বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
– ‘To safeguard civil liberties, such as individual and collective freedom of belief, expression, association and organization.’
– ‘To secure the basic necessities of life of every citizen  of Pakistan namely, food, shelter, clothes, education, medical aid and the scope to earn an honest and honorable competence.’
_ ‘To relieve sufferings, propagate knowledge, promote equality and justice, banish oppression, eradicate corruptions, elevate moral and maternal standard of the people …’

এ তো গেল দলের ‘Aims and Objectives’-এর কথা| ‘Immediate Program-এর মধ্যে আবারও ধ্বনিত হলো ইতিপূর্বে শোনা আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো।

‘Abolition of the system of zamindary without compensation and equitable distribution of land among the tillers of the soil.’
– ‘To nationalise the key industries, essential  to the life of the nation; to establish industries on Govt. initiative and also to organise, expand and encourage cottage industries, etc.’
-’To introduce free and compulsory primary education; to reorganise secondary and higher education on modern and scientific basis.’
– ‘To provide a network of Govt. charitable dispensaries to afford free medical aid all over the country.’
– ‘To fix a just and fair apportionment of all revenues betwen the centre and the provinces.’

এত দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই। সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ও চেতনায় উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং সমতামুখী অর্থনীতি পরিচালনার অঙ্গীকার দানা বেঁধে ছিল। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘চারটি মূলস্তম্ভ’ হঠাৎ করে বা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে উদ্ভূত হয়নি। এর পেছনে আমি দীর্ঘ পূর্বাপরতা-দার্শনিক মিশেল ফুকোর ভাষায় genealogical trail-দেখতে পাই, যা শেখ মুজিব ও তার দীর্ঘকালের সহকর্মীদের মনে গভীর উপলব্ধি হয়ে মিশে ছিল। গণতন্ত্র যেমন চাই, তেমনি চাই সমতামুখীন আকাঙ্ক্ষার সমাজ ও অর্থনীতি- এটা তাদের চোখে ছিল একটি স্বাভাবিক দাবি। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোচনায় পরবর্তীতে আমরা দেখব যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এই স্বাভাবিক দাবিকে ঘিরে বাহাত্তরের গণপরিষদে (যার সদস্যগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে এসেছিলেন) এক ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছিল। সমাজতন্ত্রের স্তম্ভটিকে নিয়ে একটিও আপত্তি সেদিনের গণপরিষদে উচ্চারিত হয়নি। এই ব্যাপক ঐকমত্যের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে ১৯৫০-৬০ দশকের মূলধারার রাজনীতির দলিলপত্রের আদর্শ ও কর্মসূচিকে ঘনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্নেষণ করতে হবে। তারই একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি এই অধ্যায়ের বাদবাকি অংশে।
১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকায়। সেখানে গৃহীত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ বলা হচ্ছে :
‘১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবরের খাদ্য মিছিলের ওপর সরকার হামলা করিয়া মওলানা ভাসানী, জনাব শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বহু কর্মীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখিয়াও গণতন্ত্রের দুষমন লীগ সরকার আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারে নাই। …পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাক-ভারত মৈত্রী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সপক্ষে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন… আওয়ামী মুসলিম লীগও সেই আওয়াজকে কর্মসূচিভুক্ত করে। অতঃপর পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ, লাঙ্গল যার জমি তার ভিত্তিতে ভূমি বণ্টন, জাতীয়করণের ভিত্তিতে শিল্পায়ন, প্রত্যেকের কাজের ব্যবস্থা- প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, শিক্ষার নিরাপত্তার ভিত্তিতে এক কর্মসূচি গ্রহণ করে।’
অর্থাৎ দলের ‘সাংগঠনিক রিপোর্টেও’ ১৯৫৩ সালেই পুনরায় সামন্তবাদের অবসান ও ‘জাতীয়করণ’-এর ভিত্তিতে শিল্পায়নের দাবি জানানো হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বিদেশ নীতিতেও সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল সেদিন :
‘আওয়ামী লীগ ঘোষণা করিয়াছে কমনওয়েলথ-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে। তারা আরও দেখিয়াছে কৃষি ও শিল্পে তারা যে প্রগতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে উহা সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একান্ত পরিপন্থী। তাই আওয়ামী লীগ কমনওয়েলথ ত্যাগই নহে- সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্কহীন সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করিয়াছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এই নীতির অনুকূলে শান্তি আন্দোলনেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছে।’
দেখা যাচ্ছে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ধারায় সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধিতা এবং শান্তি আন্দোলনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু পান বিশ্ব শান্তি পুরস্কার। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে মুজিব বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে বিরল জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। যার নামে ওই পুরস্কার তার পুরো নাম ফ্রেদেরিক জুলিও কুরি। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি বিজ্ঞানী, ১৯৩৫ সালে তার স্ত্রী আইরিন জুলিও কুরির (দুইবার নোবেল বিজয়ী মেরি কুরির কন্যা) সাথে একত্রে ‘আর্টিফিসিয়াল রেডিও অ্যাক্টিভিটি’র ওপরে পথিকৃৎ গবেষণার জন্য রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্সের সক্রিয় নেতা ছিলেন জুলিও কুরি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। এহেন গুণী ও সাহসী মানুষের নামে প্রদত্ত শান্তি পদক লাভ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এখানে মূল বক্তব্য অন্যত্র। উপরোক্ত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ পরিস্কার ভাষায় লেখা হয়েছিল : আওয়ামী লীগ ‘বিশ্বধ্বংসী রণপাগল সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে’ এবং আজ নীতিগতভাবে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ রকম একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও কালক্রমে প্রধান ব্যক্তিত্ব মুজিব যে উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট লেখার দুই যুগ পরে জুলিও কুরি শান্তি পদক পাবেন তাকে যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখাটাই স্বাভাবিক। পাঠকদের মনে রাখতে বলব, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের’ উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপনকালে মুজিব ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে দলটির নামান্তর হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’। এই রূপান্তর ঘটে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর দলের বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে। দলের পক্ষ থেকে ‘বার্ষিক রিপোর্ট’ উত্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব স্বয়ং। সেই বার্ষিক রিপোর্টেও ‘প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িককরণের প্রসঙ্গ’ আলোচনার পাশাপাশি ইতিপূর্বে উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো পুনরায় তোলা হয়।
যেমন, ১৯৫৫ সালে দলের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয় যে, ‘সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থাই পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের মূল প্রতিবন্ধক। বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন ও কৃষককে জমির মালিকানা স্বত্ব দান করাই সামন্তবাদী শোষণ অবসানের প্রথম পদক্ষেপ।’ কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার ‘পূর্ববঙ্গ ভূমি দখল ও প্রজাস্বত্ব’ নামে যে আইনের জন্ম দিয়েছে তা আসলে ‘ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথাকে নতুন ধাঁচে ঢালাই করার’ পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘পাটনীতি’ সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, ‘পাট শিল্পকে জাতীয়করণ না করিলে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সহিত সমপর্যায়ের ভিত্তিতে বাণিজ্য না করিলে পাট শিল্পের ভবিষ্যৎই নেই। এই জন্যই যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচিতে পাট জাতীয়করণ করার ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল।’ এর পাশাপাশি ‘শিল্পনীতি’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তি খাতের কলকারখানা বিকাশের সমস্যা তুলে ধরা হয়। যেমন, বলা হয় যে, ‘দেশের শিল্পপতিগণ আজ এক বিরাট সংকটের সম্মুখীন। একদিকে বিদেশিদের সহিত প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে তারা পঙ্গু, আবার অন্যদিকে দেশের বাজারের অধিকাংশ ক্রেতার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদিত দ্রব্যের কেনাবেচা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।’ এবং সবশেষে- ‘সরকারের বন্ধ্যা শিল্পনীতি এই সমস্যা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ এ ছাড়াও ‘শ্রমনীতি’, ‘শিল্পনীতি’, ‘স্বাস্থ্য সমস্যা’, ‘বন্যা সমস্যা’, ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘বৈদেশিক নীতির’ আলোচনা স্থান পায় উপরোক্ত বার্ষিক রিপোর্টে। সামগ্রিকভাবে, এই দলিলে লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ইতিপূর্বে আলোচিত র‌্যাডিকেল খসড়া ম্যানিফেস্টোর তুলনায় ভাষায় ও অভিপ্রায়ে অপেক্ষাকৃত সংযত ও সতর্ক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে এই দলিলে। সেটা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব ও তৎকালীন সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছুটা রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে।
১৯৬৪ সালের ‘পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো’-তে এসে অবশ্য এই ভাষাভঙ্গী পুরোপুরি পাল্টে যায়। এই লড়াকু রূপান্তরে মূল নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব। ততদিনে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেছেন, মওলানা ভাসানী তারও বেশ কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ৬ বছর পেরিয়ে গেছে। সারাদেশে গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে এক বন্ধ্যা-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভক্ত ও স্থবির দশা থেকে আওয়ামী লীগকে ‘পুনরুজ্জীবিত’ করার কঠিন সংগ্রাম চালানোর দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্যই ১৯৬৪-এর খসড়া ম্যানিফেস্টোটি আমাদের আলোচনার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, ১৯৬৬-এর ৬ দফা প্রণয়নেরও আগে এই দলিলেই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের দিকনির্দেশনাগুলো প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে নির্দেশিত হয়েছে। এই যুক্তিটি বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
‘পুনরুজ্জীবিত’ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (যার কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালের ৬-৭ মার্চ) সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও দলটির পুনরুজ্জীবনের পেছনে মূল নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এসেছিল শেখ মুজিবের কাছ থেকেই। কমিটিতে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। এই পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সে সময়ে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল (‘এবডো’ তখনও বিদ্যমান- যা ১৯৬৬ পর্যন্ত বলবৎ ছিল)। এখানে বলা দরকার, আইয়ুবের জারি করা রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য ‘এবডো’ আইন পাস হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরই। এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের খসড়া ম্যানিফেস্টো তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়। আমি এখানে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি দৃষ্টি দেব- সমতামুখীন সমাজের আদর্শ কীভাবে এদেশে গড়ে উঠেছিল তা বোঝার তাগিদ থেকে। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ শুধু নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই বলা দরকার, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে এই ম্যানিফেস্টোতে ১৯৬৪ সালে যা বলা হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি হয়েছিল পরবর্তীতে বাহাত্তরের সংবিধানে ও বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২-৭৩ সালে গৃহীত ‘সমাজতান্ত্রিক’ চিন্তা-ভাবনার বীজ এই দলিলেই সুসংহতভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং তাতে মূল অবদান রেখেছিলেন রাজনীতিবিদরাই। ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আলোচনা করা এদেশের প্রাগ্রসর ও শীর্ষস্থানীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা পরবর্তীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের প্রদর্শিত রাজনৈতিক দর্শনের নির্দেশিত পথ ধরেই।

[ক্রমশ

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৫

পূর্বে প্রকাশিতের পর
– ‘To safeguard civil liberties, such as individual and collective freedom of belief, expression, association and organization.’
– ‘To secure the basic necessities of life of every citizen  of Pakistan namely, food, shelter, clothes, education, medical aid and the scope to earn an honest and honorable competence.’
_ ‘To relieve sufferings, propagate knowledge, promote equality and justice, banish oppression, eradicate corruptions, elevate moral and maternal standard of the people …’

এ তো গেল দলের ‘Aims and Objectives’-এর কথা| ‘Immediate Program-এর মধ্যে আবারও ধ্বনিত হলো ইতিপূর্বে শোনা আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো।

‘Abolition of the system of zamindary without compensation and equitable distribution of land among the tillers of the soil.’
– ‘To nationalise the key industries, essential  to the life of the nation; to establish industries on Govt. initiative and also to organise, expand and encourage cottage industries, etc.’
-’To introduce free and compulsory primary education; to reorganise secondary and higher education on modern and scientific basis.’
– ‘To provide a network of Govt. charitable dispensaries to afford free medical aid all over the country.’
– ‘To fix a just and fair apportionment of all revenues betwen the centre and the provinces.’

এত দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই। সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ও চেতনায় উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং সমতামুখী অর্থনীতি পরিচালনার অঙ্গীকার দানা বেঁধে ছিল। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘চারটি মূলস্তম্ভ’ হঠাৎ করে বা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে উদ্ভূত হয়নি। এর পেছনে আমি দীর্ঘ পূর্বাপরতা-দার্শনিক মিশেল ফুকোর ভাষায় genealogical trail-দেখতে পাই, যা শেখ মুজিব ও তার দীর্ঘকালের সহকর্মীদের মনে গভীর উপলব্ধি হয়ে মিশে ছিল। গণতন্ত্র যেমন চাই, তেমনি চাই সমতামুখীন আকাঙ্ক্ষার সমাজ ও অর্থনীতি- এটা তাদের চোখে ছিল একটি স্বাভাবিক দাবি। বাহাত্তরের সংবিধানের আলোচনায় পরবর্তীতে আমরা দেখব যে, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এই স্বাভাবিক দাবিকে ঘিরে বাহাত্তরের গণপরিষদে (যার সদস্যগণ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে এসেছিলেন) এক ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করছিল। সমাজতন্ত্রের স্তম্ভটিকে নিয়ে একটিও আপত্তি সেদিনের গণপরিষদে উচ্চারিত হয়নি। এই ব্যাপক ঐকমত্যের পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে ১৯৫০-৬০ দশকের মূলধারার রাজনীতির দলিলপত্রের আদর্শ ও কর্মসূচিকে ঘনিষ্ঠভাবে বিচার-বিশ্নেষণ করতে হবে। তারই একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি এই অধ্যায়ের বাদবাকি অংশে।
১৯৫৩ সালের ৩ জুলাই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকায়। সেখানে গৃহীত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ বলা হচ্ছে :
‘১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবরের খাদ্য মিছিলের ওপর সরকার হামলা করিয়া মওলানা ভাসানী, জনাব শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বহু কর্মীকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রাখিয়াও গণতন্ত্রের দুষমন লীগ সরকার আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারে নাই। …পাকিস্তানের অন্যতম স্রষ্টা জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাক-ভারত মৈত্রী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সপক্ষে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন… আওয়ামী মুসলিম লীগও সেই আওয়াজকে কর্মসূচিভুক্ত করে। অতঃপর পূর্ব পাক আওয়ামী মুসলিম লীগ বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ, লাঙ্গল যার জমি তার ভিত্তিতে ভূমি বণ্টন, জাতীয়করণের ভিত্তিতে শিল্পায়ন, প্রত্যেকের কাজের ব্যবস্থা- প্রত্যেকের স্বাস্থ্য, শিক্ষার নিরাপত্তার ভিত্তিতে এক কর্মসূচি গ্রহণ করে।’
অর্থাৎ দলের ‘সাংগঠনিক রিপোর্টেও’ ১৯৫৩ সালেই পুনরায় সামন্তবাদের অবসান ও ‘জাতীয়করণ’-এর ভিত্তিতে শিল্পায়নের দাবি জানানো হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বিদেশ নীতিতেও সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল সেদিন :
‘আওয়ামী লীগ ঘোষণা করিয়াছে কমনওয়েলথ-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হইবে। তারা আরও দেখিয়াছে কৃষি ও শিল্পে তারা যে প্রগতিবাদী কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে উহা সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার একান্ত পরিপন্থী। তাই আওয়ামী লীগ কমনওয়েলথ ত্যাগই নহে- সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী জোটের সাথে সম্পর্কহীন সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করিয়াছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ এই নীতির অনুকূলে শান্তি আন্দোলনেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করিয়াছে।’
দেখা যাচ্ছে, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ধারায় সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধিতা এবং শান্তি আন্দোলনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই প্রকাশ পাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু পান বিশ্ব শান্তি পুরস্কার। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে মুজিব বিশ্ব শান্তি পরিষদের পক্ষ থেকে বিরল জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। যার নামে ওই পুরস্কার তার পুরো নাম ফ্রেদেরিক জুলিও কুরি। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি বিজ্ঞানী, ১৯৩৫ সালে তার স্ত্রী আইরিন জুলিও কুরির (দুইবার নোবেল বিজয়ী মেরি কুরির কন্যা) সাথে একত্রে ‘আর্টিফিসিয়াল রেডিও অ্যাক্টিভিটি’র ওপরে পথিকৃৎ গবেষণার জন্য রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্সের সক্রিয় নেতা ছিলেন জুলিও কুরি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। এহেন গুণী ও সাহসী মানুষের নামে প্রদত্ত শান্তি পদক লাভ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এখানে মূল বক্তব্য অন্যত্র। উপরোক্ত ‘সাংগঠনিক রিপোর্টে’ পরিস্কার ভাষায় লেখা হয়েছিল : আওয়ামী লীগ ‘বিশ্বধ্বংসী রণপাগল সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছে’ এবং আজ নীতিগতভাবে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ রকম একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় সংগঠক ও কালক্রমে প্রধান ব্যক্তিত্ব মুজিব যে উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট লেখার দুই যুগ পরে জুলিও কুরি শান্তি পদক পাবেন তাকে যৌক্তিক পরিণতি হিসেবে দেখাটাই স্বাভাবিক। পাঠকদের মনে রাখতে বলব, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের’ উক্ত সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপনকালে মুজিব ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে দলটির নামান্তর হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’। এই রূপান্তর ঘটে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর দলের বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে। দলের পক্ষ থেকে ‘বার্ষিক রিপোর্ট’ উত্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব স্বয়ং। সেই বার্ষিক রিপোর্টেও ‘প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িককরণের প্রসঙ্গ’ আলোচনার পাশাপাশি ইতিপূর্বে উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক দাবিগুলো পুনরায় তোলা হয়।
যেমন, ১৯৫৫ সালে দলের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয় যে, ‘সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থাই পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের মূল প্রতিবন্ধক। বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন ও কৃষককে জমির মালিকানা স্বত্ব দান করাই সামন্তবাদী শোষণ অবসানের প্রথম পদক্ষেপ।’ কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার ‘পূর্ববঙ্গ ভূমি দখল ও প্রজাস্বত্ব’ নামে যে আইনের জন্ম দিয়েছে তা আসলে ‘ক্ষয়িষ্ণু জমিদারি প্রথাকে নতুন ধাঁচে ঢালাই করার’ পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়। ‘পাটনীতি’ সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে, ‘পাট শিল্পকে জাতীয়করণ না করিলে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সহিত সমপর্যায়ের ভিত্তিতে বাণিজ্য না করিলে পাট শিল্পের ভবিষ্যৎই নেই। এই জন্যই যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচিতে পাট জাতীয়করণ করার ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল।’ এর পাশাপাশি ‘শিল্পনীতি’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তি খাতের কলকারখানা বিকাশের সমস্যা তুলে ধরা হয়। যেমন, বলা হয় যে, ‘দেশের শিল্পপতিগণ আজ এক বিরাট সংকটের সম্মুখীন। একদিকে বিদেশিদের সহিত প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে তারা পঙ্গু, আবার অন্যদিকে দেশের বাজারের অধিকাংশ ক্রেতার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় উৎপাদিত দ্রব্যের কেনাবেচা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।’ এবং সবশেষে- ‘সরকারের বন্ধ্যা শিল্পনীতি এই সমস্যা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’ এ ছাড়াও ‘শ্রমনীতি’, ‘শিল্পনীতি’, ‘স্বাস্থ্য সমস্যা’, ‘বন্যা সমস্যা’, ‘মৌলিক অধিকার’ ও ‘বৈদেশিক নীতির’ আলোচনা স্থান পায় উপরোক্ত বার্ষিক রিপোর্টে। সামগ্রিকভাবে, এই দলিলে লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ইতিপূর্বে আলোচিত র‌্যাডিকেল খসড়া ম্যানিফেস্টোর তুলনায় ভাষায় ও অভিপ্রায়ে অপেক্ষাকৃত সংযত ও সতর্ক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে এই দলিলে। সেটা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দীর প্রভাব ও তৎকালীন সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছুটা রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে।
১৯৬৪ সালের ‘পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো’-তে এসে অবশ্য এই ভাষাভঙ্গী পুরোপুরি পাল্টে যায়। এই লড়াকু রূপান্তরে মূল নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব। ততদিনে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেছেন, মওলানা ভাসানী তারও বেশ কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের ৬ বছর পেরিয়ে গেছে। সারাদেশে গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে এক বন্ধ্যা-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভক্ত ও স্থবির দশা থেকে আওয়ামী লীগকে ‘পুনরুজ্জীবিত’ করার কঠিন সংগ্রাম চালানোর দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্যই ১৯৬৪-এর খসড়া ম্যানিফেস্টোটি আমাদের আলোচনার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, ১৯৬৬-এর ৬ দফা প্রণয়নেরও আগে এই দলিলেই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের দিকনির্দেশনাগুলো প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে নির্দেশিত হয়েছে। এই যুক্তিটি বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
‘পুনরুজ্জীবিত’ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (যার কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালের ৬-৭ মার্চ) সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও দলটির পুনরুজ্জীবনের পেছনে মূল নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এসেছিল শেখ মুজিবের কাছ থেকেই। কমিটিতে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এইচএম কামারুজ্জামান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। এই পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সে সময়ে বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল (‘এবডো’ তখনও বিদ্যমান- যা ১৯৬৬ পর্যন্ত বলবৎ ছিল)। এখানে বলা দরকার, আইয়ুবের জারি করা রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য ‘এবডো’ আইন পাস হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরই। এ রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১৯৬৪ সালের খসড়া ম্যানিফেস্টো তথা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়। আমি এখানে শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি দৃষ্টি দেব- সমতামুখীন সমাজের আদর্শ কীভাবে এদেশে গড়ে উঠেছিল তা বোঝার তাগিদ থেকে। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ শুধু নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই বলা দরকার, ‘অর্থনৈতিক আদর্শ’ হিসেবে এই ম্যানিফেস্টোতে ১৯৬৪ সালে যা বলা হয়েছিল, তারই প্রতিধ্বনি হয়েছিল পরবর্তীতে বাহাত্তরের সংবিধানে ও বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়। এর থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২-৭৩ সালে গৃহীত ‘সমাজতান্ত্রিক’ চিন্তা-ভাবনার বীজ এই দলিলেই সুসংহতভাবে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং তাতে মূল অবদান রেখেছিলেন রাজনীতিবিদরাই। ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে আলোচনা করা এদেশের প্রাগ্রসর ও শীর্ষস্থানীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা পরবর্তীতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের প্রদর্শিত রাজনৈতিক দর্শনের নির্দেশিত পথ ধরেই।

