[তুমুল গাঢ় সমাচার ১১] সাহিত্য ও অর্থনীতি: বাংলার কয়েকটি দুর্ভিক্ষ (Literature and Economics: Some of Bengal’s Famines)

পর্ব ::১১

নতুন প্রসঙ্গ

১. ঋণং কৃত্বা

কথাটা এর আগেও কেউ কেউ বলেছিলেন, কিন্তু কৌশিক বসু যেভাবে বলেছিলেন, তাতে অর্থনীতি ও সাহিত্যের সম্পর্কের বিষয়টা অনেকের মনেই গেঁথে গিয়েছিল। তার ‘অ্যানালাইটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স :দ্য লেস ডেভেলপড্‌ ইকোনমি রিভিজিটেড’ গ্রন্থে তিনি এক পর্যায়ে আকস্মিকভাবেই শিবরাম চক্রবর্তীর ‘ঋণং কৃত্বা’ গল্পটির সবিস্তার বর্ণনা দেন। গল্পটা এমন :শিবরামের পাঁচশত টাকার জরুরি দরকার হয়ে পড়েছে মাসের বাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য। এ নিয়ে বাড়িওয়ালার কাছে অনেক কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। কোনো উপায় না দেখে তিনি তার বন্ধু হর্ষবর্ধনের শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু ধার নিতে গেলে ধার ফেরত দেওয়ারও নিশ্চয়তা থাকা চাই। অত-শত না ভেবে হর্ষবর্ধনকে তিনি বললেন, ‘বেশি নয় শ-পাঁচেক। আজ তো বুধবার, শনিবার দিনই টাকাটা আমি আপনাকে ফিরিয়ে দেবো।’ ধার পেলেন বটে, কিন্তু টাকা ফেরত দেবেন কী করে অত তাড়াতাড়ি? এ রকম ভাবছেন যখন, হঠাৎ রাস্তায় তার দেখা হয়ে গেল হর্ষবর্ধনের ছোট ভাই গোবর্ধনের সাথে। ‘গোবর্ধন ভায়া, যদি কথা দাও যে তোমার দাদাকে বলবে না তাহলে একটা কথা বলি।’ গোবর্ধন তাকে আশ্বস্ত করল। ‘অন্য কিছু নয়, কথাটা হচ্ছে এই, আমাকে শ-পাঁচেক টাকা ধার দিতে পার- দিন কয়েকের জন্য? আজ তো শনিবার? এই বুধবার সন্ধ্যের মধ্যেই টাকাটা আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব।’ গোবর্ধনের কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে শিবরাম এবার হর্ষবর্ধনকে তার ধারটা ফেরত দিয়ে দিলেন। এতে ‘ভালো ঋণ গ্রহীতা’ হিসাবে শিবরামের ওপরে আস্থা আরও বেড়ে গেল। পরের সপ্তাহে বুধবার দিনই অবশ্য আবার হর্ষবর্ধনের দ্বারস্থ হতে হলো তাকে, গোবর্ধনকে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। টাকা পেয়ে গোবর্ধনও সন্তুষ্ট, তবে বুধবার টাকা ফেরত দেওয়ার কিছু পরেই আবারও ধার করতে হলো শিবরামকে- এবার শনিবার হর্ষবর্ধনকে তার ধার শোধ দেওয়ার জন্য। এইভাবে ‘হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন, গোবর্ধন আর হর্ষবর্ধন- শনিবার আর বুধবারের দু-ধারের টানাপড়েন’ চলতে থাকল। অনেক দিন পর্যন্‌ত এটা চলছিল। কিন্তু এভাবে কতদিন আর চালানো যায়! অর্থনীতির পরিভাষায়, এ রকম দায়দেনার চক্র ‘সাসটেইনেবল’ হয় না। এর পরের অংশ শিবরামের অননুকরণীয় ভাষায় তুলে ধরছি :

‘হর্ষবর্ধন বাবু ভাই গোবর্ধন, একটা কথা আমি বলবো, কিছু মনে করো না-‘ বলে আমি শুরু করি :’ভাই গোবর্ধন, তুমি প্রত্যেক বুধবার হর্ষবর্ধন বাবুকে পাঁচশো টাকা দেবে। আর হর্ষবর্ধন বাবু, আপনি প্রত্যেক শনিবার পাঁচশো টাকা আপনার ভাই গোবর্ধনকে দেবেন। হর্ষবর্ধন বাবু, আপনি বুধবার, আর গোবর্ধন, তুমি শনিবার মনে থাকবে তো?’

‘ব্যাপার কি!’ হর্ষবর্ধন তো হতভম্ব :’কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘ব্যাপার এই যে, ব্যাপারটা আমি একেবারে মিটিয়ে ফেলতে চাই। আপনাদের দুজনের মধ্যে আমি আর থাকতে চাই না।’

কৌশিক বসু এই গল্পটি প্রোথিত করেছেন তার বইয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট’ পরিচ্ছেদে। কিন্তু আমাদের দেশের সাম্প্রতিককালের একটি বহুল আলোচিত বিষয় খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পটি শিক্ষণীয় হতে পারে। একাধিক ঋণদাতার কাছে যারা একই সময়ে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন, তারা অনেক দিন পর্যন্ত ‘শনিবার-বুধবার’ জাতীয় ঋণ-চালাচালি (Credit Juggling) করতে পারেন এবং এতে সাময়িকভাবে ‘ভালো’ ঋণ গ্রহীতা হিসেবে তাদের সুখ্যাতি বেড়েও যেতে পারে। এর ফলে যিনি কোনো ব্যাংকের কাছ থেকে শুধু সীমিত আকারের ঋণই প্রত্যাশা করতে পারতেন, ঋণ-চালাচালির মাধ্যমে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে তিনি বৃহদাকার ঋণ পাওয়ার পর্যায়ে নিজেকে উন্নীত করতে পারেন। ব্যাংকের জন্য এর মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল হতে পারে মারাত্মক। কেননা, যখন এক উৎস থেকে ধার নিয়ে আরেক উৎসের ধার ফেরত দেওয়ার ব্যাপারটি ধরা পড়ে তখন হয়তো বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে। এই অশুভ ঋণ-চালাচালির ব্যবস্থার ফলে বড় আকারের ঋণ মন্দ ঋণে বা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। এদিকটা শিবরাম চক্রবর্তীর দৃষ্টি এড়ায়নি। প্রথমবার হর্ষবর্ধনকে তার ধার ফেরত দেওয়ার পর তিনি বলছেন :

‘ভাবছেন এই যে, এই পাঁচশো টাকা ফিরিয়ে দিয়ে নিজের ক্রেডিট খাটিয়ে এর পরে আমি ফের হাজার টাকা ধার নেবো। তারপর সেটা ফেরত দিয়ে আবার দু হাজার চাইবো। আর এমনি করে ধারটা দশ-হাজারে দাঁড় করিয়ে তারপরে আর এ-ধারই মাড়াবো না? এই তো ভাবছেন আপনি?’

এ ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো যেতে পারে, মাল্টিপল লেন্ডারদের মধ্যে ঋণ-চালাচালির মাধ্যমে একজন মন্দ ঋণ গ্রহীতা শুধু সাময়িক সময়ের জন্যই পার পেতে পারে। এক সময় তাকে ধরা পড়তেই হয়, যেমনটা একদিন শিবরামকে হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন উভয়েরই মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কেননা, একজনের থেকে ধার-কর্জ করে ধার শোধ করার ‘শনিবার-বুধবার’ জাতীয় ব্যবস্থা টিকে আছে একটা শর্তের ওপরে, যাকে অর্থনীতিবিদরা বলেন, ‘ইনফর্মেশন এসিমেট্রি’। গোবর্ধনকে শিবরাম বারবার বলে দিয়েছিলেন, তার ধার করার ব্যাপারটি যেন হর্ষবর্ধনকে জানানো না হয়। আধুনিক ব্যবস্থায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাউকে বড় আকারের ঋণ দেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে তথ্য-বিনিময় করতে পারে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফর্মেশন ব্যুরোর সাহায্য নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিবরামের ‘শনিবার-বুধবার’ ব্যবস্থা কাজ করতে পারত না। যা হোক, ওপরে যে সম্ভাবনার কথা লিখলাম তা শুধু আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নয়; গ্রামাঞ্চলের মাইক্রো ক্রেডিট সেক্টরেও প্রযোজ্য। ‘শনিবার-বুধবার’ ব্যবস্থায় এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অন্য এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করা খুবই সম্ভব। যদিও বিভিন্ন এনজিও উৎস থেকে একই সঙ্গে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধ রয়েছে, তারপরও দেখা যায় এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি ঋণ গ্রহীতা বিভিন্ন সূত্রের কাছে ঋণী থাকছে। তার ন্যায়সঙ্গত কারণও রয়েছে :একজন ঋণ গ্রহীতা হয়তো তার ব্যবসা অবিলম্বে বাড়াতে চান। সে জন্য তাকে নানা উৎসের কাছে হাত বাড়াতে হয়। কিন্তু সবাই হয়তো সে কারণেই শুধু বহুবিধ উৎসের কাছে ঋণ খোঁজেন না। এক শ্রেণির ঋণ গ্রহীতা এই আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাতেও বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ লাভ করেন এবং নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে সেসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে দীর্ঘ সময় নিরাপদে কাটিয়ে দিতে পারেন। এবং এক পর্যায়ে ধরা পড়ে গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিব্যি বলে দিতে পারেন, ‘ব্যাপারটা আমি একেবারে মিটিয়ে ফেলতে চাই। আপনারা কে কত ঋণ মওকুফ করবেন সেটা নিজেরাই ঠিক করে নিন। আপনাদের মধ্যে আমি আর থাকতে চাই না।’ ততদিনে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এতটাই দায়দেনা জমেছে তার নামে; কোনো একক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাধ্য কী তাকে ধরে!

২. অমর্ত্য সেনের উদাহরণ

অর্থশাস্ত্র ও সাহিত্যের অন্তর্লীন সম্পর্ক অনুধাবন করার জন্য কৌশিক বসুর শিক্ষক অমর্ত্য সেনের মানব-উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, বৈষম্য ও দুর্ভিক্ষবিষয়ক লেখাগুলোকে ‘প্রতিনিধিত্বশীল রচনা’ হিসেবে পাঠ করা যায়। কয়েকটি উদাহরণ এখানে উপস্থাপন করছি। প্রথমেই মনে পড়বে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট তথা মানব-উন্নয়ন ধারণার কথা। ইউএনডিপি কর্তৃক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স বা মানব-উন্নয়ন সূচকের পেছনে মৌলিক দার্শনিক প্রেরণা এসেছিল দ্বিবিধ উৎস থেকে। একটি হচ্ছে, অ্যারিস্টটলের নীতিশাস্ত্র, বিশেষত ‘নিকোমেখিয়ান এথিকস’। অন্যটি হচ্ছে, বৃহদারণ্যক উপনিষদ। প্রথম সূত্রটি অপেক্ষাকৃত আলোচিত, কিন্তু শেষের সূত্রটির প্রতি সেনই প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। গল্পটি এমন :বানপ্রস্থে যাওয়ার আগে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্ক্য তার স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে ডেকে ধন-সম্পদের বরদানের ইচ্ছা পোষণ করলেন। ‘যদি সসাগরা পৃথিবী সম্পদে-বৈভবে পূর্ণ হয়ে ওঠে এবং কেবল আমারই করায়ত্ত হয়, তবে কি আমি অমরত্বপ্রাপ্ত হবো?’ মৈত্রেয়ী বরদানের পূর্বে ঋষিকে প্রশ্ন করলেন। যাজ্ঞবল্ক্ক্য বললেন, ‘না, তোমার জীবনও অন্য যে কোনো ধনী ব্যক্তির মতোই হবে সে ক্ষেত্রে। ধন-সম্পদের মাধ্যমে অমরত্ব লাভের কোনোই আশা নেই।’ সে কথা শুনে মৈত্রেয়ী তখন বলেছিলেন, ‘যে নাহং নামৃতা স্যাম তে মোহং কিম কুর্যাম? যা আমাকে অমরত্ব পেতে সাহায্য করবে না তা দিয়ে আমি কী করব?’ এ কথা উল্লেখ করার পর সেন তার ‘দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ বইয়ে লিখছেন, ‘মৈত্রেয়ীর কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি আমাকে জিএনপি বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে উন্নয়ন বিচার করার পদ্ধতির বাইরে উন্নয়নের অন্য ধারণাকে খুঁজে বের করতে ও ব্যাখ্যা করতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করছিল।’ যার প্রমাণ মেলে তার ‘ডেভেলপমেন্ট এজ ফ্রিডম’ বইয়ে।

অন্যত্র, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে সেন ব্যালটকেন্দ্রিক ধারণার বাইরে গিয়ে যুক্তিবাদী চর্চা, নাগরিক অধিকার, নির্ভয়ে মতপ্রকাশের ব্যক্তিস্বাধীনতা, জাত-পাত ভেদ-বুদ্ধির বাইরে সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা, তর্কপ্রিয়তা প্রভৃতি গুণের ওপরে জোর দিয়েছেন। পাবলিক চয়েস স্কুলের স্রষ্টা জেমস বুকাননের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে ‘গভর্নমেন্ট বাই ডিসকাসন’। এসব প্রতিটি বিষয়ে সেনের নানা লেখায় দর্শন, কবিতা, ইতিহাস, পুরাণ- এক কথায় বৃহত্তর অর্থে সাহিত্য-প্রসঙ্‌েগর উল্লেখ রয়েছে। মৃত্যু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রামমোহন রায়ের বরাত দিয়ে সেন লক্ষ্য করেন, মৃত্যু ভয়াবহ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এর ভয়াবহতা এ কারণে নয় যে, সত্তার বিলয় হচ্ছে। ‘ভাবুন একবার, আপনার মৃত্যুর দিনে চারপাশের মানুষজন অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে, আর আপনি সেসব কথা ও তর্কের কোনো উত্তর বা প্রত্যুত্তর দিতে পারছেন না।’ কেন মতের ও দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতা বা অ-সমসত্তার প্রতি জোর দেওয়া দরকার, এটা বোঝাতে তিনি আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালের একটি বিরল দৃষ্টান্তের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে ভারতে এসেছিলেন সম্রাট আলেকজান্ডার। এমনিতে অ্যারিস্টটলের কাছে শিক্ষা লাভ করেছেন, তার ওপরে মহাযোদ্ধা। বীরদর্পে তিনি ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এখানে-ওখানে অভিযান করে বেড়াচ্ছেন। এক জায়গায় গিয়ে তিনি দেখলেন, কয়েকজন জৈন ধর্মাবলম্বী দার্শনিক নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্কে ব্যস্ত। বিশ্ববিজয়ী গ্রিক সম্রাটের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার আগ্রহ বা সময় কোনোটাই তাদের নেই। এ রকম মনোভাবের কী কারণ তা জানতে চাইলে তাদের একজন বললেন, ‘হে সম্রাট আলেকজান্ডার [বিশেষ করে তোমার দিকেই আমাদের তাকাতে হবে কেন তা বুঝতে পারছি না।] তুমি যতটা পৃথিবীর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছ, প্রতিটি মানুষ ততটাই জায়গার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মতোই তুমি মানুষ; পার্থক্য কেবল যে তুমি সব সময় নিজেকে অকাজে ব্যস্ত রাখছ- কোনো কাজেই আসছ না। নিজ দেশ থেকে খামোখাই কত শত মাইল দূরে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছ এখানে। এতে তোমার যেমন বিরক্তি হচ্ছে, অন্যদেরও বিরক্তি উৎপাদন করছ… অচিরেই তোমার মৃত্যু হবে, এবং তখন এই পৃথিবীর ততটাই তোমার অধীনে থাকবে যতটা দরকার কেবল তোমাকে কবরস্থ করতে।’ কথাগুলো আলেকজান্ডারের পছন্দ হয়েছিল, যদিও বাস্তবে তার পদক্ষেপগুলো ছিল জৈন দার্শনিকদের মতের সম্পূর্ণ বিপরীতে। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। শাসকগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিরা এ রকমই হয়ে থাকেন :যে মতকে তার শ্রেষ্ঠ ও অনুকরণীয় মনে করেন, তাকে তারা কখনও অনুসরণ করেন না।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার] মিলের ভারতবর্ষ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মিল (Mill’s India and Bankimchandra)

