[তুমুল গাঢ় সমাচার ২১] ক্ষমতা প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো :মাইক্রো পাওয়ারের ধারণা (Foucault and Micro-power)

পর্ব ::২১

ফুকো অত্যন্ত নরমভাবে এই অভিযোগটা উত্থাপন করেছেন তাদের প্রতি :’When we say that sovereignty is the central problem of right in western societies, what we mean basically is that the essential function of the discourse and techniques of right has been to efface the domination intrinsic to power in order to present the latter at the level of appearance under two different aspects : on the one hand, as the legitimate rights of sovereignty, and on the other, as the legal obligation to obey it.’ ফুকো এই সম্পর্ককে একটি ত্রিভুজের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন :’ক্ষমতা, অধিকার ও সত্য’।

তবে, এ কথা ঠিক যে, ফুকো ম্যাক্রো পাওয়ার সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন না। রাষ্ট্র-ক্ষমতার ‘ক্ষমতা’ কীভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, প্রজাতন্ত্রের প্রজারা কতটা অধিকার ভোগ করছে, প্রজাতন্ত্রের সাথে তন্ত্রের বা ভাবাদর্শের ভূমিকা কী- এসব নিয়ে তিনি ভাবিত ছিলেন না। তার আগ্রহের জায়গা ছিল অন্যত্র।

৩. মাইক্রো পাওয়ার নিয়ে ফুকোর পাঁচটি উপদেশ

১৯৭৬ সালের ১৪ জানুয়ারি সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুকো একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন ‘মাইক্রো পাওয়ার’ বিষয়ে। সেখানে তিনি ম্যাক্রো পাওয়ার তথা রাষ্ট্র-ক্ষমতার ‘ক্ষমতা’কেন্দ্রিক আলোচনা সম্পর্কে তার নিরুৎসাহের কথা জানান। উদ্ৃব্দতিটি বড়। মূল ভাবটি অক্ষুণ্ণ রেখে আমার অনুবাদ নিচে তুলে ধরছি :

‘মধ্যযুগ থেকে অধিকারের ভাষায় ডিসকোর্স নির্মাণের যে রীতি চলে আসছে, গত কয়েক বছর ধরে সেই ধারাকে বদলে দেওয়াই ছিল আমার গবেষণার উদ্দেশ্য। আগের গবেষণা পদ্ধতিকে আমি উল্টে দিতে চেয়েছিলাম। অধিকার নয়, প্রভুত্ব করাই ছিল এর প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য- এটা দেখাতে চেয়েছিলাম এবং সেই সাথে এর নিষ্ঠুরতার দিকটিও। আমি আরও দেখাতে চেয়েছি কীভাবে আধিপত্য বিস্তারের ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে অধিকারের ডিসকোর্স কাজ করে। অধিকারের ডিসকোর্স শুধু আইন নয়, এর প্রয়োগের সাথে নানা অ্যাপারেটাস, প্রতিষ্ঠান এবং বিধিমালা জড়িত। আধিপত্য বলতে আমি কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা বিশেষ গ্রুপ/দলের আধিপত্য-বিস্তারকে বোঝাচ্ছি না। বরং সমাজের মধ্যে চলতে থাকা বিভিন্ন ধরনের আধিপত্য-আনুগত্য সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত করছি। কেন্দ্রীয় আসনে বা সিংহাসনে থেকে রাজা যে আধিপত্য দেখান, সে সম্পর্কে কিছু বলার নেই আমার নতুন করে; কিন্তু যারা তার প্রজা তাদের মধ্যেও পরস্পরের প্রতি আধিপত্য-আনুগত্য সম্পর্কের যে বিচিত্র সমাবেশ দেখতে পাই, তা আমাকে আকর্ষণ করে।’

