তিমিরবিনাশী সমাজের দিকে? (Towards an Enlightened Society?)

বিনায়ক সেন

১. প্রথাগত মতাদর্শের বিপর্যয়
আমরা অর্থনীতিবিদ্যার একটি সংকটের মধ্যে আছি। কোনো আপ্তবাক্যেই আমরা আর আস্থাবান থাকতে পারছি না। একসময়ের বহুশ্রুত ‘মিশ্র-অর্থনীতি’ এখন আর প্রায় ব্যবহারই হয় না বলতে গেলে। আমাদের যৌবনে মিশ্র-অর্থনীতিই ছিল সব তত্ত্বের সারাৎসার। ব্যক্তি খাত থাকবে, কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ছাড়া অর্থনীতির চাকা দ্রুত এগোবে না_ এ রকম একটি স্লোগান আমাদের খুবই প্রভাবিত করেছিল। কেইনসীয় অর্থনীতির উত্থান, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’-এর ধারণা, উপনিবেশ থেকে সবে বেরোনো দেশগুলোর রাষ্ট্রের উপায়ান্তরহীন ভূমিকা এর পেছনে কাজ করে থাকবে। এরই ভাবাদর্শগত ছায়ায় কেটেছে বাংলাদেশের সত্তরের দশক।

আশির দশকের গোড়ার দিকে দ্বিতীয় তেল-সংকটের পর থেকে শুরু করে প্রায় দুই দশক একচ্ছত্র রাজত্ব করেছে অন্য একটি ধারণা। অবাধ বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব অর্থনীতির যুক্তি-তর্কে যতটা তারও বেশি সহায়-সমর্থন পেয়েছিল রেগান-থ্যাচারের রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে। তেল-সংকটের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লাতিন আমেরিকায় দেখা দেয় ঋণ পরিশোধের সংকট। এখানেই প্রথম শুরু হয় ‘কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি’_ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের তখন মন্ত্র ছিল ‘স্টেবিলাইজেশন, লিবারেলাইজেশন এবং গ্রোথ’। অবাধ বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করলে শুধু সংকটের অবসান ঘটবে তা-ই নয়, অর্থনীতির প্রধান প্রধান সমস্যারও অবসান ঘটবে। ততদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোয় প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটে গেছে। মিশ্র-অর্থনীতি ও পরিকল্পনাময় অর্থনীতির বিপরীতে বাজার অর্থনীতির মতাদর্শকে সেদিন মনে হচ্ছিল অপ্রতিরোধ্য ও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আদর্শ বলে। দার্শনিক কান্ট_ হেগেলের ছাত্র ফুকোয়ামা যখন লিখলেন, বার্লিন দেয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে শ্রেণী-যুদ্ধের তথা ইতিহাসের অবসান ঘটেছে তখন তা সময়ের স্বাভাবিক দাবি হিসেবেই অনেকে গ্রহণ করেছেন।

