এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৭

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

৪. অন্যান্য প্রসঙ্গ

এদোয়ার্দো গালিয়েনো ঘণ্টাখানেক বলেছিলেন সেদিন ‘পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ’-এর সন্ধ্যায়। আমার থেকে-থেকে চোখ চলে যাচ্ছিল গালিয়েনোর ঢেউ খেলানো সাদা পশমের মতো চুলের দিকে। ‘মিররস’-এর অনুকরণে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কিছু লেখার পরিকল্পনা তার রয়েছে কি-না জানার জন্য প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা নিশ্চয়ই সম্ভব, কিন্তু আমার পড়াশোনা কম এই এলাকা নিয়ে।’ তারপর উল্টো আমাকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন- ‘তারচে’ বরং আপনি আগ্রহ নিয়ে করুন না কেন সেটা?’ পরে অবশ্য বুঝেছি যে, কথাটা নিতান্ত বিনয়ের সৌজন্য থেকেই বলা। এই ভূখণ্ড সম্পর্কে- এমনকি বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালোই জানতেন তিনি। তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘হান্টার অব স্টোরিস’ বইতে হঠাৎ পেয়ে যাই বাংলাদেশের উল্লেখ :

‘২০১২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এক ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ১১০ জন শ্রমিক মারা যায়। এ ধরনের ঘাম-ঝরানো কারখানাতে অধিকার বা নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পরের বছরের এপ্রিলে দগ্ধ হয়ে মারা যায় আরও ১ হাজার ১২৭ জন শ্রমিক আরেকটি এমনই ঘাম ঝরানো ফ্যাক্টরিতে। ইতিহাসে যেসব দাসের কথা আমরা পড়তে পাই, এরাও তেমনি আধুনিক যুগের অদৃশ্য দাস। তাদের অস্তিত্বের মতোই তাদের বেতনও দৃশ্যমান নয়। যেমন নয় দৈনিক এক ডলারে বেঁচে থাকা। যেটা প্রকাশ্যে দেখা যায় তাহলো এদেরই হাতে তৈরি করা পোশাক-সামগ্রী, তাদের গায়ে সুদৃশ্য দামের ট্যাগ লাগানো, আর যেগুলো বিক্রি হচ্ছে ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি, সিয়ার্স, বেনটেন, এইচ অ্যান্ড এম প্রভৃতি বিপণিবিতানে।’

নায়লা কবীর অবশ্য গালিয়েনোর ‘অদৃশ্য দাস’ বলার সাথে সহমত করবেন না। নায়লা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে দীর্ঘকাল ধরে পড়াচ্ছেন। বর্তমানে ফেমিনিস্ট ইকোনমিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সভাপতিও তিনি। বাংলাদেশের এই সুযোগ্য সন্তান শুধু বাংলাদেশের নারীদের ওপরেই মৌলিক গবেষণা করেননি। নারীবাদী অর্থনীতি বা ফেমিনিস্ট ইকোনমিক্সের ওপরে তার গবেষণা কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক ও পরবর্তীকালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। যেমন ইংরেজিতে অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারেন, তেমনি বলিষ্ঠ তার লেখনী। ২০০০ সালে নায়লা কবীর একটি বই লিখেছিলেন, যার নাম ‘দ্য পাওয়ার টু চুজ’ (Power to choose)। সেখানে তার মুখ্য প্রতিপাদ্য ছিল যে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের নারী-শ্রমিকরা ফ্যাক্টরির পরিবেশে কাজ করার সুবাদে ‘ক্ষমতায়িত হয়ে উঠেছে- অন্তত সুদূর লন্ডনে ঘরে বসে কাজ করছে এমন বাঙালি নারী-শ্রমিকদের তুলনায়। অর্থনৈতিক কাজে নারীর অংশগ্রহণ- বিশেষত ঘরের বাইরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর বিচরণ- তার জীবনমানের উন্নতি ও তাকে ‘ক্ষমতাবান’ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; এটিই ছিল নায়লার মূল তর্ক। গালিয়েনো অবশ্য লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতার সাক্ষী, তিনি হয়তো নায়লাকে বলতেন, ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নারীকে ক্ষমতাবান করে ঠিকই, কিন্তু সবই নির্ভর করছে তার দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপরে।’ এ দেশের পোশাক-শিল্পের নারীরা এখনও সেই ক্ষমতা পুরোপুরি অর্জন করেননি তাদের ‘দেশি মালিক’ আর ‘বিদেশি ক্রেতাদের’ সঙ্গে দর-কষাকষি করার ক্ষেত্রে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পরে বিদেশি ক্রেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স ইনিশিয়েটিভের। এতে ইমারত সুরক্ষা, অগ্নিনির্বাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা শুভ পরিবর্তন আসলেও নারী পোশাক শ্রমিকদের মজুরি সামান্যই বেড়েছে। শ্রমবহির্ভূত কাজের পরিবেশেও খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।

