হিমুর শহর (Himu’s City)

Humayan Ahmed
১. হুতোম ও হিমু
ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের কথা। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। শহরটা গড়ে উঠছে দ্রুত, গাড়ি-ঘোড়ার সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে একশ্রেণীর মানুষের ধন-সম্পদ। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ধরন ‘স্ট্যাটাস-সিম্বল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বাবুদের জীবনচর্চার খুঁটিনাটি নিয়ে লেখা হবে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। উন্মেষ পর্বের আধুনিকতার নিপুণ চিত্র এটি। কিন্তু রুচি বিচারে বঙ্কিমচন্দ্র হুতোমের নিন্দাই করেছেন। তাঁর পক্ষে নিন্দা করাটাই ছিল স্বাভাবিক। নকশার যত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের উপজীব্য ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের শহর কলকাতার জীবনধারা। ওই শতকের দ্বিতীয়ার্ধের ভদ্রলোক বাবুরা সে চিত্র মনে রাখতে চাইবেন না, এটাই তো প্রত্যাশিত। তবে ভিন্নমতও ছিল সেকালে। অক্ষয়চন্দ্র সরকার লিখলেন : জীবদ্দশায় আর একখানি পুস্তক আমাকে আলোড়িত করিয়াছিল। আনন্দও পাইয়াছিলাম। সেখানি কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশা। ‘আলালের ঘরের দুলালে’ও অনেক স্থানে নকশা বা ফটো তুলিবার চেষ্টা আছে বটে, কিন্তু তাহাতে পল্লী-সমাজের চিত্র যেমন পরিস্ফুট হইয়াছে। কলিকাতার অলিগলির নকশা তেমন ফুটন্ত হয় নাই। নকশা প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। পার্থ চ্যাটার্জি মন্তব্য করেছেন যে, ১৮৭০ দশকের পর থেকে শহর কলকাতা ক্রমশ বাংলা গল্প-উপন্যাস থেকে অদৃশ্য হতে থাকবে, এর অলিগলির নকশা আর সেভাবে রূপায়িত হবে না। এর জায়গা নেবে মধ্যবিত্ত পাত্র-পাত্রীরা, যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং যাদের মূল প্রেরণা হবে জাতীয়তাবাদ। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের আর্লি মডার্নিটির জায়গায় আসবে দ্বিতীয়ার্ধের ‘কলোনিয়াল মডার্নিটি’। নববাবু বিলাসের কেচ্ছা কাহিনী, নববাবুদের অবাধ ও অলজ্জিত জীবন চর্চার কাহিনী প্রকাশ করতে। সংকোচ বোধ করবে পরবর্তী সময়ের বাংলা গল্প-উপন্যাস। সেই সঙ্গে নিচুতলার মানুষের অকৃত্রিম চিত্রও হয়ে পড়বে ঝাপসা (মার্কসবাদী হাতেগোনা কিছু ‘সচেতন প্রয়াস’ ব্যতিরেকে)। হুতোমের প্রশংসা করা হবে বটে। কিন্তু তার পদ্ধতি প্রয়োগকে একালের রুচির জন্য অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হবে বঙ্কিমচন্দ্রের রুচি বিচারকে শিরোধার্য করেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত ‘বাঙালা সাহিত্য’ প্রবন্ধে নকশা নিয়ে এরূপ মন্তব্য করবেন যে হুতোম পেঁচাও পরিবর্তন সময়ের একটি মহার্ঘ রত্ন। ইহাতে তৎকালীন সমাজের অতি সুন্দর চিত্র আছে। হুতোম হুতোমীয় ভাষার প্রবর্তক এবং বহুসংখ্যক হুতোমী পুস্তকের আদিপুরুষ। আরও পরে প্রমথ চৌধুরী লিখলেন :’নকশা হচ্ছে তখনকার সমাজের আগাগোড়া বিদ্রূপ এবং অতি চমৎকার লেখা। এ বই সেকালের কলিকাতা শহরের চলতি ভাষায় লেখা। এ রকম চতুর গ্রন্থ বাঙ্গালা ভাষায় আর দ্বিতীয় নেই।’ শহর কলকাতার উঁচু ও নিচুতলার জীবন নিয়ে ঝরঝরে চলিত বাংলায় এ রকম বই আর লেখা হয়নি তার মূল কারণ অন্যত্র। লুণ্ঠন, রক্তারক্তি, উচ্ছেদ ও সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে রচিত হয় আধুনিক শহরের উন্মেষ পর্ব। সেই পর্বের নকশা সব সময়ই উচ্চবর্গের, নগরবাসীর জন্য অস্বস্তিকর। কিছু জিনিস ভুলে যাওয়াই ভালো, যেমন কোনো দূর বা নিকট অতীতের অন্ধকার অপরাধগুলো। সে কারণেই পরবর্তী সময়ে যখন শহরের সমৃদ্ধি আরও বাড়তে থাকে, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র, ইংরেজি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জাতীয়তাবাদ যখন থেকে আমাদের রুচির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, আমরা তখন উন্মেষ পর্বকে ভুলতে শুরু করি। ভুলতে ভুলতে একসময় মনেই থাকে না কিসের মধ্য দিয়ে শুরু করে কোথায় এসে পেঁছেছি। আধুনিক পুঁজিবাদ তাই মর্মগতভাবে বিস্মরণমূলক। শুধু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে কিছু লেখা, যেমন কলকাতার আদি পর্বের ‘নকশা’ অথবা বাংলাদেশের জন্য হুমায়ূন আহমেদের হিমু-পর্বের রচনাসমূহ।