[ক্রমশ

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৩

পূর্বে প্রকাশিতের পর
যে চিঠির কথা মুজিব এখানে বলছেন তা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। মুজিব এখানে একাধিক চিঠির কথা বলছেন। বস্তুতই একাধিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল সোভিয়েতের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই। আমরা সচরাচর যে চিঠির কথা মনে রেখেছি, তা হলো ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিলে লেখা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির চিঠি। ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ করে লেখা এ চিঠিতে পদগর্নি সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘চরম দুর্ভাবনা’ (Great alarm) ব্যক্ত করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, ইয়াহিয়া জরুরি ভিত্তিতে এমন ব্যবস্থা নেবেন যাতে করে রক্তপাত ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা হবে : ‘Podgorny urged Yahya to take the most urgent measures to stop the bloodshad and repression against the population in East Pakistan and for turning to methods of a peaceful political settlement.’ এটা বলে পদগর্নি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তিনি পাকিস্তানের ব্যাপারে তার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কেবল বিশ্ব-মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে : ‘Podgorny added that he was guided by ”the genarally recognized humanitarian principles recorded in the universal declaration of human rights.’’

যেটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি সেটা হলো পদগর্নির চিঠির আগেও একটি প্রতিবাদ বার্তা গিয়েছিল রুশ প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছ থেকে। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরুর দুই দিন বাদেই করাচিতে অবস্থানরত সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের মাধ্যমে ইয়াহিয়ার কাছে একটি মৌখিক বার্তা পাঠান প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন। শ্রীনাথ রাঘবনের বই থেকে সেই মৌখিক বার্তার বিষয়বস্তুটি নিচে তুলে ধরছি :
‘Kosygin had stated that Òextreme measures taken by the military administration and continuation of bloodshed in East Pakistan will not solve the existing complicated problems.’’ He asked Yahya to Òtake immediate measures for the cessation of bloodshed in East Pakistan and for the resumption of negotiations.’’ পরবর্তীতে নয় মাস ধরে বাংলাদেশকে ঘিরে সোভিয়েতের উদ্যোগে অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় চলবে ভারত সরকারের সাথে- যার সম্পর্কে মুজিব পরবর্তীকালে বিস্তারিত জেনেছিলেন। স্থানাভাবে এখানে একটি উদাহরণের কেবল উল্লেখ করব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ‘নেপথ্যের পরামর্শদাতার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটা এ থেকে স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৮ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং গিয়েছেন মস্কোয় বাংলাদেশ বিষয়ে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পূর্ব বাংলার সংকটের সমাধানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো- এই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত ইস্যুতে কোসিগিন পরামর্শ দিলেন আপাতত দুটি ইস্যুকে আলাদা করে নিষ্পত্তির চেষ্টা হোক। কোসিগিন বললেন,‘Refugees must go back, all of them, every one of them’- এটার ওপরেই প্রথমে জোর দিতে হবে। তবে এর সাথে সাথে দ্বিতীয় ইস্যুর ওপরেও কাজ করতে হবে। যদিও পাকিস্তান বলবে যে, রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসলে তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ নাক গলানো হচ্ছে, তা সত্ত্বেও ভারতের উচিত হবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে সাহায্য করে যাওয়া’ :  Kosygin suggested, Òin strict confidence’’, that India could continue to support the Bengali guerrillas as well as the mass struggle. ‘Therfore, let us not bundle the two [issues] together, but give all possible help to the democratic forces … You are a politician, you know what I am implying.” স্পষ্টতই কোসিগিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি চান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বপ্রকারের সাহায্য দিতে- প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক রীতিসম্মত বাধ্যবাধতার চৌহদ্দি লঙ্ঘন না করেই। এ দেশে যারা মনে করেন এখনও যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের ভূমিকা কেবলমাত্র সীমিত ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের যুদ্ধের দিনগুলোতে ‘ভেটো প্রদানের’ মধ্যেই তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নয় মাসে সোভিয়েতের নানামুখী ভূমিকার গভীরতা ও মাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় ওয়াকিবহাল নন। এজন্যই বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সংগ্রামের মধ্যে এক আত্যন্তিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ মার্চ রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন : ‘আমাদের দেশের জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম করেছে, যে রক্ত দিয়েছে, যে ত্যাগ স্বীকার করেছে সে খবর তারা জানে এবং প্রত্যেক রাশিয়ার জনগণ তা জানে। রাশিয়ার জনসাধারণ আমার বাংলার জনসাধারণকে সেজন্য শ্রদ্ধা করে। এ জন্য শ্রদ্ধা করে যে রাশিয়াও রক্তের মাধ্যমে সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লবের মাধ্যমে তার দেশকে মুক্ত করেছিল। আমার সাড়ে সাত কোটি বাংলার মানুষও রক্ত দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে তার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্ত করেছে। সেজন্য তাদের সঙ্গে আমাদের অনেকটা নীতির মিল রয়েছে।’
এই ‘নীতির মিল’-এর থেকে কোনো কোনো বিদ্বজ্জন এ রকম ইঙ্গিত করার প্রয়াস পেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র বা বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত-ঘেঁষা নীতির রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রতিফলিত করেছে। খুঁটিয়ে দেখলে এ রকম সিদ্ধান্তের পেছনে তথ্য-উপাত্তের প্রমাণ মেলা ভার। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের Demonstration Effect-এর প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র-সম্পর্কিত ডিসকোর্সের ওপরে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্তর দশকের গোড়াকার সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রভাব নয়। লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের (এবং সাধারণভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ-নাজিবাদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত বিশ্ব সমাজতন্ত্রের) প্রভাব অনুভূত হয়েছিল গোটা পৃথিবীতেই। ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বের ঊপনিবেশবিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, বিশ্বজোড়া পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী শান্তির সংগ্রাম, ষাটের দশকের ছাত্র-যুবকদের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আন্দোলন, হো চি মিনের ভিয়েতনাম, গণচীনের উত্থান-পর্বে সোভিয়েতের সাহায্য, ফিদেল ও চে’র কিউবার আত্মপ্রকাশ, গ্যাগারিনের মহাকাশ-যাত্রা- সবকিছুর মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা এর উজ্জ্বল ভাবমূর্তির একটা প্রভাব পড়ে থাকবে এ দেশেও। বঙ্গবন্ধু এই প্রভাববলয়ের বাইরে ছিলেন না। স্ট্যালিনের ধারার ‘ব্যারাক সমাজতন্ত্রে’ মুজিবের কোনোদিনই আস্থা ছিল না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শোষণবিরোধী চরিত্রটি তার নজর কেড়েছিল সেই তরুণ বয়সেই। তারপর সময়ের সাথে সাথে এক নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদল তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ক্রমশ স্পষ্ট রূপ নিচ্ছিল। একে যেমন সুইডিশ মডেলের সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বলা চলে না, আবার সোভিয়েত কমান্ড ইকোনমির সমাজতন্ত্রও বলা ভুল হবে। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ভাবনায় evolutionary pattern বোঝার ক্ষেত্রে নিকটতম আকর-উৎস হচ্ছে ১৯৪৭-৭১ অবধি আওয়ামী লীগের ভেতরকার দলিলপত্র। সেদিকেই আমরা এতক্ষণ দৃষ্টি দেইনি, এবং সেদিকেই এখন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই আওয়ামী লীগের দলিলপত্রে সমাজতন্ত্রের শব্দাবলি ও ধারণার উদার ব্যবহার। এমনকি যখন আওয়ামী লীগ স্বনামে আত্মপ্রকাশ করেনি, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ রূপে সবে গঠিত হচ্ছে, সেই শুরুর পর্যায়ে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সমসাময়িক তরুণ বয়সী রাজনৈতিক কর্মীরা স্বপ্ন দেখেছেন সমাজতন্ত্রের। ১৯৪৯ সালের (২৩-২৪ জুন) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘খসড়া ম্যানিফেস্টো’ নানা দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সম্ভবত এটি রচনা করেন। রচনা যারই হোক না কেন, মুজিবের সমাজতন্ত্র ভাবনায় এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং খসড়াটিকে যৌথ-ভাবনার ফসল হিসেবেও দেখা যায়। স্মর্তব্য, তখন মুসলিম লীগের শাসন চলছে পূর্ব পাকিস্তানে; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পর পাকিস্তান বাহ্যত ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষিত। তরুণ মুজিব, শামসুল হক প্রমুখ দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীর প্রশ্রয়ে এই ইসলামী ডিসকোর্সের ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন ভাষা নির্মাণ করছেন। সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে এই প্রতিবাদের ভাষাভঙ্গির ভেতরেই। একগুচ্ছ উদাহরণ:
১. সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা : ‘ভারতে মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে … বিরুদ্ধ পরিবেশ বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবান্বিত ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহাদের ছিল না। … পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বা সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছে।’
২. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও বিশ্বশান্তি : ‘সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়গুলি, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোড়জোড় শুরু করিয়াছে। এই তোড়জোড় প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমরসজ্জা ও যুদ্ধঘাঁটি স্থাপনের মধ্য দিয়া। … পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচিত এই সাম্রাজ্যবাদী ও যুযুৎসু প্রচেষ্টাকে নিরুৎসাহ করা এবং ইহার বিরুদ্ধে দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পৃথিবীর সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ হইতে পৃথিবীকে মুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে অংশীদার হইতে হইবে এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের, সর্বব্যাপী বিজয় অভিযানকে জয়যুক্ত করিবার জন্য অন্যান্য জনতার গণতান্ত্রিক ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সর্বপ্রকার প্রগতিশীল ও জনকল্যাণকর আন্দোলন ও কর্মধারায় সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা করিতে হইবে।’
৩. ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ : (ক) ‘পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ তথা সর্বপ্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের বাহিরে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ হইবে।’ দেখা যাচ্ছে যে, লাহোর প্রস্তাবের ধারায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটকে নিয়ে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ গড়ার চিন্তা ছিল তরুণ মুজিব ও তার সহকর্মীদের; (খ) ‘পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে; (গ) ‘সাধারণতন্ত্র এবং জনসাধারণের পূর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত হইবে রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র।’
৪. ‘কাজ করার অধিকার’ : ‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র-নির্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।’ বলা দরকার, এই দলীয় কাজ করার অধিকারকে ‘মৌলিক অধিকারের’ মধ্যে ফেলা হয়েছিল। মৌলিক অধিকারের মধ্যে আরও ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, সর্বজনীন নির্বাচনী প্রথা, খাত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের জন্য বেকারবীমা ও পেনশন দান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং সহজলভ্য মাধ্যমিক শিক্ষা সকল নাগরিকদের জন্য), ধর্মীয় অধিকার, নারীর অধিকার (প্রত্যেক নারীকে পূর্ণতম সুযোগ ও সুবিধাদান; ‘প্রত্যেক চাকুরিয়া নারীকে সন্তান প্রসবের পূর্বে ও পরে পূর্ণ বেতনে বিদায় মঞ্জুর’)। ‘ধনসম্পদের অধিকার’; ইত্যাদি।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬৩

পূর্বে প্রকাশিতের পর
যে চিঠির কথা মুজিব এখানে বলছেন তা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। মুজিব এখানে একাধিক চিঠির কথা বলছেন। বস্তুতই একাধিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল সোভিয়েতের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরেই। আমরা সচরাচর যে চিঠির কথা মনে রেখেছি, তা হলো ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিলে লেখা সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নির চিঠি। ইয়াহিয়াকে উদ্দেশ করে লেখা এ চিঠিতে পদগর্নি সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘চরম দুর্ভাবনা’ (Great alarm) ব্যক্ত করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, ইয়াহিয়া জরুরি ভিত্তিতে এমন ব্যবস্থা নেবেন যাতে করে রক্তপাত ও নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করা হবে : ‘Podgorny urged Yahya to take the most urgent measures to stop the bloodshad and repression against the population in East Pakistan and for turning to methods of a peaceful political settlement.’ এটা বলে পদগর্নি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তিনি পাকিস্তানের ব্যাপারে তার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কেবল বিশ্ব-মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে : ‘Podgorny added that he was guided by ”the genarally recognized humanitarian principles recorded in the universal declaration of human rights.’’

