অর্থনৈতিক হতাশাবাদ প্রসঙ্গে আরও একবার

বিনায়ক সেন
দ্রুত উপরে উঠছে বাংলাদেশ?

দৈনিক বণিক বার্তা খুলে শিরোনাম দেখলাম ‘ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ’। কিছুকাল আগেও যারা বাংলাদেশ নিয়ে প্রবল হতাশায় ভুগছিলেন দেশটিকে পারলে ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্রের তালিকায় ফেলে দিচ্ছিলেন তাদের নিরন্তর সংশয়বাদের বিপরীতে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক এইচএসবিসির ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ২০৫০ : ফ্রম দ্য টপ ৩০ টু দ্য টপ ১০০’ গবেষণা প্রতিবেদনে আগামী চার দশকে চীন, ভারতসহ ২৬টি দেশ দ্রুতগতিতে বড় হবে। বাংলাদেশ এর অন্যতম।

এইচএসবিসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে কেমন? চলতি দশকে দাঁড়াবে ৩.৬ শতাংশ, ২০২০-৩০ দশকে ৪.৪ শতাংশ, ২০৩০-৫০ পর্বে ৫ থেকে ৫.৫ শতাংশ। চলতি দশকের জন্য এই প্রক্ষেপণ ২০০০-এর দশকে অর্জিত মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় বরং সামান্য কম [গত দশকে ছিল প্রায় ৪.৩ শতাংশ]। এর থেকে দুটো দিক বের হয়ে আসে : এক. গত এক দশকে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার [উন্নয়নের গতি] বিশ্ব মাঝে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল এবং এ কারণেই বাংলাদেশকে ২০০০-২০৫০ সালের সম্ভাব্য অগ্রযাত্রা বিবেচনায় ‘দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী অর্থনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুই. প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনায় খুব স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিকোণে সব সময় আটকে থাকলে একটা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে যাচাই করা যায় না।

এদেশের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে, আজও নৈরাশ্যবাদ ও আশাবাদ উভয়ের ক্ষেত্রেই আমাদের বিদেশি বিশেষজ্ঞ বা প্রতিষ্ঠানের সাক্ষ্য মানতে হচ্ছে। সত্তরের দশকে কিসিঞ্জার এদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন বলে কথিত আছে; অন্যরা বলেছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে ‘উন্নয়নের টেস্ট কেইস’। এই শেষোক্ত কথাটি যারা বলেছিলেন সেই ফাল্যান্ড ও পারকিনসন এরই মধ্যে তাদের মত

বদল করেছেন, এমনকি কিসিঞ্জারও তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়েছেন। তার ‘অন চায়না’ শীর্ষক সাম্প্রতিক বইয়ে চীন সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, চীন থেকে স্বল্প মজুরিভিত্তিক যেসব রফতানিন হতো তা ক্রমেই ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের নিরন্তর সংশয়বাদ আরও প্রবলতর আকার ধারণ করছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশের জন্য বোধকরি একই সঙ্গে এত তীব্রভাবে আশা ও নিরাশার পূর্বাভাস উচ্চারিত হয়নি।