পর্ব ::১০

[গত সংখ্যার পর]
এটা ঠিক যে, বঙ্কিম অন্যত্র বলেছেন, ‘আকবর শাসিত ভারতবর্ষকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বলি।’ এতে রাজশক্তির সুশাসনের গুণাবলির ওপরেই গুরুত্ব বেশি করে পড়ে; তার ধর্মপরিচয় নির্ণয়ের ওপরে নয়। তবু ধর্মপরিচয় নিয়ে বঙ্কিমের নিজের ভেতরে টানাপড়েন ছিল, পাছে নিরপেক্ষ পাঠক তাকে একদেশদর্শী ভাবেন, তা নিয়ে। ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে তাই বঙ্কিম আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে :’গ্রন্থকারের বিনীত নিবেদন এই যে, কোনো পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু মুসলমানের কোনো প্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভালো হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভালো হয় না। ভালো-মন্দ উভয়ের মধ্যে তুল্যরূপেই আছে।’ কিন্তু এর থেকে বঙ্কিম ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমানের ‘যুক্ত সাধনা’র কোনো আদর্শ স্থাপনে এগিয়ে এলেন না। এর পরবর্তী লাইনগুলো ব্যয়িত হলো তুলনামূলক বাহুবল ও রাজকীয় গুণের তত্ত্বে, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শতাব্দীব্যাপী এক দ্বন্দ্বাত্মক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আচরণের কথাই কেবল তুলে ধরে। হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত যে একই সুখ-দুঃখের জীবন অতিবাহিত করে এসেছে- সে কথা রাজকীয় ইতিহাসের তুলনামূলক ভূমিকার পর্যালোচনায় চাপা পড়ে গেল। যখন হিন্দু-মুসলমানকে ইতিহাসের বলয়ে সমদর্শী চোখে দেখার চেষ্টা করেছেন তখনও বঙ্কিম রাজশক্তি লাভে ইচ্ছুক পরস্পর যুধ্যমান দুই পরাশক্তি হিসেবেই তাদেরকে চিহ্নিত করেছেন :’বরং ইহাতে স্বীকার করিতে হয় যে, যখন মুসলমান এত শতাব্দী ভারতবর্ষের প্রভু ছিল, তখন রাজকীয় গুণে মুসলমান সমসাময়িক হিন্দুদিগের অপেক্ষা অবশ্য শ্রেষ্ঠ ছিল। কিন্তু ইহাও সত্য নহে যে, সকল মুসলমান রাজা সকল হিন্দু রাজা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণের সহিত যাহার ধর্ম আছে- হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণ থাকিতেও যাহার ধর্ম নাই-হিন্দু হউক, মুসলমান হউক-সেই নিকৃষ্ট।’ এখানে তিনি স্পষ্টতই মিল-বর্ণিত লিবার্টি ও ইকুয়ালিটির সাম্য-চিন্তা থেকে সরে এসে ধর্মকেন্দ্রিক আত্মপরিচয়ের ওপরে বিশেষ করে জোর দিচ্ছেন। যিনি ধর্মানুরাগী তিনিই শ্রেষ্ঠ, যিনি ধর্মশূন্য তিনিই নিকৃষ্ট বললে হিন্দু-মুসলিম চলমান সমস্যার কোনো সুরাহা হয় না, বরং সমস্যার সূত্রপাত হয় কেবল, যার পরিচয় পাই পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্রনৈতিক সেক্যুলারিজমের ব্যর্থতায়।

তারপরও বঙ্কিমের জীবনের শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’-এ মুসলমান ফকির চাঁদশাহের মুখ দিয়ে সীতারামের উদ্দেশে যে কথা বলা হয়, তার থেকে ভিন্ন এক রাজনৈতিক-সামাজিক সম্ভাবনা যেন উঁকি দিয়ে ওঠে :’ফকির বলিল, বাবা। শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছো, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু-মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু-মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই এক জনই হিন্দু-মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহার সন্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারের বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।’

এ উক্তি সাতচল্লিশের পার্টিশনের কালে নেহরু, প্যাটেল ও জিন্নাহ্‌র প্রতিও বলা যেতে পারত। এই উক্তিকে যদি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকৃত সত্তা বলে মেনে নিই, তাহলে অন্য সব অসংবেদনশীল রূঢ় উক্তি সকলকে ব্যাখ্যা করি কী করে? আনন্দমঠ-এর অরাজক পরিবেশে ভবানন্দ কি বলেনি, ‘সকল দেশে রাজার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের সম্বন্ধ। আমাদের রাজা রক্ষা করে কই? ধর্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল, কুল গেল, এখন ত প্রাণ পর্যন্ত যায়। এ নেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’ তারপর রয়েছে দাঙ্গার বিভীষিকাময় বর্ণনা, তা-ও আবার পল্লীগ্রামের পটভূমিতে :”সকলে বলিল, ‘ইংরেজ মুসলমান একত্রে পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্ত কণ্ঠে হরি হরি বল।’ গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, ‘মুই হেঁদু’।” বাংলায় পর্যায়ক্রমিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হয় বিশ শতকে। কিন্তু তার আগেই বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যের পাতায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন জাগে- আনন্দমঠ থেকে উপরোক্ত সন্ন্যাসী ভবানন্দ-নিঃসৃত উদ্ধৃতির বঙ্কিম আর সীতারাম থেকে পূর্বে উল্লিখিত ফকির চাঁদশাহ-নিঃসৃত উদ্ৃব্দতির বঙ্কিম কি একই ব্যক্তি, একই লেখক, একই সত্তার দুই বিপরীত বহিঃপ্রকাশ? বিশ্বাস হতে চায় না এই বিভাজন-রেখা একই সৃষ্টিশীল প্রতিভার মধ্য দিয়ে চলেছে। উনিশ শতকের বাংলায় একাধারে আধুনিকতাবাদী রেনেসাঁ ও হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের যে বিকাশ ঘটে, তার মৌলিক দ্বিত্বতার প্রকাশ পাই বঙ্কিম-মানসে। এই দ্বিখণ্ডন অমোচনীয়, অপরিত্রাণযোগ্য, যা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে একটি প্রধান ধারায় পরিণত করবে তার মৃত্যুর দুই দশকের মধ্যেই। এর ত্র্যহস্পর্শ থেকে কংগ্রেস-লীগ ধারার রাজনীতিক প্রায় কেউই বাদ যাবেন না। মিল-বঙ্কিমের সত্তার বিভক্তির সূত্রেই; উদার ও অনুদার চিন্তারাজিকে একত্রে সহাবস্থানে অনুপ্রাণিত প্রদর্শিত পথেই অগ্রসর হবেন অনেক প্রাগ্রসর মুসলিম বুদ্ধিজীবীও।

৩. শেষের কথা

ফ্রয়েডের শেষ জীবনের লেখা ‘আউটলাইন অব সাইকো-অ্যানালাইসিস’-এ ‘বিভক্ত সত্তা’ বিষয়ে উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। সেখানে ফ্রয়েড দেখান কী করে সত্তা ‘নিজের ভেতরে ফাটল অথবা বিভক্তির দেয়াল তুলে দিয়ে’ ক্রমাগত দ্বৈরথের দোটানার ফলে ‘সম্ভাব্য বিনাশ থেকে নিজেকে রক্ষা করে’। এই লেখাটিকে জাক লাকাঁ ফ্রয়েডের সেরা লেখাগুলোর একটি বলে চিহ্নিত করেন। আমাদের আলোচনার জন্য ফ্রয়েডের এই ধারণাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি, ইউরোপিয়ান এনলাইটেনমেন্টের এক প্রধান ব্যক্তিত্ব জন স্টুয়ার্ট মিল কী করে ভারতবর্ষীয় উপনিবেশ প্রশ্নে এসে অবলীলায় ‘ভিন্ন রীতি’ অবলম্বনের পথে ওকালতি করেন। ইউরোপের জন্য ‘লিবারেল’ চিন্তা, আর ভারতবর্ষের জন্য ‘ইল-লিবারেল’ চিন্তার অনুমোদন উপনিবেশে আধুনিকতার চৌহদ্দি নিয়ন্ত্রণ করে দিয়েছিল। এই আধুনিকতা, যাকে ‘ঔপনিবেশিক আধুনিকতা’ বলা যায়- শব্দ-উপমা ব্যবহারে ইউরোপের ঝুলি থেকে নানা বুলি ধার করেছে। কিন্তু সেই সাথে তাকে এই সীমানাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে যে, ইউরোপীয় আধুনিকতার সবকিছু তার জন্য প্রযোজ্য নয়। কেন প্রযোজ্য হবে না, এ জন্য কোনো যুক্তি-প্রমাণ হাজির করেননি মিল। মিলের দুই সত্তা। একদিকে ইউরোপীয় উদারনৈতিক চিন্তকের ভাবমূর্তি, অন্যদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুদার নীতিমালা নির্ধারণে প্রশাসনিক ভূমিকা পাশাপাশি বিরাজ করছিল কোনো দৃশ্যত দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি না করেই। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। সত্তার ভেতরে যাতে প্রচন্ড দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি না হয় সে জন্যই সত্তা বিভক্ত হয়ে যায় দুই অচেনা প্রদেশে। এতে যুক্তিবাদিতা ও অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দুই-ই অনায়াসে মুখ দেখাদেখি না করে অনায়াসে চলতে পারে।

আমরা দেখেছি মিল-শিষ্য বঙ্কিমচন্দ্রের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বিভক্তির অনুবৃত্তি। ভারতবর্ষীয় জাতি-গঠন প্রকল্পে এসে আপাদমস্তক যুক্তিবাদী ‘র‌্যাশনাল’ বঙ্কিম শেষ পর্যন্ত এক দ্বিখণ্ডিত সত্তায় বিভক্ত হয়ে গেলেন। সেখানে শুধু হিন্দু জনগোষ্ঠীকেই জাতি গঠনের মধ্যে স্বীকার করে নেওয়া হলো; অন্যদিকে, মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেওয়া হলো জাতির বাইরে, ইতিহাসের বাইরে, আধুনিকতার বাইরে ‘অপর-বর্গ’ হিসেবে। এই কাজটি করা হলো কোনো যুক্তি-তর্ক-ফয়সালার মাধ্যমে নয়; সম্পূূর্ণ একপেশে যুক্তিরহিত পদক্ষেপের মাধ্যমে। ‘কৃষ্ণ চরিত্র’ নির্মাণে বঙ্কিম যতটা তার্কিক শক্তি ব্যবহার করেছেন, তার সামান্যতম নমুনাও আমরা কোথাও দেখতে পাই না মুসলমান জনগোষ্ঠীকে অপাঙ্‌ক্তেয় করার ক্ষেত্রে কোনো যুক্তি প্রদর্শনে। কেন তিনি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ভারতবর্ষীয় কমিউনিটির বাইরে দূরে সরিয়ে রাখলেন; ভারত-ইতিহাসের অন্দরমহলে স্থান দিলেন না- এ সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা নেই তার।

আমি সন্দেহ করি যে, সাইকো-অ্যানালাইসিসে যদিও রবীন্দ্রনাথের পক্ষপাত ছিল না, তবুও তার কোনো কোনো লেখাকে ‘বিভক্ত সত্তা’র ওপরে ক্রিটিক্যাল কমেন্টারি হিসেবে দিব্যি পাঠ করা যায়। বঙ্কিম যেখানে ইউরোপীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতি গড়ার প্রকল্পে এগোবেন এবং মাতৃরূপিণী দেবী শক্তির কাছে উৎসর্গীকৃত হিন্দু জাতির আদর্শকে শেষ পর্যন্ত শ্রেয়োজ্ঞান করবেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে (স্বদেশী সমাজ পর্বের মোহভঙ্গের পর) পুনর্বিবেচনা করবেন সমগ্র জাতি গঠন প্রকল্পকেই। জাতীয়তাবাদকে রবীন্দ্রনাথ অভিহিত করবেন ‘ভৌগোলিক অপদেবতা’ বলে; বঙ্কিম রচিত ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত যে কোনোভাবেই ‘জাতীয় সঙ্গীত’ হিসেবে গীত হতে পার না- এ মর্মে তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিকে চিঠি লিখবেন। আমার এ রকমও মনে হয় যে, তার লেখায় ‘ছোট ইংরেজ’ বনাম ‘বড় ইংরেজ’ বিভাজন শুধু ইংরেজ রাজ-কর্মচারী যারা ভারত শাসন করেছেন, আর ইংরেজ সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী যাদের লেখা পড়ে ভারতবর্ষীয়রা আধুনিক সাহিত্য-দর্শনে প্রশিক্ষিত হয়ে উঠেছেন, এই দুই বলয়ের বৈপরীত্য বোঝাবার জন্যই কেবল লেখা হয়নি। একই সত্তার মধ্যেই ‘ছোট ইংরেজ’ ও ‘বড় ইংরেজ’ ঢুকে যেতে পারে, বাইরের বিভক্তি তখন লিবারেল আধুনিকতার অন্তরের বিভক্তিতে পরিণত হতে পারে- এমন একটি সম্ভাবনা রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি।

আমি যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে সত্তার এই বিভক্তিকে কোনো সাধারণ মাপের দোলাচল, দ্বৈরথ, নিছক ‘নেতিবাচক ও ইতিবাচক’ প্রবণতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যায় না। ইউরোপের আধুনিকতার জন্য ‘এক নিয়ম’, আর ভারতবর্ষীয় ঔপনিবেশিক আধুনিকতার জন্য ‘অন্য নিয়ম’- মিলের এই কল্পনাকে নিছক ‘প্রগতিশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ প্রবণতার দ্বন্দ্ব বললে আধুনিকতার শাসন-সংকটের গভীরে যাওয়া যায় না। ঠিক একইভাবে যুক্তিবাদী বঙ্কিম-মানসে হিন্দুদের জন্য ‘এক নিয়ম’, আর মুসলমানদের জন্য ‘অন্য নিয়ম’- এ রকম কল্পনাকেও ইতি এবং নেতির দ্বন্দ্ব বলে লঘু করা যায় না। সাধারণ মাপের মানুষ হলে যা-ও বা দেখা যেত, তাদের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তীক্ষষ্টধী মনন, ইউরোপীয় ও ভারতবর্ষীয় জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় তাদের পথিকৃৎ ভূমিকার কথা মনে রাখলে তাদের ব্যক্তিগত সত্তার ফাটল আর ‘ব্যক্তিগত’ থাকে না। পরবর্তীকালের ঔপনিবেশিক শাসন ও তার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ক্রমশ বিভেদমুখী বিকাশের জন্য এই সত্তার বিভক্তি এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল ভারতবর্ষে।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ১০] মিলের ভারতবর্ষ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মিল (Mill’s India and Bankimchandra)

পর্ব ::১০

[গত সংখ্যার পর]
মিল সর্বত্রই এই সমস্যাটা এড়িয়ে গেছেন এই বলে যে, বল প্রয়োগ না করার নীতি বা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়ার নীতি ‘কেবলমাত্র সভ্য জাতিগণের’ জন্যই প্রয়োজ্য। বল প্রয়োগ বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো উচিত কেবল অন্ধকারে আটকে থাকা বর্বর অসভ্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই। এ নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি। এখানে যেটা নতুন করে তোলা দরকার তা হলো, কে বর্বর ও অসভ্য- এটা নির্ধারণ করবে কে? নিশ্চয় সভ্য জাতিরই মহাত্মনেরা যারা আলোকিত মানুষ, বিদ্যা-বুদ্ধিতে এগিয়ে? এ ধরনের নিয়ম করার ক্ষেত্রে মিল অবশ্য কোনো নৈতিক সমস্যা দেখেননি। অন্যত্র এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি যুক্তি দিচ্ছেন, অপরিণত শিশু বা অপ্রকৃতিস্থ লোকের ক্ষেত্রে কিসে তাদের ভালো, সেটা তাদের কাছে ছেড়ে দেওয়া চলে না। সে জন্য কিছুটা জবরদস্তি করা আবশ্যক হয়ে পড়ে বৈকি। একই কথা খাটে বন্য জাতি বা স্যাভেজ, আধা-বর্বর ও বর্বর জাতি এবং জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। আফ্রিকার বেশির ভাগই প্রথমোক্ত গ্রুপে পড়ে। ভারতবর্ষ পড়ে মূলত বর্বর জাতির গ্রুপে (দু’একবার অবশ্য মিল আধা-বর্বর বা সেমি-বারবারাস অভিধাও ব্যবহার করেছেন ভারতবর্ষ প্রসঙ্গে)। সভ্য ও বর্বর এবং বর্বরের মধ্যে বন্য, আধা-বর্বর ও বর্বর- এ রকম জনমিতিক শ্রেণিবিন্যাস করে একই ক্ষেত্রে ইউরোপ ও উপনিবেশের ক্ষেত্রে দুই ধরনের নীতির প্রয়োগকে মিল যুক্তিসিদ্ধ করে তুলেছেন। পাশ্চাত্য আধুনিকতার ইতিহাস লিখতে গিয়ে নিয়মের কল্পনা যেমন তাকে করতে হয়েছে, তেমনি তাকে নিয়মের ব্যত্যয়ের কল্পনাও তাকে করতে হয়েছে উপনিবেশ-সমস্যা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে। যা আদিতে সৃষ্ট হয়েছিল ব্যত্যয়ের নীতি হিসেবে (‘ইউরোপে যা চলবে উপনিবেশে তা চলবে না’) উনিশ শতকের হিতবাদী লিবারেলদের লেখায়। তা-ই পরবর্তীকালে পুনর্জন্ম পেয়ে চলেছে তৃতীয় বিশ্ব নিয়ে হালের লিবারেলদের উৎকণ্ঠাময় আলোচনায় (‘ইউরোপে যা চলবে বৈরী তৃতীয় বিশ্বে তা চলবে না’)।

মিলের অবস্থানে এই দ্বিত্বতা বঙ্কিমের চোখ এড়ায়নি। প্রবন্ধের শেষটায় তিনি মন্তব্য করেছেন- ‘পরিণামে একটি কথা বলা আবশ্যক যে, মিল স্বস্বভাবানুবর্তিতা বিষয়ে যে কোন বিধানের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা কেবল সভ্যতম জাতিগণেরই উপযোগী, এই কথা বলিয়াছেন। আমরা সেই শ্রেণীর মধ্যে গণ্য কিনা, তদ্বিষয়ে অনেক মতভেদ হইতে পারে। আর মিলের মতই যে সর্ববাদী সম্মত, এ কথাও বলা যায় না; অন্য কি, লেখক নিজেই এই প্রবন্ধের সকল কথা আন্তরিক অবলম্বন করেন না। কিন্তু মিল অতি প্রধান ব্যক্তি, তাহার মত সর্বসাধারণের গোচর হইলে কোন প্রকার অমঙ্গল হইবার সম্ভাবনা নাই।’ গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের মধ্যে ‘কলোনিয়াল রুল অব ডিফারেন্স’জনিত কারণে বেশ কিছুটা ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিল, তা এর থেকে আঁচ করা যায়। তারপরও বলতে হয় যে, মিলের অসভ্য জাতির ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের তত্ত্বটি বঙ্কিম সুবিধামত কাজে লাগিয়েছিলেন। প্রথমত, আর্যজাতি উত্থানের জন্য বাহুবলের (ও বাক্যবল) ব্যবহার দরকার হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয়ত, বাহুবলের জন্য উপযুক্ত সংগঠন গড়ে তোলার প্রেরণাও তিনি লাভ করেছিলেন মিল থেকে। সংগঠনের জন্য দরকার চরিত্র, আর চরিত্রের জন্য চাই উন্নত প্রশিক্ষণ, যার বিবরণী পাই ‘দেবী চৌধুরানী’তে।