যেটা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়নি সেটা হলো পদগর্নির চিঠির আগেও একটি প্রতিবাদ বার্তা গিয়েছিল রুশ প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছ থেকে। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরুর দুই দিন বাদেই করাচিতে অবস্থানরত সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের মাধ্যমে ইয়াহিয়ার কাছে একটি মৌখিক বার্তা পাঠান প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন। শ্রীনাথ রাঘবনের বই থেকে সেই মৌখিক বার্তার বিষয়বস্তুটি নিচে তুলে ধরছি :
‘Kosygin had stated that Òextreme measures taken by the military administration and continuation of bloodshed in East Pakistan will not solve the existing complicated problems.’’ He asked Yahya to Òtake immediate measures for the cessation of bloodshed in East Pakistan and for the resumption of negotiations.’’ পরবর্তীতে নয় মাস ধরে বাংলাদেশকে ঘিরে সোভিয়েতের উদ্যোগে অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় চলবে ভারত সরকারের সাথে- যার সম্পর্কে মুজিব পরবর্তীকালে বিস্তারিত জেনেছিলেন। স্থানাভাবে এখানে একটি উদাহরণের কেবল উল্লেখ করব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ‘নেপথ্যের পরামর্শদাতার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটা এ থেকে স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৮ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং গিয়েছেন মস্কোয় বাংলাদেশ বিষয়ে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের সাথে আলাপ-আলোচনা করতে। শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পূর্ব বাংলার সংকটের সমাধানের জন্য একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো- এই দুটি পরস্পর সম্পর্কিত ইস্যুতে কোসিগিন পরামর্শ দিলেন আপাতত দুটি ইস্যুকে আলাদা করে নিষ্পত্তির চেষ্টা হোক। কোসিগিন বললেন,‘Refugees must go back, all of them, every one of them’- এটার ওপরেই প্রথমে জোর দিতে হবে। তবে এর সাথে সাথে দ্বিতীয় ইস্যুর ওপরেও কাজ করতে হবে। যদিও পাকিস্তান বলবে যে, রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলে আসলে তার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ নাক গলানো হচ্ছে, তা সত্ত্বেও ভারতের উচিত হবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে সাহায্য করে যাওয়া’ :  Kosygin suggested, Òin strict confidence’’, that India could continue to support the Bengali guerrillas as well as the mass struggle. ‘Therfore, let us not bundle the two [issues] together, but give all possible help to the democratic forces … You are a politician, you know what I am implying.” স্পষ্টতই কোসিগিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি চান বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বপ্রকারের সাহায্য দিতে- প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক রীতিসম্মত বাধ্যবাধতার চৌহদ্দি লঙ্ঘন না করেই। এ দেশে যারা মনে করেন এখনও যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েতের ভূমিকা কেবলমাত্র সীমিত ছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের যুদ্ধের দিনগুলোতে ‘ভেটো প্রদানের’ মধ্যেই তারা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নয় মাসে সোভিয়েতের নানামুখী ভূমিকার গভীরতা ও মাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট মাত্রায় ওয়াকিবহাল নন। এজন্যই বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সংগ্রামের মধ্যে এক আত্যন্তিক যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ মার্চ রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন : ‘আমাদের দেশের জনসাধারণ স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম করেছে, যে রক্ত দিয়েছে, যে ত্যাগ স্বীকার করেছে সে খবর তারা জানে এবং প্রত্যেক রাশিয়ার জনগণ তা জানে। রাশিয়ার জনসাধারণ আমার বাংলার জনসাধারণকে সেজন্য শ্রদ্ধা করে। এ জন্য শ্রদ্ধা করে যে রাশিয়াও রক্তের মাধ্যমে সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লবের মাধ্যমে তার দেশকে মুক্ত করেছিল। আমার সাড়ে সাত কোটি বাংলার মানুষও রক্ত দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে তার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্ত করেছে। সেজন্য তাদের সঙ্গে আমাদের অনেকটা নীতির মিল রয়েছে।’
এই ‘নীতির মিল’-এর থেকে কোনো কোনো বিদ্বজ্জন এ রকম ইঙ্গিত করার প্রয়াস পেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র বা বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইন্দিরা গান্ধীর সোভিয়েত-ঘেঁষা নীতির রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রতিফলিত করেছে। খুঁটিয়ে দেখলে এ রকম সিদ্ধান্তের পেছনে তথ্য-উপাত্তের প্রমাণ মেলা ভার। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের Demonstration Effect-এর প্রভাব নিশ্চিতভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র-সম্পর্কিত ডিসকোর্সের ওপরে পড়েছিল। কিন্তু তা সত্তর দশকের গোড়াকার সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রভাব নয়। লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের (এবং সাধারণভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ-নাজিবাদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত বিশ্ব সমাজতন্ত্রের) প্রভাব অনুভূত হয়েছিল গোটা পৃথিবীতেই। ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন, তৃতীয় বিশ্বের ঊপনিবেশবিরোধী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, বিশ্বজোড়া পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী শান্তির সংগ্রাম, ষাটের দশকের ছাত্র-যুবকদের এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট আন্দোলন, হো চি মিনের ভিয়েতনাম, গণচীনের উত্থান-পর্বে সোভিয়েতের সাহায্য, ফিদেল ও চে’র কিউবার আত্মপ্রকাশ, গ্যাগারিনের মহাকাশ-যাত্রা- সবকিছুর মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা এর উজ্জ্বল ভাবমূর্তির একটা প্রভাব পড়ে থাকবে এ দেশেও। বঙ্গবন্ধু এই প্রভাববলয়ের বাইরে ছিলেন না। স্ট্যালিনের ধারার ‘ব্যারাক সমাজতন্ত্রে’ মুজিবের কোনোদিনই আস্থা ছিল না। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শোষণবিরোধী চরিত্রটি তার নজর কেড়েছিল সেই তরুণ বয়সেই। তারপর সময়ের সাথে সাথে এক নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদল তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ক্রমশ স্পষ্ট রূপ নিচ্ছিল। একে যেমন সুইডিশ মডেলের সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বলা চলে না, আবার সোভিয়েত কমান্ড ইকোনমির সমাজতন্ত্রও বলা ভুল হবে। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্রের ভাবনায় evolutionary pattern বোঝার ক্ষেত্রে নিকটতম আকর-উৎস হচ্ছে ১৯৪৭-৭১ অবধি আওয়ামী লীগের ভেতরকার দলিলপত্র। সেদিকেই আমরা এতক্ষণ দৃষ্টি দেইনি, এবং সেদিকেই এখন দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই আওয়ামী লীগের দলিলপত্রে সমাজতন্ত্রের শব্দাবলি ও ধারণার উদার ব্যবহার। এমনকি যখন আওয়ামী লীগ স্বনামে আত্মপ্রকাশ করেনি, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ রূপে সবে গঠিত হচ্ছে, সেই শুরুর পর্যায়ে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সমসাময়িক তরুণ বয়সী রাজনৈতিক কর্মীরা স্বপ্ন দেখেছেন সমাজতন্ত্রের। ১৯৪৯ সালের (২৩-২৪ জুন) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ‘খসড়া ম্যানিফেস্টো’ নানা দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সম্ভবত এটি রচনা করেন। রচনা যারই হোক না কেন, মুজিবের সমাজতন্ত্র ভাবনায় এটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং খসড়াটিকে যৌথ-ভাবনার ফসল হিসেবেও দেখা যায়। স্মর্তব্য, তখন মুসলিম লীগের শাসন চলছে পূর্ব পাকিস্তানে; দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পর পাকিস্তান বাহ্যত ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষিত। তরুণ মুজিব, শামসুল হক প্রমুখ দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীর প্রশ্রয়ে এই ইসলামী ডিসকোর্সের ভেতরে থেকেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন ভাষা নির্মাণ করছেন। সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হচ্ছে এই প্রতিবাদের ভাষাভঙ্গির ভেতরেই। একগুচ্ছ উদাহরণ:
১. সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা : ‘ভারতে মুসলমানগণ বহু শতাব্দীর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা হইতে … বিরুদ্ধ পরিবেশ বা দারুল হরবের পরিবর্তে ইসলামিক পরিবেশ বা দারুল ইসলাম কায়েম করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিল কিন্তু পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হইলেও শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের জন্য প্রতিষ্ঠিত করিবার এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও শিক্ষা প্রভাবান্বিত ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়িয়া তুলিবার ইচ্ছা তাহাদের ছিল না। … পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বা সত্যিকার মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছে।’
২. সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও বিশ্বশান্তি : ‘সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়গুলি, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের তোড়জোড় শুরু করিয়াছে। এই তোড়জোড় প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়া বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রিত করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমরসজ্জা ও যুদ্ধঘাঁটি স্থাপনের মধ্য দিয়া। … পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচিত এই সাম্রাজ্যবাদী ও যুযুৎসু প্রচেষ্টাকে নিরুৎসাহ করা এবং ইহার বিরুদ্ধে দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পৃথিবীর সমস্ত দেশের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ হইতে পৃথিবীকে মুক্ত করার সমস্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানকে অংশীদার হইতে হইবে এবং শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের, সর্বব্যাপী বিজয় অভিযানকে জয়যুক্ত করিবার জন্য অন্যান্য জনতার গণতান্ত্রিক ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সর্বপ্রকার প্রগতিশীল ও জনকল্যাণকর আন্দোলন ও কর্মধারায় সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা করিতে হইবে।’
৩. ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ : (ক) ‘পাকিস্তান ব্রিটিশ কমনওয়েলথ তথা সর্বপ্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের বাহিরে একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ হইবে।’ দেখা যাচ্ছে যে, লাহোর প্রস্তাবের ধারায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ইউনিটকে নিয়ে একটি ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংঘ’ গড়ার চিন্তা ছিল তরুণ মুজিব ও তার সহকর্মীদের; (খ) ‘পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে; (গ) ‘সাধারণতন্ত্র এবং জনসাধারণের পূর্ণ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে রচিত হইবে রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র।’
৪. ‘কাজ করার অধিকার’ : ‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র-নির্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।’ বলা দরকার, এই দলীয় কাজ করার অধিকারকে ‘মৌলিক অধিকারের’ মধ্যে ফেলা হয়েছিল। মৌলিক অধিকারের মধ্যে আরও ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা, সর্বজনীন নির্বাচনী প্রথা, খাত নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের জন্য বেকারবীমা ও পেনশন দান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার (অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং সহজলভ্য মাধ্যমিক শিক্ষা সকল নাগরিকদের জন্য), ধর্মীয় অধিকার, নারীর অধিকার (প্রত্যেক নারীকে পূর্ণতম সুযোগ ও সুবিধাদান; ‘প্রত্যেক চাকুরিয়া নারীকে সন্তান প্রসবের পূর্বে ও পরে পূর্ণ বেতনে বিদায় মঞ্জুর’)। ‘ধনসম্পদের অধিকার’; ইত্যাদি।
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬২
 পূর্বে প্রকাশিতের পর
দেখা যাচ্ছে উদারনৈতিক সমাজতন্ত্রী কাজী আবদুল ওদুদ আজ থেকে একশ’ বছর আগে সাধারণ জনমানুষের উত্থানকে ঠিকই চিনে নিতে পেরেছিলেন। আবার সেই উত্থানের সাথে জড়িত সামাজিক সম্ভাবনার পাশাপাশি ‘অসহিষ্ণুতা’ ও ‘অতিরিক্ততা’ প্রভৃতি সমস্যাকেও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, ওদুদ এখানে ‘বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক’ জাগরণের কথা বলছেন না। ওই প্রবন্ধেই ওদুদ লিখেছেন, ‘গণশক্তির জাগরণের ফলে অনেক কালের বুভুক্ষু দীন-পতিতের দলের একটা বিপুল ভোজের আয়োজন হইয়াছে। ভারতের জনগণও সেই উৎসবকে অবহেলা করিতে পারিবে না। … ভারতে কেন সমস্ত দুনিয়ার মধ্যাহ্ন দিনের মত গণশক্তির সুপ্রকাশ ও সেই গণশক্তির মূর্ত স্বরূপ গণতন্ত্রের অবাধ কর্ম চেষ্টাই চিরাচরিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইবে।’
তার চয়নকৃত ‘গণশক্তির’ ধারণাটি প্রকারান্তরে পরবর্তী কালের বঙ্গবন্ধুর ‘শোষিতের গণতন্ত্রের’ দিকেই নির্দেশ করছে। বঙ্গবন্ধুর মতোই ওদুদের চিন্তাতেও গণতন্ত্রকে গণশক্তির জাগরণের সমার্থক ধারণা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে :
‘ … গণশক্তি ও গণতন্ত্রের ভেতর দিয়া বিশ্বমানব সম্বন্ধে যে একটা সত্যের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে, তাহা মানুষের সাধারণ বিত্তস্বরূপ অতঃপর সকল দেশের মানুষের পক্ষেই সুসঙ্গত হইবে; তবু … এই গণতন্ত্রের সত্যটি উপলব্ধি করিবার জন্যও তাহাদিগকে স্ব স্ব চিরন্তন ধারা অবলম্বন করিয়া অগ্রসর হইতে হইবে। … আমরা বুঝিয়া দেখিয়াছি যে, গণতন্ত্রের গোড়ার কথা হইতেছে আপামর সাধারণের উন্নত মানুষের সুখ-সুবিধার ভাগী হইবার আকাঙ্ক্ষা ও সেই আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তির জন্য রাজশক্তির পরিচালনা। … এক কথায় যে গণতন্ত্র চিরকালের মানুষের প্রাণের কামনা দিয়া গড়া, শুধু আধুনিক ইউরোপে উহা কতকটা মূর্ত হইয়া উঠিয়া আপন সৌন্দর্য ঐশ্বর্য ঘোষণা করিতেছে, ভারতের জনগণকেও সেই গণতন্ত্রের সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার অমৃত ফল ভোগ করিয়া ইহকালের জীবনের এক অভিনব স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে।’
এখানে ওদুদ ফরাসি বিপ্লবের ‘সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার’ প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব যে বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় যুগপৎ ফরাসি বিপ্লব ও অক্টোবর বিপ্লব গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। এই সংবিধানে লিবারেল ডেমোক্রেসি ও সমাজতন্ত্র তথা সমতামুখিন সমাজের আকাঙ্ক্ষার যুগপৎ প্রতিফলন ঘটেছিল। এই সংবিধানের ভেতরে গণতন্ত্রের সামাজিক সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার পাশাপাশি মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকারের প্রথম প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। এক্ষণে আমরা আমাদের বয়ানের মূল আখ্যানভাগে প্রবেশ করছি।
৬. বাহাত্তরের সংবিধানের ‘সমাজতন্ত্র’:প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র
১৯৪৯ সালে বিখ্যাত বামপন্থি সাময়িকী ‘মান্থলি লেবার রিভিউ’ প্রথম প্রকাশিত হয়। এর প্রথম খণ্ডের প্রথম সংখ্যার লেখাটি লিখেছিলেন কোনো প্রথাগত সমাজতন্ত্রী নন- স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইন। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে, আমার ধারণা, এর দ্বিতীয় লেখাটি লিখতেন। আইনস্টাইনের লেখাটির শিরোনাম ছিল- ‘হোয়াই সোশ্যালিজম?’ কেন সমাজতন্ত্র চাই। তার কারণগুলো আইনস্টাইন সহজ ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। আজকের দিনে হলে অবশ্য বিতর্ক ঘনীভূত হতো সমাজতন্ত্র কী- হোয়াট ইজ সোশ্যালিজম- এই প্রশ্নকে ঘিরেই। অমর্ত্য সেন, এলান বাদিউ, জন রোমার, প্রণব বর্ধন, বা আমাদের দেশে আজিজুর রহমান খান, নজরুল ইসলাম সমাজতন্ত্র কী বা কী নয়, এ নিয়ে হয়তো বিতর্কে প্রবেশ করতেন। কিন্তু এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে হচ্ছে মানুষের এক সরল সাধারণ নিত্যকালের তাগিদ- ‘শোষণমুক্ত সমাজের’ স্বপ্ন দেখা। সমাজতন্ত্র শব্দটি সেই সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। সমাজতন্ত্রের ধারণা, কর্মসূচি, অর্থনৈতিক কলাকৌশল, রাজনৈতিক প্রেরণা যুগে যুগে বদল হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তার আকাঙ্ক্ষার মতো বড় এবং এই অর্থে সমাজতন্ত্রের চেয়ে সমতার আকাঙ্ক্ষা প্রাচীনতর মৌলিক তাগিদ। এর জন্য দীর্ঘকালের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া কোনো বড় কিছু ব্যাপার নয় মানবজাতির জন্যে। বারবার একথাই বলা হয়েছিল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে। তিনি ও তার সহকর্মীরা যখন সংবিধানের ওপরে বিতর্ক করেছেন, বারবার তারা শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন ও সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত ও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু শুধু কথার সমষ্টি নয়, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাগুলো পরিশীলিত হয়ে শুধু অভিপ্রায়ে সীমিত না থেকে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারায় সংযোজিত হয়েছে। দেশের আইনকানুন, আর্থিক নীতিমালা, সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্যোগ সবকিছু বিচার করার আইনি মানদণ্ড দাঁড় করায় সে দেশের সংবিধান। কোনটা মূল আদর্শ ((Fundamental Principles),), কোনটা মূলনীতি (Fundamental Policy), কোনটা ধারার মধ্যে, কোনটি উপধারা হিসেবে সংযোজিত হবে তা নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা, তর্কবিতর্কের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। আমি নিচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা-উপধারা ও এ-সম্পর্কিত তর্কবিতর্ক সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
এটুকু লিখেই আমাকে থামতে হলো। সংবিধানের সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্যের আলোচনায় প্রবেশের আগে একটি জরুরি বিষয় মীমাংসা করা দরকার। বঙ্গবন্ধুর সমতামুখী আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে বুঝতে চেয়ে আমি ফিরে তাকিয়েছি পূর্বসূরি বাঙালি চিন্তকদের সাম্যচিন্তার প্রতি। প্রথাগতভাবে কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী না হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের চিন্তায় সাম্যের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছিল এটা দেখানোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা সপ্রমাণিত করা যে, বাংলায় পূর্বাপর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। যাদের কথা উলেল্গখ করেছি, তারা ছাড়াও আরও অনেকে এখানে আলোচনার দাবী রাখেন। মুজিব এই ঐতিহ্যের আলো-হাওয়াতেই বেড়ে উঠেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের ‘সমাজতন্ত্র’ স্তম্ভটির সংযোজন ছিল সেই ঐতিহ্যগত সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই যৌক্তিক পরিণতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্র সম্পর্কিত ধারণার আরও একটি ‘নিকট-উৎস’ ছিল। আওয়ামী লীগের মতাদর্শ ও রাজনীতির বিবর্তনের ধারাতেই সেটি খুঁজে পাওয়া যায়। বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্রকে অধ্যাপক নুরল ইসলাম (একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও এ দেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান) তার এক লেখায় বলেছিলেন-‘Evolutionary Socialism’। কথাটা দ্ব্যর্থবোধক। এক অর্থে এটি   ‘Revolutionary Socialism’-এর বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রকে অবিপ্লবী ‘বিবর্তনমূলক’ মতবাদ হিসেবে শনাক্ত করার চেষ্টা। অন্য অর্থে, এটি সমাজতন্ত্রের গোটা ধারণাকেই ‘evolution’ বা বিবর্তনের ধারায় দেখার দিকে তাগিদ দেয়- তা তার রূপ কখনও ‘বিপ্লবী’ কখনও ‘অবিপ্লবী’ যে চেহারাই নিক না কেন। বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে সমাজতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। এটা কোনো বিস্ময়কর বা কাকতালীয় ব্যাপার ছিল না। আমি অবশ্য কোনো কোনো বিদ্বজ্জনকে বলতে শুনেছি যে বাহাত্তরের সমাজতন্ত্র আসলে হচ্ছে সত্তর দশকের গোড়াকার জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রভাবের (যুগের হাওয়ার) ফসল। এটি কোনো ভাবাদর্শগত অবস্থানের যৌক্তিক পরিণতি নয়। এ ক্ষেত্রে সে সময়ের নানা ঘটনাকে তারা চিহ্নিত করে থাকেন। যেমন, ১৯৭২-র আগেই ইন্দিরা কংগ্রেস নেহরু-যুগের সমাজতন্ত্রের তুলনায় আরও একটু ‘বাম দিকে’ ঝুঁকে পড়তে শুরু করেছিল। উদাহরণত ১৯৬৯ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বিদেশি ব্যাংক-বীমাসমূহ জাতীয়করণ করে নেয় এবং দেশের ভেতর মনোপলি পুঁজির ক্ষমতাও অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ‘গরিবী হঠাও’ সে সময়কার জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে ওঠে। ইন্দিরার ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতাদের মধ্যে পিএন হাকসার ও ডিপি ধর বামঝোঁকের আমলা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন এবং এদেরকে সাধারণভাবে ‘মস্কোপন্থি’ হিসেবে ভাবা হতো। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারত সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সোভিয়েতের সক্রিয় সমর্থন, ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে যখন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ চলছে, তখন যুদ্ধবিরতি আনার পাক-মার্কিন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সোভিয়েতের তিন-তিনবার ভেটো প্রদান ঢাকার পতনকে কূটনৈতিক-সামরিক দিক থেকে অনিবার্য করে তোলে। রুদ্ধশ্বাস ১৩-১৪-১৫ ডিসেম্বরের দিনগুলিতে মিত্রবাহিনী যখন ঢাকা অভিমুখে দ্রুতগতিতে অগ্র্রসর হচ্ছে, তখনও ইয়াহিয়া ও নিয়াজী আশা করছিলেন শেষ মুহূর্তের যুদ্ধবিরতির। কিন্তু সোভিয়েতের ভেটো তা হতে দেয়নি। এমনকি অপেক্ষাকৃত নিউট্রাল অবস্থানে থাকা ব্রিটেন ও ফ্রান্স ১৫ ডিসেম্বর- অর্থাৎ চূড়ান্ত বিজয়ের এক দিন আগে- একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের খসড়া আনে, যা গৃহীত হলে বাংলাদেশের বিজয়-অর্জন অনেকাংশে বিঘ্নিত হতে পারত। ব্রিটেন-ফ্রান্সের আনা প্রস্তাব ‘Called for an immediate ceasefire and withdrawal of forces, and for ‘the urgent conclusion of a comprehensive political settlement in accordance with the wishes of the people concerned as declared through their elected and acknowledged representatives.’ এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল যে ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের এই উদ্যোগ রাও ফরমান আলীর প্রস্তাবের চেয়েও নিকৃষ্ট (‘more retrograde than even Farman Ali proposal’) যেখানে অস্পষ্ট ভাষায় Political settlement-র কথা বলা হয়েছে :Even the ‘barest anatomy of the political settlement’ was unspecificd. ইন্দিরা গান্ধী সেই রাতেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হীথ এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পম্পিদুর কাছে জরুরি তারবার্তা পাঠিয়ে অনুরোধ করেন যাতে করে এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব জাতিসংঘে না তোলা হয়। ঢাকার পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোতে সোভিয়েতের দৃঢ় ভূমিকা বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘গ্যারান্টি’ হিসেবে কাজ করেছিল। শ্রীনাথ রাঘবন তার গুরুত্বপূর্ণ বই ‘1971 : A Global History of the Creation of Bangladesh’ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনেক অজানা তথ্য পরিবেশন করেছেন। ‘নিরপেক্ষ’ ইতিহাসবিদের অবস্থান নিতে গিয়ে অনেক সময় তিনি মূলধারাকে উপধারায় পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তারপরও সেসব সন্নিবেশিত তথ্যের মাঝে ডিসেম্বরের যুদ্ধরত দিনগুলোতে সোভিয়েতের সুদৃঢ় ও প্রায় নির্ধারক ভূমিকা সবকিছু ছাপিয়ে ফুটে ওঠে। বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে এ নিয়ে স্পষ্ট করে বলেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের এক ভাষণে : ‘আমি স্মরণ করি রাশিয়ার জনসাধারণ ও সরকারকে। যারা নিশ্চিতভাবে আমাদের সাহায্য করেছে। তারা প্রকাশ্যে আমাদের গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন এবং বাংলাদেশে ধ্বংসলীলা করার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছেন। … এমনকি জাতিসংঘে রাশিয়া তিনটি ভেটো দিয়েছিল, তা না হলে সেখানে যে ষড়যন্ত্র চলছিল, তাতে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতো তা বলতে পারি না।’ এর কিছুদিন আগে ৯ এপ্রিল ১৯৭২ ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু একইভাবে সোভিয়েতের উদ্যোগী ভূমিকার কথা স্মরণ করেন :
‘সোভিয়েতের জনসাধারণ ও সরকার শুধু যে আমাদের সাহায্য করেছিলেন তাই নয়। যখন সংগ্রাম করতেছিল বাংলাদেশের জনগণ, যখন আমাকে এখান থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় মেশিনগান দিয়ে, তখন প্রথম দেশ, প্রথম দেশের প্রথম নেতা হিসেবে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ করে ইয়াহিয়া খানের কাছে অনেক চিঠি পাঠান এবং মানুষ খুন বন্ধ করার আবেদনও করেন।’

