প্রথম আলো বাজেট সংলাপ ২০১২-১৩: বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ১৫-০৬-২০১২
null
আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও অর্থনীতির কোনো অঙ্কই বলছে না যে তা অর্জন করা সহজ হবে।
প্রথম আলোর কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘প্রথম আলো বাজেট সংলাপ, ২০১২-১৩’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়। আলোচনায় অংশ নেন দেশের তিনজন বিশেষজ্ঞ। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার জন্যই এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। আলোচকেরা প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এ ছাড়া বাজেট কাঠামো এবং এর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, তিনটি অনুমান সত্য হলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই হারে প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
আকবর আলি খান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে বলেন, ‘আমরা যখন প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি, তখন কেউ কেউ বলে, সেটা নিয়ে এত কথা বলার কী আছে। বছর শেষে প্রবৃদ্ধি যা হওয়ার তা-ই হয়। আসলে এ নিয়ে কথা বলার কারণ হলো, প্রবৃদ্ধি সব সময় সরলরৈখিকভাবে আসে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব থাক আর মনা পাগলাই থাক, প্রবৃদ্ধির হার একই থাকবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, যদি তিনটি অনুমান সত্য হয়, তাহলে নতুন বাজেটে প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। সেগুলো হলো: আসছে অর্থবছরে দেশে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ২০ শতাংশ হারে কমবে এবং মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভালো ভালো কথা বলার জন্য। এটিতে কোনো সমস্যা দেখি না। অর্থমন্ত্রী যদি ভালো কথা না বলেন, তাহলে সকলের মাঝে একধরনের নৈরাশ্য তৈরি হবে। তবে অর্থমন্ত্রীকে খেয়াল রাখতে হবে, ভালো কথা বলতে গিয়ে তিনি যেন অতিরঞ্জিত কোনো কথা বলে না ফেলেন। যদি সেটি হয়, তাহলে তিনি খেলো হয়ে যাবেন। অর্থমন্ত্রীর এবারের পুরো বাজেট বক্তব্য পড়ে আমার মনে হয়েছে, তাঁর বক্তব্যে বিশ্বাসযোগ্যতার বেশ অভাব আছে।’
আকবর আলি খান বলেন, গত মার্চে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) লেখা চিঠিতে অর্থমন্ত্রী নিজেই বৈদেশিক মুদ্রার সংকট প্রলম্বিত হবে বলে মত দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অর্থনীতির কিছু সংকটের কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি ও বাজেটের আকার নিয়ে আমার তেমন কোনো বিরোধিতা নেই। ঘাটতি বেশি হলেই একেবারে আসমান ভেঙে পড়বে না। আবার উচ্চাভিলাষী বাজেট—এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একমত নই।’
সাবেক এই অর্থসচিব আরও বলেন, ‘আমাদের যে অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার, তার জন্য বড় বাজেটই বরং দরকার। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি। এই ঘাটতি অর্থনীতির বড় নিয়ামক। আমি যদি দেখি সহজে ডলার ধার পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে আমি বলব ১০-১২ শতাংশ বাজেট ঘাটতিও কোনো বিষয় নয়।’
আকবর আলি খান আরও বলেন, ‘অনেক সরকারি কর্তাব্যক্তি বলেন, “আইএমএফের ঋণ নিয়েছি তাতে সমস্যা কী। ব্যাংকের কাছ থেকেও আমরা ঋণ নিই।” কিন্তু আমি বলি, আইএমএফ ব্যাংকও না, হাসপাতালও না। সেখানে তারাই যায়, যারা ইনটেনসিভ কেয়ারে থাকার উপযুক্ত। অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির সংকট দূর করতে যে ডাক্তারের (আইএমএফ) কাছে গেছেন, তিনি বলেছেন, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর আমাদের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। তিনি এও বলেন, সরকার তো আমাদের কথা শুনে না। তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের কথা না শুনে যদি আইএমএফের কথাগুলো ঠিকমতো শুনে, সেটিও মঙ্গলজনক হবে। আমরাও চাই আইএমএফের সঙ্গে করা চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হোক। সেটি হলে সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধি পাব।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের বিষয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে বড় সমস্যা, সময়মতো টেন্ডার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া। চার মাসের সময় দিয়ে টেন্ডার যদি চার মাসে সম্পন্ন করা না যায়, তাহলে কোনো ভদ্রলোকই ব্যবসা করতে আসবেন না।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আকবর আলি বলেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে দু-তিন কোটি মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাকি ১২ কোটি হয়তো মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কিছুটা খাপখাইয়ে নিতে পারে।
