বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: বাহাত্তরের সংবিধান ও সমতামুখী সমাজের আকাঙ্ক্ষা

পর্ব ::৭৬
পূর্বে প্রকাশিতের পর
এই কথাগুলো কিছুটা নির্দয় বিচারই বলে ঠেকবে- বিশেষত যদি আমরা সংবিধান নিয়ে ১৯৭২ সালের গণপরিষদেও নানা আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ককে সামগ্রিকভাবে মাথায় রাখি। কোনো প্রকার আন্তরিকতা বা আত্যন্তিক তাগিদ ছাড়াই শুধু নির্বাচনী জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতন্ত্রের হাত ধরে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছিল, এটা বিশ্বাস করা শক্ত। প্রথমত, জনসমর্থন আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রচার করা দোষের কিছু নয়। মানুষ এরকম আদর্শ সমর্থন করে কিনা তা যাচাই করার একটা বড় মাধ্যমই হচ্ছে নির্বাচন। দ্বিতীয়ত, সেদিনের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাদের অভিপ্রায় প্রকাশে আন্তরিক ছিলেন না- একে নিছক লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত বলে মনে হতে পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃত্বে বিশেষত বঙ্গবন্ধুর মধ্যে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছিল। যার চিহ্ন বিভিন্ন দলিলপত্রের আলোচনার মধ্য দিয়ে ইতোপূর্বেই আমরা দেখেছি। ‘সত্তরের নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রের কথা বলে’- লেখকের এই বিচারটিও তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। এবং সবশেষে, একটা রক্ষণশীল সমাজে- যেখানে ধর্মের আড়ালে সংস্কারের প্রভাব প্রবল, সেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বললে কৃষক-মধ্যবিত্ত সমাজের ভোট বেশি করে পাওয়া যাবে, এটাও তর্কসাপেক্ষ অনুমান। রক্ষণশীলতার এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সমাজে এখনও কাটেনি, তখনও ছিল। তার পরও জনগণের সামনে এনলাইটেনমেন্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবন ‘সমাজতন্ত্র’ তথা সামাজিক ন্যায়ের আইডিয়া তুলে ধরতে গিয়ে ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দ্বিধাগ্রস্ত হননি। আধুনিক রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়ের ধারণাকে তাঁরা কোনো প্রাগ-আধুনিক ঐতিহ্যগত চিন্তার সাথে জোর করে মেলাতে বা মেশাতে চাননি। সেরকম চেষ্টা তাদের চোখের সামনেই ছিল- ‘গান্ধীবাদী’ সমাজতন্ত্র, ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’, ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’ বিভিন্ন ধারা ষাটের দশকে চলমান ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনচেতনা ও ঐতিহ্যের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু ঐতিহ্য-রক্ষার নামে সমাজতন্ত্রের ঐতিহ্য-নিরপেক্ষ প্রগতিবাদী ধারণাকে তাঁরা অবমূল্যায়িত করতে চাননি। দুধে জল মিশিয়ে তাকে গ্রহণযোগ্য মোড়কে বিক্রি করতে চাননি- নির্বাচনে জয়লাভের জন্য হলেও। তাঁদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। ফলে, পাকিস্তানের পরিবেশে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জনগণকে কাছে টানার জন্য আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা বলে থাকবে, নইলে তারা বামপন্থি দলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে পারত, অধ্যাপক চৌধুরীর এই মীমাংসাও যুক্তিসিদ্ধ ঠেকে না। প্রথমত, যেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বলে ‘নাস্তিক’ বলে অভিহিত হওয়ার বরং আশঙ্কা আছে, সে রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কেবল জনসমর্থনের তাগিদে শব্দটি