বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৬
পূর্বে প্রকাশিতের পর
অর্থনীতিবিদরা দলের রাজনৈতিক দর্শন ও অর্থনৈতিক আদর্শ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেননি এক্ষেত্রে। রাজনীতিবিদরাই এখানে মুখ্য ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো পাঠ করলে এ নিয়ে কোনোই সন্দেহ থাকে না। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা কর্মসূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও রাজনীতিবিদদের, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে শেখ মুজিবের, মূল ও নির্ধারক ভূমিকা ছিল। এ কথা খাটে ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোর ক্ষেত্রেও। গুরুত্ব বিবেচনা করে পুরো উদ্ৃব্দতিটাই আমি এখানে তুলে ধরতে চাই। দলের অর্থনৈতিক আদর্শ হিসেবে বলা হয়েছিল :
‘আওয়ামী লীগের আদর্শ শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য ও দুর্দশার হাত হইতে মুক্তিলাভ করা সম্ভব বলিয়া আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। মূল শিল্পগুলিকে, যথা- খনিজ শিল্প, যুদ্ধের অস্ত্র-সরঞ্জাম শিল্প, বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক শিল্পকে জাতীয়করণ করিতে হইবে এবং ইহাদের পরিচালনার ভার রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গঠিত ও পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর ন্যস্ত করা হইবে। ব্যাংক, বীমা, গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন প্রভৃতি প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবশ্যকবোধে জাতীয়করণ করা হইবে। শিল্পে ও ব্যবসায় কোনো প্রকারের একচেটিয়া অধিকার স্বীকার করা হইবে না।’
বলা বাহুল্য, এই দাবিগুলির অনেক কিছুই ১৯৪৯ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ইতিপূর্বে আলোচিত ম্যানিফেস্টোতে বীজ হিসেবে বপন করা হয়েছিল। তবে এর আগে কোনো দলিলেই এত স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে, ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেই বর্তমানের শোষণ, বৈষম্য ও দুদর্শার হাত হইতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব।’ তবে এই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে ঠিক কোন ধরনের ব্যবস্থা তা অবশ্য দলিলে স্পষ্ট করা হয়নি। তবে এটি যে স্তালিন আমলের সমাজতন্ত্র নয়, সেটি এর ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ অধ্যায় থেকেই সুস্পষ্ট হয়। এই দুটি অধ্যায়ে ‘লিবার্টি প্রিন্সিপালকে’ সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ‘একমাত্র যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত অন্য কোনো সময়ে এই সকল অধিকার খর্ব করা হইবে না।’ এই দলিলে আবারো মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রচিত না হইলে কোনো শাসনতন্ত্র জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য হইবে না।’ এবং ২১ দফা অনুসরণ করে বলা হয়েছে যে, এমন শাসনতন্ত্র চাই যা ‘অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, শাসনকার্যে এবং দেশরক্ষার ব্যাপারে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান’ করবে। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কথা বলা হলেও একটি ফেডারেল ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের’ কাঠামোতেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব, এমন বিশ্বাস ছিল ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোর প্রণেতাদের। এই দলিল পাঠে বরং উল্টো প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বৃহৎ ও পরিত্যক্ত শিল্পের ‘জাতীয়করণ’ নিয়ে এত পানি ঘোলা করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কোনো কোনো মহল থেকে? সেইসব বিরুদ্ধ সমালোচকরা কি জানতেন না যে, পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের ম্যানিফেস্টোতেই ছিল দেশের বৃহৎ ও মূল শিল্পকে ‘জাতীয়করণ’ (Nationalisation) করার কথা? অর্থাৎ শেষোক্ত নীতি ১৯৭২ সালের কোনো হঠাৎ আবিস্কার নয়। শুধু মূল শিল্প নয়, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন ‘প্রত্যক্ষ জনস্বার্থমূলক’ প্রতিষ্ঠানকে ‘আবশ্যকবোধে জাতীয়করণ করা’ হবে- এ ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনেরই ঘোষিত অর্থনৈতিক আদর্শ ও কর্মসূচির অংশ। এবং সেটা এসেছিল-তৎকালীন পরিস্থিতিতে-সমতামুখীন অর্থনীতি গড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই।
১৯৬৪ সালের উপরোক্ত দলিলে অর্থনৈতিক আদর্শের অংশ হিসেবে ‘দুই অর্থনীতির’ প্রসঙ্গও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য ছিল ১৯৫২ সালের পর থেকেই একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই বৈষম্যের আলোচনাটিকে নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সেকালের প্রাগ্রসর বাঙালি জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদেরাও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কেননা, এটি উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের একটি স্বীকৃত বিষয় ছিল এবং এর গুরুত্ব বাঙালি অর্থনীতিবিদরা স্বাভাবিক কারণেই অনুধাবন করেছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারও বিষয়টির গুরুত্ব এক পর্যায়ে কিছুটা হলেও (অন্ততঃ লোক দেখানোর জন্যে হলেও) অনুভব করেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের গতিপ্রকৃতি মনিটর করার জন্য একাধিক কমিশন গঠন করা হয়।
প্রতিটি পাঁচসালা পরিকল্পনার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে নাকি কমছে- এটা তলিয়ে দেখা ছিল এসব কমিশনের কাজ। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অংশ থেকেই শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা যোগ দিতেন কমিশনের সদস্য হিসেবে। কীভাবে ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ক বৈষম্য নিয়ে পেশাদার অর্থনীতিবিদদের কাজকর্ম পরিচালিত হতো এবং পরোক্ষভাবে তা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ওপর প্রভাব ফেলত তার একটি বিবরণ নুরুল ইসলামের ২০১৭ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা থেকে পাওয়া যায় :
‘In mid-1950, there was already a great deal of unhappiness among the educated middle class about the underdevelopment of East Pakistan. This awareness was particularly acute among the economists who analysed the extent and nature of economic disparity and used to write and speak about it in their meetings and conferences. The first organized expresion of such reencutment took place in 1956 when they submitted a report at the conference of East Pakistan on the First Five Year plan of Pakistan. They enunciated that Pakistan was not one economy but consisted of two economies. They recommended a set of special measures to remove the economic disparity!’  