এক কথায়, প্রচলিত রাষ্ট্রনৈতিক মতের উদ্দেশ্য ছিল ‘সার্বভৌমতা-বশ্যতা’র সম্পর্কের ব্যাখ্যা প্রদান। অন্যদিকে ফুকোর উদ্দেশ্য ছিল ‘আধিপত্য-আনুগত্য’র সম্পর্কের বিশ্নেষণ করা। এ জন্য তিনি পাঁচটি পদ্ধতিগত বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন ১৯৭৬ সালের বক্তৃতায়, যা থেকে তার দার্শনিক মতের মূল দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ক. প্রথম উপদেশ

প্রথমত, ক্ষমতাকে তার প্রধান প্রয়োগের ক্ষেত্র, অর্থাৎ রাষ্ট্র-ক্ষমতা প্রয়োগের বাইরেও অনুসন্ধান করতে হবে। যে ক্ষমতা আইনগত সিদ্ধ, যার পেছনে যথাযথ বিধিমালা ও আইন-কানুনের ভিত্তি রয়ে গেছে, সেই ক্ষমতার অনুশীলনের ধরন-ধারণা পরিস্কার। সেখানে নতুন কিছু গবেষণা কাজের সুযোগ সামান্যই। ট্রাফিক পুলিশ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে ক্ষমতার প্রয়োগ করবে, পুলিশ বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হলে ক্ষমতার প্রয়োগ করবে, সামরিক বাহিনী দেশের অখণ্ডতা রক্ষার্থে ক্ষমতার প্রয়োগ করবে, জনপ্রশাসনের আমলারা উন্নয়নের স্বার্থে ক্ষমতার প্রয়োগ করবে; তার ন্যায্যতা প্রচলিত আইন এবং বিধিমালা দ্বারা মোটামুটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম। কিন্তু যে ক্ষমতা চোখের আড়ালে রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। এর জন্য রাষ্ট্র-যন্ত্রের বাইরে, লিবারেল ডিসকোর্সের ‘অধিকারের ভাষা’য় কথা বলার ট্র্যাডিশনের বাইরে গিয়ে, ক্ষমতা কীভাবে কাজ করছে তার তত্ত্ব-তালাশ হওয়া দরকার। শরীরের ভেতরে রক্তপ্রবাহ বড় বড় শিরা-ধমনীতে প্রবাহিত হয়, তা-ই নয়; শরীরের প্রান্ততম বিন্দুতে (উপশিরা বা ক্যাপিলারি) রক্তপ্রবাহ রয়েছে। এবং ‘ক্যাপিলারিগুলো’ ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরের সেসব স্থান বিপর্যস্ত হতে পারে। রাষ্ট্রকে শুধু যদি রাষ্ট্র-যন্ত্রের সমার্থক না ধরি, গোটা সমাজের বৃহত্তর অর্থে যদি তাকে সংজ্ঞায়িত করা যায়, তাহলে ক্ষমতার প্রবাহ শুধু মূল রাষ্ট্র-যন্ত্রের মাধ্যমে নয়, সমগ্র সমাজ-শরীরের প্রান্ততম বিন্দু তথা শিরা-উপশিরা ‘ক্যাপিলারি’ পর্যন্ত কীভাবে তা সঞ্চালিত হচ্ছে, তারও প্রকৃতি অনুধাবন করতে হবে।

