বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৭

পূর্বে প্রকাশিতের পর
কেননা, ‘ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি’ আইন, দর্শন ও রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি বহুল-অধীত ধারণা। সুযোগ কী ও কত প্রকারের, কোন সুযোগগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সে কারণেই (সম্পদ কম থাকলে) কোন সুযোগগুলোর ক্ষেত্রে সমতা বিধান সর্বাগ্রে করা উচিত এ নিয়ে পলিটিক্যাল ও মরাল ফিলোসফারদের মধ্যে বেশ খানিকটা মতানৈক্য রয়েছে। আইনী বা আনুষ্ঠানিক সমতা  (Formal equality of opportunity) বনাম বাস্তবিক সমতা  (Substantive equality of opportunity) বা ন্যায়সঙ্গত সমতা  (Fair equality of opportunity), সুযোগের সমতা (equality of opportunity) বনাম সামর্থ্যের সমতা (capability) ইত্যাদি ভেদজ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। নৈয়ায়িক বা ন্যায়বাদী দর্শনে এসব মতপার্থক্যের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সেসব আলোচনার বা টেক্সটের পূর্ব-ঐতিহ্য বাংলায় ইতোপূর্বে না থাকায় শুধু ‘সুযোগের সমতা’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে সাংবিধানিক (বা আইনি) লক্ষ্য পূরিত হবার নয়। এ জন্যেই আলোচনার জন্য ইংরেজি ও বাংলা পাঠ উভয়ের ওপরেই নির্ভর করেছি। কোন কনসেপ্টের গুরুত্ব মীমাংসা করার জন্য ইংরেজি পাঠের আশ্রয় নিয়েছি, যদিও উদ্ৃব্দতিগুলো থাকছে মূলত বাংলা পাঠ থেকে। আমার আশা যে, এই দ্বি-ভাষিক পাঠের মধ্য দিয়ে ভাবনার অনুবাদ-কর্ম সহজতর হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূল নীতি’ (Fundamental Principles of State Policy) অধ্যায়ে সমাজতন্ত্রকে শুধু একটি মৌলিক আদর্শ হিসেবেই গ্রহণ করা হয়নি। এর সংজ্ঞা সরাসরি কোনো ‘মার্কসীয় টেক্সট’ থেকেই গেছে বলে মনে হয়। নতুন সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে ‘শোষণমুক্তি’ এবং এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’। সংবিধানের ১০নং ধারায় লেখা ছিল : ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ এখানে ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ বলতে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝানো হয়নি। তবে রাষ্ট্রীয় খাতের যে বড় একটি অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকবে, সেটা ছিল স্পষ্ট। উন্নয়নের পথে রাষ্ট্রের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একথা একমাত্র চরম খোলা-বাজার অনুসারী Libertarianরা ছাড়া সকলেই কমবেশি স্বীকার করে থাকেন। অনগ্রসর এলাকা, পিছিয়ে পড়া মানুষ ও জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার জন্য রাষ্ট্রের হাত-বাড়ানো প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও অনুপস্থিতি যে যে ক্ষেত্রে প্রকট- যেমন জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে- সেখানে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয়। বাজারমুখীন বিনিয়োগ কর্মকাণ্ড, যেখানে ঋণাত্মক উপচেপড়া প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে (negative externalities and spillovers) সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরিবেশ-দূষণ এবং পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে জনস্বার্থের রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, যা কোনো একক বা সমবেত ব্যক্তি খাতের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু উদ্যোগ ও নেতৃত্ব আসতে হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকেই। এসবের বাইরেও ১৯৭২ সালের পটভূমিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে আরও কিছু বাড়তি দায়িত্ব ও চাপ নিতে হয়েছিল।
প্রথমত, বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিকাশ চেয়েছিলেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ১৯৭২ সালে সংসদে সংবিধান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কল্যাণ রাষ্ট্রে’র কল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বড় কথা হলো জনকল্যাণ। এই রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র রূপে যাতে গড়তে পারি, সেই লক্ষ্য স্থির রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।’ জনকল্যাণের জন্য ব্যয় নির্বাহের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকুলান। একটি অবিকশিত কর-রাজস্ব সিস্টেমের মাধ্যমে তা সেদিন অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য যেমন দরকার হয়ে পড়েছিল ‘নন-মার্কেট’ পন্থায় সম্পদের আহরণ, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘বাণিজ্যিক’ ভিত্তিতে গড়ে তোলা ও সেসব কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারিত করা। নন-মার্কেট পন্থায় সম্পদ আহরণের উদাহরণ হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রম-ভিত্তিক নদী-পুকুর-খাল খনন, রাস্তা-ঘাট মেরামত ও নির্মাণ প্রভৃতি স্থানীয় উদ্যোগের কথা এখানে স্মরণ করা যায়। এই ডাক ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন বিভিন্ন জনসভায়। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে ‘বাণিজ্যিক ভিত্তিতে’ পরিচালনা করার গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধ হয়েছিল সেদিন। এর পূর্বাপর ঐতিহাসিক উদাহরণ তৎকালীন নেতৃত্বের সামনেই ছিল। ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পে’ তুলনামূলকভাবে পুঁজির পরিমাণ লাগে বেশি। আর এসব খাতে টার্নওভার রেট কম- মুনাফা আসে অনেক দেরি করে- ফলে এসব খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের পুঁজিপতিরা উৎসাহিত হয় না। এক্ষেত্রে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের উদাহরণ তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাছাড়া সোভিয়েতসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ‘সংস্কারও’ তারা দেখেছিলেন (কোসিগিনের রিফর্মের কথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংসদে তুলেছিলেন)।
দ্বিতীয়ত, ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পের’ কারণ ছাড়াও সেকালের ব্যক্তি-পুঁজিবাদী খাতের দুর্বলতাও তারা বিবেচনায় নিয়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে পেছনে থেকে আর্থিক বা নৈতিক সহায়তা দানে সক্ষম বাঙালি পুঁজিবাদীদের সংখ্যা ষাটের দশকে ছিল অত্যন্ত নগণ্য। যারা ছিলেন, তাদের বেশির ভাগেরই মিল-কলকারখানা চালানোর মতো অভিজ্ঞতা বা অবিসংবাদিত দক্ষতা ছিল না। আর যাদের কিছুটা দক্ষতা ছিল, তাদের মধ্যে হিন্দু-বাঙালি পুঁজিবাদীদের অংশটি (যেমন ঢাকেশ্বরী কটন মিলের সুনীল কুমার বোস) প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের বৈরী পরিবেশে। বিশেষত ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনের কারণে এদের অনেকেই অন্যত্র পুঁজি স্থানান্তরিত করতে থাকেন। সুনীল বোসকে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর গ্রেপ্তার করা হয় এবং কেবল ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরই তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি পান। এভাবে পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে ধনিক বাঙালি ‘শিল্প বুর্জোয়া’ বসু-পরিবার স্বাধীনতার পরে শিল্প খাত থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন ও কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। আর.পি. সাহার মতো যারা মাঝারিমানের ব্যবসায়ী পূর্ব বাংলায় রয়ে গিয়েছিলেন, তারা পূর্বাপর শিল্প খাতের সঙ্গে তেমনভাবে জড়িত ছিলেন না। ফলে, চাইলেও ১৯৭২ সালে বড় কোনো শিল্পোদ্যোগে এগিয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। অন্যদিকে ১৯৩৭-৪৬ পর্বে বাংলার শাসনভার মুসলিম লীগ সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম শিল্প-পুঁজির তেমন কোনো বিকাশ ঘটেনি। বস্তুত ১৯৪৭-৭১ সময় পর্বে পাকিস্তান হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় তেমনভাবে বাঙালি মুসলিম শিল্প পুঁজির বিকাশ হয়নি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে রাজনৈতিক আনুকূল্যে ও ইপিআইডিসির সহায়তায়- বিশেষ করে পাট ও বস্ত্র খাতে- কিছু বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন কল-কারখানা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। রুশ গবেষক সের্গেই বারানভ ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় থেকে এই ধারার শিল্পোদ্যোক্তাদের ওপরে একটি সমীক্ষা চালান। তার হিসেবে মাঝারি বৃহৎ শিল্প খাতে বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন বিজনেস গ্রুপের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬। চট্টগ্রামের একে খান গ্রুপ ছাড়া সারা পাকিস্তানের পর্যায়ে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা এদের কারোরই ছিল না। এদের অধিকাংশই সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধিকার সংগ্রামে প্রবলভাবে দাঁড়াননি বা দাঁড়াতে পারেননি (কেউ কেউ সরাসরি বিরোধিতাও করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কালে)। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রস্তুতের সময় আওয়ামী লীগের ভেতরে বাঙালি শিল্পপতির সমর্থক কোনো লবির প্রবল অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মূলত ‘মধ্যস্তরের’ দল হিসেবেই পরিচিত ছিল। ক্ষমতায় আসতে পারে ভেবে যেসব (উঠতি) ধনিকেরা জাতীয়তাবাদী ধারাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে তাদের ভূমিকা আরও প্রশ্নকীর্ণ হয়ে পড়ে। অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তা গোষ্ঠীর প্রায় সবাই এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এদের অনেকেরই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় এলাকাতেই কল-কারখানা ছিল। তাদের ফেলে যাওয়া সেই মিলগুলোই ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এক হিসেবে, তা ছিল ১৯৭২ সালের মোট রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতের ৬০ শতাংশ পরিসম্পদের সমান।
তৃতীয়ত, অবাঙালি মালিকানাধীন ‘পরিত্যক্ত শিল্প খাত’ ও বাঙালি মালিকানাধীন ‘দুর্বল’ শিল্প খাত- এ দুটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিশ্রুত শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত খাত গড়ে তোলার পেছনে। বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীরা পাকিস্তানের তুলনায় এক ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো বাংলাদেশেও বৃহৎ শিল্প-বুর্জোয়া বা কার্টেল-মনোপলি গড়ে উঠুক তা তারা কখনোই মনে-প্রাণে চাননি। এরকম মনোপলি পুঁজির প্রভাব বাড়তে থাকায় পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তা তারা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রের পৌনঃপুনিক লঙ্ঘনের পেছনে এই বাইশ পরিবারের পরোক্ষ প্রভাব কার্যকর ছিল পূর্বাপর। এসবও তারা তাদের অভিজ্ঞতার বলেই জানতেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সে পথেই আবার গড়াক সেটি তারা চাননি। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করেছিল সেদিন। অর্থাৎ উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রধান খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়ার পেছনে ‘বাইশ পরিবার বিরোধিতা’ ছিল একটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ। আমার মতে, প্রধানতম কারণ। বঙ্গবন্ধু তার নানা বক্তৃতায় বিষয়টি উল্লেখ করেছেন- কী স্বাধীনতার আগে, কী স্বাধীনতার পরে। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকায় এক ভাষণে শেখ মুজিব বলেন :’২২ বছরের ইতিহাস, খুনের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস মীর জাফরের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস, খুবই করুণ ইতিহাস। ইতিহাস গৃহহারা সর্বহারার আর্তনাদের ইতিহাস… ২২ বছর কেটে গেল আমরা জীবন যৌবন ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি কিন্তু পেলাম কি আজ আমরা। আজকে দেশের মধ্যে গ্রামে গ্রামে হাহাকার। … আজকে ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়েছে। গরিব দিন দিন গরিব হয়ে গেছে। বড়লোক দিন দিন বড়লোক হয়ে যাচ্ছে।’ এর ঠিক দুই বছর পরে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় ‘জাতীয়করণ’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অবধারিতভাবে উঠে এলো বাইশ পরিবারের কথা :
‘শ্রমিকেরা সারা জীবন শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন। এগুলো জাতীয়তকরণের অর্থ হলো শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দেওয়া। আমরা শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দিয়েছি। আপনারা জানেন, পশ্চিমাদের হাতে যে সমস্ত কল-কারখানা ছিল তার সব টাকা তারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। … আমি এখানে আজ আর একটা কথা ঘোষণা করেছি। সরকার যেসব কারখানা জাতীয়করণ করেছেন, এখন থেকে সেগুলোর প্রত্যেকটির ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে দুইজন করে সদস্য থাকবেন এবং শ্রমিকরা নির্বাচনের মাধ্যমে এই সদস্যদের বোর্ডে পাঠাবেন। এ ছাড়া বোর্ডে সরকারের এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে তিনজন সদস্য থাকবেন এবং এই পাঁচজন বসে কারখানা চালাবেন। যাই আর হোক না কেন, আদমজী, দাউদ বা আমিনের পকেটে যাবে না।’ শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, বাইশ পরিবারের মতো একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ রুদ্ধ করার জন্য রাষ্ট্রের শক্ত ভূমিকা এবং বৃহৎ শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা পূর্ণভাবে টিকে থাকতে সক্ষম এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথা নানা প্রান্ত থেকেই বলা হচ্ছিল। কেউ বলছিলেন ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ যুক্তি দিয়েছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে :’আজ আমাদের দেশে, অর্থাৎ সাবেক পাকিস্তানে যে সমস্যা ছিল, তা দূর করার জন্য যদি মহানবীর বাণীর শত ভাগের এক ভাগও মেনে নিত, তাহলে কুখ্যাত আদমজি, দাউদ, ইস্পাহানির মতো লোক এ দেশে জন্মলাভ করতে পারত না।’ কেউ আবার যুক্তি দিয়েছেন ইতিহাসের নিকট অভিজ্ঞতা থেকে। ড. কামাল হোসেন পরবর্তীকালে লিখেছেন এ প্রসঙ্গে :’The vision of an independent Bangladesh which had inspirad the freedon fighter, was of a society which would be free from exploitation. They were quite clear that having freed themselves from the infamous ‘22 families’ of Pakistan, they were not going to create ‘22 families’ to take their place in Bangladesh.’