যে প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে এখানে, তার প্রস্তুতির কাজে নুরুল ইসলামের সক্রিয় অবদান ছিল। এসব জ্ঞানগত উদ্যোগের ফল পরিণামে পাকিস্তান সরকার এক পর্যায়ে বাধ্য হয় স্থায়ীভাবে ‘Finance Commissions on ‘East-West Income Disparity’ এবং ‘Inter-regional Economic Policies and Resource Allocations’ গঠন করতে। ফাইন্যান্স কমিশনের বাইরেও যেসব অর্থনীতিবিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তারাও এই পূর্ব-পশ্চিম আঞ্চলিক বৈষম্য বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে নজর কাড়ে ১৯৬১ সালের জুন মাসে ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনার। হাবিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান প্রমুখ সেখানে প্রবন্ধ পাঠ করেন। হাবিবুর রহমান পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনে কর্মরত ছিলেন লাহোরে। সরকারি চাকরির ঝুঁকি নিয়েও তিনি পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের বিষয়ে তার অর্থনৈতিক বিচার-বিশ্নেষণ তুলে ধরেন। তার উত্থাপিত প্রবন্ধের নাম ছিল ‘Two Economies in Pakistan’- ১৯৬১ সালের ২রা মে-তে লেখা। এছাড়াও তিনি ১৯৬১ সালের ১ আগস্ট ‘The case for Separating the Economies of East and West Pakistan’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রস্তুত করেন। ১৯৬২ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম ‘Growth Models and Pakistan’। বাঙালি এই অর্থনীতিবিদ পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের ‘ইকোনমিক রিসার্চ’ সেকশনের এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে যুগপৎ দায়িত্বে ছিলেন। সরকারি চাকরিতে থেকেও ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে তার উপরোক্ত দুটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন এবং জেনারেল আইয়ুব খানের রোষের শিকার হন। এই পথিকৃৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদী অর্থনীতিবিদের জীবন ও কর্মের ওপরে আরও বড় পরিসরে কাজ হওয়া উচিত। সামগ্রিকভাবে ‘দুই অর্থনীতি’ সংক্রান্ত আলোচনায় যারা ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, আখলাকুর রহমান, মোশারফ হোসেন, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান প্রত্যেকের জীবন ও কর্মের ওপর বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা হওয়া দরকার।
যাহোক, কার্জন হলের সেই বিখ্যাত সেমিনারে গঠিত রেহমান সোবহানের প্রবন্ধটি পরদিন মিডিয়ার হেডলাইন হয়েছিল। এ সম্পর্কে রেহমান সোবহান এভাবে স্মৃতিচারণা করেছেন  ‘The next morning, I opened the Pakistan observer to read a fornt page headline, ‘Rehman Sobhan says Pakistan has two economies.’ সেদিন কাকতালীয়ভাবে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন আইয়ুব খান। কার্জন হলের সেমিনারের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন? উত্তরে জেনারেল আইয়ুব বললেন,‘Pakistan has only one economy.’ পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যকার আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদেরাও এক সময় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের নেতৃত্ব দানকারী মাহবুব উল হক তার ১৯৬৩ সালের ‘দ্য স্ট্র্যাটেজি অব ইকোনমিক প্ল্যানিং’ বইতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন পাকিস্তানে পূর্ব-পশ্চিম অংশের মধ্যকার আঞ্চলিক বৈষম্যের ওপর।
আগেই বলেছি, অর্থনীতিবিদরা ‘দুই অর্থনীতি’ শক্তিশালী যুক্তিজাল বিভিন্ন সেমিনারে-কনফারেন্সে তুলে ধরেছিলেন, যদিও জনসমক্ষে এর সপক্ষে প্রচার-আলোচনা-মতামত গঠন করেন রাজনীতিবিদরাই। দুই অঞ্চলের মধ্যে আয়-বৈষম্য ও সম্পদ বরাদ্দ বৈষম্য শুধু নয়, বৈষম্যের সাথে সাথে বঞ্চনার রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুভূতি তারা প্রকাশ করেন দেশবাসীর সামনে। Theory-র সাথে Praxis-র যুগল সম্মিলনের এটি একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উপরোক্ত বিষয়ে ১৯৬৪ সালের উপরোক্ত দলিলেই বলা হয়েছিল :
‘কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদসমূহে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রায় একচেটিয়া অধিকার ও প্রাধান্য বর্তমান। সরকার ব্যক্তিগত শিল্প ও শিল্পপতিকে সাহায্যের নীতি গ্রহণ করায় উক্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের সহানুভূতিতে ও পক্ষপাতিত্বে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যক্তিগত শিল্প ব্যাপকভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে। তদুপরি, পাবলিক সেক্টরেও সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়োজিত হইয়াছে। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য সৃষ্টি হইয়াছে। এই অবস্থার প্রতিরোধ ও প্রতিকারকল্পে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশ্যে শিল্প ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট (Earmarked) অর্থ পাবলিক সেক্টরে নিয়োজিত করিবার নীতি গ্রহণ করিতে হইবে। এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যে দুই অর্থনীতির ভিত্তিতে একটা দীর্ঘকালীন ও কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে।’
উপরে উদ্ৃব্দত স্তবকে অর্থনৈতিক চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তার প্রকাশ হয়েছে রাজনৈতিক ভাষায়, যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে ‘পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য’ সৃষ্টির কথা। এর থেকে যে এক সময়ে ৬ দফা বেরিয়ে আসবে, এতে আর বিস্ময় কী! শেখ মুজিবের অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভা এখানেই। একটি যুক্তিনিষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশ্নেষণ থেকে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের  ‘Logical Next-step’ হিসেবে ‘ছয় দফা’ কর্মসূচিকে বের করে আনতে পেরেছিলেন। ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো থেকে ছয় দফা কর্মসূচিতে উত্তরণ ছিল সেরকম প্রত্যাশিত একটি যৌক্তিক উত্তরণ। এই ছয় দফা কর্মসূচির দলিল রাজনীতিবিদেরই চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও শ্রমের ফসল। বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনৈতিক সহকর্মীরাই এই দলিল প্রস্তুত করেন। কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এতে মূল ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ মুজিব স্বয়ং। অর্থনীতিবিদরা এর নির্মাণে সরাসরিভাবে কোনো ভূমিকা রাখেননি। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম একাধিক আলাপচারিতায় এ ব্যাপারে আমাকে নিশ্চিত করেছেন। কার্যতও ৬ দফা কর্মসূচি সংবলিত মূল দলিলের- ‘আমাদের বাঁচার দাবি : ৬-দফা কর্মসূচি’র লেখক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং তারই পরিচিতিতে ও বয়ানে দলিলটি দেশ-জাতির কাছে উত্থাপিত হয়।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
– ‘To safeguard civil liberties, such as individual and collective freedom of belief, expression, association and organization.’
– ‘To secure the basic necessities of life of every citizen  of Pakistan namely, food, shelter, clothes, education, medical aid and the scope to earn an honest and honorable competence.’
_ ‘To relieve sufferings, propagate knowledge, promote equality and justice, banish oppression, eradicate corruptions, elevate moral and maternal standard of the people …’