২. আধুনিক ও সনাতনী হতাশাবাদ

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘আধুনিক’ হতাশাবাদের মূল কারণ রাজনৈতিক। একে ‘আধুনিক’ তথা ভিন্ন চরিত্রের মনে করেছি কেননা ‘সনাতনী’ হতাশাবাদের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক। ফাল্যান্ড-পারকিনসন যখন এদেশকে ‘টেস্ট কেইস’ ভেবেছিলেন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জিম বয়েস যখন ‘অচলাবস্থা’ দেখেছিলেন কৃষি খাতে, ডেমোগ্রাফার মিড কেইন যখন জনসংখ্যা বিস্ফোরণের মধ্যে পর্যুদস্ত দেখেছিলেন সকল উন্নয়ন প্রয়াসকে, ইতিহাসবিদ ভ্যান শ্যান্ডেল যখন মনে করেছিলেন বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে দেখা দেবে দুর্ভিক্ষ, তখন তা অর্থনৈতিক যুক্তিতেই বলেছিলেন। এমনকি আমরাও যখন আশির দশকে অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম, তখন [বর্তমান লেখকসহ] ভাবতাম এদেশ সেভাবে কখনও উঠে দাঁড়াবে না কোনো র‌্যাডিকেল রাজনৈতিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া। বা উঠে দাঁড়ালেও তা হবে ক্ষণকালের জন্য উত্থান, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আবার তা তলিয়ে যাবে নিচে। নইলে গার্মেন্ট শিল্পের অমিত সম্ভাবনাময় বিকাশ আশির দশকেই কেন আমরা অনুমান করতে পারিনি? কেন আমরা বুঝতে পারিনি যে লুটেরা ধনিক শ্রেণীর একাংশ_ ড্যানি রডরিকের ‘সেল্ফ ডিসকভারি’র ফর্মুলা মেনে পরিণত হবে উৎপাদনশীল ধনিকে? গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যরেখার নিচের মানুষের অনুপাত গত দুই দশকে প্রায় অর্ধেক কমে যাবে কেন তার আন্দাজ পাইনি আগে? সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৮৪ সালে ক্ষেতমজুর সমিতি দাবি জানিয়েছিল যে ক্ষেতমজুরদের অন্তত ৩ কেজি চালের সমান মজুরি দিতে হবে; আজ ২০১২ সালে এসে দেখছি এই ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বাজারেও ক্ষেতমজুররা যা উপার্জন করছেন তা ৬ কেজি চালের উপরে উঠে গেছে। মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে এবং সেই সূত্রে স্বাস্থ্য-পুষ্টি সূচকে শুভ প্রভাব পড়বে_ এটা আমরা অনুমান করতে পেরেছিলাম নব্বই দশকের গোড়াতেই। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষার হার ছেলেদের অর্জনকে ছাড়িয়ে যাবে, এটা ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু কেন? লেনিন তার গোড়ার দিকের একটি রচনায় নারফনিকদের নিরন্তর হতাশাবাদের বিরুদ্ধে জোর কলম ধরেছিলেন। কেননা মার্কসের মতো তিনিও মানতেন যে, প্রাক-পুঁজিবাদের মধ্যে আটকে না পড়ে পুঁজিবাদের আধুনিক অস্থিরতাকে বরং আশ্রয় করা ভালো। আমাদেরও ভাবতে হবে, আমরা যারা নিরন্তর হতাশাবাদী তারা কি এখনও আমাদের রাষ্ট্রকে ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র মনে করি? আমরা কি সত্যি সত্যি মনে করি যে গণতন্ত্রের দুই দশক পরে এই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা আজ অন্তর্হিত? নাকি সেই সম্ভাবনা কখনও ছিল না এই রাষ্ট্রের জেনেটিক কোডে? যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের দরজা কুলুপ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে, তাদের দরজা বাইরে থেকে খোলা সহজ নয়_ এ রকম একটা কথা সূরা বাকারার শুরুতে আছে।

৩. নিটশের সুপার-হিউম্যান তত্ত্ব ও প্রধানমন্ত্রী

আমার ধারণা, আমরা আজ যে আধুনিক হতাশাবাদ দেখছি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার মূল কারণ রাজনৈতিক। আমরা রাষ্ট্রের তথা সরকারের রাজনৈতিক সমালোচনা করছি অর্থনৈতিক সূচক ব্যবহার করে। ফলে যে সব সূচকে অর্থশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে হতাশার কোনো কারণ নেই সেখানেও আমরা আশাহীনতার অন্ধকার খুঁজে বেড়াচ্ছি এবং এজন্য রাষ্ট্রের সমালোচকদের শুধু দায়ী করাটা অন্যায় হবে। রাষ্ট্র নিজেই এমন সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, যা সুশাসনের সরাসরি লঙ্ঘন।