বিবরণীটি চমকপ্রদ। ভবানী পাঠক প্রফুল্লের চরিত্র নির্মাণের জন্য প্রশিক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে। জাতীয়তাবাদী বাহুবল-তত্ত্বের জন্য সংগঠন ও চরিত্র নির্মাণকে বঙ্কিম এভাবে দেখেছিলেন :’প্রথম বৎসরে তুলার তোষকে বালিশে প্রফুল্ল শুইল। দ্বিতীয় বৎসরে বিচালির বালিশ, বিচালির বিছানা। তৃতীয় বৎসরে ভূমি-শয্যা। চতুর্থ বৎসরে কোমল দুগ্ধফেননিভ শয্যা। পঞ্চম বৎসরে স্বেচ্ছাচার। পঞ্চম বৎসরে প্রফুল্ল যেখানে পাইত, সেখানে শুইত। প্রথম বৎসরে ত্রিযাম নিদ্রা। দ্বিতীয় বৎসরে দ্বিযাম। তৃতীয় বৎসরে দুই দিন অন্তর রাত্রিজাগরণ। চতুর্থ বৎসরে তন্দ্রা আসিলেই নিদ্রা। পঞ্চম বৎসরে স্বেচ্ছাচার। প্রফুল্ল রাত জাগিয়া পড়িত ও পুঁথি নকল করিত।…প্রফুল্ল চারি বৎসর ধরিয়া মল্লযুদ্ধ শিখিল।…এই মত নানারূপ পরীক্ষা ও অভ্যাসের দ্বারা অতুল সম্পত্তির অধিকারিণী প্রফুল্লকে ভবানী ঠাকুর ঐশ্বর্য্যভোগের যোগ্য পাত্রী করিতে চেষ্টা করিলেন। পাঁচ বৎসরে সকল শিক্ষা শেষ হইল।’

মিলের সাম্যচিন্তা বঙ্কিমকে প্রভাবিত করেছিল। ‘সাম্য’ প্রবন্ধে বঙ্কিম প্রাকৃতিক বৈষম্য ও অপ্রাকৃত বৈষম্যের মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন। প্রাকৃতিক নিয়মে কেউ অধিকতর বলশালী, কেউ বেশি বুদ্ধিমান, কেউ অধিক সৌন্দর্যমণ্ডিত, এসব সাম্যের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। এখানে প্রধান বিবেচনা হচ্ছে ‘অপ্রাকৃত বৈষম্য’, যার মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণে-শূদ্রে বর্ণজনিত বৈষম্য, দেশি-বিদেশি শক্তির মধ্যে ক্ষমতার তারতম্য, অথবা ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার সম্পদজনিত বৈষম্য। এই শেষোক্ত অর্থগত বৈষম্যই সবচেয়ে গুরুতর। বঙ্কিম বলেছেন, ‘সমাজের উন্নতিরোধ বা অবনতির যে সকল কারণ আছে, অপ্রাকৃত বৈষম্যের আধিক্যই তাহার প্রধান। ভারতবর্ষের যে এতদিন হইতে এত দুর্দশা, সামাজিক বৈষম্যের আধিক্যই তাহার বিশিষ্ট কারণ।’ পৃথিবীর যে দেশেই এই বৈষম্যের আধিক্য ঘটেছে সে দেশেই শ্রীবৃদ্ধির গতি শ্নথ হয়ে এসেছে। ফ্রান্সের প্রসঙ্গ টেনে তিনি যুক্তি দিচ্ছেন যে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কারণেই সেখানে সাম্যবাদী চিন্তার উদ্ভব ঘটেছিল :’পঞ্চদশ লুইর রাজ্যকালে ফ্রান্সের দেশে এইরূপ গুরুতর বৈষম্য। এই বৈষম্য কদর্য, অপরিশুদ্ধ রাজশাসন-প্রণালীজনিত। রুশোর গুরুতর প্রহারে সেই রাজ্য ও রাজশাসন প্রণালী ভগ্নমূল হইল। তাঁহার মানসশিষ্যরা তাহা চূর্ণীকৃত করিল।’

‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে দেশের কৃষি ব্যবস্থার যে চিত্র বঙ্কিম এঁকেছিলেন, সেখানেও কদর্য বৈষম্যের নিদারুণ ছাপ পাওয়া যায়। তিনিও কি নিজেকে সাম্যের প্রচারক হিসেবে, রুশোর মতোই সাম্যবাদী চিন্তক হিসেবে দেখেছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষের পটভূমিতে? সেই জন্যই কি ‘ভূসম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্ব’ সম্পর্কে মিলের মতের উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন :’যিনি ন্যায়বিরুদ্ধ আইনের দোষে পিতৃ সম্পত্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়া, দোর্দণ্ড প্রচণ্ড প্রতাপান্বিত মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি উপাধি ধারণ করেন, তাঁহারও যেন স্মরণ থাকে যে, বঙ্গদেশের কৃষক পরাণ মণ্ডল তাঁহার সমকক্ষ, এবং তাঁহার ভ্রাতা। জন্ম, দোষগুণের অধীন নহে। তাহার জন্য কোনো দোষ নাই। যে সম্পত্তি তিনি একা ভোগ করিয়াছেন, পরাণ মণ্ডলও তাহার ন্যায়সঙ্গত অধিকারী।’

প্রশ্ন হচ্ছে, এ কথা যিনি বলতে পারেন, তিনি মুসলমান-বিদ্বেষী কী করে হতে পারলেন? পরাণ মণ্ডল বলার সাথে সাথে তার কি হাসিম শেখ-এর কথাও মনে পড়ল না? অপ্রাকৃত বৈষম্য নিয়ে বলতে গিয়ে যখন ব্রাহ্মণ-শূদ্র বা ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুললেন, তখন কি একবার তার মনে পড়ল না হিন্দু ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সাথে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের কথা? শ্রেণি-প্রশ্নে যিনি এত তীক্ষষ্ট ও উদার অবস্থান গ্রহণ করেন (যার পরিচয় আমরা পেয়েছি ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও ‘সাম্য’ রচনায়) তার মন কেন আত্মসত্তার পরিচয় প্রশ্নে তথা আইডেনটিটির প্রশ্নে এসে এতটা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে? ভারতবর্ষের জাতি বা মহাজাতি গড়ার প্রকল্পে নিয়োজিত হয়ে তিনি কেন বারবার হিন্দু-ইতিহাসের থেকেই প্রেরণা নিতে তৎপর হন? শুধু তা-ই নয়; ক্ষেত্রবিশেষে দৃষ্টিকটূ রকমের অসহিষ্ণু মনে হয় তাকে, বিশেষ করে ভারতবর্ষে মুসলমান শাসনের প্রতিক্রিয়া আলোচনা করার ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক ও শ্রেণি-সমস্যা আলোচনার ক্ষেত্রে যিনি এত উদারনৈতিক, নারী-সমস্যা ও হিন্দু-সমাজের ভেতরকার জাত-পাতের সমস্যার আলোচনায় যিনি এতটাই মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির; মুসলমান প্রসঙ্গ এলে তিনি ততটাই অনমনীয়, অশোধনযোগ্যভাবে অসংবেদনশীল; তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। শ্রেণি-রাজনীতিকে তাই ছাপিয়ে উঠে আইডেনটিটির রাজনীতি- বঙ্কিমের সত্তার দ্বিত্বতা বা দ্বিখণ্ডন ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফাটল বা দ্বিখণ্ডিত সত্তাকেই তুলে ধরে। এর ফল পরিণাম তো বঙ্কিমের মতো তীক্ষষ্টধী মানুষের কাছে অধরা থাকার কথা নয়। এর কিছু আভাস পাই বঙ্কিমের নিজের লেখাতেই। তাতে আমাদের মনোকষ্ট আরও বেড়ে যায়।

‘সীতারাম’ উপন্যাসকেই আমি এই সূত্রে বেছে নিতে চাই। তার আগে ‘আনন্দমঠ’ নিয়ে দু’একটি কথা বলা দরকার। আনন্দমঠে মুসলমান শাসনের অবসানের পর ইংরেজরাই ভারতবর্ষের শাসনভার হাতে তুলে নিয়েছিল। অর্থাৎ আনন্দমঠে হিন্দুর জয় হলো বটে, কিন্তু দেশে হিন্দুর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা পেল না। এর থেকে বঙ্কিম-জীবনীকার অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের সন্তানেরা অত্যাচারী মুসলমান রাজশক্তিকে পরাভূত করেছে ঠিক- কিন্তু সেই হিন্দু সন্তান সম্প্রদায়কে দেশ শাসনের অধিকার’ দেওয়া হয়নি। ইংরেজ রাজত্বকে আবশ্যক বলে ভেবেছেন বঙ্কিম। কেননা, প্রচলিত হিন্দু সমাজে নানা অনাচার ঢুকে পড়েছে, যা তাড়ানোর জন্য হলেও ইংরেজকে মিত্র হিসাবে চাই তার :’ইংরেজ আগে রাজা না হইলে আর্য ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। …তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা আর্য ধর্ম নহে, সে একটা লৌকিক অপকৃষ্ট ধর্ম; তাহার প্রভাবে প্রকৃত আর্য ধর্ম- ম্লেচ্ছেরা যাহাকে হিন্দু ধর্ম বলে, তাহা লোপ পাইয়াছে।’ এ জন্যই বঙ্কিম আনন্দমঠ রচনার প্রারম্ভেই ঠিক করে নিয়েছেন- ‘ইংরেজকে রাজা করিব।’ এই ব্যাখ্যা ঠিক হলে বলতে হয়, বঙ্কিম মিলের পূর্ব-কথিত ‘অপরিণত শৈশব’-এর কালতত্ত্ব এবং ভারতবর্ষের জন্য ইংরেজের অধীনে থাকার ‘আবশ্যকীয় শিক্ষানবিশী পর্ব’র যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছিলেন। এর একটি সম্ভাব্য কারণ, শেষ জীবনে বঙ্কিম ক্রমশ হিন্দু ধর্মাশ্রিত আদর্শকে বড় করে দেখেছিলেন। ‘ধর্মতত্ত্ব’তে তিনি দেশপ্রেমকে ‘শ্রেষ্ঠ ধর্ম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ‘ইউরোপ পুনঃদর্শন’ বইয়ে তপন রায় চৌধুরী বলেছেন. ‘তাঁর ব্যক্তিগত আদর্শবাদে পরিবর্তনে-কোনও অজ্ঞাত কারণে তাঁর আস্তিক্যবাদে উত্তরণ এবং পুরুষাণুক্রমিক ধর্মমতে প্রত্যাবর্তনের ফলে’ তিনি অন্তত একটি বিষয়ে ইউরোপের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এটা করতে গিয়ে তাকে মুসলমান সম্প্রদায়কে আরও দূরে সরিয়ে দিতে হয়েছিল।

অমিত্রসূদন আরও যুক্তি দেখিয়েছেন, যেহেতু মন্বন্তরের পটভূমিতে আনন্দমঠ রচিত এবং যেহেতু ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময়ে (১১৭৬-৭৮ বঙ্গাব্দকালে) অরাজক শাসন বিরাজ করছিল, এবং যেহেতু রাজকার্যে তখন পর্যন্ত মুসলমান শাসকদেরই ‘প্রধান’ দায়-দায়িত্ব ছিল, তাই সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল এবং সে কারণেই উপন্যাসটিতে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য স্থানে স্থানে বর্ণিত হয়েছে। এই ব্যাখ্যা সঠিক বলে গ্রহণ করা যায় না। পলাশীর যুদ্ধের পরে বাংলায় মুসলিম শাসন অব্যাহত ছিল- কল্পনা করা দুরূহ। বস্তুত বাংলায় তখন কোম্পানির অরাজক শাসনের বিস্তার হয়েছিল, যার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলমান রাজশক্তির একাংশের সাহায্য (বাংলার সুবেদার তখন রেজা খাঁ) নিয়েছিল কোম্পানির স্থানীয় প্রভুরা। বঙ্কিম লিখেছেন, ‘মীরজাফর গুলি খায় ও ঘুমায়। ইংরেজ টাকা আদায় করে ও ডেসপাচ লেখে।’ এখানে ঐতিহাসিক ত্রুটি আছে। মীরজাফর ১৭৬৫ সালেই মারা যান। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের জন্য হেস্টিংসকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। মীর কাশিমের সাথে ইংরেজদের যুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে বঙ্কিম প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরেছেন :’এই সময়ে যে সকল ইংরেজ বাঙ্গালায় বাস করিতেন তাঁহারা দুইটি মাত্র কার্যে অক্ষম ছিলেন। তাঁহারা লোভ সম্বরণে অক্ষম এবং পরাভব স্বীকারে অক্ষম। …তখন বাঙ্গালার বাতাসে ইংরেজদিগের অর্থাপহরণ রোগ জন্মিত…বঙ্গীয় ইংরেজদিগের মধ্যে তখন ধর্ম শব্দ লুপ্ত হইয়াছিল।’ আসল ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে, মুসলমান রাজন্যবর্গের হাতে নয়, আর দুর্ভিক্ষে এক-তৃতীয়াংশ বাংলার মানুষ যারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলেন তার অন্তত :অর্ধেক ভাগই ছিল বাংলার দরিদ্র মুসলমান চাষিরা। বিদ্রোহীদের মধ্যে সন্ন্যাসী ও ফকির উভয় সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৯] মিলের ভারতবর্ষ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মিল (Mill’s India and Bankimchandra)

পর্ব ::৯

[গত সংখ্যার পর]

লিবারেল মিলের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ছন্দপতন ঘটেছে যখন উপনিবেশ শাসনের ক্ষেত্রে ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ সরকার-ব্যবস্থার বিপরীতে সরাসরি ‘স্বৈরাচারী’ (ডেসপটিজম) শাসনের সপক্ষে সরাসরি অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনে বা ইউরোপে চলবে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার-ব্যবস্থা, কিন্তু ভারতবর্ষে বা অন্যান্য উপনিবেশগুলোয় চলবে অ-প্রতিনিধিত্বশীল ‘স্বৈরাচারী’ ব্যবস্থা- এই দ্বিত্বতা মিলের রাষ্ট্রচিন্তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ‘স্বৈরাচারী’ শাসনের যুক্তি নির্মাণের জন্য মিলকে এক সময় ওরিয়েন্টাল ডেসপটিজমের তত্ত্বকেও আশ্রয় করতে হয়েছে। এখানে মিলের যুক্তি ছিল অনেকটা পিতা জেমস মিলের (এবং হেগেলের) অনুগামী। মিল যুক্তি দেখিয়ে ছিলেন যে, যেহেতু ভারতবর্ষীয়রা ব্রিটিশপূর্ব যুগে ‘স্বৈরাচারী’ শাসন-ব্যবস্থার অধীনে ছিল, সেহেতু ইংরেজরা নতুন করে কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম করেনি সেখানে, বরং আলোকিত এক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতবর্ষীয়দের ‘সভ্য করাই’ এই শাসনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এই যুক্তি-তর্কের একটি আশু রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। রাজকর্ম পরিচালনায় জবরদস্তি বা শাসিতের জন্য অনিষ্টকর কোনো নীতিমালা (যাকে মিল বলেছেন ‘হার্ম প্রিন্সিপল’) প্রয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব এতে করে এড়িয়ে যাওয়া হলো। সাধারণভাবে মিলের নৈয়ায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, কোনো সভ্য জাতি বা জনগণের ওপরে অনিষ্টকর বা জবরদস্তির নীতি প্রয়োগ করা যাবে না। তবে যেসব জাতি বা জনগোষ্ঠী এখনও উন্নয়নের শৈশব-স্তরে রয়ে গেছে তাদের ক্ষেত্রে-তাদের সম্মতি বা অসম্মতির অপেক্ষা না করেই জবরদস্তির নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। বিশেষত যদি ইতিমধ্যেই তাদের স্বৈরাচারী শাসনে থাকার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে থাকে প্রাগ-উপনিবেশ পর্বে। মিলের এই চতুর নীতিটি সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের পক্ষে একটি জোরালো যুক্তি হিসেবে এখনও ব্যবহূত হয়ে থাকে। উদাহরণত, ১৮৫৯ সালের ‘এ ফিউ রিমার্কস অন নন-ইন্টারভেনশন’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, সভ্য জাতির ক্ষেত্রে ‘আমাদের ধ্যান-ধারণা আদর্শ অন্য জাতিগোষ্ঠীর ওপরে চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে সামান্যই যুক্তি রয়েছে’, কিন্তু এ কথা খাটে না ‘সভ্যতার নিম্নতর স্তরে থাকা জনগোষ্ঠীর বেলায়’। ওদের ক্ষেত্রে ‘প্রথাগত আন্তর্জাতিক ন্যায়-নীতি খাটে না’; কেননা এসব ন্যায়-নীতির প্রয়োগ তো পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে হবার কথা, কিন্তু ‘বর্বর জনগোষ্ঠী কখনও সমান ন্যায়-নীতির প্রয়োগের রীতিতে বিশ্বাস করে না বা করবে বলে এমনটা আস্থা করা যায় না। তাদের মন-মানসিকতা সে রকম প্রচেষ্টা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনুকূল নয়।’ ফলে তাদের নিজেদের স্বার্থেই ‘তাদেরকে পরাভূত করতে হবে এবং বিদেশি শক্তির অধীনে রেখে দিতে হবে।’ এর মধ্যে সাম্প্রতিক কালের আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইরানে হস্তক্ষেপের একটি ঐতিহাসিক ও নৈতিক যুক্তির খসড়া তৈরি হতে দেখি। মিল অবশ্য এ ধরনের হস্তক্ষেপকে এক ধরনের ‘পেডাগজিক্যাল হস্তক্ষেপ’ হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, যেমনটা হয় গুরুকুলে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্কে। ছাত্রের ভালোর জন্যই তাকে নিয়ন্ত্রণের কড়া শাসনে ও শৃঙ্খলায় বাঁধতে হয়। একই যুক্তির বলেই মিল ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমিতে’ দেখিয়েছেন যে, কেবলমাত্র সভ্য জাতির ক্ষেত্রেই ফ্রি-মার্কেট ইকোনমি ও রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট প্রযোজ্য; অসভ্য জাতির ক্ষেত্রে অর্থনীতিতেও চলতে পারে ফ্রি-মার্কেট ইকোনমির ব্যত্যয় এবং রাজনৈতিকভাবে স্বৈরাচারী শাসন-ব্যবস্থার প্রবর্তন।

