জনজীবনের অর্থনীতি

বিনায়ক সেন

১. মিল ও অমিল

প্রতিটি শাস্ত্রই তার নিজের চারদিকে একটা সীমারেখা এঁকে দেয় বা বেড়া তুলে দেয়, যাতে করে বেড়ার ভেতর থেকে কেউ বাইরে যেতে না পারে, বা বাইরে থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। রামায়ণে সীতার দেবর লক্ষ্মণ সীতার ভিটের চারদিকে একটি রেখা টেনে দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত যে-ই আসুক না কেন, সীতা যেন ঐ রেখার বাইরে পা না রাখেন। তাহলেই তিনি বিপদমুক্ত থাকবেন। বাংলা প্রবচনে একেই বলা হয়েছে_ লক্ষ্মণরেখা। শাস্ত্রগুলোও তেমনি তার চতুর্দিকে লক্ষ্মণরেখা এঁকে নিজেকে অন্য শাস্ত্রের প্রভাবমুক্ত বা ‘বিপদমুক্ত’ রাখতে চেয়েছে। বিশেষত এটা ঘটে এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে যখন শাস্ত্রগুলো ক্রমান্বয়ে একাডেমিক সনদ দানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি ‘ফ্যাকাল্টি’ হতে থাকে। বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রতিটি শাস্ত্রকেই তার নিজস্ব গণ্ডী দাঁড় করাতে হয়েছিল, সন্দেহ নেই। তবে সমাজে অত্যধিক শ্রম-বিভাজনের কারণে অতিমাত্রায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে গিয়ে কোথাও কোনো সার্বিক দার্শনিক (নৈতিক) ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে কি-না_ এ প্রশ্ন এডাম স্মিথ তার ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইতেই তুলেছিলেন। অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে নীতিশাস্ত্র (ও অন্যান্য শাস্ত্রের) বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্ষতি হয়েছে যেমন অর্থশাস্ত্রের, তেমনি নীতিশাস্ত্রেরও। এরকম একটি মত জোরে-শোরে উত্থাপন করেছিলেন অমর্ত্য সেন তার ‘এথিকস্ অ্যান্ড ইকোনমিক্স’ গ্রন্থে। আমি এসব সূত্র ধরে এই লেখায় মোটের উপর বলতে চেয়েছি যে, সাহিত্যের সঙ্গে অর্থশাস্ত্রের বিচ্ছিন্নতার কারণে অর্থনীতি নিয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনাও বেশ কিছুটা পরিমাণে ‘সংকীর্ণ’ হয়ে পড়েছে। এতে করে ক্ষতি হয়েছে দুই পক্ষেই। সাহিত্যে সর্বাধিুনিক অর্থনৈতিক চিন্তাগুলো সেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। আবার অর্থশাস্ত্রেও সাহিত্যে বিবৃত জনজীবনের অভিজ্ঞতাগুলো যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়ার ফলে শাস্ত্রটির জনবিচ্ছিন্ন বিদ্যায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটাকে এক ধরনের ‘একাডেমিক প্রটেকশনিজম’-এর ফলপরিণাম হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অথচ সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও এ দুই মানবিক বিদ্যার (হিউম্যানিটিক) মধ্যে ‘নাড়ির বন্ধনকে’ অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘সাহিত্য’ বলতে আমি মহাকাব্য, পুঁথি, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ সবকিছুকেই এক জায়গায় জড়ো করছি। বাংলায় ইকোনমিক্স শব্দটার ভাষান্তরে অর্থনীতি ও অর্থশাস্ত্র দুই-ই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দ্বিত্বতা এড়ানোর জন্য আমি এখানে ইকোনমিক্স অর্থে অর্থশাস্ত্র আর ইকোনমি অর্থে অর্থনীতি ব্যবহার করছি। সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল দেখতে পাওয়া যায় বিষয়বস্তুর অভিন্ন ঝোঁকের মধ্যেই। উন্নয়ন ও সাম্যের ধারণা দুই বিদ্যার ক্ষেত্রেই অভিনিবেশের বিষয়। কোন নীতি জনহিতৈষী বা কোন নীতিই বা জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর_ এসব আলাপ উভয়বিধ বিদ্যারই চর্চার বিষয়। এটা ঠিক যে, জনজীবনের যেসব ধারণা সাহিত্যে অনায়াসে চলে আসে, তাকে বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করে বিচারের প্রয়াস চলে অর্থশাস্ত্রে। শুধু বিশেষভাবে সংজ্ঞার ঝোঁক নয়, বিচার-পদ্ধতিতেও গাণিতিক ও ইকোনমেট্রিক মডেল নির্মাণ ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ যোগ করা হয় আধুনিক অর্থশাস্ত্রে। তারপরও সমাজ-প্রগতির বা অধোগতির তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদি কার্য-কারণ বোঝার তাগিদ পাওয়া যায় সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র উভয়ের মধ্যেই। একই ভাষার রকমফের সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যেমন দুই ভিন্ন জাতি, ঠিক তেমনভাবেই একই ঝোঁক ও মূল্যবোধ ধারণ করা সত্ত্বেও সাহিত্য ও অর্থশাস্ত্র দুই ভিন্ন বিদ্যার আদল পায়। এই মৌলিক মিলের জায়গাটিকে ধরে রাখতে পারলে দুই বিদ্যারই বিকাশে তা আরো পুষ্টি জোগাবে সেটি এখানে আরো একবার মনে করিয়ে দেওয়া। এই মৌলিক মিলের অনেক উদাহরণ রয়ে গেছে বাঙালির অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে। বাংলা সাহিত্যের নানা উদাহরণের মধ্যে পাওয়া যাবে প্রাগ্রসর অর্থনৈতিক চিন্তার পদচ্ছাপ (ফুটপ্রিন্টস)। আবার সাহিত্যের অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক অর্থনৈতিক কূটভাষের সরল সূত্র। এমনকি অনেক অর্থনৈতিক নীতিমালার সম্ভাব্য ধারণা-অভিজ্ঞান। এ রকম দুটো উদাহরণ হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা বিভূতিভূষণের ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাস। এ দুটি লেখার সূত্র ধরে আমি পরবর্তী দুই অধ্যায়ে সাহিত্যে অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়ে কিছু বাড়তি প্রসঙ্গের উল্লেখ করব।

২. স্মিথ, ডিকেন্স, মিল ও বঙ্কিম

খোলা বাজার বা অবাধ বাজার-অর্থনীতি নিয়ে আমাদের জনমনে কম-বেশি ভুল-শুদ্ধ একটা ধারণা চালু আছে। বিশেষ কতগুলো শর্তসাপেক্ষে এ অবাধ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার অর্থনীতি হচ্ছে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথ_ এরকম একটি বক্তব্যের শাস্ত্রীয় সূচনা হয় স্মিথের ‘ওয়েলথ অব নেশনস’ বইয়ে। এই বাজার-অর্থনীতি কোনো সর্বজ্ঞ পরিকল্পনাকারীর হাত ধরে কাজ করে না। বস্তুত কেউই এর পরিচালনার দায়িত্বে নেই। সমাজের সব ইকোনমিক এজেন্টেই স্বীয় স্বার্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডে যুক্ত হন। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির স্বপ্রণোদিত উদ্যমের ফল হয় সামগ্রিকভাবে সবার জন্য শুভ। এই চমৎকার পরিণতির পেছনে কোনো নিখিল প্রজ্ঞার হাত নেই_ যা আছে তা হলো বাজারের অদৃশ্য হাতের জাদু। সেই থেকে স্মিথের ইনভিজিবল হ্যান্ড-এর তত্ত্ব অর্থশাস্ত্রে চালু হয়ে রয়েছে। বাজারের এই ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব অনেকগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এ নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে এ পর্যন্ত। এর মধ্যে আবার নজর কেড়েছে দার্শনিক মিশেল ফুকোর একটি বিশ্লেষণ। তিনি এক জায়গায় বলছেন যে, অদৃশ্য হাত-এর তত্ত্বে রাজা বা সার্বভৌম ক্ষমতা পুরোপুরি অস্বীকৃত। রাজা রাষ্ট্রের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা বা রাষ্ট্রক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি অপ্রয়োজনীয় সত্তা। অর্থাৎ ফুকোর ব্যাখ্যায়, সামন্তবাদী সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে যাওয়ার এক পর্যায়ে রাজার অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংকুচিত করার জন্য ১৬৮৮ সালের ‘গ্গ্নোরিয়াস রিভুল্যুশন’ যেসব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছিল তারই সর্বোচ্চ তাত্তি্বক স্বীকৃতি মেলে ১৭৭৬ সালে স্মিথের লেখায় বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্বে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে রাজার যদি কোনো আবশ্যিক ভূমিকা না-ই থাকে, তাহলে তার অস্তিত্বের একটি বড় অংশই মহিমা হারিয়ে ফেলে। এদিক থেকে দেখলে ‘অদৃশ্য হাত’-এর তত্ত্ব আসলে একটি অন্তর্ঘাতমূলক রাজদ্রোহী তাত্তি্বক তৎপরতা_ সর্বময় ক্ষমতার মালিক রাজা বা সার্বভৌমের বিরুদ্ধে। ফুকো তাই লিখেছেন, ‘ইকোনমিক্স ইজ আ ডিসিপ্লিন উইদাউট টোটালিটি।’ আমার নড়বড়ে অনুবাদে তা দাঁড়ায় এমন :’অর্থশাস্ত্র হচ্ছে এমন একটি বিদ্যা যা রাজার পক্ষে গোটা রাষ্ট্রকে শাসন করা সম্ভব এ রকম সার্বভৌম-কেন্দ্রিক ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে।… উদারনৈতিকতাবাদের জন্মই এই সূত্রে। এক দিকে আইনের যুক্তিতে গোটা সমাজের উপরে সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, আর অন্যদিকে আধিপত্যের হাত গলে যাওয়া অসংখ্য নাগরিকের/প্রজার বিভিন্নমুখী অর্থনৈতিক স্বার্থের (স্বাধীন) অন্বেষণ। এ দুই প্রবণতার মধ্যে মৌলিক বিরোধ রয়ে গেছে।’

বাজারের অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে এভাবে র‌্যাডিক্যাল ধারায় মহিমান্বিত করার চেষ্টা সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি এসে টমাস কার্লাইল এই অদৃশ্য হাতের তত্ত্বকে নির্ভর করা শাস্ত্রটিকেই অভিহিত করলেন ‘এক বিষণ্ন বিজ্ঞান’ (ডিসমাল সায়েন্স) হিসেবে। অন্যদিকে অলিভার টুইস্ট, ব্রিক হাউস, হার্ড টাইমস প্রভৃতি উপন্যাসের মাধ্যমে চার্লস ডিকেন্স ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে অস্বীকার করে দেখালেন যে, সমাজের কল্যাণসাধন এই অর্থশাস্ত্রের অভিপ্রায় নয়। শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এসব অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে উঠল তার উপন্যাসে। পরিবেশ দূষণ, অনগ্রসর নগর পরিকল্পনা, কারখানায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধিমালার অনুপস্থিতি, জনশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা_ এসব বিতর্ক জন্মে উঠেছিল ইউরোপে আরও পরে; কিন্তু ডিকেন্সের লেখায় এসব বিতর্কের পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ডিকেন্সের এই লেখাগুলো যখন প্রকাশিক হচ্ছে, ততদিনে আত্মপ্রকাশ করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। কার্লাইল ও ডিকেন্সের সমালোচনার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিল। কার্লাইল ১৮৪৯ সালে অর্থশাস্ত্রকে বলেছেন, ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’; এর ঠিক এক বছর আগে, ১৮৪৮ সালে বেরিয়েছে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’। বইটি মৌলিক গোত্রের না হলেও স্মিথ-রিকাভো-ম্যালথাসের ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রকে সুপাঠ্যবই হিসেবে বিন্যস্ত করেছিলেন মিল। পরবর্তী প্রায় একশ’ বছর ধরে বাংলার (ও ভারতের) জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিকরা যেমন, উচ্চপর্যায়ের সরকারি চাকরি-প্রার্থী এদেশের ভদ্র সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকেই মিলের বইটির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল অর্থশাস্ত্রের পরীক্ষায় পাসের জন্য। বঙ্কিমের অর্থনৈতিক চিন্তাতেও এ বইয়ের গভীর প্রভাব ছিল। তবে বঙ্কিম তার বিভিন্ন লেখায় ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণে আরও কিছু প্রসঙ্গের সূত্রপাত করেন, যা তার চিন্তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।

অন্যত্র আমি বঙ্কিমচন্দ্রের ১৮৭২ সালের লেখা ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ এবং সে লেখায় অর্থশাস্ত্রীয় বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। এখানে সংক্ষেপে আমি তিনটি প্রসঙ্গের পুনরুক্তি করা প্রয়োজন মনে করছি। প্রথমত, দেশের শ্রীবৃদ্ধির (এখনকার পরিভাষায়_ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) প্রশ্নটিকে তিনি সরাসরিভাবে সম্পদ-বণ্টন তথা ভূমি-বণ্টন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করেছিলেন। প্রবন্ধের শুরুতেই তিনি বললেন, ‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে… আমাদের দেশের বড় মঙ্গল হইতেছে।’ কী মঙ্গল, তা-ও বললেন। চাষের অধীনে জমি বাড়ছে, রেললাইন বসেছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, বাণিজ্য দ্রব্য নিয়ে স্টিমার চলছে নদীবক্ষে, শহরে সন্ধ্যার পরে গ্রামের আলো জ্বলছে, ‘ফুলিস্কেপ কাগজে বঙ্গদর্শনের জন্য সমাজতত্ত্ব’ লেখা হচ্ছে, ইংরেজি শিক্ষার প্রসার হচ্ছে, সাহেবদের আসবাবপত্র আসছে, সেই সাথে তাদের আদব-কায়দাও আসছে। এসব বলার পরই এল তার পয়লা সওয়াল : ‘এরই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটি কথা জিজ্ঞসার আছে, কাহার এত মঙ্গল? হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাথায় খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্থিচর্ম্ম বিশিষ্ট বলছে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চষিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?… দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবী কয়জন?… যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।’ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোনো সামগ্রিক সূচকই উন্নয়নের সূচক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা গরিবমুখিন হচ্ছে সেটিই প্রধান বিচার্য।

দ্বিতীয়ত, ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যে নতুন জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন করেছিল তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন বঙ্কিম। আজকের ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা সে যুগেও ছিল রক্ষণশীল ও জমিদারি ব্যবস্থার ঘনিষ্ঠ সমর্থক। এদের সমালোচনা করে বঙ্কিম প্রজাওয়ারী (রায়তওয়ারী) ব্যবস্থার সপক্ষে যুক্তি দিলেন। তার ভাষায়, লর্ড কর্নওয়ালিস ‘মহাভ্রমে পতিত হইয়া প্রজাদিগের আরও গুরুতর সর্বনাশ করিলেন’_ তিনি ‘রাজস্বের কন্ট্রাক্টরদিগকে ভূস্বামী করিলেন’। অথচ, ”প্রজারাই চিরকালের ভূস্বামী; জমিদারেরা কস্মিনকালে কেহ নহেন_ কেবল সরকারি তহশীলদার। কর্নওয়ালিশ যথার্থ ভূস্বামীর নিকট হইতে ভূমি কাড়িয়া লইয়া তহশীলদারকে দিলেন… এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র কস্মিনকালে ফিরিবে না।” সম্পত্তির উপর মালিকানার ধরন যে অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা, এখানে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, এই অবস্থার যে দ্রুত নিরসন করা যাচ্ছে না, তার কারণ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী শুধু জমিদারেরা নন, উচ্চ শ্রেণীর কৃতবিদ্য লোকেরাও অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভদ্র সম্প্রদায় তথা বাবুরা (এ ‘বাবুদের’ নিয়ে তার একটি স্বতন্ত্র তীক্ষষ্ট ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধও রয়েছে)। বঙ্গদর্শন পত্রিকার শুরুতে ‘পত্রসূচনা’য় বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট করে জানালেন যে, বাঙালির উন্নতি বলতে তিনি কখনোই কেবল সুশিক্ষিতের উন্নতি বোঝাচ্ছেন না। তার ভাষ্যে, ‘সমগ্র বাঙালির উন্নতি না হইলে দেশের কোন মঙ্গল নাই। সমস্ত দেশের লোক ইংরেজি বুঝে না, কস্মিনকালে বুঝিবে, এ মত প্রত্যাশা করা যায় না।… সুতরাং বাঙ্গালায় যে কথা উক্ত না হইবে, তাহা তিন কোটি বাঙ্গালী কখন বুঝিবে না, বা শুনিবে না। এখনও শুনে না, ভবিষ্যতে কোন কালেও শুনিবে না। যে কথা দেশের সকল লোকে বুঝে না, বা শুনে না, সে কথায় সামাজিক বিশেষ কোন উন্নতির সম্ভাবনা নাই’। দেখা যাচ্ছে, বঙ্কিম বাংলা ভাষার জনভিত্তিক প্রসারকে উন্নতির আরম্ভ-বিন্দু হিসেবে দেখেছেন এমনকি অধস্তন ও কৃতবিদ্য শ্রেণীর মধ্যে। ‘সমকক্ষতা’ স্থাপনের একটি পাটাতন হিসেবে দেখেছেন। ভূমি-বণ্টনের অনাব্যতার প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি ভাষায় সমকক্ষতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে তিনি শুধু অর্থনৈতিক সমতা-অর্জনের উপায় হিসেবে নয়, দেশের উন্নতির ভিত্তি হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। এভাবে তিনি কার্লাইল-ডিকেন্সের ‘বিষণ্ন বিজ্ঞান’ সমালোচনার উত্তর খুঁজছেন উপনিবেশিক পরিস্থিতিতে। বেন্থাম-মিলের উপযোগীবাদী তত্ত্বকে তিনি সজোরে নাড়া দিচ্ছেন গুরু-শিষ্যের মধ্যকার সমীহ ভাবকে বজায় রেখেই। মিলের ইউটিলিটারিয়ান দর্শন নিয়ে তিনি কমলাকান্তের দফতরেও পরিহাস করেছেন। তার ভাষ্যে আবারও ফিরে যাই ‘এরূপ কখন কোন দেশে হয় নাই যে, ইতর লোক চিরকাল এক অবস্থায় রহিল, ভদ্রলোকদিগের অবিরত শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। বরং যে যে সমাজের বিশেষ উন্নতি হইয়াছে, সেই সেই সমাজে উভয় সম্প্রদায় সমকক্ষ, বিমিশ্রিত এবং সহৃদয়তাসম্পন্ন। যতদিন এই ভাব ঘটে নাই_ যতদিন উভয়ে পার্থক্য ছিল, ততদিন উন্নতি ঘটে নাই। যখন উভয় সম্প্রদায়ের সামঞ্জস্য হইল, সেই দিন হইতে শ্রীবৃদ্ধি আরম্ভ।’ এক অর্থে ধ্রুপদী অর্থশাস্ত্রের যে-উদ্বোধন ঘটেছিল স্মিথ-রিকার্ডো-মিলের হাত ধরে, তার মধ্যে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্র ছিল না। এবারে উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রের কিছু মৌলিক উপাদানের প্রতি ইঙ্গিত দিলেন বাংলার প্রথম অর্থশাস্ত্রবিশারদ বঙ্কিমচন্দ্র। তার কথিত সহৃদয়তাসম্পন্ন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও হাল আমলের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ তত্ত্বের পূর্বলেখ বলে মনে হয়।

দুর্ভাগ্য যেটা, তা হলো বাঙালি বলতে বঙ্কিমচন্দ্র বর্ণ-নির্বিশেষে ধর্ম-নির্বিশেষে অভিন্ন জাতিসত্তা বোঝাননি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এই অন্ধত্ব বিশেষ করে দেখা দিয়েছিল বাংলার মুসলমান সমাজকে স্বীকৃতি দানের প্রশ্নে। দেশের শ্রীবৃদ্ধির অসঙ্গতির আলোচনায় পরান মণ্ডল, হাসিম শেখ ও রাজা কৈবর্ত্তের উল্লেখ তবু পাই, কিন্তু জাতি-নির্মাণের প্রকল্পে কোথাও ‘হাসিম শেখ’কে দেখতে পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক চিন্তায় বঙ্কিমচন্দ্র সমতাবাদী, কিন্তু রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তায় তিনি যে নেশনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেখানে মুসলমানদের স্থান করে দেননি। ১৯৬৪ সালে আবুজাফর শামসুদ্দীন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র ফরাসি বিপ্লব নিয়ে পড়েছেন। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও জানতেন, সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি নিয়েও কখনও কখনও প্রচার চালিয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দুর ধর্মীয় পুনরুত্থান ছাড়া আর কিছুই যে বুঝতে পারেননি এটি একটি ঐতিহাসিক আশ্চর্য! এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রথমবারের মতো উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রে যে বাঙালি চিন্তকের মধ্যে মৌলিকত্ত্ব কিছুটা লক্ষ্য করা যায়, সেই চিন্তকের মধ্যেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে সুগভীর ফাটল থেকে গিয়েছিল। ফলে কার্লাইল-ডিকেন্সের বিষণ্নতার কলঙ্ক থেকে অর্থশাস্ত্রকে মুক্ত করা বঙ্কিমের মতো তীক্ষষ্টধীর পক্ষেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এক অর্থে এটি একটি ব্যর্থতার মডেল হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী বছরগুলোয়। অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর ধারণার আশ্রয়ের পাশাপাশি সামাজিক-রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে অনগ্রসর ধারণাকে লালন করার এই পরস্পরবিরোধী ধারা উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধের অনেক বাঙালির তত্ত্ব চর্চার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে। মোরশেদ শফিউল হাসানের অধুনাকালের গবেষণা ‘পূর্ব বাঙলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ : দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া’ গ্রন্থে যেসব আকর-উপাদান জড়ো করা হয়েছে, তাতে করে পাকিস্তান-উত্তর পঞ্চাশ-ষাট দশকের বাঙালি মুসলিম ‘রেনেসাঁ’ পর্বের বিভিন্ন মুসলমান চিন্তাবিদের মধ্যেও বঙ্কিম-প্রদর্শিত ফাটলের পথ ধরে চলবার প্রবণতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আকরম খাঁ থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ থেকে আবুল ফজল কেউই বঙ্কিম-প্রদর্শিত স্ববিরোধিতার পথ থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে পারেননি।

৩. দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি

অমর্ত্য সেন যেসব কারণে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ নিয়ে তাঁর মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ‘পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস্’। যেটা লক্ষ্য করার তাহলো দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যেসব রচনা পাওয়া যায় তার মধ্যে সেন-উলি্লখিত কার্যকারণের একটি পূর্ব অনুমান মেলে। ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর (যার ফলে, সরকারি হিসাবেই অবিভক্ত বাংলার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী মৃত্যুবরণ করেছিলেন) অমর্ত্য সেনের গ্রন্থের আলোচনায় আসেনি। যেমন অন্তর্ভুক্ত হয়নি উনিশ শতকের অন্তত ৫টি দুর্ভিক্ষ, যথাক্রমে ১৮৬৫/৬৬, ১৮৭৩/৭৪, ১৮৮৪, ১৮৯১/৯২ ও ১৮৯৫/৯৭। তিনি তার গ্রন্থে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ও বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কার্যকারণ ও সংঘটন।

তবে সাহিত্যের আকর-উপাদান খুঁজলে বাংলার বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়, যাতে শুধু সেনের এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের প্রমাণ্যতাই মেলে না, পাওয়া যায় আরও বাড়তি কিছু উপাদানের অস্তিত্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি মুসলমান-বিদ্বেষী উপাদানের কারণে এখন অনেকটাই অর্থনৈতিক ডিসকোর্সের বাইরে। এমনকি অর্থশাস্ত্রের ছাত্রছাত্রীরাও দুর্ভিক্ষের অর্থনীতি বোঝার প্রয়োজনে কদাচিৎ ‘আনন্দমঠ’ পড়ে দেখতে চান। বঙ্কিম অবশ্য ‘আনন্দমঠ’ লিখেছিলেন ১৭৭০-এর মহামন্বন্তর ঘটে যাওয়ার একশো বছর পরে (১৮৮০ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত)। এই দুর্ভিক্ষের আকর-উপাদান তিনি জড়ো করেছিলেন হান্টার সাহেবের লেখা ‘দ্য এনালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ পড়ে। দুর্ভিক্ষ বোঝার দৃষ্টিকোন থেকে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি পড়লে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে।

