বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৮৪

পূর্বে প্রকাশিতের পর
অর্থাৎ, নারী-পুরুষ, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সমান কর্মের জন্য অসমান পারিশ্রমিক সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে পরিগণিত হবে। এখানে এসডিজির ৫নং লক্ষ্যমাত্রা (Gender Equality) এবং ৮নং (Decent Work & Economic Growth)-এর সাদৃশ্য দৃশ্যমান।
বাহাত্তরের সংবিধানের অতিগুরুত্বপূর্ণ ২০নং ধারা নিয়ে আরও কয়েকটি কথা যোগ করা দরকার। ২০নং অনুচ্ছেদের ১নং ধারার ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্য অনুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’- এই নীতি কোন সূত্র থেকে আহরিত হয়েছিল? ইংরেজি পাঠে এই নীতিটিকে লেখা হয়েছিল এভাবে :
everyone shall be paid for his work on the basis of the principle ‘from each according to his abilities, to each according to his work’.

প্রত্যেকে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করতে সক্ষম হবেন এবং প্রত্যেকে যে যার কর্ম/শ্রম/অবদান (work/labour/contribution) অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবেন- এই বণ্টন নীতি এলো কোথা থেকে? এই বণ্টন-সূত্রের পেছনে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রভাব এসেছিল, সন্দেহ নেই। তার মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য, যা বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল পাশ্চাত্যের সমতাবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে নিবিড় যোগসূত্রে স্থাপিত করে। কথাটা কিছুটা ব্যাখ্যার দাবি করে।
যোগ্য/সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ ও কাজের পরিমাণ/গুণ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়াকে সমাজতান্ত্রিক বণ্টন নীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। এ নিয়ে বিতর্কাতীতভাবে ঐকমত্য বিরাজ করছে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি-তাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের মধ্যে। এবং এ বিষয়ে আলোচনা উঠলে প্রথমেই সবাই দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন কার্ল মার্কসের জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত রচনা ‘ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম’ লেখাটির প্রতি। ১৮৭৫ সালের এই লেখাটিতে মার্কস ভবিষ্যৎ সাম্যবাদী সমাজের দুই স্তরের প্রতি ইঙ্গিত করেন (পরবর্তীকালে, ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থের ৫ম অধ্যায়ে লেনিন ১৯১৭ সালে একে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্নেষণ করেন)। প্রথম বা নিচের স্তরে সমাজ যখন কেবল পুঁজিবাদের গর্ভ থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত হতে শুরু করেছে- তখন আয়-উপার্জনের প্রধানতম উৎস হবে শ্রম-সূত্রে প্রাপ্ত আয়। এই সমাজে আয়-বণ্টন নির্ধারিত হবে যথাসাধ্য সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এবং শ্রমের পরিমাণ ও গুণ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়ার নীতির মাধ্যমে। শ্রম বলতে এখানে শুধু কায়িক শ্রমের মজুরদের বোঝানো হচ্ছে না। এখানে মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের সঙ্গে জড়িত ‘হোয়াইট কলার’ শ্রমিক প্রাতিষ্ঠানিক তথা সেবা খাতের কারিগররাও অন্তর্ভুক্ত। সৃষ্টিশীল শ্রমের শিল্পীরাও এখানে রয়েছেন। এই প্রথম স্তরের সমাজটিকেই সাধারণত ‘সমাজতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ ধরনের সমাজেও আয়ের বণ্টনে অসমতা থাকবে, কেননা প্রত্যেকের কাজের সামর্থ্য, পরিমাণ ও কাজের গুণাবলি (উৎকর্ষতা, উপাদনশীলতা, দক্ষতা) সমান হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ ধরনের সমাজে শ্রমজনিত পার্থক্য সূত্রে যেটুকু আয়-বৈষম্য সৃষ্টি হয়, তা পুঁজিবাদী সমাজের আয়-বৈষম্যের চেয়ে অনেক কম হওয়ার কথা। এর কারণ, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রম ছাড়াও শুধু সম্পত্তির ওপরে মালিকানা-পার্থক্যের কারণেই অনেক আয়-বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে থাকে। উদাহরণত, অনেক বেশি জমি থাকার কারণে কোনোরূপ শ্রম না দিয়েও কেউ ওই জমিকে কেবল ভাড়া খাটিয়ে অনেক আয় করতে পারেন। যেটা একজন ভূমিহীন চাষির পক্ষ করা সম্ভব নয়; তার পক্ষে মজুরি-শ্রমের কাজে নিয়োজিত হয়েই কেবল উপার্জন করা সম্ভব। একই ভাবে, একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে নিয়মিত পরিশ্রম করেই আয়-উপার্জন করতে হয়। কিন্তু একাধিক গার্মেন্টস কারখানার মালিক যিনি তাকে হয়তো তার ফ্যাক্টরিতে কোনো শ্রম না দিয়েই বা সামান্য শ্রম দিয়েই শুধু মালিক হওয়ার কারণেই অনেক বেশি আয় করা সম্ভব। শুধু কৃষি জমি নয়, অন্যান্য সম্পদ ভাড়া খাটিয়েও-এবং তেমন কোনো প্রত্যক্ষ শ্রম বা তদারকি শ্রম না করেও- অনেক আয় উপার্জন করা সম্ভব, যাকে আমরা ‘ভাড়াজীবী আয়’ (Rentier Income) বলতে পারি। গত এক দশক আগে আমি একজনকে চিনতাম, যার ঢাকা শহরে ৬৫টির মতো ফ্ল্যাট ছিল। এখন হয়তো তার ফ্ল্যাটের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এসব ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে এবং তেমন কোনো প্রত্যক্ষ শ্রম করা ছাড়াই সেই লোক প্রতি মাসে অনেক আয় করে থাকে। আমাদের দেশে উচ্চ-মধ্যবিত্তদের মধ্যে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার বিষয়টি এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এক কথায়, ‘প্রোপার্টি ইনকাম’ আয়ের একটি প্রধান উৎস এ ধরনের সমাজে। তবে এখানে দুটো ফুটনোট রাখা দরকার। প্রথম ফুটনোটটি হলো, এমন কোনো ধারণা পোষণ করা উচিত নয় যে পুঁজির মালিক কেবলই ভাড়া খাটিয়ে বা অন্যকে দিয়ে মজুর খাটিয়েই আয়-উপার্জন করে থাকে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এদের একটা অংশকেই নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় নামতে হয় বা নতুন কোনো ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিকে অবলম্বন করতে হয়। এর জন্য তাকে সময় সময় ঝুঁকি নিতে হয়, যথেষ্ট উদ্ভাবনী শ্রমও ব্যয় করতে হয়- যাকে আমরা এক কথায় শিল্পোদ্যোক্তা  (entrepreneurship) ফ্যাক্টরের ‘অবদান’ বলতে পারি। মার্কসও এটা প্রকান্তরে স্বীকার করে গেছেন নতুন প্রযুক্তি ও নতুন প্রোডাক্টের উদ্ভাবনের মাধ্যমে সাময়িককালের জন্য হলেও ‘surplus profit’ আহরণের সম্ভাবনা প্রত্যক্ষ করে।
দ্বিতীয় ফুটনোটটি হলো- এরকম ধারণা আঁকড়ে ধরে রাখা উচিত নয় যে, সমাজতন্ত্রের নাগরিকেরা শুধু আয় করতে পারবেন কাজ করারই সুবাদে। শ্রমবহির্ভূত অন্যবিধ আয়েরও সুযোগ রয়েছে তাদের।Democratic Propertied Income স্কুলের চিন্তকেরা এরকম প্রস্তাব দিয়েছেন যে, সামাজিক মালিকানার অংশ হিসেবে প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানার capital stock থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘ডিভিডেন্ড আয়’ লাভ করতে পারবেন। আর সমবায়ী মালিকানার ক্ষেত্রে প্রতিটি সমবায়ের সদস্য তার সমবায়ের পুঁজি খাটানো বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘ডিভিডেন্ড আয়’ লাভ করতে পারবেন। মার্কেট সোশ্যালিজমের প্রবক্তা জন রোমার  (Roemer) যে ‘কুপন সোশ্যালিজম’-এর প্রস্তাব করেছিলেন তা ডেমোক্রেটিক propertied income-এরই একটি নির্দিষ্ট সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। এসব চিন্তা শুধু ইউটোপিয়ান জল্পনা-কল্পনা নয়। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরে যখন শিল্পায়নের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা নিয়ে প্রবল জনঅসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, তখন ২০০৮ সালের দিকে ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় বেশ কিছু খ্যাতনামা বাঙালি অর্থনীতিবিদ একত্রে একটি রচনায় প্রস্তাব রেখেছিলেন যে, এই উদ্যোগের ফলে যারা জমি হারাবেন তাদেরকে তাদের জমিতে স্থাপিত কল-কারখানার ‘ইকুইটি-মূলধনের’ অংশীদার করা হোক। তাতে করে তারা (এবং তাদের উত্তর পুরুষেরা) সেই ইকুইটি মূলধনের ওপরে ‘মালিকানা বাবদ’ নির্দিষ্ট পরিমাণে ডিভিডেন্ড ইনকাম পাবেন। পরবর্তীকালে, একই ধরনের প্রস্তাব রেখেছেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের জন্য। পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের মজুরি এমনিতেই বেশি নয়, তার কারণ এই শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হয়। যার জন্য প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুরি দেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। এই অবস্থার কিছুটা নিরসন ঘটে যদি উপরোক্ত শিল্পসমূহে ইকুইটির অংশীদারে পরিণত করা যায় ওই নারী শ্রমিকদের। এর ফলে তাদের আয়ের দ্বিবিধ উৎস হতে পারে শ্রম সূত্রে প্রাপ্ত আয় ও শ্রমবহির্ভূত ইকুইটি সূত্রে মালিকানা বাবদ প্রাপ্ত আয়। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে শ্রম-অনুযায়ী পারিশ্রমিকের পাশাপাশি পুঁজির মালিকানার অংশীদার হিসেবে ডিভিডেন্ড ইনকামের লাভের সুযোগ যৌক্তিকভাবেই নিহিত হয়েছিল। Democratic Propertied Income-এর ধারণা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হচ্ছে টমাস পিকেটি, এন্থনি এটকিনসন প্রমুখের লেখায়। আজকে যে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (UBI)-এর ধারণা জোরেশোরে সর্বত্র স্বীকৃত হচ্ছে তারও পেছনে রয়েছে সমাজের নাগরিক হিসেবে Social Product-এর অংশীদার হিসেবে প্রত্যেকেরই নূ্যনতম আয় পাওয়ার অধিকারের দাবি। UBI সকলই পাবেন- তা তিনি শ্রম করুন বা নাই করুন। UBI-এর মতো সর্বজনীন চিকিৎসা ব্যবস্থা, সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা, উন্নত মানের ও সুলভ মূল্যের গণপরিবহন ব্যবস্থা শ্রম সূত্রের বাইরে প্রাপ্তব্য আয়ের উদাহরণ মাত্র। এসব উদাহরণ শুধু গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ‘নাগরিক’ হওয়ার জন্য বাড়তি আয় উপার্জনের (বা ব্যয় সাশ্রয়ের) সুবিধা পাওয়ার অধিকারবোধকে ইঙ্গিত করে। এ ধরনের সুবিধার যতই সম্প্রসারণ হচ্ছে ততই যেন এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে যে, মানুষকে শুধু শ্রমিক হিসেবে দেখার আগে তাকে প্রথমে ‘পূর্ণ অধিকার বিশিষ্ট নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। UBI, সর্বজনীন চিকিৎসা, সর্বজনীন শিক্ষা, সর্বজনীন সুরক্ষা, সর্বজনীন গণপরিবহন ব্যবস্থা ইত্যাদি সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি শ্রমের পরিমাণ ও গুণের ওপর নির্ভর না করে মানুষের ‘চাহিদার’ ওপরে নির্ভর করবে। এছাড়াও আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম ও বিনোদনের অবকাশ পাওয়ার অধিকারের কথা। এক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ ও শ্রম অনুযায়ী বণ্টনের ব্যবস্থা থেকে ইতোমধ্যেই বর্তমান বিশ্ব ‘সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ ও চাহিদা অনুযায়ী বণ্টনের’ ব্যবস্থার দিকে চলা শুরু করেছে। এই উত্তরণ সবচেয়ে বেশি সার্থক হয় যখন (ক) সমাজ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উচ্চস্তরে পৌঁছায় এবং যখন (খ) সমাজে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সর্বস্তরে সম্প্রসারিত হতে থাকে। এই স্তরকেই মার্কস নতুন সমাজের দ্বিতীয় ও উচ্চতম স্তর তথা সাম্যবাদী সমাজ বলেছেন। Ability/Labour স্তর থেকে Ability/Need স্তরে সমাজের এই ক্রমান্বয় কিন্তু অবধারিত বিকাশকে স্বীকার করে নিয়েই বাহাত্তরের সংবিধানের ১০নং অনুচ্ছেদের Just and egalitarian socity