ক্ষমতার ‘কেন্দ্র’ থেকে ‘প্রান্তে’ দৃষ্টি ফেরানোর এই ডাকের অর্থ দ্বিবিধ। এক, জেলা-উপজেলা, শহর বা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাকে অবলোকন করতে হবে। কেননা, প্রাত্যহিক জীবনে এসব পর্যায়েই মানুষকে ক্ষমতার মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রের ‘উপরের দিকে’ যতই আইন-কানুন ও বিধিমালার যুক্তি দেখানো হোক না কেন, যত ‘নিচের দিকে’ যাওয়া যায়, ততই তার ‘আইনের বাইরের চেহারাটা’ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি উদাহরণ, জেল-কোড বা ‘পাগলা গারদ’ নিয়ে যত আইন-বিধিমালাই লেখা হোক না কেন, এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করে বা ক্ষমতার প্রয়োগ করে (বা চলতি ভাষায়, ‘ক্ষমতা ফলায়’) তা কেবল আইনের নিরিখে বা আইনি ডিসকোর্স দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এসব প্রতিষ্ঠান একদিনে গড়ে ওঠেনি। প্রাচীন গ্রিক-রোমান যুগ, মধ্যযুগ হয়ে আধুনিক যুগ অবধি এসব প্রতিষ্ঠান শাস্তি ও কয়েদ করে রাখার নিয়ম-পদ্ধতিতে (ইনস্ট্রুমেন্ট/টেকনিক) অনেক পরিবর্তন এনেছে। বিভিন্ন যুগের জেলখানা বা পাগলা গারদ বিভিন্ন রকম ছিল, এমনকি স্থাপত্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও। মানব-সভ্যতায় ‘শাস্তির ইতিহাস’ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাতে তথাকথিত বর্বরতম পদ্ধতি অনুসরণ করা থেকে শুরু করে সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ কিন্তু আরও ফলপ্রসূ শাস্তির ‘আধুনিক পদ্ধতি’ অনুসরণ করা হচ্ছে। আধুনিক পুঁজিবাদ শাস্তির নিত্যনতুন পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেছে, সেটা আমরা জানি (ওয়াটার বোর্ডিং, ট্রুথ-সিরাম প্রভৃতি ‘টেকনিক’-এর কথা শুনে থাকব)। ফুকোর কথা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যুদয়, বিবর্তন এবং তাদের আধুনিক পরিণতি নিয়ে আলাদাভাবে ইতিহাসনির্ভর বিচার-বিশ্নেষণ করা দরকার। এক কথায়, ক্ষমতা যেখানে শরীরের সংস্পর্শে আসছে, যেখানে সে শরীরকে আহত করছে বা গড়ে-পিটে নিচ্ছে, ক্ষমতা-প্রয়োগের সেই চরম-বিন্দুতে (যেখানে আইনের বাধ্যবাধকতার প্রভাবও তুলনামূলক কম), সেখানে তাকে অবলোকন করা দরকার। ফুকোর কথায় :’In other words, one should try to locate power at the extreme points of its exercise, where it is always less legal in charactcr.’

খ. দ্বিতীয় উপদেশ

ফুকোর দ্বিতীয় পদ্ধতিগত মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিশেষ যুগের বা দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে একটা সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে- রাজা কেমন ছিলেন, রাজার বিশ্বাস বা ধ্যান-ধারণা কী রকম ছিল, আসল রাজ-ক্ষমতা কি রাজার হাতে, নাকি পারিষদবর্গের হাতে, নাকি রাজার পরিবারের হাতে ছিল, রাজা তার রাজ-ক্ষমতার যেভাবে ব্যবহার করেছিলেন তার উদ্দেশ্য কি ছিল রাজকোষের সম্পদ-বৃদ্ধি, নাকি জনসাধারণের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন ইত্যাদি রাজকাহনে লিপ্ত হওয়া। ফুকো এটাকে অস্বীকার করছেন না, কিন্তু তিনি বলছেন পাঠককে- ‘আমি এ ধরনের বিচার-বিশ্নেষণের পদ্ধতিতে আগ্রহী নই।’ ক্ষমতা-প্রয়োগকারী রাজার বা রাজশক্তির ‘মনে’ কী ছিল, তার ‘মহান অভিপ্রায়’-এর পেছনে সময় নষ্ট না করে বরং দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যাক প্রজাদের অবস্থার প্রতি। প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ কীভাবে ‘অধীনস্থ প্রজা’য় পরিণত হচ্ছে; কী সব বৈষয়িক-মানসিক-দৈহিক-আদর্শিক-স্বাপ্নিক চাপের মুখে তারা ক্রমান্বয়ে রাজশক্তির বশ্যতা স্বীকার করে নিচ্ছে; এবং বশ্যতার জীবনের মধ্যেই তাদের ‘সাবজেক্টিভিটি’কে সীমিত করে ফেলেছে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, চেতনে বা অবচেতনে; এটা পরিস্কার করাই ছিল ফুকোর লক্ষ্য। ফুকো বলছেন, “আমার এই গবেষণা-প্রকল্প হবস্‌-এর ‘লেভিয়াথান’ সংক্রান্ত প্রকল্পের ঠিক বিপরীত। হবস্‌ যেখানে বুঝতে চাচ্ছেন কীভাবে অসংখ্য মানুষের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা থেকে ক্রমশ ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’র স্পিরিটের উদয় হয়, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এর উল্টোটা দেখানো। কীভাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সামনে অসংখ্য মানুষ ক্রমশ পরাধীন-অধীনস্থ প্রজার অবস্থান স্বীকার করে নেয়, সেই শোচনীয় পরিণতিকে প্রত্যক্ষ করা।”

