একটি ভিন্নধারার জন-আন্দোলন

শাহবাগ চত্বরে দেরিদা

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা ঢাকায় কখনো আসেননি। এই ভূভাগের সবচেয়ে কাছে তিনি এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়, ১৯৯৮ সালে। সেখানে তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—পৃথিবীর সবাই মিলে ‘বইকে’ রক্ষা করতে হবে ‘কম্পিউটারের আগ্রাসী আক্রমণের’ বিরুদ্ধে। তার পরও শাহবাগ স্কয়ারে (এখন যেটা ‘প্রজন্ম চত্বর’ হিসেবে ক্রমেই পরিচিতি পাচ্ছে) এলে তিনি আজ উৎফুল্লই হতেন, কিছুটা অবাকও হতেন। সেটা এই কারণে নয় যে, এই চত্বরে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের অধিকাংশই তাঁর নামই শোনেনি। সেটা এ কারণেও নয় যে, এত অসংখ্য শিশু-কিশোর-তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েকে তিনি একসঙ্গে এর আগে জড়ো হতে দেখেননি। তাঁর তো জানাই ছিল, ১৯৬৮ সালের আগুনঝরা মে মাস, যে মাসে প্যারিসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে এসে দর্শনের ও গণতন্ত্রের একটা নতুন ধারণার সূচনা করেছিল ইউরোপে।

দেরিদার কথা মনে হলো এ জন্য যে, তিনিই প্রথমে বলেছিলেন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক আন্দোলনের কথা। তাঁর পরিভাষায়—ডিসেন্টারড রেভল্যুশন। যে আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত প্ররোচনা নেই, যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী ‘কেন্দ্র’, ‘সংঘ’ বা ‘আদর্শিক’ সংগঠন বা আইডিওলজি; যে আন্দোলনের নেই কোনো নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী বা শ্রেণীজোট। এককথায়, যে আন্দোলন ধ্রুপদি মার্ক্সবাদের বাইরে, অথচ যা দেরিদার ভাষায়, সমাজ পরিবর্তনের জন্য জরুরি। সুবিদিত যে, স্পেক্টরস অব মার্ক্স লেখার পর থেকে ডিকনস্ট্রাকশনের দেরিদা ক্রমেই ঝুঁকছিলেন এক নতুন ধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে। দেরিদা অ্যান্ড দ্য টাইম অব দ্য পলিটিক্যাল গ্রন্থে তার সবিশেষ বিচার-বিশ্লেষণ রয়েছে।

দেরিদার কথা মনে হলো আরও এ কারণে যে, বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের অনেক বৈশিষ্ট্য শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের মধ্যে এরই মধ্যে দেখা গেছে এবং এখনো সেসব বৈশিষ্ট্যের পরবর্তী বিকাশের সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। তবে ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘাতের সমূহ সম্ভাবনা/আশঙ্কা রয়ে গেছে প্রজাতন্ত্রের পক্ষ ও বিপক্ষের যুযুধান শক্তির মধ্যে। যে ইতিহাসের মধ্যে আমরা এখনো আছি, সেই ক্রম-প্রকাশমান ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করা ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব। দেরিদা একে বলেছিলেন, হিস্টরি অব দ্য প্রেজেন্ট। তার পরও কয়েকটি নজরকাড়া দিকের উল্লেখ না করে পারছি না।

