পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৩৮

লোহানীর প্যারিস

অধ্যাপক ফিলিপ বেনোয়া আমার প্রায় সমবয়েসী। কৃত্তিবাস রামায়ণ নিয়ে মৌলিক গবেষণা রয়েছে তার। যে রামায়ণকে আমরা ‘কৃত্তিবাসের রামায়ণ’ বলে জানি, তার কোনো মূল পাঠ কোথাও পাওয়া যায়নি। ষোড়শ শতকের এই বাঙালি মহাকবি সম্পর্কে প্রায় কিছুই আমরা জানি না বলতে গেলে। ব্রিটিশরা এ দেশে আসার পরে শ্রীরামপুরের ডেনিশ মিশনারিদের উদ্যোগে প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় কৃত্তিবাসের রামায়ণ। সেটিই বাংলায় প্রকাশিত প্রথম বই। শুধুমাত্র এ কারণেই কৃত্তিবাস সম্পর্কে আমাদের আরেকটু উৎসাহী হওয়া দরকার। ষোড়শ শতকের পরের দুইশ’ বছরে কৃত্তিবাসের রচনার বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে পাঠের তারতম্য দেখা যায়। বেনোয়া জানালেন যে, এগুলোর মধ্যে কোনটা ‘মূল’, সেটা প্রমাণ করা কঠিন। রামায়ণের আদি-স্রষ্টা বাল্মীকির মতোই বাংলায় রামায়ণের স্রষ্টা কৃত্তিবাসের জীবন আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেছে অদ্যাবধি। বেনোয়া বাল্মীকির রামায়ণ ও কৃত্তিবাসের রামায়ণের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্নেষণ করেছেন। তাকে প্রশ্ন করি, ‘কাশিরাম দাস নিয়ে কি কোনো কাজ হয়েছে?’ বাংলায় মহাভারতের রচয়িতা কাশিরাম দাস সম্পর্কেও কোনো গবেষণা কাজ হয়নি এখন পর্যন্ত- বেনোয়ার স্পষ্ট উত্তর। বুঝলাম, কৃত্তিবাসের রামায়ণ বা কাশিরাম দাসের মহাভারত এখনও রূপকথার জগতের মতো আমাদের স্মৃতিতে বা শ্রুতিতেই রয়ে গেছে কেবল। এখানেই পাশ্চাত্যের সঙ্গে আমাদের বড় পার্থক্য। ভারতে হিন্দুত্ব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে চলেছে। সেখানে হিন্দুত্ববাদীরা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে মসীযুদ্ধ করছেন। কিন্তু বাল্মীকির রামায়ণ ও কৃত্তিবাসের রামায়ণ নিয়ে তুলনামূলক গবেষণা করে চলেছেন পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদরা। সে নিয়েও আমাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অন্ত নেই। আমরা যত তাড়াতাড়ি এডোয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ পড়ে প্রাচ্যবিদদের কাজগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকি, তার সিকি ভাগ কষ্টও করতে চাই না নিজেদের সাহিত্য-ইতিহাস-সংস্কৃতি নিয়ে প্রাচ্যবিদদের মতো মৌলিক গবেষণা করার পেছনে। অধ্যাপক বেনোয়াকে দুই দশক ধরে সংস্কৃত পড়তে হয়েছে, তারপর তিনি ‘প্রাচ্যবিদ’ হয়েছেন। আমার মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে এশিয়াটিক সোসাইটির এক সভায় অধ্যাপক আবদুল মোমিন চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, মধ্যযুগের বাংলা নিয়ে ভালো গবেষণা হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে দ্রুত। কেননা ‘এখনকার গবেষকেরা কেউ কষ্ট করে সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষা শিখতে শ্রম দিতে নারাজ।’

বেনোয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল প্যারিসে মেট্রো ‘বিবিলিওতেক নাসিওনাল’-এর কাছাকাছি একটি স্থানে। প্যারিসে এসে আমাকে জানতে হচ্ছে কৃত্তিবাস ও কাশিরাম দাসের কথা। এ ধরনের আলাপ তো ঢাকাতেও উত্তরার জসীম উদ্‌দীনের মোড়ে দাঁড়িয়ে হতে পারত। বেনোয়া শুধু কৃত্তিবাসই জানেন না, তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্য সম্পর্কেও খবর রাখেন। কথায় কথায় কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কথা উঠল। বললাম, ‘রুদ্র আর আমি একই ক্লাসে একই কলেজে একই সময়ে পড়েছি। ও ছিল আর্টসের ছাত্র, আর আমি সায়েন্সে। ওর গোড়ার দিককার কবিতাগুলো লেখা হতো যখন, তখন থেকে আমার সঙ্গে পরিচয়। ‘তখন’ শব্দকে ‘তখোন’ করে লিখত। তাই নিয়ে সমালোচনা করতাম ওকে আমরা। নিজের কবিতা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধা ছিল তার। তারপরও কবি হওয়ার জন্য মাঝ-দুপুরের রৌদ্রের ভেতরে সে ঝাঁকড়া চুল নিয়ে ক্রোশের পর ক্রোশ হেঁটে গেছে ঢাকার রাস্তায়।’ শুনে হাসলেন বেনোয়া। পরিস্কার বাংলায় বললেন, ‘রুদ্রর কবিতা আমি পড়েছি। ও খুবই শক্তিশালী কবি।’

সতেরো বছর পরে প্যারিসে আসা। এখানে বসেই মার্কস রচনা করেন তার ১৮৪৪ সালের ‘ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক ম্যানুস্ট্ক্রিপ্ট’, যা ‘প্যারিস ম্যানুস্ট্ক্রিপ্ট’ হিসেবে ছাত্রাবস্থায় জেনেছিলাম। তরুণ মার্কসের ‘মানবতাবাদী’ রচনার সারসংক্ষেপ এখানে- এই প্যারিসে বসেই। এখানেই জন্ম নিয়েছে তার বিখ্যাত ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবাদ বিষয়ক তত্ত্ব। জন স্টুয়ার্ট মিলের আগে এখানেই প্রথম তিনি লেখেন ‘স্বাধীনতা’ বা ফ্রিডম সম্পর্কে ভাবনা-উদ্রেককারী ইস্তেহার। এই প্যারিস তরুণ মার্কসের যেমন, তেমনি মার্কসের প্রায় সমান বয়েসী কবি শার্ল বোদলেয়ারেরও। প্যারিস মানেই বোদলেয়ারের প্যারিস- তার বিখ্যাত রচনা ‘Paris Spleen’ এই শহরকে ঘিরেই। যারা আক্রান্ত- কবিতা দীর্ঘকাল পড়েননি, তাদের উচিত বোদলেয়ারের এই ৫০টি ছোট ছোট গদ্য-কবিতার সংকলন দিয়ে নিমগ্ন-পাঠ শুরু করা। তার মৃত্যুর দু’বছর পরে ১৮৬৯ সালে এটি প্রকাশিত হয়। বোদলেয়ার ১৮৪৮ সালের বিপ্লব-প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেননি। কিন্তু এর জোরালো সমর্থক ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, প্যারিস যতই আধুনিক হয়ে উঠছে ততই সেখানে বাড়ছে ধনী-গরিবের বৈষম্য। এই উপলব্ধি সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশিত হয় তার Le Spleen de Paris বইটিতে। বইটির শিরোনামে ‘Spleen’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ প্লীহা, তবে অ্যানাটমির এই ‘অর্গানটি’ কবির আরাধ্য বিষয় নয়। ঝঢ়ষববহ শব্দটির অন্য একটি অর্থও রয়েছে। সেটি হলো- ‘কোনো আপতিক কারণ ছাড়াই বিষণ্ণতা, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণাবোধ।’ আধুনিকতার পথে সৃষ্ট বৈষম্যকে সেভাবেই দেখেছেন বোদলেয়ার। এ বইয়ের একটি কবিতার নাম ‘Eyes of the Poor’। ঝকঝকে নতুন একটি কাব্যের দিকে তাকিয়ে আছে একটি দরিদ্র পরিবার। সেটা দেখে বাক্যের ভেতরে বসা কবি বিচলিত বোধ করছেন : ‘Not only was I moved by that family of eyes, but I felt a little ashamed of our glasses and decanters, larger than our thrist….’। এ রকম বৈষম্যের পরিবেশে সুস্থির থাকা, সুস্থ থাকা কঠিন। সে জন্যই বোদলেয়ার বলছেন, যেন নিজেকেই শুনিয়ে বলছেন, ‘তোমাকে সবসময় বুঁদ হয়ে থাকতে হবে… সময় তোমার কাঁধের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এবং তুমি ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছ নিচে, মাটির দিকে; তোমাকে বুঁদ হয়ে থাকতে হবে বিরতিহীনভাবে।’ এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিয়েনেশন মার্কসীয়। যারা অন্য বোধের চর্চা করছেন, তাদেরকে মনে রাখতে হবে, মার্কসের ‘প্যারিস ম্যানুস্ট্ক্রিপ্ট’ আর বোদলেয়ারের ‘প্যারিস স্পিল্গন’ একই সময় ও মনোভূমি থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত।

যখন সতেরো বছর আগে প্যারিসে আসি OECD-র একটি ‘ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এর আলোচক হিসেবে, তখন আমার মাথায় ছিল মার্কসের প্যারিস ম্যানুস্ট্ক্রিপ্ট আর বোদলেয়ারের প্যারিস। আসার আগে অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খান (স্যার) বলে দিয়েছিলেন, Louvre দেখার আগে D’orsay মিউজিয়াম দেখে আসবেন। দু’দিন থাকছেন, সে কারণেই বলছি। D’orsay-তে সব ইম্প্রেশনিস্ট ও এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকর্ম এক জায়গায় পেয়ে যাবেন।’ অধ্যাপক খান নিজে একজন চিত্রশিল্পী; ইমপ্রেশনিজম ধারার ছবি আঁকার নিরিবিলি চর্চা করে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে। তার কথামতো সেবার D’orsay মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। একটা পুরো বিকেল সেখানে কাটিয়েছি। পুরোনো একটি রেলস্টেশনকে কীভাবে কেবল উদ্ভাবনী ক্ষমতার জোরে ‘মিউজিয়ামে’ রূপান্তর করে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া যায়, তার একটি প্রকৃষ্ট নমুনা এটি। সেবার তাতেই এতটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম যে Louvre ও তার মোনালিসা আমার অধরাই থেকে গিয়েছিল। তার পরও এতগুলো বছর বাদে প্যারিসে আসার পরে আমার প্রথমেই মনে পড়ল ফ্রান্সের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বা বিবিলিওতেক নাসিওনালের কথাই। আমার অবচেতন মনের ভেতরেও কোথাও এর সূত্র ছিল নিশ্চয়ই। সেদিন অধ্যাপক ফিলিপ বেনোয়ারের সঙ্গে কৃত্তিবাস বিষয়ক আলাপ করতে করতে তিনি হঠাৎ আমাকে দেখালেন লাইব্রেরিটি। ‘ঐ যে দেখছেন, আধখোলা বইয়ের মতো বিল্ডিং তিনটি, ওটাই ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল লাইব্রেরি।’ আর আমার তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল গ্যাব্রিয়েলা লোহানীর চিঠিটির কথা।

গ্যাব্রিয়েলা লোহানী ১৯২৫ সালের দিকের একটি চিঠিতে পাবনায় তার শাশুড়িকে লিখছেন প্যারিস থেকে। যার মমার্থ হলো- ‘মাজু (লোহানী) খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে একটি বইয়ের ওপরে।’ বোঝা যাচ্ছে, গোলাম আম্বিয়া খান লোহানী শুধু প্রবন্ধ লিখেই ক্ষান্ত হননি; একটি ‘বই লেখার’ কাজেও ব্যাপৃত ছিলেন সে সময়ে। তার মানে, ১৯২৪-২৫ সালে প্যারিসে অবস্থানকালেই এই লেখা তিনি শুরু করেছিলেন। ১৯৮৭ সালে যখন প্রথম গ্যাব্রিয়েলার চিঠিটি পড়ি, তখনই আমার মনে হয়েছিল, এই বইটি হয়তো প্রকাশিত হয়েছে পরে এবং হয়ে থাকলে তা হয়তো বিবিলিওতেক নাসিওনালের সংগ্রহশালায় পাওয়া যেতেও পারে। স্বয়ং এমএন রায় যার সম্পর্কে তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, বিভিন্ন ভাষাভাষী লোহানীর বুদ্ধি ছিল ‘তরোয়ালের মত ধারালো’। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর লোহানীর জার্মান, ফরাসি ও রুশ ভাষায় অনর্গল কথা বলার দক্ষতা নিয়ে তার আত্মজৈবনিক রচনা ‘যাত্রী’তে শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন। এমএন রায় ধারণা করেছেন যে, ১৯২১ সালে লেনিনকে পাঠানো ‘থিসিস অন ন্যাশনাল অ্যান্ড কলোনিয়াল কোয়েশ্চেনস’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ‘বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, গোলাম আম্বিয়া লোহানী ও পাণ্ডুরাঙ্গ খানখোজে’ ত্রয়ীর নাম-সংবলিত হলেও আসলে রচনাটি লোহানীরই- ওদের মধ্যে আর কারও এটা লেখার ক্ষমতা ছিল না। গঙ্গাধর অধিকারী কর্তৃক নানা খণ্ডে সম্পাদিত ‘হিস্টরি অব কম্যুনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’ বইতে লোহানীর নানা উল্লেখ রয়েছে এবং তার বিভিন্ন ইংরেজি রচনা সেখানে সংকলিতও হয়েছে। যদিও রুশ, ফরাসি ও জার্মান ভাষায় লেখা তার বিভিন্ন রচনা এখনও সংকলিত হওয়ার অপেক্ষায়। এই লোহানীর জন্ম বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। শিক্ষাগ্রহণ আলিগড়ে এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে; একাধারে মার্কস, মিল, লেনিন ও কেইনস্‌ বিভিন্ন স্কুলের রচনাবলির সঙ্গে তিনি ছিলেন পরিচিত, স্তালিনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৩৮ সালের এক দিনে বুখারিনের মতো ভিন্নমতাবলম্বী অন্য কমরেডদের সঙ্গে মৃত্যু হয় তার। আমাদের দেশের মুক্তি-সংগ্রামের স্মৃতি-মিউজিয়ামের অন্তত কোনো একটি কর্নারে, কোনো একটি পাদটিকায়, কোনো একটি ব্যানারে বা বইতে তার নাম থাকার কথা ছিল। তিনিই ছিলেন, কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদেরও আগে প্রথম বাঙালি মুসলিম কম্যুনিস্ট। এবং ‘শিখা’ গোষ্ঠীর ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অনেক আগেই তত্ত্বে-তথ্যে-মননে জ্বলজ্বল করা এক নাম। যারা ১৯২৮ সালে কমিনটার্নের ষষ্ঠ কংগ্রেসে ডি-কলোনাইজেশন প্রশ্নে অটো কুমিনিন-লোহানীর বিতর্ক পড়েছেন (অধিকারীর বইতে তা যথাবিহিতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে) তারাই এর পাণ্ডিত্যে বিস্মিত হবেন। লোহানীর নাম, তার জীবনী এবং প্রকাশিত/অপ্রকাশিত লেখার সংকলন আমাদের স্মৃতির আড়ালে থেকে যাবে- এটা সহজে মেনে নেওয়া যায় না। কোনো স্কুলের পাঠ্যবইতে তার নাম কখনও উচ্চারিত হবে না- এটাও অপ্রত্যাশিত। লোহানীর ফরাসি স্ত্রী গ্যাব্রিয়েলা লোহানী জানিয়েছিলেন, প্যারিস থেকে ‘দ্য ভ্যানগার্ড অব মাসেস’ সাময়িকীটি প্রকাশের পাশাপাশি তখন একটি ‘বইয়ের ওপরেও’ কাজ করছিলেন লোহানী। তার অদেখা শাশুড়ি মাকে মিথ্যে কথা কেন বলবেন তিনি? হয়তো প্যারিসের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে অথবা মস্কোর ইতিহাস বিষয়ক মহাফেজখানায় তার বইটির একদিন ঠিক খোঁজ মিলবে। ঠিক যেমন আবুল হাসান ‘এপিটাফ’-এ লিখেছিলেন, ‘একদিন আকাশ আলো মিলে যায়, মেলে’; তেমনভাবেই লোহানী আমাদের ইতিহাসে-সাহিত্যে হবেন একদিন স্বতঃপ্রকাশিত।

[ক্রমশ]

এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৭

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

৪. অন্যান্য প্রসঙ্গ

এদোয়ার্দো গালিয়েনো ঘণ্টাখানেক বলেছিলেন সেদিন ‘পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ’-এর সন্ধ্যায়। আমার থেকে-থেকে চোখ চলে যাচ্ছিল গালিয়েনোর ঢেউ খেলানো সাদা পশমের মতো চুলের দিকে। ‘মিররস’-এর অনুকরণে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কিছু লেখার পরিকল্পনা তার রয়েছে কি-না জানার জন্য প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা নিশ্চয়ই সম্ভব, কিন্তু আমার পড়াশোনা কম এই এলাকা নিয়ে।’ তারপর উল্টো আমাকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন- ‘তারচে’ বরং আপনি আগ্রহ নিয়ে করুন না কেন সেটা?’ পরে অবশ্য বুঝেছি যে, কথাটা নিতান্ত বিনয়ের সৌজন্য থেকেই বলা। এই ভূখণ্ড সম্পর্কে- এমনকি বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালোই জানতেন তিনি। তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘হান্টার অব স্টোরিস’ বইতে হঠাৎ পেয়ে যাই বাংলাদেশের উল্লেখ :

