এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ (Eliot, Orientalism and Tagore)

পর্ব ::৩১

[পূর্বে প্রকাশিতের পর]
সবশেষে, ফোর কোয়ারটেটস্‌-এর ‘দ্য ড্রাই স্যালভেজেস’র অংশে কৃষ্ণের নাটকীয় উল্লেখের প্রসঙ্গটি বিশদ ব্যাখার দাবি রাখে। কৃষ্ণ-অর্জুনের মধ্যকার সংলাপের এলিয়টকৃত ব্যাখ্যা খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, পুরো ফোর কোয়ারটেটস্‌-এর ডরকেন্ড নিহিত হয়ে আছে ‘মহাভারতে’র যুদ্ধক্ষেত্রে। বলা দরকার এলিয়ট সমস্ত ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে খুঁটিয়ে পড়েছিলেন ভাগবৎগীতার স্তবকসমূহ। এ বিষয়ে তার উপলব্ধি তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছেন :”আমার অভিজ্ঞতায় দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র পর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দার্শনিক কবিতা হচ্ছে গীতার পঙ্‌ক্তিমালা। গীতার অজুর্নকে লক্ষ্য করে যে সব বক্তব্য রাখা হয় তা শুধু এলিয়টের কবিতা ও দর্শনের ওপরেই প্রভাব ফেলেনি, তার ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও রাজনৈতিক মত গঠনেও ছায়া ফেলেছিল। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘কর্মে লিপ্ত হয়েও মনের ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলা খুবই দুস্কর, বিশেষত আমাদের জন্য। খুব উন্নত-সভ্যতার ব্যক্তিরাই সেটা পারে, যেমনটা হয়েছিল ভাগবৎগীতার নায়ক অর্জুনের ক্ষেত্রে।’ আমি কতকটা সন্দেহ করি যে, রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে গ্রহণযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি কৃষ্ণ-অর্জুন সংলাপকে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকপন্থি ও ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর মধ্যকার লড়াইয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানান এলিয়ট। তিনি প্রকারান্তরে এখানে নিজেকে অর্জুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্মর্তব্য, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে অর্জুনের মনোবৈকল্য দেখা দেয়। একদিকে ভ্রাতা পান্ডবকুল, অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজন পরিবেষ্টিত কৌরবকুল- এ দুই যুধ্যমান পক্ষের মধ্যে কার পক্ষে গিয়ে দাঁড়াবেন বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুন? যেকোনো পক্ষেই দাঁড়ান না কেন, তার ফল তো একটাই হবে :ভ্রাতৃনিধন ও জ্ঞাতিনিধন। তাছাড়া, যুদ্ধ হলে তা কেবল মিত্রশিবিরে বা শত্রুশিবিরের নিধনযজ্ঞেই সীমিত থাকবে না; তার প্রতিফল ছড়াবে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে। সাধারণ মানুষ যারা কোনো পক্ষেই নেই, তারা আরো বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দেশত্যাগ করবে বা প্রাণ হারাবে। এর দায়ভাগী কেন হতে যাবেন অর্জুন? এই প্রশ্নই তিনি করেছিলেন তার যুদ্ধসারথি শ্রীকৃষ্ণকে। এটি মহাভারত শীর্ষক মহাকাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর গীতার দর্শন-আলোচনারও মূল প্রেক্ষাপট। কিন্তু স্পেনের গৃহযুদ্ধের সাথে মহাভারতের গৃহযুদ্ধের মধ্যে তুলনীয় উপাদান খোঁজাটা খুবই কষ্টকল্পিত। স্পেনের গৃহযুদ্ধের বিবদমান পক্ষের রাজনৈতিক দর্শন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত- একপক্ষে রিপাবলিক-এর সমর্থক-দল চাইছে গণতন্ত্র ও মানবকল্যাণ; অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট শক্তির সমর্থক দল ও সামরিক বাহিনী চাইছে একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের অবলুপ্তি। এ দুই শুভ ও অশুভ পক্ষের লড়াইয়ে কথিত ‘অর্জুন-বিষাদের’ প্রশ্নই ওঠে না।