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৬
পূর্বে প্রকাশিতের পর
এই কথাগুলো কিছুটা নির্দয় বিচারই বলে ঠেকবে- বিশেষত যদি আমরা সংবিধান নিয়ে ১৯৭২ সালের গণপরিষদেও নানা আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ককে সামগ্রিকভাবে মাথায় রাখি। কোনো প্রকার আন্তরিকতা বা আত্যন্তিক তাগিদ ছাড়াই শুধু নির্বাচনী জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছিল, এটা বিশ্বাস করা শক্ত। প্রথমত, জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রচার করা দোষের কিছু নয়। মানুষ এরকম আদর্শ সমর্থন করে কিনা তা যাচাই করার একটা বড় মাধ্যমই হচ্ছে নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, সেদিনের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাদের অভিপ্রায় প্রকাশে আন্তরিক ছিলেন না- একে নিছক লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত বলে মনে হতে পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃত্বে বিশেষত বঙ্গবন্ধুর মধ্যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছিল। যার চিহ্ন বিভিন্ন দলিলপত্রের আলোচনার মধ্য দিয়ে ইতোপূর্বেই আমরা দেখেছি। ‘সত্তরের নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রের কথা বলে’- লেখকের এই বিচারটিও তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। এবং সবশেষে, একটা রক্ষণশীল সমাজে- যেখানে ধর্মের আড়ালে সংস্কারের প্রভাব প্রবল, সেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বললে কৃষক-মধ্যবিত্ত সমাজের ভোট বেশি করে পাওয়া যাবে, এটাও তর্কসাপেক্ষ অনুমান। রক্ষণশীলতার এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সমাজে এখনও কাটেনি, তখনও ছিল। তার পরও জনগণের সামনে এনলাইটেনমেন্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘সমাজতন্ত্র’ তথা সামাজিক ন্যায়ের আইডিয়া তুলে ধরতে গিয়ে ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত হননি। আধুনিক রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়ের ধারণাকে তাঁরা কোনো প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যগত চিন্তার সাথে জোর করে মেলাতে বা মেশাতে চাননি। সেরকম চেষ্টা তাদের চোখের সামনেই ছিল- ‘গান্ধীবাদী’ সমাজতন্ত্র, ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’, ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’ বিভিন্ন ধারা ষাটের দশকে চলমান ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনচেতনা ও ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু ঐতিহ্য-রক্ষার নামে সমাজতন্ত্রের ঐতিহ্য-নিরপেক্ষ প্রগতিবাদী ধারণাকে তাঁরা অবমূল্যায়িত করতে চাননি। দুধে জল মিশিয়ে তাকে গ্রহণযোগ্য মোড়কে বিক্রি করতে চাননি- নির্বাচনে জয়লাভের জন্য হলেও। তাঁদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। ফলে, পাকিস্তানের পরিবেশে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জনগণকে কাছে টানার জন্য আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা বলে থাকবে, নইলে তারা বামপন্থি দলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে পারত, অধ্যাপক চৌধুরীর এই মীমাংসাও যুক্তিসিদ্ধ ঠেকে না। প্রথমত, যেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বলে ‘নাস্তিক’ বলে অভিহিত হওয়ার বরং আশঙ্কা আছে, সে রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কেবল জনসমর্থনের তাগিদে শব্দটি প্রচার করেছিল- এই যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, ১৯৭০ সালের প্রেক্ষিতে জনতুষ্টিবাদের যুক্তিও দুর্বল, কেননা সমাজতন্ত্র তখনও গণদাবি হয়ে ওঠেনি। আর বামপন্থি দলের তরফ থেকে প্রতিযোগিতার ভয়? সেটাও আজ কষ্টকল্পনা বলে মনে হয়। বিশেষত যদি মনে রাখি যে, সত্তরের নির্বাচন বয়কট করেছিল বামপন্থি বলে দাবিদার পিকিংপন্থি ভাসানী ন্যাপ। এটি ছিল মাওলানা ভাসানীর সবচেয়ে বড় এক রাজনৈতিক ভুল- ‘স্ট্রাটেজিক ব্লান্ডার’। যদিও কমরেড হায়দার আকবর খান রনো তাঁর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একে ভাসানীর ‘ওয়াক অভার’ দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এমনও হতে পারে যে, পরবর্তী সময়ে (নব্বই বা তৎপরবর্তী) আওয়ামী লীগের ‘বুর্জোয়া’ রূপান্তর দেখে লেখক তার বিরুদ্ধ সমালোচনাকে প্রোথিত করেছেন অতীতে- ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগকে বিচার করার ক্ষেত্রে বা সংবিধানে বিধৃত গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের Authenticity যাচাই করার ক্ষেত্রে। এই সূত্রে বলে রাখি, সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমাকে একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন যে, বাহাত্তরের সংবিধানের বেশকিছু ন্যায়সংগত বামপন্থি সমালোচনা সত্ত্বেও- এবং ১৯৭২-৭৫ পর্বে বাস্তবে গৃহীত কর্মসূচির তর্কাতীত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও- সমাজতন্ত্র তথা চার আদর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের আন্তরিক অভিপ্রায় নিয়ে অন্তত তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তাঁর মনে এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কমরেড সেলিম ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকাকে স্বীকার করেন, তবে ব্যক্তিকে তার দল থেকে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না- সেটিও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য সাময়িক কালের জন্য ‘একদল’ করতেই হবে, সব সমাজতন্ত্র-অভিমুখীন দেশকেই গণতন্ত্রের প্রচলিত পথ ছাড়তেই হবে- এটা আদৌ আবশ্যক নয়। আবার একদল করলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে- ব্যাপারটা তেমনও নয়। ১৯৭২-৭৫ সালে সিপিবির অভিমতও ছিল তাই। সোভিয়েত ও অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিও সেই বার্তাই দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে- তিনি এটাও আমাকে জানিয়েছেন। মোট কথা, সমাজতন্ত্র অভিমুখে দীর্ঘ পথ চলায় বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক অভিপ্রায় ও আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় ছিল না সেদিনের বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বা বামপন্থি ন্যাপ-সিপিবি মহলে (সেদিনের গণচীন, যেটি তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি বা তার স্থানীয় সমর্থক গোষ্ঠীদের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র)। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা বাহাত্তরের সংবিধানের সমতামুখী সমাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিশেষ ধারার প্রতি মনোযোগ দেব। এই ধারাগুলোর ঘনিষ্ঠ বিচার করলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমৃদ্ধ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ধারা সম্পর্কে তাত্ত্বিক সংশয়ের আর কোনো অবকাশ থাকে না। আজকের বাংলাদেশ যদি বঙ্গবন্ধুর সেদিনের তাত্ত্বিক উপলব্ধিতে ফিরে যেতে পারে, তবে সেটা হবে একটি বড় পাওয়া।
৯. গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারা ও উপধারা
Lost in Translation বলে একটা কথা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত আছে। তর্জমায় অনেক ক্ষেত্রে মূল পাঠের অর্থই হারিয়ে যায়। যারা বিদেশি ভাষা থেকে কবিতা অনুবাদের কাজে জড়িত, তারা ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেন। তারপরও আমরা অনুবাদের কাজে ব্যাপৃত হই। সেটা শুধু কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত আমরা ‘অনুবাদ’ করে চলেছি- কখনও নিজের কথা অন্যকে বোঝানোর জন্যে, কখনও অন্যের কথা নিজের বোধের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য। সাম্রাজ্যবাদ যখন উপনিবেশে আসে, তখন সে তার ভাষা-সংস্কৃতিকে যথাসাধ্য ‘অনুবাদ’ করে স্থানীয় অধিবাসীকে তার শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে তৎপর হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এখনও এই অনুবাদ প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের বৈঠকে, এইড গ্রুপ কনসালটেশনে, প্রবাসে কর্মসংস্থানের দেন-দরবারে প্রতিপক্ষ বুঝে আমাদের ‘অনুবাদ’ করে যেতে হয়, যাতে করে দাতা ও গৃহীতা পরস্পরকে বুঝতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা একেকজন জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অনুবাদ-কর্মে নিয়োজিত। আমরা পারস্পরিক ‘সম্পর্কের অনুবাদ’ করে চলি নিজস্ব মূল্যবোধের কাঠামোয়। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য যেটা প্রাসঙ্গিক তা হলো বাহাত্তরের সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক। সুবিদিত যে, সংবিধানটির বাংলা পাঠই আদর্শ পাঠ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং বাংলা সংস্করণই ‘খসড়া’ হিসেবে গণপরিষদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানটি আদিতে আসলে বাংলায় লিখিত হয়নি। এটি প্রথমে ইংরেজিতে লিখিত হয় এবং তারপরেই কেবল বাংলায় তর্জমা করা হয়। তর্জমার পর বাংলা পাঠকেই ‘আদর্শ পাঠ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং এ সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি কোনো ধারা বা উপধারা বোঝার বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা, বিভ্রান্তি বা ‘কনফিউশন’ দেখা দেয়, তবে বাংলা পাঠকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হবে। এ নিয়ে ড. আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন :
‘ড. কামাল হোসেন এজেন্ডা পাঠালেন :বাংলাদেশের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি খসড়া তৈরি করবেন ইংরেজিতে, আমাকে তার বাংলা করে দিতে হবে, শেষ পর্যন্ত বাংলাটাই গৃহীত হবে প্রামাণ্য ভাষ্য বলে। বললাম, একা পারব না, একটা দল চাই। তিনি বললেন, আপনি লোক বেছে নিন।’
আগেই বলেছি তর্জমার দলে আরও ছিলেন কবি ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এবং ড. মযহারুল ইসলাম। সংবিধান তর্জমা করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আনিসুজ্জামান বর্ণনা করেছেন এভাবে :’মনে পড়ে, আইনমন্ত্রীর দপ্তরে এক দুপুরে কামাল আর আমি মুখোমুখি বসে। প্যাডের কাগজে খসখস করে কামাল লিখতে শুরু করলেন সংবিধানের প্রস্তাবনা। এক স্লিপ লেখা হলে সাদা কাগজের সঙ্গে সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম। একটা অনাস্বাদিত শিহরণ জাগল দেহে-মনে :এই আমার স্বাধীন দেশ, তার সংবিধান-রচনার কাজে হাত দিয়েছি। কামালকে বললাম, অনুবাদটা মাজাঘষা করতে হবে, বাড়ি নিয়ে যাই। তিনি বললেন, মূলটারও কিছু উন্নতি ঘটাতে হবে, কাল আবার বসব একসঙ্গে। …সংবিধানের কাজে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে পনেরো দিন আমি ঢাকায় থেকেছি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে… গণপরিষদ-ভবনে- পরে যা রূপান্তরিত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে- আমাকে একটা কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেখানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেটেছে। কখনও বেশি রাত হয়ে গেলে কামালের বাড়ির বসার ঘরে শুয়ে বাকি রাত যাপন করেছি। সকালে সে বাড়িতেই নাশতা করে দ্রুত চলে এসেছি গণপরিষদে।’
এক অর্থে, সংবিধানের খসড়া দুটো ভিন্ন ভাষায় সমান্তরালভাবে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু, সন্দেহ নেই, আগে ইংরেজি টেক্সট তৈরি হয়েছিল, পরে এর বাংলা তর্জমা হচ্ছিল। এ জন্যেই বাংলা পাঠকে আইনত শিরোধার্য করলেও মূল কনসেপ্ট এবং বর্ণনাগুলো যেহেতু ইংরেজিতে হচ্ছিল, এর ইংরেজি পাঠের ওপরেই সাংবিধানিক-আইনি ও দার্শনিক ‘মর্মার্থ’ অনুধাবনের জন্য জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। আমার বলার কথা হলো, সংবিধানের বাংলা পাঠ তখনই সারগর্ভ পাঠ হয়ে ওঠে, যখন আমরা এর মূল ইংরেজি আদি-পাঠকে পাশাপাশি রাখি। যেন বাংলা সংবিধানের প্রতিটি লাইনের ব্যবধানে অদৃশ্য কালিতে লেখা রয়েছে এর ইংরেজি পাঠ। যেন এই ইংরেজি পাঠকে পড়ে এর শব্দগত, প্রত্যয়গত ও গঠনগত অর্থ যথাযথ অনুধাবন করার পরই বাংলা পাঠের দিকে তাকাব কেবল- ইংরেজি পাঠকে চোখের সামনে থেকে মুছে দিয়ে। একই সঙ্গে পড়া এবং মুছে দেওয়া- দেরিদীয় এই ‘Eraser’ প্রকরণ ব্যবহার করেই কেবল সংবিধানের ধারা-উপধারার মর্মার্থ আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে পারে। একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে পড়ছে। বহু বছর আগে যখন অমর্ত্য সেনের ‘জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’ বইটি হাতে এসে পড়ল, তখন সাগ্রহে লক্ষ্য করলাম যে, বইটির শেষে অমর্ত্য সেনের নিজের করা একটি পরিভাষার তালিকা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই জানেন যে, বইটি অনূদিত হয়েছিল মূলের ইংরেজি থেকে বাংলায়। কিন্তু অমর্ত্য সেন অনূদিত পাঠটি মনোযোগ দিয়ে দেখে দিয়েছিলেন এবং দেখতে দেখতে বেশকিছু পরিভাষা নির্দেশ করেছিলেন। এর মধ্যে একটির কেবল উল্লেখ করি। ‘পণ্যমোহবদ্ধতা’ টার্মটি তিনি প্রস্তাব করেন মার্কসের ‘Commodity Fetishism’ ধারণাটি অনুবাদের ক্ষেত্রে। যেটা বলতে চাইছি, শুধু পণ্যমোহবদ্ধতা শুনলে আমরা বুঝতে পারব না শব্দটির দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ের একটি বিশিষ্ট কনসেপ্ট ‘Commodity Fetishism’-এর রূপরেখা ফুটে উঠবে না। পণ্যমোহবদ্ধতা ভালো, কিন্তু ঋবঃরংযরংস ছাড়া সে অচল। এজন্যেই বলেছি- অনুবাদে মূলের চেহারা ঢাকা পড়ে যায় :Lost in Translation।
বাহাত্তরের সংবিধান থেকে একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে আসছে। শাসনতন্ত্রের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।’ কিন্তু ‘সুযোগের সমতা’ উচ্চারণে এর অর্থ সুস্পষ্ট হয় না। কেননা, ইতোপূর্বে বাংলায় ‘সুযোগের সমতা’ ধারণাটিকে কোথাও ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর অর্থ জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর আদি ইংরেজি পাঠে, যেখানে বলা আছে :’The state shall endeavor to ensure equality of opportunity to all citizens.’ বাংলা পাঠের অর্থ বোঝার জন্য এখানে ইংরেজি পাঠের অবশ্যই অনুগামী হতে হচ্ছে।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
মোট কথা, সমাজতন্ত্রের মধ্যে গণতন্ত্রের ‘কনটেন্ট’ আরো বাড়াতে হয়, সেটা কি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার বিচারে, কি বাংলার মানুষের মন-মানসিকতা বিচার করে।
এসবের থেকে কিছুটা ভিন্ন যুক্তি দিয়েছিলেন ময়মনসিংহের আছাদুজ্জামান খান। তার মতে, সংবিধানে যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রস্তাব করা হয়েছে তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো- এর গণতান্ত্রিক ধারাসমূহকে (যথা ব্যক্তি-স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা ইত্যাদি যাকে এক কথায় বলা হয়  civil liberty) রাখা হয়েছে ‘মৌলিক অধিকারের’ অধ্যায়ে, আর সমাজতান্ত্রিক ধারাসমূহকে (যথা প্রত্যেকের ‘অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা, মজুরির নিশ্চয়তা, শিক্ষালাভের নিশ্চয়তা, চাকরির সংস্থানের নিশ্চয়তা ইত্যাদি বিষয়কে) রাখা হয়েছে ‘মূলনীতির’ অধ্যায়ে। ইচ্ছাকৃতভাবেই এগুলোকে মৌলিক অধিকারভুক্ত করা হয় নাই। কেন করা হয় নাই, তার কারণ হচ্ছে যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে এ সমস্ত অর্থনৈতিক অধিকার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে থাকলেও এর বাস্তবায়ন হবে ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রের সংগতি-সামর্থ্যের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু ব্যক্তি-স্বাধীনতা প্রভৃতি civil liberty তথা গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ অবিলম্বে দেওয়া সম্ভব হলে সেগুলো মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করাই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত। অর্থাৎ, এখানে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নযোগ্য বা Gradualist মতবাদ হিসেবে দেখার চেষ্টা হয়েছে। এর ‘গণতান্ত্রিক’ কনটেন্টকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘সমাজতান্ত্রিক’ কনটেন্টকে সংরক্ষণ করার দৃষ্টিকোণ যেটা বিধৃত হয়েছে সেটা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ। গণতন্ত্রকে এখনই নিশ্চিত করতে হবে, সমাজতন্ত্র আসবে ধীরে ধীরে। এই  Gradualist অ্যাপ্রোচ মালিকানা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও সংবিধানে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিগত মালিকানা রাখা হয়েছে, তারপরও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে দীর্ঘকালের জন্য ব্যক্তিগত মালিকানার প্রয়োজনীয়তা থেকে যাবে। চীনের সংবিধানের (অধ্যায়-২ সাধারণ নীতিমালা, ধারা-৫) উদ্ৃব্দতি দিয়ে আছাদুজ্জামান খান দেখালেন যে, সেখানে চার ধরনের মালিকানার অস্তিত্ব আছে- রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী যৌথ মালিকানা, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের একান্ত নিজস্ব মালিকানা এবং পুঁজিবাদী মালিকানা। এই শেষোক্ত মালিকানা সম্পর্কে বেশ দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি। তাতে বলা ছিল :
‘The policy of the state towards capitalist industry and commerce is to use, restrict and transform them. Through control exercised by organs of state administration, leadership by the state sector of the economy, and supervision by the masses of the workers, the state makes use of the positive aspects of capitalist industry and commerce which are beneficial to national welfare and the people’s livelihood, restricts their negative aspects which are detrimental to national welfare and the people’s livelihood, and encourages and guides their transformation of state-capitalist economy, gradually replacing capitalist ownership by the whole people.’