প্রথমত, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রকৃতিসৃষ্ট কিছু উপাদান (যেমন দুর্ভিক্ষের আগের পরপর তিনটি বছরেই ভালো ফসল না হওয়া) ক্রিয়াশীল থাকলেও একে মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষই বলতে চেয়েছেন লেখক। সামগ্রিকভাবে সুশাসনের অভাব একটি বড় কারণ ছিল এই দুর্ভিক্ষের পেছনে। মনে রাখতে হবে যে এই সময়ে কোম্পানির শাসনের গোড়া পত্তন হচ্ছিল। ১৭৫৭-এর পলাশীর যুদ্ধের পরাজয়ের পর, বিশেষত ১৭৬৫ সালের পর থেকে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসন গেড়ে বসতে থাকে। ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ হয় এমনই একটি উত্তরণকালীন পর্যায়ে_ যখন না কোম্পানি না দেশীয় নবাবেরা (যেমন রেজা খাঁ) পূর্ণ শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। আর উত্তরণকালীন পর্যায়ের সুযোগ নিয়ে শাসনব্যবস্থায় অরাজকতা নেমে এসেছিল। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা সরাসরিভাবে মহাজনী কারবারে যেমন, তেমনি প্রত্যক্ষভাবে লুণ্ঠনকার্যেও জড়িত হয়ে পড়েন। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট-এর কালে এডমন্ড বার্কের উত্থাপিত অভিযোগে এটি ছিল একটি বড় বিষয়। দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড খরার মুখে বাংলার ‘চৈতালি’ শস্যের বিনষ্ট হওয়ার পরিস্থিতিতে সরকার বছরের গোড়াতেই কোম্পানির সেনাবাহিনীর জন্য ‘৮০ হাজার মণ চাল মজুদ করার’ নীতি নেয়। ফলে বাজারে দুর্ভিক্ষ-পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো চালের সরবরাহ আরও কমে যায়। তৃতীয়ত, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসে ব্যাপকভাবে কুটিরশিল্পের ধ্বংসের কারণে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সে সময়ে রাজস্ব-সংগ্রহের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। মোগল আমলে গোটা গ্রাম সমষ্টিগতভাবে রাজস্ব দিত। গ্রামপ্রধান সে রাজস্ব সংগ্রহ করে মোগল সরকারের ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। উত্তরণশীল এই পর্বে গ্রামভিত্তিক রাজস্ব সংগ্রহের পরিবর্তে ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক রাজস্ব-ব্যবস্থা চালু হলো এবং সেটাও করা হলো ভিন্ন উপায়ে। আগে যেখানে উৎপাদিত শস্যের হিসাবে খাজনা দেওয়া হতো, এখন সেটা হতে থাকল নগদ অর্থে। দুর্ভিক্ষের আলামত সত্ত্বেও রাজস্ব-সংগ্রহের মোট পরিমাণ কমল না। আকাড়ার সময়ের সুযোগ নিয়ে মজুদদারি করে চালের ব্যবসায় এ সময়ে বিনিয়োগ করেছিলেন রাজকর্মচারীরা। সুপ্রকাশ রায় তার ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ বইতে জানিয়েছেন যে, ‘বাংলা ও বিহারের সমস্ত ইংরেজ বণিক, তাহাদের সকল আমলা-গোমস্তা, রাজস্ব বিভাগের সকল কর্মচারী, যে যেখানে নিযুক্ত ছিল সেখানেই দিবারাত্র অক্লান্ত পরিশ্রমে ধান, চাউল ক্রয় করিতে লাগিল’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রশাসনিক নির্দেশে আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র নিজেই যেখানে মজুদদারি, ব্যবসায় নিয়োজিত সেখানে শুধু বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’কে এখানে দোষ দেওয়া চলে না। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় পরবর্তীকালে জন স্টুয়ার্ট মিল আন্তঃজেলা খাদ্যশস্য আমদানি-রফতানি অবাধ করে দেওয়ার পক্ষে জোরালো অভিমত রেখেছিলেন।

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এসব উপাদান ছাড়াও আরও রয়েছে দুর্ভিক্ষের ক্রমবিস্তৃতির বিবরণ, এমনকি ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের মাংস মানুষে খাওয়ার আতঙ্ক উদ্রেককারী উল্লেখ। দীর্ঘ উদ্ধৃতির এখানে সুযোগ নেই, তারপরও একটি ছোট্ট বিবরণ দিচ্ছি যার থেকে দুর্ভিক্ষের বিস্তৃতির বিভিন্ন পর্যায়কে বিশ্লেষণাত্মক উপায়ে শনাক্ত করা সম্ভব:

‘অকস্মাৎ আশ্বিন মাসে দেবতা বিমুখ হইলেন। আশ্বিনে-কার্তিকে বিন্দুমাত্র বৃষ্টি পড়িল না। মাঠে ধান্য সকল শুকাইয়া একেবারে খড় হইয়া গেল, যাহার দুই এক কাহন ফলিয়াছিল। রাজপুরুষেরা তাহা সিপাহির জন্য কিনিয়া রাখিলেন। লোকে আর খাইতে পাইল না। প্রথমে এক সন্ধ্যা উপবাস করিল। তারপর এক সন্ধ্যা আধপেটা করিয়া খাইতে লাগিল। তারপর দুই সন্ধ্যা উপবাস আরম্ভ করিল। যে কিছু চৈত্র ফসল হইল, কাহারও মুখে তাহা কুলাইল না, [ওদিকে সরকার] একেবারে শতকরা দশ টাকা রাজস্ব বাড়াইয় দিল।… লোকে প্রথমে ভিক্ষা করিত আরম্ভ করিল। তারপর কে ভিক্ষা দেয়! উপবাস করিতে আরম্ভ করিল। তারপরে রোগাক্রান্ত হইতে লাগিল, গোরু বেচিল, লাঙল জোয়াল বেচিল, বীজধান খাইয়া ফেলিল, ঘরবাড়ি বেচিল, জোতজমা বেচিল। তারপর মেয়ে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর ছেলে বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর স্ত্রী বেচিতে আরম্ভ করিল। তারপর মেয়ে, ছেলে, স্ত্রী কে কেনে! খরিদ্দার নাই, সকলেই বেচিতে চায়। খাদ্যাভাবে গাছের পাতা খাইতে লাগিল, ঘাষ খাইতে আরম্ভ করিল, আগাছা খাইতে লাগিল।… অনেকে পলাইল, যাহারা পলাইল বিদেশে গিয়া অনাহারে মরিল। যাহারা পলাইল না, তাহারা অখাদ্য খাইয়া, না খাইয়া, রোগে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিতে লাগিল।’

১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের যে বিবরণ ‘আনন্দমঠ’-এ পাই তার সঙ্গে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’-এর তুলনা করলে আধুনিক দুর্ভিক্ষের সঙ্গে অষ্টাদশ-উনিশ শতকের দুর্ভিক্ষের বেশ কিছু মিল ও অমিল চোখে পড়বে। যারা চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে অর্থশাস্ত্রীয় গবেষণায় উৎসাহী তাদের জন্য। এরকম সাহিত্যিক তুলনা-প্রতিতুলনা বিরল অন্তর্দৃষ্টি জোগাতে পারে। ‘অশনিসংকেত’ উপন্যাসে (দুর্ভিক্ষ যখন দানা বাঁধছে) গঙ্গাচরণ চালের ব্যবসায়ী কুণ্ডু মশায়কে জিজ্ঞেস করলেন_ ‘ধান চাল কোথায় গেল? আপনার এত বড় দোকানের মাচা একদম ফাঁকা কেন?’ উত্তরে কুণ্ডু মশায় বললেন, ‘কি করবো বাপু, সেদিন পাঁচু কুণ্ডুর দোকান লুঠ হবার পর কি করে সাহস করে মাল রাখি এখানে বলুন। সবারই সে দশা। তারপর শুনচি পুলিসে নিয়ে যাবে চাল কম দমে মিলিটারির জন্যে’। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রেঙ্গুন থেকে চাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেল, জাপানের সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ইচ্ছে করেই ভেঙে দেওয়া হলো। মজুদদারি ব্যবসা তো ছিলই। সাধারণ ব্যবসায়ী ও কিছুটা অবস্থাপন্ন গৃহস্থেরাও যাকে বলে ‘প্যানিক হোর্ডিং’ করা শুরু করল। সরকার বাহাদুর নিজেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আমদানিকৃত চালের একটা বড় অংশ পাঠিয়ে দিলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধরত সেনাদের কাছে। এই নীতির জন্য সাম্প্রতিক এক গবেষণায় চার্চিলকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। আর দেশের ভেতরে বড় বড় আড়তদারকে বাধ্য করা হলো সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে। এই ধান ক্রয় করা হতো কন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে_ এর মধ্যে সে সময় বড় ভূমিকা পালন করেছিল পরবর্তীকালের শিল্পপতি ইস্পাহানির মতো ব্যবসায়ী গ্রুপেরা। অর্থনীতিবিদ আবদুল্লাহ্ ফারুক তার ‘কয়েকজন বাঙালী শিল্পোদ্যোক্তার জীবনী’ বইতে জানিয়েছেন যে, এ সময় মজুদদারি ও ফাটকাবাজি ব্যবসায় লগি্ন করে লাভবান হয়েছিলেন ‘দানবীর’ রণদাপ্রসাদ সাহারাও। তাই উপন্যাসে কুণ্ডু মশাইকে গঙ্গাচরণ বলছেন, ‘বুঝে কাজ করুন, কিছু চাল দেশে থাকুক। নইলে দুর্ভিক্ষ হবে যে’। উত্তরে কুণ্ডু মশাই বললেন, ‘বুঝি সব, কিন্তু আমি একা রাখলি তো হবে না। খাঁ বাবুরা এত বড় আড়তদার, সব ধান বেচে দিয়েচে গবর্নমেন্টের কন্ট্রাক্টরদের কাছে। এক দানা ধান রাখেনি।’

তারাশংকরের ‘মন্বন্তর’ উপন্যাসে পূর্ববঙ্গের এক গ্রাম থেকে বিজয় নীলাকে লিখেছে, ‘এখন মাঘ মাস, এরই মধ্যে দেখছি_ ধান প্রায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। গত বছরের ডিনায়েল পলিসি, এ বছরের অজমা, এর ওপর চোরা বাজারের কালো কাপড় ঢাকা হাত ধান টেনে নিচ্ছে।’ সরবরাহে ঘাটতির কারণে বাজারে চালের দামও বাড়ছিল দ্রুত হারে। সুব্রত রায় চৌধুরী তার ‘কথাসাহিত্য মন্বন্তরের দিনগুলিতে’ বইতে বিভূতিভূষণের ‘অশনিসংকেত’ থেকে চালের দামবৃদ্ধি সম্পর্কে একটি সারণি উপস্থাপন করেছেন। তাতে দেখা যায়, সে বছর ফাল্গুনে চালের দর মণপ্রতি ছিল ৬ টাকা, সেটা চৈত্রের শেষে দাঁড়ায় ২০ টাকা। আশ্বিন মাসে অনঙ্গ বৌ মতিকে বলছে যে, চালের দাম দাঁড়িয়েছে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে, উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের পারিশ্রমিক ছিল নিম্নরূপ_ গঙ্গাচরণের ক্ষেত্রে মাসিক আয় ১২ টাকা, দুর্গা পণ্ডিত পেতেন মাসে ৬ টাকা ৪৫ পয়া, নবীন বাড়ূই পেতেন দৈনিক ১৬ আনা করে, আর জেলে বৌ আরও কম_ দৈনিক ১০-১২ আনা করে। চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে এদের সকলেরই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল কয়েক মাসের মধ্যেই। এক পর্যায়ে নবীন বাড়ূই, জেলে বৌ বা মতি মুচিনীর হাতে কোনো কাজও ছিল না। মতি তো মারাই গেল। অর্থাৎ সাহিত্যেও অমর্ত্য সেন-ব্যাখ্যাত এক্সচেঞ্জ এনটাইটেলমেন্ট তত্ত্বের ন্যারেটিভ বিশ্বস্ততার সঙ্গে রূপায়িত হচ্ছিল।

দুঃখের বিষয়, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বঙ্কিমচন্দ্র ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে যে কাজটি বিভূতিভূষণ (বা তারাশংকর) করেছিলেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে বাংলাদেশে বা অন্যত্র কোনো বিশ্বস্ত সাহিত্যিকে বিবরণী আমরা পাইনি এখনো। সত্তর-আশি দশকের বাংলাদেশের অব্যাহত সুশাসনহীনতা, রাজনৈতিক খুন ও গুমখুন, সামরিক শাসনের অভ্যুদয়, লুটপাটের অর্থনীতি এরকম নানা উপসর্গের পেছনে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও দুর্ভিক্ষজনিত মূল্যবোধের ক্ষয় একটি মৌলিক বিনাশের সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। অন্তত এমনটাই আমার কাছে মনে হয়েছে। ১৯৭৪ নিয়ে নীরবতা এদেশের সাহিত্য ও অর্থনীতি চর্চা উভয়ের ক্ষেত্রেই ফলদায়ী হয়নি। কবিরা স্পষ্টভাষী বলে সে সময়ে কিছুটা পরিমাণে প্রতিবাদী হয়েছিলেন। রফিক আজাদ যেমন লিখেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’। শহীদ কাদরীও তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম দেন_ ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’। শামসুর রাহমানও লিখেছেন, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ বা ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’র মতো কাব্য-শিরোনাম। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ। সাধারণভাবে আমাদের সুবাধ্য সুশীল সমাজ ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ও তার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো অব্যাখ্যাত কারণে নীরব থাকাটাকেই শ্রেয়তর অবস্থান বলে মনে করেছে।

লেখক
গবেষক
প্রাবন্ধিক

উত্তর আধুনিকতার পাঠ

বিনায়ক সেন

১. আধুনিক যুগের ‘অবসান’ নেই?

ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে সময়কে তিন ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে_ যথাক্রমে প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে আধুনিক যুগের জন্ম এবং পাঠ্যবইয়ের যুক্তি অনুসারে এই যুগ এখনও চলছে। আধুনিক যুগের অবসান নেই। এক অর্থে আধুনিক যুগে উত্তরণের পর থেকে ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। এখন বড়জোর যেটা চলতে পারে তাহলো মূল ইতিহাসের বাইরে থেকে যাওয়া বিশ্বের অধিকাংশ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মেষশাবকের মতো ইতিহাসে প্রত্যাবর্তন। পাশ্চাত্যের যুক্তি_ সেটা সম্ভব কেবল আধুনিকায়নের মাধ্যমে। এটা শুধু এন্ড অব হিস্ট্রিখ্যাত ফুকোয়ামার যুক্তি নয়, সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট তাত্তি্বকদের প্রায় সবাই কমবেশি এই মতে জড়ো হয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, এদের মধ্যে মতবিভেদ ছিল না। কিন্তু তা ছিল আধুনিকায়নের মধ্যেই মতবিভেদ। এনার্কিজম, সিন্ডিক্যালিজম, বলশেভিজম নানা মতবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল উন্নত-মাঝারি, পুঁজিবাদী নানা দেশে এই সময়ে। তবে এসব ডিসকোর্সে উপনিবেশের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না, কেননা উপনিবেশের অধিবাসীদের এনলাইটেনমেন্ট-পরবর্তী ইউরোপ কখনও সমকক্ষ মানুষ বলেই স্বীকার করেনি। নইলে আমাদের ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ বলে ভাবাটাই সম্ভব ছিল না তাদের পক্ষে। আরিস্ততলের গণতন্ত্রে যেমন দাসত্বের স্থান ছিল না, কান্ট-হেগেলের বিশ্ব-ইতিহাসে বা বৃহত্তর অর্থে বিশ্ব-শান্তির চর্চায় উপনিবেশের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর ছিল না। আর বোবা ভাবলে বা করে রাখলে যা হয়, উপনিবেশ সম্পর্কে এক ধরনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মিথ্যাচারকে ক্রমাগতভাগে পুনরুৎপাদিত করা হচ্ছিল ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবিদ্যা নামক জ্ঞান কাণ্ডে। এসব তথ্য অবশ্য আমাদের ইতিমধ্যে এডোয়ার্ড সাইদের রচনা ও রণজিৎ গুহের নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চার কল্যাণে জানা হয়ে গেছে। এরা যেসব প্রশ্ন তুলেছেন তার আদি-প্রেরণা হিসেবে ছিলেন এবং আছেন মার্কস।

আধুনিকতা অথবা উত্তর-আধুনিকতা যে পথেই আপনি থাকুন না কেন মার্কসের কাছেই আপনাকে ফিরে যেতে হবে। অন্তত মার্কসের স্টেশনে কিছুক্ষণ হলেও আপনাকে জিরোতে হবে। এর কারণ, মার্কসের রচনাবলীর মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে আধুনিকতার অনিবার্যতা, তেমনি পাওয়া যাবে এর সমালোচনাও। অনেক সময় তিনি তার লেখায় যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন তা নিয়েই শতখানেক পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখা হয়েছে। একটা উদাহরণ দেই। মার্কস এক পর্যায়ে বলেছিলেন, হেগেলের রচনায় ডায়ালেকটিকসের তত্ত্ব ‘মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে’। তার মানে এখন তাকে ‘সোজা করে নিলেই’ বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসকে নিষ্কাষণ করা যাবে। এ রকম একটা ব্যাখ্যা হতেই পারে। যেমন, একটা ব্যাখ্যা হতে পারে হেগেলের মন ভাববাদী, কিন্তু তার পদ্ধতি ডায়ালেকটিক্যাল যাতে কোনো ভুল নেই। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার এতে বাধ সাধলেন। তার যুক্তি, মাথার উপরে দাঁড়ানো হেগেলীয় পদ্ধতিকে সোজা করে নিতে গেলে নাট-বল্টু সবকিছুতে এলোমেলো হয়ে যায়। মার্কসীয় ডায়ালেকটিকস হেগেলের লেখা থেকে নয়, মার্কসের নিজের লেখা থেকেই আবিষ্কার [নিষ্কাষণ] করে নিতে হবে। সে সূত্রে তিনি মার্কসের মধ্যেই হেগেলীয় ‘তরুণ মার্কস’ আর স্বকীয় মহিমায় ভাস্বর ‘পরিণত মার্কস’_ এ দুইয়ের মধ্যে খুঁজে পেলেন ‘জ্ঞানতাত্তি্বক ভেদরেখা’ [এপিস্টেমোলজিক্যাল ব্রেক] । যা হোক এসব তর্ক ও ধন্দের কারণে মার্কসকে কখনও আধুনিকতাবাদীরা তাদের দলে টানার চেষ্টা করেছেন। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের অনেকেই মার্কসের রচনায় আধুনিকায়নের ‘নষ্ট রক্ত’ খুঁজে পেয়েছেন। আবার ফ্রেডেরিক জেমেসনের মত উত্তর-আধুনিক মার্কসবাদীরা মার্কসকে তাদের আদি-প্রেরণা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্যরা যারা প্রথম দিকে বেশ সোচ্চারেই মার্কস-বিরোধী ছিলেন বা সেদিকেই তাদের কণ্ঠ বেশি করে শোনা গেছিল, পরবর্তীতে তারাও তাদের মত কিছুটা বদলেছেন। বিশেষভাবে এটা ঘটেছে ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদার রচনায়_ স্পেক্টর অব মার্কস গ্রন্থের পর থেকে। ফুকোর শেষের দিকে রচনায় জোরেশোরে ফিরে এসেছে ইতিহাসে কর্তার [সাবজেক্ট] ভূমিকা, ফলে মার্কসের রচনার মতোই তরুণ ফুকো ও পরিণত ফুকোর মধ্যে বেশ খানিকটা ভেদরেখা সৃষ্টি হয়ে গেছে।

এসব বিভিন্নবিধ সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনার পেছনে মূল তাগিদ হচ্ছে সমাজকে বদলানো। আর সমাজকে বদলাতে গেলে প্রথাগত ব্যবস্থার দুই প্রধান সহায়ক শক্তি_ রাষ্ট্রযন্ত্র ও অর্থনীতি_ এদেরকেও যে বদলাতে হয়। আর এই পাল্টে দেয়ার ব্যাপারটা তো পুরোনো দালান ভেঙে নতুন দালান করার প্রকল্প নয়। একেক রাষ্ট্র ও একেক অর্থনীতি একেক ধরনের সমাজ ও সেই সঙ্গে একেক ধরনের ‘মানব’ তৈরি করে থাকে। আমরা যে কথার কথা হিসেবে বলি, উনি বেশ সনাতনী ধারার লোক, উনি বেশ চলতি হাওয়ার পন্থী সেসব আদৌ কথার কথা নয়।

আধুনিকায়নের মধ্যে থাকতে থাকতে আমাদের অন্দর-মহলেও আধুনিকায়ন ঢুকে পড়ে। চিন্তা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই, কিন্তু মনের জানালা দিয়ে আধুনিকায়নের স্বপ্ন কুয়াশার মতো ঢুকতে থাকে। ঢাকার রাস্তায় হাঁটি, কিন্তু মনে মনে ঢাকা শহরকে দেখি না, আসলে হাঁটতে থাকি ম্যানহ্যাটানের ফুটপাতে। এদেশ এগুচ্ছে; তার বিলবোর্ড করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি বা আইফেল টাওয়ারের কথা। গ্রাম-বাংলার তপ্ত দুপুরের রোদে কাজ থামিয়ে ক্ষেতের পাশেই গামছা বিছিয়ে নামাজ পড়ছে যে বৃদ্ধ কৃষক তার মুখচ্ছবি আমাদের বিলবোর্ড থেকে হারিয়ে যায়। রণে-বনে- সংকটে আমরা পীর-মুর্শিদ বা পুণ্যধামে ছুটি না আর। নবযুগের পীর-আউলিয়া ড্যান মজীনারা আমাদের আশ্বস্ত করেন। কোন পথ ধরে এগুলে আমরা পাশ্চাত্যের গুডবুকে থাকব, জিএসপি সুবিধে বাতিল হবে না, বা পাব ‘মডারেট মুসলিম ডেমোক্রেসি’র খেতাব, আর কি করা গেলে ওবামা বা নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন ঢাকায়, এমডিজিতে সাফল্যের করণে_ চাই কি শান্তির নোবেল_ এসব আমাদের রাষ্ট্রীয় তৎপরতার একটি প্রধান সাফল্য-সূচকে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ছোট ইংরেজ বড় ইংরেজ’ ধারণা অনুসরণ করে বলা যেতে পারে ‘ছোট আধুনিকতা’ [তৃতীয় বিশ্ব] বনাম ‘বড় আধুনিকতা’ [পশ্চাত্য] এই খেলাই চলছে এখন।

২. আধুনিকতার আদি প্রতিশ্রুতি

‘আধুনিকতার’ কোন একক সংজ্ঞা নেই। অর্থশাস্ত্রে আধুনিকায়ন [মডার্নাইজেশন] বলতে নগরায়ন, শিল্পায়ন প্রভৃতি ধারণা ব্যক্ত হয়ে থাকে। সমাজতত্ত্বে [ইংরেজিতে_ সোশ্যাল থিওরি] আধুনিকতা বা মডার্নিটি আবার ‘পুঁজিবাদ’ ধারণার সমার্থক। উত্তর-আধুনিকেরা অবশ্য পরবর্তীতে দেখিয়েছেন যে, প্রথাগত সমাজতন্ত্রের ধারণাতেও আধুনিকতার মন্দ অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। পুঁজিবাদের মতো প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নির্মাণে, শিল্পায়নের পরিকল্পনায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে, নগর-ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধারার প্রযুক্তি-নির্ভর অবিবেচক মানসিকতা, একই ধরনের প্রবৃদ্ধি [গ্রোথ] মুখীনতাকে মানব-কল্যাণের উপরেও স্থান দেওয়া হয়েছিল। স্তালিনের শাসনামলেই ‘আদি সমাজতান্ত্রিক পুঁজি সঞ্চায়নের’ মাধ্যমে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবৃদ্ধিশীল দেশে পরিণত হয়েছিল ১৯২৬-৩৬ পর্বে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্র্তীতে ফেলদ্ম্যান-হ্যারড ডোমার প্রবৃদ্ধি-মডেলের উপত্তিগত ভিত্তি যুগিয়েছিলেন। এটা করতে গিয়ে যে অমানুষিক খেসারত দিতে হয়েছিল সেটা বড় বিবেচনা নয় এখানে। এর মধ্য দিয়ে প্রথাগত সমাজতন্ত্রে ক্রমশ স্থান করে নেয় যন্ত্র-মানব, যন্ত্রের রাজত্ব, বৃহত্তর-অর্থে ‘কলের নেশন’। ‘রক্তকরবী’র রাজা যেমন অনুভব করেছিলেন তারই সৃষ্ট যন্ত্র আর তার বশ্যতা মানছে না সেভাবেই একপর্যায়ে বিপর্যস্ত বোধ করেছিল প্রথাগত সমাজতন্ত্র। ক্রমশ প্রকৃতির প্রতি মেষপালকের মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জায়গা করে নিতে থাকে যন্ত্র-মানবের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘আই-রোবট’ সিরিজের লেখক আইজাক আসিমভ যেসব রোবটিক্যাল প্রিন্সিপলের কথা বলে গেছেন_ যা নিয়ে একুশ শতকে আমাদের আরও ভাবতে হবে_ সেসব নিয়ম মানেনি কলের রাজত্বের নব্য শাসকেরা। এর ফলেই নিয়ম উনিশ-বিশ শতকের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয় ব্যবস্থাই ধারাবাহিকভাবে সংকটে পড়েছে।

এনলাইটেনমেন্টের তাত্তি্বকরা আধুনিকায়নের মাধ্যমে মানবকল্যাণ সাধনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেই যুগ এখনও আমাদের দেখতে বাকি। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের একটি বড় অংশই সে কথা মনে করেছেন। টেকনোলজিক্যাল মেন, ওয়ান-ডাইমেনশনাল মেন, ডেথ অব মেন_ এসব ধারণার মধ্য দিয়ে সমালোচকেরা চেয়েছেন সভ্যতার নতুন পর্যায়। দেরিদাঁ যাকে সুন্দর করে বলেছেন একটি আপ্ত-বাক্যে_ ‘যে গণতন্ত্র আসতে বাকি’ [ডেমোক্রেসি-টু-কাম]। অর্থাৎ এখন গণতন্ত্রের নামে উন্নত বিশ্বে [এবং সারা বিশ্বে] যা চলছে তা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। আধুনিকতার মধ্যেই যারা বিকল্প সম্ভাবনা খোঁজেন সে রকম একজন জার্মান দার্শনিক হাবেরমাস_ তারও বক্তব্য এটাই। পাবলিক রিজন বা তর্ক-বিতর্ক-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সিভিল সমাজ নতুন কোন পথ খুঁজে নেবে ইউরোপে যা পাশ্চাত্যের অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র ও অসাম্যকে অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। বোদ্রিলার থেকে লিওতার পর্যন্ত ‘খাঁটি’ চরম উত্তর-আধুনিকতাবাদীরাও এতে হয়তো সায় দিতেও পারেন।

৩. ‘আধুনিকতা’ কি করতে চাইছে?