বার্লিনের দেয়াল ভাঙার পর আরও প্রায় ২৫ বছর কেটে গেছে। এ সময়ের অভিজ্ঞতা অবাধ বাজার অর্থনীতির ও তার আদর্শের সমাজ-রাষ্ট্রের পক্ষে যায়নি। প্রথমত, অর্থনীতিবিদ পিকেটি দেখিয়েছেন যে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণা পরিত্যাগ করার ফলে উন্নত বিশ্বের সমাজ হয়েছে আরও বেশি বৈষম্যমূলক। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের তিন দশকে (গোল্ডেন এইজ অব ক্যাপিটালিজম) জাতীয় আয়ে পুঁজির তুলনায় শ্রমের অনুপাত যা-ওবা বাড়ছিল, সে ধারা কমতে থাকে সত্তরের দশকের শেষদিকে এবং পরবর্তী দু’দশকে তা একেবারেই শুকিয়ে আসে। ফলে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেই বেড়েছে সম্পদ, আয় ও ক্ষমতার বৈষম্য। অবাধ বাজার অর্থনীতি শ্রীবৃদ্ধি এনেছে বটে; কিন্তু তার সুফল পেয়েছে মূলত একটা শ্রেণী : বড় কারবারের মালিক, সিইও, ব্যাংকার, শিল্পপতি, পুঁজিবাজারের ফটকাবাজ, রাজনৈতিক প্রকল্পের সুবিধাভোগী লবিস্ট বা দালালগোষ্ঠী। এরা সমাজের ১ শতাংশ অথচ এদের কাছে এসব দেশের ৬০ শতাংশ সম্পদ চলে গেছে। গত ২৫ বছরের অবাধ বাজার অর্থনীতির ফলে জন্ম নিয়েছে ‘সুপার-রিচ’ নামক একটি শ্রেণীর। এদেরই ওপর প্রগ্রেসিভ হারে কর বসানোর প্রস্তাব করেছেন তিনি; আয়ের ওপরে কর তো বটেই, সম্পদের ওপরও দৃষ্টি তার। পিকেটির মতই যে শিরোধার্য তা নয়, তবে তার বইটির প্রশংসা করে সমালোচনা লিখেছেন তিনজন নোবেলজয়ী, এটাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো তথ্য নয় (এর মধ্যে আছেন_ রবার্ট সলো, পল ত্রুক্রগম্যান ও জোসেফ স্টিগলিৎস)। অবাধ বাজার অর্থনীতি যে আপনাআপনি বণ্টনের সমস্যার সমাধান দিতে পারে না সেটা পিকেটি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বড় আকারে প্রমাণ করেছেন।

দ্বিতীয়ত, বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমিয়ে না আনা গেলে সামাজিক দুর্বিপাক বাড়ার সমূহ আশঙ্কা থেকে যায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় নতুন করে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো দেখা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে_ ফার্গুসনসহ বিভিন্ন শহরে বর্ণ-বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভের একটি উদাহরণ_ এদের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কার্যকারণ। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, আয়-বৈষম্য, ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও চলমান মন্দা, সামাজিক খাত বিশেষত স্বাস্থ্য খাতের অচলাবস্থা নির্ধন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের মন থেকে ‘একটি বাড়ি, অনেক সুযোগ’-এর প্রতিশ্রুতি দেওয়া আমেরিকান ড্রিম ভেঙে দিয়েছে। এখন ভরসা তৃতীয় বিশ্বের অভিবাসী সস্তা শ্রম ও মেধার জোগানের ওপর। কিন্তু মন্দা পরিস্থিতিতে এ নিয়েও স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে অভিবাসী ও স্থানীয় শ্রমের ভেতরই।

তৃতীয়ত, অবাধ বাজার অর্থনীতির তত্ত্ব রাজত্ব করেছে শুধু অর্থনৈতিক যুক্তি-তর্কের ওপর নির্ভর করে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অবাধ বাজার অর্থনীতি বা নিও-লিবারেলিজম হচ্ছে ‘একটা প্যাকেজ’। সেখানে একটা নিলে আরও কিছু উপাদান ফাও হিসেবে গছিয়ে দেওয়া হয়। এ রকমই একটি ‘ফাও’ হচ্ছে নিউ কনজারভেটিজম, মূলত খ্রিস্টীয় ধর্মাদর্শের ওপরে এর ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে, যার ব্যাখ্যাও অতি-সংকীর্ণ ধর্মবোধের দ্বারা নির্মিত। লিও স্ট্রাউসের মতবাদকে নিউ কনজারভেটিজমের অনুপ্রেরণা বলে ধরা হলেও এর অনুসারীরা গুরুমারা শিষ্যে পরিণত হয়েছেন। সামাজিক নীতিতে শিষ্যরা ‘ফ্যামিলি ভ্যালুস’-এর গুণকীর্তন করেন, ধর্মীয় নীতিতে তারা ‘ইসলামিস্ট’ শক্তিকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন এবং রাজনীতিতে তারা শুধু সেসব সরকারকেই মানতে প্রস্তুত যারা হবেন তাদের একনিষ্ঠ স্বার্থবাহী। সাদ্দামকে সরানোর জন্য ইরাক যুদ্ধ শুরু করার কিছুদিন পরই লিও স্ট্রাউসের কন্যা ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এ খোলা কলম লিখে প্রতিবাদ করলেন। তার বক্তব্য_ পল উলফোভিচ, রিচার্ড পারলে, কন্ডোলিজা রাইস এসব ‘নিউ-কন’ তাত্তি্বকরা যা বলছেন তার সঙ্গে লিও স্ট্রাউসের দর্শনের কোনো মিল নেই। বুশের ইরাক আক্রমণের তীব্র সমালোচকে পরিণত হন তিনি (যেমন_ মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন মওদুদীর ছেলে এ দেশে এসে)।

