাবুরা এত বড় আড়তদার, সব ধান বেচে দিয়েচে গবর্নমেন্টের কন্ট্রাক্টরদের কাছে। এক দানা ধান রাখেনি।’

তারাশংকরের ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসে পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম থেকে বিজয় নীলাকে লিখেছে, ‘এখন মাঘ মাস, এরই মধ্যে দেখছি_ ধান প্রায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। গত বছরের ডিনায়েল পলিসি, এ বছরের অজমা, এর ওপর চোরা বাজারের কালো কাপড় ঢাকা হাত ধান টেনে নিচ্ছে।’ সরবরাহে ঘাটতির কারণে বাজারে চালের দামও বাড়ছিল দ্রুত হারে। সুব্রত রায় চৌধুরী তার ‘কথাসাহিত্য মন্বন্তরের দিনগুলিতে’ বইতে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’ থেকে চালের দামবৃদ্ধি সম্পর্কে একটি সারণি উপস্থাপন করেছেন। তাতে দেখা যায়, সে বছর ফাল্গুনে চালের দর মণপ্রতি ছিল ৬ টাকা, সেটা চৈত্রের শেষে দাঁড়ায় ২০ টাকা। আশ্বিন মাসে অনঙ্গ বৌ মতিকে বলছে যে, চালের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে, উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের পারিশ্রমিক ছিল নিম্নরূপ_ গঙ্গাচরণের ক্ষেত্রে মাসিক আয় ১২ টাকা, দুর্গা পণ্ডিত পেতেন মাসে ৬ টাকা ৪৫ পয়া, নবীন বাড়ূই পেতেন দৈনিক ১৬ আনা করে, আর জেলে বৌ আরও কম_ দৈনিক ১০-১২ আনা করে। চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এদের সকলেরই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। এক পর্যায়ে নবীন বাড়ূই, জেলে বৌ বা মতি মুচিনীর হাতে কোনো কাজও ছিল না। মতি তো মারাই গেল। অর্থাৎ সাহিত্যেও অমর্ত্য সেন-ব্যাখ্যাত এক্সচেঞ্জ এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের ন্যারেটিভ বিশ্বস্ততার সঙ্গে রূপায়িত হচ্ছিল।

দুঃখের বিষয়, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বঙ্কিমচন্দ্র ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বিভূতিভূষণ (বা তারাশংকর) করেছিলেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলাদেশে বা অন্যত্র কোনো বিশ্বস্ত সাহিত্যিকে বিবরণী আমরা পাইনি এখনো। সত্তর-আশি দশকের বাংলাদেশের অব্যাহত সুশাসনহীনতা, রাজনৈতিক খুন ও গুমখুন, সামরিক শাসনের অভ্যুদয়, লুটপাটের অর্থনীতি এরকম নানা উপসর্গের পেছনে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও দুর্ভিক্ষজনিত মূল্যবোধের ক্ষয় একটি মৌলিক বিনাশের সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। অন্তত এমনটাই আমার কাছে মনে হয়েছে। ১৯৭৪ নিয়ে নীরবতা এদেশের সাহিত্য ও অর্থনীতি চর্চা উভয়ের ক্ষেত্রেই ফলদায়ী হয়নি। কবিরা স্পষ্টভাষী বলে সে সময়ে কিছুটা পরিমাণে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। রফিক আজাদ যেমন লিখেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’। শহীদ কাদরীও তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম দেন_ ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’। শামসুর রাহমানও লিখেছেন, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ বা ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’র মতো কাব্য-শিরোনাম। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ। সাধারণভাবে আমাদের সুবাধ্য সুশীল সমাজ ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও তার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো অব্যাখ্যাত কারণে নীরব থাকাটাকেই শ্রেয়তর অবস্থান বলে মনে করেছে।

লেখক
গবেষক
প্রাবন্ধিক

ইতিহাসের নিস্তব্ধতা

বিনায়ক সেন

১. দেশভাগ ও গণহত্যা

কোনো কাকতালীয় কারণে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশই_ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় গণহত্যা এড়াতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির আগে ও অব্যবহিত পর সংঘটিত দাঙ্গাগুলোর বিস্তৃতি এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছিল যে, একে গবেষকদের এক বড় অংশ দেখেছিলেন ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’ (বা জেনোসাইডাল পার্টিশন) হিসেবে। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন_ শহীদ আমিন, বীণা দাস ও বোন পান্ডে স্বাধীনতার আনন্দকে মলিন হয়ে যেতে দেখেছিলেন পার্টিশন-দাঙ্গার বিষয় পরিণামে। আশিষ নন্দী, উর্বশী বুটালিয়া প্রমুখ যারা প্রথাগত অর্থে নিম্নবর্গের ইতিহাস-প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন তারাই প্রথম ‘গণহত্যামূলক দেশভাগ’-এর শব্দবন্ধটি প্রয়োগ করেন। একই ধারায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, গোয়ানিজ বংশোদ্ভূত খ্রিস্টান পাকিস্তানের সাংবাদিক নেভিল এন্থনি ম্যাসকারেনহাস তার ‘সানডে টাইমস’-এর ১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রচ্ছদ নিবন্ধের শিরোনাম করেন ‘জেনোসাইড’। তবে তারও আগে আমাদের স্মরণ করতে হবে আদি-চিন্তক সাদত হাসান মান্টোকে, যিনি দেশভাগের সময়কালীন গণহত্যা নিয়ে তার অবিস্মরণীয় (কিন্তু সহজপাঠ্য নয়) ‘স্কেচগুলো’ রেখে গেছেন। এতই ব্যাপক ছিল গণহত্যামূলক দাঙ্গা যে, তার পরিণাম দেখে শিউরে উঠেছিলেন নেহরু ও জিন্নাহ উভয়েই। মান্টো তার অতি ক্ষুদ্র ‘বিনয়’ গল্পটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

‘দাঙ্গাকারীরা ট্রেনটাকে থামালো। যারা অন্য ধর্মের ছিল তাদেরকে খুঁজে খুঁজে বার করল ও হত্যা করল। এসব কাজ যখন শেষ হলো তখন ট্রেনের বাদবাকি যাত্রীদের তারা আপ্যায়িত করল দুধ, কাস্টার্ড আর টাটকা ফল দিয়ে।’

ট্রেনটা ছাড়ার আগে আতিথেয়তা দানকারীদের নেতা সমবেত যাত্রীদের উদ্দেশে একটি বক্তৃতা দিলেন : ‘ভায়েরা ও বোনেরা, যেহেতু আপনাদের ট্রেন আসার সংবাদটি আমরা দেরিতে পেয়েছি তাই আমাদের যা ইচ্ছে ছিল সে রকম কোনো আপ্যায়ন আপনাদেরকে প্রদান করতে পারিনি।’
যারা গোবিন্দ নিহালনীর সিনেমা ‘তামস’ দেখেছেন বা কুশওয়ান্ত সিংয়ের ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ পড়েছেন তাদের এ নিয়ে বাড়তি কিছু বলার নেই। ইয়াসমিন খান তার ‘দ্য গ্রেট পার্টিশন : দ্য মেকিং অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’ বইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এ রকম নির্মম দেশভাগই কি ছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের কাঙ্ক্ষিত ‘চূড়ান্ত মুহূর্ত’? একেই কি নেহরু তার ১৫ আগস্টের মধ্যরাতের বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’_ নিয়তির সঙ্গে আমাদের অচ্ছেদ্য বন্ধন?

পাঠক নিশ্চয়ই বলবেন, কথা হচ্ছে ২৫ মার্চের ও তার পরের ৯ মাসের গণহত্যা, যেটা বাংলাদেশে ঘটেছিল তা নিয়ে। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের দেশভাগ (হোক তা গণহত্যামূলক দেশভাগ) টেনে আনা কেন? দুই কারণে। এক. বাংলাদেশেও ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা হয়েছিল ২৫ মার্চের গণহত্যাময় ‘কালরাত্রির’ পরই, দুই. বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে জাতীয়তাবাদী ঘরানার ইতিহাসবিদরা যত বই লিখেছেন, গণহত্যা নিয়ে লিখেছেন খুবই কম সে তুলনায়। একই কথা প্রযোজ্য ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের ক্ষেত্রে। তারাও জাতীয় আন্দোলন লিখতে গিয়ে দেশভাগের দাঙ্গাকে কার্যত এড়িয়ে গেছেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার অভিজ্ঞতাই এক রাতের মধ্যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নাকি স্বাধীনতা’ এর মধ্যে যারা তখনও দোলাচলে ভুগছিলেন তাদের এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। এরপর আর থাকা চলে না পাকিস্তানের সঙ্গে_ এ রকম একটি সর্বজনীন বোধে মিলিত হয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। অভিজ্ঞতাটা চুন্নু ডোমের চোখে এ রকম:

‘আমরা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ শাঁখারীবাজার থেকে প্রতিবারে একশত লাশ উঠিয়ে তৃতীয়বার ট্রাকবোঝাই করে তিনশত লাশ ধলপুর ময়লা ডিপোতে ফেলেছি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ সকাল থেকে আমরা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর ও প্রবেশপথের দু’পাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিববাড়ী, রমনা কালীবাড়ি, রোকেয়া হল, মুসলিম হল, ঢাকা হল থেকে লাশ উঠিয়েছি। … আমাদের ইন্সপেক্টর পঞ্চম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এরপর আমরা লাশঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-কিশোর ও শিশুর স্তূপ করা লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জমা করেছি। আর গণেশ, রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। লাশগুলো ঝাঁঝরা দেখেছি, মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাইনি, যোনিপথ ক্ষত-বিক্ষত এবং পেছনের মাংস কাটা দেখেছি। … প্রত্যেক যুবতীর মাথায় খোঁপা খোঁপা চুল দেখলাম।’