যে বিষয়ে সংজ্ঞা দেওয়াই কঠিন তা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করাই এক ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। আধুনিকতার সরলতম সংজ্ঞায় মৌল উপাদানকে [দাবিকে] চিহ্নিত করা যেতে পারে। তার মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া হচ্ছে আধুনিকতার প্রথম দাবিটি। সেটি হচ্ছে, সব ধরনের সমাজকেই একটি অভিন্ন ছাঁচে ঢালার চেষ্টা, বা সমসত্ত্বতার [হোমজেনিটি] দাবি। মনে করুন, আপনি গত এক মাসে বিভিন্ন মহাদেশের বেশক’টি দেশের বড় বড় শহরেই ঘুরে এলেন। প্রতিটা শহরেই আপনি থেকেছেন পাঁচতারা হোটেলে। প্রতিটা হোটেলেই যে রুমে আপনি ছিলেন তাতে ছিল একই ধারার টিভি, বাথরুমের অভিন্ন ফিটিংস, কার্পেটিং এবং দেয়ালে প্রায় একই ধারার আধুনিক চিত্রকর্ম। হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারে যে রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেলেন সেটিও [ধরা যাক] ছিল ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেলেন একই ধারার বিমানে করে, একই ধরনের সিটে বসে, একই ধরনের হলিউডি বা বলিউডি সিনেমা দেখতে দেখতে এবং প্রায় একই ধরনের স্ন্যাক ও পানীয় খেতে খেতে। এমনকি প্রায় একই ধরনের হাসি হেসে প্রায় একই ধরনের পোশাকের ও চেহারার বিমানবালা আপনাকে জানালো তার মাপা অভিবাদন। প্রায় একই চেহারার বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আপনি প্রায় একই রঙের ক্যাবে করে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেখানে সর্বত্র দেখেছেন একই ধরনের কোম্পানির বিজ্ঞাপন সংবলিত বিলবোর্ড। এত ‘সমসত্ত্বতার’ মধ্যে চলতে চলতে, বাস করতে করতে, একসময় আপনার হঠাৎ মনে হতেই পারে যে আপনি আসলে কোথাও যাননি, একই জায়গাতেই রয়ে গেছেন। আপনি আসলে টেরই পাচ্ছেন না কখন আপনি মেক্সিকো সিটিতে, কখন ন্যুয়র্কে, লন্ডনে, বার্লিনে, জোহানেসবার্গে, দুবাইয়ে, দিলি্লতে, ব্যাংককে বা সিডনিতে আছেন। এসব শহরের যে সার্কিটে আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাতে করে স্থানের ও সময়ের কোনো বিশিষ্টতা খুঁজে পাচ্ছেন না আর [একমাত্র গায়ের রঙে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা ছাড়া]। কেননা, পোশাকে-আশাকেও সর্বত্র আপনি যাদের দেখছেন তারা প্রায় একই ধাঁচের জিনস, টপস, সানগ্গ্নাস পরে হালফিলের ল্যাপটপ বা আই-প্যাড নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই গল্পটা কল্পিত হলেও অবাস্তব বা অবিশ্বাস্য নয়। আধুনিকতা নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা এমনই এক সমসত্ত্ব সমাজকে [জগতকে] কল্পনা করি। এই হচ্ছে আধুনিকায়নের পয়লা নম্বর দাবি। পুঁজিবাদ সারা বিশ্বকেই তার নিজের ছাঁচে গড়ে-পিটে তুলবে তা সে আদিবাসী-অধ্যুষিত অরণ্যই হোক, কৃষক-সমাজই হোক, আর নোমাডিক বা বেদুইন পশুপালক গোত্রই হোক। সুদূর জাভা থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, দূরবর্তী পাপুয়া নিউগিনি থেকে আন্দিস পর্বতমালা, ভারতবর্ষ থেকে সাহারা অঞ্চলবর্তী আফ্রিকা_ সর্বত্রই শিল্প-পুঁজি, বণিক-পুঁজি বহুজাতিক পুঁজি তার বাজারের সন্ধানে অনুপ্রবেশ করবে, বদলে দেবে প্রাগ-পুঁজিবাদী দৃশ্যপট এবং দেখাবে একটাই সিনেমা_ মেড ইন ইউএসএ বা মেড ইন ইউরোপ। সমসত্ত্বতার এই দাবিতে ক্ষুব্ধ উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের বক্তব্য এর ফলে হ্রাস পাচ্ছে জীবনবৈচিত্র্য, সামাজিক বৈচিত্র্য, প্রতিভার বৈচিত্র্য। এই আধুনিকতা আসলে সৃষ্টিশীলতা বিনাশী, কেননা এটা ব্যক্তিক/আঞ্চলিক সংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিনষ্ট করছে। তাছাড়া সমসত্ত্ব ছকে ‘উন্নয়ন’ সম্ভব নয়, যেমন এক সাইজের জ্যাকেটে সবাইকে কাপড় পরানো চলে না। যদিও ওয়াশিংটন কনসেসাস সেটাই করতে চেয়েছিল গত দু’দশক ধরে। আধুনিক সরল সমসত্ত্বতার বিপরীতে উত্তর-আধুনিকেরা চেয়েছেন জটিলতর অসমসত্ত্বতা, বিভিন্ন কোরাস, ভিন্ন ভিন্ন পথে চলার নমনীয়তা।

আধুনিকতার দ্বিতীয় দাবিটি ক্ষমতা-সম্পর্কিত। এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতি আধুনিকতার পক্ষপাতিত্ব। এর সবচেয়ে কাছের উদাহরণ_ আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা। সমাজে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকলেও রাষ্ট্র্রের ক্ষমতা সমাজের আর সব ক্ষমতার উপরে। সবার উপরে রাষ্ট্র সত্য তাহার উপরে নাই_ এটি হচ্ছে আধুনিক চণ্ডীদাসের স্ল্নোগান। প্রথাগত সমাজতন্ত্রেও একই চেহারা। পার্টির বা এর পলিটব্যুরো সেখানে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। তুলনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভবন থাকলেও সেখানেও রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী-নির্ভর সরকার ব্যবস্থা কেন্দ্রাতীগ ক্ষমতার প্রায়োগ করে থাকে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসানের পর এক বিশ্বের ধারণা সারাবিশ্বে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক প্রয়োগকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। বিশ্বব্যাংকে বিশ্বের প্রায় সব দেশই সদস্য। কিন্তু সেখানে এক দেশ এক ভোট প্রথা নেই। বিশ্বব্যাংকের তহবিলে যার হিস্যা যত বেশি তার তত বেশি ভোট। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে একাই প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভোটে ক্ষমতাবান। অর্থাৎ সবই সমান, বলা হলেও আধুনিক গণতন্ত্রে কেউ কেউ ‘বেশি সমান’। এ ধরনের গণতন্ত্রে এক মানুষ-এক ভোট ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত প্রবর্তিত হয় এক ডলার-এক ভোট ব্যবস্থা অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষমতা যার যত বেশি তার হাতে তত বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের পটভূমিতে স্টিগলিৎজ মহাশয় এই বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছেন।

আধুনিকতার এই দ্বিতীয় দাবিটিকেও মেনে নিতে পারেননি উত্তর-আধুনিকেরা। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এ কালের পুঁজিবাদের সঙ্গে সেকালের পুঁজিবাদের পার্থক্য ঘটে গেছে গত কয়েক দশকে। সেকালের পুঁজিবাদে ক্ষমতার প্রয়োগ হতো এক-কেন্দ্র থেকে। কিন্তু এ কালের পুঁজিবাদে ক্ষমতা আর এক কেন্দ্রে সীমিত নেই; ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র ও উৎস ছড়িয়ে আছে নানা স্থানে। এটি ছড়িয়ে আছে স্কুলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্বাস্থ্যনিবাসে, জেলখানায়, পুলিশ ও সামরিক দপ্তরে, পরিবারের ভেতরে, বাজারের সিন্ডিকেটে, টেলিভিশনের চ্যানেলে, পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, খেলার মাঠে অর্থাৎ ক্ষমতা প্রায় সর্বত্র বিরাজমান। তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভুত্বশীল শ্রেণীর ক্ষমতার চর্চাকে পূর্ণ গণতন্ত্রায়ন করতে গেলে বা জনমানুষের স্বার্থের সম্পূর্ণ অনুকূলে নিতে গেলে শুধু রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে বা রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্রায়ন করলে চলবে না। সমাজের আর বাদবাকি যেসব প্রতিষ্ঠানের কথা উপরে উল্লেখ করা হলো তার প্রতিটাতেই গণতন্ত্রায়ন সাধিত হতে হবে। মিশেল ফুকো যেমন দাবি করেছেন, ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রে থাকে না; এটা বহমান রয়েছে শিরায়-উপশিরায়-তন্তুতে_স্নায়ুকোষে-ডিএনএ-তে। উত্তর-আধুনিকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার এই সর্বব্যাপী অস্তিত্বের কারণে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলালেই ক্ষমতার অবলুপ্তি ঘটে না, এতে করে বড়জোর ক্ষমতার হাতবদল ঘটে মাত্র। এই সূত্রে তাঁরা প্রথাগত সমাজতন্ত্রের মধ্যে ক্ষমতার আরও বোঝা হয়ে ‘গেড়ে বসাকে’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। জারতন্ত্র সরিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলেও ক্ষমতার দাপট কমেনি। পার্টি ও রাষ্ট্রের একশ্রেণীর আমলাদের হাত দিয়ে ক্ষমতার চর্চা চলেছে। এর কারণ, সমাজের নানা স্তরে জারতন্ত্রের শেকড় রয়ে গিয়েছিল অথবা নতুন করে পার্টিতন্ত্র সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার ক্ষমতার শেকড় ছড়িয়েছিল। মার্কস কথিত ‘ফ্রি এসোসিয়েশন অব ফ্রি প্রোডিউসার্স’ আর করা যায়নি। এ তো গেল প্রথাগত সমাজতন্ত্রের কথা। উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতা চর্চার আরও সূক্ষাতিসূক্ষ্ম শেকড়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন ফুকো ও তার অনুসারীরা। যেমন ফুকোর একটি প্রসিদ্ধ বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতাসীনেরা টিকে থাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সত্য-উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বস্তুগত উৎপাদনের মতো ‘সত্য-উৎপাদন’ পুুঁজিবাদী সমাজ-ব্যবস্থার একটি বৈশিষ্ট্য। এসব সত্য আপাত দৃষ্টিতে স্থান-কাল নিরপেক্ষ উদাহরণ মনে হলেও এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে ক্ষমতা-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। আবদুল মান্নান সৈয়দ যেমন লিখেছিলেন, ‘সত্যের মত বদমাশ’। এমনকি নিরীহতম গবেষণা-কাণ্ড যেটি তার মধ্য দিয়েও এমন সব সত্য উদ্ভাবন বা নির্মাণ করা হচ্ছে যার আসল লক্ষ্য_ মানবকে আরও বেশি করে শাস্ত্রের অধীনে আনা, এনে তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, তাকে মুক্ত করা নয়। ফুকো যেমন চিকিৎসা-শাস্ত্রের ইতিহাস ঘেঁটে জানিয়েছেন, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ ব্যবহারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে নতুন মনোবিদ্যায়। ব্যবহারের ‘স্বাভাবিকীকরণের’ [নর্মালাইজেশন] মাধ্যমে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সংক্ষুব্ধ শক্তিকে বশীভূত করা হয়েছে বিভিন্ন বিদ্যার, বিজ্ঞানের, রীতির, আচারের সমবেত প্রয়োগের মাধ্যমে। এর ফলে এক পর্যায়ে খাঁচার সব দরোজা খুলে দিলেও বনের পাখি আর উড়ে যেতে পারছে না_ স্বেচ্ছায় সে থেকে যাচ্ছে গৃহপালিত পাখি হিসেবেই।

উত্তর-আধুনিকেরা এই সত্য-উৎপাদনের তত্ত্ব ও তার ফল-পরিণামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক হিসেবে ফিরে যাচ্ছেন আন্তোনিও গ্রামসির সর্বেশ্বরতার [হেজিমনি] তত্ত্বে। আল থুসারের ‘আইডিওলজিক্যাল এপারেটাস অব স্টেট’ ধারণারও এটি কিছুটা অনুবর্তী। তবে গ্রামসি ও আল থুসার দুজনেই সত্য [বা ভাবাদর্শ] উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র-ক্ষমতার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচ্ছন্ন প্ররোচণা হিসেবে দেখেছিলেন। উত্তর-আধুনিক তাত্তি্বকদের কাছে, সত্য-উৎপাদন কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন চক্রের সজ্ঞান ষড়যন্ত্রের পরিণাম নয়। রোগ-জীবাণুর মতো তত্ত্ব বা সত্য নিজেই ক্ষমতার ধারক-বাহক হয়ে উঠতে পারে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে_ তাতে রাষ্ট্রের বিশেষ দপ্তরের ষড়যন্ত্রের বা সালতামামির প্রয়োজন নেই। এর মধ্য দিয়ে উত্তর-আধুনিকেরা নিজস্ব মূল্যেই তত্ত্ব নির্মাণ, মতাদর্শ প্রচার, বিশ্বাস ও ভাবাদর্শ_ জ্ঞানচর্চার যে কোন রূপকেই_ আরও বেশি ঘনিষ্ঠ ভাবে, জোরালো ভাবে, বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে একটি প্রশ্নে আধুনিকতাবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী উভয়েই এক-অবস্থানে। উভয়েই মনে করেছেন যে একালের পুঁজিবাদে সবকিছুই পরিণত হয়েছে পণ্যে। শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান মানব-সৃষ্টির কোনো শাখাই আর মার্কস-কথিত পণ্যমোহবদ্ধতার [কমোডিটি ফেটিশিজম] বাইরে, থাকছে না। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, সব কিছুই যদি পণ্য হয় [যেমন চে গুয়েভারার বিপ্লবী প্রতিকৃতির পোস্টার] তাহলে মানব-মুক্তি আসবে কোন পথে? যদি সমাজের সব খাতই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে এসে গিয়ে থাকে তাহলে প্রতিরোধ দানা বাঁধবে কি করে? এর উত্তরে ফুকো বলেছিলেন, যেখানেই ক্ষমতা সেখানেই প্রতিরোধ দানা বেঁধে ওঠে। মানুষের মধ্যে কোথাও স্বভূমির অস্তিত্ব থেকে যায় সমস্ত বন্দিদশার মধ্যেও। যেখানে পাখা মেলে মুক্তির বাসনা। ফুকো নিজেকে কখনো উত্তর-আধুনিক বলে দাবি করেননি। তবে ফুকো বা উত্তর-আধুনিকেরা ‘আধুনিকতার’ যে সমালোচনা নির্মাণ করেছিলেন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে। তাঁরা প্রায় কেউই উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের বাইরের তৃতীয় বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে পারেননি। শেষোক্ত ক্ষেত্রে জোরেশোরে এগিয়ে আসে উত্তর-উপনিবেশিক সমাজের তাত্তি্বকেরা। উত্তর-উপনিবেশিকতাকে [পোস্ট কলোনিয়ালিটি] বিচারের মধ্যে এনে তারা পুঁজিবাদী আধুনিকতার আরেকটি চেহারা তুলে ধরেন। এই চেহারাটি মূলত ‘কপট, প্রতারক ও মায়াবী’ আধুনিকতার, যার মোদ্দা কথা হলো : হয় ছলে, নয় বলে, যে কোনো কৌশলে সাম্রাজ্য বিস্তার করো, অথবা প্রয়োজনে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম_ এমন শক্তিকে যে কোনো উপায়ে দুর্বল করে দাও। বাংলার উপনিবেশিক আমলের একটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় টেনে আনছি। এর মধ্য দিয়ে উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশের পরিসরে আধুনিক ক্ষমতা-সম্পর্কের ‘কপট প্রতারক ও মায়াবী’ চরিত্রটি কিছুটা হলেও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

৪. আধুনিকতার স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ

উনিশ শতকের তিরিশের দশকের কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। উপনিবেশ ভারতের শিক্ষাদানের ভাষা, পাঠ্যসূচি ও সাহিত্য কীভাবে গড়ে তোলা উচিত তা নিয়ে জোর তর্ক চলছে ইংরেজদের মধ্যে। তর্কটা হচ্ছে ওরিয়েন্টালিস্ট ও এংলিসিস্টদের মধ্যে। কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনের সদস্যরা এ নিয়ে প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। ১৮৩৫ সালে লিপিবদ্ধ এর কার্যবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে, কমিটির অর্ধেক সদস্যরা ইংরেজিতে শিক্ষাদানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। বাকি অর্ধেকের রায় নেটিভদের মধ্যে প্রচলিত শিক্ষারীতির পক্ষে। আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় পাঠদান অব্যাহত থাকুক_ এটাই তারা চাইছেন। তরুণ জন স্টুয়ার্ট মিলও এই শেষোক্ত দলের পক্ষ হয়ে কলম ধরেছেন। এই বিতর্কের দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছেন গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক নিজেও। বিদগ্ধ টমাস বেবিংটন ম্যাকলে চান নেটিভদের মধ্যে এংলিসিস্ট সাহেবদের একটি দেশীয় শ্রেণী গড়ে তুলতে। তাঁর লক্ষ্য, উপনিবেশ ভারতে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে কেবল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাঠদান করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এ পথেই কেবল শিক্ষার বিস্তার ঘটতে পারে উপনিবেশে। আলোকপ্রাপ্তি হতে পারে স্থানীয় অধিবাসীদের। এভাবেই বর্বরতার যুগ থেকে উত্তরণ ঘটতে পারে আধুনিকতায়। বিতর্কের এক পর্যায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাকলে সাহেব যা বললেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের ইংরেজ শাসকদের জন্য ‘ম্যানিফেস্টো’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মোটা দাগে সেটা শোনালো এ রকম : ‘আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আসলে কোন ভাষা জানাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য সংস্কৃত বা আরবি কোনো ভাষাই আমার জানা নেই। তবে, এসব ভাষার কতটুকু অন্তর্নিহিত মূল্য তা যাচাইয়ের জন্য যা করার তার সবই আমি করেছি। আরবি ও সংস্কৃত ভাষা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ গ্রন্থগুলো আমি পড়েছি। যারা এসব ভাষায় কথা বলে থাকেন তাদের সঙ্গে আমি আলাপ-আলোচনা করেছি। যারা প্রাচ্যবিদ বলে পরিচিত, প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে তাদের জ্ঞানকে আমি মান্য করি। এসব প্রাচ্যবিদের মধ্যে আমি আজ পর্যন্ত একজনকেও পাইনি যিনি অস্বীকার করেছেন যে, একটি ভালো ইউপরোপীয় গ্রন্থাগারের যে কোনো তাকও ভারতবর্ষ ও আরব ভূভাগের সমগ্র নেটিভ সাহিত্যের সমান মূল্যবান!’ ম্যাকলে সেদিন যা বললেন, তার একদশকের মধ্যে বাংলায় শুরু হলো ‘রেনেসাঁ’। ১৮৫০-এর দশকে রেলগাড়িও এলো এদেশে। এরপর থেকে গ্রাম হয়ে গেল অজপাড়া-গাঁ, আর শহর হয়ে পড়ল আধুনিকতার কেন্দ্র। সেদিনের নবজাগরণের নায়কেরা ম্যাকলের কথাতেই আস্থা আনলেন। তাঁদের সবারই স্বপ্ন ছিল, ম্যাকলে বর্ণিত ইউরোপীয় ভাষা-সাহিত্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ওপর ভর করে ‘আধুনিক জাতি’ হিসেবে একদিন জগৎ সভায় তাঁদের সমাজ স্থান করে নেবে। ঔপনিবেশিক চিন্তার সঙ্গে আমাদের নাড়ির বন্ধনের সেখানেই সূত্রপাত। আধুনিকতার স্বপ্ন দেখার শুরু সে সময়েই। বিষয়টা তাহলে দাঁড়াচ্ছে_ আমাদের জীনের সমস্যা।

এর পরবর্তী একশ বছর ধরে ‘আধুনিক’ শব্দটা এতটাই প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছিল আমাদের যে তা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘সভ্যতা’ বা সিভিলাইজেশনের নামান্তর। উনিশ-বিশ শতকের ভদ্রসম্প্রদায় বা ভদ্রলোক এসব শব্দবন্ধের মধ্যে যে ভদ্রতার ‘ধারণা’ মিশে ছিল তাকে ওই আধুনিকতার বাইরে আর কল্পনা করা যাচ্ছিল না। যুক্তিটা ছিল এ রকম : প্রাগ-আধুনিকেরা প্রাচীনপন্থি, রক্ষণশীল, পুরনো সংস্কারের মধ্যে আবদ্ধ জীব; যেন তারা প্রায় অসভ্য, আন-সিভিলাইজড। এর বিপরীতে আধুনিকেরা হচ্ছে প্রগতিপন্থি, চলতি হাওয়ার দল, বিজ্ঞানমনস্ক, জাত-পাত না-মানা বিদ্রোহী; যেন তারাই একমাত্র সভ্য, সিভিলাইজড। এ রকম দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ল বাংলার বিদ্বৎসমাজ_ প্রথমে হিন্দুরা, পরে একপর্যায়ে এই বিভক্তি দেখা দিল কালক্রমে মুসলমান সমাজেও। অবশ্য কারও কারও মতিভ্রমও হলো_ একবার কেউ এ দলে নাম লেখালেন, আরেকবার অন্য দলে ভিড়ে গেলেন। যেমনটা হলো কেশবচন্দ্র সেন, বঙ্কিমচন্দ্র ও মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রে। কিন্তু আধুনিকতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের শিবিরবিভক্তির কয়েকটি বেদনাদায়ক ও সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া দেখা গেল অন্যত্র, যার প্রভাব বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য ভালো হয়নি।

প্রথমত, ইউরোপীয় ধারা মেনে চললে আধুনিক, নইলে তা রক্ষণশীল ও অনাধুনিক_ এ রকম একটি চটকজলদি সমীকরণ তাঁবু গাড়ল প্রথাগত জ্ঞানচর্চায়। এমনকি মনের ভুবনেও_ সেটা কিছুটা জ্ঞাতসারে, কিছুটা অজ্ঞাতসারে। প্রাগ-আধুনিক হয়েও তো সভ্য, ভদ্র ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায়। যেতে পারে। এ রকম সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া আর সহজে সম্ভব হলো না। শুধুমাত্র এই কারণেই ভূদেব মুখোপাধ্যায়_ যিনি ধর্ম ও পরিবার চিন্তায় সনাতনীয় হলেও ছিলেন হিন্দু ও মুসলমান এ দুই ধর্মের মধ্যে ব্যবহারিক, জ্ঞানগত ও আত্মিক যোগসূত্র স্থাপনে বিশ্বাসী ও উদগ্রীব_ তার সমসাময়িক বঙ্কিমের মতো তেমন কোনো গুরুত্ব পেলেন না বাংলার বিদ্বৎসমাজে। বঙ্কিমকে উপর্যুপরি ‘আনন্দমঠ’ ও ‘কৃষ্ণচরিত্র’ লেখার পরও সে রকম কোনো অপযশ কুড়াতে হলো না তাঁর স্বধর্মীদের কাছ থেকে। অথচ, ভূদেব ‘স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস’-এর মতো মৌলিক গ্রন্থ লিখেও পেলেন না সামাজিক বিজ্ঞানীর যথাবিহীত সম্মান। অর্থশাস্ত্রে বঙ্কিমের তুলনায় তাঁর অধিকতর বুৎপত্তিও আড়ালেই থেকে গেল। এর কারণ, বঙ্কিমচন্দ্রকে বরাবর দেখা হয়েছে ঔপনিবেশিক ভারতের এক পথিকৃৎ ‘আধুনিক চিন্তক’-এর ভূমিকায় [যে আধুনিকতার সংজ্ঞা আবার উপযোগবাদী মিল বেন্থাম দ্বারা নির্দিষ্ট]।

