এদোয়ার্দো গালিয়েনোর স্মৃতি (Memoirs of Eduardo Galeano)

পর্ব ::৩৪
১. পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ

ওয়াশিংটন ডিসির ভেননেস্‌ ও টেনলিটাউন মেট্রোর মাঝখানে ফুটফুটে বইয়ের দোকান পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ। দুই মেট্রোর মাঝখানের হাঁটাপথে বাস্তবিকই এক মাইল শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে। উপর-নিচ মিলিয়ে বেশ দীর্ঘ পরিসরের দোকান, তাতে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বিষয়ের বই। এ রকম বইয়ের দোকান কি আমাদের দেশেও নেই? আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু যেটা পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজকে আর দশটা বইয়ের দোকান বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বুক স্টোর থেকে আলাদা করে, সেটা হলো তার ধারাবাহিক সেমিনার- বিভিন্ন বইকে ঘিরে আলোচনা-চক্র। আর সেসব বইয়ের আলোচনা করেন লেখকেরা নিজেই, পরে থাকে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সব মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের অনুষ্ঠান। শুরু হয় সন্ধ্যে ৬টার দিকে। প্রতি মাসে অন্তত আটটা বইয়ের আলোচনা হয়। শিল্প-সাহিত্যের বইয়ের তাকগুলো যেখানে, সেখানেই শেল্কম্ফ সরিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। মোটামুটি একশ’টা চেয়ারের ব্যবস্থা, তবে সে রকম আলোচক হলে চারপাশে বইয়ের তাক ধরে সামনে-পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে আরও অনেক লোক। কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে আরও বেশি আগ্রহী শ্রোতার ভিড় জমাবার সম্ভাবনা যেখানে- সেখানে বইয়ের আলোচনা স্থানান্তরিত হয় সিক্সথ স্ট্রিটের চার্চের ভেতরে। যে রকমটা হয়েছিল সালমান রুশদীর বেলায়। অরুন্ধতী রায়ের নতুন উপন্যাসের জন্যও বড় জায়গার প্রয়োজন হয়েছিল। হিলারি ক্লিনটনের স্মৃতিচারণমূলক বইয়ের আলোচনাও হয়েছিল ওই চার্চে। কিন্তু বেশিরভাগ লেখক-ঔপন্যাসিক ‘মেমোয়ারিস্ট’-কবি-ইতিহাসবিদ-প্রবন্ধকাররাই পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজের অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকেন। কে আসেননি এখানে? স্তালিন-জীবনীকার স্টিফেন কতকিন, অর্থনীতিবদ পল ক্রুগম্যান, পোয়েট লোরিয়েট ট্রেসি স্মিথ, প্রবন্ধকার টা-নাহাসি কোটস, ‘এক্সিট ওয়েস্ট’-এর লেখক মোহ্‌সিন হামিদ- সবাই আগ্রহ নিয়ে থাকেন এখানে এসে নিজের সৃষ্টিকর্মের ওপরে কিছু বলার জন্য। ক্লিনটন, বুশ, ওবামা, ট্রাম্প যিনিই প্রেসিডেন্ট থাকুন না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই লাইব্রেরি বা বুক স্টোরকেন্দ্রিক ‘সাব-কালচারটি’ এখনও আগের মতোই জীবন্ত হয়ে রয়েছে। শুধু পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ নয়, বড়-ছোট শহরের বইয়ের দোকানকে ঘিরে আলোচনা-চক্র (এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রিডিং ক্লাবের মতো পাঠচক্র) ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে গত একশ’ বছর ধরে।

