এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৬
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

স্বৈরশাসকদের নিয়ে এদোয়ার্দো গালিয়েনোর অতি-উৎসাহের কারণ দ্বি-বিধ। প্রথম কারণটি ব্যক্তিগত। তিনি ছিলেন বামপন্থি সাংবাদিক ও লেখক। যে বছর আয়েন্দের চিলিতে পিনোশের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, সে বছরই অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হয় উরুগুয়ে নামক দেশটিতে। গালিয়েনোর জন্মভূূমি উরুগুয়েতে, সেখানেই ‘মিছিল’ বা ‘মার্চ’ [স্পেনীয় ভাষায় Marcha] পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তার খ্যাতি লাভ। এই পত্রিকায় মারিও ভার্গাস ইয়োসার মতো লেখকরা নিয়মিত লিখতেন। যা হোক, উরুগুয়েতে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে গালিয়েনোকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাড়া পেয়ে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যেতে হয় তাকে। সেখানে উদ্বাস্তু জীবনের মধ্যেই ‘ক্রাইসিস’ নামে একটি বামধারার পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তিন বছর না যেতেই ১৯৭৬ সালে আর্জেন্টিনাতেও একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। ডানপন্থি এই ক্যুর নেতৃত্ব দেন লে. জেনারেল ভিদেলা। ইসাবেলা পেরন-এর সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল ভিদেলা ক্ষমতায় আসেন। কথিত আছে, এই ক্যুর পরপর যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার আর্জেন্টিনার সামরিক নেতৃত্বের সাথে বেশ কয়েক বার ‘মিটিং’ করেন এবং বলেন, তাদের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ‘নিষ্ফ্ক্রিয় করে দেওয়া’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরোধী দলনের অভিযোগ ওঠার আগেভাগেই এ কাজটি সেরে ফেলার পরামর্শ দেন কিসিঞ্জার। এ রকম পরিস্থিতিতে আবারও দেশ ছাড়তে হয় গালিয়েনোকে। এবার তিনি পাড়ি জমান স্পেনের উদ্দেশে। এই স্পেনে বসেই তিনি লেখেন তার বিখ্যাত ট্রিলজি ‘মেমোরি অব ফায়ার’- বহ্ন্যুৎসবের স্মৃতি। আমাদের এখানে হলে হয়তো আমরা বলতাম ‘আগুন-জলের গল্প’। কেবল ১৯৮৫ সালেই গালিয়েনো ফিরতে পারেন নিজের দেশে, উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদিয়োতে। গণতন্ত্র সবে ফিরতে শুরু করেছে সেখানে। এই সেই দেশ, যেখানে কোনো মানবিক অধিকারে রীতি-নীতি মানা হয়নি। উরুগুয়ে কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদককে হেলিকপ্টারের সাথে বেঁধে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, এ রকম শুনেছি। কিন্তু গালিয়েনোর কাছে উরুগুয়ে নয়, সমগ্র লাতিন মহাদেশের পর্যায়ক্রমিক সামরিক স্বৈরশাসনের অভ্যুদয়ই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবং এ কারণেই তার লেখা পত্রে স্বৈরশাসকদের প্রবল উপস্থিতি দেখা যায়।

কিন্তু এর পেছনে দ্বিতীয় কারণও ছিল। যদি ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা তার না-ও থাকত, তাহলেও এদোয়ার্দো গালিয়েনো সম্ভবত এভাবেই লিখতেন বা ভাবতেন। দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রবল উপস্থিতির পেছনে অনেকটি কারণ কাজ করে থাকবে। এই মহাদেশে প্রথমে কলোনিয়াল অভিযান চালায় স্পেনীয়রা (এবং পর্তুগিজরা)। মায়া, ইনকা, আজটেক প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতা অধ্যুষিত মহাদেশকে স্বর্ণখনির লোভে পদানত করার জন্য সামরিক অভিযান চালায় তারা। স্থানীয় অধিবাসীদের রাজত্বগুলো ছলে-বলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। গালিয়েনো নানা অনু-গল্পে এই গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা ও কাহিনী লিখেছেন। ১৫৩৩ সালে স্পেনীয় কনকুইস্তাদর বা বিজয়-পিপাসু ফ্রান্সিসকো পিসারো পেরু অধিকার করে নেন। এই যুদ্ধে এবং পরবর্তীকালের ইউরোপ থেকে ‘আমদানি করা’ মহামারিতে নিহত হয় পেরুর ৯০ শতাংশ স্থানীয় জনসাধারণ, যাদের অধিকাংশই ছিল ইনকা সম্প্রদায়ভুক্ত। ইনকাদের সম্রাট আতাহুয়ালপাকে [Atahualpa] নির্মমভাবে খুন করা হয়। গালিয়েনো এই শঠতাপূর্ণ বিজয় নিয়ে লিখেছেন, আর সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে- এই পেরুর ইনকাদের থেকে ইউরোপ এবং এক পর্যায়ে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে আলুর চাষ। আজকে যাকে ‘মেডিকেল মারিজুয়ানা’ হিসেবে প্রচার করা হয়, তারও আদিভূমি পেরুতে।

লাতিন আমেরিকায় এই আদিম, বর্বরতম ঔপনিবেশিক অভিযানের স্মৃতি গালিয়েনো ভুলে দিতে চাননি। এর সাথে তিনি সংযুক্ত করেন পরবর্তীকালের (উনিশ-বিশ শতকের) ‘অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ’-এর বিস্তার। তখন আর উপনিবেশবাদ শুধু স্বর্ণখনির লোভে সীমিত নেই।

৩. সাম্রাজ্য :প্রেম নাকি প্রতারণা?

‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যৎ ফলাফল’ প্রবন্ধে মার্কস এ রকম মন্তব্য করেছিলেন যে, এই শাসনের ফলে যেমন ভারতবাসীর ওপরে দুর্গতি নেমে এসেছে, তেমনি এর প্রতিক্রিয়ায় এর আবদ্ধ নিশ্চলা জীবনে সূচিত হচ্ছে প্রগতির ধারা। প্রত্যন্ত উপনিবেশে পাশ্চাত্য-আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে, ভেঙে পড়ছে তার চিরাচরিত পেছনে-টানা মূল্যবোধের প্রাচ্যীয় জগৎ। যিনি ধ্বংস করেন, তিনিই আবার সৃষ্টি করছেন। উপনিবেশে ব্রিটিশ শাসনের এই দ্বিবিধ ফলাফল যুগপৎ বিনাশী ও সৃষ্টিশীল, একাধারে ধ্বংসাত্মক ও কল্যাণকামী ভূমিকা সম্পর্কে মার্কসের মূল্যায়ন নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে। এ প্রশ্নে এসে এদোয়ার্দো গালিয়েনো মার্কসকেও ছেড়ে কথা বলতেন না। মার্কস যদি বলে থাকেন যে, এযাবৎকালের ইতিহাস মূলত শ্রেণিযুদ্ধের ইতিহাস; তাহলে গালিয়েনো ভাবতেন, এযাবৎকালের ইতিহাস মূলত এক জাতির তরফে অন্য জাতির ওপর অবৈধ ক্ষমতার দাপট দেখানোর ইতিহাস। সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতা-বলয়ের বিস্তৃতি ঘটানো হয়েছে। এখানে প্রেম নেই; থাকলেও তা সাময়িক; অপ্রেমই এখানে মূল সুর; প্রতারণাই এখানে চরম পরিণাম। এ জন্যই অনেকটা আচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে গালিয়েনো সাম্রাজ্যের শঠতার কাহিনী একের পর এক লিখে গেছেন। এক পর্যায়ে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে বাংলার ওপরে। এই ঔপনিবেশিক গল্পের শুরু ইংলন্ডে আর শেষ ঢাকায়।

মুক্ত বাণিজ্য নামক এক রূপকথার জন্ম কীভাবে ইংলন্ডে জন্ম নিল; প্রথমে সে বয়ান করেছেন গালিয়েনো। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা প্রথম জেমস ও প্রথম চার্লসের শাসনামলে ব্রিটেনের ‘শিশু-শিল্প’কে রক্ষার জন্য নানাবিধ সংরক্ষণমূলক নীতি হাতে নেয় ইংরেজ সরকার। তারা কাঁচামাল হিসেবে পশম রপ্তানি বন্ধ করে দেয়; বিলাসবহুল পোশাক তৈরিতেও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বস্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য এ নিয়ম করে; ফ্রান্স ও হল্যান্ডের মতো দেশ থেকে শিল্পপণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের আগেও অর্থনৈতিক চিন্তা ছিল, কিন্তু তা ছিল মূলত সংরক্ষণমূলক [যাকে বলে ‘প্রোটেকশনিস্ট’] নীতিকে ঘিরে। এ রকমই একজন চিন্তক ছিলেন সপ্তদশ শতকের শুরুতে ‘রবিনসন ক্রুসো’র রচয়িতা ড্যানিয়েল ডেফো। গল্পের বই ছাড়াও অর্থনীতির নানা বিষয়ে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখেন। এরই একটিতে তিনি বলেন, ব্রিটিশ টেক্সটাইল শিল্পকে গতিশীল করার জন্য ইংরেজ সরকারের ‘সংরক্ষণমূলক’ নীতি খুবই কার্যকর ছিল। ইংরেজ রাজারা ‘শুল্ক্কের দেয়াল’ নির্মাণ না করলে এবং স্থানীয় শিল্পকে উপযুক্ত কর-প্রণোদনা না দিলে এই শিল্পের বিকাশ সম্ভবপর ছিল না। এই বিকাশ এতটাই ত্বরান্বিত হয়েছে যে আগামী দিনে বিশ্বের প্রতিটি দেশ বা উপনিবেশ ‘ব্রিটিশ পণ্যের ওপরেই নির্ভরশীল থাকবে।’ ডেফোর ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ছিল বলতে হয়। কেননা, পরবর্তী দুশো বছর ধরে ব্রিটেন যা করে বড় হয়েছে, তারই উল্টোটা প্রয়োগ করেছে সে অন্যদের প্রতি। অবস্থানিরপেক্ষভাবে প্রচার করেছে ‘অবাধ বাণিজ্য’-এর জয়গান। জার্মান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিখ লিস্ট এটা দেখে বলেছিলেন, ‘উপরে উঠিয়ে মইটা ফেলে দিয়েছে ইংরেজরা।’ রাতের বেলায় যখন গরিব দেশগুলোর ঘুম হয় না, তখন ধনী দেশের মন্ত্রণাদাতারা মুক্ত বাণিজ্যের রূপকথা শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে।