গ. তৃতীয় উপদেশ

এখান থেকেই তৃতীয় পদ্ধতিগত অনুসিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে। অধীনস্থ প্রজায় পরিণত হওয়া (যাকে ফুকো বলেছেন, ‘সাবজুগেশন’) ব্যাপারটা একপেশে নয়। অর্থাৎ, ‘উপর থেকে’ ক্ষমতার প্রয়োগ করা হচ্ছে, আর স্বাধীন সার্বভৌম মানুষ ক্রমশ তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে একান্ত বিশ্বস্ত, অনুগত ও বাধ্যগত প্রজায় পরিণত হচ্ছে- বিষয়টা শুধু এ রকম নয়। প্রজারাও এই পরিণতির জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী। ফুকো বলেছেন, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে প্রজারা নিজেরাই ‘ক্ষমতার বাহক’ (Vehicles of Power) হয়ে পড়ছে। ক্ষমতা যদি শুধু রাজার হাতেই থাকত, তাহলে প্রজাদের বশ মানানো সহজ হতো না। ক্ষমতা একটা ‘নেটওয়ার্কের মতো’, মাকড়সার মতো বিচিত্র তন্তুজাল বিছিয়ে ক্ষমতা প্রতিটি ব্যক্তিকে ধারণ করে আছে অবস্থা-বিশেষে। সবাই ক্ষমতার প্রয়োগ করছে, আবার অবস্থা-বিশেষে ক্ষমতার কাছে বশ্যতাও স্বীকার করছে। কর্মরত অবস্থায় একজন রাজ-কর্মচারীর প্রবল প্রতাপ, আর অবসরে যাওয়ার পর সেই একই ব্যক্তির অসহায় ক্ষমতাহীনতা এর একটি উদাহরণ। যিনি বিরোধী দলে থেকে রাষ্ট্র-যন্ত্রের নির্বিচার ক্ষমতা প্রয়োগের সমালোচনায় উচ্চকণ্ঠ, তিনিই আবার সরকারে গিয়ে সেই সমালোচনার কথা ভুলে যান। ফলে, ক্ষমতা প্রয়োগের ধারায় বড় আকারের কোনো সংস্কার আনা দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। ফুকো মনে করেন, আধুনিক পুঁজিবাদী (এবং প্রথাগত সমাজতন্ত্র) দেশে ব্যক্তিসত্তা আর ব্যক্তির অধীনে নেই। এটি প্রায় পুরোপুরি ক্ষমতার অধীন Subjugated সত্তায় পরিণত হয়েছে। ব্যক্তির শরীর, তথাকথিত নিজস্ব স্টাইল, প্রেম-অপ্রেম, দেহভঙ্গি-মনোভঙ্গি, ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, তর্কালাপ, দর্শন, তার লেখার বিষয়বস্তু, আড্ডাস্থল, আড্ডার ধরন-ধারণা, উপন্যাসের ফর্ম, কবিতার চিত্রকল্প; এমনকি তার স্বপ্ন, ঘুমের ভেতরে হিজিবিজি প্রলাপ, নিদ্রা ও অনিদ্রার কাল, জাগরণের মুহূর্ত ও জীবিকা অন্বেষণ আজ ‘ক্ষমতার চক্ষু’র অধীনে। যদি মনে রাখি, মিডিয়াও রাজ-ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র, তাহলে এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ব্যক্তি হয়তো ভাবছেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় কর্মে লিপ্ত, কিন্তু তার জাগতিক ক্রিয়া-কলাপের ছকটা আগে থেকেই সাজানো রয়েছে। সে নিজেই ক্ষমতার এই ছকে আগ্রহী কুশীলব, একজন সক্রিয় পার্টনার। হয়তো তার অস্তিত্ব-রক্ষার স্বার্থেই।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ২০] ক্ষমতা প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো :মাইক্রো পাওয়ারের ধারণা (Foucault and Micro-power)