এ রকমই একটি বইয়ের আলোচনায় এসেছিলেন এদোয়ার্দো গালিয়েনো (Eduardo Galeano)। ২০০৯ সালের শীতের এক সন্ধ্যায় গালিয়েনো আসবেন পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজে- এটা জেনে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠি। গালিয়েনোকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়ার এই সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করা চলে না। লাতিন আমেরিকার ডিক্টেটরশিপ ও তার প্রতি মার্কিনিদের অব্যাহত নির্বিচার সমর্থন নিয়ে তার ‘ওপেন ভেইনস্‌ অব লাতিন আমেরিকা’ ছাড়ার পর থেকেই তার প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠি। আমাদের দেশে আমরা যেহেতু সুদীর্ঘকাল সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ ছায়ায় কাটিয়েছি (এবং এখনও তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির গুজবের রেশ শহর-ঢাকার বুক থেকে মিলিয়ে যায়নি) লাতিন আমেরিকার ডিক্টেটরশিপ ও সামরিকতন্ত্র নিয়ে বেশি করে জানার স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল আমাদের প্রজন্মের মধ্যে। একাত্তরের স্বাধীনতা তো মিলিটারি ডিক্টেটরশিপের বিরুদ্ধে এক সুদীর্ঘ লড়াইয়েরই ফসল। পঁচাত্তরের পরে ক্যু-পাল্টা ক্যু, জেনারেলদের আমল, সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই, বেসামরিক সরকার-প্রশাসনের প্রতি ঠান্ডা যুদ্ধের কায়দায় বিভিন্ন পর্বের সামরিক চাপ আমাদের প্রজন্মের প্রতি পাকিস্তানের সামরিক অর্থনীতির ওপরে বিশেষজ্ঞ আয়েশা সিদ্দিকার সাবধানবাণী ‘কখনও সামরিকতন্ত্রকে খাল কেটে কুমিরের মতো ডেকে এনো না’, এক-এগারোর হুমকি-ধামকি, সেলিঞ্জারের অ্যাংরি ইয়াংম্যানের মতো দেশোদ্ধারে ব্রতী মিথিক্যাল অ্যাংরি ইয়াং অফিসারবৃন্দ- এসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতেই আমাদের জীবন প্রায় কেটে গেল। সন্দেহ কী যে আমাদের মধ্যে ওই তরুণ বয়সেই আগ্রহ সৃষ্টি হবে চিলির নেরুদার কবিতা আর তার প্রতিপক্ষ জেনারেলদের প্রতি বা কলম্বিয়ার মার্কেজের উপন্যাস আর তার নিঃসঙ্গ কর্নেলের প্রতি, পেরুর ভার্গাস ইয়োসার উপন্যাস, নিকারাগুয়ার এর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা, ইকুয়েডরের অসওয়াল্কেন্ধা গইয়াসামিন (Guayasamin)-এর চিত্রকর্ম, মেক্সিকোর গল্পকার কার্লোস দ্য ফুয়েন্তেস, কবি অক্টাভিও পাজ, সেন্টার-পেরিফেরি স্কুলের লাতিন আমেরিকার ‘ডিপেনডেন্‌সিরা’ তত্ত্বের প্রণেতারা (লাকলাউ, কারদোসো), উরুগুয়ের প্রাবন্ধিক-সাহিত্যিক এদোয়ার্দো গালিয়েনো এবং সেই সূত্রে সমগ্র লাতিন মহাদেশই আমাদের আত্মার কাছাকাছি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আজ সামরিকতন্ত্র কেবল টিকে আছে আফ্রিকার কিছু দেশে :সারা লাতিন আমেরিকাতেই দুর্বল হোক সবল হোক বিরাজ করছে নানা চরিত্রের গণতন্ত্র। পূর্ব এশিয়ার একদা-সামরিকতন্ত্র অধ্যুষিত দেশগুলোতেও এসেছে গণতান্ত্রিক শাসন, যদিও দেশভেদে তার গণতান্ত্রিক মর্মবস্তু অনেকটাই প্রশ্নকীর্ণ। এক সময় সুদীর্ঘকাল একচ্ছত্র শাসন করা সামরিকতন্ত্র এখন পিছু হটেছে দক্ষিণ এশিয়াতেও- যেমন পাকিস্তানে। তবে সর্বত্র পিছু হটলেও সামরিকতন্ত্রের নেপথ্য-প্রভাব কমেনি। তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ এখনও এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, সে একাই সামরিকতন্ত্রকে মোকাবিলা করতে পারবে। গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ যদি ‘ওয়েলফেয়ার স্টেটের’ আদলে গড়ে উঠতে পারে, যদি তার কল্যাণকামী দিকটি বড় হয়ে দেখা দেয়, তবেই জনগণ কেবল সেই গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদের সঙ্গী হবে। এবং সম্ভাব্য সামরিক-হুমকি বা ‘এক-এগারো’র বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু যদি এ দেশের পুঁজিবাদ ক্রমেই অতি-ধনীদের করালগ্রাসে চলে যায়, তবে নেমে আসতে পারে মাৎস্যন্যায়। যার অপেক্ষায় থাকবে সামরিকতন্ত্রের ঝুঁকি। এটাই লাতিন আমেরিকার শিক্ষা। এ নিয়েই সারা জীবন গল্প, অনুগল্প, প্রবন্ধ, ইতিহাস, দর্শন লিখে গেছেন এদোয়ার্দো গালিয়েনো। তার স্মৃতি এক গোটা জনগোষ্ঠীর স্মৃতির মতন। কিছুই ভোলা হয়নি তাতে, কোনো প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গই বাদ পড়েনি, মণি-মুক্তার মতো সেসব অভিজ্ঞতার স্মৃতি-বিস্মৃতি সংকলন করেছেন গালিয়েনো। আমাকেও বলেছিলেন, ‘আপনি এ রকম একটা চেষ্টা করে দেখুন না কেন দক্ষিণ এশিয়ার জন্যে? আপনাদেরও তো রয়েছে- আমি জানি- কত বলা কত না-বলা সংগ্রামের ইতিহাস, কথা ও কাহিনি।’
[ক্রমশ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s