প্রচার করেছিল- এই যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, ১৯৭০ সালের প্রেক্ষিতে জনতুষ্টিবাদের যুক্তিও দুর্বল, কেননা সমাজতন্ত্র তখনও গণদাবি হয়ে ওঠেনি। আর বামপন্থি দলের তরফ থেকে প্রতিযোগিতার ভয়? সেটাও আজ কষ্টকল্পনা বলে মনে হয়। বিশেষত যদি মনে রাখি যে, সত্তরের নির্বাচন বয়কট করেছিল বামপন্থি বলে দাবিদার পিকিংপন্থি ভাসানী ন্যাপ। এটি ছিল মাওলানা ভাসানীর সবচেয়ে বড় এক রাজনৈতিক ভুল- ‘স্ট্রাটেজিক ব্লান্ডার’। যদিও কমরেড হায়দার আকবর খান রনো তাঁর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একে ভাসানীর ‘ওয়াক অভার’ দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এমনও হতে পারে যে, পরবর্তী সময়ে (নব্বই বা তৎপরবর্তী) আওয়ামী লীগের ‘বুর্জোয়া’ রূপান্তর দেখে লেখক তার বিরুদ্ধ সমালোচনাকে প্রোথিত করেছেন অতীতে- ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগকে বিচার করার ক্ষেত্রে বা সংবিধানে বিধৃত গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের Authenticity যাচাই করার ক্ষেত্রে। এই সূত্রে বলে রাখি, সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমাকে একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন যে, বাহাত্তরের সংবিধানের বেশকিছু ন্যায়সংগত বামপন্থি সমালোচনা সত্ত্বেও- এবং ১৯৭২-৭৫ পর্বে বাস্তবে গৃহীত কর্মসূচির তর্কাতীত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও- সমাজতন্ত্র তথা চার আদর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার নিকটতম সহকর্মীদের আন্তরিক অভিপ্রায় নিয়ে অন্তত তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তাঁর মনে এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কমরেড সেলিম ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকাকে স্বীকার করেন, তবে ব্যক্তিকে তার দল থেকে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না- সেটিও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, তৃতীয় বিশ্বের একটি অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য সাময়িক কালের জন্য ‘একদল’ করতেই হবে, সব সমাজতন্ত্র-অভিমুখীন দেশকেই গণতন্ত্রের প্রচলিত পথ ছাড়তেই হবে- এটা আদৌ আবশ্যক নয়। আবার একদল করলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে- ব্যাপারটা তেমনও নয়। ১৯৭২-৭৫ সালে সিপিবির অভিমতও ছিল তাই। সোভিয়েত ও অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম পার্টিও সেই বার্তাই দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে- তিনি এটাও আমাকে জানিয়েছেন। মোট কথা, সমাজতন্ত্র অভিমুখে দীর্ঘ পথ চলায় বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক অভিপ্রায় ও আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় ছিল না সেদিনের বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বা বামপন্থি ন্যাপ-সিপিবি মহলে (সেদিনের গণচীন, যেটি তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি বা তার স্থানীয় সমর্থক গোষ্ঠীদের কথা অবশ্য স্বতন্ত্র)। পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা বাহাত্তরের সংবিধানের সমতামুখী সমাজের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিশেষ ধারার প্রতি মনোযোগ দেব। এই ধারাগুলোর ঘনিষ্ঠ বিচার করলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমৃদ্ধ ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ধারা সম্পর্কে তাত্ত্বিক সংশয়ের আর কোনো অবকাশ থাকে না। আজকের বাংলাদেশ যদি বঙ্গবন্ধুর সেদিনের তাত্ত্বিক উপলব্ধিতে ফিরে যেতে পারে, তবে সেটা হবে একটি বড় পাওয়া।