পর্ব ::২০

নতুন প্রসঙ্গ

১. ক্ষমতার ‘প্রাণভোমরা’

ফরাসী দার্শনিক মিশেল ফুকো তার বিভিন্ন আপ্তবাক্যের জন্য বিখ্যাত। তার মধ্যে একটি হলো- ‘যেখানেই ক্ষমতা [রাজ করে], সেখানেই [তার বিরুদ্ধে] প্রতিরোধ গড়ে ওঠে’। সমস্যাটা জটিল, কেননা আমরা জানি শেষ পর্যন্ত এ খেলার পরিসমাপ্তি কোথায়। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। যতদিন প্রতিরোধ প্রতিবাদী অবস্থায় থাকে, ততক্ষণ সে ঠিক পথে চলছে। কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সাথে সাথে তার চরিত্র পাল্টে যেতে থাকে। কেন এমন হয়, সেটা জানার জন্যই ফুকোকে পাঠ করা দরকার।

ক্ষমতা অর্থাৎ Power বিষয়টিকে ফুকো যেভাবে দেখেছেন, যত বিভিন্ন উপায়ে তার বিশ্নেষণ করেছেন, সেভাবে এর আগে কোনো দার্শনিকই ব্যাখ্যা করেননি। মার্কস যেমন পুঁজির রহস্য-উন্মোচনের জন্য পৃথিবীজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন, ফুকোও তেমনি ক্ষমতার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার সব কথা মানতেই হবে এমন নয়। এ নিয়ে আরেক ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদার সাথে তার উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। জার্মান দার্শনিক জুরগেন হাবেরমাসের সাথেও বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু সবাই এ কথা মানছেন, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্সিস বেকন ভেবেছেন, ‘নলেজ ইটসেল্কম্ফ ইজ পাওয়ার’। আমাদের বিদ্যালয়ে এখনও পড়ানো হয়, লেখাপড়া করলে গাড়ি-ঘোড়ার মালিক হওয়া যায়। ফুকো এসব অস্বীকার করবেন না। তিনি শুধু বলবেন, কোনটা ‘জ্ঞান’ আর কোনটা ‘অজ্ঞান’ এটা ঠিক করেছে কে? এই জ্ঞান, এই সত্য, অদৃশ্য ক্ষমতাবলয়ের বশীকরণ মন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত বিকৃত, আচ্ছন্ন হয়ে নেই তো? ফুকো এ রকম ভাবছেন, কেননা তিনি মনে করেন যে, জ্ঞান উৎপাদন ও জ্ঞান বণ্টনের প্রক্রিয়া যতটা নিরীহ ভাবি আমরা, আসলে সেসব আদৌ নিরীহ নয়। এক রক্তাক্ত সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে তবেই জ্ঞান তৈরি হচ্ছে। কোন মত ‘সত্য’ বলে স্বীকৃত হবে, আর কোন মতকে ‘সৃষ্টিছাড়া’ বলে বর্জনীয় ঘোষিত হবে, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ। ফুকো এক জায়গায় বলেছেন, ‘আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে [অসংখ্য পরীক্ষক প্রতিদিন আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন]… সেখানে স্কুলের শিক্ষক পরীক্ষকের ভূমিকায়, ডাক্তার পরীক্ষকের ভূমিকায়, চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদ পরীক্ষকের ভূমিকায়, সমাজ-কর্মী পরীক্ষকের ভূমিকায়। এরা সবাই মিলে কোনটা স্বাভাবিক রীতিসম্মত তার একটি রাজত্ব (Reign of normality) তৈরি করেছে। এই পরীক্ষকের কাছে প্রতিটি ব্যক্তিকে তার শরীরের আচরণ, তার আচার-ব্যবহার, তার দক্ষতা, তার অর্জন সব কিছুকে অধীনস্থ করেই তবে তাকে বাঁচতে হচ্ছে।’ ফুকো এই অদৃশ্য ও দৃশ্যমান ‘পরীক্ষকদের’ থেকে আমাদের বাঁচাতে চান।

