পুনশ্চ প্যারিস

পর্ব ::৩৯
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

৩. কলোনিয়াল এনকাউন্টার

প্যারিসে যে-ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে এসেছিলাম তার সঙ্গে কীভাবে যেন জড়িয়ে আছে দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম। ১৮৪৪ সালে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে এই প্যারিসেই দেখা হয়েছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের। ম্যাক্সমুলার তখন প্যারিসে অবস্থান করছিলেন ঋজ্ঞ্বেদের পাণ্ডুলিপি ‘প্রস্তুত করার’ কাজে। স্মর্তব্য, ঋজ্ঞ্বেদের কোনো প্রকাশিত লিপি ছিল না এর আগে। যদিও হস্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ বেশ কয়েকটি পাণ্ডুলিপি ছিল লন্ডন, বার্লিন ও প্যারিসে। সেসব থেকে সায়নের টীকা-ভাষ্যসহ একটি গ্রহণযোগ্য প্রকাশনার উদ্যোগ নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এরই ‘কনসালট্যান্ট’ হিসেবে নিয়োগ পান ম্যাক্সমুলার- প্রায় বিশ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃত সাহিত্যের পাণ্ডুলিপি পুস্তকাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ‘দ্য সেক্রেড বুকস্‌ অব দি ইস্ট’ শিরোনামে এই গ্রন্থমালা তারই পরিণতি। এর মধ্যে বেদের চার খণ্ড ও আঠাশটি উপনিষদ বিশেষভাবে ম্যাক্সমুলারের সংকলন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত। এই কাজেরই সুবাদে তরুণ ম্যাক্সমুলার প্যারিসে গিয়েছিলেন ফরাসি প্রাচ্যবিদ অধ্যাপক বার্নফের (Burnof) বক্তৃতামালা শুনতে। কলেজ দ্য ফ্রান্স (College de France)-এ এই বক্তৃতাগুলো দিয়েছিলেন বার্নফ। এই সেই কলেজ দ্য ফ্রান্স, যেখানে বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পড়াবেন আলথুসার, ফুকো ও দেরিদা। এখানে শুধু যোগ করি যে, প্রফেসর বার্নফের সঙ্গে দেখা করার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরও। এবং বার্নফের সূত্রেই দ্বারকানাথের সঙ্গে পরিচিত হন ম্যাক্সমুলার। এ প্রসঙ্গে ম্যাক্সমুলার লিখেছেন :

“I was then attending Professor Burnouf’s lectures at the college de France, and as the Indian visitor had brought letters of introduction to that great French savant, I too was introduced to the Indian stranger, and soon came to know him well. He was the representative of one of the greatest and richest families in India.”

এই দ্বারকানাথ-ম্যাক্সমুলারের মধ্যকার প্যারিস-সাক্ষাৎকেই আমি বলছি ‘কলোনিয়াল এনকাউন্টার’। কথাটা গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের একটি লেখা থেকে ধার করা। যেটা তিনি লিখেছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী ও মির্চা এলিয়াদের বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনির বিশ্নেষণ করতে গিয়ে। ১৮৪৪ সালের প্রায় সুদীর্ঘ ৫০ বছর পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ম্যাক্সমুলার দ্বারকানাথ সম্পর্কে যা লিখেছিলেন তাকে উপনিবেশ শাসনের কালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এক ধরনের ‘কলোনিয়াল এনকাউন্টার’ ছাড়া অন্য কোনো অভিধায় অভিহিত করার কথা আমার মনে আসেনি। এই সাক্ষাৎকারে বাদ-প্রতিবাদ, যোগ-অভিযোগ, দ্বন্দ্ব-মধুরতা, ঐক্য ও অনৈক্য সব উপাদানকেই শনাক্ত করা যায়। উপরে যেখানে ইংরেজিতে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে এটা স্পষ্ট যে, দেখা হচ্ছে দুই স্বগোত্রীয় বা সতীর্থের মধ্যে নয়; সব ছাপিয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে দ্বারকানাথের ‘বিদেশি’ ভাবমূর্তি- ‘দি ইন্ডিয়ান স্ট্রেঞ্জার’ উপাধি। একে বহিরাগত বা আউটসাইডার হিসেবেও অনুবাদ করা চলে। ‘আমারই মতো, কিন্তু আমাদের কেউ নয়’- এটাই হচ্ছে ম্যাক্সমুলারের চোখে দ্বারকানাথের প্রাথমিক পরিচয়। যে-ভারতবর্ষকে নিয়ে ম্যাক্সমুলার আজীবন গবেষণা করেছেন সেই ভারতবর্ষের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধির মধ্যে নিজেরই ‘অপর’ দেখছেন ম্যাক্সমুলার। দ্বারকানাথ তার কাছে একাধারে নিকটজন ও অন্যজন। এই ‘অপরায়নের’ কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, কেননা আমরা একটু পরেই দেখব, বুদ্ধিবৃত্তিতে পণ্ডিতপ্রবর ম্যাক্সমুলারের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই দ্বারকানাথ। এই ‘অপরায়নের’ মূল কারণ আসলে দুই ব্যক্তিসত্তার মধ্যে ‘ঔপনিবেশিক’ শাসক-শাসিতের ব্যবধান।