২. আন্দোলনের নজরকাড়া দিক

প্রথমত, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরের চলমান আন্দোলন কোনো দলীয় বা বহুদলীয় জোট বা মঞ্চ থেকে শুরু হয়নি বা এখনো পরিচালিত হচ্ছে না। এখানে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত কর্মীরা সামনে বা পেছনে থেকে অংশ নিচ্ছেন—নেওয়াটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে যাদেরই ব্যক্তিগত অবস্থান পরিষ্কার, তারা যে ছাত্রসংগঠনেরই হোক, তারাই এখানে আসছে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আসছে, এমনকি ছাত্রদলের সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই আসছেন। কেননা, প্রশ্নটা দলীয় নয়, ব্যক্তিগত। এখানেও ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’ আপ্তবাক্যটা খাটে। ব্যক্তিগত নৈতিক অবস্থান থেকেই এখানে লাখো মানুষ জড়ো হচ্ছে প্রতিদিন। যেটা লক্ষ করার, তা হলো, রাজনৈতিক ছাত্রকর্মীরা যাঁরা এখানে অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরছেন না বা সেই পরিচয় জাহির করার জন্য তাঁরা উদ্বেলিত হয়ে উঠছেন না।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলচর্চার বাইরে এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই আন্দোলন অরাজনৈতিক। এর মধ্যেও তীক্ষ রাজনৈতিক বোধ রয়েছে, কিন্তু সেটা দলীয় রাজনৈতিক নীতি-আদর্শগত সংকীর্ণ বোধ থেকে আলাদা। যে অর্থে গ্রামসি বলেছিলেন, ‘সব দর্শনচর্চা, সবকিছুই রাজনৈতিক’, ঠিক সেই অর্থে শাহবাগের সমাবেশের মধ্য দিয়ে দেশ-জাতি নিয়ে এক নতুন ধরনের ‘নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ’-এর সূচনা হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই নির্দলীয় রাজনৈতিক বোধ সেমিনারকেন্দ্রিক ও বিদেশি অনুদানপুষ্ট থিংক-ট্যাংক ও এনজিওভিত্তিক তথাকথিত সিভিল সমাজের ‘নাগরিক আন্দোলন’ থেকে আলাদা। এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাষ্ট্রকে ঘিরেই, মূলত সরকার-বদলকে কেন্দ্র করে, অথবা সরকারের নীতিমালাকে ঘিরে। অর্থাৎ, প্রচলিত ক্ষমতাচর্চার বলয়ে ঘুরপাক খায় এসব নাগরিক সংলাপ। এক অর্থে (গ্রামসীয় অর্থে) এসব সিভিল সমাজের আন্দোলন মূলত রাজনৈতিক সমাজের আন্দোলনেরই একটি শাখা ‘এক্সটেনশন’। এদিক থেকেও থেকেও শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকে মনে হবে আলাদা চরিত্রের। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নির্ধারণ করলেই এটা বোঝা যায়।

এই আন্দোলন আদিতে শুরু হয়েছিল যাদের তাগিদে, তাদের একটি বড় অংশ এর আগের পাঁচ-সাত বছর ধরে—এই তরুণ বয়সেই—অনলাইনে তীব্র সংগ্রাম করে এসেছেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারকারী এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একাত্তর নিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে, এ দেশের ইতিহাস নিয়ে, আজকের ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নিরন্তর দুর্ভাবনা ও মনঃকষ্ট ছিল। কিছু একটা করার তীব্র ব্যক্তিগত তাগিদ একুশ শতকের এই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ওই সাইবার যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছিল। হতে পারে, এসব ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের মন্তব্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে গিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে তাঁদের, তাতে পরিশীলনের ঘাটতি থেকে গেছে, সময় সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা তীব্র লড়াই যে সাইবার স্পেসে দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, তা এড়িয়ে যাওয়ার নয়। শাহবাগ আন্দোলনের জিনিওলজি বা সূত্রপাতের একটি চিহ্ন এখানে পাওয়া যায়।

চতুর্থত, এই আন্দোলনের ‘উৎসবমুখর চরিত্র’ ভুলে যাওয়ার নয়। একে তো ফেব্রুয়ারি মাস, তার ওপর দারুণ সময়। আমাদের সংস্কৃতির সেরা মাধ্যমগুলো: গান, নাটক, কবিতা, ছড়া, সিনেমা, চিত্রকর্ম—এসবের বর্ণিল সমাহার এখানে। এই আন্দোলনের ৯০ শতাংশের বয়সই পনেরো থেকে তিরিশের মধ্যে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ আবার মেয়েরা। এই সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে মিশেছে তারুণ্যের তীব্র ইনসাফ বোধ। সমাবেশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘তুই রাজাকার’ ধ্বনির পাশাপাশি বারবার যেটা বলা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে ‘আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে চাই আমাদের অতীতকে, আমাদের ইতিহাসকে, আমাদের সমাজকে, আমাদের রাষ্ট্রকে’। আমাদের প্রজন্ম যেটা পারেনি আশি-নব্বইয়ের দশকে, সেটা একুশ শতকের প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। একটি শিশু, একজন কিশোরী, একটি তরুণের ডাকে অন্যান্য বয়সী, অন্যান্য পেশা ও শ্রেণীর লোকেরা সাড়া দিয়ে প্রতিদিন ও প্রতিরাত আসছে এখানে। কোনো বিশেষ নেতা বা নেত্রীর ডাকে তারা এখানে আসছে না। আন্দোলনের এই মেজাজটা আমাদের বুঝতে হবে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের প্রথম বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে কোনো দলীয় নেতা-নেত্রীর ছবি বা পোস্টার নেই। এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’।