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬১
 পূর্বে প্রকাশিতের পর
প্রথম মহাযুদ্ধের কালের ‘লড়াইয়ের মূল’ প্রবন্ধে তিনি প্রতীকী ভাবে লিখেছিলেন :’সম্প্রতি পৃথিবীতে বৈশ্যরাজক যুগের পত্তন হইয়াছে। বাণিজ্য এখন আর নিছক বাণিজ্য নহে, সাম্রাজ্যের সঙ্গে একদিন তার গান্ধর্ব বিবাহ ঘটিয়া গেছে।’ এই একই জিনিস দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও। এর কারণ- আমি যুক্তি দেখাবো যে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই এক্ষেত্রে ছিলেন একই পথের অনুসারী- গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলার মানুষ। এক্ষেত্রে দুজনেরই সামন্তবাদবিরোধী, উপনিবেশেবাদ বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্পষ্ট অবস্থান ছিল। বয়সের সাথে সাথে দু’জনেই অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের পথকে অপরিহার্য বলে মনে করেননি। জনকল্যাণের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মূল মূল দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্মৃত হননি এবং বলা বাহুল্য, দুজনেই এক শোষনমুক্ত ও সুষম বন্টনের ন্যায়পরায়ণ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান থেকেই জাতীয় অর্থনৈতিক সর্বোচ্চ স্বার্থ অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু ‘জোট-নিরপেক্ষ নীতিকে’ আঁকড়ে ধরেছিলেন। একটি উদাহরণ দেই। দেশের দুর্দিনে মানুষকে বাঁচানোর জন্যে বিদেশী সাহায্য চাওয়া যায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এড়াতে বঙ্গবন্ধুর সরকার কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্য-সাহায্যের প্রত্যাশা করে নাই? কিন্তু সেই সাহায্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বে এসেছিল। তখন যা ক্ষতি হবার তা হয়ে গেছে। তারপরও মুজিব কারো সাথে বৈরী সম্পর্ক চাননি। ১৯৭৫ সালে বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘কারো সঙ্গে দুশমনি নাই। চায়না রিকগনিশন দিলো না। কিন্তু আমরা চায়নার সাথে বন্ধুত্ব চাই। তারা একটা বিগ কান্ট্রি। আমরা এখনো বন্ধুত্ব চাই। আমাদের সাথে বন্ধুত্ব আছে রাশিয়ার, আমার বন্ধুত্ব আছে ভারতবর্ষের সাথে, আমার বন্ধুত্ব আমেরিকার সাথে। এ বন্ধুত্ব সকলের সাথে চাই। আমরা কারো সাথে গোলমাল করতে চাই না। কারণ, আমি আমার দেশকে গড়তে চাই।’ একথা বলার অর্থ এটা ছিল না যে বঙ্গবন্ধু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিষয়ে নমনীয় ছিলেন। সেই একই বক্তৃতায় তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন: ‘যেখানে কোন অপ্রেসড ইন্টারন্যাশনাল পিপল থাকবে, আমরা তাদের মরাল সমর্থন দিতে পারি এবং দেব। যেখানেই থাকুক না কেন, আমরা দেব। আমরাও অপ্রেসড পিপল। আমরাও যুগ যুগ ধরে এটার সাথে পরিচিত। আমরাও মার খেয়েছি। দুনিয়ার শোষক-গোষ্ঠী, ইম্পিরিয়ালিস্ট পাওয়ার- আমাদের সম্পদ লুট করে নিয়েছে।’ মার্কিন চাপকে অগ্রাহ্য করে তিনি সেদিনই বলেছিলেন, (যাতে তারা বুঝতে পারে সেজন্য ইংরেজিতেই বলেছিলেন) ‘আমি বিশ্বাস করি, ক্যাম্বোডিয়া, আই শুড রিকগনাইজ ইট। আই ডোন্ট কেয়ার এনিবডি ইন দি ওয়ার্ল্ড হোয়েদার এনিবডি ইজ স্যাটিসফায়েড অর এনিবডি ইজ আনহ্যাপি অর এনিবডি ইজ হ্যাপি। আই ফিল দ্যাট দে আর ফাইটিং ফর দেয়ার ওন লিবার্টি। আই অ্যাম ইউথ দেম। আই সাপোর্ট পিআরজি [গ্রানাডা]। আই গিভ দেম রিকগনিশন বিকজ আই অ্যাম এ সাফারার, আই অ্যাম এ সাফারার ফর জেনারেশন টু জেনারেশন ফর দিস বেঙ্গলি নেশন। যে যুদ্ধ করছে তার মাতৃভূমির জন্য, তাকে সমর্থন দেবো। তাই বলে অন্যকে গালাগালি করবো না।’
এর থেকে একটা দিক স্পষ্ট হয়ে আসে। কারো প্রতি বৈরীতা নয়- এ নীতির অর্থ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ন্যায়-নীতির পক্ষ সমর্থন করা থেকে নিজেকে সংকুচিত করা নয়। শোষিত জনগণের  Self determination-এর আন্দোলনকে সমর্থন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব- ইমানুয়েল কান্টের সর্বোচ্চ নৈতিক ‘ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ’। অন্যের ন্যায্য সংগ্রামে নিশ্চুপ থাকাটা মুজিবের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের রুচিতে বাঁধে। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আই বিলিভ ইন পজিটিভ অ্যাপ্রোচ, নট এ নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ।’ তারপরেও ইকনমিক ইম্পিরিয়ালিজম সম্পর্কে বলতে ছাড়েননি। স্বল্পোন্নত দেশের স্বার্থবিরোধী এক জটিল আন্তর্জাতিক আবর্তে পড়ে দেশ তখন প্রবল সংকটের মুখে। ‘অবজেকটিভ পরিস্থিতি’ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সচেতন ছিলেন :
‘টাকা ছাপিয়ে বাড়িয়ে দিলেই তো দেশের মুক্তি হবে না। ইনফ্লেশন হবে। প্রোডাকশন বাড়াতে পারলে তারপরেই আপনাদের উন্নতি হবে। না হলে উন্নতি হবে না। … যেমন আমরা আজকে দেখেছি। কপাল। আমাদের কপাল। আমরা গরিব দেশ তো। আমাদের কপাল- আমাদের পাটের দাম নাই। আমার চায়ের দাম নাই। আমরা বেঁচতে গেলে অল্প পয়সায় আমাদের বিক্রি করতে হয়। আর আমি যখন কিনে আনি- যারা বড় বড় দেশ, তারা তাদের জিনিসের দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়। আমরা বাঁচতে পারি না। আমরা এই জন্য বলি, তোমরা মেহেরবানি করে যুদ্ধের মনোভাব বন্ধ করো। আরমানেন্ট রেস বন্ধ করো। তোমরা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করো। ওই সম্পদ দুনিয়ার দুঃখী মানুষকে বাঁচাবার জন্য ব্যয় করো। তাহলে দুনিয়ায় শান্তি ফিরে আসবে। আজকে তোমরা মনে করছো আমরা গরিব… যে দামেই হোক আমাকে বিক্রি করতে হবে। এইদিন থাকবে না।… যদি ডেভেলপ করতে পারি, ইনশাল্লাহ এই দিন থাকবে না। … আমরা এখানে না খেয়ে মরি, আমাদের ইনফ্লেশন হয়, আমরা বাঁচতে পারি না। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যাই, তোমরা কিছু খয়রাত দিয়ে একটু মিষ্টি হাসো। হাসো, হাসো। দুঃখে পড়েছি, বিক্রিতো হয়েছি। তোমাদের কাছে হাত পাততে হবে, হাসো। অনেকে হেসেছে- যুগ যুগ ধরে হেসেছে। হাসো।’ এত দুঃখ-বিলাপের মধ্যেও পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের উদ্দেশ্য করে বলতে ছাড়েননি : ‘আরব ভাইদের সাথে আমরা একাত্মতা ঘোষণা করছি। প্যালেস্টাইনের আরব ভাইদের ন্যায্য দাবি সমর্থন করে বাংলার মানুষ। আরব ভাইদের পেছনে তারা থাকবে প্যালেস্টাইন উদ্ধার করার জন্য। এও আমাদের পলিসি। যেখানে নির্যাতিত দুঃখী মানুষ সেখানে আমরা থাকবো।’ এতে করে কেউ যদি তাকে সোভিয়েত শিবিরের সমর্থক ভাবে সেটা তাদের তাকে বোঝার সমস্যা- তিনি তাতে একটুকু বিচলিত নন। এই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ‘আন্তর্জাতিক নীতি’- একে নিছক জাতীয় স্বার্থরক্ষার বাস্তববাদী  ‘Foreign Policy’ বললে তার দৃষ্টিভঙ্গীকে অত্যন্ত সংকীর্ন গণ্ডিতে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করা হবে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী- একথা ভুললে চলবে না।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে আরও একটি নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও প্রথাগত অর্থে বামপন্থি ছিলেন না। মন-মানসিকতার দিক থেকে তিনি ‘লিবারেলদের মধ্যে লিবারেল’- উদারনৈতিক চিন্তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি হচ্ছেন মনস্বী কাজী আবদুল ওদুদ। এক বৈদগ্ধ্যপূর্ণ পরিশীলিত মানবিকতা তার সমস্ত লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। ওদুদের উদারনৈতিক চিন্তার নমুনা হিসেবে একটি উদাহরণ দেওয়া এখানে হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘সংস্কৃতির কথা’ প্রবন্ধের শেষটায় তিনি এভাবে উত্থাপন করেছেন তার ৫ দফা। উদ্ৃব্দতিটি কৌতূহলোদ্দীপক।
‘আজকার অসার্থক সংস্কৃতি-চিন্তার স্তর থেকে সার্থক সংস্কৃতি-চিন্তার স্তরে উপনীত হতে হলে যে সব ধাপ আমাদের অতিক্রম করতে হবে, তার কিছু নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে এই ভাবে :
১. দেশে অভুক্ত ও কর্মহীন কেউ থাকবে না।
২. একান্ত বীভৎস না হলে কোনো সমাজেরই ধর্মাচার অশ্রদ্ধেয় বিবেচিত হবে না, সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে হবে, যা প্রাচীন তা প্রাচীন বলেই বরণীয় নয়, বরণীয় তার বর্তমান কার্যকারিতার জন্যে।
৩. হিন্দু-মুসলমানের পোশাক ও নামের ব্যবধান থাকবে না অথবা অস্বীকার হবে।
৪. সামাজিক আদান-প্রদান- বিবাহ-আদি সমেত- সর্বত্র সহজ হবে।
৫. আইন সমস্ত দেশের জন্য এক হবে।’
১৯৪১ সালের লেখায় কাজী আবদুল ওদুদের এরকম দৃষ্টিভঙ্গি সেকালে এবং একালেও সর্বত্র দৃশ্যমান নয়। কিন্তু এ রকম বুদ্ধিবৃত্তিক মানসিকতার প্রাক-পটভূমি ছাড়া আওয়ামী মুসলিম লীগ অনায়াসে আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত হতে পারত না, বা বাহাত্তরের সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অসাম্প্রদায়িকতা ও সর্ব ধর্ম স্বীকারের সেক্যুলার আদর্শ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেত না, এ কথা হলফ করে বলা যায়। এটা ঠিক যে, যে পরিমাণে মনোযোগ ওদুদকে আমাদের দেওয়ার কথা তা তিনি সেভাবে কখনোই পাননি। হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য বিষয়ে ১৯৩৫ সালে বিশ্বভারতীর ‘নিজাম বক্তৃতা’ দেওয়ার জন্য ওদুদ সাহেবকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এ দেশের সংবিধানে পরবর্তীকালে সংযোজিত সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ যুক্ত হওয়ার পেছনের সামাজিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজতে গেলে ওদুদের দ্বারস্থ আমাদের হতে হবেই। যাই হোক, দেশভাগের এক বছর আগে তার ‘গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে’ প্রবন্ধে উদারনীতিবাদী কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন : ‘নাৎসী আদর্শের চাইতে বোলশেভিক আদর্শের বরং আমাদের দেশে বেশি কার্যকর হবার সম্ভাবনা। কেননা মানবতার দাবি বোলশেভিক আদর্শে স্বীকৃত হয়েছে, জগতের বঞ্চিতদের পক্ষ সমর্থন তাতে বেশি আছে বলে তা জগতের মানুষের হৃদয়ের উপরে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও আমাদের ভাবা দরকার যে রুশ জাতি এই মতবাদ সার্থক করে তোলার ভার নিয়েছে তাদের দুর্ধর্ষতার কথা, তাদের অপূর্ব সাহিত্য-সম্পদের কথা।’ ওদুদ এখানে সমাজ পরিবর্তনের পেছনে প্রেরণা-যোগানো সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক ভিত্তি খুঁজছেন, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। এবং সে কথা পার্টিশনের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে তার সহযোদ্ধাদের স্মরণ করিয়েও দিতে চাচ্ছেন :’আমার জবরদস্ত বন্ধুদের কাছে আমাদের পরম বিনীত নিবেদন : ধীরে বন্ধু ধীরে। নগরকে আলোকমালায় উজ্জ্বল করা আর তাতে অগ্নিকাণ্ড ঘটানো এক কথা নয় কোনোদিন। অগ্নিকাণ্ড অল্পকালেই ঘটানো যায় সন্দেহ নেই, কিন্তু আলোকমালায় সজ্জিত করার জন্য চাই পর্যাপ্ত আয়োজন।’
সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রতি উদারনৈতিক চিন্তাবিদ কাজী আবদুল ওদুদের পক্ষপাতিত্ব দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের নাৎসিবাদের পরাজয়ের কারণে উচ্চারিত হয়েছিল এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। অসহযোগ আন্দোলনকে উপলক্ষ করে ১৯২০ সালে লেখা ‘নন-কো-অপারেশন বা অসহযোগিতা’ শীর্ষক এক দীর্ঘ প্রবন্ধে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারায় কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ থিসিস উত্থাপন করেন ওদুদ। এটি মুজিবের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে আমাদের সাহায্য করবে। এ থেকে বোঝা যাবে যে, নিছক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ছকে ওদুদের ‘গণশক্তি-ভিত্তিক’ গণতন্ত্র বা মুজিবের ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ কোনটিকেই আবদ্ধ বা সংকীর্ণ করা চলে না। দু’জনেই সমাজতন্ত্রের আদর্শ ও সংগ্রামের বিশ্বজোড়া অভিঘাত স্বীকার করে নিয়েছেন এবং এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ‘গণশক্তির’ জাগরণ ঘটেছে এটা প্রত্যক্ষ করেছেন। ওদুদের উদ্ৃব্দতিটি দীর্ঘ, কিন্তু আমাদের গণতন্ত্রের হাত ধরে চলা সমাজতন্ত্রকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২০ সালের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত উপরোক্ত প্রবন্ধে কাজী আবদুল ওদুদ বলছেন : ‘ … এ কথা নিশ্চয়ই সকলকে স্বীকার করিতে হইবে যে, যাহারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া সমস্ত উদ্ভাবনাকে সিদ্ধি দান করে তাহাদের জন্য উপযুক্ত অভাব মোচনের বন্দোবস্ত করাও সকলের কর্তব্য। এত যুগ-যুগের সভ্যতা সত্ত্বেও তাদের এই ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। … আধুনিকগণ এই সমস্ত অভাব-অভিযোগের মর্ম হাড়ে হাড়ে বুঝিয়াছে। এবং সেইজন্য কী উপায়ে রাষ্ট্রের সাক্ষাৎ পরিচালনার উপরও প্রভাব বিস্তার করিয়া সে নিজের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করিতে পারে, সে সম্বন্ধে তাহার চেষ্টার অন্ত নাই। এই দিক দিয়া ইউরোপে শ্রমজীবীর ধর্মঘট, বোলশেভিকবাদ ইত্যাদি যে সমস্ত আন্দোলন চলিয়াছে, অবশ্য তাহার সবই যে মানবের সামাজিক আদর্শ ও সভ্যতার দিক দিয়া দেখিতে গেলে ভালো বোধ হইবে এমন নহে; তবু এই সমস্ত অতিরিক্ততার ভেতর দিয়া যে একটা সত্যের সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে, তাহাকে তো কেহ অস্বীকার করিতে পারে না। … তবে ইহার ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন দুর্বলতাও আছে, সেটি হইতেছে ইহার অসহিষ্ণুতা। … গণ তো সবে মাত্র জাগিয়া উঠিয়াছে। ইহার এরূপ চেষ্টা, অসহিষ্ণুতা অতিরিক্ততা ইত্যাদির ভেতর দিয়াই গণ তাহার নির্দিষ্ট স্বচ্ছন্দ অবস্থা বুঝিয়া পাইবে। তখন আর ইহাকে এমন ব্যতিব্যস্ত হইয়া ফিরিতে হইবে না। সমাজ-মনই ইহার দাবি-দাওয়া জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে বুঝিয়া দিবে। সেটি হইতেছে ভবিষ্যতের আশা। তবে সেই অবস্থায় যতদিন সমাজ না পৌঁছায়, অথবা স্বাধীনতা যতদিন সকলের ভাগ্যে সমপরিমাণে না ঘটে ও বিজ্ঞানের চেষ্টা যত দিন নির্ভীক সর্বপ্রকার সংস্কার-বিমুক্ত পূর্ণ সত্যান্বেষণে পর্যবসিত না হয়, ততদিন ঘোর বিপ্লবই হইবে সমাজের রীতি।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৬০