দ্বিতীয়ত, প্রাগ-আধুনিক মানেই প্রাচীনপন্থি ও রক্ষণশীল এ রকম মনে করার কারণে যা-কিছু ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের বাইরে, তাকেই অস্বীকার বা খাটো করে দেখার একটা প্রবণতা দেখা দিল। মহামতি কৌটিল্য যে কিসিঞ্জারের মতোই ‘আধুনিক’ হতে পারেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিস্তারে সে সম্ভাবনাকে আমলে নেওয়া হলো না। আকবর বাদশাহ ও আবুল ফজল মিলে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে নমুনা খাড়া করেছিলেন তা ইউরোপীয় ‘সেক্যুলার’ আদর্শের তুলনায় কোনো অংশে কম আদরণীয় অর্জন ছিল না_ সেটাও আমরা অনেককাল পর্যন্ত মনে রাখিনি। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীতে চেষ্টা করেছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য_ বিশ্ব সভ্যতার এ দুই ঐতিহ্যের মধ্যে সভ্যতার ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করতে। ইউরোপের মানবতন্ত্রের সাথে বাংলার আউল-বাউল-সহজিয়া ধারার ‘মনের মানুষ’-এর মানবতন্ত্রের মধ্যে ‘সমকক্ষতা’ প্রতিষ্ঠা করা ও তাঁর দর্শনচিন্তার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। এককথায়, তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপীয় আধুনিকতার সঙ্গে বাংলার আধুনিকতাকে সমকক্ষতার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে। কিন্তু তার কথা আমরাও শুনতে চাইনি, আর ইউরোপীয় মনীষা শুনতে চাইলেও তা বুঝতে অপারগ থেকেছে। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো রবীন্দ্রনাথও যে মুক্ত-চিন্তক বা ‘ফ্রি-থিংকার’ হতে পারেন, সেভাবেও আমরা তাকে বিচার করতে পারি_ সেসব কোনো সম্ভাবনা আমাদের মনে জাগেনি। ১৮৩৫ সালের কার্যবিবরণীতে ম্যাকলে তাঁর ভাষণে যেমন বলেছিলেন, প্রাচ্যের আছে কেবল কিছু মহান কবি, কিন্তু তারা তো কল্পনার রাজ্যে বিরাজ করে থাকেন মাত্র। জ্ঞানের রাজ্যে তাদের কোনো দক্ষতা নেই। রবীন্দ্রনাথকেও আমরা সেভাবেই কমবেশি কবির শিরোপা পরিয়ে দিয়ে জ্ঞানচর্চার মূলক্ষেত্র থেকে সরিয়ে রেখেছি।

প্রাগ-আধুনিককে খাটো করে দেখার কারণে তৃতীয় যে সমস্যা দেখা দিল তা হলো, ইউরোপীয় আধুনিকতাকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বড়ো ও মহার্ঘ করে আমরা দেখতে শুরু করলাম। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। এখনও বিশ্বব্যাংক বা মার্কিন দূতাবাস বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিছু বললে আমরা ‘তা ঠিক, তা ঠিক’ করতে থাকি। উপনিবেশে ইউরোপ যেসব নিয়ম-কানুন, রাষ্ট্রযন্ত্র, তত্ত্ব ও আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা শুরু করল তাকেই আমরা নির্বিচারে মেনে নিতে শুরু করলাম ‘আধুনিক মানুষ’ হওয়ার সাধনায়। ইউরোপ যখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর গুরত্ব দিতে শুরু করল উনিশ শতকে, উপনিবেশে তারা গ্রহণ করল ভিন্ন নীতি। এ ক্ষেত্রে তারা নিল কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও নিরঙ্কুশভাবে প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতাবান করার নীতি। সেই পথ ধরে আমরাও ভাবতে শুরু করলাম যে, আধুনিক রাষ্ট্র মানে আসলে এটি একটি কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা। ইউরোপ উনিশ শতকের শেষ থেকে নিজের দেশে আস্তে আস্তে গণশিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা, গণস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থা চালু করতে শুরু করল। কিন্তু উপনিবেশে সেসব ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠাই পেতে দিল না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসের মতো ইউরোপীয় শাসকদের কেউ কেউ আদিতে চেয়েছিলেন কৃষিতে স্ব-আবাদি ব্যক্তি মালিকানাধীন খামার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু কার্যত যা গড়ে উঠল তা হচ্ছে এক আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থা, যার মূল অভিপ্রায় ছিল এক অনুগত ও বাধ্যগত দেশীয় শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা করা। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার আশ্রয়েই এ দেশে গড়ে উঠল এক জনবিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র যেটা আদৌ খোদ ইউরোপে প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল না। এককথায়, ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকেই ‘আধুনিকতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত’ মনে করে আমরা না-পেলাম প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ মনীষার ছায়া, না-পেলাম ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের সেরা অন্তর্দৃষ্টি। এর বড় প্রমাণ, প্রত্যক্ষ উপনিবেশের অবসানের পরেও আমরা নিজেদের মতো করে উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানাদি ভাবতে ও গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলাম না। ‘ইউরোপ উদ্ভাবন করবে এবং আমরা কেবল তার প্রয়োগ করব’, অর্থাৎ আমরা চিরকালই থাকব হাত পেতে_ এই মানসিক ছক থেকে বেরিয়ে যাওয়া আমাদের হলো না। আমরাও অনেক খাতে উদ্ভাবন করব এবং বাদবাকি বিশ্ব তা প্রয়োগ করবে_ এ রকম কোনো জ্ঞানভিত্তিক অভিমান আমাদের মধ্যে আজও এলো না। ফলে একজন দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথ, একজন দ্বিতীয় সত্যেন বোস, একজন দ্বিতীয় মুহাম্মদ ইউনূস_ যারা সারা বিশ্বে বঙ্গ, বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে সৃষ্টিশীলতার মানদণ্ডে অতীতে ও সাম্প্রতিককালে প্রতিষ্ঠা করেছেন_ তারা শুধু ব্যতিক্রমী উদাহরণই হয়ে থাকলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে কত কথা হচ্ছে এখন। বলা হচ্ছে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা। অথচ আজকের ঢাকা শহর যতই ‘আধুনিক’ বলে নিজেকে দাবি করুক না কেন, এখানে আজও প্রতিষ্ঠা পায় না অন্তত একটি দ্বিতল বা ত্রিতল বই-পত্রের ভবন, যেখানে থাকবে নানা দেশের ও শাস্ত্রের বই, যার নিকটতম তুলনা হতে পারে আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো বার্নস-এন্ড-নোবলস বা ওয়াটারস্টোনস। অর্থাৎ আধুনিকায়নের মন্ত্রটাও আমরা সঠিকভাবে আওড়াতে পারিনি।

আধুনিকতার মূল সমস্যাটা রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথ ঠাকুর ঠিকই কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ইউরোপীয় বা বৃহত্তর অর্থে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, সে যা বলে, যা আদর্শ হিসেবে প্রচার করে, সেটা সে আসলে মেনে চলতে চায় না। অর্থাৎ নিজের খেলার নিয়ম সে নিজেই বারবার ভাঙে। এটা রামমোহনের বুঝতে দেরি হয়নি। রামমোহন যেমন ছিলেন আপাতদৃষ্টিতে ম্যাকলের পক্ষে। তাঁর যুক্তি ছিল, উপনিষদ, ইসলাম ও ইউনিটেরিয়ান চার্চের মধ্যে রয়েছে একেশ্বরবাদী মতাদর্শের ঐক্য। ইংরেজরা যদি ইংরেজি স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যাদান করতে চায়, তবে তাই হোক। কিন্তু রামমোহনের শর্ত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ করা চলবে না_ চাই সবার জন্যে ইংরেজি শিক্ষা, চাই বেশি বেশি করে স্কুল, গুণগত মানের স্কুল। রামমোহন অনুসারী দ্বারকানাথও চেয়েছিলেন, বাংলায় শুধু বণিক-পুঁজির নয়, শিল্প-পুঁজিরও বিকাশ হোক। তিনি নিজে ছিলেন ১৮৩০-৪০ দশকের সবচেয়ে প্রাগ্রসর ব্যবসায়ী_ প্রথম বৃহৎ বাঙালি বুর্জোয়া।

প্যারিসের এক হোটেলে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে দ্বারকানাথ জানিয়েছিলেন, প্রথাগত ধর্মীয় আচার-বিচার তিনি মানেন না এবং প্রয়োজনে তিনি ইউরোপীয় যুক্তিবাদী আদর্শে ভারতীয় সনাতন ধর্ম-কর্মকে বদলে নিতেও রাজি। এ জন্যে তিনি পণ্ডিতবর্গকে মাইনে দিয়ে পুষছেনও। তারপরও একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে কিছুটা মতানৈক্য হয়েই গেল পণ্ডিতপ্রবর ম্যাক্সমুলারের। তার সমসাময়িকদের কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে ম্যাক্সমুলারকে ডাকতেন ‘মোক্ষমুলার’, যেন এই জার্মান পণ্ডিতের লেখা পড়লে মোক্ষপ্রাপ্তি ঘটবে। দ্বারকানাথ স্রেফ জানিয়ে দিলেন_ এবং গেয়েও শোনালেন_ ম্যাক্সমুলার ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের কিছুই বোঝেন না, কিন্তু তিনি ঠিকই পাশ্চত্যের রাগ-সঙ্গীত বোঝেন ও এর রস গ্রহণে পুরোপুরি সক্ষম। অর্থাৎ বিদ্যার্জনে বরং দ্বারকানাথ কিছুটা এগিয়েই ছিলেন। পাশ্চাত্যের আধুনিকতা আত্মস্থ করেও আমাদের বাড়তি কিছু দেওয়ার এখনও বহুকিছু আছে. যেমন ম্যাক্সমুলারের মতো পণ্ডিতকেও শেখানোর মতো কিছু ছিল দ্বারকানাথের।

রামমোহন-দ্বারকানাথের যৌথভাবে নির্মিত আধুনিকতা-প্রকল্পের ফাঁদে অবশ্য পা দেয়নি সদাসতর্ক ঔপনিবেশিক শক্তি। ইংরেজি ভাষাকে জনগণের স্তরে ছড়িয়ে পড়তে দেয়নি ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী। বাংলায় ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা ছিল বরাবরই অতিসীমিত, এখনও তাই। তাছাড়া সাধারণভাবে এ দেশে স্কুলের প্রসারই ছিল সীমিত। অন্যদিকে বিদেশি রীতিনীতি মেনে কারবারি ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এনে এ দেশের শিল্প-বাণিজ্যকে গতিশীল করতে চেয়েছিলেন দ্বারকানাথ। ১৮৪৭-এর বিশ্ব স্টক মার্কেটের বিপর্যয়ের পর বাংলার শিল্পখাত আর সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি প্রথম মহাযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত। বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তি মুখে বলেছে যে তারা চায় অবাধ বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠা, কিন্তু কার্যত তারা শিল্পায়নকে আরও নিরুৎসাহিতই করেছে এই পর্বে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধাতত্ত্ব জন স্টুয়ার্ট মিলের পাঠ্যবইয়ে বড় আকারে থাকলেও উপনিবেশে এর প্রয়োগ হয়েছিল অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে। আধুনিকতা ও পুঁজিবাদ ‘তার নিজের আদলে বিশ্বকে গড়ে নিতে চায়’_ এনলাইটেনমেন্টের এই মন্ত্রে পুঁজিবাদ নিজেই বিশ্বাস করেনি। পুঁজিবাদ বা আধুনিকতা ‘যা বলে সে আসলে তা না’। যখনই পাশ্চাত্যের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লেগেছে, খেলার নিয়ম ভাঙা হয়েছে, অথবা নতুন নিয়মের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গ সূত্রে বলে রাখি, পুঁজিবাদের খেলায় ক্রমশ ‘সমকক্ষ’ হওয়ার সাধনায় নামা চীন এখন রামমোহন-দ্বারকানাথের সমস্যাটা নতুন করে বুঝতে পারছে। আধুনিকতা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্বকে সেটা সে রক্ষা করেনি। আসলে সেরকম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সে পারে না, কেননা তা পুরোপুরি রক্ষা করতে গেলে ক্ষমতার চর্চা করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর ক্ষমতা প্রয়োগই তো আধুনিকতার অপ্রকাশ্য লক্ষ্য। উত্তর-আধুনিকবাদী দার্শনিকদের এই সমালোচনা মানি না মানি কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার নয়।

দারিদ্র্য কমলেও আয়-বৈষম্য বাড়ছে

সমকাল প্রতিবেদক
শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দেশে দারিদ্র্য কমেছে। এটি গর্বের বিষয় হলেও আত্মতুষ্টির কিছু নেই। কেননা দারিদ্র্য হ্রাসের পাশাপাশি ধনী-গরিবের মধ্যে আয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে। এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। শহর এবং গ্রামে উভয় ক্ষেত্রে এ বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। মূলত সম্পদের অসম বণ্টন ও অবৈধ আয়ের উৎসের কারণে আয় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ অভিমত ব্যক্ত করেন তারা। ‘দারিদ্র্য বিমোচন : কোথায় আমাদের অবস্থান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খোন্দকার। প্যানেল আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি মনোয়ার হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু কাওসার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দুর্নীতিই আমাদের উন্নয়নের প্রধান বাধা। দুর্নীতিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতি কমাতে পারলে জনগণ উন্নয়নের সুফল আরও বেশি পেত। প্রায় তিন ঘণ্টার প্রাণবন্ত আলোচনায় দারিদ্র্যের কারণ এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, দারিদ্র্য নিরসন করতে হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল পেতে হলে আয় বৈষম্য কমাতে হবে। কারণ আয় বৈষম্য থেকে দারিদ্র্যের উৎপত্তি। ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ার পেছনে কারণগুলো তুলে ধরেন বক্তারা।

তারা বলেন, প্রভাবশালীরা জমি দখল, জলাশয় দখল করে সম্পদ তৈরি করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছে। আবার কেউ কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছে না। এসব অবৈধ কাজের মাধ্যমে বিত্তশালীদের সম্পদ আরও বাড়ছে। অথচ গরিবের কাজের সুযোগ নেই, শিক্ষা নেই, ফসল উৎপাদন করলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, ব্যাংক থেকে ঋণের সুযোগও তাদের নেই। ফলে দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনের পরিবর্তন হচ্ছে না। দারিদ্র্য দূর করতে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তারা।

পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খোন্দকার অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, গুলশান ক্লাবে প্রতিদিন কোটি টাকার জুয়া খেলা হয়। যারা জুয়া খেলার পেছনে কোটি টাকা খরচ করে বুঝতে হবে তারা কত বড়লোক। তিনি বলেন, দারিদ্র্য মাপার বিষয় নয়, এটি অনুধাবনের বিষয়। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ব্যথা অনুধাবন করা গেলে সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। মন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের তুলনায় দারিদ্র্য আরও কমেছে। শিগগির এ ঘোষণা দেওয়া হবে।

ড. মির্জ্জা আজিজ বলেন, ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব এখনও প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়াতে পারে ৩২ শতাংশ। যদি তাই হয় তাহলে দুই বছরে কমবে ৮ শতাংশ, যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টির কারণ নেই। আমাদের এখনও অনেক কিছু করণীয় আছে।

অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন বলেন, দারিদ্র্য কমেছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় হলেও সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে আয় বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। যার একটি ফ্ল্যাট ছিল তার ১০টি ফ্ল্যাট হচ্ছে। অথচ গরিবরা ক্রমেই গরিব হচ্ছে। আয়কর ফাঁকি, প্রাকৃতিক সম্পদ দখল, ঋণ পরিশোধ না করা ইত্যাদি অবৈধ কাজের মাধ্যমে বিত্তশালীরা সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হলে বৈষম্য কমার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত ৫ কোটি লোক দরিদ্র। কাজেই আমাদের আত্মতুষ্টির কারণ নেই। দারিদ্র্য কমাতে হলে গরিবদের উৎপাদনমুখী কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। ড.ফরাস উদ্দিন মনে করেন, দারিদ্র্যের মূল কারণ কাজের সুযোগের অভাব। যারা গরিব তাদের সম্পদও নেই, নেই কাজের সুযোগও। দারিদ্র্যকে বহুমাত্রিক অভিশাপ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। দারিদ্র্য কমাতে শিক্ষা বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা ফ্রি করার প্রস্তাব করেন তিনি।

ড. সেলিম রায়হান দারিদ্র্য হ্রাসের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ১৯৯০-এর দশকে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮ শতাংশ। ২০০০ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৮ শতাংশ। ২০০৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ। এলডিসিভুক্ত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ অগ্রগতি অনেক ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অর্জন কম নয় কেলেঙ্কারিও আছে

জাকির হোসেন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিশ্ব অর্থনীতি ছিল মন্দার কবলে। আশঙ্কা করা হয়েছিল_ মন্দার বিলম্বিত প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশেষত রফতানি ও রেমিট্যান্স খাত বড় ধাক্কা খাবে। এ আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়নি। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের চেষ্টার পাশাপাশি মন্দা মোকাবেলায় সরকারের সহায়কনীতি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার অর্থবছরে (২০০৮-০৯) রফতানিতে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়। পরের প্রতিটি অর্থবছরে রফতানি আগের তুলনায় বেড়েছে। বলা যায়, সরকারের চার বছরে সামষ্টিক অর্থনীতি মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এ সময়ে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়; কমেছে দারিদ্র্য হার। কৃষি উৎপাদনে ভালো সাফল্য এসেছে।
গত চার বছরে অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনায় বাংলাদেশ এগিয়েছে। তবে শেয়ারবাজার, পদ্মা সেতু, হলমার্কের মতো একের পর এক কেলেঙ্কারি অর্থনীতির সাফল্যকে ম্লান করেছে। এ ছাড়া সার্বিকভাবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবেশের

সূচকে কিছুটা অবনতি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতিরও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অর্থনীতির জন্য নানা সংস্কারের ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। ব্যয় ব্যবস্থাপনা, বেসরকারিকরণ, প্রশাসনে দক্ষতা, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংস্কার ত্বরান্বিত হয়নি।

মতামত জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন সমকালকে বলেন, বর্তমান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মন্দা-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। এ সময়কালে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রশংসাযোগ্য। রফতানি বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের আরও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ এখন চীনের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক। কৃষি প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হয়েছে। খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। মোটা দাগে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়নি। তারপরও জনমনে কিছু বিষয়ে অসন্তুষ্টি আছে।

কী সেই অসন্তুষ্টি_ জানতে চাইলে বিনায়ক সেন বলেন, গত দশকে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে। ফলে মানুষের প্রত্যাশার চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সে চাপের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংস্কৃতি তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। মানুষ দিনবদলের সরকারের কাছে আরও কিছু প্রত্যাশা করেছিল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল, একটা কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। বিনিয়োগে বড় ধরনের অগ্রগতির কথা ছিল, যা হয়নি। বিনিয়োগের হার গত কয়েক বছরে একই রকম রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এডিপি বাস্তবায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রত্যাশিত সংস্কার হয়নি। শেয়ারবাজারে ধস, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের তহবিল লোপাটসহ কিছু বিষয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আর্থিক খাতের নানা সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিকে মাঝে মধ্যে ঝামেলায় ফেলেছে।

একের পর এক কেলেঙ্কারি :অর্থনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার শেয়ারবাজারে ধসের মাধ্যমে প্রথম বড় ধাক্কা খায়। ২০১০ সালের শেষে বড় ধরনের ধস নামে শেয়ারবাজারে। ফুলে-ফেঁপে ওঠা সূচকের ধারাবাহিক পতনে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। এই ধসের পেছনে একটি প্রভাবশালী অশুভ চক্রের কারসাজি ছিল, যা পরবর্তীকালে বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে। গত দুই বছরে সরকারের নানা পদক্ষেপেও শেয়ারবাজারের সংকট দূর হয়নি। বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রতি আস্থাবান হতে পারছেন না।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর পদ্মা সেতু নিয়ে বিপাকে পড়ে সরকার। মহাজোট সরকারের চার বছর নিয়ে সমকালের সাম্প্রতিক এক জরিপে বেশির ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে জটিলতার প্রধান দায় সরকারের।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির ফলে আর্থিক খাতে সরকারের মনোযোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগের কারণে সরকার সমালোচিত হয়। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে একটি চক্র জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাৎ করে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হলমার্কই নেয় দুই হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। এটি ছিল ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে ডেসটিনি গ্রুপও নানা কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। এই গ্রুপের এমডিসহ শীর্ষ কর্তারা এখন কারাগারে।

চাঙ্গা হয়নি বিনিয়োগ :জিডিপিতে বিনিয়োগের অংশ ২৪ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বিগত বিএনপি সরকারের আমলেও একই হারে বিনিয়োগ হয়। বাংলাদেশকে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের হার হতে হবে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশ। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থায় ওই হারে বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিক হিসাবে গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। বেড়ে গেছে ঋণের সুদহার। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মনোভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি খেলাপি ঋণও অনেক বেড়ে গেছে। ঋণ শ্রেণীকরণের নতুন নীতি এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যেতে পারে।

কিছু স্বস্তিকর পরিসংখ্যান :মন্দার শুরুতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে চলে যায়। এর পরের তিন বছরে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ছিল ৬৭৬ ডলার। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৮ ডলার। মন্দা-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী ছিল। একটি অর্থবছর বাদে এ খাতে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। সরকার বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে পেরেছে। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে।

দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ কমেনি :সমকালের জরিপে প্রশ্ন ছিল_ দ্রব্যমূল্য চার বছর আগের তুলনায় এখন সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে কি-না। এর উত্তরে ৫৫ শতাংশ ‘না’ বলেছেন। কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে_ এমন উত্তর দিয়েছেন ৩১ শতাংশ। চালের দাম কিছুটা কমলেও বাস্তবতা এমনই। আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬২ শতাংশে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নেমেছে।

বেসরকারি সংস্থা কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দ্রব্যমূল্য বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, গত এক বছরে মিনিকেট, নাজিরশাইল, আমন, পাইজাম, স্বর্ণাসহ নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের দরকারি চালের দাম কমেছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। চাল ছাড়া অন্যান্য নিত্যপণ্য যেমন_ আটা, ডাল, সয়াবিন তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি প্রভৃতির দাম বেড়েছে।

মধ্যাহ্নের সমাজ

বিনায়ক সেন

১.
কেন মধ্যাহ্ন উপন্যাসটি লিখতে হলো_ তাকে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘সময়কে’ ধারণ করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। সচরাচর যেসব বিষয় নিয়ে তার চরিত্ররা মাথা ঘামায় না- রাজনীতি, কাল, সমাজ- সে সবকিছুকে আর গল্পের বাইরে রাখা গেল না। কেননা, গল্পটাই কতদূর এগুলো মানুষ- তা নিয়ে। ১৯০৫ সালের পর থেকে পূর্ববঙ্গের সমাজ কীভাবে বদলে যেতে থাকল এ রকম কোনো ইতিহাসবোধে তাকে পেয়ে বসেছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্প্রতি-প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সাজ্জাদ শরীফকে জানিয়েছিলেন যে, নিজের জীবন ভাঙিয়ে আর কত উপন্যাস লেখা যায়! সে জন্যেই নাকি তাকে একা এবং কয়েকজন, সেই সময়, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ ও ‘প্রথম আলো’র মতো ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লিখতে হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের জন্য বিষয়টা এমন নয়। তিনি খুব সচেতন প্রয়োজনেই এই ইতিহাস-প্রকল্পে হাত দিয়েছিলেন বোধ করি। তাঁর নিজস্ব স্টাইলে ব্যাখ্যাটা এরকম :’আমি লিখি নিজের খুশিতে। আমার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, কাল, মহান বোধ [!] এই সব অতি প্রয়োজনীয় [?] বিষয়গুলি এসেছে কি আসে নি, তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। ইদানীং মনে হয়, আমার কোনো সমস্যা হয়েছে। হয়তো বা ব্রেনের কোথাও শর্ট সার্কিট হয়েছে। যে-কোনো লেখায় হাত দিলেই মনে হয়_ চেষ্টা করে দেখি, সমস্যাটাকে ধরা যায় কি-না। মধ্যাহ্নেও একই ব্যাপার হয়েছে। ১৯০৫ সালে কাহিনী শুরু করে এগুতে চেষ্টা করেছি। পাঠকরা চমকে উঠবেন না। আমি ইতিহাসের বই লিখছি না। গল্পকার হিসেবে গল্পই বলছি। তার পরেও…’