কিন্তু ফোর কোয়ারটেটস্‌ যখন এলিয়ট শেষ করে আনছেন, ততদিনে স্পেনের গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেছে। রিপাবলিকপন্থিরা পরাজিত হয়ে গেছেন, স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। লোরকার মতো কবিরা ফ্যাসিস্টদের হাতে অত্যাচারিত হয়ে মারা গেছেন। এসব সংবাদ এলিয়টের কাছে যথারীতি পৌঁছেছে। ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে পুরো মাত্রায়। পুঁজিবাদী ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একজোটে যুদ্ধ করছে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাশিয়া। তাদের লক্ষ্য একটাই :জার্মানির নাজিবাদ, ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জাপানের সমরবাদের পতন ঘটানো। আবার নতুন করে পক্ষ-নির্বাচনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এবারে এলিয়টের মনে দ্বিধা দেখা দিয়েছে। তবে কি আগে যেটা চিন্তা করেছিলেন তা ভুল ছিল? তবে কি এই যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান বলে কিছু নেই? কর্মে (অর্থাৎ যুদ্ধে) প্রবৃত্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই? অথচ এলিয়ট জানেন- প্রথম মহাযুদ্ধের ফলাফল তো তিনি ‘ওয়েস্ট ল্যান্ডেই’ প্রত্যক্ষ করেছেন- এই যুদ্ধে মারা যাবে অগণিত মানুষ। তাহলে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করবেন কোন নৈতিকতা বোধে? এই প্রশ্নে এসে এলিয়ট দ্বিতীয়বারের মতো অর্জুন-বিষাদে আক্রান্ত হলেন এবং স্বগতোক্তির মতো করে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘ ÔI sometimes wonder if that is what Krishna meant?’ কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন অর্জুনকে-যুদ্ধ করো, কিন্তু নির্লিপ্ত থাকো এর ফলাফলে. কেননা এতে বিজয়ী হওয়ার গর্ববোধ নেই যেমন, এতে পরাজয়ের বিষণ্ণতাও নেই? যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এতে মোহহীনভাবে ফলাফলের আকাঙ্ক্ষা না করে। এভাবেই যুদ্ধকর্মের ভেতরে প্রবেশ করেও একজন মানুষ অনাসক্ত থাকতে পারে, এবং অনাসক্ত থাকতে পারলে সেই কর্মের দোষ বা গুণ কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। কর্মের সুফল পায় বিশ্ব-প্রকৃতি, সমাজ-সংসার; অশুভর পরাজয়ে শুভত্ববোধ সর্বত্রগামী হয়। ফলের ওপরে অধিকার অন্যের, বহির্লোকের, সমাজ-রাষ্ট্রের, এর ওপরে ব্যক্তির নিজের কোনো অধিকার নেই। ‘আমি মাজে মাঝে ভাবি কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন’- এই জন্যেই এলিয়টের মনে প্রশ্নটি জেগে উঠেছে- বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিতে।

এরই মধ্যে এলিয়ট গীতায় পেয়েছেন, ‘যিনি কর্মে অকর্ম এবং অকর্মে কর্ম দেখেন, মনুষ্যের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান, তিনি যোগী, তিনি সর্বকর্মকারী’ ‘অকর্ম’ মানে রহধপঃরড়হ, আর ‘কর্ম’ মানে ধপঃরড়হ-এ দুইয়ের মধ্যে একটি ‘ভারসাম্য’ খুঁজছিলেন এলিয়ট। একথা তিনি ফোর কোয়ারটেটস-এর আগেও বলেছিলেন ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’-এ :

‘You know and do not know, what it is to act or suffer.
You know and do not know, that acting is suffering,
And suffering action. Neither does the agent suffer
Nor the patient act. But both are fixed
In an eternal action, an eteranal patience
To which all must consent that it may be willed
And which all must suffer that may will it,
That the pattern may subsist, that the wheel may turn and still
Be forever still.’