এ তো গেল দলের ‘Aims and Objectives’-এর কথা| ‘Immediate Program-এর মধ্যে আবারও ধ্বনিত হলো ইতিপূর্বে শোনা আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো।

‘Abolition of the system of zamindary without compensation and equitable distribution of land among the tillers of the soil.’
– ‘To nationalise the key industries, essential  to the life of the nation; to establish industries on Govt. initiative and also to organise, expand and encourage cottage industries, etc.’
-’To introduce free and compulsory primary education; to reorganise secondary and higher education on modern and scientific basis.’
– ‘To provide a network of Govt. charitable dispensaries to afford free medical aid all over the country.’
– ‘To fix a just and fair apportionment of all revenues betwen the centre and the provinces.’

এত দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই। সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ও চেতনায় উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং সমতামুখী অর্থনীতি পরিচালনার অঙ্গীকার দানা বেঁধে ছিল। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘চারটি মূলস্তম্ভ’ হঠাৎ করে বা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে উদ্ভূত হয়নি। এর পেছনে আমি দীর্ঘ পূর্বাপরতা-দার্শনিক মিশেল ফুকোর ভাষায় genealogical trail-দেখতে পাই, যা শেখ মুজিব ও তার দীর্ঘকালের সহকর্মীদের মনে গভীর উপলব্ধি হয়ে মিশে ছিল। গণতন্ত্র যেমন চাই, তেমনি চাই সমতামুখীন আকাঙ্ক্ষার সমাজ ও অর্থনীতি- এটা তাদের চোখে ছিল একটি স্বাভাবিক দাবি। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোচনায় পরবর্তীতে আমরা দেখব যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এই স্বাভাবিক দাবিকে ঘিরে বাহাত্তরের গণপরিষদে (যার সদস্যগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে এসেছিলেন) এক ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছিল। সমাজতন্ত্রের স্তম্ভটিকে নিয়ে একটিও আপত্তি সেদিনের গণপরিষদে উচ্চারিত হয়নি। এই ব্যাপক ঐকমত্যের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে ১৯৫০-৬০ দশকের মূলধারার রাজনীতির দলিলপত্রের আদর্শ ও কর্মসূচিকে ঘনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্নেষণ করতে হবে। তারই একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি এই অধ্যায়ের বাদবাকি অংশে।
১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকায়। সেখানে গৃহীত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ বলা হচ্ছে :
‘১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবরের খাদ্য মিছিলের ওপর সরকার হামলা করিয়া মওলানা ভাসানী, জনাব শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বহু কর্মীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখিয়াও গণতন্ত্রের দুষমন লীগ সরকার আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারে নাই। …পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাক-ভারত মৈত্রী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সপক্ষে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন… আওয়ামী মুসলিম লীগও সেই আওয়াজকে কর্মসূচিভুক্ত করে। অতঃপর পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ, লাঙ্গল যার জমি তার ভিত্তিতে ভূমি বণ্টন, জাতীয়করণের ভিত্তিতে শিল্পায়ন, প্রত্যেকের কাজের ব্যবস্থা- প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, শিক্ষার নিরাপত্তার ভিত্তিতে এক কর্মসূচি গ্রহণ করে।’
অর্থাৎ দলের ‘সাংগঠনিক রিপোর্টেও’ ১৯৫৩ সালেই পুনরায় সামন্তবাদের অবসান ও ‘জাতীয়করণ’-এর ভিত্তিতে শিল্পায়নের দাবি জানানো হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বিদেশ নীতিতেও সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল সেদিন :
‘আওয়ামী লীগ ঘোষণা করিয়াছে কমনওয়েলথ-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে। তারা আরও দেখিয়াছে কৃষি ও শিল্পে তারা যে প্রগতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে উহা সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একান্ত পরিপন্থী। তাই আওয়ামী লীগ কমনওয়েলথ ত্যাগই নহে- সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্কহীন সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করিয়াছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এই নীতির অনুকূলে শান্তি আন্দোলনেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছে।’
দেখা যাচ্ছে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ধারায় সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধিতা এবং শান্তি আন্দোলনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু পান বিশ্ব শান্তি পুরস্কার। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে মুজিব বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে বিরল জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। যার নামে ওই পুরস্কার তার পুরো নাম ফ্রেদেরিক জুলিও কুরি। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি বিজ্ঞানী, ১৯৩৫ সালে তার স্ত্রী আইরিন জুলিও কুরির (দুইবার নোবেল বিজয়ী মেরি কুরির কন্যা) সাথে একত্রে ‘আর্টিফিসিয়াল রেডিও অ্যাক্টিভিটি’র ওপরে পথিকৃৎ গবেষণার জন্য রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্সের সক্রিয় নেতা ছিলেন জুলিও কুরি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। এহেন গুণী ও সাহসী মানুষের নামে প্রদত্ত শান্তি পদক লাভ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এখানে মূল বক্তব্য অন্যত্র। উপরোক্ত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ পরিস্কার ভাষায় লেখা হয়েছিল : আওয়ামী লীগ ‘বিশ্বধ্বংসী রণপাগল সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে’ এবং আজ নীতিগতভাবে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ রকম একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও কালক্রমে প্রধান ব্যক্তিত্ব মুজিব যে উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট লেখার দুই যুগ পরে জুলিও কুরি শান্তি পদক পাবেন তাকে যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখাটাই স্বাভাবিক। পাঠকদের মনে রাখতে বলব, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের’ উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপনকালে মুজিব ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে দলটির নামান্তর হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’। এই রূপান্তর ঘটে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর দলের বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে। দলের পক্ষ থেকে ‘বার্ষিক রিপোর্ট’ উত্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব স্বয়ং। সেই বার্ষিক রিপোর্টেও ‘প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িককরণের প্রসঙ্গ’ আলোচনার পাশাপাশি ইতিপূর্বে উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো পুনরায় তোলা হয়।
যেমন, ১৯৫৫ সালে দলের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয় যে, ‘সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থাই পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের মূল প্রতিবন্ধক। বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন ও কৃষককে জমির মালিকানা স্বত্ব দান করাই সামন্তবাদী শোষণ অবসানের প্রথম পদক্ষেপ।’ কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার ‘পূর্ববঙ্গ ভূমি দখল ও প্রজাস্বত্ব’ নামে যে আইনের জন্ম দিয়েছে তা আসলে ‘ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথাকে নতুন ধাঁচে ঢালাই করার’ পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘পাটনীতি’ সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, ‘পাট শিল্পকে জাতীয়করণ না করিলে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সহিত সমপর্যায়ের ভিত্তিতে বাণিজ্য না করিলে পাট শিল্পের ভবিষ্যৎই নেই। এই জন্যই যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচিতে পাট জাতীয়করণ করার ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল।’ এর পাশাপাশি ‘শিল্পনীতি’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তি খাতের কলকারখানা বিকাশের সমস্যা তুলে ধরা হয়। যেমন, বলা হয় যে, ‘দেশের শিল্পপতিগণ আজ এক বিরাট সংকটের সম্মুখীন। একদিকে বিদেশিদের সহিত প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে তারা পঙ্গু, আবার অন্যদিকে দেশের বাজারের অধিকাংশ ক্রেতার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদিত দ্রব্যের কেনাবেচা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।’ এবং সবশেষে- ‘সরকারের বন্ধ্যা শিল্পনীতি এই সমস্যা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ এ ছাড়াও ‘শ্রমনীতি’, ‘শিল্পনীতি’, ‘স্বাস্থ্য সমস্যা’, ‘বন্যা সমস্যা’, ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘বৈদেশিক নীতির’ আলোচনা স্থান পায় উপরোক্ত বার্ষিক রিপোর্টে। সামগ্রিকভাবে, এই দলিলে লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ইতিপূর্বে আলোচিত র‌্যাডিকেল খসড়া ম্যানিফেস্টোর তুলনায় ভাষায় ও অভিপ্রায়ে অপেক্ষাকৃত সংযত ও সতর্ক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে এই দলিলে। সেটা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব ও তৎকালীন সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছুটা রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে।
১৯৬৪ সালের ‘পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো’-তে এসে অবশ্য এই ভাষাভঙ্গী পুরোপুরি পাল্টে যায়। এই লড়াকু রূপান্তরে মূল নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব। ততদিনে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেছেন, মওলানা ভাসানী তারও বেশ কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ৬ বছর পেরিয়ে গেছে। সারাদেশে গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে এক বন্ধ্যা-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভক্ত ও স্থবির দশা থেকে আওয়ামী লীগকে ‘পুনরুজ্জীবিত’ করার কঠিন সংগ্রাম চালানোর দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্যই ১৯৬৪-এর খসড়া ম্যানিফেস্টোটি আমাদের আলোচনার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, ১৯৬৬-এর ৬ দফা প্রণয়নেরও আগে এই দলিলেই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের দিকনির্দেশনাগুলো প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে নির্দেশিত হয়েছে। এই যুক্তিটি বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
‘পুনরুজ্জীবিত’ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (যার কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালের ৬-৭ মার্চ) সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও দলটির পুনরুজ্জীবনের পেছনে মূল নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এসেছিল শেখ মুজিবের কাছ থেকেই। কমিটিতে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। এই পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সে সময়ে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল (‘এবডো’ তখনও বিদ্যমান- যা ১৯৬৬ পর্যন্ত বলবৎ ছিল)। এখানে বলা দরকার, আইয়ুবের জারি করা রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য ‘এবডো’ আইন পাস হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরই। এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের খসড়া ম্যানিফেস্টো তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়। আমি এখানে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি দৃষ্টি দেব- সমতামুখীন সমাজের আদর্শ কীভাবে এদেশে গড়ে উঠেছিল তা বোঝার তাগিদ থেকে। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ শুধু নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই বলা দরকার, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে এই ম্যানিফেস্টোতে ১৯৬৪ সালে যা বলা হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি হয়েছিল পরবর্তীতে বাহাত্তরের সংবিধানে ও বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২-৭৩ সালে গৃহীত ‘সমাজতান্ত্রিক’ চিন্তা-ভাবনার বীজ এই দলিলেই সুসংহতভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং তাতে মূল অবদান রেখেছিলেন রাজনীতিবিদরাই। ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আলোচনা করা এদেশের প্রাগ্রসর ও শীর্ষস্থানীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা পরবর্তীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের প্রদর্শিত রাজনৈতিক দর্শনের নির্দেশিত পথ ধরেই।

[ক্রমশ

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
– ‘To safeguard civil liberties, such as individual and collective freedom of belief, expression, association and organization.’
– ‘To secure the basic necessities of life of every citizen  of Pakistan namely, food, shelter, clothes, education, medical aid and the scope to earn an honest and honorable competence.’
_ ‘To relieve sufferings, propagate knowledge, promote equality and justice, banish oppression, eradicate corruptions, elevate moral and maternal standard of the people …’

এ তো গেল দলের ‘Aims and Objectives’-এর কথা| ‘Immediate Program-এর মধ্যে আবারও ধ্বনিত হলো ইতিপূর্বে শোনা আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো।

‘Abolition of the system of zamindary without compensation and equitable distribution of land among the tillers of the soil.’
– ‘To nationalise the key industries, essential  to the life of the nation; to establish industries on Govt. initiative and also to organise, expand and encourage cottage industries, etc.’
-’To introduce free and compulsory primary education; to reorganise secondary and higher education on modern and scientific basis.’
– ‘To provide a network of Govt. charitable dispensaries to afford free medical aid all over the country.’
– ‘To fix a just and fair apportionment of all revenues betwen the centre and the provinces.’