হুতোমের সঙ্গে হিমুর প্রসঙ্গ আসছে ঠিক কী অর্থে? শহর কলকাতার মতো শহর ঢাকা গড়ে ওঠার অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাই হুমায়ূন আহমেদের লেখায়। বস্তুত তার সমগ্র রচনাকর্ম গত চার দশকের বেশি সময় ধরে এই রাষ্ট্রের, এই সমাজের এবং এই শহরের গড়ে ওঠারই ইতিবৃত্ত। বিশেষত স্বল্পতম সময়ে কী করে একটি আধুনিক নগর-সমাজ গড়ে উঠল? কী করে এই ঢাকা শহরের বুকে একটি ‘নববাবু সমাজ’ আত্মপ্রকাশ করল তার রাখঢাকহীন বর্ণনা উঠে এসেছে হিমুর বয়ানে। এ চিত্র হুমায়ূন না লিখলে আমরা আর কারও কাছ থেকে এ সময়ে পেতাম না, পাইনি এখনও। হিমু আরও নানা কারণে মনে রাখার মতো। হুতোম যেখানে কেবলই ‘নকশা’, কোনো গল্প-উপন্যাস লেখার চেষ্টা করা হয়নি সেখানে, হিমু সেখানে নিজেই এক দীর্ঘ উপাখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র। বাংলা সাহিত্যে এ রকম চরিত্র নির্মাণ এর আগে কখনও ছিল না। এর পরও কখনও হয়নি। হিমুর ব্যতিক্রমী জীবনচর্চার পাশাপাশি তার সমৃদ্ধ দার্শনিকতা বা অনর্গল ভাবনার জীবন চরিত্রটিকে পাঠকের ঘনিষ্ঠ করেছে। হিমু একই সঙ্গে যুক্ত ও বিযুক্ত ঘটনার কেন্দ্রে ও প্রান্তে, অনুভূতিপ্রবণ এবং নির্বিকার, লজিক এবং অ্যান্টি-লজিক হিমুকে ভাবলে আমার একটি সংস্কৃত-ভাষ্যের কথা মনে পড়ে যায় :’যিনি কর্মে অকর্ম এবং অকর্মে কর্ম দেখেন, মনুষ্যের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান, তিনিই যোগী এবং তিনিই সর্বকর্মকারী।’ ব্যক্তিগত এসব বিশিষ্টতার কারণে হিমু বিষয়ক রচনা পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। কিন্তু হিমু সমগ্রকে অন্যভাবেও পাঠ করা যায়। এর প্রায় প্রতিটিরই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শহর ঢাকার জীবন। হিমু অনায়াসে এই শহরের উঁচুতলা ও নিচুতলায় যাতায়াত করে রাস্তার ভিক্ষুক, ফুটপাতের খাবার বিক্রেতা, দিনমজুর থেকে শুরু করে একই দিনে যে অবলীলায় চলে যেতে পারে অভিজাততম প্রাসাদে বা হোটেলে। হিমুর এই পারাপার করার ক্ষমতা তাঁকে একধরনের ‘ইন্টারপ্রেটার’-এর ভূমিকা দিয়েছে। সে ক্ষমতাবানদের কাছে ক্ষমতাহীনের অবস্থা তুলে ধরে, আবার ক্ষমতাবানদের তুলে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দেয় ক্ষমতাহীনদের মধ্যিখানে। অন্য সময়ে, যেন পরীক্ষা করতেই, ক্ষমতাহীনকে বানিয়ে দেয় একদিনের বাদশাহ, যেমন বাদশাহকে পথের ফকির এবং এই চলাচলের মধ্য দিয়ে আর কে না জানে ‘পথ চলাতেই তাঁর যত আনন্দ, সে আবিষ্কার করে ঢাকা শহরের জন্মবৃত্তান্ত। ঢাকার অলিগলির নকশা আমাদের সামনে তুলে ধরে কোনো আড়াল না করে; এমনকি প্রচণ্ড ক্ষমতাধরদের বাধা বা হুমকির তোয়াক্কা না করেই। এখানেই হুতোমের সঙ্গে হিমুর বড় মিল।