এবং ২০ নং অনুচ্ছেদের Principle ‘from each acording to his abilities to each acording to his work’ এর বিধান সংযোজিত হয়েছে- এটা মনে রাখতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত অর্থনৈতিক দর্শনের প্রেক্ষিতে দুটো অভিযোগের কথা তুলতে চাই। একটি অভিযোগ বেশি শোনা যায় ‘বামপন্থী’ অবস্থান থেকে; আরেকটি অভিযোগ বেশি শোনা যায় ‘ডানপন্থী’ অবস্থান থেকে। ‘বামপন্থী’ অভিযোগের মর্মার্থ হলো, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত ১৫নং ধারার ‘মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা’, ১৭নং ধারার ‘অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা’, ১৮নং ধারার ‘জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা’, ১৯নং ধারার ‘সুযোগের সমতা’ এবং ২০নং ধারার ‘কর্মের অধিকার ও সম্মান’ এসবই সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূলনীতি’র অধ্যায়ে সন্নিবেশিত কেবল। এইসব ‘ভালো ভালো’ কথাগুলো সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ অধ্যায়ে স্থান পায়নি। তাদের যুক্তি হচ্ছে, মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে স্থান পেলে এসবের বাস্তবায়নের পেছনে রাষ্ট্রের সচেষ্ট দায়বদ্ধতা থাকত। বঙ্গবন্ধু (ও তার নিকটতম সহকর্মীরা) এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। পাল্টা যুক্তি তারা দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালেই- গণপরিষদে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন। তাদের যুক্তি ছিল, ‘মৌলিক অধিকার’ অধ্যায়ে যেসব অধিকার দেওয়া আছে সেগুলোর আশু বাস্তবায়ন না ঘটলে বা ব্যত্যয় ঘটলে তার জন্য নাগরিকেরা অবিলম্বে কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদি সুবিধা সকলের জন্য আশু-ভিত্তিতে রাষ্ট্রের পক্ষে নিশ্চিত করার সম্ভব নয় বলেই এসব উন্নয়ন-ধারাকে রাষ্ট্রের ‘মৌলিক নীতিমালার’ ভেতরে রাখা হয়েছে ‘ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নযোগ্য অধিকার’ হিসেবে, বা যাকে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান ওসমানী বলেছেন- ‘progressively realizable rights’। প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সাথে সাথে রাষ্ট্রের ব্যয় বরাদ্দের সক্ষমতা বাড়তে থাকলে এসব অধ্যায়কে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করা সহজতর হবে।
এবারে আসি ‘ডানপন্থী’ অভিযোগের বিষয়ে। ইতোপূর্বে আমি বলেছি, বঙ্গবন্ধু তার ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’কে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানার দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করতে চাননি। এরিক ওলিন রাইট (wright) দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানা ভিত্তিক ব্যবস্থা হচ্ছে একটি রাষ্ট্রতন্ত্র (statism)-এটি সমাজতন্ত্র নয়। সমাজতন্ত্রের মূল সারবস্তু হচ্ছে সমাজ ও সমাজের স্বার্থে অর্থনীতি পরিচালনা করা-সেখানে সমাজই মুখ্য। রাষ্ট্র মুখ্য নয়। এ চিন্তা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ভাবনার বিরুদ্ধে সমাজনির্ভর ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয় (যেটি রবীন্দ্রনাথের ‘আত্মশক্তি’ পর্বের চিন্তাতেও দেখতে পাই)। [ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s