এত দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই। সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ও চেতনায় উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং সমতামুখী অর্থনীতি পরিচালনার অঙ্গীকার দানা বেঁধে ছিল। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘চারটি মূলস্তম্ভ’ হঠাৎ করে বা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে উদ্ভূত হয়নি। এর পেছনে আমি দীর্ঘ পূর্বাপরতা-দার্শনিক মিশেল ফুকোর ভাষায় genealogical trail-দেখতে পাই, যা শেখ মুজিব ও তার দীর্ঘকালের সহকর্মীদের মনে গভীর উপলব্ধি হয়ে মিশে ছিল। গণতন্ত্র যেমন চাই, তেমনি চাই সমতামুখীন আকাঙ্ক্ষার সমাজ ও অর্থনীতি- এটা তাদের চোখে ছিল একটি স্বাভাবিক দাবি। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোচনায় পরবর্তীতে আমরা দেখব যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এই স্বাভাবিক দাবিকে ঘিরে বাহাত্তরের গণপরিষদে (যার সদস্যগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে এসেছিলেন) এক ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছিল। সমাজতন্ত্রের স্তম্ভটিকে নিয়ে একটিও আপত্তি সেদিনের গণপরিষদে উচ্চারিত হয়নি। এই ব্যাপক ঐকমত্যের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে ১৯৫০-৬০ দশকের মূলধারার রাজনীতির দলিলপত্রের আদর্শ ও কর্মসূচিকে ঘনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্নেষণ করতে হবে। তারই একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি এই অধ্যায়ের বাদবাকি অংশে।
১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকায়। সেখানে গৃহীত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ বলা হচ্ছে :
‘১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবরের খাদ্য মিছিলের ওপর সরকার হামলা করিয়া মওলানা ভাসানী, জনাব শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বহু কর্মীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখিয়াও গণতন্ত্রের দুষমন লীগ সরকার আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারে নাই। …পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাক-ভারত মৈত্রী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সপক্ষে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন… আওয়ামী মুসলিম লীগও সেই আওয়াজকে কর্মসূচিভুক্ত করে। অতঃপর পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ, লাঙ্গল যার জমি তার ভিত্তিতে ভূমি বণ্টন, জাতীয়করণের ভিত্তিতে শিল্পায়ন, প্রত্যেকের কাজের ব্যবস্থা- প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, শিক্ষার নিরাপত্তার ভিত্তিতে এক কর্মসূচি গ্রহণ করে।’
অর্থাৎ দলের ‘সাংগঠনিক রিপোর্টেও’ ১৯৫৩ সালেই পুনরায় সামন্তবাদের অবসান ও ‘জাতীয়করণ’-এর ভিত্তিতে শিল্পায়নের দাবি জানানো হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বিদেশ নীতিতেও সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল সেদিন :
‘আওয়ামী লীগ ঘোষণা করিয়াছে কমনওয়েলথ-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে। তারা আরও দেখিয়াছে কৃষি ও শিল্পে তারা যে প্রগতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে উহা সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একান্ত পরিপন্থী। তাই আওয়ামী লীগ কমনওয়েলথ ত্যাগই নহে- সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্কহীন সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করিয়াছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এই নীতির অনুকূলে শান্তি আন্দোলনেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছে।’
দেখা যাচ্ছে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ধারায় সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধিতা এবং শান্তি আন্দোলনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু পান বিশ্ব শান্তি পুরস্কার। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে মুজিব বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে বিরল জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। যার নামে ওই পুরস্কার তার পুরো নাম ফ্রেদেরিক জুলিও কুরি। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি বিজ্ঞানী, ১৯৩৫ সালে তার স্ত্রী আইরিন জুলিও কুরির (দুইবার নোবেল বিজয়ী মেরি কুরির কন্যা) সাথে একত্রে ‘আর্টিফিসিয়াল রেডিও অ্যাক্টিভিটি’র ওপরে পথিকৃৎ গবেষণার জন্য রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্সের সক্রিয় নেতা ছিলেন জুলিও কুরি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। এহেন গুণী ও সাহসী মানুষের নামে প্রদত্ত শান্তি পদক লাভ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এখানে মূল বক্তব্য অন্যত্র। উপরোক্ত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ পরিস্কার ভাষায় লেখা হয়েছিল : আওয়ামী লীগ ‘বিশ্বধ্বংসী রণপাগল সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে’ এবং আজ নীতিগতভাবে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ রকম একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও কালক্রমে প্রধান ব্যক্তিত্ব মুজিব যে উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট লেখার দুই যুগ পরে জুলিও কুরি শান্তি পদক পাবেন তাকে যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখাটাই স্বাভাবিক। পাঠকদের মনে রাখতে বলব, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের’ উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপনকালে মুজিব ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে দলটির নামান্তর হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’। এই রূপান্তর ঘটে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর দলের বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে। দলের পক্ষ থেকে ‘বার্ষিক রিপোর্ট’ উত্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব স্বয়ং। সেই বার্ষিক রিপোর্টেও ‘প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িককরণের প্রসঙ্গ’ আলোচনার পাশাপাশি ইতিপূর্বে উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো পুনরায় তোলা হয়।
যেমন, ১৯৫৫ সালে দলের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয় যে, ‘সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থাই পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের মূল প্রতিবন্ধক। বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন ও কৃষককে জমির মালিকানা স্বত্ব দান করাই সামন্তবাদী শোষণ অবসানের প্রথম পদক্ষেপ।’ কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার ‘পূর্ববঙ্গ ভূমি দখল ও প্রজাস্বত্ব’ নামে যে আইনের জন্ম দিয়েছে তা আসলে ‘ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথাকে নতুন ধাঁচে ঢালাই করার’ পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘পাটনীতি’ সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, ‘পাট শিল্পকে জাতীয়করণ না করিলে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সহিত সমপর্যায়ের ভিত্তিতে বাণিজ্য না করিলে পাট শিল্পের ভবিষ্যৎই নেই। এই জন্যই যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচিতে পাট জাতীয়করণ করার ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল।’ এর পাশাপাশি ‘শিল্পনীতি’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তি খাতের কলকারখানা বিকাশের সমস্যা তুলে ধরা হয়। যেমন, বলা হয় যে, ‘দেশের শিল্পপতিগণ আজ এক বিরাট সংকটের সম্মুখীন। একদিকে বিদেশিদের সহিত প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে তারা পঙ্গু, আবার অন্যদিকে দেশের বাজারের অধিকাংশ ক্রেতার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদিত দ্রব্যের কেনাবেচা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।’ এবং সবশেষে- ‘সরকারের বন্ধ্যা শিল্পনীতি এই সমস্যা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ এ ছাড়াও ‘শ্রমনীতি’, ‘শিল্পনীতি’, ‘স্বাস্থ্য সমস্যা’, ‘বন্যা সমস্যা’, ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘বৈদেশিক নীতির’ আলোচনা স্থান পায় উপরোক্ত বার্ষিক রিপোর্টে। সামগ্রিকভাবে, এই দলিলে লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ইতিপূর্বে আলোচিত র‌্যাডিকেল খসড়া ম্যানিফেস্টোর তুলনায় ভাষায় ও অভিপ্রায়ে অপেক্ষাকৃত সংযত ও সতর্ক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে এই দলিলে। সেটা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব ও তৎকালীন সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছুটা রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে।
১৯৬৪ সালের ‘পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো’-তে এসে অবশ্য এই ভাষাভঙ্গী পুরোপুরি পাল্টে যায়। এই লড়াকু রূপান্তরে মূল নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব। ততদিনে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেছেন, মওলানা ভাসানী তারও বেশ কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ৬ বছর পেরিয়ে গেছে। সারাদেশে গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে এক বন্ধ্যা-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভক্ত ও স্থবির দশা থেকে আওয়ামী লীগকে ‘পুনরুজ্জীবিত’ করার কঠিন সংগ্রাম চালানোর দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্যই ১৯৬৪-এর খসড়া ম্যানিফেস্টোটি আমাদের আলোচনার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, ১৯৬৬-এর ৬ দফা প্রণয়নেরও আগে এই দলিলেই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের দিকনির্দেশনাগুলো প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে নির্দেশিত হয়েছে। এই যুক্তিটি বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
‘পুনরুজ্জীবিত’ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (যার কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালের ৬-৭ মার্চ) সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও দলটির পুনরুজ্জীবনের পেছনে মূল নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এসেছিল শেখ মুজিবের কাছ থেকেই। কমিটিতে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। এই পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সে সময়ে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল (‘এবডো’ তখনও বিদ্যমান- যা ১৯৬৬ পর্যন্ত বলবৎ ছিল)। এখানে বলা দরকার, আইয়ুবের জারি করা রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য ‘এবডো’ আইন পাস হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরই। এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের খসড়া ম্যানিফেস্টো তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়। আমি এখানে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি দৃষ্টি দেব- সমতামুখীন সমাজের আদর্শ কীভাবে এদেশে গড়ে উঠেছিল তা বোঝার তাগিদ থেকে। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ শুধু নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই বলা দরকার, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে এই ম্যানিফেস্টোতে ১৯৬৪ সালে যা বলা হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি হয়েছিল পরবর্তীতে বাহাত্তরের সংবিধানে ও বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২-৭৩ সালে গৃহীত ‘সমাজতান্ত্রিক’ চিন্তা-ভাবনার বীজ এই দলিলেই সুসংহতভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং তাতে মূল অবদান রেখেছিলেন রাজনীতিবিদরাই। ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আলোচনা করা এদেশের প্রাগ্রসর ও শীর্ষস্থানীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা পরবর্তীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের প্রদর্শিত রাজনৈতিক দর্শনের নির্দেশিত পথ ধরেই।

[ক্রমশ

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৩

পূর্বে প্রকাশিতের পর
যে চিঠির কথা মুজিব এখানে বলছেন তা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। মুজিব এখানে একাধিক চিঠির কথা বলছেন। বস্তুতই একাধিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল সোভিয়েতের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই। আমরা সচরাচর যে চিঠির কথা মনে রেখেছি, তা হলো ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিলে লেখা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির চিঠি। ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ করে লেখা এ চিঠিতে পদগর্নি সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘চরম দুর্ভাবনা’ (Great alarm) ব্যক্ত করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, ইয়াহিয়া জরুরি ভিত্তিতে এমন ব্যবস্থা নেবেন যাতে করে রক্তপাত ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা হবে : ‘Podgorny urged Yahya to take the most urgent measures to stop the bloodshad and repression against the population in East Pakistan and for turning to methods of a peaceful political settlement.’ এটা বলে পদগর্নি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তিনি পাকিস্তানের ব্যাপারে তার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কেবল বিশ্ব-মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে : ‘Podgorny added that he was guided by ”the genarally recognized humanitarian principles recorded in the universal declaration of human rights.’’

যেটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি সেটা হলো পদগর্নির চিঠির আগেও একটি প্রতিবাদ বার্তা গিয়েছিল রুশ প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছ থেকে। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরুর দুই দিন বাদেই করাচিতে অবস্থানরত সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের মাধ্যমে ইয়াহিয়ার কাছে একটি মৌখিক বার্তা পাঠান প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন। শ্রীনাথ রাঘবনের বই থেকে সেই মৌখিক বার্তার বিষয়বস্তুটি নিচে তুলে ধরছি :
‘Kosygin had stated that Òextreme measures taken by the military administration and continuation of bloodshed in East Pakistan will not solve the existing complicated problems.’’ He asked Yahya to Òtake immediate measures for the cessation of bloodshed in East Pakistan and for the resumption of negotiations.’’ পরবর্তীতে নয় মাস ধরে বাংলাদেশকে ঘিরে সোভিয়েতের উদ্যোগে অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় চলবে ভারত সরকারের সাথে- যার সম্পর্কে মুজিব পরবর্তীকালে বিস্তারিত জেনেছিলেন। স্থানাভাবে এখানে একটি উদাহরণের কেবল উল্লেখ করব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ‘নেপথ্যের পরামর্শদাতার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটা এ থেকে স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৮ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং গিয়েছেন মস্কোয় বাংলাদেশ বিষয়ে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পূর্ব বাংলার সংকটের সমাধানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো- এই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত ইস্যুতে কোসিগিন পরামর্শ দিলেন আপাতত দুটি ইস্যুকে আলাদা করে নিষ্পত্তির চেষ্টা হোক। কোসিগিন বললেন,‘Refugees must go back, all of them, every one of them’- এটার ওপরেই প্রথমে জোর দিতে হবে। তবে এর সাথে সাথে দ্বিতীয় ইস্যুর ওপরেও কাজ করতে হবে। যদিও পাকিস্তান বলবে যে, রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসলে তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ নাক গলানো হচ্ছে, তা সত্ত্বেও ভারতের উচিত হবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে সাহায্য করে যাওয়া’ :  Kosygin suggested, Òin strict confidence’’, that India could continue to support the Bengali guerrillas as well as the mass struggle. ‘Therfore, let us not bundle the two [issues] together, but give all possible help to the democratic forces … You are a politician, you know what I am implying.” স্পষ্টতই কোসিগিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি চান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বপ্রকারের সাহায্য দিতে- প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক রীতিসম্মত বাধ্যবাধতার চৌহদ্দি লঙ্ঘন না করেই। এ দেশে যারা মনে করেন এখনও যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের ভূমিকা কেবলমাত্র সীমিত ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের যুদ্ধের দিনগুলোতে ‘ভেটো প্রদানের’ মধ্যেই তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নয় মাসে সোভিয়েতের নানামুখী ভূমিকার গভীরতা ও মাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় ওয়াকিবহাল নন। এজন্যই বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সংগ্রামের মধ্যে এক আত্যন্তিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ মার্চ রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন : ‘আমাদের দেশের জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম করেছে, যে রক্ত দিয়েছে, যে ত্যাগ স্বীকার করেছে সে খবর তারা জানে এবং প্রত্যেক রাশিয়ার জনগণ তা জানে। রাশিয়ার জনসাধারণ আমার বাংলার জনসাধারণকে সেজন্য শ্রদ্ধা করে। এ জন্য শ্রদ্ধা করে যে রাশিয়াও রক্তের মাধ্যমে সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লবের মাধ্যমে তার দেশকে মুক্ত করেছিল। আমার সাড়ে সাত কোটি বাংলার মানুষও রক্ত দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে তার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্ত করেছে। সেজন্য তাদের সঙ্গে আমাদের অনেকটা নীতির মিল রয়েছে।’
এই ‘নীতির মিল’-এর থেকে কোনো কোনো বিদ্বজ্জন এ রকম ইঙ্গিত করার প্রয়াস পেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র বা বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত-ঘেঁষা নীতির রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রতিফলিত করেছে। খুঁটিয়ে দেখলে এ রকম সিদ্ধান্তের পেছনে তথ্য-উপাত্তের প্রমাণ মেলা ভার। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের Demonstration Effect-এর প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র-সম্পর্কিত ডিসকোর্সের ওপরে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্তর দশকের গোড়াকার সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রভাব নয়। লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের (এবং সাধারণভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ-নাজিবাদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত বিশ্ব সমাজতন্ত্রের) প্রভাব অনুভূত হয়েছিল গোটা পৃথিবীতেই। ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বের ঊপনিবেশবিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, বিশ্বজোড়া পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী শান্তির সংগ্রাম, ষাটের দশকের ছাত্র-যুবকদের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আন্দোলন, হো চি মিনের ভিয়েতনাম, গণচীনের উত্থান-পর্বে সোভিয়েতের সাহায্য, ফিদেল ও চে’র কিউবার আত্মপ্রকাশ, গ্যাগারিনের মহাকাশ-যাত্রা- সবকিছুর মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা এর উজ্জ্বল ভাবমূর্তির একটা প্রভাব পড়ে থাকবে এ দেশেও। বঙ্গবন্ধু এই প্রভাববলয়ের বাইরে ছিলেন না। স্ট্যালিনের ধারার ‘ব্যারাক সমাজতন্ত্রে’ মুজিবের কোনোদিনই আস্থা ছিল না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শোষণবিরোধী চরিত্রটি তার নজর কেড়েছিল সেই তরুণ বয়সেই। তারপর সময়ের সাথে সাথে এক নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদল তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ক্রমশ স্পষ্ট রূপ নিচ্ছিল। একে যেমন সুইডিশ মডেলের সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বলা চলে না, আবার সোভিয়েত কমান্ড ইকোনমির সমাজতন্ত্রও বলা ভুল হবে। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ভাবনায় evolutionary pattern বোঝার ক্ষেত্রে নিকটতম আকর-উৎস হচ্ছে ১৯৪৭-৭১ অবধি আওয়ামী লীগের ভেতরকার দলিলপত্র। সেদিকেই আমরা এতক্ষণ দৃষ্টি দেইনি, এবং সেদিকেই এখন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই আওয়ামী লীগের দলিলপত্রে সমাজতন্ত্রের শব্দাবলি ও ধারণার উদার ব্যবহার। এমনকি যখন আওয়ামী লীগ স্বনামে আত্মপ্রকাশ করেনি, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ রূপে সবে গঠিত হচ্ছে, সেই শুরুর পর্যায়ে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সমসাময়িক তরুণ বয়সী রাজনৈতিক কর্মীরা স্বপ্ন দেখেছেন সমাজতন্ত্রের। ১৯৪৯ সালের (২৩-২৪ জুন) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘খসড়া ম্যানিফেস্টো’ নানা দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সম্ভবত এটি রচনা করেন। রচনা যারই হোক না কেন, মুজিবের সমাজতন্ত্র ভাবনায় এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং খসড়াটিকে যৌথ-ভাবনার ফসল হিসেবেও দেখা যায়। স্মর্তব্য, তখন মুসলিম লীগের শাসন চলছে পূর্ব পাকিস্তানে; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পর পাকিস্তান বাহ্যত ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষিত। তরুণ মুজিব, শামসুল হক প্রমুখ দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীর প্রশ্রয়ে এই ইসলামী ডিসকোর্সের ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন ভাষা নির্মাণ করছেন। সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে এই প্রতিবাদের ভাষাভঙ্গির ভেতরেই। একগুচ্ছ উদাহরণ:
১. সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা : ‘ভারতে মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে … বিরুদ্ধ পরিবেশ বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবান্বিত ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহাদের ছিল না। … পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বা সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছে।’
২. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও বিশ্বশান্তি : ‘সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়গুলি, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোড়জোড় শুরু করিয়াছে। এই তোড়জোড় প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমরসজ্জা ও যুদ্ধঘাঁটি স্থাপনের মধ্য দিয়া। … পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচিত এই সাম্রাজ্যবাদী ও যুযুৎসু প্রচেষ্টাকে নিরুৎসাহ করা এবং ইহার বিরুদ্ধে দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পৃথিবীর সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ হইতে পৃথিবীকে মুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে অংশীদার হইতে হইবে এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের, সর্বব্যাপী বিজয় অভিযানকে জয়যুক্ত করিবার জন্য অন্যান্য জনতার গণতান্ত্রিক ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সর্বপ্রকার প্রগতিশীল ও জনকল্যাণকর আন্দোলন ও কর্মধারায় সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা করিতে হইবে।’
৩. ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ : (ক) ‘পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ তথা সর্বপ্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের বাহিরে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ হইবে।’ দেখা যাচ্ছে যে, লাহোর প্রস্তাবের ধারায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটকে নিয়ে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ গড়ার চিন্তা ছিল তরুণ মুজিব ও তার সহকর্মীদের; (খ) ‘পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে; (গ) ‘সাধারণতন্ত্র এবং জনসাধারণের পূর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত হইবে রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র।’
৪. ‘কাজ করার অধিকার’ : ‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র-নির্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।’ বলা দরকার, এই দলীয় কাজ করার অধিকারকে ‘মৌলিক অধিকারের’ মধ্যে ফেলা হয়েছিল। মৌলিক অধিকারের মধ্যে আরও ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, সর্বজনীন নির্বাচনী প্রথা, খাত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের জন্য বেকারবীমা ও পেনশন দান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং সহজলভ্য মাধ্যমিক শিক্ষা সকল নাগরিকদের জন্য), ধর্মীয় অধিকার, নারীর অধিকার (প্রত্যেক নারীকে পূর্ণতম সুযোগ ও সুবিধাদান; ‘প্রত্যেক চাকুরিয়া নারীকে সন্তান প্রসবের পূর্বে ও পরে পূর্ণ বেতনে বিদায় মঞ্জুর’)। ‘ধনসম্পদের অধিকার’; ইত্যাদি।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৩

