বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৭

পূর্বে প্রকাশিতের পর
কেননা, ‘ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি’ আইন, দর্শন ও রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি বহুল-অধীত ধারণা। সুযোগ কী ও কত প্রকারের, কোন সুযোগগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সে কারণেই (সম্পদ কম থাকলে) কোন সুযোগগুলোর ক্ষেত্রে সমতা বিধান সর্বাগ্রে করা উচিত এ নিয়ে পলিটিক্যাল ও মরাল ফিলোসফারদের মধ্যে বেশ খানিকটা মতানৈক্য রয়েছে। আইনী বা আনুষ্ঠানিক সমতা  (Formal equality of opportunity) বনাম বাস্তবিক সমতা  (Substantive equality of opportunity) বা ন্যায়সঙ্গত সমতা  (Fair equality of opportunity), সুযোগের সমতা (equality of opportunity) বনাম সামর্থ্যের সমতা (capability) ইত্যাদি ভেদজ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। নৈয়ায়িক বা ন্যায়বাদী দর্শনে এসব মতপার্থক্যের ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সেসব আলোচনার বা টেক্সটের পূর্ব-ঐতিহ্য বাংলায় ইতোপূর্বে না থাকায় শুধু ‘সুযোগের সমতা’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে সাংবিধানিক (বা আইনি) লক্ষ্য পূরিত হবার নয়। এ জন্যেই আলোচনার জন্য ইংরেজি ও বাংলা পাঠ উভয়ের ওপরেই নির্ভর করেছি। কোন কনসেপ্টের গুরুত্ব মীমাংসা করার জন্য ইংরেজি পাঠের আশ্রয় নিয়েছি, যদিও উদ্ৃব্দতিগুলো থাকছে মূলত বাংলা পাঠ থেকে। আমার আশা যে, এই দ্বি-ভাষিক পাঠের মধ্য দিয়ে ভাবনার অনুবাদ-কর্ম সহজতর হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূল নীতি’ (Fundamental Principles of State Policy) অধ্যায়ে সমাজতন্ত্রকে শুধু একটি মৌলিক আদর্শ হিসেবেই গ্রহণ করা হয়নি। এর সংজ্ঞা সরাসরি কোনো ‘মার্কসীয় টেক্সট’ থেকেই গেছে বলে মনে হয়। নতুন সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে ‘শোষণমুক্তি’ এবং এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’। সংবিধানের ১০নং ধারায় লেখা ছিল : ‘মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ এখানে ‘সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ বলতে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝানো হয়নি। তবে রাষ্ট্রীয় খাতের যে বড় একটি অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকবে, সেটা ছিল স্পষ্ট। উন্নয়নের পথে রাষ্ট্রের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একথা একমাত্র চরম খোলা-বাজার অনুসারী Libertarianরা ছাড়া সকলেই কমবেশি স্বীকার করে থাকেন। অনগ্রসর এলাকা, পিছিয়ে পড়া মানুষ ও জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করার জন্য রাষ্ট্রের হাত-বাড়ানো প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও অনুপস্থিতি যে যে ক্ষেত্রে প্রকট- যেমন জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে- সেখানে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হয়। বাজারমুখীন বিনিয়োগ কর্মকাণ্ড, যেখানে ঋণাত্মক উপচেপড়া প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে (negative externalities and spillovers) সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়। পরিবেশ-দূষণ এবং পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে জনস্বার্থের রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, যা কোনো একক বা সমবেত ব্যক্তি খাতের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু উদ্যোগ ও নেতৃত্ব আসতে হবে রাষ্ট্রের তরফ থেকেই। এসবের বাইরেও ১৯৭২ সালের পটভূমিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে আরও কিছু বাড়তি দায়িত্ব ও চাপ নিতে হয়েছিল।
প্রথমত, বঙ্গবন্ধু ও তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিকাশ চেয়েছিলেন। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ১৯৭২ সালে সংসদে সংবিধান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কল্যাণ রাষ্ট্রে’র কল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বড় কথা হলো জনকল্যাণ। এই রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র রূপে যাতে গড়তে পারি, সেই লক্ষ্য স্থির রেখে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।’ জনকল্যাণের জন্য ব্যয় নির্বাহের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকুলান। একটি অবিকশিত কর-রাজস্ব সিস্টেমের মাধ্যমে তা সেদিন অর্জন করা সম্ভব ছিল না। এর জন্য যেমন দরকার হয়ে পড়েছিল ‘নন-মার্কেট’ পন্থায় সম্পদের আহরণ, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষ ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘বাণিজ্যিক’ ভিত্তিতে গড়ে তোলা ও সেসব কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারিত করা। নন-মার্কেট পন্থায় সম্পদ আহরণের উদাহরণ হিসেবে স্বেচ্ছাশ্রম-ভিত্তিক নদী-পুকুর-খাল খনন, রাস্তা-ঘাট মেরামত ও নির্মাণ প্রভৃতি স্থানীয় উদ্যোগের কথা এখানে স্মরণ করা যায়। এই ডাক ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন বিভিন্ন জনসভায়। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে ‘বাণিজ্যিক ভিত্তিতে’ পরিচালনা করার গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধ হয়েছিল সেদিন। এর পূর্বাপর ঐতিহাসিক উদাহরণ তৎকালীন নেতৃত্বের সামনেই ছিল। ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পে’ তুলনামূলকভাবে পুঁজির পরিমাণ লাগে বেশি। আর এসব খাতে টার্নওভার রেট কম- মুনাফা আসে অনেক দেরি করে- ফলে এসব খাতে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের পুঁজিপতিরা উৎসাহিত হয় না। এক্ষেত্রে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশের উদাহরণ তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাছাড়া সোভিয়েতসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ‘সংস্কারও’ তারা দেখেছিলেন (কোসিগিনের রিফর্মের কথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংসদে তুলেছিলেন)।
দ্বিতীয়ত, ‘মৌলিক ও ভারী শিল্পের’ কারণ ছাড়াও সেকালের ব্যক্তি-পুঁজিবাদী খাতের দুর্বলতাও তারা বিবেচনায় নিয়েছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে পেছনে থেকে আর্থিক বা নৈতিক সহায়তা দানে সক্ষম বাঙালি পুঁজিবাদীদের সংখ্যা ষাটের দশকে ছিল অত্যন্ত নগণ্য। যারা ছিলেন, তাদের বেশির ভাগেরই মিল-কলকারখানা চালানোর মতো অভিজ্ঞতা বা অবিসংবাদিত দক্ষতা ছিল না। আর যাদের কিছুটা দক্ষতা ছিল, তাদের মধ্যে হিন্দু-বাঙালি পুঁজিবাদীদের অংশটি (যেমন ঢাকেশ্বরী কটন মিলের সুনীল কুমার বোস) প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের বৈরী পরিবেশে। বিশেষত ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনের কারণে এদের অনেকেই অন্যত্র পুঁজি স্থানান্তরিত করতে থাকেন। সুনীল বোসকে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর গ্রেপ্তার করা হয় এবং কেবল ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরই তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে মুক্তি পান। এভাবে পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে ধনিক বাঙালি ‘শিল্প বুর্জোয়া’ বসু-পরিবার স্বাধীনতার পরে শিল্প খাত থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন ও কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। আর.পি. সাহার মতো যারা মাঝারিমানের ব্যবসায়ী পূর্ব বাংলায় রয়ে গিয়েছিলেন, তারা পূর্বাপর শিল্প খাতের সঙ্গে তেমনভাবে জড়িত ছিলেন না। ফলে, চাইলেও ১৯৭২ সালে বড় কোনো শিল্পোদ্যোগে এগিয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। অন্যদিকে ১৯৩৭-৪৬ পর্বে বাংলার শাসনভার মুসলিম লীগ সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম শিল্প-পুঁজির তেমন কোনো বিকাশ ঘটেনি। বস্তুত ১৯৪৭-৭১ সময় পর্বে পাকিস্তান হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় তেমনভাবে বাঙালি মুসলিম শিল্প পুঁজির বিকাশ হয়নি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে রাজনৈতিক আনুকূল্যে ও ইপিআইডিসির সহায়তায়- বিশেষ করে পাট ও বস্ত্র খাতে- কিছু বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন কল-কারখানা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। রুশ গবেষক সের্গেই বারানভ ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় থেকে এই ধারার শিল্পোদ্যোক্তাদের ওপরে একটি সমীক্ষা চালান। তার হিসেবে মাঝারি বৃহৎ শিল্প খাতে বাঙালি মুসলিম মালিকানাধীন বিজনেস গ্রুপের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬। চট্টগ্রামের একে খান গ্রুপ ছাড়া সারা পাকিস্তানের পর্যায়ে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা এদের কারোরই ছিল না। এদের অধিকাংশই সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধিকার সংগ্রামে প্রবলভাবে দাঁড়াননি বা দাঁড়াতে পারেননি (কেউ কেউ সরাসরি বিরোধিতাও করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কালে)। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রস্তুতের সময় আওয়ামী লীগের ভেতরে বাঙালি শিল্পপতির সমর্থক কোনো লবির প্রবল অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মূলত ‘মধ্যস্তরের’ দল হিসেবেই পরিচিত ছিল। ক্ষমতায় আসতে পারে ভেবে যেসব (উঠতি) ধনিকেরা জাতীয়তাবাদী ধারাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে তাদের ভূমিকা আরও প্রশ্নকীর্ণ হয়ে পড়ে। অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তা গোষ্ঠীর প্রায় সবাই এদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এদের অনেকেরই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় এলাকাতেই কল-কারখানা ছিল। তাদের ফেলে যাওয়া সেই মিলগুলোই ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এক হিসেবে, তা ছিল ১৯৭২ সালের মোট রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতের ৬০ শতাংশ পরিসম্পদের সমান।