চতুর্থত, অবাধ বাজার অর্থনীতির মতাদর্শ সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সে সূত্রে কান্টের ‘চিরস্থায়ী শান্তির’ মতো নিখিল প্রশান্তি বিশ্বে নেমে আসবে, যুদ্ধ বিগ্রহহীন বিশ্বের তত্ত্বও প্রচার করেছিল। দেখা গেল যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ হয়নি, বরং তা ক্রমাগত নতুন নতুন মাত্রা পেয়ে চলেছে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নানা পর্যায়ে। সোভিয়েতের অবসান হলেও যুদ্ধের অবসান হয়নি, সমরবাদ আজও বাড়-বাড়ন্ত। ২০১৪ সালে নিঃশব্দে পালিত হলো ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর শতবার্ষিকী। ১০০ বছর আগে লেনিন লিখেছিলেন_ ‘যুদ্ধ ছাড়া সাম্রাজ্য চলতে পারে না।’ ওবামার যুগে এসেও দেখতে পাচ্ছি এ কথা খাটছে। লেনিনের অনেক কথা হয়তো মিলেছে অথবা মেলেনি; কিন্তু অন্তত এ পর্যবেক্ষণটি আজও এতসব এক বিশ্ব তত্ত্ব, পোস্ট মডার্নিজম, পোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালিজমের পরও সত্য বলে প্রতিভাত হচ্ছে।

আর ‘গণতন্ত্র’? অবাধ বাজার অর্থনীতির সঙ্গে বলা হয়েছিল গণতন্ত্র সর্বত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। আমি সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কে যাচ্ছি না। মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় কারা থাকবেন বা না থাকবেন এটি ঠিক করা গণতন্ত্রের একটি আবশ্যকীয় দিক। কিন্তু নির্বাচনকেন্দ্রিক সংজ্ঞার বাইরে যাওয়ারও দরকার আছে। অমর্ত্য সেন এক বক্তৃতায় বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে ‘আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শাসনকার্য চালানো’ (গভর্নিং বাই ডিসকাশন)। এটিও গণতন্ত্রের একটি মর্মগত উপলব্ধি। অন্যদিকে সমাজের ‘সর্বস্তরে গণতন্ত্রায়নের’ কথাও আমরা শুনেছি_ এটি বোধকরি ম্যাক্সিম্যালিস্ট অভিধা। এই ৩টি সংজ্ঞার যেটিকেই আশ্রয় করা হোক না কেন, বার্লিন দেয়াল পতনের পরের ২৫ বছরে গণতন্ত্রের অবস্থা বিশ্বজুড়েই ভালো নয়। অনেক দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে আবার পিছু হটতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে মিশ্র বা ‘সংকর গণতন্ত্রের’ নানা অসম্পূর্ণ রূপ। ২০০০-এর দশক থেকে অনেকটা ইরাক যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এসবের সমান্তরালে_ গণতন্ত্রের প্রবণতায় অসুস্থতা বা পিছু হটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। লিটারেচারে একে বলা হচ্ছে, পশ্চাৎপসরণ বা ডেমোক্রেটিক ব্যাকট্রেকিং। শুধু তাই নয়, পার্থ চ্যাটার্জি লিখেছেন, পুঁজিবাদ নিজেই হয়ে পড়েছে তার বিঘোষিত গণতন্ত্রের বিরোধী সত্তা। ক্যাপিটালিজম এগেইনস্ট ডেমোক্রেসি।