পূর্বে প্রকাশিতের পর
যে চিঠির কথা মুজিব এখানে বলছেন তা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। মুজিব এখানে একাধিক চিঠির কথা বলছেন। বস্তুতই একাধিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল সোভিয়েতের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই। আমরা সচরাচর যে চিঠির কথা মনে রেখেছি, তা হলো ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিলে লেখা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির চিঠি। ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ করে লেখা এ চিঠিতে পদগর্নি সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘চরম দুর্ভাবনা’ (Great alarm) ব্যক্ত করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, ইয়াহিয়া জরুরি ভিত্তিতে এমন ব্যবস্থা নেবেন যাতে করে রক্তপাত ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা হবে : ‘Podgorny urged Yahya to take the most urgent measures to stop the bloodshad and repression against the population in East Pakistan and for turning to methods of a peaceful political settlement.’ এটা বলে পদগর্নি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তিনি পাকিস্তানের ব্যাপারে তার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কেবল বিশ্ব-মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে : ‘Podgorny added that he was guided by ”the genarally recognized humanitarian principles recorded in the universal declaration of human rights.’’

যেটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি সেটা হলো পদগর্নির চিঠির আগেও একটি প্রতিবাদ বার্তা গিয়েছিল রুশ প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছ থেকে। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরুর দুই দিন বাদেই করাচিতে অবস্থানরত সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের মাধ্যমে ইয়াহিয়ার কাছে একটি মৌখিক বার্তা পাঠান প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন। শ্রীনাথ রাঘবনের বই থেকে সেই মৌখিক বার্তার বিষয়বস্তুটি নিচে তুলে ধরছি :
‘Kosygin had stated that Òextreme measures taken by the military administration and continuation of bloodshed in East Pakistan will not solve the existing complicated problems.’’ He asked Yahya to Òtake immediate measures for the cessation of bloodshed in East Pakistan and for the resumption of negotiations.’’ পরবর্তীতে নয় মাস ধরে বাংলাদেশকে ঘিরে সোভিয়েতের উদ্যোগে অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় চলবে ভারত সরকারের সাথে- যার সম্পর্কে মুজিব পরবর্তীকালে বিস্তারিত জেনেছিলেন। স্থানাভাবে এখানে একটি উদাহরণের কেবল উল্লেখ করব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ‘নেপথ্যের পরামর্শদাতার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটা এ থেকে স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৮ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং গিয়েছেন মস্কোয় বাংলাদেশ বিষয়ে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পূর্ব বাংলার সংকটের সমাধানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো- এই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত ইস্যুতে কোসিগিন পরামর্শ দিলেন আপাতত দুটি ইস্যুকে আলাদা করে নিষ্পত্তির চেষ্টা হোক। কোসিগিন বললেন,‘Refugees must go back, all of them, every one of them’- এটার ওপরেই প্রথমে জোর দিতে হবে। তবে এর সাথে সাথে দ্বিতীয় ইস্যুর ওপরেও কাজ করতে হবে। যদিও পাকিস্তান বলবে যে, রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসলে তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ নাক গলানো হচ্ছে, তা সত্ত্বেও ভারতের উচিত হবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে সাহায্য করে যাওয়া’ :  Kosygin suggested, Òin strict confidence’’, that India could continue to support the Bengali guerrillas as well as the mass struggle. ‘Therfore, let us not bundle the two [issues] together, but give all possible help to the democratic forces … You are a politician, you know what I am implying.” স্পষ্টতই কোসিগিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি চান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বপ্রকারের সাহায্য দিতে- প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক রীতিসম্মত বাধ্যবাধতার চৌহদ্দি লঙ্ঘন না করেই। এ দেশে যারা মনে করেন এখনও যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের ভূমিকা কেবলমাত্র সীমিত ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের যুদ্ধের দিনগুলোতে ‘ভেটো প্রদানের’ মধ্যেই তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নয় মাসে সোভিয়েতের নানামুখী ভূমিকার গভীরতা ও মাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় ওয়াকিবহাল নন। এজন্যই বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সংগ্রামের মধ্যে এক আত্যন্তিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ মার্চ রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন : ‘আমাদের দেশের জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম করেছে, যে রক্ত দিয়েছে, যে ত্যাগ স্বীকার করেছে সে খবর তারা জানে এবং প্রত্যেক রাশিয়ার জনগণ তা জানে। রাশিয়ার জনসাধারণ আমার বাংলার জনসাধারণকে সেজন্য শ্রদ্ধা করে। এ জন্য শ্রদ্ধা করে যে রাশিয়াও রক্তের মাধ্যমে সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লবের মাধ্যমে তার দেশকে মুক্ত করেছিল। আমার সাড়ে সাত কোটি বাংলার মানুষও রক্ত দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে তার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্ত করেছে। সেজন্য তাদের সঙ্গে আমাদের অনেকটা নীতির মিল রয়েছে।’
এই ‘নীতির মিল’-এর থেকে কোনো কোনো বিদ্বজ্জন এ রকম ইঙ্গিত করার প্রয়াস পেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র বা বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত-ঘেঁষা নীতির রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রতিফলিত করেছে। খুঁটিয়ে দেখলে এ রকম সিদ্ধান্তের পেছনে তথ্য-উপাত্তের প্রমাণ মেলা ভার। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের Demonstration Effect-এর প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র-সম্পর্কিত ডিসকোর্সের ওপরে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্তর দশকের গোড়াকার সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রভাব নয়। লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের (এবং সাধারণভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ-নাজিবাদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত বিশ্ব সমাজতন্ত্রের) প্রভাব অনুভূত হয়েছিল গোটা পৃথিবীতেই। ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বের ঊপনিবেশবিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, বিশ্বজোড়া পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী শান্তির সংগ্রাম, ষাটের দশকের ছাত্র-যুবকদের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আন্দোলন, হো চি মিনের ভিয়েতনাম, গণচীনের উত্থান-পর্বে সোভিয়েতের সাহায্য, ফিদেল ও চে’র কিউবার আত্মপ্রকাশ, গ্যাগারিনের মহাকাশ-যাত্রা- সবকিছুর মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা এর উজ্জ্বল ভাবমূর্তির একটা প্রভাব পড়ে থাকবে এ দেশেও। বঙ্গবন্ধু এই প্রভাববলয়ের বাইরে ছিলেন না। স্ট্যালিনের ধারার ‘ব্যারাক সমাজতন্ত্রে’ মুজিবের কোনোদিনই আস্থা ছিল না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শোষণবিরোধী চরিত্রটি তার নজর কেড়েছিল সেই তরুণ বয়সেই। তারপর সময়ের সাথে সাথে এক নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদল তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ক্রমশ স্পষ্ট রূপ নিচ্ছিল। একে যেমন সুইডিশ মডেলের সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বলা চলে না, আবার সোভিয়েত কমান্ড ইকোনমির সমাজতন্ত্রও বলা ভুল হবে। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ভাবনায় evolutionary pattern বোঝার ক্ষেত্রে নিকটতম আকর-উৎস হচ্ছে ১৯৪৭-৭১ অবধি আওয়ামী লীগের ভেতরকার দলিলপত্র। সেদিকেই আমরা এতক্ষণ দৃষ্টি দেইনি, এবং সেদিকেই এখন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই আওয়ামী লীগের দলিলপত্রে সমাজতন্ত্রের শব্দাবলি ও ধারণার উদার ব্যবহার। এমনকি যখন আওয়ামী লীগ স্বনামে আত্মপ্রকাশ করেনি, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ রূপে সবে গঠিত হচ্ছে, সেই শুরুর পর্যায়ে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সমসাময়িক তরুণ বয়সী রাজনৈতিক কর্মীরা স্বপ্ন দেখেছেন সমাজতন্ত্রের। ১৯৪৯ সালের (২৩-২৪ জুন) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘খসড়া ম্যানিফেস্টো’ নানা দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সম্ভবত এটি রচনা করেন। রচনা যারই হোক না কেন, মুজিবের সমাজতন্ত্র ভাবনায় এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং খসড়াটিকে যৌথ-ভাবনার ফসল হিসেবেও দেখা যায়। স্মর্তব্য, তখন মুসলিম লীগের শাসন চলছে পূর্ব পাকিস্তানে; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পর পাকিস্তান বাহ্যত ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষিত। তরুণ মুজিব, শামসুল হক প্রমুখ দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীর প্রশ্রয়ে এই ইসলামী ডিসকোর্সের ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন ভাষা নির্মাণ করছেন। সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে এই প্রতিবাদের ভাষাভঙ্গির ভেতরেই। একগুচ্ছ উদাহরণ:
১. সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা : ‘ভারতে মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে … বিরুদ্ধ পরিবেশ বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবান্বিত ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহাদের ছিল না। … পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বা সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছে।’
২. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও বিশ্বশান্তি : ‘সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়গুলি, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোড়জোড় শুরু করিয়াছে। এই তোড়জোড় প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমরসজ্জা ও যুদ্ধঘাঁটি স্থাপনের মধ্য দিয়া। … পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচিত এই সাম্রাজ্যবাদী ও যুযুৎসু প্রচেষ্টাকে নিরুৎসাহ করা এবং ইহার বিরুদ্ধে দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পৃথিবীর সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ হইতে পৃথিবীকে মুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে অংশীদার হইতে হইবে এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের, সর্বব্যাপী বিজয় অভিযানকে জয়যুক্ত করিবার জন্য অন্যান্য জনতার গণতান্ত্রিক ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সর্বপ্রকার প্রগতিশীল ও জনকল্যাণকর আন্দোলন ও কর্মধারায় সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা করিতে হইবে।’
৩. ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ : (ক) ‘পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ তথা সর্বপ্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের বাহিরে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ হইবে।’ দেখা যাচ্ছে যে, লাহোর প্রস্তাবের ধারায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটকে নিয়ে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ গড়ার চিন্তা ছিল তরুণ মুজিব ও তার সহকর্মীদের; (খ) ‘পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে; (গ) ‘সাধারণতন্ত্র এবং জনসাধারণের পূর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত হইবে রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র।’
৪. ‘কাজ করার অধিকার’ : ‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র-নির্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।’ বলা দরকার, এই দলীয় কাজ করার অধিকারকে ‘মৌলিক অধিকারের’ মধ্যে ফেলা হয়েছিল। মৌলিক অধিকারের মধ্যে আরও ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, সর্বজনীন নির্বাচনী প্রথা, খাত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের জন্য বেকারবীমা ও পেনশন দান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং সহজলভ্য মাধ্যমিক শিক্ষা সকল নাগরিকদের জন্য), ধর্মীয় অধিকার, নারীর অধিকার (প্রত্যেক নারীকে পূর্ণতম সুযোগ ও সুবিধাদান; ‘প্রত্যেক চাকুরিয়া নারীকে সন্তান প্রসবের পূর্বে ও পরে পূর্ণ বেতনে বিদায় মঞ্জুর’)। ‘ধনসম্পদের অধিকার’; ইত্যাদি।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬২
 পূর্বে প্রকাশিতের পর
দেখা যাচ্ছে উদারনৈতিক সমাজতন্ত্রী কাজী আবদুল ওদুদ আজ থেকে একশ’ বছর আগে সাধারণ জনমানুষের উত্থানকে ঠিকই চিনে নিতে পেরেছিলেন। আবার সেই উত্থানের সাথে জড়িত সামাজিক সম্ভাবনার পাশাপাশি ‘অসহিষ্ণুতা’ ও ‘অতিরিক্ততা’ প্রভৃতি সমস্যাকেও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, ওদুদ এখানে ‘বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক’ জাগরণের কথা বলছেন না। ওই প্রবন্ধেই ওদুদ লিখেছেন, ‘গণশক্তির জাগরণের ফলে অনেক কালের বুভুক্ষু দীন-পতিতের দলের একটা বিপুল ভোজের আয়োজন হইয়াছে। ভারতের জনগণও সেই উৎসবকে অবহেলা করিতে পারিবে না। … ভারতে কেন সমস্ত দুনিয়ার মধ্যাহ্ন দিনের মত গণশক্তির সুপ্রকাশ ও সেই গণশক্তির মূর্ত স্বরূপ গণতন্ত্রের অবাধ কর্ম চেষ্টাই চিরাচরিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইবে।’
তার চয়নকৃত ‘গণশক্তির’ ধারণাটি প্রকারান্তরে পরবর্তী কালের বঙ্গবন্ধুর ‘শোষিতের গণতন্ত্রের’ দিকেই নির্দেশ করছে। বঙ্গবন্ধুর মতোই ওদুদের চিন্তাতেও গণতন্ত্রকে গণশক্তির জাগরণের সমার্থক ধারণা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে :
‘ … গণশক্তি ও গণতন্ত্রের ভেতর দিয়া বিশ্বমানব সম্বন্ধে যে একটা সত্যের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে, তাহা মানুষের সাধারণ বিত্তস্বরূপ অতঃপর সকল দেশের মানুষের পক্ষেই সুসঙ্গত হইবে; তবু … এই গণতন্ত্রের সত্যটি উপলব্ধি করিবার জন্যও তাহাদিগকে স্ব স্ব চিরন্তন ধারা অবলম্বন করিয়া অগ্রসর হইতে হইবে। … আমরা বুঝিয়া দেখিয়াছি যে, গণতন্ত্রের গোড়ার কথা হইতেছে আপামর সাধারণের উন্নত মানুষের সুখ-সুবিধার ভাগী হইবার আকাঙ্ক্ষা ও সেই আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তির জন্য রাজশক্তির পরিচালনা। … এক কথায় যে গণতন্ত্র চিরকালের মানুষের প্রাণের কামনা দিয়া গড়া, শুধু আধুনিক ইউরোপে উহা কতকটা মূর্ত হইয়া উঠিয়া আপন সৌন্দর্য ঐশ্বর্য ঘোষণা করিতেছে, ভারতের জনগণকেও সেই গণতন্ত্রের সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার অমৃত ফল ভোগ করিয়া ইহকালের জীবনের এক অভিনব স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে।’
এখানে ওদুদ ফরাসি বিপ্লবের ‘সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার’ প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব যে বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় যুগপৎ ফরাসি বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লব গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। এই সংবিধানে লিবারেল ডেমোক্রেসি ও সমাজতন্ত্র তথা সমতামুখিন সমাজের আকাঙ্ক্ষার যুগপৎ প্রতিফলন ঘটেছিল। এই সংবিধানের ভেতরে গণতন্ত্রের সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার পাশাপাশি মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকারের প্রথম প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। এক্ষণে আমরা আমাদের বয়ানের মূল আখ্যানভাগে প্রবেশ করছি।
৬. বাহাত্তরের সংবিধানের ‘সমাজতন্ত্র’:প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র