‘২০১২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এক ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ১১০ জন শ্রমিক মারা যায়। এ ধরনের ঘাম-ঝরানো কারখানাতে অধিকার বা নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পরের বছরের এপ্রিলে দগ্ধ হয়ে মারা যায় আরও ১ হাজার ১২৭ জন শ্রমিক আরেকটি এমনই ঘাম ঝরানো ফ্যাক্টরিতে। ইতিহাসে যেসব দাসের কথা আমরা পড়তে পাই, এরাও তেমনি আধুনিক যুগের অদৃশ্য দাস। তাদের অস্তিত্বের মতোই তাদের বেতনও দৃশ্যমান নয়। যেমন নয় দৈনিক এক ডলারে বেঁচে থাকা। যেটা প্রকাশ্যে দেখা যায় তাহলো এদেরই হাতে তৈরি করা পোশাক-সামগ্রী, তাদের গায়ে সুদৃশ্য দামের ট্যাগ লাগানো, আর যেগুলো বিক্রি হচ্ছে ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি, সিয়ার্স, বেনটেন, এইচ অ্যান্ড এম প্রভৃতি বিপণিবিতানে।’

নায়লা কবীর অবশ্য গালিয়েনোর ‘অদৃশ্য দাস’ বলার সাথে সহমত করবেন না। নায়লা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে দীর্ঘকাল ধরে পড়াচ্ছেন। বর্তমানে ফেমিনিস্ট ইকোনমিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সভাপতিও তিনি। বাংলাদেশের এই সুযোগ্য সন্তান শুধু বাংলাদেশের নারীদের ওপরেই মৌলিক গবেষণা করেননি। নারীবাদী অর্থনীতি বা ফেমিনিস্ট ইকোনমিক্সের ওপরে তার গবেষণা কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক ও পরবর্তীকালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। যেমন ইংরেজিতে অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারেন, তেমনি বলিষ্ঠ তার লেখনী। ২০০০ সালে নায়লা কবীর একটি বই লিখেছিলেন, যার নাম ‘দ্য পাওয়ার টু চুজ’ (Power to choose)। সেখানে তার মুখ্য প্রতিপাদ্য ছিল যে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নারী-শ্রমিকরা ফ্যাক্টরির পরিবেশে কাজ করার সুবাদে ‘ক্ষমতায়িত হয়ে উঠেছে- অন্তত সুদূর লন্ডনে ঘরে বসে কাজ করছে এমন বাঙালি নারী-শ্রমিকদের তুলনায়। অর্থনৈতিক কাজে নারীর অংশগ্রহণ- বিশেষত ঘরের বাইরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর বিচরণ- তার জীবনমানের উন্নতি ও তাকে ‘ক্ষমতাবান’ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; এটিই ছিল নায়লার মূল তর্ক। গালিয়েনো অবশ্য লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতার সাক্ষী, তিনি হয়তো নায়লাকে বলতেন, ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নারীকে ক্ষমতাবান করে ঠিকই, কিন্তু সবই নির্ভর করছে তার দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপরে।’ এ দেশের পোশাক-শিল্পের নারীরা এখনও সেই ক্ষমতা পুরোপুরি অর্জন করেননি তাদের ‘দেশি মালিক’ আর ‘বিদেশি ক্রেতাদের’ সঙ্গে দর-কষাকষি করার ক্ষেত্রে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পরে বিদেশি ক্রেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স ইনিশিয়েটিভের। এতে ইমারত সুরক্ষা, অগ্নিনির্বাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা শুভ পরিবর্তন আসলেও নারী পোশাক শ্রমিকদের মজুরি সামান্যই বেড়েছে। শ্রমবহির্ভূত কাজের পরিবেশেও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।

গালিয়েনো নিজের জীবনের টুকরো-টাকরা স্মৃতি নিয়ে কিছু খণ্ডদৃশ্য লিখেছেন। তার ‘মেমরি অব ফায়ার’ বইটির শেষ খণ্ডে সামরিক শাসিত উরুগুয়ের ‘কনিষ্ঠতম রাজনৈতিক বন্দি’ সম্পর্কে একটি এন্ট্রি রয়েছে। সে ছিল পাঁচ বছরের একটি মেয়ে, তার অপরাধ ছিল একটাই :তার নাম রাখা হয়েছিল ‘মাইলাই’। ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে মার্কিন সেনা দল মাইলাই নামে গোটা একটা গ্রামকেই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উরুগুয়েতে তখন চলছে প্রবল সামরিক শাসন। মাইলাই নাম উচ্চারণও তখন অপরাধ। আর সেখানে কিনা জলজ্যান্ত একটি মেয়ে- হোক না সে পাঁচ বছরের মেয়ে; এই নাম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে (বা পার্কে-মাঠে-কিন্ডারগার্টেনে দাপটের সঙ্গে হেসেখেলে দিন কাটাচ্ছে)। গালিয়েনো লিখেছেন যে, বইটি বেরুনোর পর অনেক বাবা-মায়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলেন তিনি। তারাও তাদের নবজাতকের নাম ‘মাইলাই’ রাখতে চান। কিন্তু প্রশাসন তাতে বাগড়া দিচ্ছে। এমনকি ১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনার এক মা তাকে লিখেছেন, ‘আমার মেয়েকে এখনও নথিবদ্ধ করা যায়নি।’ জন্ম ও মৃত্যুর রেজিস্ট্রি করা এখন এ দেশেও বাধ্যতামূলক। লাতিন আমেরিকায় তা আগেই চালু হয়েছিল আমাদের দেশের তুলনায়। আন-ডকুমেন্টেড থেকে গেছে তার মেয়ে অদ্যাবধি- এই ছিল পাঠিকার অভিযোগ। এসব দেশে নাম তালিকাভুক্ত করাতে গেলে সমস্যা অনেক। কোনো সেইন্টের নাম নিতে চাইলে কাজটা সহজ হয়ে যেত। কিন্তু মাইলাই তো সে রকম কোনো নাম নয়। একে পাওয়া যাবে না অভিধানে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রির ইতোমধ্যে তালিকাবদ্ধ নামের সারিতেও এর দেখা মিলবে না। মাইলাই-এর কোনো অধিকার নেই কার্যত নিজেকে মাইলাই বলে ডাকার।

একবার চিলির সালভাদর আয়েন্দের সঙ্গে সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল গালিয়েনোর। নিজ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এক রক্তাক্ত ক্যু-তে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিহত হন আয়েন্দে। সেটাই বলতে গেলে প্রথম ‘নয়-এগারো’। এই ক্যুর পেছনে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের সরাসরি প্ররোচনা ছিল। যা হোক, গালিয়েনো যে ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন তা এর বেশ কিছুকাল আগে, তখনও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। তখন ছিল শীতের সময়। চিলির দক্ষিণের প্রদেশ পুন্টা আরেনাতে সবে বরফ পড়তে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে বাইরের তুলার মতো বরফ নেমে আসার দৃশ্য দেখতে দেখতে আয়েন্দে তার নির্বাচনী বক্তৃতার একটি খসড়া দেখালেন গালিয়েনোকে। আগামীকালই একটি বক্তৃতা দিতে হবে তাকে। বক্তৃতা যথারীতি হলো। কিন্তু গালিয়েনো খেয়াল করলেন যে, আয়েন্দের বক্তৃতায় কী করে যেন একটি নতুন লাইন ঢুকে গেছে। যেটা গতকাল রাতে পড়া খসড়ার মধ্যে ছিল না। সমবেত জনতার বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে তিনি শুনতে পেলেন আয়েন্দে বলছেন :’যেসব ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন, সেসবের জন্যে মৃত্যুবরণ করার মধ্যে অর্থ রয়েছে।’ এটা কি ছিল কোনো অনিচ্ছাকৃত ভবিষ্যদ্বাণী, কে জানে!

লোর্কা নিয়েও একাধিক গল্প বলেছেন তিনি। ফ্রাংকোর স্পেনে কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কার মৃত্যুর পর অনেককাল তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি। তার জনপ্রিয় নাটকগুলো নিষিদ্ধ ছিল। লোর্কার মৃত্যুর বহু বছর পরে- ফ্রাংকো তখনও জীবিত- উরুগুয়ের এক নাট্য দল গেল মাদ্রিদে। সাহস করে লোর্কার একটি নাটক মঞ্চস্থ করল তারা। নাটকের শেষে চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী কোনো হাততালি শোনা গেল না। দর্শক সবাই দাঁড়িয়ে গিয়ে পা দিয়ে মেঝের ওপরে এক সাথে শব্দ করতে লাগল অনেকক্ষণ। নাটকের কুশীলবরা প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। এর মাধ্যমে কী বোঝাতে চাইছে দর্শকরা! তাদের অভিনয় কলাকৌশল কি সেরূপ হয়নি? তাহলে এমন ধরনের ব্যবহার কেন দর্শকদের? বহু দিন পরে কুশীলবদের একজন এদোয়ার্দো গালিয়েনোকে বুঝিয়েছিলেন যে, পা দিয়ে শব্দ কেন তুলেছিলেন মাদ্রিদের দর্শকরা? তারা লোর্কার জন্য সেই শব্দ তুলে হল প্রকম্পিত করেছিলেন সেদিন। লোর্কা, যাকে কেবল বামেদের সমর্থক এবং বৃত্তের বাইরের মানুষ হওয়ার অভিযোগে অযথা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তাকে বলেছিলেন দর্শকরা- ‘ফেদেরিকো, দ্যাখো, তুমি এখনও আমাদের মধ্যে কীভাবে বেঁচে আছ।’ এই গল্পটা গালিয়েনো বর্ণনা করছিলেন মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সামনে। সেদিনের সন্ধ্যায় গালিয়েনোর বক্তৃতা পাঠ শেষে অবাক করা কাণ্ড ঘটল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে সমবেত ছয় হাজার মানুষের পায়ের শব্দে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি উঠেছিল। তারাও বলতে চেয়েছিল- ‘গালিয়েনো, তুমি আমাদের মধ্যে বেঁচে আছ।’

[এই বিষয় সমাপ্ত]

এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৬
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

স্বৈরশাসকদের নিয়ে এদোয়ার্দো গালিয়েনোর অতি-উৎসাহের কারণ দ্বি-বিধ। প্রথম কারণটি ব্যক্তিগত। তিনি ছিলেন বামপন্থি সাংবাদিক ও লেখক। যে বছর আয়েন্দের চিলিতে পিনোশের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, সে বছরই অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হয় উরুগুয়ে নামক দেশটিতে। গালিয়েনোর জন্মভূূমি উরুগুয়েতে, সেখানেই ‘মিছিল’ বা ‘মার্চ’ [স্পেনীয় ভাষায় Marcha] পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তার খ্যাতি লাভ। এই পত্রিকায় মারিও ভার্গাস ইয়োসার মতো লেখকরা নিয়মিত লিখতেন। যা হোক, উরুগুয়েতে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে গালিয়েনোকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাড়া পেয়ে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যেতে হয় তাকে। সেখানে উদ্বাস্তু জীবনের মধ্যেই ‘ক্রাইসিস’ নামে একটি বামধারার পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তিন বছর না যেতেই ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনাতেও একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ডানপন্থি এই ক্যুর নেতৃত্ব দেন লে. জেনারেল ভিদেলা। ইসাবেলা পেরন-এর সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল ভিদেলা ক্ষমতায় আসেন। কথিত আছে, এই ক্যুর পরপর যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার আর্জেন্টিনার সামরিক নেতৃত্বের সাথে বেশ কয়েক বার ‘মিটিং’ করেন এবং বলেন, তাদের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ‘নিষ্ফ্ক্রিয় করে দেওয়া’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরোধী দলনের অভিযোগ ওঠার আগেভাগেই এ কাজটি সেরে ফেলার পরামর্শ দেন কিসিঞ্জার। এ রকম পরিস্থিতিতে আবারও দেশ ছাড়তে হয় গালিয়েনোকে। এবার তিনি পাড়ি জমান স্পেনের উদ্দেশে। এই স্পেনে বসেই তিনি লেখেন তার বিখ্যাত ট্রিলজি ‘মেমোরি অব ফায়ার’- বহ্ন্যুৎসবের স্মৃতি। আমাদের এখানে হলে হয়তো আমরা বলতাম ‘আগুন-জলের গল্প’। কেবল ১৯৮৫ সালেই গালিয়েনো ফিরতে পারেন নিজের দেশে, উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদিয়োতে। গণতন্ত্র সবে ফিরতে শুরু করেছে সেখানে। এই সেই দেশ, যেখানে কোনো মানবিক অধিকারে রীতি-নীতি মানা হয়নি। উরুগুয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদককে হেলিকপ্টারের সাথে বেঁধে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এ রকম শুনেছি। কিন্তু গালিয়েনোর কাছে উরুগুয়ে নয়, সমগ্র লাতিন মহাদেশের পর্যায়ক্রমিক সামরিক স্বৈরশাসনের অভ্যুদয়ই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবং এ কারণেই তার লেখা পত্রে স্বৈরশাসকদের প্রবল উপস্থিতি দেখা যায়।

কিন্তু এর পেছনে দ্বিতীয় কারণও ছিল। যদি ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা তার না-ও থাকত, তাহলেও এদোয়ার্দো গালিয়েনো সম্ভবত এভাবেই লিখতেন বা ভাবতেন। দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রবল উপস্থিতির পেছনে অনেকটি কারণ কাজ করে থাকবে। এই মহাদেশে প্রথমে কলোনিয়াল অভিযান চালায় স্পেনীয়রা (এবং পর্তুগিজরা)। মায়া, ইনকা, আজটেক প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতা অধ্যুষিত মহাদেশকে স্বর্ণখনির লোভে পদানত করার জন্য সামরিক অভিযান চালায় তারা। স্থানীয় অধিবাসীদের রাজত্বগুলো ছলে-বলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। গালিয়েনো নানা অনু-গল্পে এই গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা ও কাহিনী লিখেছেন। ১৫৩৩ সালে স্পেনীয় কনকুইস্তাদর বা বিজয়-পিপাসু ফ্রান্সিসকো পিসারো পেরু অধিকার করে নেন। এই যুদ্ধে এবং পরবর্তীকালের ইউরোপ থেকে ‘আমদানি করা’ মহামারিতে নিহত হয় পেরুর ৯০ শতাংশ স্থানীয় জনসাধারণ, যাদের অধিকাংশই ছিল ইনকা সম্প্রদায়ভুক্ত। ইনকাদের সম্রাট আতাহুয়ালপাকে [Atahualpa] নির্মমভাবে খুন করা হয়। গালিয়েনো এই শঠতাপূর্ণ বিজয় নিয়ে লিখেছেন, আর সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে- এই পেরুর ইনকাদের থেকে ইউরোপ এবং এক পর্যায়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে আলুর চাষ। আজকে যাকে ‘মেডিকেল মারিজুয়ানা’ হিসেবে প্রচার করা হয়, তারও আদিভূমি পেরুতে।

লাতিন আমেরিকায় এই আদিম, বর্বরতম ঔপনিবেশিক অভিযানের স্মৃতি গালিয়েনো ভুলে দিতে চাননি। এর সাথে তিনি সংযুক্ত করেন পরবর্তীকালের (উনিশ-বিশ শতকের) ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’-এর বিস্তার। তখন আর উপনিবেশবাদ শুধু স্বর্ণখনির লোভে সীমিত নেই।

৩. সাম্রাজ্য :প্রেম নাকি প্রতারণা?

‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল’ প্রবন্ধে মার্কস এ রকম মন্তব্য করেছিলেন যে, এই শাসনের ফলে যেমন ভারতবাসীর ওপরে দুর্গতি নেমে এসেছে, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় এর আবদ্ধ নিশ্চলা জীবনে সূচিত হচ্ছে প্রগতির ধারা। প্রত্যন্ত উপনিবেশে পাশ্চাত্য-আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে, ভেঙে পড়ছে তার চিরাচরিত পেছনে-টানা মূল্যবোধের প্রাচ্যীয় জগৎ। যিনি ধ্বংস করেন, তিনিই আবার সৃষ্টি করছেন। উপনিবেশে ব্রিটিশ শাসনের এই দ্বিবিধ ফলাফল যুগপৎ বিনাশী ও সৃষ্টিশীল, একাধারে ধ্বংসাত্মক ও কল্যাণকামী ভূমিকা সম্পর্কে মার্কসের মূল্যায়ন নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে। এ প্রশ্নে এসে এদোয়ার্দো গালিয়েনো মার্কসকেও ছেড়ে কথা বলতেন না। মার্কস যদি বলে থাকেন যে, এযাবৎকালের ইতিহাস মূলত শ্রেণিযুদ্ধের ইতিহাস; তাহলে গালিয়েনো ভাবতেন, এযাবৎকালের ইতিহাস মূলত এক জাতির তরফে অন্য জাতির ওপর অবৈধ ক্ষমতার দাপট দেখানোর ইতিহাস। সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতা-বলয়ের বিস্তৃতি ঘটানো হয়েছে। এখানে প্রেম নেই; থাকলেও তা সাময়িক; অপ্রেমই এখানে মূল সুর; প্রতারণাই এখানে চরম পরিণাম। এ জন্যই অনেকটা আচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে গালিয়েনো সাম্রাজ্যের শঠতার কাহিনী একের পর এক লিখে গেছেন। এক পর্যায়ে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে বাংলার ওপরে। এই ঔপনিবেশিক গল্পের শুরু ইংলন্ডে আর শেষ ঢাকায়।

মুক্ত বাণিজ্য নামক এক রূপকথার জন্ম কীভাবে ইংলন্ডে জন্ম নিল; প্রথমে সে বয়ান করেছেন গালিয়েনো। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা প্রথম জেমস ও প্রথম চার্লসের শাসনামলে ব্রিটেনের ‘শিশু-শিল্প’কে রক্ষার জন্য নানাবিধ সংরক্ষণমূলক নীতি হাতে নেয় ইংরেজ সরকার। তারা কাঁচামাল হিসেবে পশম রপ্তানি বন্ধ করে দেয়; বিলাসবহুল পোশাক তৈরিতেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বস্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য এ নিয়ম করে; ফ্রান্স ও হল্যান্ডের মতো দেশ থেকে শিল্পপণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের আগেও অর্থনৈতিক চিন্তা ছিল, কিন্তু তা ছিল মূলত সংরক্ষণমূলক [যাকে বলে ‘প্রোটেকশনিস্ট’] নীতিকে ঘিরে। এ রকমই একজন চিন্তক ছিলেন সপ্তদশ শতকের শুরুতে ‘রবিনসন ক্রুসো’র রচয়িতা ড্যানিয়েল ডেফো। গল্পের বই ছাড়াও অর্থনীতির নানা বিষয়ে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখেন। এরই একটিতে তিনি বলেন, ব্রিটিশ টেক্সটাইল শিল্পকে গতিশীল করার জন্য ইংরেজ সরকারের ‘সংরক্ষণমূলক’ নীতি খুবই কার্যকর ছিল। ইংরেজ রাজারা ‘শুল্ক্কের দেয়াল’ নির্মাণ না করলে এবং স্থানীয় শিল্পকে উপযুক্ত কর-প্রণোদনা না দিলে এই শিল্পের বিকাশ সম্ভবপর ছিল না। এই বিকাশ এতটাই ত্বরান্বিত হয়েছে যে আগামী দিনে বিশ্বের প্রতিটি দেশ বা উপনিবেশ ‘ব্রিটিশ পণ্যের ওপরেই নির্ভরশীল থাকবে।’ ডেফোর ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ছিল বলতে হয়। কেননা, পরবর্তী দুশো বছর ধরে ব্রিটেন যা করে বড় হয়েছে, তারই উল্টোটা প্রয়োগ করেছে সে অন্যদের প্রতি। অবস্থানিরপেক্ষভাবে প্রচার করেছে ‘অবাধ বাণিজ্য’-এর জয়গান। জার্মান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিখ লিস্ট এটা দেখে বলেছিলেন, ‘উপরে উঠিয়ে মইটা ফেলে দিয়েছে ইংরেজরা।’ রাতের বেলায় যখন গরিব দেশগুলোর ঘুম হয় না, তখন ধনী দেশের মন্ত্রণাদাতারা মুক্ত বাণিজ্যের রূপকথা শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে।

এই রূপকথাই অন্য রকম শোনায় ঔপনিবেশিক বাংলার পটভূমিতে। গালিয়েনো লিখেছেন যে, বাংলা থেকে সুতি ও রেশমি কাপড় আমদানিতে প্রথমদিকে অতি-উচ্চ হারে শুল্ক্ক বসানো হতো। ১৬৮৫ সাল থেকে এই শুল্ক্ক বসানো হতে থাকে, এক পর্যায়ে কাপড় আমদানি প্রায় বন্ধই করে দেওয়া হয়। এত বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও ইংলন্ডে শিল্প-বিপ্লব শুরু হওয়ার পর প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত-বাংলার বস্ত্রশিল্প বেঁচে ছিল। ম্যানচেস্টার থেকে বস্ত্র যখন বাংলায় আসত, তখন তাতে কিন্তু আমদানি শুল্ক্ক বসানো হয়নি। কারণ ততদিনে ফ্রি-মার্কেটের তত্ত্ব রুলিং আইডিওলজি হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটেনে। গুণগত মান ভালো থাকার জন্যে এবং স্বল্প উৎপাদন মূল্যের কারণে অসম প্রতিযোগিতার ভেতরেও অনেক দিন টিকে ছিল বাংলার বস্ত্র উৎপাদকরা। উনিশ শতকের গোড়াতে যখন ওদের ওপরে এক বিষম করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখনই কেবল ওরা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই বি-শিল্পায়নের পরিবেশে ম্যানচেস্টারের টেক্সটাইল শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বাংলার বাজার ও ঘরে ঢুকতে থাকে। ঢাকার ওপরে এই অসম প্রতিযোগিতার ফল হয়েছিল মারাত্মক। গালিয়েনো লিখেছেন :

‘প্রবাদপ্রতিম লর্ড ক্লাইভ যে ঢাকাকে [সমৃদ্ধি-ঐশ্বর্য] লন্ডন ও ম্যানচেস্টার শহরের সাথে তুলনা করতেন, সেই শহরটি এই পর্যায়ে জনশূন্য হয়ে পড়ে। পাঁচজনের মধ্যে চারজনই শহর ছেড়ে চলে যায়। তারপরও বাংলার শিল্প খাতের কেন্দ্র ছিল ঢাকা, তবে তা বস্ত্রশিল্পের জন্য নয়; আফিম উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই আফিমের অতিরিক্ত সেবন করতে গিয়েই এক সময় মৃত্যু হয় ক্লাইভের।’

অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দী নিয়ে আরো অনেক গল্প আছে গালিয়েনোর ঝুলিতে। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ বইটিকে তিনি উপনিবেশ-অভিযানের ন্যারেটিভ হিসেবে পাঠ করেছেন। এর লেখক জোনাথান সুইফট্‌-এর মনে কী ছিল, তা জানা যায় না। তবে অনেক সময় তাকে মনে হয় আসলে তিনি একজন ‘অন্তর্ঘাতমূলক’ লেখক; উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তাবিদ। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’এ-র সর্বশেষ পরিচ্ছেদে কীভাবে কিছু বর্বর জলদস্যুর হাতে স্থানীয় অধিবাসীরা পরাজিত হলো এবং নেটিভদের দেশকে এক অবাধ লুণ্ঠণক্ষেত্র তথা উপনিবেশে পরিণত করা হলো, তার প্রায় পরাবাস্তববাদী বর্ণনা রয়েছে। মূলের বর্ণনাটি এতই তীক্ষষ্ট ও মর্মভেদী যে অনুবাদে তা হারিয়ে যাক সেটা আমি চাই না :

A crew of pirates goes on shore to rob and plunder, they see a harmless people, are entertained with kindness; they give the country a new name; they take formal possession of it for their king; they set up a rotten plank, or a stone, for a memorial.
Here commences a new dominion, acquired with a title by divine right. Natives are driven out or destroyed; their princes tortured to discover their gold; a free license given to all acts of inhumanity and lust, the earth reeking with the blood of its inhabitants : and this execrable crew of butchers, employed in so pious an expedition, is a modern colony, sent to convert and civilize an idolatrous and barbarous people!

সন্দেহ কি, জোনাথান সুইফটকে এক সময় ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করা হবে খোদ ব্রিটেনে।

[ক্রমশ]

এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৫

২. এদোয়ার্দো গালিয়েনোর জীবন

পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ-এ সেদিন ছিল এদোয়ার্দো গালিয়েনোর ‘মিররস্‌’ বই নিয়ে ভাষণ; গালিয়েনোর গল্প বলার ধরনে এক ‘রহস্যময় জাদু’ থাকে- এরকম একটি আপ্তবাক্য বলেছিলেন ঔপন্যাসিক ইসাবেলা আয়েন্দে। গালিয়েনো কাজ করতে চান ভাস্করের মতো। প্রথমে তিনি ইতিহাস, প্রবন্ধ বা লোককাহিনি ঘেঁটে ‘তথ্য’ আহরণ করেন, তারপর তিনি তৈরি করেন এর প্রথম-পাঠ। সেই পাঠের ওপরে তিনি অনেক বছর ধরে কাজ করতে থাকেন যতক্ষণ-না এর বর্ণনাভঙ্গি, বক্তব্য, বক্তব্যের প্রধান ও অপ্রধান মুহূর্ত তার মনোমত হয়ে দাঁড়ায়। তার অনু-রচনাগুলো অনেকটা গানের মতো- স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ- পর্যায়ক্রমে তা ধ্বনি থেকে কবিতায় পরিণত হয়। একজন প্রাবন্ধিককে প্রথমাবধি একজন ‘স্টাইলিস্ট’ হতেই হয়। রিল্ক্কের মতো তিনিও লিখে রেখে যেতে পারতেন- ‘একজন তরুণ প্রাবন্ধিকের প্রতি’ কোনো গাঢ় উপদেশাবলি। যেমন, ধরা যাক, তিনি লিখতে চান স্পেনের দোর্দণ্ড প্রতাপ জেনারেল ফ্রাংকো সম্পর্কে। স্পেনের বিখ্যাত রক্তক্ষয়ী সিভিল ওয়ারে রিপাবলিকপন্থিদের হারিয়ে জেনারেল ফ্রাংকো ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৩৯ সালে, এবং ১৯৭৫ সালে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন নিরঙ্কুশ ডিক্টেটরশিপ অব্যাহত রেখে। না-প্রাচ্য না-পাশ্চাত্য কোনো শক্তিই তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি। এহেন প্রতাপশালী জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোকে নিয়ে এক পাতার মধ্যে কী লেখা যায়, যা হবে তার নিষ্ঠুর চরিত্রের ইঙ্গিতবাহী, আবার একই সঙ্গে কালোত্তীর্ণ সাহিত্য? গালিয়েনো এ নিয়ে অনেক ভেবেছেন, তারপর তার মনে হয়েছে জেনারেল ফ্রাংকোর পক্ষীশিকার নিয়েই বরং লেখা যাক। বিবরণীটি অনেকটা এরকম, তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘হান্টার অব স্টোরিস্‌’ থেকে সংগৃহীত :

‘বধ করার মধ্যে একটা নিষ্ঠুর আনন্দ রয়েছে। তা সে নোংরা ঘেঁটে বেড়ানো কাক বা সরোবরের রাজহংসী বা একজন গণতন্ত্রী প্রজাতন্ত্রী যে-ই হোক না কেন। তবে কোয়েল পাখি শিকারে ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর বিশেষ আগ্রহ ছিল বরাবর। ১৯৫৯ সালের অক্টোবরের এক দিনে জেনারেল ফ্রাংকো ৪ হাজার ৬০০টি কোয়েল পাখি বধ করেছিলেন, তারই করা পূর্বতন সব রেকর্ড ভেঙে।

আলোকচিত্রী শিল্পীরা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে অমর করে রেখেছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে বিজয়ী বেশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার পায়ের নিচে লুটোপুটি খাচ্ছে তার যুদ্ধজয়ের সামগ্রী- মৃত চোখ-উল্টে পড়া অসংখ্য কোয়েল পাখি।’

এসব ক্ষেত্রে এদোয়ার্দো গালিয়েনো যেটা করে থাকেন, তিনি যুক্ত করেন অনেক প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ। যেমন ডিক্টেটরদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত খাটো ছিলেন ফ্রাংকো- পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি, যেখানে হিটলার ছিলেন পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি, আর মুসোলিনি- পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। ফটোগ্রাফাররা এমনভাবে ছবি তুলতেন যাতে করে এই অপেক্ষাকৃত খর্বকায় একনায়কদের বেশি খাটো না দেখায়। আমাদের দেশেও অনেক খর্বকায় জেনারেল ছিলেন- যারা সময় সময় ডিক্টেটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চেয়েছেন- তারাও অত্যন্ত ক্যামেরা সচেতন ছিলেন। ‘তৃতীয় মাত্রা’য় একবার এক-এগারোর অন্যতম নায়ক জেনারেল মইন-এর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। তখন দেখে মনেই হয়নি যে তিনি এতটা খর্বকায়। আসলে ক্ষমতার লেন্স আর ফটোগ্রাফারদের লেন্স দুই-ই এই জেনারেলদের সুউচ্চ মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করায়।

অন্যত্র, গালিয়েনো এক ‘আলোকপ্রাপ্ত’ সামরিক ডিক্টেটরের কথা বলেছেন, যার নাম আউগুস্তো পিনোচেট বা পিনোশে। চিলির এই নির্মম মিলিটারি ডিক্টেটর তার জীবদ্দশায় হাজার হাজার বই সংগ্রহ করেন তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির জন্য। রাজকোষের অনেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি, সেসবের অনেকটাই সময়মতো আমেরিকার রিগস ব্যাংকের ডলার-অ্যাকাউন্টে পাচার করেছেন তিনি। তবে জনতার অর্থ নিয়ে তিনি প্রচুর বইও কিনেছেন। তিনি বই কিনতেন পড়ার জন্য নয়, শুধু ‘সংগ্রহ’ করার জন্য। কে জানে এই ডিক্টেটরের বুকের ভেতরে বইয়ের জন্য হাহাকার কী কারণে বাসা বেঁধেছিল! পিনোশের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে শুধু নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ওপরেই ৮৮৭টি বই ছিল। মূল্যবান চামড়ায় বাঁধানো সেসব খণ্ড। আর গ্রন্থাগারের বইয়ের তাকে তাকে বোনাপার্টের অনেক মূর্তি সসম্মানে রাখা হয়েছিল। সংগৃহীত প্রতিটি বইয়ে পিনোশের ব্যক্তিগত মোড়ক বসানো। যেন ভাবীকাল তাকে এভাবেই মনে রাখে। জেনারেল পিনোশে-র এই কখনোই না-পড়া গ্রন্থরাজি এখন বিরাজ করছে চিলির সামরিক বাহিনীর ওয়ার কলেজের ‘প্রেসিডেন্ট আউগুস্তো পিনোশে উগার্তে লাইব্রেরি’তে। এই লাইব্রেরিটি পিনোশে নিজেই তৈরি করেছিলেন- ভবিষ্যতের সামরিক শাসকদের ‘আলোকপ্রাপ্তি’র জন্য।

এদোয়ার্দো গালিয়েনো কাউকেই কোনো কিছুকেই তার ক্ষুরধার বিশ্নেষণের জরিপ থেকে বাদ দেননি। ‘মিররস্‌’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন ইংরেজ দার্শনিক জন লক-এর কথা। ‘স্বাধীনতা’র দার্শনিক বললে লক-এর কথাই প্রথমে মনে পড়বে। তার লেখায় তিনি অবাধ বাণিজ্য, কারখানা, অবাধ প্রতিযোগিতা, ‘অবাধ নিয়োগ ও ছাঁটাই’ এসবের প্রয়োজনীয়তা অবাধে লিখে গেছেন। সেই সাথে বলেছেন অবাধে বিনিয়োগ করার স্বাধীনতার কথাও। তিনি যখন ‘এন এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর মতো দার্শনিক গ্রন্থ লিখছেন, সে সময়েই ‘রয়াল আফ্রিকান কোম্পানি’র স্টক কেনার ক্ষেত্রে তার সঞ্চয়কে ব্যয় করেন। গালিয়েনো লিখছেন, এই কোম্পানির যৌথ মালিকানায় ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং মুক্ত-বাণিজ্যপন্থি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াস অ্যান্ড র‌্যাশনাল’ বণিকগোষ্ঠী। এই কোম্পানির মূল কাজ ছিল আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কালো মানুষদের ক্রীতদাস হিসেবে কিনে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করা।

এ রকম দ্বিচারিতা আরেকজন ইংরেজ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল-এর মধ্যেও ছিল। সারাজীবন তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে কাজ করে গিয়েছেন; একপর্যায়ে কোম্পানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকও হন। কোম্পানির চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও এর নীতি নির্ধারণে মিলের পরোক্ষ ভূমিকা অব্যাহত ছিল। ১৮৬০-এর দশকে অন লিবার্টি, অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট, ‘নারীমুক্তি’, এমনকি ‘সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। সারা বিশ্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে একটা ‘সভ্য চেহারা’ দেওয়া ছিল তার অন্যতম বড় কীর্তি। ঔপনিবেশিক দ্বিচারিতার অনেকগুলো উদাহরণ দিয়েছেন গালিয়েনো। ক্রীতদাসের প্রথা একসময় ইংল্যান্ডে এবং তার দেখাদেখি সারা ইউরোপেই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে গেল। রোমক সাম্রাজ্যের পতনের একটি কারণ ছিল ক্রীতদাসের বিদ্রোহ। চার্চ ঘোষণা দিয়েছিল, যে কাউকে ক্রীতদাস করা ঈশ্বরের চোখে ঘোরতর অন্যায় কাজ। ইউরোপের শ্রেষ্ঠ বিচারকেরা রায় দিলেন, ক্রীতদাস নিয়ে বাণিজ্য (স্লেভ-ট্রেড) করা আইনত গর্হিতকর অপরাধ। মনে হতে পারে যে, এর পর ‘ক্রীতদাস-বাণিজ্য’ উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু এই বাণিজ্য থামল না। ষোড়শ, সপ্তদশ, অষ্টাদশ, এমনকি উনিশ শতকেও এই বাণিজ্য শুধু-ই থেমে থাকেনি তা-ই নয়, আফ্রিকায় উপনিবেশ সম্প্রসারণের সাথে সাথে ক্রীতদাসের বাণিজ্য নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেল। আগে ক্রীতদাস কেনা হতো কেবল উপকূলীয় বন্দর এলাকা থেকে। আফ্রিকার ভেতর প্রদেশে যাওয়ার ফলে উন্মোচিত হলো তার সমৃদ্ধ খনিজসম্পদ, তাতে করে স্থানীয় অধিবাসীদের দ্রুত পরিণত করা হলো ক্রীতদাসে, যাদের জোরপূর্বক খাটানো হতো খনিগুলোতে। এই ক্রীতদাসদের একটা অংশকে আবার ‘আন্তঃমহাদেশীয়’ স্লেভ-ট্রেডে ব্যবহার করা হতো : লাভজনকভাবে খনিও চলত, আমেরিকার সাথে বহির্বাণিজ্যও নির্বিঘ্নে চলত ক্রীতদাস ক্রয়-বিক্রয়ের সুবাদে।

