সাম্প্রতিকের তর্ক ও বিতর্ক

পর্ব ::৪৭

১. তর্কটা কী নিয়ে?

এই লেখাটি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের পিছু-হটার উদ্বেগজনক পরিণতি নিয়ে। এই প্রতিপাদ্যটি কিছু তাত্ত্বিক মীমাংসা, কিছু সাম্প্রতিক বইয়ের আলোচনা, কিছু কেস-স্টাডি, কিছু পরিসংখ্যানগত তথ্য-উপাত্ত ও কিছু অনুমান দিয়ে নানাভাবে বলার চেষ্টা হয়েছে (বলা দরকার এ লেখাটির একটি আদি রূপ এর আগে ‘সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশ হয়ে ছিল)। অবশ্য গণতন্ত্রের পিছু-হটাকে প্রমাণ করার জন্য আরও তত্ত্ব ও তথ্যের কাঠখড় পোড়াতে হবে। সেটা স্বীকার করে নিয়েই নির্দিষ্ট করে তিনটি কথা বলতে চেয়েছি।

প্রথমত, গণতন্ত্র ‘পিছু হটছে’ (যাকে Democratic Recession বা Backsliding বলেছেন স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ল্যারি ডায়মন্ড)। এই পিছু-হটা কেবল নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়, বা নির্দিষ্ট কিছু মাথাপিছু আয়ের গ্রুপে সীমিত নেই। এটা যেমন ঘটছে ‘প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে’ (যেখানে অনেক দশক ধরে গণতন্ত্র বিরাজ করছে, যেমন ইউরোপ-আমেরিকার ‘উন্নত জীবনযাত্রার’ দেশগুলোয়), তেমনি ঘটছে ‘দুর্বল গণতন্ত্রে’ (যেখানে দুই বা বড় জোর তিন দশক ধরে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, যেমন অধিকাংশ ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোয়)। প্রতিষ্ঠিত ও দুর্বল গণতন্ত্রের মাঝামাঝি স্তরে রয়েছে পূর্ব ইউরোপের তুলনামূলকভাবে (তৃতীয় বিশ্বের তুলনায়) বেশি শিক্ষা-দীক্ষার কিন্তু মাঝারি-আয়ের দেশগুলো। যারা স্ট্যালিনীয় সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় বিকশিত হতে শুরু করেছে। এসব দেশের সদ্য-বিকশিত গণতন্ত্র এর মধ্যে পিছু হটতে শুরু করেছে কম-বেশি। এই তিন ধারার দেশই পুঁজিবাদী অর্থনীতির পথে রয়েছে, যদিও পুঁজিবাদের চর্চায় এরা নানা স্তরে অবস্থান করছে। এর অর্থ হলো যে, পুঁজিবাদ সত্ত্বেও গণতন্ত্র পিছু হটছে। বুর্জোয়াদের শাসনে বুর্জোয়া গণতন্ত্র আর নিরাপদে থাকছে না।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের পিছু-হটা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হলেও বিভিন্ন দেশে পিছু-হটার কারণ একরূপ নয়। তবে উপসর্গ বা কারণের বিভিন্নতা সত্ত্বেও অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, পিছু-হটার পেছনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়া বা কমার কোনো যোগসূত্র নেই। গত দুই দশক ধরেই পিছু-হটার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল নানা দেশে। উঁচু আয়, নিচু আয়, দ্রুত প্রবৃদ্ধি, শ্নথ প্রবৃদ্ধি- সব রকমের ‘কনটেক্সটে’ গণতন্ত্রের পিছু-হটা দেখতে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, বলতে চাচ্ছি যে, এখানে অর্থনৈতিক ‘ডিটারমিনিজমের’ কোনো সুযোগ নেই। ভাবাদর্শ বা মতাদর্শ, ‘পাওয়ার অব আইডিয়া’; গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া; আত্মসত্তার রাজনীতি; রাষ্ট্রের কোন কোন দিকের ক্রম-বিলীয়মান ভূমিকা, আবার কোন কোন দিকের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা; এক কথায়, রাষ্ট্র ও পুরসমাজের (State-Civil Society) মধ্যকার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, অনেক কিছুই হয়তো এই গণতন্ত্রের পিছু-হটার ওপরে প্রভাব রাখছে। আমি এ লেখায় সেসব সম্ভাব্য প্রভাবকের তেমন কোনো বিশ্নেষণ করতে যাইনি। আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি যে, খরঢ়ংবঃ-কথিত আশাবাদের কোনো সুযোগ নেই এখানে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় নিম্ন-আয়ের থেকে মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক উন্নয়ন হবে তথা সবলতর গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটবে, এ রকম যুক্তির পেছনে কোনো তথ্যগত ভিত্তি সেভাবে নেই। উন্নয়নের ধারায় একসময়ে অপেক্ষাকৃত সুশাসনের স্তরে (বা সুশাসিত রাষ্ট্রের দিকে) যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অনিবার্যভাবে আরও গণতন্ত্রের দিকে উত্তরণ সম্ভব, সে রকম কোনো প্রবণতা এখানে কাজ করছে না। এ রকম কোনো গ্যারান্টিও তত্ত্বে বা তথ্যে নেই :প্রগতির রথের ঘোড়া সামনেও যেতে পারে, পেছনেও যেতে পারে। অমর্ত্য সেন যাকে বলেছেন, ‘Government by Discussion’ সেই গণতন্ত্র অনেক জিডিপি আহরণের পরও দূর নক্ষত্রের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে। সন্দেহ কী, কিছুটা ভিন্ন-অর্থে দার্শনিক জাঁক দেরিদাও বলবেন- সেই গণতন্ত্র ভূ-ভারতে কেন, এই ভূলোকেও প্রায় কোথাও নেই, এবং কোনো লাগসই শিরোনাম না পেয়ে এর নাম দেবেন ‘Democracy-to-come’!

