দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কোনো স্থায়ী সমাধান নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২১-০৬-২০১২

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তাঁরা এ খাতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
পাশাপাশি তাঁরা এ-ও বলেছেন, দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। স্বল্প সময়ের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি চালু থাকতে পারে। তবে প্রকৃত উন্নয়নের পথে যেতে হলে দরকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আর এ জন্য সবার আগে শিক্ষার উন্নয়নে নজর দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক, শিক্ষা খাতে তিন বছর ধরেই বাজেটে বরাদ্দ কমছে।
প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল বুধবার ‘অতিদারিদ্র্য নিরসন: সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ব্র্যাক অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জের সহযোগিতায় প্রথম আলো বৈঠকটির আয়োজন করে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান এতে স্বাগত বক্তব্য দেন। বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী ও হোসেন জিল্লুর রহমান, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান এ কে এম নুরুন্নবী, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন, বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি সাপোর্ট প্রোগ্রামের চিফ অব পার্টি আখতার আহমেদ, ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির পরিচালক শীপা হাফিজা, প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক প্রমুখ।
টেকসই নিরাপত্তা: রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, দারিদ্র্য নিরসনই মূল কথা নয়। গতানুগতিক দারিদ্র্য নিরসনের চিন্তার বাইরে গিয়ে গোটা বিষয়কে দেখা দরকার সামাজিক ন্যায়বিচারের অর্থে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এখন আর টেবিলের এক পাশে পড়ে থাকা বিষয় নয়। এ বিষয়ে গত ৩০ বছরে আমরা কী করলাম, তার হিসাব মেলানো দরকার।’ তিনি বলেন, ‘ভারত এ বিষয়ে সাংবিধানিক অধিকার তৈরির পর বাস্তবায়নের দিকে গেছে। আর আমরা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করছি।’ তিনি বলেন, খোলাবাজারে চাল বিক্রির (ওএমএস) মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করা যাবে না।
মাহবুব হোসেন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি আরও ২০ থেকে ৩০ বছর চালিয়ে নিতে হবে। তিনি মনে করেন, এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ঠিকই আছে। দরকার মূলত কর্মসূচিগুলোর কর্মদক্ষতা। অনেক কর্মসূচি রয়েছে ত্রাণ হিসেবে। পানিতে ডুবে গেলে মানুষের নাকটা যেমন শুধু ভেসে থাকে, অনেকটা সে রকম। এ থেকে উত্তরণ দরকার।
মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না যে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে দারিদ্র্য নিরসন হবে। সরকারের অন্য খাতগুলোকেও সমানভাবে কাজ করতে হবে।’
শীপা হাফিজা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলোর কোনো তথ্যভান্ডারই এখনো তৈরি হয়নি। তা ছাড়া যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলোতে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নীতি গ্রহণ করা দরকার আসলে ‘মানুষ’কে মাথায় রেখে, যা খুব বেশি হয় না।
আনিসুল হক বলেন, যমুনা সেতু হওয়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। তৈরি পোশাক কারখানা, নির্মাণ শ্রমিক, ভুট্টা চাষ, পোলট্রি ইত্যাদিতে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, কর্মসূচিগুলো বেশির ভাগই প্রকল্পভিত্তিক। প্রকল্প শেষ হলেই যেন সব শেষ হয়ে যায়। আর যেখানে যত বেশি প্রকল্প, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবও তত বেশি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক কারণেও কিছু কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। যেমন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’। ফলাফল কী হবে, এখনই বলা যাবে না। আবার কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেখানে তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য ঘুষ দেওয়া-নেওয়া হয়।
আখতার আহমেদ বলেন, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব।
নগর দারিদ্র্য: বিনায়ক সেন বলেন, নগর দরিদ্ররা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তবে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, নগর দরিদ্ররা গ্রামে চলে গেলে নগরের ওপর চাপ কমত, তাদের জীবনও আরও সুন্দর হতে পারত। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কয়েক বছর আগে নগর দরিদ্রদের জন্য অস্থায়ীভাবে নগরে জমি বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছিল। একে ‘সর্বনাশা প্রস্তাব’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক কষ্টে তা রোধ করা গেছে। একবার বরাদ্দ দিলে তাদের আর উচ্ছেদ করা যেত না। রাজনৈতিক হলেও নানা প্রণোদনা দিয়ে নগর দরিদ্রদের গ্রামে পাঠানোর জন্য যে ‘ঘরে ফেরা কর্মসূচি’ হাতে নেওয়া হয়েছিল, তার অনেক সুফল পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষার উন্নয়ন: মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, শিক্ষা এবং একমাত্র শিক্ষার উন্নয়নই হতে পারে দারিদ্র্য নিরসনের অন্যতম উপায়। এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে তা-ই হয়েছে। তিনি বলেন, কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কর্মসংস্থানের বিশাল আয়োজন করা না গেলে কিছুই হবে না।
অথচ বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ তিন বছর ধরেই কমছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের যে ধারণা, তাতে এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না।’
আখতার আহমেদ বলেন, শিক্ষা খাতে বৃত্তিজাতীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু পুষ্টির বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত। অথচ শিক্ষা ও পুষ্টি—এ দুই খাতেই সমান নজর দিতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারলে এর চেয়ে বেশিও অর্জন করা সম্ভব।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: সব পরিকল্পনার মধ্যেই জনসংখ্যাকে রাখতে হবে বলে মনে করেন এ কে এম নুরুন্নবী। তিনি বলেন, কোনো ক্ষেত্রেই সঠিক কোনো তথ্য নেই। কারণ, সরকারি উৎসগুলোর মধ্যেই সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধনটাও কার্যকরভাবে করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার-ব্যবস্থাকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
নুরুন্নবী আরও বলেন, এখন থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যথাযথ পদক্ষেপ না নিতে পারলে আগামী ১০ বছরে দেশ বয়স্ক লোকের ভারে ভরে যাবে। শুরু হয়ে যাবে অরাজকতা।
কিছু পরামর্শ: হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে যায় হঠাৎ অসুখ বিসুখে পড়লে, ওষুধের খরচের কারণে। অথচ এ বিষয়ে কোনো কর্মসূচি নেই। অক্টোবর-নভেম্বরে মৌসুমি দরিদ্রদের কোনো কাজ থাকে না। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ও মানুষের কিছু করার থাকে না। তাদের জন্যও কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল একেবারে না খাওয়াটাই ছিল সমস্যা। এখন সমস্যা পুষ্টিহীনতা।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সরকারের ওপরই চাপটা বেশি। সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম বিত্তশালীদের এ ব্যাপারে চাপ দেয় না। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কেন তাঁদের অনীহা বুঝতে পারছি না।’
ফরাসউদ্দিন আরও বলেন, ২০০১ সালের হিসাবে দেশে ১৪ লাখ প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।
বিনায়ক সেন বলেন, ধনিক শ্রেণীর সম্পদের ওপর থেকে কর আদায় করে তা সহজেই সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে ব্যয় করা যায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s