১৮৮৫ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ ভাগাভাগির সম্মেলন। ইংরেজ, ফরাসি, বেলজীয়, ওলন্দাজ, জার্মান প্রভৃতি পরাশক্তির মধ্যে ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের ভাগবাটোয়ারার সম্মেলন ছিল এটিই। এই সম্মেলনে বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের সম্মানে তাকে উপহার দেওয়া হলো ‘কঙ্গো’ নামক দেশটি- তার ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ হিসেবে। অচিরেই তিনি দুর্গম কঙ্গোকে একটি বাণিজ্য-ক্ষেত্র করে তুললেন। কঙ্গো হয়ে দাঁড়াল ‘হাতির দাঁতের’ সবচেয়ে বড় রপ্তানির উৎস; কঙ্গো থেকে সুলভে এবং প্রচুর পরিমাণে আসতে থাকল ‘রাবার’, যেটি সদ্য-আবিস্কৃত মোটরগাড়ির টায়ার হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যবহূত হতে থাকে; কঙ্গো থেকে অবাধে আমদানি হতে থাকল রক্তমুখী হীরে- আমেরিকা-ইউরোপে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য আংটি একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। এসবই হলো কঙ্গোর জনসাধারণকে ক্রীতদাস বানিয়ে অর্থাৎ ক্রীতদাস শ্রমের সুবাদে। ইতিহাসের বইপত্রে ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত তিরিশ বছরকে বলা হয়ে থাকে ‘নিখিল বিশ্ব-শান্তির যুগ’, যা কেবল ভেঙে যায় প্রথম মহাযুদ্ধের পরেই। জার্মানি তার আফ্রিকার উপনিবেশগুলো হারায়, আর ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-বেলজিয়াম তাদের উপনিবেশের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়।

কীভাবে সম্ভব হলো উনিশ শতকের পটভূমিতে সভ্য ইউরোপ, আধুনিক ইউরোপ, বিজ্ঞানমনস্ক ইউরোপ, শিল্পোন্নত ইউরোপের দ্বারা এই ‘ক্রীতদাস-নির্ভর’ অর্থনীতির পরিচালনা? এর অন্তর্নিহিত যুক্তি-জাল পাওয়া যায় জন স্টুয়ার্ট মিলের রচনায়। তিনি সারাবিশ্বের মানবগোষ্ঠীকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন : সভ্য, আধাসভ্য ও অসভ্য। ‘সভ্য’ হচ্ছে ইউরোপ, সমগ্র বিশ্ববাসীকে সভ্য করার দায়িত্ব তার। ‘আধাসভ্য’ হচ্ছে ভারতবর্ষ- সেখানে ‘সংহত’ ধরনের নীতি প্রয়োগ করার পক্ষপাতী মিল। আর ‘অসভ্য’ হচ্ছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার আদিবাসী স্থানীয় জনগোষ্ঠী- তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে রূঢ় ও কর্কশ আচরণে পিছু-পা না হতে বলছেন মিল। তার আগে অবশ্য এ রকম কথা আরো কেউ কেউ বলেছেন। দার্শনিক হেগেল লক্ষ্য করেছিলেন যে, আফ্রিকার কোনো ‘ইতিহাস নেই’, একে শুধু ‘বর্বরতা আর নৃশংসতার’ কেস-স্টাডি হিসেবে পড়া চলে। দার্শনিক জীবতাত্ত্বিক, নৃতত্ত্ববিদ এবং উনিশ শতকের ‘ভিক্টোরিয়ান যুগের’ অন্যতম প্রধান লিবারেল তাত্ত্বিক হার্বার্ট স্পেন্সার অনেকটা ভেবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, সভ্যতার উচিত হবে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সব অনগ্রসর জাতিকে মুছে ফেলা’, প্রগতির রথের নিচে এসব বাধাকে চূর্ণ না করতে পারলে সভ্যতাকে অগ্রসর করা যাবে না।

বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডকে নিয়ে কঙ্গোর গল্প বলতে গিয়ে অবধারিতভাবে একসময় চলে এসেছে ঔপন্যাসিক জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’-এর কথা। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছে কুর্টজ, যার সাইড-পেশা হচ্ছে হাঁতির দাঁতের ব্যবসা করা। কনরাড নিজে কঙ্গোতে গিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক বাহিনীতে কর্মরত অফিসার ক্যাপ্টেন লিওন রোম-কে মনে রেখে তিনি গড়ে তুলেছিলেন কুর্টজ-এর চরিত্র। কুর্টজ-এর শাসনে কোনো নেটিভই সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না- চারপেয়ে জন্তুর মতো অবস্থানে থেকে নেটিভরা কুর্টজ-এর আদেশ গ্রহণ করত। তার প্রাসাদোপম গৃহে প্রবেশের মুখে ফুল দিয়ে সাজানো ছিল পর পর বিশটি ধাপ, প্রতিটি ধাপের মধ্যে থাকত একটি কালো মানুষের বিদ্রোহী কাটামুণ্ডু। যখন তিনি ক্রীতদাস বা হাতি শিকার না করতেন, অর্থাৎ অবসর সময়ে, ক্যাপ্টেন কুর্টজ আঁকতেন নিসর্গ-চিত্র, রচনা করতেন কবিতা, সংগ্রহ করতেন প্রজাপতি। এইভাবে সভ্যতা আর অসভ্যতা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করত তার মধ্যে। কনরাডের চোখে, কুর্টজই ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদ, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন- ‘ছোট ইংরেজ’।
[ক্রমশ]

এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৪
১. পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ

ওয়াশিংটন ডিসির ভেননেস্‌ ও টেনলিটাউন মেট্রোর মাঝখানে ফুটফুটে বইয়ের দোকান পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ। দুই মেট্রোর মাঝখানের হাঁটাপথে বাস্তবিকই এক মাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে। উপর-নিচ মিলিয়ে বেশ দীর্ঘ পরিসরের দোকান, তাতে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বিষয়ের বই। এ রকম বইয়ের দোকান কি আমাদের দেশেও নেই? আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু যেটা পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজকে আর দশটা বইয়ের দোকান বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বুক স্টোর থেকে আলাদা করে, সেটা হলো তার ধারাবাহিক সেমিনার- বিভিন্ন বইকে ঘিরে আলোচনা-চক্র। আর সেসব বইয়ের আলোচনা করেন লেখকেরা নিজেই, পরে থাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সব মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের অনুষ্ঠান। শুরু হয় সন্ধ্যে ৬টার দিকে। প্রতি মাসে অন্তত আটটা বইয়ের আলোচনা হয়। শিল্প-সাহিত্যের বইয়ের তাকগুলো যেখানে, সেখানেই শেল্কম্ফ সরিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। মোটামুটি একশ’টা চেয়ারের ব্যবস্থা, তবে সে রকম আলোচক হলে চারপাশে বইয়ের তাক ধরে সামনে-পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে আরও অনেক লোক। কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে আরও বেশি আগ্রহী শ্রোতার ভিড় জমাবার সম্ভাবনা যেখানে- সেখানে বইয়ের আলোচনা স্থানান্তরিত হয় সিক্সথ স্ট্রিটের চার্চের ভেতরে। যে রকমটা হয়েছিল সালমান রুশদীর বেলায়। অরুন্ধতী রায়ের নতুন উপন্যাসের জন্যও বড় জায়গার প্রয়োজন হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটনের স্মৃতিচারণমূলক বইয়ের আলোচনাও হয়েছিল ওই চার্চে। কিন্তু বেশিরভাগ লেখক-ঔপন্যাসিক ‘মেমোয়ারিস্ট’-কবি-ইতিহাসবিদ-প্রবন্ধকাররাই পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজের অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকেন। কে আসেননি এখানে? স্তালিন-জীবনীকার স্টিফেন কতকিন, অর্থনীতিবদ পল ক্রুগম্যান, পোয়েট লোরিয়েট ট্রেসি স্মিথ, প্রবন্ধকার টা-নাহাসি কোটস, ‘এক্সিট ওয়েস্ট’-এর লেখক মোহ্‌সিন হামিদ- সবাই আগ্রহ নিয়ে থাকেন এখানে এসে নিজের সৃষ্টিকর্মের ওপরে কিছু বলার জন্য। ক্লিনটন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্প যিনিই প্রেসিডেন্ট থাকুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই লাইব্রেরি বা বুক স্টোরকেন্দ্রিক ‘সাব-কালচারটি’ এখনও আগের মতোই জীবন্ত হয়ে রয়েছে। শুধু পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ নয়, বড়-ছোট শহরের বইয়ের দোকানকে ঘিরে আলোচনা-চক্র (এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রিডিং ক্লাবের মতো পাঠচক্র) ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে গত একশ’ বছর ধরে।

এ রকমই একটি বইয়ের আলোচনায় এসেছিলেন এদোয়ার্দো গালিয়েনো (Eduardo Galeano)। ২০০৯ সালের শীতের এক সন্ধ্যায় গালিয়েনো আসবেন পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজে- এটা জেনে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি। গালিয়েনোকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়ার এই সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করা চলে না। লাতিন আমেরিকার ডিক্টেটরশিপ ও তার প্রতি মার্কিনিদের অব্যাহত নির্বিচার সমর্থন নিয়ে তার ‘ওপেন ভেইনস্‌ অব লাতিন আমেরিকা’ ছাড়ার পর থেকেই তার প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠি। আমাদের দেশে আমরা যেহেতু সুদীর্ঘকাল সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ ছায়ায় কাটিয়েছি (এবং এখনও তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির গুজবের রেশ শহর-ঢাকার বুক থেকে মিলিয়ে যায়নি) লাতিন আমেরিকার ডিক্টেটরশিপ ও সামরিকতন্ত্র নিয়ে বেশি করে জানার স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আমাদের প্রজন্মের মধ্যে। একাত্তরের স্বাধীনতা তো মিলিটারি ডিক্টেটরশিপের বিরুদ্ধে এক সুদীর্ঘ লড়াইয়েরই ফসল। পঁচাত্তরের পরে ক্যু-পাল্টা ক্যু, জেনারেলদের আমল, সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই, বেসামরিক সরকার-প্রশাসনের প্রতি ঠান্ডা যুদ্ধের কায়দায় বিভিন্ন পর্বের সামরিক চাপ আমাদের প্রজন্মের প্রতি পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির ওপরে বিশেষজ্ঞ আয়েশা সিদ্দিকার সাবধানবাণী ‘কখনও সামরিকতন্ত্রকে খাল কেটে কুমিরের মতো ডেকে এনো না’, এক-এগারোর হুমকি-ধামকি, সেলিঞ্জারের অ্যাংরি ইয়াংম্যানের মতো দেশোদ্ধারে ব্রতী মিথিক্যাল অ্যাংরি ইয়াং অফিসারবৃন্দ- এসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতেই আমাদের জীবন প্রায় কেটে গেল। সন্দেহ কী যে আমাদের মধ্যে ওই তরুণ বয়সেই আগ্রহ সৃষ্টি হবে চিলির নেরুদার কবিতা আর তার প্রতিপক্ষ জেনারেলদের প্রতি বা কলম্বিয়ার মার্কেজের উপন্যাস আর তার নিঃসঙ্গ কর্নেলের প্রতি, পেরুর ভার্গাস ইয়োসার উপন্যাস, নিকারাগুয়ার এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা, ইকুয়েডরের অসওয়াল্কেন্ধা গইয়াসামিন (Guayasamin)-এর চিত্রকর্ম, মেক্সিকোর গল্পকার কার্লোস দ্য ফুয়েন্তেস, কবি অক্টাভিও পাজ, সেন্টার-পেরিফেরি স্কুলের লাতিন আমেরিকার ‘ডিপেনডেন্‌সিরা’ তত্ত্বের প্রণেতারা (লাকলাউ, কারদোসো), উরুগুয়ের প্রাবন্ধিক-সাহিত্যিক এদোয়ার্দো গালিয়েনো এবং সেই সূত্রে সমগ্র লাতিন মহাদেশই আমাদের আত্মার কাছাকাছি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আজ সামরিকতন্ত্র কেবল টিকে আছে আফ্রিকার কিছু দেশে :সারা লাতিন আমেরিকাতেই দুর্বল হোক সবল হোক বিরাজ করছে নানা চরিত্রের গণতন্ত্র। পূর্ব এশিয়ার একদা-সামরিকতন্ত্র অধ্যুষিত দেশগুলোতেও এসেছে গণতান্ত্রিক শাসন, যদিও দেশভেদে তার গণতান্ত্রিক মর্মবস্তু অনেকটাই প্রশ্নকীর্ণ। এক সময় সুদীর্ঘকাল একচ্ছত্র শাসন করা সামরিকতন্ত্র এখন পিছু হটেছে দক্ষিণ এশিয়াতেও- যেমন পাকিস্তানে। তবে সর্বত্র পিছু হটলেও সামরিকতন্ত্রের নেপথ্য-প্রভাব কমেনি। তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, সে একাই সামরিকতন্ত্রকে মোকাবিলা করতে পারবে। গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ যদি ‘ওয়েলফেয়ার স্টেটের’ আদলে গড়ে উঠতে পারে, যদি তার কল্যাণকামী দিকটি বড় হয়ে দেখা দেয়, তবেই জনগণ কেবল সেই গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের সঙ্গী হবে। এবং সম্ভাব্য সামরিক-হুমকি বা ‘এক-এগারো’র বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু যদি এ দেশের পুঁজিবাদ ক্রমেই অতি-ধনীদের করালগ্রাসে চলে যায়, তবে নেমে আসতে পারে মাৎস্যন্যায়। যার অপেক্ষায় থাকবে সামরিকতন্ত্রের ঝুঁকি। এটাই লাতিন আমেরিকার শিক্ষা। এ নিয়েই সারা জীবন গল্প, অনুগল্প, প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন লিখে গেছেন এদোয়ার্দো গালিয়েনো। তার স্মৃতি এক গোটা জনগোষ্ঠীর স্মৃতির মতন। কিছুই ভোলা হয়নি তাতে, কোনো প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গই বাদ পড়েনি, মণি-মুক্তার মতো সেসব অভিজ্ঞতার স্মৃতি-বিস্মৃতি সংকলন করেছেন গালিয়েনো। আমাকেও বলেছিলেন, ‘আপনি এ রকম একটা চেষ্টা করে দেখুন না কেন দক্ষিণ এশিয়ার জন্যে? আপনাদেরও তো রয়েছে- আমি জানি- কত বলা কত না-বলা সংগ্রামের ইতিহাস, কথা ও কাহিনি।’
[ক্রমশ]

পভার্টি ট্র্যাপ ও আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য: সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ (Poverty Trap and Poverty of Aspiration: Tagore in Sylhet)

পর্ব ::৩৩

৫. আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য

কিন্তু শ্রীহট্ট কলেজে তার ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল অন্যত্র নিহিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নয়, উন্নয়নের দৃষ্টিকোণকেই রবীন্দ্রনাথ সেখানে বেশি করে প্রাধান্য দিয়েছেন। দরিদ্ররা যে চিরকালেই দারিদ্র্যের ফাঁদে থেকে যায়, তার মূল কারণের মধ্যে ‘আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য’ও একটি। সাম্প্রতিক উন্নয়ন অর্থশাস্ত্রেও ‘পভার্টি অব এসপিরেশন’ একটি স্বীকৃত ধারণা। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সহকর্মীদের একটি বড় পর্যবেক্ষণ হলো- গরিবরা গরিব শুধু তাদের বৈষয়িক অবস্থার কারণে নয়, এর মূলে রয়েছে তাদের উপরে-ওঠার উচ্চাকাঙ্খার অভাব। একবার সেই আকাঙ্খাকে প্ররোচিত করতে পারলে-সেটা ‘ক্ষুদ্র প্রণোদনা’ দিয়েই অর্জন সম্ভবুদরিদ্রের মৃদুমন্দ চলাকে বৃহৎ উল্লম্ম্ফনে পরিবর্তন করা যায়। এটাকে অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন-‘উদ্বুদ্ধকরণের অর্থনীতি’ বা nudge-economics. যার মাধ্যমে গরিব মানুষের আচরণ-কার্যকলাপের ধরন-ধারণা পরিবর্তন করা সম্ভব। যাতে করে তারা দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে একশো বছর আগেই এই দারিদ্র্য-ফাঁদের তত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি শ্রীহট্ট ভাষণে সেদিন বলেছিলেন :’যদি মূলের দিকে তাকিয়ে দেখি তাহলে দেখব আমাদের যে দারিদ্র্য সে আত্মারই দারিদ্র্য। …নদী যখন মরে যায় তখন দেখতে পাই গর্ত এবং বালি, সেই শূন্যতার সেই শুস্কতার অস্তিত্ব নিয়ে বিলাপ করবার কথা নেই। আসল বিলাপের কারণ নদীর সচল ধারার অভাব নিয়ে। আত্মার সচল প্রবাহ যখন শুস্ক তখনি আচারের নীরস নিশ্চলতা।’

আচারের নিশ্চলতা আসে গতানুগতিকতার বৃত্তে নিজেকে বেঁধে ফেলার মানসিকতার কারণে। রবীন্দ্রনাথ এর কারণ অন্যত্র দেখেছিলেন আমাদের বহুধা-বিভক্ত জাত-পাতসর্বস্ব ধর্মাচারের মধ্যে। ‘আকাঙ্ক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন শিক্ষা-ব্যবস্থার দীনতা নিয়ে। কোন জাতিকে যদি ধ্বংস করে দিতে চাও তাহলে তার শিক্ষা-ব্যবস্থাকে ভেতর-থেকে ধ্বংস করে দাও- এই ছিল তার মত। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এ প্রসঙ্গে :’আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে শিশুকাল থেকেই কোমর বেঁধে আমরা খর্ব করি। অর্থাৎ সেটাকে কাজে খাটাবার আগেই তাকে খাটো করে দিই। অনেক সময়ে বড় বয়সে সংসারের ঝড়-ঝাপটার মধ্যে পড়ে আমাদের আকাঙ্খার পাখা জীর্ণ হয়ে যায়। তখন আমাদের বিষয়বুদ্ধি, অর্থাৎ ছোট বুদ্ধিটাই বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, শিশুকাল থেকেই আমরা বড় রাস্তায় চলবার পাথেয় ভার হালকা করে দিই।’