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ এই বিশ্বজোড়া গণতন্ত্রের সামগ্রিক পিছু-হটার বা Democratic Recession-এর বাইরে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এখানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এই পিছু-হটার মধ্যেও ‘প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে’ শনাক্ত করা বা তাদের পক্ষে সমর্থন জোরালো করা সম্ভব। বাংলাদেশ কি রুয়ান্ডার মতো হবে, নাকি ঘানার মতো হবে? তুরস্ক নাকি তিউনিশিয়ার মতো হবে? ইন্দোনেশিয়ার নাকি থাইল্যান্ডের মতো অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে? ইকুয়েডর নাকি ভেনেজুয়েলাকে অনুসরণ করবে? চিলি নাকি আর্জেন্টিনার মতো হবে? স্লোভেনিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো হবে, নাকি হবে হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের মতো? এই দেশগুলো ‘লিবারেল ডেমোক্রেসি’ ও ‘ইলেকটরাল ডেমোক্রেসি’ যে কোনো নিরিখেই পিছু হটেছে গণতন্ত্রের সূচকে, কিন্তু এদের মধ্যে রাজনৈতিক উন্নয়নের স্তরে কী বিপুল পার্থক্য! এই Choice-এর অবকাশ তো বাংলাদেশের জন্য এখনও রয়ে গেছে। এদিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাও প্রবন্ধটির একটি উদ্দেশ্য।

লেখাটি ৫টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রথম অধ্যায়ে প্রারম্ভিক যুক্তি ও বক্তব্য উপস্থাপনার পরে দ্বিতীয় অধ্যায়ে গণতন্ত্রের তত্ত্ব নিয়ে এথেনিয়ান ডেমোক্রেসির যুগের ক্ল্যাসিক চিন্তাবিদদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে আমি বলার চেষ্টা করছি যে, ইলেকটরাল ডেমোক্রেসির বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যদি নির্বাচনী গণতন্ত্রে কোনো দেশ ভালো ‘স্কোর’ করেও থাকে, কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের উদারনৈতিক চর্চা ও মূল্যবোধ ‘লিবারেল ডেমোক্রেসির’ নিরিখে উত্তরোত্তর ‘রক্ষণশীল’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ হতে থাকে, তাহলে সে দেশটিতে গণতন্ত্রের সংকট দানা বাঁধতে বাধ্য। অর্থনীতিবিদ ডানি রডরিকের পথ ধরে আমি বলার চেষ্টা করছি যে, ‘লিবারেল ডেমোক্রেসিই’ শ্রেষ্ঠতর, এবং সমাজে ‘লিবারেল আইডিয়া’-এর ভূমিকা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ অধ্যায়ে বেশকিছু তথ্য ও উপাত্ত জড়ো করা হয়েছে দেশে দেশে গণতন্ত্রের পিছু-হটা সম্পর্কে। এটি হচ্ছে এই লেখার মূল ‘ইমপিরিক্যাল’ অংশ। পঞ্চম অধ্যায়ে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রের পিছু-হটার সামগ্রিক প্রবণতার মধ্যে আদৌ কতটুকু কী করা সম্ভব- উন্নয়নের ফলাফলকে আরও জনকল্যাণমুখী করার ক্ষেত্রে- সে বিষয়ে কিছুটা জল্পনা থাকছে।

২. গ্রিক দেবী ডেমোক্রেটিয়া

গণতন্ত্রের দেবীর নাম গ্রিকরা দিয়েছিল ‘ডেমোক্রেটিয়া’। এথোনিয়ান দেব-দেবীর মধ্যে তার অবস্থান মধ্যম সারিতে। সবার ওপরেও নয়, সবার নিচেও নয়। প্রায় ষাট বছর আগে ‘ইন ডিফেন্স অব পলিটিক্স’ বইতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বানার্ড ক্রিক এই দেবীকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে : ‘She is everybody’s mistress and yet somehow retains her magic even when a lover sees that her favours are being, in his light, illicity shared by many another.’ গণতন্ত্রের দেবী সবারই উপপত্নী, এবং প্রত্যেকেই তার আবেদনময়ী আচরণে মোহমুগ্ধ কথাটা নির্দয় শোনায়। কিন্তু লন্ডনের সুবিখ্যাত বার্কবেক কলেজের (যেখানে দার্শনিক জিজেক অধ্যাপনা করেন) অধ্যাপক ক্রিক সাহেব বিনা কারণে কথাটা উচ্চারণ করেননি। প্রত্যেকেই এই দেবীর কাছে প্রসাদ চেয়েছেন যার যার মতো করে, আর প্রত্যেকেই কিছু না-কিছু পেয়ে প্রীত হয়েছেন এমনই সহৃদয়া ডেমোক্রেটিয়া দেবী। সেই থেকে বিশেষণের কমতি নেই। এথেনিয়ান ডেমোক্রেসি, বুর্জোয়া গণতন্ত্র, শোষিতের গণতন্ত্র, ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি, লিবারেল ডেমোক্রেসি, রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসি, ইললিবারেল ডেমোক্রেসি, র‌্যাডিকেল ডেমোক্রেসি, ‘ডেমোক্রেসি-টু-কাম’ ইত্যাদি নানা অভিধায় ডাকা হয়েছে তাকে। এই নামকরণের ইতিহাস ও ট্যাক্সোনমি একটি পৃথক আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে।