নিরঙ্কুশ পরিকল্পনার অর্থনীতি নিয়ে মোহভঙ্গের যথেষ্ট ন্যায়সঙ্গত কারণ রয়েছে। মিশ্র অর্থনীতির প্রতিও আস্থা নেই। বাকি ছিল_ অবাধ বাজার অর্থনীতি। ২৫ বছর আগে তার যে অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি ছিল সেটি এখন অনেকটাই ঝাঁপসা হয়ে এসেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি সমালোচনার মুখে পড়ছে ওপরে বর্ণিত ৫টি কারণে। সাধারণভাবে এখন আর বলা যাবে না যে, একটি আদর্শ অর্থনীতির মডেল আমাদের চোখের সামনে রয়েছে_ আমাদের কাজ হচ্ছে তাকে কেবল যথাসাধ্য অনুসরণ করা। আমাদের ঝুঁলিতে নিরঙ্কুশ পরিকল্পনার অর্থনীতি, মিশ্র অর্থনীতি ও অবাধ বাজার অর্থনীতির বিশ্ব-অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু সেসব খণ্ডচিত্র মাত্র। এই অর্থে আমি বলেছি শুরুতে, আমরা অর্থনীতিবিদ্যার একটি সংকটের মধ্যে আছি। জীবনানন্দ ‘তিমিরবিনাশী’ সমাজের প্রতীক্ষায় ছিলেন। আমাদের সে লক্ষ্যে তত্ত্বগত চর্চাকে নিরুৎসাহ করা নয়, বরং আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় সে চর্চাকে আরও বেশি মেধা, মনন ও নিষ্ঠায় ধারালো করে তুলতে হবে।

২. ব্যাস্টিক ও সমষ্টির মেলবন্ধন
চোখের সামনে কোনো আরাধ্য অর্থনৈতিক মতাদর্শ আর নেই, এক অর্থে এটা ভালোই। রাস্তাটা এখন ডেড-এন্ডে পেঁৗছেছে অভিযানের সমাপ্তি, এখনই প্রকৃত যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হতে পারে। কোনোটা জাতীয়তাবাদসম্মত, কোনোটা পুঁজিবাদী ধারার, কোনোটা সমাজতন্ত্রের পক্ষে_ এসব বিবেচনা আর বড় নির্ণায়ক হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। বিশ্বজোড়া গরিবরা ওপরে উঠছে, মধ্যবিত্তের আকার বড় হচ্ছে, নারীদের কণ্ঠস্বর ও অবস্থান জোরালো হচ্ছে, অভিবাসীরা মেধা ও প্রবৃদ্ধির জোগান দিচ্ছেন। আর রয়েছে সারাবিশ্বেরই এক-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ-যুবাগোষ্ঠী_ এরা সবকিছুই গ্রহণ করতে প্রস্তুত; কিন্তু কোনো কিছুকে পরীক্ষা না করে যাচাই-বাছাই না করে নির্বিচারে মেনে নেওয়ার পাত্র নয়। গর্বাচেভ সমাজতন্ত্রকে নবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সে কথা রাখেননি, বরং গোটা ব্যবস্থাকেই অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। ওবামা পুঁজিবাদকে সহনীয় ও মানবিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি সে কথা রাখতে পারেননি, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আমলেই জড়িয়ে পড়েছে নতুন নতুন ড্রোন যুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং নতুন স্নায়ুযুদ্ধে। এরা নিজেদের দেশে প্রথম দিকে ‘চেইঞ্জ-এজেন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সাধারণ মানুষ তাতে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু শেষাবধি তারা হতাশই হয়েছে। আমি ক্লিনটন-ডেমোক্র্যাট আর বেল্গয়ারের নিউ লেবারের কথা না-ই তুললাম এখানে। সামগ্রিকভাবে একটি উদার-সহনশীল জনকল্যাণমুখী সুষম বণ্টনের সমাজ দিতে পারেনি এদের শাসনাধীন সরকারগুলো।