৯. গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারা ও উপধারা
Lost in Translation বলে একটা কথা ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত আছে। তর্জমায় অনেক ক্ষেত্রে মূল পাঠের অর্থই হারিয়ে যায়। যারা বিদেশি ভাষা থেকে কবিতা অনুবাদের কাজে জড়িত, তারা ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেন। তারপরও আমরা অনুবাদের কাজে ব্যাপৃত হই। সেটা শুধু কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত আমরা ‘অনুবাদ’ করে চলেছি- কখনও নিজের কথা অন্যকে বোঝানোর জন্যে, কখনও অন্যের কথা নিজের বোধের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য। সাম্রাজ্যবাদ যখন উপনিবেশে আসে, তখন সে তার ভাষা-সংস্কৃতিকে যথাসাধ্য ‘অনুবাদ’ করে স্থানীয় অধিবাসীকে তার শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে তৎপর হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এখনও এই অনুবাদ প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের বৈঠকে, এইড গ্রুপ কনসালটেশনে, প্রবাসে কর্মসংস্থানের দেন-দরবারে প্রতিপক্ষ বুঝে আমাদের ‘অনুবাদ’ করে যেতে হয়, যাতে করে দাতা ও গৃহীতা পরস্পরকে বুঝতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা একেকজন জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে অনুবাদ-কর্মে নিয়োজিত। আমরা পারস্পরিক ‘সম্পর্কের অনুবাদ’ করে চলি নিজস্ব মূল্যবোধের কাঠামোয়। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য যেটা প্রাসঙ্গিক তা হলো বাহাত্তরের সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক। সুবিদিত যে, সংবিধানটির বাংলা পাঠই আদর্শ পাঠ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং বাংলা সংস্করণই ‘খসড়া’ হিসেবে গণপরিষদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানটি আদিতে আসলে বাংলায় লিখিত হয়নি। এটি প্রথমে ইংরেজিতে লিখিত হয় এবং তারপরেই কেবল বাংলায় তর্জমা করা হয়। তর্জমার পর বাংলা পাঠকেই ‘আদর্শ পাঠ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং এ সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি কোনো ধারা বা উপধারা বোঝার বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা, বিভ্রান্তি বা ‘কনফিউশন’ দেখা দেয়, তবে বাংলা পাঠকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা হবে। এ নিয়ে ড. আনিসুজ্জামান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন :
‘ড. কামাল হোসেন এজেন্ডা পাঠালেন :বাংলাদেশের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি খসড়া তৈরি করবেন ইংরেজিতে, আমাকে তার বাংলা করে দিতে হবে, শেষ পর্যন্ত বাংলাটাই গৃহীত হবে প্রামাণ্য ভাষ্য বলে। বললাম, একা পারব না, একটা দল চাই। তিনি বললেন, আপনি লোক বেছে নিন।’
আগেই বলেছি তর্জমার দলে আরও ছিলেন কবি ও অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এবং ড. মযহারুল ইসলাম। সংবিধান তর্জমা করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আনিসুজ্জামান বর্ণনা করেছেন এভাবে :’মনে পড়ে, আইনমন্ত্রীর দপ্তরে এক দুপুরে কামাল আর আমি মুখোমুখি বসে। প্যাডের কাগজে খসখস করে কামাল লিখতে শুরু করলেন সংবিধানের প্রস্তাবনা। এক স্লিপ লেখা হলে সাদা কাগজের সঙ্গে সেটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম। একটা অনাস্বাদিত শিহরণ জাগল দেহে-মনে :এই আমার স্বাধীন দেশ, তার সংবিধান-রচনার কাজে হাত দিয়েছি। কামালকে বললাম, অনুবাদটা মাজাঘষা করতে হবে, বাড়ি