যে নামে দেবীকে ডাকা হচ্ছে, সেই স্বরূপেই তার ভক্তরা তাকে দেখতে চান। অন্য কোনো নামে বা অভিব্যক্তিতে তাকে দেখতে চান না তারা। রূপে-রসে-গন্ধে এসব নামকরণ এতটাই পৃথক যে, এদের মধ্যে প্রায় ভাব-বিনিময় চলে না। একটা উদাহরণ দিই। একসময় মার্কসবাদীরা বলতেন, গণতন্ত্র বলতে যার ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে সেটা আদৌ ‘প্রকৃত’ গণতন্ত্র নয়; সেটা হচ্ছে আসলে ‘বুর্জোয়া’ গণতন্ত্র। কথাটা মার্কসও তার নানা লেখায় ব্যবহার করেছেন। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের রাজা লুই ফিলিপ বিদায় নিলেন। এই বিপ্লব গভীরতর সমাজ-পরিবর্তন আনল না যদিও, কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকারের একটা বার্তা ইউরোপে ছড়িয়ে দিল। বার্তাটি পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটির। বলা দরকার, ফরাসি বিপ্লবের সময়ে উচ্চারিত ‘লিবার্টি, ইকুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি’ শ্নোগানের মধ্যে যে ইকুয়ালিটি তা হচ্ছে পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটি নিয়ে। পরবর্তীতে মার্কস সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের যে অর্থনৈতিক ইকুয়ালিটির কথা তুলবেন এটা তার থেকে আলাদা। মার্কস ও এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালের কমিউনিস্ট ম্যানিফ্যাস্টোর পাতায় পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটির পাশাপাশি ইকোনমিক ইকুয়ালিটির কথা বলেছিলেন। প্রথম ধারণাটি, তার চোখে, নিতান্তই সংকীর্ণ ধারণা; অর্থনৈতিক সমতা ছাড়া রাজনৈতিক সমতা অর্থহীন। সেই থেকে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুত পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটিকে মার্কসের অনুসারীরা ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ বলে জেনে এসেছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বামধারার চিন্তাবিদেরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রকেও ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে দেখবেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিকেরা (থিওডর এডোর্নো বা ম্যাক্স হর্কহেইমার) বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে কীভাবে অ-গণতন্ত্রের তথা স্বৈরতন্ত্রের বিষবৃক্ষ বড় হচ্ছে তা বড় আকারে দেখালেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের কাছে ঋণ ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তেমনভাবে স্বীকার করেননি। তার পরও বলতে হয় ফুকোর গণতন্ত্রবিরোধী ধারণা জার্মান দার্শনিকদের কাছ থেকেই পাওয়া। গণতন্ত্র-এর ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করলেন ফুকো, যা প্রায় মার্কসের রক্ষণশীলতাকেও ছাড়িয়ে যায়। পুরো উদ্ধৃতিটি তাই তুলে দিচ্ছি :

‘If one understands by democracy the effective exercise of power by a population which is neither divided nor hierarchically ordered in classes, it is quite clear that we are very far from democracy. It is only too clear that we are living under a regime of a dictatorship of class, of a power of class which imposes itself by violence, even when the instruments of this violence are institutional and constitutional; and to that degree, there isn’t any question of democracy for us.’

নোয়াম চমস্কির সঙ্গে বিতর্কে ফুকো এ কথা বলেছিলেন ১৯৭১ সালে- তার মৃত্যুর ১৩ বছর আগে। তাহলে উনিশ শতকের মার্কসের তুলনায় বিশ শতকের সত্তর দশকেও এসে দেখা যাচ্ছে উন্নত দেশের গণতন্ত্রে খুব একটা ‘ইতিবাচক কিছ’ু অর্জিত হয়নি! ফুকোর শব্দ ব্যবহারটিও দেখুন : সত্তর দশকেও তিনি দেখছেন উন্নত আধুনিক গণতন্ত্রের পেছনে ধনিক শ্রেণির ক্ষমতার দাপট- ‘ডিক্টেটরশিপ অব ক্লাস’।

[ক্রমশ]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৬

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

ওকাম্পো-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক সাহিত্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক রূপায়ণের ক্ষেত্রে এক আধুনিক বোধের জন্ম দিয়েছিল। সমালোচকেরা এদের মধ্যকার সম্পর্ককে কী নামে ডাকবেন, সেটা বুঝি এখনও পুরোপুরি স্থির করতে পারেননি। কেউ একে বলেছেন- গভীর দার্শনিক ও আত্মিক যোগাযোগ; কেউ বলেছেন ‘প্লাতোনিক প্রেম’; কেউ বা সন্দেহ করেছেন- এর চেয়ে আরও বেশি কিছুর। আমি এই শেষোক্ত দলে পড়ি। আঁদ্রে জিদ ভিক্টোরিয়ার প্রগাঢ় জ্ঞানচর্চার পরিধি দেখে বলেছিলেন- ‘ওকাম্পো যেন নিজেই এক পুরাণ গ্রন্থ।’ মান রে’র (Man Ray) মতো শিল্পী যার পোর্ট্রেট ছবি তুলেছেন; যিনি লাতিন আমেরিকার নবধারার সাহিত্য-আন্দোলনের পথিকৃৎ ‘Sur’ পত্রিকার ডাকসাইটে সম্পাদক; একজন পুরোধা নারীবাদী; তুখোড় সাহিত্য-সমালোচক; বোর্হেসের মতো সাহিত্যিকের সঙ্গে যার রয়েছে দীর্ঘ কথোপকথনের অনন্য দলিল; একজন বহু ভাষাভাষী সুন্দরী ও বিদূষী (রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলের সব আধুনিকা নারীদের চেয়ে যিনি আধুনিকতমা ও জ্ঞানে-রুচিতে প্রাগ্রসরা) এবং সর্বোপরি বিশ্বস্ত ও মমতাময়ী- তার প্রতি নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের আকৃষ্ট না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না সেদিন। পরবর্তী দিনগুলোয় এই আকর্ষণ গভীর আস্থার, বন্ধুত্বের ও ভালোবাসার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে (এটা কোন ধরনের প্রেম বা প্রেম হয়ে থাকলে তার সামনে সতর্ক ‘এপিথেট’ বসানোর কষ্টকর চেষ্টা কিছুটা হাস্যকরও ঠেকে) চিত্রকর্মে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ সেই তরুণ বয়স থেকেই। লেখার ফাঁকে ফাঁকেই তিনি বিরতিহীনভাবে মুখ, মুখোশ, জীবজন্তু, পৌরাণিক বা অবচেতন মনের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে এমন কিছু আঁকছেন বা আঁকিবুঁকি করে আসছেন। এটা একসময় নেশায় পেয়ে বসে কবিকে। ষাটোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথ নিজের ভেতরে একদিন হঠাৎই আবিস্কার করলেন স্ব-অস্তিত্বে ও স্ব-মহিমায় বিশ্বাসী এক চিত্রশিল্পীর :’ছবির নেশার আমার কাব্যের উপর কিছু উৎপাত বাধিয়েচে। অধিক বয়সে তরুণী ভার্য্যায় মানুষকে অভিভূত করে এমন একটা প্রবাদ আছে। আমার প্রাচীনাটি এই তরুণীটির সঙ্গে পেরে উঠচে না।’ ওকাম্পোর লেখায় সেই নেশার আদি-মুহূর্তের বিবরণ রয়েছে। ওকাম্পো লিখেছেন (গণেশ পাইনের সুবাদে সে তথ্য তুলে দিচ্ছি)-