এই রূপকথাই অন্য রকম শোনায় ঔপনিবেশিক বাংলার পটভূমিতে। গালিয়েনো লিখেছেন যে, বাংলা থেকে সুতি ও রেশমি কাপড় আমদানিতে প্রথমদিকে অতি-উচ্চ হারে শুল্ক্ক বসানো হতো। ১৬৮৫ সাল থেকে এই শুল্ক্ক বসানো হতে থাকে, এক পর্যায়ে কাপড় আমদানি প্রায় বন্ধই করে দেওয়া হয়। এত বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও ইংলন্ডে শিল্প-বিপ্লব শুরু হওয়ার পর প্রায় ৫০ বছর পর্যন্ত-বাংলার বস্ত্রশিল্প বেঁচে ছিল। ম্যানচেস্টার থেকে বস্ত্র যখন বাংলায় আসত, তখন তাতে কিন্তু আমদানি শুল্ক্ক বসানো হয়নি। কারণ ততদিনে ফ্রি-মার্কেটের তত্ত্ব রুলিং আইডিওলজি হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটেনে। গুণগত মান ভালো থাকার জন্যে এবং স্বল্প উৎপাদন মূল্যের কারণে অসম প্রতিযোগিতার ভেতরেও অনেক দিন টিকে ছিল বাংলার বস্ত্র উৎপাদকরা। উনিশ শতকের গোড়াতে যখন ওদের ওপরে এক বিষম করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখনই কেবল ওরা ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এই বি-শিল্পায়নের পরিবেশে ম্যানচেস্টারের টেক্সটাইল শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বাংলার বাজার ও ঘরে ঢুকতে থাকে। ঢাকার ওপরে এই অসম প্রতিযোগিতার ফল হয়েছিল মারাত্মক। গালিয়েনো লিখেছেন :

‘প্রবাদপ্রতিম লর্ড ক্লাইভ যে ঢাকাকে [সমৃদ্ধি-ঐশ্বর্য] লন্ডন ও ম্যানচেস্টার শহরের সাথে তুলনা করতেন, সেই শহরটি এই পর্যায়ে জনশূন্য হয়ে পড়ে। পাঁচজনের মধ্যে চারজনই শহর ছেড়ে চলে যায়। তারপরও বাংলার শিল্প খাতের কেন্দ্র ছিল ঢাকা, তবে তা বস্ত্রশিল্পের জন্য নয়; আফিম উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই আফিমের অতিরিক্ত সেবন করতে গিয়েই এক সময় মৃত্যু হয় ক্লাইভের।’

অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দী নিয়ে আরো অনেক গল্প আছে গালিয়েনোর ঝুলিতে। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ বইটিকে তিনি উপনিবেশ-অভিযানের ন্যারেটিভ হিসেবে পাঠ করেছেন। এর লেখক জোনাথান সুইফট্‌-এর মনে কী ছিল, তা জানা যায় না। তবে অনেক সময় তাকে মনে হয় আসলে তিনি একজন ‘অন্তর্ঘাতমূলক’ লেখক; উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তাবিদ। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’এ-র সর্বশেষ পরিচ্ছেদে কীভাবে কিছু বর্বর জলদস্যুর হাতে স্থানীয় অধিবাসীরা পরাজিত হলো এবং নেটিভদের দেশকে এক অবাধ লুণ্ঠণক্ষেত্র তথা উপনিবেশে পরিণত করা হলো, তার প্রায় পরাবাস্তববাদী বর্ণনা রয়েছে। মূলের বর্ণনাটি এতই তীক্ষষ্ট ও মর্মভেদী যে অনুবাদে তা হারিয়ে যাক সেটা আমি চাই না :

A crew of pirates goes on shore to rob and plunder, they see a harmless people, are entertained with kindness; they give the country a new name; they take formal possession of it for their king; they set up a rotten plank, or a stone, for a memorial.
Here commences a new dominion, acquired with a title by divine right. Natives are driven out or destroyed; their princes tortured to discover their gold; a free license given to all acts of inhumanity and lust, the earth reeking with the blood of its inhabitants : and this execrable crew of butchers, employed in so pious an expedition, is a modern colony, sent to convert and civilize an idolatrous and barbarous people!

সন্দেহ কি, জোনাথান সুইফটকে এক সময় ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করা হবে খোদ ব্রিটেনে।

[ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s