৩. এই আন্দোলনকে কীভাবে দেখব?

প্রতিটা প্রজন্ম তার নিজের নায়ক বেছে নেয়, তার নিজের বিপ্লব গড়ে তোলে, তার নিজের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। বায়ান্নতে যার জন্ম, সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে; যাদের জন্ম একাত্তরে, তারা অংশ নিয়েছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে; যাদের জন্ম নব্বইয়ের শুরুতে, তারা এখন অংশ নিচ্ছে ২০১৩ সালের এই শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে। আজ যারা অংশ নিচ্ছে তারা তাদের স্বকীয়তা নিয়েই আসছে। এর অকৃত্রিমতাকে (অথেনটিসিটি) যেন চিনতে ভুল না করি।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত এক দশকে তো মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এমন কোনো চেতনার পুনরুজ্জীবন হয়নি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, তাহলে এই ফেসবুক জেনারেশনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত চেতনা এত তীব্র হলো কী করে? এর একটা উত্তর হতে পারে, আমাদের ও তাদের মধ্যে প্রজন্মগত এক বড় ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। তরুণেরা যে আমাদের থেকে প্রজন্মগত যুক্তিতেই অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং নিজস্বভাবে দেশপ্রেমের এক আলাদাবোধ ও বয়ান শাণিত করে তুলতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি। গত দুই দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের নীরবে উঠে দাঁড়ানোও তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে থাকবে ‘কলঙ্কমোচন’-এর যুদ্ধে নামার ক্ষেত্রে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদের কলঙ্ক যেভাবে আমরা গা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি; যেভাবে আমরা জাতি হিসেবে ভালো করছি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য মোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতের সরলতম সূচকে; যেভাবে গত দুই দশকে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ ছড়িয়ে পড়েছে এ দেশের নানা জেলায়-উপজেলায়; যেভাবে রপ্তানি খাতে, প্রবাসের কাজে, ক্ষুদ্রঋণে, আধুনিক ব্যাংক-বিমা সেবায়, নারীশিক্ষায়, ক্রিকেটে, বই প্রকাশনায়, গানে-নাটকে, বেসরকারি মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনে আমরা এগিয়ে গেছি—এসব নানা সাফল্যের পাশাপাশি বড় দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গিয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে আমাদের গত কয়েক দশকের ঔদাসীন্য ও নির্লিপ্তি। এটা একুশ শতকের আধুনিক তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলা মাধ্যমেই শিক্ষা নিক বা ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষা নিক—মাধ্যমনির্বিশেষে একই ধরনের প্রেরণায় একটি মূল দাবিতে একাত্ম হতে পেরেছে তারা।

কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, এর পরে কী? তরুণেরা কেন কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নেই নিজেদের দাবিগুলো সীমিত রাখছে? সমাজে তো কত অনাচার আছে, রাষ্ট্রের তো কত অন্যায় আছে, সরকারেরও তো কত দিকে ঘাটতি-ব্যর্থতা আছে—সেসব ইস্যু কেন স্থান পাবে না শাহবাগ চত্বরের স্লোগানে? আন্দোলনকারীরা এর উত্তরে বলতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে তাৎক্ষণিকভাবে তাড়িত হয়ে আমরা আমাদের আন্দোলন শুরু করেছি—আমরা এখনো দেশের ভার কাঁধে তুলে নিইনি। সব দায়মুক্তির ভার আমরা এখনই নেব কেন? তার পরও আমরা খোলা রেখেছি বইয়ের পাতা, বন্ধ করিনি অন্য সম্ভাবনাগুলো, আন্দোলনের জনতা চাইলে অন্যান্য ইস্যু আনতে পারে, তবে এটি আমাদের আদি ভাবনা ছিল না। কেননা, যেসব দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, তার অর্ধেক অর্জনও হবে আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া।