১৯৪৯ সালে বিখ্যাত বামপন্থি সাময়িকী ‘মান্থলি লেবার রিভিউ’ প্রথম প্রকাশিত হয়। এর প্রথম খণ্ডের প্রথম সংখ্যার লেখাটি লিখেছিলেন কোনো প্রথাগত সমাজতন্ত্রী নন- স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইন। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে, আমার ধারণা, এর দ্বিতীয় লেখাটি লিখতেন। আইনস্টাইনের লেখাটির শিরোনাম ছিল- ‘হোয়াই সোশ্যালিজম?’ কেন সমাজতন্ত্র চাই। তার কারণগুলো আইনস্টাইন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। আজকের দিনে হলে অবশ্য বিতর্ক ঘনীভূত হতো সমাজতন্ত্র কী- হোয়াট ইজ সোশ্যালিজম- এই প্রশ্নকে ঘিরেই। অমর্ত্য সেন, এলান বাদিউ, জন রোমার, প্রণব বর্ধন, বা আমাদের দেশে আজিজুর রহমান খান, নজরুল ইসলাম সমাজতন্ত্র কী বা কী নয়, এ নিয়ে হয়তো বিতর্কে প্রবেশ করতেন। কিন্তু এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে হচ্ছে মানুষের এক সরল সাধারণ নিত্যকালের তাগিদ- ‘শোষণমুক্ত সমাজের’ স্বপ্ন দেখা। সমাজতন্ত্র শব্দটি সেই সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। সমাজতন্ত্রের ধারণা, কর্মসূচি, অর্থনৈতিক কলাকৌশল, রাজনৈতিক প্রেরণা যুগে যুগে বদল হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তার আকাঙ্ক্ষার মতো বড় এবং এই অর্থে সমাজতন্ত্রের চেয়ে সমতার আকাঙ্ক্ষা প্রাচীনতর মৌলিক তাগিদ। এর জন্য দীর্ঘকালের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া কোনো বড় কিছু ব্যাপার নয় মানবজাতির জন্যে। বারবার একথাই বলা হয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে। তিনি ও তার সহকর্মীরা যখন সংবিধানের ওপরে বিতর্ক করেছেন, বারবার তারা শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন ও সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত ও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু শুধু কথার সমষ্টি নয়, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাগুলো পরিশীলিত হয়ে শুধু অভিপ্রায়ে সীমিত না থেকে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারায় সংযোজিত হয়েছে। দেশের আইনকানুন, আর্থিক নীতিমালা, সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্যোগ সবকিছু বিচার করার আইনি মানদণ্ড দাঁড় করায় সে দেশের সংবিধান। কোনটা মূল আদর্শ ((Fundamental Principles),), কোনটা মূলনীতি (Fundamental Policy), কোনটা ধারার মধ্যে, কোনটি উপধারা হিসেবে সংযোজিত হবে তা নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা, তর্কবিতর্কের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। আমি নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা-উপধারা ও এ-সম্পর্কিত তর্কবিতর্ক সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
এটুকু লিখেই আমাকে থামতে হলো। সংবিধানের সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের আলোচনায় প্রবেশের আগে একটি জরুরি বিষয় মীমাংসা করা দরকার। বঙ্গবন্ধুর সমতামুখী আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে বুঝতে চেয়ে আমি ফিরে তাকিয়েছি পূর্বসূরি বাঙালি চিন্তকদের সাম্যচিন্তার প্রতি। প্রথাগতভাবে কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী না হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের চিন্তায় সাম্যের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল এটা দেখানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা সপ্রমাণিত করা যে, বাংলায় পূর্বাপর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। যাদের কথা উলেল্গখ করেছি, তারা ছাড়াও আরও অনেকে এখানে আলোচনার দাবী রাখেন। মুজিব এই ঐতিহ্যের আলো-হাওয়াতেই বেড়ে উঠেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘সমাজতন্ত্র’ স্তম্ভটির সংযোজন ছিল সেই ঐতিহ্যগত সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই যৌক্তিক পরিণতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণার আরও একটি ‘নিকট-উৎস’ ছিল। আওয়ামী লীগের মতাদর্শ ও রাজনীতির বিবর্তনের ধারাতেই সেটি খুঁজে পাওয়া যায়। বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্রকে অধ্যাপক নুরল ইসলাম (একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও এ দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান) তার এক লেখায় বলেছিলেন-‘Evolutionary Socialism’। কথাটা দ্ব্যর্থবোধক। এক অর্থে এটি   ‘Revolutionary Socialism’-এর বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে অবিপ্লবী ‘বিবর্তনমূলক’ মতবাদ হিসেবে শনাক্ত করার চেষ্টা। অন্য অর্থে, এটি সমাজতন্ত্রের গোটা ধারণাকেই ‘evolution’ বা বিবর্তনের ধারায় দেখার দিকে তাগিদ দেয়- তা তার রূপ কখনও ‘বিপ্লবী’ কখনও ‘অবিপ্লবী’ যে চেহারাই নিক না কেন। বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে সমাজতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এটা কোনো বিস্ময়কর বা কাকতালীয় ব্যাপার ছিল না। আমি অবশ্য কোনো কোনো বিদ্বজ্জনকে বলতে শুনেছি যে বাহাত্তরের সমাজতন্ত্র আসলে হচ্ছে সত্তর দশকের গোড়াকার জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রভাবের (যুগের হাওয়ার) ফসল। এটি কোনো ভাবাদর্শগত অবস্থানের যৌক্তিক পরিণতি নয়। এ ক্ষেত্রে সে সময়ের নানা ঘটনাকে তারা চিহ্নিত করে থাকেন। যেমন, ১৯৭২-র আগেই ইন্দিরা কংগ্রেস নেহরু-যুগের সমাজতন্ত্রের তুলনায় আরও একটু ‘বাম দিকে’ ঝুঁকে পড়তে শুরু করেছিল। উদাহরণত ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বিদেশি ব্যাংক-বীমাসমূহ জাতীয়করণ করে নেয় এবং দেশের ভেতর মনোপলি পুঁজির ক্ষমতাও অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ‘গরিবী হঠাও’ সে সময়কার জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে ওঠে। ইন্দিরার ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতাদের মধ্যে পিএন হাকসার ও ডিপি ধর বামঝোঁকের আমলা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন এবং এদেরকে সাধারণভাবে ‘মস্কোপন্থি’ হিসেবে ভাবা হতো। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সোভিয়েতের সক্রিয় সমর্থন, ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে যখন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ চলছে, তখন যুদ্ধবিরতি আনার পাক-মার্কিন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সোভিয়েতের তিন-তিনবার ভেটো প্রদান ঢাকার পতনকে কূটনৈতিক-সামরিক দিক থেকে অনিবার্য করে তোলে। রুদ্ধশ্বাস ১৩-১৪-১৫ ডিসেম্বরের দিনগুলিতে মিত্রবাহিনী যখন ঢাকা অভিমুখে দ্রুতগতিতে অগ্র্রসর হচ্ছে, তখনও ইয়াহিয়া ও নিয়াজী আশা করছিলেন শেষ মুহূর্তের যুদ্ধবিরতির। কিন্তু সোভিয়েতের ভেটো তা হতে দেয়নি। এমনকি অপেক্ষাকৃত নিউট্রাল অবস্থানে থাকা ব্রিটেন ও ফ্রান্স ১৫ ডিসেম্বর- অর্থাৎ চূড়ান্ত বিজয়ের এক দিন আগে- একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের খসড়া আনে, যা গৃহীত হলে বাংলাদেশের বিজয়-অর্জন অনেকাংশে বিঘ্নিত হতে পারত। ব্রিটেন-ফ্রান্সের আনা প্রস্তাব ‘Called for an immediate ceasefire and withdrawal of forces, and for ‘the urgent conclusion of a comprehensive political settlement in accordance with the wishes of the people concerned as declared through their elected and acknowledged representatives.’ এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল যে ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের এই উদ্যোগ রাও ফরমান আলীর প্রস্তাবের চেয়েও নিকৃষ্ট (‘more retrograde than even Farman Ali proposal’) যেখানে অস্পষ্ট ভাষায় Political settlement-র কথা বলা হয়েছে :Even the ‘barest anatomy of the political settlement’ was unspecificd. ইন্দিরা গান্ধী সেই রাতেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হীথ এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পম্পিদুর কাছে জরুরি তারবার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করেন যাতে করে এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব জাতিসংঘে না তোলা হয়। ঢাকার পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোতে সোভিয়েতের দৃঢ় ভূমিকা বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘গ্যারান্টি’ হিসেবে কাজ করেছিল। শ্রীনাথ রাঘবন তার গুরুত্বপূর্ণ বই ‘1971 : A Global History of the Creation of Bangladesh’ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনেক অজানা তথ্য পরিবেশন করেছেন। ‘নিরপেক্ষ’ ইতিহাসবিদের অবস্থান নিতে গিয়ে অনেক সময় তিনি মূলধারাকে উপধারায় পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তারপরও সেসব সন্নিবেশিত তথ্যের মাঝে ডিসেম্বরের যুদ্ধরত দিনগুলোতে সোভিয়েতের সুদৃঢ় ও প্রায় নির্ধারক ভূমিকা সবকিছু ছাপিয়ে ফুটে ওঠে। বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে এ নিয়ে স্পষ্ট করে বলেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের এক ভাষণে : ‘আমি স্মরণ করি রাশিয়ার জনসাধারণ ও সরকারকে। যারা নিশ্চিতভাবে আমাদের সাহায্য করেছে। তারা প্রকাশ্যে আমাদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন এবং বাংলাদেশে ধ্বংসলীলা করার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছেন। … এমনকি জাতিসংঘে রাশিয়া তিনটি ভেটো দিয়েছিল, তা না হলে সেখানে যে ষড়যন্ত্র চলছিল, তাতে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতো তা বলতে পারি না।’ এর কিছুদিন আগে ৯ এপ্রিল ১৯৭২ ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু একইভাবে সোভিয়েতের উদ্যোগী ভূমিকার কথা স্মরণ করেন :
‘সোভিয়েতের জনসাধারণ ও সরকার শুধু যে আমাদের সাহায্য করেছিলেন তাই নয়। যখন সংগ্রাম করতেছিল বাংলাদেশের জনগণ, যখন আমাকে এখান থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় মেশিনগান দিয়ে, তখন প্রথম দেশ, প্রথম দেশের প্রথম নেতা হিসেবে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করে ইয়াহিয়া খানের কাছে অনেক চিঠি পাঠান এবং মানুষ খুন বন্ধ করার আবেদনও করেন।’

[ক্রমশ]