হুমায়ূন আহমেদের মতো শক্তিশালী লেখক ২৫ মার্চের গণহত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে তার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বইয়ে ন্যারেটিভ থামিয়ে দিয়ে গণহত্যার এসব প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য পাতার পর পাতাজুড়ে তুলে দিয়েছেন। মার্চের রাজনৈতিক সংলাপের এক পর্যায়ে এ রকম একটি গণহত্যা ঘটানোর পরিকল্পনা পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তি করল কী করে? এটা করলে অখণ্ড পাকিস্তানের সমর্থক যারা এ দেশে তখন পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিলেন তারাও যে বিরুদ্ধ-পক্ষে চলে যাবেন এবং তার পরিণতি তো আরও অনিবার্য হয়ে উঠবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়_ কিছু আগে বা কিছু পরে সে সম্ভাবনাটুকু তারা কি আদৌ বিবেচনায় নিয়েছিলেন? ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে খ্যাত ২৫ মার্চের গণহত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন, ‘আমি আর্মির এ পদক্ষেপের বিরোধী ছিলাম। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলরা এর পক্ষে ছিলেন। তিন দিন ধরে আলোচনা চলছিল মুজিবকে নিয়ে কী করা হবে_ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হবে নাকি মেরে ফেলা হবে, তা নিয়ে। একাংশ চেয়েছিল তাঁকে মেরে ফেলতে। ২১ মার্চ পর্যন্ত আমরা জানতাম না আর্মি কোনো অ্যাকশনে যাবে কি-না। ২২ মার্চ টিক্কা (খান) আমাদের জানালেন_ তৈরি থাকতে।’ এই উদৃব্দতিটি যেখান থেকে নেওয়া সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পাকিস্তানের সিএসপি আমলা হাসান জাহিরের বই ‘দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান’। তার বইয়ে অনেক নেপথ্যে বলা ঘটনার উল্লেখ আছে, শুধু বর্ণনা নেই ২৫ মার্চের গণহত্যার। এক জায়গায় তিনি বলছেন, মে-জুন মাসের দিকে তিনি গেছেন তার কিছু বাঙালি বন্ধুর বাসায়। সেসব বাসায় ভীত, বিচলিত, আতঙ্কিত দেখেছেন তাদের পরিবারকে : ‘সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে, তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে ভীতি ও নৈতিক মনোবল হারিয়ে ফেলার যে চিত্র আমি দেখেছি তা আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। এদের প্রতিটি পরিবার ভয়াবহ কাহিনী শুনিয়েছে আমাদের, এর মধ্যে ছিল মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা আর এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ছিল আর্মি অপারেশন।’ এর বেশি আর কিছু সেখানে পাওয়া যায় না। শুধু এক জায়গায়, তিনি বাঙালি নিধন-পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেছেন ‘ফাইনাল সল্যুশন’ হিসেবে। বলা বাহুল্য, এই শব্দবন্ধটি হিটলারের জার্মানিতে নাজিরা ব্যবহার করেছিল ইহুদিদের সমূলে সংহারের মাধ্যমে জাতি-নিধন পরিকল্পনাকে বোঝাতে গিয়ে। এই নীতি এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছিল_ এটা হাসান জাহির হিসাবে নেননি। ২৫ মার্চের গণহত্যার শিকার হয়েছিল প্রথমে রেললাইনের ধারের বস্তিবাসী ও তার পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়_ এটিও তার নজর এড়িয়ে গেছে।

২. ইতিহাসের ‘উচ্চকণ্ঠ’ বনাম ইতিহাসের ‘নিস্তব্ধতা’

ইতিহাস অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলে, অনেক বেশি বলে, কিন্তু অনেক বিষয় নিয়ে আবার কোনো উচ্চবাচ্যই করে না, এড়িয়ে যায় বা ‘নিস্তব্ধ’ থাকে। ইতিহাস যেহেতু আমাদের কাছে ‘অতীত’কে বিনির্মাণ করে, উপস্থাপনা করে, সেহেতু কোন ঘটনাটা কতটা প্রাধান্য পায় তার ওপরে ভিত্তি করে আমাদের লিখিত-পড়িত ‘ইতিহাসবোধ’ (টেক্সট) তৈরি হয়। ইতিহাসের জন্য যা অস্বস্তিকর, সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ফলে শেষাবধি আমরা যা পাই তা হলো সময়ের এক খণ্ডিত চিত্র কেবল। এই খণ্ডিত চিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে যে সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তাও খণ্ডিত হতে থাকে ‘ভেতর থেকে’। নিটশে একে বলেছিলেন, এ রকম ইতিহাসে ‘মৃতরা জীবিতদের মাটিচাপা দিয়ে কবর দেয়’।

বিসমার্ক জার্মানিতে একনায়ক হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার দু’বছর পরে, ১৮৭৩ সালে, জার্মান দার্শনিক নিটশে কিছু ‘অসময়ের ভাবনা’ লিখতে শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি লেখেন_ ‘দ্য ইউজ অ্যান্ড এবিউস অব হিস্টরি ফর লাইফ’। এই ছোট্ট পুস্তিকাটি প্রথাগত

ইতিহাসবিদ্যার মৌলিক পদ্ধতিগত সমালোচনা হিসেবে আজ স্বীকৃত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইতিহাস চর্চার নানা খুঁটিনাটি তথ্য পেশ করে আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে, অথচ অনেক জরুরি বিষয় নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই, বিচার-বিশ্লেষণ তো আরও পরের কথা। এই ছিল নিটশের মূল কথা। নিটশের এই কথার সূত্র ধরে নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ তার একটি লেখায় বলেছেন, কোনো কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ইতিহাসপনা_ অতিরিক্ত স্মৃতিশক্তির মতো_ কোনো দেশের সংস্কৃতির অবক্ষয়মান স্বাস্থ্যকে নির্দেশ করে’। এক্ষেত্রে তিনি বিখ্যাত স্নায়ু

মনস্তত্ত্ববিদ এআর লুবিয়ার একটি গল্প উদৃব্দত করেন। এই মনস্তত্ত্ববিদের কাছে সমস্যা নিয়ে এক রোগী এসেছেন। তার সমস্যা হলো_ তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি : সে কোনো কিছুই ভুলতে পারে না, সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ খণ্ড খণ্ড চিত্র হিসেবে তার মনের মধ্যে রয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এত অসংখ্য খুঁটিনাটির মধ্যে তালগোল পাকিয়ে গিয়ে কোনো কিছুরই অর্থ উদ্ধার করা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চা উভয় ধারার মধ্যেই অনেক অনাবশ্যক খুঁটিনাটি তথ্যের জড়ো হওয়াকে একটি বড় মানসিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও কোনো কোনো বিষয়ে আমাদের ‘প্রখর স্মৃতিশক্তির’ পরিচয় পাই। বস্তুত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ_ এই তিনটি দেশেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে অনাবশ্যক নানা তথ্যের বিপুল আয়োজন, যা পাঠককে (ও নাগরিককে) ‘ক্লান্ত, ক্লান্ত’ করে। বাহান্না, বাষট্টি, ছেষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তরের ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ_ জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক নিয়ে বলতে গিয়ে আবেগ-উচ্ছ্বাসে যেটা হারিয়ে যায় তা হলো সাধারণ জনচৈতন্যের ও জনজীবনের ক্রমবিবর্তনশীল নিত্যদিনের সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা। আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের পুরো গল্পটা আবর্তিত হতে থাকে ‘আগে থেকে গল্পের সমাপ্তি কী জেনে নিয়ে’ গল্প বলার মধ্যে (অর্থাৎ ‘টেলিওলজিক্যাল’ চরিত্রসম্পন্ন) এবং সে গল্পও আবর্তিত হতে থাকে ‘নায়ককে’ ঘিরে_ সেটা হতে পারে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, ব্যক্তিনায়ক হিসেবে মুজিব, ২৬ মার্চ, ১৭ এপ্রিল ও ১৬ ডিসেম্বরের বীরগাথা আর এসবের ‘অতিরিক্ত’ আয়োজনে চাপা পড়ে যায় ২৫ মার্চ_ যার সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে কেবল ‘একটি কালরাত্রি’। এমনকি ‘মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস’ যেন নয়-নয়টি মাসের বিবরণ নয়, এটি যেন পূর্ব-নির্মিত রাজনৈতিক ভাবাদর্শের একটি অধীনস্থ প্রত্যয়, যেন একটি দ্রুত ঘটে যাওয়া পর্ব, যার প্রতিটি দিনের কোনো বিবরণ নেই বা যা হারিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের সামরিক যুদ্ধের খাতওয়ারি দিনলিপির মধ্যে। যদি ইতিহাসকে ‘ক্রম-প্রকাশ্য’ (আগে থেকে অনুমান সম্ভব নয় এমন) কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা যেত তাহলে আমরা অন্যরকম ইতিহাসের বয়ান পেতাম। সে ক্ষেত্রে আরও বেশি জীবন্ত, সত্যাশ্রয়ী ও মানবিক দেখাত ওপরের বর্ণিত জাতীয় মাইলফলকগুলো। সেখানেও স্বাধীনতার ইচ্ছা কীভাবে দানা বেঁধে উঠছিল তাকে ধরার চেষ্টা থাকত; কিন্তু সেটা হতো সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের চেয়ে আরও জটিল, বহু-সম্ভাবনাময় এবং বহু-ইঙ্গিতময় বয়ান। সেখানে উত্থান-পতন, সংশয়-দোলাচল, অস্থিরতা ও গণজাগরণ থাকত সব মানবিক বাস্তবতা নিয়ে। সেটি হতো না কেবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা সমরকৌশলের বিবরণ মাত্র। এ কারণেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ (বা চেতনাগুলো) এসব কথাকে কখনোই আমরা ঘটনাপরম্পরায় শনাক্ত করতে পারিনি এবং এ জন্যই (আমার ধারণা) আমাদের মৌলিক সাংবিধানিক প্রত্যয়গুলোতে যেমন : বাঙালি জাতীয়তাবাদের ‘বাঙালিত্ব’, সমাজতন্ত্রের ‘অভিপ্রায়’, গণতন্ত্রের ‘বৈশিষ্ট্য’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার ‘মানে কী’_ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো ‘সংজ্ঞাকে’ আমরা আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ডিসকোর্সে তুলে ধরতে পারিনি বা তা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক করতে পারিনি। এটা সম্ভব হতো যদি আমরা বাংলাদেশের ‘জনগণের ইতিহাসকে’ (পিপলস হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ) আমাদের ইতিহাস চর্চার প্রধান বিষয় হিসেবে শনাক্ত করতাম। তা না করে আমরা যা করেছি (কিছু স্মরণীয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে, যেমন বদরুদ্দীন উমরের ‘ভাষা আন্দোলন’ বিষয়ক গবেষণা) তা হলো একটি (নতুন) রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্ত লেখার চেষ্টা। ‘রাষ্ট্র’ অবশ্যই জনগণের ইতিহাস লেখার একটি অংশ; কিন্তু সেটিই একমাত্র ও প্রধান অংশ নয়।

৩. গণহত্যা নিয়ে পাঠ ও অপাঠ

‘রাষ্ট্রীয় ইতিহাস’ বনাম ‘জনগণের ইতিহাস’ এই প্রতিস্থাপনাটি সবচেয়ে বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বা তার পরের ৯ মাসের ক্রমাগত গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের বিবরণী পাঠ করি। আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ড, যেখানে সংকলিত হয়েছে ‘গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’। এর ভূমিকায় সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে আমাদের সংগ্রহে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার দলিল ও তথ্য জমা হয়েছে। এর ভেতর ১৫ হাজার পৃষ্ঠা ছাপা হচ্ছে। বাকি দলিল ও তথ্যাদি ছাপার বাইরে রয়ে যাবে’। দুঃখের বিষয়, বাদবাকি দলিল ও তথ্যাদি গ্রন্থিত আকারে আমরা এখনও পাইনি বা পেলেও হয়তো অত্যন্ত আংশিকভাবে পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, এ অষ্টম খণ্ডটির কোনো ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থও (আমার জানা মতে) এখন পর্যন্ত বাজারে আসেনি। অষ্টম খণ্ডটিতে ২৬২টি মূল্যবান সাক্ষাৎকার রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই হলো সাধারণ মানুষের বয়ান। এ সাক্ষাৎকারগুলো সংগৃহীত আলাপের অতি সামান্য অংশ; কিন্তু এতে করেই একাত্তরের গণহত্যার যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে তাতে করে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়কে প্রামাণ্যতার ভিত্তিতে আমাদের নিজেদের ও বিশ্ববাসীর জন্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করা সম্ভব।

কী আছে এসব সাক্ষাৎকারে? প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো, এক বৈরী রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত সামরিক-রাজনৈতিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অসহায় এক নিরপরাধ সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভয়ার্ত দিনযাপন। একাত্তরের ৯ মাসে কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই পুরো দেশটা এক বন্দিশিবিরে পরিণত হয়েছিল তার প্রামাণ্যতা মেলে এখানে। আমি বলেছি, প্রথম অনুভূতিটা ছিল ‘ভয়ের’_ এক ভীতিবহ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির গোড়াপত্তন হয়েছিল ওই নয় মাসে। একটি উদাহরণ নাজিমুদ্দিন মানিক বলছেন, ২৬ মার্চের ভোরবেলার কথা:

‘বায়তুল মোকাররমের মোড়ে রাস্তার ওপর আরও দুটি নাম না জানা বাঙালি বীরের নশ্বর দেহ চোখে পড়ল, চোখে পড়ল জিপিওর পেছনের গেটে এক ঝুড়ি রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ড আর নাড়িভুঁড়ি। তবুও আমি হেঁটে চলেছি, হেঁটে চলেছেন আমার চারপাশের মানুষজন। কেননা আমি এবং আমার চারপাশের মানুষ_ আমরা সবাই তখন বাঁচতে চাই এবং সে জন্যই আমাদের কারও প্রতি কারও কোনো খেয়াল নেই, কারও সঙ্গে কারও কোনো কথা নেই। সবার চোখেই একটা সন্ত্রস্ত ভাব। সবাই ভীতি বিহ্বল’।

প্রাথমিকভাবে যেটা ছিল ভয়ের অনুভূতি, সেটা সময়ের সঙ্গে নীরব অসহযোগিতা ও ক্রমেই সক্রিয় প্রতিবাদ প্রতিরোধে রূপ নেয়। অনেকগুলো সাক্ষাৎকারে বর্ণিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ ছাত্র, নারী, বৃদ্ধ, সাধারণ কৃষক, মেহনতি মানুষ, আলেম, ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, শারীরিক নির্যাতন, অগি্নসংযোগ ও হত্যার বিবরণ। বিশেষভাবে এসেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ‘জাতিগতভাবে’ ধ্বংস ও তাদের হত্যা করার বর্ণনা। এসব সাক্ষাৎকার একনাগাড়ে পড়াও সম্ভব নয়, এমনই সব নির্যাতনের বিবরণ দেয়া হয়েছে। যত ধরনের নারী-নির্যাতন সম্ভব, যত ধরনের হত্যা সম্ভব, যত ধরনের আক্রমণ ও লুণ্ঠন সম্ভব_ সব কিছুর নমুনা সংকলিত হয়েছে এসব গণহত্যা ও গণসন্ত্রাসের ডকুমেন্টেশনের মধ্যে।

এসব সাক্ষাৎকারে বেরিয়ে এসেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসার বা জওয়ানদের চেয়েও পাশবিক ভূমিকা পালন করেছে এ দেশের একটি গোষ্ঠী_ যারা রাজাকার বাহিনী, শান্তি কমিটি প্রভৃতি সাংগঠনিক আয়োজনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে মফস্বল শহরে ও গ্রামাঞ্চলে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। ব্যক্তিগতভাবে এদের মধ্যেও কেউ কেউ কদাচিৎ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন এমনও দৃষ্টান্ত মেলে এসব সাক্ষাৎকারে। তবে সাধারণ চিত্রটা ছিল এদের সম্পর্কে এটাই। অকাট্য সব প্রমাণ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপতৎপরতা ও সরাসরিভাবে নিরীহ-নির্দোষ মানবতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত অপরাধে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে। ১৯৭১ সালের জুন মাসের পরের সময়ের বিবরণ যেসব সাক্ষাৎকারে দেয়া হয়েছে তাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে দখলদার বাহিনী ও তার সহযোগী শক্তিদের মধ্যে ক্রমাগত ভীতি সঞ্চারের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাধারণ অবাঙালিদের ওপর বাঙালির আক্রমণেরও কিন্তু সাক্ষ্য পাওয়া যায় এসব সাক্ষাৎকারে। এ সময়ের বেশিরভাগ অত্যাচার-নির্যাতনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা। যারা অত্যাচারিত হয়েছে তারা খুব কম উদাহরণেই সেসব তথ্য দিয়েছেন শত অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তারা তথ্য গোপন করেছেন বা ভুল তথ্য দিয়েছেন। এদের অনেকেই বলেছেন যে, তারা এখন শারীরিকভাবে পঙ্গু বা চলৎশক্তিহীন বা ক্রনিক কোনো ব্যাধিতে ভুগছেন বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দিন কাটাচ্ছেন কোনোভাবে। এসব বীরত্বময় ব্যক্তিরা প্রতিরোধের কাহিনী পড়তে গিয়ে আপনার মনে হবে_ এরাও তো ছিলেন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা, তা তাদের সনদপত্র থাকুক বা না থাকুক। আমার প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কি এদেরকে অষ্টম খণ্ড থেকে শনাক্ত করে কোনো সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা কখনো নিয়েছে? বা কোনো নিতান্ত বৈষয়িক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে রাষ্ট্রের তরফ থেকে? আছে কি এদের নামে প্রতিটি গ্রামে কোনো স্মৃতিফলক? এ জন্যই এই লেখার শুরুর দিকে উচ্চকণ্ঠ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ইতিহাসের বিপরীতে জন-ইতিহাসের নিস্তব্ধতার কথা বলেছি।

তবে এতসব সাক্ষ্য-প্রমাণের ধারেকাছেও যাননি এখনো যারা দেশে-বিদেশে ১৯৭১-এর গণহত্যা অস্বীকার করেন_ তারা। হার্ভার্ড গবেষক শর্মিলা বোস এদের একজন। তিনি অনায়াসে তাই লিখতে পারেন যে, নারী নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন এ জাতীয় কাজ দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী করেনি বা করলেও এসবে তাদের অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই। এ দেশের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যারা ভেতর থেকে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছিল নয় মাস ধরে, তারাই বেশিরভাগ আক্রমণ-নির্যাতন করে থাকবে। এ জন্যই তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ বলার পরিবর্তে ‘গৃহযুদ্ধ’ শব্দটি পছন্দ করেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে তা সঠিক হলেও সাধারণভাবে এটি একটি অতি অসত্য পর্যবেক্ষণ। শর্মিলা বোস তার ‘ফিল্ড-ওয়ার্ক’-এর ভিত্তিতে যে বইটি লিখেছেন তার নাম ‘দ্য ডেড রেকনিং’। সে বইয়ে তিনি

অষ্টম খণ্ডের একটি কেস স্টাডিকেও আবার নতুন করে বিচার করার প্রয়াস নেননি স্বীয় মত প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি ব্যাপক হারের গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু অষ্টম খণ্ডের যে কোনো সাক্ষাৎকারই তার মতের বিপক্ষে যায়। তিনি ব্যাপকভাবে ‘নারী ধর্ষণ’-এর বিষয়টিকেও ‘অতিরঞ্জিত’ বলে মনে করেছেন। আমার সামান্য হিসেবে আমি দেখতে পাচ্ছি যে, শতকরা ৭০ ভাগ সাক্ষাৎকারেই সরাসরিভাবে নারী ধর্ষণের উল্লেখ রয়েছে এবং বিশেষ করে যেখানে নারীরা নিজেরা বয়ান দিয়েছেন তার প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই পাশবিক নারী নির্যাতনের উল্লেখ রয়েছে। এসব নারীর কারো ঠিকানা সংগ্রহ করে মুখোমুখি হতে চেষ্টা করেননি শর্মিলা বোস। গণহত্যা অস্বীকারকারী হলোকাস্ট ডিনায়ার হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তার বইয়ের জন্য, বিশেষভাবে যা সমাদৃত হয়েছিল জেনারেল পারভেজ মোশাররফের পাকিস্তানে, যেখানে তিনি প্রায় সেলিব্রেটি। পারিবারিক সূত্রে তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের ভাই শিশির কুমার বোসের মেয়ে_ ফলে তিনি বাড়তি কিছুটা মনোযোগও পেয়েছেন। আমি নির্মোহভাবে বিচার করেই এ সিদ্ধান্তে এসেছি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের অষ্টম খণ্ডটি অস্বীকার করে, বিশেষত একে তার গবেষণার নমুনা বয়ানে অন্তর্ভুক্ত না করে, তিনি মৌলিক অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছেন।

২৫ মার্চের গণহত্যা বা সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস-নির্যাতন সম্পর্কে নিস্তব্ধতা রয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাস চর্চায়। এই নিস্তব্ধতা এখনো চলছে। হামিদ মীরের মতো সাহসী সাংবাদিক এর ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই, কিন্তু তারপরও এই উদাসীন্য চলছে। সে দেশের জনগণকে একাত্তরের প্রকৃত ঘটনা জানতে দেয়া হয়নি কখনো। এখনো তারা একাত্তরের গণহত্যার অধ্যায়টি সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না। ২০০৭ থেকে ২০০৯ প্রায় তিন বছর বর্তমান লেখক বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ হিসেবে পাকিস্তানের ওপর কাজ করেছেন। পাকিস্তানের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রণালয়ে ও দফতরে তাকে যেতে হয়েছে কর্মোপলক্ষে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমি লক্ষ্য করেছি যে, ২৫ মার্চের গণহত্যা বা নয় মাসের অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই সাধারণ পাকিস্তানিদের, এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আমলাদেরও। বাংলাদেশ ‘বিযুক্ত হয়েছে’ সামরিক শাসকদের এবং ভুট্টোর ভুলের কারণে_ এ পর্যন্ত তারা কেউ কেউ স্বীকার করেন; কিন্তু গণহত্যার আলোচনা সম্পর্কে তারা অজ্ঞ, অথবা তা জ্ঞানত বা অজ্ঞানত এড়িয়ে গেছেন। এদের মধ্যে যারা কিছুটা অসহিষ্ণু_ তারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের জন্য ইন্দিরাকে দায়ী করেন এবং মুজিবকে সাধারণভাবে মনে করেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। পাকিস্তানের নানা শহরে পূর্ব

পাকিস্তানের অনেক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদের নামে সড়ক রয়েছে (শেরে বাংলা ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীসহ)। কিন্তু একটিও সড়ক নেই শেখ মুজিবের নামে। অফিসিয়াল এস্টাবলিশমেন্টেরচোখে মুজিব এখনো ‘সবচেয়ে ঘৃণিত’ ব্যক্তি। ২০০৭ সালে লাহোরে সেন্সাস কার্যালয়ে নানা আপ্যায়নের মধ্যে আমার কাছে এ রকম একটি বক্তব্য জোরেশোরে তুলে ধরেছিলেন একজন উচ্চপদস্থ আমলা। আমি তাকে হাসান আসকারী রিজভীর লেখা ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘মিলিটারি, স্টেট অ্যান্ড সোসাইটি ইন পাকিস্তান’ বইটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। সেখানে এক জায়গায় রিজভী লিখছেন:

‘(মার্চের) সামরিক পদক্ষেপ প্রতিরোধ আন্দোলনকে স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। আওয়ামী লীগের কট্টর অংশটি চেয়েছিল মার্চের শুরুতেই স্বাধীনতার ঘোষণা করতে; কিন্তু মুজিবুর রহমান তাদেরকে পিছু টেনে রেখেছিলেন। মার্চের আন্দোলনের পরে … পাকিস্তানের সাথে যেটুকু ভঙ্গুর যোগাযোগ ছিল দেশটির, যদিওবা তার অবশিষ্ট কিছু থেকে থাকে সেসময়ে, তাও সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গেল যখন সেনারা শহরে ঢুকল শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতে।’

২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল আমাদের সাধারণ জনচৈতন্যে তদানীন্তন পাকিস্তানের সাথে অবশিষ্ট মানসিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার মুহূর্ত। এই কথাটা আমি লাহোরে কেন্দ্রীয় সেন্সাস কার্যালয়ে বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেছিলাম। এরপর সভাকক্ষে এক ধরনের বিষণ্ন ও অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছিল। ইতিহাস শুধু ‘অনিবার্যতার’ মাধ্যমে অগ্রসর হয় না, এর মধ্যে ক্রান্তিলগ্নের ‘আকস্মিকতার’ অবদানও ক্রিয়াশীল থাকে, যা নাটকীয়ভাবে ভিন্ন যুগের ভেতরে আমাদেরকে টেনে নিয়ে যায়।

লেখক
অর্থনীতিবিদ
প্রাবন্ধিক

উপর্যুপরি আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা

দ্বিতীয় কিস্তি (প্রথম কিস্তি)

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতন বিভিন্ন যুগে হয়েছে। তবে ধারণা করা যায় যে প্রাক-ঔপনিবেশিক, ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক ও আধুনিক আমলে এই নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ছিল। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে ২০১২ বা ২০১৩ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতনকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। এটাই এখানে আমার মূল বক্তব্য।

কিন্তু তার আগে আমাকে বাঁশখালীতে ফিরে যেতে হবে। আমি সেখানে যাইনি। অনেকের মতো আমিও সেই বিপর্যস্ত নারীকে দেখেছি টিভির পর্দায়, বিভিন্ন চ্যানেলে, দগ্ধ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত অবস্থায় কাতরস্বরে কী যেন বলছেন এবং পরমুহূর্তে আবার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত তাঁর এত দিনকার গৃহস্থালির অবশিষ্টাংশ ও পোড়ামাটির ধুলায় ক্লান্তিতে কান্নায় শুয়ে পড়ছেন—এ রকম একটা ছোট্ট ‘ক্লিপ’ আমাদের দেখানো হয়েছে। আমি তাঁর নাম পর্যন্ত জানি না। কিন্তু মাতৃসমা এই নারী আমাকে পেয়ে জানতে চাইতেই পারেন, ‘বাবা, এই যে এসব ঘটে গেল, এটা কেন হলো, এর ব্যাখ্যা কী?’ ফলে প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলোকে আবারও বিস্মৃতি থেকে টেনে আনতে হচ্ছে কেবল তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য, যেপ্রশ্ন তিনি কখনোই আমাকে করেননি বা হয়তো কাউকেই করেননি বা সম্ভবত কোনো দিনই করবেন না। তবে তাঁর ঘর-গৃহস্থালির অবশেষ দেখে এবং শুধু তাঁর নয়, অধিকাংশ মানুষ যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সম্প্রদায়কেন্দ্রিক এই আক্রমণে, তাঁদের সহায়-সম্পত্তি দেখে—এ রকম ধারণা আমার জন্মেছে যে তাঁরা কেউই উচ্চবর্গের নন। এমনকি শহরে মধ্যবিত্তের যে জীবনমান তার চেয়েও বেশ কিছুটা নিচুতেই তাঁদের অবস্থান বোধ করি। বস্তুত, আক্রমণের পর তাঁদের ঘর-গৃহস্থালির যে চেহারা দেখানো হয়েছে টিভির পর্দায় বা পত্রিকার স্থিরচিত্রে, তাতে করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জেগেছে আমার তা হলো—এখান থেকে লুটপাটের কী পেল দুর্বৃত্তরা? এঁরা হয়তো ভূমিহীন চরম দরিদ্র পরিবারের কেউ নন, কিন্তু মধ্যবিত্তের সম্পদ-জমি ইত্যাদি সংজ্ঞায় এঁরা পড়েন কি না এ নিয়ে শেষাবধি সন্দেহ থেকেই গেল। সম্পদ বলতে একটা ভিটেমাটি, চালাঘরের মধ্যে একটা খাট বা বড়জোর একটা আলনা, কিছু ঘটি-বাটি, একটা দুটো চেয়ার-টেবিল বা বড়জোর কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটা ছোট্ট টিভি। এঁরা গ্রামবাংলার ধ্রুপদি গরিব কৃষক বা ছোট্ট মফস্বল শহরের বা বাজার-উপজেলা কেন্দ্রের খুদে ব্যবসায়ী। প্রথাগত অর্থে সংখ্যালঘু বলতে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যে শ্রেণীটিকে বোঝানো হয়ে থাকে, এঁদের স্থান তার থেকে অনেক নিচে—সামাজিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, শিক্ষার মান যেকোনো মানদণ্ডেই তাঁদের বিচার করুন না কেন। এই কারণে আমি এঁদের ‘অতি-সংখ্যালঘু’ বলছি। এরা আলট্রা-পুওরের মতোই আলট্রা-মাইনরিটি।

সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ-নির্যাতনের যেসব প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে তা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কোনো বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার জন্য। এর কোনোটা লেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলে ঘটে যাওয়া দাঙ্গাগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে (যেমন ১৮৮০ সাল থেকে শুরু করে ১৯২৬-এর দাঙ্গার কারণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে)। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের আগের (১৯৪৬ সালের) দাঙ্গা বোঝার তাগিদ থেকে। কোনোটা লেখা হয়েছে পার্টিশনের পরের (১৯৫০ বা ১৯৬৪ সালের) দাঙ্গার প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য। স্বাধীনতার পর এ দেশে ১৯৯২ সালের বা ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন নিয়েও কিছু লেখালেখি হয়েছে। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঁড় করানো হয়েছিল সেসব ঘটনা বোঝার ক্ষেত্রেও এগুলো যথেষ্ট ছিল কি না সে বিষয়েও আমার কিছুটা সংশয় রয়েছে। কিন্তু আমি এখানে সেসব বিচারে যাব না। আমি ধরে নেব এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ন্যায্যতা রয়েছে। আমি শুধু দেখব যে এসব ডিসকোর্স দিয়ে ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে ব্যাখ্যা করা চলে কি না।

হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে একই আলো-হাওয়ার মধ্যে শত শত বছর বাস করেও ‘যাহা মনুষ্যচিত, যাহা ধর্মবিহিত’ সে রকম একটি সম্পর্ক ‘আমাদের মধ্যে হয় নাই’ এবং এই অর্থে আমাদের মধ্যে ‘একটি পাপ আছে’ ও ‘এই পাপ বহুদিন হইতে চলিয়া আসিতেছে’। এটা স্বীকার না করলে ‘এই পাপ থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নাই’। এর থেকে আভাস মেলে যে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলেও, বিচ্ছিন্ন হলেও, মাঝেমধ্যেই দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়েছে; উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে নিয়ম না-মানা চৈতন্যপন্থী, সহজিয়া ও বৈষ্ণব মতের যেমন, তেমনি সমতাবাদ অনুসারী নব্য ধর্মমত ইসলামের সঙ্গেও। তবে সে আমলে অতি-শাস্ত্র মানা বিশুদ্ধপন্থীদের সঙ্গে শাস্ত্র হুবহু না-মানা অবিশুদ্ধপন্থীদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এক ধরনের সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মধ্যযুগীয় সমাজে; ফলে দ্বন্দ্ব থাকলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তা পর্যবসিত হয়নি সেকালে। এই অবস্থাটা উনিশ শতকের বাংলায়ও বহুকাল অবধি ছিল। ফরায়েজি-ওহাবি শুদ্ধাচরণের মতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গড়ে উঠেছিল লালন ও তাঁর অনুসারীদের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। তখনকার সমাজ এ রকম নানা মতবাদ ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পেরেছিল বলেই সামাজিক ভারসাম্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাটা ১৮৮০ সালের পর থেকে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর পেছনে দায়ী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাম্প্রদায়িক উত্থান, যা বঙ্কিম-প্রদর্শিত বাহুবলের তত্ত্বকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে পরবর্তী দশকগুলোয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারের ওপর আক্রমণ-নির্যাতনকে এই দ্বন্দ্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় কি না? প্রথমেই আমাদের মনে পড়বে জমিদার-কৃষক দ্বন্দ্বের তত্ত্বের কথা। হিন্দু জমিদার বনাম মুসলমান কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িকীকরণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অনিবার্যভাবে জন্ম নিল—এমন মত পাওয়া যাবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের রচনায়। জমিদার বনাম কৃষক এই শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব যে সাম্প্রদায়িক পরিণতিতে গড়াতে পারে তার আভাস রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে বিশদভাবেই পাওয়া যায়। তবে বাঁশখালীতে, বেগমগঞ্জে বা বাগেরহাটে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের ঠিক ঘরে-বাইরে-এর নিখিলেশের শ্রেণীতে ফেলা যায় না—এতে আশা করি কম-বেশি সবাই একমত হবেন। ১৯০৫-০৭ সালের ‘স্বদেশি আন্দোলন’ চলাকালীন বঙ্গভঙ্গ রোধে সেভাবে মুসলমান কৃষকেরা অংশ নেয়নি। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে কৃষকেরা ভেবেছিল, বাবুরা তো এমনিতে তাদের কাছে আসেন না, ‘বাবুরা বোধকরি বিপদে পড়িয়াছে’ বলেই এখন তাদের কাছে এসে স্বদেশি প্রচারণা চালিয়ে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু বাঁশখালীর ওই প্রৌঢ়া নারীর পরিবারকে বা উপজেলা কেন্দ্রের আক্রমণের শিকার খুদে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ঠিক ধ্রুপদি অর্থে ‘হিন্দু বাবু’ বলা চলে না বোধকরি।

১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন দাঙ্গার একটি মেইনস্ট্রিম ব্যাখ্যা হলো, হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণভাবে ব্যাপক কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাপক দ্বন্দ্ব ছিল এবং দ্বন্দ্ব বাড়ছিল এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত ও মুসলমান মধ্যবিত্ত প্রতিযোগিতা করছিল চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা খাতে নিজেদের ক্ষমতাবান করতে। একসময় সে প্রতিযোগিতা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের রূপ নেয় ও এর পরিণতিতে এমনকি তা দাঙ্গা-আক্রমণ-নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কালপর্ব নিয়ে লেখা হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন উপন্যাসে এ রকম দ্বন্দ্বের বিস্তার কীভাবে গ্রাম এলাকায় ক্রমেই ছড়িয়ে পড়েছিল তার সত্যনিষ্ঠ বিবরণী পাই। ক্রমেই জমিদার নিয়ামত হোসেন ও অত্যাচারী শশাংক পালের জায়গা নিচ্ছিল উঠতি ধনিক ধনু শেখ। তবে দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্বার্থচিন্তার তত্ত্বও বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ, বাগেরহাটের ২০১৩ সালের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতন-দাঙ্গাকে ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না। নির্যাতিত পরিবারগুলোকে কোনোভাবেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত উঠতি মধ্যবিত্ত বলে মনে হয়নি আমার। এরা আদৌ কোনো আকর্ষণীয় সরকারি বা বেসরকারি খাতের চাকরিতে নিয়োজিত কি না সে বিষয়েও সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।

১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দুটো বড় দাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট সামাজিক ভিতকেও ভেতর থেকে নড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও দেশভাগের দাঙ্গার প্রাথমিক আঘাত সামলে উঠে হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিল। ১৯৪১ সালে এই বঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগের বছরে এদের সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে। ২০১১ সালে এটা আরও নেমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে। ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাগুলোর পেছনে মূলত দায়ী করা হয় বৈরী রাষ্ট্রশক্তিকে এবং সেই শক্তির সমর্থক মুসলিম লীগের রাজনীতিকে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর শত্রু-সম্পত্তি আইন যারা জমি-বাড়ির মালিক, সেসব হিন্দু পরিবারের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল করে দেয়। বস্তুত, দাঙ্গার মাধ্যমে যতটা ক্ষতিসাধন হয়েছে এই শ্রেণীর, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে শত্রু-সম্পত্তি আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও হাল আমলের সাম্প্রদায়িক নির্যাতনকে বুঝতে সাহায্য করে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় আজ সাম্প্রদায়িক বৈরী শক্তি অধিষ্ঠিত নেই। নেই মুসলিম লীগের মতো কোনো শাসক দলও। শত্রু-সম্পত্তি আইন সাধারণভাবে সারা দেশেই এখনো বিদ্যমান—এই পাপ আপনার, আমার, সবার—কিন্তু বিশেষভাবে বাঁশখালী, বেগমগঞ্জ বা বাগেরহাটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কেন রাষ্ট্রশক্তি বা তার সহযোগী স্থানীয় সামাজিক শ্রেণী-দলগুলো চড়াও হতে যাবে কেবল সম্পত্তি দখলের জন্য, তার সপক্ষে যুক্তি মেলা ভার। এই অতি-সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করে জামায়াত-শিবির (যদি করেও থাকে) কী ফায়দা পাবে, সেটিও কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেথড ইন দ্য ম্যাডনেস’ সে রকম কিছু খুঁজে পাচ্ছি না এখানে। তাহলে এই অযৌক্তিককে কোন যুক্তিতে ধরব?

সাম্প্রদায়িক আক্রমণ-নির্যাতনের সর্বশেষ যে ব্যাখ্যাটি আমার হাতের কাছে রয়েছে তা হলো, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রে এক জাতি, এক ধর্ম, এক রাষ্ট্র—এ রকম রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের চাপে এসব দুরাচার ঘটছে। এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেহেতু আত্যন্তিকভাবে কোনো বিশেষ একটা আত্মপরিচয়কেই বড় ও চূড়ান্ত করে দেখতে চায়, সেহেতু অন্যান্য আত্মপরিচয়ের জাতি, গ্রুপ বা ব্যক্তিরা হয়ে পড়ে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। একেই কালচারাল স্টাডিজ এবংবিধ বিদ্যায়তনিক পরিসরে বলা হয়ে থাকে ‘অপরায়ণ’। তবে ‘অপর’ হলেই যে ‘পর’ হবে বা ‘পর’ হলেই যে ‘শত্রু’ হবে এবং ‘শত্রু’ হলেই ‘নির্যাতনের লক্ষ্য’ হবে—এ রকম কোনো অবধারিত নিয়মনীতি অপরায়ণের সূত্রে গাঁথা নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাজনীতিতে সেক্যুলার বাঙালিত্ব তথা ‘ভাষাকে’ বড় করে তুলছে বলেই এর বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনীতিতে দাঁড়াতে হবে ‘ধর্মকে’ কেন্দ্র করে—এ রকম কোনো মিঠে ডায়ালেকটিক অনিবার্য নয়। এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে গিয়ে যিনি জাতিসংঘে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি একসময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সদালাপী এই ব্যক্তিটি বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ‘জল বনাম পানির’ উপমা টেনে এনেছিলেন। কিন্তু বিষয়টা এত সরল ছিল না। বাংলা ভাষায় বিভিন্ন ভাষার ও অঞ্চলের এবং ধর্মের শব্দ এত বেশি ঢুকেছে যে এই ভাষার মিশ্র চরিত্রের ভিত্তিতে বঙ্কিমের মতো সাম্প্রদায়িক চিন্তকও একপর্যায়ে বাঙালি হিন্দুর বিশুদ্ধ ইতিহাস ব্যাখ্যা লেখা অসম্ভব বলে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন যে বঙ্কিম অবিমিশ্র আর্য জাতি হিসেবে বাঙালি জাতির ইতিহাস লেখার বদলে একপর্যায়ে সম্ভবত ‘বহুজাতিক বাঙালি’র ইতিহাস লেখার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, ‘বাংলার স্বাধীন (মুসলমান) সুলতানদের আমলকেই বঙ্কিম প্রকৃত রেনেসাঁসের যুগ মনে করতেন’, ইত্যাদি। ভুল শুনলাম কি—‘বহুজাতিক বাঙালি’? যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে একই সঙ্গে বাঙালি ও বাংলাদেশি, একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ‘বহুজাতি’ এ দেশে গড়ে উঠতে পারা যাবে না কেন? এ রকম ‘বহুজাতিক বাঙালি’তে কে সংখ্যাগুরু, কে সংখ্যালঘু—এই প্রশ্নের গুরুত্বই কমে যায়। তা ছাড়া এই ভূখণ্ডে তো বাংলা ছাড়াও অন্যান্য বহু ভাষাভাষী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী রয়েছেই, তাদেরও তো এই বহুজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমি বাঁশখালীর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে পোড়ামাটির গন্ধ ও কালো ধুলার মধ্যে ভূলুণ্ঠিতা মাতৃসমা ওই নারীকে এসব তত্ত্ব বোঝাব কী করে? (শেষ)

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

সংখ্যালঘু বনাম আত্মপরিচয়ের স্বাধীনতা

প্রথম কিস্তি

আমি কি সংখ্যালঘু? এক অর্থে প্রশ্ন রাখাটাই হাস্যকর। আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া নামই বলে দিচ্ছে আমি কী। এ নিয়ে বাহাস করার অর্থই হয় না। তবে বিষয়টা অত সরল না-ও হতে পারে। আজকাল সংখ্যালঘু কথাটার ‘সংখ্যায় লঘু’ এমন একটা কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সংখ্যায় মেজরিটি হয়েও কেউ কার্যত মাইনরিটি হতে পারে। সারা বিশ্বে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশি, শিশুমৃত্যুর হারে অনেক বৈষম্য থেকে যাওয়ার পরেও। তারপরও কি আমরা বলতে পারি যে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? সংখ্যায় বেশি হওয়ার পরেও সংখ্যালঘুর মতো অধস্তন অবস্থান তাদের। তার মানে ব্যাপারটা শুধু সংখ্যায় (নিউমেরিক্যালি) বেশি-কমের বিবেচনা নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—কে কত বেশি ক্ষমতাবান? নারীরা পুরুষদের চেয়ে এখনো কম ক্ষমতাবান বলেই সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু। সুতরাং সংখ্যায় বেশি-কম যা-ই থাক না কেন, কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা ব্যক্তি ‘ক্ষমতা হারিয়ে’ কীভাবে সংখ্যালঘু ‘হয়ে ওঠে’, সেটিই হচ্ছে প্রথম বিচার্য বিষয়। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, নারীরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’। যখন আপনি সংখ্যালঘু হয়ে ওঠেন, তখন আপনি নিজেকে ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’ ভাবতে শুরু করেন। জ্যাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, একজন ইহুদি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যাকে অ্যান্টি-সেমিটিকরা ইহুদি বলে ডাকে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, একজন সংখ্যালঘু হচ্ছে সেই মানুষ, যাকে একজন সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বলে ডাকে, যেমন: ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে ‘উপজাতি’ বলে পরিচিত করে না, তাকে ‘উপজাতি’ বলে কোনো বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ।

সমাজে প্রতিটি ব্যক্তিরই নানা পরিচয় থাকে। কোন পরিচয়ে কে কখন কতটা নিজেকে জাহির করবে, সেই স্বাধীনতাটা সবার সমান নয়। আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) জাহির করার স্বাধীনতা যে সমাজে যত বেশি, সেই সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতাও তত বেশি এবং সেই সমাজও তত বেশি উন্নত। অমর্ত্য সেন তাঁর আইডেনটিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ে নিজের বিভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছেন। আমার অক্ষম অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন: ‘আমি একই সঙ্গে হতে পারি একজন এশীয়, একজন ভারতীয় নাগরিক, একজন বাঙালি, যার রয়েছে বাংলাদেশি পূর্বপুরুষ, একজন মার্কিন দেশে বা ব্রিটেনে বসবাসকারী, একজন অর্থনীতিবিদ, দর্শনচর্চায় অনুপ্রবেশকারী, একজন লেখক, একজন সংস্কৃত ভাষায় বিশেষজ্ঞ, সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রে জোরালোভাবে বিশ্বাসী, একজন পুরুষ, একজন নারীবাদী, একজন “হেটেরোসেক্সুয়াল”, কিন্তু সমকামীদের অধিকারের পক্ষাবলম্বনকারী, যার জীবনযাত্রার ধরন কোনো বিশেষ ধর্মের সঙ্গে খাপ খায় না (নন-রিলিজিয়াস), সে এসেছে হিন্দু সামাজিক পটভূমি (ব্যাকগ্রাউন্ড) থেকে, সে অ-ব্রাহ্মণ, এবং সে বিশ্বাস করে না মৃত্যু-পরবর্তী কোনো জীবনে (আফটার লাইফে), বা এই প্রশ্ন যদি তাকে করা হয়, সে এ-ও বলবে—সে বিশ্বাস করে না কোনো পূর্ব-জন্মেও। এটা হচ্ছে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের একটি ক্ষুদ্র নমুনা-চয়ন, যার প্রতিটাতেই আমি হয়তো একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত—এবং চাইলে এ রকম আরও অনেক পরিচয়ের সদস্য হতে পারি আমি; সবকিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতির বিচারে কোন পরিচয়টা সেই মুহূর্তে আমাকে বেশি টানছে, তার ওপর।’ অমর্ত্য সেনের স্বাধীনতা আছে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে লাগসই পরিচয়টা অবস্থাভেদে, পছন্দ অনুযায়ী ও রুচির বিচারে বেছে নেওয়ার। এই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ সবার থাকে না, সব শ্রেণীর থাকে না, সব সমাজে থাকে না।

অমর্ত্য সেন বইটি লিখেছিলেন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে প্রচারিত হয়েছিল ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব। সংঘাত বলতে পাশ্চাত্য ও ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক মূলগত দ্বন্দ্বের ‘আবিষ্কার’ করেছিলেন স্যামুয়েল হান্টিংটন ও তাঁর অনুসারীরা। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নানাভাবে পাশ্চাত্যের শত্রু বানিয়ে এই তত্ত্বকে বাস্তবেই কাজে লাগানো হয়েছিল। তারই বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হিসেবে অমর্ত্য সেন ২০০৬ সালে বইটি লিখেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে এই বিরোধ আবিষ্কার ছিল একটি দুষ্ট-পরিকল্পনা। প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর সারা বিশ্বকে এক পরাশক্তির অধীনে আনার ও সর্বত্র আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘সভ্যতার সংঘাত’-এর তত্ত্ব জোরেশোরে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু অমর্ত্য সেন এই বই লেখার আরও বহু বছর আগে থেকেই আমি আবছা করে বুঝতে পেরেছিলাম, প্রতিটি ব্যক্তিকেই কোনো বিশেষ আত্মপরিচয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র বা ধর্ম বেঁধে দিতে পারে না। কোন পরিচয়ে সে নিজেকে কখন পরিচিতি করাতে চায়, সেই ‘বাছাইয়ের স্বাধীনতা’ তার চাই—এটা তার মৌলিক মানবিক অধিকার। এবং সে কারণেই কৈশোর থেকেই কেউ আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললে আপত্তি করেছি, পারলে প্রতিবাদ করেছি, না করলেও মেনে নিইনি।

এর জন্য আমার পারিবারিক ঐতিহ্যও কিছুটা দায়ী। আমি এখানে কোনো ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার কথা তুলছি না। আমার ধারণা, এ রকম অভিজ্ঞতা আরও অনেকের জীবনেই হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সেটা মনে রেখেই দু-একটি আত্মজৈবনিক তথ্য যোগ করব এখানে। ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই এই আত্মকথন—তার জন্য আগেই তত্ত্বজ্ঞ পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার মা ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে তাঁর পরিচয়কে সীমিত রাখেননি। ঈদে বা শবেবরাতের অনুষ্ঠানে নিজে উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন, বাসায় হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে দাওয়াতও দিতেন। উৎসবে বা সংকটে পড়লে মাজারে ‘মানত’ করা ছিল তাঁর সংসারের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব কিছু ‘ভোকাবুলারি’ ছিল। হাইকোর্টের মাজার ‘গরম পীরের মাজার’, ফলে মাজারের পাশ দিয়ে গেলে হাত তুলে শ্রদ্ধা জানানো চাই। নইলে আধ্যাত্মিক গুরু রুষ্ট হবেন। মিরপুরের মাজার আবার ছিল ‘ঠান্ডা পীরের মাজার’—তিনি দুর্বাসা মুনি নন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিতে দোষ নেন না। আমাদের বাসায় জন্মাবধি দেখেছি নানা সময়ে বিভিন্ন মুসলমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন পুণ্যবান ব্যক্তিরা এসেছেন। তাঁদের যথাবিহিত যত্ন করা হয়েছে। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো যুক্তি শৈশব থেকেই পাইনি। মা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতেন—যদি হিন্দু ধর্মে তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে ভারতমুখিনতার সঙ্গে সমীকরণ করা হতো। পাড়ার বাজারে পেঁয়াজ কিনতে গেলে যদি বিক্রেতা তাঁকে বলত, ‘দাদি, আপনাদের দ্যাশ থেকে আইছে।’ মা উত্তরে বলেছেন, ‘তাই নাকি, জানতাম না তো সিলেটে আজকাল এসব পেঁয়াজ হচ্ছে,’ এবং তারপরেই তিরস্কার করে বলে উঠতেন, ‘দাদির সঙ্গে ফাজলামি করার আর বিষয় পাওনি, না?’ বিক্রেতা লজ্জিত হতো, ‘না, দাদি, ভুল হয়ে গেছে’—এমনটাই বলত। তিনি বাজারের সবার কাছে ছিলেন ‘সর্বজনীন দাদি’। শুনেছি, মৃত্যুর পরে তাঁর মৃতদেহ শেষবারের মতো দেখার জন্য অনেক লোক তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন মুসলমান। আমার ধারণা, আমার বাবাও এই মতেরই মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন—অসংখ্য ছাত্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। মানুষ বড়ই রহস্যময় জীব। আমি মৃত্যুর পরে তাঁকে একবার মাত্র স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু তাঁর পূর্বতন (মুসলমান) ছাত্ররা ও সহকর্মীরা—যাঁরা পরবর্তী সময়ে উচ্চতর পদে আসীন হয়েছিলেন—তাঁকে নাকি অনেকবারই স্বপ্নে দেখেছেন এবং সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবিতে দেখেছেন। তাঁরা ফোন করে বা দেখা করে আমাকে তা বলার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমি পারমার্থিক বিষয়ে নিবিষ্ট নই, কিন্তু আমার শুধু বলার কথা—হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের বিভিন্নতা সেখানে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি। ফলে আমার পক্ষে, নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবা কখনোই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয় একটি কারণও ছিল। আর সেটা মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আমার বাবা অধ্যক্ষ বি বি সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সংগঠকের ভূমিকায়। প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন সমগ্র নর্থ-ইস্ট সেক্টরের ‘এডুকেশন অফিসার’ হিসেবে। শিলংয়ে সে সময় বাংলাদেশ সরকারের একটি অস্থায়ী কার্যালয় ছিল। কাজটা ছিল রিলিফ ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের পরিচালনার কাজে অংশ নেওয়া। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে তিনিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করেন। তারপর আবার ফিরে গেছেন তাঁর পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে অধ্যক্ষ হিসেবে। এ দেশে বীরাঙ্গনাদের প্রথম কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁর পরিচালিত প্রতিষ্ঠানেই। মুজিবনগর সরকারে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা সবাই নাকি একটি করে ‘প্রমোশন’ পেয়েছিলেন। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তবে স্বীকৃতি বা পদোন্নতি নিয়ে তাঁর মনে কখনো ক্ষোভ ছিল না। এই না-পাওয়াটাকে তিনি তাঁর ‘সংখ্যালঘু’ পরিচিতির সঙ্গে কখনোই যুক্ত করেননি। দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। একবার পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ সন্ধ্যার মুখে। সেবার পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার তাঁর পাকিস্তানি বস-এর ছোট ভাই হওয়ায় তিনি প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। আরেকবার এই স্বাধীন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোনো অব্যাখ্যাত কারণে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে, সেনা-অভ্যুত্থানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে (বর্তমান লেখকসহ)। এই গ্রেপ্তার ছিল ভুল-বোঝাবুঝির, গ্রেপ্তার এবং যাঁরা এটা করেছিলেন তাঁরা পরবর্তী সময়ে তাঁদের উপাত্তগত ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করেছিলেন। সে রকম শুনেছি। তবে আমার গর্বের ব্যাপার যে আমার বড় ভাই ছিলেন একজন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা। মুজিববাহিনীতে নয়, সে সুযোগও তাঁর ছিল। তিনি সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে (এফএফ) যোগ দেন ৪ নম্বর সেক্টরে। জানের তোয়াক্কা না করে তিনি যুদ্ধ করেছেন এবং তাঁকে আমরা সারা শরীরে জোঁকে-খাওয়া অবস্থায় দেখতে পাই নয় মাস যুদ্ধের পরেই। কিছুদিন ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখার দায়িত্বপূর্ণ কাজেও ছিলেন, কিন্তু তদানীন্তন নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৭৪ সালেই ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি নেন। সেটাও (পরে শুনেছি) স্বাধীনতার পরে ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা একজন প্রখ্যাত ছাত্রনেতার মুখ গলে তাঁর কানে এসে পৌঁছেছিল, বা এমনই কিছুর প্রতিবাদে। এরপর বাদবাকি জীবনটা প্রায় প্রবাসেই কাটালেন কোনো প্রবল অভিমান বুকে নিয়ে। এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গর্বিত সদস্য হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ আত্মপরিচয়টা মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মতো আমারও আপত্তির যথেষ্ট কারণ ছিল ও আছে।

তৃতীয় একটি কারণও রয়েছে, তবে সেটা মোটামুটি প্রকাশ্যেই ধারণ করে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই এবং কালক্রমে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিলাম। ফলে নিজেকে ‘সংখ্যালঘু’ ভাবার কোনো কারণ ছিল না, কেননা পার্টিতে মণি সিংহ বা মোহাম্মদ ফরহাদ, জিতেন ঘোষ বা হাতেম আলী, মণিকৃষ্ণ সেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজয় রায়, মতিউর রহমান বা মনজুরুল আহসান খান—এসব নামের মধ্যে কোনো সম্প্রদায়গত বিবেচনাবোধ কখনোই মনে স্থান পাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি। আমার প্রথম ও প্রধান আত্মপরিচয় ছিল—আমি সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের প্রগতির পক্ষের লোক। আমাকে ‘সংখ্যালঘু’ বললেই (বলতে পারেন অনেকেই) আমি তা মানব কেন? ঠিক একইভাবে, পারিবারিক দিক থেকে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়ার কারণে আমার স্ত্রীও (যতই তাঁকে বোঝানো যাক) নিজেকে এখনো ‘সংখ্যালঘু’ বলে ভাবতে চান না বা পারেন না।

মোট কথা, অমর্ত্য সেনের দার্শনিক গ্রন্থটা পড়ার আগে থেকেই আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে বিভিন্ন আত্মপরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা কখন কী পরিমাণে আমি জাহির করব, সে স্বাধীনতাটা আমাকে দেওয়া দরকার বা আমার অর্জন করা দরকার। কিন্তু এসব কথা আমি বাঁশখালীর ওই সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া মাতৃসমা নারীটিকে বোঝাব কী করে? বস্তুত, আমি তাঁকে সংখ্যালঘুও বলতে চাইছি না। তাঁর পরনের পোশাক, তাঁর ঘর-গৃহস্থালি, তাঁর পরিবেশ-প্রকৃতি আমাকে বলে দিচ্ছে, অন্য কোনো শব্দবন্ধ প্রযুক্ত হওয়া দরকার এ ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে অনন্যোপায় হয়ে বলছি—তিনি আসলে অতি-সংখ্যালঘু।

দ্বিতীয় কিস্তি: অতি-সংখ্যালঘুর ওপরে আক্রমণ: প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা
বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক।

একটি ভিন্নধারার জন-আন্দোলন

শাহবাগ চত্বরে দেরিদা

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা ঢাকায় কখনো আসেননি। এই ভূভাগের সবচেয়ে কাছে তিনি এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়, ১৯৯৮ সালে। সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—পৃথিবীর সবাই মিলে ‘বইকে’ রক্ষা করতে হবে ‘কম্পিউটারের আগ্রাসী আক্রমণের’ বিরুদ্ধে। তার পরও শাহবাগ স্কয়ারে (এখন যেটা ‘প্রজন্ম চত্বর’ হিসেবে ক্রমেই পরিচিতি পাচ্ছে) এলে তিনি আজ উৎফুল্লই হতেন, কিছুটা অবাকও হতেন। সেটা এই কারণে নয় যে, এই চত্বরে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের অধিকাংশই তাঁর নামই শোনেনি। সেটা এ কারণেও নয় যে, এত অসংখ্য শিশু-কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েকে তিনি একসঙ্গে এর আগে জড়ো হতে দেখেননি। তাঁর তো জানাই ছিল, ১৯৬৮ সালের আগুনঝরা মে মাস, যে মাসে প্যারিসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসে দর্শনের ও গণতন্ত্রের একটা নতুন ধারণার সূচনা করেছিল ইউরোপে।

দেরিদার কথা মনে হলো এ জন্য যে, তিনিই প্রথমে বলেছিলেন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলনের কথা। তাঁর পরিভাষায়—ডিসেন্টারড রেভল্যুশন। যে আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত প্ররোচনা নেই, যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী ‘কেন্দ্র’, ‘সংঘ’ বা ‘আদর্শিক’ সংগঠন বা আইডিওলজি; যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী বা শ্রেণীজোট। এককথায়, যে আন্দোলন ধ্রুপদি মার্ক্সবাদের বাইরে, অথচ যা দেরিদার ভাষায়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য জরুরি। সুবিদিত যে, স্পেক্টরস অব মার্ক্স লেখার পর থেকে ডিকনস্ট্রাকশনের দেরিদা ক্রমেই ঝুঁকছিলেন এক নতুন ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে। দেরিদা অ্যান্ড দ্য টাইম অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে তার সবিশেষ বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।

দেরিদার কথা মনে হলো আরও এ কারণে যে, বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মধ্যে এরই মধ্যে দেখা গেছে এবং এখনো সেসব বৈশিষ্ট্যের পরবর্তী বিকাশের সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। তবে ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘাতের সমূহ সম্ভাবনা/আশঙ্কা রয়ে গেছে প্রজাতন্ত্রের পক্ষ ও বিপক্ষের যুযুধান শক্তির মধ্যে। যে ইতিহাসের মধ্যে আমরা এখনো আছি, সেই ক্রম-প্রকাশমান ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। দেরিদা একে বলেছিলেন, হিস্টরি অব দ্য প্রেজেন্ট। তার পরও কয়েকটি নজরকাড়া দিকের উল্লেখ না করে পারছি না।

২. আন্দোলনের নজরকাড়া দিক

প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরের চলমান আন্দোলন কোনো দলীয় বা বহুদলীয় জোট বা মঞ্চ থেকে শুরু হয়নি বা এখনো পরিচালিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীরা সামনে বা পেছনে থেকে অংশ নিচ্ছেন—নেওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে যাদেরই ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার, তারা যে ছাত্রসংগঠনেরই হোক, তারাই এখানে আসছে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আসছে, এমনকি ছাত্রদলের সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই আসছেন। কেননা, প্রশ্নটা দলীয় নয়, ব্যক্তিগত। এখানেও ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ আপ্তবাক্যটা খাটে। ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকেই এখানে লাখো মানুষ জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন। যেটা লক্ষ করার, তা হলো, রাজনৈতিক ছাত্রকর্মীরা যাঁরা এখানে অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরছেন না বা সেই পরিচয় জাহির করার জন্য তাঁরা উদ্বেলিত হয়ে উঠছেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলচর্চার বাইরে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই আন্দোলন অরাজনৈতিক। এর মধ্যেও তীক্ষ রাজনৈতিক বোধ রয়েছে, কিন্তু সেটা দলীয় রাজনৈতিক নীতি-আদর্শগত সংকীর্ণ বোধ থেকে আলাদা। যে অর্থে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘সব দর্শনচর্চা, সবকিছুই রাজনৈতিক’, ঠিক সেই অর্থে শাহবাগের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি নিয়ে এক নতুন ধরনের ‘নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ’-এর সূচনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ সেমিনারকেন্দ্রিক ও বিদেশি অনুদানপুষ্ট থিংক-ট্যাংক ও এনজিওভিত্তিক তথাকথিত সিভিল সমাজের ‘নাগরিক আন্দোলন’ থেকে আলাদা। এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ঘিরেই, মূলত সরকার-বদলকে কেন্দ্র করে, অথবা সরকারের নীতিমালাকে ঘিরে। অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতাচর্চার বলয়ে ঘুরপাক খায় এসব নাগরিক সংলাপ। এক অর্থে (গ্রামসীয় অর্থে) এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সমাজের আন্দোলনেরই একটি শাখা ‘এক্সটেনশন’। এদিক থেকেও থেকেও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে মনে হবে আলাদা চরিত্রের। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নির্ধারণ করলেই এটা বোঝা যায়।

এই আন্দোলন আদিতে শুরু হয়েছিল যাদের তাগিদে, তাদের একটি বড় অংশ এর আগের পাঁচ-সাত বছর ধরে—এই তরুণ বয়সেই—অনলাইনে তীব্র সংগ্রাম করে এসেছেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাত্তর নিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে, এ দেশের ইতিহাস নিয়ে, আজকের ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিরন্তর দুর্ভাবনা ও মনঃকষ্ট ছিল। কিছু একটা করার তীব্র ব্যক্তিগত তাগিদ একুশ শতকের এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ওই সাইবার যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছিল। হতে পারে, এসব ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁদের, তাতে পরিশীলনের ঘাটতি থেকে গেছে, সময় সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র লড়াই যে সাইবার স্পেসে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শাহবাগ আন্দোলনের জিনিওলজি বা সূত্রপাতের একটি চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়।

চতুর্থত, এই আন্দোলনের ‘উৎসবমুখর চরিত্র’ ভুলে যাওয়ার নয়। একে তো ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর দারুণ সময়। আমাদের সংস্কৃতির সেরা মাধ্যমগুলো: গান, নাটক, কবিতা, ছড়া, সিনেমা, চিত্রকর্ম—এসবের বর্ণিল সমাহার এখানে। এই আন্দোলনের ৯০ শতাংশের বয়সই পনেরো থেকে তিরিশের মধ্যে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আবার মেয়েরা। এই সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মিশেছে তারুণ্যের তীব্র ইনসাফ বোধ। সমাবেশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির পাশাপাশি বারবার যেটা বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ‘আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে চাই আমাদের অতীতকে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রকে’। আমাদের প্রজন্ম যেটা পারেনি আশি-নব্বইয়ের দশকে, সেটা একুশ শতকের প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। একটি শিশু, একজন কিশোরী, একটি তরুণের ডাকে অন্যান্য বয়সী, অন্যান্য পেশা ও শ্রেণীর লোকেরা সাড়া দিয়ে প্রতিদিন ও প্রতিরাত আসছে এখানে। কোনো বিশেষ নেতা বা নেত্রীর ডাকে তারা এখানে আসছে না। আন্দোলনের এই মেজাজটা আমাদের বুঝতে হবে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে কোনো দলীয় নেতা-নেত্রীর ছবি বা পোস্টার নেই। এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’।

৩. এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখব?

প্রতিটা প্রজন্ম তার নিজের নায়ক বেছে নেয়, তার নিজের বিপ্লব গড়ে তোলে, তার নিজের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বায়ান্নতে যার জন্ম, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে; যাদের জন্ম একাত্তরে, তারা অংশ নিয়েছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে; যাদের জন্ম নব্বইয়ের শুরুতে, তারা এখন অংশ নিচ্ছে ২০১৩ সালের এই শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে। আজ যারা অংশ নিচ্ছে তারা তাদের স্বকীয়তা নিয়েই আসছে। এর অকৃত্রিমতাকে (অথেনটিসিটি) যেন চিনতে ভুল না করি।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক দশকে তো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এমন কোনো চেতনার পুনরুজ্জীবন হয়নি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, তাহলে এই ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত চেতনা এত তীব্র হলো কী করে? এর একটা উত্তর হতে পারে, আমাদের ও তাদের মধ্যে প্রজন্মগত এক বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। তরুণেরা যে আমাদের থেকে প্রজন্মগত যুক্তিতেই অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিজস্বভাবে দেশপ্রেমের এক আলাদাবোধ ও বয়ান শাণিত করে তুলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি। গত দুই দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের নীরবে উঠে দাঁড়ানোও তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে থাকবে ‘কলঙ্কমোচন’-এর যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদের কলঙ্ক যেভাবে আমরা গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি; যেভাবে আমরা জাতি হিসেবে ভালো করছি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য মোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতের সরলতম সূচকে; যেভাবে গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ ছড়িয়ে পড়েছে এ দেশের নানা জেলায়-উপজেলায়; যেভাবে রপ্তানি খাতে, প্রবাসের কাজে, ক্ষুদ্রঋণে, আধুনিক ব্যাংক-বিমা সেবায়, নারীশিক্ষায়, ক্রিকেটে, বই প্রকাশনায়, গানে-নাটকে, বেসরকারি মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনে আমরা এগিয়ে গেছি—এসব নানা সাফল্যের পাশাপাশি বড় দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আমাদের গত কয়েক দশকের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্তি। এটা একুশ শতকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা নিক বা ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা নিক—মাধ্যমনির্বিশেষে একই ধরনের প্রেরণায় একটি মূল দাবিতে একাত্ম হতে পেরেছে তারা।

কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, এর পরে কী? তরুণেরা কেন কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নেই নিজেদের দাবিগুলো সীমিত রাখছে? সমাজে তো কত অনাচার আছে, রাষ্ট্রের তো কত অন্যায় আছে, সরকারেরও তো কত দিকে ঘাটতি-ব্যর্থতা আছে—সেসব ইস্যু কেন স্থান পাবে না শাহবাগ চত্বরের স্লোগানে? আন্দোলনকারীরা এর উত্তরে বলতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি—আমরা এখনো দেশের ভার কাঁধে তুলে নিইনি। সব দায়মুক্তির ভার আমরা এখনই নেব কেন? তার পরও আমরা খোলা রেখেছি বইয়ের পাতা, বন্ধ করিনি অন্য সম্ভাবনাগুলো, আন্দোলনের জনতা চাইলে অন্যান্য ইস্যু আনতে পারে, তবে এটি আমাদের আদি ভাবনা ছিল না। কেননা, যেসব দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, তার অর্ধেক অর্জনও হবে আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া।

আমার চোখে, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের একটি মৌলিক অভিপ্রায় হচ্ছে—সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকেই আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতে, সমাজ সংগঠনে ও সংস্কৃতিবলয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি মানেই আওয়ামী লীগ নয়; বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের একটা বড় অংশ একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না—এমনটাও ভাবা অসংগত নয়। ইউরোপের অনেক দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক নামের দল রয়েছে, সে সূত্রে এখানেও এমন দল থাকতে পারে, কিন্তু যে দলই করুক না কেন, চিহ্নিত যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের দলে রেখে কোনো পার্টি, জোট বা শক্তি রাজনীতি করতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। আগামী দিনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় বিবেচনা হিসেবে দেখা দেবে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের এটা একটি মূল পর্যবেক্ষণ। কেউ তো বাধা দেয়নি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শাহবাগে এসে সংহতি জানানোর ক্ষেত্রে। সেটা তারা করল না কেন? এর বিপরীতে আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পরে তাদের যে বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে এসেছে, বেশ কিছুটা হতাশই হয়েছি। এই শক্তিশালী ও অপার সম্ভাবনাময় আধুনিকমনা একটি প্রধান দলের কাছ থেকে আরও বলিষ্ঠ ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনরত সাধারণ জনসমাজের ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রে আরও সচেষ্ট হওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের না বোঝার কথা নয়।

সবশেষে, একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে—এই আন্দোলন আর কত দিন চলবে? সরকারি মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, পাছে এই আন্দোলন আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার দিকে গড়াতে থাকে! প্রধান বিরোধী দলের উদ্বেগ তো ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। শাসক অর্থনৈতিক শ্রেণীরাও চিন্তিত এই ভেবে যে, তাজরীন গার্মেন্টস-জাতীয় কোনো শ্রেণী-পেশার আন্দোলনের সঙ্গে তারুণ্যের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কি না! পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোনো আন্দোলনকেই শাসকশ্রেণী ও দলগুলো বেশি দিন সহজভাবে নিতে পারে না—এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। শাহবাগের আন্দোলন যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার পরও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যাবে আগামী বছরগুলোতে। আমরা পূর্ণ নয়, খণ্ডিতকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি। আমরা চিরস্থায়ী হতে চাই না, ক্ষণস্থায়িত্বেই আমাদের আনন্দ। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনে, কেননা সাইবার স্পেস থেকে রাজপথের স্পেসে চাইলে আমরা যেকোনো সময়েই আবার বেরিয়ে আসতে পারি, অন্য কোনো দাবি নিয়ে। আবার কালই ফিরে যেতে পারি, যদি জনসমাজ তা চায়। ভবিষ্যতে যারা এ দেশের গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে শঙ্কিত, তারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের এই বোধকে আশা করি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। শীত যাই যাই, ঋতুরাজ সমাগত, কড়া নাড়ছে দরজায়। এই আন্দোলনের উৎসবমুখর চরিত্র সবারই যে ভালো লাগবে এমন নয়। কোনো নিরীহ জন-আন্দোলনও একপর্যায়ে সহিংস আক্রমণের শিকার হতে পারে, এবং একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তার পরও মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের একটা দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন থেকে যাবে, একটা বড় দাগ রেখে যাবে এটি। কবি যেমনটা বলেছিলেন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।