 পূর্বে প্রকাশিতের পর
এই আগ্রহ বঙ্গবন্ধু এর আগেও দেখিয়েছেন। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে আনিসুর রহমানকে গণভবনে ডেকে পাঠিয়েছেন। প্রাথমিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন :
– ‘আপনার গ্রামের কাজ কেমন চলছে।’
আনিসুর রহমান তা নিয়ে কিছু কথা বললেন; চলে এলো রংপুর স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রসঙ্গ। কিছুক্ষণ পর মুজিব আসল কথায় আসলেন :
– ‘ডাক্তার সাহেব আমার একটা আইডিয়া এসেছে।’
-‘কী আইডিয়া?’
-‘আমি একটা প্রেস কনফারেন্স ডাকি। আমি সেখানে বসে থাকবো, আর আপনি আপনার এই সব আইডিয়া বলবেন। সবাই শুনবে।’
আনিসুর রহমান দ্বিধান্বিত। তিনি এখনই এতে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি নন। তিনি বললেন : আপনি তো জানেন এই কাজ নিয়ে অনেক রকম প্রশ্ন-বিতর্ক চলছে। এ সময় আপনি এরকম বড়ো কিছু করলে সেটা ব্যাক-ফায়ার করতে পারে, যারা এর বিপক্ষে, ছাত্রদের মধ্যেই হোক, আমলাদের মধ্যেই হোক, তারা এই কাজকে এতখানি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে দেখে এর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগতে পারে। আমার মনে হয়, কাজটা আপনাআপনিই আরও এগোক? আরও পরে দেখা যাবে একে নিয়ে কী করা যায়।
আনিসুর রহমান সংশয়ে ছিলেন সেদিন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু যথেষ্ট উৎসাহিত হয়েছিলেন গ্রামের স্বনির্ভর আন্দোলন সম্পর্কে। চেয়েছিলেন একে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে আনিসুর রহমানের প্রেরণায় স্থানীয় মিঠাপুকুরের ছেলেরা ‘ধান কাটছে’ এ খবর শেখ মুজিবুরের কাছে পৌঁছেছিল। তিনি সেদিনও আনিসুর রহমানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
– ‘শুনছি খুব গ্রামে যাচ্ছেন, কী করছেন বলেন।’
আনিসুর রহমান তাঁকে বললেন কী করছেন, কী দেখছেন- এসব। শুনে বঙ্গবন্ধুর চোখটা যেন চক চক করে উঠল। বললেন,
– “খুব ভালো কাজ। শোনেন, এটা আমার আর আপনার প্রোগ্রাম- আপনি আমার দফতরে একটা সেল খোলেন, ধরুন তার নাম হতে পারে ‘স্টুডেন্টস, মবিলাইজেশন সেল’। আপনার কিছু সাপোর্ট লাগবে- আমি আপনাকে কয়েক লাখ টাকা দেব, আর কয়েকটা জিপ ইত্যাদি। আর প্রত্যেক সপ্তাহে আমি নিজে আপনাকে দু’ঘণ্টা সময় দেব। আপনি আমাকে যে কোনো গ্রামে যেতে বলবেন আমি যাব, যেয়ে আপনার সঙ্গে কোদাল দিয়ে মাটি কাটবো। আপনাকে আর প্ল্যানিং কমিশনের অন্য কোনো কাজ করতে হবে না- এটাই হবে আপনার কাজ।”
যে কোনো কারণেই হোক, আনিসুর রহমান এত তাড়াতাড়ি এ কাজে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে জল ঢেলে তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয় না ওপর থেকে এ রকম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন করবার এখনি সময় এসেছে। ছাত্রদের খুব অল্প পার্সেন্টেজই এই উদ্যোগে নেমেছে, অন্যেরা নামেনি, এবং অনেকে এটা নিয়ে অনেক সমালোচনাও করছে। উদ্যোগটা নিজের গতিতে এগোক। কোনো পর্যায়ে যদি প্রক্রিয়াটা থেকেই কোনো রকম সাপোর্টিং কাঠামোর প্রয়োজন দেখা যায়, তাহলে আমি আপনাকে জানাবো।’ সেদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব এতে নিরাশ হয়েছিলেন। খানিকটা হয়তো বিষণ্ণ : ‘প্রধানমন্ত্রী চুপ করে থাকলেন আর কিছু বললেন না।’ আমার ধারণা, গ্রামের কাজে তরুণ শিক্ষার্থীদের জড়ানো, গ্রামের মানুষদের স্বনির্ভর করা এবং এসব কাজে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে উৎসাহ দান- এসব ‘আইডিয়া’ বঙ্গবন্ধুর মাথায় স্থায়ীভাবে গেঁথে গিয়েছিল। এর অনেক কিছুই বাকশালের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পরবর্তী সময়ে জায়গা করে নেবে।
গ্রাম-জীবনকে অর্থনীতি পলিসির ক্ষেত্রে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এমনকি অর্থনীতি শিক্ষার ক্ষেত্রেও ‘পাঠ্যরূপে’ গণ্য করতে হয়, এ চিন্তা এদেশে রবীন্দ্রনাথের মনেই প্রথম এসেছিল। ১৯৩৯-এ প্রকাশিত হয় স্যার আজিজুল হকের (তিনি ছিলেন অখণ্ড বাংলার শিক্ষামন্ত্রী) বিখ্যাত বই  ‘The Man behind the Plough’ । গ্রন্থটি হাতে পেয়েই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখলেন :(ভূঁইয়া ইকবালের ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করছি)
‘এখানে তোমার ইংরেজি বইখানা- লাঙলের পিছনকার মানুষটি আমার হাতে পড়ল। বাংলাদেশের এই উপেক্ষিত অকিঞ্চনদের জীবনযাত্রার সুবিস্তীর্ণ ভূমিকাটি তুমি যে রকম বিস্তারিতভাবে বিবৃত করেছ, এমন আমি আর কোনো বইয়ে দেখিনি। তোমার নিরলংকার বাস্তব বর্ণনার ভিতর দিয়ে বাঙালি কৃষিজীবীর দুর্ভাগ্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে। এই বইখানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি শিক্ষা বিভাগে পাঠ্যরূপে গণ্য করা উচিত।’
রবীন্দ্রনাথের মতোই সমবায় ও কৃষি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং সে লক্ষ্যে প্রাথমিক আয়োজনও শুরু করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পাবনায় এক ভাষণে সর্বপ্রথম তিনি ‘নন-মার্কেট’ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দিয়েছেন- এর ফলে সরকারের কোষাগারে কম রাজস্ব জমা পড়বে। কিন্তু রাজস্ব না পেলে সরকার চলবে কী করে? পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে- ‘একটা গাছ লাগালেও পাঁচ বছরের আগে ফল পায় না।’ আর ‘সাত কোটি মানুষের গাছ, যে গাছকে পথের ভিখারী করে দিয়ে গেছে।’ এই অবস্থা থেকে মুক্তির প্রয়োজনে কতগুলো ক্ষেত্রে ‘নন-মার্কেট’ ভিত্তিতে ব্যাপক  Labour Mobilization করা দরকার হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু তার সোজা সহজ ভাষায় বললেন:
‘আমার কৃষক খাজনা দিবার পারে না। আমি বলে দিলাম, বকেয়া খাজনা সুদসহ সব মাফ। ২৫ বিঘা যাদের জমি আছে, ২৫ বিঘা পর্যন্ত তাদের খাজনা… রোজ কেয়ামত পর্যন্ত মাফ হয়ে যাবে। … অন্যান্য যে ট্যাক্স আছে তা দিতে হবে, না হয় সরকার চালানো যাবে না। … সেজন্য আপনাদের কাজ করতে হবে। আপনাদের গ্রামে গ্রামে এই যে কুড়ালি পয়সা যদি আমার থাকত, আমি বলতাম দিলাম পয়সা, কুড়াব কুড়াল। পয়সা নাই বলে আমি বলছি। আমিও কুড়াল মারি, তোমরাও মার। ইনভেস্টমেন্ট যত রাস্তা খাল এগুলো আপনাদের কাটতে হবে। … স্বাধীনতা বৃথা হয়ে যাবে যদি আমার ছেলেরা কাজ না পায়। কিন্তু সময়ের প্রয়োজন।… আপনাদের সহ্য করতে হবে। কাজ করতে হবে, খাটতে হবে। আর আমি বলেছি কৃষিবিপ্লব। আমার দুনিয়ার কাছ থেকে খালি খাবার কিনতে হবে- পারব না। খাবার তৈরি করতে হবে। আপনাদের গ্রামে গ্রামে খাবার উৎপাদন করতে হবে। আমি জানি বন্যায় নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু পয়সা কোথায়? চেষ্টা করতেছি। … সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রাখতে হবে। এই দায়িত্ব যেমন সরকারের, এই দায়িত্ব তেমনি জনসাধারণের।’
কৃষি বিপ্লবের চিন্তাটি বিস্তৃত জায়গা করে নেবে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার দলিলে এবং গ্রাম-জীবনের পুনর্নির্মাণের বিষয়টিও আরও বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে বাকশালের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে। এটা ছিল বাঙালি সাম্য-চিন্তার ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতি। আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখের চিন্তার ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তার ক্ষেত্রেও সাম্যবাদ-বিরোধী ও গ্রাম-সমবায় ভিত্তিক প্রকল্পের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উপাদান সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি স্পষ্ট আকার নিচ্ছিল।
৫. উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান
বাঙালির সাম্য-চিন্তা ও বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায় এর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবিস্তারকারী নীতিমালার বিরুদ্ধে বাংলার প্রাগ্রসর চিন্তাবিদ ও লেখকরা বরাবর একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। এর প্রভাব পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনাতেও। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে ডেভিড ফ্রস্টের সাথে বিখ্যাত সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনার চিন্তার ওপরে কোন কোন রাষ্ট্রনায়ক সবচেয়ে প্রভাব ফেলেছেন?’ উত্তরে মুজিব যাদের নাম করেছিলেন, তাদের মধ্যে লিবারেল ও সমাজতন্ত্রী উভয় গ্রুপেরই বিশ্বনেতাদের উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এক চার্চিলকে বাদ দিলে অধিকাংশই ছিলেন বর্ণবাদ, সাম্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তারা হলেন : ‘লিঙ্কন, মাও, লেনিন, চার্চিল, কেনেডি, গান্ধী, নেহেরু, এ কে ফজলুল হক, এইচ, এম সোহরাওয়ার্দী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, ড. সুকার্নো ও আতার্তুক।’ এই নামগুলো যেভাবে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারে এসেছিল, আমি সেভাবেই এখানে তুলে ধরেছি। এসব নামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদের দিকটি যেমন উন্মোচিত হয়, তেমনি তার ‘মধ্য-পন্থার’ দিকটিও সমানভাবে ফুটে ওঠে। ‘লিবারেল ডেমোক্রেসি’র পথিকদের সাথে এক নিঃশ্বাসে তিনি ‘সমাজতন্ত্রী’ ব্যক্তিত্বদেরও স্মরণ করতে ভোলেননি। তখনও চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, মাও তখনও বেঁচে ছিলেন, তার পরও লিঙ্কনের পর প্রথমেই তার মনে এলো চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং-এর কথা। এবং এর পরপরই লেনিনের কথা। গান্ধী, নেহেরু, নেতাজী, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী সবার কথা মনে করলেন, কিন্তু একবারও জিন্নাহর কথা বলেননি তিনি। বলার কথাও নয় তার। আগেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবনের অভিজ্ঞতা যেমন কাজ করেছে, তেমনি পুঁজিবাদের চিন্তা-ভাবনাও এখানে প্রভাব ফেলে থাকবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের কথা আলোচনার দাবি রাখে।
রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চিন্তা নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। নেপাল মজুমদার ও চিন্মোহন সেহানবীশ এ নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন। প্রথাগত অর্থে বামপন্থি না হয়েও সমাজতন্ত্রী বা কমিউনিস্ট না হয়েও রবীন্দ্রনাথ নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থান নিয়েছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, গান ও উপন্যাস রচনা করেছেন। ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ প্রবন্ধটির প্রতি এখানে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সেখানে অ-কমিউনিস্ট রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
‘বিলেতে ইম্পিরিয়ালিজমের একটা নেশা ধরিয়াছে। অধীন দেশ ও উপনিবেশ প্রভৃতি জড়াইয়া ইংরেজ সাম্রাজ্যকে একটি বৃহৎ উপসর্গ করিয়া তুলিবার ধ্যানে সে দেশে অনেকে নিযুক্ত আছেন। … এইরূপ বড় বড় মৎলব পৃথিবীতে অনেক সময় অনেক লোকে মনে মনে আঁটিয়াছে। এ সকল মতলব টেকে না; কিন্তু নষ্ট হইবার পূর্বে পৃথিবীতে কিছু অমঙ্গল না সাধিয়া যায় না।’
Black Lives Matter (BLM) আন্দোলন সম্প্রতি আমেরিকায় অনেক বর্ণবাদী নেতার মূর্তি অপসারণ করেছে। একইভাবে বিলেতেও বর্ণবাদী নেতা স্যার সেসিল রোডসের স্ট্যাচু অপসারণ করা হয়েছে। তার নামে বহু বছর ধরে ‘রোডস স্কলারশিপ’ দেওয়া হয়েছে দেশ-বিদেশের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের। অনেকে প্রশ্ন করেছেন- মূর্তি সরানোর এই ‘বাড়াবাড়ি’র দরকার ছিল কি? সেই রোডস সাহেব সম্পর্কে ১৯০৫ সালেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :
‘যাঁহারা ইম্পিরিয়ালিজমের খেয়ালে আছেন, তাঁহারা দুর্বলের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে অকাতরে নির্মম হইতে পারেন এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। পৃথিবীর নানা দিকেই তাহার দৃষ্টান্ত দেখা যাইতেছে।…ব্রিটিশ এম্পায়ারের মধ্যে এক হইয়া যাওয়াই ভারতবর্ষের পক্ষে যখন পরমার্থ লাভ, তখন সেই মহদুদ্দেশ্যে ইহাকে জাঁতায় পিষিয়া বিশিষ্ট করাই ‘হিয়ুম্যানিটি’! … সেসিল রোডস্‌ একজন ইম্পিরিয়াল বায়ুগ্রস্ত লোক ছিলেন, সেজন্য দক্ষিণ আফ্রিকা হইতে বোয়ারদের স্বাতন্ত্র্যলোপ করিবার জন্য তাঁহাদের দলের লোকের কিরূপ আগ্রহ ছিল, তাহা সকলেই জানেন। ব্যক্তিগত ব্যবহারে যে সকল কাজকে চৌর্য্য মিথ্যাচার বলে, যাহাকে জাল খুন ডাকাতি নাম দেয়, একটা ইজম-প্রত্যয়যুক্ত শব্দে তাহাকে শোধন করিয়া কতদূর গৌরবের বিষয় করিয়া তোলে, বিলাতি ইতিহাসের মান্য ব্যক্তিদের চরিত্র হইতে তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়।’
রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে শাপ-শাপান্ত করছেন তীব্র শব্দাবলি উচ্চারণ করে- এটা ভাবা যায়? এটা কেবল ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যদি এ কথা মনে রাখি যে রবীন্দ্রনাথ নিছক লিবারেল গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন না; তিনি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। তিনি গণতন্ত্রকে কমিউনিস্টদের মতো ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ বলেননি বটে, কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষার গণতন্ত্রকে তিনি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ব্যবস্থা বলেই মনে করতেন। তার গণতন্ত্রের ধারণা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতাকে অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে ভেবে এসেছে। আর যতই দিন গড়িয়েছে- তার জীবনের শেষ তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরে- রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা সচেতনভাবে অবাধ ধনবাদ বিরোধিতার দিকে এগিয়ে গেছে। এই কথাটা আমি বিশেষ জোরের সাথে বলতে চাই।