তবে উপনিবেশের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারের প্রয়োগ করতে গিয়ে মিল কিছুটা নমনীয় ছিলেন নেটিভদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনচর্চার নিজস্বতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে। দার্শনিক কোম্‌তের সঙ্গে চিঠিপত্রে তিনি একদিকে সমালোচনা করেছেন ভারতবর্ষের রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রথা সমূহের, যার মধ্যে রয়েছে শিশু হত্যা, ঠগি-বৃত্তি, সতীদাহ প্রথা, তুকতাক বিদ্যা, পর্দা প্রথা ইত্যাদি। অন্যদিকে মিল বুঝেছিলেন যে, এসব প্রথা বিলয়ের জন্য শুধু সহায়ক আইন জারি করাই যথেষ্ট নয়; এর জন্য ক্রমান্বয়ে সংস্কার আনতে হবে নেটিভ সমাজবলয়ে। এ ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। প্রথম উদাহরণটি হচ্ছে, পূর্ব উল্লিখিত এংলিসিস্ট বনাম ওরিয়েন্টলিস্ট বিতর্ক। এই বিতর্কে যদিও মিল শেষ পর্যন্ত ম্যাকলে সাহেবের সঙ্গে সুর মেলান ‘বাদামি সাহেব’ তৈরি করার প্রকল্পে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছু সংযোজন ছিল তার। ১৮৩৬ সালের ‘রিসেন্ট চেইঞ্জেস ইন নেটিভ এডুকেশন’ ডিসপ্যাচের খসড়ায় মিল প্রস্তাব করেন যে, (ক) এই নেটিভ সাহেবদের প্রাচ্য ভাষা ও প্রাচ্যবিদ্যায় প্রশিক্ষিত হতে হবে; (খ) ভারতবর্ষের ক্লাসিক্যাল ভাষাসমূহ যথা সংস্কৃত, ফার্সি ও আরবি ভাষা জানা এবং হিন্দু-মুসলমান আইন সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকাটা সঠিক বিচারকার্য পরিচালনার জন্যও অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয় উদাহরণটি হচ্ছে, ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করা নিয়ে। এখানে কান্টের অনুগামী হয়েছেন মিল। কান্ট বলেছিলেন, ‘আমি যুক্তি থেকে পিছু হটে বিশ্বাসকে কিছুটা জায়গা করে দিতে বাধ্য হলাম’। যুক্তিবাদ সর্বত্র খাটে না, যুক্তিবাদেরও সীমা রয়েছে, এবং যদিও অযৌক্তিক অনেক ক্ষতিকর সামাজিক বিশ্বাস-সংস্কার রয়ে গেছে যার মূল উৎপাটন করা জরুরি, তবুও এসব বিশ্বাসের একটা গুরুত্ব রয়ে গেছে সাধারণ জনজীবনে। ১৮৫৮ সালের পিটিশনে তাই মিল জোরেশোরে যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ভারতবর্ষের জনগণের মধ্যে নানাবিধ ‘ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করার যে সিদ্ধান্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অদ্যাবধি নিয়ে এসেছে’ (অবশ্যই কতিপয় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বাদ দিয়ে- যেগুলো মানবতার জন্য স্পষ্টত অত্যন্ত গর্হিতকর) তা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত রাখা দরকার।

মিলের কিছু কিছু লেখায় প্রকাশ্য বর্ণবাদেরও ছায়াপাত ঘটেছে। নেটিভ আমেরিকানদের তিনি কুঁড়ে বলেছেন; চীনাদের মধ্যে তিনি পেয়েছেন দূরদর্শিতার অভাব; ভারতবর্ষীয় ও চীনাদের মধ্যে সম্পদ-আহরণের কোনো তাগিদ দেখেননি। তবে এ ক্ষেত্রেও বলতে হয় যে, আপাতদৃষ্টিতে বর্ণবাদী কথাবার্তা সত্ত্বেও মিল স্বীকার করে গেছেন যে, এসব জাতিগত পার্থক্য মূলত উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে না ওঠার কারণেই সৃষ্ট হয়েছে। এসব পার্থক্য কোনো নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যজনিত নয়। উদাহরণত তিনি দেখিয়েছেন, নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে চীনে, ভারতবর্ষে, এমনকি য়ুরোপের অপেক্ষাকৃত স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় (যথা রাশিয়া, তুরস্ক, স্পেন, আয়ারল্যান্ড) বিরাজ করছে এমন ধরনের ভূমিসত্ত্ব আইন যার মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে- ফলে তাদের মধ্যে সম্পদ-আহরণের স্পৃহা আসবে কোথা থেকে? ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে তিনি কর্নওয়ালিশের জমিদারি আইনের সমালোচক ছিলেন এবং সরাসরি প্রজার কাছে রায়তওয়ারি স্বত্ব দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে মিল ও বঙ্কিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রত্যাশিত সদৃশতা ছিল।

তারপরও সব ছাপিয়ে মিলের দ্বিত্ব-অবস্থানের দিকটিই বড় হয়ে ওঠে। সভ্য ইংরেজ জাতি স্বৈরাচারী পদ্ধতি অবলম্বন করে পদানত করে হলেও অসভ্য ভারতবর্ষকে উন্নত (নেটিভদের ভালোর জন্যই) করবে- এর সপক্ষে মিল আমৃত্যু অবিচল থেকে গেছেন। ভারতবর্ষের লোকেরা নিজেরা নিজেদের মতো করে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার-ব্যবস্থা দাঁড় করাবে ব্রিটিশ রাজশক্তির সহায়তা ছাড়াই, এটি মিলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা মনে হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য কোনো দিন-ক্ষণের আভাস দিতে রাজি হননি মিল। বরং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘প্রত্যক্ষ শাসন’ আরও দীর্ঘকালের জন্য অব্যাহত থাকুক, এর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন তিনি। য়ুরোপের প্রাগ্রসর চিন্তাবিদের মধ্যে এই যে দ্বিত্বতা আমরা দেখতে পাই তা কোনো সাধারণ মাপের দ্বিধা, দোলাচল বা দ্বন্দ্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একেই আমরা প্রবন্ধের শুরুতে ‘সত্তার বিভক্তি’ বলেছি যখন সত্তা উদার ও অনুদার চিন্তার বলয়ে বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। শাসক ও শাসিতের জন্য তৈরি হয় আলাদা নিয়ম-কানুন। যে রীতি ইংল্যান্ডে চলে সে যুক্তি ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে চলে না। মিলের সত্তার এই দ্বৈততা ইউরোপীয় আধুনিকতারই অন্তর্গত দ্বৈততার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এই দ্বৈততা ‘আমাদের ও তাদের’ এ দুই সাংস্কৃতিক ভুবনের মধ্যে একাধারে আধুনিক উদার ও ঔপনিবেশিক অনুদার নির্ভরশীলতার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি করে।

২. বঙ্কিমচন্দ্রের মিল

মিলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বঙ্কিম যথার্থই শোকাভিভূত হয়েছিলেন : ‘মিলের মৃত্যু হইয়াছে! আমরা কখন তাঁহাকে চক্ষে দেখি নাই; তিনি কখন বঙ্গদর্শনের পরিচয় গ্রহণ করেন নাই। তথাপি আমাদিগের মনে হইতেছে যেন আমাদিগের কোন পরম আত্মীয়ের সহিত চির বিচ্ছেদ হইয়াছে।’ মিলের কীর্তির উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি জোর দিয়েছেন এথিকস ও ইকোনমিক্স বিষয়ে তার অবদানের ওপরে : ‘মিল অতি সূক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন নৈয়ায়িক ছিলেন। তাঁহার কৃত ইংরেজি ন্যায়শাস্ত্র এবং অর্থব্যবহারশাস্ত্র তাহার প্রধানকীর্তি। ইহাতে তিনি যে কোন নূতন কথার উদ্ভাবন করিয়াছেন তাহা নহে কিন্তু এতৎসংক্রান্ত সমুদয় কথা এমন সুশৃঙ্খল করিয়া লিখিয়াছেন এবং প্রত্যেক বিষয় এত পরিস্কার করিয়া বুঝাইয়াছেন যে তাঁহার গ্রন্থ পাঠ না করিলে কাহারই উক্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন সম্পূর্ণ হইবেক না।’ এই প্রবন্ধেরই এক জায়গায় মিল (যিনি ব্যক্তিপ্রাধান্য-বাদী) ও কোম্‌তের (যিনি সমষ্টির স্বার্থবাদী) মধ্যে প্রতিতুলনা করে তিনি বলেছেন, ‘মতদ্বয় মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ এবং কোনটি নিকৃষ্ট তদ্বিষয়ে আমরা কোন কথা বলতে পারি না।’ অনত্র তিনি বলেছেন, ‘অর্ধেক বেন্থাম অর্ধেক কোম্‌তের’ মধ্যে ‘সমুচিত সামঞ্জস্য বিধানের কথা।’ কেননা, ‘চিত্তমধ্যে এই দুই মতের সমুচিত সামঞ্জস্যই আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতা।’ যা হোক, সমষ্টির স্বার্থ (কোম্‌ত) ও ব্যক্তিস্বার্থানুরাগ (বেন্থাম বা মিল) এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য করা যে ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না সে ক্ষেত্রে কী করা তা নিয়ে বঙ্কিমের দ্বিধা ছিল সে সময়ে। এই লেখার এক দশকের মধ্যেই লেখা হবে আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী ও সীতারাম উপন্যাস ত্রয়ী। তখন এসব দ্বিধা কেটে যাবে। সমষ্টির কল্যাণের জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে প্রয়োজনে তুচ্ছ জ্ঞান করতে হবে- এই দাঁড়াবে তার অভিমত। ভক্তি ও বাহুবল সেখানে লিবারেল ইনডিভিজুয়ালিটির বদলে জায়গা করে নেবে। ব্যক্তির ইউটিলিটির বদলে সামষ্টিক ইউটিলিটির ওপরে জোর দেবেন তিনি, যার অন্য নাম ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ।

শুধু আনন্দমঠ নয়। ইউটিলিটির সামষ্টিক ব্যাখ্যা কমলাকান্তর দপ্তরেও আছে। যেমন কমলাকান্তের দপ্তরে তৃতীয় সংখ্যার শিরোনাম ছিল ‘ইউটিলিটি বা উদর-দর্শন’। বঙ্কিম যেখানে ইউটিলিটারিয়ান দর্শনের সার-সংক্ষেপ টানছেন এভাবে : ‘এই মতের সার কথা এই যে যাহা হিতকর, তাহাই অনুষ্ঠেয় ও কর্তব্য। যাহা অহিতকর, তাহা বর্জনীয় এবং অকর্তব্য। হিতাহিত ফলোৎপাদকতা ভিন্ন কর্তব্যাকর্তব্যের অর্থাৎ পুণ্য পাপের- অন্য লক্ষণ নাই।’ এই দর্শনকে অস্ত্র করেই তিনি ‘কৃষ্ণ-চরিত্রে’ বললেন, ‘যাহা লোকহিতকর তাহাই ধর্ম’, অর্থাৎ ধর্মের বিচার কেবল শাস্ত্র-অনুযায়ী করা উচিত নয়। এভাবে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ধর্মের যোগসূত্র স্থাপিত হলো।

১২৭৯ ভাদ্র সংখ্যায় ছাপা হয় ‘স্বস্বভাবানুবর্তিতা’ মানে ইনডিভিজুয়ালিটি নিয়ে বঙ্কিমের প্রবন্ধ। সেখানে মিলের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বের কথা উল্লেখ করে বঙ্কিম লিখলেন, ‘মিল বলেন যে, যাহাতে অন্য কাহার সুখের ব্যাঘাত হয়, অথবা সমাজস্থ অধিকাংশ লোকের অসুখ জন্মে, অথবা যেখানে প্রত্যেকের কিছু কিছু কষ্ট বা ক্ষতি সহ্য না করিলে সমাজ রক্ষা হয় না, এরূপ স্থলে স্বেচ্ছাচার এবং স্বস্বভাবানুবর্তিতা নিবারণের জন্য বলপ্রয়োগ করা অন্যায় নহে।’ প্রশ্ন উঠে, বলপ্রয়োগের এ নিয়মটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি-না, নাকি সে ক্ষেত্রে মিলের অন্য নিয়মটিই কেবল খাটবে যেখানে তিনি বলছেন, ‘সকল স্ব স্ব জ্ঞান ও বিবেচনানুসারে যে মত ইচ্ছা তাহাই অবলম্বন করিবে, তাহাতে প্রচলিত মতের বিরোধীদিগের প্রতি কোন প্রকার অত্যাচার করা অন্যায়’? কোন নিয়মটা প্রয়োগ করা হবে নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যথার্থ?

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৮] মিলের ভারতবর্ষ ও বঙ্কিমচন্দ্রের মিল (Mill’s India and Bankimchandra)

পর্ব ::৮

দীপেশ চক্রবর্তীর জন্য
এটি অনেকেই এর আগে লক্ষ্য করেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র যেন এক ব্যক্তি নন। দুই বঙ্কিম একই সত্তার মধ্যে বিচরণ করছেন। যিনি লিখেছেন ‘বঙ্গদেশের কৃষক’, ‘সাম্য’ ও ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর মতো প্রগতিশীল রচনা; তিনিই লিখেছেন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী তথা হিন্দুত্ববাদী ‘আনন্দমঠ’ ও ‘ধর্মতত্ত্ব’- ভাবা যায়! কেন এই বৈপরীত্য? এ যেন সত্তারই বিভক্তি। ড. জেকিল ও মি. হাইডের বাংলা কী, আমি জানি না। দুই বিখণ্ডিত সত্তা, যেখানে যুক্তি ও অযৌক্তিক দাবি এবং নির্মাণ পাশাপাশি চলছে কোনো রাখঢাক না করেই; কোনো স্ববিরোধিতা সম্পর্কে অবগত না হয়েই। এই লেখাটিতে আমি বলবার চেষ্টা করেছি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের সত্তার এই বিভক্তি গোটা য়ুরোপীয় আধুনিকতা ও তৎসূত্রে প্রাপ্ত জাতীয়তাবাদী সত্তারই বিভক্তি। য়ুরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট এই বিভক্তিকে ধারণ করেছিল। বঙ্কিমের মন্ত্রগুরু জন স্টুয়ার্ট মিলের মধ্যেও দেখি একই বিভাজন- যেখানে যুক্তি ও অযৌক্তিক, মানবিক ইনক্লুশন ও ঔপনিবেশিক এক্সক্লুশন, সভ্য আর অ-সভ্য জাতি ও জনগণের জন্য ভিন্ন নিয়ম-রীতি প্রয়োগের যুক্তি-তর্ক পাশাপাশি চলেছে। গুরু-শিষ্যের মধ্যকার এই মৌলিক মিল সম্পর্কে আলোকপাত করাই এ প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য। একই সত্তার মধ্যে এই স্ববিরোধী আয়োজন এক সময় সৃষ্টি করে সত্তার ফাটল বা বিভক্তি, যা শেষ পর্যন্ত সংক্রমিত হয় পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্র-সংবিধান-রাজনীতিতে।

১. মিলের ভারতবর্ষ

লর্ড মেঘনাদ দেশাইকে আমি একবার প্রশ্ন করেছিলাম, লিবারেল চিন্তক জন স্টুয়ার্ট মিল কী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো জায়গায় বছরের পর বছর ধরে কাজ করে গেলেন? শুধু কাজ করা নয়, ১৮২৩ সালে ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট একজামিনার’ হিসেবে ঢোকার পর থেকে মিল পদোন্নতি পেয়ে এক পর্যায়ে কোম্পানির সর্বোচ্চ পদে ‘চিফ একজামিনার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। দেশাইকে আমি আরও জিজ্ঞেস করেছিলাম, মিলের ভারতবর্ষ সম্পর্কিত রচনাবলি তিনি খুঁটিয়ে পড়েছেন কি-না এবং সে সম্পর্কে তার অভিমতই বা কী? দেশাই শুধু আমাকে বলেছিলেন, ‘চিফ একজামিনার’ হিসেবে কোম্পানি শাসনের নীতিমালা ঠিক করার ক্ষেত্রে মিলের একটি প্রধান নীতি-নির্ধারণী ভূমিকা ছিল, যা মোটেই হেলাফেলা করার ব্যাপার নয়। তবে এ সম্পর্কে তার বিশেষ কিছু জানা নেই।

মিল যেসব ‘প্রগতিশীল’ ও ‘লিবারেল’ চিন্তারাজির স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বিষয়-বৈচিত্র্য ও আয়তনে সত্যই বিস্ময়কর। ১৮৪৩ সালের ‘এ সিস্টেম অব লজিক’, ১৮৪৮ সালের ‘প্রিন্সিপল্‌স অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’, ১৮৫৯ সালের ‘অন লিবার্টি’, ১৮৬১ সালের ‘কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট’, ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’, ১৮৬৯ সালের ‘দ্য সাবজেকশন অব উইমেন’, ‘সোশ্যালিজম’ এবং ১৮৭৩ সালের ‘অটোবায়োগ্রাফি’ বিবেচনায় নিলে সন্দেহ থাকে না যে, মিলকে কেন উনিশ শতকের য়ুরোপীয় লিবারেল চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দেখা হয়ে থাকে। এতে মিলের প্রচলিত রচনাকর্মের প্রেক্ষিতে সম্ভাব্য একাধিক কূটাভাস বা প্যারাডক্সের আভাস পাই। কূটাভাস অন্তত দুটো। প্রথমত, এত উদার চিন্তা যার, তিনি তার কর্মজীবন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বৃত্তে কাটালেন কী করে? সেকালের ইউরোপের সূক্ষ্ণ নৈয়ায়িকদের মধ্যে যিনি অগ্রগণ্য তাকে এটা করতে গিয়ে কি নিত্যনতুন নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়নি? দ্বিতীয়ত, যদি যুক্তির খাতিরে ধরেই নিই, মাসিক স্থিতিশীল আয়-উপার্জনের পথ খোলা রাখার জন্য তাকে বেছে নিতে হয়েছিল কোম্পানির ‘চাকরি’, তাহলেও বাড়তি প্রশ্ন থেকে যায়। সেই বাড়তি প্রশ্নটি হচ্ছে, ভারতবর্ষ নিয়ে মিলের রচনাগুলোর মূল ঝোঁক নিয়ে। ঔপনিবেশিক শাসনে আবদ্ধ ভারতবর্ষেও দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘব করার ক্ষেত্রে সেসব লেখা কাজ করেছিল কি-না? মিলের পক্ষ থেকে সেদিকে কোনো বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়েছিল কি-না? নাকি তিনিও ছিলেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের হাতিয়ার কেবল?