কিন্তু তাতে জনসমস্যার সমাধান খোঁজার তাগিদ তো কমে যায়নি। তবে প্রশ্নটাকে এখন নতুন করে পেশ করতে হবে। অন্ধ মতাদর্শ নয়, বরং বাস্তব অনুশীলনে ও ক্রমাগত তত্ত্বচর্চার পরিশীলনে যা নিজ দেশের মানুষের জন্য ‘শ্রেষ্ঠ’ বলে মনে হবে তার একাধিক বিকল্প মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। একেক দেশের পরিস্থিতিতে তা হবে হয়তো একেক রকম, যদিও এ নবভাবনার কিছু প্রাথমিক সূত্রের তত্ত্ব-তালাশ করা সম্ভব। এই তত্ত্ব-তালাশের উৎস হতে হবে নানা স্থানিক সূত্রে গাঁথা। এতে সাহিত্য থাকবে, বিজ্ঞান থাকবে, সংস্কৃতি থাকবে, প্রশাসন থাকবে_ এর চিন্তার উৎস হবে বিভিন্ন, স্বেচ্ছাকৃতভাবে ‘একলেকটিক’। একলেকটিক হওয়া মানে_ বহু উৎসের প্রতি হাত বাড়ানো; নির্বিচারে অগ্রসর হওয়া নয়। এখানে রবীন্দ্রনাথ, মার্কস উভয়ই থাকবেন, মিল ও গ্রামসি এরাও থাকবেন, যেমন থাকবেন লালন ও রামমোহন রায়, রোকেয়া ও গান্ধী, চার্বাক, সন্ত কবীর ও ইবনে আরাবি। হারিয়ে যাওয়া ইসলামী সভ্যতা ও লোকজ দর্শন-সংস্কৃতি, আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন জাদুঘর ও উপনিষদের দুর্লভ গ্রন্থরাজি, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য, সব মানবিক জ্ঞানের আধার হবে এই নতুন মননশীলতা। বাংলাদেশে নতুন সভ্যতার নির্মাণ করতে চাইলে এই বহুমুখী সংগ্রহশীলতার প্রয়োজন। তিনটি উদাহরণ টানছি।

বঙ্কিমের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ রচনাটির কথা অনেকেরই মনে আছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান চালচিত্রের এক জায়গায় মিল খুঁজে পাই। প্রবৃদ্ধি নাকি সমতামুখী প্রবৃদ্ধি, এই বিতর্ক বোঝার জন্য রচনাটি জরুরি পাঠ্য বলে মনে হতে পারে, অন্তত পরিকল্পনাবিদ ও অর্থনীতিবিদদের জন্য। সেখানে বঙ্কিম শুরু করেছেন এই বলে_ ‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশে বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে।’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বটে; কিন্তু তাতে করে কি জনকল্যাণ বাড়ছে, বণ্টন আরও সুষম হচ্ছে? এ প্রশ্ন বঙ্কিম তুললেন সেখানে। অবকাঠামো নির্মাণ মানেই ‘দেশের বড় মঙ্গল হইতেছে’ এ ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করে বললেন_

‘কি মঙ্গল, দেখিতে পাইতেছ না? ঐ দেখ, ভাগীরথীর যে উত্তাল তরঙ্গমালায় দিগ্গঞ্জ ভাসিয়া গিয়াছিল, অগি্নময়ী তরণি ক্রীড়াশীল হংসের ন্যায় তাহাকে বিদীর্ণ করিয়া বাণিজ্য দ্রব্য বহিয়া ছুটিতেছে। ঐ যে দেখিতেছ, রাজপথ, পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে ঐ স্থানে সন্ধ্যার পর, হয় কাদায় পিছলে পা ভাঙিয়া পড়িয়া থাকিতে, না হয় দস্যু হস্তে প্রাণত্যাগ করিতে; এখন সেখানে গ্যাসের প্রভাবে কোটি চন্দ্র জ্বলিতেছে_ এই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে, কাহার এত মঙ্গল? ঐ যে হাসিম শেখ, আর রামা কৈর্বত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাতায়, খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্তিচর্মাবশিষ্ট বলদে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চসিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?_ বল দেখি চষ্মা নাকে বাবু! ইহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে? তুমি লেখাপড়া শিখিয়া ইহাদিগের কি মঙ্গল সাধিয়াছ?’

বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট : শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটালেই বা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলেই দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে না। ‘দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবী কয়জন?_ হিসাব করিলে তাহারাই দেশ_ দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী; যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের মঙ্গল নাই।’ অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি যদি সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে না পারে সে প্রবৃদ্ধিতে কীসের মঙ্গল, কীসের জনকল্যাণ?