এই বলে রবীন্দ্রনাথ তার নিজের গড়া শান্তিনিকেতনের উদাহরণ টেনে আনলেন। সেখানেও কিছুতেই ছাত্র-ছাত্রীদের পুঁথিগত বিদ্যার প্রভাব থেকে সরিয়ে আনা যাচ্ছিল না। ‘নিজের বিদ্যালয়ে ছোট ছোট বালকদের মধ্যেই সেটা আমি অনুভব করি। প্রথমে কয় বৎসর একরকম বেশ চলে কিন্তু ছেলেরা যেই থার্ড ক্লাসে গিয়ে পৌঁছয় অমনি বিদ্যা অর্জন সম্বন্ধে তাদের বিষয়বুদ্ধি জেগে ওঠে। অমনি তারা হিসাব করতে শিখতে বসে। তখন থেকে তারা বলতে আরম্ভ করে, আমরা শিখব না, আমরা পাস করব। অর্থাৎ যে পথে যথাসম্ভব কম জেনে যতদূর সম্ভব বেশি মার্ক পাওয়া যায় আমরা সেই পথে চলব।’

একেই অর্থনীতিবিদ ল্যান্ট প্রিচেট আখ্যায়িত করেছেন ‘জানার সংকট’ বা লার্নিং ক্রাইসিস বলে। আমরা ডিগ্রি পাচ্ছি, কিন্তু যা জানা দরকার ছিল তা জানছি না। রবীন্দ্রনাথ একে কেবল উন্নতমানের শিক্ষা-পদ্ধতি বা ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’-এর সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। বেশি করে জানার ইচ্ছাটাই মরে যাচ্ছে, বিশেষ করে এটা মরে যাচ্ছে গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য। কোন ভাবে পাশ করে সরকারী চাকুরে হওয়ার ইঁদুর-দৌড়ে গরিব-মধ্যবিত্ত সবাই নিয়োজিত। জানার জন্য জানা- এই আকাঙ্খা প্রায় উঠেই যাচ্ছে। এ-ই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের চরম দুর্ভাবনা।

শিক্ষার নানা আনুষ্ঠানিক ধাপ অতিক্রম করা হচ্ছে, কিন্তু জ্ঞান বাড়ছে না, ‘জানার সংকট’ থেকে যাচ্ছে- এর ফলে একভাবে দেখলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়লেও দেশ থেকে অন্ধকার দূর হচ্ছে না। দেশের উন্নয়নে এই শিক্ষা যথাযথ অবদান রাখতে পারছে না। আর সেটা দেখে যারা দেশের বাজেট প্রণয়ন করেন, তারা শিক্ষার পেছনে বাজেট-বরাদ্দ বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এক ধরনের বিষ-বৃত্তের সৃষ্টি হচ্ছে এতে। শুধু পরীক্ষা-পাসের শিক্ষায় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে; কিন্তু দেশ ও দশের উন্নয়ন বেগবান হয় কিনা- সে প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের সংশয় ছিল। এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘আকাঙ্ক্ষা’ ভাষণে স্পষ্ট করে তার ভিন্নমত উত্থাপন করেছেন : ‘যে দেশে বিদ্যালয়ে কেবল দেখতে পাই, ছাত্র নোটবুকের পত্রপুট মেলে ধরে বিদ্যার মুষ্টি ভিক্ষা করছে, কিম্বা পরীক্ষার পাসের দিকে তাকিয়ে টেক্‌স্‌ট্‌ বইয়ের পাতায় পাতায় বিদ্যার উঞ্ছবৃত্তিতে নিযুক্ত; যে দেশে মানুষের বড় প্রয়োজনের সামগ্রী মাত্রেই পরের কাছে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করা হচ্ছে, নিজের হাতে দেশের লোকে দেশকে কিছুই দিচ্ছে না- না স্বাস্থ্য, না অন্ন, না জ্ঞান, না শক্তি; যে দেশে কর্মের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ, কর্মের চেষ্টা দুর্বল, যে দেশে শিল্পকলায় মানুষ আপন প্রাণ মন আত্মার আনন্দকে নব নব রূপে সৃষ্টি করছে না; যে দেশে অভ্যাসের বন্ধনে সংস্কারের জালে মানুষের মন এবং অনুষ্ঠান বদ্ধবিজড়িত; যে দেশে প্রশ্ন করা, বিচার করা, নূতন করে চিন্তা করা, ও সেই চিন্তা ব্যবহারে প্রয়োগ করা কেবল যে নেই তা নয় সেটা নিষিদ্ধ এবং নিন্দনীয়, সেই দেশে আপন সমাজে আত্মাকে দেখতে পায় না, কেবল হাতের হাতকড়া, পায়ের বেড়ি এবং মৃতযুগের আবর্জনা-রাশিকেই চারদিকে দেখতে পায়, জড় বিধিকে দেখে, জাগ্রত বিধাতাকে দেখে না।’

পরীক্ষা-পাসের দাসত্ব থেকে জানার বা জ্ঞানের সংকট শুধু আর শিক্ষা ক্ষেত্রের দীনতায় সীমিত রইল না। এই শিক্ষার সংকটের কারণে ভিন্ন রুচির মানুষের জন্ম হলো, যার হাত দিয়ে উন্নয়ন বেগবান করা প্রায় অসম্ভব। এ কথা রবীন্দ্রনাথ অন্যান্য লেখাতেও নানাভাবে বলেছেন। শিক্ষাকে তাৎক্ষণিকের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করতে চাইলে হিতে বিপরীত ঘটে। রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’ এ প্রসঙ্গে মনে পড়বে। ‘আকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক ভাষণের দু’বছর পূর্বে ‘সবুজপত্র’ সাময়িকীতে প্রকাশিত রূপক-গল্পে তিনি লিখেছিলেন :’এক যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত; শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত; জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে। রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’ মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’ এর ফল কী হয়েছিল, তা আমাদের জানা। পাখিকে পুঁথি-শিক্ষা দিতে গিয়ে রাশি রাশি পুঁথির পাতা তাকে গেলানো হলো। জীবনাবসান হলো তার এক পর্যায়ে। পরীক্ষা-পাসের তাড়নায় একালের ছাত্র-ছাত্রীদেরও তোতাকাহিনীর পাখির দশা হওয়ার উপক্রম। তাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যেতে বসেছে, মহৎ কিছু করার স্বপ্ন প্রায় অবলুপ্ত। রবীন্দ্রনাথ যে-যুগে এসব কথা বলেছিলেন, আজ সে কথা এই ‘ম্যাস এডুকেশন’-এর যুগে আরো প্রাসঙ্গিক। জনমানসে শিক্ষার যে বাসনা জেগেছে, সেটাকে যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, কীভাবে শিক্ষার সাধনাকে অন্তত দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যায়তনগুলোতে উৎসাহিত করা যায় সেদিকটি নিয়েও রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাবতে বলেছেন। এ প্রেক্ষিতে তিনি ‘নালন্দা বিক্রমশীলা তক্ষশীলা’র উদাহরণ টেনে বিশ্ববিদ্যালয়কে তত্ত্বজ্ঞানীদের মিলনক্ষেত্র করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন; আবার অন্যদিকে যারা উচ্চশিক্ষার সোপানে উন্নীত হবে না, তাদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিস্তার চেয়েছেন। জ্ঞানের বৈষয়িক দিককে তিনি অস্বীকার করেন নি। তিনি জ্ঞানের সাধনার দিকের সর্বাত্মক বিকাশ চেয়েছিলেন কেবল। ইউরোপের ছকে নয়, আমাদের দেশের আদলে আমাদের প্রয়োজন মাথায় রেখে আমরা যেন বিদ্যায়তন গড়ে তুলি; সেটা তিনি চেয়েছিলেন। অথচ আমরা একে একে দেশের উচ্চ বিদ্যায়তনগুলো শেষ করে দিচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলেছেন: ‘যে-জ্ঞান আমাদের সত্যের দিকে নিয়ে যায় গোড়া থেকেই সেই জ্ঞানের সঙ্গে অসত্য ব্যবহার। এর কি অভিশাপ আমাদের দেশের পরে লাগছে না? এই জন্যেই কি জ্ঞানের যজ্ঞে আমরা ভিক্ষার ঝুলি হাতে দূরে বাইরে বসে নেই? আপিসের বড় বাবু হয়েই কি আমাদের এই অপমান ঘুচবে? …সব বড় দেশে যে বড় আকাঙ্ক্ষা মানুষকে আপন শক্তিতে আপন ভাবনায় আপন হাতে সৃষ্টি করবারই গৌরব দান করে আমরা সেই আকাঙ্ক্ষাকেই কেবল যে বিসর্জন করছি তা নয়, দল বেঁধে লোক ডেকে বিসর্জনের ঢাক পিটিয়ে সেই তালে তাণ্ডব নৃত্য করছি।’ এখনো সেই তাণ্ডব নৃত্যই আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে।

৬. আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য থেকে পরনির্ভরতা

একশো বছর আগে সিলেটে রবীন্দ্রনাথ যে আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্যের কথা বলেছিলেন, তার ফলে শুধু চাকরি খোঁজা তরুণ সম্প্রদায়েরই সৃষ্টি হচ্ছে না, ‘বড় কিছু’ করার ইচ্ছেও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এর থেকে জন্ম নিয়েছে এক অভূতপূর্ব পরনির্ভরশীল মানসিকতার। সিলেটে আসার কয়েক বছর আগে একটি প্রবন্ধে তিনি ভরসার ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবের কথা সবিস্তারে উল্লেখ করেছিলেন :

“আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, অপরে আমাদের শক্তি সম্বন্ধে সর্বদা সন্দেহ প্রকাশ করে বলিয়াই এবং সেই সন্দেহকে মিথ্যা প্রমাণ করিবার কোনো ক্ষেত্র পাই না বলিয়াই অন্তরে তন্তরে নিজের সম্বন্ধেও একটা সন্দেহ বদ্ধমূল হইয়া যায়। এমনি করিয়া আপনার প্রতি যে লোক বিশ্বাস হারায় সে কোনো বড়ো নদী পাড়ি দিবার চেষ্টা পর্যন্তও করিতে পারে না; অতি ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যে ডাঙ্গার কাছে কাছে সে ঘুরিয়া বেড়ায় এবং তাহাতেই সে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকে এবং যেদিন সে কোনো গতিকে কাগবাজার হইতে বরানগর পর্যন্ত উজান ঠেলিয়া যাইতে পারে সেদিন সে মনে করে, ‘আমি অবিকল কলম্বাসের সমতুল্য কীর্তি করিয়াছি।”

চাকরি লাভের জন্য যে শিক্ষা তাতে শিক্ষার চেয়ে চাকরির প্রাপ্তিই বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তুমি কেরানির চেয়ে বড়ো, ডেপুটি মুনসেফের চেয়ে বড়ো’- এটাই আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে। কেননা, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতি হিসেবে, সমষ্টি হিসেবে, আরো উপরে, ঐ উপরে ওঠার।’ ‘পাখির ছানা তো বিএ পাস করিয়া উড়িতে শেখে না; উড়িতে পায় বলিয়াই উড়িতে শেখে।’ কিন্তু আমাদের উড়বার ইচ্ছেটাই মরে গেছে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। রাষ্ট্রজীবনে জ্ঞান-তপস্যার স্বীকৃতি ও গুরুত্ব কমে এসেছে। অনুকৃতিকেই আমরা পরম আরাধ্য বলে বিবেচনা করছি। এভাবে চললে দেশ হিসেবেও আমরা পিছিয়ে যাব, পেছনের সারিতে পড়ে থাকব চিরকাল। রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানজগতের পরনির্ভরতাকে শেষের বিচারে আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্যের সাথে যুক্ত করে দেখেছেন। পুরো উদ্ৃব্দতিটা পাঠ করলে সে বিষয়ে কোনো সংশয় থাকে না :’যে ইতিহাস ইংরেজি কেতাবে পড়িয়াছি তাহাই আমাদের একমাত্র ইতিহাসের বিদ্যা, যে পলিটিক্যাল ইকোনমি মুখস্থ করিয়াছি তাহাই আমাদের একমাত্র পলিটিক্যাল ইকোনমি। যাহা কিছু পড়িয়াছি তাহা আমাদিগকে ভূতের মতো পাইয়া বসিয়াছে… আমরা মনে করিতেছি। পলিটিক্যাল সভ্যতা ছাড়া সভ্যতার আর কোনো আকার হইতেই পারে না।… মানুষ যদি এমন করিয়া শিক্ষার নীচে চাপা পড়িয়া যায়, সেটাকে কোনোমতেই মঙ্গল বলিতে পারি না।… আমরা জগতের ইতিহাসকে নিজের স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখিতে সাহস করিলাম কৈ, আমরা পলিটিক্যাল ইকোনমিকে নিজের স্বাধীন গবেষণার দ্বারা যাচাই করিলাম কোথায়?’

[এই বিষয় সমাপ্ত]

পভার্টি ট্র্যাপ ও আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য: সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ (Poverty Trap and Poverty of Aspiration: Tagore in Sylhet)

পর্ব ::৩২

১. অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার ‘পভার্টি ট্র্যাপের’ তত্ত্ব

২০১৯ সালের অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সহকর্মীদের গবেষণার একটি মূল বিষয় ছিল ‘পভার্টি ট্র্যাপের’ তত্ত্ব। দরিদ্ররা কী করে দীর্ঘকালের জন্য দারিদ্র্যের ‘ফাঁদে’ পড়ে যান- অনেক ক্ষেত্রে বংশানুক্রমিকভাবেই সেই ফাঁদে জীবন কাটান- এ কথা অভিজিৎ ব্যানার্জি, এস্থার ডুফলো ও মাইকেল ক্রেমারের আগে অনেকেই বলেছিলেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যের বিশেষত্ব হলো যে, তারা দেখিয়েছেন এই ফাঁদ থেকে উত্তরণও সম্ভবপর, তবে তার জন্য সামান্য প্ররোচনা বা উদ্বুদ্ধকরণের প্রয়োজন। এটা ‘বাইরের থেকে’ দিতে পারলে দরিদ্ররা ফাঁদ সম্পর্কিত জড় নিশ্চল অবস্থা কাটিয়ে উঠে উপরে ওঠার প্রেরণা পাবেন এবং এতে করে তাদের অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন করা সম্ভব। ব্যানার্জি ও তার সহকর্মীদের পভার্টি ট্র্যাপ ও তার উত্তরণে ‘সামান্য প্ররোচনা’র তত্ত্ব দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মন-মানসিকতাকে উপজীব্য করে গড়ে উঠেছে। মনের জড়তা কাটিয়ে ওঠা গেলে দারিদ্র্যের জড়তাও দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সহকর্মীরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মনের জড়তা কোনো মনোবিকলনের বিষয় নয়। বিভিন্ন ‘প্রতিষ্ঠানের’ বা ইনস্টিটিউশনের অনুপস্থিতির কারণে এই জড়তা স্থায়ী আকার ধারণ করে। এক্ষেত্রে তারা নানা উদাহরণ দেখিয়েছেন। দরিদ্ররা সঞ্চয় কম করে তা এই কারণে নয় যে, তাদের আয় কম বা সঞ্চয়ের তাৎপর্য তারা বোঝে না। কিন্তু তারা যেটুকু সঞ্চয় করতে পারে তা এতই সামান্য যে, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেই সঞ্চয় আমানত হিসেবে নিতে আগ্রহী থাকে না। ফলে, হয় তাকে সেই ক্ষুদ্রতম সঞ্চয়কে বাঁশের খুঁটিতে রেখে দিতে হবে (চুরি যায় কি-না এ রকম নিত্য অনিশ্চয়তার মধ্যে), নতুবা তাকে সেই সঞ্চয় অতি তাড়াতাড়ি ভেঙে ফেলে ‘খেয়ে’ ফেলতে হবে। বিদ্যা-অর্জনের ক্ষেত্রেও এই যুক্তি খাটে। অতিদরিদ্ররা অক্ষরজ্ঞান, ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াতে চায় না তার কারণ বেশি ক্লাসে পড়ানোর ইচ্ছার সঙ্গে প্রাইভেট মাস্টারের কাছে পড়ানোসহ ‘বাড়তি খরচের’ বোঝা এসে পড়ে। তারা ছেলেমেয়েদের সম্ভাব্য যেসব স্কুলে পাঠাতে পারত, সেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষাও এমন কোনো গুণে-মানের নয়। ফলে চাকরি ক্ষেত্রে শহরের অপেক্ষাকৃত ধনী ঘরের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকার সম্ভাবনা গরিবদের ক্ষেত্রে খুবই কম। আর তাই গরিবদের প্রায়ই আগে বলতে শুনেছি, এত পড়িয়ে কী হবে, তার চেয়ে ক্ষেত-কৃষি বা নিদেনপক্ষে ছোটখাটো ব্যবসাটাই ভালো করে করুক। এইভাবে কম ও নিচু মানের শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে বংশানুক্রমিকভাবে দারিদ্র্যে থেকে যাওয়ার ‘ফাঁদ’-এর সৃষ্টি হয়।

অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সহকর্মীদের আগে এমনকি সমাজতত্ত্ববিদ অর্জুন আপ্পাদুরাই-এরও আগে (‘যিনি ক্যাপাসিটি টু এসপায়ার’ এই শব্দবন্ধটি চয়ন করেছিলেন এবং যাকে ভিত্তি করে দেবরাজ রায় প্রমুখেরা ‘এসপিরেশন ট্র্যাপ’ এর প্রবন্ধ লিখেছিলেন)- পভার্টি ট্র্যাপের অন্য একটি উৎসের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেটি হচ্ছে ‘আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য’ বা পভার্টি অব এসপিরেশন। এই চিন্তাটি তিনি দুই অর্থে ব্যক্ত করেছিলেন। একটি হচ্ছে, দরিদ্ররা দরিদ্র থেকে যাচ্ছে ‘ভরসার’ অভাবে, অনেক ক্ষেত্রে তার ‘আত্মশক্তি’র চিন্তাকে ভরসার দারিদ্র্য হিসেবেও পাঠ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি একদিন একটি গ্রামের উন্নতি করতে গিয়েছিলুম। গ্রামের লোকদের জিজ্ঞাসা করলুম, ‘সেদিন তোদের পাড়ায় আগুন লাগল, একখানা চালাও বাঁচাতে পারলি নে কেন?’ তারা বলল, ‘কপাল!’ আমি বললেম, ‘কপাল নয় রে, কুয়োর অভাব। পাড়ায় একখানা কুয়ো দিস নে কেন?’ তারা তখনি বললে, ‘আজ্ঞে, কর্তার ইচ্ছে হলেই হয়।’ একথা বলার পর রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছেন, ‘যাদের ঘরে আগুন লাগাবার বেলায় থাকে দৈব তাদেরই জল দান করবার ভার কোনো-একটি কর্তার।’ অর্থাৎ নিজের ওপরে ভরসা নেই লোক সাধারণের। সেখানে রয়েছে ‘কালেটিভ অ্যাকশনের’ সমস্যা। তার পেছনে রয়েছে ভরসার অভাব, যার মূলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য।

সিলেটে রবীন্দ্রনাথের ভাষণে আমরা স্পষ্ট করে ‘আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য’-এর কথা শুনতে পাই- কিন্তু নিজের প্রতি ভরসা বা আত্মশক্তির থেকে ভিন্নতর অর্থে। আমি সেই ধরনেরই মানুষ হই বা হয়ে পড়তে পারি যেরকম মানুষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করি। তাই ইংরেজি প্রবাদকে মাথায় রেখে বলা যায়, স্বপ্ন দেখার আগে দেখে নিতে হবে কীসের স্বপ্ন দেখব। কেননা বলা তো যায় না স্বপ্নটা সত্যও হয়ে যেতে পারে! রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে সেরকম একটি ‘স্বপ্ন দেখার’ সংকট দেখতে পাচ্ছেন। একেই তিনি আকাঙ্ক্ষার দারিদ্র্য বলছেন সিলেটে শ্রীহট্ট কলেজের ছাত্রদের সমাবেশে এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে। এই নিয়েই আজকের আলোচনা।

২. আজি হতে শতবর্ষ আগে

রবীন্দ্রনাথ সিলেট আসেন ১৯১৯ সালের ৪ নভেম্বর (১৯ কার্তিক) বুধবার সকালে। ৮ নভেম্বর সিলেট থেকে ত্রিপুরা রাজ-পরিবারের আমন্ত্রণে আগরতলা যান। সিলেটে অবস্থানকালে তিনি তিনটি বক্তৃতা দেন। প্রথমটি ৬ নভেম্বর সকালে টাউন হল প্রাঙ্গণে; প্রায় পাঁচ হাজার লোকের উপস্থিতিতে গণসংবর্ধনায়। সেখানে কবি যে ভাষণ দেন, তা ‘বাঙ্গালীর সাধনা’ নামে পরে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় টাউন হলের একটি সমাবেশে রবীন্দ্রনাথ আরো একটি বক্তৃতা দেন। ‘শ্রীহট্টে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধের লেখক সুধীরেন্দ্রনারায়ণ সিংহ এ বিষয়ে লিখেছেন, সিলেটে ‘কবি যে-সমস্ত বক্তৃতা করেছিলেন তন্মধ্যে এইটিই সবচেয়ে উদ্দীপনাপূর্ণ এবং প্রাণস্পর্শী হয়েছিল। দুঃখের বিষয় অনুলিখিত না হওয়ার দরুন কবির এই অমূল্য বক্তৃতাটি চিরস্থায়ীরূপে রক্ষিত হল না।’ রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় বক্তৃতাটি অনুষ্ঠিত হয় ৭ নভেম্বর শুক্রবার। সমাবেশটি হয় শ্রীহট্ট কলেজে। ছাত্ররা শোভাযাত্রা করে তাকে নিয়ে আসে সেখানে। উপস্থিত প্রায় চার হাজার লোকের অর্ধেকই ছিল ছাত্র। সেখানে রবীন্দ্রনাথ যে-ভাষণ দিয়েছিলেন সেটি পরে ‘আকাঙ্খা’ নামে ওই বছরেই ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকায় (পৌষ ১৩২৬) প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া আরো কয়েকটি স্থানে কবি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা এখানে আমার মনোযোগের বিষয়বস্তু নয়। আমি এখানে মূলত শ্রীহট্ট কলেজে তার ভাষণের সুবাদে রবীন্দ্রনাথের উন্নয়ন-চিন্তার কয়েকটি দিকের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

৩. মৌমাছির চাক

মার্কসের একটি কথা ছিল যে, অতি-দক্ষ মৌমাছির চাকের চেয়ে একজন স্বল্প-দক্ষ স্থপতিও অনেক বেশি সৃষ্টিশীল। কেননা, একজন স্থপতি গৃহ-নির্মাণের আগে একটি ছক এঁকে নেয়। সেই ছকটি আগে তার মাথায় আসে, তারপরেই কেবল সেই ছকটি বাস্তবায়ন করে। এই যে প্রথমে কল্পনা-শক্তির ফলে নির্মিত ডিজাইন, সেটি একটি ‘অ্যাবস্ট্রাকশন’ কেবল। কিন্তু এই বিমূর্ত চিন্তা করার সামর্থ্যের ভিত্তিতেই পরে ‘কনক্রিট’-এর ইমারত গড়ে ওঠে। অতি-দক্ষ চাক-নির্মাণে নিপুণ মৌমাছির দলের সেই অ্যাবস্ট্রাকশনের শক্তি নেই-তারা একই পথ দিয়ে ঘুরে-ফিরে একই ধরনের মৌচাক বানিয়ে থাকে একে অপরের দেখাদেখি। এখানে মৌমাছির শ্রম হচ্ছে পুনরাবৃত্তিমূলক শ্রম বা ‘রিপিটেটিভ লেবর’। পক্ষান্তরে, একজন স্থপতির শ্রম হচ্ছে ‘নন-রিপিটেটিভ লেবর’ :একেকটি নকশা অপরের থেকে আলাদা, এবং সেই অর্থে অভিপ্রায়ে-ডিজাইনে-পরিণামে যেকোন স্থপতির শ্রমই সৃষ্টিশীল চরিত্রের বা ‘ক্রিয়েটিভ’। মার্কসের মত রবীন্দ্রনাথও চেয়েছিলেন যাতে করে বিদ্যাপীঠগুলো সৃষ্টিশীলতার বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। মার্কসের মতই তার এক্ষেত্রে মৌমাছির তুলনাই মনে এল :’যে সমাজে কিছুই ভাববার নেই, কিছুই করবার নেই, সমস্তই ধরাবাঁধা, সে সমাজ কি বুদ্ধিমান শক্তিমান মানুষের বাসের যোগ্য? সে সমাজ ত মৌমাছির চাক বাঁধবার জায়গা।’

আমাদের মনে, আমাদের বিদ্যায়তনে অসংখ্য এমন মৌমাছির চাক বাসা বেঁধেছে। এর মূলে রয়েছে ‘আকাঙ্খার দারিদ্র্য’। এটাই শ্রীহট্ট কলেজের সমাবেশে রবীন্দ্রনাথের ভাষণের মূলকথা। সেখানে কবি ইউরোপের সভ্যতার সাথে আমাদের সভ্যতার তুলনা করে বলেছেন, ইউরোপ-যে ইউরোপ হতে পেরেছে তা মুখস্থ বা মনস্থ বিদ্যার জোরে নয়, কেবল মাত্র আকাঙ্খার জোরে। সে আকাঙ্খা কিসের তাড়নায়? সে কি কেবল শুধু পরীক্ষায় পাস করে একটা উন্নত মানের চাকুরি জোগাড়ের জন্যে? নাকি, আরো বৃহত্তর কিছু অর্জনের আশায়? এখানে রবীন্দ্রনাথের উত্তর হলো, শুধু মানব-পুঁজি বা হিউম্যান-ক্যাপিটাল আহরণের মাধ্যমে ইউরোপ আজকের পর্যায়ে পৌঁছায় নি :

‘এই যুগে সমস্ত পৃথিবীতে য়ুরোপ শিক্ষকতার ভার পেয়েছে। কেন পেয়েছে? গায়ের জোরে আর সব হতে পারে কিন্তু গায়ের জোরে গুরু হওয়া যায় না। যে মানুষ গৌরব পায় সেই গুরু হয়। যার আকাঙ্খা বড় সেই ত গৌরব পায়। য়ুরোপ বিজ্ঞান ভূগোল ইতিহাস প্রভৃতি সম্বন্ধে বেশি খবর রেখেছে বলেই আজকের দিনে মানুষের গুরু হয়েছে এ-কথা সত্য নয়। তার আকাঙ্খা বৃহৎ, তার আকাঙ্খা প্রবল; তার আকাঙ্খা কোন বাধাকে মানতে চায় না, মৃত্যুকেও না। মানুষের যে বাসনা ক্ষুদ্র স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে, সেটাকে বড় করে তুলে মানুষ বড় হয় না, ছোটই হয়ে যায়। সে যেন খাঁচার ভিতরে পাখীর ওড়া, তাতে পাখার সার্থকতা হয় না।’

৪. বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার উৎস :ইউরোপ বনাম উপনিবেশ

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের মধ্যে এই বৃহত্তর ওড়ার আকাঙ্ক্ষা জাগল কেন? এর একটি সহজ উত্তর হতে পারত- ইউরোপ তার নিজের প্রয়োজনে পৃথিবীকে তার পদানত করতে চেয়েছিল। আর সে কারণেই সে ছুটে গেছে অনির্দিষ্ট গন্তব্যের সন্ধানে বিপদ-সংকুল সমুদ্র যাত্রায়, কখনো কলম্বাসের মত ভারত-আবিস্কারে বেরিয়ে উপনীত হয়েছে আমেরিকা মহাদেশে। কখনো ভাস্কো দা গামার মত উত্তমাশা অন্তরীপ পেরিয়ে কোচিনের উপকূলে। এলিজাবেথীয় যুগে স্যার ওয়াল্টার র‌্যালে প্রমুখ পরিব্রাজনার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন রাজ-তরফে। লক্ষ্য একটাই- বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, আর সম্প্রসারণের আড়ালে উপনিবেশের স্থাপনা তথা সাম্রাজ্যের বিস্তার। ইউরোপে যখন এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিকেরা প্রগতির মশাল জ্বেলেছেন, তা অন্তত :স্বল্প মেয়াদে মানব-মুক্তির জন্যে যতটা কাজ করেছে, তারচে বেশি করে ‘নিউ ওয়ার্ল্ডে’ উপনিবেশ স্থাপন করে ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড’-কে সমৃদ্ধশালী করার জন্যে। ‘আকাঙ্খা’ প্রবন্ধে ইউরোপের উচ্চকাঙ্ক্ষা ও বৃহত্তর জ্ঞানান্বেষণের পেছনে ক্ষমতালিপ্সুতার অন্তর্লীন যোগাযোগ রবীন্দ্রনাথের চোখে বড় হয়ে দেখা দেয়নি। সেটা হবে আরো পরে- দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রাক্কালে। ‘কালান্তর’-এর প্রবন্ধমালায় তার স্বীকৃতি রয়েছে। ১৯৩৭ সালে এসে কবি বলেছেন :

‘বর্তমান যুগ য়ুরোপীয় সভ্যতা-কর্তৃক সম্পূর্ণ অধিকৃত এ কথা মানতেই হবে। এই যুগ একটি বিশেষ উদ্যমশীল চিত্তপ্রকৃতির ভূমিকা সমস্ত জগতে প্রবর্তিত করেছে।’ এ কথা বলেই তিনি লক্ষ্য না করে পারলেন না :’আমি জানি, য়ুরোপীয় শিক্ষা ও সভ্যতার মহত্ত্ব সম্বন্ধে সুতীব্র প্রতিবাদ জানাবার দিন আজ এসেছে। এই সভ্যতা বস্তুগত ধন-সঞ্চয়ে ও শক্তি-আবিস্কারে অদ্ভুত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। …মানুষের দুরাকাঙ্খাকে এমন বৃহৎ আয়তনে, এমন প্রভূত পরিমাণে, এমন সর্ববাধাজয়ী নৈপুণ্যের সঙ্গে জয়যুক্ত করতে কোন দিন কোন মানুষ সক্ষম হয় নি।’ আবার এ-ও ঠিক যে, ‘হিংস্ট্রতা, লুব্ধতা, রাষ্ট্রিক কূটনীতির কুটিলতা পাশ্চাত্য মহাদেশ থেকে যেরকম প্রচণ্ড মূর্তি ধরে মানুষের স্বাধিকারকে নির্মমভাবে দলন করতে উদ্যত হয়েছে ইতিহাসে এমন আর কোন দিন হয় নি।’ ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনী ভাষণে রবীন্দ্রনাথ এই কথাগুলো বলেছিলেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, আকাঙ্ক্ষার নেশার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিক সম্পর্কেই রবীন্দ্রনাথ সমানভাবে সজাগ ছিলেন।

[ক্রমশ]

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ (Eliot, Orientalism and Tagore)

পর্ব ::৩১

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
সবশেষে, ফোর কোয়ারটেটস্‌-এর ‘দ্য ড্রাই স্যালভেজেস’র অংশে কৃষ্ণের নাটকীয় উল্লেখের প্রসঙ্গটি বিশদ ব্যাখার দাবি রাখে। কৃষ্ণ-অর্জুনের মধ্যকার সংলাপের এলিয়টকৃত ব্যাখ্যা খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, পুরো ফোর কোয়ারটেটস্‌-এর ডরকেন্ড নিহিত হয়ে আছে ‘মহাভারতে’র যুদ্ধক্ষেত্রে। বলা দরকার এলিয়ট সমস্ত ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে খুঁটিয়ে পড়েছিলেন ভাগবৎগীতার স্তবকসমূহ। এ বিষয়ে তার উপলব্ধি তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছেন :”আমার অভিজ্ঞতায় দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র পর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দার্শনিক কবিতা হচ্ছে গীতার পঙ্‌ক্তিমালা। গীতার অজুর্নকে লক্ষ্য করে যে সব বক্তব্য রাখা হয় তা শুধু এলিয়টের কবিতা ও দর্শনের ওপরেই প্রভাব ফেলেনি, তার ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও রাজনৈতিক মত গঠনেও ছায়া ফেলেছিল। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘কর্মে লিপ্ত হয়েও মনের ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলা খুবই দুস্কর, বিশেষত আমাদের জন্য। খুব উন্নত-সভ্যতার ব্যক্তিরাই সেটা পারে, যেমনটা হয়েছিল ভাগবৎগীতার নায়ক অর্জুনের ক্ষেত্রে।’ আমি কতকটা সন্দেহ করি যে, রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে গ্রহণযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি কৃষ্ণ-অর্জুন সংলাপকে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকপন্থি ও ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মধ্যকার লড়াইয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানান এলিয়ট। তিনি প্রকারান্তরে এখানে নিজেকে অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্মর্তব্য, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে অর্জুনের মনোবৈকল্য দেখা দেয়। একদিকে ভ্রাতা পান্ডবকুল, অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত কৌরবকুল- এ দুই যুধ্যমান পক্ষের মধ্যে কার পক্ষে গিয়ে দাঁড়াবেন বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুন? যেকোনো পক্ষেই দাঁড়ান না কেন, তার ফল তো একটাই হবে :ভ্রাতৃনিধন ও জ্ঞাতিনিধন। তাছাড়া, যুদ্ধ হলে তা কেবল মিত্রশিবিরে বা শত্রুশিবিরের নিধনযজ্ঞেই সীমিত থাকবে না; তার প্রতিফল ছড়াবে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে। সাধারণ মানুষ যারা কোনো পক্ষেই নেই, তারা আরো বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশত্যাগ করবে বা প্রাণ হারাবে। এর দায়ভাগী কেন হতে যাবেন অর্জুন? এই প্রশ্নই তিনি করেছিলেন তার যুদ্ধসারথি শ্রীকৃষ্ণকে। এটি মহাভারত শীর্ষক মহাকাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর গীতার দর্শন-আলোচনারও মূল প্রেক্ষাপট। কিন্তু স্পেনের গৃহযুদ্ধের সাথে মহাভারতের গৃহযুদ্ধের মধ্যে তুলনীয় উপাদান খোঁজাটা খুবই কষ্টকল্পিত। স্পেনের গৃহযুদ্ধের বিবদমান পক্ষের রাজনৈতিক দর্শন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত- একপক্ষে রিপাবলিক-এর সমর্থক-দল চাইছে গণতন্ত্র ও মানবকল্যাণ; অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট শক্তির সমর্থক দল ও সামরিক বাহিনী চাইছে একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের অবলুপ্তি। এ দুই শুভ ও অশুভ পক্ষের লড়াইয়ে কথিত ‘অর্জুন-বিষাদের’ প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু ফোর কোয়ারটেটস্‌ যখন এলিয়ট শেষ করে আনছেন, ততদিনে স্পেনের গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেছে। রিপাবলিকপন্থিরা পরাজিত হয়ে গেছেন, স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। লোরকার মতো কবিরা ফ্যাসিস্টদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে মারা গেছেন। এসব সংবাদ এলিয়টের কাছে যথারীতি পৌঁছেছে। ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে পুরো মাত্রায়। পুঁজিবাদী ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একজোটে যুদ্ধ করছে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাশিয়া। তাদের লক্ষ্য একটাই :জার্মানির নাজিবাদ, ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জাপানের সমরবাদের পতন ঘটানো। আবার নতুন করে পক্ষ-নির্বাচনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এবারে এলিয়টের মনে দ্বিধা দেখা দিয়েছে। তবে কি আগে যেটা চিন্তা করেছিলেন তা ভুল ছিল? তবে কি এই যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান বলে কিছু নেই? কর্মে (অর্থাৎ যুদ্ধে) প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই? অথচ এলিয়ট জানেন- প্রথম মহাযুদ্ধের ফলাফল তো তিনি ‘ওয়েস্ট ল্যান্ডেই’ প্রত্যক্ষ করেছেন- এই যুদ্ধে মারা যাবে অগণিত মানুষ। তাহলে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করবেন কোন নৈতিকতা বোধে? এই প্রশ্নে এসে এলিয়ট দ্বিতীয়বারের মতো অর্জুন-বিষাদে আক্রান্ত হলেন এবং স্বগতোক্তির মতো করে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘ ÔI sometimes wonder if that is what Krishna meant?’ কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন অর্জুনকে-যুদ্ধ করো, কিন্তু নির্লিপ্ত থাকো এর ফলাফলে. কেননা এতে বিজয়ী হওয়ার গর্ববোধ নেই যেমন, এতে পরাজয়ের বিষণ্ণতাও নেই? যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এতে মোহহীনভাবে ফলাফলের আকাঙ্ক্ষা না করে। এভাবেই যুদ্ধকর্মের ভেতরে প্রবেশ করেও একজন মানুষ অনাসক্ত থাকতে পারে, এবং অনাসক্ত থাকতে পারলে সেই কর্মের দোষ বা গুণ কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কর্মের সুফল পায় বিশ্ব-প্রকৃতি, সমাজ-সংসার; অশুভর পরাজয়ে শুভত্ববোধ সর্বত্রগামী হয়। ফলের ওপরে অধিকার অন্যের, বহির্লোকের, সমাজ-রাষ্ট্রের, এর ওপরে ব্যক্তির নিজের কোনো অধিকার নেই। ‘আমি মাজে মাঝে ভাবি কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন’- এই জন্যেই এলিয়টের মনে প্রশ্নটি জেগে উঠেছে- বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিতে।