এই কবিতাংশের মধ্যে action I suffering নিয়ে যা বলা হয়েছে, ‘the wheel may turn’ বলে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে কৃষ্ণের বচনাংশ সুপ্ত হয়ে আছে। কৃষ্ণ বলেছিলেন গীতায়,’suffering is born of action… He who does not, in this world, turn the wheel thus set in motion, is evil in his nature, sensual in his delight, and… lives in vain..’ ফোর কোয়ারটেটস-এ এসে বচনাংশ নয়, পরোক্ষ ভাষণ নয়, সরাসরিভাবে কৃষ্ণ সমুপস্থিত। আমার অক্ষম অনুবাদে তা তুলে দিচ্ছি :

”মাঝে মাঝে আমার মনে হয়
কৃষ্ণ কি এটাই বোঝাতে চেয়েছেন
এক ভাবে বা অন্য ভাবে:
‘কেননা ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই
কেননা ভাবীকাল লুকানো
শেষ হয়ে আসা গানের সুরে
গোলাপের নিভন্ত আলোর
অপসৃয়মান সৌরভে,
যারা এখনো জন্মায়নি
তাদের জন্য শোকে-পরিতাপে,
যে-বই কখনো খোলা হয়নি
তার হলুদ ঝলসে-যাওয়া পাতায়।
উপরে ওঠার সিঁড়ি আসলে
নিচের দিকেই ঘুরে ঘুরে নামছে।
সামনে চলা আসলে পিছনে ফেরা।
এসবই তোমার বোধের অতীত,
তবে নিশ্চিত জেনো-
সময় কারো শুশ্রূষা করে না,
এখানে সে রকম আর্ত কেউ নেই।…
কখনো ভাববে না অতীত-পুরোপুরি অতীত,
আর আগামী-কেবলি অনাগত পল।…
যা উৎসন্ন ও যা আসন্ন
তার দিকে তাকাও
সমান মন নিয়ে…
কর্ম ও অকর্মের মাঝে রয়ে গেছে
এক তৃতীয় সম্ভাবনা।…
কখনো কর্মফলের অপেক্ষায় থেকো না।…
সম্মুখে অথই পারাবার, দ্যাখো।
বিদায় নয়-শুভ হোক যাত্রা।
এই পথ চলাতেই
তোমার শেষ গন্তব্য।’
এই বলেছিলেন কৃষ্ণ সেদিন
অর্জুনকে তিরস্কার করে,
মহাযুদ্ধ কুরুক্ষেত্রের ভেতরে।”