দ্বারকানাথ ঠাকুর যে কত বিষয়ে গুণান্বিত ছিলেন তা ম্যাক্সমুলারের সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকেও ফুটে ওঠে। তার ব্যবসা-বাণিজ্যে ঈর্ষণীয় সাফল্যের কথা অন্যত্র সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’-এর ২য় খণ্ডে ‘বাঙ্গালী শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণীর ইতিহাস’ প্রবন্ধে আমি দ্বারকানাথ ঠাকুরকে তার আমলের শীর্ষস্থানীয় ‘বুর্জোয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছিলাম। তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠান, উত্থান ও পতনের কিছু বিশ্নেষণও সেখানে রয়েছে। এর একটি তাৎপর্য যে, রবীন্দ্রনাথকে যারা কেবল ‘জমিদার’ (সেই অর্থে সামন্তবাদী) রবীন্দ্রনাথ হিসেবে দেখতে চান, তারা ভুল করেন। রবীন্দ্রনাথের অভ্যুদয়ের পেছনে দ্বারকানাথের ‘বুর্জোয়া’ সত্তা সক্রিয় পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। ঠাকুরবাড়ির মডার্নিটিকে বুঝতে গেলে দ্বারকানাথের জীবন ও চিন্তাভাবনাকে আমাদের সবিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পাঠ করতে হবে। হয়তো নতুনভাবে তার মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু এখানে আমি দ্বারকানাথের অর্থনৈতিক জীবনবৃত্তান্ত দিতে বসিনি। যারা উৎসাহী তারা কৃষ্ণ কৃপালিনীর ‘দ্বারকানাথ টেগোর : আ ফরগটেন পাইওনিয়ার’ এই প্রায়-বিস্মৃত বইটি দেখতে পারেন। প্যারিসে বসে ম্যাক্সমুলার দ্বারকানাথকে- তার কাছের কিন্তু দূরভুবনের ‘অপরকে’- কীভাবে দেখছেন তার প্রতিই আমি এখানে কেবল দৃষ্টি দেব।

পরস্পর মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে দু’জনের বয়সটাও আমলে আনা প্রয়োজন। ১৮৪৪ সালে দ্বারকানাথের বয়স ছিল ৫০, আর ম্যাক্সমুলারের ২৩। ফলে আলোচনাটি সমকক্ষ সমবয়সীদের মধ্যে হয়নি। তরুণ ম্যাক্সমুলারকে উপনিবেশের প্রতি পাশ্চাত্যের আচরণ বিষয়ে বেশ কিছু কথা- কিছুটা অনুযোগ, কিছুটা বিরক্তির সঙ্গেই- জানিয়েছেন দ্বারকানাথ। তার নিজের জীবনে ইউরোপকে যেমনভাবে চিনেছিলেন তারই নির্যাস ছিল সেসব তিরস্কারে। এই কথাবার্তার দু’বছরের মাথায় মৃত্যু হবে দ্বারকানাথের। ফলে শুধু কথার কথা নয়, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে দ্বারকানাথের জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতার ‘সার-সংক্ষেপ’ হিসেবেও একে পড়া চলে।