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, ‘তারপরেও’ বলতে গল্প ছাড়াও ইতিহাস সম্পর্কে কোনো নতুন সচেতনতার প্রতি কি তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন? আর ইতিহাস-গল্প মিলিয়ে যদি কিছু লিখবেন তাহলে ১৯০৫ সাল থেকেই তা শুরু করবেন কেন? সময় ধরার ইচ্ছের কথা বলছেন, কিন্তু কোন কালপর্বে শুরু করে কোথায় তার যতি টানবেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চয়ই। ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসে যে-সময়কে অনুভব করা হয়েছে, তার ব্যাপ্তি ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর দেশভাগ অবধি। কেন এই বিশেষ সময়ের টানাপোড়েনের মধ্যে তাকে প্রবেশ করতে হলো_ সেটা একটা প্রশ্ন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, উপন্যাসটিতে যে সমাজকে তিনি এঁকেছেন, সেই সমাজচিত্র সে সমাজকল্পিত, না বাস্তব_ সে প্রশ্নে পরে আসা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, চিত্রটাকে তিনি কেন এত গুরুত্বের সঙ্গে আঁকলেন? আজকের যুগের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিচালিত সমাজের প্রেক্ষিতে মধ্যাহ্নের সমাজকে মনে হবে কোন অচিনপুরের গল্প_ এক আধুনিক ইউটোপিয়া। এই উপন্যাস ভর করে আছে আদর্শস্থানীয় দুই চরিত্রের ওপরে, যার একজন হরিচরণ সাহা এবং অন্যজন মওলানা ইদ্রিস। এই দুই শুভবোধসম্পন্ন মানুষ_ বস্তুত নিয়ত এবাদতে রত সূফী-সন্তই বলা চলে তাদের_ যারা সবসময়েই কী করে মানুষের উপকার করা যায় সেই চেষ্টায় নিয়োজিত, তারাই উপন্যাসের ঘটনাবলির ওপরে বৃক্ষের ছায়া হয়ে থাকেন শুরুর লাইন থেকে শেষ পর্যন্ত। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের শুরু হয় যে-পুকুরঘাটে, দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ হয় একই পুকুরঘাটে; কেবল শুরুর দৃশ্যে ছিলেন হরিচরণ, শেষের দৃশ্যে মওলানা ইদ্রিস। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র_ ভালো স্বভাবের ও মন্দ স্বভাবের চরিত্ররা সবাই এদেরকে নিয়েই, এদেরকে পাশে রেখেই যার যার জীবন কাটায়, যার যার মতো করে মৃত্যুবরণ করে।

মধ্যাহ্নের সমাজের বড় শক্তি তার অন্তর্নিহিত নৈতিক শ্রেয়বোধ। এর প্রধান উৎস হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিসের মতো মানুষেরা হলেও অপেক্ষাকৃত খাটো মানুষ যারা, তারাও প্রবল মানবিকতায় আক্রান্ত। তারা পারতপক্ষে অন্যায় করেন না, বা করলেও পরিহার্য বলে আত্মগ্গ্নানিতে ভুগতে থাকেন। জুলেখা, শরীফা, মনিশংকর, শিবশংকর, আতর_ এরা সবাই পৃথিবীতে ভালোমানুষের পাল্লা ভারী করেছে। আর লাবুস তো জুলেখার পুত্র সন্তান হলেও আসলে হরিচরণ-মওলানা ইদ্রিসের আধ্যাত্মিক সন্তান। লাবুস শহরে এলে কটকটে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটত, খুবই স্বাভাবিক হতো তার হিমু-হওয়া! তার মানে এই নয় যে, এই সমাজে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের সংঘাত ছিল না। সংঘাত-দ্বন্দ্ব-অনাচার ছিল যদিও, কিন্তু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হতো না। হরিচরণের নিজের পাটের আড়ত রয়েছে, ‘সাহা’ যেহেতু সেহেতু কৃষিপণ্য নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা তার উপার্জনের স্বাভাবিক উৎস। সুতরাং বাণিজ্যবিরোধী ছিল না ওই সমাজ। যে অঞ্চল নিয়ে এই উপন্যাস তার হাওরেই সওদাগররা ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য় তাদের নৌবাণিজ্যের নাও ভাসিয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যের ধারা থাকলেও এ ধরনের সমাজে টাকার শক্তিতে মানুষের ক্ষমতাকে মাপা হয়নি। শশাংক পালের মতো জমিদার বা ধনু শেখের মতো কুটিল ব্যবসায়ী মানুষও সমীহ করে চলেছে হরিচরণকে_ সেটা তার অর্থের কারণে যতটা, তার চেয়েও বেশি তার নৈতিক স্বভাবের কারণে। আরেকটি দিক হচ্ছে, মধ্যাহ্নের সমাজে স্বার্থপরতাই ব্যক্তির একমাত্র প্রণোদনা নয়; এখানে পরার্থপরতার বোধ সহজাতভাবে ক্রিয়াশীল থাকে বিভিন্ন স্তরে। বলা বাহুল্য, একুশ শতকের আজকের এই অপরাহ্নের সমাজ বাণিজ্যিক বোধের সমাজ। ঊনিশ-বিশ শতকের [অন্তত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ও মোটা দাগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত পর্যন্ত] অপেক্ষাকৃত নির্দোষ পৃথিবীর মূল্যবোধের থেকে আজকের এই সমাজ মৌলিকভাবেই আলাদা। মধ্যাহ্নে অনায়াসে সমাজের বিভিন্ন স্তর, শ্রেণী ও ধর্মের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যাতায়াত চলে। এখানে বৃক্ষের অসুখ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়, জুলেখা গায় উকিল মুন্সি ও রাধারমণের গান, রাধা-কৃষ্ণের বিচ্ছেদের হাহাকার, হাওরের ঢেউয়ে বেজে ওঠে। সেটা যে কেবল নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য_ তা মনে করেননি লেখক। ব্যাপক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান আদান-প্রদানকে ধারণ করেছিল এই মধ্যাহ্নের সমাজ। সেখানে কোন চিহ্নটা কার, বা কোন গানের লাইনটা কোন সম্প্রদায়ের জীবনবোধ থেকে উঠে এসেছে_ সেটা হিন্দুর নাকি মুসলমানের, মজুরের নাকি অবস্থাপন্ন কৃষকের_ সেটা বের করাটা দুরূহ। ওই সমাজের অবশ্য তাতে কিছু যায় আসেনি।

এ রকম সমাজের কাহিনী কি ইউটোপিয়ার মতো শোনাচ্ছে? হোক ইউটোপিয়া, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই কল্পকথা নির্মাণে [নাকি বাস্তবেই গল্পটা এভাবেই তিনি শুনেছিলেন] এত শ্রম ও মেধা ঢালবেন কেন? আমার ধারণা, মধ্যাহ্নের ভূমিকায় পুরো কারণটা হুমায়ূন আহমেদ বলেননি। শুধু ‘সময়’কে ধরার জন্য ওই বিশেষ কালপর্বের প্রতি চোখ ফেরাননি তিনি; আরও কিছু উদ্দেশ্য ছিল তার। কোনো অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা ছিল আমাদের মন ও মননকে নাড়া দেওয়ার জন্যে। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সমাজের অন্তরাল প্রাণশক্তির উৎস কোথায়, তা দেখানো চোখে আঙ্গুল দিয়ে।

২.
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশের একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা না ভোগ করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই।’ মধ্যাহ্ন উপন্যাসে সেই পাপকে অবলীলাক্রমে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই পাপের মধ্যে সহাবস্থানকেই চূড়ান্ত মানেনি। শশাংক পালের মতো অত্যাচারী জমিদারেরা এতকাল নিরীহ রায়তের পেছনে লেগেছে। তার মৃত্যুর পরে ধনু শেখের মতো ব্যবসায়ীরা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। শশাংক পালের যোগাযোগ ছিল কোলকাতার প্রশাসনের সাথে, ধনু শেখ নিয়েছে মুসলিম লীগের আশ্রয়। স্বদেশী আন্দোলনের তাড়া খাওয়া বিপ্লবীর হাতে আহত হতে হয় তাকে; শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষই দাঙ্গা ঘটানোর ষড়যন্ত্রী হিসেবে তাকে দায়ী করে এবং তার ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দেয়। আর শশাংক পালের মৃত্যু হয় কোনো অব্যাখ্যাত ব্যাধিতে। শশাংক পাল_ ধনু শেখের প্ররোচনার কারণে হোক, আর দুই যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্রমে বেড়ে যাওয়া ভেদবুদ্ধির কারণে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প মধ্যাহ্নের সমাজেও ঢুকতে থাকে। রাতের অন্ধকারে একদল আরেক দলের লঞ্চ ডুবিয়ে দেয়, একপক্ষ আরেক পক্ষের জাতিনাশ ধর্মনাশ করে, বাড়িতে আগুন লাগায়, পুলিশের কাছে মিথ্যে মামলা দিয়ে, হুমকি দিয়ে এলাকা পরিত্যাগে বাধ্য করে, নষ্ট মেয়ের অপবাদ দেয়, হাওরের নির্জনে এনে ধর্ষণ করে, জায়গা-জমি বসতবাড়ি দখল করে নেয়। এসবই হয়, কিন্তু এটা মধ্যাহ্নের সমাজের অন্দরমহলকে ছুঁতে পারে না। কোনো লৌকিক বা অলৌকিক কারণে এর মানুষগুলো পরস্পরের বিপদে এগিয়ে আসে।
পরস্পরের পাশে সহায়-সমর্থনের উদাহরণ অনেক এই উপন্যাসে। আমি এখানে দু’একটি উদাহরণ দেব। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে মওলানা ইদ্রিস রওনা হয়েছেন বগুড়ার মহাস্থানগড়ের দিকে। পথ হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। বগুড়ার পরিবর্তে রংপুরে চলে গেছেন। এক পর্যায়ে রাত হলে তাকে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে এসেছে একটি হিন্দু পরিবার। লক্ষণ দাসের পরিবার কাছেরই এক মন্দিরের সেবায়েত। ঐ বাড়ীতেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তার। খাবারেরও ব্যবস্থা হয়েছে_ অবশ্য রাখা হয়েছে উঠানেই। লোকটা তাকে বলেছে, ‘মুসলমানকে বাড়িতে ঢুকাব না। এত বড় পাপ করতে পারব না।’ মওলানা তাতেই খুশী। তিনি নামাজ শেষ করে মোনাজাত করে দোয়া চাইলেন যাতে এই পরোপকারী পরিবারটির প্রতি রহমত বর্ষিত হয়। এ সময়ে কপালে চওড়া করে সিন্দুর দেয়া ঘোমটা পরা একটা মেয়ে মওলানার সামনে এসে দাঁড়াল প্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ থেকে। মওলানার হাতে একটি কাঁথা দিয়ে বলল চলে যেতে : ‘দৌড় দিয়া তালগাছ পর্যন্ত যাবেন। সেখানে নদী পাবেন। নদীর নাম করতোয়া। নদী বরাবর দক্ষিণমুখী হাঁটবেন। থামবেন না। আমার স্বামী লোক খারাপ। আপনার সঙ্গে টাকাপয়সা আছে আপনি তাকে বলেছেন। সে লোক আনতে গেছে। টাকাপয়সা কেড়ে নিবে। আপনাকে মেরেও ফেলতে পারে। এই কাজ সে আগেও কয়েকবার করেছে। দাঁড়ায়া আছেন কেন? দৌড় দেন’।

রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে যে পাপ আছে তা অস্বীকার না করে স্বীকার করাই ভাল, স্বীকার করলে যদি আমরা পরিত্রাণের পথ পাই। হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করেও, করার মাঝেই, থমকে দাঁড়িয়েছে অথবা স্পষ্ট করে প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ধনু শেখ এলাকার মসজিদের ইমাম নিয়ামত হোসেনকে ডেকে নিয়ে বলেছে, ‘জুম্মার নামাজের পরে তুমি সুন্দর কইরা ওয়াজ করবা। তুমি বলবা সব মুসলমানের দায়িত্ব নিজেদের রক্ষা করা। পরিবার রক্ষা করা এবং পাকিস্তান হাসেলের জন্য কাজ করা। … তার জন্যে প্রয়োজনে রক্তপাত করতে হবে। শহীদ হতে হবে। বলতে পারবা না?’ আপাতত সম্মতি দিলেও চে’গুয়েভারার চেয়ে কোন অংশে কম যান না ইমাম নিয়ামত হোসেন। রাতের অন্ধকারে মনিশংকরের কাছে গিয়ে বলে দিয়েছেন, কাল জুম্মার নামাজের পরে দাঙ্গা শুরু হবে। শুধু তা-ই নয়, পরদিন জুম্মার নামাজ শেষে ইমাম নিয়ামত মওলানা ইদ্রিসকে আমন্ত্রণ জানালেন কিছু বলার জন্যে। ইদ্রিসকে বহুদিন ধরে হরিচরণ সাহার বাসায় আশ্রয়ের পর থেকেই হিন্দুদের সঙ্গে উঠা-বসা করার জন্যে একঘরে করে রেখেছে ধনু শেখ। মওলানা ইদ্রিস দাঙ্গা ঘটানোর পরিস্থিতি বদলাতে উঠে দাঁড়িয়ে সুরা হুজুরাত এর তের নম্বর আয়াতের স্মরণ করলেন, যেখানে পৃথিবীর সব মানুষকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করে পরে বিভক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন জাতিতে ও গোত্রে, যাতে তারা ‘একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে’। দোয়া পাঠের সময় ইমাম নিয়ামত হোসেন প্রার্থনা করলেন যেন বান্ধবপুরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা না হয়।

হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের মধ্যে প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠানের ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে এক উদারনৈতিক আবহাওয়া বিরাজ করেছিল এলাকায়। অত্যাচারী শশাংক পাল মারা যাওয়ার পর তার মুখাগি্ন করতে তার স্বধর্মের কেউ রাজী হলো না। হয়তো তিনি সারাজীবন অবিশ্বাসী নাস্তিক ছিলেন বলে, হয়তো অত্যাচারী ছিলেন বলে। মুসলমান হয়ে মওলানা ইদ্রিস এগিয়ে এলেন এক্ষেত্রে। সমস্যা হলো পুরোহিতের সাথে তাকেও কিছু মন্ত্র পড়তে হলো শেষকৃত্যের প্রয়োজনে। এর জন্যে কাফের বলে ফতোয়া দেওয়া হলো তার বিরুদ্ধে। লাবুস এসে প্রতিবাদ করে বলল, ‘লাশের মুখে আগুন দিয়েছে। লাশের আবার হিন্দু মুসলমান কী? লাশ নামাজ কালাম পড়ে না। মন্দিরে ঘণ্টাও বাজায় না’। অন্যত্র, লাবুস ও ইদ্রিসের মধ্যে অন্য একটি ধর্মীয় আলাপের বিনিময় হয়। ইদ্রিসের শিশুবয়সী মেয়ে পুষ্পরাণীকে দুধ খাওয়ানোর কেউ নেই। তার স্ত্রী জুলেখা তাকে পরিত্যাগ করে গেছেন। এদিকে গ্রামের বাগাদিপাড়ার মেয়ে ষোল সতেরো বয়সী কালী গতকালই তার মেয়েকে হারিয়েছে। পুষ্পরাণীকে পেয়ে সাগ্রহে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে সে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের কণ্ঠেই শোনা যাক : ‘মাওলানা ইদ্রিস লাবুসের কাছে হিন্দু-মেয়ের বুকের দুধ খাওয়া নিয়ে ক্ষীণ আপত্তি তুললেন। লাবুস বলল, দুধের কোনো হিন্দু-মুসলমান নাই। হিন্দু-মুসলমান মানুষের চিন্তায়। দুধের চিন্তার শক্তি নাই। লাবুসের কথায় মাওলানা হকচকিয়ে গেলেন। ধর্ম নিয়ে এইভাবে তিনি কোনোদিন চিন্তা করেননি। এই দিকে চিন্তা করা যেতে পারে।’ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাত্যহিকের সাংস্কৃতিক ব্যবহারিক বিনিময়ের এ রকম অনেক উদাহরণ আরো ছড়িয়ে আছে। আজকের এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির যুগে ধর্ম-ধর্ম করে আমাদের নগর ও গ্রামের জীবন এখন ব্যতিব্যস্ত। লাবুস-মওলানা ইদ্রিস হরিচরণের মতো চরিত্ররা কি আছে এখনো আমাদের আশেপাশে কোথাও?

৩.
তাহলে দাঁড়াচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানে মিলে একটা যে অভিন্ন সংস্কৃতি, তলার দিকে গড়ে উঠেছিল, শত কংগ্রেসী লীগ রাজনীতির ডামাডোলেও যেটা পুরোপুরি ধসে যায়নি, সে রকম কোন শুভনীতিবোধসম্পন্ন অস্তিত্বকেই অমাদের ‘মধ্যাহ্ন’ অর্থাৎ ‘স্বর্ণযুগ’ বলছেন লেখক? আজ সেই মধ্যাহ্ন গড়িয়ে এই সমাজ_ এই তিমিরবিলাসী সমাজ উপনীত হয়েছে তার অপরাহ্নে। ‘অপরাহ্ন’ কথাটা আমি ‘লেইট ক্যাপিটলিজম’-এর তাত্তি্বক সাহিত্য-সমালোচক ফ্রেডেরিক জেমসনের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। বণিজ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকৃতিকে, শিল্পকেও মানবসত্ত্বাকে ক্রমাগত ‘ব্যবহৃত-ব্যবহৃত’ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বর্জ্যের মতো পাগলার লেগুনের মতো অন্ধকার কোণে। হুমায়ূন আহমেদ এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গীনির্ভর সমাজকে মন থেকে কখনো মেনে নিতে পারেননি। হিমুকে দিয়েছেন এই বাণিজ্যিক সমাজকে বিদ্রূপ করার মনোমুগ্ধকর ক্ষমতা। ‘অয়োময়’-এর মীর্জা হেরে যাচ্ছে উঠতি বণিক শ্রেণীর কাছে, যেভাবে ধনু শেখের কাছে হেরে গিয়েছিল শশাংক পাল। তবু স্রষ্টার পক্ষপাতিত্ব পরাজিতের দিকেই। সত্যজিতের ‘জলসাঘর’-এর শেষ দৃশ্যে বিশ্বাম্ভর কোথায় মিলিয়ে যান সে খবর আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমাদের মনে থেকে যায় শেষ সঙ্গীত সভার নৃত্যগীতের রেশ। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষে আমরা জানতে পেরেছি ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ আসন্ন, ভিটেমাটি ছাড়ছে দু’তরফেই, নতুন রাষ্ট্রজীবনের শুরু হবে সীমান্তের দু’দিকেই। পাকিস্তান হচ্ছে ‘কৃষকের ইউটোপিয়া’ গবেষকরা রায় দিয়েছেন, শুধু কিছু মানুষের মনে শান্তি নেই। কোথাও গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। হরিচরণ সাহা মারা গেছেন, লাবুস মৃত্যুশয্যায়, মওলানা ইদ্রিস সবচেয়ে বেশি নিরাশ্রয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একই সুখ-দুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ হরিচরণ ও মওলানা ইদ্রিস ছিলেন এই পাপবিদ্ধ সমাজের রক্ষাকবচ_ তারা আঁকড়ে ছিলেন সমাজের ভালোত্বকে শুভবোধকে, মঙ্গলকামনাকে। তারা সমাজকে অন্ধকারর্ খাদের মধ্যে গড়িয়ে পড়তে দেননি।

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের শেষটা এ রকম। লাবুস, যে কিনা আমাদের অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎকে নায়কের মতো লালন করেছে, সে মারা যাচ্ছে। কোনো অব্যাখ্যাত অসুখে তাকে আক্রান্ত করেছে। অসুখ নিয়েই সে এসেছে নির্জন পুকুরের ঘাটে এবং সেখানে হঠাৎই সে তার মৃত মাকে দেখতে পাচ্ছে কাছে। একপর্যায়ে মা’র কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। তার এই মৃত মার নাম জুলেখা। যিনি জীবিত থাকাকালে স্বয়ং উকিল মুন্সীকে গান শুনিয়েছেন এবং নজরুল যাকে দিয়ে কলকাতায় গান রেকর্ড করিয়েছেন। তিনি এবারে গুনগুন করে গান ধরেছেন। হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন বইটির শেষ দুটি লাইন, যা পড়তে থাকলে এখনো আমি এক অনির্বচনীয় শিহরণ অনুভব করি : ‘মওলানা ইদ্রিস ঘর থেকে বের হয়েছেন, হাদিস উদ্দিন বের হয়েছে। পুকুরঘাট থেকে যে সুরধ্বনি বের হয়ে আসছে, তার জন্ম এই পৃথিবীতে নয়। অন্য কোনোখানে।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হোসেন মিয়া ময়নাদ্বীপের সমতাবাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদের বান্ধবপুর তেমনি একটি প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্র, সেখানে সব গোত্রের ও বর্ণের মানুষেরা মানবিক মমতায় পরস্পরের হাত আঁকড়ে ধরবে। তবে এই অপরাহ্নের সমাজের কাছে হুমায়ূনের এই ইতিহাসপাঠ কল্পজগতের ভাষ্য বলে মনে হতে পারে।

অর্থনীতি ও রাজনীতির ধাঁধা

বিনায়ক সেন, অজয় দাশগুপ্ত

সামনে বাজেট রয়েছে। কিন্তু সরকারের চতুর্থ বছরটা উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের বছর নয়। এর পরিবর্তে আগের বছরগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতি এসেছে তা বজায় রাখা, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারে অবনতি ঘটতে না দেওয়া, রফতানি উৎসাহিত করা_ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা জরুরি। নির্বাচনের আগের বাজেটে জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণের চাপ থাকবে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি ব্যাহত হতে পারে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে ঋণ বাড়ালেও সমস্যা দেখা দিতে পারে আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি বড় ধাঁধা বা পাজল দিয়েই লেখাটা শুরু করি। অর্থনীতিবিদ যারা, দেশ-দুনিয়ার অর্থ নিয়ে চর্চা করেন যারা, তাদের বিবেচনায় গত দুই যুগে বাংলাদেশে অর্থনীতির বেশ কিছু সূচক যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। যেমন প্রবৃদ্ধির হার ভালো, দারিদ্র্য হ্রাসের হার বাড়ছে, সামাজিক সূচকে রয়েছে সফলতা। অর্থনীতিবিদরা এসব অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আলোচ্য সময়ে দেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে। গণমাধ্যম যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করেছে। নিয়মিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সরকার পরিবর্তনের এটাই একমাত্র পন্থা হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এ অর্জনের পরও কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হতে পারছে না কেন? তাহলে কি অর্থনীতিবিদদের কাছে যেসব সূচক গুরুত্বপূর্ণ শাসকদের মূল্যায়নে; নাগরিকরা একই সূচকের ওপর নির্ভর করে না?