ফোর কোয়ারটেটস্‌ পড়তে পড়তে একথা আমার বারবার মনে হয়েছে এই চরৈবতি, এই পরিব্রাজনা, এই মোহমুক্তির বাসনা রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ও গানে কতভাবেই না বেজে উঠেছিল-এলিয়ট কি সেটা জানতেন? তিনি কি রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ পড়েছিলেন? কখনো রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে উপনিষদকে দেখেছিলেন? পড়েছিলেন তার ‘রিলিজিওন অব ম্যান’, যেখানে আছে ফকির লালন ও তার বাউল সহচরদের কথা? দর্শন ও কবিতার সংশ্নেষণ করতে গিয়ে এলিয়ট প্রথাগত ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের পাঠের ওপরই কেবল জোর দিলেন। এই শাস্ত্রের বাইরের লোকজ ধর্মাচরণের দিকে নজর দিলেন না। কবীর-এর অনুবাদের পরও তাকে স্বীকার করে নিলেন না কোনো প্রবন্ধে বা কবিতায়। লালন ও তার সহচরগণের সাধনা এলিয়টের ওরিয়েন্টালিজমে শেষ পর্যন্ত অস্বীকৃতই থেকে গেল। আমরা এ প্রশ্নও না করে থাকতে পারি না যে, এলিয়ট ও রবীন্দ্রনাথ দু’জনেই অধ্যাত্মবাদী-একই পথের দুই পরিণাম বলা যেতে পারে-কেন তাদের মধ্যে দর্শন ও ধর্ম নিয়ে কোনো সংলাপ হলো না? সত্য কী-এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যে তর্কালাপ হয়েছিল। এলিয়টের সাথে উপনিষদ, পত্রঞ্জলির যোগসূত্র, গীতার কৃষ্ণ-অর্জুন সংবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিব্যি আলোচনা চলতে পারত। আরো ব্যাপক পরিসরে সেই তর্কালাপ হতে পারত। আমরা আগেই দেখেছি, সেই পরিবেশও ছিল। রবীন্দ্রনাথ এলিয়টের কবিতা মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছিলেন, একাধিক কবিতার অনুবাদও করেছিলেন। ওয়েস্ট ল্যান্ডের শেষ চরণে ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’ ভাষ্যে রবীন্দ্রনাথের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বাদ দিলে এলিয়ট রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিস্ময়করভাবে নীরব।

রবীন্দ্রনাথের জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী (মীরা দেবীর স্বামী) ‘মেডিটেশন’ নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘Thoughts for Meditation : A way to Recover from within ‘১৯৫১ সালে প্রকাশিত বইটির ভূমিকা লেখেন এলিয়ট স্বয়ং। সেখানে এলিয়ট লক্ষ্য করেন যে খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, ‘সুফী’ দর্শনে, ইহুদি প্রভৃতি নানা ধর্মেই ধ্যান বা মেডিটেশন-এর সুউচ্চ স্থান স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই নিজ নিজ পথের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে, যেন অন্যান্য ধর্মের পথগুলো সত্যের কোনো একটি দিকও উন্মোচিত করেনি। ‘Truth is ifself is never occult, never confined to one tradition or religion’ সত্য সংগুপ্ত নেই কোনো অজ্ঞেয় বাতেনী মন্ত্রে- কোনো বিশেষ তন্ত্র-মন্ত্রের শাখায় বা দর্শনে। তার মানে এই নয় যে, এলিয়ট প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের মধ্যে সহজ সমীকরণের সম্ভাবনা দেখতেন। তার মতে, বিভিন্ন ধারার মধ্যে সমীকরণ সম্ভব কেবল এসব শাস্ত্র, দর্শন ও ধর্মগ্রন্থের নিবিড়তম চর্চার মাধ্যমে-শুধু মৌখিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজদেহে ও রাষ্ট্রের শরীরে বিভিন্নমুখী আলোকসম্পাত ঘটেছিল নানা দিক থেকে-সেকথা রবীন্দ্রনাথ তার নানা লেখায় বলে গেছেন। ‘শক হুনদল পাঠান মোগল এক দেহে হলো লীন’ সে রকম চিন্তাধারায় রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যকেও অঙ্গীকৃত হতে দেখেছেন আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় (ভারতবর্ষ বললে তা এখন ‘মোদির ভারত’ বলে শোনাতে পারে ভেবে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করলাম)। অর্থাৎ দেয়া-নেয়া, আমদানি-রফতানি গ্রহণ-বর্জন দুইই চলতে পারে। চলা উচিত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে-এই ছিল রবীন্দ্রনাথের মত। এরকম কথা ওয়াল্ট হুইটম্যানও ভেবেছিলেন। নিউ ইয়র্ক ক্রমশ বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে-বিভিন্ন জাতির মানুষেরা সেখানে জড়ো হচ্ছে, এক সময় তাতে যোগ দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসী মানুষেরাও। ১৮৫০-র দশকে লেখা কবিতাটিতে হুইটম্যান বলছেন :