এসবের উদ্ধৃতি দিয়ে আছাদুজ্জামান খান এ রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন :’আমাদের এখানেও পুঁজিবাদী শিল্প ও ব্যবসাকে প্রথমে  protect করে পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিলোপ সাধন করা হবে। আমরাও সেই নীতিই গ্রহণ করেছি। একেবারে তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান :’সমাজতন্ত্র পর্যায়ক্রমে করতে হবে।’ কেননা, ‘আমাদের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা আছে।’ তা ছাড়া ‘কার্ল মার্কস যা বলেছেন, তা চিরকাল সত্য হবে- তেমন কথা আর স্বীকৃত নয়।’ এবং সে কারণেই ‘মার্কসকে সর্বত্র কপি করা হয়নি।’ এই শেষোক্ত পয়েন্টটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :’বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যবস্থার অধীনে বিভিন্ন চিন্তাধারা নিয়ে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে চলেছে।’ এখানে মূল প্রশ্ন হলো, ‘আমরা সমাজতন্ত্রের পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করেছি কি না?’ আছাদুজ্জামান মনে করেন, কোনো বাধার সৃষ্টি করা হয়নি। কেননা, রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে ‘কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া ছাড়াই’ এবং ‘গণস্বার্থে’ কোনো সম্পত্তি ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত (বা সমবায়ী) মালিকানায় নিয়ে আসতে পারেন :’সে জন্যেই আমি বলেছি যে, চীন বা অন্য কোনো দেশের চাইতে বেশি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা আমরা রেখেছি।’ বামপন্থি সমালোচকেরা (সংসদের ভেতরে ও বাইরে) খামোখাই এ নিয়ে মাঠ গরম করা বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন!
সুবিদিত যে, বাহাত্তরের সংবিধানের সবচেয়ে তীব্র ‘বামপন্থি’ সমালোচনা এসেছিল গণপরিষদ সদস্য ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর কাছ থেকে। তবে সংসদের বাইরে থেকেও Dissent এসেছিল। তাতে একটি প্রবল মত ছিল, ‘সমাজতন্ত্রের ধারা’ সংবিধানে রাখার দরকারটাই বা কী? শুধুমাত্র গণতন্ত্র থাকলেই হলো। যুক্তিটা হলো, সত্যিকারের গণতন্ত্র কোনো সমাজে কার্যকর থাকলে সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতা এসব কোনোটারই আলাদাভাবে রাখা দরকার হয় না। এ রকম একটি লিবারেল যুক্তি দিয়েছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ। ‘সত্যিকারের গণতন্ত্র’ বলতে কোন ধরনের গণতন্ত্র দরকার তা অবশ্য তিনি স্পষ্ট করেননি তার লেখায়। কিন্তু চার-স্তম্ভের বঙ্গবন্ধুর সাংবিধানিক আদর্শকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং উক্ত চার দফাকে সংবিধানে সংযোজন করাকে সরাসরিভাবে ভুল পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেছেন। ‘শেখ মুজিব-নেতৃত্বের আওয়ামী লীগ পার্টির সর্বাপেক্ষা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ ত্বরিত গতিতে দেশের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা’ এ কথা বলার পর এর ‘বিধানিক ত্রুটি’ কোথায় তা তিনি নির্দেশ করলেন। ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থের লেখকের স্বভাবসুলভ ambiguous অবস্থান এখানেও পাওয়া যায়। একদিকে তিনি যা বলতেন, পরের মুহূর্তেই তিনি তার বিপরীতার্থক সম্ভাবনা দেখতে পেতেন। সংবিধান প্রশ্নে এসেও তার এই প্রবণতা চোখে পড়ে। একদিকে আবুল মনসুর আহমদ স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘ডেমোক্র্যাসি, সোশিয়ালিজম, ন্যাশনালিজম, সেকিউলারিজম :এই চারটিকে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি করা হইয়াছে। এর সব কয়টির আমি ঘোরতর সমর্থক। শুধু এমনি সমর্থক না, মূলনীতি হিসেবেও সমর্থক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আধুনিক যুগের সব রাষ্ট্রকেই সেকিউলার ডেমোক্র্যাটিক নেশন-স্টেট হইতে হইবে।’ তার পরের বাক্যেই তিনি মত ঘুরিয়ে ফেললেন :’কিন্তু আমার মত এই যে, এর কোনোটাই সংবিধানে মূলনীতিরূপে উল্লিখিত হইবার বিষয় নয়। গণতন্ত্র ছাড়া আর বাকি সব কটিই সরকারি নীতি; রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। দেশে ঠিকমতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেই আর সব ভালো কাজ নিশ্চিত হইয়া যায়।’ এই ‘ঠিকমত গণতন্ত্র’-এর স্বরূপ অবশ্য লেখক এখানেও প্রকাশ করেননি। তবে শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলেই আর সমাজবাদের আলাদা উল্লেখের আবশ্যিকতা থাকে না- এ যুক্তি আজ পাশ্চাত্যের কোনো লিবারেল তাত্ত্বিকই জোর গলায় বলার সাহস পান না। দার্শনিক জন রাউলস বা অমর্ত্য সেনরা তাহলে ন্যায়পরায়ণ সমাজের কথা কেন আলাদা করে আলোচনা করবেন, বা গণতন্ত্রের পাশাপাশি ‘আইডিয়া অব জাস্টিস’-এর কথা তুলবেন কেন?
যা হোক, আবুল মনসুর আহমদ সে ধরনের যুক্তি-চর্চায় গেলেন না। তিনি ‘অকাট্য প্রমাণ’ হাজির করলেন তার পরিবর্তে (পাঠক লক্ষ্য করুন যে তিনি সচেতনভাবে সমাজতন্ত্র শব্দটি এড়িয়ে ‘সমাজবাদ’ শব্দটিকে ব্যবহার করছেন) :’এই ধরনের একটি বিচ্যুতির কথা বলিয়াই আমি আমাদের সংবিধান রচয়িতাদের ত্রুটির প্রমাণ দিতেছি। এটা সমাজবাদের বিধান। সমাজবাদ একটা অর্থনীতি। এটাকে সংবিধানের মূলনীতি করার কোনো দরকার ছিল না। যে কোনো গণতন্ত্রী পার্টি যদি সমাজবাদ প্রতিষ্ঠাকে তাদের পার্টি-প্রোগ্রাম রূপে গ্রহণ করেন, তবে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের জনগণের বিপুল সমর্থন তারা পাইবেনই। তবু আওয়ামী লীগ পার্টি অনাবশ্যকভাবে সমাজবাদকে সংবিধানের মূলনীতি রূপে গ্রহণ করিয়াছেন।’ এবং এ জন্যে তিনি সাক্ষী মেনেছেন ভারতের নেতা নেহরুকে। কথাটা আংশিক সত্যি। নেহরু-আম্বেদকরের ১৯৫১ সালের সংবিধানে সরাসরি সমাজতন্ত্রের কথা মূলনীতি হিসেবে ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও ছিল না। আমরা আগেই দেখেছি, এই দুটি শব্দ ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ১৯৭৬ সালে সংযোজিত হয় মূলনীতি হিসেবে ভারতীয় সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদ অন্তত এটুকু যোগ করতে পারতেন যে, নেহরু-আম্বেদকরের মূল সংবিধানেই চৎবধসনষব-এ যুক্ত হয়েছিল ৪টি মূলনীতি :
Preamble- :
Justice (social, economic and political), (Liberty of thought, expression, belief, faith and worship), Equality (of status and of opportunity), and Fraternity (assuring  the dignity of individual)। এর মধ্যে  Liberty এবং Fraternity বাদ দিলে Justice এবং Equality সংক্রান্ত ঘোষণা দুটি ছিল সরাসরি ‘সমাজবাদ’ তথা সমতামুখীন সমাজের আকাঙ্ক্ষার সাথে সরাসরিভাবে সম্পর্কিত।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল মনসুর আহমদের কিছু ত্রুটিও হয়েছে বঙ্গবন্ধুর চার-আদর্শকে নিয়ে। তার লেখায় তিনি প্রকারান্তরে দাবি করেছেন- সংবিধানে সংযোজনের আগে আওয়ামী লীগের আর কোনো মেনিফেস্টোতে সমাজতন্ত্রের উল্লেখ ছিল না। ইতোপূর্বে আমি দেখাবার চেষ্টা করেছি, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে আওয়ামী লীগের দলিলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা সরাসরিভাবে সন্নিবেশিত হয়েছিল বেশ আগে থাকতেই। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি অবশ্য রাজনৈতিক vocabularyতে আসে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের বক্তব্য-বিবৃতি-ভাষণে (এর আগে শুধু অসাম্প্রদায়িকতা ও কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে বৈষম্য না করার কথা ছিল)। লেখক এই মতে পৌঁছাচ্ছেন যে, বঙ্গবন্ধুর চার-আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং সংবিধানের প্রণেতারা এই দাবি করে বরং সত্যের অপলাপ করেছেন। লেখকের বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমাদের সংবিধান রচয়িতারা নিজেরা ওই মহান আদর্শকে সংবিধানভুক্ত করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলেন। তাই জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ওই ভুল তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন।’ এটা পড়লে লেখকের তথ্যনিষ্ঠা সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ না জেগে পারে না। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই বঙ্গবন্ধুর চার আদর্শের অবয়ব কালক্রমে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল।
আবুল মনসুর আহমদের সংবিধানের ওপর উপরোক্ত সমালোচনা এসেছিল ‘ডান দিক’ থেকে। অর্থাৎ লিবারেল বা উদারনৈতিক গণতন্ত্রী দৃষ্টিকোণ থেকে। তবে, ‘বাম দিক’ থেকেও সেদিন সংবিধানের ওপরে অনেক সমালোচনা এসেছিল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংসদের ভেতরে থেকে সেসব সমালোচনার অনেকটাই উত্থাপন করেছিলেন। সংসদের বাইরে থেকে বামপন্থি দলগুলোও যার যার মতো করে সেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। কোনটা রাষ্ট্রের মূলনীতি আর কোন কোন দাবি রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হবার দাবি রাখে- এ নিয়ে সেদিন জোর তর্ক-বিতর্ক উঠেছিল। তবে বামধারার অধিকাংশ সমালোচকই (আমি ন্যাপ-সিপিবি ঘরানার কথা বলছি) সেদিনের গণপরিষদের অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিবর্তন বা প্রাতিষ্ঠানিক evolution-এর সাথে সাথে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গিও বদল হতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদ’ বইতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার সংশয় ব্যক্ত করেছেন এভাবে :’রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে সমাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিতে আওয়ামী লীগের যে অত্যন্ত উৎসাহ ছিল, তা মোটেই নয়।… সত্তরের নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রের কথা বলে; সমাজে শোষণ থাকবে না এবং অর্থনীতির লক্ষ্য হবে সমাজতন্ত্র অভিমুখী- এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ওই লক্ষ্যে ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমিহীনদের কাছে জমি পৌঁছে দেওয়া, কর ও ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ঘোষণাতে ছিল। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি আন্তরিক ছিল- এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। এগুলো দেওয়া হয়েছিল নিতান্ত বাধ্য হয়ে। নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনগণের পক্ষে না বলে উপায় থাকে না। তা ছাড়া বামপন্থি দলগুলো সমাজতন্ত্রের কথা বলে জনগণকে নিজেদের দিকে টেনে নেবে- এমন আশঙ্কাও ছিল।’
[ক্রমশ]https://googleads.g.doubleclick.net/pagead/ads?client=ca-pub-9442091006829624&output=html&h=250&slotname=9443271832&adk=1331586746&adf=832419000&pi=t.ma~as.9443271832&w=300&lmt=1628144762&psa=1&format=300×250&url=https%3A%2F%2Fwww.samakal.com%2Fnational-election-2018%2Farticle%2F210149669%2F%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%2599%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%2597%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A7%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2597%25E0%25A6%25A3%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%2595-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A4%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25A7%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%2593-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%2580-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2599%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B7%25E0%25A6%25BE&flash=0&wgl=1&adsid=ChAI8PWoiAYQhMehqNPvj6IvEjwAD2iaZOefh47pms1-Z9eHrb6_E-7agz-dJRdprKBDHvePmXdx3PSW_dboDZyJ9AptOOxy35t6YCGZlGI&uach=WyJXaW5kb3dzIiwiMTAuMCIsIng4NiIsIiIsIjkyLjAuNDUxNS4xMDciLFtdLG51bGwsbnVsbCxudWxsXQ..&tt_state=W3siaXNzdWVyT3JpZ2luIjoiaHR0cHM6Ly9hdHRlc3RhdGlvbi5hbmRyb2lkLmNvbSIsInN0YXRlIjo3fV0.&dt=1628144726881&bpp=1&bdt=1182&idt=403&shv=r20210802&mjsv=m202108040201&ptt=9&saldr=aa&abxe=1&cookie=ID%3D41f465110656505a-22353dcdafca0002%3AT%3D1628144727%3ART%3D1628144727%3AS%3DALNI_MYweFHM8DCHnzhgcM7jCgXB3R4IKw&prev_fmts=0x0%2C300x250%2C300x250%2C304x250%2C300x250&nras=1&correlator=2247964085113&frm=20&pv=1&ga_vid=1203111009.1628143455&ga_sid=1628144727&ga_hid=1291477603&ga_fc=0&u_tz=360&u_his=1&u_java=0&u_h=1080&u_w=1920&u_ah=1040&u_aw=1920&u_cd=24&u_nplug=3&u_nmime=4&adx=643&ady=4476&biw=1903&bih=937&scr_x=0&scr_y=745&eid=20211866%2C21067496&oid=3&pvsid=418908138783655&pem=873&ref=https%3A%2F%2Fsamakal.com%2F&eae=0&fc=1920&brdim=0%2C0%2C0%2C0%2C1920%2C0%2C1920%2C1040%2C1920%2C937&vis=1&rsz=%7Co%7CoeEbr%7C&abl=NS&pfx=0&fu=0&bc=31&ifi=4&uci=a!4&btvi=3&fsb=1&xpc=9c8dTasLvk&p=https%3A//www.samakal.com&dtd=35549

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৪

পূর্বে প্রকাশিতের পর
চীনের ১৯৪৯ সালের সংবিধানে ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্পষ্ট স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের অবস্থা চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো নয়। এ জন্যই তাজউদ্দীন বলেছেন, ‘৫০ বছর আগে সোভিয়েট ইউনিয়নের মানুষ যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থার সঙ্গে আমাদের এখনকার অবস্থার তুলনা করতে হবে। ২৫ বছর আগের পূর্ব জার্মানির সঙ্গে আমাদের তুলনা করতে হবে।’ এখানকার সোভিয়েত, চীন বা পূর্ব জার্মানির সঙ্গে তুলনা করে সংবিধান তৈরি করলে চলবে না। বিপ্লবের পরপর যে বিধান ছিল এসব দেশে সেখানে তো ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল- এই হচ্ছে তাজউদ্দীনের যুক্তি। বামপন্থি দলগুলোর সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি  historicism-র অনুবর্তী; শুধু যুক্তির খাতিরে না, বিশ্বাস করেন বলেই। যে সমাজ বা দেশের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রতিতুলনা করা হবে, তাদের সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে আমরা আছি কিনা, সেটাই প্রথমে দেখা দরকার :
‘কেউ যদি সোভিয়েট ইউনিয়নের ১৯৪৭ সালের সংবিধানের সঙ্গে তুলনা করে সেই পর্যায়ে আমাদের সমাজতন্ত্রের বিধান করার দাবি জানান, তাহলে আমি বলব যে, সেই সমাজের সেই পর্যায়ে আমরা আছি কিনা, আমাদের সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মানসিকতা সেই পর্যায়ে আছে কিনা, সেটা বিবেচনা করতে হবে।’
এ থেকে স্পষ্ট করে বোঝা যায় কেন বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রকে এক চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন, কেন বলেছিলেন যে, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানো অনেক দূরের পথ, এর জন্যে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, সবশেষে তাজউদ্দীন এ-ও বললেন, ‘সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্রের’ কথা যাঁরা বলেন, তিনি তাদের দলে পড়েন না। কেননা, ‘সম্পূর্ণ’ বলা মানে সে আদর্শের বিকাশের গতি অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। দর্শন সম্পর্কে তার অবধানতার পরিচয় পাই এই স্তবকে :
‘সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝা যায়? আমি এটুকু জানি, সমাজতান্ত্রিক দর্শন সম্বন্ধে যে-কেউ যদি বলে, এই জিনিস করলে পরে পূর্ণ সমাজতন্ত্র হয়ে যাবে, তা হলে বলতে হবে যে, ভবিষ্যতে সভ্যতার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল।’
অর্থাৎ পূর্ণ সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে হেগেলীয় End of Histroy প্রকল্পের মতোই সমার্থক চিন্তা। ‘পূর্ণতার’ দিকে আমরা কেবল পৌঁছানোর চেষ্টাই করে যেতে পারি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে- এর বেশি কিছু নয়। স্পষ্টতই, তাজউদ্দীন সমাজতন্ত্রের Idealized version-এ বিশ্বাসী ছিলেন না। সে জন্যেই তার সিদ্ধান্ত হলো, সংবিধানে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন মিশ্র মালিকানা সমন্বিত অর্থনীতির প্রস্তাবনাই সঠিক হয়েছে :
‘ব্যক্তিগত মালিকানা দিয়েছি দেখে সেটার জন্য সমাজতন্ত্র দাবিদার একটা দল বলেছেন যে, এটা সমাজতন্ত্র হয়নি, আবার আর একটা দল বলছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা যা দেওয়া হয়েছে, তা ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি, খুব কম দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত মালিকরা বড় ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। আমার মনে হয়, দুই দলের কথায় যখন তারা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের কারও কথায় কর্ণপাত না করে আমরা যেটা দিয়েছি, সেটাই তাদের গ্রহণ করা উচিত। কারণ, এটা সুসামঞ্জস্য হয়েছে এবং সুসমন্বিত হয়েছে।’
সবশেষে, তাজউদ্দীন হঠকারী ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী’ দলে দাবিদার বলে গোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টি দিলেন (এই গণপরিষদের অধিবেশন চলাকালীনই জাসদের জন্ম হবে)। কেন মালিকানা-প্রশ্নে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রাধান্য রেখেই ব্যক্তি খাতের নিয়ন্ত্রিত বিকাশকে উৎসাহ দিতে হবে- এর পেছনে ‘প্র্যাকটিক্যাল নেসেসিটি’ ছাড়াও জনগণের ‘পশ্চাৎপদ মানসিকতার’ দিকেও সচেতন থাকার কথা বললেন তিনি। বিপ্লব ডি-রেইলড হয়ে যেতে পারে এই হঠকারী অতি বামপন্থি শক্তি ও দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির যুগপৎ সাঁড়াশি আক্রমণে। তাজউদ্দীন বললেন :
‘জনাব স্পিকার সাহেব, আপনি জানেন, আমার সমাজের শিক্ষিত এবং তরুণ এবং অত্যন্ত আদর্শবাদী বলে পরিচিত কিছু কিছু লোক- তাদের সংখ্যা বেশি কি কম, তা নির্ণয় করা আমার পক্ষে খুব কঠিন- যে কার্যকলাপ দেখাচ্ছে, সেটা খুবই দুঃখজনক। যেখানে একটা সমাজতান্ত্রিক বিধানে স্বাভাবিকভাবে বলা যায় যে, যৌথ মালিকানা থাকবে, সেই জায়গায় একদিকে তারা প্রগতির কথা বলছে, আর একদিকে অপরের পকেট থেকে কেড়ে পর্যন্ত সম্পদ নিতে, পয়সা নিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। এই যে মনোবৃত্তি, এতে আর যাই হোক, সমাজতন্ত্র যে হবে না, তাতে কোনো সন্দেহ নাই।’
এ রকম হতাশার কথা বঙ্গবন্ধুও তার ১৯৭২-৭৫ পর্বের নানা ভাষণে ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ক্ষেদোক্তি করেছিলেন। প্রথমে তিনি চিহ্নিত করলেন পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি ও সমমনা অন্যান্য হঠকারী অতি বামদের :
‘এক রাতের অন্ধকারে গুলি করে মারে, আর বলে রাজনীতি করে। রাতে একজন লোক শুয়ে আছে, তাকে জানালা দিয়ে গুলি করে মারল। বলে আমি বিপ্লবী। তুমি বিপ্লবী, না দাগী চোর? এদের কোনো নীতি নাই, এদের কোনো আদর্শ নাই, এদের কিছুই নাই। এরা বড় বড় কথা বলে।… হাটবাজার, চিনির দোকানে, মুরগির দোকানে, সবজির দোকানে ডাকাতি করে বিপ্লব হয় না। ঐ রণদিভের থিওরি ইট মারো, সেপাইয়ের আস্তানায় ইট মারো, ওয়ালে একটা পাথর মারো, এতে বিপ্লব হয় না।’
এই হটকারী অতি বামপন্থি শক্তির মধ্যে দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তিও প্রথম থেকেই বা একপর্যায়ে এসে মিশে গিয়েছিল। মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলে আসলে তারা সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল। তাদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে বলেছিলেন :
‘যারা মনে করেন রাতের অন্ধকারে গুলি করে কিংবা রেললাইন তুলে দিয়ে টেররিজম করে বিপ্লব হয়, তারা কোথায় আছেন তারা জানেন না। … এই টেররিজম দিয়ে দেশের বিপ্লব হয় না, হয় নাই, হতে পারে না। … দুঃখের বিষয়, অনেকে এখনও টেররিজম-এ বিশ্বাস করেন। যাই হোক, ভবিষ্যতে তাদের ভুল ভাঙবে। … আর একটা জিনিস। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক- তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে, সে কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। … সেই জন্যেই এক মুখে সোশ্যালিজম ও প্রগতির কথা এবং আর এক মুখে সাম্প্রদায়িকতা চলতে পারে না। সমাজতন্ত্র প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না। একটা হচ্ছে পূর্ব আর একটা হচ্ছে পশ্চিম।’
এ ছাড়াও দলের ভেতরে সুবিধালিপ্সু শক্তির অনুপ্রবেশ, দুর্নীতির প্রসার, শৃঙ্খলার স্খলন প্রভৃতি সমস্যার কথা বলেছিলেন সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু। এর থেকে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্র গড়ার পথে বাধা কত প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত দিক থেকে আসতে পারে। এর জন্য নতুন মানুষ ও নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। নতুন মানুষ প্রয়োজন- এটা বঙ্গবন্ধু বা তাজউদ্দীনের জন্য শুধু কথার কথা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র কেন রাতারাতি বা স্বল্পতম সময়ে করা যাবে না সে সম্পর্কে তাজউদ্দীনের সর্বশেষ যুক্তির দিকে এটা আবারও আমাদের ধাবিত করে। ১৯৭২ সালের ৩০ অক্টোবরের সেই ভাষণে তাজউদ্দীন তাই স্বীকারোক্তি সুরে বলে উঠেছিলেন :
‘মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত, প্রত্যেকটি মানুষ সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত কেবল আইন লিখে সুষ্ঠুভাবে আমরা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। তাই আমি আবার বলছি, বারবার বলতে চাচ্ছি যে, যে সমস্ত প্রগতিশীল দল এবং দেশপ্রেমিক দল, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থায় বিশ্বাসী, তাদের কর্তব্য হবে আজকে সেই মানুষ গড়ে তোলা, যে মানুষ সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হবেন, যে মানুষ যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী হবেন। যে মানুষ অপরের থেকে কেড়ে নিয়ে মালিক বনে সমাজতন্ত্রবাদী হওয়ার দাবি করবেন না। ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেই হোন আর যাই হোন, তিনি সেই ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী থেকে কোনো অংশে কম দোষী হবেন না, তার চাইতে কোনো অংশেই ভালো মানুষ বলে পরিচিত হবেন না। কাজেই আজকে সেই মানুষ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে।’
নতুন মানুষ আগে সৃষ্টি হবে, নাকি নতুন উৎপাদন সম্পর্ক আগে সৃষ্টি হবে, নাকি দুই-ই ‘দ্বান্দ্বিকভাবে’ একত্রে সৃষ্টি হবে- এটি মার্কসীয় সমাজ বদলের তত্ত্বের একটি অতি পুরাতন সমস্যা। সম্ভবত তাজউদ্দীন জানতেন যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের বাস্তবায়ন কতকগুলি বিষয়ীগত (সাবজেকটিভ) ও বস্তুগত (অবজেকটিভ) অবস্থার ওপরে নির্ভরশীল। সাধারণভাবে সমাজতন্ত্রের পূর্বশর্ত সম্পর্কে মার্কস যা বলেছিলেন তা ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। A Contribution to the Critique of Political Economy গ্রন্থের বিখ্যাত ‘ভূমিকায়’ মার্কস লিখেছিলেন :
‘No social order is ever developed before all the productive forces for wihch it is sufficient have been developed, and new superior relations of production never replace older ones before the material conditions for their existence have matured within the framework of the old society.’