২. হিমুর উচ্চবর্গ প্রতিপক্ষ
জন্মসূত্রে প্রাপ্ত কয়েকটি ডালপালা হিমুকে উচ্চবর্গের কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। কৃষ্ণের মাতুলবংশ যেমন (কংসকুল) সবসময় অন্যের অনিষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, হিমুর মাতুলবংশও তেমনি সব সময় অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত। হুমায়ূন আরও কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘পিশাচবংশ’। পিশাচের সংজ্ঞাও নির্দিষ্ট হয়েছে এভাবে : ‘মানুষ হিসেবে মামারা পিশাচ শ্রেণীর। তাঁদের সমস্ত ভালোবাসা নিজের মানুষদের জন্যে। বাইরের কারোর জন্যে নয়।’ প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েও এদের পিশাচ স্বভাব যায়নি। বড় মামা মরবার সময় এক অন্ধকার বৃষ্টির রাতে একজন কেউ মাছ মারবার কোঁচ দিয়ে তাকে গেঁথে ফেলে তিনি তার ‘ডেথ বেড কনফেসনে’ নির্দোষ প্রতিপক্ষ কিছু মানুষকে জড়িয়ে দিয়ে যান। মরবার আগে মেজো মামাকে কানে কানে বললেন ‘এক ধাক্কায় চার শত্রু শেষ। কাজটা মন্দ হয় নাই। এই মেজো মামা আবার গোটা পাঁচেক খুন করেছেন। অতি ধুরন্ধর ব্যক্তি।’ এহেন মামার বাড়িতে থেকে হিমু ম্যাট্রিক পাস করেছে। হুমায়ূন আহমেদ শুভ-অশুভের ডিভাইন-ডেভিলের গোপন সম্পর্ক-তত্ত্বে বোধকরি বিশ্বাস করতেন। আর সব মানুষ যেখানে যাঁ শ্রেণীর ইয়েস ম্যান গোছের, সেখানে না-শ্রেণীর মানুষেরা হয় শয়তান নয় মহাপুরুষ এ রকম একটি ভাবনা তাঁর মাথায় ছিল হিমুর বংশ লতিকার স্বভাব বর্ণনার ক্ষেত্রে। কিন্তু পরবর্তীতে হিমুর কাহিনী যতই শহরজীবনের অন্তস্থলে এগোতে থাকে, ততই বুঝতে পারি আমরা গ্রামের ফিউডাল পিশাচ বংশের চেয়ে বড় পিশাচ হচ্ছে ঢাকা শহরের নব বাবু সমাজ। তাদের মধ্যে পরার্থপরতার বালাই নেই হিমুর মাতুলবংশের মতই, কিন্তু যেখানে ভিন্নতা সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর এদের অনায়াস কর্তৃত্ব। এরা দুর্নীতিপরায়ণ-নীতিবোধের কোন সংশয় নেই এদের মনে এরা দিনকে রাত করে, অবলীলায় মানুষ খুন করে ধ্রুপদী সংগীতে গা ভাসিয়ে দিতে পারে। গাঁও-গেরামের মাতুলেরা সে তুলনায় চুনোপুঁটি। গ্রাম থেকে ছোট মামা হিমুর জরুরি বার্তা পেয়ে ছুটে এসেছেন, তার সাথে হিমুর কথা হচ্ছে জেলখানার এক ফাঁসির আসামির সাথে দেখা করার অনুমতি করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। ছোট মামা প্রথমে ভেবেছেন, টাকা খরচ করেই কার্যোদ্ধার করবেন, পরে বুঝলেন যে ঢাকা শহরে শুধু টাকা খরচই যথেষ্ট নয়, ক্ষমতার স্থান টাকারও উপরে। হিমু তাই বলল, ‘তুমি পারবে না মামা। তোমার ক্ষমতার বাইরে।’ মামা সব শুনে বললেন, ‘পুলিশে সাজানো মামলা পেছনে আছে বড় খুঁটি। ‘কিছু করা যাবে না।’ ঢাকা শহরের নবলব্ধ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে একটা শ্রেণীর হাতে নবলব্ধ উত্তরোত্তর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। এই ক্যাপিটালিজমের কাছে ফিওডালিজম অসহায়।