আজ যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবার কাছে এসে বলতেন, গত দু-তিন বছরে অনেক সুশাসনগত ব্যত্যয় ঘটেছে, যার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না এবং এসব ঘটনার যাতে আর পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যবস্থা নেবেন, তাহলে হয়তো অর্থনৈতিক সমালোচনার সুরও অনেকটা বদলে যেত। মিডিয়াকে স্বাধীনভাবে চলতে দিয়েও তার প্রতি সহৃদয় আচরণ না করা, আইন-শৃঙ্খলার বড় বড় বিপর্যয়ের ঘটনায় ত্বরিত ব্যবস্থা না নেওয়া, বিরোধী দলের প্রধান নেত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীলতা ও সম্মান প্রদর্শন না করা, অধ্যাপক ইউনূসসহ সিভিল সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বদের যাতে কোনো কারণে সম্মানহানি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা, সরকারের অর্থনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এসব ব্যক্তিত্বের মতামত মন দিয়ে শোনা ও তা যতটা সম্ভব আমলে নেওয়া, অতীতে কে বা কারা কীভাবে বা কখন কী বলেছিলেন সে কথা ধরে বসে না থেকে কে দীর্ঘমেয়াদের বন্ধু তা বোঝার মত প্রজ্ঞা ও উদারতা দেখানো, গরিব-মেহনতি মানুষের জীবন কীভাবে কাটছে তা দেখার জন্য মাঝে মাঝে মাঠ পর্যায়ে [প্রয়োজনে আরব্য রজনী খ্যাত আব্বাসীয় বাদশাহ হারুনুর রশিদের মতো ছদ্মবেশে] গিয়ে সরেজমিন অভিজ্ঞতা নেওয়া, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন কেবল নয়, এসব প্রতিবেদন যাচাইয়ের জন্য হলেও দলীয় রাজনৈতিক নেতা ও তাদের সহযোগীদের সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ের জনগণের [এমনকি দলের সাধারণ সদস্যদের] মতামত গত দু’বছরে কত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে তা সরাসরি নিজ কানে শোনার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এই ডিজিটাল যুগে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় যে ঢাকা ছেড়ে মফস্বলে, মাঠে, বাজারে যেতে হবে তা নয়, ঢাকায় বসেই নিয়মিতভাবে তিনি দ্বৈবচয়নে মনোনীত জেলা ও উপজেলায় দলের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার আশঙ্কাজনক হ্রাসের খবর জানতে পারতেন, কারা এর জন্য দায়ী সে সম্পর্কে তার কাছে জনগণই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরতে পারত এবং তিনিও বুঝতে পারতেন খেলার এই হাফ-টাইমে সরকারের ও দলের কোথায় কী পরিবর্তন আনতে হবে। তারপরও হয়তো শেষরক্ষা হবে না আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সরকারই পরপর দু’বার নির্বাচনে জিততে পারেনি; কিন্তু তার মনে হয়তো সান্ত্বনা থাকবে যে, যতটুকু সম্ভব ছিল তার পক্ষে তিনি তা করার চেষ্টা করেছেন।

দুঃখের বিষয়, শুধু যে উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেননি তা-ই নয়, এসব পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণ হিসেবে আবার তাকেই বেশি করে দায়ী করা হচ্ছে! এমনকি অর্থনীতির কিছু দুর্বিপাক, যেমন পদ্মা সেতু, অধ্যাপক ইউনূস, বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ কমে আসা, ভারতীয় বিনিয়োগ তথা তিস্তাসহ নানা অমীমাংসিত ইস্যু, চাই কি শেয়ারবাজারের প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তদের শাস্তি হওয়া এ সব কিছুর জন্যই সমালোচনার তীর ছোড়া হচ্ছে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর দিকেই বেশি বেশি করে। যত না এটা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে তার চেয়ে এটা বেশি করে বলা হচ্ছে অপ্রকাশ্যে। আমি জানি না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব তথ্য কেউ এরই মধ্যে জানিয়েছেন কি-না, বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব তথ্য তাদের কোনো প্রতিবেদনের অংশ করেছে কি-না। দেশের সব ঋণাত্মক নীতি, অসফলতা ও দুর্বিপাকের দায় কেন আমাদের গণতন্ত্রে কেবল প্রধানমন্ত্রীর ওপরেই বর্তাবে? নিটশের সুপার-হিউম্যান তত্ত্ব মানলেই কেবল কেউ এরকম চিন্তা করতে পারে। কেননা সুপার-হিউম্যান মানলেই কেবল পূর্ববর্তী সরকারের মতো দোষ বেগম জিয়া ও বর্তমান সরকারের যত দোষ-ত্রুটির দায়ভার শেখ হাসিনার কাঁধে চাপাতে পারি আমরা! ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’ ও সুপার-হিউম্যান তত্ত্ব এ দুটি পরস্পরবিরোধী ঝোঁক আমাদের গণতন্ত্রকে বারবারই এক বিপদসংকুল খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে।