বঙ্কিমচন্দ্র কোনো বামপন্থি ছিলেন না। না হয়েও, তিনি আজকের দিনের পরিভাষায় যাকে বলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বা সমতামুখী প্রবৃদ্ধি কিসে এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিলের ছাত্র (যদিও ‘একলব্য ছাত্র’_ কেননা মিলের সাথে তার কখনও দেখা হয়নি) বিধায় বঙ্কিম ‘প্রিন্সিপালস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ ভালো করে পড়েছিলেন। ‘বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধা-তত্ত্বে’ তার আস্থা ছিল। ওই লেখাতেই তিনি বলেছেন, ‘বিদেশীয় বাণিজ্য কারণ আমাদিগের দেশের ধনবৃদ্ধি হইতেছে।’ কিন্তু সেটা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দেশের ভেতরে অন্যায় সম্পদ যারা কেন্দ্রীভূত করছেন বৈধ ও অবৈধ উপায়ে তাদের ছাড় দিতে হবে। যেমন_ জমিদার শ্রেণীভিত্তিক যে ভূমি ব্যবস্থা তাকে তিনি সর্বাংশে নিন্দা করেছেন : ‘জীবের শত্রু জীব; মনুষ্যের শত্রু মনুষ্য; বাঙালি কৃষকের শত্রু বাঙালি ভূস্বামী। ব্যাঘ্রাদি বৃহজ্জন্তু, ছাগাদি ক্ষুদ্র জন্তুগণকে ভক্ষণ করে; জমিদার নামক, বড় মানুষ, কৃষক নামক ছোট মানুষকে ভক্ষণ করে।’ সমস্ত তথ্য-উপাত্ত বিচার করে বঙ্কিম এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, জমিদারি ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়াই ভালো, এর পরিবর্তে বাংলায় চালু হওয়া উচিত রায়তওয়ারি বা প্রজাওয়ারি মালিকানায় জমি বন্দোবস্ত। এ রকম র‌্যাডিকেল প্রস্তাব যার, তিনি বাস্তবে কোনো সোশ্যালিস্ট বা সিন্ডিক্যালিস্ট ছিলেন না। অর্থনীতির নির্মোহ বিশ্লেষণই তাকে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের (আজকের পরিভাষায়, রফতানিমুখী উন্নয়নের) পাশাপাশি কৃষক ও গ্রামমুখিন উন্নয়ন চিন্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রশ্নে অবিচল রেখেছিল। ১৮৭২ সালে লেখা প্রবন্ধটি হান্টারের ‘এনালস্ অব রুরাল বেঙ্গল’ গবেষণার পূর্বসূরি। রচনাটির যুক্তিগুলো বাংলার প্রথম আদমশুমারির আগেই পরিকল্পিত হয়েছিল।

‘দেশের শ্রীবৃদ্ধি’ ও ‘কৃষকের কল্যাণ’_ যথাক্রমে সামষ্টিক ও ব্যাস্টিক এ দুই অর্থনৈতিক দিককে বঙ্কিম তার লেখায় মেলাতে চেয়েছেন। সে চিন্তায় সুশাসনেরও স্থান রয়েছে। সেখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা রয়েছে, রয়েছে ‘আদিম ধনসঞ্চয়’-এর কথাও। ‘রুল অব ল’-এর জাঁতাকলে পড়ে কত কৃষক আইন-আদালত করে কবে সর্বস্ব হারাল তার মর্মস্পর্শী বিবরণ আছে এতে। বস্তুত, উন্নয়ন অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের এ লেখাটির তুল্য বিশ্লেষণাত্মক লেখা সর্বত্রই দুর্লভ। এটি উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই পঠিত হতে পারবে।