হিমুর দীর্ঘ উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ ঢাকার নব অভিজাত শ্রেণীর ও তাদের নবলব্ধ ক্ষমতার সম্পর্কে এমন কিছু কঠিন কঠিন কথা বলেছেন যা দুই বাংলার সমসাময়িক সাহিত্যেই অত্যন্ত দুর্লভ। এক-আধবার হলে কথা ছিল না, কিন্তু বইয়ের পর বইয়ে এই কঠিন কথাগুলো স্থান পেয়েছে। হিমুর প্রতিটা বইই আকারে ছোট উপন্যাসিকা বা ছোট উপন্যাস জাতীয় কিন্তু এদের মধ্যে কন্টিনিউটি, সম্পর্ক (ও বিচ্ছেদ) রয়েছে। ফলে সবগুলো মিলিয়ে হিমু-বিষয়ক একটি দীর্ঘ উপাখ্যান বা ন্যারেটিভ ভাবতে কষ্ট হয় না। এই উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে উচ্চচিত্ত সমাজের নীচতা, অমানবিকতা ও পাশবিকতার নির্মম নকশা মাঝে মাঝেই ঝলসে উঠেছে। হালকা রসিকতা বা ইয়ার্কির ছলে চলা কথোপকথনের মধ্যে হঠাৎই বেরিয়ে পড়েছে থলের বেড়াল, আর এ রকম হলে অজস্র। ‘দরজার ওপাশে’ শুধু একটি বই থেকেই এটা প্রমাণ করা যায়। একগুচ্ছ উদাহরণ :