প্রথমেই ম্যাক্সমুলার যেটা লক্ষ্য করছেন সেটা দ্বারকানাথের বিত্তবৈভব নয়- সাহিত্য, ধর্মশাস্ত্র, সংগীত, সমসাময়িক ইউরোপীয় পত্রপত্রিকা ও রাজনীতির ওপরে তার বিস্ময়কর দখল। সংস্কৃতজ্ঞ ম্যাক্সমুলার বলেছেন, ‘দ্বারকানাথ ঠাকুর সংস্কৃত বিশেষজ্ঞ ছিলেন না ঠিক, কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্য-সম্ভার সম্পর্কে অপরিচিত ছিলেন না।’ প্যারিসের ইনস্টিটিউট দ্য ফ্রান্স (Institute de France)- যাদের আমন্ত্রণে প্যারিসে যাই এবারে- সেখানকার অধ্যাপক বার্নফ সংস্কৃত ভাগবৎ-পুরাণের একটি চমকপ্রদ ফরাসি অনুবাদ করেছিলেন। সে বইটি বার্নফ দ্বারকানাথকে উপহার দেন। বইটির একদিকে ছিল মূল সংস্কৃত পাঠ, অন্যদিকে ফরাসিতে অনুবাদ। এর ফরাসি পাতার অংশে হাত বুলাতে বুলাতে দ্বারকানাথ বলেছিলেন, ‘আহ্‌, যদি আমি ভাষাটা আরও ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারতাম।’ ম্যাক্সমুলার বলছেন যে সংস্কৃত ভাষা নয়, ‘আরও ভালোভাবে ফরাসি ভাষা জানার জন্য’ কতটা উৎসাহ ছিল তার। ম্যাক্সমুলার আরও লিখেছেন, তিনি প্রাচীন সাহিত্য সম্পর্কে ‘স্কলার’ ছিলেন না বা ছিলেন না তার নিজের ধর্ম বা নিজের সাহিত্য যে-ভাষায় লেখা হয়েছে সে-সম্পর্কে মনোযোগী। কিন্তু যেইমাত্র অধ্যাপক বার্নফের থেকে তিনি শুনলেন যে ম্যাক্সমুলার বেদের পাণ্ডুলিপি সংকলন করছেন প্যারিসে বসেই, অমনি তার সব মনোযোগ গিয়ে পড়ল তরুণ গবেষকের প্রতি। প্যারিসে তিনি থাকতেন সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেলে। সেখানে তাকে প্রায়ই আমন্ত্রণ জানাতেন দ্বারকানাথ। ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে ভারতবর্ষ সম্পর্কে, এর আচার-প্রথা সম্পর্কে গল্প করতেন তিনি। এতে ম্যাক্সমুলারেরও লাভ হতো। স্বয়ং ফ্রান্সের রাজা লুই ফিলিপের সভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। সেই সভায় আমন্ত্রিত সব অতিথিকে রাজকীয় শাল উপহার দিয়েছিলেন দ্বারকানাথ। পরাধীন ভারতবর্ষের মান-সম্মান রাখার জন্যই তিনি এটা করেছিলেন। মাসে ২০০ পাউন্ডের বেতন নিয়ে কাজ করা ম্যাক্সমুলারের কাছে (যে-বেতনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীও কাজ করত না তখন) দ্বারকানাথের বৈভবপূর্ণ সাহচর্য নিশ্চয়ই অভাবনীয় ছিল। কিন্তু বিত্তবৈভব নয়, দ্বারকানাথের অন্যবিধ গুণের পর্যালোচনাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ম্যাক্সমুলারের স্মৃতিচারণায়। তবু দ্বারকানাথের অভিজাত শ্রেণিতে পদচারণার একটি উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ম্যাক্সমুলার লিখছেন :

‘Darkanath Tagore lived in a truly magnificent Oriental style while at Paris. The king, Louis Philippe, received him, nay, he honoured him, if I remember right, by his presence and that of his Court at a grand evening party. The room was hung with Indian shawls, then the height of ambition of every French lady. And what was their delight when the Indian Prince placed a shawl on the shoulders of each lady as she left the room!