যে কোনো দল সাধারণ নির্বাচনে যাওয়ার আগে ইশতেহার ঘোষণা করে এবং তাতে দরিদ্র মানুষের সহায়তার জন্য বিভিন্ন অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এসবের বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে সে বিষয়ে তারা খেয়াল রাখে। এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান অন্য অনেক উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় ভিন্ন। বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে তারা সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। সাধারণ নির্বাচনেও বাংলাদেশের ভোটার উপস্থিতির হার যথেষ্ট বেশি। এখানকার নাগরিকরা ধরেই নেয় যে, ম্যাক্রো অর্থনীতি এবং সামাজিক সূচকগুলো ক্রমাগত ভালো হতে থাকবে এবং এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সম্ভবত সরকার সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নে তারা এসবকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। সামাজিক খাতেও রয়েছে সাফল্য। কিন্তু পাশাপাশি গত দুই দশকে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আয়-বৈষম্য বেড়েছে এবং এটা জনমনে অসন্তোষ ও হতাশার সৃষ্টি করছে। যদিও এ সময়ে দারিদ্র্য কমছে, কিন্তু জনসাধারণ আপেক্ষিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। মজুরি হার বেড়েছে। শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা-পুষ্টির ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটছে। কিন্তু এগুলোর যতটা না গুরুত্ব, সেটা ছাপিয়ে ওঠে ‘আমার চেয়ে তার বেশি উন্নতির’ প্রশ্নটি। এ বিষয়টি তারা ভালো চোখে দেখে না। এখানে আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। যদি এ আয়-বৈষম্য অধিকতর শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে ঘটত সেটা সহনশীল হতো। কিন্তু বাস্তবে এ বৈষম্যের পেছনে হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানব পুঁজির যতটা না অবদান, ব্যবসায়িক দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা যতটা না কাজ করে, তার অনেক বেশি কাজ করে দুর্নীতি। সহজ কথায় বলা যায়, অনুপার্জিত আয়ের মাধ্যমে কিছু লোক বাড়তি সম্পদ সৃষ্টি করে। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি, রাজধানী ঢাকায় এখন সাধারণ মানের একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্যও ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয় পড়ে। যারা সরকারি চাকরি করেন তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ও যাদের, তাদের পক্ষে এ আয় থেকে সঞ্চয় করে এত দামের ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়।

একটি জেলা সদরে সাম্প্রতিক সফর থেকে জানা গেছে যে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কিছু লোকের হাতে পাজেরো বা এ ধরনের দামি গাড়ি এবং অন্যান্য সম্পদ চলে আসে, যা জনগণের কাছে দৃষ্টিকটু ঠেকে। পরিশ্রম, দক্ষতা বা উন্নত শিক্ষার জন্য এসব অর্জন নয়, বরং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এর মূলে। জনগণের মধ্যে সম্পদের যে বৈষম্য, তার পেছনে দুর্নীতির রয়েছে বড় ভূমিকা_ সেটা বুঝতে পারে বলেই জনমন বিষিয়ে যায়। আর এ কারণেই নির্বাচনের সময়ে সরকারের ম্যাক্রো অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সাফল্য এখন পর্যন্ত বড় হয়ে দেখা দেয় না। এটাও লক্ষ্য করা হয় যে, অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত বলে জনগণ মনে করে এবং এসব করেও তারা দিব্যি থাকতে পারে। তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত এবং পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করায় রাজনীতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণেই যে সরকার ক্ষমতায় থাকছে, নির্বাচনকালে জনগণের বড় অংশ তার বিপরীতে চলে যাচ্ছে।

এই যে ধাঁধা, তার নিরসন করতে হলে যে দুর্নীতির মাধ্যমে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট কিছু লোক নিজের সম্পদ বাড়িয়ে নিচ্ছে, তার অবসান ঘটানো আবশ্যিক হয়ে পড়েছে। নির্বাচন হয় বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের মধ্যে। কিন্তু এমনকি দলের প্রধান নেতার জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচনে সেটা নিয়ামক থাকে না। বরং দায়ভার নিতে হয় পুরো দলকে।
সরকার বলতে পারে যে, বৈষম্য কমাতে তারা চেষ্টা করছে। এর উদাহরণ হিসেবে সামাজিক বেষ্টনী কর্মসূচির নজির টানা হয়। এ ধরনের অন্তত ৮০-৮৫টি কর্মসূচির কথা তারা বলতেও পারে। এতে ব্যয় হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ অর্থ। এ থেকে সমস্ত সুবিধা চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে কি-না, কোনো লিকেজ আছে কি-না সে প্রশ্ন রয়েছে। যদি ধরেও নিই যে, লিকেজ নেই অর্থাৎ দুর্নীতি-অনিয়ম হয় না এবং বয়স্ক ভাতা, ছাত্রী উপবৃত্তি, মঙ্গা এলাকার বিশেষ কর্মসূচির পূর্ণ সুফল সংশ্লিষ্টরা পাচ্ছে; তাহলেও এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ প্রতীকই থেকে যায় এবং তা দিয়ে জীবন খুব একটা বদলানো যায় না। তাতে হয়তো ক্ষুধা কিছুটা লাঘব হয়, কিন্তু আয়-বৈষম্য কমে না। ইউরোপের অনেক দেশে বিশেষত ওয়েলফেয়ার স্টেটগুলোতে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে এ ধরনের লক্ষ্য অর্জন করা গেছে। এর কারণ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে তাদের বাজেটের ২ শতাংশ নয়, বরং ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের হাতে এত সম্পদ নেই যে, রাজস্ব বাজেট থেকে এ অর্থ বরাদ্দ করা যাবে। আমাদের কর রাজস্ব আদায় সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। তারপরও এর পরিমাণ জিডিপির ১০-১১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এ কারণে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক যে, বাজেটের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কতটা কমানো যাবে। একটি উদাহরণ দিই। যে সম্পত্তির মূল্য ২ কোটি টাকার বেশি, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ বসানোর একটি পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের ৯ মাসে তা থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি টাকার মতো এবং দিয়েছে ১১শ’র মতো পরিবার। এত কম অর্থ আদায় হওয়ার কারণ সম্পত্তির মূল্য ধরা হয়েছে উৎস ধরে। ১০ বা ১৫ বছর আগে যে দামে তা কেনা, সেটাই উৎস মূল্য। কর আদায়ে নানাবিধ জটিলতা বাদ দিলেও কেবল মূল্য কম ধরায় অনেক ধনবান ব্যক্তিই সারচার্জের আওতায় আসছে না। বর্ধিত কর পাওয়া গেলে তা দিয়ে অনেক ধরনের কাজ সম্পন্ন করা যায়। যেমন স্বাস্থ্য বীমা। ভারতে বেশিরভাগ রাজ্যে এটা চালু আছে। বাংলাদেশেও কোনো কোনো এনজিও পাইলট প্রকল্প নিয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প চালু হলে দরিদ্রদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে আসে এবং বিপদে পড়ে সামান্য সম্পদ বিক্রি করতে হবে না।

সামনে বাজেট রয়েছে। কিন্তু সরকারের চতুর্থ বছরটা উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়নের বছর নয়। এর পরিবর্তে আগের বছরগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে স্থিতি এসেছে তা বজায় রাখা, বাজেট ঘাটতি কমানো, বিনিময় হারে অবনতি ঘটতে না দেওয়া, রফতানি উৎসাহিত করা_ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা জরুরি। নির্বাচনের আগের বাজেটে জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণের চাপ থাকবে। এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতি ব্যাহত হতে পারে। সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে ঋণ বাড়ালেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আমরা জানি, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের তিনটি উৎস_ বৈদেশিক ঋণ-অনুদান, আর্থিক খাত-ব্যাংক ব্যবস্থা এবং কর রাজস্ব। কিন্তু কর রাজস্ব স্বল্প মেয়াদে খুব একটা বাড়ানো সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতি চাইলে প্রথম ও দ্বিতীয় উৎসের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। কিন্তু এ বছর বৈদেশিক সূত্র থেকে ঋণ-অনুদান নেতিবাচক। অর্থাৎ নতুন করে যা প্রাপ্তি তার চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে গেছে পুরনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। যেহেতু বৈদেশিক সাহায্য সেভাবে আসেনি, তাই সরকারকে কম সময়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে এবং আরও ঋণের জন্য হাত বাড়াতে হবে। ফলে ঝুঁকি রয়েছে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার। এ অবস্থায় বৈদেশিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগী হওয়ার বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে বোঝাপড়ার কারণে এ বছর ৯০ কোটি ডলারের (তিন বছরে এ ঋণ দেওয়া হবে) প্রথম কিস্তি মিলেছে। কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থায়ন স্থগিত হয়ে আছে এবং দাতারা এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে। বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে আগামী কয়েক মাসে নাটকীয় পরিবর্তনের আশা দূরাশা। এ অবস্থায় সরকারের সামনে বিকল্প হচ্ছে নিজের চাহিদা কমিয়ে আনা। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোও একই লক্ষ্য থেকে করা। এক হিসেবে দেখা যায়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও ভর্তুকি থাকবে এবং এ খাতে আগামী বছর ৬৪১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে।

সরকার কুইক রেন্টাল সূত্রে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এসব প্রকল্প চালু রাখতে হলে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল অর্থ দরকার হয়। কিন্তু সরকারের হাতে এ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেই। উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা করেও জনগণকে তার সুফল দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে সরকার ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে এবং দাতাদের পরামর্শও তেমনই। কিন্তু তাতে জনমনে প্রভাব পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ৭৭ শতাংশ জনগণের আস্থা রয়েছে_ গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জনমতের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গ্যালাপ পোলের জরিপে এ কথা বলা হলেও সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে এখন তা হ্রাস পাওয়ার কথা।

প্রশ্ন উঠতে পারে_ এ ধরনের পরিস্থিতি কি আগে ঘটেনি? ২০০৭-০৮ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গম-চালের দাম বেড়েছিল। সে সময় বিশ্বব্যাংকের তরফে বাজেট সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার সেটা পায়নি। ফলে সামষ্টিক খাতের ওপর চাপ সামলাতে অভ্যন্তরীণ সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রফতানি বাড়ছে। প্রবাসীরাও ভালো অর্থ পাঠাচ্ছে। কিন্তু সরকার বৈদেশিক সূত্রে বড় ধরনের রিলিফ পাবে_ এমন আশা কম। এ কারণেই বৈদেশিক সাহায্যদাতাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা দরকার। অর্থনীতির তাগিদই ঠিক করে দেবে রাজনৈতিক কৌশল, এমনটাই স্বাভাবিক ছিল। এ বছরের জানুয়ারিতে সমকালে ‘একে একে নিভে যাচ্ছে বাতি’ শিরোনামের লেখার (লেখক বিনায়ক সেন) ভাবনায় ছিল যে সরকার নমনীয় হবে। কিন্তু গত ২-৩ মাসের ঘটনাবলিতে দেখা যাচ্ছে, সরকার সে পথে এগোচ্ছে না। অর্থাৎ এখনও হার্ডলাইনেই চলেছে।

প্রকৃতই আয়-বৈষম্য হ্রাসে সরকারের হাতে হাতিয়ার কম। গত এক দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ভালো। কৃষকের দাবি, এখন ধানের ন্যায্যমূল্য। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ভালো হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডারে চাপ অপেক্ষাকৃত কম থাকছে।
সার্বিক প্রবৃদ্ধির হার এখনও সন্তোষজনক বলব। কয়েক বছরে সাড়ে পাঁচ-ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। অনেকেই মূল্যস্ফীতির হারের সঙ্গে মজুরি বাড়িয়ে নিতে পারছে। ধান কাটার সময়ে দিনে চার-পাঁচশ’ টাকা আয় করা সম্ভব। এ সময়ে মাসে ২০ দিন কাজ করেই ৩-৪ মাসের মতো চাল ঘরে তোলা যায়। ধানের চাতালে দেখেছি, নারী শ্রমিকরা কাজ থাকুক আর না থাকুক, বছরজুড়ে দিনে ১১০-১২০ টাকা আয় করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে পাঁচ-ছয় শতাংশ হলেও গ্রামের দরিদ্ররা ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শহরে বসবাস করে এমন অনেক লোক এখন গ্রামের জমি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ক্ষুদ্র কৃষক বা ক্ষেতমজুরদের চাষাবাদের জন্য দেয়। এর পেছনে অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে।

নির্মাণ খাতের চিত্রও ভালো। এর প্রভাব পড়ছে শহরের দরিদ্রদের একটি অংশের ওপর। সার্বিক অর্থনৈতিক এ চিত্র অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বিদেশিরা কে, কোথায়, কী বললেন কিংবা ট্রান্সপারেন্সির সূচকে কী বলা হলো, তার চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে অর্থনীতির নিজস্ব ডিনামিক্স।

তবে আমরা যদি সংস্কারের ক্ষুধা হারিয়ে না ফেলতাম, তাহলে আরও কিছু অর্জন সম্ভব হতো। এটা বলা হয়ে থাকে যে, যখন সম্পদ থাকে না তখন ভাবসম্পদ বিনিয়োগ করে সুফল পাওয়া যায়। আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্ধেকও বাস্তবায়ন করতে পারি না। এ অবস্থা অনেক বছর ধরে চললেও আমরা কেন প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনে ব্যর্থ হচ্ছি? জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে_ এটা কেন যথাসময়ে উদ্যোক্তারা ও সরকার বুঝতে পারল না? কুইক রেন্টালের ভায়াবিলিটি হিসাব করার সময় ২০০৭-০৮ সময়ে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য কেন বিবেচনায় নেওয়া হলো না? অনেকের অভিযোগ, অর্থনীতিবিদদের দ্বারা অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। ঋণ কোথায় দেওয়া হবে এবং কোথায় নয়, ব্যাংকিং সেক্টরের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে সেটা মূল্যায়ন করার ক্ষমতা থাকতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অপেশাদারিত্ব কাঙ্ক্ষিত নয় এবং এর পরিবর্তন এমনকি ক্ষমতার শেষ বছরেও করা সম্ভব। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ কমিটি রয়েছে। এমনকি নামজাদা অর্থনীতিবিদ ড. মনমোহন সিংও ড. কৌশিক বসুসহ অনেকের পরামর্শ নেন নিয়মিত।

বৈষম্য রোধে সরকার ভূমি সংস্কারের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে। এক সময়ে বলা হতো. কলকাতাকেন্দ্রিক বাবুরা কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে না। কিন্তু এখন কেন অনেকে কৃষক শ্রেণী থেকে উঠে এসে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হতে গিয়ে কৃষকের স্বার্থ ভুলে যান? কেন তাদের কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের প্রতি মমত্ববোধ থাকবে না? খাসজমি সরকারের হাতে যেটুকু রয়েছে সেটা পুনর্বণ্টন বিষয়ে অবশ্যই সিদ্ধান্তে আসতে হবে। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রতিও মনোযোগ দিতে হবে। এর ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে। ইউরোপ যে ইউরোপ হলো তার বড় প্রাতিষ্ঠানিক কারণ উনিশ ও বিশ শতকে স্থানীয় সরকার নিয়ে চর্চা। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। আমরা বিকেন্দ্রীকরণের এসব শিক্ষা জানা থাকলেও তা গ্রহণ করছি না? স্থানীয় সরকার যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এখন বড় ধরনের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত এবং তাদের সক্ষমতা বাড়াতে ইউএনডিপি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় সরকারকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও যুক্ত করা গেলে গ্রামের জনগণ বুঝতে পারবে যে, তাদের উন্নয়নে সরকার অর্থ বরাদ্দ করছে এবং তা কাজে লাগানো হচ্ছে। এমনকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের অবস্থার পরিবর্তনও স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে করা সম্ভব।

আমরা মনে করি, বর্তমান বাজেটের মধ্যে সরকার আরেকটু গ্রামমুখী হতে পারে। বৈষম্য কমিয়ে জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হতে পারে। সময় যে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে_ সেটা নিশ্চয়ই তারা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

ড. বিনায়ক সেন :গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস
অজয় দাশগুপ্ত :সাংবাদিক

খেলায় এখন হাফ টাইম : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এখনও সময় আছে

বিনায়ক সেন, অজয় দাশগুপ্ত | তারিখ: ১০ জুন ২০১২

জাতীয় সংসদে ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। এ সময়ে বিরোধীরা সংসদে ছিল না এবং বাজেট আলোচনায় অংশ নেবে, এমন সম্ভাবনাও প্রায় নেই। এ নিয়ে যা কিছু পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, সেটা দেখছি সংসদের বাইরে। এতে একাডেমিক চর্চা আছে, অর্থনীতিবিদদের আলোচনা আছে। রাজনীতিকরা তো মুখর আছেনই। আলোচনায় জোর পড়ছে মোট দেশজ প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়েছে কি-না, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে নেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কি-না এবং এ ধরনের আরও কিছু বিষয়ে। তবে আমাদের মনে হয়, আমজনতা যাদের বলি তাদের ঠিক পরিসংখ্যানের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে ততটা মাথাব্যথা থাকে না। তারা চায় প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে এমন পণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় থাকুক, আইন-শৃঙ্খলা ভালো থাকুক, জীবনযাপন সহজ থাকুক।
অর্থনীতি যেভাবে চলছে তাতে কেউ আশাবাদের কথা বলতে পারেন, কেউবা হতাশার দিকটিকেই বড় করে দেখবেন। এ ছাড়া নিরন্তর সংশয়বাদীরা তো রয়েছেনই। তারা এমনকি চূড়ান্ত হিসাবের জন্য অপেক্ষা করতেও রাজি নন। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে যখন প্রথমে ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলো, তখন তারা বলতে থাকলেন_ হতেই পারে না। বস্তুতপক্ষে ওই বছরে চূড়ান্ত হিসাবে এই ৬.৭ শতাংশ হারেই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এ বছরেও অর্থাৎ ২০১১-১২ অর্থবছরে বলা হতে থাকল সরকারের ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি, ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমতে থাকা, কুইক রেন্টালজনিত সমস্যা, বৈদেশিক সাহায্য কম আসা ইত্যাদি কারণে অচিরেই সংকট নেমে আসবে। এমন অবস্থা ২০০৭-০৮ সময়েও ছিল। সেটা অনেকটা বৈদেশিক সহায়তায় কাটিয়ে ওঠা গেছে। এবারেও গত তিন-চার মাসে পরিস্থিতির কিছুটা রাশ টানা সম্ভব হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা এবং আমদানি হ্রাস ও রফতানি বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে মূল্যস্ফীতি কমেছে, টাকা অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও সর্বশেষ প্রতিবেদনে এর প্রশংসা করেছে। এ ধরনের নীতি-কৌশলও কিন্তু অর্থনীতির পণ্ডিতদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।
এবারে বাজেটের প্রসঙ্গে আসি। অর্থনীতিতে কী ভালো হয়েছে, সেটা কেউ স্বীকার করতে পারেন, না-ও পারেন। মন্দ দিক প্রসঙ্গেও একই কথা। কিন্তু চলতি প্রসঙ্গে ব্যস্ত থেকে যেন আরও ভালো করার জন্য কী করা দরকার এবং কীভাবে করা দরকার সে আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে না রাখি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কাঠামোগত সংস্কার। এটি করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই গতিশীলতা আসবে না, সেটা অনেকেই স্বীকার করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ বড়ই কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তা চলতি বছরে কম এসেছে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে বাজেটে বিদেশি ঋণ-অনুদানের পরিমাণ থাকত জিডিপির ১০ শতাংশের মতো। কিন্তু এবারে মিলেছে ১.৩ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মিলেছে ১.৩৪ শতাংশ। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিরূপ থাকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে_ এ ধরনের পরিস্থিতিতে বছরে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বিদেশি সহায়তা পেলেই রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মেটানো যেত। ফলে ফিসকাল ঘাটতি মেটানোর অপর উৎস অভ্যন্তরীণ সূত্রের ওপর (ব্যাংকিং ও অ-ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অপেক্ষাকৃত বেশি সুদে ঋণ গ্রহণ) এভাবে চাপ পড়ত না। এখন প্রশ্ন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তা জোগাতে কেন পারছি না? বাজেটে এ নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত ছিল, কিন্তু নেই। শুধু এ বছর নয়, আগেও মেলেনি। কী কারণে পাওয়া যায়নি সেটা তুলে ধরা হলে জনগণ বুঝতে পারত যে এ জন্য কে দায়ী এবং কেনই বা ঋণ-নির্ভর বাজেট (যেটা জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন)। এটা মস্ত ধাঁধা যে সরকার একদিকে বিদেশি সাহায্য সংগ্রহ করতে পারছে না, অন্যদিকে পাইপলাইনে প্রচুর অর্থ-প্রস্তাব জমা পড়ে আছে। একদিকে আমরা বিদেশি সাহায্য চাইছি, একই সঙ্গে ঘরের দোরে এ সাহায্য প্রস্তাব নিয়ে কেউ কেউ হাজির থাকলেও সেটা নিতে পারছি না।
যদি সক্ষমতার অভাব হয়ে থাকে, তাহলে সমাধান হচ্ছে এটি বাড়াতে হবে। কোন কোন মন্ত্রণালয়ে বৈদেশিক সহায়তাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি ঘাটতি সেটা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের অধীনে সভা হতে পারে। দরকার মনে করলে পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য এ সক্ষমতাকে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধার শর্ত করা যায়।
যদি দেখা যায়, দাতাদের কোনো কোনো শর্ত অযৌক্তিক, যেমনটি অতীতে দেখেছি_ সেটাও জনগণকে বলা দরকার। তাহলে দাতারাও বড় মুখে বলতে পারবে না যে বাংলাদেশ সরকার ঋণ-অনুদান ব্যবহার করতে অসমর্থ।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসবে_ আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতা কি কমে গেছে? যদি এটা হয়ে থাকে তার সমাধান হচ্ছে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের এসব প্রকল্পে দায়িত্ব প্রদান করা। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছে তেমনটি ঘটতে থাকলে কখনোই ছাড় মিলবে না, এটাই এখনকার বাস্তবতা। স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যতিরেকে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মিলবে, এমন সম্ভাবনা কম।
কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্নে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাঁধা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন কম থাকছে। সাধারণত সৎ বা অসৎ যে কোনো লোকেরই বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা থাকে। ঠিকাদার টাকা ব্যয় না করলে কীভাবে লাভবান হবে? তারা কেন এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ এবং জুনের মধ্যে ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারবে না? যদি ১০০ শতাংশ ব্যয় করা হয় তাহলে প্রশ্ন আসবে_ গুণ-মান ঠিক আছে তো? আমাদের অর্থমন্ত্রীর বাজেটে এটা কখনও সংযোজিত হতে দেখা যায়নি যে, বড় বড় কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি হয়েছে। কাজ শেষ করা গেলেই যেখানে বিল মিলবে, সেখানে কেন পুরো অর্থ ব্যয় করা যায় না_ এ রহস্যের জট খোলা দরকার। একান্তই যদি আমাদের সচিবালয়কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে ১০-১৫ শতাংশ কাজ স্থানীয় সরকারের হাতে তুলে দিতে সমস্যা কোথায়? ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে এ ভার দেওয়া যেতে পারে। তারা স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করবে। এভাবে ফিসকাল বিকেন্দ্রীকরণ করে সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ স্থানীয় সরকারের কাছে দেওয়া হয়। উন্নত দেশগুলোতে এর হার আরও বেশি।
প্রশ্ন আসতে পারে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা রয়েছে কি-না। এ ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব হতে পারে_ কেন্দ্রীয় সরকার দেবে ৮০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার ২০ শতাংশ। নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকে তারা এ অর্থের জোগান দেবে। গত এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে থাকছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর আদায়ের সুযোগ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে ট্যাক্স-কোড কিছুটা বদলাতে হবে_ স্থানীয় সরকারের কোন কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কর আদায় করতে পারবে সে বিষয়টি এতে স্পষ্ট করা থাকবে। লোকাল গভর্নমেন্ট সাপোর্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প রয়েছে, যার উদ্দেশ্য স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকৃতই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১০-১৫ শতাংশ বিকেন্দ্রীকরণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘাটতি স্থানীয় সরকার কর্তৃক পূরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তৃতীয় যে সংস্কারের প্রশ্নটি তুলতে চাই সেটা হচ্ছে ঢাকার অভ্যন্তরে এবং বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। এ লক্ষ্য অর্জন কেবল সম্পদ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা বস্তিতে থাকে, তারা কি এভাবে থাকতে চায়? প্রকৃতপক্ষে তারা কাজের স্থলের কাছাকাছি থাকতে চায়। দূরে থেকেও যদি সহজে আসা-যাওয়া করা যায়, তাহলে সে বিকল্প অবশ্যই বিবেচনায় থাকত। শ্রীলংকার কলম্বো শহরে দেখেছি গল এক্সপ্রেস অনেকেরই পছন্দ। এতে চেপে সকালে অনেকে রাজধানীতে আসে এবং সন্ধ্যায় ফিরে যায়। এর প্রভাব কলম্বোতে যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। শহরের ভেতরে ও বাইরে যোগাযোগ বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। আমাদের জাতীয়তাবাদ এক। রাজধানী এক। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-গরিব_ সবাই এক সমাজের অংশীদার। বিদেশে গেলে দেখি, সব ধরনের নাগরিক বাস-ট্রাম-রেলগাড়ি-মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে-ফেরি_ এসব যান ব্যবহার বেশি করে। কিন্তু আমাদের দেশে চলার পথেই শ্রেণী বিভাজন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গরিবরা পায়ে হাঁটে, নিম্নবিত্তরা বাসে চাপে, মধ্যবিত্তরা রিকশা-সিএনজি ব্যবহার করে। আর সচ্ছলরা চাপে প্রাইভেট কার কিংবা সিএনজিতে। যেখানে উন্নত পুুঁজিবাদী দেশগুলোতে পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সেখানে আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ দাবি করেও পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রেখেছি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দিনে দিনে তা প্রকট হচ্ছে। আমাদের জাতীয় বাজেটে এমন কোনো প্রস্তাব নেই যাতে গণপরিবহন ব্যবস্থা সুলভ হতে পারে। এ জন্য যে বিনিয়োগ সুবিধা দরকার, সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। যদি আমরা এ পথে অগ্রসর হই, জাতীয় সঞ্চয়েও তার প্রভাব পড়বে। অনেক অনেক নারী-পুরুষ ব্যক্তিগত যানবাহন ছেড়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে শুরু করলে পারিবারিক ও জাতীয় সঞ্চয় বাড়বে।
দুঃখের বিষয় যে অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও তার বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের ধারেকাছেও নেই। যেমন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের সড়ক পথ, বুড়িগঙ্গা নদীর নাব্যতা বাড়ানো, রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ এবং রেল যোগাযোগের প্রসার। এসব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে তার প্রধান কারণ অর্থের অপ্রতুলতা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ-আয়োজনের অভাবও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু কেন হলো না, সে বিষয়ে সরকার জনগণের কাছে সঠিক তথ্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। ত্রুটি কোথায় ছিল এবং তার নিরসনে যে পদক্ষেপ নেওয়া হলো দাতারা কেন তাতে সন্তুষ্ট হলো না? এটি ছিল আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের বৃহত্তম আর্থিক প্রকল্প। স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ না পেলে এ ধরনের প্রকল্প লাভজনক হয় না। মালয়েশিয়া বা অন্য দেশ থেকে বেশি সুদে ঋণ নেওয়া হলে তা পরিশোধের জন্য টোলের হার বাড়াতে হবে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে নামমাত্র সুদে ঋণের কারণেই টোলের হার কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। এ বছরের বাজেটে পদ্মা সেতু খাতে ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ধরনের বরাদ্দ রাখা হলে ২০ বছরের বেশি সময় দরকার হবে সেতু নির্মাণে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলেই ফেলি। বড় বড় প্রকল্পে কেবল সরকারি নিরীক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কি-না, বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হয়েছে কি-না_ এসব দেখার জন্য স্বাধীন সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। আমাদের বোধকরি তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো শক্তিশালী উন্নয়ন কর্মসূচি মূল্যায়ন কমিশন দরকার, যার কাজ হবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পর্কে সরেজমিন মূল্যায়ন শেষে অভিমত প্রদান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান উন্নত দেশগুলোতে রয়েছে। তারা সরকার ও গণমাধ্যমকে পর্যালোচনার ফল জানাবে। এমনকি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পগুলোর বিষয়েও এ দুটি সংস্থার স্বাধীন মূল্যায়ন টিম রয়েছে, যারা বোর্ডে সরাসরি প্রতিবেদন পাঠায়।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রসঙ্গে উদ্যোগ নেই, সেটা বলেছি। সরকার নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি যা এতক্ষণ যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলো তা দূর করায় সহায়ক হতে পারে। শুধু তাই নয়, তারা চলতি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথভাবে চলার ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এখন দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেই। ফলে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নত না হলে দুই দিক থেকেই জনগণের সমস্যা। বর্তমানে স্বনিয়োজিত ও মজুরিভিত্তিক_ এই দু’ভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মজুরিভিত্তিক কাজে সরকারের তেমন উদ্যোগ নিতে হয় না। এটা করে বেসরকারি খাত। যেমন কৃষি। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ভালো। কৃষি মজুররা দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করে। শহর এলাকায় নির্মাণ খাতে কাজ মেলে এবং মজুরির হার ভালো। স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। কৃষি খাতের মতো এ ক্ষেত্রেও দুই দশক ধরে চলছে নীরব কর্মযজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নামে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু অযাচিত উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়, যা স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ গ্রামীণ ব্যাংক এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গত বছর সরকারের তদন্ত কমিটি এবং এ বছর তদন্ত কমিশন গঠন। এর ফলে অন্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো কিছুটা হলেও ভীত হয়ে পড়তে পারে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সম্মান ও মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে এই নাগরিক আশঙ্কা বাদ দিলেও স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের বৃহত্তর তাগিদ থেকে এ বিষয়টি তুলে ধরছি। আশ্চর্যের কথা এই যে, যে আর্থিক সংস্থার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই সেখানে যখন অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে_ এর বিপরীতে সরকারি ঋণদানকারী যেসব সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্য প্রকৃতই ঝুঁকিতে তাদের জন্য কোনো কমিটি-কমিশন সরকার গঠন করছে না। আশির দশকে মন্দ ঋণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সে সময়ে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। এখনকার অবস্থা তখনকার তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে, এমন প্রবণতা লক্ষণীয়। এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এক. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শ্রেণীবদ্ধ ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এর মধ্যে যৎসামান্য নগদ আদায়_ ১০ শতাংশ বা তার কম। বাকি সবটাই পুনঃতফসিল। এ ক্ষেত্রে নিয়ম যেখানে সর্বোচ্চ তিনবার করার, সেখানে ৮-১০ বারও করা হচ্ছে। এতে করে তারল্য সংকটের কারণে নতুন ঋণগ্রহীতার কাছে তহবিল পুনঃচক্রায়িত করা যাচ্ছে না। এ ধরনের পুনঃতফসিলের কারণে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকখানি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দুই. যেসব ঋণ গত কয়েক বছরে দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ উৎপাদনমুখী খাতে দেওয়া হয়েছে কি-না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কতটা দেওয়া হয়েছে তার মূল্যায়ন কোনো সরকারি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না। এ জন্য কোনো কাজ হচ্ছে বলেও এ মুহূর্তে জানা নেই।
তিন. সরকারি এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক হিসেবে যারা রয়েছেন তাদের অনেকের পেশাগত ব্যাংকিংয়ের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, রাজনৈতিক পরিচয়ই মুখ্য। এটাও লক্ষণীয় যে, যখন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ তহবিলের জন্য অর্থ সংকটে ভুগছে সেখানে নতুন করে কোন বিবেচনায় কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হলো। এর পেছনে দৃঢ় অর্থনৈতিক যুক্তি মেলে না। যুক্তি মিলত যদি এসব ব্যাংক এমন কোনো খাতের জন্য নির্দিষ্ট থাকত কিংবা নতুন কোনো ফিন্যান্সিয়াল প্রডাক্ট বাজারে আনত_ যেমন : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণ, আদিবাসী, চর এলাকা কিংবা স্থানীয় সরকারের জন্য অর্থায়ন। অতীতে বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক কোনো না কোনো রাজনৈতিক কানেকশনে অনুমতি পেয়েছে, এটা বড় করে দেখতে চাই না। কিন্তু দক্ষতার প্রশ্ন তো তোলা উচিত।
বাজেট আলোচনায় গরিবদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসঙ্গ থাকেই। ধরে নেওয়া হবে, প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যতটা কর্মসংস্থান হবে তার বাইরে যারা থাকবে তাদের এ বেষ্টনীর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। নব্বইয়ের দশকে বাজেটে এ বাবদ জিডিপির ০.৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকত (বাজেটের ৫ শতাংশ)। এখন তা জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে (মোট সরকারি ব্যয়ের ১৬-১৮ শতাংশ)। আপাতদৃষ্টিতে এটাকে উইন উইন কৌশল মনে হতে পারে। কিন্তু কার্যত কি তাই? এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এর তিনটি কারণ তুলে ধরব। এক. এসব কর্মসূচিতে যে পরিমাণ মাসিক সুবিধা দেওয়া হয় তা অতি নগণ্য। ৩০০-৫০০ টাকার বিধবা ভাতা কিংবা অন্য কোনো হেডে সহায়তার পরিমাণ এক বা দেড় দিনের কৃষি মজুরির সমান। এতে দরিদ্রের পক্ষে মই ধরে ওপরে ওঠার সুযোগ নেই। দ্বিতীয় হচ্ছে, এ ধরনের কর্মসূচি, বিশেষ করে খাদ্যভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, যার পরিমাণ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। অনেক এলাকায় অবহেলিত জনগোষ্ঠী এসব কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে না। তৃতীয় সমস্যা যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ_ বাজেট মানেই গরিবমুখীনতা, এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে না পারা। আর্থিক বরাদ্দ না বাড়িয়েও অনেক উপায়ে দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব। যেমন খাস জমি বিতরণ। যে খাস জমি সরকারের হাতে রয়েছে তা নিয়ম অনুযায়ী ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা চাই। অনেক গবেষণায় প্রমাণিত, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় এ ব্যবস্থায় অনেক পরিবার উপকৃত হয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের বাজেট আলোচনায় যেমন অনুপস্থিত তেমনি মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ নিয়ে তাগিদ দেখা যায় না। অথচ মাত্র দুই দশক আগে আমাদের বাবা-দাদারাই তো কৃষি কাজে নিযুক্ত ছিলেন! এ ধরনের শ্রেণী বিস্মৃতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাছাড়া শহর ও গ্রামের মধ্যেও রয়েছে বিস্মৃতি। শহরের দরিদ্ররা যেন দরিদ্র নয়, তারা যেন অনুপ্রবেশকারী। গ্রামের দরিদ্রদের জন্য যা কিছু ব্যবস্থা সেসব শহরের দরিদ্রদের জন্য বন্ধ। দিনবদলের এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সরকারের কাছে এটা আশা করিনি।
একটি সাবেকী মত হচ্ছে প্রবৃদ্ধি আবশ্যকীয়, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। এখন মত বদল হচ্ছে। যে প্রবৃদ্ধি পরিবেশ ধ্বংস করে, প্রাকৃতিক সম্পদ অবক্ষয় করে সে প্রবৃদ্ধি যেমন স্থায়িত্বশীল হয় না, তেমনি তা হয় বৈষম্যবর্ধক ও জনকল্যাণ বিরোধী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তুরাগ নদ ভরাট করে নির্মাণ শিল্পের বিকাশ। হাইপোথেটিক্যালি বলা যায়, বুড়িগঙ্গা ভরাট করে শিল্প নগরী করা হলে সেটা কি মেনে নেব? বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ হলে প্রবৃদ্ধি চীনের মতো ১০-১১ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজের অকল্যাণ হতে পারে, পরিবেশের সর্বনাশ হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেটের কোথাও পরিবেশসম্মত উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলা নেই। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবেশ সহনশীল প্রবৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন সহজ নয়। এ জন্য যেমন কর প্রশাসনে গ্রিন ট্যাক্স বড় ভূমিকা পালন করবে, তেমনি পরিবেশ দূষণকারী সব নির্মাণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বন্ধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া জলবায়ু বিপন্ন এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীল জনকল্যাণমুখী প্রবৃদ্ধি প্রায় অসম্ভব।
আমাদের জন্য দুঃখের বিষয় যে একটি রাজনৈতিক সরকার উন্নয়নকে কেবল ৫ বছরের মেয়াদেই সীমিত দেখতে চায়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যতটা সুযোগ প্রথম বছরে থাকে, নির্বাচনের আগে দুই বছরে সে তাগিদ ফুরিয়ে যায়। বর্তমান সরকার প্রথম দুই বছরে মন দিয়েছে শেয়ারবাজারে কৃত্রিম তেজীভাব সৃষ্টি করে চটজলদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তড়িঘড়ি সমাধানের প্রতি। যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার তুলে ধরা জরুরি ছিল, তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় চলে যায় পেছনের সারিতে। শেয়ারবাজার ও কুইক রেন্টাল সরকারকে বিপদে ফেলেছে। তবে খেলায় এখন হাফ টাইমের বিরতি চলছে। এখনও সময় আছে, যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা এতক্ষণ তুলে ধরলাম সেদিকে মনোযোগ দিলে সরকার হয়তো ক্রমশ লুপ্ত জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ড. বিনায়ক সেন : অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক এবং গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস
অজয় দাশগুপ্ত : সাংবাদিক