১. ‘টাকা থাকলে এই দেশে খুন কোনো ব্যাপারই না। এক লাখ টাকা থাকলে দুটা খুন করা যায়। প্রতি খুনে খরচ হয় পঞ্চাশ হাজার। পলিটিক্যাল লোক হলে কিছু বেশি লাগে।’
২. ‘জাজ সাহেবদের টাকা খাওয়াতে হবে। আগে জাজ সাহেবরা টাকা খেত না। এখন খায়। অনেক জাজ দেখেছি কাতলা মাছের মত হাঁ করে থাকে।’
৩. ‘বুদ্ধিমান লোক মাঝে মাঝে প্রথম শ্রেণীর বোকার মত কাজ করে। আমিও তাই করেছি। টাকা পয়সা অনেক ব্যাংকেই ছিল। ছিল আমার নিজের নামে। কিছু যে অন্যের নামে রাখা দরকার, কিছু ক্যাশ দরকার এটা কখনো মনে হয়নি।’
৪. ‘একটা বোকা লোক সব সরকারের আমলে মন্ত্রী হয় না। এক সরকারের আমলে হয়, অন্য সরকারের আমলে জেলে চলে যায়।’
৫. ‘পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ কঠিন জিনিস। শরীরের চামড়াটা শুধু থাকবে হাড্ডি যা আছে পানি হয়ে পিসাবের সঙ্গে বের হয়ে যাবে।’

আমাদের এও ভুলে গেলে চলবে না এক-এগারোর প্রবল দাপটের সময় হিমুর মাধ্যমেই হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন ‘হলুদ হিমু কালো র‌্যাব’ এর মতো সাহসী উপন্যাস। নানা দেশে বিশেষ বাহিনীর অত্যাচারের যে ধারা চালু আছে তার বিরুদ্ধে হিমুকে দিয়ে প্রতিবাদ করিয়েছেন লেখক। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে যে কোনো মানুষই অসহায়, বিশেষ বাহিনীর কাছে আরও বেশি অসহায়। এদেরকে নিয়ে ঠাট্টা ছলে যে কাণ্ড হিমু করেছে তাতে সাধারণ মানুষের চাপা ক্ষোভের প্রকাশ পেয়েছে। একটি উদাহরণ : হিমুকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তিনজনের একটা টিম ঘামবাবু, হামবাবু ও মধ্যমণি এই নাম দিয়ে পাঠকদের সাথে পরিচয় করানো হচ্ছে। সেখানে ছড়া কাটছে হিমু : ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/র‌্যাব এল দেশে/সন্ত্রাসীরা ধান খেয়েছে/খাজনা দেব কীসে?’ এটি ননসেন্স রাইম যার কোনো মানে হয় না, আবার হয়ও। অথবা এই বইয়ের অন্যত্র, হিমুকে যখন ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে, তখন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এ রকম :

‘বালতিতে কী?

পানি।

দেখাও। পানিও দেখালাম।

তোমার ব্যাগে কী?

একটা বই স্যার।

কী বই?

জঙ্গি বই স্যার। বিরাট বড় এক জঙ্গির জীবনকথা। জঙ্গির নাম চেঙ্গিস খান। নাম শুনেছেন কি-না জানি না।

দেখি বইটা। র‌যাবের এই লোক (কথাবার্তায় মনে হচ্ছে অফিসার) বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বইটা কার?

আমার মামাতো বোনের মেয়ের। মেয়ের নাম মিতু। ভিকারুননিসা স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ছাত্রী খারাপ না। স্যার, আমি এখন যেতে পারি?

না। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে।

আমি আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার ক্রসফায়ার হবে?’

অফিসার জবাব দিলেন না।

এর পরপরই এল সেই মোক্ষম লাইন যা হুমায়ূনের একান্ত নিজস্ব আবিষ্কার : ‘পুলিশের সঙ্গে র‌্যাবের এইটাই মনে হয় তফাত। পুলিশ কথা বেশি বলে। র‌যাব চুপচাপ। তারা কর্মবীর। কর্মে বিশ্বাসী। ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠার জন্য, এই সাহসিকতা দেখানোর জন্যে হিমুকে সাধারণ মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।