‘ওঁর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকত, ওরই মধ্যে কবিতা লিখতেন …লেখার নানা কাটাকুটিকে একত্র জুড়ে দিয়ে তার উপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি। এই আঁকিবুঁকি থেকেই বেরিয়ে আসত সব রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোলতাবোল। …এই ছোট খাতাটিই হলো শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।’ পরবর্তীকালে দেশে ফিরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিজয়াকে লিখেছিলেন, ‘তুলি দিয়ে আমি ছবি আঁকব না, যে কলম দিয়ে কথার কাব্য লিখি, সেই কলমে রং এবং রেখার কাব্য লিখতে পারি কিনা, তারই একটা পরীক্ষা চালাতে চাই।’

এককথায়, রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার উন্মেষ-পর্বের সাক্ষী ছিলেন বিজয়া। যখন সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রকর’ হয়ে উঠলেন, তখন এই বিজয়াই সমস্ত সহায়সম্বল নিয়ে এগিয়ে এলেন। আর্জেন্টিনায় যে দু’মাস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া সব খরচ চালিয়ে ছিলেন ওকাম্পো। এজন্যে তাকে তার মহা মূল্যবান হিরের আংটিটি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। ১৯৩০ সালে প্যারিসে কবির চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করার জন্য শুধু সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে ছুটে আসাই নয়, তাকে অনেক অর্থ-ব্যয়ও করতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এই মর্মে :’ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত, তাহলে ছবি ভালোই হোক মন্দই হোক কারও চোখে পড়ত না। একদিন রথী ভেবেছিল, ঘর পেলে ছবির প্রদর্শনী আপনি ঘটে- অত্যন্ত ভুল। …ভিক্তোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্ছে। এখানকার গুণীজ্ঞানীদের ও জানে- ডাক দিলেই তারা আসে।’ ওকাম্পো ‘ডাক দিলেই’ প্যারিসের এলিট বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকেরা ‘ছুটে আসে’- এই একটি কথার মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন বিজয়ার আকর্ষণী বিদূষী সত্ত্বাকে।

প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ২ মে। ১২৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল তাতে। এর সমস্ত আয়োজন/ ব্যবস্থা করেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। শুধু রবীন্দ্রনাথের ডাকেই এটা করেছিলেন তিনি। অন্য কোনো কারণে আসেননি। আর্জেন্টিনা থেকে শুধু একটা প্রদর্শনী আয়োজন করার জন্যই তিনি সেবার প্যারিসে এসেছিলেন। ওটা অ্যারোপ্লেন-যুগের আগের কথা, এ কথাও মনে রাখতে হবে। একে যদি আমরা গাঢ় প্রেমের চিহ্ন হিসেবে না দেখি, তাহলে ‘প্রেম’ কাকে বলব? রবীন্দ্রনাথ প্যারিস ছেড়ে যান ১১ মে। প্যারিসের গ্যার দ্যু পর্দ রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শেষবারের মতো তার দেখা হয়েছিল ভিক্টোরিয়ার সাথে। এর ঠিক চার মাসের মাথায় রবীন্দ্রনাথ (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩০) যাবেন বিপ্লব-উত্তর রাশিয়া দেখতে। ভিক্টোরিয়া ফিরে যাবেন বুয়েনস এয়ার্সে। কিন্তু অপ্রত্যক্ষে থেকেও দু’জনের মধ্যে পত্রালাপ ও মৌনালাপ আমৃত্যু চলতেই থাকবে। দু’তরফ থেকেই দেখা এর সম্পূর্ণ চিত্র অবশ্য এখনও আমরা পাইনি।