[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৫৯
পূর্বে প্রকাশিতের পর
প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ ও ‘বাঙালি-পেট্রিয়াটিজম’ প্রবন্ধ দুটি পাঠে বোঝা যায় প্রথাগত সমাজতন্ত্রী না হয়েও কী করে সমাজতন্ত্রী হওয়া যায়। সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রের কথা বলেও কী করে সামাজিক সাম্য ও অর্থনৈতিক সুষম বণ্টনের পক্ষে দাঁড়ানো যায়। যেমনটা ছিলেন বঙ্গবন্ধু- তার সমাজতন্ত্র ছিল কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষের গণতন্ত্র, যাকে তিনি একপর্যায়ে ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এটা তার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্যারাডাইমের একটি মৌলিক ধারণা। এটি স্পষ্টতই বিলেতের ‘লেবার পার্টির সমাজতন্ত্র’ থেকে মৌলিকভাবে পৃথক একটি নিজস্ব উদ্ভাবন। এ নিয়ে পরবর্তীকালে আরো কিছু কথা যোগ করব। কিন্তু আপাতত এটুকু বলব যে, পাকিস্তানের বৃহৎ ভূস্বামী-জমিদার-জায়গিরদারদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যেমন প্রকাশ্যেই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন- সেই সামন্তবাদবিরোধী অবস্থানটি বাঙালির সাম্যচিন্তায় পূর্বাপর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল। বঙ্কিমের সাম্যচিন্তার প্রসঙ্গ এ ক্ষেত্রে পূর্বেই উল্লেখ করেছি। রমেশচন্দ্র দত্তের ‘দ্য পেজেন্ট্রি অব বেংগল’ বইটির কথাও বড় করে উল্লেখ করতে হয়। এর কিছুকাল আগে বঙ্কিম-ভ্রাতা সঞ্জীবচন্দ্র ‘দ্য বেঙ্গল রায়তস’ গ্রন্থটি লিখেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন পল্লীসমাজ পুনর্গঠনবিষয়ক তার অসংখ্য রচনা ও চিঠিপত্র। ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী কৃষকের স্বার্থ-রক্ষার প্রশ্ন তোলাতেই তাকে ‘বলশেভিক জুজুর’ ভয় দেখানো হয়েছিল। প্রমথ চৌধুরী যেখানে ছিলেন Peasant Proprietorship-র পক্ষে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আরো এক ধাপ এগিয়ে। অর্থনৈতিক বিচারে সমবায়ী মালিকানার কার্যকারিতা নিয়ে অনেক তর্ক উঠতে পারে। কিন্তু এটা সত্য যে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একধরনের ‘যৌথ খামারের’ পক্ষে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ‘মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ’ চিন্তার মৌলিক মিল দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। বাকশালের সেন্ট্রাল কমিটির প্রথম বৈঠকে কৃষিতে দ্বিতীয় বিপ্লব সম্পর্ক বলতে গিয়ে তিনি বললেন যে, অন্তত নিরীক্ষামূলকভাবে হলেও ৬০ থেকে ১০০টা কো-অপারেটিভ করে দেখা হবে যে এই সিস্টেম আদৌ কাজ করে কিনা :
‘আমি জাম্প করতে চাই না। আমি জাম্প করবার মানুষ নই …। আমি অ্যাডভেঞ্চারিস্ট নই। … সেই জন্য আমি বলে দিয়েছি, ৬০টা ৭৫ কি ১০০টা কো-অপারেটিভ করবো। এই কো-অপারেটিভ যদি দরকার হয়, সেন্ট্রাল কমিটির এক একজন মেম্বার এক একটা চার্জে থাকবেন। … ওয়ান্স ইউ আর সাকসেসফুল অ্যাবাউট দিস মাল্টিপারপাস সোসাইটি, দেশের মানুষকে একতাবদ্ধ করা যাবে। বদমায়েশ একদল লোক, জমি সব শেখ সাহেব নিয়ে যাবে বলে তারা প্রপাগান্ডা করে। জমি নেবো না। তোমরা চেষ্টা করবে, একসঙ্গে ফসল উৎপাদন করবে, তোমার শেয়ার তুমি নেবে। … জমি নেবো না, জমি থাকবে। কিন্তু জমির একটা লিমিট আছে তোমাদের রাখার। আইন হয়েছে, ১০০ বিঘার বেশি রাখতে পারবে না। সেটা আমরা ফলো করবার চেষ্টা করবো এবং আস্তে আস্তে যদি ফ্লাড বন্ধ করতে পারি, সেচের ব্যবস্থা করতে পারি, ফার্টিলাইজার দিতে পারি, নিশ্চয়ই আমরা চিন্তা করবো, আরো কতদূর কী করতে পারি। কেননা, আমার দেশের জমির মধ্যে পার্থক্য আছে। এখন আমি যদি সুনামগঞ্জের জমি যেখানে তিনবার বছরে বন্যা হয়, এক বছর ফসল হয়- নর্থ বেঙ্গলের জমি আর বরিশালের জমি, চিটাগাং হিল ট্রাক্টের জমি। আর অন্য সব জমি এক পর্যায়ে দেখতে চাই তাহলে অসুবিধা হবে। আমার স্টাডির প্রয়োজন আছে। কোন জায়গায় কত পরিমাণে ফসল হতে পারে।’ এ ধরনের নিরীক্ষামূলক সমবায়ের চিন্তা রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও পাই। ১৯০৮ সালে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীর সভাপতির ভাষণে তিনি যৌথ চাষাবাদের প্রস্তাব রেখেছিলেন এবং এই যৌথ পরিচালনায় সাহায্য করার জন্য দেশের গ্রামাঞ্চলকে একেকটা অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করেছিলেন। প্রথমে দেবো যৌথ চাষাচাদের ভিত্তিতে সমবায় প্রতিষ্ঠার উদ্ৃব্দতি এবং পরে দেবো গ্রামকে ঘিরে অর্থনৈতিক জীবন সক্রিয় করার বিবরণী। যৌথতা ছাড়া যে সার্বিক গ্রামীণ পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্তি নেই এটা ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ :
‘জোতদার ও চাষা রায়ত যতদিন প্রত্যেকে স্বতন্ত্র থাকিয়া চাষাবাস করিবে ততদিন তাহাদের অসচ্ছল অবস্থা কিছুতেই ঘুচিবে না। পৃথিবীতে চারিদিকে সকলেই জোট বাঁধিয়া প্রবল হইয়া উঠিতেছে; এমন অবস্থায় যাহারাই বিচ্ছিন্ন এককভাবে থাকিবে, তাহাদিগকে চিরদিনই অন্যের গোলামি ও মজুরি করিয়া মরিতেই হইবে। … অদ্যকার দিনে যাহার যতটুকু ক্ষমতা আছে সমস্ত একত্র মিলাইয়া বাঁধ বাঁধিবার সময় আসিয়াছে। এ না হইলে ঢালু পথ দিয়া আমাদের ছোটো ছোটো সামর্থ্য ও সম্বলের ধারা বাহির হইয়া গিয়া অন্যের জলাশয় পূর্ণ করিবে। … য়ুরোপে আমেরিকার কৃষির নানা প্রকার মিতশ্রমিক যন্ত্র বাহির হইয়াছে- নিতান্ত দারিদ্র্যবশত সে সমস্ত আমাদের কোনো কাজেই লাগিতেছে না- অল্প জমি ও অল্প শক্তি লইয়া সে সমস্ত যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভব নহে। যদি এক-একটি মণ্ডলী অথবা এক-একটি গ্রামের সকলে সমবেত হইয়া নিজেদের সমস্ত জমি একত্র মিলাইয়া দিয়া কৃষিকার্যে প্রবৃত্ত হয়, তবে আধুনিক যন্ত্রাদির সাহায্যে অনেক খরচ বাঁচিয়া ও কাজের সুবিধা লইয়া তাহারা লাভবান হইতে পারে। … পাটের ক্ষেত সমস্ত এক করিয়া লইলে প্রেসের সাহায্যে তাহারা নিজেরাই পাট বাঁধাই করিয়া লইতে পারে। গোয়ালারা একত্র হইয়া জোট করিলে গো-পালন ও মাখন, ঘৃত প্রভৃতি প্রস্তুত করা সস্তায় ও ভালোমতো সম্পন্ন হয়।’
রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি গোটা গ্রামজীবনের বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাকে ঘিরে। সেখানে তিনি বলছেন যে, প্রতিটি গ্রাম বা কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা ‘মণ্ডলী’ হবে এক ধরনের Local State. মনে রাখতে হবে, ১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ডের সংস্কারের অধীন প্রস্তাবিত ইউনিয়ন বোর্ডের ১১ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এই প্রস্তাব রাখছেন। পাঠকই বিবেচনা করে দেখুন :
‘দেশের সমস্ত গ্রামকে নিজের সর্বপ্রকার প্রয়োজন সাধনক্ষম করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে। কতগুলো পল্লী লইয়া এক-একটি মণ্ডলী স্থাপিত হইবে। সেই মণ্ডলীর প্রধানগণ যদি গ্রামের সমস্ত কর্মের এবং অভাবমোচনের ব্যবস্থা করিয়া মণ্ডলীকে নিজের মধ্যে পর্যাপ্ত করিয়া তুলিতে পারে, তবেই স্বায়ত্তশাসনের চর্চা সর্বত্র সত্য হইয়া উঠিবে।’
একে Local Self Government না বলে  Local Self Governance-এর মডেলই বলা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কেননা, পরাধীন ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ চাননি গ্রামের স্ব-শাসনের ব্যবস্থার মধ্যে সরকার বাহাদুরের অনুপ্রবেশ ঘটুক। Governmentalization বা সর্বত্র সরকারীকরণের বিরুদ্ধে ছিলেন ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ Governmentalization-র বিরোধী ছিলেন : পঞ্চায়েতের মধ্যে সরকারের বেনো জল একবার ‘ঢুকিলে পঞ্চায়েতের পঞ্চায়েতত্ব ঘুচিল’- এ রকম সতর্কবাণী তিনি একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন তার ‘স্বদেশী সমাজ’ ও অন্যান্য রচনায়। যা হোক, পাবনা সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন :
‘নিজের পাঠশালা, শিল্পশিক্ষালয়, ধর্মগোলা, সমবেত পণ্যভাণ্ডার ও ব্যাংক স্থাপনের জন্য ইহাদিগকে শিক্ষা সাহায্য ও উৎসাহ দান করতে হইবে। প্রত্যেক মণ্ডলীর একটি করিয়া সাধারণ মণ্ডপ থাকিবে, যেখানে কর্মে ও আমোদে সকলে একত্র হইবার স্থান পাইবে এবং সেইখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধানেরা মিলিয়া সালিশের দ্বারা গ্রামের বিবাদ ও মামলা মিটাইয়া দিবে।’
দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে মণ্ডলীকে নিছক গ্রাম-সভার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পাটাতন বলে ভাবেননি, এমনকি আজকের যুগের ‘ইউনিয়ন কাউন্সিল’ রূপেও ভাবেননি। তিনি প্রতিটি গ্রাম মণ্ডলীকেই একটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ স্ব-শাসিত ‘সর্বপ্রকার প্রয়োজন-সাধনক্ষম’ করে গড়ে উঠতে দেখতে চেয়েছিলেন। এসব প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন (Institutional development) ছাড়া গ্রামের কৃষকের জীবনের মৌলিক উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়- এই ছিল তার সুচিন্তিত মত। ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পরের লেখাগুলোয় আরও বিস্তৃতভাবে রবীন্দ্রনাথ যৌথ-চাষাবাদ, বহুমুখী সমবায় ও স্বশাসিত গ্রাম-পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিয়ে লিখেছেন। দুঃখের বিষয়, রবীন্দ্রনাথের কবি-খ্যাতি তার এই গুরুত্বপূর্ণ সাম্যবাদী লেখাগুলোকে এতদিন প্রায় আড়াল করে রেখেছিল। ফলে বাঙালি নীতিপ্রণেতাদের এদিকে বিশেষ নজর পড়েনি। ১৯১৮ সালে লেখা তার ‘সমবায়’ প্রবন্ধটি পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর নিরীক্ষামূলক মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ কৃষকদের উদ্দেশ করে বলছেন :
‘যাহা একজনে না পারে তাহা পঞ্চাশ জনে জোট বাঁধিলেই হইতে পারে। তোমরা যে পঞ্চাশ জনে চিরকাল পাশাপাশি পৃথক পৃথক চাষ করিয়া আসিতেছ, তোমরা তোমাদের সমস্ত জমি হাল-লাঙ্গল গোলাঘর পরিশ্রম একত্র করিতে পারিলেই গরিব হইয়াও বড়ো মূলধনের সুযোগ আপনিই পাইবে। যখন কল-আনাইয়া লওয়া, কলে কাজ করা- কিছুই কঠিন হইবে না। কোনো চাষীর গোয়ালে যদি তার নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক সের মাত্র দুধ বাড়তি থাকে, সে দুধ লইয়া সে ব্যবসা করিতে পারে না। কিন্তু একশো দেড়শো চাষী এমন বাড়তি দুধ একত্র করিলে মাখন-তোলা কল আনাইয়া ঘিয়ের ব্যবসা চালাইতে পারে। য়ুরোপে এই প্রণালীর ব্যবসা অনেক জায়গায় চলিতেছে। ডেনমার্ক প্রভৃতি ছোটো-ছোটো দেশে সাধারণ লোকে এইরূপে জোট বাঁধিয়া মাখন পনির ক্ষীর প্রভৃতির ব্যবসা খুলিয়া দেশ হইতে দারিদ্র্য একেবারে দূর করিয়া দিয়াছে। এই সকল ব্যবসায়ের যোগে সেখানকার সামান্য চাষী ও সামান্য গোয়ালা সমস্ত পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে আপন বৃহৎ সম্বন্ধ বুঝিতে পারিয়াছে। এমনি করিয়া শুধু টাকায় নয়, মনে ও শিক্ষায় সে বড়ো হইয়াছে। এমনি করিয়া অনেক গৃহস্থ অনেক মানুষ একজোট হইয়া জীবিকা নির্বাহ করিবার যে উপায় তাহাকেই য়ুরোপে আজকাল কো-অপারেটিভ-প্রণালী এবং বাংলায় ‘সমবায়’ নাম দেওয়া হইয়াছে। আমার কাছে মনে হয়, এই কো-অপারেটিভ প্রণালীই আমাদের দেশকে দারিদ্র্য হইতে বাঁচাইবার একমাত্র উপায়।’
এই সমবায়ী মালিকানাই বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তরের সংবিধানের ‘Fundamental Principles of State Policy’ অধ্যায়ের ১৩নং আর্টিকেলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কথাটি ছিল এরূপ :  ‘Co-operative Ownership, that is Ownership by Co-operatives on behalf of their members & within such limits as may be prescribed by law’। অর্থাৎ, সমবায়ী মালিকানার পরিধি ছিল ব্যাপক- তা যে কোনো খাতেই গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। পরবর্তীকালে এই সমবায়ী মালিকানা বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচিতে ও বাকশালের মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ধারণার প্রয়োগে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়াস ছিল। সমবায় সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর নিজের প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। ১৯৭২-৭৩ সালে স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই গ্রামাঞ্চলে সমবায় নিয়ে নিরীক্ষামূলক কাজকর্ম নিয়ে তার মধ্যে গভীর আগ্রহ দেখা দেয়। এ রকমই একটি নিরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অর্থনীতিবিদ মো. আনিসুর রহমান। এটা ছিল গ্রামকে ‘স্বনির্ভর’ করার আন্দোলন সম্পর্কিত একটি নিরীক্ষামূলক উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগে শুধু গ্রামবাসীরাই উদ্যোগী হয়েছিলেন তাই নয়, গ্রামের স্বনির্ভর কর্মকাণ্ডে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাতে সম্পৃক্ত হতে পারেন, তারও নতুন উদাহরণ তৈরি হচ্ছিল। ফিরে যাই চুয়াত্তরের জানুয়ারিতে, যখন আনিসুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথন হচ্ছে গ্রামের উন্নয়নকে ঘিরে, ততদিনে আনিসুর রহমান পরিকল্পনা কমিশনের কাজ ছেড়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় ফিরে গেছেন। দু’জনের কথোপকথনের বিষয়বস্তু গ্রাম। আনিসুর রহমানের ‘পথে যা পেয়েছি’ থেকে উদ্ধৃতি করছি। আনিসুর রহমানকে দেখে বঙ্গবন্ধু সস্নেহে তাকে তার পাশে বসালেন। বললেন, ‘এতদিন আসেননি কেন?
আনিসুর রহমান- ‘আপনি এত ব্যস্ত মানুষ, খামাখা এসে আপনাকে বিরক্ত করব কেন?’
বঙ্গবন্ধু- ‘আপনার গ্রামের কাজ কেমন চলছে?
আনিসুর রহমান-‘চলছে একরকম।’
বঙ্গবন্ধু- ‘জানেন, আমার একটা আইডিয়া আছে। আমার দুটা গ্রাম আছে, … এ দুটো আমার নিজের গ্রাম, আমি সেখানে যাই, গ্রামের লোকেরা আসে, আমার কথা শোনে। চলেন এক দিন গ্রাম দুটোতে আমি আর আপনি যাই, আপনি আপনার সব গ্রাম-উন্নয়নের আইডিয়া বলবেন, তারা শুনবে।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৫৮