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন নিয়ে লিখতে গিয়ে মিল সব সময় ভাবতে চাইতেন, শাসক জনগোষ্ঠী যেহেতু জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-অর্থনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা ও সমরকুশলে অপেক্ষাকৃত পরিণত ও দক্ষ জাতি, এবং এই অর্থে ‘সভ্য জাতি’, সেহেতু তাদের ওপরে নৈতিক দায়িত্ব এসে পড়ে বৈকি শাসিত ‘অসভ্য জনগোষ্ঠী’কে অন্ধকার যুগ থেকে টেনে তোলার। সাম্রাজ্যবাদ বলতে লুণ্ঠন-যুদ্ধ-শোষণের যে ক্ল্যাসিক চিত্র আমরা পাই, তা মিলের প্রকল্পের জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যে উপনিবেশ এখনও সভ্য হয়নি, তাকে তার ভালোর জন্যই উন্নত জাতি কর্তৃক শাসিত হতে হবে, এবং শাসিত থেকেই ক্রমশ তাকে ‘উন্নতির উচ্চতর স্তরে উত্তরণ’-এর চেষ্টা করা হবে। মিল বলেছেন, ‘আমরা বলতে পারি না যে এই আদর্শ নীতি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা গেছে। কিন্তু এ রকম নীতি না গ্রহণ করলে সর্বোচ্চ নৈতিক আস্থাটুকু শাসক শ্রেণির ওপর থেকে উঠে যাবে।’ কোম্পানি শাসন থেকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনের অধীনে ক্ষমতা-স্থানান্তরের প্রাক্কালে মিলকে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। সেখানে মিল ভারতবর্ষের ওপর কোম্পানি শাসনের সপক্ষে জোরালো ওকালতি করেন। কোম্পানির প্রত্যক্ষ ও নিবিড় শাসনের চেয়ে অপ্রত্যক্ষ ও ‘দূরত্ব থেকে’ শাসনের ফলাফল শাসক ও শাসিত উভয়ের জন্যই ভালো হবে না- এমনটাই ছিল তার অভিমত। ভারতবর্ষ শাসন করা সাধারণ আমলাতন্ত্রের দ্বারা সহজসাধ্য হবে না। কেননা, মিলের মতে, ভারত-বিদ্যা দর্শন, অর্থশাস্ত্র, বিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞানকাণ্ডের মতোই একটি ‘বিশেষ বিদ্যা’, বিশেষ অভিনিবেশের দাবি করে, যা প্রথাগত ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের আয়ত্তে নেই, এবং যেটা শুধু আয়ত্ত করা সম্ভব ভারতবর্ষ বিষয়ে বিশেষভাবে উৎসর্গীকৃত একটি পরিচালনামণ্ডলীর মাধ্যমেই। আর সেটা কোম্পানি-শাসনের মাধ্যমেই শুধু অর্জন সম্ভব। মিলকে তখন এ প্রশ্নও করা হয়েছিল- রাজকার্যে নেটিভদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তার মত কী? নেটিভরা কি ঔপনিবেশিক সরকারের উচ্চতর বা উচ্চতম পর্যায়ে কখনো যেতে পারবে, বা সেটা হলে ইংরেজ রাজশক্তির ওপর ‘নির্ভরশীলতার’ অবস্থা তখন কোথায় দাঁড়াবে? এ ক্ষেত্রে তার স্পষ্ট উত্তর ছিল, প্রথমত, নেটিভদের যোগ্য করে তুলতে যাবতীয় প্রচেষ্টা নিতে হবে, এবং নেটিভদের মধ্যে যোগ্য লোক পাওয়া গেলে উচ্চতর পর্যায়েও তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, ‘এখনও যদিও ভারতবর্ষ সে’ অবস্থায় পৌঁছায়নি, কিন্তু একদিন যাতে সে অবস্থায় পৌঁছায় সে চেষ্টা শাসকদের তরফ থেকে থাকতে হবে।’ নইলে তাদের বর্তমান (ঔপনিবেশিক) শাসনের পক্ষে ‘নৈতিক কোনো যুক্তি’ থাকে না। অবশ্য মিল এ ক্ষেত্রে উচ্চতর পর্যায়ে ‘সামরিক’ ও ‘বেসামরিক’ নিযুক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন :’সামরিক বাহিনী পরিচালনার ক্ষেত্রে নেটিভদের বিজড়িত করা যায় না। কেননা, সে ক্ষেত্রে ব্র্রিটিশ রাজত্ব বজায় রাখা সম্ভবপর হবে না। তবে সিভিল প্রশাসনের এক বড় অংশ নেটিভদের জন্য খুলে দেওয়া খুবই সম্ভব; কোনোরূপ ঝুঁকি ছাড়াই।’ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য করা যায় কি-না- এ প্রশ্নের উত্তরে মিল বলেছিলেন, ‘নেটিভদের থেকে গভর্নর জেনারেল হয়তো কাউকে বানানো যাবে না, তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক উচ্চতর পদেই তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। আশা করা যায়, ততদিনে তারা এসব পদে যাওয়ার জন্য যোগ্য ও বিশ্বস্ত হয়ে উঠবে। এ রকম একটি পরিবর্তন আনা শুধু সম্ভবই না; আমাদের ওপরে দায়িত্বও এসে বর্তায় এ রকম কিছু করার।’ সে প্রেক্ষিতে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে- এ প্রশ্নের জবাবে মিলের উত্তর ছিল- ‘এ রকম অবস্থাতেও ভারতে ব্রিটিশ শাসন অব্যাহত থাকবে যদি আমরা সতর্কতার সাথে বিষয়টা পরিচালনা করতে পারি, অন্তত ততদিন পর্যন্ত, যতদিন-না নেটিভরা আমাদের সাহায্য ছাড়াই অনুরূপ সরকার ব্যবস্থা চালানোর ক্ষেত্রে উপযুক্ত হয়ে উঠছে।’

এখানে এসে মিলের প্রতিদ্বন্দ্বী মেকলে সাহেবের ‘দ্য প্রাউডেস্ট ডে’ তত্ত্বের অনুবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। একে ‘নমনীয় সাম্রাজ্যবাদ’-এর অবস্থান হিসেবে ভাবতে পারেন কেউ কেউ। বা হাল আমলের ‘সফট পাওয়ার’ তত্ত্বের পূর্বলেখও পাওয়া যেতে পারে এতে। নামকরণ যা-ই হোক, লিবারেল মিল-এর কুশলী যুক্তির জাল বিস্তারের উদ্দেশ্য পরিস্কার :সাম্রাজ্যবাদকে বাদ দিয়ে নয়, বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে সতর্কতার সাথে নমনীয় ও সূক্ষ্ণভাবে পরিচালনা করতে হবে।

সভ্য জাতির ‘সভ্যতার’ সংজ্ঞা কী ছিল, মিলের চিন্তায় এ প্রশ্ন এখানে ওঠা স্বাভাবিক। ভারতবর্ষের ওপরে ব্রিটিশ জীবনযাত্রা চাপিয়ে দেওয়াকে মিল সভ্য হয়ে ওঠার মাপকাঠি ভাবতেন না। ভারত আরেকটা ইংল্যান্ড হয়ে উঠুক- সেটা তার কাম্য ছিল না। মেকলে সাহেবের মতো তিনি কখনো (অন্তত স্পষ্ট করে) বলেননি কোথাও যে, ভারতবর্ষীয়রা কালক্রমে ‘বাদামি সাহেবে’ পরিণত হলে ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে। মিলের মতে, ইংরেজ প্রোটেস্টান্টরা যেমন তাদের সন্তানদের রোমান ক্যাথলিক সেমিনারিতে পাঠাতে চান না, ভারতবর্ষীয়রাও তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে খ্রিষ্টান বানাতে চাইবে না; এটাই স্বাভাবিক। ১৮৩০-এর দশকে অ্যাংলিসিস্ট বনাম ওরিয়েন্টালিস্ট বিতর্কের কালে তরুণ মিল কলম ধরেছিলেন ওরিয়েন্টালিস্টদের পক্ষে; বাবা জেমস মিলের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে। মিলের কাঙ্ক্ষিত আদর্শ ‘সভ্য জাতির’ গুণাবলির তালিকায় ছিল সর্বজনমান্য সব বৈশিষ্ট্য- রুল অব ল, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, অপরাধের অবসান, অন্যায়ের প্রতিকার, পরমতসহিষ্ণুতা, অসুখ, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সমবায়ী উদ্যোগ গ্রহণ ইত্যাদি। ফুকোর লেখা থেকে এখন আমরা জানি- নিম্নবর্গের ঐতিহাসিকরা এটা বিভিন্নভাবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন- এসব আপাত নিরীহ সুশাসনমূলক ও উন্নয়ন-উদ্যোগ সভ্যতা প্রতিষ্ঠার নামে আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতার কাছে বশ্যতা বা নতি স্বীকার করাকেই জায়েজ করেছে। মিল এখানে ফুকো-কথিত গভর্নমেন্টালিটিকেই ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এর পরিণতি সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর হয়নি।

এমনকি মিল-শিষ্য বঙ্কিমের তা দৃষ্টি এড়ায়নি। ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “আমরা দেখাইলাম যে, ব্রিটিশ রাজ্যকালে ভূমিসংক্রান্ত যে সকল আইন হইয়াছে, তাহাতে পদে পদে প্রজার অনিষ্ট হইয়াছে। প্রতি বারে দুর্বল প্রজার বল হরণ করিয়া আইনকারক বলবান জমীদারের বলবৃদ্ধি করিয়াছেন। তবে জমীদার প্রজাপীড়ন না করিবেন কেন?’ এমনকি রুল অব লর প্রবল প্রবক্তা মিলের বিরুদ্ধে গিয়ে সবিস্তারে জানাচ্ছেন, ‘কেন আইন আদালতে কৃষকের উপকার’ হয় নাই। প্রথমত, মোকদ্দমা অতিশয় ব্যয়সাধ্য। দ্বিতীয়ত, আদালত প্রায় দূরস্থিত, আর ‘যাহা দূরস্থ, তাহা কৃষকের পক্ষে উপকারী হইতে পারে না।’ তৃতীয়ত, বিলম্ব- ‘সকল আদালতেই মোকদ্দমা নিষ্পন্ন হইতে বিলম্ব হয়’, আর ‘বিলম্বে যে প্রতিকার, সে প্রতিকারকে প্রতিকার বলিয়া বোধ হয় না।’ চতুর্থত, ঔপনিবেশিক আইনের ‘অযৌক্তিকতা ও জটিলতা’। পঞ্চমত, বিচারকবর্গের অযোগ্যতা, যাহার মধ্যে অধিকাংশই ইংরেজ।”

এসব উল্লেখ করার পর বঙ্কিম যুক্তি দিচ্ছেন, এর পরও আমরা যদি ভাবি, ‘আমরা বড় সন্তুষ্ট হইলাম- কেননা, জুরির বিচার হইয়াছে- বিলাতি প্রথানুসারে বিচার হইয়াছে- আমরা বড় সভ্য হইয়া উঠিয়াছি’; তাহলে এর চেয়ে ভ্রমাত্মক আর কিছুই হতে পারে না।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৭] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৭

[গত সংখ্যার পর]
দ্বিতীয়ত, এই সাংস্কৃতিক নব-জাগরণের ওপরে বিশ্ব-সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরেরা অন্তরীক্ষ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। এর পেছনে বোদলেরীয় ক্লেদজ কুসুমের অবক্ষয়ের ছায়া যেমন ছিল, তেমনি ছিল শানিত সমাজ-মনস্কতা। সার্ত্রে ও কাম্যুর অস্তিত্ববাদ, ফ্রয়েডের মনোবিকলন ও মার্কসের সমাজ-ইতিহাস সচেতনতা একই সাথে ক্রিয়াশীল ছিল ষাটের দশকের কবিতায়। লালনও ছায়া হয়েছিলেন। ফুলের মৃত্যু না হলে দুঃখে-বিরহে যেমন কবিতার জন্ম হয় না; কবির মৃত্যু না হলে তেমনি কষ্টে-শোকে ফুলের জন্ম হয় না- এ রকম সম্ভাবনার কথা কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার একটি প্রবন্ধে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ষাটের কবিকুলের জন্য অবক্ষয়বোধ ও সমাজ-বদলের নিগূঢ় অভিপ্রায় তেমনি পরস্পর-বিরোধী না হয়ে সম্পূরক সত্তার মতো কাজ করেছিল। পূর্বাপর অনিবার্য ঋতুবদল বা ভাবান্তর হিসেবেই তা চিহ্নিত হয়েছিল। যদিও নানাবিধ উৎস থেকে আলো এসে পড়েছিল এই কবিদের ওপরে, কিন্তু তারা ছিলেন নিজ নিজ ভুবনের সপ্রতিষ্ঠ কারিগর। প্রেরণা-তাড়িত হয়ে তারা তাদের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোকে লিখেছিলেন, যার সাথে পাকিস্তানের রাষ্ট্র, ইতিহাস, দর্শন ও রাজনীতির আমূল বিরোধ দেখা দিয়েছিল। তৃতীয়ত, যে-অর্থে এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ড ও জয়েসের ইউলিসিস বিশের দশকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে, ষাটের দশকের বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ধারাও তেমনিভাবে পাকিস্তানি ভাবধারার বিরুদ্ধে এক অনাস্বাদিত আধুনিকতার, শিল্পরুচির ও বোধের জন্ম দিয়েছিল, যার পরিণতিতে সম্ভাব্য মনে হয়, বা সম্ভবতার হয়ে উঠেছিল বাহাত্তরের রাষ্ট্র, সংবিধান ও আজকের বাংলাদেশ।

ষাটের দশকের গোটা জীবন-যাপনকেই যেন একটি মায়াবী আয়নার মধ্যে- তার সমস্ত অমঙ্গলবোধ ও শুভত্বের বাসনা নিয়ে- প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেদিনের কবি-সাহিত্যিকেরা। অবাস্তব অমার্জনীয় মনে হয়েছিল সেদিনের পাকিস্তানি রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আইন-টাইন, কানুন-কালাকানুন, বেশ-পরিবেশ। অলক্ষ্যেই ধসে পড়েছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যুক্তি। সে জন্যই তারা অনায়াসে কখনও এলিয়টকে আঁকড়ে ধরে, কখনও ভায়েহোকে জড়িয়ে, কখনও রবীন্দ্রনাথের গানে উজ্জীবিত হয়ে, আবার কখনও বোদলেয়ারের কাছে ঋণস্বীকার করে নতুন একটি দেশ-সমাজ প্রার্থনা করেছেন, যেখানে প্রতিটি মানুষ বাধাবন্ধনহীন মুক্ত, সৃষ্টিশীল, রহস্যময়, আপন ভুবনের সম্রাট। বিচ্ছিন্ন, একক, বহিরাগত, অচেনা বলেই এই কবিকুল বৃত্তের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র-সমাজের শাসন ও অনুশাসনকে দেখতে পেরেছিলেন। যা সম্ভব ও বাস্তব তাকে তাদের কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয়নি; আর যা অসম্ভব ও অবাস্তব তাকে তারা শ্রেয়োজ্ঞান করেছেন। প্রতিটি রেনেসাঁই অসম্ভব ও অবাস্তবকে পৃথিবীর মাটিতে ফলদায়ী বৃক্ষের মত লালনের স্বপ্ন দেখেছে। রফিক আজাদের মত ‘অসম্ভবের পায়ে’ নিজেকে উৎসর্গ করেছে। বোদলেয়ার যেমন বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বলেছেন :

‘বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিষ্ণু মেঘ… ঐ উঁচুতে… ঐ উঁচুতে
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।’

না ভ্রাতা, না ভগ্নি, না পিতা, না জননী, আমি বা আমরা যে রাষ্ট্রে বাস করতে চাই, তা লালনের রিপাবলিক। এভাবেই আগামীর সমাজ-রাষ্ট্রকে দেখেছেন তারা।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৬] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৬

[গত সংখ্যার পর]

৫.