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজটিও তাই শুধু ইচ্ছাপূরণের বিষয় না হয়ে বিষয়ীগত এবং বস্তুগত পরিস্থিতির বিকাশের ওপরে নির্ভর করে গড়ে উঠবে। এমনটাই বঙ্গবন্ধু ও তার নিকট সহকর্মীদের দ্বারা প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানের সার্বিক আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসে। তবে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ধারণার মধ্যে কতটুকু গণতন্ত্রের ওপরে জোর দেওয়া হবে, আর কতটুকু সমাজন্ত্রের ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হবে, এ নিয়ে সেদিনের গণপরিষদের ভেতরে এবং বাইরে বেশ কিছুটা ভিন্ন মত ছিল। গণপরিষদের ভেতরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন এই বলে যে, প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক দেশের একটা বড় ত্রুটি তার মধ্যে গণতন্ত্রকে সেভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। যদিও সেসব দেশের সাম্প্রতিক ঝোঁক হলো রাষ্ট্রের আরও গণতন্ত্রায়নের প্রতি। এ জন্যে এসব দেশে নানা ধরনের সাংবিধানিক সংশোধনী আসছে। স্ট্যালিন আমলের সঙ্গে ক্রুশ্চেভের আমলে তুলনা করে তিনি বললেন যে, ‘কে ভুল ছিল, কে শুদ্ধ ছিল, বলব না। তবে ক্রুশ্চেভের সময় থেকে মৌলিক মানবিক অধিকার ও গণতন্ত্রকে দেওয়ার জন্য মানুষের একটা প্রচেষ্টা সোভিয়েট রাশিয়ায় চলছে এবং যা আজকে কোসিগিনকে পর্যন্ত করতে হচ্ছে। তাতে বোঝা যায় রাশিয়ায় আজ গণতন্ত্রকে গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চলছে এবং কালের উত্তরণে এই প্রবণতা যদি এগিয়ে যায়, তাহলে এমন সময় আসতে পারে, যখন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র আনা সম্ভব।’ অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের মডেল সোভিয়েতের জন্যও প্রযোজ্য। গণতন্ত্র ছাড়া সমাজতন্ত্র আখেরে কার্যকর হয় না এবং সে কারণে এসব দেশের জন্যও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রই চূড়ান্ত পরিণাম হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য। তার মানে ধ্রুপদি সমাজতন্ত্রের মডেলে বেশি করে গণতন্ত্রের প্রতি জোর দিতে হবে। এটাই হচ্ছে মূল যুক্তি :’সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নতুন নতুন কর্মপন্থা যারা দেবে, জনগণ তাদেরকেই ভোট দেবে। গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র হবে- এই আদর্শকে অবলম্বন করে যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করতে পারে।’ এম মনসুর আলীও একইভাবে মনে করেছেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানের ‘সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি অবস্থান’। শুধু তাই নয়, সংবিধানে এর সংযোজন সারা বিশ্বেই একটি অনন্য উদাহরণ :’একমাত্র বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এই যে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি অবস্থান এবং অগ্রসর হওয়া এটা সম্ভব। কেননা, অস্বীকার করার উপায় নাই যে, যে সমাজতন্ত্র জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সত্যিকারের সমাজতন্ত্র হতে পারে না। মানুষের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, বিকাশ লাভ করে, সেই সমাজতন্ত্রই প্রকৃত সমাজতন্ত্র।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

৩. গণতন্ত্রের হাত ধরে এই সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা করা শক্ত- এটা স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে : ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ দীর্ঘকাল ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায় রয়েছেন। সংবিধানে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছে।’ কিন্তু ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা’ আর ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ এ দুটো লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠবে না তো? এই সম্ভাবনা স্বীকার করে বলা হচ্ছে : ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রা করতে গিয়ে আমরা যে নতুন পথে চলেছি, সে বিষয়ে আমরা সচেতন। সমাজতন্ত্রের দিকে পরিকল্পিত অগ্রগতির পথে যাতে কোনো বাধা সৃষ্টি হতে না পারে, সেজন্য সংবিধানে কয়েকটি বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।’ এর মধ্যে একটি হলো, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে ‘সম্পত্তির অধিকারকে’ সীমাবদ্ধ করা। উদ্ৃব্দতিটি তাৎপর্যপূর্ণ :

‘সম্পত্তির অধিকার বা ব্যবসা ও বাণিজ্যের অধিকার কোনো কোনো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, ভূমি-সংস্কার ও অন্যান্য ব্যবস্থার পক্ষে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি। এই জন্যে আমরা বলেছি যে, আইন সাপেক্ষে এইসব অধিকার ভোগ করা হবে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন মনে করলে সংসদ এই সব অধিকার হরণ করতে বা সীমাবদ্ধ করতে পারবেন। সংসদ যদি সেরকম কোনো আইন প্রণয়ন করেন, তাহলে আদালত তা নাকচ করতে পারবেন না। নাগরিকদের অধিকার রক্ষার পূর্ণ ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করে সম্পত্তি ও ব্যবসা সংক্রান্ত যেসব আইন সংসদ তৈরি করবেন, আদালত সেগুলো নাকচ করতে পারবেন না।’

অর্থাৎ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে এমন ধুয়া তুলে কালক্ষেপণ করা যাবে না। এখানে লিবারেল প্রিন্সিপলকে অতিক্রম করে সোস্যালিস্ট প্রিন্সিপলকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক হিসাবে, মিলকে ছাড়িয়ে এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মার্কসের উত্তরাধিকার। এই সমাজতন্ত্র উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ ধারণার চেয়ে স্পষ্টতই আরও বেশি কিছু। এ কথা স্পষ্ট করে উচ্চারিত হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামের ১৯ অক্টোবরের ভাষণে। সেই ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন, তা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমার দালিলিক আলোচনাকে সমর্থন করে :

‘আমার বন্ধু যারা অনেক সময় ইতিহাসের বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করেন, তারা পর্যালোচনা করে অনেক সময় দেখতে চান না যে, যেদিন সমাজতন্ত্রের প্রোগ্রাম আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছিল, সেদিন আজকের অনেক দল শুধুমাত্র welfare state-এর প্রোগ্রাম নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে যখন আমরা গণতন্ত্রের সংগ্রাম করতে করতে মানুষের অধিকার এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের পন্থাকে চিন্তা করে সমাজতন্ত্রের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলাম, তার পূর্ব হতেই আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম করে আসছিল।’

তারপরও গণতন্ত্রের পথ ধরে সমাজতন্ত্রে পৌঁছনো যাবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় ছিল অনেকের মনেই। ওই একই বক্তৃতায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছেন : ‘গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব কি সম্ভব নয়, সেই বিতর্কে আমি যাব না। তবে আমরা বিশ্বাস এবং আস্থার সঙ্গে সেই পথ বেছে নিয়েছি। বেছে নিয়েছে সারা জাতি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, একনায়কত্ব নয়।’ সমাজতন্ত্রের দিকে চলার পথে গণতন্ত্র বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কিনা সে সম্পর্কে সাংবিধানিক ধারা সংযোজন করা দরকার এই মর্মে ড. কামাল হোসেন যে কথা ইতোপূর্বে বলেছিলেন, এবার তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তিনি। গণতান্ত্রিক সব অধিকারই থাকবে, শুধু একটি জায়গায় ছাড়া। সেটি হলো শাসনতন্ত্রের তৃতীয় ভাগের ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। সৈয়দ নজরুল বললেন :

‘যারা মনে করেন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব নয়, তারা যে প্রশ্নটি করেন সেটা হলো এই যে, সম্পত্তির মৌলিক অধিকার যদি স্বীকার করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রায়ত্ত করা অথবা সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য রাষ্ট্রের যদি যে কোনো সময় সম্পত্তির অধিকার করা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত করার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে তার প্রতি সেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় কিনা… আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও এই প্রশ্ন এসেছিল। যেদিন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ব্যাংক, ইনসিওরেন্স জাতীয়করণ করার জন্য আইন পাস করেছিল, সেদিন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের চিফ জাস্টিস জনাব হেদায়েতুল্লাহ তাকে নাকচ করেছিলেন এই বলে যে, সম্পত্তির মৌলিক অধিকারের প্রশ্নের এটা বিরোধী। সেজন্য আমাদের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণেতাগণ অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন ছিলেন বলে এই শাসনতন্ত্রের তৃতীয় ভাগে ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রযোজিত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং মৌলিক আদর্শের প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত করার আদর্শকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।’

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্টের পূর্ব ইতিহাস রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের- এ কথা সেদিনের গণপরিষদের বক্তৃতায় ব্যাখ্যা করেছেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তার বক্তব্য পরিস্কার- গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার যেমন দীর্ঘদিনের, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ার প্রতিও দলটির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বহু বছর আগে থেকেই চলে আসছে। সেটা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সংগ্রামে আরও বেশি করে গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এর উৎপত্তি আরও আগে। এ বিষয়ে পূর্ববর্তী অধ্যায়ে ১৯৬৪ সালের পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ঘোষণা ও কর্মসূচির আলোচনায় আমি কিছুটা আলোচনা করেছি। কিন্তু তার একটি সাক্ষ্য পাচ্ছি স্বয়ং তাজউদ্দীন আহমদের সেদিনের ভাষণেও। সেটি এবার শুনে নেওয়া যাক। ৩০ শে অক্টোবরের এই ভাষণে তাজউদ্দীন সংসদে বলেছিলেন :

‘অর্থনৈতিক অধিকারের কথা বলতে গেলে আজকে গর্বের সঙ্গে এই পরিষদে ঘোষণা করতে চাই, আমার দল আওয়ামী লীগ ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসের ৬, ৭, ৮ তারিখে ঢাকার গ্রিন রোডের আমবাগানে যে কাউন্সিল অধিবেশন করেছিলেন, তাতে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে পরিস্কার ভাষায় এ দেশের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। এই সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন ধাপে জাতীয়করণের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়ার বিধান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে গৃহীত হয়। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরবচ্ছিন্নভাবে এ দেশে সমাজতন্ত্রের কথা বলে এসেছেন। আগে সমাজতন্ত্রের কথা মানুষ পরিস্কারভাবে বুঝত না। যারা সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিল তারা মানুষের মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করত। সমাজতন্ত্রের কথা বললে সমাজতন্ত্রকে ধর্মের সঙ্গে জড়িত করে তাকে ধর্মবিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হতো এবং মানুষের এক অংশকে এ ব্যাপারে দায়ী করা যেত। আজকে আওয়ামী লীগ বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্কারভাবে সমাজতন্ত্র কী, তা বলে দিয়েছে।’

এরপর তাজউদ্দীন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেব সমাজতন্ত্রের কথা তুললেন : ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে আইন প্রণয়নের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় ৪৭ অনুচ্ছেদের কথা।’ এরপর ‘প্রগতিবাদী’ সমালোচকদের উদ্দেশ করে তিনি বললেন : ‘যারা প্রগতিবাদী বলে দাবি করেন, তারা সমালোচনা করছেন এই সংবিধান সমাজতান্ত্রিক সংবিধান নয় বলে। আমি জানি না, সমাজতান্ত্রিক সংবিধান কীভাবে হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে হতে পারে, সে পরিকল্পনা কেউ যদি দিতে পারতেন, তাহলে এই পরিষদ তা অত্যন্ত সতর্কতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতেন। আমি সমাজতান্ত্রিক দেশের বিভিন্ন সংবিধান- ২৫ বছর আগের, ৩০ বা ৫০ বছর আগের সংবিধান দেখেছি। তাতে যে বিধান রয়েছে সে বিধান আজকে বাংলাদেশের সংবিধানের চাইতে যে উন্নত, সে কথা বলা চলে না … তবে বাস্তব ভিত্তিতে এই অবস্থায় এ দেশে সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র করা যাবে কিনা, সেটা দেখতে হবে।’

এটা বলেই তাজউদ্দীন লক্ষ্য করেন যে, সেদিনের বাংলাদেশে সম্পূর্ণ সমাজতন্ত্র দূরে থাক, পূর্ণ গণতন্ত্রও বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন : ‘আজকে আমাদের সামনে সবচাইতে বড় যে কর্তব্য রয়েছে, সেটা হচ্ছে আমাদের সমাজের অবস্থা লক্ষ্য করা। … আজকে আমাদের সমাজের যে অবস্থা, তাতে সমাজতন্ত্র দূরের কথা- পূর্ণ গণতন্ত্রের অবস্থাও আসতে পারে না।’ তাজউদ্দীনের গোটা ভাষণে তার স্বভাবসুলভ বিশ্নেষণী মনের ছাপ আগাগোড়া ফুটে উঠেছে। প্রথমত, ‘কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে’ এবং এই লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতীকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য’ রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার- এ কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে তিনি যোগ করলেন ‘সমবায় ভিত্তিতে যৌথ কৃষি খামার’ করার কথাও, কেননা এ ব্যাপারে (সমবায়ী মালিকানা স্বীকার করে নেওয়ার পর) ‘এই সংবিধানে (আর) কোনো বাধা নেই।’

তাজউদ্দীনের সেদিনের ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ব্যক্তি-পুঁজির প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার আবশ্যকতা নিয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিখাতের মধ্যে সুসামঞ্জস্য অনুপাত থাকা দরকার এটা ব্যাখ্যা করে তিনি যা বললেন তার সরলার্থ হলো বাস্তবের নিরিখে ও কালক্রমে এই অনুপাত পরিবর্তিত হতে পারে। প্রথমত, ‘উঠতি পুঁজিবাদ সম্পর্কে আমরা ব্যবস্থা করেছি’; এই উঠতি পুঁজিবাদ যাতে বিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ না হতে পারে সেদিকে রাষ্ট্রের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। পুরো উদ্ৃব্দতিটি প্রণিধানযোগ্য :’আজকে ব্যক্তিগত মালিকানা, ব্যক্তিগত পুঁজিতে যে সংশয়ভাব দেখা দিয়েছে, তাতে শুধু এটাই আমরা বলতে পারি, আইনের বিধান মোতাবেক ব্যক্তিগত মালিককে যেটা দেওয়া হবে, সেটার মালিকানা সে নিশ্চয়ই আইনের বিধান-অনুযায়ী নির্বিঘ্নে ভোগ করতে পারবে। আইনের বিধান-অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই অর্থনৈতিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে না। কিন্তু পুঁজিপতিদেরকে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাবের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। কাজেই, … আজকে ব্যক্তিগত মালিকানায় উৎসাহ আমরা ততটুকুই দেব, যতটুকু উৎসাহ দিলে ব্যক্তিগত শোষণ, ব্যক্তিগত বঞ্চনা এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব ঘটাবার সুবিধা ব্যক্তি মালিকানায় থাকে না। এটা পরিস্কার থাকা ভালো।’

দ্বিতীয়, ব্যক্তিগত পুঁজিকে যদি নিয়ন্ত্রণে রেখেই বিকাশ করতে দেওয়া হয়, তাহলে সংবিধানে এর নিম্নসীমা-ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হলো না কেন? কেন ব্যাপারটাকে অনংঃৎধপঃ রাখা হলো কেবল ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ত্রিবিধ মালিকানার কথা বলে? এ বিষয়ে তাজউদ্দীনের সুচিন্তিত উত্তর হচ্ছে, পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে মাথায় রাখতে হবে :

“ব্যক্তিগত মালিকানা অবশ্য আইনের বিধান মোতাবেক হবে এবং ব্যক্তিগত মালিক যাতে করে সম্পত্তি বৃদ্ধি করে, মুনাফা বৃদ্ধি করে, সম্পদ বৃদ্ধি করে তার ‘প্রফিট’ দিয়ে আমার সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থাকে বানচাল করতে না পারে, তার ব্যবস্থা আইন অবশ্যই করবে। বলা হয়েছে, তা হলো সেই বিধান সংবিধানে কেন করা হলো না? আমি আগেই বলেছি, সংবিধানে সব আইন, চুলচেরা আইন বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করা যায় না, করা বাঞ্ছনীয় নয়। কতটুকু করা হবে, সেটার উচ্চসীমা, নিম্নসীমা কতটুকু থাকবে, সেগুলি সংবিধানে বেঁধে দেওয়া যায় না। ভবিষ্যৎ সংসদ সে উচ্চসীমা বা নিম্নসীমা, কোন সময় তার কতটুকু সীমা নির্ধারণ করা উচিত, তা বিবেচনা করে দেখতে পারবেন।”

অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সংসদে যারা আসবেন, তারা সে সময়ের পরিস্থিতি বিচার করে ব্যক্তিগত পুঁজির চৌহদ্দি নির্ধারণ করবেন। তবে পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ যে স্বাধীন বাংলাদেশে করতে দেওয়া হবে না, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই সংবিধান প্রণেতাদের মনে।

তৃতীয়ত, অনেকে বলেছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা রয়েছে বলে সমাজতন্ত্র আর থাকে না। এরও উত্তর দিলেন তাজউদ্দীন। তিনি দেখালেন যে, সমাজতান্ত্রিক এমন অনেক দেশ, রয়ে গেছে যেখানে ব্যক্তিমালিকানা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। যেমন- ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদে দেখতে পাবেন সেখানে তারা ৪ প্রকারের মালিকানা দিয়েছে।’

[ক্রমশ]

সাম্প্রতিকের তর্ক ও বিতর্ক

পর্ব ::৪৭

১. তর্কটা কী নিয়ে?