দ্বিতীয় উদাহরণটি রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ থেকে নেওয়া। রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাতেও ব্যাস্টি ও সমষ্টির কল্যাণের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা বড় আকারে উত্থাপিত হয়েছে। রাশিয়ায় বলশেভিক মত চলছে; কিন্তু সে মত কালের বিচারে টিকবে কি-না এ নিয়ে তার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যকে আজকের দিনেও অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ মনে হয়। নতুন সোভিয়েত ব্যবস্থাকে নির্বিচারে গাল-মন্দও করেননি, আবার ভক্তি বিগলিত চোখেও দেখতে চাননি। তিনি লিখছেন, ‘সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কসীয় অর্থনৈতিক মতটা সম্পূর্ণ গ্রাহ্য কি-না সে কথা বলবার সময় আজও আসেনি; কেননা এ মত এতদিন প্রধানত পুঁথির মধ্যেই টলে টলে বেড়াচ্ছিল, এমন বৃহৎ ক্ষেত্রে এত বড় সাহসের সঙ্গে ছাড়া পায়নি। পরীক্ষার ভিতর দিয়ে পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে এ মতের কতটুকু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আজ নিশ্চিত কেউ বলতে পারে না।’ স্বার্থপরতা একেবারে ছেড়ে দিলে আপদ বাড়তে পারে, মানব প্রকৃতির স্বভাবজ সম্পত্তি-পরায়ণতা একেবারে ছেঁটে ফেলতে চাইলে এ ‘সিস্টেম’ হয়তো টিকবে না। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি পরার্থপরতা ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে এক ধরনের সামঞ্জস্য খুঁজেছেন। এই মেলানোর তত্ত্বে তার পক্ষপাতিত্ব অবশ্য সামষ্টিক জনকল্যাণের দিকে, বাজার অর্থনীতির স্বার্থবুদ্ধির প্রতি নয়। এ ক্ষেত্রে নিখুঁত সমাধান তার জানা নেই : “ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যখন উৎকট স্বার্থপরতায় পেঁৗছিয়ে সমাজে নানা প্রকার উৎপাত মথিত করে তখন উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বার্থ থেকে স্ব-টাকে এক কোপে দাও উড়িয়ে। তাহলেই সমস্ত ঠিক চলবে।’ তাতে হয়তো উৎপাত কমতে পারে। কিন্তু চলার পথ বন্ধ হওয়া অসম্ভব নয়।” ব্যক্তির জন্য ইনসেনটিভ ও জনকল্যাণের ওয়েলফেয়ার ইকোনমিক্সের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে রবীন্দ্রনাথ এ প্রশ্নে পূর্বাপর সচেতন ছিলেন। ১৯২০-এর দশকে লেখা ‘সংহতি’ প্রবন্ধেও এর পূর্বলেখ পাই আমরা।

তৃতীয় উদাহরণটি নজরুলের ‘ছুৎমার্গ’ রচনা থেকে নেওয়া। শ্রেণীর নামে, জাতের নামে, ধর্মের নামে, বর্ণের নামে সামাজিক ছুৎমার্গকে প্রশ্রয় দিলে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নই সামাজিক উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারে না। এডাম স্মিথের মতাদর্শ ছিল সামাজিক ছুৎমার্গহীন এক ‘অর্থনৈতিক মানব’-এর সমাজের। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ অবাধ বাজার অর্থনীতিকে শিরোধার্য করেছে, কিন্তু ‘অর্থনৈতিক মানব’ তত্ত্বকে যৌক্তিকভাবে স্বীকার করেনি। ফলে বেশকিছুটা প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন ঘটলেও সামাজিক জাত-পাত-ধর্ম-আচার প্রভৃতির ভেদবুদ্ধি থেকে আমাদের মতো দেশগুলোর মুক্তি মেলেনি। সামাজিকভাবে আমরা ‘ছাড়া-ছাড়া’ থাকব আর অর্থনৈতিকভাবে আমরা ‘একত্রিত’ হব_ বাজার অর্থনীতির এই সামাজিক মতাদর্শ অবাস্তব। আমেরিকা-ইউরোপের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, শত মাল্টিকালচারালিজম আওড়ানো সত্ত্বেও সেখানে ‘সামাজিক প্রভেদ’ ঘুচেনি বা ‘সামাজিক দেওয়া-নেওয়ার’ সম্পর্ক বিভিন্ন সামাজিক বর্গের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পায়নি। নজরুল লিখছেন, ‘আমাদের গভীর বিশ্বাস যে, হিন্দু মুসলমান মিলনের প্রধান অন্তরায় হইতেছে এই ছোঁয়াছুঁয়ির জঘন্য ব্যাপারটাই। … বিবেকানন্দ বলিয়াছেন যে, ভারতে যেদিন হইতে এই ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দটার উৎপত্তি সেদিন হইতেই ভারতের পতন, মুসলমান আগমনে নয়। … মানুষ হইয়া মানুষকে কুকুর-বিড়ালের মতো এত ঘৃণা করা মনুষ্যত্বের ও আত্মার অবমাননা করা নয় কি? … হিংসা, দ্বেষ জাতিগত রেষারেষির কি সাংঘাতিক বীজ রোপণ করিতেছ তোমরা! অথচ মঞ্চে দাঁড়াইয়া বলিতেছ, ‘ভাই মুসলমান এস, ভাই ভাই এক ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই!’ ‘কী ভীষণ প্রতারণা! মিথ্যার কি বিশ্রী মোহজাল! এই দিয়া তুমি একটা অখণ্ড জাতি গড়িয়া তুলিবে?’ নরেন্দ্র মোদির আধুনিক ভারত-তত্ত্ব বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে যাওয়ার কংগ্রেসি তত্ত্ব এ প্রেক্ষিতেই আমাদের দেখতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক উদারীকরণ করে ভারতীয় সমাজ আধুনিক হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে সামাজিক ‘ছুৎমার্গ’ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারছে। জাত-পাতের ব্যবধান ডিঙিয়ে পরস্পরকে আপনার, ‘সমকক্ষ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, ‘কাছের করে’ জানতে হবে। নইলে কাঙ্ক্ষিত সমাজের সূত্রপাত ঘটবে না।