তবে ষাটের দশকের কবিতার প্রগতিপন্থা অন্যভাবেও সংক্রমিত হয়েছিল। পঞ্চাশের যুগেই বাম-প্রগতিশীল ধারার সাথে জাতীয়তাবাদী ধারার অন্তর্লীন যোগাযোগ গড়ে উঠতে থাকে। সেটা বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে ষাটের দশকে। এই যোগাযোগ রাজনৈতিক আন্দোলনে যেমন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও ক্রমশ এক নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে থাকে। বাম-প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মী-সংগঠকদের পক্ষ থেকে সচেতনভাবে ‘জাতীয়তাবাদী’ ধারার প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী ধারার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা অগ্রগণ্য ছিলেন, তাদের মধ্যে শামসুর রাহমানের নাম প্রথমেই চলে আসবে। বাম-প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা শামসুর রাহমানের সাথে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন, প্রেরণা জোগাতেন, কোনো বিশেষ দিবস বা উপলক্ষে বাংলার এই প্রতিভাবান কবি যাতে কবিতা লেখেন, সে সম্পর্কে সচেতন প্ররোচনা ছিল তাদের।

যে কোনো কারণেই হোক, ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইতে শামসুর রাহমানের প্রসঙ্গ আসেনি। এর একটি কারণ হতে পারে, পঞ্চাশের দশকের কবি হিসেবে তার অভ্যুদয়। তবে ঘনিষ্ঠ বিচারে শামসুর রাহমানকে ছাড়া ষাটের কবিতায় আধুনিকতার নির্মাণ ও পুনর্জাগরণের বিষয়টি আলোচনা করা প্রায়-অসম্ভব। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। সে হিসেবে, বাংলা কবিতার ষাটের দশক তার হাত দিয়েই শুরু। বস্তুত, ষাটের দশকেই বের হতে থাকে সাড়া-জাগানো তার একের পর এক কাব্যগ্রন্থ :রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩), বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৬), নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮) ও নিজ বাসভূমে (১৯৭০)। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় লেখা ‘বন্দীশিবির থেকে’ (১৯৭২) থেকে পেছনে ফিরে গেলে দেখা যাবে যে গোটা ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি-সংগ্রাম তার কবিতার মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে গ্রন্থিত হয়ে এসেছে। রৌদ্র করোটিতেই তিনি লিখেছেন ‘লালনের গান’; রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন কবিতা যখন তার গানকে বেআইনি করা হয়েছে; ভাষা আন্দোলন ও বাংলা কবিতার অভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যকে সমর্থন করে লিখেছেন বিধ্বস্ত নীলিমার ‘বাংলা কবিতার প্রতি’; আয়ুব শাহীর স্বৈরাচার শাসনের ছায়ায় লিখেছেন নিরালোকে দিব্যরথের ‘সকল প্রশংসা তার’; রাজনৈতিক দমন-পীড়নকে মনে রেখে লিখেছেন ‘টেলেমেকাস’; গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে লিখেছেন নিজ বাসভূমের এক ঝাঁক প্রতিবাদী কবিতা- ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’, ‘পুলিশ রিপোর্ট’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘ঐকান্তিক শ্রেণীহীনা’, ‘কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি’, ‘কবিয়াল রমেশ শীল’, ‘কী যুগে আমরা করি বাস’, ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’, ‘এ যুদ্ধের শেষ নেই’, অথবা ‘আমি কথা বলাতে চাই’। ষাটের দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম শামসুর রাহমানের অন্তরঙ্গে-বহিরঙ্গে যেমন অনুভবযোগ্য পরিবর্তন এনেছিল, তেমনি এসব আন্দোলন-সংগ্রাম নিছক রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার মধ্যে আটকে না থেকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আইডেনটিটি বা আত্মসত্তা খুঁজে পেয়েছিল তার ও তার সহযাত্রীদের কবিতা-গানের মাধ্যমে।

এইসবই পুরোনো, বহু-চর্চিত প্রসঙ্গ। রাজনীতি ও সংস্কৃতি এ দুইয়ের মধ্যে ইতিহাসের গভীর এরিয়েলে অলক্ষ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে যায়। শামসুর রাহমানের ষাটের দশকের লেখায় ক্রম-বাড়ন্ত রাজনৈতিক, এমনকি শ্রেণি-সচেতনতার যে লক্ষণ দেখতে পাই তার কারণ নিহিত ছিল সে সময়ের পরিবেশে, হাওয়ায়, এমনকি দেয়াল-লিখনে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা বুঝি স্পষ্ট হয়। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে কবির সাথে দেখা হলে আমি বলি যে আমার বহুদিনের ইচ্ছা যে তিনি যেন সেজার ভায়েহোর একটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ভায়েহোর কোন কবিতাটির কথা বলছেন? কবিতাটির নাম শুনে তিনি বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে বললেন, আপনি হয়তো জানেন না, এই কবিতাটির আদলে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম ষাটের দশকেই, আমার নিজ বাসভূমে কাব্যগ্রন্থে সেটি আছে। অস্বীকার করব না যে আমি কিছুটা পরিমাণে চমকে উঠেছিলাম। ষাটের দশকের কবি-সাহিত্যিকেরা যারা এ দেশের নব-জাগরণের অধ্যায় নীরবে সৃষ্টি করেছিলেন তাদের পঠন-পাঠনে কোনো খামতি ছিল না। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী সৃষ্টির সাথে তাদের যেমন পরিচিতি ছিল, প্রগতিবাদী সাহিত্যের সাথেও তাদের যোগসূত্র ছিল নিবিড়। পেরুর কবি সেজার ভায়েহো মার্কসবাদে অনুপ্রাণিত কবি ছিলেন, ১৯২৮ ও ১৯২৯ সালে পরপর দু’বার তিনি রাশিয়ার নতুন নির্মাণ দেখতে যান, ১৯৩১ সালে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, ১৯৩৬-৩৯ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে তিনি দু’বছর সক্রিয় অংশ নেন জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনীর বিরুদ্ধে, আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের অংশ হয়ে। ১৯৩৮ সালে প্যারিসে ৪৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। আমি ভেবেছিলাম যে শামসুর রাহমানকে আমি তার সম্ভাব্য অজানা কোনো এক কবির সম্পর্কে আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিচ্ছি। অথচ প্রায় তিন দশক আগেই কবি সেজার ভায়েহো সম্পর্কে জেনেছেন; শুধু জেনেছেন নয়, তার কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের এক শ্রেষ্ঠ কবিতাও রচনা করেছেন। বাংলাদেশের ষাটের দশকের নব-জাগরণের এমনি ছিল গভীর মানবিক নির্মাণ, যা দেশ-মাটির জলে শেকড় ছাড়লেও অতিক্রম করে গিয়েছিল দেশ-কালের গণ্ডী।

সেজার ভায়েহোর কবিতাটি ছিল এ রকম :

I will die in Paris, on a rainy day
on some day I can already remember.
I will die in ParisÑ and I don’t step asideÑ
Perhaps on a Thursday, as today is Thursday, in autumn.

It will be a Thursday, because today, Thursday, setting down
these lines, I have put my upper arm bones on
wrong, and never so much as today have I found myself
with all the road ahead of me, alone.

Ceasar Vallejo is dead. Everyone beat him
although he never does anything to them;
they beat him hard with a stick and hard also

with a rope. These are the witnesses :
the Thursdays, and the bones of my arms,
the solitude, and the rain, and the roads… I will die in Paris, on a rainy day
on some day I can already remember.
I will die in Paris and I don’t step aside
Perhaps on a Thursday, as today is Thursday, in autumn.

It will be a Thursday, because today, Thursday, setting down
these lines, I have put my upper arm bones on
wrong, and never so much as today have I found myself
with all the road ahead of me, alone.

Ceasar Vallejo is dead. Everyone beat him
although he never does anything to them;
they beat him hard with a stick and hard also

with a rope. These are the witnesses :
the Thursdays, and the bones of my arms,
the solitude, and the rain, and the roads…

বিষণ্ণ, অতি-ব্যক্তিক, অমোঘ পরিণতির দিকে ধাবমান, কবি-জীবনের সায়াহ্নকালীন এই উচ্চারণ তরুণতর শামসুর রাহমানের হাতে পড়ে এক অন্য রূপ পেয়েছিল। ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিবেচনা’ কবিতাটির অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি (পাঠক, পুরোটা পড়ে নেবেন, এই ভরসা রাখি) :

‘সেদিনও কি এমনি অক্লান্ত ঝরঝর বৃষ্টি হবে এ শহরে?

ঘিনঘিনে কাদা

জমবে গলির মোড়ে সেদিনও কি এমনি,

যেদিন থাকব পড়ে খাটে নিশ্চেতন,

নির্বিকার, মৃত?

আলনায় খুব

সহজে থাকবে ঝুলে সাদা জামা। বোতামের ঘরগুলো যেন

করোটির চোখ, মানে কালো গহ্বর। জুতো জোড়া

রইবে পড়ে এক কোণে, যমজ কবর। কবিতার

খাতা নগ্ন নারীর মতোই চিৎ হয়ে

উদর দেখিয়ে

টেবিলে থাকবে শুয়ে আর দেয়ালের টিকটিকি

প্রকাশ্যেই করবে সঙ্গম।

যেদিন মরব আমি, সেদিন কি বার হবে, বলা মুশকিল।

শুক্রবার? বুধবার? শনিবার? নাকি রবিবার?

যেবারই হোক,

সেদিন বর্ষায় যেন না ভেজে শহর, যেন ঘিনঘিনে কাদা

না জমে গলির মোড়ে। সেদিন ভাসলে, পথঘাট,

পুণ্যবান শবানুগামীরা বড় বিরক্ত হবেন।’

এই সাক্ষাতের আরও কিছুকাল পরে- ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে, এ দেশেও বাম-প্রগতিশীল মহলে নানা জিজ্ঞাসার টানাপড়েন দেখা দিয়েছে- কবির সাথে তার শ্যামলীর বাসায় দেখা হয়েছিল। এসব ভাঙন, বিলুপ্তিবাদ, অস্থিরতা কবির ভালো লাগেনি। বেশ জোরের সাথেই অনুযোগ করেছিলেন, ‘এখন তো আর পার্টির থেকে কেউ আমার কাছে আসে না। আগে তারা কত আসতেন, আমাকে দিয়ে তারা কত কবিতা লিখিয়েছেন। সেইসব দিনের কথা মনে পড়ে।’

৬.

এবার বোধহয় উপসংহারের দিকে যাওয়া চলে। এই প্রবন্ধটিতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইটিকে উপলক্ষ করে ষাটের দশকের কবিতা প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চেয়েছি। প্রথমত, বলার কথা ছিল এই যে, ষাটের দশকে রাজনৈতিক আন্দোলন তথা আমাদের জাতীয় মুক্তি-সংগ্রাম এমনিতেই সফলতা পায়নি। ‘আন্দোলন’ যে ‘মুক্তি-সংগ্রামে’ পরিণত হয়েছিল তার পেছনে যেমন অর্থনীতিবিদদের গড়া ‘দুই-অর্থনীতি’ শীর্ষক বৈষম্যের তত্ত্ব যুক্তি-ভিত্তি জুগিয়েছিল ষাটের দশকের শিল্প আন্দোলন, বিশেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতার আন্দোলনও কাজ করে থাকবে। আধুনিক বাংলা কবিতার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক নব-জাগরণের ধারার সাথে যুক্ত হয়েছিল। ষাটের দশকের ‘রেনেসাঁ’ ছাড়া আমরা বিশ্বতালে তাল রেখে চলা শিখতে পারতাম না, আমাদের সেই বিরল আত্মবিশ্বাসটুকু আত্মস্থ হতো না যেটি না আসলে একটি সংগ্রামরত জাতি জগৎ-সম্মুখে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, যেমন পারে না একটি অর্বাচীন বালক ভাব প্রকাশের ভাষাহীন হয়ে সৃষ্টিশীল হতে, শত মেধা থাকা সত্ত্বেও। ষাটের দশকের কবিতার ভুবন, তার শিল্পলোক, সেই বালকটিকে এক মেধাসম্পন্ন জাগতিক সম্ভাবনার একটি আত্মনির্ভর পাটাতন দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে একটি জাতি-নির্মাণের স্বপ্ন দেখা যায়।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৫] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৫

[গত সংখ্যার পর]

বলেওছিলাম তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে, এ নিয়ে লিখতে। তিনি আগ্রহের সাথে তার অনন্যসাধারণ উচ্চারণে গাঢ় কণ্ঠে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন তার ‘আপনারা জানেন’ কবিতাটি। এর ফর্ম নিয়ে মৌলিকত্বের দাবি ছিল তার :

আপনারা জানেন
মহামতি প্লেটো কী বলেছেন…
দার্শনিক কান্ট কী বলেছেন…
হেগেল কী বলেছেন…
মহামতি বুদ্ধ কী বলেছেন…
দেকার্তে কিংবা
বেগর্স কী বলেছেন…
বার্ট্রান্ড রাসেল কী বলেছেন…
হোয়াইটহেড কী বলেছেন…
জীবনানন্দ দাশ কী বলেছেন…
বুদ্ধদেব বসু কিংবা বিষ্ণু দে কী বলেছেন…
কী বলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ!
কী বলেছেন কবিকুল চূড়ামণি মাইকেল!
আপনারা জানেন
ঈশ্বরের পুত্র যিশু কী বলেছেন…
ইউরিপিডিস কিংবা সফোক্লিস কী বলেছেন…
মিশেল ফুকো কী বলেছেন,
দেরিদ্দা কী বলেছেন
কী বলেছেন পিকাসো
কিংবা পল এলুয়ার!
এই গ্রন্থের মহাপুরুষেরা কে কী বলেছেন
আপনার সবাই জানেন। এখানে বক্তৃতা আমার উদ্দেশ্য
নয়, আমি এক নগণ্য মানুষ, আমি
শুধু বলি :জলে পড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন

আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, একদিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার কবিতার আলোচনা করার সময় আমাদের শহীদ কাদরী পড়তে বলেছিলেন। বাংলা কবিতায় আবেগের প্রবল উত্তাপ ও আতিশয্য, এখানে তির্যক ভঙ্গিতে বলার মতো শক্তি, স্যাটায়ার-এর সংহত ক্ষমতা প্রায় দুর্লক্ষ্য। শহীদ কাদরী সেই দুর্লভতমদের একজন। এটাই ছিল স্যারের বক্তব্য। ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’র তির্যক কবিতাগুলোকে মনে রেখেই তিনি এ কথা বলেছিলেন। তখন আমার মনে হতো যে, বহিরঙ্গে স্যাটায়ার থাকলেও ভেতরে ভেতরে শহীদ কাদরী সময়ের সাথে আরও বেশি নিঃসঙ্গ বেদনাহত সমাজের ক্ষত সারিয়ে তোলা যায় এমন পঙ্‌ক্তিমালায় সংহতি খুঁজছিলেন। হয়তো জাগরণের পরেই আসে মোহভঙ্গের পর্ব, আমাদের জাতীয় জীবনেও এটা পর্বান্তর ঘটেছিল। যে-বই থেকে নিজের প্রিয় কবিতাটি বেছে সেদিন পড়েছিলেন তার পাতায় কিছু লিখে দিতে অনুরোধ করায় শহীদ কাদরী লিখেছিলেন- ‘এই নশ্বর গ্রহ থেকে একদিন সব স্বাক্ষরই মুছে যাবে- মনে রেখো।’

৪.

আলোচনার বাইরে থেকে গেল আরও অনেক কবি-সাহিত্যিকের রচনা- মহাদেব সাহা, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক, অরুণাভ সরকার, হায়াৎ মামুদ প্রমুখ। যেমন বাইরে থেকে গেল ষাটের দশকের চলতি সাময়িকীর প্রসঙ্গ। একুশে উপলক্ষে যেসব পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বার হতো তার মধ্যে সমাজ-বদলের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অনেক কবিতা ও গদ্য-রচনা থাকত। সেসব লেখাও পরোক্ষভাবে ষাটের দশকের নব-জাগরণে সাহায্য করেছিল। এই দশকের স্বল্পায়ু কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ‘লিটল ম্যাগাজিন’গুলোর মধ্যে ছিল সাম্প্রতিক, স্বাক্ষর, না, কালবেলা ও বক্তব্য। সংক্ষিপ্ত অথচ সংকেতবাহী নাম-সংবলিত এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত ইতিহাস-গবেষকদের বা বর্তমানকালের সাহিত্য-পাঠকদের কাছ থেকে যথাযথ মনোযোগ লাভ করেনি। এসব পত্রপত্রিকা থেকে শ্রমে-নিষ্ঠায় সেরা লেখাগুলো বাছাই করে খণ্ডে খণ্ডে এক সময় সংকলন বের হবে- এটা আশা করা অন্যায় নয়। একই রকমের প্রত্যাশা ছিল ‘একতা’ পত্রিকার বিষয়েও। এই পত্রিকার পাতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে সত্তর ও আশির দশকে, পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে যার সংকলন হওয়া জরুরি। এসব সংকলনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নব-জাগরণের ‘প্রগতিবাদী’ ধারার একটি সমৃদ্ধ ছবি ফুটে উঠবে। আগামী দিনে বাম-প্রগতিশীল ধারার বিকাশের জন্যও এটি জরুরি।