দু’জনার মধ্যে আলোচনা ভালোই চলছিল ভারতীয় সাহিত্য, ধর্ম, কৃষ্টি ও সভ্যতা নিয়ে। গোল বাধল সংগীতের ক্ষেত্রে। দ্বারকানাথ পাশ্চাত্য কবিতা ও সংগীতের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ইতালীয় ও ফরাসি সংগীতের প্রতি অনুরাগ ছিল তার। ম্যাক্সমুলার লিখেছেন, ‘আমি পিয়ানো বাজাতাম, আর তিনি গান শোনাতেন। আমি দেখলাম, তার শুধু ভালো গানের গলা আছে তা-ই নয়, এ বিষয়ে তিনি খুব প্রশিক্ষিতও। গানের বিষয়ে আমাদের সম্পর্কটা খুব জমে উঠেছিল। একবার তার ইতালীয় গানের অনুরুক্তি নিয়ে প্রশংসা করার পর আমি তাকে অনুরোধ করলাম একটা খাঁটি ভারতীয় সংগীত শোনাতে। তিনি যেটা গাইলেন সেটা আসলে ভারতীয় নয়, ফার্সি একটি গান, যার মধ্যে না আছে স্টাইল, না আছে কোনো চরিত্র।’ সম্ভবত তাকে কোনো রাগপ্রধান উত্তর ভারতীয় (হিন্দুস্তানি) সংগীত গেয়ে শুনিয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। তরুণ ম্যাক্সমুলার তাতে নিরস্ত হবার নন। “আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, অন্য কোনো ‘প্রকৃত’ ভারতীয় সংগীত তিনি জানেন কিনা। উত্তরে তিনি হাসলেন এবং পাশ কাটানোর মতো বললেন, ‘ও তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না।’ আমি তারপরও অনুরোধ করতে থাকলে তিনি পিয়ানোতে গিয়ে বসলেন, কিছুক্ষণ গুনগুন করার পর বাজাতে শুরু করলেন এবং গান করতে লাগলেন। সত্যি বলতে কি, আমি সেদিন কিছুটা হোঁচটই খেয়েছিলাম। যা শুনলাম তাতে আমি না- পেলাম কোনো সুর, না-কোনো তাল, না-কোনো ছন্দ। সে কথা তাকে বলাতে তিনি বারবার অস্বীকারমূলক মাথা নাড়তে লাগলেন।” প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার অনৈক্যের মূল কোথায় তা জানার জন্য ম্যাক্সমুলারকে দ্বারকানাথ ঠাকুর সেদিন যা বলেছিলেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। দ্বারকানাথ তরুণ সংস্কৃতজ্ঞ ও প্রাচ্যবিদ ম্যাক্সমুলারকে যা বলেছিলেন তা এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বইতে উদ্ধৃত হতে পারত। দ্বারকানাথের বক্তব্য ম্যাক্সমুলারের বয়ানেই শোনা যাক এবারে :

‘তোমরা সবাই একই রকম। কোনো কিছু ঠেকলে বা সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের প্রীত না করলে, তোমরা মুহূর্তেই মুখ ফিরিয়ে নাও। আমি যখন প্রথম ইতালীয় সংগীত শুনি, আমার কাছে সেটা কোনো সংগীত বলেই মনে হয়নি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, চেষ্টা করে গেছি যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা আমার ভালো লাগছে বা তোমরা যাকে বলো সমজদার হওয়া সেভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। এই যেটা বললাম সেটা অন্য সব কিছুর জন্যও খাটে। তোমরা বলো যে আমাদের ধর্ম কোনো ধর্মই নয়, আমাদের কবিতা কোনো কবিতাই নয়, আমাদের দর্শন কোনো দর্শনই নয়।

[ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s