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বাজেটের বিভিন্ন দিকের প্রাক্কলনে সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বব্যাংক বলেছে আগামীতে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সরকার বলছে, ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কীভাবে সম্ভব, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই, যেখানে তিন বছর ধরেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহও সন্তোষজনক নয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার প্রসঙ্গে বলেন, আগামীতে জনপ্রশাসনে এমন কী বিপ্লব হয়ে যাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সুশাসন ও বিভিন্ন সংস্কারের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মোস্তাফিজ অবশ্য বলেন, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়-ব্যয় ইত্যাদিতে বাংলাদেশ ভালো করেছে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রতি দশকে এক শতাংশ করে। প্রতি সাত বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ এবং প্রতি ২১ বছরে তা আট গুণ হওয়ার উদাহরণ অনেক দেশই তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পক্ষেও এ রকম অর্জন করা অসম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরোপিতভাবে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন। তিনি বলেন, গত দুই দশকের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির প্রবণতাকে বিবেচনায় নিলে তা ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ হওয়াই যথেষ্ট ছিল। তবে আগামীতে তা যদি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
বৈদেশিক সাহায্য প্রসঙ্গে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘২০০৬ সালে কিন্তু সাহায্য বেশ এসেছিল। হঠাৎ করে কী হলো। এখন আমাদের মধ্যেই হতাশার সুর যে আগামীতেও এ সাহায্য খুব বেশি আসবে না।’ বিনায়ক সেনের প্রশ্ন, ‘এটা কি পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়টি প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার কারণে, নাকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সবকিছুই গোলমেলে লাগছে।’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বিনায়ক সেন বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়িত না হওয়ার কোনো যোগাযোগ নেই। দুর্নীতিবাজ আমলা হলে বরং শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করত। কারণ, কাজ হলেই না হয় কিছু পাওয়া যায়।’ এ বিষয়ে বিনায়ক সেন বলেন, আমলারা কি ইংরেজি বোঝেন না, না দাতাদের ভাষা বোঝেন না—প্রশ্ন তোলা যায়। তবে এই যদি কেন্দ্রীয় সরকারের বাস্তবতা হয়, বাস্তবায়নের দায়িত্ব বরং স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়।
দেশে অদ্ভুত এক রাজনৈতিক দর্শন কাজ করছে মন্তব্য করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার কথাটি কি এখন শুনতে পান? এখন তো সবই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী।’ অবকাঠামো বলতে শুধু সড়ক অবকাঠামো বোঝানো হয়ে থাকে—এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিনায়ক সেন বলেন, ‘অথচ যেকোনো ভালো শহরের বৈশিষ্ট্য হলো এমন গণপরিবহন থাকা, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে শহরে এসে কাজ সেরে আবার তাঁরা শহরের বাইরে চলে যেতে পারেন।’
খেলাপি ঋণ দুই থেকে তিনবার পুনঃ তফসিল করা যেতে পারে, ১০ থেকে ১২ বার নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফল কী, প্রবাসী-আয়ের সুফল সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না—এসব বিষয় উল্লেখ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের ফলে কী পরিবর্তন হয়েছে বা দেশের উন্নয়নে এসব প্রতিবেদন কীভাবে অবদান রাখছে, তা নিয়ে গবেষণার তাগিদ দেন বিনায়ক সেন।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। সঞ্চালক ছিলেন বার্তা সম্পাদক শওকত হোসেন। এ ছাড়া প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, উপসম্পাদক আনিসুল হক, প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহিছ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s