এই লেখাটি বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের পিছু-হটার উদ্বেগজনক পরিণতি নিয়ে। এই প্রতিপাদ্যটি কিছু তাত্ত্বিক মীমাংসা, কিছু সাম্প্রতিক বইয়ের আলোচনা, কিছু কেস-স্টাডি, কিছু পরিসংখ্যানগত তথ্য-উপাত্ত ও কিছু অনুমান দিয়ে নানাভাবে বলার চেষ্টা হয়েছে (বলা দরকার এ লেখাটির একটি আদি রূপ এর আগে ‘সমাজ অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশ হয়ে ছিল)। অবশ্য গণতন্ত্রের পিছু-হটাকে প্রমাণ করার জন্য আরও তত্ত্ব ও তথ্যের কাঠখড় পোড়াতে হবে। সেটা স্বীকার করে নিয়েই নির্দিষ্ট করে তিনটি কথা বলতে চেয়েছি।

প্রথমত, গণতন্ত্র ‘পিছু হটছে’ (যাকে Democratic Recession বা Backsliding বলেছেন স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ল্যারি ডায়মন্ড)। এই পিছু-হটা কেবল নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়, বা নির্দিষ্ট কিছু মাথাপিছু আয়ের গ্রুপে সীমিত নেই। এটা যেমন ঘটছে ‘প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে’ (যেখানে অনেক দশক ধরে গণতন্ত্র বিরাজ করছে, যেমন ইউরোপ-আমেরিকার ‘উন্নত জীবনযাত্রার’ দেশগুলোয়), তেমনি ঘটছে ‘দুর্বল গণতন্ত্রে’ (যেখানে দুই বা বড় জোর তিন দশক ধরে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, যেমন অধিকাংশ ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোয়)। প্রতিষ্ঠিত ও দুর্বল গণতন্ত্রের মাঝামাঝি স্তরে রয়েছে পূর্ব ইউরোপের তুলনামূলকভাবে (তৃতীয় বিশ্বের তুলনায়) বেশি শিক্ষা-দীক্ষার কিন্তু মাঝারি-আয়ের দেশগুলো। যারা স্ট্যালিনীয় সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোয় বিকশিত হতে শুরু করেছে। এসব দেশের সদ্য-বিকশিত গণতন্ত্র এর মধ্যে পিছু হটতে শুরু করেছে কম-বেশি। এই তিন ধারার দেশই পুঁজিবাদী অর্থনীতির পথে রয়েছে, যদিও পুঁজিবাদের চর্চায় এরা নানা স্তরে অবস্থান করছে। এর অর্থ হলো যে, পুঁজিবাদ সত্ত্বেও গণতন্ত্র পিছু হটছে। বুর্জোয়াদের শাসনে বুর্জোয়া গণতন্ত্র আর নিরাপদে থাকছে না।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের পিছু-হটা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হলেও বিভিন্ন দেশে পিছু-হটার কারণ একরূপ নয়। তবে উপসর্গ বা কারণের বিভিন্নতা সত্ত্বেও অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, পিছু-হটার পেছনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়া বা কমার কোনো যোগসূত্র নেই। গত দুই দশক ধরেই পিছু-হটার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল নানা দেশে। উঁচু আয়, নিচু আয়, দ্রুত প্রবৃদ্ধি, শ্নথ প্রবৃদ্ধি- সব রকমের ‘কনটেক্সটে’ গণতন্ত্রের পিছু-হটা দেখতে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, বলতে চাচ্ছি যে, এখানে অর্থনৈতিক ‘ডিটারমিনিজমের’ কোনো সুযোগ নেই। ভাবাদর্শ বা মতাদর্শ, ‘পাওয়ার অব আইডিয়া’; গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া; আত্মসত্তার রাজনীতি; রাষ্ট্রের কোন কোন দিকের ক্রম-বিলীয়মান ভূমিকা, আবার কোন কোন দিকের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা; এক কথায়, রাষ্ট্র ও পুরসমাজের (State-Civil Society) মধ্যকার সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, অনেক কিছুই হয়তো এই গণতন্ত্রের পিছু-হটার ওপরে প্রভাব রাখছে। আমি এ লেখায় সেসব সম্ভাব্য প্রভাবকের তেমন কোনো বিশ্নেষণ করতে যাইনি। আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি যে, খরঢ়ংবঃ-কথিত আশাবাদের কোনো সুযোগ নেই এখানে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় নিম্ন-আয়ের থেকে মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক উন্নয়ন হবে তথা সবলতর গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটবে, এ রকম যুক্তির পেছনে কোনো তথ্যগত ভিত্তি সেভাবে নেই। উন্নয়নের ধারায় একসময়ে অপেক্ষাকৃত সুশাসনের স্তরে (বা সুশাসিত রাষ্ট্রের দিকে) যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অনিবার্যভাবে আরও গণতন্ত্রের দিকে উত্তরণ সম্ভব, সে রকম কোনো প্রবণতা এখানে কাজ করছে না। এ রকম কোনো গ্যারান্টিও তত্ত্বে বা তথ্যে নেই :প্রগতির রথের ঘোড়া সামনেও যেতে পারে, পেছনেও যেতে পারে। অমর্ত্য সেন যাকে বলেছেন, ‘Government by Discussion’ সেই গণতন্ত্র অনেক জিডিপি আহরণের পরও দূর নক্ষত্রের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে। সন্দেহ কী, কিছুটা ভিন্ন-অর্থে দার্শনিক জাঁক দেরিদাও বলবেন- সেই গণতন্ত্র ভূ-ভারতে কেন, এই ভূলোকেও প্রায় কোথাও নেই, এবং কোনো লাগসই শিরোনাম না পেয়ে এর নাম দেবেন ‘Democracy-to-come’!

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ এই বিশ্বজোড়া গণতন্ত্রের সামগ্রিক পিছু-হটার বা Democratic Recession-এর বাইরে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এখানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এই পিছু-হটার মধ্যেও ‘প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে’ শনাক্ত করা বা তাদের পক্ষে সমর্থন জোরালো করা সম্ভব। বাংলাদেশ কি রুয়ান্ডার মতো হবে, নাকি ঘানার মতো হবে? তুরস্ক নাকি তিউনিশিয়ার মতো হবে? ইন্দোনেশিয়ার নাকি থাইল্যান্ডের মতো অবস্থায় গিয়ে দাঁড়াবে? ইকুয়েডর নাকি ভেনেজুয়েলাকে অনুসরণ করবে? চিলি নাকি আর্জেন্টিনার মতো হবে? স্লোভেনিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো হবে, নাকি হবে হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের মতো? এই দেশগুলো ‘লিবারেল ডেমোক্রেসি’ ও ‘ইলেকটরাল ডেমোক্রেসি’ যে কোনো নিরিখেই পিছু হটেছে গণতন্ত্রের সূচকে, কিন্তু এদের মধ্যে রাজনৈতিক উন্নয়নের স্তরে কী বিপুল পার্থক্য! এই Choice-এর অবকাশ তো বাংলাদেশের জন্য এখনও রয়ে গেছে। এদিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাও প্রবন্ধটির একটি উদ্দেশ্য।

লেখাটি ৫টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রথম অধ্যায়ে প্রারম্ভিক যুক্তি ও বক্তব্য উপস্থাপনার পরে দ্বিতীয় অধ্যায়ে গণতন্ত্রের তত্ত্ব নিয়ে এথেনিয়ান ডেমোক্রেসির যুগের ক্ল্যাসিক চিন্তাবিদদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে আমি বলার চেষ্টা করছি যে, ইলেকটরাল ডেমোক্রেসির বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যদি নির্বাচনী গণতন্ত্রে কোনো দেশ ভালো ‘স্কোর’ করেও থাকে, কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের উদারনৈতিক চর্চা ও মূল্যবোধ ‘লিবারেল ডেমোক্রেসির’ নিরিখে উত্তরোত্তর ‘রক্ষণশীল’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ হতে থাকে, তাহলে সে দেশটিতে গণতন্ত্রের সংকট দানা বাঁধতে বাধ্য। অর্থনীতিবিদ ডানি রডরিকের পথ ধরে আমি বলার চেষ্টা করছি যে, ‘লিবারেল ডেমোক্রেসিই’ শ্রেষ্ঠতর, এবং সমাজে ‘লিবারেল আইডিয়া’-এর ভূমিকা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ অধ্যায়ে বেশকিছু তথ্য ও উপাত্ত জড়ো করা হয়েছে দেশে দেশে গণতন্ত্রের পিছু-হটা সম্পর্কে। এটি হচ্ছে এই লেখার মূল ‘ইমপিরিক্যাল’ অংশ। পঞ্চম অধ্যায়ে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রের পিছু-হটার সামগ্রিক প্রবণতার মধ্যে আদৌ কতটুকু কী করা সম্ভব- উন্নয়নের ফলাফলকে আরও জনকল্যাণমুখী করার ক্ষেত্রে- সে বিষয়ে কিছুটা জল্পনা থাকছে।

২. গ্রিক দেবী ডেমোক্রেটিয়া

গণতন্ত্রের দেবীর নাম গ্রিকরা দিয়েছিল ‘ডেমোক্রেটিয়া’। এথোনিয়ান দেব-দেবীর মধ্যে তার অবস্থান মধ্যম সারিতে। সবার ওপরেও নয়, সবার নিচেও নয়। প্রায় ষাট বছর আগে ‘ইন ডিফেন্স অব পলিটিক্স’ বইতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বানার্ড ক্রিক এই দেবীকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে : ‘She is everybody’s mistress and yet somehow retains her magic even when a lover sees that her favours are being, in his light, illicity shared by many another.’ গণতন্ত্রের দেবী সবারই উপপত্নী, এবং প্রত্যেকেই তার আবেদনময়ী আচরণে মোহমুগ্ধ কথাটা নির্দয় শোনায়। কিন্তু লন্ডনের সুবিখ্যাত বার্কবেক কলেজের (যেখানে দার্শনিক জিজেক অধ্যাপনা করেন) অধ্যাপক ক্রিক সাহেব বিনা কারণে কথাটা উচ্চারণ করেননি। প্রত্যেকেই এই দেবীর কাছে প্রসাদ চেয়েছেন যার যার মতো করে, আর প্রত্যেকেই কিছু না-কিছু পেয়ে প্রীত হয়েছেন এমনই সহৃদয়া ডেমোক্রেটিয়া দেবী। সেই থেকে বিশেষণের কমতি নেই। এথেনিয়ান ডেমোক্রেসি, বুর্জোয়া গণতন্ত্র, শোষিতের গণতন্ত্র, ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি, লিবারেল ডেমোক্রেসি, রিপ্রেজেন্টেটিভ ডেমোক্রেসি, ইললিবারেল ডেমোক্রেসি, র‌্যাডিকেল ডেমোক্রেসি, ‘ডেমোক্রেসি-টু-কাম’ ইত্যাদি নানা অভিধায় ডাকা হয়েছে তাকে। এই নামকরণের ইতিহাস ও ট্যাক্সোনমি একটি পৃথক আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে।

যে নামে দেবীকে ডাকা হচ্ছে, সেই স্বরূপেই তার ভক্তরা তাকে দেখতে চান। অন্য কোনো নামে বা অভিব্যক্তিতে তাকে দেখতে চান না তারা। রূপে-রসে-গন্ধে এসব নামকরণ এতটাই পৃথক যে, এদের মধ্যে প্রায় ভাব-বিনিময় চলে না। একটা উদাহরণ দিই। একসময় মার্কসবাদীরা বলতেন, গণতন্ত্র বলতে যার ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে সেটা আদৌ ‘প্রকৃত’ গণতন্ত্র নয়; সেটা হচ্ছে আসলে ‘বুর্জোয়া’ গণতন্ত্র। কথাটা মার্কসও তার নানা লেখায় ব্যবহার করেছেন। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের রাজা লুই ফিলিপ বিদায় নিলেন। এই বিপ্লব গভীরতর সমাজ-পরিবর্তন আনল না যদিও, কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকারের একটা বার্তা ইউরোপে ছড়িয়ে দিল। বার্তাটি পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটির। বলা দরকার, ফরাসি বিপ্লবের সময়ে উচ্চারিত ‘লিবার্টি, ইকুয়ালিটি, ফ্রেটারনিটি’ শ্নোগানের মধ্যে যে ইকুয়ালিটি তা হচ্ছে পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটি নিয়ে। পরবর্তীতে মার্কস সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের যে অর্থনৈতিক ইকুয়ালিটির কথা তুলবেন এটা তার থেকে আলাদা। মার্কস ও এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালের কমিউনিস্ট ম্যানিফ্যাস্টোর পাতায় পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটির পাশাপাশি ইকোনমিক ইকুয়ালিটির কথা বলেছিলেন। প্রথম ধারণাটি, তার চোখে, নিতান্তই সংকীর্ণ ধারণা; অর্থনৈতিক সমতা ছাড়া রাজনৈতিক সমতা অর্থহীন। সেই থেকে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুত পলিটিক্যাল ইকুয়ালিটিকে মার্কসের অনুসারীরা ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ বলে জেনে এসেছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বামধারার চিন্তাবিদেরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রকেও ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে দেখবেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিকেরা (থিওডর এডোর্নো বা ম্যাক্স হর্কহেইমার) বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যে কীভাবে অ-গণতন্ত্রের তথা স্বৈরতন্ত্রের বিষবৃক্ষ বড় হচ্ছে তা বড় আকারে দেখালেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের কাছে ঋণ ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো তেমনভাবে স্বীকার করেননি। তার পরও বলতে হয় ফুকোর গণতন্ত্রবিরোধী ধারণা জার্মান দার্শনিকদের কাছ থেকেই পাওয়া। গণতন্ত্র-এর ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করলেন ফুকো, যা প্রায় মার্কসের রক্ষণশীলতাকেও ছাড়িয়ে যায়। পুরো উদ্ধৃতিটি তাই তুলে দিচ্ছি :

‘If one understands by democracy the effective exercise of power by a population which is neither divided nor hierarchically ordered in classes, it is quite clear that we are very far from democracy. It is only too clear that we are living under a regime of a dictatorship of class, of a power of class which imposes itself by violence, even when the instruments of this violence are institutional and constitutional; and to that degree, there isn’t any question of democracy for us.’

নোয়াম চমস্কির সঙ্গে বিতর্কে ফুকো এ কথা বলেছিলেন ১৯৭১ সালে- তার মৃত্যুর ১৩ বছর আগে। তাহলে উনিশ শতকের মার্কসের তুলনায় বিশ শতকের সত্তর দশকেও এসে দেখা যাচ্ছে উন্নত দেশের গণতন্ত্রে খুব একটা ‘ইতিবাচক কিছ’ু অর্জিত হয়নি! ফুকোর শব্দ ব্যবহারটিও দেখুন : সত্তর দশকেও তিনি দেখছেন উন্নত আধুনিক গণতন্ত্রের পেছনে ধনিক শ্রেণির ক্ষমতার দাপট- ‘ডিক্টেটরশিপ অব ক্লাস’।

[ক্রমশ]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৬

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

ওকাম্পো-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক সাহিত্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক রূপায়ণের ক্ষেত্রে এক আধুনিক বোধের জন্ম দিয়েছিল। সমালোচকেরা এদের মধ্যকার সম্পর্ককে কী নামে ডাকবেন, সেটা বুঝি এখনও পুরোপুরি স্থির করতে পারেননি। কেউ একে বলেছেন- গভীর দার্শনিক ও আত্মিক যোগাযোগ; কেউ বলেছেন ‘প্লাতোনিক প্রেম’; কেউ বা সন্দেহ করেছেন- এর চেয়ে আরও বেশি কিছুর। আমি এই শেষোক্ত দলে পড়ি। আঁদ্রে জিদ ভিক্টোরিয়ার প্রগাঢ় জ্ঞানচর্চার পরিধি দেখে বলেছিলেন- ‘ওকাম্পো যেন নিজেই এক পুরাণ গ্রন্থ।’ মান রে’র (Man Ray) মতো শিল্পী যার পোর্ট্রেট ছবি তুলেছেন; যিনি লাতিন আমেরিকার নবধারার সাহিত্য-আন্দোলনের পথিকৃৎ ‘Sur’ পত্রিকার ডাকসাইটে সম্পাদক; একজন পুরোধা নারীবাদী; তুখোড় সাহিত্য-সমালোচক; বোর্হেসের মতো সাহিত্যিকের সঙ্গে যার রয়েছে দীর্ঘ কথোপকথনের অনন্য দলিল; একজন বহু ভাষাভাষী সুন্দরী ও বিদূষী (রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলের সব আধুনিকা নারীদের চেয়ে যিনি আধুনিকতমা ও জ্ঞানে-রুচিতে প্রাগ্রসরা) এবং সর্বোপরি বিশ্বস্ত ও মমতাময়ী- তার প্রতি নিঃসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের আকৃষ্ট না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না সেদিন। পরবর্তী দিনগুলোয় এই আকর্ষণ গভীর আস্থার, বন্ধুত্বের ও ভালোবাসার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে (এটা কোন ধরনের প্রেম বা প্রেম হয়ে থাকলে তার সামনে সতর্ক ‘এপিথেট’ বসানোর কষ্টকর চেষ্টা কিছুটা হাস্যকরও ঠেকে) চিত্রকর্মে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ সেই তরুণ বয়স থেকেই। লেখার ফাঁকে ফাঁকেই তিনি বিরতিহীনভাবে মুখ, মুখোশ, জীবজন্তু, পৌরাণিক বা অবচেতন মনের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে এমন কিছু আঁকছেন বা আঁকিবুঁকি করে আসছেন। এটা একসময় নেশায় পেয়ে বসে কবিকে। ষাটোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথ নিজের ভেতরে একদিন হঠাৎই আবিস্কার করলেন স্ব-অস্তিত্বে ও স্ব-মহিমায় বিশ্বাসী এক চিত্রশিল্পীর :’ছবির নেশার আমার কাব্যের উপর কিছু উৎপাত বাধিয়েচে। অধিক বয়সে তরুণী ভার্য্যায় মানুষকে অভিভূত করে এমন একটা প্রবাদ আছে। আমার প্রাচীনাটি এই তরুণীটির সঙ্গে পেরে উঠচে না।’ ওকাম্পোর লেখায় সেই নেশার আদি-মুহূর্তের বিবরণ রয়েছে। ওকাম্পো লিখেছেন (গণেশ পাইনের সুবাদে সে তথ্য তুলে দিচ্ছি)-

‘ওঁর একটি ছোট খাতা টেবিলে পড়ে থাকত, ওরই মধ্যে কবিতা লিখতেন …লেখার নানা কাটাকুটিকে একত্র জুড়ে দিয়ে তার উপর কলমের আঁচড় কাটতে যেন মজা পেতেন কবি। এই আঁকিবুঁকি থেকেই বেরিয়ে আসত সব রকমের মুখ, প্রাগৈতিহাসিক দানব, সরীসৃপ অথবা নানা আবোলতাবোল। …এই ছোট খাতাটিই হলো শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সূচনাপর্ব।’ পরবর্তীকালে দেশে ফিরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিজয়াকে লিখেছিলেন, ‘তুলি দিয়ে আমি ছবি আঁকব না, যে কলম দিয়ে কথার কাব্য লিখি, সেই কলমে রং এবং রেখার কাব্য লিখতে পারি কিনা, তারই একটা পরীক্ষা চালাতে চাই।’

এককথায়, রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার উন্মেষ-পর্বের সাক্ষী ছিলেন বিজয়া। যখন সত্যি সত্যি রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রকর’ হয়ে উঠলেন, তখন এই বিজয়াই সমস্ত সহায়সম্বল নিয়ে এগিয়ে এলেন। আর্জেন্টিনায় যে দু’মাস ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া সব খরচ চালিয়ে ছিলেন ওকাম্পো। এজন্যে তাকে তার মহা মূল্যবান হিরের আংটিটি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। ১৯৩০ সালে প্যারিসে কবির চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করার জন্য শুধু সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে ছুটে আসাই নয়, তাকে অনেক অর্থ-ব্যয়ও করতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এই মর্মে :’ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত, তাহলে ছবি ভালোই হোক মন্দই হোক কারও চোখে পড়ত না। একদিন রথী ভেবেছিল, ঘর পেলে ছবির প্রদর্শনী আপনি ঘটে- অত্যন্ত ভুল। …ভিক্তোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্ছে। এখানকার গুণীজ্ঞানীদের ও জানে- ডাক দিলেই তারা আসে।’ ওকাম্পো ‘ডাক দিলেই’ প্যারিসের এলিট বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকেরা ‘ছুটে আসে’- এই একটি কথার মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিলেন বিজয়ার আকর্ষণী বিদূষী সত্ত্বাকে।

প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ২ মে। ১২৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল তাতে। এর সমস্ত আয়োজন/ ব্যবস্থা করেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। শুধু রবীন্দ্রনাথের ডাকেই এটা করেছিলেন তিনি। অন্য কোনো কারণে আসেননি। আর্জেন্টিনা থেকে শুধু একটা প্রদর্শনী আয়োজন করার জন্যই তিনি সেবার প্যারিসে এসেছিলেন। ওটা অ্যারোপ্লেন-যুগের আগের কথা, এ কথাও মনে রাখতে হবে। একে যদি আমরা গাঢ় প্রেমের চিহ্ন হিসেবে না দেখি, তাহলে ‘প্রেম’ কাকে বলব? রবীন্দ্রনাথ প্যারিস ছেড়ে যান ১১ মে। প্যারিসের গ্যার দ্যু পর্দ রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শেষবারের মতো তার দেখা হয়েছিল ভিক্টোরিয়ার সাথে। এর ঠিক চার মাসের মাথায় রবীন্দ্রনাথ (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩০) যাবেন বিপ্লব-উত্তর রাশিয়া দেখতে। ভিক্টোরিয়া ফিরে যাবেন বুয়েনস এয়ার্সে। কিন্তু অপ্রত্যক্ষে থেকেও দু’জনের মধ্যে পত্রালাপ ও মৌনালাপ আমৃত্যু চলতেই থাকবে। দু’তরফ থেকেই দেখা এর সম্পূর্ণ চিত্র অবশ্য এখনও আমরা পাইনি।