এরই মধ্যে এলিয়ট গীতায় পেয়েছেন, ‘যিনি কর্মে অকর্ম এবং অকর্মে কর্ম দেখেন, মনুষ্যের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান, তিনি যোগী, তিনি সর্বকর্মকারী’ ‘অকর্ম’ মানে রহধপঃরড়হ, আর ‘কর্ম’ মানে ধপঃরড়হ-এ দুইয়ের মধ্যে একটি ‘ভারসাম্য’ খুঁজছিলেন এলিয়ট। একথা তিনি ফোর কোয়ারটেটস-এর আগেও বলেছিলেন ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’-এ :

‘You know and do not know, what it is to act or suffer.
You know and do not know, that acting is suffering,
And suffering action. Neither does the agent suffer
Nor the patient act. But both are fixed
In an eternal action, an eteranal patience
To which all must consent that it may be willed
And which all must suffer that may will it,
That the pattern may subsist, that the wheel may turn and still
Be forever still.’

এই কবিতাংশের মধ্যে action I suffering নিয়ে যা বলা হয়েছে, ‘the wheel may turn’ বলে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে কৃষ্ণের বচনাংশ সুপ্ত হয়ে আছে। কৃষ্ণ বলেছিলেন গীতায়,’suffering is born of action… He who does not, in this world, turn the wheel thus set in motion, is evil in his nature, sensual in his delight, and… lives in vain..’ ফোর কোয়ারটেটস-এ এসে বচনাংশ নয়, পরোক্ষ ভাষণ নয়, সরাসরিভাবে কৃষ্ণ সমুপস্থিত। আমার অক্ষম অনুবাদে তা তুলে দিচ্ছি :

”মাঝে মাঝে আমার মনে হয়
কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছেন
এক ভাবে বা অন্য ভাবে:
‘কেননা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই
কেননা ভাবীকাল লুকানো
শেষ হয়ে আসা গানের সুরে
গোলাপের নিভন্ত আলোর
অপসৃয়মান সৌরভে,
যারা এখনো জন্মায়নি
তাদের জন্য শোকে-পরিতাপে,
যে-বই কখনো খোলা হয়নি
তার হলুদ ঝলসে-যাওয়া পাতায়।
উপরে ওঠার সিঁড়ি আসলে
নিচের দিকেই ঘুরে ঘুরে নামছে।
সামনে চলা আসলে পিছনে ফেরা।
এসবই তোমার বোধের অতীত,
তবে নিশ্চিত জেনো-
সময় কারো শুশ্রূষা করে না,
এখানে সে রকম আর্ত কেউ নেই।…
কখনো ভাববে না অতীত-পুরোপুরি অতীত,
আর আগামী-কেবলি অনাগত পল।…
যা উৎসন্ন ও যা আসন্ন
তার দিকে তাকাও
সমান মন নিয়ে…
কর্ম ও অকর্মের মাঝে রয়ে গেছে
এক তৃতীয় সম্ভাবনা।…
কখনো কর্মফলের অপেক্ষায় থেকো না।…
সম্মুখে অথই পারাবার, দ্যাখো।
বিদায় নয়-শুভ হোক যাত্রা।
এই পথ চলাতেই
তোমার শেষ গন্তব্য।’
এই বলেছিলেন কৃষ্ণ সেদিন
অর্জুনকে তিরস্কার করে,
মহাযুদ্ধ কুরুক্ষেত্রের ভেতরে।”

ফোর কোয়ারটেটস্‌ পড়তে পড়তে একথা আমার বারবার মনে হয়েছে এই চরৈবতি, এই পরিব্রাজনা, এই মোহমুক্তির বাসনা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ও গানে কতভাবেই না বেজে উঠেছিল-এলিয়ট কি সেটা জানতেন? তিনি কি রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ পড়েছিলেন? কখনো রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে উপনিষদকে দেখেছিলেন? পড়েছিলেন তার ‘রিলিজিওন অব ম্যান’, যেখানে আছে ফকির লালন ও তার বাউল সহচরদের কথা? দর্শন ও কবিতার সংশ্নেষণ করতে গিয়ে এলিয়ট প্রথাগত ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের পাঠের ওপরই কেবল জোর দিলেন। এই শাস্ত্রের বাইরের লোকজ ধর্মাচরণের দিকে নজর দিলেন না। কবীর-এর অনুবাদের পরও তাকে স্বীকার করে নিলেন না কোনো প্রবন্ধে বা কবিতায়। লালন ও তার সহচরগণের সাধনা এলিয়টের ওরিয়েন্টালিজমে শেষ পর্যন্ত অস্বীকৃতই থেকে গেল। আমরা এ প্রশ্নও না করে থাকতে পারি না যে, এলিয়ট ও রবীন্দ্রনাথ দু’জনেই অধ্যাত্মবাদী-একই পথের দুই পরিণাম বলা যেতে পারে-কেন তাদের মধ্যে দর্শন ও ধর্ম নিয়ে কোনো সংলাপ হলো না? সত্য কী-এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যে তর্কালাপ হয়েছিল। এলিয়টের সাথে উপনিষদ, পত্রঞ্জলির যোগসূত্র, গীতার কৃষ্ণ-অর্জুন সংবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিব্যি আলোচনা চলতে পারত। আরো ব্যাপক পরিসরে সেই তর্কালাপ হতে পারত। আমরা আগেই দেখেছি, সেই পরিবেশও ছিল। রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের কবিতা মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছিলেন, একাধিক কবিতার অনুবাদও করেছিলেন। ওয়েস্ট ল্যান্ডের শেষ চরণে ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’ ভাষ্যে রবীন্দ্রনাথের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বাদ দিলে এলিয়ট রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে নীরব।

রবীন্দ্রনাথের জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী (মীরা দেবীর স্বামী) ‘মেডিটেশন’ নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘Thoughts for Meditation : A way to Recover from within ‘১৯৫১ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকা লেখেন এলিয়ট স্বয়ং। সেখানে এলিয়ট লক্ষ্য করেন যে খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, ‘সুফী’ দর্শনে, ইহুদি প্রভৃতি নানা ধর্মেই ধ্যান বা মেডিটেশন-এর সুউচ্চ স্থান স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই নিজ নিজ পথের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে, যেন অন্যান্য ধর্মের পথগুলো সত্যের কোনো একটি দিকও উন্মোচিত করেনি। ‘Truth is ifself is never occult, never confined to one tradition or religion’ সত্য সংগুপ্ত নেই কোনো অজ্ঞেয় বাতেনী মন্ত্রে- কোনো বিশেষ তন্ত্র-মন্ত্রের শাখায় বা দর্শনে। তার মানে এই নয় যে, এলিয়ট প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে সহজ সমীকরণের সম্ভাবনা দেখতেন। তার মতে, বিভিন্ন ধারার মধ্যে সমীকরণ সম্ভব কেবল এসব শাস্ত্র, দর্শন ও ধর্মগ্রন্থের নিবিড়তম চর্চার মাধ্যমে-শুধু মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজদেহে ও রাষ্ট্রের শরীরে বিভিন্নমুখী আলোকসম্পাত ঘটেছিল নানা দিক থেকে-সেকথা রবীন্দ্রনাথ তার নানা লেখায় বলে গেছেন। ‘শক হুনদল পাঠান মোগল এক দেহে হলো লীন’ সে রকম চিন্তাধারায় রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যকেও অঙ্গীকৃত হতে দেখেছেন আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় (ভারতবর্ষ বললে তা এখন ‘মোদির ভারত’ বলে শোনাতে পারে ভেবে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করলাম)। অর্থাৎ দেয়া-নেয়া, আমদানি-রফতানি গ্রহণ-বর্জন দুইই চলতে পারে। চলা উচিত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে-এই ছিল রবীন্দ্রনাথের মত। এরকম কথা ওয়াল্ট হুইটম্যানও ভেবেছিলেন। নিউ ইয়র্ক ক্রমশ বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে-বিভিন্ন জাতির মানুষেরা সেখানে জড়ো হচ্ছে, এক সময় তাতে যোগ দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসী মানুষেরাও। ১৮৫০-র দশকে লেখা কবিতাটিতে হুইটম্যান বলছেন :

‘To us, then at last the Orient comes…
The Originatress comes,\
The nest of languages, the begueaters of poems….
The race of Brahma comes. ‘

হুইটম্যান-প্রভাবিত এলিয়ট আরো গভীরে গিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজেছেন। তার সংস্কৃত-অধ্যয়ন, উপনিষদ-গীতার ব্যাখ্যা, বৌদ্ধ-দর্শনের শূন্যবাদ, সুফী দর্শনের উল্লেখ্য, সবকিছুই নানাভাবেই তার কবিতার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ উপকরণ হিসেবে এসেছে। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি নিজেকে একজন ‘দার্শনিক-কবি’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন-শুধু কবি বা শুধু দার্শনিক হিসেবে নয়। এটাই এলিয়টের ‘প্রাচ্যবাদী মুহূর্তের’ বা Orientatist Turn-র পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ। এক জায়গায় এলিয়ট বলেছেন,

‘The life of a soul does not consist in the contemplation of one consistent world but in the painful task of unifying (to a greater or lesser extent) jarring and incompatible ones, and passing, when possible, from one or more discordant viewpoints to a higher which shall somehow include and transmute them.’

অর্থাৎ এলিয়ট বিশ্বাস করতেন যে প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের দর্শন ও মতবাদের মধ্যে যত বাদানুবাদই থাকুকক না কেন, যত ভিন্নপথের পথিক হিসেবে তারা নিজেদের দাবি করুক না নে, একটা বৃহত্তর ক্ষেত্রে-আইনস্টাইনের ‘ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরির’ মতো করে-সে সব দর্শন ও মতের মধ্যে মেলবন্ধন সম্ভব। রবীন্দ্রনাথও এমনটা মনে করেছিলেন-শেষ জীবনে প্রথাগত ধর্মের অনুশাসন ও মতবাদের থেকে সরে এসে তার মতো করে তিনি নিজস্ব একটি ধর্মমত ও দর্শন গড়ে তুলেছিলেন-যার সাক্ষ্য পাই তার ‘রিলিজিওন অব ম্যান’ বক্তৃতামালায়। এলিয়ট অবশ্য সেই পথ ধরে হাঁটেননি। তার পথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন-পড়া ছাত্রের মত-তিনি সত্যকে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন তত্ত্বও মতবাদের অলিগলিতে। এবং এই হাতড়ে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে নিজের সংশয়, আস্থা ও উপলব্ধি সংবলিত কবিতার পঙক্তিমালা সৃষ্টি করে গেছেন। দর্শন নয়, কবিতার প্রয়োজনে, একটি নতুন ধারার কবিতা লেখার জন্যেই তার যত শ্রম, আয়োজন, ও অন্তর্গত রক্তক্ষরণ। বৌদ্ধ শূন্যবাদ নিয়ে যখন একটি ‘হাইকু’ তার হাত থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত হয়েছে তখন তার পেছনের দর্শন নয়। সামনের কবিতার আলোকদীপ্তি আমাদের বিমোহিত করে। তিন প্রাচ্যবাদী কি না, পাশ্চাত্য দর্শনের ছাত্র কি না, তার চেয়ে তার বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় তার কবিতার আধুনিক মনোমুগ্ধকর রূপ। ফোর কোয়ারটেটস-এর Burnt Norton-যা বৌদ্ধ-দর্শন দ্বারা গভীরভাবে সমাচ্ছন্ন-এই রূপের বর্ণনা দিয়েছে :

‘And the pool was filled with water out of sunlight,
And the lotos, rose, quietly, quietly,
The surface glittened out of heart of light,
Then a cloud passed, and the pool was empty.’

মেঘ সরে যেতেই দেখা গেল পথটিও নেই, সরোবরও নেই, আর তার কবিও অন্তর্হিত।

[এই প্রসঙ্গ সমাপ্ত :আগামী পর্বে নতুন প্রসঙ্গ]

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ (Eliot, Orientalism and Tagore)

পর্ব ::৩০

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

Doctrine of Karma ও জন্মান্তরের চক্র বড় আকারে এসেছে এলিয়টের কাব্য-নাট্য ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’-এর ভেতরে। সেখানে প্রুফ্রকের সমুদ্রতলের পরিত্যক্ত কাঁকড়া থেকে গুবরো পোকা, মাছ, হাতি হয়ে বন-মানুষ ও মানুষে রূপান্তরের পরিক্রমা উঠে এসেছে। তার প্রকাশভঙ্গি (ফর্ম/টেকনিক) অত্যন্ত আধুনিক। আমি বিক্ষিপ্ত স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তি তুলে ধরছি :

‘I have lain on the floor of the sea and breathed/
with the breathing of the sea-anemone…/
I have lain in the soil and criticized the worm…/I have felt
The horn of the beetle, the scale of the riper, the/
Mobile hard insensitive skin of the elephant, the/
Evasive flank of the fish…/
I have seen/
Rings of light coiling downwards, descending/
To the horror of the ape…

এবারে আসি ওয়েস্ট ল্যান্ডের শেষাংশে এসে এলিয়টের আকস্মিক বৃহদারণ্যক উপনিষদের দিকে ফিরে তাকানো প্রসঙ্গে। যদিও কাব্যগ্রন্থের নাম নষ্ট পতিত জমি; কবিতাটির শেষাংশটি প্রাণিত পুনর্জাগরণ ও প্রতিকারের প্রার্থনায়। এ জন্যই কবি বেছে নিয়েছেন বৃহদারণ্যক উপনিষদ। এর অনুবাদ আমার সাধ্যের বাইরে। আমি শুধু ভাবের তর্জমাটুকু করে দিচ্ছি বেশ কিছুটা স্বাধীনতা নিয়ে। দীর্ঘ কবিতাটির শেষে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে, অচিরেই বৃষ্টি হবে। পুষ্প-পল্লবে ভরে যাবে পৃথিবীর উপত্যকা, সব খানা-খন্দক, মরুভূমি। এ রকম একটি দৃশ্যপটে প্রোথিত হচ্ছে লাইনগুলো :

‘গঙ্গা অর্ধমৃত, চারপাশের নুয়ে-পড়া পাতাগুলো কাঁপছে

বৃষ্টির প্রতীক্ষায়,

বহুদূরে হিমবাহের শিখরে

জড়ো হচ্ছে কালো মেঘ,

বাকরুদ্ধ বনভূমি

হাত-পা গুটিয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষমাণ,

ঠিক তখনই বজ্র নির্ঘোষে বেজে উঠল দৈববাণী

দা

দত্তা :আমরা এতদিন কী দিয়েছি পৃথিবীকে?

ও বন্ধু আমার, বুকের মধ্যে রক্ত যেন শব্দ করে উঠল

এক মুহূর্তের জন্য, আসুন আত্মসমর্পণ করি এবারে

এই যুক্তি-তর্কের যুগ যা কখনোই দিতে পারবে না

আমাদের শোকসভায়

মাকড়সার মতো জাল বিছানো স্মৃতির কুণ্ডয়নে

যাকে কখনোই পাওয়া যাবে না

যা নেই আমাদের এই শূণ্য ঘরে

সিল-গালা ভাঙা চুক্তিপত্রের ভেতরে-

দা

দয়াধ্যাম :আমি শুনেছি সেই সবখোল চাবির কথা

সেই দরোজা একবারই খোলা যায়, কেবল একবারই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

আমরা সবাই সেই চাবির আশায় প্রহর গুনছি

প্রত্যেকে যার যার কুঠরিতে বসে চাবির কথা ভাবছি

প্রত্যেকে আবদ্ধ করে রাখছি নিজেদের নিজস্ব কুঠরিতে

কেবল রাতের বেলায় চারপাশে অস্পষ্ট ধ্বনি শোনা যায়

ভেঙে-পড়া কোরিওলেনাসের অবয়ব মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠে

দা

দময়ত্তা :নৌকা দুলে উঠেছে

যারা পাল তুলে দাঁড় টেনে নাও বাইতে জানে

তারাই দায়িত্ব নেবে এবারে বিশ্বস্ত হাতে।

দ্যাখো, সমুদ্র শান্ত, তোমারও হৃদয়

হয়তো সাড়া দিত এভাবেই

হয়তো দুলে উঠত, যদি সেই আমন্ত্রণ একবার শুনতে পেতে

যারা সবকিছুর দায়িত্ব বুঝে নিতে জানে

যদি মুহূর্তের জন্য সমর্পিত হতে তাদের কাছে…

আমি এক ছিপ-ফেলা প্রশান্তি নিয়ে তীরে বসে আছি

আমার পিছনে বিরান প্রান্তর

আমার দেশে কি শেষটায় সত্যি সত্যি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে?