তৃতীয়ত, অবাঙালি মালিকানাধীন ‘পরিত্যক্ত শিল্প খাত’ ও বাঙালি মালিকানাধীন ‘দুর্বল’ শিল্প খাত- এ দুটিই একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল না বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিশ্রুত শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত খাত গড়ে তোলার পেছনে। বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীরা পাকিস্তানের তুলনায় এক ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের মতো বাংলাদেশেও বৃহৎ শিল্প-বুর্জোয়া বা কার্টেল-মনোপলি গড়ে উঠুক তা তারা কখনোই মনে-প্রাণে চাননি। এরকম মনোপলি পুঁজির প্রভাব বাড়তে থাকায় পূর্ব বাংলার উন্নয়ন কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তা তারা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রের পৌনঃপুনিক লঙ্ঘনের পেছনে এই বাইশ পরিবারের পরোক্ষ প্রভাব কার্যকর ছিল পূর্বাপর। এসবও তারা তাদের অভিজ্ঞতার বলেই জানতেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সে পথেই আবার গড়াক সেটি তারা চাননি। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য বিরাজ করেছিল সেদিন। অর্থাৎ উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রধান খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপরে বিশেষ জোর দেওয়ার পেছনে ‘বাইশ পরিবার বিরোধিতা’ ছিল একটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ। আমার মতে, প্রধানতম কারণ। বঙ্গবন্ধু তার নানা বক্তৃতায় বিষয়টি উল্লেখ করেছেন- কী স্বাধীনতার আগে, কী স্বাধীনতার পরে। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকায় এক ভাষণে শেখ মুজিব বলেন :’২২ বছরের ইতিহাস, খুনের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস মীর জাফরের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস, খুবই করুণ ইতিহাস। ইতিহাস গৃহহারা সর্বহারার আর্তনাদের ইতিহাস… ২২ বছর কেটে গেল আমরা জীবন যৌবন ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি কিন্তু পেলাম কি আজ আমরা। আজকে দেশের মধ্যে গ্রামে গ্রামে হাহাকার। … আজকে ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়েছে। গরিব দিন দিন গরিব হয়ে গেছে। বড়লোক দিন দিন বড়লোক হয়ে যাচ্ছে।’ এর ঠিক দুই বছর পরে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় ‘জাতীয়করণ’ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অবধারিতভাবে উঠে এলো বাইশ পরিবারের কথা :
‘শ্রমিকেরা সারা জীবন শিল্প-কারখানা, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন। এগুলো জাতীয়তকরণের অর্থ হলো শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দেওয়া। আমরা শোষণের চাবিকাঠি ধ্বংস করে দিয়েছি। আপনারা জানেন, পশ্চিমাদের হাতে যে সমস্ত কল-কারখানা ছিল তার সব টাকা তারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। … আমি এখানে আজ আর একটা কথা ঘোষণা করেছি। সরকার যেসব কারখানা জাতীয়করণ করেছেন, এখন থেকে সেগুলোর প্রত্যেকটির ম্যানেজমেন্ট বোর্ডে দুইজন করে সদস্য থাকবেন এবং শ্রমিকরা নির্বাচনের মাধ্যমে এই সদস্যদের বোর্ডে পাঠাবেন। এ ছাড়া বোর্ডে সরকারের এবং ব্যাংকের পক্ষ থেকে তিনজন সদস্য থাকবেন এবং এই পাঁচজন বসে কারখানা চালাবেন। যাই আর হোক না কেন, আদমজী, দাউদ বা আমিনের পকেটে যাবে না।’ শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, বাইশ পরিবারের মতো একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ রুদ্ধ করার জন্য রাষ্ট্রের শক্ত ভূমিকা এবং বৃহৎ শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা পূর্ণভাবে টিকে থাকতে সক্ষম এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথা নানা প্রান্ত থেকেই বলা হচ্ছিল। কেউ বলছিলেন ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ যুক্তি দিয়েছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে :’আজ আমাদের দেশে, অর্থাৎ সাবেক পাকিস্তানে যে সমস্যা ছিল, তা দূর করার জন্য যদি মহানবীর বাণীর শত ভাগের এক ভাগও মেনে নিত, তাহলে কুখ্যাত আদমজি, দাউদ, ইস্পাহানির মতো লোক এ দেশে জন্মলাভ করতে পারত না।’ কেউ আবার যুক্তি দিয়েছেন ইতিহাসের নিকট অভিজ্ঞতা থেকে। ড. কামাল হোসেন পরবর্তীকালে লিখেছেন এ প্রসঙ্গে :’The vision of an independent Bangladesh which had inspirad the freedon fighter, was of a society which would be free from exploitation. They were quite clear that having freed themselves from the infamous ‘22 families’ of Pakistan, they were not going to create ‘22 families’ to take their place in Bangladesh.’

[ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s