গালিয়েনো নিজের জীবনের টুকরো-টাকরা স্মৃতি নিয়ে কিছু খণ্ডদৃশ্য লিখেছেন। তার ‘মেমরি অব ফায়ার’ বইটির শেষ খণ্ডে সামরিক শাসিত উরুগুয়ের ‘কনিষ্ঠতম রাজনৈতিক বন্দি’ সম্পর্কে একটি এন্ট্রি রয়েছে। সে ছিল পাঁচ বছরের একটি মেয়ে, তার অপরাধ ছিল একটাই :তার নাম রাখা হয়েছিল ‘মাইলাই’। ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে মার্কিন সেনা দল মাইলাই নামে গোটা একটা গ্রামকেই গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উরুগুয়েতে তখন চলছে প্রবল সামরিক শাসন। মাইলাই নাম উচ্চারণও তখন অপরাধ। আর সেখানে কিনা জলজ্যান্ত একটি মেয়ে- হোক না সে পাঁচ বছরের মেয়ে; এই নাম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে (বা পার্কে-মাঠে-কিন্ডারগার্টেনে দাপটের সঙ্গে হেসেখেলে দিন কাটাচ্ছে)। গালিয়েনো লিখেছেন যে, বইটি বেরুনোর পর অনেক বাবা-মায়ের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছিলেন তিনি। তারাও তাদের নবজাতকের নাম ‘মাইলাই’ রাখতে চান। কিন্তু প্রশাসন তাতে বাগড়া দিচ্ছে। এমনকি ১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনার এক মা তাকে লিখেছেন, ‘আমার মেয়েকে এখনও নথিবদ্ধ করা যায়নি।’ জন্ম ও মৃত্যুর রেজিস্ট্রি করা এখন এ দেশেও বাধ্যতামূলক। লাতিন আমেরিকায় তা আগেই চালু হয়েছিল আমাদের দেশের তুলনায়। আন-ডকুমেন্টেড থেকে গেছে তার মেয়ে অদ্যাবধি- এই ছিল পাঠিকার অভিযোগ। এসব দেশে নাম তালিকাভুক্ত করাতে গেলে সমস্যা অনেক। কোনো সেইন্টের নাম নিতে চাইলে কাজটা সহজ হয়ে যেত। কিন্তু মাইলাই তো সে রকম কোনো নাম নয়। একে পাওয়া যাবে না অভিধানে, ন্যাশনাল রেজিস্ট্রির ইতোমধ্যে তালিকাবদ্ধ নামের সারিতেও এর দেখা মিলবে না। মাইলাই-এর কোনো অধিকার নেই কার্যত নিজেকে মাইলাই বলে ডাকার।

একবার চিলির সালভাদর আয়েন্দের সঙ্গে সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল গালিয়েনোর। নিজ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে এক রক্তাক্ত ক্যু-তে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিহত হন আয়েন্দে। সেটাই বলতে গেলে প্রথম ‘নয়-এগারো’। এই ক্যুর পেছনে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের সরাসরি প্ররোচনা ছিল। যা হোক, গালিয়েনো যে ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন তা এর বেশ কিছুকাল আগে, তখনও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। তখন ছিল শীতের সময়। চিলির দক্ষিণের প্রদেশ পুন্টা আরেনাতে সবে বরফ পড়তে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে বাইরের তুলার মতো বরফ নেমে আসার দৃশ্য দেখতে দেখতে আয়েন্দে তার নির্বাচনী বক্তৃতার একটি খসড়া দেখালেন গালিয়েনোকে। আগামীকালই একটি বক্তৃতা দিতে হবে তাকে। বক্তৃতা যথারীতি হলো। কিন্তু গালিয়েনো খেয়াল করলেন যে, আয়েন্দের বক্তৃতায় কী করে যেন একটি নতুন লাইন ঢুকে গেছে। যেটা গতকাল রাতে পড়া খসড়ার মধ্যে ছিল না। সমবেত জনতার বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে তিনি শুনতে পেলেন আয়েন্দে বলছেন :’যেসব ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন, সেসবের জন্যে মৃত্যুবরণ করার মধ্যে অর্থ রয়েছে।’ এটা কি ছিল কোনো অনিচ্ছাকৃত ভবিষ্যদ্বাণী, কে জানে!

লোর্কা নিয়েও একাধিক গল্প বলেছেন তিনি। ফ্রাংকোর স্পেনে কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কার মৃত্যুর পর অনেককাল তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি। তার জনপ্রিয় নাটকগুলো নিষিদ্ধ ছিল। লোর্কার মৃত্যুর বহু বছর পরে- ফ্রাংকো তখনও জীবিত- উরুগুয়ের এক নাট্য দল গেল মাদ্রিদে। সাহস করে লোর্কার একটি নাটক মঞ্চস্থ করল তারা। নাটকের শেষে চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী কোনো হাততালি শোনা গেল না। দর্শক সবাই দাঁড়িয়ে গিয়ে পা দিয়ে মেঝের ওপরে এক সাথে শব্দ করতে লাগল অনেকক্ষণ। নাটকের কুশীলবরা প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। এর মাধ্যমে কী বোঝাতে চাইছে দর্শকরা! তাদের অভিনয় কলাকৌশল কি সেরূপ হয়নি? তাহলে এমন ধরনের ব্যবহার কেন দর্শকদের? বহু দিন পরে কুশীলবদের একজন এদোয়ার্দো গালিয়েনোকে বুঝিয়েছিলেন যে, পা দিয়ে শব্দ কেন তুলেছিলেন মাদ্রিদের দর্শকরা? তারা লোর্কার জন্য সেই শব্দ তুলে হল প্রকম্পিত করেছিলেন সেদিন। লোর্কা, যাকে কেবল বামেদের সমর্থক এবং বৃত্তের বাইরের মানুষ হওয়ার অভিযোগে অযথা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তাকে বলেছিলেন দর্শকরা- ‘ফেদেরিকো, দ্যাখো, তুমি এখনও আমাদের মধ্যে কীভাবে বেঁচে আছ।’ এই গল্পটা গালিয়েনো বর্ণনা করছিলেন মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সামনে। সেদিনের সন্ধ্যায় গালিয়েনোর বক্তৃতা পাঠ শেষে অবাক করা কাণ্ড ঘটল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে সমবেত ছয় হাজার মানুষের পায়ের শব্দে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি উঠেছিল। তারাও বলতে চেয়েছিল- ‘গালিয়েনো, তুমি আমাদের মধ্যে বেঁচে আছ।’

[এই বিষয় সমাপ্ত]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s