লন্ডন ব্রিজ ভেঙে পড়ছে ভেঙে পড়ছে ভেঙে পড়ছে …

আজ আমার ধ্বংসের বিপরীতে গিয়ে

এই লাইন ক’টি রাখলাম…

দত্তা। দয়াধ্যাম। দময়ত্তা।

শান্তি শান্তি শান্তি।’

এখানে এলিয়টের কথিত খ্রিষ্টীয় আত্মসমর্পণ ছাড়াও উপনিষদের ওরিয়েন্টালিজম রয়েছে স্পষ্ট করেই। বৃহদারণ্যক উপনিষদে দত্তা, দয়াধ্যাম ও দময়ত্তা শব্দ তিনটি এসেছে একটি উপাখ্যানের সূত্র ধরে। প্রজাপতি ব্রহ্মা একই প্রশ্ন রেখেছিলেন মানুষ, দেবতা ও অসুরদের কাছে। ‘দা’- এই অক্ষরটি ধ্বনিত হলে তিনটি দল তার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ করে। এলিয়ট যাকে বলেছেন ‘What the thunder said’, তা হচ্ছে দৈববাণী এক। একই ধ্বনি শুনে মানুষ বলেছে ‘দত্তা’ বা অন্যকে দান-দক্ষিণা করার কথা। দেবগণ বলেছেন ‘দময়ত্তা’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের কথা। আর অসুরেরা বলেছে দয়াধ্যাম বা অন্যের প্রতি সদাচারপ্রবণ ও সংবেদনশীল হওয়ার কথা। যার মধ্যে যা নেই সে বুকের মধ্যে সেই ধ্বনিই বাজতে শুনেছে। মানুষ দয়া ভুলে গেছে, তাই সে শুনেছে দান-দক্ষিণার কথা। অসুরেরা অন্যের প্রতি সদা রুষ্ট, তারা শুনেছে সংবেদনশীল হওয়ার কথা। আর দেবগণ প্রায়ই আত্মগরিমায় বিভোর থাকেন- তারা শুনেছেন আত্ম-সংবরণের উপদেশ বাণী। সমগ্র মানব জাতির জন্য এই তিনটি অর্থই- be self-controlled, be charitable and be compassionate- সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম মহাযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের উপরে দাঁড়িয়ে লেখা ওয়েস্ট ল্যান্ডের ট্র্যাজিক পরিণতির শেষে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পা বাড়াতে চেয়েছেন এলিয়ট, এবং সে কারণেই বৃহদারণ্যক উপনিষদের ওই তিনটি নীতি তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

[ক্রমশ]

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ (Eliot, Orientalism and Tagore)

পর্ব ::২৯
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’- এই সমাপ্তি চরণটি যদি রবীন্দ্রনাথের সূত্রে প্রাপ্ত না হয়ে থাকে, তাহলে এর আদি-প্রেরণা কোথা থেকে এসেছিল? এক্ষেত্রে আমার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হয় সেই উত্তরটি যেটি এলিয়টের মনন, পাঠ্যাভ্যাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগ্রহণের সাথে জড়িত। ভুলে গেলে চলবে না যে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এলিয়ট ভারতীয় দর্শন এবং প্রাচ্যীয় ভাষার ওপরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোর্স নিয়ে ছিলেন। শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য কোর্স নেননি, এ বিষয়ে তার পূর্বাপর আগ্রহ অটুট ছিল। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের নানা সূত্রের উল্লেখ ও প্রতিতুলনা করে তিনি ব্রাডলির ভাববাদের ওপরে গবেষণা করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাকে রীতিমতো হাত ধরে পথ দেখিয়েছিলেন দু’জন সেরা প্রাচ্যবিদ- তার একজন হচ্ছেন অধ্যাপক চার্লস লানমেন, যার কাছে এলিয়ট শিখেছিলেন সংস্কৃত এবং অন্যজন হচ্ছেন অধ্যাপক জেমস উড্‌স। লানমেন-এর কাছে সংস্কৃতে তিনি পাঠ করেছিলেন উপনিষদ ও ‘গীতা’, আর উড্‌স-এর কাছে অধ্যয়ন করেছিলেন পতঞ্জলির ‘যোগসূত্র’। মূল সংস্কৃতে তিনি চারটি বেদ ও আঠাশটি উপনিষদ থেকে কেবল ‘নির্বাচিত অংশই’ পাঠ করতে পেরেছিলেন (মূল সংস্কৃতে পড়াটা হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট কোর্স সমাপ্ত করার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল)। কিন্তু বাদবাকি বেদ ও উপনিষদ তিনি অনুবাদের মাধ্যমে জেনেছিলেন ম্যাক্সমুলার সম্পাদিত Sacred Books of East, চার্লস লানমেন-এর Sanskrit Reader, এবং জেমস উড্‌স-এর অনূদিত Yoga-system of Patanjali থেকে। ভারতীয় দর্শনবিষয়ক তার অধ্যয়ন ছাত্রাবস্থাতেই থেমে থাকেনি। আমৃত্যু তিনি এই বিষয়ে চর্চা করে চলছিলেন এবং এ বিষয়ে তার অর্জন ছিল প্রায় লোকচক্ষুর বাইরে। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে Cleo Kearns তার ‘T. S. Eliot and Indic Traditions’ বইতে লিখেছেন তা পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতির দাবি রাখে :

‘Eliot was as deeply versed in the ancient traditions of Indic thought as he was in the later and more precisely delineated tenets of Buddhism. The matrix of myth provided by the Vedas and the philosophical richness and diversity of the Upanishads repeatedly claimed his attention, and the brilliance of the orthodox Hindu systems, Sometimes parallel to, sometimes diverging from Buddhist debates, formed an important part of his philosophical training. Nor was the effect of these traditions and debates merely theoretical; their terminology, their distinctions, and at times their tone and cadence inform Eliot’s poetry at many points, providing images, aphorisms and points of view that often shape his stance toward his material, even when the material itself seems quite different in origin and intent.’

হ্যারল্ড ব্লুম যার বইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেই অধ্যাপকের কথা মনোযোগের দাবি রাখে। অধ্যাপক keans-এর বক্তব্য হচ্ছে যে, এলিয়ট প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে ততটাই নিমজ্জিত ছিলেন যতটা তিনি পরবর্তীতে প্রভাবিত ছিলেন বৌদ্ধ দর্শনে। বেদের উপাখ্যানগুলো যেমন তার দৃষ্টি কেড়েছিল, তেমনিভাবে উপনিষদের পাতায় বিবৃত দর্শনের বৈচিত্র্য ও বিশালতা তার ওপরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কখনও সনাতনী হিন্দু শাস্ত্রের নানা শাখা, কখনও এসবের বিরুদ্ধে তোলা বৌদ্ধ-বিতর্ক এলিয়টের দার্শনিক হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল। এসবের প্রভাব শুধু তত্ত্বগত ভাবলে ভুল হবে। এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল তার কাব্যজগতে- শব্দাবলির ব্যবহারে, বাক্‌প্রতিমায়, উপলব্ধির বর্ণনায়, নানা স্থানে। এলিয়টের কবিতার ব্যবহূত চিত্রকল্পে, আপ্তবাক্যে, মতামত প্রকাশের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে এই প্রভাব। কবিতার বিষয়বস্তুকে কীভাবে তিনি জড়ো করেন তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে এসব উপাদান ছায়া ফেলেছে, এমনকি যখন এসব উপাদানের উৎপত্তিস্থল বা আয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন বলয়ের আবহে গড়ে উঠেছিল তখনও।

আমার অক্ষম ও দ্রুত ভাব-তর্জমা থেকে এটুকু অন্তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আধুনিক পাশ্চাত্যের কাব্যরীতির স্রষ্টা যিনি- অন্তত পক্ষে পুরোধা ব্যক্তিত্ব যিনি- তার সৃষ্টিকর্মের পেছনে রয়ে গেছে প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট অধ্যয়ন-পাঠ ও অবস্থান। তার মতো করে তিনি তার ‘নিজস্ব প্রাচ্য’ গড়ে নিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে দার্শনিক Simon weil-i The Needs for Roots-র ভূমিকায় এলিয়ট লিখেছিলেন, ‘উপনিষদ পাঠে যতই নিমজ্জিত হওয়া যায় ততই একজন ইউরোপীয় ছাত্রের কাছে মর্মোদ্ধার করা কঠিনতর মনে হতে থাকে।’ তারপরও তিনি বার বার ছুটে গেছেন উপনিষদের দিকে, কেননা তিনি অন্যান্য ওরিয়েন্টালিস্টদের মতো বিশ্বাস করতেন এর মধ্যকার জ্ঞানে পাশ্চাত্য ‘উপকৃত’ হবে। এলিয়টের এই বিশ্বাসের ভেতরে এডওয়ার্ড সাইদ কথিত ওরিয়েন্টালিজমের ছায়া দেখতে পাবেন কেউ কেউ। তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এলিয়টের বিশ্বাসের জগৎ আমাদের কাছে দূরবর্তী হতে পারে, আমরা সে বিশ্বাসকে অগ্রাহ্যও করতে পারি, কিন্তু বিষ্ণু দে’র মতো আমরা দেখতে পারি কী করে প্রাচ্যীয় দর্শন পাশ্চাত্যের কাব্য ভুবনে আধুনিকতার নতুন ভঙ্গিমা, চিত্রকল্প, অনুভব ও কণ্ঠস্বরের সৃষ্টি করছে। ক্লেদজ কুসুমের মতো অশুদ্ধ পটভূমি থেকে শুদ্ধতম কবিতার লাইন নিঃসৃত হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এলিয়টের কাব্যজগতে প্রাচ্যীয় দর্শনের প্রভাবকে আমরা বিচার করতে পারি। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

এলিয়টের কবিতা বুঝতে গেলে তার কবিতার পেছনের দর্শন-চিন্তাকে বোঝা দরকার। আগেই বলেছি, এই দর্শন-চিন্তার ভূমিতে ভারতীয় দর্শন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। এ নিয়ে এলিয়ট পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে :’চার্লস লানম্যান-এর অধীনে দু’বছর ধরে সংস্কৃত শিক্ষার পর এবং জেমস উডস্‌-এর অধীনে আরও এক বছর পতঞ্জলির যোগ-সূত্রের জটিল পথে চলার পরে আমার অবস্থা অনেকটা আলোকপ্রাপ্ত সাধু-সন্তদের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা যা করতে চেয়েছেন; তাদের চিন্তাভাবনার সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ দিকের তুলনায় বেশির ভাগ য়ুরোপীয় দার্শনিকদেরই আজ নিতান্ত স্কুল-বালক বলে মনে হবে। সেই মহৎ প্রচেষ্টার অর্ধেকও যদি বুঝে থাকি তার ফল হয়তো এই যে, আমার মন থেকে গ্রিক থেকে শুরু করে য়ুরোপীয় দর্শনের যাবতীয় ক্যাটাগরি আর বৈশিষ্ট্যসমূহের মোহ মন থেকে মুছে গিয়েছিল।’

ভারতীয় দর্শন বলতে নির্দিষ্ট করে উপনিষদ, শংকরের অদ্বৈতবাদ, পতঞ্জলির ভাষ্যে যোগসূত্র, গীতার সকাম ও নিস্কাম কর্মফলের তত্ত্ব ও বৌদ্ধ দর্শন বিশেষ করে এলিয়টের মনকে প্রভাবিত করেছিল। এসব তাকে পড়তে হয়েছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাডলির ওপরে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখার কালে এলিয়ট এদিক থেকে ভাগ্যবান ছিলেন। একদিকে সংস্কৃৃত ও ভারতীয় দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি পেয়েছিলেন চার্লস লানম্যান ও জেমস উড্‌সের মতো অধ্যাপকবৃন্দ, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনের শিক্ষক হিসেবে বার্ট্রান্ড রাসেলকে। লানম্যানই তাকে ‘২৮টি উপনিষদ’ থেকে বিভিন্ন নির্বাচিত অংশ বিশেষভাবে পাঠ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এর মধ্যে ছিল বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই বিখ্যাত অংশটি, যেটা এলিয়ট ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর শেষাংশে ব্যবহার করেন। মূল সংস্কৃতে অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতে ততদিনে প্রকাশিত অনুবাদ-গ্রন্থের সহায়তা নেন। ইংরেজি ছাড়া ফরাসি ও জার্মানও জানতেন তিনি। হার্ভার্ডে প্রবেশের আগে বয়স কম হওয়ার কারণে বোস্টনের সুবিখ্যাত প্রাইভেট স্কুল মিল্টন একাডেমিতে এক বছর বাড়তি হাইস্কুলের পড়াশোনা করতে হয়েছিল এলিয়টকে। সেই ‘অতিরিক্ত’ বছরে এলিয়টের পাঠ্যসূচিতে জার্মান ভাষা-শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে পল ডিউসেন-এর (Deussen) ‘দ্য সিস্টেম অব বেদান্ত’ বইটি মূল জার্মান সংস্করণেই পাঠ করেছিলেন। এ ছাড়া ম্যাক্সমুলারের ‘দ্য সেক্রেড বুকস্‌ অব দ্য ইস্ট’ তো তার পাঠ্যসূচিতে ছিলই। হার্ভার্ডে পড়ার সময় এক সেমিস্টারের জন্য প্যারিসে আঁরি বার্গসঁর কাছে পাশ্চাত্য দর্শনও পড়তে যান এলিয়ট। আমি বলতে চাচ্ছি, ইয়েটস বাদ দিলে সমসাময়িক কবিকুলের মধ্যে ইলিয়টের মতো এতটা দর্শনে প্রশিক্ষিত কেউ ছিলেন না আমেরিকা বা ইউরোপে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য- এই উভয়বিধ দর্শনেই আগ্রহ ও ব্যুৎপত্তি দুই-ই ছিল তার এবং এটি তার আধুনিক কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে অন্তনির্হিত শক্তি ও ভরসা জুগিয়েছিল। তার বিভিন্ন পর্যায়ের কবিতায় এ কারণেই অনায়াসে প্রাচ্য দর্শন উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে গেছে। তাতে করে কবিতার আধুনিক সাজ-সজ্জায় কোনো বিরুদ্ধাচার হয়নি। একজন দক্ষ কারিগর যেমন করে থাকেন, তেমনিভাবে বিভিন্নমুখী প্রভাবকে এলিয়ট আত্মস্থ করেছেন- আবহমান সময় ও তার স্বভাবকে নৈর্ব্যক্তিক ধররে প্রায় ‘তৃতীয় নয়ন’ ব্যবহার করেই তুলে ধরেছেন।

উপনিষদের ‘কর্মফল’তত্ত্ব, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘doctrine of Karma’ এলিয়টের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। কর্মফলের কারণে সুখ বা অসুখ, সত্তার জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম, যুক্ত ও বিযুক্ত কর্ম এবং এ মোহের আবরণ থেকে মুক্তি- এমনই উপনিষদের বড় অংশজুড়ে আলোচিত হয়েছে। সেটি এখানে আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমি দেখাতে চাইছি, এই আপাত নীরস এবং জটিল দর্শনের থেকে কবিতার জন্য নতুন ইমেজ-চিত্রকল্প ও উপমা এবং হয়তোবা কোনো দার্শনিক রোধ আহরণ করতে চেয়েছেন এলিয়ট। ‘লাভ সং অব প্রুফ্রক’-এ ‘doctrine of Karma’ অনুসরণে প্রুফ্রক-এর মনে হয়েছে যে, ব্যর্থ এই জীবন- যেখানে ভক্তিতেও আত্মসমর্পণ করতে পারেনি, কর্মেও মনোনিবেশ করতে পারেনি। তারচে বরং ভালো ছিল নিঃশব্দ সমুদ্রের তলদেশে পরিত্যক্ত একাকী কাঁকড়ার মতো নিজেকে টেনে বেড়ানো : ‘I should have been a pair of ragged claws/Scuttling across the floors of silent seas’ ‘জন্ম, প্রজনন ও মৃত্যু’- এ রকম একটি ক্ষান্তিহীন চক্রের ভেতর দিয়ে প্রুফ্রকের পথচলা :সময় গেলে যেমন সাধন হয় না, সাধনের সময় কখনোই আসে না প্রুফ্রকের জীবনে। এই নিষ্ম্ফলা জীবনের আর্তনাদ বেজে ওঠে :

‘There will be time, there will be time
To prepare a face to meet the faces that you meet;
There will be time to murder and create,
And time for all the works and days of hands…’

এ রকম বিফল মনুষ্য-জীবনে বারবার এসে লাভ কী? এলিয়ট তার প্রথম কাব্য-নাট্য প্রচেষ্টা ‘Sweeney Agonistes : Fragments of an Aristophanic Melodrama’তে আরও স্পষ্ট করে জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে বলছেন :

ÔI’ve been born, and once is enough
You don’t remember, but I remember,
Once is enough.’

[ক্রমশ]