‘পাথরের কোরাস’ কবিতার শুরুর স্তবকেই টি. এস. এলিয়ট বলেছিলেন যে, জ্ঞানরাজ্যের অরণ্যে আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি:

Where is the life we have lost in living?
Where is the wisdom we have lost in knowledge?
where is the knowledge we have lost in information?

এলিয়ট জ্ঞানরাজ্যের অন্ধকার দিকের সম্পর্কে সজাগ ছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বীয় সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেননি। প্রত্যাশা করেছেন দৈবপ্রেরণার, যেখানে অপেক্ষা করে আছে। ইমানুয়েল কান্ট যাকে বলেছিলেন ঊঃবৎহধষ চবধপব- এক অনন্ত শান্তির কাল। ফুকোর মধ্যে সেই দিব্যোন্মাদ চাহনী নেই। কেননা তার চোখে, দেবতারা যেমন, ‘মানুষ’ বলতে আমরা যা ভাবি তা প্রতিনির্মিত হয়ে চলেছে। এবং এ কাজটি করেছে রাজাধিরাজ ক্ষমতা ও তার কথিত পরীক্ষকবৃন্দ। এ জন্যই ফুকো কী বলছেন তা গুরুত্বের সাথে শোনা জরুরি।

ক্ষমতা বিষয়ে ফুকোর আলাপকে (যাকে তিনি বলেছেন ‘ডিসকোর্স’, এ শব্দটি তারই উদ্ভাবন) কয়েকটি শিরোনামে ভাবা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ম্যাক্রো ও মাইক্রো পাওয়ার, ‘ডিসিপ্লিনারি’ পাওয়ার, নরমালাইজিং পাওয়ার, ‘বায়ো পাওয়ার’ ইত্যাদি। এসব ধারণা ফুকোর বিভিন্ন পর্যায়ের লেখায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ আমি বলতে চেয়েছি, ক্ষমতা প্রসঙ্গে ফুকো চিরকাল এক রূপ ভাবতেন না। আমি এখানে ফুকোর মাইক্রো পাওয়ার ধারণার কিছুটা আলোচনা করব।

ফুকোর মাইক্রো পাওয়ারের ধারণা বোঝাতে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র একটি রূপকথাকে স্মরণ করা যেতে পারে। দৈত্যাকার ক্ষমতাকে সম্মুখ বা গেরিলা যুদ্ধে পরাস্ত করা অসম্ভব। কেননা, দৈত্যের ‘প্রাণভোমরা’ লুকিয়ে আছে অন্যত্র। গহীন বনের নির্জনতম সরোবরের তলদেশে, যেখানে রাখা একটি রুপোর কৌটো এবং যার ভেতরে বাস করে সেই প্রাণভোমরা। যদি সেই কৌটো খুঁজে পাওয়া যায় এবং একটি একটি করে সেই ভোমরের হাত-পা-ডানা ছিঁড়ে ফেলা যায়, তবেই সে দৈত্যের ধ্বংসসাধন সম্ভব। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বৈরাচারকেও সেভাবে ছাড়া পরাস্ত করা সম্ভব নয়। সেই ক্ষমতার ‘প্রাণভোমরা’ ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে- সরোবরের তলদেশে শুধু নয়, সমাজ-শরীরের সর্বত্র :বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক, জেলখানা, বিচারালয়, পত্রিকার অফিস, টিভি চ্যানেল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-এনজিও, উপাসনালয়, পাড়ার ক্লাব, মহল্লার সংগঠন, পরিবারের অভ্যন্তর, এমনকি ব্যক্তিসত্তার মধ্যেও। এসব অপ্রত্যাশিত স্থানে উৎকীর্ণ হয়ে আছে ক্ষমতার ফুটপ্রিন্ট! অর্থাৎ ফুকো এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন, সর্বত্র অশুভ ‘ক্ষমতা-চর্চা’র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ না করতে পারলে শুধু রাষ্ট্র-ক্ষমতা বদলে সর্বাত্মক পরিবর্তন আসবে না, বা এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