তিমিরবিনাশী দুই কবি

বিনায়ক সেন

দু’জনেই ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। বিদেশী অনুষঙ্গে তাদের মননচর্চা ছাত্রাবস্থা থেকেই বিশিষ্ট হয়ে উঠছিল। মালার্মে-ভালেরী তো ছিলেনই, আরো ছিলেন রিল্কে, ইয়েটস, এলিয়ট, এলুয়ার, আরাগঁ, অডেন। জীবনানন্দের জন্য বাড়তি প্রেরণা ছিলেন কীটস; শামসুর রাহমানের জন্য পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার ঋতুবদলের প্রধান উৎস বোদলেয়ার। উভয়ের জন্যই এক অভিন্ন আশ্রয়স্থল ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শামসুর রাহমান তার নানা কবিতায় বেশুমার ব্যবহার করেন অগ্রজ ও সমসাময়িক কবিদের নাম। শুধু য়ুরোপীয় সাহিত্যের সূত্রে নয়, হাত বাড়ান তার বাইরেও যেমন জালালুদ্দিন রুমী, নাজিম হিকমত, গার্সিয়া লোরকা, পাবলো নেরুদা, সেজার ভায়েহো। জীবনানন্দ এটা প্রায় কখনোই করেননি এত গভীরভাবে বিদেশী সাহিত্য পড়া ও পড়ানোর মধ্যে নিমজ্জিত থেকেও। ব্যতিক্রম হয় শুধু রবীন্দ্রনাথের বেলায়। দু’জনের কবিতায় নানা সময়ে ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ। তবে গদ্য রচনায় ও পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় জীবনানন্দ নিবিষ্ট আলোচনা করছেন বিদেশী নক্ষত্রমণ্ডলের সেখানে ইয়েটস, রিল্কে, হার্ডি, হাউসম্যান, সিটওয়েল, এলিয়ট, পাউন্ড, ডে-লুইস, স্পেন্ডর, অডেন, কামিংস কেউ বাদ পড়ছেন না। দু’জনেই আবার সমসাময়িকদের রচনা নিয়ে মনোযোগী আলোচনায় প্রবৃত্ত হচ্ছেন। জীবনানন্দ নিয়ে সুধীন্দ্রনাথ কোনো অব্যাখ্যাত কারণে একটি বাক্যও মন্তব্য করেননি [অন্তত তার জীবদ্দশায়]। সুধীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জীবনানন্দ উচ্ছ্বসিত আলোচনা করেছেন এমনকি কাব্যবিচারে তাকে স্থান দিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু-অমিয় চক্রবর্তীর উপরে। শোনা যাক তারই অননুকরণীয় কণ্ঠে :

‘সুধীন্দ্রনাথ আজকাল কবিতা লেখা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। এই কবির প্রতিভা এবং আন্তরিকতা এঁর নিজের জিনিস। আর কিছু জানাবার নেই মেনে হয়তো তিনি আত্মজিজ্ঞাসায় চুপ হয়ে আছেন। এ রকম আত্মপ্রসাদহীন সংযম দেশী-বিদেশী খুব কম লেখকের বেলাই দেখা যায়। তিনি আধুনিক বাংলা কাব্যের সবচেয়ে বেশি নিরাশাকরোজ্জ্বল চেতনা। … আধুনিক সাহিত্যের প্রায় কারো আনা তথাকথিত প্রাগ্রসর কবিতার চেয়ে সুধীন্দ্রনাথের কবিতা বেশি প্রবীণ; তার নিজের এষণার কবিতালোকে তিনি আধুনিক প্রায় সকল কবির চেয়েই বেশি আন্তরিক নন কি?’

‘সুধীন্দ্রীয় কাব্য’ এই অভিধাও জীবনানন্দেরই দেয়া। এই কাব্য একাধারে ‘নৈর্ব্যক্তিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক’। শামসুর রাহমানও তার সমসাময়িক ও তরুণ প্রজন্মের কবি-শিল্পী-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আলোচনা করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে উৎসর্গ করেছেন স্মরণীয় সব কবিতা। এতে হয়তো বিস্ময়ের কিছু নেই :শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৬৫টি। [এর সমতুল্য কাব্যগ্রন্থ রচনা কোনো বাঙালি কবিরই আজো নেই)। কিন্তু মনের বিশাল উদারতাও ছিল সমকালীনের প্রতি এত ঘনিষ্ঠ মনোযোগের পেছনে একটা কারণ। রশীদ করীম [যিনি শামসুর রাহমান সম্পর্কে একাধিক নিবিষ্ট লেখার জন্ম দিয়েছেন তার কাব্যকৃতির নানা দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে] আড্ডার ছলে জানাচ্ছেন ‘বেচারা শামসুর রাহমান একবার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নামের সঙ্গে একই নিঃশ্বাসে রশীদ করীমের নামটি উচ্চারণ করে বড়ই নাকাল হয়েছিলেন।’ ঐ লেখাতেই রশীদ করীম জানিয়েছেন যে শামসুর রাহমান তাকে রহস্য করে বলেছেন, ‘আমার সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে আপনাদের নাম বড় বেশি উলি্লখিত হচ্ছে। কিছুদিন একেবারে ‘ব্ল্যাক-আউট’ করতে হবে। নামগুলো শওকত ওসমান, রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ এবং আরো কিছু কিছু নাম’। এর সত্যতায় সন্দেহের কিছু নেই। শামসুর রাহমানের নিজের সৃষ্ট ক্ষুদ্রায়তন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়েই রয়েছে সমসাময়িক ও তরুণ প্রজন্মের দেশী-বিদেশী কবি-সাহিত্যিকের ওপরে আলোচনা।

জীবনানন্দকে পারলে সবাই কোন না কোন সময়ে, কখনো কোন কারণ ছাড়াই, ঠুকেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঠোকা হয়েছে পরস্পরবিরোধী কারণে ও উপলক্ষে। কেন আরো বেশি করে জনগণের কবি হয়ে উঠতে পারেননি এই অভিযোগে কবিকে ‘তুলোধোনা’ করেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। জীবনানন্দর মৃত্যুর পরে স্মৃতিচারণায় সুভাষ লিখেছেন, ‘আমি আকথা কুকথা লিখলেও আমার প্রতি স্নেহ-মমতায় কোনো টান পড়েনি’ এবং এমন আভাস দিয়েছেন যে, তার পূর্বতন সমালোচনাটুকু লেখা হয়েছিল ‘সাতটি তারার তিমির’ না পড়েই! আবার, ‘সাতটি তারার তিমির’ ও এর পরবর্তী সময়ে সমাজ-ইতিহাস-দর্শনবিদ্ধ কবিতা লেখার কারণে ‘কবিতা’ পত্রিকার গোষ্ঠী [বুদ্ধদেব বসুসহ] তাদের প্রাক্তন সমর্থন ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। বুদ্ধদেবের এই ক্রমনিরাসক্তি জীবনানন্দের চোখ এড়ায়নি। প্রভাকর সেনকে লেখা ১৯৪৬ সালের এক চিঠিতে জীবনানন্দ আক্ষেপহীনভাবে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে প্রগতির ও বুদ্ধদেব বসুর কাছে আমার কবিতা ঢের বেশি আশা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল … অতএব সাহস ও সততা দেখাবার সুযোগ লাভ করে চরিতার্থ হলাম বুদ্ধদেব বাবুর বিচারশক্তির ও হৃদয়বুদ্ধির; আমার কবিতার জন্য বেশ বড় স্থান দিয়েছিলেন তিনি ‘প্রগতি’তে এবং পরে ‘কবিতা’য় প্রথম দিক দিয়ে। তারপরে ‘বনলতা সেন’-এর পরবর্তী কাব্যে আমি তার পৃথিবীর অপরিচিত, আমার নিজেরও পৃথিবীর বাইরে চলে গেছি বলে মনে করেন তিনি। এর বিপরীতে ‘পূর্বাশা’ [ও ‘নিরুক্ত’]পত্রিকার সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য মনে করেছেন যে, জীবনানন্দের শেষের দিকের কবিতায় বরং তার ‘পারিপাশর্ি্বক চেতনা প্রৌঢ় পরিণতি’ লাভ করেছে। এই প্রশংসায় অবশ্য পুরোপুরি সায় ছিল না জীবনানন্দের কেননা সমাজ-ইতিহাস চেতনার বাইরে আরো কয়েকটি নতুন ‘সুর’ রয়ে গেছে আবিষ্কারের অপেক্ষায় এমনটা তার মনে হয়েছিল। ‘সাতটি তারার তিমির’ এর কবিতা রূপ নিয়েছে ‘দার্শনিকতায় এবং সে দর্শনও অবোধ্য’ এই অভিযোগ উঠেছে আবু সঈদ আয়ুব, অশোক মিত্র, তরুণতর নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাছ থেকে। যদিও কবির মৃত্যুর পর নীরেন্দ্রনাথ তার পূর্বতন অবস্থান কিছুটা শুধরে নিয়ে বলেছেন :’তার এই সময়ের কবিতা যদি আমাদের কাছে ঈষৎ দুর্বোধ্য লাগে তার ভাবনানিব্যাসকে যদি ঈষৎ অসচ্ছ অস্পষ্ট অবয়ব বলে মনে হয় তাতে বিস্ময়বোধের কারণ নেই। তার কারণ অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে মহৎ কবিমাত্রেই আমাদের থেকে দু-দশ বছর সামনে এগিয়ে থাকেন।’
তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে শামসুর রাহমানকেও কাছের ও দূরের বলয় থেকে নানা বিরুদ্ধ সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রেমের বনাম রাজনৈতিক কবিতা, তাৎকাল্য প্রবণতা বনাম কালোত্তীর্ণতা, নগরকেন্দ্রিকতা বনাম বৃহত্তর জনজীবন মুখীনতা, বিদেশী উপমা-উৎপ্রেক্ষা বনাম লোকজ উপমা অনুষঙ্গের অনুসৃতি, স্লোগান-ধর্মী বনাম শিল্পকলাসম্মত বিধি, নিজের কাব্যকলার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি বনাম ক্রমাগত নবায়ন নানা কারণে [এবং কখনো কোন কারণ ছাড়াই] কবিকে এ দেশে বিভিন্ন অসুখী সমালোচনার তোপে পড়তে হয়েছে। তবে এসব কাব্যবিচার নিয়ে দু’জনের মধ্যেই এক ধরনের নির্লিপ্তি অনুভব করা যায়। আধুনিক বাংলা কবিতার দুই প্রধান স্থপতি রবীন্দ্র-উত্তর যুগের জীবনানন্দ দাশ ও জীবনানন্দ-উত্তর যুগের শামসুর রাহমান দু’জনেই সমসাময়িকতায় বিদ্ধ হয়েও ছিলেন মূলত আত্মবৃত কবি। অন্নদাশংকর রায় জীবনানন্দকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘শুদ্ধতম কবি’ হিসেবে, আর শামসুর রাহমান আমরণ কবিতারই ধ্যান করেছেন। দু’জনেই ছিলেন শিল্পী-সাহিত্যিকদের সচরাচর নিঃসঙ্গকামিতার মাপকাঠিতেও ‘পাবলিক লাইফ’ থেকে অনেকটাই দূরত্বে। জীবনানন্দের শেষের দিকের কবিতাগুলোয় আদর্শগত অবস্থান এক নিজস্ব প্রগতিবাদী দৃষ্টিকোণে বিবর্তিত হচ্ছিল, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ক্যাম্পে তিনি ছিলেন না। শামসুর রাহমান নানা প্রগতিবাদী আন্দোলন ও অবস্থানের সাথে কবিতার মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে ছিলেন একান্ত নির্জনতাপ্রিয়। জীবনানন্দের মধ্যে এটা তীব্র মাত্রায় ছিল বুদ্ধদেব লিখেছেন, ‘যে অতিলৌকিক আবহাওয়া তার কবিতার, তা-ই যেন মানুষটিকেও ঘিরে থাকত সবসময় তার ব্যবধান অতিক্রম করতে ব্যক্তিগত জীবনে আমি পারিনি। সমসাময়িক অন্য কোনো সাহিত্যিকও না।’

কবির সাথে আমার যৎসামান্য যে পরিচয় ঘটেছিল তাতে আমার ধারণা হয়েছে, শামসুর রাহমানও ছিলেন দিনের অধিকাংশ প্রহর নিরালায় থাকতে ভালোবাসেন এমন একজন মানুষ। বিশ্বসাহিত্যের উপরে অগাধ দখল সত্ত্বেও কখনো তাকে সেসব নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হতে দেখিনি বা কেউ দেখেছে বলে শুনিনি। নিজস্ব পড়াশোনাটাকে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালেই রেখে দিতেন অন্যের কাছে শুনতেই চাইতেন বেশি। তার ক্ষুদ্রায়তন প্রবন্ধগুচ্ছ তার নানা ধরনের পড়াশোনার বিশেষত কবিতার পঠন-পাঠনের নানা অভিজ্ঞতার সামান্যই তুলে ধরেছে।

একবার রবার্ট ব্লাই-এর অনুবাদে সেজার ভায়েহোর একটি কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে শামসুর রাহমানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘প্যারিসে মারা যাব আমি কোন বৃষ্টির সন্ধ্যায়’ কবিতাটি তার চোখে পড়েছে কিনা। উত্তরে মুহূর্ত বিলম্ব না করে তিনি জানালেন, ওটি তার একটি প্রিয় কবিতা এবং ওর প্রভাবে তিনি ষাটের দশকের শেষে নিজেই একটি কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। নাজিম হিকমতেরও নিবিষ্ট পাঠক ছিলেন তিনি এবং শেষের দিকের বেশ কিছু কবিতায় নাজিমের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। আসলে, জীবনানন্দ ও শামসুর রাহমান উভয়ের কবিতাতে নানা মহাদেশ থেকে আলো ঠিকরে পড়েছে, কিন্তু নিজেদের তারা উন্মুক্ত করে রেখেছিলেন কেবল এই কারণে যে নিজেদেরকে তারা বদ্ধ পুকুরে ঘেরাও করে রাখতে চাননি। তার এক কবিতায় শামসুর রাহমান বলেছেন, বিশ্ব-সভ্যতার নানা সময়ের অনেক প্রতিভার কাছে দায়বদ্ধ বলেই তিনি প্রতিক্রিয়ার হুমকির মুখে পিছু হটতে চান না। তাছাড়া বিদেশী অনুষঙ্গ কিংবা চিত্রকল্প ব্যবহার করার আরেকটি প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য হচ্ছে, ‘পাঠকের মানসিক দিগন্তকে একটুখানি প্রসারিত করে দেয়া।’ এ বিষয়ে আল মাহমুদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার কিছুটা মতভিন্নতা ছিল বলে রশীদ করীম জানিয়েছেন আমাদের। এই সূত্রেই আমরা বাংলা কবিতায় ব্রাকের মাছ, সেজানের আপেল আর মাতিস-শাগালের কুহকিনীদের আকাশে উড়তে দেখেছি।