৩. হিমুর ‘সাব-অলটার্ন’ বন্ধুরা
আগেই বলেছি, হিমু ঠিক সাব-অলটার্ন অর্থাৎ নিম্নবর্গের মানুষ নন। উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের মধ্যে তার অবাধ সামাজিক যাতায়াত, এ দুইয়ের মধ্যে সে বোধকরি শেষ সামাজিক সেতু। ইংরেজিতে ‘গো বিটুইন’ যাকে বলে। কিন্তু এটাও ঠিক, হুমায়ূনের পক্ষপাতিত্ব কোনখানে দূরসম্পর্কের রেশমা খালার প্রসাদ যেটা হচ্ছে গুলশান এলাকার সবচেয়ে অভিজাত বাড়ি তার চোখ-ধাঁধানো বর্ণনা আছে ‘এবং হিমু’ বইতে। একই বাড়িতে ঘরের পর ঘর। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের অপূর্ব মিলন যাকে বলে, ইউরোপীয় স্টাইলে বার-ঘরও আছে। ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি দিয়ে করা নামাজ ঘরও আছে। শঠতা ও ধর্মভাবাপন্নতা হুতোমের যুগে যেমন, হিমুর কালেও সমান তালে বিদ্যমান। নকশা-য় বাবুরা সেজে-গুজে ‘বারোইয়ারী’ দুর্গাপূজা দর্শন সেরে বেশ্যা পল্লীতে যাচ্ছেন, এ যুগে এরই রকম-ফের চলছে ধর্মকর্ম ও দুর্নীতিলব্ধ আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা সমান তালে ঠিক রেখে। সেই শঙ্ক ঘোষের কবিতার মতো ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি। দুর্গা-মার কাছে প্রাণ খুলে বর চাইছি যাতে ‘লুটে পুটে’ খাই। এসব প্রবণতা হুমায়ূন তাঁর নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন এর মধ্যে উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গ উভয় শ্রেণীরই মানুষ রয়েছে। কিন্তু তার মূল পক্ষপাতিত্ব বরাবর ছিল ক্ষমতাহীন অসহায় মানুষদের প্রতি। তাই সন্ত্রাসী ‘আঙুল কাটা জগলু’ হিমুর হাতে পড়ে কেমন নরম মানবিক হয়ে যায়। গরম ভাত ও ডিম সেদ্ধ খাওয়ার জন্য আকুল ক্রসফায়ারের ‘মুরগি ছাদেক’-এর জন্য এক ধরনের সহমর্মিতা বোধ করি আমরা। শুভ্র-র বাবা র‌্যাব অফিসার হামবাবু হঠাৎ ভদ্র ব্যবহার করতে শুরু করেন। হিমু যুক্তি দেয়, ‘স্যার, মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে। … এত যত্নে তৈরি একটা জিনিস বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে মারা পড়ে এটা কি ঠিক?’ কেননা, পিশাচেরও বিচার আছে। ‘পিশাচের কথাও আমরা শুনব। সে কেন পিশাচ হয়েছে এটাও দেখব।’

হিমুর সাব-অলটার্ন বন্ধুদের কথা উঠলেই প্রথমে মনে পড়বে ‘দীনের হাতে দীন’ চরম দরিদ্র মানুষদের কথা যাদের কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে হিমুর নানা পর্বে। ইয়াদ সাহেব ভিখেরিদের নিয়ে গবেষণা করছেন, তার বিষয় ‘ভাসমান জনগোষ্ঠী : আর্থ-সামজিক নিরীক্ষার আলোকে’। হিমু এক পর্যায়ে তার মাথায় ঢুকিয়েছে যে ভিক্ষুকের ওপরে কাজ করতে হলে তাকে ভিক্ষুকের সাথে থাকতে হবে। হিমুর পক্ষে ভিক্ষুক-শ্রেণীর সাথে নিশিযাপন কোনো বিষয় না, সে কতবার ফুটপাতে এমন ঘুমিয়েছে। ফুটপাতে বা নিম্নবিত্তদের হোটেলে ভাত খাওয়া বরং হিমুর একটি প্রিয় কাজ। মজনু মিয়ার ভাত মাছের হোটেল, বস্তিতে গিয়ে মাতৃস্থানীয়া মহিলার হাতে রাঁধা মাছের সালুন-তরকারি, ড্রাইভার মকবুলের সাথে শহর অবাধে ঘোরা। তরঙ্গিনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মুহিব সাহেবের কাছে বাকিতে চেয়ে জিনিস আনা, মেসের জীবন বাবুর কাছে তার সুখ-দুঃখের কথা শোনা ইত্যাদি। ‘হিমু’ উপন্যাসে মেসের জীবন বাবু এসে হিমুকে এ-ও জানিয়েছেন কোনো একটা রুমে বোর্ডারদের মধ্যে মারামারি রক্তারক্তি কাণ্ড হয়েছে। কেউ মারা যায়নি তাতে, কিন্তু যদি মারা যেত তাহলে তিনি বিপদে পড়তে পারতেন। ‘খুনখারাবি হলে পুলিশ আগে কাকে ধরত? আমাকে। আমি হলাম মাইনরিটি দলের লোক। … সব চাপ যায় মাইনরিটির ওপর। আপনারা মেজরিটি হয়ে বেঁচে গেছেন।’