কুই ব্রানলি মিউজিয়ামে আফ্রিকা, পলিনেশিয়া, ওশেনিয়া, লাতিন আমেরিকার আজটেক, মায়া, ইনকা, বৃহত্তর অর্থে তৃতীয় বিশ্বের আদিবাসী সংস্কৃতির প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্ট দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছিল, ‘আধুনিকতার’ পেছনে ‘অনাধুনিকের’ একটি বড় ধরনের অবদান রয়ে গেছে। এটা চেঁচিয়ে চলা দরকার। এই ‘অবদান’ যেমন পাই পাশ্চাত্যের সেজান-পরবর্তী পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট, কিউবিস্ট, এক্সপ্রেশনিস্ট ও বিমূর্ত চিত্রকলায়, তেমনি পাই এই ভূভাগের বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায়। শিল্প-সমালোচক আনন্দ কুমারস্বামী সঠিকভাবেই এর কুললক্ষণ শনাক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলো হচ্ছে, ‘genuine examples of modern primitive art.’ পক্ষান্তরে, ইউরোপের প্রিমিটিভ আর্টের আধুনিক অনুসারীরা বরং ‘More calculated primitivisms, archaisms, and pseudo-barbarisms’-র নিদর্শনই তুলে ধরেছেন। কথাটায় হয়তো অতিশয়োক্তি রয়েছে। পিকাসো, মাতিস, মদিলিয়ানি, নোল্‌দে, ক্লি, ক্রিশ্‌নের বা মিরো প্রিমিটিভিজমের সিরিয়াস চর্চাই করেছেন এবং আধুনিক শিল্পকলায় নবধারার বিপ্লবের সূচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের কাজের গুরুত্বকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তিনি কোনো ভুল বা ‘বিভ্রান্তিকর’ (কথাটা ডাইসন-অধিকারীর) ব্যাখ্যা দিয়ে যাননি। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক প্রিমিটিভ ‘ছবির রবীন্দ্রনাথ’ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলার ‘ফর্মাল’ অনুশীলন না করেই কী করে আঁকার জগতে প্রবেশ করতে পারলেন? এর উত্তর কিছুটা মেলে শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কথায় :’আমাদের দেশে মডার্ন যে এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, সেটা গুরুদেবই করছেন। একটা লোকের ভেতরে যদি চরম সেন্স অব রিজন, মিউজিক, কালার থাকে তার অ্যাকাডেমিক ট্রেনিং দরকার হয় না।’ তবে প্রথাগত অনুশীলন না থাকলেও ইউরোপের সর্বাধুনিক চিত্রকলার প্রতিলিপি তিনি সংগ্রহ করে দেখতেন; রোদ্যাঁর সাথে তিনি দেখা করেছেন, কান্ডিনস্কি ও বাউহাউস স্কুলের প্রদর্শনী স্বচক্ষে দেখেছেন; Kathe Kollwitz-র মতো শিল্পীরা তার সাথে দেখা করেছেন এবং তার সাথে ছবির ভাবনার বিনিময় করেছেন। পঞ্চাশে নোবেল-প্রাপ্তির পরে সত্তরে তার চিত্রকর্মই ছিল রবীন্দ্রনাথের- তার ভাষাতেই বলছি- ‘শেষ কীর্ত্তি’। এই সৃষ্টিসম্ভারকে তার নিজের দেশে অনেকেই বুঝতে পারেনি সে সময়ে; বিদেশেও অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। যেমন, আমেরিকায়, যেখানে তখন পর্যন্ত কিউবিস্ট বা এক্সপ্রেশনিস্ট আর্ট সমাদৃত হতে শুরু করেনি। আমেরিকায় ছবির রাজ্যে বিপ্লব ঘটবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে। তখন জ্যাকসন পোলককে কেন্দ্র করে বেরিয়ে আসবে একঝাঁক নতুন প্রজন্মের শিল্পী- জন্ম হবে আর্টের আরেক নবধারা, যার নাম দেওয়া হবে ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’। সর্বাধুনিক রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হয়তো বুঝতে পেরেছিল ফ্রান্স, কিছুটা পরিমাণে জার্মানি ও রাশিয়া (হ্যাঁ, মালেভিচ-লিসিৎস্কি-শাগাল-ওসিপা জাদকিনের রাশিয়া)। আমেরিকা তখনও ইউরোপের তুলনায় শিল্পকলার রুচিতে অনেক পিছিয়ে। কবি পল ভ্যালেরি প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী দেখে বলেছিলেন, ‘ইওর পিকচার্স উইল বি অ্যা লেসন টু আওয়ার আর্টিস্টস্‌’। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার ছবিতে যাদের অনীহা, সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিরুদ্ধতার কারণে নয়, নিতান্তই ‘চিত্রদর্শনের অভিজ্ঞতার’ অভাবের কারণে। আর সে কারণেই বলতে পেরেছিলেন যে, ‘সে জন্য এ দেশে আমাদের রচনা অনেকদিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে।’ হয়তো ‘আমার মৃত্যুর পর ওর (রবীন্দ্রনাথের ছবির) আবরণ মোচন করো- তখন ওর মূল্য হবে ঐতিহাসিক দিক থেকে।’ উপমহাদেশের আধুনিকতম চিত্রকলার একজন পুরোধা শিল্পী গণেশ পাইন রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্পর্কে বলেছেন, তার ছবি এতই একক ও স্বয়ম্ভু, এ দিয়ে ‘কোনো ঘরানা আপাতত তৈরি করা যায়নি।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘কেউ যদি তার ছবি দেখে বলতেন সুন্দর হয়েছে, তৎক্ষণাৎ সেই ছবির উপর কালি ঢেলে দিতেন তিনি এবং সেই অন্ধকারের মধ্যেই সন্ধান করতেন তার ‘সুন্দর’-এর।’ ঠিক প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের নাম-না-জানা অগণিত শিল্পীর মতো। নিজেকে তিনি কখনও কখনও বলেছেন এক ‘আজগুবি ছবি-আঁকিয়ে’ বলে। কিন্তু আমরা তো এখন বুঝতে পারি ধারাবাহিকভাবে খাপছাড়া ও আজগুবি ছবি এঁকে যাওয়া কত কঠিন। অবনীন্দ্রনাথ এদিকটি বুঝতে হয়তো ভুলই করেছেন। নইলে তিনি রানী চন্দকে বলবেন কেন- ‘একটা ঢেউ উঠেছে, প্রিমিটিভ, ক্রুড, এই সব আঁকতে হবে। তাতে কী আছে, না, ‘স্ট্রেংথ’ আছে। সেটা ভুল। প্রকৃতিতে তো তা নেই। …একটা জিনিস যখন অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকে, সেটাকেই বলে ক্রুড। …’স্ট্রেংথ’ থাকবে ভিতরে, কিন্তু বাইরে থাকবে সৌন্দর্যের আবরণ।’ ট্রকাদেরো মিউজিয়ামে গ্রেবো মূর্তির মধ্যে যে ম্যাজিক, যে সম্মোহনের প্রভা দেখেছিলেন পিকাসো, সেটিই আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মে। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী দেখার পর চিত্রকর আঁদ্রে কার্পেলেসের কথায় পিকাসোর বিস্ময়-বিমুগ্ধ অভিজ্ঞতারই অনুরণন পাই। কার্পেলেস প্যারিস-প্রদর্শনীটির ছবিগুলো দেখে রথীন্দ্রনাথকে যা লিখেছিলেন, তা সম্পূর্ণ উদ্ৃব্দতির দাবি করে:

‘They are far beyond what I expected and dreamt ofÑ You are rightÑ RothiÑ It is some thing newÑ uniqueÑ grandÑ Not only will they be a treat for the admirers but they will be the bestÑ long awaited lesson for the western artists. What they have been looking for, struggling for, what they have failed to expressÑ (because abstraction needs genius to find the means of making it tangible) [Tagore] has attained it in one unique flight. His pictures have the freshness, the mysterious strength of the early primitive expressions of art …They are modern bccause they bring the message of something entirely original.’

প্রিমিটিভ কিন্তু মডার্ন, পুরাতনী কিন্তু সাম্প্রতিক- এই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের অর্ধচেতন অবচেতন সচেতন আঁকিবুঁকি থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত স্ব-উদ্ভাবিত চিত্রকলা।

[এই বিষয় সমাপ্ত]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৫
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

‘জার্মান এক্সপ্রেশনিজম :প্রিমিটিভিজম অ্যান্ড মডার্নিটি’ বইয়ের লেখক জিল লয়েড এ বিষয়ে লিখেছেন যে জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের ওপরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল অজন্তার গুহাচিত্র :
‘Once again a composite notion of the ‘primitive’ emerges, and it is difficult to distinguish between the exotic and ‘Gothic’ stimuli. For example, the characteristic combination of green and purple that Kirchner began to use at this date is usually associated with the colour illustrations of the Ajanta temple paintings he knew from the Dresden library.’

রবীন্দ্রনাথ এই ‘প্রিমিটিভ’ ও ‘মডার্ন’-এর মধ্যকার প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি এই উপমহাদেশের চিত্রকরদের মধ্যে সর্বপ্রথম অনুভব করেছিলেন। সমালোচকেরা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের নানা ছবির অদ্ভুত জীবজন্তুর সমাবেশ শুধু অন্যমনস্ক আঁকিবুঁকি (doodles) থেকে উৎসারিত হয়নি। উদাহরণত, তার ২২৩২-সংখ্যক ছবিটির সাথে তুলনীয় হয়েছে পল ক্লি-র ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিটি। এই বিশেষ ছবিটি যখন ১৯৩০-এ প্যারিসে প্রদর্শিত হয়, তখন ব্যাখ্যা হিসেবে তাতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘I have searched out the cave of the primitive/ in my mind/ with its etchings of animals.’ পরে কবি নিজেই দিয়েছেন এর বাংলা তর্জমা :’বিস্মৃত যুগে গুহাবাসীদের মন/ যে ছবি লিখিত ভিত্তির কোণে/ অবসরকালে বিনা প্রয়োজনে/ সেই ছবি আমি আপনার মনে/ করেছি অন্বেষণ।’ রবীন্দ্রনাথের ‘প্রিমিটিভ’ মনের প্রকাশ পাওয়া যায় ‘খাপছাড়া’ গ্রন্থে তার বিচিত্রবিধ ড্রইং-এর ভেতরেও। কাইয়ুম চৌধুরীও লিখেছেন, “পল ক্লির কলমে করা ড্রইংয়ের ছায়া ‘খাপছাড়া’ ও সে বইয়ের ইলাস্ট্রেশনে দেখতে পাওয়া যায়।”