কুই ব্রানলি মিউজিয়ামে আফ্রিকা, পলিনেশিয়া, ওশেনিয়া, লাতিন আমেরিকার আজটেক, মায়া, ইনকা, বৃহত্তর অর্থে তৃতীয় বিশ্বের আদিবাসী সংস্কৃতির প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্ট দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছিল, ‘আধুনিকতার’ পেছনে ‘অনাধুনিকের’ একটি বড় ধরনের অবদান রয়ে গেছে। এটা চেঁচিয়ে চলা দরকার। এই ‘অবদান’ যেমন পাই পাশ্চাত্যের সেজান-পরবর্তী পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট, কিউবিস্ট, এক্সপ্রেশনিস্ট ও বিমূর্ত চিত্রকলায়, তেমনি পাই এই ভূভাগের বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায়। শিল্প-সমালোচক আনন্দ কুমারস্বামী সঠিকভাবেই এর কুললক্ষণ শনাক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলো হচ্ছে, ‘genuine examples of modern primitive art.’ পক্ষান্তরে, ইউরোপের প্রিমিটিভ আর্টের আধুনিক অনুসারীরা বরং ‘More calculated primitivisms, archaisms, and pseudo-barbarisms’-র নিদর্শনই তুলে ধরেছেন। কথাটায় হয়তো অতিশয়োক্তি রয়েছে। পিকাসো, মাতিস, মদিলিয়ানি, নোল্‌দে, ক্লি, ক্রিশ্‌নের বা মিরো প্রিমিটিভিজমের সিরিয়াস চর্চাই করেছেন এবং আধুনিক শিল্পকলায় নবধারার বিপ্লবের সূচনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের কাজের গুরুত্বকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তিনি কোনো ভুল বা ‘বিভ্রান্তিকর’ (কথাটা ডাইসন-অধিকারীর) ব্যাখ্যা দিয়ে যাননি। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক প্রিমিটিভ ‘ছবির রবীন্দ্রনাথ’ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলার ‘ফর্মাল’ অনুশীলন না করেই কী করে আঁকার জগতে প্রবেশ করতে পারলেন? এর উত্তর কিছুটা মেলে শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কথায় :’আমাদের দেশে মডার্ন যে এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, সেটা গুরুদেবই করছেন। একটা লোকের ভেতরে যদি চরম সেন্স অব রিজন, মিউজিক, কালার থাকে তার অ্যাকাডেমিক ট্রেনিং দরকার হয় না।’ তবে প্রথাগত অনুশীলন না থাকলেও ইউরোপের সর্বাধুনিক চিত্রকলার প্রতিলিপি তিনি সংগ্রহ করে দেখতেন; রোদ্যাঁর সাথে তিনি দেখা করেছেন, কান্ডিনস্কি ও বাউহাউস স্কুলের প্রদর্শনী স্বচক্ষে দেখেছেন; Kathe Kollwitz-র মতো শিল্পীরা তার সাথে দেখা করেছেন এবং তার সাথে ছবির ভাবনার বিনিময় করেছেন। পঞ্চাশে নোবেল-প্রাপ্তির পরে সত্তরে তার চিত্রকর্মই ছিল রবীন্দ্রনাথের- তার ভাষাতেই বলছি- ‘শেষ কীর্ত্তি’। এই সৃষ্টিসম্ভারকে তার নিজের দেশে অনেকেই বুঝতে পারেনি সে সময়ে; বিদেশেও অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। যেমন, আমেরিকায়, যেখানে তখন পর্যন্ত কিউবিস্ট বা এক্সপ্রেশনিস্ট আর্ট সমাদৃত হতে শুরু করেনি। আমেরিকায় ছবির রাজ্যে বিপ্লব ঘটবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে। তখন জ্যাকসন পোলককে কেন্দ্র করে বেরিয়ে আসবে একঝাঁক নতুন প্রজন্মের শিল্পী- জন্ম হবে আর্টের আরেক নবধারা, যার নাম দেওয়া হবে ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’। সর্বাধুনিক রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হয়তো বুঝতে পেরেছিল ফ্রান্স, কিছুটা পরিমাণে জার্মানি ও রাশিয়া (হ্যাঁ, মালেভিচ-লিসিৎস্কি-শাগাল-ওসিপা জাদকিনের রাশিয়া)। আমেরিকা তখনও ইউরোপের তুলনায় শিল্পকলার রুচিতে অনেক পিছিয়ে। কবি পল ভ্যালেরি প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী দেখে বলেছিলেন, ‘ইওর পিকচার্স উইল বি অ্যা লেসন টু আওয়ার আর্টিস্টস্‌’। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার ছবিতে যাদের অনীহা, সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিরুদ্ধতার কারণে নয়, নিতান্তই ‘চিত্রদর্শনের অভিজ্ঞতার’ অভাবের কারণে। আর সে কারণেই বলতে পেরেছিলেন যে, ‘সে জন্য এ দেশে আমাদের রচনা অনেকদিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে।’ হয়তো ‘আমার মৃত্যুর পর ওর (রবীন্দ্রনাথের ছবির) আবরণ মোচন করো- তখন ওর মূল্য হবে ঐতিহাসিক দিক থেকে।’ উপমহাদেশের আধুনিকতম চিত্রকলার একজন পুরোধা শিল্পী গণেশ পাইন রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্পর্কে বলেছেন, তার ছবি এতই একক ও স্বয়ম্ভু, এ দিয়ে ‘কোনো ঘরানা আপাতত তৈরি করা যায়নি।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘কেউ যদি তার ছবি দেখে বলতেন সুন্দর হয়েছে, তৎক্ষণাৎ সেই ছবির উপর কালি ঢেলে দিতেন তিনি এবং সেই অন্ধকারের মধ্যেই সন্ধান করতেন তার ‘সুন্দর’-এর।’ ঠিক প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের নাম-না-জানা অগণিত শিল্পীর মতো। নিজেকে তিনি কখনও কখনও বলেছেন এক ‘আজগুবি ছবি-আঁকিয়ে’ বলে। কিন্তু আমরা তো এখন বুঝতে পারি ধারাবাহিকভাবে খাপছাড়া ও আজগুবি ছবি এঁকে যাওয়া কত কঠিন। অবনীন্দ্রনাথ এদিকটি বুঝতে হয়তো ভুলই করেছেন। নইলে তিনি রানী চন্দকে বলবেন কেন- ‘একটা ঢেউ উঠেছে, প্রিমিটিভ, ক্রুড, এই সব আঁকতে হবে। তাতে কী আছে, না, ‘স্ট্রেংথ’ আছে। সেটা ভুল। প্রকৃতিতে তো তা নেই। …একটা জিনিস যখন অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকে, সেটাকেই বলে ক্রুড। …’স্ট্রেংথ’ থাকবে ভিতরে, কিন্তু বাইরে থাকবে সৌন্দর্যের আবরণ।’ ট্রকাদেরো মিউজিয়ামে গ্রেবো মূর্তির মধ্যে যে ম্যাজিক, যে সম্মোহনের প্রভা দেখেছিলেন পিকাসো, সেটিই আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মে। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী দেখার পর চিত্রকর আঁদ্রে কার্পেলেসের কথায় পিকাসোর বিস্ময়-বিমুগ্ধ অভিজ্ঞতারই অনুরণন পাই। কার্পেলেস প্যারিস-প্রদর্শনীটির ছবিগুলো দেখে রথীন্দ্রনাথকে যা লিখেছিলেন, তা সম্পূর্ণ উদ্ৃব্দতির দাবি করে:

‘They are far beyond what I expected and dreamt ofÑ You are rightÑ RothiÑ It is some thing newÑ uniqueÑ grandÑ Not only will they be a treat for the admirers but they will be the bestÑ long awaited lesson for the western artists. What they have been looking for, struggling for, what they have failed to expressÑ (because abstraction needs genius to find the means of making it tangible) [Tagore] has attained it in one unique flight. His pictures have the freshness, the mysterious strength of the early primitive expressions of art …They are modern bccause they bring the message of something entirely original.’

প্রিমিটিভ কিন্তু মডার্ন, পুরাতনী কিন্তু সাম্প্রতিক- এই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের অর্ধচেতন অবচেতন সচেতন আঁকিবুঁকি থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত স্ব-উদ্ভাবিত চিত্রকলা।

[এই বিষয় সমাপ্ত]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৫
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

‘জার্মান এক্সপ্রেশনিজম :প্রিমিটিভিজম অ্যান্ড মডার্নিটি’ বইয়ের লেখক জিল লয়েড এ বিষয়ে লিখেছেন যে জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের ওপরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল অজন্তার গুহাচিত্র :
‘Once again a composite notion of the ‘primitive’ emerges, and it is difficult to distinguish between the exotic and ‘Gothic’ stimuli. For example, the characteristic combination of green and purple that Kirchner began to use at this date is usually associated with the colour illustrations of the Ajanta temple paintings he knew from the Dresden library.’

রবীন্দ্রনাথ এই ‘প্রিমিটিভ’ ও ‘মডার্ন’-এর মধ্যকার প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি এই উপমহাদেশের চিত্রকরদের মধ্যে সর্বপ্রথম অনুভব করেছিলেন। সমালোচকেরা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের নানা ছবির অদ্ভুত জীবজন্তুর সমাবেশ শুধু অন্যমনস্ক আঁকিবুঁকি (doodles) থেকে উৎসারিত হয়নি। উদাহরণত, তার ২২৩২-সংখ্যক ছবিটির সাথে তুলনীয় হয়েছে পল ক্লি-র ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিটি। এই বিশেষ ছবিটি যখন ১৯৩০-এ প্যারিসে প্রদর্শিত হয়, তখন ব্যাখ্যা হিসেবে তাতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘I have searched out the cave of the primitive/ in my mind/ with its etchings of animals.’ পরে কবি নিজেই দিয়েছেন এর বাংলা তর্জমা :’বিস্মৃত যুগে গুহাবাসীদের মন/ যে ছবি লিখিত ভিত্তির কোণে/ অবসরকালে বিনা প্রয়োজনে/ সেই ছবি আমি আপনার মনে/ করেছি অন্বেষণ।’ রবীন্দ্রনাথের ‘প্রিমিটিভ’ মনের প্রকাশ পাওয়া যায় ‘খাপছাড়া’ গ্রন্থে তার বিচিত্রবিধ ড্রইং-এর ভেতরেও। কাইয়ুম চৌধুরীও লিখেছেন, “পল ক্লির কলমে করা ড্রইংয়ের ছায়া ‘খাপছাড়া’ ও সে বইয়ের ইলাস্ট্রেশনে দেখতে পাওয়া যায়।”

আগেই বলেছি, চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ যেদিকে পা ফেলেছিলেন তা তার নিজ দেশের সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে বা শিল্পরসিক মহলে তেমন একটা নাড়া দিতে পারেনি। এদিক থেকেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিঃসঙ্গ শিল্পী। বিদেশেও তার বন্ধুদের অনেকেই এই নব্যধারার শিল্পকলার জগতের সাথে সম্যক পরিচিত ছিলেন না। এমনকি রোমাঁ রোলাঁ বা রোটেনস্টাইনের মতো রবি-ঘনিষ্ঠ প্রাচীনপন্থিরা। এখানেও তার নির্জনতা চোখে পড়ার মতো (ব্যতিক্রমদের মধ্যে ছিলেন পল ভালেরি বা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মতো ব্যক্তিত্বরা- সে প্রসঙ্গে একটু পরেই আসছি)। তার চিত্রকর্মকে ধৈর্য ধরে বোঝার চেষ্টা ছিল না প্রায় সমসামরিক কারও মধ্যেই- বিশেষত এ দেশে। প্রগতি-কল্লোল-পরিচয় যুগের আধুনিক কবিদের সাথে গদ্যকবিতা ও এলিয়ট নিয়ে তার যা-ও বা এক ধরনের সংলাপ বা বিতর্ক হচ্ছিল, চিত্রকলায় তিনি ছিলেন তার স্বদেশে প্রায় নির্বাসিত। ছবি আঁকাকে নিতান্ত কবির খামখেয়ালিপনা বলে মনে করা হতো। এ নিয়ে তার কিছু ক্ষোভও ছিল। থাকাটাই স্বাভাবিক। ১৯২২ সালে কলকাতায় সাম্প্রতিক ইউরোপীয় চিত্রকলার- বিশেষত ‘বাউহাউস’ স্কুলের এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকর্মের যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়- তার প্রধান প্ররোচনা ও উৎসাহ এসেছিল রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকেই এ কথা এখন অনায়াসে বলা চলে। এ তথ্যও রয়েছে যে, ‘রবীন্দ্রনাথ নাকি শান্তিনিকেতনে বাউহাউস একটি শাখাও খুলতে চেয়েছিলেন।’ এই কলকাতা প্রদর্শনীর জন্য ‘বাউহাউস কর্তৃপক্ষ’ যেসব ছবি পাঠিয়েছিল তার মধ্যে ছিল অসাধারণ সব নাম :’পল ক্লির নয়টি জলরং, কান্ডিনস্কির চারটি জলরং, ফাইনিঙ্গারের উনিশটি ড্রইং ও ষোলোটি উডকাট, এটেনের তেইশটি ড্রইং, গেরহার্দ মার্কসের বিশটি জলরং, জর্জ ম্যুচের নয়টি এচিং, লোথার স্ট্ক্রেয়ারের সাতটি ছাপাই ছবি, সোফিয়ে কর্নারের দুটি জলরং, মাগ্রিট টেরি এডলারের কিছু কাজ প্রভৃতি।’ সুশোভন অধিকারী আরও জানিয়েছেন যে, ‘স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাকি পল ক্লি ও কান্ডিনস্কির একটি করে ছবি কিনেছিলেন।’ দুঃখের বিষয়, এ প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বাউহাউস কর্তৃপক্ষ উপরোক্ত কোনো একটি ছবিও ফেরত পায়নি! এমনকি, রবীন্দ্রনাথের ইতোপূর্বে ক্রয় করা ক্লি ও কান্ডিনস্কির ছবি দুটোরও কোনো হদিস মেলেনি। এত সবকিছুর পরও সমসাময়িক উপমহাদেশের চিত্রকলার ওপরে বাউহাউস প্রদর্শনীর প্রভাব খুব সামান্যই পড়েছিল, বা পড়ে থাকলেও তার প্রতিঘাত ভারতীয় চিত্রকলায় সঞ্চারিত হয়েছিল খুবই সন্তর্পণে। এটাও রবীন্দ্রনাথকে বিমর্ষ করে থাকবে। পরের আট বছরে কবি নিজেই যখন সর্বাধুনিক ধরনে ছবি আঁকতে লেগে গেলেন, সেটা নিয়েও উপর-ভাসা মন্তব্য ছাড়া কোনো গভীর সমাদরের আভাস পাই না আমরা। কাকা রবীন্দ্রনাথের ছবি প্রসঙ্গে শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় বলেছিলেন, ‘ওগুলো ছবি নয়, যেন অগ্নিগিরির অগ্ন্যুৎসার।’ এ থেকে রবীন্দ্রনাথের ছবির কোনো মূল্যায়ন বুঝতে পারি না আমরা। গণেশ পাইন বলেছেন, ‘স্বদেশ তার চিত্রাবলীকে তাঁর ঈপ্সিত অভ্যর্থনা দেয়নি।’ এর একটা কারণ হতে পারে, আমাদের দেশে পাশ্চাত্যের আধুনিক ও সাম্প্রতিক চিত্রকলা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিচয় না থাকা। রবীন্দ্রনাথের সেটা ছিল। গণেশ পাইন লিখেছেন, ‘পশ্চিমি নব্য শিল্পের নানা ধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল, এ কথা আমরা জানি। …বহুবার গেছেন প্রতীচীর শিল্পতীর্থ পারী নগরীতে …নানা প্রদর্শশালায় দেখেছেন …ইম্প্রেশনিস্ট, পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট, আর অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট।’ ১৯২৫-এ সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথ লিখতে পেরেছেন, ‘য়ুরোপে আজকাল চিত্রকলার ইতিহাসে একটা বিপ্লব এসেছে। …আধুনিক কলারসজ্ঞ মানুষ বলছেন, আদিকালের মানুষ তার অশিক্ষিত পটুত্বে বিরলরেখায় যে রকম সাদাসিধে ছবি আঁকত, ছবির সেই গোড়াকার ছাঁদের মধ্যে ফিরে না গেলে এই অবান্তরভারপীড়িত আর্টের উদ্ধার নেই।’ অর্থাৎ প্রিমিটিভ আর্টের প্রতারক সরলতার মধ্যে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আধুনিক শিল্পকলার ‘মুক্তি নেই’। এই উপলব্ধি যেমন সাম্প্রতিক শিল্পকলার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরলরেখার ‘মিনিমালিজমে’ ফিরে তাকানোও সমানভাবে দরকার ছিল।

রবীন্দ্রনাথ হুয়ান মিরোর (Joan Miro) মিনিমালিস্ট ও শিশু সারল্যে ভরা ছবিগুলো দেখেছিলেন কিনা আমরা জানি না। প্যারিসে অবশ্য মিরোর নামাঙ্কিত বাগানে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষমূর্তি পরবর্তীতে স্থাপিত হয়েছে। মিরোর মতই ছবির সেই ‘গোড়াকার ছাঁদের’ দিকে ফিরে যাওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা ছিল তার মধ্যে। কিন্তু এর যোগ্য সমাদর মেলেনি তার দৈশিক পরিপার্শ্বের কাছ থেকে। কলকাতায় তার ছবির প্রথম প্রদর্শনী সমসাময়িকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘তিনসঙ্গী’র অভীক চরিত্রটি এ নিয়ে খেদোক্তি করেছে :’আমি যে আর্টিস্ট এ পরিচয়ে তোমাদের একটুও শ্রদ্ধা নেই। এ আমার চিরদুঃখের কথা। আমি নিশ্চিত করে জানি, একদিন সেই রসজ্ঞ দেশের গুণী লোকেরা আমাকে স্বীকার করে নেবে, যাদের স্বীকৃতির খাঁটি মূল্য আছে।’ শুধু উপন্যাসের মাধ্যমে নয়, এ কথা পত্রালাপেও জানিয়েছেন। প্যারিসে চিত্র-প্রদর্শনীর বছরেই কবি নিজেই এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন নির্মলাকুমারী (রানী) মহলানবিশকে। প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ ও অর্থনীতিবিদ (পরবর্তীতে নেহরুর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ‘আর্কিটেক্ট’) প্রশান্তচন্দ মহলানবিশ-এর সহধর্মিণী বলে নয়, তার নিজস্ব মননশীলতার কারণেই রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় পাত্রী ছিলেন নির্মলাকুমারী। ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসের এই চিঠিতে কবি জানাচ্ছেন :’জর্মনিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতটা আশা করি তোমরা বোঝো। …আমার দেশের সঙ্গে আমার চিত্রভারতীর সম্বন্ধ নেই বলে মনে হয়। …ছবি যখন আঁকি তখন রেখা বলো রঙ বলো কোনো বিশেষ প্রদেশের পরিচয় নিয়ে আসে না। অতএব, এ জিনিসটা যারা পছন্দ করে তাদেরই, আমি বাঙ্গালি বলে এটা আপন হতেই বাঙ্গালির জিনিস নয়। এই জন্যে স্বতঃই এই ছবিগুলিকে আমি পশ্চিমের হাতে দান করেছি। …আমি যে শতকরা একশো হারে বাঙ্গালি নই, আমি যে সমান পরিমাণে য়ুরোপেরও, এই কথাটারই প্রমাণ হোক আমার ছবি দিয়ে।’ শেষের লাইনটি লক্ষ্য করার মতো। এই কথা শতভাগ খাটে শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, অমর্ত্য সেন, রণজিৎ গুহসহ সব প্রাগ্রসর বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রে। এদেরকে কোনো ‘জাতীয়তাবাদী’ কালো বাক্সে বন্দি করা যাবে না।