বেঁচে অবশ্য যাওয়া যায়নি। যারা সততার সাথে জীবন নির্বাহ করতে চান তাদের জন্য দুটো পথই খোলাসা হয়, পিঁপড়ের মতো অসহায় হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। নয়তো সততার পথ ছাড়তে হবে। হিমুর হুমায়ূন তৃতীয় পথে বিশ্বাস করতেন। প্রতিবাদ করে যেতে হবে, প্রতিবাদ করে যেতে হবে এবং প্রতিবাদ করে যেতে হবে। সরবে এবং নীরবে, এক্ষেত্রে কালীপ্রসন্ন সিংহ তার সাথেই রয়েছেন। কলকাতার নববাবু সমাজকে উদ্দেশ করে নকশার উপসংহারে বলছেন : ‘হা বঙ্গবাসীগণ! তোমরা এইরূপেই আপনাদিগকে সভ্য বলে পরিচয় দিয়ে থাক! যাঁদের ধর্ম্ম কর্ম্ম এইরূপ, যাঁদের আমোদ প্রমোদের প্রণালী এই, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই এইরূপ হিপোক্রিট। তাঁরা আবার সভ্য বলে পরিচয় দেন।’

একথা হুমায়ূন আহমেদও বলতে পারতেন, ‘রঙপেন্সিল’ শীর্ষক কলাম-গুচ্ছে এক জায়গায় তিনি বলেছেন, পবিত্র কোরআন শরিফের একটি আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘এবং বেহেশতে তোমরা প্রবেশ করবে ঈর্ষামুক্ত অবস্থায়!’ হিমুর শহর দরিদ্রকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। মানি লোকের সম্মান করতে জানে না। হিমু পড়তে পড়তে একসময় আমার মনে হয়েছে, এই নিষ্ঠুর, মূক ও বধির শহরে একই সাথে চেতন ও অবচেতনে অবগাহন করা ছাড়া উপায় নেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার। এজন্যেই কি ঢাকার রাস্তায় চলতে চলতে হিমু অনেক সময় জ্যোৎস্নার জগতে হারিয়ে যায়? আর কে না জানে। জ্যোৎস্নার অলৌকিক জগতে একবার ঢুকে গেলে লৌকিক জগতে ফিরে আসা বা না আসা সমান অর্থহীন হয়ে পড়ে।

2 thoughts on “হিমুর শহর (Himu’s City)

  1. স্যার, লেখাটির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। ঢাকার ক্রমশ বেড়ে ওঠা পুঁজির ঝলকে মানবতার দীর্ঘশ্বাস আরও প্রবলভাবে কানে বাজছে। একি বাঁচার অর্থনীতি নাকি ধীরলয়ে মৃত্যুর নাকি তাও ঠেকিয়ে দেবে ফরমালিন? সংস্কৃত ভাষ্যটি অত্যন্ত উৎসাহজনক – ’যিনি কর্মে অকর্ম এবং অকর্মে কর্ম দেখেন, মনুষ্যের মধ্যে তিনিই বুদ্ধিমান, তিনিই যোগী এবং তিনিই সর্বকর্মকারী।’। আবারও ধন্যবাদ স্যার, আবারও হিমু পড়তে হবে। সম্ভব হলে, কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশাও’।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s