ষাটের দশকে এই ভূখণ্ডে একজন ‘কমিটেড’ সমর সেন, দীনেশ দাস, সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো কেউ ছিলেন না। এরা সবাই জীবনের বড় সময়জুড়ে বামধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য, এ দেশের গদ্যের ভুবনে একজন শহীদুল্লা কায়সার সৃষ্টিশীল ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত জেলে বসে লেখা তার ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসটি ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত হয়। শ্রেণি-সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িকতা, সামন্ততান্ত্রিক প্রথার বিরুদ্ধে নারীর বিদ্রোহ- সব মিলিয়ে সংশপ্তক উপন্যাসটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পটভূমি অলক্ষ্যে নির্মাণ করে দেয়। শহীদুল্লা কায়সার সরাসরিভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ভাই জহির রায়হানও একই আদর্শে প্রাণিত হয়েছিলেন এবং সাহিত্য রচনা করেছিলেন, যদিও তার প্রতিভা পূর্ণতা পেয়েছিল শিল্পকলার সেলুলয়েড মাধ্যমেই। তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করতে সাহায্য করেছিল চলচ্চিত্রের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমে। অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ-চেতনার ধারায় প্রেরণা এসেছিল প্রথাগত বাম-গণতান্ত্রিক ধারার বাইরের অস্তিত্ববাদ থেকেও। আমি এই সূত্রে বিশেষ করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচনাবলির কথা উল্লেখ করতে চাই। অস্তিত্ববাদের ভেতরের এক বিশেষ ধারা- আলবেয়ার কাম্যুর থিওরি অব অ্যাবসার্ড ওয়ালীউল্লাহকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। ওয়ালীউল্লাহর লেখায় গদ্যকে সামনে এগিয়ে দিয়ে পিছু পিছু হাঁটে কবিতা এবং এক মোহাচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি করে। ‘চাঁদের অমাবস্যা’র সূচনা-পর্বেই আলবেয়ার কাম্যু ভর করেন এ দেশের নব-জাগরণের নিঃশব্দ উত্থানের ওপরে। ‘যুবক শিক্ষক’ (যার নাম পুরো উপন্যাসে জানা যায় না) বাঁশঝাড়ের মধ্যে রাতের আলো-অন্ধকারে একটি যুবতী নারীর অর্ধ-উলঙ্গ মৃতদেহ দেখতে পায় এবং দৃশ্যটি দেখে সে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়ে :’যুবক শিক্ষক জ্যান্ত মুরগি-মুখে হাল্ক্কা তামাটে রঙের শেয়াল দেখেছে। বুনো বেড়ালের রক্তাক্ত মুখ দেখেছে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট মহামারী-হাহাকার দেখেছে, কিন্তু কখনও বিজন রাতে বাঁশঝাড়ের মধ্যে যুবতী নারীর মৃতদেহ দেখে নাই। হত্যাকারী দেখে নাই। সে ছুটতেই থাকে।’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ চল্লিশের দশকে সিপিআই-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সংশপ্তকের মার্কসীয় শ্রেণি-সংগ্রামের সাথে চাঁদের অমাবস্যার ফ্রয়েডীয় সাইকো-অ্যানালাইসিস মিলেমিশে গিয়ে পূর্ব বাংলার গদ্য-সাহিত্যের দৃষ্টিশক্তিকে প্রসারিত করে দিয়েছিল। যার ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে নির্মিত হতে পেরেছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ অথবা হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’র মতো উপন্যাস।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা শহীদুল্লা কায়সার উভয়েরই প্রগতিশীল মার্কসবাদী ভাবাদর্শের নিরিখে মানস-জমিন আগে থেকে তৈরি করা ছিল। তারা যেটা গদ্যে পেরেছিলেন, সেভাবে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে ষাটের কবিতার ভুবনে সমাজ বদলের কাব্য লিখতে খুব বেশি কেউ সক্রিয় ছিলেন না। রণেশ দাশগুপ্ত তার ‘আধুনিক বাংলা কবিতার প্রগতিতে বাংলাদেশের ধারা’ নিবন্ধে হুমায়ুন কবির ও নিয়ামত হোসেনের উল্লেখ করেছেন। ‘চাঁদের অমাবস্যা’র যুবতীর মৃতদেহের মতোই হুমায়ুন কবির ‘করালী বেহুলা’ কবিতার লখিন্দরের মৃতদেহকে পড়ে থাকতে দেখেন :

‘নিথর চাঁদের রাত হরিদ্রাভ চাঁপার আকাশ

বণিক বণিতা ঘুমে জাগে একা কল্লোলিনী প্রেম

সোনার বরণ তনু ক্ষয়ে যায় বিষের ছোঁয়ায়

তখন হঠাৎ হায়! হায়, প্রাকৃত নারী কতবার হতভাগ্য হবে।!’

ষাটের দশকেই ‘কুসমিত ইস্পাত’-এর কবি হুমায়ুন কবির অনায়াসে বলে ওঠেন :

‘কলার মান্দাসে আজ বেহুলা ভাসে না বুঝি

শরীরী আগুন তার দেহ; করাল রূপালী নারী

আগুনের তরঙ্গে ফোঁপায়, বুঝি ঝড় উঠে আসে।

চম্মক নগরে থাকি বৃদ্ধ চাঁদ বণিক আমরা

বেহুলা বলয়ে শোন- খোঁজ সেই কুটিল নাগিনী

ছিন্নভিন্ন হত্যা করো, দগ্ধ করো, বিষময় দেহ।’

রণেশ দাশগুপ্ত সঙ্গত কারণেই তার নিবন্ধে উপ-শিরোনাম দিয়েছেন- ‘একটি অসমাপ্ত পর্যালোচনা’। এর কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের নব-জাগরণে প্রগতিবাদী ধারার সম্যক মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমে চাই এর সংকলন। তিনি ১৯৮৯ সালে এ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন তা এখনও প্রাসঙ্গিক :

‘বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের আধুনিক প্রগতির কবিতার ধারাটাকে বোঝার জন্য চাই সমস্ত কবিতার সমাবেশ বা সমারোহ। চাই অন্ততপক্ষে সংকলন। … বাংলাদেশের কবিদের বই একটি-দুটি করে বেরোতে শুরু করে সাধারণত ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এর আগে এবং পরে প্রথিতযশা কবিদের লেখাও বেরিয়েছে প্রধানত ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর রবিবাসরীয় পৃষ্ঠায় অথবা সাধারণভাবে অনিয়মিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় কিংবা বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাব্যপত্রে অথবা একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শহীদ স্মরণিকায়। … বাংলাদেশের কবিতার জগতে রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রাম একটি আবহ গড়ে দিয়েছে, যাতে প্রথিতযশারা এবং উদীয়মানেরা হাতে হাত রাখতে ভ্রূক্ষেপ করেন না।’

রণেশ দাশগুপ্ত এর পর গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছিলেন ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘আধুনিক কবিতা’, সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিষ্ণু দে সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের কবিতা এক স্তবক’ এবং জুলাই ১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দুর্গাদাস সরকার ও সনাতন কবিয়াল সম্পাদিত ‘গ্রাম থেকে সংগ্রাম’ সংকলন গ্রন্থের। এই শেষোক্ত সংকলনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এ দেশের ‘মহিলা-কবিদের কবিতা-সংগ্রহ’। এর থেকে অবশ্য ষাটের দশকের কবিতার প্রগতিবাদী ধারা সম্পর্কে সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় না, কেবল আমাদের ঔৎসুক্য আরও বেড়ে যায়।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৪] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৪
[গত সংখ্যার পর]

৩. নব-জাগরণের ভাষা ও শহীদ কাদরী

শহীদ কাদরীকে আমি ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থের প্রসঙ্গ তুলে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তার ষাটের দশকের কবিতায় অবক্ষয়ের, যুদ্ধের, মড়কের, দাঙ্গার প্রভৃতি বিপর্যয়ের যত উল্লেখ, তা কতটা পরিমাণে সমকালীন বাস্তব দ্বারা চিহ্নিত, নাকি সেটা নিতান্তই তার কল্পনাপ্রসূত? নব-জাগরণের অকৃত্রিমতা বোঝার জন্য এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া জরুরি।

‘উত্তরাধিকার’-এর একেকটি কবিতা ধরে ধরে কবি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে এই যুদ্ধ-দাংগা অবক্ষয়-বোধ ষাটের দশকের নয়, এগুলো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। উদাহরণত, নাম-কবিতায় তিনি স্মরণীয় করে লিখেছেন :

জন্মেই কুকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে-
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন
দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রক্তচক্ষু সেই ব্লাক আউট আঁধারে।

এখানে সন্ত্রস্ত শহর, ব্লাক আউট আধার প্রভৃতি শব্দ ষাটের দশকের ঢাকাকে বোঝাচ্ছে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন কলকাতার দীপহীন রাত্রিকে নির্দেশ করছে। অনেক যুদ্ধ, দাঙ্গা, মহামারী ও মন্বন্তর সূচিত শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে শহীদ কাদরী শ্রান্ত-ক্লান্ত কলকাতা থেকে উদ্ভিন্নযৌবনা ঢাকা শহরে এসে পা রাখলেন। দেশভাগের পরিণামে এক প্রকার উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল তাকে। এর ফলে যেসব কবিতা বেরিয়েছিল তাকে নিছক কবির ‘মনোজাত নাগরিক বিকলাঙ্গ জীবনজগতের সন্ধান’ (জনৈক সমালোচকের উক্তি তুলে ধরছি) বলে চিহ্নিত করলে পুরোটা বলা হয় না। দেশভাগের ফলে উন্মূল উৎপাটিত খসড়া জীবনের কষ্টটা তাতে চাপা পড়ে যায়। উদ্বাস্তু জীবন থেকেই উদ্বাস্তু মনের উদ্ভব। তাই তিনি ‘নপুংসক সন্তের উক্তি’ কবিতায় বলেছেন :

‘কেন এই স্বদেশ সংলগ্ন আমি, নিঃসঙ্গ উদ্বাস্তু,
জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা,
আঁধার টানেলে যেন ভূতলবাসীর মতো, যেন
সদ্য, উঠে আসা কিমাকার বিভীষিকা নিদারুণ!
আমার বিকট চুলে দুঃস্বপ্নের বাসা? সবার আত্মার পাপ
আমার দুচোখে শুধু পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমার মত লেগে আছে
জানি, এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর গোধূলীর যে বংশজাত আমি
বস্তুতই নংপুসক, অন্ধ, কিন্তু সত্যসন্ধা দুরন্ত সন্তান।

একে কেবল স্যাড জেনারেশন, হাংরি জেনারেশন, ষাটের অবক্ষয়বাদী কবিতার ধারা বলে শনাক্ত করা চলে না। এর একটি আশু তাৎপর্য এই যে, অবক্ষয়বোধের পেছনে শুধু হই-চই, শুধু প্রথাগতকে অস্বীকার করে তারুণ্যের স্বাক্ষর রাখার তাগিদ ছিল না। এর পেছনে রাষ্ট্র-সমাজজীবনের বিপর্যয়ের যোগসূত্র ছিল। ইতিহাসের গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েই তবে লেখা সম্ভব ছিল ‘উত্তরাধিকার’-এ :

‘-এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা
এবং আমাকে নিস্কপর্দক নিষ্ফ্ক্রিয়, নঞর্থক
করে রাখে; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা!’

আগেই বলেছি, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এক গভীর দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদ অবক্ষয়ের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়। কিন্তু দেশ-ভাবনাকে নিয়েও খেলেছিলেন তারা ছন্দে-উপমায় চিত্রকল্পে-সংকেতে। এর একটা বড় কারণ ছিল ষাটের কবিদের মধ্যে প্রবল সমকালীনতাবোধ। ষাটের দশকে শুধু ছয়-দফা আন্দোলনই নয়; ১৯৬৮ থেকে শুরু করে ফ্রান্স, আমেরিকা, চেকোশ্নোভাকিয়া, সারা বিশ্বেই ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল। ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল; চে গুয়েভারা মারা গেলেন বলিভিয়ায়, রবার্ট কেনেডি নিহত; নিক্সন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন। সত্তর সালের জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু হলো পূর্ববাংলার অসংখ্য মানুষের। আর সে বছরই নির্বাচনে জয় পেল শেখ মুজিবের দল, সেই মুজিব যিনি পান্নালালের গান ভালবাসতেন-‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।’ এসবের প্রভাব এসে পড়েছিল কবিতার স্বগত উচ্চারণেও। শহীদ কাদরীর ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’ এর উদাহরণ :

সংবাদপত্রের শেষ পৃষ্ঠা থেকে বেরিয়ে এসেছে
এক দীর্ঘ সাঁজোয়া-বাহিনী
এবং হেডলাইনগুলো অনবরত বাজিয়ে চলছে সাইরেন।
একটি চুম্বনের মধ্যে সচিৎকার ঝলসে গেল কয়েকটা মুখ,
একটি নিবিড় আলিঙ্গনের আয়ুস্কালে
৬০,০০০,০০ উদ্বাস্তুর উদ্বিগ্ন দঙ্গল
লাফিয়ে উঠলো এই টেবিলের ‘পর;
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুখাদ্যের ধোঁয়া
কেননা এক বাচাল বাবুর্চির
সবল নেতৃত্বে
আর সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে
আমাদের সচ্ছল কিচেনে
অনর্গল রান্না হ’য়ে চলেছে আপন-মনে
নানা ধরনের মাংস-
নাইজেরিয়ার, আমেরিকার, সায়গনের, বাংলার
কালো, শাদা, এবং ব্রাউন মাংস।

সমসাময়িক জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এই তীব্র সচেতনতা ষাটের অবক্ষয়-পেরুনো জাগরণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। উল্লেখ্য, সে যুগে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি ছিল গর্বের সাথে ধারণ করার মতো একটি শিরস্ত্রাণ। সেটি যত-না মাওবাদ বা সোভিয়েতের কারণে (১৯৬৮ সালে চেকোশ্নোভকিয়ায় গিয়েছিল রুশি ট্যাংক- সে স্মৃতি তখনও তাজা) তারচেয়ে বেশি পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিকল্প খোঁজার তাগিদে। প্রায় একই সময়ে ইন্দিরার কংগ্রেস, ভুট্টোর পিপিপি আর মুজিবের আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রকে তার অন্যতম আত্ম-পরিচয় হিসেবে স্বীকার করে নেয়। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই পরিবর্তন মাও সে তুং-এর ‘রেড বুক’-এর কারণে হয়নি। ষাটের দ্বিতীয় ভাগের কবিতায় সমাজ-চেতনা সে ধরনের বোধে প্রধানত চালিত হয়নি। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, পাকিস্তানে ‘বাইশ পরিবার’-এর উত্থান প্রভৃতি অনুষঙ্গ ৬-দফাকে ১১-দফায় পরিণত করতে সাহায্য করেছিল। এই অর্থনৈতিক চেতনা কবিতার বলয়ে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে থাকবে। এক অসহায় বিপর্যস্ত মানবিক বোধে ষাটের কবিরা সমাজ-পরিবর্তন ও সাম্য-ধারণার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে দাঁড়ালেও সে তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ছাড়তে চাননি। শহীদ কাদরী লিখেছেন :

চুলের চটুল অহঙ্কার সহনীয় নয় কোনো সুধীমণ্ডলীর কাছে
অতএব খাটো হতে হবে তাকে,
সমাজের দশটা মাথার মতো হতে হলে, দশটা মাথার মতো
অতএব বেঁটে হ’তে হবে তাকে
তবু সে আমার চুল
অন্ধ
মূক ও বধির চুল মাস না যেতেই
আহত অশ্বের মতো আবার লাফিয়ে উঠছে অবিরাম

শুধু শহীদ কাদরী নন; এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সামষ্টিক কল্যাণ কামনা অনায়াসে সহাবস্থান করছিল ষাটের দশকের প্রায় সব কবির মানসে-কবিতায়।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। ষাটের প্রতিনিধিত্বশীল কন্ঠ হিসেবে শহীদ কাদরীর আলোচনা কতদূর সঙ্গত? এটা তো সবারই জানা যে, শহীদ কাদরীর সাথে ছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের একদার গভীর বন্ধুত্ব, যা গড়ে উঠেছিল পঞ্চাশের দশকেই। তারপরও শহীদ কাদরীকে আলোচনায় টেনে আনা। কেননা, তিনি উভয় দশকেই তার পদচ্ছাপ রেখেছিলেন। ষাটের তরুণ ও তরুণতর কবিকুলের আড্ডায়-এমনকি সত্তরের দশকেও প্রবাসের পথে পাড়ি দেওয়া পর্যন্ত- তার ছিল নিয়মিত উপস্থিতি। এমনকি এসব আড্ডার অনেকাংশে তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। ষাট দশককে যদি জাগরণের পর্ব বলি, তাহলে সে সাংস্কৃৃতিক উত্থানের নিঃসঙ্গ যুবরাজ তিনি। এ নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাক্ষ্য তুলে ধরছি :

‘উদ্দাম বলিষ্ঠ প্রাণশক্তি নিয়ে নাইল ভ্যালিতে আসত আরও একজন, শহীদ কাদরী-আমাদের সবার বিস্ময় ও মোটামুটি কেন্দ্রীয় আকর্ষণ।… বিশ শতকী ইউরোপীয় আধুনিকতার ও ছিল প্রায় মূর্ত-প্রতীক। পড়াশোনায় ও চেতানজগতে সেই আধুনিকতাকে ও ধারণ করত। প্রথম ষাটের অনেক তরুণ-লেখকের আধুনিকতার চেতনা অনেকখানিই ওর হাত থেকে পাওয়া। আমাদের দলের কেউ ছিল না ও, কখনো হয়ওনি তা, কিন্তু যাকে ঘিরে নাইল ভ্যালির আসর সবচেয়ে উদ্দাম আর ভরাট হয়ে থাকত সে ঐ শহীদ।… কেবল ষাটের লেখকদের নয়, পঞ্চাশ-ষাটের প্রায় সব লেখকের মূলবিন্দু ছিল শহীদ। ওর বলিষ্ঠ মাদকতাপূর্ণ আকর্ষণ সবাইকে ওর দিকে টেনে নিত। আমাদের অগ্রজ লেখকদের থেকে শুরু করে সে-সময়কার তরুণতম লেখকটির যা ছিল সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত-সেই পশ্চিমি আধুনিকতার উন্মূল মনোভঙ্গি, নিঃস্বতা, বোদলেয়ার বা আমেরিকার বিটনিক সম্প্রদায়ের বেহিশেবি বোহেমিয়ান জীবনযাত্রা, কাম্যুর উপন্যাসের বহিরাগত মানুষ বা এলিয়টের ফাঁপা মানুষ- সবকিছুকে নিজের ভেতর ধারণ-করা এক রহস্যময় মানুষ ছিল ও।… ওর কোনো দল ছিল না। ও ছিল একা। নিজের নিঃশব্দ একক দলের একচ্ছত্র অধিপতি।’

ষাটের রেনেসাঁর এই যোগ্যতম প্রতিনিধির মৃত্যু হয় প্রবাসেই, যদিও তখনও তিনি স্বদেশকে একটি অঙ্গুরীর মতো নৈকট্যে রেখেছিলেন। মৃত্যুর বছর কয়েক আগে নিউইয়র্কে তার বাসগৃহে এক দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল তার সাথে মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, নিম্নবর্গের ইতিহাস-চর্চা, হাক্সলির দ্য ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে। মিশেল ফুকো, জাঁক দেরিদা এবং অন্যান্য ফরাসি দার্শনিককে নিয়ে প্রচুর আগ্রহ ছিল তার। তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’-র অনেক কবিতায় সেসব বিষয় ঘুরে-ফিরে এসেছে। দেশভাগ, বোদলেয়ার, এলিয়ট, গিন্সবার্গ, অবক্ষয়-চেতনা, স্বদেশ-চিন্তা, প্রেম-অপ্রেম, কোলাহল-নিঃসঙ্গতা এসবের ভেতর দিয়ে একাকী অচেনা মাছের মতো তিনি চলছিলেন এক বৃহত্তর মানব-কল্যাণবোধে, দীপিত-তাপিত হয়ে; আমি ‘অন্য সাম্যবাদ’ বলব (যা প্রথাগত আদলের সমাজতন্ত্রের ধারণার বাইরে)।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল

[তুমুল গাঢ় সমাচার ৩] ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা (Poetry of the Sixties and Our Modernity)

তুমুল গাঢ় সমাচার: নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পর্ব ::৩

[গত সংখ্যার পর]

এসব বিভিন্ন ধারার উৎস থেকে ষাটের দশকের সাহিত্য জগতে নানামুখী প্রভাব যে অনায়াসে এসে পড়তে পারছিল, তার একটা বড় কারণ ছিল এসব উৎসের মধ্যে সম্পূরক স্ববিরোধিতা। ক্লেদজ কুসুম-এর বোদলেয়ার তরুণ বয়সে ১৮৪৮ সালের বিপ্লব-প্রচেষ্টায় অংশ নিয়েছিলেন; এই বিপ্লবে বুক বেঁধেই মার্কস-এঙ্গেলস লিখেছিলেন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। সার্ত্র-কাম্যু অস্তিত্ববাদী হয়েও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালে নাজি-অধিকৃত ফ্রান্সে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন এবং নিয়মিত ‘কমবেট’ পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন; অ্যালেন গিন্সবার্গ পারিবারিক সূত্র এবং মতাদর্শগতভাবে ছিলেন বামপন্থার দিকে ঝুঁকে : পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিনাশই তার কাম্য ছিল (যদিও তার ‘অন্য বামপন্থা’ ছিল প্রথাগত বামপন্থার বাইরে)। আমি বলতে চাইছি, ষাটের কবিতা তথা সাহিত্যলোকে অবক্ষয়ের ঋতু নেমে আসার পেছনে নানাবিধ প্রেরণা ক্রিয়াশীল থাকলেও মোটের ওপর তা সমাজমুখী চিন্তা-ভাবনার দূরবর্তী ছিল না। এবং সে কারণেই রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চাপে যখন দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছিল তখন তারা সহজেই অবক্ষয়ী নেতিবাদ থেকে সমাজমুখী ইতিবাদে চলে যেতে পেরেছিলেন। তবে এই চলে যাওয়া তাদের জন্য একমুখী উৎক্রমণ ছিল না। সমাজমুখী প্রেরণার পর্বেও তারা তাদের পূর্বের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মনোভঙ্গি হারাননি। এ জন্যই নির্মলেন্দু গুণ লিখতে পেরেছিলেন ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’র এত দ্বিত্বতা-ধর্মী শিরোনাম; আবুল হাসান ‘রাজা যায় রাজা আসে’র মতো নির্বিকার পর্যবেক্ষণ, বা জন্ম নিয়েছিল আবদুল মান্নান সৈয়দের সাড়া-জাগানো গল্প-গ্রন্থ ‘সত্যের মত বদমাশ’ (যা ছিল ভুল কারণে নিষিদ্ধ বই তখনকার দিনে, এবং যা মিশেল ফুকোর ‘রিজিম অব ট্রুথ’কে একবারের জন্য হলেও মনে করাবে)। এই বিপরীত সন্নিপাতই রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য, যেখানে অন্তর্মুখী স্বভাব ও বহির্মুখী পদচারণা, প্রেম ও দ্রোহ, ব্যক্তিগত অবক্ষয় বোধ ও সামষ্টিক পরার্থপরতা একসাথে ক্রিয়াশীল থাকে। ষাটের প্রধান প্রধান কবি-সাহিত্যিকদের জন্যই এ কথা খাটে- ওই দশকের প্রথম পর্ব-দ্বিতীয় পর্ব নির্বিশেষে। বিপরীতের একত্র-সমাবেশ এই থিসিসকে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার ‘ভালবাসার সাম্পান’ বইতে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এভাবে :

‘আমাদের প্রথম তারুণ্যকে জ্বালিয়ে তুলেছিল অবক্ষয়; এ আমাদের অনুভূতিকে তীব্রভাবে উদ্দীপিত করেছিল, কিন্তু (প্রথম যৌবনের প্রচণ্ডতায় ও অপরিণতির কারণে) একে আমরা ভালভাবে আত্মস্থ করতে পারিনি। তাই অবক্ষয় নিয়ে আমরা হৈ-চৈ করলেও এ ধারণায় আমাদের চোখে পড়ার মতো সাফল্য কম। কিন্তু জাগরণকে আমরা দেখেছিলাম কিছুদিন পরে, সামান্য একটু পরিণত বয়সে। তা ছাড়া এর সঙ্গে শৈল্পিক দূরত্বও আমাদের ছিল দ্বিতীয় লেখকদের চেয়ে বেশি। তাই ওদের চেয়ে আমরা একে আত্মস্থ করেছিলাম অনেক বেশি নিবিড়ভাবে এবং এতে আমাদের সাফল্যও হয়েছিল ওদের চেয়ে বেশি। লেখক-জীবনের সূচনায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বিশেষ করে রফিক আজাদ ছিল আমণ্ডুপদনখ অবক্ষয়ের চেতনায় প্রোথিত। কিন্তু ধীরে ধীরে গভীর দেশাত্মবোধ এবং উচ্চতর সংঘ-চেতনাকে তারা আত্মস্থ করেছিল।’

কিন্তু তার মানে কি এই যে, ষাটের দ্বিতীয় পর্বের জাতীয়তাবাদ এবং সমাজচেতনা একে একে গ্রাস করেছিল অবক্ষয়ের কবি-সাহিত্যিকদের? তারা কি হয়ে পড়েছিলেন জাতীয়তাবাদের দাস? রাষ্ট্র-ক্ষমতার জনবিচ্ছিন্ন চরিত্রকে গোড়া থেকেই কি তারা সন্দেহের চোখে দেখেননি? ‘রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট’ বলে করেননি কি প্রতিবাদ? ‘অথেনটিক’ তথা অকৃত্রিম জাগরণের একটি কুলক্ষণই হলো তার রাজশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলার ক্ষমতা। এ জন্যই রফিক আজাদ স্বাধীনতার প্রথম প্রহরেই অনায়াসে বলতে পারেন একই সাথে আশা ও হতাশায় বিদ্ধ স্থিতধী পঙ্‌ক্তিমালা। একগুচ্ছ বিচ্ছিন্ন উদাহরণ তার ‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’ (১৯৭৪) গ্রন্থ থেকে-সেসব আজও কী সাম্প্রতিক শোনায়!

যেখানে রয়েছো স্থির-মূল্যবান আসবাব, বাড়ি;
কিছুতে প্রশান্তি তুমি এ-জীবনে কখনো পাবে না।
শব্দহীন চ’লে যাবে জীবনের দরকারি গাড়ি-
কেননা, ধ্বংসের আগে সাইরেন কেউ বাজাবে না।
আমার জীবনে স্থায়ী কোন সকাল-দুপুর নেই,
সারাক্ষণ ব্যেপে থাকে- অপরাহেপ্ত-মনোধিমণ্ডলে।
সম্পূর্ণ বর্জন নয়, গ্রহণে-বর্জনে গড়ে নেই
মানুষের বসবাসযোগ্য চিরস্থায়ী ঘর-বাড়ি;
বহিরঙ্গে নাগরিক-অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক;
স্থান-কাল পরিপার্শ্বে নিজ হাতে চাষাবাদ করি
সামান্য আপন জমি, বর্গা-জমি চষি না কখনো।
অ্যাটম বোমার থেকে দু’বছর বড় এই আমি
ধ্বংস ও শান্তির মধ্যে মেরু-দূর প্রভেদ মানি না।
ক্ষীয়মাণ মূল্যবোধে, সভ্যতার সমূহ সংকটে
আমি কি উদ্বিগ্ন খুব?-উদ্বিগ্নতা আমাকে সাজে কি?
রাষ্ট্র, রাষ্ট্রনীতি, নেতা, নানাবিধ আইন-কানুন
নিয়ন্ত্রিত ক’রে যাচ্ছে যথারীতি প্রকাশ্য জীবন,
ভিতর-মহল জেঁকে বসে আছে লাল বর্ণমালা।
যদি না মেটাতে পারো আমার সামান্য এই দাবী,
তোমার সমস্ত রাজ্যে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘ’টে যাবে;
ক্ষুুধার্তের কাছে নেই ইষ্টানিষ্ট, আইন-কানুন-
সম্মুখে যা-কিছু পাবো খেয়ে যাবো অবলীলাক্রমে;
থাকবে না কিছু বাকি- চলে যাবে হা-ভাতের গ্রাসে।

যেজন প্রকৃত বিষাদগ্রস্ত সেই কেবল গভীর দেশাত্মবোধে আলোড়িত হতে পারে- এই ধূসর পাণ্ডুলিপি শুধু জীবনানন্দ লেখেননি। রফিক আজাদ যেমন ‘বেশ্যার বেড়াল’-এর মতো কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ‘গান হতে বলি’; নির্মলেন্দু গুণ যেমন লিখেছেন ‘হুলিয়া’, তেমনি দুর্ভিক্ষের ঘনায়মান দৃশ্যপটকে মনে রেখে ‘সর্বগ্রাসী হে নাগিণী’র বিখ্যাত সূচনা-পঙ্‌ক্তি (সঙ্গত কারণেই তার প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে পরবর্তীতে বিবেচিত হয়েছে)। আবদুল মান্নান সৈয়দ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’-এর পরাবাস্তববাদী ভুবনে বিচরণ করে অসাধারণ সব লাইন লিখে গেলেন। এই এক কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে পরাবাস্তববাদ (ও ‘জীবন আমার বোন’-এর পাস্তেরনাক) আমাদের জাগরণের সাথী হয়ে গেল। আজও যখন পড়ি চমৎকৃত না হয়ে পারি না: ‘এই রাত্রিরা বেথেলহাম-কে ব্রথেলে পরিণত করে’; ‘সিংহের খাঁচায় বসে আমি গল্প লিখছি মনে মনে’; ‘দাও আমাকে সুযোগ বিশুদ্ধ পাগল কি বিশুদ্ধ মাতাল কি বিশুদ্ধ চরিত্রহীন কি বিশুদ্ধ ভালোমানুষের’; ‘খটখটে মাটির ভিতর উনিশ বছর আমি ছিপ ফেলে বসে আছি আত্মার সন্ধানে’; অথবা ‘পাপের ভিতর গোলাপ থাকে, এমনকি শব্দের পাপেও, কবিরা যেমন’। ১৯৬৯ সালে উত্তাল দেশের পরিস্থিতিতে তিনি যখন ভাবছেন তার নিজের জীবনের পরিণতি নিয়ে, তখনও স্বদেশ সকাল বেদনার্ত উঠে আসতে দেখতে পাই। ‘জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসায়’ তাকে বলতে শুনি এভাবে :

আমি দীপহীন অন্ধকার ঘরে একা
এরি মাঝখানে নিজের আগুনে জ্বালিয়েছি লণ্ঠন আমার,
এই শতাব্দীর সন্ধ্যাকালে।
এ আঁধারে দু-হাত পেয়ালা করে
তারা-জ্বলা পানি খাবো বলে নেমে যাবো ভীষণ জীবনে।
আমার নিজের তৈরি, নিজের আগুনে জ্বালা
লণ্ঠন কি সঙ্গে যাবে? লণ্ঠন কি সঙ্গে সঙ্গে যাবে?
চিৎকারে ছুটেছি একটি কালো ঘোড়া, পরে নিয়ে
মানুষের ছদ্মবেশ; দীপ্র, সান্দ্র আত্মা বিক্রি করে
জীবনের লঘু-গুরু প্রত্যেকটি দোকানে ফিরেছি,
শরীরে ধারণ করে একমাত্র লাশের প্রচ্ছদ।

আর ‘ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ’ পর্যায়ে এসে ভেঙে পড়বে পূর্বেকার সব মায়াবী আয়না। কালো ঘোড়া তখন উৎফুল্ল শাদা ঘোড়া হয়ে যাবে। তিনি বলে উঠবেন :

মন্বন্তর আমাকে এক জন্ম দিয়েছে
মহোত্থান আমাকে দ্বিতীয় জন্ম দিক
সমস্ত দৃশ্যচ্ছবি আমি ধরে ফেলি
কালো হাওয়া
সমস্ত শব্দমালা আমি ধরে ফেলি
লাল হাওয়া
আমি শূন্যে প্রোথিত হয়েও জাগ্রত রেখেছি আমার স্বপ্নের এ্যানটেনা
আমার হাত ফসকে শাদা একটি ঘোড়া বেরিয়ে গেছে প্রান্তরে
ফাল্কগ্দুনের এই দিন

সুবিদিত যে, ঐতিহাসিকভাবে পরাবাস্তবাদীদের মধ্যে দুই দল হয়ে গিয়েছিল। এক দল আন্দ্রে ব্রেতোর নেতৃত্বে ‘প্রগতিশীল’ রাজনীতির পথে পা বাড়িয়েছিলেন, ৪র্থ ইন্টারন্যাশনালের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন (এর বিনিময়ে ট্রটস্কি হাত দিয়েছিলেন ব্রেতো-রচিত সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টোর খসড়ার পরিমার্জনায়)। আরেক দল থেকে গিয়েছিলেন জাগরণবিমুখ স্ব্বপ্নের মায়াচ্ছন্নতায় (এদের কেউ কেউ ভিড়ে গিয়েছিলেন সালভাদর দালির ফ্যাসিবাদী ক্যাম্পে)। ষাটের শেষের দিকে এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এমনই বিভাজন হয়তো ঘটে থাকবে প্রথম ষাটের চন্দ্রাহত কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে। আদিতে পরাবাস্তববাদে আক্রান্ত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন সময়ের সাথে সাথে আরও সমাজমনস্ক থিমের মধ্যে ঢুকে গেছেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্য পরিবর্তনটা সাময়িক হলেও তার সমগ্র কাব্যচর্চার জন্য এটি যে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়-ফেরা, তা এখন বির্তকের ঊর্ধ্বে।

এক-অর্থে, ‘কণ্ঠস্ব্বর’-এর প্রথম সংখ্যার ম্যানিফেস্টো ধারার উচ্চারণ ও তৃতীয় সংখ্যার ম্যানিফেস্টো ধারার উচ্চারণের মধ্যে একটি বিপরীতমুখী ভাবের প্রকাশ দেখতে পাই। প্রথম ধারার উচ্চারণে ছিল শুধু শিল্প-তাড়িতদের কথা: ‘যারা সাহিত্যের ঘনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী’ তাদের মানবিক শৈল্পিক স্বীকৃতির প্রচ্ছন্ন তাগিদ ছিল সেই আহ্বানে। ‘কণ্ঠস্বর’ তৃতীয় সংখ্যায় পড়ি অন্যরকম (যদিও একটি আরেকটিকে অস্বীকার করে না) প্রেরণা :’যারা জীবনকে অনুভব করতে চান শত তলে, শত পথে, বিঘ্নিত রাস্তায়; আঙ্গিকের জটিলাক্ষরে, চিন্তার বিচিত্র সরণিতে; কটু স্বাদে ও লোনা আঘ্রাণে, সততায়, শ্রদ্ধদ্ধায়, বিস্ময়ে অভিভূতিতে ও পাপে; মহত্ত্বে ও রিরংসায়; উৎকণ্ঠায় ও আলিঙ্গনে’ সেই তরুণদের ডাক দেওয়া হবে সেখানে। এই পরিবর্তনটা ঘটেছিল সমাজ-রাজনীতির পালাবদলের হাত ধরেই। এক্ষেত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নিজের ব্যাখ্যা তাৎপর্যপূর্ণ :’ষাটের দশকের বিপুল সামষ্টিক উত্থান এবং গণজোয়ারের মুখে এই জাতির সমস্ত ব্যক্তিগত বিবেচনা যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল তখনও আমাদের ধারার লেখকদের ভেতর জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি ব্যক্তিক মনোভঙ্গি এবং অনিকেতের চেতনা নিবিড়ভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’কে আমি এর একটি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। ষাটের প্রায় প্রতিটি লেখকের লেখাতেই এই ব্যাপারটা কমবেশি ঘটেছে।’

এক হিসেবে, এটা বিতর্কাতীত বিষয় হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত বিবেচনা ও সামষ্টিক বোধ- এ দুইয়ের মধ্যে কোন অলঙ্ঘ্য দেয়াল কল্পনা করা যায় না। ফ্রয়েড ও মার্কস উভয়েই পুঁজিবাদকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন, যে রকম জাক লাকাঁ ও মিশেল ফুকো। ব্যক্তিগত বেদনা ও সামষ্টিক ক্ষোভ এদের প্রতিতুলনা চলতে পারে কেবল সীমিত অর্থে ও পরিসরে ঘোরতর স্তালিনবাদী না হলে সবাই স্বীকার করবেন যে, মান্দেলস্টাম (যিনি গুলাগ বন্দিশিবিরে প্রাণ হারিয়েছিলেন) ও মায়াকোভস্কি (যিনি বিপ্লবকে কবিতায় ধারণ করেছিলেন) উভয়েই জলে-পড়া পিঁপড়েদের ডাঙায় তুলতে চেয়েছিলেন। আখমাতভাকে কি এক পর্যায়ে ‘বুর্জোয়া ডেকাডেন্সের’ অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হয়নি? তাহলে বিশেষভাবে ষাটের প্রথম ভাগের কবি-সাহিত্যিকদের কেন অবক্ষয়বাদী বলে চিহ্নিত হতে হবে এবং নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে? এই প্রেক্ষিতে আমি শহীদ কাদরীর পালাবদলকে বাড়তি প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাই।

[ক্রমশ]

Original in সমকাল