এই একই কথা বলেছেন ১৯৩০ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্তকেও। জার্মানিতে তার ছবিগুলো দেখে সবাই খুব প্রশংসা করেছে, অথচ দেশে সেগুলো গুরুত্ব পায়নি :’আশা হচ্ছে এগুলো রসিকের দৃষ্টিগোচর হবে। পণ করেচি “আমার জন্মভূমিতে” ফিরিয়ে নিয়ে যাব না- অযোগ্য অভাজনদের স্থূল হস্তাবলেপ অসহ্য হয়ে এসেচে।’ ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন নিজের ছবি সম্পর্কে- বিদেশের মাটিতেই ছবিগুলো রেখে দিতে চান :’আমার পরম সৌভাগ্য এই যে আমাদের নিজপারের ঘাট পেরিয়ে এসেচি। আমার এই শেষ কীর্ত্তি এই দেশেই রেখে যাব।’ রানী মহলানবিশকে এমনভাবে বলেছেন যেন এ বিষয়ে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন :’আমার ছবিগুলোকে স্বদেশে কদাচ নিয়ে যাব না- পশ্চিম সাগরের পারে সমস্ত উজাড় করে দিয়ে তবে ফিরব।’ ততদিনে চিত্রকলা যে তার ‘শেষ কীর্ত্তি’ সেটা আমাদের জানা হয়ে গেছে। এর কারণও লিখেছেন- ‘যাই হোক ইন্ডিয়ান আর্ট যাকে বলে সেটা আমার আনাড়ি কলমে প্রকাশ পায়নি’, অর্থাৎ প্রথাগত ভারতীয় চিত্রকলা বলতে যে ‘রিয়ালিস্টিক’ ধরনের শিল্পকর্ম বোঝানো হয়ে থাকে (রবি বর্মা যার বড় উদাহরণ ছিলেন উনিশ শতকের শেষ ভাগে), সে রকম আদৌ নয় রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম। বা অবনীন্দ্রনাথ-নন্দলাল প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল স্কুলের’ আর্টের ধারাতেও তিনি নেই। আর সেজন্যেই এটা হয়তো পাশ্চাত্যের রসজ্ঞ মহলে বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু হতে পারে। ফ্রান্সে তার ছবির প্রদর্শনী নিয়ে ইন্দিরা দেবীকে ২৭ মে ১৯৩০ তারিখে লিখেছেন, ‘ফ্রান্সের মত কড়া হাকিমের দরবারেও শিরোপা মিলেচে- কিছুমাত্র কার্পণ্য করেনি’, আর জার্মানিতো তার দ্বার খুলে দিয়েছে বার্লিনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের ছবি কিনে। এজন্যেই রানী মহলানবিশকে লেখা ১৮ আগস্ট ১৯৩০-এর চিঠিতে চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ বলতে দ্বিধা করেননি যে ‘এই যাত্রায় আগেরবারের চেয়ে জর্মনির অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে আমার প্রবেশাধিকার ঘটেছে। ওদের কাছাকাছি এসেছি।’ ১৯১৬ সালে কবি তার কন্যা মীরা দেবীকে লিখেছিলেন, ‘চিত্রবিদ্যা ত আমার বিদ্যা নয়, যদি তা হত তাহলে একবার দেখাতুম আমি কি করতে পারতুম।’ শেষ পর্যন্ত উক্ত চিঠি লেখার ১৪ বছরের মধ্যেই তিনি দেখিয়ে ছেড়েছিলেন যে চিত্রকলার শাখাতেও তিনি কতটা স্বতন্ত্র, মৌলিক এবং সর্বাধুনিক হতে পারেন।

এ সবকিছুই অবশ্য হতো না যদি তিনি ঠিক সময়ে তার আর্জেন্টিনার ‘বিজয়া’ তথা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সমর্থন ও সহায়তা না পেতেন। ‘প্যারিস ১৯৩০’ মানেই ওকাম্পো ও রবীন্দ্রনাথের প্যারিস- এটা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। এই গল্পের বীজ বোনা হয়েছিল আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এয়ার্সের অদূরের সাবার্বে সান-ইসিদ্রার এক নির্জন প্রাসাদোপম বাড়িতে (প্রায় দুই মাস ছিলেন কবি যেখানে ভিক্টোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে)। তখন বিজয়ার বয়স ৩৪, রবীন্দ্রনাথের বয়স ৬৩। এই সাক্ষাৎ-এর কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছিল।

[ক্রমশ]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৪
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

৫. ১৯৩০ : রবীন্দ্রনাথ ও প্যারিস

একথা এখন সকলেরই জানা যে, রবীন্দ্রনাথই ছিলেন এই উপমহাদেশের চিত্রকলার জগতে প্রথম ‘আধুনিক ধারার’ চিত্রশিল্পী। আর প্যারিসেই তার চিত্রকর্মের প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৩০ সালের মে মাসে। এর আগের এক দশকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। শুধু নিজেই যে এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন তা-ই নয়, ১৯২২ সালে (জার্মানী থেকে প্রত্যাবর্তনের এক বছর বাদে) কলকাতায় ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট (ISOA)-এর উদ্যোগে জার্মানির অত্যাধুনিক Bauhaus ধারার চিত্রকর্মের এক অভিনব প্রদর্শনীরও আয়োজন হয় তারই উদ্যোগে (যদিও এ নিয়ে প্রশান্ত কুমার পাল evidence-র দুর্বলতার প্রশ্ন তুলেছেন)। ‘বাউ হাউস’ শব্দটি জার্মান-এর আক্ষরিক অর্থ ‘বিল্ডিং হাউস’; অন্যভাবে বললে ‘স্থাপত্য-ভবন’। এই আন্দোলনের সাথে পল ক্লী Klee বা ক্লে), কান্ডিনস্কি, রুশ ‘কনস্ট্রাকটিভিস্ট’ আর্টিস্ট লিসিৎস্কি (Lissitzky),De Stijl (মানে ‘স্টাইল’) আন্দোলনের ডাচ পেইন্টার Thea van Doesburg, অস্ট্রিয়ার ককশকা (Osker Kokoschka) প্রমুখ জড়িত ছিলেন। ক্লী-কান্ডিনস্কির চিত্রকর্ম রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে (এবং প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়) প্রদর্শিত হলো ১৯২২ সালে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে কলকাতায়- ভাবা যায়? আজ যদি ঢাকায় কেউ ফ্রাঙ্ক স্টেলা (frank stella), রিচার্ড ডিবেনকর্ন (Diebonkorn), পিটার ব্লেইক (Blake), গেরহার্ড রিখটার (Richter), ডেভিড হকনি (Hockney), হাওয়ার্ড হচকিন (Hodgkin), বাংক্‌সি (Banksy), ইয়োশিটমো নারা (Yoshitomo Nara), কুসামা (Yayai Kusama), জুলিয়ান ওপি (opie), বারবারা রে (Rae) প্রমুখের চিত্রকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, তাহলে রবীন্দ্রনাথের সেদিনের আয়োজনের তাৎপর্য কিছুটা হলেও বোঝা যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে এই তাগিদ দেখা দিয়েছিল কেন? মানুষের মধ্যকার নানা সত্ত্বার মতো রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও নানা রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল। থাকাটাই স্বাভাবিক। সেখানে যেমন গীতাঞ্জলির জীবনদেবতা ছিল; লালনের মনের মানুষ ছিল; তেমনি ছিল পদ্মাপাড়ের বৃত্তান্ত, তার ছোট ছোট দুঃখ-কথা। সেভাবেই ছিল স্বদেশি যুগের গোরা; ঘরে-বাইরের বিমলা-নিখিলেশ-সন্দ্বীপ। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের পক্ষে এক সময় অবস্থান নিলেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন ‘ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধমালায়। Nation-র Mythology নির্মাণ করতে চাননি তিনি। যেটা বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট সচেতন বা অসচেতনভাবে করে চলেছিল। যে দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি গান্ধীর চরকা ও অসহযোগ আন্দোলনকে ‘ক্রিটিক’ করেছিলেন, সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি বেঙ্গল স্কুলের Neo-traditionalism কে আঘাত করলেন সর্বাধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলার আফ্রিকা-প্রভাবিত প্রিমিটিভিস্ট ও এক্সপ্রেশনিস্ট আর্টের প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কেবল তার নিজের দেশের ও কাছের ভুবনের চিত্রশিল্পীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। তাতেও যখন কাজ হলো না, তখন রং-তুলি ধরলেন তিনি নিজেই। ১৯৩০ সালে ফ্রান্সে তার চিত্র-প্রদর্শনীতে এসে কবি ও শিল্প-সমালোচক পল ভালেরী রবীন্দ্রনাথের এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকলা দেখে হতবাক হয়েছিলেন। জার্মানিতেও যেসব শহরে প্রদর্শনী হয়েছে, সেখানেই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক কৌতূহলের গণ্ডি ছাড়িয়ে যারপরনাই বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে। এই ভূভাগের আধুনিক ও সাম্প্রতিক চিত্রকলার জনক আসলে আর কেউ নন- রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। আধুনিক চিত্রকলার চারিত্র নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাধিকবার তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। যেমন, প্রশান্ত কুমার পাল তার রবিজীবনীর ৮ম খণ্ডে জানিয়েছেন যে, কবি শিল্প-কলায় সহজ-সরল রিয়ালিস্ট ধারার অনুকৃতিকে পছন্দ করতেন না। তার বরং আগ্রহ ছিল আকৃতি ও গঠনের ভাঙচুর, অর্থাৎ ফর্মের ডি-কনস্ট্রাকশনের প্রতি। যেটি সেজান-পরবর্তী আধুনিক চিত্রকলার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যটি গুরুদাস মল্লিক লিপিবদ্ধ করেছেন ও প্রশান্ত কুমার পাল তা হুবহু তুলে ধরেছেন। শিল্পকলা বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় কবি বললেন : ‘আর্ট অসীমের প্রকাশ; রূপ অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেইটিই যেন শেষ লক্ষ্য না হয়। নিরাকারের আভাস দেবে সে, তার ব্যতিক্রম প্রতারণা মাত্র।’- ‘Was art an expression,- accurate or artistic,- only of pleasure or pain, of an happening, historical or otherwise? No, it should ever express the infinite, revealed through either of these elements. A realistic portrayal of these could be called skill or decoration, but not art.’ এর থেকেই বোঝা যায় যে, অবনীন্দ্রনাথ নন্দলালের সনাতনী রিপ্রেজেন্টেশনাল আর্ট-কেন্দ্রিক শিল্প-চিন্তার বিপরীতে ১৯২২ সালেই রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলা নিয়ে কতটা প্রাগ্রসর চিন্তা-ভাবনা করতেন। আবারও বলছি, রবীন্দ্রনাথই এই ভূভাগ থেকে উত্থিত প্রথম সচেতনভাবে ইউরোপীয় অর্থে ‘আধুনিক’ ধারার চিত্রকর। প্রিমিটিভ ও এক্সপ্রেশনিস্ট আর্টের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৮২ সালে টেট গ্যালারিতে যে ৬ জন উপমহাদেশের চিত্রশিল্পী নিয়ে পুরোধা ব্রিটিশ চিত্রকর ও শিল্পী ভূপেন খাকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হাওয়ার্ড হচকিন চিত্র-প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন তার মধ্যে প্রথমেই এসেছিল রবীন্দ্রনাথের নাম। সেটা তার কবিখ্যাতির জন্যে নয়, প্রধানত তার মৌলিক চিত্রকর্মের স্বীকৃতিদানের তাগিদে।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে এখানে নতুন করে কিছু যোগ করার নেই। এ নিয়ে নানা গুণীজন ইতোপূর্বে আলোচনা করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, বিনোদবিহারী, রামকিংকর, যামিনী রায় এরা রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে লিখেছেন, মন্তব্য করেছেন- তার কোনোটি হয়তো চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের কোনো বিশেষ দিক তুলে ধরে, কোনোটি হয়তো তর্কসাপেক্ষ পর্যালোচনা। চলচ্চিত্রকার ও চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায় যেমন আগেই বলে গেছেন রবীন্দ্রনাথের ছবির মৌলিকত্বের কথা। তিনি বলেছেন, ‘It is important to stress that he was uninfluenced by any painter, eastern or western.’ এটা কিছুটা বাড়িয়েই বলা। কেননা, আমরা একটু পরেই দেখব যে প্রভাব এসে পড়েছিল নানা সূত্র থেকেই।

আমি বিশেষ করে উল্লেখ করব গণেশ পাইন-এর ‘শিল্পীর দৃষ্টিতে রবীন্দ্র-চিত্রকলা’, সত্যজিৎ চৌধুরীর ‘চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ’, কাইয়ুম চৌধুরীর ‘রবিতীর্থে’, সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিত্রী রবীন্দ্রনাথ :অনাগত কালের আগামবার্তা’, আবুল মনসুরের ‘রবীন্দ্রনাথ-চিত্রশিল্পী-কলাভবন পরম্পরার সম্পর্কসূত্র’, আলী আনোয়ারের ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রমালার ল্যাবিরিন্‌থ’, আনা ইসলামের ‘প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ’, সুশোভন অধিকারীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাউহাউস :কিছু চেনা, কিছু অচেনা খবর’ শীর্ষক প্রবন্ধ এবং অতি-আবশ্যিকভাবে কেতকী কুশারী ডাইসন ও সুশোভন অধিকারীর ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর মতো মৌলিক গবেষণা-গ্রন্থ। শেষোক্ত গ্রন্থের বিতর্কিত মন্তব্য (‘লাল রংটা রবীন্দ্রনাথের চোখে ঠিকমতো ধরা দিত না’) সত্ত্বেও এর উল্লেখ করেছি, কেননা এটি তথ্যে ঠাসা একটি গবেষণা কাজ। আমি শুধু বর্তমান আলোচনার মূল বিষয়বস্তু- আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলার ওপরে প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের প্রভাব-এর সঙ্গে সংগতি রেখে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের প্রতিফলন নিয়ে কিছু মন্তব্য করব। প্যারিসের কুই ব্রানলি মিউজিয়ামে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার এই অজানা দিকটির প্রতি আমি সজাগ হয়ে উঠি।

রবীন্দ্রনাথ যে জার্মান শিল্পী এমিল নোল্ডে (Nolde)-এর এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকলায় বিমোহিত হয়েছিলেন এবং তার অনেক চিত্রকর্মের মধ্যে নোল্ডের প্রভাব অনুভব করা যায়- এটি নানাজনের সাক্ষ্য থেকেই বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু নোল্ডে নিজে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কার থেকে বা কোন উৎস থেকে? এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা নজরে পড়ে তা হলো নোল্ডে (বা নোল্‌দে)-এর ছবিতে মুখ ও মুখোশের প্রবল উপস্থিতি, যা রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মেও দেখা যায়। এ নিয়ে ডাইসন-অধিকারী তাদের বইতে লিখেছেন :’নোল্‌দের ছবির সঙ্গে [রবীন্দ্রনাথের] যে কিছু পরিচয় ছিল- অন্তত বইপত্রে প্রতিলিপির মাধ্যমে- তা সন্দেহাতীত। জার্মানিতে ভ্রমণকালে [রবীন্দ্রনাথ] কিছু মূল ছবি দেখেছিলেন এমন অনুমান করাও অসংগত নয়। ফর্মে ও থিমে নোল্‌দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এমন কিছু চমকপ্রদ মিল লক্ষ্য করা যায়, যা থেকে মনে হয় নোল্‌দের কিছু ছবি তিনি রীতিমতো স্টাডি করেছিলেন।’ কিন্তু নোল্‌দে কার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন? ডাইসন-অধিকারী ইঙ্গিত করেছেন প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীদের প্রতি। সেটা যেমন মুখের (বা Head-স্টাডি করার) ক্ষেত্রে, তেমনি মুখের সম্প্রসারণে মুখোশের (বা Mask-স্টাডি করার) ক্ষেত্রে। পুরো উদ্ৃব্দতিটি এখানে তুলে দেওয়া প্রাসঙ্গিক হবে :