ইচ্ছা করেই অন্যান্য বাঙালি তাত্তি্বক, চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিকদের কথা এ প্রসঙ্গে বাদ রাখলাম। এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আমার বলার কথা ছিল যে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন চিন্তা বড় বেশি পরনির্ভরশীল তত্ত্বের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থানীয় চিন্তার সূত্রে অর্থনৈতিক তত্ত্বকে আমরা সেভাবে দাঁড় করাতে পারিনি। অথচ সে সম্ভাবনা বিশদভাবে রয়ে গেছে পূর্বসূরিদের চিন্তা-ভাবনায়। প্রবৃদ্ধি হলেই আমরা ধরে নিচ্ছি তা অবধারিতভাবে জনকল্যাণমুখী এবং সে কারণেই ফি-বছর প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক একটি প্রথাগত সংলাপে পরিণত হচ্ছে। সমতামুখিন প্রবৃদ্ধি কিসে সাধিত হবে সে ধরনের প্রশ্নে আমরা প্রবেশ করতে কুণ্ঠিত হচ্ছি। দারিদ্র্য কমছে বলে কিছুটা আত্মপ্রসাদ বোধ করছি, দারিদ্র্য কমার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছি না। তুলনামূলকভাবে অদক্ষ শ্রমের কল্যাণ হচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তুলনামূলকভাবে অদক্ষ শ্রমজীবী মানুষের ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানরা আগামীতে মধ্যবিত্তে পরিণত হবে কি-না এই মৌলিক সামাজিক সচলতার প্রশ্নটি অধরাই থেকে যাচ্ছে। তা ছাড়া, হাড় ভাঙা খাটুনির পর হাসিম শেখ-রামা কৈবর্ত্তের পুষ্টির সমস্যা এখনও চলে যায়নি। দেশের হয়তো শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, ‘মঙ্গলের ছড়াছড়ি হচ্ছে’; কিন্তু ‘চরম দরিদ্রে’ থাকা মানুষরা কিন্তু এখনও সংখ্যায় প্রায় ২ কোটির মতো। এরা এখনও ‘দীনের হতে দীন’। তিন বেলা হয়তো এরা খেতে পারছে; কিন্তু মৌলিক অনেক নাগরিক সুবিধা থেকে এরা এখনও বঞ্চিত। ক্ষমতার কাছে এরা এখনও অসহায়। মধ্য আয়ের দেশ হয়তো অচিরেই আমরা হতে পারব; কিন্তু চরম দরিদ্র মানুষের অবস্থার পরিবর্তন না হলে এই শ্রীবৃদ্ধিতে সান্ত্বনা নেই। আছে কি?

লেখক
প্রাবন্ধিক
অর্থনীতি বিশ্লেষক

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s