আগেই বলেছি, চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ যেদিকে পা ফেলেছিলেন তা তার নিজ দেশের সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে বা শিল্পরসিক মহলে তেমন একটা নাড়া দিতে পারেনি। এদিক থেকেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিঃসঙ্গ শিল্পী। বিদেশেও তার বন্ধুদের অনেকেই এই নব্যধারার শিল্পকলার জগতের সাথে সম্যক পরিচিত ছিলেন না। এমনকি রোমাঁ রোলাঁ বা রোটেনস্টাইনের মতো রবি-ঘনিষ্ঠ প্রাচীনপন্থিরা। এখানেও তার নির্জনতা চোখে পড়ার মতো (ব্যতিক্রমদের মধ্যে ছিলেন পল ভালেরি বা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মতো ব্যক্তিত্বরা- সে প্রসঙ্গে একটু পরেই আসছি)। তার চিত্রকর্মকে ধৈর্য ধরে বোঝার চেষ্টা ছিল না প্রায় সমসামরিক কারও মধ্যেই- বিশেষত এ দেশে। প্রগতি-কল্লোল-পরিচয় যুগের আধুনিক কবিদের সাথে গদ্যকবিতা ও এলিয়ট নিয়ে তার যা-ও বা এক ধরনের সংলাপ বা বিতর্ক হচ্ছিল, চিত্রকলায় তিনি ছিলেন তার স্বদেশে প্রায় নির্বাসিত। ছবি আঁকাকে নিতান্ত কবির খামখেয়ালিপনা বলে মনে করা হতো। এ নিয়ে তার কিছু ক্ষোভও ছিল। থাকাটাই স্বাভাবিক। ১৯২২ সালে কলকাতায় সাম্প্রতিক ইউরোপীয় চিত্রকলার- বিশেষত ‘বাউহাউস’ স্কুলের এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকর্মের যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়- তার প্রধান প্ররোচনা ও উৎসাহ এসেছিল রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকেই এ কথা এখন অনায়াসে বলা চলে। এ তথ্যও রয়েছে যে, ‘রবীন্দ্রনাথ নাকি শান্তিনিকেতনে বাউহাউস একটি শাখাও খুলতে চেয়েছিলেন।’ এই কলকাতা প্রদর্শনীর জন্য ‘বাউহাউস কর্তৃপক্ষ’ যেসব ছবি পাঠিয়েছিল তার মধ্যে ছিল অসাধারণ সব নাম :’পল ক্লির নয়টি জলরং, কান্ডিনস্কির চারটি জলরং, ফাইনিঙ্গারের উনিশটি ড্রইং ও ষোলোটি উডকাট, এটেনের তেইশটি ড্রইং, গেরহার্দ মার্কসের বিশটি জলরং, জর্জ ম্যুচের নয়টি এচিং, লোথার স্ট্ক্রেয়ারের সাতটি ছাপাই ছবি, সোফিয়ে কর্নারের দুটি জলরং, মাগ্রিট টেরি এডলারের কিছু কাজ প্রভৃতি।’ সুশোভন অধিকারী আরও জানিয়েছেন যে, ‘স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাকি পল ক্লি ও কান্ডিনস্কির একটি করে ছবি কিনেছিলেন।’ দুঃখের বিষয়, এ প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বাউহাউস কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত কোনো একটি ছবিও ফেরত পায়নি! এমনকি, রবীন্দ্রনাথের ইতোপূর্বে ক্রয় করা ক্লি ও কান্ডিনস্কির ছবি দুটোরও কোনো হদিস মেলেনি। এত সবকিছুর পরও সমসাময়িক উপমহাদেশের চিত্রকলার ওপরে বাউহাউস প্রদর্শনীর প্রভাব খুব সামান্যই পড়েছিল, বা পড়ে থাকলেও তার প্রতিঘাত ভারতীয় চিত্রকলায় সঞ্চারিত হয়েছিল খুবই সন্তর্পণে। এটাও রবীন্দ্রনাথকে বিমর্ষ করে থাকবে। পরের আট বছরে কবি নিজেই যখন সর্বাধুনিক ধরনে ছবি আঁকতে লেগে গেলেন, সেটা নিয়েও উপর-ভাসা মন্তব্য ছাড়া কোনো গভীর সমাদরের আভাস পাই না আমরা। কাকা রবীন্দ্রনাথের ছবি প্রসঙ্গে শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় বলেছিলেন, ‘ওগুলো ছবি নয়, যেন অগ্নিগিরির অগ্ন্যুৎসার।’ এ থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবির কোনো মূল্যায়ন বুঝতে পারি না আমরা। গণেশ পাইন বলেছেন, ‘স্বদেশ তার চিত্রাবলীকে তাঁর ঈপ্সিত অভ্যর্থনা দেয়নি।’ এর একটা কারণ হতে পারে, আমাদের দেশে পাশ্চাত্যের আধুনিক ও সাম্প্রতিক চিত্রকলা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিচয় না থাকা। রবীন্দ্রনাথের সেটা ছিল। গণেশ পাইন লিখেছেন, ‘পশ্চিমি নব্য শিল্পের নানা ধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল, এ কথা আমরা জানি। …বহুবার গেছেন প্রতীচীর শিল্পতীর্থ পারী নগরীতে …নানা প্রদর্শশালায় দেখেছেন …ইম্প্রেশনিস্ট, পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট, আর অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট।’ ১৯২৫-এ সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথ লিখতে পেরেছেন, ‘য়ুরোপে আজকাল চিত্রকলার ইতিহাসে একটা বিপ্লব এসেছে। …আধুনিক কলারসজ্ঞ মানুষ বলছেন, আদিকালের মানুষ তার অশিক্ষিত পটুত্বে বিরলরেখায় যে রকম সাদাসিধে ছবি আঁকত, ছবির সেই গোড়াকার ছাঁদের মধ্যে ফিরে না গেলে এই অবান্তরভারপীড়িত আর্টের উদ্ধার নেই।’ অর্থাৎ প্রিমিটিভ আর্টের প্রতারক সরলতার মধ্যে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আধুনিক শিল্পকলার ‘মুক্তি নেই’। এই উপলব্ধি যেমন সাম্প্রতিক শিল্পকলার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরলরেখার ‘মিনিমালিজমে’ ফিরে তাকানোও সমানভাবে দরকার ছিল।

রবীন্দ্রনাথ হুয়ান মিরোর (Joan Miro) মিনিমালিস্ট ও শিশু সারল্যে ভরা ছবিগুলো দেখেছিলেন কিনা আমরা জানি না। প্যারিসে অবশ্য মিরোর নামাঙ্কিত বাগানে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষমূর্তি পরবর্তীতে স্থাপিত হয়েছে। মিরোর মতই ছবির সেই ‘গোড়াকার ছাঁদের’ দিকে ফিরে যাওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা ছিল তার মধ্যে। কিন্তু এর যোগ্য সমাদর মেলেনি তার দৈশিক পরিপার্শ্বের কাছ থেকে। কলকাতায় তার ছবির প্রথম প্রদর্শনী সমসাময়িকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘তিনসঙ্গী’র অভীক চরিত্রটি এ নিয়ে খেদোক্তি করেছে :’আমি যে আর্টিস্ট এ পরিচয়ে তোমাদের একটুও শ্রদ্ধা নেই। এ আমার চিরদুঃখের কথা। আমি নিশ্চিত করে জানি, একদিন সেই রসজ্ঞ দেশের গুণী লোকেরা আমাকে স্বীকার করে নেবে, যাদের স্বীকৃতির খাঁটি মূল্য আছে।’ শুধু উপন্যাসের মাধ্যমে নয়, এ কথা পত্রালাপেও জানিয়েছেন। প্যারিসে চিত্র-প্রদর্শনীর বছরেই কবি নিজেই এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন নির্মলাকুমারী (রানী) মহলানবিশকে। প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ ও অর্থনীতিবিদ (পরবর্তীতে নেহরুর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ‘আর্কিটেক্ট’) প্রশান্তচন্দ মহলানবিশ-এর সহধর্মিণী বলে নয়, তার নিজস্ব মননশীলতার কারণেই রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় পাত্রী ছিলেন নির্মলাকুমারী। ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসের এই চিঠিতে কবি জানাচ্ছেন :’জর্মনিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতটা আশা করি তোমরা বোঝো। …আমার দেশের সঙ্গে আমার চিত্রভারতীর সম্বন্ধ নেই বলে মনে হয়। …ছবি যখন আঁকি তখন রেখা বলো রঙ বলো কোনো বিশেষ প্রদেশের পরিচয় নিয়ে আসে না। অতএব, এ জিনিসটা যারা পছন্দ করে তাদেরই, আমি বাঙ্গালি বলে এটা আপন হতেই বাঙ্গালির জিনিস নয়। এই জন্যে স্বতঃই এই ছবিগুলিকে আমি পশ্চিমের হাতে দান করেছি। …আমি যে শতকরা একশো হারে বাঙ্গালি নই, আমি যে সমান পরিমাণে য়ুরোপেরও, এই কথাটারই প্রমাণ হোক আমার ছবি দিয়ে।’ শেষের লাইনটি লক্ষ্য করার মতো। এই কথা শতভাগ খাটে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, অমর্ত্য সেন, রণজিৎ গুহসহ সব প্রাগ্রসর বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রে। এদেরকে কোনো ‘জাতীয়তাবাদী’ কালো বাক্সে বন্দি করা যাবে না।