পূর্বে প্রকাশিতের পর
১৯২০ সালেই প্রমথ চৌধুরী বলছেন যে স্বাতন্ত্র্য-চর্চা ফুটিয়ে তোলা গেলেই কেবল প্রদেশে-প্রদেশে, জাতিতে-জাতিতে ঐক্যের অন্যরকম সম্ভাবনা বা ভিত্তি তৈরি হবে :তখন ভারতবর্ষের নানা জাতি একাকার হবার চেষ্টা করবে না। পরস্পরের ভিতর ঐক্য স্থাপন করবার চেষ্টা করবে। আজকের দিনের কনগ্রেসি ঐক্যের সঙ্গে সে ঐক্যের আকাশপাতাল প্রভেদ হবে।… এক জেলে পাঁচজন কয়েদির মিলন আর এক সমাজের পাঁচজন স্বাধীন লোকের মিলনের ভিতর যে প্রভেদ আছে, আজকের ভারতের নানা জাতির কন্‌গ্রেসী মিলনের সঙ্গে কালকের স্বরাজ্যবাদী জাতিদের মিলনের সেই প্রভেদ থাকবে। তখন প্রাদেশিক পেট্রিয়টিজমের ভিত্তির ওপরেই বাক্যগত নয়, বস্তুগত ভারতবর্ষীয় পেট্রিয়টিজম গড়ে উঠবে।’ প্রমথের চিন্তা অনুসরণ করলে দেখা যায় যে, এক ভাষা, এক জাতি, এক রাষ্ট্র- এ রকম চিন্তাই হচ্ছে ‘সেলফডিটারমিনেশন-বিরোধী ইন্ডিয়ান ইম্পিরিয়ালিজম’। এই কৃত্রিম একত্ব থেকে বেরিয়ে এসে যার যার প্রাদেশিক ন্যাশনালিজমের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক-রাষ্ট্রিক বিকাশ কামনা করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। বেঁচে থাকলে শরৎ বসু-সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের যুক্ত-বাংলাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে সায় থাকত তার, এটাও অনুমান করা অসঙ্গত নয়। এজন্যই তিনি নিদ্র্বিধায় বলতে পেরেছেন, ‘বাঙালির ন্যাশনালিজমের আদর্শ যে কি, তা অনুমান করা কঠিন নয়। সমগ্র ভারতবাসীকে ডোরকৌপীন পরানো আমাদের আদর্শ হতে পারে না।… আমার শেষ কথা এই যে, যে দেশকে আমি অন্তরের সহিত ভালোবাসি, সে বর্তমান বাংলাও নয়, অতীত বাংলাও নয়- ভবিষ্যৎ বাংলা, অর্থাৎ যে বাংলা আমাদের হাতে ও মনে গড়ে উঠেছে।’
যদিও দেশভাগের আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহ অন্যদিকে গড়িয়ে গেল। ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের মূল ভার্সনে  ‘states’ শব্দের বদলে ১৯৪৬ সালে প্রতিস্থাপিত হলো ‘state’ শব্দটি। জিন্নাহ বললেন যে, ১৯৪০-র states আসলে ছিল একটি মুদ্রণজনিত প্রমাদ- a typographical error! বাংলার কংগ্রেসি নেতারাও শরৎ বসু-সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের যুক্তবঙ্গের প্রস্তাব সমর্থন করতে চাইলেন না। নেহেরু পূর্বাপর প্রাদেশিক সেলফ-ডিটারমিনেশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। প্রমথ চৌধুরীর প্রদেশভিত্তিক স্বরাজ-রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। এসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শেখ মুজিব এই রাজনৈতিক পরিণতিকে সহজে মেনে নিতে পারেননি। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন :”কাউন্সিল প্রস্তাব লেখা হল, সেই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাব থেকে আপাতদৃষ্টিতে ছোট কিন্তু মৌলিক একটা রদবদল করা হল। একমাত্র হাশিম সাহেব আর সামান্য কয়েকজন যেখানে পূর্বে ‘স্টেটস’ লেখা ছিল, সেখানে ‘স্টেট’ লেখা হয় তার প্রতিবাদ করলেন; তবুও তা পাস হয়ে গেল।” এর অর্থ হলো, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়ে একাধিক পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল, তা আর থাকল না। কলমের এক খোঁচায় ১৯৪৬ সালের দিল্লি কনভেনশনে কেবল মাত্র একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু এ নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি বললেন, ‘১৯৪০ সালে লাহোরে যে প্রস্তাব কাউন্সিল পাস করে, সে প্রস্তাব আইনসভার সদস্যদের কনভেনশনে পরিবর্তন করতে পারে কি না এবং সেটা করার অধিকার আছে কি না এটা চিন্তাবিদেরা ভেবে দেখবেন।’ পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালের ২১ দফায় এবং ১৯৬৬ সালের ৬ দফায় মূল লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চাওয়া হয়েছিল।
এত সাতকাহনের উদ্দেশ্য হলো এটা দেখানো যে, শেখ মুজিব ও তার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সহকর্মীদের ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েই প্রমথ চৌধুরী কথিত ‘বাঙালি-পেট্রিয়টিজমের’ সাধনা করতে হয়েছিল। প্রমথ চৌধুরী যাকে বলেছিলেন ‘প্রাদেশিক স্বরাজ’, পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে তার রূপরেখা গোড়া থেকে দাঁড় করাতে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীদের। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত এই আন্দোলন ক্রমশ লাহোর প্রস্তাবের সংকীর্ণ মুসলিম জাতীয়তাবাদী গণ্ডি ছাড়িয়ে সার্বিকভাবে বাঙালির ন্যাশনালিজমের আদর্শকে এক রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুমোদনের কালে সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু এই জাতীয়তাবাদকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন :
“জাতীয়তাবাদের অনেক সংজ্ঞা আছে। অনেক ঋষি, অনেক মনীষী, অনেক বুদ্ধিজীবী, অনেক শিক্ষাবিদ এ সম্পর্কে অনেক রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন। সুতরাং, এ সম্বন্ধে আমি আমার নতুন সংজ্ঞা নাই বা দিলাম। আমি শুধু বলতে পারি, আমি বাংলাদেশের মানুষ, আমি একটা জাতি। এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন- সকল কিছুর সঙ্গে একটা জিনিস রয়েছে। সেটা হল অনুভূতি। এই অনুভূতি যদি না থাকে, তাহলে কোন জাতি বড় হতে পারে না এবং জাতীয়তাবাদও আসতে পারে না। অনেক জাতি দুনিয়ায় আছে, যারা বিভিন্ন ভাষাবলম্বী হয়েও এক-জাতি হয়েছে। অনেক দেশই আছে, একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু নিয়ে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে- তারা এক জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর। সেজন্য আজ বাঙালী জাতি যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা নিয়েছে, যার উপর ভিত্তি করে আমরা স্বাধীনতা নিয়েছি, যার উপর ভিত্তি করে আমরা সংগ্রাম করেছি, সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালী, আমার ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’। এর মধ্যে যদি কেউ আজকে দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন তুলতে চান, তাহলে তাকে আমি অনুরোধ করব, মেহেরবানি করে আগুন নিয়ে খেলবেন না।”
বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই সংজ্ঞায় প্রমথ চৌধুরীর কোনো আপত্তি থাকত না। রবীন্দ্রনাথও এ ক্ষেত্রে সহমত হতেন। কারণ এই জাতীয়তাবাদ (প্রমথের ভাষায়) ‘আমাদের হাতে ও মনে গড়ে উঠেছে।’ এই জাতীয়তাবাদ আমাদের ‘সেলফ-রিয়ালাইজেশনের’ ফসল। এ কথাটিও প্রমথ চৌধুরীর- ‘জাতির পক্ষে একমাত্র আদর্শ হচ্ছে সেলফ-রিয়ালাইজেশন।’ কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর চিন্তায় ‘প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদভিত্তিক স্বরাজ-গঠন’ এই নভেল আইডিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণই এখানে আমার একমাত্র বা প্রধান লক্ষ্য নয়। বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও মধ্যপন্থার মানুষ। অবাধ পুঁজিবাদও চান না, আবার একনায়কত্ব-ভিত্তিক সমাজতন্ত্রও চান না। তিনিও অন্য এক সমাজতন্ত্র খুঁজছেন। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের তিন বছরের মাথাতেই প্রমথ চৌধুরী রূপক অর্থে যা লিখলেন তার সমসাময়িক তুলনা মেলা ভার। অন্তত এই উদ্ধৃতিটি বড় করে দেওয়ার দাবি রাখে :
‘একটা কথার অর্থ পরিস্কার করা দরকার, সে কথাটা হচ্ছে স্বার্থ।… এ তো হবারই কথা। আমরা যখন প্রাণী, ও প্রাণের সর্বপ্রধান চেষ্টা যখন আত্মরক্ষা করা, তখন অন্ন আমাদের চাইই চাই। আর পলিটিক্সের যত বড়ো বড়ো কথা আছে তার আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক খোলস ছাড়িয়ে নিলে কি দেখা যায় না যে, তার ভিতরকার মোটা কথা হচ্ছে অন্ন? আজকের দিনে পৃথিবীতে পলিটিক্সের দুটি বড় কথা হচ্ছে ক্যাপিটালিজম এবং বলশেভিজম, বাদবাকি আর যতরকম  ism আছে সে সবই হয় ক্যাপিটালিজম নয় বলশেভিজমের কোঠায় পড়ে। হাল পলিটিক্সের এই দুই ধর্ম এতই পরস্পরবিরোধী যে, উভয়ের মধ্যে অর্ধেক পৃথিবীজুড়ে আজ জীবনমরণের যুদ্ধ চলছে। অথচ এই উভয় পলিটিক্যাল ধর্মের ভিতর একই জিনিস আছে এবং সে জিনিস হচ্ছে অন্ন। তবে মানবজাতি যে দুভাগ হয়ে পড়েছে সে ঐ অন্নের ভাগ নিয়ে। ক্যাপিটালিজমের মূল সূত্র হচ্ছে অল্প লোকের বহু অন্ন, আর বলশেভিজমের মূল সূত্র হচ্ছে, বহু লোকের যথেষ্ট অন্ন। আমার বিশ্বাস এ দুয়ের কোনোটিই টিকবে না। কেননা, ক্যাপিটালিজম ভুলে গিয়েছে যে, রুটি সকলেরই চাই, আর বলশেভিজম মনে রাখেনি  Man does not live by bread alone, অর্থাৎ, মানুষের মন বলেও একটা জিনিস আছে, অতএব, পেটের খোরাক ছাড়া মানুষের মনের খোরাকও চাই, নচেৎ মানুষ পশুর সঙ্গে নির্বিশেষ হয়ে পড়ে।’ কিছু আগেই আমরা দেখেছি যে, বঙ্গবন্ধু নয়া চীনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে বলেছিলেন যে, অন্নের সাথে স্বাধীনতা না পেলে মানুষের মন ‘পাথরের মত’ শুস্ক হয়ে যায়।
আজ থেকে ১০০ বছর আগে লেখা প্রবন্ধটিতে যখন পড়ি অবাধ পুঁজিবাদ ও একনায়কত্ব-ভিত্তিক সমাজতন্ত্র ‘কোনটিই টিকবে না’, তখন প্রমথের বিশ্নেষণকে প্রফেটিক মনে না হয়ে পারে না। তার মানে এই নয় যে, বলশেভিজমের মধ্যে প্রমথ চৌধুরী কোনো প্রগতিশীল উপাদান খুঁজে পাননি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রায়ত বা কৃষককে জমির মালিকানা দেওয়ার প্রশ্ন উঠলেই বলশেভিজম বা সমাজতন্ত্রের হাত আবিস্কার করা হত তাতে। ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী এ বিষয়ে বলছেন :
‘দেখা গেল যে, রায়তদের শিক্ষার দাবি ও স্বাস্থ্যের দাবি সকলেই মঞ্জুর করেন, কিন্তু তাদের স্বত্বের দাবির কথা কানে ঢোকবামাত্র চমকে ওঠেন, এমন লোকের এ দেশে অভাব নেই। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে অনেকে আবার প্রজার পক্ষ যারা সমর্থন করতে উদ্যত হন তাদের বুদ্ধি ও চরিত্রের উপর নানারূপ দোষারোপ করতে ক্ষণমাত্র দ্বিধা করেন না। যে প্রজার অধিকারের কথা তোলে, কারো মতে সে বলশেভিক, কারো মতে সে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শত্রু, আবার কারো মতে-বা সে এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আর-এক সম্প্রদায়ের মারামারি-কাটাকাটির পক্ষপাতী। এরা যদি একটু ভেবে দেখেন তা হলেই দেখতে পাবেন যে, এ সকল অপবাদ কতদূর অমূলক। প্রথমত, বলশেভিক জন্তুটি যে কি, তা তারাও জানেন না আমরাও জানি নে। জুজুর ভয় ভদ্রলোকের পক্ষে অপরকে দেখানোও যেমন অনুচিত, নিজে পাওয়াও তেমনি ছেলেমি।’
প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ লিখিত হয় ১৯১৯ সালে, আর রাশিয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে ১৯১৭ সালে। দু’বছরের মধ্যেই ‘বলশেভিক জুজুর’ আলোচনা বাংলার শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে বিশেষ তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল, দেখা যাচ্ছে। প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধেই সর্বপ্রথম বাংলার কৃষকের কাছে জমি হস্তান্তর করার দাবি জানানো হয়েছিল। গণতান্ত্রিক ভূমি সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছিল। যেটা বঙ্কিমের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও ‘সাম্য’ প্রবন্ধে সরাসরিভাবে বলা হয়নি আগে। সেসব লেখায় মূলত রায়তদের দুঃখ-দুর্দশার কথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর ঋজু চিন্তায় এ গদ্যে স্পষ্ট করে দাবিটা তোলা হয়েছিল সেদিন। বাঙালির সাম্য-চিন্তায় তার অনন্যসাধারণ অবস্থান এতে করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
‘আমাদের জনসাধারণের মধ্যে সবচেয়ে কিসের বিশেষ অভাব আছে জানেন?- স্বাধিকারের জ্ঞান। মনস্তত্ত্ববিদেরা জানেন যে, স্বত্বের জ্ঞান থেকেই মানুষের অধিকারের জ্ঞান জন্মায়।… এ দেশের কৃষকদের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক লোকের জমি তার নিজস্ব সম্পত্তি। বাংলার প্রজা যদি জমি হস্তান্তর করবার, গাছ কাটবার, কোঠা বাড়ি করবার, কুয়ো খোঁড়বার অধিকার পায়, এবং সেই সঙ্গে তার জোত মৌরসী-মোকবরি হয়, তাহলে সে ইংরেজিতে যাকে বলে  peasant proprietor তাই হয়ে উঠবে। প্রজা জমির মালিক হয়ে উঠলে জাতির শক্তি ও দেশের ঐশ্বর্য যে কতদূর বেড়ে যায় তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ বর্তমান ফ্রান্স। আর প্রজাকে স্বত্বহীন ও দরিদ্র করে রাখলে তার ফল যে কী হয়, তারও জাজ্বল্যমান উদাহরণ বর্তমান রাশিয়া।’ প্রমথ চৌধুরী প্রথাগত কোনো সমাজতন্ত্রী ছিলেন না (প্রবন্ধটি যখন লেখা হয়েছে ভারতে বা বাংলায় তখনো কমিউনিস্ট পার্টি গঠিতই হয়নি)। তিনি ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেসির পক্ষের লোক, কিন্তু ‘দ্য ল্যান্ড কোয়েশ্চনস’কে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। সুতীব্র ভাষায় তিনি সামন্তবাদকে আক্রমণ করেছিলেন। খোদ কৃষকের হাতে জমির স্বত্ব দেওয়ার নীতিকে সমর্থন করেছিলেন সামাজিক ন্যায়ের তাগিদে। এজন্যে তাকে ‘বলশেভিক জুজুর’ ভয় দেখানো হলেও তিনি পিছু হটেননি। তিনি উচ্চকণ্ঠে কথা বলার মতো মানুষ নন। রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলে তার অবস্থান (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিদুষী কন্যা ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন)। তার কাছে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান-তোলা সমাজতন্ত্র আশাও করতে পারি না আমরা। তার পরও তাকে বলতে হয়েছিল :
‘যারা বলশেভিজমের ভয়ে কাতর তাদের অনুরোধ করি যে, তারা বাংলার রায়তকে বাংলার  peasant proprietor করবার জন্য তৎপর হোন। যেরকম দিনকাল পড়েছে, তাতে করে মানুষকে আর দাস ও দরিদ্র করে রাখা চলবে না। প্রজাকে এসব অধিকার আমরা যদি আজ দিতে প্রস্তুত না হই তো কাল তারা তা নিতে প্রস্তুত হবে।’
[ক্রমশ]

বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৫৭
পূর্বে প্রকাশিতের পর
মুজিব সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘সমাজতন্ত্রের জন্মভূমি সোভিয়েত রাশিয়ায় ৫০ বছর পার হয়ে গেল অথচ এখনও তারা সমাজতন্ত্র বুঝতে পারে নাই।… সমাজতন্ত্র বুঝতে অনেক দিনের প্রয়োজন, অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। সেই পথ বন্ধুরও হয়। সেই পথ অতিক্রম করে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানো যায়। সেজন্য পহেলা Step, যাকে প্রথম Step বলা হয়, সেটা আমরা গ্রহণ করেছি।… এক এক দেশ এক এক পন্থায় সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো শোষণহীন সমাজ। সেই দেশের কী Climate, কী ধরনের অবস্থা, কী ধরনের মনোভাব, কী ধরনের আর্থিক অবস্থা, সবকিছু বিবেচনা করে Step by step এগিয়ে যেতে হয় সমাজতন্ত্রের দিকে… বিদেশ থেকে হাওলাত করে এনে কোনোদিন সমাজতন্ত্র হয় না। তা যারা করেছেন, তারা কোনোদিন সমাজতন্ত্র করতে পারেন নাই। কারণ লাইন, কমা, সেমিকোলন পড়ে সমাজতন্ত্র হয় না- যেমন আন্দোলন হয় না। সেজন্য দেশের environment, দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের ‘কাস্টম’, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব, সবকিছু দেখে Step by step এগিয়ে যেতে হয়। একদিনে সমাজতন্ত্র হয় না… কোনোকিছু করলে কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়ই। সেটা process-র মাধ্যমে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।’
এত দীর্ঘ উদ্ৃব্দতি দেওয়ার পেছনে আমার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, ‘সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে গভীরভাবেই ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তত্ত্বের ‘লাইন, কমা, সেমিকোলন পড়ে সমাজতন্ত্র হয় না।’ গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে গেলে মানব-প্রকৃতি ও দেশজ ইতিহাস-সংস্কৃতি- ‘কাস্টম’ বিবেচেনায় নিতে হয়, এই দিকের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই আমার উদ্দেশ্য। একে শুধু হাল আমলের Social Democracy বললে ভুল হবে, আবার প্রথাগত Soviet-style Socialism বললেও ভুল হবে। একটা পশ্চাৎপদ দেশে গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র গড়তে হলে ধাপে ধাপে Step by Step লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয় নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে। এটা বঙ্গবন্ধুর সাম্যচিন্তার একটি বিশিষ্ট দিক।
মানব-প্রকৃতি ও স্থানীয় বৈশিষ্ট্য বিবেচনার কথা রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও উঠে এসেছিল স্ট্যালিনীয় সমাজতন্ত্রের আলোচনা করতে গিয়ে। রবীন্দ্রনাথ সেদিন (পরবর্তীকালের বঙ্গবন্ধুর মতোই) যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, প্রথাগত সমাজতন্ত্রের মডেল ‘মানব প্রকৃতি’কে পুরোপুরি অস্বীকার করে টিকতে পারবে না:
‘যে কোনো মতবাদ মানুষ সম্বন্ধীয় তার প্রধান অঙ্গ হচ্ছে মানবপ্রকৃতি। এই মানবপ্রকৃতির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য কী পরিমাণে ঘটবে, তার সিদ্ধান্ত হতে সময় লাগে। তত্ত্বটাকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করবার পূর্বে অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তবুও সে সম্বন্ধে আলোচনা করা চলে। কেবলমাত্র লজিক দিয়ে বা অঙ্ক কষে নয়, মানবপ্রকৃতিকে সামনে রেখে। মানুষের মধ্যে দুটো দিক আছে- একদিকে সে স্বতন্ত্র, আর একদিকে সে সকলের সঙ্গে যুক্ত। এর একটাকে বাদ দিলে যেটা বাকি থাকে, সেটা অবাস্তব।… ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যখন উৎকট স্বার্থপরতায় পৌঁছিয়ে সমাজে নানা প্রকার উৎপাত মথিত করে, তখন উপদেষ্টা বলেন, স্বার্থ থেকে স্ব-টাকে এক কোপে দাও উড়িয়ে, তা হলেই সমস্ত ঠিক চলবে। তাতে হয়তো উৎপাত কমতে পারে। কিন্তু চলা বন্ধ হওয়া অসম্ভব নয়।’
অর্থাৎ মানুষের স্বার্থ ও নিঃস্বার্থ দুই দিকের দিকে লক্ষ্য করেই নতুন ধারার সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। মানুষের স্বার্থপরতা ‘ডিমান্ড’ করে যাতে করে ব্যক্তি উদ্যোগ ও এডাম স্মিথের ‘বাজার-অর্থনীতি’ তথা ‘অদৃশ্য-হাত’ (Invisible Hand)-এর ক্রিয়াকলাপ যেন সম্পূর্ণ রুদ্ধ না হয়ে যায়। ব্যক্তি উদ্যোগের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেও সামষ্টিক কল্যাণ ও পরার্থপরতাকে লালন করা সম্ভব। প্রথম দিকটি অর্থাৎ ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য রক্ষা লিবারেল ডেমোক্রেসির ‘লিবার্টি প্রিন্সিপাল’কে নির্দেশ করছে। আবার ‘উৎকট স্বার্থপরতা’ সমাজের জন্য ক্ষতিকর- সে রকম লাগামছাড়া ‘লোভ’কে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। এটি সমাজতন্ত্রের ‘সামাজিক কল্যাণ’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচারের’ দিকে নির্দেশ করছে।
এক হিসাবে রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধি শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও পাওয়া যায়। ১৯৫২ সালে চীনে গিয়ে নয়াচীনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই ত্রিশোত্তীর্ণ মুজিবের চোখে পড়েছিল। তার ‘গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্র’ নির্মাণের ধারণাকে বোঝার জন্য চীনের অভিজ্ঞতাকে এক মূল্যবান সূচক হিসেবে দেখতে পারি। বলা দরকার, নয়াচীনের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা শেখ মুজিব নিছক ভ্রমণ কাহিনি লেখার জন্য করেননি। এর পেছনে ছিল দেশের অবস্থার সাথে সেদিনের চীনের পরিস্থিতিকে মিলিয়ে দেখার প্রবল রাজনৈতিক তাগিদ। ১৯৫২ সালে মুজিব লিখেছেন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ রচনায়:
‘আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগণের ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করেছে। আর চীনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল, এই দেশ এবং এদেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নন।… একটা মাত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল সাদা চামড়ার জায়গায় কালা চামড়ার আমদানি হয়েছে।’
এই যে জাতীয় ধন-সম্পদ-ক্ষমতা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে চলে যাওয়া- যাকে আমরা ইতিপূর্বে  Concentration of Economic Power বলে শনাক্ত করেছি- সেটা সার্বিক বিবেচনায় গ্রামজীবন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবেশ থেকে উঠে আসা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কোনো তত্ত্বের সাহায্য ছাড়াই সেদিন অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিল। তাছাড়া কলকাতায় পড়াশোনাকালে মেট্রোপলিটান মন ও সংবেদনশীলতা তাঁর ওপরে প্রভাব ফেলে থাকবে। ফজলুল হক-সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে রাজনৈতিক নৈকট্যের কারণে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল ঘরানার সাথে তার অন্তরঙ্গ সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল। ফলে ঐ তুলনামূলক তরুণ বয়সেই তার মনে কতিপয় এলিট গোষ্ঠীর কাছে অর্থনৈতিক বিত্ত ও ক্ষমতার ঘনীভবন বিষয়টিকে তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি এবং এটি পরবর্তীতে তার সাম্যচিন্তার একটি বিশিষ্ট স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।
এর পরপরই চলে এলো একটি অসাধারণ ‘পলিটিক্যাল টেস্টামেন্ট’ যা Early-Mujib ও Late-Mujib-এর মধ্যে সাম্যচিন্তার যোগসূত্র স্থাপন করে দেয়। এই কথাগুলো ত্রিশোত্তীর্ণ মুজিবের বিশ্বাসের কথা, তার মনের কথা, কাউকে শোনাবার জন্য নয়, নিজের চিন্তাকে একটি স্থায়ী উপলব্ধির কাঠামো দেওয়ার প্রয়াস, সেটি কখনোই তার মন থেকে মুছে যায়নি, আমৃত্যু যাকে তিনি লালন করেছেন। এখানে তার ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে উদ্ৃব্দতি দিচ্ছি :
‘চীনের জনগণ সরকারের কাজে সাহায্য করছে এটা বুঝতে কষ্ট হলো না। জনমত দেখলাম চীন সরকারের সাথে। চীন সরকার নিজেকে ‘কমিউনিস্ট সরকার’ বলে ঘোষণা করে নাই, তারা তাদের সরকারকে ‘নতুন গণতন্ত্রের কোয়ালিশন সরকার’ বলে থাকে। কমিউনিস্ট ছাড়াও অন্য মতাবলম্বী লোকও সরকারের মধ্যে আছে। যদিও আমার মনে হলো কমিউনিস্টরা নিয়ন্ত্রণ করছে সকল কিছুই। আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিবাদী সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে, ততদিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের কর্তব্য বিশ্বশান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা।’
এই ম্যানিফেস্টো-ধারার বিবৃতিকে নিছক ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেসির’ তথা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ‘ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজম’-এর অনুবর্তী বললে বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র ধারণাটিকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করা হয়। আবার একে প্রথাগত সোভিয়েত-চীনের ধারার সমাজতন্ত্র বললেও অন্যায় হবে। এখানেই তার ‘গণতন্ত্রের হাত ধরে চলা সমাজতন্ত্রের’ বিশেষত্ব। কতিপয় গোষ্ঠীর কাছে অর্থনৈতিক ক্ষমতা চলে যাক এটা যেমন তিনি চান না, তেমনি চান না কোনো একনায়কত্বের শাসন। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আর একটা তর্কের বিষয় হচ্ছে ডিক্টেটরশিপ অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যাপারে নায়কতন্ত্র নিয়ে। কোনো বিষয়েই নায়কিয়ানা আমি পছন্দ করি নে।… একনায়কতার বিপদ আছে বিস্তর।’ মনে রাখতে হবে, তখনো ত্রিশের দশকের স্ট্যালিনীয় শুদ্ধি অভিযানগুলো শুরু হয়নি। ১৯৩৬-৩৮ পর্বের এই Purge-এর কারণে অনেকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন ও ভিন্নমত প্রকাশের নীতি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে সোভিয়েত ইউনিয়নে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এর প্রাথমিক আলামত তখনই আঁচ করেছিলেন :’ডিক্টেটরশিপ একটা মস্ত আপদ। সে কথা আমি মানি এবং সেই আপদের বহু অত্যাচার রাশিয়ায় আজ ঘটছে- সে কথাও আমি বিশ্বাস করি।’ নয়াচীন ভ্রমণকালে মুজিবও এটা লক্ষ্য করেছেন। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থে তিনি বলছেন : ‘ভাত কাপড় পাবার ও আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকারও মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবন বোধ হয় পাথরের মতো শুস্ক হয়ে যায়।’
৪. সাম্যচিন্তার অন্যান্য উৎস ও বঙ্গবন্ধু
ভাত-কাপড়ের অর্থনৈতিক অধিকার চাই, আবার চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও চাই- বঙ্গবন্ধুর এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের রূপরেখা আরেকজন বাঙালি বুদ্ধিজীবীর লেখায় কিছুটা ভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি হচ্ছেন প্রমথ চৌধুরী। তার বৈদগ্ধ্যের কথা এক স্তবকে বা এক প্রবন্ধে বলে শেষ করার নয়। বাংলায় আমরা যে বর্তমানে ‘শুদ্ধ চলিত’ রীতিতে গদ্য লিখি, তার উদ্ভাবক প্রমথ চৌধুরী। তাঁর সম্পাদনায় ‘সবুজপত্র’ বাংলায় শুদ্ধ চলিত রীতিতে প্রকাশিত গদ্য লেখার প্রধান বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথও তার গদ্যরীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। সাধু-ভাষার দাঁতভাঙা গদ্যের দেয়াল ভেঙে বাংলা ভাষাকে চলিত রীতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহসকে এক নিঃশব্দ সামাজিক বিপ্লবের সাথে তুলনা করা চলে। রবীন্দ্রনাথ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রমথনাথ সবুজপত্রকে ‘যে একটি বিশিষ্টতা দিয়েছিলেন তাতে আমার তখনকার রচনাগুলি সাহিত্য-সাধনায় একটি নূতন পথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। প্রচলিত অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষণীর মধ্যে তা সম্ভবপর হতে পারত না। সবুজপত্রে সাহিত্যের এই একটি নূতন ভূমিকা রচনা প্রমথর প্রধান কৃতিত্ব। আমি তার কাছে ঋণ স্বীকার করতে কখনও কুণ্ঠিত হইনি।’ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বছর সাতেকের ছোট প্রমথ চৌধুরী দেশভাগের এক বছর আগে ১৯৪৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ ও ‘গল্পসংগ্রহ’ পড়লে বোঝা যায় কী বিপুল পরিমাণে পড়াশোনা ছিল তার। শুধু শুদ্ধ চলিত রীতির গদ্যের উদ্ভাবনেই নয়, রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কার নিয়ে তার বিশিষ্ট মত ছিল। উদাহরণত, ‘বাঙালি-পেট্রিয়টিজম’ প্রবন্ধে তিনি অভিন্ন ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের’ একচ্ছত্র দাপটের বিপরীতে ‘প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদের’ সপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। তিনি স্মরণীয়ভাবে বলেছিলেন যে, ‘বাঙালি-পেট্রিয়টিজমের মূলে আছে বাঙালি জাতির স্বীয় স্বাতন্ত্র্যজ্ঞান। Self-determination of small nations-এর মতানুসারে বাঙালি-পেট্রিয়টিজমের বিশেষ সার্থকতা আছে। … বহুকে এক করবার চেষ্টা ভালো, কিন্তু একাকার করবার চেষ্টা মারাত্মক, কেননা তার উপায় হচ্ছে জবরদস্তি। … বাংলার সঙ্গে মাদ্রাজের যে প্রভেদ ইংলন্ডের সঙ্গে হল্যান্ডের সে প্রভেদ নেই, এমনকি, ফ্রান্সের সঙ্গে জর্মানিরও সে প্রভেদ নেই। তবে যে প্রাদেশিক পেট্রিয়টিজমের নাম শুনলে এক দলের পলিটিশিয়ানরা আঁতকে ওঠেন, তার কারণ তাদের বিশ্বাস ও মনোভাব জাতীয় স্বার্থপরতার পরিচয় দেয়।’ এই সমালোচনার তীর কংগ্রেসি হেজিমনির বিরুদ্ধে নিক্ষিপ্ত। প্রমথ চৌধুরী চান প্রতিটি প্রদেশ তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে ওঠে দাঁড়াক এবং যার যার স্বাতন্ত্র্য-চর্চার সফলতা লাভ করে তারা বিভিন্ন প্রদেশের বা জাতির ভেতরে ‘ঐক্য স্থাপনের’ চেষ্টা করুক। প্রমথ চৌধুরী তার কল্পনায় কার্যত স্বাধীন ভারতবর্ষকে বিভিন্ন প্রদেশভিত্তিক রাষ্ট্রের সহযোগে এক ধরনের  loose fedaration হিসেবে ভেবেছিলেন- যেখানে প্রতিটা প্রদেশ অবিভক্ত থেকে যার যার প্রাদেশিক বিশিষ্টতা নিয়ে স্বাধীন স্বতন্ত্রভাবে প্রথমে উঠে দাঁড়াবে।

[ক্রমশ]