৪. কৌটিল্য, আবুল ফজল ও সুশাসন

কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্রে’ রাজাকে প্রজাহিতৈষী হতে যেমন বলা হয়েছে, তেমনি তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জনগণের অবস্থা ও মনোভাব সম্পর্কে সার্বক্ষণিক পরিসংখ্যান সংগ্রহের জন্য। মৌর্য সাম্রাজ্যের এই তাত্তি্বক ও পরামর্শক বহু বছর আগে যা লিখে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রকার্য পরিচালনা সম্পর্কে তার মূল্য এখনও অপরিসীম। এর মধ্যে একটি সুদূরপ্রসারী পরামর্শ ছিল রাজন্যবর্গ, অমাত্য ও রাজ-কর্মচারীদের দুর্নীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের নিয়মিত পরিবীক্ষণ করার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ও তথ্যপ্রবাহের যুগে এ ধরনের পরিবীক্ষণের তথ্যাদি জনসমক্ষে তুলে ধরা একটি বাড়তি তাগিদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও তার দলের সব সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন তা স্বাধীনতার পর সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’-এর নজির বাদ দিলেও মধ্যযুগের খ্যাতনামা পণ্ডিত আবুল ফজলের যুক্তিও এ ক্ষেত্রে একই রূপ। রাহুল সাংকৃত্যায়ন লিখেছেন, “যদি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র আমাদের জন্য তৎকালীন রাজনীতি ও অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয়ের ভাণ্ডার হয়, আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ ও ‘আইনে-আকবরী’ তদপেক্ষাও অনেক বড় ভাণ্ডার।” সেই আবুল ফজল যিনি মারা গেলেন যুদ্ধক্ষেত্রে যুবরাজ সেলিমের [পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীর] প্ররোচনায়, যেমনটা মারা গিয়েছিলেন সেনেকা আততায়ীর হাতে। সেই আবুল ফজল, যার মৃত্যুতে শিশুর মতো কেঁদে উঠেছিলেন সম্রাট আকবর এবং তিনিও আবুল ফজলের মৃত্যুর তিন-চার বছরের মধ্যেই মারা যান। এটা ছিল সেই যুগ, যখন ভারতবর্ষ সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বিন্দুতে পেঁৗছেছিল এবং যখন ইউরোপে নেমে এসেছিল অন্ধকার, বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার যুগ। ব্রিটিশরা অবিভক্ত ভারতবর্ষের শাসনভার নেওয়ার পর প্রথমেই যেটা করে তা হলো আবুল ফজলের রচনাবলির অনুবাদ। যেমন আকবর তার আমলে আবুল ফজলকে বলেছিলেন সংস্কৃত থেকে ‘পঞ্চতন্ত্র’ হিতোপদেশসমূহ সহজ করে অনুবাদ করতে। জন স্টুয়ার্ট মিল যেমন নয় বছর না পেরোতেই পিতা জেমস মিলের কাছে শিক্ষা নিয়ে হয়ে উঠেছিলেন নানা ভাষায় পারদর্শী, আবুল ফজলও তার পিতা পণ্ডিত সুবরকের অধীনে শিক্ষা গ্রহণের ফলে দশ না পেরোতেই হয়ে ওঠেন আল্লামা এবং বিশ বছর বয়সে স্থান পান আকবরের মন্ত্রিসভায়। আমি সেই আবুল ফজলের কথা বলছি যার পরামর্শ ছিল বিদেশের ভাষা-প্রযুক্তি-আইডিয়ার কাছে দেশকে উন্মুক্ত করে দেওয়া, তেমনি স্বদেশের ভেতরে ধর্মীয় ভেদ, জাত-পাত, বিভিন্ন ভাষার দেয়াল ভেদ করে একটি মাল্টিপল আইডেন্টিটির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি সর্বত্রই তিনি তার পরামর্শের ছাপ রেখে গেছেন। তারই পরামর্শে আব্বাসীয় বাদশাহ হারুনুর রশিদের আমলের মতো মোগল বাদশাহ আকবরও তার নবরত্নের কাউকে নিয়ে ছদ্মবেশে বের হতেন দেশের অর্থনীতি ও জনগণের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে ও স্বকর্ণে শুনতে। এটাই ছিল ‘পার্টিসিপেটরি অবজারভেশনি’-এর ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশের ভবিষ্যৎ শাসকদের প্রতি আবুল ফজলের পহেলা সবক। সুশাসনের এসব উদাহরণ আমাদের দেশেই, আমাদের ইতিহাসেই রয়েছে। এর জন্য বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর হাত থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে কেন কেবল? বাইবেলে আছে, যা তোমার আছে তা-ই তোমাকে কেবল দেওয়া হবে। এখনও সময় পার হয়ে যায়নি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের ক্ষেত্রে শক্ত হাতে হাল ধরার। ভুল-ত্রুটির জন্য জনগণের কাছে খোলা মনে দাঁড়িয়ে দেশের সমস্যাগুলো তুলে ধরে বিরোধী দলের সঙ্গে মিলে-মিশে একটি সহনীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার। আমাকে অনেকেই বলেছেন, এটা একটা স্বপ্ন কেবল এটা কখনও বাস্তবায়িত হওয়ার নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, তিনি শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়তে রাজি নন মানুষের ওপর থেকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s