‘To us, then at last the Orient comes…
The Originatress comes,\
The nest of languages, the begueaters of poems….
The race of Brahma comes. ‘

হুইটম্যান-প্রভাবিত এলিয়ট আরো গভীরে গিয়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজেছেন। তার সংস্কৃত-অধ্যয়ন, উপনিষদ-গীতার ব্যাখ্যা, বৌদ্ধ-দর্শনের শূন্যবাদ, সুফী দর্শনের উল্লেখ্য, সবকিছুই নানাভাবেই তার কবিতার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ উপকরণ হিসেবে এসেছে। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, তিনি নিজেকে একজন ‘দার্শনিক-কবি’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন-শুধু কবি বা শুধু দার্শনিক হিসেবে নয়। এটাই এলিয়টের ‘প্রাচ্যবাদী মুহূর্তের’ বা Orientatist Turn-র পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ। এক জায়গায় এলিয়ট বলেছেন,

‘The life of a soul does not consist in the contemplation of one consistent world but in the painful task of unifying (to a greater or lesser extent) jarring and incompatible ones, and passing, when possible, from one or more discordant viewpoints to a higher which shall somehow include and transmute them.’

অর্থাৎ এলিয়ট বিশ্বাস করতেন যে প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের দর্শন ও মতবাদের মধ্যে যত বাদানুবাদই থাকুকক না কেন, যত ভিন্নপথের পথিক হিসেবে তারা নিজেদের দাবি করুক না নে, একটা বৃহত্তর ক্ষেত্রে-আইনস্টাইনের ‘ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরির’ মতো করে-সে সব দর্শন ও মতের মধ্যে মেলবন্ধন সম্ভব। রবীন্দ্রনাথও এমনটা মনে করেছিলেন-শেষ জীবনে প্রথাগত ধর্মের অনুশাসন ও মতবাদের থেকে সরে এসে তার মতো করে তিনি নিজস্ব একটি ধর্মমত ও দর্শন গড়ে তুলেছিলেন-যার সাক্ষ্য পাই তার ‘রিলিজিওন অব ম্যান’ বক্তৃতামালায়। এলিয়ট অবশ্য সেই পথ ধরে হাঁটেননি। তার পথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শন-পড়া ছাত্রের মত-তিনি সত্যকে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন তত্ত্বও মতবাদের অলিগলিতে। এবং এই হাতড়ে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে নিজের সংশয়, আস্থা ও উপলব্ধি সংবলিত কবিতার পঙক্তিমালা সৃষ্টি করে গেছেন। দর্শন নয়, কবিতার প্রয়োজনে, একটি নতুন ধারার কবিতা লেখার জন্যেই তার যত শ্রম, আয়োজন, ও অন্তর্গত রক্তক্ষরণ। বৌদ্ধ শূন্যবাদ নিয়ে যখন একটি ‘হাইকু’ তার হাত থেকে নিষ্ফ্ক্রান্ত হয়েছে তখন তার পেছনের দর্শন নয়। সামনের কবিতার আলোকদীপ্তি আমাদের বিমোহিত করে। তিন প্রাচ্যবাদী কি না, পাশ্চাত্য দর্শনের ছাত্র কি না, তার চেয়ে তার বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় তার কবিতার আধুনিক মনোমুগ্ধকর রূপ। ফোর কোয়ারটেটস-এর Burnt Norton-যা বৌদ্ধ-দর্শন দ্বারা গভীরভাবে সমাচ্ছন্ন-এই রূপের বর্ণনা দিয়েছে :

‘And the pool was filled with water out of sunlight,
And the lotos, rose, quietly, quietly,
The surface glittened out of heart of light,
Then a cloud passed, and the pool was empty.’

মেঘ সরে যেতেই দেখা গেল পথটিও নেই, সরোবরও নেই, আর তার কবিও অন্তর্হিত।

[এই প্রসঙ্গ সমাপ্ত :আগামী পর্বে নতুন প্রসঙ্গ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s