“মুখের প্রসঙ্গে আরও দেখতে পাই, নোল্‌দের প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ থেকে এমন কতগুলি মনোক্রোমধর্মী স্কেচ জন্ম নেয়, যাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শেষ দিকের কালি-তুলির স্কেচের সাদৃশ্য লক্ষ্য করবার মতো। …তাঁর [১৯১৩/১৪ সালের] ‘একজন স্থানীয় আদিবাসীর মাথা’ বা ‘স্থানীয় আদিবাসী’-এর পাশাপাশি রাখা যায় রবীন্দ্রভবনের ১৯৩৬, ২৯৬৪, বা ৩৪৫০-র মতো ছবিকে। …মুখোশও দুই শিল্পীর মধ্যে একটা সাধারণ এলাকা। …রবীন্দ্রভবনের রেখাঙ্কনধর্মী ২৭৯৮, ২৮৫৪, বা ২৯২৫-সংখ্যক [ছবির] সঙ্গে তুলনীয় নোল্‌দের ১৯১১-র মুখোশভিত্তিক স্টিল লাইফগুলি।” নোল্‌দে-রবীন্দ্রনাথের মুখোশভিত্তিক ছবিগুলোও প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের সুবাদেই অনুপ্রাণিত :’পিকাসোর ছবিতে যেমন আফ্রিকান মুখোশের একটা স্টাইলাইজেশন ঘটে …নোল্‌দের এই ছবিগুলিতে তেমনটি হয় না। এই ছবিগুলিতে মুখোশগুলি প্রথমতঃ বর্ণোজ্জ্বল গ্রোটেস্ক নৃতাত্ত্বিক সামগ্রী হিসাবেই চিহ্নিত, যেন সংগ্রহশালার শো-কেসে সাজানো রয়েছে। আবার তাদের মধ্যে মানুষের মুখের ভাবের অতিরিক্ত অভিব্যক্তিও সঞ্চারিত করা হয়েছে, নাটকের মুখোশে যেমন।’ নোল্‌দের মুখোশগুলো রবীন্দ্রনাথকে আচ্ছন্ন করেছিল :নোল্‌দের ১৯১২ সালে করা ‘মানুষের মাথা’ ছবিটিতে তিনটি মাথা আঁকা হয়েছে। ‘তিন মুখে তিন রকমের রঙের প্রাধান্য’। রবীন্দ্রনাথের ২১৭৮-সংখ্যক ছবিতেও ঠিক তেমনি পাশাপাশি সাজানো তিনটি মুখোশ :’রবীন্দ্রনাথের মুখোশ-ছবিতে নোল্‌দের মতো বর্ণৌজ্জ্বল্য না পাওয়া গেলেও সারি-বাঁধা মুখোশের উপস্থিতি ভারতীয় চিত্রকলায় অভিনব। এইসব মুখোশের ঠোঁট কোথাও চাপা, কোথাও ফাঁক-করা, কোথাও বা তাদের চোখের তারা বিস্ম্ফারিত। কার্টুনঘেঁষা ভাবভঙ্গিতে এরা রবীন্দ্রচিত্রবিশ্বে এক নতুন, অদ্ভুত জগৎ রচনা করে।’
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, আফ্রিকা বা পলিনেশিয়ার প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্ট (ও আর্ট-ফর্ম) শুধু যে ব্র্যাক, মাতিস, পিকাসো, ক্লি, কিরশনের, নোল্‌দে প্রমুখকেই প্রভাবিত করেছে তা-ই নয়, এদের ছবির সুবাদে বা প্রত্যক্ষভাবে প্রিমিটিভ আর্টের প্রভাব এসে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার ক্ষেত্রেও। এই প্রভাব রবীন্দ্রনাথকে তার নিজের মতো করে ‘এক্সপ্রেশনিস্ট’ হতে সাহায্য করেছে। আমরা শুধু পাশ্চাত্যের কাছ থেকে হাত পেতে গ্রহণই করিনি, আমরাও পাশ্চাত্যকে দান করতে কার্পণ্য করিনি। এই ‘আমরা’ আসলে কারা? এই ‘আমরা’ এ যুগের (বা সে যুগের) পাশ্চাত্যের অন্ধ-অনুকরণপ্রিয় বাঙালি মধ্যবিত্ত সত্ত্বা নয়। দান এসেছিল আমাদের দেশের নিম্নবর্গ অন্ত্যজ শ্রেণির কাছ থেকেই। কিরশ্‌নের যেমন করে প্রভাবিত হয়েছিলেন অজন্তার গুহাচিত্রের নাম-না-জানা নিম্নবর্গের শিল্পীদের দ্বারা।

[ক্রমশ]

পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৪৩

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

আগেই বলেছি, মাতিসের কাছে আফ্রিকার প্রিমিটিভ ভাস্কর্যের ‘ফর্মাল’ দিকটি বেশি করে ধরা দিয়েছিল। সামঞ্জস্যহীনতা, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে স্বাভাবিক অনুপাতের ভারসাম্যকে ইচ্ছাকৃত ভেঙে ফেলা, ‘ভয়ংকর সুন্দর’কে প্রত্যক্ষ করার চেষ্টা- এসব শৈল্পিক প্রয়োগকে এক স্বাধীন স্বরাট শিল্পীসত্তার প্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন মাতিস। ‘ফর্মের স্বাধীনতা’ সব সময়ই মাতিসের কাছে একটি মুখ্য বিবেচনা ছিল। কিন্তু ট্রকাদেরো মিউজিয়াম হঠাৎই চোখে-পড়া আফ্রিকার ভাস্কর্য পিকাসোর কাছে মনে হয়েছিল রহস্যময় এক জাদুকরী শক্তির আধার হিসেবে। ভাস্কর্য ছাড়াও মুখোশও তাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। সম্ভবত সেখানে আইভরি কোস্ট বা লাইবেরিয়ার কোনো Grebo mask দেখে থাকবেন তিনি। যদিও ট্রাইবাল আর্টকে ‘কালো-কুচ্ছিৎ’ বলে কখনও কখনও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন পিকাসো, কিন্তু সব ছাপিয়ে তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এসব ভাস্কর্য ও মুখোশের ‘ম্যাজিক্যাল পাওয়ার’। জাদুকরী ক্ষমতা, মায়াবী আকর্ষণ, সম্মোহিত করার মতো শক্তি- এমন সব উচ্চারণই বেরিয়েছে পিকাসোর মুখ থেকে। এদিক থেকে মাতিসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পিকাসোর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফ্রাঁসোয়া জিলোটের সঙ্গে কথোপকথনের আড়ালে স্বীকারোক্তিতে পিকাসো সেদিন যা বলেছিলেন, তা এতই তীক্ষষ্ট ও তলদর্শী, যা আমার অক্ষম অনুবাদে নিশ্চিতভাবে হারিয়ে যাবে। ইংরেজি ভাষ্যেই পিকাসোর কথাটা প্রথমে শোনা যাক (জিলোট তার ‘লাইফ উইথ পিকাসো’ বইতে এ নিয়ে লিখেছেন) :

‘Men had made those masks and other subjects for a sacred purpose, a magic purpose, as a king of mediation between themselves and the unknown hostile forces that surrounded them, in order to overcome their fear and horror by giving it a form and an image. At that moment I realized that this was what painting was all about. Painting isn’t an aesthetic operation; it’s a form of magic designed as mediation between this strange, hostile world and us, a way of seizing power by giving form to our terrors as well as our desires. When I came to that realization, I knew I had found my way.’

ট্রাইবাল আর্টের মুখোমুখি হওয়ার পর পিকাসোর মনে হলো যে চিত্রকর্মের মূল উদ্দেশ্য নান্দনিক আনন্দের বিতরণ নয়। চারপাশের তৈরি জগৎ ও ভীতসন্ত্রস্ত মানুষের মধ্যে কোনো এক রহস্যময় উপায়ে- প্রায় জাদু-বাস্তবতার কথাই এটা- ‘সেতু স্থাপন করা’ এর লক্ষ্য। যাতে করে মানুষ তার নিঃসঙ্গতার ভয়-ভীতি কাটিয়ে উঠতে পারে। আবশ্যিকভাবেই, এই সেতু অলৌকিক; এই যোগাযোগ ও বিনিময় মায়াবী, সব রকম ব্যাখ্যার অতীত। কিন্তু ব্যাখ্যাতীত এই বাস্তবতা বা জাদু-বাস্তবতায় পৌঁছানোই শিল্পকলার আসল লক্ষ্য। গত শতকের আশির দশকে মার্কেজের উচ্চারণে এই জাদু-বাস্তবতার অন্য এক রাজনৈতিক রূপও আমরা দেখতে পাই। এবারে শুধু আফ্রিকার সঙ্গে পাশ্চাত্যের যোগসূত্র স্থাপিত হবে তা-ই নয়, গোটা লাতিন মহাদেশের শিল্প-সাহিত্য কলম্বিয়ার মার্কেজের ও পেরুর ইয়োসার গদ্যে, চিলির নেরুদা ও আর্জেন্টিনার বোর্হেসের কবিতায়, ইকুয়েডরের গুইসামিন (Guayasamin), মেস্কিকোর তামায়ো (Rutins Tamayo) ও কিউবার লামের (Wilfredo Lam) চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে শত শত বছরের সন্ত্রাস, ভয়, জড়তা ও নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠে পাদপ্রদীপের আলোয় ঝলমল করে উঠবে সাহসের সঙ্গে।

জিলোটের সঙ্গে আলাপে সেদিন পিকাসো তার সৃষ্টিশীল পথের একটি ‘মেজর টার্নিং পয়েন্ট’-এর কথা বলেছিলেন আফ্রিকান প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের আলোচনা-সূত্রে। আফ্রিকান শিল্পীরা ইউরোপের তুলনায় ভিন্ন চোখে শিল্পমাধ্যমকে দেখেন। নিছক আনন্দ-উপভোগের জন্য নয়। ‘আর্ট ফর আর্টস সেইক’ এ ধরনের মিথ্যা ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ‘প্রিমিটিভ’ আর্টিস্টরা নেই। এটাই পিকাসোর সজাগ দৃষ্টি কেড়েছিল ট্রকাদেরো মিউজিয়ামে সেদিন। পিকাসোর এই চিন্তা সমসাময়িক ফ্রান্সের স্ট্রাকচারালিস্ট এনথ্রোপলজিস্ট অন্দ্রে মালরোঁ, ক্লদ লেভি-স্ট্রস প্রমুখের নৃতাত্ত্বিক চিন্তার অনুবর্তী।

কিন্তু শুধু পিকাসো নন বিশিষ্ট এ ক্ষেত্রে। আরও অনেক সহযাত্রী রয়েছেন তার সঙ্গে। রোমানিয়ান ভাস্কর কনস্তানটিন ব্রানকুসি (Brancusi), রাশান ভদ্মামিলি কান্ডিনস্কি ও মার্ক শাগালের মতো বড় একটা সময় কাটিয়ে ছিলেন প্যারিসে। তার হাতে করা বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘এডাম ও ইভ’-এর সঙ্গে আইভরি কোস্টের কুলানগো (Kulango) ট্রাইবের কোনো নাম-না-জানা শিল্পীর হাতে গড়া মূর্তির প্রচণ্ড সাদৃশ্য। অকালমৃত আমাদেও মডিলিয়ানি চিত্রকর্মের জন্যই বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তার করা অল্প কয়েকটি ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে ‘স্ট্যান্ডিং ন্যুড’; এর সঙ্গে পূর্বে উল্লেখকৃত গ্যাবন দেশের Fang মূর্তিটির বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। জার্মান পল ক্লি-এর কথাও এ ক্ষেত্রে স্মর্তব্য।

পল ক্লী-র চিত্রকর্মে বিশেষ করে নর্থ আফ্রিকার লোকজ শিল্পের প্রভাব প্রবলভাবে অনুভূত হয়। উত্তর আফ্রিকা বলতে ‘মাগরেব অঞ্চল’কে বোঝানো হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও লিবিয়া। যারাই পল ক্লীর চিত্রকর্মে প্রাচীন নৃগোষ্ঠীর মতো করে হাতে আঁকা ‘প্রিমিটিভ’, চিহ্ন, জ্যামিতিক আঁকিবুঁকি ও নকশা দেখে ভেবেছেন এর রহস্য কী, তারা অন্তত এটুকু বুঝেছেন যে, এ জিনিস ‘ইউরোপ’ থেকে আসেনি। রেনেসাঁ-উত্তর চিত্রকলার কোনো শিল্পগত ঐতিহ্যেই এ রকম চিহ্ন বা প্রতীকের চর্চা হয়নি। এটা উঠে এসেছে আফ্রিকার লোক-শিল্পের গভীর তলদেশ থেকে। এর ‘সর্বাধুনিক পাঠের’ মিথস্ট্ক্রিয়া থেকে। ‘দ্য ম্যাজিক অব সাইনস্‌ অ্যান্ড প্যাটার্নস্‌ ইন নর্থ আফ্রিকান আর্ট’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্ট লিখেছে : ‘Many of (these) shapes and symbols have a marked resemblance to Neolithic Pottery found in the region. By combining signs with magical numbers or stylizing traditional symbols, contemporary artists top the unconscious to create abstract work that references the past and Present.’
এবং এ কথা বলেই তাদের মনে পড়ে যায় পল ক্লী-র কথা :’On several visits to North Africa, German artist Paul Klee was inspired by these mystical shapes and incorporated signs, number and letters into his work.’ অবশ্যই পল ক্লী-র চিত্রকর্ম আধুনিক উত্তর আফ্রিকার চিত্রশিল্পীদের প্রভাবিত করেছে পরবর্তীকালে, এ কথা স্বীকার করতেই হবে আমাদের। একটা সৃষ্টিকর্মের ওপরে নানা স্থান ও উৎস থেকে আলো এসে পড়তেই পারে, কিন্তু প্রভাব-সমুচয়ের বিষয়টি কেবল একতরফাভাবে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশে এসে পড়েছে বা পড়বে, বিষয়টা এমন নয়। আফ্রিকাও পিকাসো বা ক্লীর পর্যায়ের আধুনিক শিল্পকলার পথিকৃতদের প্রভাবিত করতে পারে। তাদেরকে শুধু বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে নয়, ‘ফর্মের’ ভাঙচুরের ক্ষেত্রে প্ররোচিত করতে পারে, এমনকি জন্ম দিতে পারে পিকাসোর কিউবিজম বা (পল ক্লী-র বেলায়) ‘মিস্টিক্যাল এবস্ট্রাকট’ পর্বের। সেই দ্বিমুখী সম্ভাবনার কথাই আবার মনে করিয়ে দেওয়া।

কুই ব্রানলি জাদুঘরে গেলে এ রকম অনেক সদৃশ্যতার কথা মনে পড়বে। ‘1906 Blast of Negro Art in Modern Art’ নামে একটি বই লিখেছেন আর্ট হিস্টোরিয়ান ণাবং ঈৎব্থযধষবঃ. আধুনিক শিল্পকর্মে কালো আফ্রিকার শিল্পকলার বিস্ম্ফোরণ। ১৯০৬ সালটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন এ ক্ষেত্রে, কেননা ওই বছরেই মার্সাইতে ‘কলোনিয়াল এক্সিবিশনের’ আয়োজন করা হয়েছিল। এই প্রদর্শনীর প্রভাব এসে পড়েছিল ব্র্যাক, মাতিস, পিকাসো, মদিলিয়ানি, পল-ক্লী প্রমুখের শিল্পকর্মে বিশেষত চিত্রকলায়। কবি গীয়ম আপোলেনিয়র আইভরি কোস্টের একটি Dan মাস্ক (Dan Tankagle) কিনেছেন সেটা আবার চিরিকোর (Giorgio de Chirico) করা আপোলেনিয়রের প্রতিকৃতির ওপরে প্রভাব ফেলেছে। তানজানিয়ার মাকন্দে (Makonde) মাস্ক। নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা (Yaruba) মাস্ক, মালির দগন (Dogon) মাস্ক, কঙ্গোর কুন্ডু-গাতা (N’kundu-Ngata) নারী-মূর্তি, কদ্ধান (Kran) মাস্ক, গ্যাবনের ফ্যাং (Fang) মাস্ক, মালির বাম্বারা (Bambara) মাস্ক, লাইবেরিয়ার গ্রেব্রো (Grebo-Kron) মাস্ক, এঙ্গোলার Tschokwe মাস্ক, আঁরি রুসো থেকে শুরু করে পিকাসো দেরাঁ থেকে লেজে (Fernand Leger), ক্লী থেকে ম্যাক্স আর্নস্ট, সবাইকে বিমোহিত করেছিল। এদিক থেকে দেখলে এই ভোগের চিত্রকলায় ও ভাস্কর্যে আফ্রিকার তুলনামূলক অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। আমাদের শিল্পকলায় ‘লোকজ’ শব্দটি জাতীয়তাবাদের ঘেরাটোপে বন্দি। যামিনী রায়কে কালীঘাটের পটশিল্পের প্রভাবে দেখতে পারি বা কামরুল হাসানকে ‘পটুয়া’ বলতে আগ্রহী হয়ে উঠি- প্রিমিটিভ ও ট্রাইবাল আর্টের প্রতি আমাদের উৎসাহের চৌহদ্দি ঐ পর্যন্তই। আধুনিক ভারতের বা বাংলাদেশের চিত্রকলায় ‘আফ্রিকার’ কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া ভার। আমাদের দেশে আমাদের মতো করে ট্রাইবাল জীবনের ‘আধুনিক রূপায়ণ’ আছে, কিন্তু আধুনিক জীবনের ‘প্রিমিটিভ রূপায়ণ’ দুর্লভ। একজন হাল আমলের শিল্পী যখন সাঁওতাল, ম্র অথবা চকমা রমণীকে আঁকেন তখন তার লক্ষ্য থাকে আদিবাসী জীবনযাত্রার নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি, পরিধানের বিশিষ্ট পোশাক বা দেহ গঠনের ভিন্নতার প্রতি। তাতে করে আধুনিক চিত্রকলার ওপরে আদিবাসী মনোজগতের, বিশ্বাসের বা সিম্বলিজমের কোনো আঁচড় পড়ে না, কোনো আলোড়ন সৃষ্টি হয় না, বা এর থেকে বলতে পারি না যে, দক্ষিণ এশিয় চিত্রকলায় ট্রাইবাল আর্টের ‘blast’ বা বিস্ম্ফোরণ হয়েছে। একজন সাঁওতাল বা মারমা রমণী হয়তো আমাদের কাছে এনথ্রোপলজিক্যাল আগ্রহের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু শিল্পকর্মে কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, কোনো নতুন আদর্শ বা নতুন ভাষার প্ররোচনা এতে করে সৃষ্টি হয় না। আমি যামিনী রায়ের এক্সপেরিমেন্ট অথবা ফ্রান্সিস নিউটন সুজা-র প্রিমিটিভ-প্রভাবিত চিত্রকলার কথা ভুলে যাইনি। একজন J.M.S. mari বা একজন এস. এম. সুলতান এ ভূভাগেও আছে। তারপরও বলতে হয়, যেভাবে ব্রাক-মাতিস-পিকাসো-ক্লীর কাছে ট্রাইবাল ও প্রিমিটিভ আর্ট নতুন আন্দোলন ও নতুন অভিব্যক্তির জন্ম দিল, সেভাবে দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলায় কেন প্রিমিটিভিজম ও মডার্নিজমের মধ্যে ভাবের, ভাষার এবং শুভদৃষ্টির বিনিময় হলো না, সেটা একটা ধাঁধার মতোই হয়ে থাকল।

নতুন আন্দোলন ও নতুন অভিব্যক্তি যে ট্রাইবাল ও প্রিমিটিভের গভীর তলদেশ থেকে জন্ম নিতে পারে তার জন্য ইউরোপ-আমেরিকার প্রতি তাকানোর দরকার নেই। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথেই আবার ফিরে যেতে হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু ও গগনেন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন ‘বেঙ্গল পেইন্টার্স’ গ্রুপকে রবীন্দ্রনাথের খুব বেশি পছন্দ হয়নি। বেঙ্গল স্কুল খুব বেশি ‘জাতীয়তাবাদী’ ধারার শিল্পকলা বলে ঠেকেছিল তার কাছে। যেমন তিনি নৃত্যকলার জন্য খুঁজে এনেছিলেন মণিপুরি নৃত্যের ‘ফর্ম’, তেমনিভাবে চিত্রকলায় নতুন অভিব্যক্তির নিরন্তর সন্ধানে ছিলেন। তিনি মুকুল দে-কে জাপানে চিত্রকলা শেখানোর একটি উদ্দেশ্য ছিল নতুন আর্ট-ফর্মের সন্ধান। কিন্তু তাতে তার মন সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এরপর নিজেই লেগে গেলেন রং-তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে। দেশীয় ঐতিহ্যের সাথে কোনোই মিল নেই, কিন্তু জার্মান প্রিমিটিভিস্ট ও এক্সপ্রেশনিস্টদের সাথে তার মেজাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি এ ক্ষেত্রে মিলে গেল। ফিগারেটিভ, ল্যান্ডস্কেপ অথবা বিমূর্ত যে কোনো বিষয়েই রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় দেখা গেল এক ভিন্ন ধরনের প্রভা, যার নিকটতম তুলনা কেবল পাওয়া যায় প্রিমিটিভ ও এক্সপ্রেশনিস্ট আর্টে। [ক্রমশ]