এই একই কথা বলেছেন ১৯৩০ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্তকেও। জার্মানিতে তার ছবিগুলো দেখে সবাই খুব প্রশংসা করেছে, অথচ দেশে সেগুলো গুরুত্ব পায়নি :’আশা হচ্ছে এগুলো রসিকের দৃষ্টিগোচর হবে। পণ করেচি “আমার জন্মভূমিতে” ফিরিয়ে নিয়ে যাব না- অযোগ্য অভাজনদের স্থূল হস্তাবলেপ অসহ্য হয়ে এসেচে।’ ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন নিজের ছবি সম্পর্কে- বিদেশের মাটিতেই ছবিগুলো রেখে দিতে চান :’আমার পরম সৌভাগ্য এই যে আমাদের নিজপারের ঘাট পেরিয়ে এসেচি। আমার এই শেষ কীর্ত্তি এই দেশেই রেখে যাব।’ রানী মহলানবিশকে এমনভাবে বলেছেন যেন এ বিষয়ে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন :’আমার ছবিগুলোকে স্বদেশে কদাচ নিয়ে যাব না- পশ্চিম সাগরের পারে সমস্ত উজাড় করে দিয়ে তবে ফিরব।’ ততদিনে চিত্রকলা যে তার ‘শেষ কীর্ত্তি’ সেটা আমাদের জানা হয়ে গেছে। এর কারণও লিখেছেন- ‘যাই হোক ইন্ডিয়ান আর্ট যাকে বলে সেটা আমার আনাড়ি কলমে প্রকাশ পায়নি’, অর্থাৎ প্রথাগত ভারতীয় চিত্রকলা বলতে যে ‘রিয়ালিস্টিক’ ধরনের শিল্পকর্ম বোঝানো হয়ে থাকে (রবি বর্মা যার বড় উদাহরণ ছিলেন উনিশ শতকের শেষ ভাগে), সে রকম আদৌ নয় রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম। বা অবনীন্দ্রনাথ-নন্দলাল প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল স্কুলের’ আর্টের ধারাতেও তিনি নেই। আর সেজন্যেই এটা হয়তো পাশ্চাত্যের রসজ্ঞ মহলে বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু হতে পারে। ফ্রান্সে তার ছবির প্রদর্শনী নিয়ে ইন্দিরা দেবীকে ২৭ মে ১৯৩০ তারিখে লিখেছেন, ‘ফ্রান্সের মত কড়া হাকিমের দরবারেও শিরোপা মিলেচে- কিছুমাত্র কার্পণ্য করেনি’, আর জার্মানিতো তার দ্বার খুলে দিয়েছে বার্লিনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের ছবি কিনে। এজন্যেই রানী মহলানবিশকে লেখা ১৮ আগস্ট ১৯৩০-এর চিঠিতে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ বলতে দ্বিধা করেননি যে ‘এই যাত্রায় আগেরবারের চেয়ে জর্মনির অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে আমার প্রবেশাধিকার ঘটেছে। ওদের কাছাকাছি এসেছি।’ ১৯১৬ সালে কবি তার কন্যা মীরা দেবীকে লিখেছিলেন, ‘চিত্রবিদ্যা ত আমার বিদ্যা নয়, যদি তা হত তাহলে একবার দেখাতুম আমি কি করতে পারতুম।’ শেষ পর্যন্ত উক্ত চিঠি লেখার ১৪ বছরের মধ্যেই তিনি দেখিয়ে ছেড়েছিলেন যে চিত্রকলার শাখাতেও তিনি কতটা স্বতন্ত্র, মৌলিক এবং সর্বাধুনিক হতে পারেন।

এ সবকিছুই অবশ্য হতো না যদি তিনি ঠিক সময়ে তার আর্জেন্টিনার ‘বিজয়া’ তথা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সমর্থন ও সহায়তা না পেতেন। ‘প্যারিস ১৯৩০’ মানেই ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথের প্যারিস- এটা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। এই গল্পের বীজ বোনা হয়েছিল আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এয়ার্সের অদূরের সাবার্বে সান-ইসিদ্রার এক নির্জন প্রাসাদোপম বাড়িতে (প্রায় দুই মাস ছিলেন কবি যেখানে ভিক্টোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে)। তখন বিজয়ার বয়স ৩৪, রবীন্দ্রনাথের বয়স ৬৩। এই সাক্ষাৎ-এর কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছিল।

[ক্রমশ]