২. জীবনানন্দকে যারা গাঁও-গেরামের কবি, আধুনিকতা-বিচ্ছিন্ন নির্জনতার কবি বলে মনে করেন এখনো এ রকম রয়ে গেছেন কেউ কেউ তারা তার যুক্তিধর্মী মানসগঠনকে ভুলে যান। পারিবারিক পটভূমির বিষয়টিও সময় সময় তাদের খেয়ালে থাকে না। জীবনানন্দের যুক্তিধর্মী মানসগঠন [যার জমিন ছেলেবেলাতেই নির্মিত হয়ে গিয়েছিল] সম্পর্কে প্রথমেই মনে রাখবার বিষয় হলো এই পরিবারের ব্রাহ্ম-সমাজীয় পটভূমি। বাবা সত্যনন্দ দাশ শুধু ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতার দায়িত্বই পালন করেননি, তাকে ঘিরে ‘এক উন্মেষধর্মী সংঘ গড়ে উঠেছিল সেখানে সাহিত্যিক, শৈল্পিক, নৈতিক, রাষ্ট্রীয় আলোচনায় বিকেলবেলা ও রাত্রিগুলো যেন কেমন একটি স্বাধিকার ফিরে পেত।’ তাছাড়া তার ধর্মজীবনও ছিল লক্ষ্য করার। শুধু যে বরিশালের ব্রাহ্মসমাজের তিনি আচার্য ও বক্তা ছিলেন তা-ই নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় তার অবাধ বিচরণ ছিল। জীবনানন্দের বর্ণনায়, তার পিতা ‘সেকালের ঊনবিংশ শতাব্দীর ডারউইন, হাক্সলি, মিল এঁদের মতামত যেমন পর্যালোচনা করেছেন, তেমনই ওয়েলস-রাসেল এমনকি আধুনিক রাশিয়ার নববিধানের সঙ্গেও তিনি অপরিচিত ছিলেন না।’ পিতার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তাঁর ধর্মবিশ্বাস কোনো দিন আঘাত পেতে ভয় পেত না। ব্রাহ্মসমাজের পুরাচার্যদের কাছ থেকে ও নিজের পিতার কাছ থেকে যে ধর্মবিশ্বাস তিনি পেয়েছিলেন পুনরায় নিজের অন্বেষায় সে জিনিস অর্জন না করে ভোগ করবার মতোন অলস পাণ্ডিত্য তাঁর কোনো দিন ছিল না।’ এই ব্রহ্মবাদী পিতার কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েই জীবনানন্দের ‘সজাগ প্রাজ্ঞ মন ইতিহাসধারার মুখোমুখি বসে ব্যক্তিগত দুঃখকে কখনো আক্ষেপে পরিণত হতে দেয়নি।’ সাহিত্যের আদি মূল্যবোধও তিনি পেয়েছিলেন কিছুটা পিতার এবং কিছুটা তার মা’র বাবা চন্দ্রনাথ দাশ ও মা কুসুম কুমারীর কাছ থেকে। কুসুম কুমারী বিদুষী ছিলেন :’বাবা-র ও পিসেমশায়ের অবর্তমানে তিনি বরিশাল-এর ব্রাহ্মসমাজে আচার্যের কাজ করতেন।’ কুসুমকুমারী কবিতা লিখতেন, তার সন্তানদের চেয়ে পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, যদিও বিয়ের কারণে এন্ট্রান্স দেওয়া হয়নি, তারপরও তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব অনুভব করা যায় সামান্য কয়েকটি বাক্যে।

চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পরে জীবনানন্দ একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেটি পড়ে মা লিখলেন :’চিত্তরঞ্জন সম্বন্ধে লিখেছ, ভালোই করেছ। কিন্তু রামমোহন-এর ওপর লিখতে বলেছি তোমাকে। মহর্ষির ওপরেও।’ ছেলেবেলায় ঘুমানোর আগে বসে থাকতেন কখন মা দিনের সব কাজ শেষ করে ঘরে আসবেন। ‘সমস্ত দিনের শেষে দু’চারটে পত্র-পত্রিকা-বই নিয়ে’ মা পড়ছেন। আর মায়ের ‘মুখচোখের সামনের সেই প্রদীপটির দিকে তাকিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ছেন’ এই ছিল প্রথম মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকের সেই অপেক্ষাকৃত নির্দোষ পৃথিবীর স্মৃতিচারণ। অন্যদিকে এটাও কবির মনে হয়েছে যে, কুসুমকুমারী যখন সময় সময় ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, তখন ‘সেই আরাধনা উপাসনা আশ্চর্য নির্ঝরের মতো ধ্বনিত হয়ে তবুও ধ্বনির অতীত অর্থগৌরবের দিকে আমাদের মর্ম ফিরিয়ে রাখত; কোথাও ঠেকতেন না। তাল কেটে যেত না পুনরুক্তি ছিল না, কিন্তু যে সাহিত্যিকের ও কবির গরিমা তার প্রাপ্য ছিল, সেটাকে অন্তর্দমিত করে রাখলেন তিনি প্রকাশ্য কোনো পুরস্কার নিতে গেলেন না।’ আর পিতার ক্ষেত্রে যে ‘ভারতীয় দর্শন ও ভারতবর্ষের উপনিষদই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণের জিনিস ছিল’ একথা তো আগেই জানিয়েছেন। তবে বাড়তি যে উপাদানটি লক্ষ্য করার তাহলো পিতাকে নিয়ে কবির নিত্যদিনের অভিজ্ঞতাটি : ‘প্রায় রোজ শেষরাতে বিশেষত হেমন্তকালে ও শীতকালে উপনিষদ-এর শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে তিনি আমাদের অপরূপ সূর্য-চেতনার প্রভাতে নিয়ে আসতেন।’ জীবনানন্দের এই স্মৃতিচারণা না বুঝলে কীভাবে তার ভেতরের যুক্তিধর্মী মানস ও নন্দনতাত্তি্বক অনুভব গড়ে উঠেছিল, তার উৎস নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এমনকি কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রতি জীবনানন্দীয় সন্দেহের পেছনে তার পিতৃদেবের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল বলে আজ মনে হয়।

সত্যানন্দ দাশের ভাবাদর্শ নিয়ে বলতে গিয়ে কবি লিখেছেন, ‘বিদেশের আগে নিজের দেশের অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রিক দুরবস্থা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন হয়েও তিনি প্রচলিত ন্যাশনালিজম ও স্বদেশপ্রীতির ভিতরের পার্থক্য অনুভব করতেন। তথাকথিত ন্যাশনালিজমকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখলেও দেশাত্মবোধ তাঁর কাছে গৌরবের জিনিস ছিল। রাষ্ট্রিক আন্দোলনে তিনি নিবেদনের বা ভিক্ষা মানসিকতার পক্ষপাতী ছিলেন না। জনসাধারণের সঙ্গে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের যে একটি বিভেদ রয়ে গেছে, তা না ঘোচালে অল্পস্বল্প বা বিশেষ রাষ্ট্রিক পরিবর্তনেও যে কোনও দেশেরই স্থায়ী মঙ্গল হবে না। এ-সম্বন্ধে তিনি অবহিত ছিলেন। দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ পর্বের জাতীয়তাবাদের সমালোচনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ সত্যানন্দ দাশের সূত্রে জীবনানন্দকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং ‘বেলা অবেলা কালবেলা’র পর্বে এসে নেশনের ব্যভিচার নিয়ে যেসব কবিতা জীবনানন্দ পরবর্তীতে লিখেছিলেন তার পূর্বসাক্ষ্য এখানেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। শামসুর রাহমান সে তুলনায় ভিন্ন ঘরানার মানুষ। কিন্তু নিজের মা, বাবা, ভাই, সন্তান ও আত্মীয়-স্বজন নিয়ে অনেকগুলো স্মরণীয় ও পৃথকভাবে আলোচ্য কবিতা লিখেছেন তিনি সারা জীবনে। মাকে নিয়ে তার বিখ্যাত কবিতা ‘কখনো আমার মাকে’ কাব্যজীবনের প্রথম পর্বেই রচিত হয়ে গিয়েছিল। কুসুমকুমারীর মত কবিতা লিখতেন না তিনি, এমনকি গুনগুনিয়ে গানও করতে শোনেননি মাকে। কিন্তু জীবনের সংকটময় মুহূর্তে নৈতিক সাহস যুগিয়েছেন তিনিই কবিকে। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হামলায় কায়রোয় ছুরিকাহত হয়েছিলেন নাগিব মাহফুজ, সেই একইভাবে একই যুগে এ রকম হামলার মুখোমুখি হয়েছিলেন এদেশে হুমায়ুন আজাদ ও শামসুর রাহমান। সেই আতঙ্কের রেশ ও মহাপতনের শব্দ শোনা যায় কবির শেষ দিককার কাব্যগ্রন্থগুলোয়। তবে সেখানেও তার আঁকড়ে-ধরার উৎসমূল তার মা। মার সাথে হয়তো কোনদিন আর দেখা হবে না জেনেও স্বপ্নে তিনি শুনতে পান মা তাকে ভরসা দিচ্ছেন, বলছেন, যতক্ষণ তিনি সত্যের পথে অছেন, কোন ভয় নেই তার। অন্যত্র, মাতামহীর টাইপরাইটার অলৌকিকভাবে আবৃত্তি করতে থাকে কোরানের আয়াত, আওড়ায় ফার্সি বয়েত। কবির স্বপ্নের দ্বীপে তার মাতামহী হয়ে দাঁড়ান প্রজ্ঞাবান প্রস্পেরো। আর এসবই ধরা পড়ে কবির কাছে যখন তিনি ভাবছিলেন উপনিষদ তর্জমা করার সময় যুবরাজ দারাশিকোর মনে কি ভাবনার দোলা দিচ্ছিল, অথবা কী রকম জীবন ছিল সেইসব ইহুদীদের যারা আউসভিৎসের কন্সেনট্রেশন ক্যাম্পে মৃত্যুর দিন গুনছিলেন।

৩. ২০ শে মে ১৯৫৩’র চিঠিতে সুরজিৎ দাশগুপ্তকে জীবনানন্দ লেখেন, ‘আমার কবিতা সম্বন্ধে নানা জায়গায় নানা রকম লেখা দেখেছি/মন্তব্য শুনেছি; প্রায় চোদ্দআনি আমার কাছে অসার বলে মনে হয়েছে।’ অসারত্বের একটি নবতর নমুনা পাওয়া যায় ঐ উক্তির পাঁচ বছর পরে বেরুনো সুকুমার সেন-এর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে। ততদিনে কবি বেঁচে নেই। জীবনানন্দের ভূমিকা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি গোবিন্দচন্দ্র দাসের সাথে কবির নৈকট্য দাবী করে বসেন : ‘গোবিন্দচন্দ্র দাসের পর জীবনানন্দই একমাত্র যাহার রচনায় পূর্ববঙ্গের নিজস্ব আবেষ্টনের রূপ ও রস ধরিয়াছে। তবে জীবনানন্দের অবলম্বিত বিশিষ্ট শিল্পকৌশলে সে প্রাকৃতিক আবেষ্টন শেষ অবধি কতকগুলি যেন সিম্বলে বিধৃত হইয়া হারাইয়া গিয়াছে’। এখন বোঝা যায় কেন অধ্যাপকদের উদ্দেশ্য করে জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘বরং নিজেই তুমি লেখো নাকো একটি কবিতা’!

বেঁচে থাকলে গোবিন্দচন্দ্র দাসের সাথে তুলনা জীবনানন্দকে আরো বেশি আহত করত কেননা সহজাত বা স্বভাবকবিত্ব বিষয়টিকে বরাবরই প্রতিভার নিতান্ত প্রাথমিক লক্ষণ বলে জ্ঞান করেছেন তিনি। সহজাতের হাত ধরে চূড়ান্ত পরিণতিতে পেঁৗছানো দুরূহ। ‘কবিতা, তার আলোচনা’ প্রবন্ধে তিনি সহজ কবিগুণকে আরো দর্শন সচেতন ও জ্ঞানশুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ‘পৃথিবীর ও নিজের জীবনের ক্রমিক অভিজ্ঞতায়, কোন অভিজ্ঞতার কী মূল্য সেই চেতনায়, বিজ্ঞান কী দিতে পারছে, পারবে, জ্ঞান কী দিল’ এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে তরুণ কবিস্বভাবকে ‘আরো সজাগ ও তপঃশক্তিশীলভাবে শিক্ষিত ও অনুভূতিঘন ও সুস্পষ্ট’ করে তোলার পরামর্শ ছিল তার। তার মানে এই নয় যে, কবিকে তিনি বৈজ্ঞানিক, অর্থনীতিবিদ বা দার্শনিক হয়ে যেতে বলছেন। সেখানে একটা সীমারেখা টানতেই হয়েছে তাকে : ‘দার্শনিকের মতো এতটা সচেতন ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নয় কান্ট’এর মতো বা মার্ক্স’এর মতো নয়’, কিন্তু তবুও আরো প্রশিক্ষিতভাবে অগ্রসর হতে বলছেন তরুণ কবিকে এবং এ পথেই কেবল নিজেকে সফল ও শুদ্ধ করে নেয়া সম্ভব। তরুণ-কবির কাছে রিল্কে যে-উপদেশ দিয়েছিলেন, সেভাবেও এই রচনাটিকে দেখতে পারি আমরা। বাংলাদেশে মনন-বিরোধী চর্চার একটা ধারা বেশ কিছুকাল ধরে চালু হতে শুরু করেছে মনন-বিরোধী এক ‘বাউলিয়ানার চর্চা’ বলা যেতে পারে একে। জীবনানন্দের প্রবন্ধ-সমগ্র ঘাঁটলে এ রকম ধারার প্রতি তার সায় থাকত না এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বনলতা সেন-উত্তর জীবনানন্দের প্রেক্ষিতে তো এটা নিদ্বর্িধায় বলা যায়। লোককবি ও কবিতা সম্পর্কে তার বক্তব্য অশ্রদ্বেয় কিছু ছিল না, কিন্তু একে শিল্পের আদর্শকল্প ভাবতে চাননি কখনোই : ‘লোক কবিতা বলতে না বোঝায় আমাদের দেশে সেটা ভালো জিনিস, কিন্তু নিজের স্বভাবগুণকে আরও শিক্ষিত, ক্রমেই বেশি-শিক্ষিত করে নিয়ে ঢের বেশি পরিণতির পথে চালিয়ে নিতে পারা যায়। অনেক বৈষ্ণব কবির সহজাত কবিত্ব ছিল শিক্ষিত হয়েছিলেন কিন্তু ততবেশি শিক্ষিত দেশ, সমাজ, সে কালের বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক জ্ঞান ও প্রস্থান সম্পর্কে শিক্ষাদীক্ষায় সে-রকম কিছু সিদ্ধ-হয়ে উঠতে পারেন নি’। যারা মৌলিকভাবেই লোক দর্শনের অনুচিন্তন করেছিলেন সন্ত কবীর, দাদূ থেকে শুরু করে লালন ও হাসনরাজা তাদের কবিতায় ও গানে জীবনের ক্রমিক অভিজ্ঞতা, দর্শন ও জ্ঞানচর্চা অকৃত্রিমভাবে বিকাশমান হয়েছে। অথেনটিসিটি-এর কোন খামতি ছিল না তাতে। হুমায়ূন আহমেদের একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবনে যুক্তির বাইরের হিমু ও যুক্তির ভেতরের মিসির আলী পরস্পরের সমর্থক হিসাবে কাজ করে যায়। সেখানেও অথেনটিসিটির-এর কোন ঘাটতি নেই। তবে র‌্যাশনালিজম পাশ্চাত্যের বিশেষ মানসিক গড়ন নয়, যেমন নয় মরমীবাদ প্রাচ্যের একচেটিয়া অধিকারে বীজগণিতের বীজ যেমন পাই মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সভ্যতার চর্চায়, তেমনি ক্যালকুলাসের উদ্বোধন হয়েছিল মঞ্জুলা, দ্বিতীয় আর্যভট্ট ও দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য্যের রচনা। থিওসফিক্যাল সোসাইটিগুলো বাজার পেয়েছিল পাশ্চাত্যেই [সে সুবাদে উনিশ-বিশ শতকে এদেশের নাগরিক বাবু সমাজে প্লানচেট-এর বেহ্তর আমদানি হয়েছিল]। সম্প্রতি ইংলন্ডের এক দোকানদারনী আমাকে বুঝিয়েছেন যে প্রাচ্যে তোমরা চর্চা করো মিস্টিকের, আর পাশ্চাত্যে আমরা চর্চা করি ম্যাজিকের। সুতরাং স্বভাবগুণকে মরমীগুণের আধার হিসেবে দেখে ভক্তিবাদেই প্রাচ্যের মুক্তি; এতে সায় থাকার কোন কথা ছিল না জীবনানন্দের ক্ষেত্রে। সমসাময়িক ইতিহাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, ধর্ম, রাজনীতি সমস্ত জটিল বর্তমানকে কবিতার অনুভবে আরো ভালোভাবে ব্যক্ত কী করে করা যায় সে রকম একটা চ্যালেঞ্জ বুকে নিয়ে জীবনানন্দ ধূসর পাণ্ডুলিপি-বনলতা সেন-এর চিরচেনা ভূমি ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিছক পর্বান্তর নয়_ ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটির তারার তিমির’ ও [মরণোত্তর] ‘বেলা অবেলা ও কালবেলা’ ছিল সেই সচেতন সিদ্ধান্তেরই কতিপয় শিল্প-প্রকল্প। এতে করে শিল্পোত্তীর্ণতার সফলতা-ব্যর্থতার যেসব অনিশ্চয়তা থাকল সেসব ঝুঁকি নিয়েই তিনি কাজ করেছেন।

এক ভিন্ন পটভূমি থেকে শামসুর রাহমানও নিজেকে সঙ্গী করেছিলেন ঐ একই অভিযানে। তিনিও বিশ্বাস করতেন আধুনিকতার থেকে পিছিয়ে নয়, আধুনিকতার বাইরে নয়, এক ‘অন্য আধুনিকতার’ জন্ম দিয়েই কাব্যের [ও সমাজেরও] মুক্তি ঘটবে। যে তিমিরবিনাশী ‘আশা-ভরসার সমাজের’ স্বপ্ন দেখতেন জীবনানন্দ তা একদিনে হবার ছিল না। সে তো বার্লিনের দেয়ালের পতনের এবং ওয়াল স্ট্রিটের অধুনাতন বিপর্যয়ের পর আজ আমরা সহজেই বুঝতে পারি। যে ধরনের সমাজে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি ঘটবে, সে ‘অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ’ এ রকম একটি জ্ঞান-আশ্রিত মানবিক সমাজ জীবনানন্দ ও শামসুর রাহমানের আদর্শস্থানীয় ছিল। জ্ঞানের বিহনে যেমন প্রেম নেই, প্রেমের বিহনে তেমনি জ্ঞানও সংকলিত জিনিসের ভিড় শুধু : ‘এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কংকাল।’ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শামসুর রাহমান হঠাৎই আবার জীবনানন্দীয় সুরে বলে ওঠেন : ‘হয়তো তখন আরও অগ্রসর মানব-মানবী জন্ম নেবে।’ তবে দু’জনে এই উপলব্ধিতে পেঁৗছেছিলেন যার যার নিজস্ব যানে করে।

৪. দুর্বোধ্যতার যে অভিযোগই আবু সঈদ আইয়ুব আনুন না কেন, বা [এর বিপরীতে] স্বভাব-কবিত্বের যে তকমাই সুকুমার সেন দিতে চান না কেন, জীবনানন্দের মৃত্যুর পরবর্তী তিন দশকে প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের মতোই অমোঘ ও ‘সর্বনেশে’ হয়ে উঠছে জীবনানন্দের প্রভাব। শুরু হয়ে গেছে জীবনানন্দের যুগ। অশোক মিত্র ১৯৬৫ সালে তারইকৃত পূর্বতন তিক্ত সমালোচনার মোড় ঘুরিয়ে ‘ভয়ে ভয়ে’ বললেন, ‘আজ থেকে অর্ধশতাব্দী আগেকার রবীন্দ্রানুস্মৃতির মতোই, বর্তমানের জীবনানন্দীয় ঘোর, আমার ধারণায়, বাংলা কাব্যকে এক জায়গায় আটকে রেখেছে, জীবনানন্দকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে না আসতে পারলে মুক্তি অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় জীবনানন্দের সৃষ্টি জ্যোতির্ময়তম। কিন্তু সে জন্যই বলছি, তাঁর সর্ব সমাচ্ছন্ন করা প্রভাব পরম সর্বনাশের ব্যাপার।’ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ যিনি রচনা করেছেন এ কথা অবশ্য তার বহু আগেই জানা হয়ে গিয়েছিল। সেই যে জীবনানন্দের কবিতায় ‘রূপালী স্নান’ করে উঠে নিজের স্বভূমির দিকে পা বাড়ালেন কিছু ফলদ ব্যতিক্রম বাদ দিলে মূলত শামসুর রাহমান জীবনানন্দের প্রভাব থেকে নিজেকে সচেতনভাবেই আগলে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর নিজের ভাষ্যে, ‘আমার নিজের কবিসত্তার বিকাশের তাগিদে কখনও কখনও স্বেচ্ছায় জীবনানন্দ দাশের কাব্যসম্ভার থেকে কিয়দ্দূরে থেকেছি কিন্তু তাঁকে অগ্রাহ্য করার স্পর্ধা দেখাইনি কস্মিনকালেও।’ পরের দিকে ‘নিদ্রার কুয়াশায়’ কবিতা-আকারে বলেছেন, ‘অম্লান জীবনানন্দ, পল এলুয়ার, ইয়েটস্ ফেলেছেন নিরিবিলি ছায়া’ তাঁর কোনো কোনো কবিতায়। ‘নেমকহারাম নই, করবো না অস্বীকার’ বলেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন পাঠকদের যে এক কবিতার থেকে অন্য কবিতার জন্ম হতে পারে, যেমন এক শলাকার আগুন থেকে অন্য শলাকায় আগুন নেওয়া যেতে পারে। এ নিয়ে চায়ের পেয়ালায় নিরর্থক ঝড় তোলা।

শামসুর রাহমান যে জীবনানন্দকে পাশে সরিয়ে তার নিজস্ব ভূ-ভাগ দখলের দিকে অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারলেন তার একটা বড় কারণ ছিল ষাটের দশকের স্বাধিকার-প্রমত্ত আন্দোলন। ‘বাংলাদেশ’ এই দেশের কাব্যভুবনের নিভৃত নায়ক শামসুর রাহমানকে দিয়ে ক্রমাগতভাবে মোহন শব্দাবলি লিখিয়ে নিচ্ছিল যার অভিজ্ঞতা জীবনানন্দের মধ্যে থাকার কথা ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলন ও স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্রের কাঠামো-উপরিকাঠামোজুড়ে কুরে কুরে খাওয়া সন্ত্রাস, অপশাসন ও অগণতান্ত্রিকতা, আর এসবের বিপরীতে ‘গোরস্তানে কোকিলের করুণ আহ্বান’ শামসুর রাহমানের দুই-তৃতীয়াংশ কাব্যসম্ভারের বিশেষ চরিত্র নির্ধারণ করে দিয়েছে। কবির শেষ দিন পর্যন্ত এ কথা বলা যায়।

এর বিপরীতে জীবনানন্দের শেষ জীবনের কবিতা ক্লিষ্ট হয়েছে দেশভাগের আগে ও পরের রাজনীতি, দাঙ্গা, মন্বন্তর ও উদ্বাস্তুতার ছায়ায়। শহীদ কাদরীকে কলকাতা ছেড়ে এসে ঢাকায় নতুন করে জীবন গড়ে তুলতে হয়েছে তার গোড়ার দিকের কবিতায় যুদ্ধের যে ছায়াপাত ঘটে যাকে তিনি ‘উত্তরাধিকার’ বলছেন র্যাঁবোর মতো তা হলো দেশভাগের আগে-পরের যুদ্ধের ছায়া, নরকের ঋতু। শামসুর রাহমানকে তুলনীয়ভাবে দেশান্তরিত হতে হয়নি। কিন্তু জীবনানন্দকে ছেড়ে আসতে হয়েছে পূর্ববঙ্গ, বরিশাল, ধানসিঁড়ি; ছেড়ে আসতে হয়েছে ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশন, ব্রাহ্মসমাজ, নারকেল-সুপারির বন, যেখানে ‘এক মাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে’ছিল। তার শেষ জীবনের কবিতার লাইনের অর্থদ্যোতনা, অস্পষ্টতা, জটিলতা ও দ্বন্দ্বের যে ক্রমাগত বিরোধাভাস পাই এর পেছনে উপদ্রুত উদ্বাস্তু জীবন, কলকাতায় গিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার তুমুল প্রাণপাত প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক টানাপড়েনের গ্গ্নানি, যুদ্ধ-মন্বন্তর-দাঙ্গার মধ্য দিয়ে দেশভাগ আর এসবের সাথে জড়িত পথনির্দেশহীনতা বেশ কিছুটা পরিমাণে দায়ী। শামসুর রাহমান ও জীবনানন্দ দু’জনেই এক অর্থে জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিজেকে ‘নিজভূমে পরবাসী’ বলে মনে করে থাকবেন। শহীদ কাদরীকে উৎসর্গ করা শেষ দিককার একটি কবিতায় স্পষ্ট করে শামসুর রাহমান বলেছিলেনও সে কথা। তবে দু’জনেই ছিলেন তিমিরবিনাশী সমাজের বিপরীতে নিষ্কম্প দাঁড়ানো তিমিরবিনাশী সমাজের অভ্যুদয়ের আশায়।