নিয়ে যাই। তিনি বললেন, মূলটারও কিছু উন্নতি ঘটাতে হবে, কাল আবার বসব একসঙ্গে। …সংবিধানের কাজে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে পনেরো দিন আমি ঢাকায় থেকেছি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে… গণপরিষদ-ভবনে- পরে যা রূপান্তরিত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে- আমাকে একটা কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেখানেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেটেছে। কখনও বেশি রাত হয়ে গেলে কামালের বাড়ির বসার ঘরে শুয়ে বাকি রাত যাপন করেছি। সকালে সে বাড়িতেই নাশতা করে দ্রুত চলে এসেছি গণপরিষদে।’
এক অর্থে, সংবিধানের খসড়া দুটো ভিন্ন ভাষায় সমান্তরালভাবে তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু, সন্দেহ নেই, আগে ইংরেজি টেক্সট তৈরি হয়েছিল, পরে এর বাংলা তর্জমা হচ্ছিল। এ জন্যেই বাংলা পাঠকে আইনত শিরোধার্য করলেও মূল কনসেপ্ট এবং বর্ণনাগুলো যেহেতু ইংরেজিতে হচ্ছিল, এর ইংরেজি পাঠের ওপরেই সাংবিধানিক-আইনি ও দার্শনিক ‘মর্মার্থ’ অনুধাবনের জন্য জোর দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। আমার বলার কথা হলো, সংবিধানের বাংলা পাঠ তখনই সারগর্ভ পাঠ হয়ে ওঠে, যখন আমরা এর মূল ইংরেজি আদি-পাঠকে পাশাপাশি রাখি। যেন বাংলা সংবিধানের প্রতিটি লাইনের ব্যবধানে অদৃশ্য কালিতে লেখা রয়েছে এর ইংরেজি পাঠ। যেন এই ইংরেজি পাঠকে পড়ে এর শব্দগত, প্রত্যয়গত ও গঠনগত অর্থ যথাযথ অনুধাবন করার পরই বাংলা পাঠের দিকে তাকাব কেবল- ইংরেজি পাঠকে চোখের সামনে থেকে মুছে দিয়ে। একই সঙ্গে পড়া এবং মুছে দেওয়া- দেরিদীয় এই ‘Eraser’ প্রকরণ ব্যবহার করেই কেবল সংবিধানের ধারা-উপধারার মর্মার্থ আমাদের কাছে স্পষ্ট হতে পারে। একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে পড়ছে। বহু বছর আগে যখন অমর্ত্য সেনের ‘জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’ বইটি হাতে এসে পড়ল, তখন সাগ্রহে লক্ষ্য করলাম যে, বইটির শেষে অমর্ত্য সেনের নিজের করা একটি পরিভাষার তালিকা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই জানেন যে, বইটি অনূদিত হয়েছিল মূলের ইংরেজি থেকে বাংলায়। কিন্তু অমর্ত্য সেন অনূদিত পাঠটি মনোযোগ দিয়ে দেখে দিয়েছিলেন এবং দেখতে দেখতে বেশকিছু পরিভাষা নির্দেশ করেছিলেন। এর মধ্যে একটির কেবল উল্লেখ করি। ‘পণ্যমোহবদ্ধতা’ টার্মটি তিনি প্রস্তাব করেন মার্কসের ‘Commodity Fetishism’ ধারণাটি অনুবাদের ক্ষেত্রে। যেটা বলতে চাইছি, শুধু পণ্যমোহবদ্ধতা শুনলে আমরা বুঝতে পারব না শব্দটির দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ের একটি বিশিষ্ট কনসেপ্ট ‘Commodity Fetishism’-এর রূপরেখা ফুটে উঠবে না। পণ্যমোহবদ্ধতা ভালো, কিন্তু ঋবঃরংযরংস ছাড়া সে অচল। এজন্যেই বলেছি- অনুবাদে মূলের চেহারা ঢাকা পড়ে যায় :Lost in Translation।
বাহাত্তরের সংবিধান থেকে একটি উদাহরণ এই সূত্রে মনে আসছে। শাসনতন্ত্রের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।’ কিন্তু ‘সুযোগের সমতা’ উচ্চারণে এর অর্থ সুস্পষ্ট হয় না। কেননা, ইতোপূর্বে বাংলায় ‘সুযোগের সমতা’ ধারণাটিকে কোথাও ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর অর্থ জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে এর আদি ইংরেজি পাঠে, যেখানে বলা আছে :’The state shall endeavor to ensure equality of opportunity to all citizens.’ বাংলা পাঠের অর্থ বোঝার জন্য এখানে ইংরেজি পাঠের অবশ্যই অনুগামী হতে হচ্ছে।
[ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s