আমার চোখে, শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের একটি মৌলিক অভিপ্রায় হচ্ছে—সরকারে হোক, বিরোধী দলে হোক, সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকেই আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতে, সমাজ সংগঠনে ও সংস্কৃতিবলয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি মানেই আওয়ামী লীগ নয়; বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের একটা বড় অংশ একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না—এমনটাও ভাবা অসংগত নয়। ইউরোপের অনেক দেশে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক নামের দল রয়েছে, সে সূত্রে এখানেও এমন দল থাকতে পারে, কিন্তু যে দলই করুক না কেন, চিহ্নিত যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের দলে রেখে কোনো পার্টি, জোট বা শক্তি রাজনীতি করতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। আগামী দিনের নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় বিবেচনা হিসেবে দেখা দেবে। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের এটা একটি মূল পর্যবেক্ষণ। কেউ তো বাধা দেয়নি বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে শাহবাগে এসে সংহতি জানানোর ক্ষেত্রে। সেটা তারা করল না কেন? এর বিপরীতে আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পরে তাদের যে বিবৃতি প্রচারমাধ্যমে এসেছে, বেশ কিছুটা হতাশই হয়েছি। এই শক্তিশালী ও অপার সম্ভাবনাময় আধুনিকমনা একটি প্রধান দলের কাছ থেকে আরও বলিষ্ঠ ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেছিলাম। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনরত সাধারণ জনসমাজের ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রে আরও সচেষ্ট হওয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব তাদের না বোঝার কথা নয়।

সবশেষে, একটা প্রশ্ন এরই মধ্যে উঠেছে—এই আন্দোলন আর কত দিন চলবে? সরকারি মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, পাছে এই আন্দোলন আরও র‌্যাডিক্যাল হয়ে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার দিকে গড়াতে থাকে! প্রধান বিরোধী দলের উদ্বেগ তো ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। শাসক অর্থনৈতিক শ্রেণীরাও চিন্তিত এই ভেবে যে, তাজরীন গার্মেন্টস-জাতীয় কোনো শ্রেণী-পেশার আন্দোলনের সঙ্গে তারুণ্যের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে কি না! পরিচিত গণ্ডির বাইরে কোনো আন্দোলনকেই শাসকশ্রেণী ও দলগুলো বেশি দিন সহজভাবে নিতে পারে না—এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। শাহবাগের আন্দোলন যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, তার পরও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যাবে আগামী বছরগুলোতে। আমরা পূর্ণ নয়, খণ্ডিতকে আশ্রয় করেই বেঁচে আছি। আমরা চিরস্থায়ী হতে চাই না, ক্ষণস্থায়িত্বেই আমাদের আনন্দ। আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনে, কেননা সাইবার স্পেস থেকে রাজপথের স্পেসে চাইলে আমরা যেকোনো সময়েই আবার বেরিয়ে আসতে পারি, অন্য কোনো দাবি নিয়ে। আবার কালই ফিরে যেতে পারি, যদি জনসমাজ তা চায়। ভবিষ্যতে যারা এ দেশের গণতন্ত্রের গতি-প্রকৃতি নিয়ে শঙ্কিত, তারা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের এই বোধকে আশা করি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। শীত যাই যাই, ঋতুরাজ সমাগত, কড়া নাড়ছে দরজায়। এই আন্দোলনের উৎসবমুখর চরিত্র সবারই যে ভালো লাগবে এমন নয়। কোনো নিরীহ জন-আন্দোলনও একপর্যায়ে সহিংস আক্রমণের শিকার হতে পারে, এবং একপর্যায়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তার পরও মনে হচ্ছে, এই আন্দোলনের একটা দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন থেকে যাবে, একটা বড় দাগ রেখে যাবে এটি। কবি যেমনটা বলেছিলেন, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।

বিনায়ক সেন: অর্থনীতিবিদ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s