২. ম্যাক্রো বনাম মাইক্রো পাওয়ার :

সাধারণত আমরা ‘পাওয়া’র বলতে রাষ্ট্র-ক্ষমতা বা রাজ-ক্ষমতাকে নির্দেশ করে থাকি। এই ক্ষমতা ‘ওপর থেকে’ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই ক্ষমতা যিনি ‘রাষ্ট্রের প্রধান’ (যেমন রাজা, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী), তারই শুধু চর্চার বিষয় নয়, তার অধীনস্থ রাষ্ট্র-যন্ত্র (প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান, বিধিমালা, আইন-কানুন) এই চর্চার অংশ। আধুনিক রাষ্ট্র-ক্ষমতার প্রয়োগ ও পরিধিকে ঘিরে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই এক আইনি আলোচনা গড়ে উঠতে থাকে। যাকে ফুকো বলেছেন ‘লিগ্যাল-জুরিডিক্যাল ডিসকোর্স’। এই আলোচনার মূল মনোযোগ ছিল রাষ্ট্র-ক্ষমতার পরিধিকে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ করা। রাজা সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন, কিন্তু নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে যেতে পারবেন না। তেমনি, প্রজারাও সকল অধিকার ভোগ করতে পারবেন, কিন্তু নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে বাড়তি কিছু প্রত্যাশা করতে পারবে না। এভাবে রাজা ও প্রজার মধ্যে যার যার অধিকার নির্দিষ্ট করে ক্ষমতা প্রয়োগের একটি সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও নাগরিকদের যার যার অধিকার রক্ষাপূর্বক ক্ষমতা-প্রয়োগের স্বীকৃত কাঠামোকে নানা ধরনের রক্ষাকবচ দিয়ে আরো যুক্তিসিদ্ধ করে তোলা হয়েছে। উদাহরণত, ট্রাম্পের শাসনামলে প্রেসিডেন্টের প্রভূত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প তার ইচ্ছামতো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। সেখানে কংগ্রেস-সিনেটের অনেক নিয়ম-নীতির রক্ষাকবচ রয়ে গেছে। তার ওপরে স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং সর্বোপরি সুপ্রিম কোর্টের অলঙ্ঘনীয় ছায়া রয়েছে। তারপরও সাংবিধানিক বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যায় রাষ্ট্রের বিধিমালা ও আইন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভের (আইন-প্রণয়ন, বিচার ও প্রশাসন) মধ্যে দায়িত্ব-বণ্টন, সরকারের পরিচালনা পদ্ধতি, বিভিন্ন দপ্তর-মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে মাঝে মাঝেই ‘টেনশন’ সৃষ্টি হয় এবং তা নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বলা দরকার, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে গড়ে ওঠা ‘অধিকারের ভাষায়’ (Rights based discourse) নির্মিত ক্ষমতা-প্রয়োগের এই ডিসকোর্সকে ফুকো অস্বীকার করছেন না। এই ক্ষমতা-প্রয়োগের অংশ হিসেবে মার্কস, গ্রামসি বা আলথুসার যখন ‘আইডিওলজিক্যাল অ্যাপারেটাস অব স্টেট’-এর প্রসঙ্গ উত্থাপন করছেন, সেটিকেও ফুকো অস্বীকার করছেন না। তিনি শুধু বলছেন, সুদূর প্রাচীন বা মধ্যযুগেও রাজশক্তি যে টিকে ছিল, তা শুধু কর্তৃত্ব প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্জিত হয়নি। আধিপত্য বিস্তার (ডমিনেশন) যেমন তাতে ছিল, তেমনি ছিল আধিপত্য-প্রয়োগের ন্যায্যতা সম্পর্কে ‘সত্যের প্রচার’। উল্লেখ্য, ফুকোর ‘রিজিম অব ট্রুথ’ এবং গ্রামসির ‘হেজিমনি’ ধারণার মধ্যে মিল আছে। তবে সব রিজিম অব ট্রুথ সর্বেশ্বরতা পায় না। অর্থাৎ হেজিমনিক স্তরে যেতে পারে না। তবে সব রাজাকেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে সত্যের প্রচার করতে হয়েছে কম-বেশি। ফুকো বলেছেন, ÔRight in the west is the king’s Right … [The] resurrection of Roman law [in the 12th century] was the major event around which, and on whose basis, the juridical edifice which had collapsed after the fall of the Roman Empire was reconstructed.’ রোমান ল-এর পুনর্জীবনের মধ্য দিয়ে আবার মধ্যযুগের রাজ-রাজড়াদের Ôabsolute power’ প্রয়োগের আইনি ও প্রশাসনিক দিকটির সুরাহা করা হয়েছিল। কিন্তু ফুকো বলছেন, তখনও সত্য-উৎপাদন ও তা পরিবেশনের প্রয়োজনীয়তা ছিল। যেমন, ‘মহাভারত’-এর যুগে অনুশাসন-পর্বের বিষয়বস্তু ছিল, আজকের পরিভাষায়, ‘গভর্ন্যান্স’ বা সুশাসনের প্রয়োগ-বিধির আলোচনা। অর্থাৎ রাজা বা রাজশক্তি কীভাবে যুক্তিসঙ্গতভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ করবেন, রাজার অধিকার কতটুকু, প্রজাদেরই বা অধিকার কতটুকু, তাকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে সেখানে। কৌটিল্যর ‘অর্থশাস্ত্র’তে এই নির্দিষ্ট অধিকারকে বিধিমালা ও আইনের মাধ্যমে আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। উদাহরণত, কৌটিল্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ৩২ রকমের দুর্নীতি শনাক্ত করেছেন এবং তার জন্য পৃথক দণ্ডের সুপারিশ করেছেন। সত্য-উৎপাদন ও তা পরিবেশনার তাগিদ না থাকলে আবুল ফজল আইন-ই-আকবরী লিখতেন না। একই কথা বলা যায় ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা বিষয়েও।

আধুনিক যুগের রাষ্ট্রতাত্ত্বিকরা যথা হবস, লক, বেন্থাম, মিল প্রমুখ যখন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক রাজশক্তির ক্ষমতার বৈধতা, গণ্ডি বা চৌহদ্দির সীমা নির্ণয় করতে কলম ধরেছেন, সেটাও সত্য-উৎপাদন ও তা পরিবেশনার প্রয়োজনেই। সার্বভৌম (Sovereignty) যিনি, তার ‘ন্যায়সঙ্গত’ অধিকার কতটুকু ও কী কী- এটি যেমন তাদের আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল, তেমনি প্রজাদেরও ‘আইনসম্মত’ অধিকার কতটুকু, সেসব আলোচনায় স্থান পেয়েছে। ফুকো বলছেন, এসব আলোচনা, ডিসকোর্স তথা সত্য-উৎপাদনের মধ্য দিয়ে মূল উদ্দেশ্যটা খোলাসা করে বলা হয়নি। লিবারেল বা কনজারভেটিভ সব ধারারই পলিটিক্যাল ফিলোসফাররা যার যার মতো ‘অধিকারের ভাষা’ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু, তারা এটা করতে গিয়ে আসলে ‘ক্ষমতার সম্পর্ক’কেই আড়াল করেছেন।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল